সুওয়াল-জাওয়াব

সংখ্যা: ২১৮তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ আল আমীন

ঘোড়াশাল, নরসিংদী

সুওয়াল:   কুরবানী কার উপর ওয়াজিব?

জাওয়াব:  যিলহজ্জ মাসের দশ, এগার, বার অর্থাৎ দশ তারিখের সুবহে সাদিক হতে বার তারিখের সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যদি কেউ মালিকে নিসাব হয় অর্থাৎ হাওয়ায়িজে আছলিয়াহ (নিত্য প্রয়োজনীয় ধন-সম্পদ) বাদ দিয়ে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপা বা তার সমপরিমাণ মূল্যের মালিক হয়, তাহলে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব। উল্লেখ্য যে, যদি কারো নিকট প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থাকে এবং তা যদি নিসাব পরিমাণ হয়, যেমন- কারো পাঁচটি ঘর আছে, একটির মধ্যে সে থাকে আর তিনটির ভাড়া দিয়ে সে সংসার চালায় আর একটি অতিরিক্ত, যার মূল্য নিসাব পরিমাণ। এ ক্ষেত্রে তার উপরে কুরবানী ওয়াজিব হবে। {দলীলসমূহ: (১) আলমগীরী, (২) শামী, (৩) আইনুল হিদায়া, (৪) ফতহুল কাদীর, (৫) গায়াতুল আওতার, (৬) শরহে বিকায়া, (৭) বাহর, (৮) দুররুল মুখতার, (৯) কাজীখান, (১০) ইনায়া ইত্যাদি।}

মুহম্মদ গোলাম রব্বানী, রাজশাহী।

সুওয়াল: ওয়াজিব ও নফল কুরবানী, ওলীমা ও  আক্বীকা এক সাথে করা জায়িয হবে কিনা? জাওয়াব:   হ্যাঁ, জায়িয হবে।  {দলীল: শামী, আলমগীরি ইত্যাদি।}

মুহম্মদ মিজানুর রহমান, চাঁদপুর।

সুওয়াল: আইয়ামে নহর বা কুরবানীর দিনে কুরবানীর পশু কুরবানী করার পূর্বে অথবা কুরবানী করার সময়ে হাঁস, মুরগি, কবুতর ইত্যাদি যবেহ করা জায়িয আছে কি? জাওয়াব: মুসলমানদের আইয়ামে নহর বা কুরবানীর দিনে যারা মজুসী বা অগ্নি উপাসক তারা তাদের ধর্মীয় বিধান মুতাবিক হাঁস-মুরগি ইত্যাদি যবেহ করে থাকে। এখন যদি কোন মুসলমান তাদের সাথে মুশাবাহ বা সাদৃশ্য রেখে কুরবানীর দিন হাঁস-মুরগি ইত্যাদি যবেহ করে, তাহলে সেটা কুফরী হবে। কারণ আল্লাহ পাক উনার রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন-

من تشبه بقوم فهو منهم.

অর্থ: “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।”

আর যদি কোন মুসলমান সাধারণভাবে উক্ত সময়ে হাঁস-মুরগি ইত্যাদি যবেহ করে, তাহলে সেটা মাকরূহ তাহরীমী হবে, যেহেতু এটাও মুশাবাহ হয়ে যায়।

আর যদি কোন মুসলমান খুব জরুরতে হাঁস-মুরগি ইত্যাদি যবেহ করে, তাহলে সেটাও মাকরূহ্ তানযিহী হবে। আর এমন কোন মুসলমান, যার উপর কুরবানী ওয়াজিব অথবা ওয়াজিব নয়, তারা যদি কুরবানীর দিন হাঁস, মুরগি ইত্যাদি খেতে চায়, তাহলে তারা যেন ছুবহি ছাদিকের পূর্বেই সেটা যবেহ করে, কেটে, পাক করে রেখে দেয় অথবা শুধু যবেহ করে, কেটে রেখে দিবে পরে পাক করলেও চলবে। (এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ৪৪, ৭০, ৭৯, ১০৭তম সংখ্যাগুলো পাঠ করুন।) {দলীলসমূহ: শামী, আলমগীরি, ফতহুল ক্বাদীর, শরহে হিদায়া ইত্যাদি।}

মুসাম্মত সালমা খাতুন,

মুসাম্মত পান্না আক্তার, রংপুর

সুওয়াল:  হালাল পশুর কোন কোন অংশ খাওয়া নিষিদ্ধ? জাওয়াব:  কুরবানী বা হালাল পশুর ৮টি জিনিস খাওয়া যাবেনা। (১) দমে মাছফুহা বা প্রবাহিত রক্ত হারাম, (২) অ-কোষ, (৩) মূত্রনালী, (৪) পিত্ত, (৫) লিঙ্গ, (৬) গুহ্যদ্বার, (৭) গদুদ বা গুটলী মাকরূহ তাহরীমী, (৮) শিরদাড়ার ভিতরের মগজ, এটা কেউ মাকরূহ তাহরীমী, আবার কেউ মাকরূহ তানযিহী বলেছেন। {দলীলসমূহঃ শামী, মাতালেবুল মু’মিনীন, উমদাতুল কালাম, কিতাব- শাইখুল ইসলাম ইত্যাদি।

মুহম্মদ সিরাজুল ইসলাম, কক্সবাজার।

সুওয়াল: কুরবানীর পশু যবেহ করার পূর্বে চামড়া বিক্রি করা জায়িয আছে কি? জাওয়াব:  কুরবানীর পশু অথবা অন্য যে কোন হালাল পশুই হোক, তা যবেহ করার পূর্বে চামড়া বিক্রি করা জায়িয নেই। এমনিভাবে বাঁটে দুধ থাকতে, ঝিনুকে মুক্তা থাকতে, মেষের পিঠে লোম থাকতে, সে দুধ, মুক্তা, লোম বিক্রি করা নাজায়িয। (ফতওয়ায়ে শামী)

মুহম্মদ উমর ফারুক, চাঁদপুর।

সুওয়াল:   কুরবানীর কিছুদিন আগে নাকি হাত ও পায়ের নখ কাটা, মোছ ছাঁটা এবং মাথার চুল ইত্যাদি কাটা যায় না? কুরবানী করার পর কাটতে হয়! কথাটা কতটুকু সত্য? বিস্তারিত জানাবেন। জাওয়াব: হ্যাঁ, যারা কুরবানী দেয়ার নিয়ত রাখেন, তাদের পক্ষে যিলহজ্বের চাঁদ ওঠার পর থেকে এই চাঁদের দশ তারিখ কুরবানী করা পর্যন্ত মাথার চুল হাতের ও পায়ের নখ ইত্যাদি না কাটা মুস্তাহাব। যেমন হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে-

عن حضرت ام سلمة عليها السلام قالت قال رسول

الله صلى الله عليه وسلم من راى هلال ذى الحجة واراد ان يضحى فلا ياخذ من شعره ولا من اظفاره.

অর্থ: “উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে সালমা আলাইহাস সালাম উনার থেকে বর্ণিত, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি যিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখলো এবং কুরবানী করার নিয়ত করলো, সে যেন (কুরবানী না করা পর্যন্ত) তার শরীরের চুল, নখ ইত্যাদি না কাটে।” (মুসলিম শরীফ)

মূলত: ছহীহ ও গ্রহণযোগ্য মত হলো এই যে, যারা কুরবানী করবে এবং যারা কুরবানী করবে না, তাদের উভয়ের জন্যই উক্ত আমল মুস্তাহাব ও ফযীলতের কারণ। আর এ ব্যাপারে দলীল হলো এ হাদীছ শরীফ-

যেমন হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত আছে-

عن عبد الله بن عمرو رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم امرت بيوم الاضحى عيدا جعله الله لـهذه الامة قال له رجل يا رسول الله صلى الله عليه وسلم ارايت ان لـم اجد الا منيحة انثى افاضحى بـها قال لا ولكن خذ من شعرك واظفارك وتقص شاربك وتحلق عانتك فذلك تـمام اضحيتك عند الله.

অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত, আল্লাহ্ পাক-উনার রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, “আমি কুরবানীর দিনকে ঈদের দিন হিসেবে নির্ধারণ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। আল্লাহ পাক তিনি উক্ত দিনটিকে এই উম্মতের জন্য ঈদ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এক ব্যক্তি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে জিজ্ঞাসা করলো, হে আল্লাহ পাক-উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি যদি একটি মাদী মানীহা (উটনী) ব্যতীত অন্য কোন পশু কুরবানীর জন্য না পাই, তাহলে আপনি কি (আমাকে) অনুমতি দিবেন যে, আমি উক্ত মাদী মানীহাকেই কুরবানী করবো। জবাবে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, না। তুমি উক্ত পশুটিকে কুরবানী করবে না। বরং তুমি কুরবানীর দিনে তোমার (মাথার) চুল ও হাত-পায়ের নখ কাটবে। তোমার গোঁফ খাট করবে এবং তোমার নাভির নিচের চুল কাটবে, এটাই মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট তোমার পূর্ণ কুরবানী অর্থাৎ এর দ্বারা তুমি মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট কুরবানীর পূর্ণ ছওয়াব পাবে।” (আবু দাউদ শরীফ)

উক্ত হাদীছ শরীফ-এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ আছে যে, যারা কুরবানী করবে না, তাদের জন্যও যিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানী করার আগ পর্যন্ত নিজ শরীরের চুল, নখ ইত্যাদি না কাটা মুস্তাহাব। আর যে ব্যক্তি তা কাটা থেকে বিরত থাকবে, সে একটি কুরবানীর ছওয়াব পাবে। {দলীলসমূহ: নাসায়ী, মিশকাত, শরহে নববী, বজলুল মাযহুদ, মিরকাত, লুময়াত, আশয়াতুল লুময়াত, শরহুত ত্বীবী, তা’লীকুছ ছবীহ, মুযাহেরে হক্ব ইত্যাদি।}

 

মুহম্মদ রফিকুল ইসলাম

সদর, চাঁদপুর

 

সুওয়াল: ধর্মব্যবসায়ীদের মাদরাসাতে তথা সন্ত্রাসী তৈরিকারী মাদরাসাগুলোতে কুরবানীর চামড়া দেয়া জায়িয হবে কি?

জাওয়াব: ধর্মব্যবসায়ীদের মাদরাসাতে তথা সন্ত্রাসী তৈরিকারী মাদরাসাগুলোতে কুরবানীর চামড়া দেয়া জায়িয হবে না। কুরবানীর চামড়া দেয়ার উত্তম স্থান হলো ‘মুহম্মদিয়া জামিয়া শরীফ’।

কুরবানী প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন-

فصل لربك وانحر

অর্থ: “আপনার রব উনার উদ্দেশ্যে নামায আদায় করুন এবং কুরবানী করুন।” (সূরা কাওছার: আয়াত শরীফ ২)

আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদ করেন-

لكل امة جعلنا منسكا هم ناسكوه فلا ينازعنك فى الامر

অর্থ: “প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি যবেহের বিধান দিয়েছিলাম যা তারা অনুসরণ করে। সুতরাং আপনার সাথে এ ব্যাপারে বিতর্কে প্রবৃত্ত হওয়া তাদের উচিত নয়।” (সূরা হজ্জ: আয়াত শরীফ ৬৭)

কুরবানী একটি ঐতিহ্যবাহী শরয়ী বিধান ও ইসলামী কাজ। যা উম্মতে হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য ওয়াজিব। কাজেই কুরবানী দেয়ার সাথে সাথে কুরবানীর চামড়া সঠিক স্থানে দেয়াও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

উল্লেখ্য, কুরআন শরীফ-এ সবস্থানে আল্লাহ পাক তিনি আগে ‘ঈমান’ আনার কথা বলেছেন পরে ‘আমলের’ কথা বলেছেন।

এক খোদা তায়ালা উনাকে প্রায় সবাই মানে কিন্তু হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে না মানার কারণেই অর্থাৎ আক্বীদার পার্থক্যের কারণেই পৃথিবীতে মুসলমান ব্যতীত হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ইত্যাদি হাজারো বিধর্মী তথা কাফির ও বাতিল ৭২ দল রয়েছে। কুরআন শরীফ-এর ভাষায় তারা সবাই জাহান্নামী যদি তওবা-ইস্তিগফার করে খালিছভাবে ঈমান না আনে।

স্মরণীয় যে, শুধু কাফির সম্প্রদায়ই নয়, মুসলমান নামধারী অনেক মাওলানা, মুফতী,  মুহাদ্দিছ, মুফাসসির, শাইখুল হাদীছ, ইমাম, খতীব তথা অনেক ইসলামী দলও রয়েছে যাদের মূলত: মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্পর্কে আক্বীদা খারাপ রয়েছে। কাজেই তারা মুসলমান নামধারী হলেও তারা মুসলমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা ইসলামী দল নামধারী হলেও আসলে তারা ইসলামী দলের অন্তর্ভুক্ত নয়।

উল্লেখ্য, ইসলামে মৌলবাদ, সন্ত্রাসবাদ হারাম। ইসলামের নামে ব্যবসা করা হারাম। ইসলামের নামে গণতান্ত্রিক দল করা হারাম। ইসলামের নামে নির্বাচন করা হারাম। ইসলামের নামে ভোট চাওয়া হারাম।

আরো উল্লেখ্য, বর্তমানে অধিকাংশ মাদরাসাগুলোই হচ্ছে জামাতী, ওহাবী, খারিজী মতাদর্শের তথা সন্ত্রাসী তৈরির সূতিকাগার। ইসলামের দোহাই দিয়ে, ইসলামের নামে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক স্বার্থ ও প্রতিপত্তি হাছিলের প্রকল্প। ইসলামের নামে নির্বাচন করার ও ভোটের রাজনীতি করার পাঠশালা- যা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।

কাজেই, কুরবানীর চামড়া কোথায় দেয়া হচ্ছে তা দেখে দিতে হবে। জামাতী, খারিজী, ওহাবী, সন্ত্রাসী ও মৌলবাদী তথা ধর্মব্যবসায়ীদের মাদরাসাতে কুরবানীর চামড়া দেয়া কস্মিনকালেও জায়িয হবে না।

জামাতী, ওহাবী তথা সন্ত্রাসীদের মাদরাসায় কুরবানীর চামড়া দিলে তাতে বদ আক্বীদা ও বদ আমলের প্রচারে সহায়তা করা হবে। সন্ত্রাসী-জামাতী ও ধর্মব্যবসায়ী তৈরিতে সাহায্য করা হবে। তাতে লক্ষ-কোটি কবীরা গুনাহে গুনাহগার হতে হবে।

মূলত: ধর্মব্যবসায়ীদের মাদরাসায় কুরবানীর চামড়া, যাকাত-ফিতরা ইত্যাদি দান-ছদকা না দেয়া মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশ। মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নির্দেশ তথা সন্তুষ্টির কারণ।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি কুরআন শরীফ-এ নির্দেশ করেন-

تعاونوا على البر والتقوى ولا تعاونوا على الاثم والعدوان واتقوا الله ان الله شديد العقاب.

অর্থ: “তোমরা নেক কাজে ও পরহেযগারীতে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করো। বদ কাজে ও শত্রুতার মধ্যে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করো না। আর এ বিষয়ে মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করো। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি কঠিন শাস্তিদাতা” (সূরা মায়িদা: আয়াত শরীফ ২)

মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন-

عن حضرت جرير رضى الله تعالى عنه قال قال النبى صلى الله عليه وسلم من سن فى الاسلام سنة سيئة كان عليها وزرها و وزر من عمل بها من بعده.

অর্থ: “হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, যে কেউ একটা বদ কাজের সূচনা করলো যতজন তাতে শরীক হলো তাদের সবার গুনাহই যে বদকাজের সূচনা করেছে তার উপর গিয়ে পড়বে।” (মুসলিম শরীফ, মিশকাত শরীফ)

পত্রিকার রিপোর্টে পাওয়া যায়, জামাতী-খারিজীরা তাদের নিয়ন্ত্রিত মাদরাসায় সংগৃহীত যাকাত, ফিতরা, কুরবানীর চামড়ার মাধ্যমে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা আয় করে। যা মূলত: তাদের বদ আক্বীদা ও বদ আমল তথা ধর্মব্যবসার কাজেই ব্যয়িত হয়।

অনুরূপভাবে এমন কোন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনকেও কুরবানীর চামড়া দেয়া জায়িয হবে না যারা তা আমভাবে খরচ করে থাকে। যেমন রাস্তা-ঘাট, পানির ব্যবস্থা, বেওয়ারিশ লাশ দাফন করার কাজে। অথচ কুরবানীর চামড়া গরিব মিসকীনদের হক্ব। তা গরিব মিসকিনদের মালিক করে দিতে হবে।

আফদ্বালুন নাস বা’দাল আম্বিয়া হযরত আবু বকর ছিদ্দীক্ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি যাকাতের একটি রশির জন্যও জিহাদ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। কাজেই, যাকাতের একটি রশির মতই কুরবানীর একটি চামড়াও যাতে ভুল উদ্দেশ্যে ও ভুল পথে পরিচালিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন, “কুরবানীর রক্ত ও গোশত কিছুই মহান আল্লাহ পাক উনার দরবারে পৌঁছায় না। পৌঁছায় তোমাদের বিশুদ্ধ নিয়ত।” কাজেই বিশুদ্ধ নিয়তে কুরবানীর চামড়া ঠিক জায়গায় দিতে হবে। অনেকে পাড়ার মাস্তান, গুণ্ডা-পাণ্ডা, ছিনতাইকারী ও হিরোইনখোরদের হাতে রাখার উদ্দেশ্যে তাদেরকে কম দামে কুরবানীর চামড়া দেয়। এতে কিন্তু নিয়ত বিশুদ্ধ হবে না এবং কুরবানীও শুদ্ধভাবে আদায় হবে না।

তাই বর্তমান হিজরী শতাব্দীর মুজাদ্দিদ, যামানার মুজতাহিদ ও ইমাম, ইমামুল আইম্মাহ, মুহইস সুন্নাহ, কুতুবুল আলম, হুজ্জাতুল ইসলাম, সাইয়্যিদুল আওলিয়া, আওলাদে রসূল, মুজাদ্দিদে আ’যম ইমাম রাজারবাগ শরীফ-এর হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, বর্তমানে হক্ব মত-পথ ও সুন্নতী আমলের একমাত্র ও উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো, ‘মুহম্মদিয়া জামিয়া শরীফ মাদরাসা ও ইয়াতীমখানা’।

কাজেই, যাকাত-ফিতরা বা কুরবানীর চামড়া দিয়ে যারা ছদকায়ে জারীয়ার ছওয়াব হাছিল করতে চায় তাঁদের জন্য একমাত্র ও প্রকৃত স্থান হলো ‘মুহম্মদিয়া জামিয়া শরীফ মাদরাসা ও ইয়াতীমখানা’ ৫ নং আউটার সার্কুলার রোড, রাজারবাগ শরীফ, ঢাকা।

মুহম্মদ তাজুর রহমান রনি

ভোলাহাট, চাপাইনবাবগঞ্জ

 

সুওয়াল: কুরবানী করার সুন্নতী পদ্ধতি এবং নিয়ত জানালে খুশি হবো। জাওয়াব:  কুরবানীর পশুর মাথা দক্ষিণ দিকে এবং পা পশ্চিম দিকে রেখে অর্থাৎ ক্বিবলামুখী করে শোয়ায়ে পূর্ব দিক থেকে চেপে ধরতে হবে, তারপর কুরবানী করতে হবে। আর  কুরবানী করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে, সীনার উপরিভাগ এবং কণ্ঠনালীর মাঝামাঝি স্থানে যেন যবেহ করা হয়। আরো উল্লেখ্য যে, গলাতে চারটি রগ রয়েছে, তন্মধ্যে গলার সম্মুখভাগে দুটি- খাদ্যনালী ও শ্বাসনালী এবং দু’পার্শ্বে দুটি রক্তনালী। এ চারটির মধ্যে খাদ্যনালী, শ্বাসনালী এবং দুটি রক্তনালীর মধ্যে একটি অবশ্যই কাটতে হবে। অর্থাৎ চারটি রগ বা নালীর মধ্যে তিনটি অবশ্যই কাটতে হবে, অন্যথায় কুরবানী হবেনা। যদি সম্ভব হয়, তবে ছুরি চালানোর সময় বিজোড় সংখ্যার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে।

কুরবানীর নিয়ত: (যবেহ করার পূর্বে)

انى وجهت وجهى للذى فطر السموت والارض حنيفا وما انا من الـمشركين ان صلاتى ونسكى ومحياى ومماتى لله رب العلمين لا شريك له وبذلك امرت وانا من الـمسلمين. اللهم منك ولك.

উচ্চারণ: ইন্নী ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাজি ফাত্বারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন। ইন্না ছলাতী ওয়া নুসুকী ওয়া মাহ্ইয়া ইয়া ওয়া মামাতী লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। লা শারীকালাহু ওয়া বি যালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমীন। আল্লাহুম্মা মিনকা ও লাকা। এ  দোয়া  পড়ে بسم الله الله اكبر ‘বিস্মিল্লাহি আল্লাহু আকবর’ বলে যবেহ করতে হবে।

যবেহ করার পর এ দোয়া পড়বে-

اللهم تقبله منى كما تقبلت من حبيبك سيدنا رسول الله صلى الله عليه وسلم وخليلك سيدنا ابراهيم عليه السلام

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা তাক্বাব্বালহু মিন্নী কামা তাক্বাব্বালতা মিন হাবীবিকা সাইয়্যিদিনা রাসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও খালীলিকা ইব্রাহীমা আলাইহিস সালাম।

যদি নিজের কুরবানী হয়, তবে منى (মিন্নী) বলতে হবে। আর যদি  অন্যের  কুরবানী হয়, তবে  من (মিন) শব্দের পর যার বা যাদের কুরবানী, তার বা তাদের নাম উল্লেখ করতে হবে। আর যদি অন্যের সাথে শরীক হয়, তাহলে منى (মিন্নী)ও বলবে, অতঃপর من (মিন) বলে অন্যদের নাম বলতে হবে। কেউ যদি উপরোক্ত নিয়ত না জানে, তাহলে জবেহ করার সময় শুধু বিস্মিল্লাহি আল্লাহু আকবর বলে কুরবানী করলেও শুদ্ধ হয়ে যাবে। কারণ নিয়ত অন্তরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তবে অবশ্যই প্রত্যেক যবেহকারীর উচিত উপরোক্ত নিয়ত শিক্ষা করা। কেননা উপরোক্ত নিয়ত পাঠ করে কুরবানী করা সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।

{দলীলসমূহ: আহমদ, আবূ দাউদ, তিরমীযী, দারিমী ইবনে মাযাহ, বজলূল মযহুদ, মিশকাত, মিরকাত, মুযাহেরে হক্ব, লুমায়াত, ত্বীবী, তালিকুছ ছবীহ, আশয়াতুল লুমায়াত, আলমগীরী, শামী, দুররুল মুখতার, আইনুল হিদায়া ও বাহর ইত্যাদি।}

মুহম্মদ মুফিজুর রহমান, কুমিল্লা

 সুওয়াল:  যাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব হয়নি, এমন দুই বা ততোধিক ব্যক্তি এক নামে কুরবানী দিয়ে গোশত বণ্টন করে নিতে পারবে কিনা? জাওয়াব:  হ্যাঁ, যাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব হয়নি, এমন দুই বা ততোধিক ব্যক্তি কুরবানী দিয়ে গোশত বন্টন করে নিতে পারবে। তবে কুরবানীর পশু গরু, মহিষ ও উটে সাত নাম এবং দুম্বা, মেষ  বা ভেড়া, বকরী, খাসিতে এক নাম দেয়ার হুকুম রয়েছে।

গরু, মহিষ, উটে সাত নামের বেশি দিলে কুরবানী দুরুস্ত হবেনা। আর সাত নামের কমে কুরবানী করলে দুরুস্ত হবে। আর ছাগল, দুম্বা, ভেড়া এক নামের বেশি নামে কুরবানী করলে কারো কুরবানী দুরুস্ত হবেনা।

যেমন- যদি ২০ জন ব্যক্তি ১০০০ টাকা করে ২০,০০০ টাকা দিয়ে একটা গরু কিনে সাত নামে বা তার থেকে কম নামে কুরবানী করে গোশত বন্টন করে নেয়, তাতেও কুরবানী শুদ্ধ হবে।

তদ্রƒপ একটা খাসি তিনজনে মিলে পয়সা দিয়ে খরীদ করে, যদি এক নামে কুরবানী করে গোশত বন্টন করে নেয়, তবে সে কুরবানীও শুদ্ধ হবে।

এখন প্রশ্ন হলো- যারা সম্মিলিতভাবে টাকা দিয়ে কুরবানী করতে চায়, তারা কার নামে কুরবানী করবে?

এর জাওয়াব হচ্ছে- এরূপ কুরবানীর ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই যেহেতু নিজস্ব নামে কুরবানী করতে চাইবে, কুরবানীর ফযীলত হাছিলের জন্য। আর গরু, মহিষ ও উটে সাত নামের বেশি এবং ছাগল, ভেড়া ও দুম্বাতে এক নামের বেশি দেয়া যায় না। কার নাম দিবে বা কার নাম বাদ দিবে, এ নিয়ে ঝগড়া-ফ্যাসাদ ও মনোমালিন্যের সৃষ্টি হবে। এছাড়াও যদি কারো নামে দেয়া হয়, অন্য কেউ  প্রকাশ্যে আপত্তি না করে কিন্তু অন্তরে সম্মতি না থাকে তাহলে কুরবানী শুদ্ধ হবেনা। কারণ একজনের টাকা দিয়ে অন্যজনের নামে কুরবানী করলে কুরবানী শুদ্ধ হবেনা। টাকাওয়ালার সম্মতি ব্যতীত। এজন্য উত্তম ও আদব হচ্ছে- এক নাম দিলে মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারকে দেয়া। এরপর অন্য কারো নাম দিলে যাদের মাধ্যমে কুরবানীর বিধান চালু হয়ে আসছে, যেমন- হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম, হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম, হযরত হাজেরা আলাইহাস সালাম উনাদের নামে কুরবানী দেয়া উত্তম। আরো বেশি নামে কুরবানী দিলে হযরত আম্বিয়া আলাইহিস্ সালাম, হযরত উম্মুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম, হযরত আহলে বাইত আলাইহিমুস সালাম এবং হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ-উনাদের নামেও কুরবানী করা যেতে পারে। {দলীলসমূহ: শামী, আলমগীরি, ফতহুল ক্বাদীর, কাজীখান ইত্যাদি।}

মুহম্মদ মিজানুর রহমান

বাবুরহাট, চাঁদপুর

সুওয়াল: কোন ব্যক্তির উপর কুরবানী ওয়াজিব। সে তার নিজের নামে কুরবানী না দিয়ে মৃত বা জীবিত পিতা-মাতার নামে কুরবানী দিলে তার নিজের কুরবানী আদায় হবে কিনা?

জাওয়াব: আমাদের হানাফী মাযহাব মতে মালিকে নিছাব প্রত্যেকের উপর আলাদাভাবে কুরবানী করা ওয়াজিব। যার উপর কুরবানী ওয়াজিব তার পক্ষ থেকেই কুরবানী করতে হবে। যার উপর কুরবানী ওয়াজিব সে তার নামে কুরবানী না করে মৃত বা জীবিত অপরের নামে কুরবানী করলে ওয়াজিব তরকের কারণে সে কঠিন গুনাহে গুনাহগার হবে। যদিও বাবা মা উনাদের নামে কুরবানী করে। যাদের প্রতি কুরবানী ওয়াজিব নয়। (দলীলসমূহ: সমূহ হাদীছ শরীফ, তাফসীর শরীফ ও ফিক্বাহর কিতাব দ্রষ্টব্য)

বিঃ দ্রঃ এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত ১৫৩তম সংখ্যার সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ পাঠ করুন।

মুহম্মদ নূরুর রহমান (সিয়াম)

কুড়িগ্রাম।

সুওয়াল:  বর্তমান সময়ে কোনো ব্যক্তি যদি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নামে ছাগল, বকরী, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি কুরবানী দেয় অথবা গরু, মহিষ, উটের সাত নামের মধ্যে যদি এক নাম নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারকে দেয়, তবে উক্ত নাম মুবারক-এর গোশ্তের হুকুম কি? এটা কি সকলে খেতে পারবে? অথবা এ গোশ্ত অছিয়তকৃত গোশ্তের হুকুমের অন্তর্ভুুক্ত হবে কি-না? জাওয়াব:  হ্যাঁ, উক্ত কুরবানীকৃত গোশ্ত সকলে খেতে পারবে। আর এটা অছিয়তকৃত গোশ্তের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে না। কেননা হাদীছ শরীফ-এ আছে, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে বিশেষভাবে কুরবানী করার জন্য যে নির্দেশ দিয়েছেন এটা উনার জন্যই খাছ।

বর্তমান সময়ে কোনো ব্যক্তি যদি হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার তরফ থেকে কুরবানী দেয়, তবে এটা তার ফযীলত, তথা বারাকাত, ফুয়ুজাত, নিয়ামত, রহ্মত, মাগফিরাত, নাজাত সর্বোপরি মহান আল্লাহ পাক ও উনার রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সন্তুষ্টি লাভ করা ও তার কুরবানী কবুল হওয়ার একটি উসীলা হবে।

কাজেই মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার তরফ থেকে যদি কেউ কুরবানী দেয়, তবে উক্ত কুরবানীকৃত গোশ্ত সকলেই খেতে পারবে। {দলীলসমূহ : আবূ দাউদ, তিরমিযী, বজলুল মজহুদ, শরহে তিরমিযী, মিশকাত, মিরকাত, লুময়াত, আশয়াতুল লুময়াত, ত্বীবী, তালিক ও মুজাহের ইত্যাদি।}

মুহম্মদ যুফার আলী

ভোলাহাট, চাপাইনবাবগঞ্জ

সুওয়াল: ঈদুল আযহার নামায কখন পড়া সুন্নত? জানতে বাসনা রাখি।

জাওয়াব: সূর্য পূর্ণভাবে উদিত হবার পর থেকে (অর্থাৎ মাকরূহ ওয়াক্ত শেষ হবার পর থেকে অথবা সূর্য উদয়ের শুরু থেকে ঘড়ির মিনিট অনুযায়ী ২৩ মিনিট পর) ঈদের নামাযের ওয়াক্ত শুরু হয়। আর যাহওয়াতুল কুবরা বা যাওয়াল অথবা শরয়ী অর্ধদিন বা দ্বিপ্রহর অর্থাৎ সূর্যের এস্তাওয়া আরম্ভ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ঈদের নামাযের ওয়াক্ত থাকে।

ফজরের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পর ২৩ মিনিট পর্যন্ত মাকরূহ ওয়াক্ত এবং এরপর ঈদের নামাযের ওয়াক্ত শুরু হয় এবং যুহরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার ১ ঘণ্টা পূর্ব পর্যন্ত ঈদের নামাযের ওয়াক্ত থাকে। সূর্য পূর্ণভাবে উদিত হওয়ার পর থেকে অর্থাৎ মাকরূহ ওয়াক্ত যা ঘড়ির হিসাব অনুযায়ী ২৩ মিনিট অতিক্রম হওয়ার পূর্বে ঈদের নামায আদায় করলে নামায হবে না এবং যুহরের নামাযের ওয়াক্ত হওয়ার পূর্বের ১ ঘন্টা যা মাকরূহ ওয়াক্ত নামে পরিচিত অর্থাৎ যাহওয়াতুল কুবরা বা সূর্যের এস্তাওয়া আরম্ভ হওয়ার পর ঈদের নামায আদায় করলে তা আদায় হবে না।

ঈদের নামায কোন্ সময় আদায় করলে তা সুন্নত হবে সে সম্পর্কে হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, “ঈদের দিন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফজরের নামায পড়ে হুজরা শরীফে গিয়ে সকাল সকাল গোসল করতেন এবং ঈদুল ফিতর হলে বিজোড় সংখ্যক (৩, ৫, ৭) খোরমা খেজুর খেয়ে ঈদগাহে যেতেন। আর ঈদুল আযহার সময় কিছু না খেয়ে সরাসরি ঈদগাহে যেতেন এবং ঈদের নামাযের ওয়াক্ত হওয়ার সাথে সাথে ঈদের নামায আদায় করতেন। তারপর খুৎবা দিতেন এবং নছীহত করতেন।”

“হযরত আবুল হোয়ায়রেস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আমর ইবনে হাযম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে নাজরানের গভর্ণর থাকা অবস্থায় চিঠি দিয়ে আদেশ করেছেন, ঈদুল আযহার নামায খুব সকাল সকাল পড়বে এবং ঈদুল ফিতরের নামায ঈদুল আযহার চেয়ে অল্প একটু দেরীতে পড়বে এবং নামাযের পরে মানুষকে নছীহত করবে।

কাজেই, ঈদের নামায সকাল সকাল পড়া সুন্নত। ঈদের নামাযের সম্মানার্থে এবং ঈদের নামায যাতে আদায়ে দেরী না হয়, সেজন্য ঈদের দিন ইশরাকসহ অন্যান্য নফল নামায পড়া নিষিদ্ধ।

 

মুহম্মদ ফাহিমুর রহমান

বরিশাল

 

সুওয়াল: তাকবীরে তাশরীক কাকে বলে? এবং তা কতবার বলতে হয়?

জাওয়াব: পবিত্র যিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আছর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরয নামাযের পর যে তাকবীর পাঠ করা হয় তাকেই তাকবীরে তাশরীক বলে। জামায়াতে বা একাকী, মুসাফির অথবা মুকীম, শহর অথবা গ্রামে প্রত্যেককেই প্রতি ফরয নামাযের পর উক্ত তাকবীর পাঠ করতে হবে।

“দুররুল মুখতার” কিতাবে উল্লেখ আছে যে, “তাকবীরে তাশরীক একবার বলা ওয়াজিব, তবে যদি (কেউ) একাধিকবার বলে, তাহলে তা ফযীলতের কারণ হবে। আর “ফতওয়ায়ে শামী” কিতাবে উল্লেখ আছে,

وقيل ثلاث مرات

অর্থ: কেউ কেউ বলেছেন (তাকবীরে তাশ্রীক) তিনবার।”  “গায়াতুল আওতার শরহে দুররুল মুখতার” কিতাবে উল্লেখ আছে-

اور واجب ہے تکبیر تشریق صحیح ترقول میں ایکبار بسبب اسکے مامور ہونے کے اور اگر زیادہ کہےایکبار سے تو ہوگا ثواب.

অর্থ: “বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে (মহান আল্লাহ পাক উনার পক্ষ থেকে) আদিষ্ট হওয়ার কারণে একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। আর যদি একবারের চেয়ে অতিরিক্ত বলে তবে ছাওয়াবের অধিকারী হবে।”

উপরোক্ত নির্ভরযোগ্য কিতাবের বর্ণনা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব এবং তিনবার বলা মুস্তাহাব।{দলীলসমূহ: শামী, আইনী, আলমগীরী, হাশিয়ায়ে তাহতাবী, রদ্দুল মুহতার, দুররুল মুখতার ইত্যাদি।}

মুহম্মদ আশিকুল্লাহ

ঢাকা

সুওয়াল : মাসিক মদীনা মার্চ ২০১২ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে বলা হয়েছে, “শুধুমাত্র স্ত্রীর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে নিজেকে যুবক দেখানোর উদ্দেশ্যে নিরেট কালো খেজাব ব্যবহার করা মকরূহ।”

এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক মদীনার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? আর বাজারে প্রচলিত কালো খেজাবও কি ব্যবহার করা জায়িয হবে? সঠিক জাওয়াব জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব : “শুধুমাত্র স্ত্রীর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে নিজেকে যুবক দেখানোর উদ্দেশ্যে নিরেট কালো খেজাব ব্যবহার করা সম্পর্কে মাসিক মদীনার সম্পাদক মাহিউদ্দীন খানের উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়নি। বরং ভুল ও অশুদ্ধ হয়েছে । কারণ বাজারে প্রচলিত কালো খেজাব ব্যবহার করা যেহেতু হারাম, সেহেতু “স্ত্রীর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে নিজেকে যুবক দেখানোর উদ্দেশ্যে কোন পুরুষের পক্ষে কালো খেজাব ব্যবহার করা জায়িয হবে না।

কেননা হাদীছ শরীফ-এ মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন-

لا طاعة لـمخلوق فى معصية الخالق

অর্থ : “মহান আল্লাহ পাক উনার নাফরমানী করে কোন মাখলূকাতের আনুগত্য করা জায়িয নেই।” (মিশকাত শরীফ, মুসনাদে আহমদ শরীফ)

কাজেই কোন অবস্থাতেই স্ত্রীর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে শরীয়তের হুকুমের খিলাফ কালো খেজাব ব্যবহার করা জায়িয হবে না।

দ্বিতীয়ত: বাজারে প্রচলিত কালো খেজাবও ব্যবহার করা জায়িয হবে না। কারণ বাজারে প্রচলিত কালো খেজাব ব্যবহার করলে মাথার চুলে ও দাড়িতে নখ পালিশের ন্যায় একটি আবরণ বা প্রলেপ পড়ে, যার ফলে মাথার চুলে ও দাড়িতে পানি পৌঁছে না এবং এ কারণে তার ওযূ ও ফরয গোসল হবে না। আর ওযূ ও ফরয গোসল না হলে, তার নামাযও শুদ্ধ হবে না। কারণ নামায শুদ্ধ হওয়ার জন্য পূর্বশর্ত হলো, শরীর পাক হওয়া। আর শরীর পাক করতে হলে ফরয গোসলে সমস্ত শরীর ধৌত করতে হবে এমনকি মাথার চুলে ও দাড়িতে পানি পৌঁছাতে হবে যেন একটি চুলও শুকনা না থাকে।

কেননা চুল শুকনা থাকলে গোসল শুদ্ধ হবে না এবং শরীরও পাক হবেনা। যেহেতু ফরয গোসলে মাথার চুলে ও দাড়িতে পানি পৌঁছানো ফরয।

যেমন, “ফতওয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবের ১ম খ-ের ৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

والخضاب اذا تجسد ويبس يمنع تمام الوضو والغسل

অর্থ : “খেজাব (কলপ) যখন শরীরে (চুলে, দাড়ি ইত্যাদিতে) জমে বা লেগে যাবে এবং শুকিয়ে যাবে তখন ওযূ ও গোসল শুদ্ধ হবে না।”

উল্লেখ্য, চুলে বাজারে প্রচলিত যে কোন ধরনের কলপ ব্যবহার করার কারণে মূল চুলে পানি পৌঁছে না বরং প্রলেপের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। যার কারণে শরীর পাক হয় না।

তৃতীয়ত: শরীর পাক থাকলে নামায শুদ্ধ হওয়ার জন্য ওযূ করা ফরয। আর ওযূতে মাথার চুল মাসেহ করা ফরয এবং দাড়িতে পানি প্রবাহিত করাও ফরয। কিন্তু চুলে যে কোন রঙের কলপ ব্যবহার করলে মাথার চুলে ও দাড়িতে প্রলেপ পড়ে যাওয়ার কারণে মূল চুলের উপর মাসেহ ও পানি প্রবাহিত হয় না বরং প্রলেপের উপর দিয়ে মাসেহ ও পানি প্রবাহিত হয়। ফলে তার ওযূও হয় না। আর ওযূ ও ফরয গোসল না হলে নামাযও শুদ্ধ হয় না অর্থাৎ হবে না।

শুধু তাই নয়, এমনকি বাজারে প্রচলিত কালো খেজাব ব্যবহারকারী ব্যক্তি মারা গেলে তার জানাযা নামাযও শুদ্ধ হবে না। কারণ তাকে গোসল দেয়ার সময় তার দাড়িতে ও চুলে পানি না পৌঁছানোর কারণে সে পবিত্র হবেনা।

সুতরাং তাকে পবিত্র করতে হলে তার দাড়ি ও চুল মু-ন করে গোসল করাতে হবে। এরপর তার জানাযা দিতে হবে। অন্যথায় সে কস্মিনকালেও পবিত্র হবে না এবং তার জানাযা নামায পড়ানোও জায়িয হবে না।

সুতরাং মাসিক মদীনার সম্পাদক মাহিউদ্দীনের উক্ত বক্তব্যও ভুল বলেই প্রমাণিত হলো।

স্মর্তব্য, কালো খেজাব দু’ধরনের হয়ে থাকে।

প্রথমত: যেটা ব্যবহার করলে আবরণ বা প্রলেপ পড়ে না কিন্তু কালো হয়। আর এ ধরনের কালো রঙের খেজাব ব্যবহার করাও শরীয়তে হারাম বলা হয়েছে।

যেমন, হাদীছ শরীফ-এর কিতাব “আবু দাউদ” ও “নাসায়ী শরীফ”-এ উল্লেখ আছে,

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يكون فى اخر الزمان قوم يخضبون بالسواد كحواصل الحمام لايجدون رائحة الجنة

অর্থ : “আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, আখিরী যামানায় এমন কিছু লোক বের হবে যারা কবুতরের পালকের ন্যায় কালো খেজাব ব্যবহার করবে, তারা জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।”

হাদীছ শরীফ-এর কিতাব “তবারানী শরীফ” -এ ইরশাদ হয়েছে-

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من خضب بالسواد سود الله وجهه يوم القيامة

অর্থ : “আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, যে ব্যক্তি কালো খেজাব ব্যবহার করবে, মহান আল্লাহ পাক তিনি ক্বিয়ামতের দিন তার চেহারাকে কালো করে দিবেন।”

“মুসলিম শরীফ”-এর ২য় খন্ডের ১৯৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

ويحرم خضابه بالسواد على الاصح وقيل يكره كراهة تنزيه والمختار التحريم لقوله صلى الله عليه وسلم واجتنبوا السواد

অর্থ : “অধিক ছহীহ বা বিশুদ্ধ মতে, কালো খেজাব ব্যবহার করা হারাম। কেউ কেউ বলেছেন, মাকরূহ তানযীহ। তবে গ্রহণযোগ্য মত হলো, কালো খেজাব ব্যবহার করা মাকরূহ তাহরীমী। কারণ হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেন, তোমরা কালো রঙের খেজাব বর্জন করো।”

কালো খেজাব সম্পর্কে বিখ্যাত মুহাদ্দিছ হযরত মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি “শরহে শামায়িলে তিরমিযী শরীফ”-এ উল্লেখ করেন-

ذهب اكثر العلماء الى كراهة الخضاب بالسواد ورجح الثورى الى انها كراهة تحريم

অর্থ : “অধিকাংশ আলিমগণের মতে কালো খেজাব ব্যবহার করা মাকরূহ। হযরত ইমাম সুফিয়ান ছাওরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার তরজীহপ্রাপ্ত মতে মাকরূহ তাহরীমী।”

মিশকাত শরীফ-এর শরাহ “আশয়াতুল লুময়াতে” উল্লেখ আছে-

خضاب بحناء باتفاق جائزاست ومختار در سواد حرمت است

অর্থ : “মেহেদী বা মেন্দী দ্বারা খেজাব দেয়া সর্বসম্মতিক্রমে জায়িয। আর গ্রহণযোগ্য মতে, কালো খেজাব ব্যবহার করা হারাম।”

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, চুল বা দাড়িতে কালো রঙের খেজাব ব্যবহার করা আমাদের হানাফী মাযহাব মুতাবিক মাকরূহ তাহরীমী তথা হারাম।

তৃতীয়ত: আমাদের দেশে বা বিদেশে যে সমস্ত খেজাব পাওয়া যায় তার প্রত্যেকটি ব্যবহারেই প্রলেপ পড়ে। প্রলেপ পড়ে না এমন কোন খেজাব এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি বা বিশ্বে কোথাও পাওয়া যায়না।

অতএব, বর্তমানে বাজারে যেসব কালো বা অন্য কোন রঙের খেজাব পাওয়া যায়, তা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নাজায়িয ও হারাম।

সুতরাং “শুধুমাত্র স্ত্রীর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে নিজেকে যুবক দেখানোর উদ্দেশ্যে নিরেট কালো খেজাব ব্যবহার করা সম্পর্কে মাসিক মদীনার সম্পাদক মাহিউদ্দীনএর উক্ত বক্তব্য ভুল, মনগড়া ও দলীলবিহীন হয়েছে বলেই প্রমাণিত হলো।

{বিশেষ দ্রষ্ট্রব্য- এ সম্পর্কে আরও জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ১৯, ৩২, ৪২, ৬০, ৬৬, ৬৭, ৭৫, ৯৫, ১০৯, ১২৫, ২০৬ ও ২১৭তম সংখ্যা পাঠ করুন। সেখানে মাসিক মদীনা, মাসিক পৃথিবী, মাসিক রাহমানী পয়গাম ও হাটহাজারী থেকে প্রকাশিত অখ্যাত মাসিক পত্রিকার ভুল বক্তব্য খ-ন করে সঠিক জাওয়াব দেয়া হয়েছে।}

{দলীলসমূহ : (১) মুসলিম শরীফ, (২) তিরমিযী শরীফ, (৩) আবু দাউদ শরীফ,  (৪) নাসাঈ শরীফ,  (৫) ইবনে মাজাহ শরীফ, (৬) তিবরানী শরীফ, (৭) মিশকাত  শরীফ, (৮) উমদাতুল ক্বারী, (৯) জামউল ওসায়িল, (১০)  মিরকাত, (১১) আশয়াতুল লুময়াত, (১২) লুময়াত, (১৩) শরহে শামায়িলে তিরমিযী, (১৪) যখীরা, (১৫) ওয়াজীয, (১৬) সিরাজুল ওয়াহহাজ, (১৭) দুররুল মুখতার, (১৮) ফতওয়ায়ে আলমগীরী, (১৯) ফতওয়ায়ে শামী, (২০) ফতওয়ায়ে হিন্দীয়া, (২১) ইমদাদুল ফতওয়া, (২২) কিফায়াতুল মুফতী, (২৩) Manufacture of Beauty products By SBP Board of Consultants & Engineers (24) Yahoo search engine P-Phenylenediamine all related files ইত্যাদি}

 

মুহম্মদ নাজমুল হুদা

রাজৈর, মাদারীপুর

 

সুওয়াল : ইহরাম অবস্থায় নাকি মেয়েদের চেহারা বা মুখম-লে কাপড় লাগানো যায় না। কাপড় লাগলে বা স্পর্শ করলে দম ওয়াজিব হয়। তাহলে কি মেয়েরা চেহারা না ঢেকে খুলে রাখবে? অর্থাৎ ইহরাম অবস্থায় কি মেয়েদের জন্য পর্দা করার দরকার নেই? জাওয়াব : ‘ইহরাম অবস্থায় মেয়েদের চেহারা বা মুখম-লে কাপড় স্পর্শ করা বা লাগানো যাবে না, এ কথা সত্য।’ তবে এক্ষেত্রে মাসয়ালা হলো, যদি একদিন বা এক রাত্রি মুখম-লে কাপড় স্পর্শ করে তাহলে তাদের উপর দম অর্থাৎ একটি কুরবানী ওয়াজিব হবে। আর যদি এক দিন বা এক রাত্রির কম সময় কাপড় স্পর্শ করে তাহলে এক ফিতরা পরিমাণ ছদকা করা ওয়াজিব হবে।

এর অর্থ এটা নয় যে, মেয়েরা ইহরাম অবস্থায় মুখম-ল খোলা রেখে বেপর্দা হবে। মেয়েদের সর্বাবস্থায় বেগানা পুরুষদের সামনে মুখম-ল খোলা রাখা হারাম যা কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।

অতএব, ইহরাম অবস্থায় মেয়েদের করণীয় হচ্ছে- তারা মুখম-লের উপর এমনভাবে কাপড় ঝুলিয়ে রাখবে যাতে কাপড় মুখম-লে স্পর্শ না করে। অর্থাৎ নেট বা জালি জাতীয় কোন কিছুর সাহায্যে নেকাব মুখম-ল থেকে কিছুটা দূরে  ঝুলিয়ে রাখবে।

স্মরণ রাখতে হবে যে, কোন অবস্থাতেই পর্দার খিলাফ করা যাবে না। কারণ মেয়েদের জন্য পর্দা রক্ষা করা হচ্ছে স্বতন্ত্র একটি ফরয। যা ফরযে আইন; এবং তা দায়িমী ফরযের অন্তর্ভুক্ত। যেমনিভাবে পুরুষের জন্য স্বতন্ত্র ও দায়িমী ফরয হচ্ছে হালাল কামাই করা।

এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে-

عن حضرت عبد الله رضى الله تعالى عنه  قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم طلب كسب الحلال فريضة بعد الفريضة

অর্থ: “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, “পুরুষের জন্য অন্যান্য ফরযের পর ফরয হচ্ছে হালাল কামাই করা।” (বাইহাক্বী, মিশকাত)

وللنساء الحجاب

“আর মেয়েদের জন্য ফরয হচ্ছে পর্দা করা।”

অর্থাৎ কালিমা, নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাতের পর পুরুষের জন্য ফরয হলো হালাল কামাই করা আর মেয়েদের জন্য ফরয পর্দা করা। নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাতের ন্যায় এ দুটি ফরয পালনের ক্ষেত্রেও কুরআন-সুন্নাহর কঠোর নির্দেশ আরোপিত হয়েছে।

যেমন, হালাল রুজির ব্যাপারে হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত হয়েছে, এক দিরহাম বা এক পয়সা হারাম খেলে চল্লিশ দিন ইবাদত কবুল হয় না এবং আরও বর্ণিত হয়েছে-

عن حضرت جابر رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لا يدخل الجنة لحم نبت من السحت وكل لحم نبت من السحت كانت النار اولى به.

    অর্থ : “হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, ওই গোশতের টুকরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না যা হারাম খাদ্যের দ্বারা তৈরি হয়েছে। শরীরের যে গোশতের টুকরা হারাম খাদ্যের দ্বারা তৈরি হয়েছে তার জন্য জাহান্নামের আগুনই যথেষ্ট। অর্থাৎ যে ব্যক্তি হারাম রুজি ভক্ষণ করে সে জাহান্নামী।” (আহমদ, দারিমী, বাইহাক্বী, মিশকাত)

আর পর্দার ব্যাপারে হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত হয়েছে-

عن حضرت الحسن رحمة الله عليه مرسلا قال بلغنى ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال لعن الله الناظر والـمنظور اليه.

    অর্থ : “হযরত হাসান বছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মুরসাল সূত্রে বর্ণনা করেন, আমার নিকট এই হাদীছ শরীফ পৌঁছেছে, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, যে দেখে এবং যে দেখায় উভয়ের প্রতি মহান আল্লাহ পাক উনার লা’নত।” (বাইহাক্বী, মিশকাত)

আরও বর্ণিত হয়েছে যে-

عن حضرت بريدة رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لعلى يا على لاتتبع النظرة النظرة فان لك الاولى وليست لك الاخرة.

    অর্থ : “হযরত বুরাইদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত আলী আলাইহিস সালাম উনাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, হে আলী আলাইহিস সালাম! আপনি দৃষ্টিকে অনুসরণ করবেন না। প্রথম দৃষ্টি যা অনিচ্ছা সত্ত্বে পতিত হয় তা ক্ষমা করা হবে; কিন্তু পরবর্তী দৃষ্টি ক্ষমা করা হবে না।” অর্থাৎ প্রতি দৃষ্টিতে একটি কবীরা গুনাহ লেখা হয়ে থাকে। (আহমদ, তিরমিযী, আবু দাউদ, দারিমী, মিশকাত)       পর্দা সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন-

وقرن فى بيوتكن ولا تبرجن تبرج الجاهلية الاولى.

     অর্থ : “তোমরা তোমাদের গৃহে অবস্থান কর এবং জাহিলিয়াত যুগের নারীদের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বাইরে ঘোরাফেরা কর না।” (সূরা আহযাব : আয়াত শরীফ ৩৩) তিনি আরও ইরশাদ করেন-

وقل للمؤمنات يغضضن من ابصارهن.

     অর্থ : “হে হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি ঈমানদার মহিলাদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে।” (সূরা নূর : আয়াত শরীফ ৩১)

উপরোক্ত আয়াত শরীফ-এর ব্যাখ্যায় হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে-

عن حضرت ابن مسعود رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم الـمرأة عورة فاذا خرجت استشرفها الشيطان.

অর্থ : “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, মেয়েরা পর্দার অধীন থাকবে। কেননা তারা যখন কোথাও বের হয় তখন শয়তান উঁকি-ঝুঁকি দিতে থাকে পাপ কাজ সংঘটিত করানোর জন্য।” (তিরমিযী, মিশকাত)

মূলত একজন মেয়ে যখন উপযুক্ত তথা বালেগা হয় তখন হতে তার উপর ব্যক্তিগতভাবে পর্দা করা ফরয। এ ফরয পালনে যাতে কোন প্রকার গাফলতি কিংবা ত্রুটি না হয় এজন্য মেয়ের অভিভাবকগণকেও শরীয়ত কঠোর নির্দেশবাণী আরোপ করেছে।

হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে-

الديوث لا يدخل الجنة

       অর্থ : “দাইয়ূছ’ বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবেনা। ‘দাইয়ূছ’ ওই ব্যক্তি যে তার অধীনস্থ মেয়েদের পর্দা করায়না।” ( দাইলামী, কানযুল উম্মাল)

আরও ইরশাদ হয়েছে-

قال حضرت عبد الله رضى الله تعالى عنه قال رسول الله  صلى الله عليه وسلم ثلاث لا يدخلون الجنة ولا ينظر الله اليهم يوم القيامة العاق لوالديه والـمرأة المترجلة الـمتشبهة بالرجال والديوث.

অর্থ : “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, তিন প্রকার লোক জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না এবং আল্লাহ পাক তিনি ক্বিয়ামতের দিন তাদের প্রতি (রহমতের)  দৃষ্টি দিবেন না। (১) পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, (২) পুরুষের ছূরত ধারণকারিণী মহিলা, (৩) দাইয়ূছ।” (মুসনাদে আহমদ বিন হাম্বল ২য় জিলদ ১৩৪ পৃষ্ঠা, নাসায়ী শরীফ কিতাবুয্ যাকাত বাব নং ৬৯)

উল্লেখ্য, মেয়েদের জন্য পর্দা এমন গুরুত্বপূর্ণ ফরয যে, তা কেবল জীবিতাবস্থায়ই করতে হবে তা নয় বরং তাদের ইন্তিকালের পরও পর্দা করা ফরয। অর্থাৎ মৃত্যুর পরও যেন কোন বেগানা পুরুষ না দেখে।

স্মরণযোগ্য যে, অন্যান্য ফরযের মতো পর্দাও একটি ফরয এবং তার হুকুম-আহকামও আলাদাভাবে বর্ণিত রয়েছে। কাজেই, শরীয়ত এ বিধান আরোপ করেনি যে, একটি ফরয পালন করার জন্য অন্য একটি ফরয পরিত্যাগ করতে হবে।

বরং শরীয়তের নির্দেশ হচ্ছে এটাই যে, প্রতিটি ফরয-ওয়াজিব যথাযথভাবে আদায় করা। একটার জন্য আরেকটা ছেড়ে দেয়া জায়িয নেই।

অতএব, পর্দা শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত একটি ফরয। কোন মহিলার জন্য ইহরাম অবস্থায় হোক আর ইহরাম ব্যতীত অন্য অবস্থায়ই হোক পর্দা তরক্ব করা হারাম ও কবীরা গুনাহ।

যে মেয়ে ইহরাম অবস্থায় মুখম-ল খোলা রাখবে সে ফরয তরক্ব করার কারণে ফাসিক হিসেবে সাব্যস্ত হবে। অথচ মহান আল্লাহ্ পাক তিনি কুরআন শরীফ-এ হজ্জ আদায়ের ক্ষেত্রেও অশ্লীল-অশালীন ও ফাসিকী বা নাফরমানী ইত্যাদি কাজ করতে নিষেধ করেছেন। আর যারা ফাসিকী বা নিষিদ্ধ কাজ করে তাদের প্রকৃতপক্ষে হজ্জে মাবরুর নছীব হবে না।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন-

فمن فرض فيهن الحج فلا رفث ولا فسوق ولا جدال فى الحج وما تفعلوا من خير يعلمه الله وتزودوا فان خير الزاد التقوى واتقون ياولى الالباب.

      অর্থ : “যে ব্যক্তি হজ্জের মাসসমূহে হজ্জ করার নিয়ত করে সে যেন হজ্জের মধ্যে নির্জন অবস্থান ও তার সংশ্লিষ্ট কোন কাজ না করে এবং কোন প্রকার ফাসিকী বা নাফরমানিমূলক কাজ না করে এবং ঝগড়া-বিবাদ না করে। আর তোমরা যে নেক কাজ কর আল্লাহ পাক তা জানেন এবং তোমরা পাথেয় সংগ্রহ কর। নিশ্চয়ই উত্তম পাথেয় হচ্ছে তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি। আর একমাত্র আমাকেই ভয় কর হে জ্ঞানীগণ।” (সূরা বাক্বারা : আয়াত শরীফ ১৯৭)

উল্লেখ্য, ‘হজ্জে মাবরুর’ অর্থ কবুল হজ্জ। এর ব্যাখায় বলা হয়েছে-

هو ما لا يخالطه الاثم ولا سمعة ولا رياء

     অর্থ : “যে হজ্জের মধ্যে কোন প্রকার পাপের সংমিশ্রণ ঘটবেনা, (বেপর্দা, বেহায়া-বেশরা কাজ করবেনা অর্থাৎ কুফর, শিরক, বিদয়াত, হারাম, ফিসক, ফুজুরী, অশ্লীল-অশালীন কথাবার্তা, আচার-আচরণ, ঝগড়া-ঝাটি, মারামারি, কাটাকাটি হারাম শরীফ-এ নিষিদ্ধ কার্যসমূহ করবেনা কোন ফরয, ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদা তরক্ব করবেনা।) লোককে শোনানোর উদ্দেশ্যে থাকবেনা এবং রিয়া বা লোক প্রদর্শনের জন্য করা হবেনা।”

এ সমস্ত প্রকার দোষ-ত্রুটি হতে মুক্ত হজ্জকেই হজ্জে মাবরুর বলা হয়। আর বেপর্দা হওয়া সাধারণ বা ছগীরা গুনাহ নয়। বরং তা শক্ত হারাম ও কবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত। আর হারাম ও কবীরা গুনাহ করে হজ্জ সম্পাদন করা হলে তা কস্মিনকালেও হজ্জে মাবরুর হবে না। অতএব, এ বিষয়ে সকল পুরুষ ও মেয়েদের পরহেয থাকতে হবে। {দলীলসমূহ : (১) আহকামুল কুরআন জাস্সাস, (২) কুরতুবী, (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) রুহুল বয়ান, (৫) খাযিন, (৬) বাগবী, (৭) তাবারী, (৮) কবীর, (৯) মাযহারী, (১০) দুররে মনছুর, (১১) বুখারী, (১২) মুসলিম, (১৩) আবূ দাউদ, (১৪) কানযুল উম্মাল, (১৫) মিশকাত, (১৬) মিরকাত, (১৭) আশয়াতুল লুময়াত, (১৮) লুময়াত, (১৯) ত্বীবী, (২০) তা’লিকুছ ছবীহ, (২১) মুযাহিরে হক্ব, (২২) আলমগীরী, (২৩) শামী, (২৪) দুররুল মুখতার, (২৫) রদ্দুল মুহতার, (২৬) আইনুল হিদায়া, (২৭) ফতহুল ক্বাদীর, (২৮) শরহে বিক্বায়া, (২৯) ফাযায়েলে হজ্জ, (৩০) আহকামে হজ্জ ও যিয়ারত, (৩১) হজ্ব ও যিয়ারত, (৩২) আহকামে হজ্জ, (৩৩) মক্কা ও মদীনার পথে ইত্যাদি।

 

মুহম্মদ  শাহীনূর রহমান

সভাপতি, ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত রামপুরা শাখা, ঢাকা।

 

সুওয়াল : হজ্জ পালনের ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলার আমলের মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি?  জাওয়াব : হ্যাঁ, পুরুষ ও মহিলার আমলের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। তন্মধ্যে জরুরী কিছু পার্থক্য বর্ণনা করা হলো। (১) হজ্জে পুরুষেরা মাথা খোলা রাখবে মহিলারা মাথা ঢেকে রাখবে। (২) পুরুষেরা তালবিয়া পাঠ করবে উচ্চস্বরে আর মহিলারা তালবিয়া পাঠ করবে নিম্নস্বরে। (৩) পুরুষেরা তাওয়াফের সময় রমল করবে মহিলারা রমল করবেনা। (৪) ইজতেবা পুরুষেরা করবে মহিলাদের করতে হয়না। (৫) সাঈ করার সময় পুরুষেরা মাইলাইনে আখজারাইনের মধ্যস্থানে দৌড়াবে মহিলারা দৌড়াবেনা। (৬) পুরুষেরা মাথা কামাবে মহিলারা শুধু মাথার চুল এক অঙ্গুলি বা এক ইঞ্চি পরিমাণ কাটবে। (৭) বিদেশী পুরুষ হাজী সাহেবদের জন্য তাওয়াফে বিদা করা ওয়াজিব। বিদেশী মহিলা হাজীদের জন্যও ওয়াজিব। তবে প্রাকৃতিক কারণে মহিলারা অসুস্থ হয়ে পড়লে এ ওয়াজিব তাদের জন্য সাকিত হয়ে যায়। (৮) পুরুষদের জন্য সেলাই করা কাপড় পরিধান নিষিদ্ধ মহিলারা সেলাই করা কাপড় পরিধান করতে পারবে।

মুহম্মদ আনোয়ার হোসেন হিরু শান্তিবাগ, ঢাকা।

সুওয়াল : হজ্জ আদায়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্থানে যে আলাদা আলাদা দোয়া-দুরূদ ও তাসবীহ পড়ার নিয়ম রয়েছে তা প্রায় অনেক হাজী সাহেবদের পক্ষেই আদায় করা সম্ভব হয়না। তার কারণ হচ্ছে- (১) স্মরণ শক্তির অভাব, (২) সময়ের স্বল্পতা ও (৩) অধিক ব্যস্ততা ইত্যাদি।

এক্ষেত্রে তাদের জন্য এমন কোন আমল আছে কি যা হাজী সাহেবরা সহজে আদায় করতে পারবে? জাওয়াব : হ্যাঁ, যে সমস্ত হাজী সাহেবরা হজ্জের বিস্তারিত দোয়া-দরূদ ও তাসবীহ ইত্যাদি পাঠ করতে অপারগ তাদের জন্য সবচেয়ে সহজ আমল হচ্ছে তারা প্রতি কদমে, প্রতি মাকামে ও প্রতি স্থানে শুধু দুরূদ শরীফ পাঠ করবে। আর দুরূদ শরীফ-এর মধ্যে সবচেয়ে সহজ দুরূদ শরীফ হলো-

صلى الله عليه وسلم

উচ্চারণ : “ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।”

আর যদি কোন হাজী ছাহেবদের পক্ষে সম্ভব হয় তাহলে উক্ত দুরূদ শরীফ পাঠ করার ফাঁকে ফাঁকে যা নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খাছ দোয়া, তা পাঠ করতে পারে। দোয়াটি হচ্ছে-

لا اله الا الله وحده لا شريك له له الـملك وله الحمد وهو على كل شىء قدير

উচ্চারণ : “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহূ লা শারীকালাহূ লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদির।”

 

মুহম্মদ রাকিবুর রহমান

পলাশ, নরসিংদী

সুওয়াল: হজ্জের ফরযসমূহ কয়টি?

জাওয়াব: হজ্জের ফরয হচ্ছে ৩টি। (১) ইহরাম বাঁধা অর্থাৎ “মীক্বাত” হতে ইহরাম বাঁধা। (২) ওকূফে আরাফা অর্থাৎ ৯ই যিলহজ্জের দ্বিপ্রহরের পর হতে অর্থাৎ সূর্য ঢলার পর হতে ১০ই যিলহজ্জ ছুব্হে ছাদিকের পূর্ব পর্যন্ত যে কোন সময় আরাফার ময়দানে উপস্থিত থাকা। (৩) তাওয়াফে যিয়ারত অর্থাৎ ১০, ১১ ও ১২ই যিলহজ্জ তারিখের মধ্যে কা’বা শরীফ তাওয়াফ করা।

মুহম্মদ আযীযুল্লাহ

পলাশ, নরসিংদী

 

সুওয়াল : হজ্জের ওয়াজিব কয়টি?

জাওয়াব : হজ্জের মূল ওয়াজিব ৫টি। (১) সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সায়ী করা। (২) মুযদালিফায় অবস্থান করা। (৩) রমী বা কঙ্কর নিক্ষেপ করা। (৪) মাথা মু-ন করা। (৫) তাওয়াফে বিদা বা বিদায়ী তাওয়াফ করা।

মুহম্মদ মুনিরুজ্জামান

বাবুরহাট, চাঁদপুর

 

সুওয়াল : হজ্জ আদায়ের ছহীহ পদ্ধতি বা নিয়ম জানতে বাসনা রাখি।

জাওয়াব : হজ্জ করতে হলে প্রথমে ইহরাম বাঁধতে হয়। ইহরাম বাঁধা হজ্জের অন্যতম রুকন বা ফরয। বাংলাদেশ তথা পাক ভারত উপমহাদেশের লোকেরা সাধারণত ইয়েমেন হয়ে হজ্জে গমন করে থাকে। সে হিসেবে তাদের “মীক্বাত” (ইহরাম বাঁধার স্থান) হচ্ছে ‘ইয়ালামলাম।’

যারা সরাসরি হজ্জ করতে না গিয়ে আগে মদীনা শরীফ গিয়ে সেখানে অবস্থান করার পর হজ্জ আদায় করার ইচ্ছা পোষণ করে, তাদেরকে মদীনা শরীফ-এর অধিবাসীদের মীক্বাত “যুলহুলাইফা” নামক স্থান হতে হজ্জের ইহরাম বাঁধতে হবে।

আমাদের হানাফী মাযহাব মোতাবেক তিন প্রকার হজ্জের মধ্যে ‘হজ্জে ক্বিরান’ হচ্ছে সুন্নত ও আফযল।

ইহরাম বাঁধতে হলে প্রথমে ওযু বা গোসল করে নিতে হয়, তবে গোসল করাটাই উত্তম। অতঃপর দু’খানা নতুন বা পরিষ্কার কাপড় পরিধান করবে। একখানা সেলাইবিহীন ইযার, অপরখানা চাদর। সাথে সুগন্ধি থাকলে মেখে নিবে। অতঃপর দু’রাকায়াত নামায পড়ে নিম্নের দোয়া পাঠ করবে যা হজ্জে ক্বিরানের নিয়ত :

اللهم انى اريد الحج والعمرة فيسّرهما لى وتقبلهما منى.

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নী উরীদুল হাজ্জা ওয়াল ওমরাতা ফাইয়াস্সির হুমালী ওয়া তাক্বাব্বালহুমা মিন্নী।” অর্থ : আয় আল্লাহ পাক! আমি হজ্জ ও উমরার নিয়ত করলাম। আমার জন্য উভয়টি সহজ করুন এবং আমার পক্ষ থেকে উভয়টি কবুল করুন।

আর যদি কেউ হজ্জে তামাত্তুর নিয়ত করে তাহলে তাকে প্রথমে উমরার নিয়তে ইহরাম বাঁধতে হবে।

উমরার নিয়ত :

اللهم انى اريد العمرة فيسّرها لى وتقبلها منى.

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি উরীদুল উমরাতা ফাইয়াস্সিরহা-লী ওয়া তাক্বাব্বাল্হা মিন্নী। অর্থ : আয় আল্লাহ পাক! আমি উমরা করার নিয়ত করছি। অতঃপর তা আমার জন্য সহজ করে দিন এবং তা আমার তরফ থেকে কবুল করে নিন।

আর যদি কেউ হজ্জে ইফরাদের নিয়ত করে তাহলে তাকে শুধু হজ্জের নিয়ত করতে হবে।

হজ্জের নিয়ত :

اللهم انى اريد الحج فيسّره لى وتقبله منى.

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি উরীদুল হাজ্জা ফাইয়াস্সিরহু লী ওয়া তাক্বাব্বাল্হু মিন্নী।

অর্থ : আয় আল্লাহ পাক! নিশ্চয়ই আমি শুধু হজ্জ করার নিয়ত করছি। সুতরাং আপনি আমার জন্য তা পালন করা সহজ করুন এবং আমার পক্ষ হতে কবুল করুন।

অতঃপর তালবিয়া পাঠ করবে। তালবিয়া হচ্ছে-

لبيك اللهم لبيك، لبيك لا شريك لك لبيك، ان الحمد والنعمة لك والـملك لا شريك لك.

উচ্চারণ : লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা, লাব্বাইকা লা- শারীকালাকা লাব্বাইকা, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান্ নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্কা লা-শারীকা লাকা।

অর্থ: আমি হাজির আছি হে আল্লাহ পাক! আমি হাজির আছি। আমি হাজির আছি, আপনার কোন শরীক নেই, আমি হাজির আছি। নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা ও সমস্ত নিয়ামত এবং সমস্ত রাজত্ব আপনারই, আপনার কোন শরীক নেই।

এ তালবিয়ার কোন শব্দ বাদ দেয়া যাবেনা। ইচ্ছা করলে বৃদ্ধি করা যেতে পারে। আর তালবিয়া পাঠ করা হলেই ইহরাম বাঁধা হয়ে গেলো।

ইহরাম বেঁধে মক্কা শরীফ প্রবেশ করেই তাওয়াফের দ্বারাই কাজ শুরু করতে হবে। অর্থাৎ ক’াবা শরীফ ৭ বার প্রদক্ষিণ করে তাওয়াফের কাজ সমাধা করতে হবে।

তাওয়াফের নিয়ম :

তাওয়াফের নিয়তের সাথে ওযু-গোসল করে কা’বা শরীফ-এর হজরে আসওয়াদের ঠিক বরাবর দাঁড়িয়ে হজরে আসওয়াদ চুম্বন করে আর ভিড়ের জন্য চুম্বন করতে না পারলে ইস্তেলাম (হাতে ইশারা করে চুম্বন) করে তাওয়াফ শুরু করবে। (উল্লেখ্য, হজরে আসওয়াদ থেকে সামনে বেড়ে তাওয়াফ শুরু করলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। আর তাওয়াফকালীন শুধুমাত্র হজরে আসওয়াদ চুম্বন করার সময় মুখ কা’বা শরীফ-এর দিকে থাকবে, অন্যসময় মুখ সামনের দিকে থাকবে। আর বাইতুল্লাহ শরীফ বাম পার্শ্বে থাকবে। তাওয়াফের সময় মুখ বা পিঠ কা’বা শরীফ-এর দিকে থাকলে তাওয়াফ শুদ্ধ হবেনা।)

পর্যায়ক্রমে হজরে আসওয়াদ থেকে শুরু করে মুলতাযিম এরপর বাই তুল্লাহ শরীফ-এর দরজা, রুকনে ইরাকী হয়ে হাতিমের বাহির দিয়ে পর্যায়ক্রমে রুকনে শামী, রুকনে ইয়ামেন হয়ে এরপর হজরে আসওয়াদ পর্যন্ত পৌঁছলে এক চক্কর সমাধা হলো। অতঃপর হজরে আসওয়াদ চুম্বন করবে। ভিড়ের কারণে চুম্বন করতে না পারলে ইস্তেলাম করবে। পুনরায় হজরে আসওয়াদ থেকে তাওয়াফের দ্বিতীয় চক্কর শুরু করবে। প্রত্যেক চক্করের সময় খেয়াল রাখতে হবে, তাওয়াফকারী যেন কোন চক্করের সময়ই হজরে আসওয়াদ থেকে সামনে বেড়ে তাওয়াফ শুরু না করে।

তাওয়াফের মধ্যে প্রথম তিন চক্কর রমল (হাত বাঁকা করে বুক পর্যন্ত উঠিয়ে হাত নেড়ে নেড়ে বীরের ন্যায় মধ্য গতিতে দৌড়ানোকে রমল বলে) ও শেষ চার চক্কর মাশী (সাধারণ গতিতে চলাকে মাশী বলে।) করবে।

তাওয়াফ সমাধা করে ছাফা মারওয়াতে সায়ী (দৌড়ানো) করবে। এ সমস্ত কাজগুলি উমরার। অর্থাৎ উমরাহ সমাধা হলো।

যদি কেউ হজ্জে তামাত্তুর নিয়ত করে থাকে তাহলে চুল মু-ন করে ইহরাম ছেড়ে দিবে। অতঃপর তামাত্তুকারী ৮ই যিলহজ্জ হেরেম শরীফ-এর সীমানা অন্তর্ভুক্ত কোন এক স্থান থেকে হজ্জের জন্য ইহরাম বেঁধে নিবে। এরপর যথারীতি হজের আহকামসমূহ পালন করবে। তামাত্তুকারীও যদি হজ্জের পূর্বে নফল তাওয়াফ করে তার মধ্যে রমল, ইজতেবা আদায় করে এবং এরপর সায়ী করে তাহলে তামাত্তুকারীকেও তাওয়াফে যিয়ারতের মধ্যে রমল, ইজতেবা ও এরপর সায়ী করতে হবেনা। অতঃপর হজ্জের জন্য যথারীতি হজ্জে ইফরাদের মত তাওয়াফে কুদূম করতে হবে।

ক্বিরানকারী তাওয়াফে কুদূম করার সময় রমল ও ইজতেবার সাথে তাওয়াফ করবে। অতঃপর ছাফা ও মারওয়া সায়ী করবে। তাহলে তাওয়াফে যিয়ারতের সময় রমল ও ইজতেবা ও পরে সায়ী করতে হবেনা।

হজ্জে ইফরাদকারী যদি তাওয়াফে কুদূমের মধ্যে রমল, ইজতেবা ও সায়ী করে তাহলে তাওয়াফে যিয়ারতের মধ্যে রমল, ইজতেবা ও এরপর সায়ী করতে হবেনা। তবে ইফরাদ হজ্জে তাওয়াফে যিয়ারতের পর সায়ী করা উত্তম।

তাওয়াফ শুরু করার পূর্বে ইজতেবা করতে হবে। ইজতেবা হলো- চাদরকে ডান বগলের নিচে দিয়ে ও বাম কাঁধের উপর দিয়ে পরা যাতে ডান কাঁধ খোলা থাকে এবং বাম কাঁধ ঢাকা থাকে।

উল্লেখ্য, প্রতিবার তাওয়াফ করার সময় হাতীমের বাহির দিয়ে তাওয়াফ করতে হবে। হাতীম হলো- ক’াবা শরীফ-এর উত্তর পার্শ্বে দু’দিক খোলা কমর পর্যন্ত উঁচু দেয়াল দ্বারা ঘেরা স্থান। তাওয়াফ করার সময় প্রথম তিন চক্কর রমল করবে ও শেষ চার চক্কর মাশী করবে। তাওয়াফকালীন প্রত্যেকবারই হজরে আসওয়াদের নিকট আসলে উহাকে চুম্বন করবে অথবা হাতে ইস্তেলাম করবে। ইস্তেলাম হলো- হাতে ইশারা করে চুম্বন করা। শেষবার চুম্বন বা ইস্তেলাম করে তাওয়াফ সমাধা করবে। অতঃপর মাক্বামে ইব্রাহীমে এসে দু’রাকায়াত নামায আদায় করবে। যদি ভিড় বা অন্য কোন কারণে সেখানে নামায পড়া সম্ভব না হয় তাহলে মাকামে ইবরাহীমের পিছনে মসজিদে হারামের যেখানে সম্ভব হয় সেখানেই দু’রাকায়াত নামায আদায় করবে। এই তাওয়াফকে তাওয়াফে কুদূম বলে। ইহা আদায় করা সুন্নত। ইহা মক্কাবাসীদের জন্য আদায় করতে হয়না।

অতঃপর মসজিদে হারামের বাবুছছাফা নামক দরজা দিয়ে বের হয়ে ছাফা পাহাড়ে গিয়ে আরোহণ করবে। সেখানে কাবা শরীফ-এর দিকে মুখ করে তাসবীহ-তাহলীল বলে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার  প্রতি দুরূদ শরীফ পাঠ করে নিজের আরজু মোতাবেক দোয়া করবে। অতঃপর সেখান থেকে অবতরণ করে সাধারণ গতিতে মারওয়া পাহাড়ের দিকে চলবে।

তবে বত্নে ওয়াদীতে পৌঁছে মাইলাইনে আখজারাইনে (সবুজ রঙয়ের মাইল দ্বারা চিহ্নিত স্থান) দৌড়াবে। অতঃপর সাধারণ গতিতে মারওয়া পাহাড়ে আরোহণ করবে। ছাফা পাহাড়ের অনুরূপ মারওয়া পাহাড়েও তাকবীর, তাহলীল, দুরূদ শরীফ পাঠ ও দোয়া করবে। এতে একবার হলো। অনুরূপ সাতবার ছাফা-মারওয়াতে দৌড়াবে। অর্থাৎ ছাফা হতে শুরু করবে মারওয়াতে শেষ করবে। অতঃপর ইহরাম অবস্থায় মক্কা শরীফ-এ অবস্থান করবে এবং যত ইচ্ছা তাওয়াফ করবে।

উল্লেখ্য, হজ্জ উপলক্ষে তিনটি খুতবা দেয়া হয়। (১) যিলহজ্জ মাসের ৭ তারিখে যোহরের পর মসজিদে হারামে এক খুতবা দিতে হয়। খুতবার মধ্যে বসতে হয়না। (২) আরাফার ময়দানে যিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখে দুই খুতবার মধ্যে বসতে হবে। ইহা যুহরের নামাযের পূর্বে দিতে হয়। (৩) যিলহজ্জের ১১ই তারিখে মীনাতে যুহরের পরে এক খুতবা দিতে হয়, মধ্যে বসতে হয়না।

হজ্জ আদায়কারী ৮ই যিলহজ্জ ফজর নামায মক্কা শরীফ-এ পড়ে মিনার দিকে রওয়ানা হবে। মিনাতে যুহর, আছর, মাগরিব, ইশা ও ফজর আদায় করবে। অতঃপর সেখান থেকে আরাফার ময়দানে যাবে অর্থাৎ ৯ই যিলহজ্জ আরাফার ময়দানে সারাদিন অবস্থান করবে। আরাফার ময়দানে ইমাম ছাহিব খুতবার মাধ্যমে আরাফার কার্যসমূহ শুরু করবে। খুতবান্তে যুহরের ওয়াক্তে ইমাম ছাহিব এক আযান ও দু’ইকামতে  যুহর ও আছরের নামায পড়াবেন।

যে ব্যক্তি নিজ স্থানে একা একা নামায আদায় করবে সে যুহরের ওয়াক্তে যুহরের নামায, আছরের ওয়াক্তে আছরের নামায আদায় করবে। ইহাই হযরত ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ফতওয়া।

নামাযের পরে আরাফার ময়দানে ওকূফ বা অবস্থান করবে যতটুকু সম্ভব জাবালে রহমতের নিকটে। আরাফার ময়দানে বত্নে আ’রানা ব্যতীত সমস্তটুকুই অবস্থানস্থল।

ওকূফ অবস্থায় ইমাম ছাহিব বাহনের উপর থেকে হাত তুলে দোয়া করবে। আর অন্যান্যরাও যত বেশি সম্ভব দোয়া-ইস্তিগফারে মশগুল থাকবে।

৯ই যিলহজ্জ সূর্যাস্তের পর ইমাম ছাহিব সকলকে নিয়ে সাধারণ গতিতে মুযদালিফায় রওয়ানা হবে। সেখানে কুযা নামক পাহাড় যার উপর মিকাদা রয়েছে তার নিকট অবতরণ করবে। সেখানে ইমাম ছাহিব ইশার ওয়াক্তে একই আযান ও একই ইক্বামতে সকলকে নিয়ে মাগরিব ও ইশার নামায আদায় করবে। এর মধ্যে সুন্নত ও নফল পড়বেনা। পথে যদি কেউ মাগরিব পড়ে তবে সেটা আদায় হবেনা।

বত্নে মুহাস্সার ব্যতীত সকল স্থানই মুযদালিফায় অবস্থানস্থল

ছুবহে ছাদিক হওয়া মাত্রই ইমাম ছাহিব সকলকে নিয়ে অন্ধকার থাকতেই ফজর নামায আদায় করে সকলকে নিয়ে দাঁড়িয়ে দোয়া করবে। আর সূর্যোদয়ের পূর্বে ইমাম ছাহিব তার সাথে সকলকে নিয়ে মিনায় রওয়ানা হবে।

মুযদালিফা হতে মিনায় যাওয়ার পূর্বে বা পথে ৪৯টি বা ৭টি বা ৭০টি কঙ্কর নিয়ে তালবিয়া পাঠ করতে করতে মিনার দিকে রওয়ানা দিবে। ১০ই যিলহজ্জ সকালে শুধুমাত্র মিনাস্থ জমরাতুল আকাবাতে ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। কঙ্কর নিক্ষেপ করতে প্রত্যেকবার তাকবীর বলবে এবং কঙ্কর নিক্ষেপ করার পর সেখানে একটুও দাঁড়াবেনা। আর প্রথম কঙ্কর নিক্ষেপ করার সাথে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করে দিবে।

অতঃপর কুরবানী করতে হবে। যারা শুধু হজ্জে ইফরাদ করবে তাদের জন্য এ কুরবানী করা মুস্তাহাব। আর যারা হজ্জে তামাত্তু ও হজ্জে ক্বিরান করবে তাদের জন্য এ কুরবানী করা ওয়াজিব। যা কুরবানী করতে হবে তা হচ্ছে- এক বকরী অথবা এক দুম্বা অথবা গরু, মহিষ বা উটের এক সপ্তমাংশ।

যদি তামাত্তু ও ক্বিরানকারী আর্থিক অনটনের কারণে ওয়াজিব কুরবানী করতে না পারে তাহলে তাদের জন্য ১০ই যিলহজ্জের পূর্বে ৩টি এবং ১৩ই যিলহজ্জের পরে ৭টি রোযা রাখা ওয়াজিব হবে। যদি ১০ই যিলহজ্জের পূর্বে ৩টি রোযা রাখতে না পারে তাহলে কুরবানী অবশ্যই করতে হবে। কুরবানী করার পর পুরুষেরা মাথা মু-ন করে অথবা চুল ছেঁটে ইহরাম খুলে ফেলবে। মহিলারা চুল মু-ন না করে এক অঙ্গুলি বা এক ইঞ্চি পরিমাণ চুল ছাঁটবে।

এ অবস্থায় মুহরিমের জন্য নির্জন বাস ছাড়া সবই হালাল হয়ে গেলো। একই দিনে অর্থাৎ ১০ই যিলহজ্জে তাওয়াফে যিয়ারত করা উত্তম যা হজ্জের শেষ ফরয। তাওয়াফে যিয়ারত ১২ই যিলহজ্জ সূর্যাস্তের পূর্বে আদায় করতে হবে। অন্যথায় দম দেয়া ওয়াজিব হবে।

১০, ১১ এবং ১২ই যিলহজ্জ তারিখে মিনায় অবস্থান করা সুন্নত। ১১ এবং ১২ই যিলহজ্জ তারিখে মিনার জমরাতুল আকাবা, জমরাতুল উস্তা ও জমরাতুল ঊলাতে পর্যায়ক্রমে ৭টি করে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে। ১০ তারিখে সূর্য ঢলার পূর্বে ১১ ও ১২ তারিখে সূর্য ঢলার পরে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে।

১২ই যিলহজ্জ সূর্যাস্তের পূর্বেই মিনা হতে মক্কা শরীফ-এ চলে আসা যায়। যদি আসতে রাত্র হয়ে যায় তাহলে আসাটা মাকরূহের সাথে জায়িয রয়েছে। আর যদি ১৩ তারিখ সকাল হয়ে যায় তাহলে তিন স্থানে ৭টি করে ২১টি কঙ্কর নিক্ষেপ করে আসতে হবে। এটাই সুন্নত। কঙ্কর নিক্ষেপের সময় হলো সূর্য ঢলার পর হতে সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত।

মিনাতে কঙ্কর নিক্ষেপের জন্য অবস্থান করতঃ মাল-সামানা বা আসবাবপত্র মক্কা শরীফ-এ পাঠিয়ে দেয়া মাকরূহ। মিনাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করা শেষ করে মক্কা শরীফ-এ আসার পথে মুহাস্সার নামক স্থানে কিছুক্ষণ অবস্থান করা সুন্নত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সেখানে যুহর, আছর, মাগরিব ও ইশার নামায আদায় করেছেন। অতঃপর মক্কা শরীফ-এ এসে তাওয়াফে বিদা বা তাওয়াফে ছুদুর করবে। মক্কাবাসী ব্যতীত অন্যান্য সকলের জন্য এ তাওয়াফে বিদা ও তাওয়াফে ছুদূর ওয়াজিব। যাদের উপর তাওয়াফে বিদা বা তাওয়াফে ছুদূর ওয়াজিব তারা এ তাওয়াফ না করলে তাদের জন্য দম দেয়া ওয়াজিব।

যে সমস্ত মহিলারা অসুস্থ হয়ে যায় অর্থাৎ যারা মাজূর হয়ে যায় তাদের জন্য তাওয়াফে ছুদুর ওয়াজিব থাকেনা। এ তাওয়াফ ব্যতীতই তারা বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করবে।

মুহম্মদ এনায়েত হুসাইন

সদর, চাঁদপুর

সুওয়াল : মীক্বাত কাকে বলে?

জাওয়াব : যে স্থান থেকে হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধতে হয় সে স্থানকে মীক্বাত বলে। বাংলাদেশের হাজী ছাহিবরা যেহেতু ইয়েমেন হয়ে হজ্জ করতে যায় সেহেতু ইয়েমেনবাসীর যে মীক্বাত “ইয়ালামলাম” বাংলাদেশীদেরও সেই একই মীক্বাত। আর যদি বাংলাদেশী হাজী ছাহিবরা মদীনা শরীফ হয়ে যায় তাহলে মদীনা শরীফবাসীদের যে মীক্বাত যুলহুলাইফা” সেখান থেকে তাদেরকে ইহরাম বাঁধতে হবে।

এছাড়াও যদি ইরাক হয়ে যায় তাহলে ইরাকবাসীদের যে মীক্বাত যাতে ইরাক” সেখান থেকে ইহরাম বাঁধতে হবে।

আর যদি সিরিয়া হয়ে যায় তাহলে জুহ্ফা” থেকে ইহরাম বাঁধতে হবে যা সিরিয়াবাসীদের মীক্বাত।

আর যদি নজদ হয়ে যায় তাহলে করণ” হতে ইহরাম বাঁধতে হবে যা নজদবাসীদের মীক্বাত।

এছাড়াও আরও মীক্বাত রয়েছে। যারা মীক্বাতের ভিতরের অধিবাসী তাদের মীক্বাত হলো হিল”। মীক্বাত ও হেরেম শরীফ-এর মধ্যবর্তী স্থানকে হিল বলে।

মক্কাবাসীদের হজ্জের জন্য মীক্বাত হলো- হেরেম শরীফ।” আর উমরার জন্য মীক্বাত হলো- হিল।”

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল ও জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব