(ধারাবাহিক)
এ প্রসঙ্গে বলা হয় যে, “যমীনে সবচাইতে প্রথম যে ফিৎনা হয়েছিল সেটাও মেয়ে সংক্রান্ত বিষয়।” যেটা আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লক্ষ্য করে বলেন,
واتل عليهم نبا ابنى ادم بالحق اذ قربا قربانا فتقبل من احدهما ولم يتقبل من الاخر قال لاقتلنك قال انما يتقبل الله من المتقين.
আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন, “হে আমার হাবীব(ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)!
واتل عليهم نبا ابنى ادم بالحق.
“আপনি হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম-এর যে দুই সন্তান ছিল হাবিল এবং কাবিল তাদের সম্পর্কে সত্য সংবাদ তাদেরকে জানিয়ে দিন।”
اذ قربا قربانا فتقبل من احدهما ولم يتقبل من الاخر.
“যখন তারা উভয়ে আল্লাহ্ পাক-এর জন্য কুরবানী করেছিল তখন একজনেরটা কবুল করা হয়েছিল, আরেকজনেরটা কবুল করা হয়নি।”
قال لاقتلنك. “একজন বলেছিল, আমি তোমাকে হত্যা করব বা কতল করব।”
قال انما يتقبل الله من المتقين.
“আরেকজন বলেছিল, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক একমাত্র যারা মুত্তাক্বী, পরহেযগার তাদেরটা কবুল করে থাকেন। এ সম্পর্কে আপনি জানিয়ে দিন।” (সূরা মায়িদা/২৭)
কি সংবাদ? সংবাদ হচ্ছে, “হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম যখন যমীনে আসলেন, হযরত হাওয়া আলাইহাস্ সালামও আসলেন, উনাদের ঘরে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করতো একজন ছেলে, একজন মেয়ে, এক সাথে। তখন শরীয়তের নিয়ম ছিল, যারা একসাথে জন্মগ্রহণ করতো তাদের পরস্পর পরস্পরের মধ্যে বিয়ে-শাদী নিষিদ্ধ, হারাম।”
আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে জানিয়ে দেয়া হলো, “প্রথমবারে যে সন্তান বা যে ছেলে জন্মগ্রহণ করবে, দ্বিতীয়বার যে মেয়ে জন্মগ্রহণ করবে তাদের উভয়ের মধ্যে বিবাহ্ হবে। আর প্রথমবারের মেয়ে দ্বিতীয়বারের ছেলে। এভাবে তাদের বিবাহ্-শাদী হবে।”
হাবিল এবং কাবিল জন্মগ্রহণ করলেন, তাদের সাথেও একজন করে মেয়ে জন্মগ্রহণ করলেন। এদের নাম পর্যায়ক্রমে, ‘গাযা’ বা ‘লিঁউজা’ আর ‘আকলিমা’ অথবা ‘ইকলিমা’ বলা হয়েছে কিতাবে। কাবিলের সাথে যে মেয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তাকে কাবিল বিয়ে করতে চেয়েছিলো কিন্তু আল্লাহ্ পাক-এর নিষেধ ছিল সে মেয়েকে বিয়ে করা। আদেশ ছিল হাবিলের সাথে যে মেয়ে জন্মগ্রহণ করেছে তাকে বিবাহ্ করতে হবে। কিন্তু কাবিল সেটাতে রাজী হচ্ছিলনা। যার কারণে আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে জানিয়ে দেয়া হলো, “আপনি এক কাজ করুন! আপনার ছেলেদ্বয়কে বলে দিন, তারা যেন আল্লাহ্ পাক-এর নামে কিছু কুরবানী করে।”
কি কুরবানী করবে? হাবিল যিনি ছিলেন উনি পশু চড়াতেন, মেষ, দুম্বা ইত্যাদি উনার ছিল। উনাকে বলা হলো, “উনার পছন্দনীয় একটা দুম্বা নিয়ে এক নির্দিষ্টস্থানে রেখে আসার জন্য।” উনি রেখে আসলেন। আর কাবিল সে ক্ষেত-খামারে কাজ করতো, ফসল ফলাতো। তাকে বলা হলো, “তোমার পছন্দনীয় কিছু ফসল নিয়ে সে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে আস। যদি আল্লাহ্ পাক কবুল করেন তাহলে আকাশ থেকে একটা আগুন এসে সেটা জ্বালিয়ে দিবে। যারটা জ্বালিয়ে দেয়া হবে তারটা কবুল করা হলো। সেই কাবিলের সাথে যে মেয়ে জন্মগ্রহণ করেছে তাকে বিয়ে করবে। আর যারটা আগুন জ্বালাবে না সে কাবিলের সাথে যে মেয়ে জন্মগ্রহণ করেছে তাকে বিয়ে করতে পারবেনা।”
সেটাই আল্লাহ্ পাক উল্লেখ করেছেন,
واتل عليهم نبا ابنى ادم بالحق اذ قربا قربانا.
“যখন তারা সেই উৎসর্গ অর্থাৎ কুরবানীর বিষয়গুলো অর্থাৎ প্রাণী এবং শস্য রেখে আসলো,
فتقبل من احدهما ولم يتقبل من الاخر.
“হাবিলেরটা কবুল করা হলো। আকাশ থেকে একটা আগুন এসে তার দুম্বাটা জ্বালিয়ে দিল। কিন্তু কাবিলের যে শস্য বা ফল-ফসল ছিল সেটাকে আগুন জ্বালালো না। যার কারণে দেখা গেল, ব্যাপারটা হাবিলের পক্ষে আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে রায় এসে গেল। কিন্তু এরপরও কাবিল সেটা মানতে নারাজ। সে গোস্বা হয়ে বললো, قال لاقتلنك. “হাবিল আমি তোমাকে হত্যা করবো।” সেটা কাবিল ঘোষণা করলো। তার জবাবে হাবিল অনেক কিছুই বলেছে। প্রথম যা বলেছে সেটা হচ্ছে,
قال انما يتقبل الله من المتقين.
“নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক কবুল করেন, যারা মুত্তাক্বী তাঁদের কুরবানীর বিষয়গুলো। অর্থাৎ প্রাণী বা শস্য যা একমাত্র আল্লাহ্ পাক-এর জন্য করে। অর্থাৎ যারা তাক্বওয়া হাছিল করেছে এবং আল্লাহ্ পাককে ভয় করে। সেটা শুনে কাবিল আরো উত্তেজিত হলো। সে তাকে হত্যা করার জন্য সিদ্ধান্ত নিলো। এরপর আল্লাহ্ পাক উল্লেখ করেন,
فطوعت له نفسه قتل اخيه فقتله فاصبح من الخسرين.
“কাবীলের নফস কাবিলকে উত্তেজিত করেছে, ওয়াস্ওয়াসা দিয়েছে, কু-মন্ত্রণা দিয়েছে” قتل اخيه “তার ভাই হাবিলকে হত্যা করার জন্য।”
فقتله فاصبح من الخسرين. “কাবিল হাবিলকে হত্যা করলো এবং সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেলো।” আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “দেখ, কাবিল হাবিলকে হত্যা করলো। আল্লাহ্ পাক-এর যমীনে সবচাইতে প্রথম যে হত্যা সংঘটিত হলো তা হলো কাবিলের দ্বারা। কাবিল যে হাবিলকে হত্যা করলো এটার একমাত্র কারণ হচ্ছে, মেয়ে সংক্রান্ত বিষয়।” সেটাই আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
فاتقوا الدنيا واتقوا النساء فان اول فتنة بنى اسرائيل كانت فى النساء.
“দুনিয়ার থেকে সতর্ক থাক। মেয়েদের থেকেও সতর্ক থাক। নিশ্চয়ই বণী ইসরাঈলের প্রথম যে ফিৎনা হয়েছিল সেটা মেয়ে সংক্রান্ত।”
অর্থাৎ যমীনে প্রথম যে হত্যা সংঘটিত হয়েছিলো, যে ফিৎনার সৃষ্টি হয়েছিল সেটা মেয়ে সংক্রান্ত। কাজেই এ মেয়ে সংক্রান্ত বিষয়ে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক থাকতে বলেছেন।
হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে,
عن اسامة بن زيد رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ماتركت بعدى فتنة اضر على الرجال من النساء.
“হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আখিরী রসূল হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “আমি আমার পরে এমন কোন জিনিস রেখে যাচ্ছি না, যেটা পুরুষদের জন্য সবচাইতে ক্ষতির কারণ এবং ফিৎনার কারণ। যেটা রেখে যাচ্ছি সেটা হচ্ছে, একমাত্র মেয়ে, মহিলা। আমার পরে পুরুষদের জন্য সবচাইতে ক্ষতির কারণ এবং ফিৎনার কারণ যে বিষয়টা সেটা হচ্ছে মহিলা। কাজেই মহিলা এবং মেয়ে থেকে পুরুষদের সতর্ক এবং সাবধান থাকতে হবে। যার কারণে আল্লাহ্ পাক পর্দা করা ফরয করে দিয়েছেন যে, এর মধ্যে বিরাট ফিৎনা রয়েছে, মারামারি, কাটাকাটি, খুনাখুনি রয়েছে। যার জন্য আল্লাহ্ পাক পর্দা করা ফরয করে দিয়েছেন। আল্লাহ্ পাক কোন হিজরীতে পর্দা করা ফরয করেছেন, মুফাস্সিরীন-ই-কিরাম সে বিষয়ে ইখতিলাফ করেছেন। যারা মুহাক্কিক, মুদাক্কিক তাঁরা ইখতিলাফ করেছেন। তৃতীয় হিজরী থেকে পঞ্চম হিজরীর মধ্যে পর্দা করা ফরয করা হয়েছে এবং একাধিক আয়াত শরীফ আল্লাহ্ পাক নাযিল করেছেন পর্দা ফরয করার জন্য। (অসমাপ্ত)
ওয়াজ শরীফ: কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পর্দার গুরুত্ব-তাৎপর্য, ফাযায়েল-ফযীলত ও হুকুম-আহ্কাম
ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পর্দার গুরুত্ব-তাৎপর্য, ফাযায়েল-ফযীলত ও হুকুম-আহ্কাম
ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পর্দার গুরুত্ব-তাৎপর্য, ফাযায়েল-ফযীলত ও হুকুম-আহ্কাম