সুওয়াল – জাওয়াব বিভাগ

সংখ্যা: ১৯৬তম সংখ্যা | বিভাগ:

খন্দকার সেলিম আহমদ

পাহাড় কাঞ্চনপুর, টাঙ্গাইল

 

সুওয়াল: হাটহাজারী মাদরাসা থেকে প্রকাশিত অখ্যাত মাসিক পত্রিকা ফেব্রুয়ারী-২০০৫ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-সমাধান বিভাগে, মাসিক আল বাইয়্যিনাত-অক্টোবর ২০০৩ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রদত্ত æমীলাদ-ক্বিয়াম” সম্পর্কিত বক্তব্যের সমালোচনা করতে গিয়ে  এবং একই বিষয়ে এপ্রিল-২০০৫ ঈসায়ী ও মে-২০০৫ ঈসায়ী সংখ্যায় এছাড়াও মাসিক মদীনা পত্রিকা ফেব্রুয়ারী-২০০৫ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে একই ধরনের জাওয়াব দেয়া হয়েছে।

তাদের বক্তব্যগুলোর মধ্যে যে বিষয়গুলো আমার নিকট সন্দেহজনক তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

যেমন, মে-২০০৫ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-সমাধান বিভাগে বলা হয়েছে, æসমাজে বহুল প্রচলিত যে মীলাদ দেখা যায়, তা সম্পূর্ণ কুরআন সুন্নাহর খিলাফ, যা কোন দিন ভালো কাজ হতে পারে না।” …

এখন আমাদের সুওয়াল হলো, সমাজে বহুল প্রচলিত যে মীলাদ শরীফ দেখা যায়, সে সম্পর্কে তাদের উল্লিখিত বক্তব্য কতটুকু দলীলসম্মত? কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের দৃষ্টিতে দলীলভিত্তিক জাওয়াব দিয়ে আমাদের আক্বীদা, আমল হিফাযতে সহায়তা করবেন বলে আমরা আশাবাদী।

জাওয়াব: সমাজে বহুল প্রচলিত মীলাদ শরীফ ও ক্বিয়াম শরীফ সম্পর্কে হাটহাজারী মাদরাসার অখ্যাত মাসিক পত্রিকার জিজ্ঞাসার সমাধানে এবং অপর একটি পত্রিকার প্রশ্নোত্তর বিভাগে যা বলা হয়েছে তা শুদ্ধ তো হয়ইনি, বরং সম্পূর্ণই মিথ্যা, ভুল, মনগড়া ও দলীলবিহীন এবং অনুসরণীয় ইমাম-মুজতাহিদ ও ফক্বীহগণের সর্বজনমান্য ও স্বীকৃত বিশ্ব বিখ্যাত ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাবসমূহের বক্তব্যের বিপরীত ও বিরুদ্ধমত। যা ইতঃপূর্বে আমাদের æমাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ”-এর অনেক সংখ্যায় খ-ন করে সঠিক ও দলীলভিত্তিক জাওয়াব দেয়া হয়েছে। আর æমাসিক আল বাইয়্যিনাত শীরফ”-এর জাওয়াবকে খ-ন করা হাটহাজারী মৌলভী ছাহেবদের পক্ষে আদৌ সম্ভব হয়নি, হবেও না ইনশাআল্লাহ।

এরপরেও হাটহাজারীর মৌলভী ছাহেব এবং তাদের সকল সমজাতীয়রা বার বার ‘মীলাদ শরীফ ও ক্বিয়াম শরীফ’ সম্পর্কে বিনা তাহক্বীকে ও বিনা দলীলে উক্ত ভুলেরই পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছে।

(ধারাবাহিক)

যেমন, উল্লিখিত প্রথম বক্তব্যের প্রথমেই তারা বলেছে, æসমাজে বহুল প্রচলিত যে মীলাদ দেখা যায়  তা সম্পূর্ণ কুরআন সুন্নাহর খিলাফ, যা কোন দিন ভালো কাজ হতে পারে না।” নাউযুবিল্লাহ।

এর জাওয়াবে বলতে হয় যে, কুরআন শরীফ-এর কোন আয়াত শরীফ-এ ‘সমাজে বহুল প্রচলিত মীলাদ শরীফকে কুরআন শরীফ-এর খিলাফ বলা হয়েছে এবং হাদীছ শরীফ-এর কোন হাদীছ শরীফ-এ ‘সমাজে বহুল প্রচলিত মীলাদ শরীফকে সুন্নাহ বা হাদীছ শরীফ-এর খিলাফ বলা হয়েছে, তা হাটহাজারী মৌলভী ছাহেবরা কুরআন শরীফ-এর আয়াত শরীফ, হাদীছ শরীফ-এর ইবারতসহ দলীল উল্লেখ করেনি। সুতরাং তাদের দলীলবিহীন, ইবারতবিহীন, মনগড়া ও মিথ্যা বক্তব্য মোটেই গ্রহনযোগ্য নয়।

নি¤েœ কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস এবং বুযুর্গদের আমল দ্বারা প্রমাণিত বিস্তারিত দলীল-আদিল্লাহ পেশ করা হলো-

স্মরণীয় যে, মীলাদ শরীফ ও ক্বিয়াম শরীফ-এর মূল উদ্দেশ্য হলো সংক্ষেপে আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার ছানা-ছিফত ও বিলাদত শরীফ সম্পর্কে আলোচনা করা এবং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার প্রতি ছলাত-সালাম পাঠ করা।

এক কথায় মীলাদ শরীফ ও ক্বিয়াম শরীফ-বলতে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত ও আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার ছানা-ছিফত, তা’রীফ, প্রশংসা, উনার মু’জিযা বর্ণনা, বিলাদত শরীফ-এর আলোচনা, না’ত, শে’র, কাছীদা শরীফ পাঠ ও উনার প্রতি ছলাত ও সালাম  প্রেরণ করা ইত্যাদি পাঠ করা হয়।

যেমন- মীলাদ শরীফ-এর প্রথমেই কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা হয়।

অতঃপর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার উপর ছলাত পাঠ করা হয়। কারণ ছলাত পাঠ করা আল্লাহ পাক ও উনার রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনাদেরই নির্দেশ।

তাছাড়া আমরা যেভাবে মজলিস করে মীলাদ শরীফ-এর মাহফিল করে থাকি তা খোদ আল্লাহ পাক-উনার হাবীব, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের যামানাতেই ছিল।

যেমন এ সম্পর্কে হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে-

عن ابن عباس رضى الله تعالى عنهما انه كان يحدث ذات يوم فى بيته وقائع ولادته صلى الله عليه وسلم لقوم فيستبشرون ويحمدون الله ويصلون عليه صلى الله عليه وسلم فاذا جاء النبى صلى الله عليه وسلم قال حلت لكم شفاعتى.

অর্থ: æহযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা উনার নিজগৃহে সমবেত ছাহাবী উনাদেরকে আল্লাহ পাক-উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার বিলাদত শরীফ-এর ঘটনাসমূহ শুনাচ্ছিলেন। এতে শ্রবণকারীগণ আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করছিলেন এবং আল্লাহ পাক-উনার প্রশংসা তথা তাছবীহ-তাহলীল পাঠ করছিলেন এবং আল্লাহ পাক-উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার উপর (ছলাত-সালাম) দরূদ শরীফ পাঠ করছিলেন। এমন সময় হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সেখানে উপস্থিত হলেন এবং (মীলাদ শরীফ পাঠের অনুষ্ঠান দেখে) বললেন, তোমাদের জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব।” সুবহানাল্লাহ! (কিতাবুত তানবীর ফী মাওলিদিল বাশীর ওয়ান নাযীর, ছুবুলুল হুদা ফী মাওলিদে মুস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)

আরো ইরশাদ হয়েছে-

عن ابى درداء رضى الله تعالى عنه انه مرمع النبى صلى الله عليه وسلم الى بيت عامر الانصارى رضى الله تعالى عنه وكان يعلم وقائع ولادته صلى الله عليه وسلم لابنائه وعشيرته ويقول هذا اليوم هذا اليوم فقال عليه الصلوة والسلام ان الله فتح لك ابواب الرحمة والملائكة كلهم يستغفرون لك من فعل فعلك نجى نجتك.

অর্থ: æহযরত আবু দরদা রদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত আছে যে, একদা তিনি হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনিসহ আমির আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-উনার গৃহে উপস্থিত হয়ে দেখতে পেলেন যে, তিনি উনার সন্তানাদি এবং আত্মীয়-স্বজন, জ্ঞাতি-গোষ্ঠী, পাড়া-প্রতিবেশীদেরকে নিয়ে আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার বিলাদত শরীফ-এর ঘটনাসমূহ শুনাচ্ছেন এবং বলছেন, এই দিবস এই দিবস (অর্থাৎ এই দিবসে হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যমীনে তাশরীফ এনেছেন)।

এটা শুনে হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, æনিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা উনার রহমতের দরজা আপনার জন্য উন্মুক্ত করেছেন এবং সমস্ত ফেরেশতাগণ উনারা আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন এবং যে কেউ আপনার মত এরূপ কাজ করবে, আপনার মত সেও নাযাত (ফযীলত) লাভ করবে।” সুবহানাল্লাহ! (কিতাবুত তানবীর ফী মাওলিদিল বাশীর ওয়ান নাযীর, ছুবুলুল হুদা ফী মাওলিদে মুস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)

অতএব, উল্লিখিত বর্ণনা থেকে সুস্পষ্ট হলো যে, মীলাদ শরীফ ও ক্বিয়াম শরীফ শুধু ইজমা, ক্বিয়াস ও বুযূর্গ উনাদের আমল দ্বারাই প্রমাণিত নয় বরং মীলাদ শরীফ ও ক্বিয়াম শরীফ উভয়টি কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ দ্বারাই প্রমাণিত।

আর কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত কোন বিষয়কে নাজায়িয বলা প্রকাশ্য কুফরী। মুসলমান হয়ে যারা কুফরী করে শরীয়তের দৃষ্টিতে তারা মুরতাদ।

 

মুহম্মদ হুসাইন

নরসিংদী

সুওয়াল: মাসিক মদীনা নভেম্বর-২০০৯ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নি¤েœাক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপা হয়-

প্রশ্ন: মুসলমানগণ যে টুপি মাথায় পরেন তার আকৃতি সম্পর্কে যেমন গোল হওয়া চাই, না কিসতির মত লম্বা হওয়া চাই স্পষ্ট হাদীছ শরীফ আছে কিনা? হাদীছ শরীফ-এর নাম উল্লেখ করে জানাবেন আশা করি।

উত্তর: টুপি পরা সুন্নত। হযরত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম টুপি পরেছেন এবং পাগড়ী পরার সময় পাগড়ীর নিচে টুপি পরতে তাগিদ দিয়েছেন। টুপি এবং পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে তাই সুন্নত বলে স্বীকৃত যা সমকালীন নির্ভরযোগ্য ওলামা-মাশায়িখগণের মধ্যে সাধারণভাবে প্রচলিত। হাদীছ শরীফ-এ (শামায়িলে-তিরমিযী) বলা হয়েছে, হযরত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাথার টুপি ছিল চেপ্টা, যা মাথার সাথে লেগে থাকতো। সেই টুপির অনুকরণে ছাহাবীগণ এবং পরবর্তী যুগের ওলামা-মাশায়িখগণ কাপড়ের দ্বারা নির্মিত টুপি তৈরি করেছেন। কারো টুপি গোল ছিল, কারো টুপি কিসতি আকৃতির ছিল, কারো টুপি পাঁচ কল্লি বা তিন কল্লির ছিল। এইসব ধরনের টুপি যেহেতু ওলামা-মাশায়িখগণের মধ্যে প্রচলিত ছিল এবং এ যুগেও রয়েছে। সুতরাং এসব ধরনের টুপিই সুন্নত অনুযায়ী মনে করে পরা যেতে পারে। অনুসরণযোগ্য ওলামাগণের পছন্দনীয় পোশাকাদি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা অভিপ্রেত নয়।

মাসিক মদীনা পত্রিকার উক্ত প্রশ্নের উত্তরে যে বিষয়গুলো আমার কাছে আপত্তিকর মনে হয়, তাহলো-

১. আল্লাহ পাক-উনার রসূল, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে টুপি ও পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে কোন সুন্নতের বর্ণনা নেই।

২. টুপি ও পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদেরকে বাদ দিয়ে সমকালীন আলিমদেরকে অনুসরণ করতে হবে।

৩. শামায়িলে তিরমিযী-এর বরাতে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার নামে মিথ্যারোপ করা হয়েছে।

৪. হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত ‘কুম্মাতুন (كمة) ও বুতহুন (بطح) শব্দের মনগড়া অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

৫. হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণও কিসতি, পাঁচ কল্লি, তিন কল্লি টুপি পরিধান করেছেন।

৬. সমকালীন আলিমগণের মধ্যে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী আমল জারি থাকলেও সেটাই অনুসরণ করতে হবে। বিরোধিতা করা যাবেনা।

উপরোক্ত প্রতিটি বিষয়ের শরীয়তসম্মত জাওয়াব দিয়ে আমাদের ঈমান-আমল হিফাযতে সহায়তা করবেন বলে আমরা আশাবাদী।

জাওয়াব: মাসিক মদীনায় প্রদত্ত টুপি সম্পর্কিত প্রশ্ন-উত্তরের প্রেক্ষিতে আপনার চতুর্থ সুওয়াল হচ্ছে-

৪. হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত ‘কুম্মাতুন (كمة) ও বুতহুন (بطح) শব্দের মনগড়া অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এর জবাবে বলতে হয় যে, হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত হযরত নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার মুবারক টুপি সম্পর্কিত মাসিক মদীনার সম্পাদক মাহিউদ্দীনের উক্ত বক্তব্য ভুল, দলীলবিহীন, ডাহা মিথ্যা। কারণ মাসিক মদীনার সম্পাদক মাহিউদ্দীন হাদীছ শরীফ-এর মনগড়া অর্থ করে বলেছে, æহযরত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মাথা মুবারক এর টুপি মুবারক ছিল চেপ্টা। …..।

অথচ হাদীছ শরীফ-এর বর্ণিত ‘কুম্মাতুন (كمة) ও বুতহুন (بطح) শব্দের অর্থ হলো গোল টুপি। নি¤েœ হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত ‘কুম্মাতুন (كمة) ও বুতহুন (بطح) শব্দ সম্পর্কিত হাদীছ শরীফ দু’খানা উল্লেখ করে, হাদীছ শরীফে বর্ণিত æকুম্মাতুন (كمة) ও বুতহুন (بطح) শব্দের দলীলভিত্তিক সঠিক অর্থ উল্লেখ করা হলো। আর এতেই প্রমাণিত হবে যে, হযরত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার মুবারক টুপি সম্পর্কিত মাসিক মদীনার সম্পাদক মাহিউদ্দীনের উক্ত বক্তব্য ভুল, দলীলবিহীন, ডাহা মিথ্যা এবং সে একটা মূর্খ।

আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে টুপি মুবারকের বর্ণনা:

যেমন হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে-

عن عائشة عليها السلام قالت كانت له كمة بيضاء.

অর্থ: হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাদা রংয়ের গোল টুপি ছিল।’ (আদদিমিয়াতী, মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া লিল কুস্তলানী, শরহে মাওয়াহিব লিযযুরক্বানী)

উপরোক্ত হাদীছ শরীফ-এ কুম্মাতুন (كمة) শব্দ উল্লেখ আছে।

আর হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাদের থেকে টুপি মুবারকের বর্ণনা:

যেমন হাদীছ শরীফ-এ উল্লেখ আছে-

عن ابى كبشة رضى الله تعالى عنه قال كان كمام اصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم بطحا.

অর্থ: হযরত আবু কাবশা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছাহাবীগণের টুপি ছিল গোল।’ (তিরমিযী, মিশকাত, মিরকাত, লুময়াত, আশয়াতুল লুময়াত, শরহুত ত্বীবী, তা’লীকুছ ছবীহ, মুযাহিরে হক্ব)

উপরোক্ত হাদীছ শরীফ-এ বুতহা (بطح) শব্দ উল্লেখ আছে।

‘কুম্মাতুন (كمة) ও বুতহুন (بطح) শব্দ এর

দলীলভিত্তিক লুগাতী তাহক্বীক্ব ও ব্যাখ্যা:

 

উল্লেখ্য, প্রথম দু’টি হাদীছ শরীফ-এ টুপির ক্ষেত্রে كمة ও كمام শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ হলো- গোল টুপি। যেমন উক্ত كمة ও كمام এর ব্যাখ্যায় বিখ্যাত মুহাদ্দিছ ইমামুল মুহাদ্দিছীন, হযরত ইমাম মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিখ্যাত কিতাব ‘মিরকাত শরহে মিশকাত’-এর ৮ম খ-ের ২৪৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-

(كمام) بكسر الكاف جمع كمة بالضم كقباب وقبة وهى قلنسوة المدورة سميت بها لانها تغطى الرأس

অর্থ: ‘(كمام) কিমামুন কাফের নীচে যের দিয়ে ইহা মূলত (كمة) (কাফের উপর পেশ) কুম্মাতুন-এর বহুবচন। আর কুম্মাতুন মূলত গোল টুপি উহা যেহেতু মাথাকে ঢেকে ফেলে তাই এ নামকরণ করা হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে বিশ্বখ্যাত আরবী লোগাত আল ক্বামুসুল মুহীত ও লিসানুল আরবে উল্লেখ আছে-

الكمة. قلنسوة مدورة لانها تغطى الرأس.

অর্থ: ‘কুম্মাতুন’ হলো গোল টুপি, কেননা তা মাথাকে ঢেকে রাখে।’

আর আরবী মশহুর ও বিখ্যাত অভিধান গ্রন্থ মিছবাহুল লুগাত ও আল মুনজিদে উল্লেখ আছে-

الکمة گول ٹوپی دہکنا

অর্থ: æ(الكمة) আল কুম্মাতুন অর্থ হলো- গোলা টুপি, আবৃত করা।”

কেননা হাদীছ শরীফে (كمة) কুম্মাতুন-এর সাথে (بطح) বুতহুন শব্দও উল্লেখ আছে। আর বুতহুন (بطح) শব্দের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত মুহাদ্দিছ, ইমামুল মুহাদ্দিছীন, হযরত ইমাম মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিখ্যাত কিতাব মিশকাত শরীফ-এর বিখ্যাত শরাহ æমিরকাত শরীফের” ৮ম খ-ের ২৪৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন,

(بطحا) اى كانت مبسوطة على رؤسهم لازقة غير مرتفعة عنها.

অর্থ: ‘‘বুতহা’’ এমন প্রশস্ত গোল টুপি যা মাথার সাথে উপর দিক থেকে মিলিত থাকে, মাথা হতে উঁচু বা ফাঁকা নয়।’’ অনুরূপ শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ্ ছবীহ্, মুযাহিরে হক্ব ইত্যাদিতেও উল্লেখ আছে।

আর হাদীছ শরীফ-এর বিখ্যাত কিতাব ‘ইবনুল আছীরে’ (بطح) ‘বুতহা’ শব্দের ব্যখ্যায় উল্লেখ করা হয়-

بطحا اى لازقة بالرأس غير ذاهبة فى الهواء.

অর্থ: æবুতহা” এমন গোল টুপি, যা মাথার সাথে মিলিত থাকে, বাতাসে উড়ে যায় না।

আর শায়খুল মাশায়িখ, শায়খুল হাদীছ, আশিকে রাসূল, আল্লামা শায়খ হযরত আব্দুল হক মুহাদ্দিছ, দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি (بطحا) (বুতহা) শব্দের ব্যাখ্যায় বলেন-

چپیدہ بسرنہ بلند رفتہ در ہوا بطحا نیز گویند یعنی بود کلاہائے ایشان مدور ومبسوط چپیدہ بسر  نہ در از و بلند بر رفتہ بجانب.

অর্থ: (بطحا) বুতহা শব্দের অর্থ হলো- মাথার সাথে লেগে থাকা, এরূপ উঁচু নয় যা বাতাসে উড়ে যায় এবং এ অর্থও করা যায়- এমন ধরণের গোল ও প্রশস্ত টুপি যা উপরের দিক থেকে মাথার তালুর সাথে চাপানো এবং মাথার সাথে লেগে থাকে। এমন উঁচু নয় যা বাতাসে উড়ে যায়। (আশায়াতুল লুময়াত)

হাদীছ শরীফ-এর উপরোক্ত বর্ণনা ও লুগাতী তাহক্বীকের দ্বারা এটাই প্রমাণিত হলো যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুম উনাদের টুপি মুবারক ছিল, গোল, সাদা যা চতুর্দিক থেকে মাথা মুবারকের সাথে লেগে থাকতো। তবে উক্ত গোল টুপি মুবারক কি ধরনের ছিল, তার সুন্দর ও সুস্পষ্ট বর্ণনা সম্পর্কে ‘মাজমুয়ায়ে মাল্ফুযাতে খাজেগানে চিশ্ত’- কিতাবের  ১ম বাবের ১০-১১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

حضرت حاضی شریف زندنی رحمہ اللہ علیہ .. ارشاد فرمایا کہ اے عثمان جبکہ تمنے کلاہ چھار ترکی سر پر رکھی ہے. لازم ہے کہ اسکا حق بجالاؤگے … حضرت خواجہء عالم صلی اللہ علیہ وسلم نے جس وقت سے اس کلاہ کو اپنی سر مبارک پر رکہا فقر وفاقہ اختیار کیا. بعد اسکے حضرت علی کرم اللہ وجہہ نے پہنا اور فقر وفاقہ کو اپنی ذات پر لازم گردانا. اسیطرح سلسلۃ مجھ تک پھنچا. (انیس الارواح)

অর্থ: ‘‘হযরত হাজী শরীফ জিন্দানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হে ওছমান হারুনী ! (রহমতুল্লাহি আলাইহি) যখন আপনি চার টুকরা বিশিষ্ট টুপি মাথায় পরিধান করেছেন, তখন আপনার জন্য তার হক্ব আদায় করা আবশ্যক। …. সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লাম তিনি যখন চার টুকরা বিশিষ্ট টুপি মাথা মুবারকে পরিধান করেন, তখন দারিদ্র্যতা ও উপবাসকে গ্রহণ করেন। তারপর হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু চার টুকরা বিশিষ্ট টুপি পরিধান করেন এবং দারিদ্র্যতা ও উপবাসকে নিজের জন্য জরুরী করে নেন। এরুপভাবে পর্যায়ক্রমে চার টুকরা বিশিষ্ট টুপি আমার নিকট পৌছে।’ (আনীসুল আরওয়াহ)

‘ইসরারুল আওলিয়া’ কিতাবের ১১৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, হে দরবেশগণ! চার টুকরা বিশিষ্ট গোল টুপিই প্রকৃত টুপি। হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বেহেশত হতে এ টুপি  এনে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে পরিধান করতে দিয়ে বলেন, আপনি পরিধান করুন এবং আপনি যাকে ইচ্ছা তাকে এ টুপি দান করে আপনার খলীফা নিযুক্ত করুন। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিয়্যীন হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি চার টুকরা বিশিষ্ট গোল টুপিটি মাথায় পরিধান করেন এবং পরবর্তীতে হযরত আবু বকর ছিদ্দীক্ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত ওমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু, হযরত উসমান যুন নূরাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাদেরকে একটি করে টুকরা দান করেন।’ (অনুরূপ আনীসুল আরওয়াতেও উল্লেখ আছে।)

খলীফায়ে আ’যম, শায়খে শুয়ুখিল আলম, সানাদুল মুওয়াহ্হেদীন, সুলতানুল আরিফীন, ওয়ারিছুন নবী ফিল হিন্দ, মুঈনুল মিল্লাত ওয়াশ্ শরা ওয়াল হুদা ওয়াদ্ দ্বীন, হাবীবুল্লাহ হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চীশ্তি, সানজিরী ছুম্মা আজমিরী রহমতুল্লাহি আলাইহি-উনার মালফূযাত সম্বলিত বিখ্যাত ও ইমামুল আইম্মা, হযরত ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি-উনার মালফূযাত সম্বলিত কিতাব æইসরারুল আওলিয়া’” নামক কিতাবের উক্ত বর্ণনা দ্বারা স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হলো যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও বিশিষ্ট ছাহাবী, খুলাফায়ে রাশিদীন রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুম উনারা  ‘চার টুকরা বিশিষ্ট গোল টুপি পরিধান করতেন। কাজেই চার টুকরা বিশিষ্ট গোল টুপিই হচ্ছে খাছ সুন্নতী টুপি। আর এ ধরণের সুন্নত সম্পর্কে হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে-

 عليكم بسنتى وسنة الخلفاء الرشدين المهديين, تمسكوا بها وعضوا عليها بالنواجذ

অর্থ: তোমাদের জন্য আমার ও খুলাফায়ে রাশিদীন উনাদের সুন্নত অবশ্যই পালনীয়, তোমরা মাড়ীর দাঁত দ্বারা মজবুতভাবে উক্ত সুন্নতগুলো আঁকড়িয়ে ধর” (মিশকাত, মিরকাত, শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ্ ছবীহ, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, মুযাহিরে হক্ব, মিরআতুল মানাযীহ)

অতএব প্রমাণিত হলো যে, সাদা রংয়ের গোল ও চার টুকরা বিশিষ্ট টুপিই পরিধান করা সন্নতে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সুন্নতে ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়ল্লাহু তায়ালা আনহুম ও সুন্নতে আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম। অর্থাৎ æচার টুকরা বিশিষ্ট সাদা ও গোল টুপিই হচ্ছে, খাছ সুন্নতী টুপি। কারণ আল্লাহ পাক-উনার রসূল, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের ও হযরত আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের টুপি ছিল-সাদা, গোল ও চার টুকরা বিশিষ্ট। এছাড়াও সাদা ও চার টুকরা বিশিষ্ট গোল টুপির বহু দলীল হাদীছ শরীফ ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ও অনুসরণীয় কিতাবসমূহে রয়েছে।

কাজেই, æহযরত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথার টুপি ছিল চেপ্টা” মাসিক মদীনার সম্পাদক মাহিউদ্দীনের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল, দলীলবিহীন, ডাহা মিথ্যা। পাশাপাশি এটাও প্রমাণিত হলো যে, মাসিক মদীনার সম্পাদক মাহিউদ্দীন হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত æকুম্মাতুন (كمة) ও বুতহুন (بطح) শব্দের দলীলবিহীন ও মনগড়া অর্থ করেছে। যা দ্বারা তার মূর্খতা প্রকাশ পেয়েছে।

অথচ হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত æকুম্মাতুন (كمة) ও বুতহুন (بطح) শব্দের অর্থ হলো গোল টুপি। এমন গোল টুপি যা মাথার চতুর্দিক থেকে এবং মাথার উপর দিক থেকে মাথার সাথে লেগে থাকতো, যা মাথা হতে উচু বা ফাঁক নয়।”

{বিঃ দ্রঃ æচার টুকরা বিশিষ্ট সাদা ও গোল টুপিই হচ্ছে, খাছ সুন্নতী টুপি। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ-এর ৫৩, ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭, ৫৮ ও ৫৯তম সংখ্যাগুলো পাঠ করলে টুপি সম্পর্কিত প্রশ্নোল্লিখিত বিষয়সহ যাবতীয় বিষয়ে সুস্পষ্ট দলীলভিত্তিক ফায়সালা পেয়ে যাবেন।}

 

মুসাম্মত সানজিদা আক্তার

সভানেত্রী- ছাত্রী আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত

মুহম্মদপুর, ঢাকা।

 

সুওয়াল: অখ্যাত মাসিক রাহমানী পয়গাম এপ্রিল/২০০৩ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-জবাব বিভাগে নিম্নোক্ত ১২৪৭ নম্বর জিজ্ঞাসার জবাব ছাপা হয়।

জিজ্ঞাসা: ছাহাবী আবু সাঈদ খুদরী ও আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা বলেন যে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন আমার মৃত্যুর পর পূর্ব দেশগুলির মধ্য হতে কোন একটি দেশ হতে আমার উম্মতের ভিতর হতে একটি দল বের হবে। এই দলের সদস্যগণ হবে অশিক্ষিত ও মূর্খ। এদের মধ্যে কোন শিক্ষিত লোক গেলে সেও হয়ে যাবে মূর্খের মত। তাদের বক্তৃতা হবে বহু বহু গুণের ফযীলতের। তাদের মত বক্তৃতা বা বয়ান কারো হবে না। …… তারা কুরআনের উপর আমল কিম্বা কুরআন প্রতিষ্ঠার একটু চেষ্টাও করবে না কখনো। উক্ত অখ্যাত পত্রিকা হাদীছ শরীফ ছহীহ স্বীকার করলেও মন্তব্য করেছে যে, প্রচলিত তাবলীগের কার্যক্রম পুরোপুরি শরীয়তসম্মত। ইসলাম পরিপন্থী কোন কিছু এতে নেই।

উক্ত অখ্যাত পত্রিকার উল্লিখিত æজিজ্ঞাসা-জবাবের” প্রেক্ষিতে আমার সুওয়াল বা জানার বিষয় হলো-

…. (৪) প্রচলিত ছয় উছূলী তাবলীগীদের পৃষ্ঠপোষকতায় বা পরিচালনায় যারা রয়েছে তারা সকলেই হক্কানী আলিম, তাদের এ দাবি কতটুকু সঠিক? আসলে হক্কানী আলিমের সংজ্ঞা বা পরিচিতি কি?

কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও ক্বিয়াসের দৃষ্টিতে উল্লিখিত সুওয়ালগুলোর দলীলভিত্তিক জাওয়াব দিয়ে আমাদের আক্বীদা, আমল হিফাযতে সহায়তা করবেন বলে আমরা আশাবাদী।

জাওয়াব: প্রচলিত ছয় উছূলী তাবলীগ জামায়াত সম্পর্কে উক্ত অখ্যাত পত্রিকার জবাব শুদ্ধ হয়নি। বরং ভুল, মনগড়া ও দলীলবিহীন হয়েছে।

তাই নিম্নে সুওয়ালে বর্ণিত বিষয়গুলোর দলীলভিত্তিক জাওয়াব দেয়া হলো-

ছয় উছূলী তাবলীগ সম্পর্কে প্রশ্নে উল্লিখিত অখ্যাত পত্রিকার অপব্যাখ্যা ও মিথ্যাচারিতার খ-নমূলক জবাব

প্রচলিত ছয় উছূলী তাবলীগ সম্পর্কে অখ্যাত পত্রিকার জিজ্ঞাসার জবাবের প্রেক্ষিতে আপনার চতুর্থ সুওয়াল হলো-

(৪) æপ্রচলিত ছয় উছূলী তাবলীগের পৃষ্ঠপোষকতায় বা পরিচালনায় যারা রয়েছে তারা সকলেই হক্কানী আলিম, তাদের এ দাবি কতটুকু সঠিক? আসলে হক্কানী আলিমের সংজ্ঞা বা পরিচিতি কি?

আপনার উক্ত সুওয়ালের প্রেক্ষিতে বলতে হয় যে, প্রচলিত ছয় উছূলীদের উক্ত দাবি সম্পূর্ণই অবান্তর, মিথ্যা ও দলীলবিহীন। কারণ গত দুই সংখ্যায় প্রদত্ত হক্কানী আলিমের সংজ্ঞা বা পরিচিতিমূলক আলোচনা দ্বারা অকাট্যভাবেই প্রমাণিত হয়েছে যে, হক্কানী আলিম বা সত্যিকার নায়িবে নবী তিনিই (১) যিনি ইসলামের প্রতিটি বিষয়ে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত অনুযায়ী আক্বীদা পোষণ করেন, (২) ইলমে ফিক্বাহ অর্জন করার সাথে সাথে একজন হক্কানী শায়খ বা মুর্শিদের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করে তাছাউফ চর্চা করত অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহভীতি বা তাক্বওয়া অর্জন করেছেন, (৩) অর্জিত ইলম অনুযায়ী পরিপূর্ণ আমল করেন, (৪) সুন্নতের পূর্ণ  পায়রবী করেন, (৫) হারাম-নাজায়িয ও শরীয়তবিরোধী কাজে লিপ্ত হননা। কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ-এর দৃষ্টিতে তাঁরাই আলিম বা নায়িবে নবী।

অথচ প্রচলিত ছয় উছূলীদের কথিত আলিমদের মধ্যে উল্লিখিত গুণাবলীসমূহের কোনটাই বিদ্যমান নেই। আমরা যদি উল্লিখিত পাঁচটি বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করি তবে বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হয়ে যাবে।

পূর্ব প্রকাশিতের পর

হক্কানী-রব্বানী আলিম হওয়ার জন্য চতুর্থ শর্ত হচ্ছে-

(৪) সুন্নতের পরিপূর্ণ ইত্তিবা বা অনুসরণ অনুকরণ করা।”

কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ শরীফ-এর আলোচনা দ্বারা স্পষ্টই প্রমাণিত হয়েছে যে, মহান আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার রিযামন্দী বা সন্তুষ্টি লাভ করতে হলে বা হক্কানী-রব্বানী আলিম হতে হলে, সুন্নতের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং হুবহু অনুসরণ-অনুকরণ করতে হবে। কারণ সুন্নতের খিলাফ আমল করে কখনোই হক্কানী-রব্বানী আলিম হওয়া সম্ভব নয়।

যদি তাই হয়ে থাকে তবে প্রচলিত ছয় উছূলীরা যে দাবি করে থাকে æছয় উছূলী তাবলীগের পরিচালনায় যারা রয়েছে তারা সকলেই হক্কানী আলিম” তাদের এ দাবি কি করে সত্য হতে পারে? তারা সবক্ষেত্রে সুন্নতের ইত্তিবা করা তো দূরের কথা পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেই তো সুন্নত থেকে অনেক দূরে। অর্থাৎ তাদের মাথার টুপি থেকে শুরু করে সবগুলোই সুন্নতের খিলাফ। সুন্নতী পোশাকের কয়েকটি বিষয় নিয়ে দলীলভিত্তিক আলোচনা করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে।

২. সুন্নতি ক্বমীছ বা কোর্তা

প্রচলিত ছয় উছূলীরা সাধারণত যে কোর্তা পরিধান করে থাকে তা খাছ সুন্নতী কোর্তা নয়। কেননা শরীয়তের দৃষ্টিতে সেটাই খাছ সুন্নতী ক্বমীছ বা কোর্তা- যেটা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পরিধান করেছেন। আর তা হলো নিছফুস সাক্ব পর্যন্ত লম্বা, গোল বা কোণা বন্ধ, সুতি কাপড়ের, সাদা রংয়ের কাপড়ের গুটলী বা বোতামওয়ালা। এধরনের ক্বমীছ বা কোর্তাসই খাছ সুন্নতী ক্বমীছ বা কোর্তা। নি¤েœ এ সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে দলীলভিত্তিক আলোচনা করা হলো।

সুন্নতী ক্বমীছ বা কোর্তার বর্ণনা

قميص ক্বমীছ শব্দটির শাব্দিক অর্থ হলো- কোর্তা, জামা ইত্যাদি। আর শরীয়তের পরিভাষায় ক্বমীছ বা কোর্তা হলো, যার গেরেবান আছে যা বন্ধ করার জন্য কাপরের গুটলী লাগানো হয় যা নিছফুস সাক্ব। অর্থাৎ হাঁটু ও পায়ের গিরার মধ্যবর্তী স্থান পর্যন্ত প্রলম্বিত। গোল যা কোণা ফাড়া নয়, যারা আস্তিন আছে, যা অতি সহজেই মানুষের সতর ও ইজ্জত আবরু ঢাকে। যেমন ‘আবু দাউদ শরীফ’-এর বিশ্ববিখ্যাত শরাহ ‘আউনুল মা’বূদ’-এর কিতাবুল লিবাসের ‘ক্বমীছ বা কোর্তার’ আলোচনা পর্বে উল্লেখ রয়েছে-

وجه احبيه القميص اليه صلى الله عليه وسلم انه استر للاعضاء عن الازار والرداء ولانه اقل مؤنة واخف على البدن ولابسه اكثر تواضعا.

অর্থ: æহুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনা নিকট ক্বমীছ বা কোর্তা সবচেয়ে পছন্দনীয় হওয়ার কারণ হলো: কেননা, ক্বমীছ ইযার বা লুঙ্গি ও রিদা বা চাদর অপেক্ষা সতরকে পরিপূর্ণভাবে ঢাকে। অথচ ক্বমীছ অল্প খরচে হয় শরীরের জন্য হালকা এবং এটা পরিধানে অধিক বিনয়-ন¤্রতা প্রকাশ পায়।” (অনুরূপ জামউল ওয়াসায়িল-এ উল্লেখ আছে)

قال المحقق ابو زرعة ولعله ماخوذ من الجلدة التى هى غلاف القلب فان اسمها القميص وهو اسم لما يلبس من المخيط الذى له كمان وجيب.

অর্থ: æমুহাক্কিক আবু যুরয়াহ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, মানুষের ক্বলব আবৃতকারী পর্দাকেও ক্বমীছ বলা হয়। কেননা, তা ক্বলবকে ঢেকে রাখে। ক্বমীছ হলো: যা সেলাই করে পরা হয়, যার দুটি আস্তিন ও একটি গেরেবান বা গলাবন্ধনি আছে।” (আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া শরহে শামায়িলে অনুরূপ আছে)

ক্বমীছের গেরেবান আটকানো গুটলী বা বোতাম কাপড়েরর হওয়াই খাছ সুন্নত। যাকে আরবীতে বলা হয় زر যিররুন। এর বহুবচন ازرار আযরারুন ও زرور যুরূরুন। যার অর্থ হলো, গুটলী, কাপড়ের তৈরি গুটলী বা বোতামা ইত্যাদি। যেমন- এ প্রসঙ্গে লুগাত বা অভিধানে উল্লেখ আছে যে-

گریبان کو بند کر نے کیلے کپٹے یدھا گے کے  گول بطے گھنٹی.

অর্থাৎ æকোর্তার গেরেবান বন্ধ করার জন্য কাপড় অথবা সুতার নির্মিত গোল গুটলী। (ফিরোযুল লুগাত, লুগাতে সাঈদী, লুগাতে হিরা, গিয়াছুল লুগাত ইত্যাদি)

আল্লামা হযরত জালালুদ্দীন রূমী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মছনবী শরীফে লিখেছেন-

پر اہن تا نصف ساق وبے شرکاف+ ہست بہترنیز مسنون بے خلاف

অর্থ: æক্বমীছ বা কোর্তা নিছফুস সাক্ব পর্যন্ত এবং ফাড়াবিহীন অর্থাৎ কোণাবন্ধ, গোল হওয়াই খাছ সুন্নত। এর ব্যতিক্রম হলে তা খিলাফে সুন্নত হওয়ায় উত্তম হবে না।”

দেওবন্দ মাদরাসার মুহাদ্দিছ, মাওলানা আছগর হুসাইন দেহলবী æগুলজারে সুন্নত” কিতাবে লিখেছে-

سنت قمیص  یعنی کرتہ حدیث  میں ہے کرتہ حضور اکرام صلی اللہ علیہ وسلم کا محبوب لباس تھا لمبای میں اس کی مقدار گھٹنے سے نیچے ٹخنے کی اوپر ہونی چا ہے جو کرتہ اں حضرت صلی اللہ علیہ وسلم اور صحابہ کر ام کا معمول تھا وہ بغیر ثگاف کے تھا لہزا گول نصف ساق کرتہ ہی مسنون ہے ثگاف دارجامہ جتنا لمبا ہو ہرگز سنت ادا نہ ہوگی.

অর্থ: æসুন্নতী ক্বমীছ বা কোর্তার বর্ণনা- হাদীছ শরীফ-এ উল্লেখ আছে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার নিকট ক্বমীছ অধিক পছন্দনীয় ছিল। ক্বমীছ হাঁটুর নিচ ও টাখনুর উপর পর্যন্ত প্রলম্বিত হওয়া চাই। যে ক্বমীছ বা কোর্তা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ও হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা পরিধান করতেন, তা কোনা ফাঁড়া ছিল না। তাই গোল, নিছফুস সাক্ব ক্বমীছ বা কোর্তাই সুন্নতী কোর্তা। কোণা ফাড়া কোর্তা যতই লম্বা হোকনা কেন, তাতে কখনোই সুন্নত আদায় হবেনা।”

শামায়িলুত তিরমিযীর বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ æশরহুল মানাবী মিছরী” কিতাবে উল্লেখ আছে-

القميص ثوب مخيظ بكمين غير مفرج

অর্থ: æক্বমীছ সিলাইযুক্ত হবে, যার দুটি আস্তিন থাকবে। কোণা ফাড়া হবে না তথা গোল হবে।” (অনুরুপ মিরকাত শরীফেও আছে)

এ সম্পর্কে জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ১৪০তম সংখ্যা পাঠ করুন।

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, প্রচলিত ছয় উছূলীরা সুন্নতী ক্বমীছ বা কোর্তার ক্ষেত্রে সুন্নতের ইত্তিবা করে না। বরং সুন্নতের খিলাফ আমল করে থাকে। সুন্নতের খিলাফ আমল করে হক্কানী আলিম দাবি করা মিথ্যাচার নয় কি? (চলবে)

 

মুহম্মদ রাশেদুল আবেদীন,

৮৪-৩৪, ১৬৯ স্ট্রিট, দ্বিতীয় তলা, জানাইকা

এনওয়াই, ১১৪৩২, ইউএসএ-২০৩৪

 

সুওয়াল: কোন নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম কিংবা কোন আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের ওসীলা দিয়ে দোয়া করা জায়িয কিনা?

আমাদের এখানে কতিপয় মাওলানা ফতওয়া দিয়েছেন যে, কোন নবী-রসূল, আওলিয়া তো দূরের কথা, স্বয়ং আল্লাহ পাক-উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার ওসীলা দিয়েও কোন দোয়া বা আরজি পেশ করা জায়িয নেই। (নাঊযুবিল্লাহ)

এখন আমাদের জানার বিষয় হলো, কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ এবং ইজমা-ক্বিয়াসে ওসীলা দিয়ে দোয়া করা জায়িয থাকলে তার দলীল-আদিল্লাহ পেশ করে আমাদের ঈমান-আমল হিফাযত করবেন বলে আশা রাখি।

জাওয়াব: হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম কিংবা কোন আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের ওসীলা দিয়ে দোয়া করা অবশ্যই জায়িয। শুধু জায়িযই নয় বরং দোয়া কবুল হওয়ার কারণও বটে। এমনকি উনাদের অজুদ মুবারক, উনাদের নাম মুবারক ও উনাদের তবারুকসমূহও সৃষ্টিরাজির জন্যে মহান ওসীলা। এটা কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের দ্বারা প্রমাণিত।

কাজেই, যারা বলবে, নবী-রসূল ও ওলী-আওলিয়ায়ে কিরাম উনাদের ওসীলা দিয়ে দোয়া বা আরজি পেশ করা জায়িয নেই, তারা কাদিয়ানী অথবা তারা হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত ৭২টি বাতিল ফিরক্বার কোন না কোন একটির অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ তারা ওহাবী, খারিজী, শিয়া, মু’তাজিলা, মুশাবিহা, মওদুদী, জামাতী, দেওবন্দী, তাবলীগী, সালাফী, লা-মাযহাবী ইত্যাদির অন্তর্ভুক্ত। তারা আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের অন্তর্ভুক্ত নয়।

নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম ও আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের ওসীলা গ্রহণ করা প্রসঙ্গে কালামুল্লাহ শরীফ-এর বহু আয়াত শরীফ-এ এবং বহু হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে। যার বর্ণনা বিগত সংখ্যাগুলোর মধ্যে পেশ করা হয়েছে।

মূলত হযরত ছাহাবা আজমাঈন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা এবং সমস্ত উম্মতের ইজমা বা ঐকমত্য এবং আক্বীদা হলো যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমগ্র সৃষ্টির জন্য মহান ওসীলা এবং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার তোফায়েলে ওলীগণ উনারাও ওসীলা।

যারা নবী ও ওলী উনাদের ওসীলা গ্রহণকে অস্বীকার করে থাকে এরা দু’শ্রেণীতে বিভক্ত। এক শ্রেণী হচ্ছে, যারা ওসীলাকে একচ্ছত্রভাবে অস্বীকার করে থাকে।

আর কেউ কেউ রয়েছে যারা কেবল বিছালপ্রাপ্ত বুযুর্গ উনাদের ওসীলাকে অস্বীকার করে। তবে জীবিত বুর্যুগ উনাদের ওসীলাকে সমর্থন করে।

এবং এ উভয় শ্রেণী ওসীলা গ্রহণের উপর অর্থাৎ ওসীলার বিরুদ্ধে যেসব প্রশ্ন উপস্থাপন করে দলীল ও যুক্তি প্রদান করে থাকে সেসব প্রশ্নের খ-নমূলক জাওয়াব পেশ করা হলো।

১০. ওসীলা অস্বীকারকারীদের প্রশ্ন:

ওসীলার মাসয়ালা দ্বারা মানুষ অসৎ হয়ে যাবে যখন জানতে পারবে যে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তাদের ক্ষমা করিয়ে দিবেন তখন আমল করার কষ্ট কেন করবে?

এর জাওয়াব হলো: এ প্রশ্নটি এমন যেমন ‘আরিয়া’ নামের একটি ভ্রান্ত সম্প্রদায় বলে থাকে যে, তওবার মাসয়ালা দ্বারা অপকর্ম এবং যাকাতের মাসয়ালা দ্বারা বেকারত্ব বেড়ে যায়। কেননা যখন মুসলমানগণ জানে যে তওবার দ্বারা গুনাহ মাফ হয়ে যায় তখন অধিক গুনাহ করে তওবা করে নেবে। আর যখন দরিদ্র ব্যক্তির জানা আছে যে ধনী ব্যক্তিদের বাৎসরিক লক্ষ লক্ষ টাকা যাকাত এসে থাকে তখন রোজগার কি জন্য করবে? যখন বিনা পরিশ্রমে টাকা পাওয়া যাচ্ছে তখন পরিশ্রম করার প্রয়োজন কি? এটাই হলো উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তর।

মূলত তওবা কবুল হওয়া যেমন নিশ্চিত নয় তদ্রƒপ সম্পদশালীদের যাকাত পাওয়াও নিশ্চিত নয়।

অনুরূপভাবে যদি অপকর্ম করা হয় তাহলে নিশ্চিত নয় যে ওসীলা নসীব হবে কিনা। বরং ওসীলা অস্বীকার করায় অপকর্ম বেড়ে যাবে। কেননা গুনাহগার যখন শাফায়াত থেকে নিরাশ হবে তখন ইচ্ছামত গুনাহ করবে। কারণ দোযখে যখন যেতেই হবে তখন আরও বেশি গুনাহ করে যাবে। নাঊযুবিল্লাহ! আল্লামা হযরত শায়খ সা’দী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন-

نہ بینی کہ چوں گربہ عاجز شور

بر  آرد بچنگا چشم پلنگ

অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত বিড়ালের প্রাণ বাঁচার আশা থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত বাঘ থেকে পালায় কিন্তু যখন আটকে গিয়ে প্রাণের আশা ছেড়ে দেয় তখন বাঘের উপর আক্রমণ করে বসে। অর্থাৎ নৈরাশ্য সাহসিকতা বৃদ্ধি করে।

১১. ওসীলা অস্বীকারকারীদের প্রশ্ন:

আরবের মুশরিককরা এ কারণে মুশরিক হয়েছে যে তারা মূর্তিগুলোকে আল্লাহ তায়ালার বান্দা মনে করতো কিন্ত ভিতরে ভিতরে ওইগুলোকে আল্লাহ তায়ালাকে পাওয়ার ওসীলা মনে করতো। তারা কোন মূর্তিকে স্রষ্টা বা মালিক মনে করতো না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

ولئن سالتهم من خلق السموت والارض ليقولن الله

অর্থ: যদি আপনি মুশরিকদেরকে জিজ্ঞেস করেন যে, আসমান ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেন? তারা বলবে, আল্লাহ তায়ালা। অর্থাৎ ওই মুশরিকরা শুধু এ কারণে মুশরিক হয়েছে যে, তারা মূর্তিগুলোকে আল্লাহ তায়ালার বান্দা মেনে তাদেরকে প্রয়োজন পূর্ণকারী, বিপদ দূরকারী ও সাহায্যকারী মনে করতো। সুতরাং ওসীলা বিশ্বাসকারী আর মুশরিকদের মধ্যে পার্থক্য থাকলো কোথায়?

এর জাওয়াব হলো: আল্লাহ পাক-উনার কুদরত বা অপরিসীম ক্ষমতা হলো এই যে, তিনি ইচ্ছে করলে ওসীলাবিহীন নিজেই সব কাজ সম্পাদন করতে পারেন। যেমন- আল্লাহ পাক-উনার কুদরত সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে-

وامره اذا اراد شيئا ان يقول له كن فيكون

অর্থ: æআল্লাহ তায়ালা-উনার শান হলো এই, তিনি কোন জিনিস সৃষ্টি করার যখন ইচ্ছা করেন তখন ‘কুন’ (হয়ে যাও) বলেন, সাথে সাথে ওই জিনিস হয়ে যায়।” সুবহানাল্লাহ!

কিন্তু আল্লাহ তায়ালা-উনার কানুন বা নিয়ম হলো স্বীয় বান্দাদের মাধ্যমে তিনি কাজ সম্পাদন করিয়ে থাকেন। আর এই ‘কানুন’ বা নিয়মের বিকাশ সম্পর্কে বহু আয়াত শরীফ ইরশাদ হয়েছে। যেমন, আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন-

قل يتوفكم ملك الموت الذى وكل بكم

অর্থ: æহে হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি বলে দিন, তোমাদেরকে মালাকুল মউত আলাইহিস সালাম মৃত্যু দিবেন যাকে তোমাদের উপর নিয়োগ করা হয়েছে।”

আরো ইরশাদ হয়েছে-

ويزكيهم ويعلمهم الكتاب والحكمة

অর্থ: æহাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তাদেরকে পবিত্র করেন, কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন।”

আরো ইরশাদ হয়েছে,

قل رب ارحم هما كما ربيانى صغيرا

অর্থ: æবলুন, হে আমার রব! যেরূপ আমার পিতা-মাতা ছোটকালে আমাকে লালন-পালন করেছেন তদ্রƒপ আপনিও তাদের উপর রহমত বর্ষণ করুন।”

দেখুন- মৃত্যু দেয়া, পবিত্র করা ও লালন-পালন করা ইত্যাদি আল্লাহ তায়ালা উনার কাজ কিন্তু বান্দাদের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে।

মূল কথা হলো, মক্কা শরীফ-এর মুশরিকদের এ আক্বীদা ছিল এক খোদা তায়ালা তিনি এত বড় জগৎ পরিচালনায় অক্ষম। নাঊযুবিল্লাহ! এ কারণে তিনি বান্দাকে স্বীয় সাহায্যার্থে জগৎ পরিচালনার জন্য নিযুক্ত করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা উনার বান্দাগণকে উনার সমকক্ষ মনে করার কারণে তারা মুশরিক হয়েছে। যেমন- তারা রোজ হাশরে মূর্তিদের উদ্দেশ্য করে বলবে-

اتا الله انا كنا لفى ضلل مبين اذ نسويكم برب العالمين

অর্থ: খোদা তায়ালা উনার কসম! আমরা প্রকাশ্য গুমরাহীতে ছিলাম যে, আমরা তোমাদেরকে রব্বুল আলামীন উনার সমকক্ষ মনে করতাম।

প্রমাণিত হলো, মক্কা শরীফ-এর মুশরিকরা মূর্তিগুলোকে বান্দা মেনে ওইগুলোকে তারা আল্লাহ তায়ালা উনার মুখাপেক্ষী মানতো। যে কারণে তারা মুশরিক সাব্যস্ত হয়েছে। কেননা আল্লাহ পাক তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। যেমন, ইরশাদ হয়েছে-

لم يتخذ ولدا ولم يكن له شريك فى االملك ولم يكن له ولى من الذل وكبره تكبيرا

অর্থ: æআল্লাহ তায়ালা না তিনি নিজে সন্তান গ্রহণ করেছেন, না উনার রাজ্যে কেউ শরীক রয়েছে, না অক্ষমতার কারণে উনার কোন ওলী রয়েছে। অতএব, আল্লাহ তায়ালার মহানত্বকে বর্ণনা করো।”

কাজেই, আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন নবী ও ওলী উনাদেরকে নিযুক্ত করেছেন ও করেন স্বীয় শান প্রকাশের জন্য, উনার দুর্বলতা বা অক্ষমতার কারণে নয়।

মোটকথা, যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালা উনার অপরিসীম কুদরত বা ক্ষমতাকে অস্বীকার করবে সে মুশরিক এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালা উনার কুদরতকে স্বীকার করে উনার কানুনকে অস্বীকার করবে সে ওহাবী। আর যারা আল্লাহ তায়ালা উনার কুদরত ও কানুন দুটোকেই স্বীকার করেন উনারাই প্রকৃত মু’মিন।

উল্লেখ্য, নিজেদের জীবনের প্রতি গভীর দৃষ্টিপাত করলে জানা যাবে যে, দুনিয়ার কোন নিয়ামত ওসীলাবিহীন অর্জিত হয়নি। জš§, লালন-পালন মাতা-পিতার ওসীলায়, জ্ঞান-গরীমা ওস্তাদের ওসীলায়, সুস্থতা হেকিমদের ওসীলায় হয়ে থাকে। দুনিয়াবী নিয়ামতের ক্ষেত্রে যদি ওসীলার প্রয়োজন হয় তাহলে পরকালীন নিয়ামত লাভের জন্য কি ওসীলার প্রয়োজন হবে না? অবশ্যই হবে।

আরো উল্লেখ্য যে, ইবাদতসমূহের ফায়দা শুধু মানুষ পেয়ে থাকে কিন্তু ওসীলার ফায়দা শুধু মানুষই নয় জ্বিন, ফেরেশতা, জীব-জন্তু, জামাদাত, শাজারাত, হাজারাত সবাই লাভ করে থাকে। দেখুন মক্কা শরীফ হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার ওসীলায় সম্মানিত। তুর পর্বত হযরত মূসা কালীমুল্লাহ আলাইহিস সালাম-উনার ওসীলায় উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, যমযম কূপের পানি হযরত ইসমাঈল যবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম-উনার ওসীলায় বরকতময় হয়েছে। হযরত আইয়ুব আলাইহিস সালাম স্বীয় পা মুবারক দিয়ে ভূমির উপর ঘর্ষণ করে যে পানির প্রশ্রবন সৃষ্টি হয়েছিল আল্লাহ তায়ালা উনার নির্দেশে তা পান করা এবং তা দ্বারা গোসল করার কারণে তিনি আরোগ্য লাভ করেন। সুবহানাল্লাহ!

প্রতিভাত হলো, ওলী-আওলিয়া-বুযূর্গ উনাদের ওসীলা প্রত্যেক জিনিসকে উপকৃত করে।  সুবহানাল্লাহ!

সুওয়াল – জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল – জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল – জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল – জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল – জাওয়াব বিভাগ