সুওয়াল-জাওয়াব

সংখ্যা: ২২৭তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ রূহুল কুদুস, বগুড়া।

ডা. মুহম্মদ আওক্বাত আলী, চাঁপাইনবাবঞ্জ।

সুওয়াল : মামদূহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত ১০ম খলীফা এবং শাহযাদা হুযূর ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি ১১তম খলীফা এবং ‘আস সাফফাহ’ লক্বব মুবারক উনার অর্থ ও ব্যাখা-বিশ্লেষণ ও মামদূহ হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনিই যে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত মহান খলীফা ‘হযরত আস সাফফাহ আলাইহিস সালাম’ এবং উনার মুবারক উছীলায় যে, অবশ্যই অবশ্যই বর্তমান যামানায় সম্মানিত খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ মুবারক প্রতিষ্ঠিত হবে এ সম্পর্কে দলীল ভিত্তিক বিস্তারিতভাবে জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব :

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

পবিত্র হাদীছ শরীফ মুবারক উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عَنْ حَضْرَتْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰی عَنْهُ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ لَا يَزَالُ الْإِسْلَامُ عَزِيْزًا إِلَى اثْنَيْ عَشَرَ خَلِيْفَةً كُلُّهُمْ مِنْ قُرَيْشٍ وَفِيْ رِوَايَةٍ لا تَزَالُ أُمَّتِيْ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِيْنَ ولاَ يَزَالُ أَمْرُ أُمَّتِىْ صَالِحًا لَا يَضُرُّهُمْ عَدَاوَةُ مَنْ عَادَاهُمْ حَتَّى يَلِيَهُمُ اثْنَا عَشَرَ خَلِيْفَةً كُلُّهُمْ مِنْ قُرَيْشٍ وَفِي رِوَايَةٍ لَا يَزَالُ الدِّيْنُ قَائِمًا حَتَّى تَقُومَ السَّاعَة أَوْ يَكُوْنُ عَلَيْهِمُ اثْنَا عَشَرَ خَلِيْفَةً كُلُّهُمْ مِنْ قُرَيْشٍ .

“হযরত জাবির ইবনে সমুরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি শুনেছি নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেছেন, দ্বীন ইসলাম ততদিন পর্যন্ত পরাক্রমশালী থাকবে, কুওওয়াতশালী থাকবে যতদিন পর্যন্ত ১২ জন মহান খলীফা আলাইহিমুস সালাম উনাদের মুবারক আর্বিভাব ঘটবে। উনারা প্রত্যেকেই সম্মানিত কুরাইশ বংশীয় হবেন। অন্য বর্ণনায় এসেছে, আমার সম্মানিত উম্মত উনারা ততদিন পর্যন্ত পবিত্র হক্ব উনার উপর অবিচল  থাকবেন, উনাদের সম্মানিত শাসন ব্যবস্থা তথা সম্মানিত খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ মুবরক ততদিন পর্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং উনাদের শত্রুরা উনাদের বিরোধিতা করে কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না যতদিন পর্যন্ত উনাদের মাঝে ১২জন মহান খলীফা আলাইহিমুস সালাম উনারা সম্মানিত খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ মুবারক পরিচালনা করবেন। উনারা প্রত্যেকেই সম্মানিত কুরাইশ বংশীয় হবেন।  অন্য বর্ণনায় এসেছে, ক্বিয়ামত অবধি সময়ের মধ্যে দ্বীন ইসলাম শক্তিশালী থাকবে ১২ জন মহান খলীফা আলাইহিমুস সালাম উনাদের মাধ্যমে। উনারা প্রত্যেকেই সম্মানিত কুরাইশ বংশীয় হবেন।” { দলীল সমূহ : (১) বুখারী, (২) মুসলিম, (৩) আবূ দাউদ, (৪) তিরমিযী, (৫-১০) মুসনাদে আহমদ ৫/৮৭, ৮৮, ৮৯, ৯২, ১০৬, ১০৭, (১১-১৪) মুসনাদে বাযযার ৫/৩২০, ১০/১৫৮, ১৯৪, ১৯৭, (১৫) মুসনাদে আবূ ইয়া’লা ১৩/৩৭৯, (১৬Ñ১৭) মু’জামুছ ছাহাবাহ ১/১৪৪, ৩/২৩৪, (১৮-২২) মুসতাখরাজে আবী আওয়ানা ৮/১৪০, ১৪২, ১৪৫, ১৪৬, ১৪৭, (২৩-২৪) মুস্তাদরাকে হাকিম ৩/৭১৫, ৭১৬, (২৫) মুসনাদে ইবনে জা’দ ১/৩৯০, (২৬-২৭) মুসনাদে ত্বয়ালসী ১/১০৫, ১৮০,  (২৮) দায়লামী ৫/১০২, (২৯) আবী শায়বাহ ৬/৩৬৩, (৩০) দালাইলুন নুবুওওয়াহ লিল বাইহাক্বী ৬/৫২০, (৩১-৩৯) আল মু’জামুল কাবীর ২/২৭৪, ২৭৫, ২৭৮, ২৭৯, ২৯৩, ৩০৩, ৩৬৩, ৩৬৭, ১৫/৪৯৫, (৪০) আল মু’জামুল আওসাত্ব ৬/২৬৮, (৪১) মু’জামুশ শুয়ূখ ১/৩২৭, (৪২) আল আহাদ ওয়াল মাছানী ৩/১৫৩, (৪৩) শরহুস সুন্নাহ ১৫/৩০, (৪৪) সুন্নাহ ২/৫৩২, (৪৫) মা’রিফাতুছ ছাহাবাহ লিআবী নাঈম ১/৭৭, (৪৬) তাসমিয়াতু মা রওয়াহু সাঈদ ইবনে মানছূর লিআবী নাঈম ১/১৫, (৪৭) হাদীছুল আনছারী ১/৭১, (৪৮) ফাদ্বাইলুল খুলাফাইর রাশিদীন আলাইহিমুস সালাম লি আবী নাঈম ১/৩২৩, (৪৯) কিতাবুল ফাওয়াইদ ১/৪১১, (৫০-৫১) সুনানুল ওয়ারিদা ফিল ফিতান ২/৪৯২, ৫/৯৫৫, (৫২-৫৩) ইবনে হাব্বান ১৫/ ৪৩-৪৪, (৫৪) ইবনে জা’দ, (৫৫-৬০) জামিউল আহাদীছ ১৬/১২৯, ১৭/১২৯, ১৩৩, ১৪৭, ১৫১, ১৯০, (৬১-৬৮) জামউল জাওয়ামি’ ১/১৮০৪৪, ১৯৩৮৮, ১৯৩৮৯, ১৯৩৯৮, ১৯৩৯৯, ১৯৪৪১, ১৯৪৪৮, ১৯৫৫৬, (৬৯-৭০) ইস্তিয়াব ১/১৯৮, ২/৬৫৬, (৭১) জামি’উল উছূল ৪/২০২২, (৭২) খছাইছুল কুবরা ২/১৭৫,  (৭৩) তারীখুল খুলাফা ৮ পৃ, (৭৪-৭৬) মুখতাছারু তারীখি দিমাশক্ব ১/৩৯২, ৩/৩২১, ৮/১৪৮,  (৭৭) তারীখে বাগদাদ, (৭৮) ফাতহুল কাবীর ৩/৩৪৮, (৭৯) মাজমাউঝ ঝাওয়াইদ ৫/২২৮, (৮০) মাত্বালিবুল আলিয়া, (৮১) দালাইলুন নুবুওওয়াহ লিআবী নাঈম ২/৭৯, (৮২-৮৩) সুবুলুল হুদা ওয়ার রশাদ ১০/৮৩, ১২৩, (৮৪) ক্বছাছুল আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম লি ইবনে কাছীর ১/২০১, (৮৫) আছ ছওয়াইকুল মুহরিক্বাহ ১/৫৪, (৮৬) ইযালাতুল খফা ১/৩২৩, (৮৭-৯১) বিদায়া-নিহায়া ১/১৭৭, ৬/২১৫, ২২১, ২৭৮, ২৭৯, (৯২-৯৩) আন নিহায়া ফিল ফিতান ১/৫, ১৫, (৯৪) তারীখ লিআবী নাঈম ১/২৭৩, (৯৫) তারীখে ইবনে খালদুন ১/৩২৫, (৯৬) মিশকাত শরীফ ৫৫০ পৃষ্ঠা, (৯৭) মিরকাত, (৯৮) আশয়াতুল লুমাত, (৯৯) শরহুত ত্বিবী, (১০০-১০১) আত তারীখুল কাবীর লিল বুখারী ১/৪৪৬, ৮/৪১১, (১০২) আছ ছিক্বাত ৭/২৪২, (১০৩) তাহযীবুল কামাল ৩/২২৪, (১০৪) সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ১৯/৩৯৮, (১০৫) আল হাওই ২/৮০, (১০৬-১০৭) ফাতহুল বারী ১৩/২১১, ২১২, (১০৮) উমদাতুল ক্বারী ৩৫/৩২৭, (১০৯) ইকমাল ৬/১১১, (১১০) আল মুফহিম ১২/৬৮, (১১১) শরহুন নববী ৬/২৮৫, (১১২) আদ দীবাজ ৪/৪৪০, (১১৩) কাশফুল মুশকিল ১/২৮৯, (১১৪-১১৫) তুহফাতুল আহওয়ায ৬/৫, ৮, (১১৬) ফখরিল আরব ১/৩, (১১৭) আওনুল মা’বূদ ৯ম খ-, (১১৮) আল ‘উরফ ১/১৫১, (১১৯) ফী কিতাবিল আহকাম ২/৫৩৮, (১২০-১২২) তুহফাতুল আশরাফ ২/১৪৮, ১৫১, ১৬১, (১২৩-১২৬) কানযুল উম্মাল ১১/১৩৫, ১৫২, ১২/৩২, ১২/৩৩, তারীখুল খুলাফা ৪৬ ইত্যাদি। এছাড়াও পৃথিবীর আরো অন্যান্য বিশ্বখ্যাত কিতাব মুবারক উনাদের মধ্যে আলোচ্য পবিত্র হাদীছ শরীফখানা রয়েছে। সুবহানাল্লাহ!}

‘আবূ দাউদ শরীফ’ উনার মধ্যে অপর এক বর্ণনায় এসেছে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

لاَ يَزَالُ هذَا الدّيْنُ عَزِيْزًا إِلَى اثْنَىْ عَشَرَ خَلِيْفَةً  قَالَ فَكَبَّرَ النَّاسُ وَضَجُّوْا.

“দ্বীন ইসলাম ততদিন যাবত পরাক্রমশালী থাকবে, কুওওয়াতশালী থাকবে যতদিন পর্যন্ত ১২ জন মহান খলীফা আলাইহিমুস সালাম উনাদের মুবারক আর্বিভাব ঘটবে। (উনারা প্রত্যেকেই সম্মানিত কুরাইশ বংশীয় হবেন।)” বর্ণনাকারী তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এই মুবারক ভবিষৎবাণী শুনে সমবেত হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা প্রত্যেকেই উচ্চ আওয়ায মুবারক-এ তাকবীর দিলেন তথা খুশি প্রকাশ করলেন, ঈদ পালন করলেন।” সুবহানাল্লাহ।

সুতরাং উপরোক্ত দলীলভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হলো যে, ক্বিয়ামত অবধি সময়ের মধ্যে এই উম্মতের মাঝে ১২ জন মহান বিশেষ খলীফা আলাইহিমুস সালাম উনাদের মুবারক আবির্ভাব ঘটবে। এখানে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কেননা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে স্পষ্টভাবে ১২ জন খলীফা আলাইহিমুস সালাম উনাদের কথা বলা হয়েছে। আর এই পবিত্র হাদীছ শরীফগুলো ছহীহ হওয়ার ব্যাপারে সমস্ত ইমাম মুজতাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা ঐক্যমত পোষণ করেছেন। সুবহানাল্লাহ! তাই এই ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করলে ঈমানদার থাকা যাবে না।

 

মুহম্মদ আনিছুর রহমান

সদর, চাঁদপুর

 

সুওয়াল: পবিত্র হজ্জ উনার ফরযসমূহ কয়টি?

জাওয়াব: পবিত্র হজ্জ উনার ফরয হচ্ছে ৩টি। (১) ইহরাম বাঁধা অর্থাৎ “মীক্বাত” হতে ইহরাম বাঁধা। (২) ওকূফে আরাফা অর্থাৎ ৯ই যিলহজ্জ উনার দ্বিপ্রহরের পর হতে অর্থাৎ সূর্য ঢলার পর হতে ১০ই যিলহজ্জ ছুব্হে ছাদিকের পূর্ব পর্যন্ত যে কোন সময় আরাফার ময়দানে উপস্থিত থাকা। (৩) তাওয়াফে যিয়ারত অর্থাৎ ১০, ১১ ও ১২ই যিলহজ্জ তারিখের মধ্যে কা’বা শরীফ তাওয়াফ করা।

 

 

মুহম্মদ আব্দুল্লাহ আন নূর

সদর, মাদারীপুর

 

সুওয়াল : পবিত্র হজ্জ উনার ওয়াজিব কয়টি?

জাওয়াব : পবিত্র হজ্জ উনার মূল ওয়াজিব ৫টি। (১) সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সায়ী করা। (২) মুযদালিফায় অবস্থান করা। (৩) রমী বা কঙ্কর নিক্ষেপ করা। (৪) মাথা মু-ন করা। (৫) তাওয়াফে বিদা বা বিদায়ী তাওয়াফ করা।

 

মুহম্মদ মুফীজুর রহমান

সদর, চাঁদপুর

 

সুওয়াল : পবিত্র হজ্জ আদায়ের ছহীহ পদ্ধতি বা নিয়ম জানতে বাসনা রাখি।

জাওয়াব : পবিত্র হজ্জ করতে হলে প্রথমে ইহরাম বাঁধতে হয়। ইহরাম বাঁধা পবিত্র হজ্জ উনার অন্যতম রুকন বা ফরয। বাংলাদেশ তথা পাক ভারত উপমহাদেশের লোকেরা সাধারণত ইয়েমেন হয়ে হজ্জে গমন করে থাকে। সে হিসেবে তাদের “মীক্বাত” (ইহরাম বাঁধার স্থান) হচ্ছে ‘ইয়ালামলাম।’

যারা সরাসরি পবিত্র হজ্জ করতে না গিয়ে আগে মদীনা শরীফ গিয়ে সেখানে অবস্থান করার পর পবিত্র হজ্জ আদায় করার ইচ্ছা পোষণ করে, তাদেরকে মদীনা শরীফ উনার অধিবাসীদের মীক্বাত “যুলহুলাইফা” নামক স্থান হতে পবিত্র হজ্জ উনার ইহরাম বাঁধতে হবে।

আমাদের হানাফী মাযহাব মোতাবেক তিন প্রকার পবিত্র হজ্জ উনার মধ্যে ‘হজ্জে ক্বিরান’ হচ্ছে সুন্নত ও আফযল।

ইহরাম বাঁধতে হলে প্রথমে ওযু বা গোসল করে নিতে হয়, তবে গোসল করাটাই উত্তম। অতঃপর দু’খানা নতুন বা পরিষ্কার কাপড় পরিধান করবে। একখানা সেলাইবিহীন ইযার, অপরখানা চাদর। সাথে সুগন্ধি থাকলে মেখে নিবে। অতঃপর দু’রাকায়াত নামায পড়ে নিম্নের দোয়া পাঠ করবে যা হজ্জে ক্বিরানের নিয়ত

اللهم انى اريد الحج والعمرة فيسّرهما لى وتقبلهما منى.

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নী উরীদুল হাজ্জা ওয়াল ওমরাতা ফাইয়াস্সির হুমালী ওয়া তাক্বাব্বালহুমা মিন্নী।” অর্থ : আয় মহান আল্লাহ পাক! আমি পবিত্র হজ্জ ও উমরার নিয়ত করলাম। আমার জন্য উভয়টি সহজ করুন এবং আমার পক্ষ থেকে উভয়টি কবুল করুন।

আর যদি কেউ পবিত্র হজ্জে তামাত্তুর নিয়ত করে তাহলে তাকে প্রথমে উমরার নিয়তে ইহরাম বাঁধতে হবে।

উমরার নিয়ত :

اللهم انى اريد العمرة فيسّرها لى وتقبلها منى.

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি উরীদুল উমরাতা ফাইয়াস্সিরহা-লী ওয়া তাক্বাব্বাল্হা মিন্নী। অর্থ : আয় মহান আল্লাহ পাক! আমি উমরা করার নিয়ত করছি। অতঃপর তা আমার জন্য সহজ করে দিন এবং তা আমার তরফ থেকে কবুল করে নিন।

আর যদি কেউ পবিত্র হজ্জে ইফরাদের নিয়ত করে তাহলে তাকে শুধু পবিত্র হজ্জ উনার নিয়ত করতে হবে।

পবিত্র পবিত্র হজ্জ উনার নিয়ত :

اللهم انى اريد الحج فيسّره لى وتقبله منى.

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি উরীদুল হাজ্জা ফাইয়াস্সিরহু লী ওয়া তাক্বাব্বাল্হু মিন্নী।

অর্থ : আয় মহান আল্লাহ পাক! নিশ্চয়ই আমি শুধু পবিত্র হজ্জ করার নিয়ত করছি। সুতরাং আপনি আমার জন্য তা পালন করা সহজ করুন এবং আমার পক্ষ হতে কবুল করুন।

অতঃপর তালবিয়া পাঠ করবে। তালবিয়া হচ্ছে-

لبيك اللهم لبيك، لبيك لا شريك لك لبيك، ان الحمد والنعمة لك والـملك لا شريك لك.

উচ্চারণ : লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা, লাব্বাইকা লা- শারীকালাকা লাব্বাইকা, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান্ নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্কা লা-শারীকা লাকা।

অর্থ: আমি হাজির আছি হে মহান আল্লাহ পাক! আমি হাজির আছি। আমি হাজির আছি, আপনার কোন শরীক নেই, আমি হাজির আছি। নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা ও সমস্ত নিয়ামত এবং সমস্ত রাজত্ব আপনারই, আপনার কোন শরীক নেই।

এ তালবিয়ার কোন শব্দ বাদ দেয়া যাবেনা। ইচ্ছা করলে বৃদ্ধি করা যেতে পারে। আর তালবিয়া পাঠ করা হলেই ইহরাম বাঁধা হয়ে গেলো।

ইহরাম বেঁধে মক্কা শরীফ প্রবেশ করেই তাওয়াফের দ্বারাই কাজ শুরু করতে হবে। অর্থাৎ ক’াবা শরীফ ৭ বার প্রদক্ষিণ করে তাওয়াফের কাজ সমাধা করতে হবে।

তাওয়াফের নিয়ম :

তাওয়াফের নিয়তের সাথে ওযু-গোসল করে কা’বা শরীফ উনার হাজরে আসওয়াদের ঠিক বরাবর দাঁড়িয়ে হজরে আসওয়াদ চুম্বন করে আর ভিড়ের জন্য চুম্বন করতে না পারলে ইস্তেলাম (হাতে ইশারা করে চুম্বন) করে তাওয়াফ শুরু করবে। (উল্লেখ্য, হজরে আসওয়াদ থেকে সামনে বেড়ে তাওয়াফ শুরু করলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। আর তাওয়াফকালীন শুধুমাত্র হজরে আসওয়াদ চুম্বন করার সময় মুখ কা’বা শরীফ উনার দিকে থাকবে, অন্যসময় মুখ সামনের দিকে থাকবে। আর বাইতুল্লাহ শরীফ বাম পার্শ্বে থাকবে। তাওয়াফের সময় মুখ বা পিঠ কা’বা শরীফ উনার দিকে থাকলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবেনা।)

পর্যায়ক্রমে হজরে আসওয়াদ থেকে শুরু করে মুলতাযিম এরপর বাইতুল্লাহ শরীফ উনার দরজা, রুকনে ইরাকী হয়ে হাতিমের বাহির দিয়ে পর্যায়ক্রমে রুকনে শামী, রুকনে ইয়ামেন হয়ে এরপর হজরে আসওয়াদ পর্যন্ত পৌঁছলে এক চক্কর সমাধা হলো। অতঃপর হজরে আসওয়াদ চুম্বন করবে। ভিড়ের কারণে চুম্বন করতে না পারলে ইস্তেলাম করবে। পুনরায় হজরে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফের দ্বিতীয় চক্কর শুরু করবে। প্রত্যেক চক্করের সময় খেয়াল রাখতে হবে, তাওয়াফকারী যেন কোন চক্করের সময়ই হজরে আসওয়াদ থেকে সামনে বেড়ে তাওয়াফ শুরু না করে।

তাওয়াফের মধ্যে প্রথম তিন চক্কর রমল (হাত বাঁকা করে বুক পর্যন্ত উঠিয়ে হাত নেড়ে নেড়ে বীরের ন্যায় মধ্য গতিতে দৌড়ানোকে রমল বলে) ও শেষ চার চক্কর মাশী (সাধারণ গতিতে চলাকে মাশী বলে।) করবে।

তাওয়াফ সমাধা করে ছাফা মারওয়াতে সায়ী (দৌড়ানো) করবে। এ সমস্ত কাজগুলি উমরার। অর্থাৎ উমরাহ সমাধা হলো।

যদি কেউ পবিত্র হজ্জে তামাত্তুর নিয়ত করে থাকে তাহলে চুল মু-ন করে ইহরাম ছেড়ে দিবে। অতঃপর তামাত্তুকারী ৮ই যিলহজ্জ পবিত্র হেরেম শরীফ উনার সীমানার অন্তর্ভুক্ত কোন এক স্থান থেকে পবিত্র হজ্জ উনার জন্য ইহরাম বেঁধে নিবে। এরপর যথারীতি পবিত্র হজ্জের আহকামসমূহ পালন করবে। তামাত্তুকারীও যদি পবিত্র হজ্জ উনার পূর্বে নফল তাওয়াফ করে তার মধ্যে রমল, ইজতেবা আদায় করে এবং এরপর সায়ী করে তাহলে তামাত্তুকারীকেও তাওয়াফে যিয়ারতের মধ্যে রমল, ইজতেবা ও এরপর সায়ী করতে হবেনা। অতঃপর পবিত্র হজ্জ উনার জন্য যথারীতি পবিত্র হজ্জে ইফরাদের মত তাওয়াফে কুদূম করতে হবে।

ক্বিরানকারী তাওয়াফে কুদূম করার সময় রমল ও ইজতেবার সাথে তাওয়াফ করবে। অতঃপর ছাফা ও মারওয়া সায়ী করবে। তাহলে তাওয়াফে যিয়ারতের সময় রমল ও ইজতেবা ও পরে সায়ী করতে হবেনা।

পবিত্র হজ্জে ইফরাদকারী যদি তাওয়াফে কুদূমের মধ্যে রমল, ইজতেবা ও সায়ী করে তাহলে তাওয়াফে যিয়ারতের মধ্যে রমল, ইজতেবা ও এরপর সায়ী করতে হবেনা। তবে ইফরাদ হজ্জে তাওয়াফে যিয়ারতের পর সায়ী করা উত্তম।

তাওয়াফ শুরু করার পূর্বে ইজতেবা করতে হবে। ইজতেবা হলো- চাদরকে ডান বগলের নিচে দিয়ে ও বাম কাঁধের উপর দিয়ে পরা যাতে ডান কাঁধ খোলা থাকে এবং বাম কাঁধ ঢাকা থাকে।

উল্লেখ্য, প্রতিবার তাওয়াফ করার সময় হাতীম উনার বাহির দিয়ে তাওয়াফ করতে হবে। হাতীম হলো- ক’াবা শরীফ উনার উত্তর পার্শ্বে দু’দিক খোলা কমর পর্যন্ত উঁচু দেয়াল দ্বারা ঘেরা স্থান। তাওয়াফ করার সময় প্রথম তিন চক্কর রমল করবে ও শেষ চার চক্কর মাশী করবে। তাওয়াফকালীন প্রত্যেকবারই হাজরে আসওয়াদের নিকট আসলে উনাকে চুম্বন করবে অথবা হাতে ইস্তেলাম করবে। ইস্তেলাম হলো- হাতে ইশারা করে চুম্বন করা। শেষবার চুম্বন বা ইস্তেলাম করে তাওয়াফ সমাধা করবে। অতঃপর মাক্বামে ইব্রাহীমে এসে দু’রাকায়াত নামায আদায় করবে। যদি ভিড় বা অন্য কোন কারণে সেখানে নামায পড়া সম্ভব না হয় তাহলে মাকামে ইবরাহীমের পিছনে মসজিদে হারামের যেখানে সম্ভব হয় সেখানেই দু’রাকায়াত নামায আদায় করবে। এই তাওয়াফকে তাওয়াফে কুদূম বলে। ইহা আদায় করা সুন্নত। ইহা মক্কাবাসীদের জন্য আদায় করতে হয়না।

অতঃপর মসজিদে হারামের বাবুছছাফা নামক দরজা দিয়ে বের হয়ে ছাফা পাহাড়ে গিয়ে আরোহণ করবে। সেখানে ক’াবা শরীফ উনার দিকে মুখ করে তাসবীহ-তাহলীল বলে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার  প্রতি দুরূদ শরীফ পাঠ করে নিজের আরজু মোতাবেক দোয়া করবে। অতঃপর সেখান থেকে অবতরণ করে সাধারণ গতিতে মারওয়া পাহাড়ের দিকে চলবে।

তবে বত্নে ওয়াদীতে পৌঁছে মাইলাইনে আখজারাইনে (সবুজ রঙয়ের মাইল দ্বারা চিহ্নিত স্থান) দৌড়াবে। অতঃপর সাধারণ গতিতে মারওয়া পাহাড়ে আরোহণ করবে। ছাফা পাহাড়ের অনুরূপ মারওয়া পাহাড়েও তাকবীর, তাহলীল, দুরূদ শরীফ পাঠ ও দোয়া করবে। এতে একবার হলো। অনুরূপ সাতবার ছাফা-মারওয়াতে দৌড়াবে। অর্থাৎ ছাফা হতে শুরু করবে মারওয়াতে শেষ করবে। অতঃপর ইহরাম অবস্থায় মক্কা শরীফ-এ অবস্থান করবে এবং যত ইচ্ছা তাওয়াফ করবে।

উল্লেখ্য, পবিত্র হজ্জ উপলক্ষে তিনটি খুতবা দেয়া হয়। (১) পবিত্র যিলহজ্জ মাসের ৭ তারিখে যোহরের পর মসজিদে হারামে এক খুতবা দিতে হয়। খুতবার মধ্যে বসতে হয়না। (২) আরাফার ময়দানে পবিত্র যিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখে দুই খুতবার মধ্যে বসতে হবে। ইহা যুহরের নামাযের পূর্বে দিতে হয়। (৩) পবিত্র যিলহজ্জ উনার ১১ই তারিখে মীনাতে যুহরের পরে এক খুতবা দিতে হয়, মধ্যে বসতে হয়না।

পবিত্র হজ্জ আদায়কারী ৮ই পবিত্র যিলহজ্জ ফজর নামায মক্কা শরীফ-এ আদায় করে মিনার দিকে রওয়ানা হবে। মিনাতে যুহর, আছর, মাগরিব, ইশা ও ফজর আদায় করবে। অতঃপর সেখান থেকে আরাফার ময়দানে যাবে অর্থাৎ ৯ই পবিত্র যিলহজ্জ আরাফার ময়দানে সারাদিন অবস্থান করবে। আরাফার ময়দানে ইমাম ছাহিব খুতবার মাধ্যমে আরাফার কার্যসমূহ শুরু করবে। খুতবান্তে যুহরের ওয়াক্তে ইমাম ছাহিব এক আযান ও দু’ইকামতে  যুহর ও আছরের নামায পড়াবেন।

যে ব্যক্তি নিজ স্থানে একা একা নামায আদায় করবে সে যুহরের ওয়াক্তে যুহরের নামায, আছরের ওয়াক্তে আছরের নামায আদায় করবে। ইহাই হযরত ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ফতওয়া।

নামাযের পরে আরাফার ময়দানে ওকূফ বা অবস্থান করবে যতটুকু সম্ভব জাবালে রহমতের নিকটে। আরাফার ময়দানে বত্নে আ’রানা ব্যতীত সমস্তটুকুই অবস্থানস্থল।

ওকূফ অবস্থায় ইমাম ছাহিব বাহনের উপর থেকে হাত তুলে দোয়া করবে। আর অন্যান্যরাও যত বেশি সম্ভব দোয়া-ইস্তিগফারে মশগুল থাকবে।

৯ই পবিত্র যিলহজ্জ সূর্যাস্তের পর ইমাম ছাহিব সকলকে নিয়ে সাধারণ গতিতে মুযদালিফায় রওয়ানা হবে। সেখানে কুযা নামক পাহাড় যার উপর মিকাদা রয়েছে তার নিকট অবতরণ করবে। সেখানে ইমাম ছাহিব ইশার ওয়াক্তে একই আযান ও একই ইক্বামতে সকলকে নিয়ে মাগরিব ও ইশার নামায আদায় করবে। এর মধ্যে সুন্নত ও নফল পড়বেনা। পথে যদি কেউ মাগরিব পড়ে তবে সেটা আদায় হবেনা।

বত্নে মুহাস্সার ব্যতীত সকল স্থানই মুযদালিফায় অবস্থানস্থল

 

ছুবহে ছাদিক হওয়া মাত্রই ইমাম ছাহিব সকলকে নিয়ে অন্ধকার থাকতেই ফজর নামায আদায় করে সকলকে নিয়ে দাঁড়িয়ে দোয়া করবে। আর সূর্যোদয়ের পূর্বে ইমাম ছাহিব তার সাথে সকলকে নিয়ে মিনায় রওয়ানা হবে।

মুযদালিফা হতে মিনায় যাওয়ার পূর্বে বা পথে ৪৯টি বা ৭টি বা ৭০টি কঙ্কর নিয়ে তালবিয়া পাঠ করতে করতে মিনার দিকে রওয়ানা দিবে। ১০ই যিলহজ্জ সকালে শুধুমাত্র মিনাস্থ জমরাতুল আকাবাতে ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। কঙ্কর নিক্ষেপ করতে প্রত্যেকবার তাকবীর বলবে এবং কঙ্কর নিক্ষেপ করার পর সেখানে একটুও দাঁড়াবেনা। আর প্রথম কঙ্কর নিক্ষেপ করার সাথে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করে দিবে।

অতঃপর কুরবানী করতে হবে। যারা শুধু পবিত্র হজ্জে ইফরাদ করবে তাদের জন্য এ কুরবানী করা মুস্তাহাব। আর যারা পবিত্র হজ্জে তামাত্তু ও পবিত্র হজ্জে ক্বিরান করবে তাদের জন্য এ কুরবানী করা ওয়াজিব। যা কুরবানী করতে হবে তা হচ্ছে- এক বকরী অথবা এক দুম্বা অথবা গরু, মহিষ বা উটের এক সপ্তমাংশ।

যদি তামাত্তু ও ক্বিরানকারী আর্থিক অনটনের কারণে ওয়াজিব কুরবানী করতে না পারে তাহলে তাদের জন্য ১০ই পবিত্র যিলহজ্জ উনার পূর্বে ৩টি এবং ১৩ই পবিত্র যিলহজ্জ উনার পরে ৭টি রোযা রাখা ওয়াজিব হবে। যদি ১০ই পবিত্র যিলহজ্জ উনার পূর্বে ৩টি রোযা রাখতে না পারে তাহলে কুরবানী অবশ্যই করতে হবে। কুরবানী করার পর পুরুষেরা মাথা মু-ন করে অথবা চুল ছেঁটে ইহরাম খুলে ফেলবে। মহিলারা চুল মু-ন না করে এক অঙ্গুলি বা এক ইঞ্চি পরিমাণ চুল ছাঁটবে।

এ অবস্থায় মুহরিমের জন্য নির্জন বাস ছাড়া সবই হালাল হয়ে গেলো। একই দিনে অর্থাৎ ১০ই যিলহজ্জে তাওয়াফে যিয়ারত করা উত্তম যা পবিত্র হজ্জ উনার শেষ ফরয। তাওয়াফে যিয়ারত ১২ই পবিত্র যিলহজ্জ সূর্যাস্তের পূর্বে আদায় করতে হবে। অন্যথায় দম দেয়া ওয়াজিব হবে।

১০, ১১ এবং ১২ই যিলহজ্জ তারিখে মিনায় অবস্থান করা সুন্নত। ১১ এবং ১২ই যিলহজ্জ তারিখে মিনার জমরাতুল আকাবা, জমরাতুল উস্তা ও জমরাতুল ঊলাতে পর্যায়ক্রমে ৭টি করে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। ১০ তারিখে সূর্য ঢলার পূর্বে ১১ ও ১২ তারিখে সূর্য ঢলার পরে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে।

১২ই যিলহজ্জ সূর্যাস্তের পূর্বেই মিনা হতে মক্কা শরীফ-এ চলে আসা যায়। যদি আসতে রাত্র হয়ে যায় তাহলে আসাটা মাকরূহের সাথে জায়িয রয়েছে। আর যদি ১৩ তারিখ সকাল হয়ে যায় তাহলে তিন স্থানে ৭টি করে ২১টি কঙ্কর নিক্ষেপ করে আসতে হবে। এটাই সুন্নত। কঙ্কর নিক্ষেপের সময় হলো সূর্য ঢলার পর হতে সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত।

মিনাতে কঙ্কর নিক্ষেপের জন্য অবস্থান করতঃ মাল-সামানা বা আসবাবপত্র মক্কা শরীফ-এ পাঠিয়ে দেয়া মাকরূহ। মিনাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করা শেষ করে মক্কা শরীফ-এ আসার পথে মুহাস্সার নামক স্থানে কিছুক্ষণ অবস্থান করা সুন্নত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সেখানে যুহর, আছর, মাগরিব ও ইশার নামায আদায় করেছেন। অতঃপর মক্কা শরীফ-এ এসে তাওয়াফে বিদা বা তাওয়াফে ছুদুর করবে। মক্কাবাসী ব্যতীত অন্যান্য সকলের জন্য এ তাওয়াফে বিদা ও তাওয়াফে ছুদূর ওয়াজিব। যাদের উপর তাওয়াফে বিদা বা তাওয়াফে ছুদূর ওয়াজিব তারা এ তাওয়াফ না করলে তাদের জন্য দম দেয়া ওয়াজিব।

যে সমস্ত মহিলারা অসুস্থ হয়ে যায় অর্থাৎ যারা মাজূর হয়ে যায় তাদের জন্য তাওয়াফে ছুদুর ওয়াজিব থাকেনা। এ তাওয়াফ ব্যতীতই তারা বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করবে।

 

মুহম্মদ রায়হানুর রহমান

সদর, রাজশাহী

সুওয়াল : মীক্বাত কাকে বলে?

জাওয়াব : যে স্থান থেকে পবিত্র হজ্জ উনার জন্য ইহরাম বাঁধতে হয় সে স্থানকে মীক্বাত বলে। বাংলাদেশের হাজী ছাহিবরা যেহেতু ইয়েমেন হয়ে পবিত্র হজ্জ করতে যায় সেহেতু ইয়েমেনবাসীর যে মীক্বাত “ইয়ালামলাম” বাংলাদেশীদেরও সেই একই মীক্বাত। আর যদি বাংলাদেশী হাজী ছাহিবরা মদীনা শরীফ হয়ে যায় তাহলে মদীনা শরীফবাসীদের যে মীক্বাত “যুলহুলাইফা” সেখান থেকে তাদেরকে ইহরাম বাঁধতে হবে।

এছাড়াও যদি ইরাক হয়ে যায় তাহলে ইরাকবাসীদের যে মীক্বাত “যাতে ইরাক” সেখান থেকে ইহরাম বাঁধতে হবে।

আর যদি সিরিয়া হয়ে যায় তাহলে “জুহ্ফা” থেকে ইহরাম বাঁধতে হবে যা সিরিয়াবাসীদের মীক্বাত।

আর যদি নজদ হয়ে যায় তাহলে “করণ” হতে ইহরাম বাঁধতে হবে যা নজদবাসীদের মীক্বাত।

এছাড়াও আরও মীক্বাত রয়েছে। যারা মীক্বাতের ভিতরের অধিবাসী তাদের মীক্বাত হলো “হিল”। মীক্বাত ও হেরেম শরীফ উনার মধ্যবর্তী স্থানকে হিল বলে।

মক্কাবাসীদের পবিত্র পবিত্র হজ্জ উনার জন্য মীক্বাত হলো- “হেরেম শরীফ।” আর উমরার জন্য মীক্বাত হলো- “হিল।”

 

মুহম্মদ আল আমীন

পলাশ, নরসিংদী

সুওয়াল : ইহরাম অবস্থায় নাকি মেয়েদের চেহারা বা মুখম-লে কাপড় লাগানো যায় না। কাপড় লাগলে বা স্পর্শ করলে দম ওয়াজিব হয়। তাহলে কি মেয়েরা চেহারা না ঢেকে খুলে রাখবে? অর্থাৎ ইহরাম অবস্থায় কি মেয়েদের জন্য পর্দা করার দরকার নেই? জাওয়াব : ‘ইহরাম অবস্থায় মেয়েদের চেহারা বা মুখম-লে কাপড় স্পর্শ করা বা লাগানো যাবে না, এ কথা সত্য।’ তবে এক্ষেত্রে মাসয়ালা হলো, যদি একদিন বা এক রাত্রি মুখম-লে কাপড় স্পর্শ করে তাহলে তাদের উপর দম অর্থাৎ একটি কুরবানী ওয়াজিব হবে। আর যদি এক দিন বা এক রাত্রির কম সময় কাপড় স্পর্শ করে তাহলে এক ফিতরা পরিমাণ ছদকা করা ওয়াজিব হবে।

এর অর্থ এটা নয় যে, মেয়েরা ইহরাম অবস্থায় মুখম-ল খোলা রেখে বেপর্দা হবে। মেয়েদের সর্বাবস্থায় বেগানা পুরুষদের সামনে মুখম-ল খোলা রাখা হারাম যা কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।

অতএব, ইহরাম অবস্থায় মেয়েদের করণীয় হচ্ছে- তারা মুখম-লের উপর এমনভাবে কাপড় ঝুলিয়ে রাখবে যাতে কাপড় মুখম-লে স্পর্শ না করে। অর্থাৎ নেট বা জালি জাতীয় কোন কিছুর সাহায্যে নেকাব মুখম-ল থেকে কিছুটা দূরে  ঝুলিয়ে রাখবে।

স্মরণ রাখতে হবে যে, কোন অবস্থাতেই পর্দার খিলাফ করা যাবে না। কারণ মেয়েদের জন্য পর্দা রক্ষা করা হচ্ছে স্বতন্ত্র একটি ফরয। যা ফরযে আইন; এবং তা দায়িমী ফরযের অন্তর্ভুক্ত। যেমনিভাবে পুরুষের জন্য স্বতন্ত্র ও দায়িমী ফরয হচ্ছে হালাল কামাই করা।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عن حضرت عبد الله رضى الله تعالى عنه  قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم طلب كسب الـحلال فريضة بعد الفريضة

অর্থ: “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, “পুরুষের জন্য অন্যান্য ফরযের পর ফরয হচ্ছে হালাল কামাই করা।” (বাইহাক্বী শরীফ, মিশকাত শরীফ)

وللنساء الحجاب

“আর মেয়েদের জন্য ফরয হচ্ছে পর্দা করা।”

অর্থাৎ কালিমা, নামায, রোযা, পবিত্র হজ্জ ও যাকাতের পর পুরুষের জন্য ফরয হলো হালাল কামাই করা আর মেয়েদের জন্য ফরয পর্দা করা। নামায, রোযা, পবিত্র হজ্জ ও যাকাতের ন্যায় এ দুটি ফরয পালনের ক্ষেত্রেও পবিত্র কুরআন শরীফ-পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনার মধ্যে কঠোর নির্দেশ আরোপিত হয়েছে।

যেমন, হালাল রুজির ব্যাপারে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত হয়েছে, এক দিরহাম বা এক পয়সা হারাম খেলে চল্লিশ দিন ইবাদত কবুল হয় না এবং আরও বর্ণিত হয়েছে-

عن حضرت جابر رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لا يدخل الـجنة لـحم نبت من السحت وكل لـحم نبت من السحت كانت النار اولى به.

    অর্থ : “হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, ওই গোশতের টুকরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না যা হারাম খাদ্যের দ্বারা তৈরি হয়েছে। শরীরের যে গোশতের টুকরা হারাম খাদ্যের দ্বারা তৈরি হয়েছে তার জন্য জাহান্নামের আগুনই যথেষ্ট। অর্থাৎ যে ব্যক্তি হারাম রুজি ভক্ষণ করে সে জাহান্নামী।” (আহমদ শরীফ, দারিমী শরীফ, বাইহাক্বী শরীফ, মিশকাত শরীফ)

আর পর্দার ব্যাপারে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত হয়েছে-

عن حضرت الحسن رحمة الله عليه مرسلا قال بلغنى ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال لعن الله الناظر والـمنظور اليه.

    অর্থ : “হযরত হাসান বছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মুরসাল সূত্রে বর্ণনা করেন, আমার নিকট এই পবিত্র হাদীছ শরীফ পৌঁছেছে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে দেখে এবং যে দেখায় উভয়ের প্রতি মহান আল্লাহ পাক উনার লা’নত।” (বাইহাক্বী, মিশকাত)

আরও বর্ণিত হয়েছে যে-

عن حضرت بريدة رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لعلى يا على لاتتبع النظرة النظرة فان لك الاولى وليست لك الاخرة.

    অর্থ : “হযরত বুরাইদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম উনাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, হে হযরত আলী আলাইহিস সালাম! আপনি দৃষ্টিকে অনুসরণ করবেন না। প্রথম দৃষ্টি যা অনিচ্ছা সত্ত্বে পতিত হয় তা ক্ষমা করা হবে; কিন্তু পরবর্তী দৃষ্টি ক্ষমা করা হবে না।” অর্থাৎ প্রতি দৃষ্টিতে একটি কবীরা গুনাহ লেখা হয়ে থাকে। (আহমদ শরীফ, তিরমিযী শরীফ, আবু দাউদ শরীফ, দারিমী শরীফ, মিশকাত শরীফ)       পর্দা সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

وقرن فى بيوتكن ولا تبرجن تبرج الجاهلية الاولى.

     অর্থ : “তোমরা তোমাদের গৃহে অবস্থান কর এবং জাহিলিয়াত যুগের নারীদের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বাইরে ঘোরাফেরা কর না।” (পবিত্র সূরা আহযাব শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৩) তিনি আরও ইরশাদ মুবারক করেন-

وقل للمؤمنات يغضضن من ابصارهن.

     অর্থ : “হে হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি ঈমানদার মহিলাদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে।” (পবিত্র সূরা নূর শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৩১)

উপরোক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-

عن حضرت ابن مسعود رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم الـمرأة عورة فاذا خرجت استشرفها الشيطان.

অর্থ : “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, মেয়েরা পর্দার সাথে থাকবে। কেননা তারা যখন কোথাও বের হয় তখন শয়তান উঁকি-ঝুঁকি দিতে থাকে পাপ কাজ সংঘটিত করানোর জন্য।” (তিরমিযী শরীফ, মিশকাত শরীফ)

মূলত একজন মেয়ে যখন উপযুক্ত তথা বালেগা হয় তখন হতে তার উপর ব্যক্তিগতভাবে পর্দা করা ফরয। এ ফরয পালনে যাতে কোন প্রকার গাফলতি কিংবা ত্রুটি না হয় এজন্য মেয়ের অভিভাবকগণকেও শরীয়ত কঠোর নির্দেশবাণী আরোপ করেছে।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

الديوث لا يدخل الجنة

       অর্থ : “দাইয়ূছ’ বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবেনা। ‘দাইয়ূছ’ ওই ব্যক্তি যে তার অধীনস্থ মেয়েদের পর্দা করায়না।” ( দাইলামী শরীফ, কানযুল উম্মাল শরীফ)

আরও ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

قال حضرت عبد الله رضى الله تعالى عنه قال رسول الله  صلى الله عليه وسلم ثلاث لا يدخلون الجنة ولا ينظر الله اليهم يوم القيامة العاق لوالديه والـمرأة الـمترجلة الـمتشبهة بالرجال والديوث.

অর্থ : “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, তিন প্রকার লোক জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং মহান আল্লাহ পাক তিনি ক্বিয়ামতের দিন তাদের প্রতি (রহমতের)  দৃষ্টি দিবেন না। (১) পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান (২) পুরুষের ছূরত ধারণকারিণী মহিলা (৩) দাইয়ূছ।” (মুসনাদে আহমদ বিন হাম্বল ২য় জিলদ ১৩৪ পৃষ্ঠা, নাসায়ী শরীফ কিতাবুয্ যাকাত বাব নং ৬৯)

উল্লেখ্য, মেয়েদের জন্য পর্দা এমন গুরুত্বপূর্ণ ফরয যে, তা কেবল জীবিতাবস্থায়ই করতে হবে তা নয় বরং তাদের ইন্তিকালের পরও পর্দা করা ফরয। অর্থাৎ মৃত্যুর পরও যেন কোন বেগানা পুরুষ না দেখে।

স্মরণযোগ্য যে, অন্যান্য ফরযের মতো পর্দাও একটি ফরয এবং তার হুকুম-আহকামও আলাদাভাবে বর্ণিত রয়েছে। কাজেই, শরীয়ত এ বিধান আরোপ করেনি যে, একটি ফরয পালন করার জন্য অন্য একটি ফরয পরিত্যাগ করতে হবে।

বরং শরীয়তের নির্দেশ হচ্ছে এটাই যে, প্রতিটি ফরয-ওয়াজিব যথাযথভাবে আদায় করা। একটার জন্য আরেকটা ছেড়ে দেয়া জায়িয নেই।

অতএব, পর্দা শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত একটি ফরয। কোন মহিলার জন্য ইহরাম অবস্থায় হোক আর ইহরাম ব্যতীত অন্য অবস্থায়ই হোক পর্দা তরক্ব করা হারাম ও কবীরা গুনাহ।

যে মেয়ে ইহরাম অবস্থায় মুখম-ল খোলা রাখবে সে ফরয তরক্ব করার কারণে ফাসিক হিসেবে সাব্যস্ত হবে। অথচ মহান আল্লাহ্ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ-এ পবিত্র হজ্জ আদায়ের ক্ষেত্রেও অশ্লীল-অশালীন ও ফাসিকী বা নাফরমানী ইত্যাদি কাজ করতে নিষেধ করেছেন। আর যারা ফাসিকী বা নিষিদ্ধ কাজ করে তাদের প্রকৃতপক্ষে হজ্জে মাবরুর নছীব হবে না।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

فمن فرض فيهن الحج فلا رفث ولا فسوق ولا جدال فى الحج وما تفعلوا من خير يعلمه الله وتزودوا فان خير الزاد التقوى واتقون ياولى الالباب.

      অর্থ : “যে ব্যক্তি পবিত্র হজ্জ উনার মাসসমূহে পবিত্র হজ্জ করার নিয়ত করে সে যেন পবিত্র হজ্জ উনার মধ্যে নির্জন অবস্থান ও তার সংশ্লিষ্ট কোন কাজ না করে এবং কোন প্রকার ফাসিকী বা নাফরমানিমূলক কাজ না করে এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। আর তোমরা যে নেক কাজ কর মহান আল্লাহ পাক তা জানেন এবং তোমরা পাথেয় সংগ্রহ কর। নিশ্চয়ই উত্তম পাথেয় হচ্ছে তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি। আর একমাত্র আমাকেই ভয় কর হে জ্ঞানীগণ।” (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১৯৭)

উল্লেখ্য, ‘হজ্জে মাবরুর’ অর্থ কবুল হজ্জ। এর ব্যাখায় বলা হয়েছে-

هو ما لا يخالطه الاثم ولا سمعة ولا رياء

     অর্থ : “যে পবিত্র হজ্জ উনার মধ্যে কোন প্রকার পাপের সংমিশ্রণ ঘটবেনা, (বেপর্দা, বেহায়া-বেশরা কাজ করবেনা অর্থাৎ কুফর, শিরক, বিদয়াত, হারাম, ফিসক, ফুজুরী, অশ্লীল-অশালীন কথাবার্তা, আচার-আচরণ, ঝগড়া-ঝাটি, মারামারি, কাটাকাটি হারাম শরীফ-এ নিষিদ্ধ কার্যসমূহ করবেনা কোন ফরয, ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদা তরক্ব করবেনা।) লোককে শোনানোর উদ্দেশ্যে থাকবেনা এবং রিয়া বা লোক প্রদর্শনের জন্য করা হবেনা।”

এ সমস্ত প্রকার দোষ-ত্রুটি হতে মুক্ত পবিত্র হজ্জকেই হজ্জে মাবরুর বলা হয়। আর বেপর্দা হওয়া সাধারণ বা ছগীরা গুনাহ নয়। বরং তা শক্ত হারাম ও কবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত। আর হারাম ও কবীরা গুনাহ করে পবিত্র হজ্জ সম্পাদন করা হলে তা কস্মিনকালেও হজ্জে মাবরুর হবে না। অতএব, এ বিষয়ে সকল পুরুষ ও মেয়েদের পরহেয থাকতে হবে। {দলীলসমূহ : (১) আহকামুল কুরআন জাস্সাস, (২) কুরতুবী, (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) রুহুল বয়ান, (৫) খাযিন, (৬) বাগবী, (৭) তাবারী, (৮) কবীর, (৯) মাযহারী, (১০) দুররে মনছুর, (১১) বুখারী, (১২) মুসলিম, (১৩) আবূ দাউদ, (১৪) কানযুল উম্মাল, (১৫) মিশকাত, (১৬) মিরকাত, (১৭) আশয়াতুল লুময়াত, (১৮) লুময়াত, (১৯) ত্বীবী, (২০) তা’লিকুছ ছবীহ, (২১) মুযাহিরে হক্ব, (২২) আলমগীরী, (২৩) শামী, (২৪) দুররুল মুখতার, (২৫) রদ্দুল মুহতার, (২৬) আইনুল হিদায়া, (২৭) ফতহুল ক্বাদীর, (২৮) শরহে বিক্বায়া, (২৯) ফাযায়েলে হজ্জ, (৩০) আহকামে পবিত্র হজ্জ ও যিয়ারত, (৩১) হজ্ব ও যিয়ারত, (৩২) আহকামে পবিত্র হজ্জ, (৩৩) মক্কা ও মদীনার পথে ইত্যাদি।

 

মুহম্মদ  মুঈনুল ইসলাম মানিক নগর, ঢাকা।

 

সুওয়াল : পবিত্র হজ্জ পালনের ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলার আমলের মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি?  জাওয়াব : হ্যাঁ, পুরুষ ও মহিলার আমলের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। তন্মধ্যে জরুরী কিছু পার্থক্য বর্ণনা করা হলো। (১) হজ্জে পুরুষেরা মাথা খোলা রাখবে মহিলারা মাথা ঢেকে রাখবে। (২) পুরুষেরা তালবিয়া পাঠ করবে উচ্চস্বরে আর মহিলারা তালবিয়া পাঠ করবে নিম্নস্বরে। (৩) পুরুষেরা তাওয়াফের সময় রমল করবে মহিলারা রমল করবেনা। (৪) ইজতেবা পুরুষেরা করবে মহিলাদের করতে হয়না। (৫) সাঈ করার সময় পুরুষেরা মাইলাইনে আখজারাইনের মধ্যস্থানে দৌড়াবে মহিলারা দৌড়াবেনা। (৬) পুরুষেরা মাথা কামাবে মহিলারা শুধু মাথার চুল এক অঙ্গুলি বা এক ইঞ্চি পরিমাণ কাটবে। (৭) বিদেশী পুরুষ হাজী সাহেবদের জন্য তাওয়াফে বিদা করা ওয়াজিব। বিদেশী মহিলা হাজীদের জন্যও ওয়াজিব। তবে প্রাকৃতিক কারণে মহিলারা অসুস্থ হয়ে পড়লে এ ওয়াজিব তাদের জন্য সাকিত হয়ে যায়। (৮) পুরুষদের জন্য সেলাই করা কাপড় পরিধান নিষিদ্ধ মহিলারা সেলাই করা কাপড় পরিধান করবে।

 

মুহম্মদ আলাউদ্দীন আল আযাদ

শান্তিবাগ, ঢাকা।

সুওয়াল : পবিত্র হজ্জ আদায়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্থানে যে আলাদা আলাদা দোয়া-দুরূদ ও তাসবীহ পড়ার নিয়ম রয়েছে তা প্রায় অনেক হাজী সাহেবদের পক্ষেই আদায় করা সম্ভব হয়না। তার কারণ হচ্ছে- (১) স্মরণ শক্তির অভাব, (২) সময়ের স্বল্পতা ও (৩) অধিক ব্যস্ততা ইত্যাদি।

এক্ষেত্রে তাদের জন্য এমন কোন আমল আছে কি যা হাজী সাহেবরা সহজে আদায় করতে পারবে? জাওয়াব : হ্যাঁ, যে সমস্ত হাজী সাহেবরা পবিত্র হজ্জ উনার বিস্তারিত দোয়া-দরূদ ও তাসবীহ ইত্যাদি পাঠ করতে অপারগ তাদের জন্য সবচেয়ে সহজ আমল হচ্ছে তারা প্রতি কদমে, প্রতি মাকামে ও প্রতি স্থানে শুধু দুরূদ শরীফ পাঠ করবে। আর দুরূদ শরীফ উনার মধ্যে সবচেয়ে সহজ দুরূদ শরীফ হলো-

صلى الله عليه وسلم

উচ্চারণ : “ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।”

আর যদি কোন হাজী ছাহেবদের পক্ষে সম্ভব হয় তাহলে উক্ত দুরূদ শরীফ পাঠ করার ফাঁকে ফাঁকে যা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খাছ দোয়া, তা পাঠ করতে পারে। দোয়াটি হচ্ছে-

لا اله الا الله وحده لا شريك له له الـملك وله الحمد وهو على كل شىء قدير

উচ্চারণ : “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহূ লা শারীকালাহূ লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদির।”

 

মুহম্মদ আখলাছুর রহমান

কলেজ রোড, শ্রীমঙ্গল

 

সুওয়াল: যদি কোন আলিম হিন্দু লোক মারা যাবার পর তার মাগফিরাত কামনায় দুআ করেন এবং দাওয়াত খান। এটা ইসলাম উনার দৃষ্টিতে সঠিক কি না? উক্ত আলিমের ব্যাপারে ইসলাম উনার কি ফায়ছালা? দলীলভিত্তিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।

জাওয়াব : আলিম পরিচয়ধারী ব্যক্তি হোক আর সাধারণ মু’মিন মুসলমান হোক কারো জন্যেই কোন মৃত কাফির, মুশরিক, মুনাফিক, বিধর্মী-বিজাতীদের জন্য মাগফিরাত বা ক্ষমা প্রার্থনা করা জায়িয নেই। পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যেই তা নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। স্মরণ রাখতে হবে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার কোন কোন আয়াত শরীফ নাযিলের বিষয়টা হচ্ছে খাছ অর্থাৎ কোন কোন আয়াত শরীফ নাযিল হয়েছে বিশেষ ক্ষেত্রে কিন্তু তার হুকুম হবে আম বা সাধারণ। অর্থাৎ নুযুল খাছ আর হুকুম আম।

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

ولاتصل على احد منهم مات ابدا ولاتقم على قبره انـهم كفروا بالله ورسوله وماتوا وهم فاسقون

অর্থ: আর তাদের থেকে কারো মৃত্যু হলে তার উপর কখনো জানাযার নামায পড়বেন না এবং তাদের কবরের নিকটেও দাঁড়াবেন না। কেননা তারা মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের প্রতি কুফরী করেছে এবং কাফির অবস্থায়ই তারা মারা গেছে। (পবিত্র সূরা তওবা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৮৪)

এ পবিত্র আয়াত শরীফ উনার দ্বারা কাফির, মুশরিক, মুনাফিকদের মধ্যে কেউ মারা গেলে তার জন্য জানাযা নামায পড়া, তার জন্য মাগফিরাত কামনা করা কিংবা তার জন্য নাজাতের দুআ করা সম্পূর্ণরূপে নিষেধ করা হয়েছে।

যদি কেউ মাসআলা না জেনে অজ্ঞতাবশত কিংবা ভুলে কোন মৃত কাফির, মুশরিক, মুনাফিকের জন্য দুআ করে বা ক্ষমা প্রার্থনা করে; সে দুআ বা ক্ষমা প্রার্থনা কবুল হবে না। এ সম্পর্কেও মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

استغفرلهم او لاتستغفرلهم ان تستغفرلهم سبعين مرة فلن يغفر الله لهم ذلك بانهم كفروا بالله ورسوله.

অর্থ : তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা হোক অথবা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না করা হোক (উভয়ই সমান)। যদি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়, তবুও মহান আল্লাহ পাক তিনি তাদেরকে ক্ষমা করবেন না। এর কারণ হলো যে, তারা মহান আল্লাহ পাক উনার ও উনার রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের প্রতি কুফরী করেছে। (পবিত্র সুরা তওবা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৮০)

মহান আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন-

ان الذين كفروا وماتوا وهم كفار فلن يقبل من احدهم ملء الارض ذهبا ولو افتدى به اولئك لهم عذاب اليم وما لـهم من ناصرين.

অর্থ : নিশ্চয়ই যারা কুফরী করেছে অর্থাৎ যারা কাফির এবং কাফির অবস্থায় মারা গেছে। তারা যদি কুফরীর ফিদিয়া বা কাফফারা বাবদ যমীন পরিপুর্ণ স্বর্ণ দিয়ে দেয় (শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য) তবুও তা কখনোই গ্রহণ করা হবে না। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক কঠিন শাস্তি এবং তাদের জন্য কোন সাহায্যকারীও থাকবে না। (পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৯১)

অর্থাৎ যারা কাফির, মুশরিক, মুনাফিক তাদের প্রতি মহান আল্লাহ পাক তিনি এতটা অসন্তুষ্ট যে তিনি তাদেরকে কখনোই ক্ষমা করবেন না এবং  তাদের জন্য কোন সাহায্যকারীও থাকবে না, তাদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত এবং অনন্তকাল ধরে জাহান্নামের কঠিন আযাব-গযবে তারা গ্রেফতার থাকবে। জাহান্নাম থেকে কখনোই তাদেরকে অব্যাহতি বা পরিত্রাণ দেয়া হবে না।

কাফির, মুশরিক, মুনাফিকরা তারা মহান আল্লাহ পাক উনার শত্রু। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শত্রু এবং মু’মিন মুসলমান উনাদের শত্রু। তারা কুফরী অবস্থায় মারা যাওয়া এবং চিরকালের জন্য জাহান্নামী হওয়ার কারণে যেমনিভাবে তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করা জায়িয নেই তেমনি এ উদ্দেশ্যে দাওয়াত খাওয়াটাও জায়িয নেই। কারণ যে কুফরী করে মারা গেছে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার অর্থ হচ্ছে তার শুভাকাঙ্খী ও সাহায্যকারী বনে যাওয়া; অথচ মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেছেন-

وما لـهم من ناصرين

অর্থ: তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী থাকবে না। (পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ২২)

বিশেষ করে কাফির-মুশরিক-মুনাফিকদের মৃত্যুতে তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা এবং এজন্য দাওয়াত খাওয়ার দ্বারা তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও ভালবাসা প্রকাশ পায়।

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

ومن يتولـهم منكم فانه منهم

অর্থ : ঈমানদারদের মধ্যে যে ব্যক্তি তাদের অর্থাৎ কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব বা মুহব্বত রাখবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। (পবিত্র সূরা মায়িদা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৫১)

অতএব, হিন্দু তথা কোন মুশরিক, কাফির, মুনাফিক মারা গেলে তার জন্য মাগফিরাত বা ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং এ উদ্দেশ্যে দাওয়াত খাওয়া সম্পূর্ণরূপে নাজায়িয ও হারাম।

সুতরাং উক্ত আলিম পরিচয়ধারী ব্যক্তিকে এ কাজ থেকে খালিছ তওবা করতে হবে। যদি তওবা করে তাহলে বুঝতে হবে অজ্ঞতা বশতঃ বা ভুল বশত তিনি এ কাজ করেছেন। ভবিষ্যতে তিনি আর এমন ধরণের কাজ করবেন না। আর যদি তওবা না করে এবং তার এ কাজ সঠিক বলে মনে করে তাহলে বুঝতে হবে এ ব্যক্তি সত্যিকারের আলিম তথা উলামায়ে হক্কানী-রব্বানী নয়; বরং সে হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত উলামায়ে সূ’র অন্তর্ভুক্ত। যাদের আক্বীদা ও আমলের মধ্যে ত্রুটি বা কুফরী রয়েছে। যাদেরকে জাহান্নামের জুব্বুল হুযনের অধিবাসী বলে ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাদেরকে যারা অনুসরণ করবে তারাও জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। নাঊযুবিল্লাহ!

কাজেই, এই ধরণের মাওলানাদের থেকে দূরে থাকা এবং এদের দূরে রাখা সমস্ত মু’মিন-মুসলমানদের জন্য ফরয ওয়াজিব।

 

মুহম্মদ আলমগীর হুসাইন

পশ্চিম শান্তিবাগ, ঢাকা

সুওয়াল: তৃতীয় শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’ প্রতিটি পাঠ্য বইয়ের অধিকাংশ জায়গায় নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারক উনার পর সংক্ষিপ্ত দুরূদ শরীফ হিসেবে (স.) লেখা হয়েছে। এ ব্যাপারে পবিত্র শরীয়ত উনার ফায়ছালা জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব: সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র নাম মুবারক লেখার পর সংক্ষিপ্ত দুরূদ শরীফ হিসেবে (স.) লেখা জায়িয নেই। আম ফতওয়া মতে মাকরূহ তাহরীমী। কিন্তু খাছ এবং আসল ফতওয়া হচ্ছে কুফরী।

কেননা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র নাম মুবারক বলা ও শোনার ক্ষেত্রে যেরূপ পুরো দুরূদ শরীফ অর্থাৎ ‘ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ পাঠ করা ফরয-ওয়াজিব; তদ্রƒপ লিখার ক্ষেত্রেও পুরো দুরূদ শরীফ লিখাটা ফরয-ওয়াজিব।

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

يايها الذين امنوا صلوا عليه وسلموا تسليما

অর্থ : হে ঈমানদারগণ! তোমরা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ছলাত পাঠ করো এবং সালাম দেয়ার মতো সালাম দাও অর্থাৎ সম্মানের সাথে তথা দাঁড়িয়ে সালাম পেশ করো। (পবিত্র সূরা আহযাব শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৫৬)

স্মরণীয় যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শান মুবারকে ছলাত ও সালাম উভয়টি উল্লেখ করতে হবে।

এ কারণে উনার পবিত্র নাম মুবারকে ‘আলাইহিস সালাম’ না বলে ‘ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ বলতে হয়; যার মধ্যে ছলাত ও সালাম উভয়টি রয়েছে।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عن حضرت ابى هريرة رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم رغم انف رجل ذكرت عنده فلم يصل على.

অর্থ : হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, “ওই ব্যক্তির নাক ধুলায় ধুসরিত হোক অর্থাৎ সে ব্যক্তি অপমানিত হোক, যার সম্মুখে আমার নাম মুবারক উচ্চারণ করা হলো, অথচ সে আমার প্রতি ছলাত (দুরূদ শরীফ) পাঠ করলো না।” (তিরমিযী শরীফ)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عن حضرت على عليه السلام قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم البخيل الذى من ذكرت عنده فلم يصل على.

অর্থ : “হযরত আলী আলাইহিস সালাম উনার থেকে বর্ণিত। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, “ওই ব্যক্তি বড় বখীল (কৃপণ), যার সম্মুখে আমার নাম মুবারক উচ্চারণ করা হয়, অথচ সে আমার প্রতি ছলাত পাঠ করে না।” (তিরমিযী শরীফ)

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عن حضرت كعب بن عجرة رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم احضروا الـمنبر فحضرنا فلما ارتقى الدرجة الاولى قال امين فلما ارتقى الدرجة الثانية قال امين فلما ارتقى الدرجة الثالثة قال امين فلما نزل قلنا يا رسول الله صلى الله عليه وسلم لقد سمعنا منك اليوم شيأ ماكنا نسمعه قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان حضرت جبريل عليه السلام عرض لى فقال بعد من ادرك رمضان فلم يغفرله قلت امين فلما رقيت الثانية قال بعد من ذكرت عنده فلم يصل عليك قلت امين فلما رقيت الثالثة قال بعد من ادرك ابويه الكبر او احدهما فلم يدخلاه الـجنة قلت امين.

অর্থ : হযরত কা’ব ইবনে উজরাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,  নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি একদিন আমাদেরকে মিম্বরের নিকটবর্তী হতে বললেন। আমরা সকলে মিম্বরের নিকটবর্তী হলাম। অতপর তিনি মিম্বরের প্রথম ধাপে আরোহণ করেই বললেন, “আমীন।” দ্বিতীয় ধাপে আরোহণ করেও বললেন, “আমীন।” তৃতীয় ধাপে আরোহণ করেও বললেন, “আমীন।” এরপর খুতবা এবং নামায শেষে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন মিম্বর শরীফ থেকে অবতরণ করলেন তখন আমরা বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আজকে আমরা আপনার যবান মুবারক থেকে এমনকিছু পবিত্র হাদীছ শরীফ শুনলাম যা আমরা আর কখনো শুনিনি। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, আমি যখন মিম্বর শরীফ উনার প্রথম সিঁড়িতে পা মুবারক রাখলাম তখন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি আসলেন এবং বললেন, যে ব্যক্তি রমাদ্বান শরীফ মাস পাওয়ার পরও নিজেদের গুনাহখতাগুলো ক্ষমা করাতে পারলো না, সে ব্যক্তি হালাক বা ধ্বংস। আমি বললাম, আমীন। অতঃপর দ্বিতীয় সিঁড়িতে যখন পা মুবারক রাখলাম, হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি  বললেন, যে ব্যক্তির সম্মুখে আপনার নাম মুবারক উচ্চারণ করা হলো অথচ সে আপনার প্রতি ‘ছলাত-সালাম’ পাঠ করলো না সে ব্যক্তি হালাক বা ধ্বংস। আমি বললাম, আমীন। অতঃপর যখন তৃতীয় সিঁড়িতে পা মুবারক রাখলাম, হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, যে ব্যক্তি পিতা-মাতা দুজনকে অথবা একজনকে বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা অবস্থায় পেয়েও তাদের খিদমত করে জান্নাত লাভ করতে পারলো না, সে ব্যক্তি হালাক বা ধ্বংস। আমি বললাম, আমীন। (বায়হাকী শরীফ, মিশকাত শরীফ)

উপরোক্ত হাদীছ শরীফ উনার বর্ণনা দ্বারা এ বিষয়টি স্পষ্ট প্রমাণিত হলো যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারক উচ্চারণ করে এবং শ্রবণ করে যারা উনার প্রতি ‘ছলাত’ ও ‘সালাম’ অর্থাৎ দুরূদ শরীফ পাঠ করবে না, তারা নিশ্চিত হালাক তথা জাহান্নামী।

কাজেই, দুরূদ শরীফ বড় হোক কিংবা ছোট হোক পূর্ণ দুরূদ শরীফ পাঠ করত হবে। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারক উচ্চারণে, শ্রবণে ও লিখনে উম্মত যাতে অতিসহজে পূর্ণ দুরূদ শরীফ উনার আমল মুবারক করতে পারে সেজন্য হযরত ইমাম-মুজতাহিদগণ উনারা ছোট দুরূদ শরীফ হিসেবে ‘ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ এ বাক্য মুবারক প্রবর্তন করেন, ফলে আমরা দেখতে পাই পবিত্র হাদীছ শরীফ, তাফসীর শরীফ, ফিক্বাহ ও ফতওয়ার মূল কিতাবসমূহে হযরত মুহাদ্দিছীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম, হযরত মুফাসসিরীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম এবং হযরত ফুক্বাহায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা ‘ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ এ দুরূদ শরীফখানা পুরোই লিপিবদ্ধ করেছেন।

কিন্তু পরবর্তীতে সৃষ্টির নিকৃষ্ট জীব উলামায়ে ‘সূরা’ পুরো দুরূদ শরীফ লেখার পরিবর্তে সংক্ষেপ যেমন-

(ص), (عم), (صلعم), (صللم) (স.), (সাঃ), (ঝয), (উ) ইত্যাদি আরবী, ফার্সী, উর্দু, বাংলা, ইংরেজী অক্ষর দ্বারা লেখার প্রচলন করে। নাউযুবিল্লাহ! আর এ বিষয়টি তাহক্বীক্ব বা উপলব্ধি না করার কারণে দেখা গেছে অনেক হক্কানী-রব্বানী আলিম-উলামা উনারা পর্যন্ত উনাদের লিখনীতে এ অশুদ্ধ নিয়মের অনুসরণ করে গেছেন। নাঊযুবিল্লাহ!

যদিও এ বিষয়ে শরীয়ত উনার সুস্পষ্ট ফতওয়া উল্লেখ রয়েছে। যেমন এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

فبدل الذين ظلموا قولا غير الذى قيل لـهم فانزلنا على الذين ظلموا رجزا من السماء بما كانوا يفسقون

অর্থাৎ: যালিমদেরকে যেরূপ বলতে বলা হয়েছে তদ্রƒপ না বলে তারা  পরিবর্তন করে বলেছিল। ফলে আমি তাদের নাফরমানীর কারণে তাদের উপর আসমান থেকে আযাব অবতীর্ণ করি। (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৫৯)

অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক তিনি বণী ইসরাঈলকে حطة বলতে বলতে এক শহরে প্রবেশ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন কিন্তু তারা উক্ত শব্দ মুবারক উনার পরিবর্তে حنطة বলতে থাকে। এতে শুধু শব্দই পরিবর্তিত হয়ে যায়নি বরং অর্থও সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। যেমন حطة (হিত্তাতুন) অর্থ তওবা, পাপ কাজ পরিহার করা। আর حنطة (হিনত্বতুন) অর্থ গম।

বলার অপেক্ষা রাখেনা, এ ধরণের শব্দগত পরিবর্তন কিংবা অর্থগত পরিবর্তন, তা পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে হোক অথবা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে হোক সর্বসম্মতিক্রমে তা হারাম ও কুফরী। কেননা, এটা পবিত্র কালাম উনার মধ্যে এক ধরণের তাহরীফ বা বিকৃতিসাধন।

যেমন এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

من الذين هادوا يحرفون الكلم عن مواضعه ويقولون سمعنا وعصينا واسمع غير مسمع وراعنا ليا بالسنتهم وطعنا فى الدين ولو انهم قالوا سمعنا واطعنا واسمع وانظرنا لكان خيرا لهم واقوم ولكن لعنهم الله بكفرهم

অর্থ : ইহুদীদের অন্তর্ভুক্ত লোকেরা যারা কালাম বা বাক্য মুবারক উনার স্থান হতে পরিবর্তন করে ফেলে, যা (মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শান বা মর্যাদা মুবারক সম্পর্কে তাওরাত শরীফ উনার মধ্যে নাযিল করেন) আর (নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন তাদেরকে কোন বিষয়ে নির্দেশ মুবারক দান করেন তখন) তারা বলতো যে, আমরা আপনার আদেশ শুনেছি কিন্তু আমরা মানবনা। আপনাকে কোন ভাল কথা শুনানো না হোক, আপনার কথার বিরূপ উত্তরই আপনার কর্ণগোচর হোক এবং আরো বলতো, রায়িনা অর্থাৎ আমাদের রাখাল। তারা মুখ বাঁকিয়ে পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে এভাবে বলতো। (নাউযুবিল্লাহ!) অথচ তারা যদি বলতো যে, আমরা শুনেছি ও মান্য করেছি এবং যদি বলতো, শুনুন এবং আমাদের প্রতি লক্ষ্য রাখুন; তবে ইহা হতো তাদের জন্য উত্তম এবং যথার্থ বা সঠিক। কিন্তু মহান আল্লাহ পাক তিনি কুফরীর কারণে তাদের প্রতি লা’নত বা অভিসম্পাত করেছেন। (পবিত্র সূরা নিসা শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ৪৬)

এখানে ইহুদী সম্প্রদায় যে মহান আল্লাহ পাক উনার পবিত্র কালাম উনার তাহরীফ বা পরিবর্তন ও বিকৃতিসাধন করেছিল এবং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র শান মুবারকে ইহানত, ব্যাঙ্গোক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে যে শব্দমালা উচ্চারণ করেছিল তা উল্লেখ করা হয়েছে।

এখান থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট তাহলো, যে শব্দ বা শব্দমালা দ্বারা ইহানত, অবজ্ঞা, অসম্মান অর্থ প্রকাশ পায় অথবা যা অর্থহীন তা কোন সম্মানিত ব্যক্তি উনার শান মুবারকে ব্যবহার হতে পারে না। তাহলে (স.), (সাঃ), (দঃ) ইত্যাদি হ্রাসপূর্ণ, অসম্পূর্ণ, অর্থহীন শব্দ কী করে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শান মুবারকে ব্যবহৃত হতে পারে। এ ধরণের শব্দ উনার শান মুবারকে ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে চরম বেয়াদবী,  ইহানত ও অবজ্ঞার সামিল এবং সুস্পষ্ট কুফরী।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

من صلى على فى كتاب لـم تزل صلاته جارية له ما دام اسمى فى ذلك الكتاب

অর্থ : নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি আমার উপর দুরূদ শরীফ লিখবে, অবশ্যই ঐ দুরূদ শরীফ লেখায় সর্বদা আমার নাম মুবারক উনার সাথে পূর্ণ দুরূদ শরীফ লিখবে। (তাফসীরে রূহুল বয়ান ৭ম খ- ২২৮ পৃষ্ঠা)

তাফসীরে রূহুল বয়ান ৭ম খ- ২২৮ পৃষ্ঠায় নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ছলাত ও সালাম পাঠ সম্পর্কিত একখানা পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় উল্লেখ রয়েছে-

ويكره ان يرمز للصلوة والسلام على النبى عليه الصلاة والسلام فى الـخط بان يقتصر من ذالك على الحرفين هكذا (عم) او نحو ذالك كمن يكتب (صلعم) يشير به الى (صلى الله عليه وسلم) ويكره حذف واحد من الصلاة والتسليم والاقتصار على احدهما.

অর্থ : নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপর ছলাত ও সালাম লেখার সময় চিহ্ন বা অক্ষর দ্বারা লেখাটা মাকরূহ তাহরীমী। যেমন : সংক্ষেপে দুটি অক্ষর (عم) লেখার মাধ্যমে এবং অনুরূপ صلى الله عليه وسلم বাক্যকে ইঙ্গিতে বোঝানোর জন্য (صلعم) সংক্ষেপে লেখা। ছলাত ও সালাম শব্দ দুখানার যে কোন একখানা হযফ করা বা বাদ দেয়া এবং যে কোন একখানা শব্দকে সংক্ষেপ করা মাকরূহ তাহরীমী।

অনুরূপ বর্ণনা ‘আনওয়ারুল মাশারিক’ কিতাবেও উল্লেখ আছে। তাহত্বাবী আলা দুররিল মুখতার ১ম খ- ৬নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে-

ويكره الرمز بالصلوة والترضى بالكتاب بل يكتب ذالك كله بكماله

অর্থ : ‘ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ এবং ‘রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু’ কোন চিহ্ন বা অক্ষর দ্বারা লেখাটা মাকরূহ। বরং এ (দুআ সম্বলিত) বিষয়গুলি পূর্ণরূপে লিখতে হবে।

তাতারখানিয়া কিতাবে দুরূদ শরীফ সংক্ষিপ্তভাবে লিখাকে ‘শানে নুবুওওয়াত’ উনাকে খাটো করার অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ‘তাতারখানিয়া কিতাবে আরো উল্লেখ আছে যে-

من كتب عليه السلام بالـهمزة والـميم يكفر لانه تخفيف وتخفيف الانبياء عليهم الصلاة والسلام كفر بلا شك.

অর্থ : যে ব্যক্তি হামযাহ ও মীম দ্বারা ‘আলাইহিস সালাম’ অথবা ‘ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ লিখলো, সে কুফরী করলো। কেননা এটা হ্রাস তথা ইহানতের সামিল। আর হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম উনাদের শান মুবারকে ছলাত ও সালাম শরীফ উনার ইহানত নিঃসন্দেহে কুফরী।

এ প্রসঙ্গে কিতাবে আরো উল্লেখ আছে-

حضور پور نور سید عالم صلی اللہ علیہ وسلم کے ذکر کریم کے ساتہ جس طرح زبان سے درود شریف پڑھنے کا  حکم ھے اللہم صل وسلم وبارک علیہ وعلی الہ وصحبہ ابدا درود شریف کی جگہ فقط صاد یا عم یا صلعم  یا صللم کھنا ہرگز کافی نہیں بلکہ وہ الفاظ بے معنی ھیں

অর্থ : “হুযূর পুর নূর, সাইয়্যিদে আলম, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারক উল্লেখ করার সময় দুরূদ শরীফ পড়ার হুকুম রয়েছে। দুরূদ শরীফ উনার স্থলে শুধুমাত্র  (ص)  অথবা (عم) অথবা (صلعم) অথবা (صللم) বলা কখনই যথেষ্ট নয়। বরং উক্ত শব্দ একেবারেই অর্থহীন।

উপরে বর্ণিত পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয়েছে যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শান মুবারকে ‘ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ এ পূর্ণ বাক্য মুবারক উনার পরিবর্তে (স.), (সা:) ইত্যাদি চিহ্ন বা অক্ষর ব্যবহার করাটা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। এ কুফরী আমল পরিহার করা প্রত্যেক মুসলমান উনাদের জন্য ফরযে আইন।

অতএব, অবিলম্বে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রণীত সকল শ্রেণীর ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বই থেকে এ কুফরী বিষয়ের অবসান হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সরকার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরকেই ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। কুফরী প্রচার-প্রসারের জন্য তাদেরকেই কঠিন জবাবদিহী ও শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিখ্যাত মুহাদ্দিছ হযরত ইমাম আবু যারআ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যখন ইনতিকাল করলেন। ইনতিকাল করার পর একজন বুযুর্গ ব্যক্তি উনাকে স্বপ্নে দেখলেন যে, উনি আসমানের উপর হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের ইমাম হয়ে নামায পড়াচ্ছেন। বুযুর্গ ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, হে হযরত ইমাম আবু যারআ রহমতুল্লাহি আলাইহি! আপনি এই ফযীলত হাছিল করলেন কিভাবে? জাওয়াবে তিনি বললেন, আমার জীবনে আমি দশ লক্ষ হাদীছ শরীফ লিখেছি। প্রতিটি হাদীছ শরীফ লেখার সময় আমি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারক উনার পর ‘ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ দুরূদ শরীফখানা স্পষ্ট ও সুন্দর করে লিখেছি। যে প্রসঙ্গে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

من صلى على صلوة واحدة صلى الله عليه عشر صلوات

অর্থাৎ- যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দুরূদ শরীফ পাঠ করবে, তার প্রতি মহান আল্লাহ পাক দশটি রহমত নাযিল করবেন।

কাজেই, আমি যেহেতু দশ লক্ষবার দুরূদ শরীফ লিখেছি সেহেতু মহান আল্লাহ পাক তিনি আমার প্রতি এক কোটিবার রহমত নাযিল করেছেন। যার বদৌলতে মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদের ইমাম করে দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ!

আবার পূর্ণ দুরূদ শরীফ লেখার ব্যাপারে যারা কার্পন্য করবে অর্থাৎ দুরূদ শরীফ লিখবে না অথবা লিখলেও সংক্ষেপে লিখবে, সে সম্পর্কেও কিতাবে অনেক ঘটনাই বর্ণিত রয়েছে তন্মধ্যে একটি ঘটনা হলো, এক ব্যক্তি সে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারক লেখার পর দুরূদ শরীফ লিখতো না কারণ হলো কাগজ কম পড়বে। অর্থাৎ বখীলতার কারণে সে দুরূদ শরীফ লিখতো না। যার কারণে দেখা গেল সে ব্যক্তির হাতের মধ্যে কুষ্ঠ রোগ হলো এবং শেষ পর্যন্ত আস্তে আস্তে তার পুরো হাতটা নষ্ট হয়ে গেল। নাঊযুবিল্লাহ!

স্মরণীয় যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারক লেখার সময় পূর্ণ দুরূদ শরীফ লেখা যেহেতু ফরয-ওয়াজিব; তাই আমরা দেখতে পাই যে, পূর্ববর্তী সকল হাদীছ শরীফ, সকল তাফসীর শরীফ এবং সকল ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাবসমূহে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারক উনার শেষে পূর্ণ দুরূদ শরীফসহ লিখা আছে।

কিন্তু বর্তমানে প্রকাশিত প্রায় সকল ধরণের কিতাবাদী, বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকা ও লিখনীতে দেখা যায়, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারক উনার পর পূর্ণ দুরূদ শরীফ লেখার পরিবর্তে (স.), (সা:), (দঃ) ইত্যাদি লেখা হয়। এর প্রধান কারণ হলো কাগজ-কালি বেশি লাগা এবং সময় বেশি লাগা।

কথা হচ্ছে, যারা কাগজ-কালি ও সময় বাঁচানোর জন্য নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শান মুবারকে পূর্ণ দুরূদ শরীফ লেখার পরিবর্তে নিজেদের কার্পন্য ও গাফলতিবশতঃ (স.) বা (দঃ) লিখছে ও লেখা প্রচার-প্রসার করছে, এজন্য অবশ্যই তাদেরকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে এবং কঠিন শাস্তি পেতে হবে।

কেননা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ওসীলায় আমাদের সৃষ্টি, উনার মাধ্যমে আমরা মহান আল্লাহ পাক উনার রহমত পেয়ে থাকি, সমস্ত নিয়ামত লাভ করে থাকি এবং খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার মুহব্বত, মা’রিফাত সন্তুষ্টি, দয়া, মাগফিরাত ও নাজাত হাছিলের যিনি মূল ওসীলা বা মাধ্যম, মোটকথা দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় ভালাই ও নাজ-নিয়ামত অর্জনের যিনি প্রধান উপলক্ষ উনার শান মুবারকে দুরূদ শরীফ পঠন ও লিখনের ব্যাপারে উম্মতের কৃপণতা ও গাফলতি কেবল দুঃখজনকই নয় বরং কুফরীও বটে। নাউযুবিল্লাহ!

অথচ এ পবিত্র আমলটি এমন এক আমল যা কবুল হওয়ার ব্যাপারে এবং নাজাত ও সন্তুষ্টি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনরূপ সন্দেহ নেই।

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল ও জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব