মাওলানা, মুফ্তী, মুহাদ্দিস, মুহম্মদ শরীয়তুল্লাহ্ আল মাদানী
تنظفوا بكل ما استطعتم فان الله بنى الاسلام على النظافة ولن يدخل الجنة الا كل نظيف.
অর্থঃ- “যা দিয়ে সম্ভব হোক তোমরা পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন কর। কেননা আল্লাহ্ তায়ালা পরিচ্ছন্নতার ভিত্তির উপরেই ইসলামকে স্থাপন করেছেন। আর জান্নাতে কেবল পবিত্র-পরিচ্ছন্ন লোকেরাই প্রবেশ করবে।” (আল খাফফাজী ফি শরহিশ শেফা)
সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শরীর মুবারকের পরিচর্যা ও বাহ্যিক পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
শরীর মুবারকের পরিচর্যার ক্ষেত্রে গুরুত্ব প্রদানঃ রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ শরীর মুবারক-এর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সর্বদা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে সদা সতর্ক ছিলেন। এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমদেরকেও শরীরের পরিচর্যার জন্য নির্দেশ দিতেন। তিনি তাই প্রত্যেক জুমুয়ার দিন অবশ্যই গোসল করতেন এবং খাবারের পূর্বে এবং পরে দুহাত ধুয়ে নিতেন। আর প্রতিনিয়ত মেসওয়াক করার প্রতি যত¦বান থাকতেন। তিনি মোচ খাটো করা, নখ কেটে ফেলা, বগলের লোম উপড়িয়ে ফেলা এবং নাভীর নীচের লোম ক্ষুর ব্যবহারে চেঁছে ফেলতেন। পাক-পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে তিনি বলতেন
ان الله طيب يحب الطيب، نظيف يحب النظافة، كريم يحب الكرم، جواد يحب الجود.
অর্থঃ- “নিশ্চিতভাবে আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র। পবিত্রতাকে তিনি ভালবাসেন, তিনি পরিচ্ছন্ন এবং পরিচ্ছন্নতাকে ভালবাসেন, তিনি দয়ালু-দয়া অনুগ্রহকে ভালবাসেন, তিনি দানশীল, দানশীলতাকে তিনি পছন্দ করেন।” (তিরমিযী শরীফ)
হাবীবুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শরীর মুবারকের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার এক বিরাট দলীল হচ্ছে এই যে তাঁর ঘাম মুবারক সুগন্ধি হতে উত্তম ছিল। তিনি যে পথে চলতেন তাঁর শরীর মুবারকের সুগন্ধে সে পথ সুঘ্রাণে পরিপূর্ণ হয়ে যেতো। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে এটা তাঁর খাস বৈশিষ্ট্য ছিল।
চুল মুবারকের পরিচর্যাঃ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর চুল মুবারকের পরিচর্যার জন্যে নিয়মিত তা পরিস্কার করতেন, চিরুনী করতেন ও চুল বিন্যাস করতেন। আনাস বিন মালেক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন,
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يكثر دهن راسه وتسريح لحيته، ويكثر القناع.
অর্থঃ- “রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মাথা মুবারকে অধিক পরিমাণে তেল ব্যবহার করতেন এবং দাড়ী মুবারক (চিরুনী দিয়ে বিন্যাস করতেন। আর অনেক সময় পাগড়ীতে তেল লেগে যাওয়া হতে হিফাযতের জন্য মাথার উপর এক টুকরা কাপড় ব্যবহার করতেন। (মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল ইনসান আল কামিল)
চোখ মুবারক-এর পরিচ্ছন্নতা বিধানঃ হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন,
أن النبى صلى الله عليه وسلم كان له مكحلة يكتحل منها كل ليلة، ثلاثة فى هذء وثلاثة فى هذه.
অর্থঃ- “নবীজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি সুরমাদানী ছিল। তা থেকে তিনি প্রতি রাতে চোখ মুবারকে সুরমা ব্যবহার করতেন। এক চোখে তিনবার আর অন্য চোখে তিনবার। (প্রাগুক্ত)
দাঁত শরীফের পরিচ্ছন্নতাঃ ইমামুল আম্বিয়া, মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদ্য গ্রহণের পর দাঁত মুবারক খিলাল করতেন এবং বলতেন-
حبذ المتخللون من امتى.
অর্থঃ- “আমার উম্মতের খিলালকারীগণ কতই না চমৎকার।”
তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো- ইয়া রসূলাল্লাহ্! “মুতাখাল্লেলুন” কি? তিনি ইরশাদ করলেন-
المتخللون فى الوضوء والمتخللون فى الطعام.
“ওজু এবং খাদ্যের ক্ষেত্রে খিলালকারীগণ!” ওজুর ক্ষেত্রে খিলাল করা হচ্ছে মজমজা (কুল্লী) করা এবং ইসতেনশাক (নাকে পানি দেয়া) করা সহ অঙ্গুলী সমূহ খিলাল করা। আর আহারের পরে দাঁতে খিলাল করা। কেননা নামায আদায়ের সময় মু’মিনের দাঁতের ফাঁকে লেগে থাকা খাদ্যাংশ সঙ্গী ফেরেশতাদের নিকট অত্যন্ত কষ্টদায়ক। (তিবরাণী ফিল কাবীর) ইমাম আহমদ রহমতুল্লাহি আলাইহিও উক্ত বর্ণনা দিয়েছেন সংক্ষিপ্তাকারে।
আর দাঁতের পরিচর্যার জন্য রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিনিয়ত মেসওয়াক করতেন। নামাযের সময়, ওজু করার সময়, ঘুমানোর পূর্বে ঘুম থেকে উঠে, বাড়ীতে প্রবেশের সময়, কোথাও বের হবার সময়। বরং তিনি মিসওয়াক ব্যবহারের নির্দেশ দিতেন এবং উৎসাহিত করতেন এবং বলতেন,
السواك مطهرة للفم ومرضاة للرب.
অর্থঃ- “মিসওয়াক হচ্ছে মুখের পবিত্রতার জন্য এবং আল্লাহ্তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য।
তিনি আরো বলতেন,
لولا ان أشق على أمتى لأمرتهم بالسواك مع كل صلاة.
অর্থঃ- “কঠিন হবে মনে না করলে, আমি তাদেরকে প্রত্যেক নামাযের জন্য মিসওয়াক করতে নির্দেশ দিতাম।” (বুখারী)
পোশাক ও বাহ্যিক সৌন্দর্যের পরিচ্ছন্নতাঃ রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জন্য বর্ণনা করেছেন যে বাহ্যিক অবয়বের সৌন্দর্যবর্ধন এবং উত্তম পরিধেয় ব্যবহার আম্বিয়া আলাইহিমুস্ সালামদের মূল বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত। (তিরমিযী ও মালেক)
আমাদের আঁকা, আমাদের নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হচ্ছেন সাইয়্যিদুল আম্বিয়া। আর সেহেতু আল্লাহ্-এর সৃষ্টিকুলের মধ্যে সর্বাধিক পবিত্র, পরিচ্ছন্নতার অধিকারী ছিলেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, “এই ব্যক্তির (রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ন্যায় আর কাউকে উত্তম চেহারা বিশিষ্ট এবং পরিস্কার বস্ত্র পরিহিত দেখিনি। (তিবরানী) তিনি বলতেন-
ان الله اذا انعم على عبد نعمة يحب أن يرى اثر نعمته على عبده.
অর্থঃ- “আল্লাহ্ তায়ালা যখন তাঁর কোন বান্দার উপর নিয়ামত দেন তখন তিনি বান্দার উপর তার বহিঃপ্রকাশ দেখতে পছন্দ করেন।” (তিবরানী ও বায়হাকী)
তিনি আরো বলেছেন,
ان من كرامة المؤمن على الله نقاء ثوبه ورضاه باليسر.
অর্থঃ- “আল্লাহ্র নিকট মু’মিনের একটি মর্যাদার বিষয় হচ্ছে তার পোশাকের পরিচ্ছন্নতা এবং অল্পে সন্তুষ্টি।” (তিবরানী, আবু নাঈম)
মহানবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাপড় ময়লাযুক্ত করা থেকে বারণ করতেন এবং মাটি হতে তা উর্ধ্বে উঠাতে নির্দেশ দিতেন এবং বলতেন,
ارفع ازارك فانه انقى وأبقى.
অর্থঃ- “তোমার লুঙ্গীকে উঁচু কর, কেননা তাতে অধিক পবিত্রতা ও দীর্ঘস্থায়ীত্ব রয়েছে।” (আল ইনসানুল কামিল/ ২৬)
বাসগৃহের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতাঃ প্রিয়নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ বাসভবনের পরিচ্ছন্নতার প্রতি দৃষ্টি রাখতেন এবং পরিস্কার রাখার জন্য উদ্দীপ্ত করতেন। তেমনি লোকদেরকেও বাড়ীঘর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে নির্দেশ দিতেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, “তোমরা তোমাদের বাড়ীর উঠানকে পরিচ্ছন্ন রাখ।”
মসজিদের পরিচ্ছন্নতাঃ তিনি মসজিদের পবিত্রতা ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি তীক্ষè নজর রাখতেন। আর মসজিদ পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে নিয়োজিত লোকের উপর খুব খুশী হতেন। সে জন্যই যখন মসজিদ পরিস্কার-পরিচ্ছন্নকারিনী সেই মহিলা মৃত্যুবরণ করলো এবং লোকেরা দাফন করে দেয়ার পর রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে সম্পর্কে জানতে পারলেন, তখন তিনি দুঃখিত হন এবং বলেন- هلا اذنتمونى؟
অর্থঃ- “তোমরা কেন আমাকে জানালেনা? “অতঃপর তিনি ঐ মহিলার কবরের পাশে গিয়ে নামাযে জানাযা আদায় করলেন।
মসজিদের পবিত্রতার জন্য সুগন্ধি ধোঁয়া দেবার নিমিত্তে নাঈম আল মুজমের নামে এক ব্যক্তি নিয়োজিত ছিলেন। শুধু মসজিদে নববী শরীফের পবিত্রতা-ই নয়, বরং এ পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার হুকুম সব মসজিদের জন্য সাধারণভাবে দিয়েছেন। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বাড়ীতে মসজিদ বানাতে (বাড়ীতে নামাযের স্থান) নির্দেশ দিয়েছেন এবং তা পরিস্কার ও পবিত্র রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন।” (তিরমিযী)
এছাড়া মসজিদে কফ, থু থু নিক্ষেপ করতে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এমনকি ক্ষুদ্র খড়কুটা, বা ময়লা হতেও মসজিদকে পরিস্কার রাখার নির্দেশ এসেছে। আর এই ক্ষুদ্র খড় কুটা পরিস্কার করাতেও বিরাট নেকীর ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
অথচ অধুনা একদল লোক বেরিয়েছে তারা মসজিদকে রান্নাবান্না করার স্থান এবং বিশ্রামাগার বানিয়ে যেন আবাসিক হোটেলে পরিণত করেছে। আল্লাহ্ তায়ালা তাদেরকে হিদায়েত দিন।
মূলতঃ রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে সৌন্দর্যমন্ডিত হতেন এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমগণকে সৌন্দর্যমন্ডিত হতে উৎসাহিত করতেন এবং বলতেন,
ان الله جميل يحب الجمال.
অর্থঃ- “নিশ্চিই আল্লাহ্ তায়ালা সৌন্দর্যশীল, সৌন্দর্যশীলদের তিনি ভালবাসেন।” (আমীন)