-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ শোয়াইব আহমদ
আরবী মাসের দ্বিতীয় মাস হচ্ছে ছফর। ফযীলত ও বুযুর্গীর ক্ষেত্রে এ মাসটিও এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ঈমানদার বান্দাদের জন্য এ মাসেও ইবাদত-বন্দেগী করে আল্লাহ্ পাক-এর রেজামন্দী-সন্তুষ্টি হাছিল করার যথেষ্ট সুযোগ নিহিত রয়েছে।
এ মাসেই মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ উৎস “আখিরী চাহার শোম্বা” দিনটি পালিত হয়। “আখির” শব্দটি আরবী। এর অর্থ- শেষ। আর “চাহার শোম্বা” হচ্ছে ফার্সী। এর অর্থ- বুধবার। আরবী ও ফার্সী শব্দের সংমিশ্রনে “আখিরী চাহার শোম্বা” বলতে ছফর মাসে শেষ বুধবারকে বুঝানো হয়ে থাকে। মূলতঃ এ দিনটি মুসলিম উম্মাহ্র জন্য খুশীর দিন।
এ মুবারক দিনটির ফযীলত সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিদায়ের পূর্ববর্তী মাসের অর্থাৎ ছফর মাসের তৃতীত সপ্তাহে তিনি ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দিন দিন তাঁর অসুস্থতা বাড়তেই থাকে। কিন্তু এই মাসের ২৮ তারিখ বুধবার দিন ভোর বেলা ঘুম থেকে জেগে তিনি বললেন, ‘ওগো! আমার নিকট কে আছ?’ এ কথা শুনা মাত্রই উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা ছুটে আসলেন এবং বললেন, ‘ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার মাতা-পিতা আপনার জন্য কুরবান হোক। আমি হাযির আছি।’ তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “হে আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা! আমার মাথা বেদনা দূর হয়ে গেছে এবং শরীরও বেশ হালকা মনে হচ্ছে। আমি আজ বেশ সুস্থতা বোধ করছি।’ এ কথা শুনে হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং তাড়াতাড়ি পানি আনয়ন করে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাথা মুবারক ধুয়ে দিলেন এবং সমস্ত শরীর মুবারকে পানি ঢেলে ভালভাবে গোসল করিয়ে দিলেন।
এই গোসলের ফলে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম-এর শরীর মুবারক হতে বহু দিনের রোগজনিত ক্লান্তি ও অবসাদ অনেকাংশে দূর হয়ে গেল। তারপর তিনি বললেন, “হে আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা! ঘরে কোন কিছু খাবার আছে কি?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘জী-হ্যাঁ, কিছু রুটি পাকানো আছে।’ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আমার জন্য তা নিয়ে আস আর হযরত মা ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাকে খবর দাও, সে যেন তাঁর দু’পুত্র হযরত হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে সঙ্গে নিয়ে তাড়াতাড়ি আমার নিকট চলে আসে।
হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হযরত ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাকে সংবাদ দিলেন এবং ঘরে যে খাবার তৈরি ছিল তা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট পেশ করলেন।
হযরত ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা পুত্রদ্বয়কে নিয়ে নবী পাক ছল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটে হাযির হলেন। নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মা ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাকে নিজের গলার সাথে জড়িয়ে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিলেন, নাতীদ্বয়ের কপালে চুমো খেলেন এবং তাঁদেরকে সাথে নিয়ে আহারে বসলেন। কয়েক লোকমা খাবার গ্রহণ করার পর অন্যান্য উম্মুল মু’মিনীন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুন্নাগণ খিদমতে এসে হাযির হলেন এবং বিশিষ্ট ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণও তথায় উপস্থিত হলেন। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘হে ছাহাবীগণ! আমার বিদায়ের পর তোমাদের অবস্থা কিরূপ হবে?’ এ কথা শুনে ছাহাবীগণ ব্যাকুলচিত্তে কান্না শুরু করলেন। তাঁদের এ অবস্থা দেখে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদেরকে সান্তনা দান করলেন। অতঃপর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে নববী শরীফে গমন করলেন এবং ওয়াক্তিয়া নামাযের ইমামতি করলেন।
হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দীর্ঘদিন অসুস্থতার পর সুস্থ দেহ মুবারকে মসজিদে নববী শরীফে আগমন করেছেন এবং নামাযের ইমামতি করেছেন এই অপার আনন্দে ছাহাবীগণ নিজ নিজ সামর্থ অনুসারে অনেক কিুছ দান-খয়রাত করলেন।
কোন কোন বর্ণনায় জানা যায় যে, খুশীতে বাগবাগ হয়ে হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সাত হাজার দীনার, হযরত ওমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু পাঁচ হাজার দীনার, হযরত ওসমান যুন্ নূরাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু দশ হাজার দীনার, হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিন হাজার দীনার, হযরত আর্ব্দু রহমান ইবনে আউফ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একশত উট ও একশত ঘোড়া আল্লাহ্ পাক-এর রাস্তায় দান করলেন।
ছাহাবীগণের নীতি অনুসরণে মুসলমানগণও যুগ যুগ ধরে “আখিরী চাহার শোম্বা” পালন করে আসছে। কালামুল্লাহ্ শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
والذين اتبعو هم باحسان رضى الله عنهم-
অর্থঃ- “যারা ছাহাবীগণকে উত্তমভাবে অনুসরণ করে আল্লাহ্ পাক তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট।” (সূরা তওবা/১০০)
মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ-সম্মানিত রবীউছ ছানী শরীফ মাস এবং উনাদের প্রাসঙ্গিক আলোচনা