(ধারাবাহিক)
একটা বিষয় আমরা ফিকির করলে দেখতে পাই তা হলো, পিতা যদি সন্তানকে নামায শিক্ষা না দেয়, কুরআন শরীফ শিক্ষা না দেয় তাহলে সে সন্তান তো নামায পড়বেনা। যে নামায পড়বেনা সে তো নিজের জন্য দোয়াও করবেনা। যে নামায পড়েনা, নিজের জন্য দোয়া করেনা, সে কি করে তার পিতার জন্য দোয়া করতে পারে? কখনই সম্ভব নয়। যে নিজের জন্য দোয়া করেনা, সে পিতা-মাতার জন্য দোয়া করবে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। নিজে না খেয়ে অপরজনকে খাওয়াবে এ প্রকার কতটা লোক পাওয়া যাবে? যদি কিছু ব্যতিক্রম আল্লাহ্ পাক-এর যমীনে থেকে থাকে সেটা হচ্ছে আলাদা। সাধারণভাবে নিজের জন্য যে দোয়া করেনা, সে অপরের জন্য দোয়া করার প্রশ্নই আসতে পারেনা। কারণ, সে তো নিজেই নামায পড়ছেনা, নিজের জন্যই সে দোয়া করছেনা তাহলে পিতা-মাতার জন্য দোয়া করার সুযোগটা তার কোথায়? কখন সে দোয়া করবে? কঠিন ব্যাপার!
কাজেই সন্তান যখন বুঝবে, সে নিজের জন্য দোয়া করবে, পিতা-মাতার জন্যও সে দোয়া করবে, তখন সন্তান পিতা-মাতার জন্য কাজে আসবে। কাজেই পিতার দায়িত্ব হচ্ছে, সন্তানের হক্বটা যথাযথ আদায় করে দেয়া। তাহলে তার জন্য সে বিষয় বিশ্বাস স্থাপন করা সম্ভব অন্যথায় নয়।
এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, হযরত নু’মান বিন বশির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, হযরত নু’মান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ছাহাবী ছিলেন। উনার পিতা হযরত বশির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুও ছাহাবী ছিলেন। উনি বর্ণনা করেন যে, আমার পিতা একদিন আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গেলেন। গিয়ে বললেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি সাক্ষী থাকুন।” জিজ্ঞাসা করলেন, “কি ব্যাপারে সাক্ষী থাকবো?” “আমার এই ছেলে নু’মান তাকে আমি অনেক কিছু দিয়েছি। অনেক কিছু দান করেছি। যেমন- গোলাম দিয়েছি, ঘোড়া দিয়েছি ইত্যাদি ইত্যাদি।” তখন আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন যে, “তোমার কি আরো সন্তান রয়েছে?” উনি বললেন, “হ্যাঁ, আমার আরো সন্তান রয়েছে।” “তুমি প্রত্যেক সন্তানকে দান করেছো? প্রত্যেক সন্তানকে দিয়েছো?” উনি বললেন যে, “না, আমি প্রত্যেক সন্তানকে দেইনি। শুধু এক সন্তানকে দিয়েছি।” তখন আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন যে, “এই বিষয়ে আমি সাক্ষী থাকতে পারবোনা। তুমি অন্য কাউকে সাক্ষী রাখ। তুমি কি এটা পছন্দ কর, তোমার সন্তান একেকজন একেক রকম ব্যবহার করুক?” “জী-না ইয়া রসূলাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!” “তাহলে তুমি কেন একেক সন্তানের সাথে একেক রকম ব্যবহার করবে? প্রত্যেকের সাথে সমব্যবহার করবে।”
এরপর আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
واتقوا الله واعدلوا فى اولادكم.
“আল্লাহ্ পাককে ভয় কর এবং সন্তানদের ব্যাপারে সমতা রক্ষা কর।” সর্তক থাক, সন্তানদের ব্যাপারে। সতর্ক থাক, প্রত্যেকেরই হক্ব যথাযথ আদায় কর। যার যা প্রাপ্য, যার যতটুকু হক্ব রয়েছে ঠিক সেই হক্বটা তুমি যথাযথ আদায় করবে। সেটাই আল্লাহ্ পাক-এর নির্দেশ এবং আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ।
এ বিষয়ে প্রত্যেককেই সতর্ক থাকতে হবে। সতর্ক না থেকে যদি সে হক্ব যথাযথ আদায় না করে, সে জন্য প্রত্যেককেই জবাবদিহী করতে হবে। প্রত্যেককেই জবাবদিহী করতে হবে। যার যে হক্ব রয়েছে, সন্তানের যত প্রাপ্য রয়েছে পিতা আদায় করে দিবে। তার দ্বীনি ইল্ম শিক্ষার ক্ষেত্রে হোক, তার আমল-আখলাকের ব্যাপারে হোক, অন্যান্য যা বিষয় রয়েছে প্রত্যেকটা বিষয়েই পিতা যেন যথাযথ হক্ব আদায় করে দেয় এবং সন্তানও সেটা আদায় করবে। আর যদি পিতা আদায় করলে সন্তান আদায় না করে তাহলে অবশ্যই সন্তানকে আল্লাহ্ পাক-এর কাছে জবাবদিহী করতে হবে। কঠিন শাস্তির সম্মূখীন হতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, কতটুকু শাস্তি সে সন্তানকে দেয়া হবে।
প্রথমে পিতা সন্তানের হক্ব আদায় করবে। যেহেতু পিতাই সন্তানের অভিভাবক। প্রথমে, সে জন্য তার দায়িত্ব¡। পরবর্তীতে সন্তান পিতার হক্ব আদায় করবে।
এ প্রসঙ্গে বলা হয় যে, আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে উল্লেখ করেছেন যে, “আরব দেশে পূর্ববর্তী যামানায় অনেক সন্তানকেই হত্যা করা হয়েছে। বিশেষ করে মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণ করলে আরব দেশে হত্যা করা হতো।” বলা হয়েছে, অনেক কারণ তার মধ্যে কয়েকটা কারণ প্রসিদ্ধ ছিল।
এক নাম্বার হচ্ছে, মেয়েদেরকে হত্যা করা হতো জিহালতের কারণে, অর্থাৎ মেয়েদের হত্যা করা হতো সেটা হলো, তাদের কোন দেবতার নামে বলি দেয়া হতো, আর বলি দেয়ার জন্য তারা মেয়েদেরকে বেশি পছন্দ করতো।
দুই নাম্বার হচ্ছে, মেয়েদেরকে হত্যা করার কারণ বলা হয়েছে সেটা হচ্ছে, কোন মানুষ তার মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণ করলে সেটা অপমানজনক মনে করতো, লজ্জাজনক মনে করতো।
আর তৃতীয় নাম্বার হচ্ছে, তারা মনে করতো, মেয়েটা যখন বড় হবে তাকে বিয়ে দিতে হবে, স্বামীর ঘরে সে যাবে। সেখানে মেয়ের স্বামীর কাছে আমাকে নিচু হতে হবে। কারণ মেয়ের স্বামীর সাথে যদি আমি ঠিক মত ব্যবহার না করি আমার মেয়ের সাথে সে ভাল ব্যবহার করবেনা। কাজেই মেয়ের স্বামীর কাছে ইচ্ছায় আর অনিচ্ছায় আমাকে কিছু নত হতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি খেয়াল করে আরব দেশের লোকেরা মেয়েদেরকে হত্যা করে ফেলতো।
সেটাই আল্লাহ্ পাক বলে দিয়েছেন কুরআন শরীফে,
ولا تقتلوا اولادكم من املاق نحن نرزقكم واياهم.
“তোমরা সন্তানদেরকে হত্যা করনা। খাওয়া-পরার অভাবে হত্যা করনা। তোমাদেরকে আমি যেমন রিযিক দেই তাদেরকেও তদ্রুপ রিযিক দিব।” (সূরা আনআম/১৫১)
অর্থাৎ সাধারণভাবে হক্ব নষ্ট করা সেটা এক প্রকার। আর হত্যা করে হক্ব নষ্ট করা সেটা হচ্ছে অন্য প্রকার যা বড় কঠিন ব্যাপার। যে কোন অবস্থাতেই তোমরা সন্তানের হক্ব নষ্ট করবেনা, সাধারণভাবেও নয়, আর হত্যা করেও নয়। কারণ রিযিকের জন্য, খাওয়া-পরার জন্য, মান-সম্মানের জন্য তোমরা করে থাক; কিন্তু সমস্ত কিছুর মালিক হচ্ছি আমি আল্লাহ্ পাক। কাজেই আমি সবাইকে সবকিছু দিয়ে থাকি। কাজেই সেই হক্ব নষ্ট করা তোমাদের ঠিক হবেনা।
আল্লাহ্ পাক নিষেধ করে দিয়েছেন সরাসরি কুরআন শরীফে একাধিক আয়াতে যে,
ولا تقتلوا اولادكم خشية املاق نحن نرزقهم واياكم.
“তোমরা সন্তানকে খাওয়া-পরার অভাবে হত্যা করনা। আমি তোমাদেরকে যেমন খাওয়া পরা দিয়ে থাকি ঠিক তাদেরকেও তদ্রুপ দিব।” (সূরা বণী ইসরাঈল/৩১)
প্রত্যেক সন্তান যখন জন্মগ্রহণ করে তখন সে তার রিযিক সাথে নিয়ে আসে অর্থাৎ প্রত্যেকেই তার রিযিক নিয়ে আসে। যেমন, সন্তান যমীনে আসার আগেই আল্লাহ্ পাক মা’র বুকে দুধ দিয়ে দেন। সেখানে কেউ দুধ দেয়না। কিন্তু কুদরতীভাবে আল্লাহ্ পাক সেটা ব্যবস্থা করে দেন। তাই আল্লাহ্ পাক-
هو الرزاق ذو القوة المتين-
“তিনি উত্তম ও শক্তিশালী রিযিকদাতা।” (সূরা জারিয়াত/৫৮)
এটাও তার একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, আরব দেশের লোকেরা সত্যিই হত্যা করে ফেলতো সন্তানদেরকে। বিশেষ সংখ্যক লোকেরাই হত্যা করতো। তবে কিছু সংখ্যক লোক আবার এমনও ছিলেন আল্লাহ্ পাক-এর যমীনে, যারা সেই সমস্ত সন্তান যাদেরকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হতো, তাদেরকে কিনে এনে লালন-পালন করতো।
উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক এলাকা এমন ছিল, যেখানে কোন মহিলার সন্তান হওয়ার সময় হলে দূরে আগুন জ্বালানো হতো। বিশেষ করে কবি ফরজদক-এর দাদা যার নাম ছিল শাহ্শাহ্। সেই ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যে, “তিনি প্রায় তাঁর জীবনে ৯৪টা মেয়েকে মৃত্যু থেকে কিনে এনে হিফাযত করেছেন।”
সে ব্যক্তি উল্লেখ করেছেন যে, “সে সমস্ত মেয়ে সন্তানদের হক্ব তারা নষ্ট করতো এমনভাবে যে, যখন কোন মহিলার সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যেত অর্থাৎ ব্যাথা উঠে যেত তখন একটু দূরে তারা আগুন জ্বালিয়ে দিত। আগেই ব্যবস্থা করে রাখতো। বড় চুলা করে আগুন জ্বালিয়ে দিত। শর্ত ছিল যদি ছেলে সন্তান হয় তাহলে তাকে হিফাযত করা হবে। মেয়ে হওয়ার সাথে সাথে তাকে নিয়ে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে এবং তাই করা হতো।”
সে ব্যক্তি বলেছেন যে, “আমি একবার এমন এক জায়গায় গিয়েছি। হঠাৎ একদিন আমি সফরে গিয়েছি। দেখলাম দূর থেকে আগুনের ধুয়া দেখা যাচ্ছে।” তিনি বললেন, “আমি মনে করেছি প্রথমে, হয়তো কোন ব্যক্তি কোন বিপদে পড়েছে সেজন্য আগুন জ্বালিয়েছে। আমি দেখি তার কোন ব্যবস্থা করা যায় কি-না।” তিনি বললেন, “আমি সেখানে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, কিছু পুরুষ লোক সেখানে বসা আগুনের পাশে এবং সেই গোত্রের যে প্রধান সেও বসা। এই গোত্র প্রধানেরই ছেলের ঘরে সন্তান হবে। জিজ্ঞাসা করলাম, কি ব্যাপার? আপনারা এখানে আগুন জ্বালিয়েছেন, তার কি কারণ?” সে গোত্রের প্রধান তার মেজাজ-মর্জি অন্য রকম, কথা-বার্তা, আচার-আচরণে সে একটা মুতাকাব্বির অর্থাৎ অহংকারী লোক যেমন হয়ে থাকে ঠিক তদ্রুপ। সে প্রথমে উনাকে কোন প্রাধান্যই দিলনা। পরে বললো, “আপনার এখানে কি দরকার রয়েছে? আমাদের যা দরকার সেটা আমরা করছি।” তিনি বললেন, “আমি একটু বিনয় প্রকাশ করে বললাম যে, আপনারা কেন আগুন জ্বালিয়েছেন!” তখন তারা একটু নরম হয়ে বললো যে, “এই অবস্থা, এখন সন্তান হবে, যদি সে মেয়ে হয় আমরা আগুনে ফেলে দিব। আর যদি ছেলে হয় তাহলে তাকে হিফাযত করা হবে। সেজন্য আগুন জ্বালানো হয়েছে।” তিনি বললেন, “আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। ঠিক আছে সন্তান হোক, কি হয় দেখি।” দেখা গেল, সত্যি একটি মেয়ে হলো। তখন তারা বললো, “মেয়েটিকে আগুনে ফেলে দাও।” তখন তিনি বললেন যে, “এক কাজ কর। আমাকে দিয়ে দাও মেয়েটা।” তারা বললো, “তুমি কিনে নাও।” বিনা পয়সায় তারা দিবেনা। কিনে নিতে হবে। “ঠিক আছে কত দাম?” তিনি দাম দিয়ে নিয়ে আসলেন। তিনি বললেন, “এভাবে আমি প্রায় ৯৪টা মেয়েকে হিফাযত করেছি। কিন্তু এছাড়াও শত, সহস্র, লক্ষ লক্ষ মেয়েকে আগুনে জ্বালানো হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে, ছোট বেলায় তো করাই হয়েছে বিশেষ করে জন্মের সময়, সন্তান জন্মগ্রহণ করার সাথে সাথে তারা গলা টিপে মেরে ফেলতো। কেউ বুঝতে পারতো না সেটা। মানুষ মনে করতো স্বাভাবিকভাবেই ইন্তিকাল করেছে। কিন্তু সেখানে গলা টিপেই মেরে ফেলতো।” (অসমাপ্ত)
ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য
ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য
ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য