সুওয়াল – জাওয়াব বিভাগ

সংখ্যা: ১৯৪তম সংখ্যা | বিভাগ:

খন্দকার সেলিম আহমদ

পাহাড় কাঞ্চনপুর, টাঙ্গাইল

 

সুওয়াল: হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে প্রকাশিত অখ্যাত মাসিক পত্রিকা ফেব্রুয়ারী-২০০৫ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-সমাধান বিভাগে, মাসিক আল বাইয়্যিনাত-অক্টোবর ২০০৩ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রদত্ত “মীলাদ-ক্বিয়াম” সম্পর্কিত বক্তব্যের সমালোচনা করতে গিয়ে  এবং একই বিষয়ে এপ্রিল-২০০৫ ঈসায়ী ও মে-২০০৫ ঈসায়ী সংখ্যায় এছাড়াও মাসিক মদীনা পত্রিকা ফেব্রুয়ারী-২০০৫ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে একই ধরনের জাওয়াব দেয়া হয়েছে।

তাদের বক্তব্যগুলোর মধ্যে যে বিষয়গুলো আমার নিকট সন্দেহজনক তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

যেমন, মে-২০০৫ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-সমাধান বিভাগে বলা হয়েছে, “সমাজে বহুল প্রচলিত যে মীলাদ দেখা যায়, তা সম্পূর্ণ কুরআন সুন্নাহর খিলাফ, যা কোন দিন ভালো কাজ হতে পারে না।” …

এখন আমাদের সুওয়াল হলো, সমাজে বহুল প্রচলিত যে মীলাদ শরীফ দেখা যায়, সে সম্পর্কে তাদের উল্লিখিত বক্তব্য কতটুকু দলীলসম্মত? কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের দৃষ্টিতে দলীলভিত্তিক জাওয়াব দিয়ে আমাদের আক্বীদা, আমল হিফাযতে সহায়তা করবেন বলে আমরা আশাবাদী।

জাওয়াব: সমাজে বহুল প্রচলিত মীলাদ শরীফ ও ক্বিয়াম শরীফ সম্পর্কে হাটহাজারী মাদ্রাসার অখ্যাত মাসিক পত্রিকার জিজ্ঞাসার সমাধানে এবং অপর একটি পত্রিকার প্রশ্নোত্তর বিভাগে যা বলা হয়েছে তা শুদ্ধ তো হয়ইনি, বরং সম্পূর্ণই মিথ্যা, ভুল, মনগড়া ও দলীলবিহীন এবং অনুসরণীয় ইমাম-মুজতাহিদ ও ফক্বীহগণের সর্বজনমান্য ও স্বীকৃত বিশ্ব বিখ্যাত ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাবসমূহের বক্তব্যের বিপরীত ও বিরুদ্ধমত। যা ইতঃপূর্বে আমাদের “মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ”-এর অনেক সংখ্যায় খণ্ডন করে সঠিক ও দলীলভিত্তিক জাওয়াব দেয়া হয়েছে। আর “মাসিক আল বাইয়্যিনাত শীরফ”-এর জাওয়াবকে খণ্ডন করা হাটহাজারী মৌলভী ছাহেবদের পক্ষে আদৌ সম্ভব হয়নি, হবেও না ইনশাআল্লাহ।

এরপরেও হাটহাজারীর মৌলভী ছাহেব এবং তাদের সকল সমজাতীয়রা বার বার ‘মীলাদ শরীফ ও ক্বিয়াম শরীফ’ সম্পর্কে বিনা তাহক্বীকে ও বিনা দলীলে উক্ত ভুলেরই পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছে।

(ধারাবাহিক)

যেমন, উল্লিখিত প্রথম বক্তব্যের প্রথমেই তারা বলেছে, “সমাজে বহুল প্রচলিত যে মীলাদ দেখা যায়  তা সম্পূর্ণ কুরআন সুন্নাহর খিলাফ, যা কোন দিন ভালো কাজ হতে পারে না।” নাউযুবিল্লাহ।

এর জাওয়াবে বলতে হয় যে, কুরআন শরীফ-এর কোন আয়াত শরীফ-এ ‘সমাজে বহুল প্রচলিত মীলাদ শরীফকে কুরআন শরীফ-এর খিলাফ বলা হয়েছে এবং হাদীছ শরীফ-এর কোন হাদীছ শরীফ-এ ‘সমাজে বহুল প্রচলিত মীলাদ শরীফকে সুন্নাহ বা হাদীছ শরীফ-এর খিলাফ বলা হয়েছে, তা হাটহাজারী মৌলভী ছাহেবরা কুরআন শরীফ-এর আয়াত শরীফ, হাদীছ শরীফ-এর ইবারতসহ দলীল উল্লেখ করেনি। সুতরাং তাদের দলীলবিহীন, ইবারতবিহীন, মনগড়া ও মিথ্যা বক্তব্য মোটেই গ্রহনযোগ্য নয়।

নি¤েœ কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস এবং বুযুর্গদের আমল দ্বারা প্রমাণিত বিস্তারিত দলীল-আদিল্লাহ পেশ করা হলো-

স্মরণীয় যে, মীলাদ শরীফ ও ক্বিয়াম শরীফ-এর মূল উদ্দেশ্য হলো সংক্ষেপে আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছানা-ছিফত ও বিলাদত শরীফ সম্পর্কে আলোচনা করা এবং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ছলাত-সালাম পাঠ করা।

এক কথায় মীলাদ শরীফ ও ক্বিয়াম শরীফ-বলতে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত ও আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছানা-ছিফত, তা’রীফ, প্রশংসা, উনার মু’জিযা বর্ণনা, বিলাদত শরীফ-এর আলোচনা, না’ত, শে’র, কাছীদা শরীফ পাঠ ও উনার প্রতি ছলাত ও সালাম  প্রেরণ করা ইত্যাদি পাঠ করা হয়।

যেমন- মীলাদ শরীফ-এর প্রথমেই কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা হয়। আর কুরআন শরীফ তিলাওয়াতের ফযীলত সম্পর্কে হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-

وعليك بتلوات القران فانه نور لك فى الارض وذخر لك فى السماء

অর্থ: “কুরআন শরীফ তিলাওয়াত কর। নিশ্চয়ই সেটা ইহকালে তোমার জন্য নূর (হিদায়েত) হবে এবং পরকালে তোমার জন্য পুঁজি বা নাজাতের জরিয়া হবে।”

হাদীছ শরীফ-এ আরো ইরশাদ হয়েছে-

عن ابن مسعود رضى الله تعالى قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من قرء حرفا من كتاب الله فله به حسنة والحسنة بعشر امثالها ولا اقول الم حرف بل الف حرف لام حرف ميم حرف.

অর্থ: “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কালামুল্লাহ শরীফ-এর একটি অক্ষর তিলাওয়াত করবে তার জন্য নেকী রয়েছে। আর সে নেকীটা হচ্ছে (কমপক্ষে) দশগুণ। আমি বলিনা, আলিফ-লাম-মীম একটি অক্ষর। বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর, মীম একটি অক্ষর।” (তিরমিযী, দারিমী, মিশকাত)

আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো ইরশাদ করেন-

افضل العبادة امتى قرائة القران.

অর্থ: “আমার উম্মতের ইবাদতসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম ইবাদত হলো কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা।” (দাইলামী, বাইহাক্বী, কানযুল উম্মাল)

মহান আল্লাহ পাক উনার যিকির সম্পর্কে ইরশাদ করেন-

واذكروا الله كثيرا لعلكم تفلحون.

অর্থ: “তোমরা বেশি বেশি আল্লাহ পাক-এর যিকির কর। তাহলে অবশ্যই তোমরা কামিয়াবী লাভ করবে।” (সূরা জুমুয়া-১০)

فاذكرونى اذكركم

অর্থ: “তোমরা আমার যিকির কর আমিও তোমাদের স্মরণ করবো।” (সূরা বাক্বারা-১৫২)

আল্লাহ পাক হাদীছে কুদসী শরীফ-এ ইরশাদ করেন-

وانا معه اذا ذكرنى

অর্থ: “বান্দা যখন আমার যিকির করে তখন আমি তার সাথে থাকি।” (বুখারী, মিশকাত)

হাদীছ শরীফ-এ আরো ইরশাদ হয়েছে-

اذا مررتم برياض الجنة فارتعوا قالوا وما رياض الجنة قال حلق الذكر.

অর্থ: “যখন তোমরা কোথাও বেহেশতের বাগান দেখতে পাবে তখন সেখান থেকে ফায়দা হছিল কর। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ জিজ্ঞাসা করলেন, বেহেশতের বাগান কি? তিনি বললেন, যিকিরের মাজলিস।” (বুখারী, মিশকাত)

অতঃপর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর ছলাত পাঠ করা হয়। কারণ ছলাত পাঠ করা আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরই নির্দেশ।

ছলাত-সালাম পাঠ সম্পর্কে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-

ان الله وملئكته يصلون على النبى يايها الذين امنوا صلوا عليه وسلموا تسليما.

অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক এবং উনার ফেরেশতারা নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ছলাত (দরূদ শরীফ) পাঠ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও উনার প্রতি ছলাত পাঠ কর এবং সালাম দেয়ার মত সালাম দাও (অর্থাৎ আদবের সাথে সালাম দাও।)” (সূরা আহযাব-৫৬)

হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-

من صلى على صلوة واحدة صلى الله عليه عشر صلوات وحطت عنه عشر خطيئات ورفعت له عشر درجات.

অর্থ: “যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার ছলাত (দরূদ শরীফ) পাঠ করবে আল্লাহ পাক তার প্রতি দশটি রহমত নাযিল করবেন, তার দশটি গুনাহ ক্ষমা করবেন এবং তার দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন।” (নাসাঈ, মিশকাত)

উপরোক্ত জবাব থেকে একথা প্রমাণিত হচ্ছে যে, আল্লাহ পাক কুরআন শরীফ-এ আর আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীছ শরীফ-এ পর্যায়ক্রমে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত, যিকরুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি-এর প্রতি ছলাত-সালাম পাঠ করা ও ফাযায়িল-ফযীলত বর্ণনা করা ইত্যাদি সম্পর্কে আদেশ দিয়েছেন, নির্দেশ করেছেন ও গুরুত্বারোপ করেছেন।

এক কথায় মীলাদ মাহফিলে তাই করা হয়। তাহলে এত দলীল-আদিল্লাহ থাকার পরও কি করে একথা বলা যেতে পারে, “সমাজে বহুল প্রচলিত যে মীলাদ শরীফ দেখা যায়, তা সম্পূর্ণ কুরআন-সুন্নাহর খিলাফ, যা কোন দিন ভালো কাজ হতে পারে না …..।” নাঊযুবিল্লাহ!

প্রকৃতপক্ষে হাটহাজারী মৌলভী ছাহেবদের এ বক্তব্য দ্বারা এটাই প্রমানিত হয় যে তারা কালামুল্লাহ শরীফ-এর তিলাওয়াত এবং ছলাত ও সালাম পাঠ করাকে প্রথমতঃ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ শরীফ-এর খিলাফ দ্বিতীয়তঃ ভাল কাজ নয় নাঊযুবিল্লাহ! যা আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ-নির্দেশের সম্পূর্ণ খিলাফ হওয়ার কারণে কাট্টা কুফরী হয়েছে। কোন মুসলমান নামধারী ব্যক্তি কুফরী করলে সে মুরতাদ হয়ে যায়। আর মুরতাদের শরয়ী ফায়ছালা হলো তাকে তিনদিন সময় দেয়া হবে তওবা করার জন্য। অন্যথায় মুরতাদের একমাত্র শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদ-। (চলবে)

 

মুহম্মদ হুসাইন

নরসিংদী

 

সুওয়াল: মাসিক মদীনা নভেম্বর-২০০৯ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নি¤েœাক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপা হয়-

প্রশ্ন: মুসলমানগণ যে টুপি মাথায় পরেন তার আকৃতি সম্পর্কে যেমন গোল হওয়া চাই না কিসতির মত লম্বা হওয়া চাই স্পষ্ট হাদীছ শরীফ আছে কিনা? হাদীছ শরীফ-এর নাম উল্লেখ করে জানাবেন আশা করি।

উত্তর: টুপি পরা সুন্নত। হযরত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম টুপি পরেছেন এবং পাগড়ী পরার সময় পাগড়ীর নিচে টুপি পরতে তাগিদ দিয়েছেন। টুপি এবং পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে তাই সুন্নত বলে স্বীকৃত যা সমকালীন নির্ভরযোগ্য ওলামা-মাশায়িখগণের মধ্যে সাধারণভাবে প্রচলিত। হাদীছ শরীফ-এ (শামায়িলে-তিরমিযী) বলা হয়েছে, হযরত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাথার টুপি ছিল চেপ্টা, যা মাথার সাথে লেগে থাকতো। সেই টুপির অনুকরণে ছাহাবীগণ এবং পরবর্তী যুগের ওলামা-মাশায়িখগণ কাপড়ের দ্বারা নির্মিত টুপি তৈরি করেছেন। কারো টুপি গোল ছিল, কারো টুপি কিসতি আকৃতির ছিল, কারো টুপি পাঁচকল্লি বা তিন কল্লির ছিল। এইসব ধরনের টুপি যেহেতু ওলামা-মাশায়িখগণের মধ্যে প্রচলিত ছিল এবং এ যুগেও রয়েছে, সুতরাং এসব ধরনের টুপিই সুন্নত অনুযায়ী মনে করে পরা যেতে পারে। অনুসরণযোগ্য ওলামাগণের পছন্দনীয় পোশাকাদি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা অভিপ্রেত নয়।

মাসিক মদীনা পত্রিকার উক্ত প্রশ্নের উত্তরে যে বিষয়গুলো আমার কাছে আপত্তিকর মনে হয়, তাহলো-

১. আল্লাহ পাক-এর রসূল, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে টুপি ও পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে কোন সুন্নতের বর্ণনা নেই।

২. টুপি ও পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদেরকে বাদ দিয়ে সমকালীন আলিমদেরকে অনুসরণ করতে হবে।

৩. শামায়িলে তিরমিযী-এর বরাতে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে মিথ্যারোপ করা হয়েছে।

৪. হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত ‘কুম্মাতুন (كمة) ও বুতহুন (بطح) শব্দের মনগড়া অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

৫. হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণও কিসতি, পাঁচ কল্লি, তিন কল্লি টুপি পরিধান করেছেন।

৬. সমকালীন আলিমগণের মধ্যে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী আমল জারি থাকলেও সেটাই অনুসরণ করতে হবে। বিরোধিতা করা যাবেনা।

উপরোক্ত প্রতিটি বিষয়ের শরীয়তসম্মত জাওয়াব দিয়ে আমাদের ঈমান-আমল হিফাযতে সহায়তা করবেন বলে আমরা আশাবাদী।

জাওয়াব: মাসিক মদীনায় প্রদত্ত টুপি সম্পর্কিত প্রশ্ন-উত্তরের প্রেক্ষিতে আপনার দ্বিতীয় সুওয়াল হচ্ছে-

২. টুপি ও পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদেরকে বাদ দিয়ে সমকালীন আলিমদেরকে অনুসরণ করতে হবে। একথা কতটুকু সঠিক?

এর জবাবে বলতে হয় যে, টুপি এবং পোশাক-পরিচ্ছদ সম্পর্কিত মাসিক মদীনার সম্পাদক মাহিউদ্দীনের উক্ত বক্তব্য ভুল, দলীলবিহীন, ডাহা মিথ্যা যা কাট্টা কুফরী হয়েছে। কেননা কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ-এর প্রতিক্ষেত্রে আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতঃপর হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদেরকে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।

যেমন- এ প্রসঙ্গে কুরআন শরীফ-এ আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-

اطيعوا الله ورسوله ان كنتم مؤمنين.

অর্থ: “আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইতায়াত (অনুসরণ-অনুকরণ) করো যদি তোমরা মু’মিন হয়ে থাক।” (সূরা আনফাল-১)

আল্লাহ পাক আরো ইরশাদ করেন-

وان تطيعوا تهتدوا.

অর্থ: “তোমরা উনাকে (অর্থাৎ আল্লাহ পাক-এর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইতায়াত) অনুসরণ করলে হিদায়েত লাভ করবে।” (সূরা নূর-৫৫)

অতঃপর হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদেরকে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। যেমন, এ প্রসঙ্গে কুরআন শরীফ-এ আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-

السابقون الاولون من المهاجرين والانصار والذين اتبعوهم باحسان رضى الله عنهم ورضوا عنه.

অর্থ: “ঈমান ও আমলের সর্বপ্রথম স্থান অধিকারী মুহাজির ও আনসার ছাহাবাগণ এবং উনাদেরকে উত্তমভাবে অনুসরণকারী সকলের প্রতি আল্লাহ পাক সন্তুষ্ট এবং উনারাও আল্লাহ পাক-এর প্রতি সন্তুষ্ট।” (সূরা তওবা-১০০)

আর হাদীছ শরীফ-এ হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের মর্যাদা-মর্তবা সম্পর্কে যথাযথভাবে অবগত হয়ে উনাদের ইখলাছের সাথে পরিপূর্ণ অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

যেমন- এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে-

عن عبد الله بن مسعود رضى الله تعالى عنه قال من كان مستنا فليستن بمن قد مات فان الحى لا تؤمن عليه الفتنة اولئك اصحاب محمد صلى الله عليه وسلم كانوا افضل هذه الامة ابرها قلوبا واعمقها علما واقلها تكلفا اختارهم الله لصحبة نبيه ولاقامة دينه فاعرفوا لهم فضلهم واتبعوا على اثرهم وتمسكوا بما استطعتم من اخلاقهم وسيرهم فانهم كانوا على الهد الـمستقيم.

অর্থ: “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি শরীয়তের ছহীহ নিয়মের অনুসারী হতে চায় তার জন্য একান্ত কর্তব্য আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছাহাবাগণের অনুসরণ করা। ছাহাবীগণই উম্মতের মধ্যে অতি উত্তম। উনারা আত্মার দিক দিয়ে অতি পবিত্র। ইলমের দিক দিয়ে গভীর জ্ঞানের অধিকারী। মানুষকে দেখানোর জন্য উনারা কোন কাজ করেননি। আল্লাহ পাক উনাদেরকে মনোনীত করেছেন আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছোহবত অর্জনের জন্য এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য। সুতরাং তোমরা উনাদের মর্যাদা সম্পর্কে অবগত হও এবং উনাদের কথা ও কাজের অনুসরণ কর এবং যথাসম্ভব উনাদের গুণাবলী ও চরিত্র মুবারককে গ্রহণ কর। কারণ উনারা হিদায়েত ও সীরতে মুস্তাক্বীমের উপর দৃঢ় ছিলেন।” (মিশকাত শরীফ)

হাদীছ শরীফ-এ আরো উল্লেখ আছে-

وقال رسول الله صلى الله عليه وسلم اصحابى كالنجوم فبايهم اقتديتم اهتديتم

অর্থ: অতঃপর রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লা ইরশাদ করেন, “আমার ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ প্রত্যেকেই তারকা সাদৃশ্য, উনাদের যে কাউকে তোমরা অনুসরণ করবে, হিদায়েত প্রাপ্ত হবে। (মিশকাত শরীফ)

উপরোক্ত বর্ণনা থেকে এটাই প্রমাণিত হলো যে, আমলে-আখলাকে, সীরত-ছূরতে অর্থাৎ প্রতিক্ষেত্রে আল্লাহ পাক-এর হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, নূরে মুজাস্সাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদেরকে অনুসরণ-অনুকরণ করতে হবে। তথা সুন্নত মুতাবিক চলতে হবে। তবেই সঠিক পথের পথিক হওয়া যাবে।

হ্যাঁ হক্কানী-রব্বানী আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমদেরকে তথা উলিল আমরকে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে অর্থাৎ উলিল আমরকে তখনই অনুসরণ করতে হবে যখন উলিল আমরগণ কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস মুতাবিক চলবেন।

যেমন- এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-

يايها الذين امنوا اطيعوا الله واطيعوا الرسول واولى الامر منكم

অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ পাক-এর ইতায়াত কর এবং আল্লাহ পাক-এর রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইতায়াত কর এবং তোমাদের মধ্যে যারা উলিল আমর রয়েছেন উনাদের ইতায়াত কর।” (সূরা নিসা-৫৯)

কাজেই যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস মুতাবিক চলবেন অর্থাৎ- যে ব্যক্তি আল্লাহ পাক-এর মতে মত এবং আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পথে পথ হয়েছেন উনাকেই অনুসরণ করতে হবে।

অতএব সমকালীন আলিমদেরকে কোন বিষয়ে অনুসরণ করতে হলে দেখতে হবে তার উক্ত আমল কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসসম্মত কিনা? যদি সমকালীন আলিমদের উক্ত আমল কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা এবং ক্বিয়াসসম্মত হয় তবে তাকে সে বিষয়ে অনুসরণ করা যাবে। আর যদি সমকালীন আলিমদের উক্ত আমল কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসসম্মত না হয়, তাহলে সমকালীনদেরকে সে বিষয়ে অনুসরণ করা যাবে না।

কাজেই মাহিউদ্দীনের বর্ণিত সমকালীন আলিমরা পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে যেহেতু কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস অনুসরণ করেনা, তাই এক্ষেত্রে তাদেরকে অনুসরণ করা জায়িয নেই। এক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করতে বলার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগনের অনুসরণ থেকে মানুষদেরকে ফিরায়ে রাখা, যা কাট্টা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।

তাছাড়া মাহিউদ্দীনের সমকালীন আলিমদের অধিকাংশ আমলগুলোই শরীয়ত ও সুন্নতের খিলাফ। অর্থাৎ সর্বদাই তারা হারাম, নাজায়িয ও বিদয়াত বা সুন্নত পরিপন্থী কাজে মশগুল। যেমন পর্দা করা ফরয, তারা বেপর্দা হয়, ছবি তোলা হারাম, তারা ছবি তোলে, নারী নেতৃত্ব মানা হারাম, তারা নারী নেতৃত্ব মেনে চলে। কুশপুত্তলিকা দাহ করা বা মূর্তি বানানো হারাম, তারা তা করে। অনুরূপভাবে তাদের টুপি থেকে শুরু করে স্যান্ডেল, পোশাক-পরিচ্ছদ, চলা-ফেরা, উঠা-বসা, কথা-বার্তা, চাল-চলন সবই সুন্নতের খিলাফ।

অতএব, যারা ২৪ ঘণ্টা হারাম কাজে মশগুল থাকে তারা কি করে অনুসরণীয় হতে পারে? তাদেরকে অনুসরণ করা সম্পূর্ণই হারাম। কারণ আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন-

ولا تطع من اغفلنا قلبه عن ذكرنا واتبع هواه وكان امره فرطا.

অর্থ: সেই ব্যক্তিকে অনুসরণ করো না, যার ক্বলবকে আমার যিকির থেকে গাফিল করেছি। অর্থাৎ যার ক্বলবে আমার যিকির নেই, সে নফসকে (শয়তানকে) অনুসরণ করে। আর তার কাজগুলো (আমলগুলো) শরীয়তের খিলাফ।” (সুরা কাহফ-২৮) (চলবে)

 

মুসাম্মত সানজিদা আক্তার

সভানেত্রী- ছাত্রী আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত

মুহম্মদপুর, ঢাকা।

 

সুওয়াল: অখ্যাত মাসিক রাহমানী পয়গাম এপ্রিল/২০০৩ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-জবাব বিভাগে নিম্নোক্ত ১২৪৭ নম্বর জিজ্ঞাসার জবাব ছাপা হয়।

জিজ্ঞাসা: ছাহাবী আবু সাঈদ খুদরী ও আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা বলেন যে, রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন আমার মৃত্যুর পর পূর্ব দেশগুলির মধ্য হতে কোন একটি দেশ হতে আমার উম্মতের ভিতর হতে একটি দল বের হবে। এই দলের সদস্যগণ হবে অশিক্ষিত ও মূর্খ। এদের মধ্যে কোন শিক্ষিত লোক গেলে সেও হয়ে যাবে মূর্খের মত। তাদের বক্তৃতা হবে বহু বহু গুণের ফযীলতের। তাদের মত বক্তৃতা বা বয়ান কারো হবে না। …… তারা কুরআনের উপর আমল কিম্বা কুরআন প্রতিষ্ঠার একটু চেষ্টাও করবে না কখনো। উক্ত অখ্যাত পত্রিকা হাদীছ শরীফ ছহীহ স্বীকার করলেও মন্তব্য করেছে যে, প্রচলিত তাবলীগের কার্যক্রম পুরোপুরি শরীয়তসম্মত। ইসলাম পরিপন্থী কোন কিছু এতে নেই।

উক্ত অখ্যাত পত্রিকার উল্লিখিত “জিজ্ঞাসা-জবাবের” প্রেক্ষিতে আমার সুওয়াল বা জানার বিষয় হলো-

…. (৪) প্রচলিত ছয় উছূলী তাবলীগীদের পৃষ্ঠপোষকতায় বা পরিচালনায় যারা রয়েছে তারা সকলেই হক্কানী আলিম, তাদের এ দাবি কতটুকু সঠিক? আসলে হক্কানী আলিমের সংজ্ঞা বা পরিচিতি কি?

কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও ক্বিয়াসের দৃষ্টিতে উল্লিখিত সুওয়ালগুলোর দলীলভিত্তিক জাওয়াব দিয়ে আমাদের আক্বীদা, আমল হিফাযতে সহায়তা করবেন বলে আমরা আশাবাদী।

জাওয়াব: প্রচলিত ছয় উছূলী তাবলীগ জামায়াত সম্পর্কে উক্ত অখ্যাত পত্রিকার জবাব শুদ্ধ হয়নি। বরং ভুল, মনগড়া ও দলীলবিহীন হয়েছে।

তাই নিম্নে সুওয়ালে বর্ণিত বিষয়গুলোর দলীলভিত্তিক জাওয়াব দেয়া হলো-

ছয় উছূলী তাবলীগ সম্পর্কে প্রশ্নে উল্লিখিত অখ্যাত পত্রিকার অপব্যাখ্যা ও মিথ্যাচারিতার খণ্ডনমূলক জবাব

প্রচলিত ছয় উছূলী তাবলীগ সম্পর্কে অখ্যাত পত্রিকার জিজ্ঞাসার জবাবের প্রেক্ষিতে আপনার চতুর্থ সুওয়াল হলো-

(৪) “প্রচলিত ছয় উছূলী তাবলীগের পৃষ্ঠপোষকতায় বা পরিচালনায় যারা রয়েছে তারা সকলেই হক্কানী আলিম, তাদের এ দাবি কতটুকু সঠিক? আসলে হক্কানী আলিমের সংজ্ঞা বা পরিচিতি কি?

আপনার উক্ত সুওয়ালের প্রেক্ষিতে বলতে হয় যে, প্রচলিত ছয় উছূলীদের উক্ত দাবি সম্পূর্ণই অবান্তর, মিথ্যা ও দলীলবিহীন। কারণ গত দুই সংখ্যায় প্রদত্ত হক্কানী আলিমের সংজ্ঞা বা পরিচিতিমূলক আলোচনা দ্বারা অকাট্যভাবেই প্রমাণিত হয়েছে যে, হক্কানী আলিম বা সত্যিকার নায়িবে নবী তিনিই (১) যিনি ইসলামের প্রতিটি বিষয়ে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত অনুযায়ী আক্বীদা পোষণ করেন, (২) ইলমে ফিক্বাহ অর্জন করার সাথে সাথে একজন হক্কানী শায়খ বা মুর্শিদের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করে তাছাউফ চর্চা করত অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহভীতি বা তাক্বওয়া অর্জন করেছেন, (৩) অর্জিত ইলম অনুযায়ী পরিপূর্ণ আমল করেন, (৪) সুন্নতের পূর্ণ  পায়রবী করেন, (৫) হারাম-নাজায়িয ও শরীয়তবিরোধী কাজে লিপ্ত হননা। কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ-এর দৃষ্টিতে তাঁরাই আলিম বা নায়িবে নবী।

অথচ প্রচলিত ছয় উছূলীদের কথিত আলিমদের মধ্যে উল্লিখিত গুণাবলীসমূহের কোনটাই বিদ্যমান নেই। আমরা যদি উল্লিখিত পাঁচটি বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করি তবে বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হয়ে যাবে।

পূর্ব প্রকাশিতের পর

হক্কানী-রব্বানী আলিম হওয়ার জন্য চতুর্থ শর্ত হচ্ছে-

(৪) “সুন্নতের পরিপূর্ণ ইত্তিবা বা অনুসরণ অনুকরণ করা।”

কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ শরীফ-এর আলোচনা দ্বারা স্পষ্টই প্রমাণিত হেেয়ছে যে, মহান আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রিযামন্দী বা সন্তুষ্টি লাভ করতে হলে বা হক্কানী-রব্বানী আলিম হতে হলে, সুন্নতের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং হুবহু অনুসরণ-অনুকরণ করতে হবে। কারণ সুন্নতের খিলাফ আমল করে কখনোই হক্কানী-রব্বানী আলিম হওয়া সম্ভব নয়।

যদি তাই হয়ে থাকে তবে প্রচলিত ছয় উছূলীরা যে দাবি করে থাকে “ছয় উছূলী তাবলীগের পরিচালনায় যারা রয়েছে তারা সকলেই হক্কানী আলিম” তাদের এ দাবি কি করে সত্য হতে পারে? তারা সবক্ষেত্রে সুন্নতের ইত্তিবা করা তো দূরে কথাই পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেই তো সুন্নত থেকে অনেক দূরে। অর্থাৎ তাদের মাথার টুপি থেকে শুরু করে সবগুলোই সুন্নতের খিলাফ। সুন্নতী পোশাকের কয়েকটি বিষয় নিয়ে দলীলভিত্তিক আলোচনা করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে।

১. সুন্নতী টুপি

প্রচলিত ছয় উছূলীরা সাধারণত পাঁচ কল্লি কিশতি, জালি বা মোটা কাপড়ের নকশা করা টুপি পরিধান করে থাকে যার একটিও খাছ সুন্নতী টুপি নয়। কেননা শরীয়তের দৃষ্টিতে সেটাই খাছ সুন্নতী টুপি। যেটা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ পরিধান করেছেন। উল্লিখিত টুপিগুলো উনারা পরিধান করেছেন বলে প্রচলিত ছয় উছূলীরা একটি প্রমাণও দেখাতে পারবে না।

মূলত খাছ সুন্নতী টুপি হচ্ছে চার টুকরাবিশিষ্ট গোলা, সাদা ও সুতি কাপড়ের টুপি। যা সবদিক থেকে মাথার সাথে ভালভাবে লেগে থাকে। হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত যে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত ছাহাবায়ে কিরামগণ এধরনের টুপিই পরিধান করেছেন।

যেমন এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে-

عن عائشة رضى الله تعالى عنها قالت كانت له كمة بيضاء.

অর্থ: হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাদা রংয়ের গোল টুপি ছিল।’ (আদদিমিয়াতী, মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া লিল কুস্তলানী, শরহে মাওয়াহিব লিয্ যুরক্বানী)

হাদীছ শরীফ-এ আরো উল্লেখ আছে-

عن ابى كبشة رضى الله تعالى عنه قال كان كمام اصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم بطحا.

অর্থ: “হযরত আবু কাবশা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছাহাবীগণের টুপি ছিল গোল যা চতুর্দিক থেকে মাথার সাথে লেগে থাকতো।” (তিরমিযী, মিশকাত, মিরকাত, লুময়াত, আশয়াতুল লুময়াত, শরহুত ত্বীবী, তা’লীকুছ ছবীহ, মুযাহিরে হক্ব)

বিখ্যাত মুহাদ্দিছ ইমামুল মুহাদ্দিছীন হযরত ইমাম মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত কিতাব ‘মিরকাত শরহে মিশকাত’-এর ৮ম খণ্ডের ২৪৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-

(كمام) بكسر الكاف جمع كمة بالضم كقباب وقبة وهى قلنسوة المدورة سميت بها لانها تغطى الرأس

অর্থ: ‘(كمام) কিমামুন কাফের নিচে যের দিয়ে ইহা মূলত (كمة) (কাফির উপর পেশ) কুম্মাতুন-এর বহুবচন। আর কুম্মাতুন মূলত গোল টুপি উহা যেহেতু মাথাকে ঢেকে ফেলে তাই এ নামকরণ করা হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে বিশ্বখ্যাত আরবী লোগাত আল ক্বামুসুল মুহীত ও লিসানুল আরবে উল্লেখ আছে-

الكمة. قلنسوة مدورة لانها تغطى الرأس.

অর্থ: ‘কুম্মাতুন’ হলো গোল টুপি, কেননা তা মাথাকে ঢেকে রাখে।’

বিখ্যাত মুহাদ্দিছ, ইমামুল মুহাদ্দিছীন হযরত ইমাম মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত কিতাব মিশকাত শরীফ-এর বিখ্যাত শরাহ “মিরকাত শরীফের” ৮ম খণ্ডের ২৪৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-

(بطحا) اى كانت مبسوطة على رؤسهم لازقة غير مرتفعة عنها.

অর্থ: ‘বুতহা’ এমন প্রশস্ত গোল টুপি যা মাথার সাথে উপর দিক থেকে মিলিত থাকে, মাথা হতে উঁচু বা ফাঁকা নয়। অনুরূপ শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ্ ছবীহ্, মুযাহিরে হক্ব ইত্যাদিতেও উল্লেখ আছে।

হাদীছ শরীফ-এর উপরোক্ত বর্ণনা ও লুগাতী তাহ্ক্বীকের দ্বারা এটাই প্রমাণিত হলো যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদের টুপি মুবারক ছিল, গোল, সাদা যা চতুর্দিক থেকে মাথার সাথে লেগে থাকতো। তবে উক্ত গোল টুপি মুবারক কি ধরনের ছিল, তার সুন্দর ও সুস্পষ্ট বর্ণনা সম্পর্কে  ‘মাজমুয়ায়ে মাল্ফুযাতে খাজেগানে চিশ্ত’- কিতাবের  ১ম বাবের ১০-১১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

حضرت حاضی شریف زندنی رحمہ اللہ علیہ .. ارشاد فرمایا کہ اے عثمان جبکہ تمنے کلاہ چھار ترکی سر پر رکھی ہے. لازم ہے کہ اسکا حق بجالاؤگے … حضرت خواجہء عالم صلی اللہ علیہ وسلم نے جس وقت سے اس کلاہ کو اپنی سر مبارک پر رکہا فقر وفاقہ اختیار کیا. بعد اسکے حضرت علی کرم اللہ وجہہ نے پہنا اور فقر وفاقہ کو اپنی ذات پر لازم گردانا. اسیطرح سلسلۃ مجھ تک پھنچا.

অর্থ: “হযরত হাজী শরীফ জিন্দানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হে ওছমান হারুনী (রহমতুল্লাহি আলাইহি!) যখন আপনি চার টুকরা বিশিষ্ট গোল টুপি মাথায় পরিধান করেছেন, তখন আপনার জন্য তার হক্ব আদায় করা আবশ্যক। …. সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লাম যখন চার টুকরা বিশিষ্ট গোল টুপি মাথায় পরিধান করেন, তখন দরিদ্রতা ও উপবাসকে গ্রহণ করেন। তারপর হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু চার টুকরা বিশিষ্ট টুপি পরিধান করেন দরিদ্রতা ও উপবাসকে নিজের জন্য জরুরী করে নেন। এরূপভাবে পর্যায়ক্রমে চার টুকরা বিশিষ্ট টুপি আমার নিকট পৌছে।” (আনীসুল আরওয়াহ)

‘ইসরারুল আওলিয়া’ কিতাবের ১১৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, “হে দরবেশগণ! চার টুকরা বিশিষ্ট গোল টুপিই প্রকৃত টুপি। হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম বেহেশত হতে এ টুপি এনে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পরিধান করতে দিয়ে বলেন, আপনি পরিধান করুন এবং আপনি যাকে ইচ্ছা তাকে এ টুপি দান করে আপনার খলীফা নিযুক্ত করুন। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চার টুকরা বিশিষ্ট গোল টুপিটি মাথায় পরিধান করেন এবং পরবর্তিতে হযরত আবু বকর ছিদ্দীক্ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত উসমান যিন নূরাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে একটি করে টুকরা দান করেন।” অনুরূপ আনীসুল আরওয়াতেও উল্লেখ আছে।

খলীফায়ে আ’যম, শায়খে শুয়ুখিল আলম, সানাদুল মুওয়াহ্হেদীন, সুলতানুল আরিফীন, ওয়ারিছুন নবী ফিল হিন্দ, মুঈনুল মিল্লাত ওয়াশ্ শরা ওয়াল হুদা ওয়াদ্ দ্বীন, হাবীবুল্লাহ হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন হাসান চীশ্তি, সানজিরী ছুম্মা আজমিরী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মালফূযাত সম্বলিত বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য কিতাব ‘আনীসুল আরওয়াহ’ ও ইমামুল আইম্মাহ হযরত ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মালফূযাত সম্বলিত কিতাব ‘ইসরারুল আওলিয়া’ নামক কিতাবের উক্ত বর্ণনা দ্বারা স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হলো যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও বিশিষ্ট ছাহাবী খুলাফায়ে রাশিদীন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা চার টুকরা বিশিষ্ট গোল টুপি পরিধান করতেন। কাজেই চার টুকরা বিশিষ্ট গোল টুপিই হচ্ছে খাছ সুন্নতী টুপি।

এছাড়াও সাদা ও চার টুকরা বিশিষ্ট গোল টুপির বহু দলীল হাদীছ শরীফ ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ও অনুসরণীয় কিতাবসমূহে রয়েছে।

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, প্রচলিত ছয় উছূলীরা টুপির ক্ষেত্রে সুন্নতের ইত্তিবা করে না। বরং সুন্নতের খিলাফ আমল করে থাকে। সুন্নতের খিলাফ আমল করে হক্কানী আলিম দাবি করা মিথ্যাচার নয় কি? (চলবে)

 

মুসাম্মত মা’রূফা জান্নাত

সদর, চাঁদপুর

 

সুওয়াল:  আখিরী চাহার শোম্বাহ কি? জাওয়াব: ‘আখিরী চাহার শোম্বাহ’ এ শব্দগুলো ফার্সী ভাষায় ব্যবহৃত শব্দ। ‘আখির’ অর্থ শেষ। আর ‘চাহার শোম্বাহ’ অর্থ বুধবার। অর্থাৎ শেষ বুধবার। এ হলো ‘আখিরী চাহার শোম্বাহ’-এর শাব্দিক বা আভিধানিক অর্থ। আর ইছতিলাহী বা পারিভাষিক  অর্থে ‘আখিরী চাহার শোম্বাহ’ বলতে ছফর মাসের শেষ বুধবারকে বলা হয়। ছফর মাস ব্যতীত আর কোন মাসের শেষ বুধবারকে ‘আখিরী চাহার শোম্বাহ’ বলা হয় না। যেমন ‘আশূরা’ শব্দটি আরবী ‘আশরাতুন’ শব্দ হতে এসেছে; যার অর্থ দশ বা দশম। কিন্তু ইছতিলাহী বা পারিভাষিক অর্থে ‘আশূরা’ বলতে শুধুমাত্র মুহররমুল হারাম মাসের ১০ তারিখ দিনটিকে বুঝানো হয়ে থাকে। অন্য কোন মাসের ১০ তারিখকে আশূরা বলা হয় না।

মূলতঃ মুহররমুল হারাম মাসের ১০ তারিখ দিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদাম-িত হওয়ার কারণে যেমনিভাবে সে দিনটি ‘আশূরা’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে তদ্রুপ ছফর মাসের শেষ বুধবার দিনটিও বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদাম-িত হওয়ার কারণে ‘আখিরী চাহার শোম্বাহ’ হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। আর সে বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদাম-িত বিষয়টি হলো আল্লাহ পাক-এর হাবীব নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ‘আখিরী চাহার শোম্বাহ’ দিনে সুস্থতা লাভ করেন।

আসলে কুল-কায়িনাত বা কুল-মাখলূক্বাতের কারোরই কোন মর্যাদা নেই বা ছিল না। কেবলমাত্র মর্যাদা-মর্তবার অধিকারী ছিলেন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। অর্থাৎ তিনি হলেন মর্যাদার উৎস। অতঃপর উনার সাথে যার যতটুকু সম্পৃক্ততা বা নিসবত রয়েছে তার তত মর্যাদা।

স্মরণীয় যে, ‘আখিরী চাহার শোম্বাহ’ দিনটি মুসলিম উম্মাহর নিকট  অত্যন্ত তাৎপর্যম-িত। কেননা এ স্মরণীয় দিনটির সাথে আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ, নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বরকতময় জীবন মুবারক-এর বিশেষ স্মৃতি জড়িত।

আখিরী রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১১ হিজরীর মুহররম মাসের তৃতীয় সপ্তাহে অসুস্থ হন। এর পরে সুস্থতা লাভ করেন। অতঃপর ছফর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আবার অসুস্থতা বোধ করেন। অসুস্থতা মারাত্মক আকার ধারণ করে। যার কারণে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন যে, আখিরী রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি সত্যিই বিদায় নিয়ে যাবেন?

আল্লাহ পাক বান্দাদের প্রতি দয়া করে তাদের প্রতি আরো বেশি রহমতে খাছ নাযিল করার লক্ষ্যে আখিরী রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ছফর মাসের শেষ বুধবার সকালে সুস্থতা দান করেন। যার কারণে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ খুশি প্রকাশ করেন। অর্থাৎ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সুস্থ দেখে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ খুশি হয়ে অনেক টাকা পয়সা দান করেন এবং অনেক টাকা-পয়সা হাদিয়াস্বরূপ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খিদমতে পেশ করেন।

বর্ণিত রয়েছে, আফদ্বালুন্ নাস বা’দাল আম্বিয়া হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সাত হাজার দিনার, ফারুকে আ’যম হযরত উমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু পাঁচ হাজার দিনার, খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উসমান যুন নূরাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু দশ হাজার দিনার, আসাদুল্লাহিল গালিব হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিন হাজার দিনার এবং মুবাশশারুল জান্নাহ হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একশত উট ও একশত ঘোড়া আল্লাহ পাক-এর রাস্তায় দান ও হাদিয়া করেন।

এদিকে স্বয়ং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্থ হয়ে সকাল বেলা হযরত উম্মুল  মু’মিনীন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুন্নাগণ এবং আহলে বাইত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে নিয়ে নাস্তা করেন এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের খোঁজ খবর নেন ও খুশি প্রকাশ করেন। যার কারণে ‘আখিরী চাহার শোম্বাহ’ দিনটিতে খুশি প্রকাশ করা সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।

অবশ্য উক্ত দিন বা’দ আছর থেকে পুনরায় নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সে অসুস্থতা নিয়েই ১২ই রবীউল আউয়াল সোমবার শরীফ বিছাল শরীফ লাভ করেন।

উল্লেখ্য, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ ‘আখিরী চাহার শোম্বাহ’ দিনে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সুস্থ পেয়ে খুশি হয়ে উনার খিদমতে যে হাদিয়া পেশ করেছেন এবং আল্লাহ পাক-এর রাস্তায় দান-ছদক্বা করেছেন এসব হাদিয়া ও দানের উদ্দেশ্য ছিল নূরে মুজাস্সাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতঃপর আল্লাহ পাক জাল্লা শানুহু-এর মুহব্বত ও সন্তুষ্টি হাছিল করা। এ কারণে আল্লাহ পাক-এর মা’রিফাত-মুহব্বতে দগ্ধিভূত বান্দাগণ এ দিনটিকে মা’রিফাত-মুহব্বত লাভের ওসীলা হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।

অতএব, এ মুবারক দিনটিতে উম্মাহর দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুহব্বত-মারিফাত, সন্তুষ্টি ও রেযামন্দি হাছিলের উদ্দেশ্যে সাধ্য ও সামর্থ্য মুতাবিক দান-ছদক্বা করা ও খুশি প্রকাশ করা।

দলীলসমূহ: মা ছাবাতা বিস্সুন্নাহ্, মাদারিজুন নুবুওওয়াত ইত্যাদি।

 

মুহম্মদ আব্দুল্লাহ আল মু’মিন

চট্টগ্রাম

 

সুওয়াল: আমি অগ্রণী ব্যাংকে পাঁচ বছর মেয়াদী সঞ্চয় হিসাব খুলেছি। ব্যাংক প্রতি ছয় মাস অন্তর সুদ দিয়ে থাকে। জানতে চাই, বর্তমানে ঐ পরিমাণ টাকা নিজ পকেট থেকে দান করলে ব্যাংকের সুদ ভবিষ্যতে হালাল হবে কি?

জাওয়াব: আল্লাহ পাক সুদকে হারাম করেছেন। সুদ খাওয়া যেমন হারাম তদ্রুপ সুদের টাকা দান করাও হারাম। আল্লাহ পাক বান্দাকে যেমন হালাল খাদ্য গ্রহণ করতে বলেছেন তদ্রুপ দান করার ক্ষেত্রে হালাল উপার্জন থেকে দান করতে বলেছেন। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-

يايها الذين امنوا انفقوا من طيبت ما كسبتم

অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে উত্তম তথা হালাল বস্তু দান করো। (সূরা বাক্বারা-২৬৭)

এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে-

عن ابى هريرة رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ما تصدق احد بصدقة من طيب ولا يقبل الله عز وجل الا الطيب

অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “কোন ব্যক্তি পবিত্র বা উৎকৃষ্ট বস্তু হতে দান করলো। আর আল্লাহ পাক তো পবিত্র বা উৎকৃষ্ট ব্যতীত কোন কিছুই কবুল করেন না।” (বুখারী শরীফ)

অর্থাৎ দান করার জন্য বস্তু হালাল হওয়া শর্ত। অন্যথায় তা আল্লাহ পাক-এর নিকট কবুলযোগ্য নয়।

কাজেই, শরীয়তে হারাম বস্তু দান করাটা যেমন নিষিদ্ধ তদ্রুপ হারাম বস্তুর পরিবর্তে যা হালাল সেটাও দান করা নিষিদ্ধ।

আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-

ولا تلبسوا الحق بالباطل

অর্থ: তোমরা হক্বকে নাহক্বের সাথে মিশ্রিত করো না। অর্থাৎ হালালকে হারামের সাথে মিশ্রিত করো না। (সূরা বাক্বারা-৪২)

অতএব, নিজের হালাল টাকা দান করার দ্বারা ব্যাংকের জমাকৃত সুদের টাকা কখনই হালাল হবে না।

এক্ষেত্রে করণীয় হলো, সুদের টাকার পরিবর্তে নিজ পকেটের হালাল টাকা দান না করে বরং সে টাকা নিজের জন্য ব্যয় বা খরচ করা। এরপর ব্যাংকের জমাকৃত হালাল টাকার অতিরিক্ত যে টাকা উঠানো হবে যা সুদ, সেটা ছওয়াবের নিয়ত ব্যতীত এমন ব্যক্তিদের জন্য ব্যয় করে দিতে হবে যাদের জন্য হারাম খাদ্য গ্রহণ করা বা ব্যবহার করাটা মুবাহের অন্তর্ভুক্ত। যেমন এমন অভাবগ্রস্ত যে বা যারা ৩ দিনের বেশি না খেয়ে থাকে অর্থাৎ যার থাকা-খাওয়ার কোনই ব্যবস্থা নেই অথবা এমন অসুস্থ ও বৃদ্ধ যে উপার্জনে অক্ষম হয়ে পড়েছে অথবা এমন বিধবা যে তার ছেলে-মেয়েদের ভরণ-পোষণের ব্যাপারে একেবারে অক্ষম। অথবা এমন কোন অভাবগ্রস্ত যে টাকা-পয়সার অভাবে তার উপযুক্ত বা বালেগা মেয়েকে বিবাহ দিতে পারছে না সে মেয়ের বিবাহের জন্য। ইত্যাদি।

 

মুহম্মদ আল আমীন

নরসিংদী

 

সুওয়াল: লা-মাযহাবীরা বলে, আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাকি মাটির তৈরি মানুষ। নাউযুবিল্লাহ!

তাদের উক্ত বক্তব্য কতটুকু সঠিক? দয়া করে জানাবেন।

জাওয়াব: আল্লাহ পাক উনার হাবীব, নবীদের নবী, রসূলদের রসূল, নূরে মুজাস্সাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে লা-মাযহাবীদের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা, মনগড়া ও দলীলবিহীন এবং তা কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ এবং সর্বোপরি হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শানের খিলাফ ও মিথ্যা হওয়ার কারণে কুফরী হয়েছে।

কেননা, আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হচ্ছেন নূরের সৃষ্টি। আল্লাহ পাক কুল-মাখলূক্বাত সৃষ্টির পূর্বে সর্বপ্রথম যে নূর মুবারক সৃষ্টি করেন সে নূর মুবারকই হলো হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অজুদ পাক। এবং সেই অজুদ পাক হতে কুল-কায়িনাতের সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি হযরত আদম আলাইহিস্ সালামসহ সমস্ত নবী ও রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণ উনারাও সৃষ্টি হয়েছেন সেই নূর মুবারক হতে। সুবহানাল্লাহ!

এ বিষয়ে যামানার তাজদীদী মুখপত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ-এর একাধিক সংখ্যায় বিস্তারিত আলোচনা এসেছে। বিশেষ করে এ বিষয়ে ৬০-৮২তম সংখ্যা পর্যন্ত বিস্তারিত ফতওয়া প্রকাশ করা হয়েছে। সে ফতওয়ার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে,্ একমাত্র হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম  ব্যতীত আর কেউই মাটি হতে সৃষ্টি নন চাই তিনি নবী হোন কিংবা সাধারণ মানুষ হোন। মূলতঃ কুরআনুল কারীমে মানুষ মাটির তৈরি বলে যত আয়াত শরীফ ইরশাদ হয়েছে তা দ্বারা হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে বুঝানো হয়েছে। অন্য কেউ নন। যা সমস্ত তাফসীরের কিতাবেই উল্লেখ রয়েছে।

আরো উল্লেখ্য, হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম ব্যতীত আর কেউই মাটির দ্বারা সৃষ্টি বা তৈরি নন সেটা স্পষ্টভাবে কুরআনুল কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে।

ইরশাদ হয়েছে-

وبدا خلق الانسان من طين ثم جعل نسله من سللة من ماء مهين.

অর্থ: এবং তিনি অর্থাৎ আল্লাহ পাক মানুষ সৃষ্টির সূচনা করেন মাটি থেকে অতঃপর উনার বংশধর সৃষ্টি করেছেন স্বচ্ছ বা পবিত্র পানির নির্যাস থেকে। সূরা সাজদাহ-৭, ৮)

এ আয়াতে কারীমার মধ্যে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, শুধুমাত্র হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম উনাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর উনার যারা আল আওলাদ অর্থাৎ বংশধর উনাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে বা হয়ে থাকে স্বচ্ছ বা পবিত্র পানির নির্যাস থেকে অর্থাৎ সেই স্বচ্ছ বা পবিত্র পানির নির্জাস থেকে আল্লাহ পাক প্রত্যেক মানুষের দেহ বা আকৃতি কুদরতীভাবে মায়ের রেহেম শরীফে গঠন করে থাকেন।

কাজেই, প্রমাণিত হচ্ছে যে, হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম ব্যতীত অন্য কাউকে মাটির সৃষ্টি বলাটাই কুফরী। আর যিনি হযরত আদম আলাইহিস্ সালামসহ সমস্ত নবী ও রসূলগণের, সমস্ত জিন-ইনসানের, সমস্ত সৃষ্টি-কায়িনাতের নবী ও রসূল, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সৃষ্টির রহস্য তো সম্পূর্ণ আলাদা। তাহলে উনাকে মাটির সৃষ্টি বলাটা কত মারাত্মক কুফরী তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আল্লাহ পাক উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, উনার যারা দুশমন তারা ব্যতীত আর কেউই উক্ত কুফরী কথা উচ্চারণ করতে পারে না।

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল – জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল – জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল – জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল – জাওয়াব বিভাগ