(ধারাবাহিক)
আমি সে ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, “হে ব্যক্তি! তোমার সামনে আমি কোন নূর দেখতে পাচ্ছিনা বা আলো দেখতে পাচ্ছিনা। তুমি ব্যতীত এই কবরস্থানে যারা রয়েছে সকলের সামনেই নূর বা আলো রয়েছে, তোমার সামনে নেই তার কি কারণ?“ সে ব্যক্তি বললো যে, “হুজুর! কি বলবো, আমি এই কবর স্থানের মধ্যে সবচাইতে লাঞ্ছিত, অপমানিত, অবহেলিত অবস্থায় রয়েছি।” তখন সেই বুযুর্গ ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন স্বপে¦র মধ্যে, “তোমার কি কোন আল আওলাদ নেই? যারা তোমার জন্য দোয়া করবে?” তখন সে ব্যক্তি বললো যে, “সকলের জন্য দোয়া করে তাদের সন্তানরা। যার জন্য তারা এত সুখ-শান্তিতে রয়েছে। হ্যাঁ, আমার একটা সন্তান রয়েছে তবে সে আমার জন্য কোন দোয়াও করে না এবং দান-খয়রাতও করে না, ফলে আমার কাছে কোন নেকীও পৌঁছেনা, তাই আমি লাঞ্ছিত, অবহেলিত এবং অপমানিত অবস্থায় রয়েছি।” তখন সেই বুযুর্গ ব্যক্তি বললেন, “আমি স্বপে¦র মধ্যেই সে লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, আচ্ছা! তোমার যে সন্তান রয়েছে, তার ঠিকানা কি তোমার জানা রয়েছে?” সে বললো, “হ্যাঁ।” “কোথায়?” “ওমুক স্থানে।” “নাম কি?” “ওমুক।” আমি স্বপে¦র মধ্যে তার ঠিকানা এবং নামটা জেনে নিলাম। আমি তাকে বললাম, ঠিক আছে আমি তোমার সন্তানকে তোমার ব্যাপারে বলবো।” এরপর ঘুম ভেঙ্গে গেল। সকাল হলো। ফজর নামাজ পড়ার পর আমি এলাকাবাসীদেরকে ডেকে বললাম যে, “তোমাদের এই কবর স্থানে কাদের কবর রয়েছে?” তারা বললো, “আমাদের এলাকায় যারা মারা গিয়েছে তাদের কবর রয়েছে।” তখন জিজ্ঞাসা করলাম, “শেষ কর্ণারে যে কবরটা রয়েছে, সেটা কার?” তারা বললো যে, “ওমুক ব্যক্তির কবর।” পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, “তার কি কোন ছেলে রয়েছে?” জবাব দিল “হ্যাঁ, তার একটা সন্তান রয়েছে। তবে কোথায় থাকে তার ঠিকানা সুস্পষ্টভাবে আমাদের জানা নেই।” তখন সে বুযুর্গ ব্যক্তি বললেন, “আমার সেটা জানা রয়েছে, এই তার ঠিকানা। তোমরা এক কাজ কর, তাকে সংবাদ দাও, আমার কাছে দেখা করার জন্য তাকে বলো।” সে এলাকার লোকেরা ঠিকানা নিয়ে তাকে সংবাদ দিলো, সে আসলো। আসার পর সে বুযুর্গ ব্যক্তি বর্ণনা করতেছেন যে, “তার সূরত-সিরত দেখে মনে হলো, অবশ্যই সে বেশরা-বেদ্য়াতী লোক হবে।” তাকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম যে,“ তোমার পিতা কোথায়?” সে বললো, “ইন্তেকাল করেছেন।” “কোথায় দাফন করেছো?” “এই কবর স্থানে।” তখন আমি তাকে বললাম যে, “তোমার পিতা যে ইন্তেকাল করেছেন তার কি অবস্থা তুমি কি জান?” সে বললো, “না। সেটা কি করে আমি জানবো, কবরের ভিতরে?” সে বুযুর্গ ব্যক্তি বললেন, “আমি তো জানি, তোমার পিতা খুব কঠিন অবস্থার মধ্যে রয়েছে। তুমি সন্তান হিসেবে জমিনের উপর রয়েছো। তোমার পিতা কষ্টে রয়েছেন।” তখন সে সন্তান পিতার জন্য অনেক কাঁদা-কাটা করলো। তখন আল্লাহ্ পাক-এর ওলী বললেন, “দেখ, তোমার আব্বা এই কবর স্থানে সবচাইতে লাঞ্ছিত, অপমানিত, অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে।
সকলেরই সন্তান রয়েছে তারা দোয়া করে, দান-খয়রাত করে তাদের পিতা-মাতার জন্য। তাই তারা সুখ শান্তিতে রয়েছে। একমাত্র তুমি তোমার পিতার জন্য কোন দোয়া করছো না। যার জন্য তোমার পিতা খুব কঠিন অবস্থায় রয়েছে।” তখন বুযুর্গ ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি কর?” সে প্রথমে বলতে চাচ্ছিল না, শেষ পর্যন্ত সে বললো, “আমি মূলত গান-বাজনা করে থাকি।” (নাউযুবিল্লাহ্) তখন তিনি বললেন, “তুমি খালিছ তওবা কর।” আরো জিজ্ঞাসা করলেন, “নামাজ-কালাম পড় কি?” সে বললো, “জ্বী-না পড়ি না।” পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, “দান-খয়রাত কর?” জবাব দিল, “না।” তিনি বললেন, “তুমি আজ থেকে খালিছ তওবা কর।” এলাকার লোকেরাও তাকে বললো, “তুমি আজকে খালিছ তওবা কর। যেহেতু আল্লাহ্ পাক-এর ওলী এসেছেন, তিনি আবার কবে আসবেন। এখনই তওবা কর।” তাকে তওবা করানো হলো। তওবা করিয়ে বলা হলো, “তুমি আজ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে। প্রত্যেক নামাজের পর দোয়া করবে। আর প্রতিদিন তুমি যা কামাই-রোজগার করবে তা থেকে কিছু দান করবে। তোমার পূর্বের যে পেশা বা ব্যবসা সেটা ছেড়ে দাও। হালাল কামাই করবে, তাতে কমপক্ষে প্রতিদিন কিছু হলেও তোমার পিতা-মাতার জন্য তুমি দান-খয়রাত করবে।” সে ওয়াদাবদ্ধ হলো, খালিছ তওবা করলো। অনেক কাঁদা-কাটি করলো। শত হলেও পিতা। অতঃপর সে চলে গেল।
আল্লাহ্ পাক-এর ওলী আবার বর্ণনা করতেছেন, মাত্র এক সপ্তাহ অতিবাহিত হয়েছে। এক সপ্তাহ যাবৎ আল্লাহ্ পাক-এর ওলী সেখানে অবস্থান করতেছিলেন। ঠিক পরবর্তী বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত্রে অর্থাৎ শুক্রবার জুমার রাত্রে উনি স্বপে¦ দেখলেন। একই স্বপ¦। উনি দেখলেন, সেই কবর স্থানে গিয়েছেন। (বাদ তাহাজ্জুদ) যেয়ে দেখলেন সকলেই আবার পূর্বের মত প্রত্যেকেরই কবরের উপর উঠে বসে আছেন। সকলের সামনে নূরের টুকরা রয়েছে। উনি আবার ঠিক পূর্বের মত এক প্রান্ত থেকে শুরু করে অর্থাৎ দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্ত থেকে শুরু করে হেঁটে হেঁটে এক কাতার এক কাতার করে, সারি সারি করে আবার ঠিক উত্তর-পূর্ব প্রান্তে গিয়ে থামলেন। সেখানে শেষ যে ব্যক্তি ছিল, গত সপ্তাহে যার সন্তানকে তওবা করানো হয়েছিল। সেখানে গিয়ে উনি থামলেন। থেমে তায়াজ্জুব হয়ে গেলেন! উনি বর্ণনা করতেছেন, “প্রত্যেকের সামনে যে নূরের টুকরা ছিল, প্রত্যেকটা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে এক সপ্তাহে, তবে স্বাভাবিক। কিন্তু শেষ প্রান্তে যে লোকটা গত সপ্তাহে দেখেছিলাম, যার সামনে কোন নূর বা আলো নেই। যে লাঞ্ছিত, অপমানিত, অবহেলিত অবস্থায় ছিল, তার সামনে গিয়ে আমি তায়াজ্জুব হয়ে গেলাম! এক পাহাড় পরিমাণ আলো, যে আলোর দিকে দৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছিল না।” আমি দেখে বললাম যে, “হে ব্যক্তি! গত সপ্তাহে তোমাকে দেখলাম এত অপমানিত, লাঞ্ছিত, অবহেলিত অবস্থায়। এক সপ্তাহ মাত্র পার্থক্য। এর মধ্যে তোমার পাহাড় পরিমাণ নূর যা সমস্ত কবর স্থানে যত নূর বা আলো রয়েছে, মনে হয় তার চাইতে বেশি, এত বড় নূর তুমি কোথা থেকে পেলে?” সে ব্যক্তি বললো, “হুজুর! মূলত এটা আপনার দোয়ার বদৌলতে আমি পেয়েছি।” বুযুর্গ ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, “কি হয়েছে?” তখন সে বললো, “আমার ছেলে আপনার কাছে খালিছ তওবা করেছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, প্রতি ওয়াক্তের পর আমার জন্য সে দোয়া করে থাকে, এবং প্রতিদিন সে আমার জন্য কিছু দান-খয়রাতও করে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে আল্লাহ্ পাক আমাকে এই কবর স্থানের মধ্যে সবচাইতে সম্মানিত অবস্থায় রেখেছেন।” (সুবহানাল্লাহ্)
ولد صالح يدعوله.
নেক সন্তান যখন পিতা-মাতার জন্য দোয়া করে, নেক সন্তান যখন পিতা-মাতার জন্য দোয়া করে, আল্লাহ্ পাক সেটা কবুল করেন এবং তার বদলা বা জাযা-খায়ের আল্লাহ্ পাক দান করেন। যেমন আল্লাহ্ পাক এই লোকটাকে দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, আল্লাহ্ পাক কতটুকু কবুল করেন আর কতটুকু দান করেন সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। কাজেই প্রত্যেক সন্তানের দায়িত্ব হচ্ছে, কর্তব্য হচ্ছে, তার পিতা-মাতার জন্য খালিছ ভাবে দোয়া করা এবং সে দোয়ার বদলা অবশ্যই পিতা যেমন পাবেন সন্তানও পাবে। যেটা আল্লাহ্ পাক বলেছেন,
هل جزاء الاحسان الا الاحسان.
“ভাল-এর বদলা কি ভাল ছাড়া হয়।” (সূরা আর রহমান/৬০)
ان احسنتم احسنتم لانفسكم.
“যে অপরের উপকার করে মূলত সে নিজের উপকার করলো।” (সূরা বণী ইসরাঈল/৭)
যদি কেউ তার পিতার জন্য দোয়া করে, অবশ্যই পিতার জন্য তার দোয়া করা দায়িত্ব কর্তব্য রয়েছে। তবে সে পিতার জন্য দোয়া করার কারণে তার নিজেরও ফায়দা হবে। আল্লাহ্ পাক তাকেও তার বদলা দান করবেন। কাজেই সন্তানের দায়িত্ব রয়েছে, পিতার জন্য দোয়া করা তার হক্ব আদায় করা, এটা তার হক্বের অন্তর্ভূক্ত।
যেটা আল্লাহ্ পাক বলেছেন, رب اغفرلى ولوالدى.
যেটা আল্লাহ্ পাক-এর নবী হযরত নূহ আলাইহিস সালাম দোয়া করেছেন আল্লাহ্ পাক-এর কাছে যে, “আল্লাহ্ পাক! আমাকে ক্ষমা করুন, আমার পিতা-মাতাকে ক্ষমা করুন।” (সূরা নূহ/২৮)
কাজেই প্রত্যেক সন্তানের সে দায়িত্ব রয়েছে, পিতা-মাতা চাই জীবিত থাকুক অথবা ইন্তিকাল করুক, খালিছভাবে দোয়া-ইস্তেগ্ফার ও দান-খয়রাত করা। (অসমাপ্ত)
ওয়াজ শরীফ: কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য
ওয়াজ শরীফ: কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য