ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য

সংখ্যা: ৯২তম সংখ্যা | বিভাগ:

(ধারাবাহিক)

          এখন এখানে এ হাদীস শরীফ থেকে যারা ইমাম-মুজতাহিদ উনারা মাসয়ালা বের করেছেন যে, “পিতা যদি কোন সন্তানকে বলে তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেয়ার জন্য তাহলে তালাক দিয়ে দিবে।” প্রশ্ন হচ্ছে, কোন ক্ষেত্রে? হযরত উমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এমন ব্যক্তিত্ব যে, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরে কেউ নবী হলে তিনি নবী হওয়ার যোগ্যতা রাখতেন। কাজেই তিনি ইনছাফ এবং হক্ব সম্পর্কে যতটুকু জানেন বা জানবেন ততটুকু আল্লাহ্ পাক-এর যমীনে আর কেউ জানবে না। সেই ইনছাফ এবং হক্বের উপর ভিত্তি করে তিনি একথা বলেছেন। অতএব, যখন শরীয়তসম্মত হবে তখনই সেটা গ্রহণযোগ্য হবে। আর যখন শরীয়তসম্মত হবেনা তখন সেটা গ্রহণযোগ্য হবেনা। তখন অন্য কোন ব্যবস্থা করে ফায়সালা করার চেষ্টা করতে হবে।

          যেমন এ প্রসঙ্গে বলা হয় যে, আল্লাহ্ পাক-এর নবী হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম যখন হযরত হাজেরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা এবং হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালামকে মক্কা শরীফে রেখে চলে যান। এর পর তিনি মাঝে মাঝে এসে দেখতেন। এদিকে হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালাম যখন বড় হলেন, উনার মাতা যুরহাম গোত্রে উনাকে বিবাহ্ করালেন। হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালামকে বিবাহ্ করালেন উনার মাতা। তাই তিনি সেখানে থাকতেন। মাঝে-মধ্যে এদিক-সেদিক শিকারেও যেতেন অথবা কোন জরুরী কাজেও বের হতেন। একদিন তিনি বের হয়েছেন, তিনি বাড়ীতে ছিলেননা। এদিকে আল্লাহ্ পাক-এর নবী হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম আসলেন ঘোড়ায় চড়ে। এসে সংবাদ নিলেন, “ঘরে কে রয়েছে, ঘরে কেউ নেই?” তিনি দেখলেন, ঘরে একটা মেয়ে রয়েছে। জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কে?” ঐ মেয়ে পরিচয় দিলেন যে, “আমি হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালাম-এর স্ত্রী।” আল্লাহ্ পাক-এর নবী, খলীল হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম জিজ্ঞাসা করলেন, “কেমন আছ তোমরা?” জবাব দিল, “খুব কষ্টে আছি, খুব কষ্টে আছি, খাওয়া-পরা ইত্যাদি অসুবিধা রয়েছে।” “স্বামী তোমার সাথে কেমন ব্যবহার করে থাকেন?” “করেন এক রকম।” কথাগুলো হালকা হালকা ছিল যা আল্লাহ্ পাক-এর নবী হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালাম-এর যে শান ও মর্যাদা সে অনুযায়ী ছিলনা।  বেশকিছু আলোচনা করলেন কিন্তু সেই বৃদ্ধ লোকটাকে সেই মহিলা চিনলোনা যে, তিনি আল্লাহ্ পাক-এর খলীল, হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম। শেষ পর্যন্ত তিনি কিছুক্ষণ সেই ঘোড়ার উপর থেকে  (আল্লাহ্ পাক-এর নির্দেশ ছিলো যে, “আপনি নামতে পারবেন না। ঘোড়ার উপর ছওয়ার অবস্থায় সংবাদ নিতে হবে।)” সংবাদ নিলেন; কিন্তু সেই মহিলা অর্থাৎ হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালাম-এর স্ত্রী কিছুই বললেননা।  হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম শেষ পর্যন্ত বললেন, “এক কাজ কর, আমি চলে যাচ্ছি। তোমার স্বামী আসলে বলো যে, এ ধরণের একজন বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন, উনি এসে বলে গেছেন যে, আপনাকে অর্থাৎ হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালামকে, “আপনার ঘরের চৌকাঠটা পালটিয়ে ফেলতে হবে। কারণ চৌকাঠটা ভাল নয়, তাই পালটিয়ে ফেলতে হবে।” একথা বলে উনি চলে গেলেন। এদিকে আল্লাহ্ পাক-এর নবী হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালাম আসলেন। আসার পর উনার স্ত্রী সংবাদ দিলো যে, “একজন লোক এসেছিলেন, বৃদ্ধ লোক, এরকম আকার-আকৃতি মুবারক। আল্লাহ্ পাক-এর নবী হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালাম চিনতে পারলেন যে, “উনার পিতা এসেছিলেন।” শুনে তিনি বললেন, “আমার পিতাকে তুমি তা’যীম-তাকরীম করলেনা? খেদমত করলে না?” স্ত্রী বললো, “উনি নামেননি, কাজেই আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব ছিলনা। তাই আমি কিছু করিনি।” তখন হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালাম জিজ্ঞাসা করলেন, “তিনি কি বলেছেন?” তিনি বলেছেন, “কেমন আছ?” আমি বলেছি, “কষ্টে আমাদের দিন যাপন হচ্ছে, কিছু অসুবিধাও রয়েছে নানান দিক থেকে।” তিনি কি বললেন? তিনি বললেন যে, “ঘরের চৌকাঠ পাল্টানোর জন্য। আমি যেন আপনাকে বলি, আপনার ঘরের চৌকাঠটা পালটিয়ে ফেলার জন্য।” তখন আল্লাহ্ পাক-এর নবী হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালাম বললেন যে, “দেখ! আমার পিতা এসেছিলেন। তিনি আল্লাহ্ পাক-এর খলীল হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম। তিনি বলেছেন, “চৌকাঠ পাল্টানোর জন্য। অর্থাৎ তোমাকে তালাক দিয়ে দেয়ার জন্য। কাজেই আমি তোমাকে তালাক দিয়ে দিলাম।” বলে তালাক দিয়ে দিলেন সাথে সাথে। তালাক দিয়ে দেয়া হলো। স্ত্রী চলে গেল। হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালাম আরেকটা বিবাহ্ করলেন। দ্বিতীয় বিবাহ্রে বেশ কিছুদিন পর আল্লাহ্ পাক-এর খলীল হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম আবার আসলেন। এসে উনি উনার সেই নিয়ম অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর নির্দেশ “আপনি ছওয়ারী থেকে নামতে পারবেন না।” উনি সেই ছওয়ারীতে চড়ে ঘরের সামনে আসলেন। সেদিনও আল্লাহ্ পাক-এর নবী হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালাম ছিলেন না। উনার দ্বিতীয় স্ত্রী ঘরে অবস্থান করতেছিলেন। যখন ঘরের সামনে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম থামলেন, উনার স্ত্রী দৌঁড়ে আসলেন, এসে আদবের সহিত জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কাকে চাচ্ছেন?” তিনি বললেন, “আমি হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালামকে চাচ্ছি।”  উনার স্ত্রী বললেন, “দেখে মনে হচ্ছে আপনার আকার-আকৃতি, চেহারা মুবারক উনার অনুরূপ। আপনি কি উনার পিতা?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ আমি উনার পিতা।” হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালাম-এর স্ত্রী আরজু করলেন, কাকুতি-মিনতি করলেন, “আপনি দয়া করে একটু নামুন আমাদের এখানে, আমি একটু খেদমত করি আপনার।” উনি বললেন, “আমার প্রতি আল্লাহ্ পাক-এর আদেশ নেই নীচে নামার।” তখন হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালাম-এর স্ত্রী “কিছু পানি এনে বললেন, “আমার খেদমত করার তেমন কিছু নেই।” বলে পানি দিয়ে উনার পা মুবারক ধোয়ায়ে দিলেন। ধোয়ায়ে দিয়ে উনার চুল দিয়ে পা মুবারক মুছে দিলেন। মুছে দেয়ার পর হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম জিজ্ঞাসা করলেন যে, “তোমরা এখন কেমন আছ?” উনি বললেন, “আল্লাহ্ পাক খুব সুখে রেখেছেন, শান্তিতে রেখেছেন। সব দিক থেকে আমরা এত্মিনান, কোন অসুবিধা নেই।” যখন উনার স্ত্রী সে প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিলেন, উনি বললেন যে, “ঠিক আছে আমি চলে যাচ্ছি। আমি তোমাদের জন্য দোয়া করতেছি। তবে তোমার স্বামী আসলে বলবে যে, “আমি এসেছিলাম এবং আমি বলে গেছি যেন ঘরের চৌকাঠ আর পাল্টানো না হয়। উত্তম চৌকাঠ হয়েছে এবার। চৌকাঠ যেন পাল্টানো না হয়। এটা তোমার স্বামীকে বলে দিও।” উনি বলে চলে গেলেন। হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালাম আসলেন। এসে যখন পৌঁছলেন, তখন উনার স্ত্রী বললেন, উক্ত ঘটনা শেষ পর্যন্ত। এটাও বললেন যে, “উনি বলে গেছেন আপনাকে আপনি যেন আপনার ঘরের চৌকাঠ না পাল্টান। অর্থাৎ “চৌকাঠ নাকি খুব ভাল হয়েছে।” আল্লাহ্ পাক-এর নবী হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালাম বললেন যে, “হ্যাঁ, এর অর্থ কি তুমি বুঝতে পেরেছ?” উনি বলেছেন, “তোমার কথা। তোমাকে যেন তালাক না দেয়া হয়, তোমাকে নিয়ে যেন আমি ঘর-সংসার করি।” এবং হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালাম সেই স্ত্রীকে নিয়েই ঘর-সংসার করেছিলেন।

          কাজেই সন্তানকে যদি শরীয়তসম্মত নির্দেশ দেয়া হয় তা অবশ্যই তাকে পালন করতে হবে। আর যদি শরীয়তের খেলাফ আদেশ-নির্দেশ করা হয় তখন তা পালন করা সন্তানের দায়িত্ব থাকেনা। যেহেতু হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম আল্লাহ্ পাক-এর নবী ছিলেন। ওহী ছাড়া তিনি কোন কাজ করতেননা। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন তিনি পাল্টিয়েছেন।

          অতএব, সন্তানের প্রতি পিতার হক্ব রয়েছে অনেক এবং পিতার প্রতি সন্তানের হক্বও রয়েছে। তাই প্রত্যেকেরই সেটা যথাযথ আদায় করতে হবে। এর খেলাফ করলে প্রত্যেককেই আল্লাহ্ পাক-এর কাছে জবাবদিহী করতে হবে।

সন্তানের হক্ব ও পিতার হক্ব প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে দিয়েছেন,

مروا اولادكم بالصلوة وهم ابناء سبع سنين واضربوهم عليها وهم ابناء عشر سنين وفرقوا بينهم فى المضاجع.

“তোমরা আদেশ কর। আদেশ কর তোমাদের সন্তানদেরকে নামাযের জন্য। যখন বয়স সাত বৎসর হয়ে যাবে, আর দশ বৎসর হলে যদি সে নামায আদায় না করে তাহলে তাকে শাস্তি দাও এবং তার বিছানা আলাদা করে দাও। আল্লাহ্ পাক-এর রসূল আদেশ করেছেন, নির্দেশ দিয়েছেন যে, পিতার হক্ব হচ্ছে সন্তানের যা শরয়ী দায়িত্ব-কর্তব্য, সেটা পালন করানো সন্তানকে দিয়ে।” (অসমাপ্ত)

সম্পাদকীয়

ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য

ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য

ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য

খলীফাতুল্লাহ, খলীফাতু রসূলিল্লাহ, ছাহিবু সাইয়্যিদি সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ, ছাহিবে নেয়ামত, আল মালিক, আল মাখদূম, কুতুবুল আলম, গাউছুল আ’যম, মুজাদ্দিদে আ’যম, মুহইউস সুন্নাহ, মাহিউল বিদয়াত, আযীযুয যামান, ক্বইউমুয যামান, ইমামুল আইম্মাহ, আস সাফফাহ, আল জাব্বারিউল আউওয়াল, আল ক্বউইউল আউওয়াল, হাবীবুল্লাহ, মুত্বহ্হার, মুত্বহ্হির, আহলু বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ক্বায়িম মাক্বামে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, মাওলানা মামদূহ মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র ওয়াজ শরীফ মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের আলোকে- মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হজ্জ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র উমরা উনাদের ফাযায়িল-ফযীলত, হুকুম-আহকাম সম্পর্কে (৩৩)