মুহম্মদ নূরুল হুদা
من صلى على صلوة واحدة صلى الله عليه عشرا.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি আমার প্রতি এক বার ছলাত বা দরূদ শরীফ পাঠ করবে। আল্লাহ্ পাক তাঁর প্রতি দশটি রহমত নাযিল করবেন।” (মিশকাত শরীফ)
হযরত শাহ্ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি বিরোচিত “জয্বুল কূলুব” কিতাবের সতের অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদে লিখা আছে, “দরূদ শরীফ পাঠকারীর সমস্ত কষ্ট সহজ হয়ে যায়, প্রয়োজন পূর্ণ হয়, গুণাহ্ ক্ষমা করে দেয়া হয়, সমন্ত মন্দ কাজের কাফ্ফারা (ক্ষতিপূরণ) হয়ে যায়, তার দুঃখণ্ডবেদনা, চিন্তা-অস্থিরতা দূর হয়ে যায়, রোগের শিফা (আরোগ্য) হয়, ভয়-ভীতি দূর হয়ে যায়। যদি কেউ গুণাহ্র মধ্যে অভিযুক্ত হয়ে পড়ে তবে তাকে ঐ গুণাহ্ হতে পাক-পবিত্র করে, দুশমনদের উপর জয়ী করে, আল্লাহ্ তায়ালা তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন। আল্লাহ্ পাক-এর মুহব্বত তার মধ্যে সৃষ্টি হবে, ফেরেশ্তাগণ তার জন্য দোয়া করবেন। তার আমল ও মাল পাক হবে ও বৃদ্ধি হবে। তার দেহ পাক হবে। অন্তর পরিস্কার হবে, মনের অস্থিরতা দূর ও সমস্ত কাজে বরকত হবে, এমনকি আসবাবপত্রের মধ্যে, সন্তান-সন্ততির মধ্যে এবং তার সন্তানদের মধ্যে চার বংশ পর্যন্ত ক্বিয়ামতের কষ্ট হতে মুক্তি পাবে। আর মৃত্যুর কষ্ট সহজ হবে, দুনিয়ার কষ্ট-যাতনা, অভাব-অনটন হতে মুক্তি পাবে। ভুলে যাওয়া বস্তু স্মরণ হবে, কৃপণতা ও অত্যাচার হতে বেঁচে থাকবে। কেননা, হাদীস শরীফে আছে, “যে ব্যক্তি রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আলোচনা হওয়ার সময় তাঁর উপর দরূদ শরীফ না পড়বে সে কৃপণ, এমনকি সে যেন তাঁর উপর অত্যাচার করলো।”
“জয্বুল কূলুব” কিতাবের সতের অধ্যায়ের, দ্বিতীয় পরিচ্ছদে লিখা আছে, “হযরত ছাখাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ (হাদীসবিদ) (আল্লাহ্ পাক তাঁদের উপর রহমত বর্ষণ করুন) হযরত সায়ীদ ইবনে মাতরাফ রহমতুল্লাহি আলাইহি সম্বন্ধে বর্ণনা করেছেন, “তাঁর শয়নের পূর্বে দরূদ শরীফ পড়ার মধ্যে কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিলনা। অর্থাৎ যতটুকু সম্ভব রাত্রে শোয়ার পূর্বে সর্বদা দরূদ শরীফ পাঠ করতেন। একদিন রাত্রে হযরত সায়ীদ ইবনে মাতরাফ রহমতুল্লাহি আলাইহি স্বপ্নে দেখলেন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ঘরে তাশরীফ এনেছেন এবং নিজের জামাল ও কামালের নূরে সমস্ত ঘরকে আলোকিত করেছেন এবং তাঁকে বললেন, “তোমার মুখকে আমার সম্মুখে আন, যে মুখ দিয়ে তুমি দরূদ শরীফ পগে খাক আমি তাতে চুমু দিব।” তখন হযরত সায়ীদ ইবনে মাতরাফ রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, ”আমার মুখ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুখ মুবারকের সম্মুখে আনতে লজ্জাবোধ হলো। সুতরাং আমি আমার গালের দিকটা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মুখে বাড়িয়ে দিলাম। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার গন্ডদেশে চুমু দিলেন। অতঃপর নিদ্রা হতে জেগে দেখলাম সমস্ত ঘর মেশ্ক আম্বরের সুগন্ধে মোহিত হয়ে গেছে। আর আটদিন পর্যন্ত আমার গন্ডদেশে হতে মেশ্ক আম্বরের সুগন্ধ আসত।”
হযরত শেখ আহমদ ইবনে আবু বকর রওয়াদ ছূফী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত আব্দুল হক্ব মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজের কিতাবে শেখ মজদুদ্দীন ফিরুজাবাদী হতে সনদসহ বর্ণনা করেছেন, আক্নসি বর্ণনা করেছেন, “একদিন হযরত শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত আবু বকর মুজাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর খিদমতে আসলেন। হযরত আবূ বকর মুজাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁকে সম্মান দেখাবার জন্য দাঁড়ালেন এবং তাঁর সঙ্গে মুয়ানাকা করলেন আর তাঁর দুই চক্ষুর মধ্যস্থলে চুমু দিলেন। তখন আমি বললাম, হে সায়ীদ! আপনি হযরত শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে এমন সম্মান করলেন ব্যাপার কি? এমনকি আপনি নিজে এবং বাগদাদের সমস্ত লোকেরা জানে যে, সে একজন পাগল। তখন হযরত আবূ বকর মুজাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, আমি করিনি বরং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে করেছি। এক রাত্রে আমি স্বপ্নে দেখলাম হযরত শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট আসলেন। আর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে আসতেই দাঁড়ালেন এবং তাঁকে কোলে বসালেন ও তাঁর দুই চক্ষুর মধ্যস্থলে চুমু দিলেন। তখন আমি বললাম, “ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি হযরত শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে এমন সম্মান করলেন কারণ কি?” হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, “সে এশার নামাযের পরে এই আয়াত শরীফ পাঠ করতো,
لقدجاء كم رسول من انفسكم عزيز عليه ما عنتم حريص عليكم بالمؤمنين رئوف رحيم.
অর্থঃ- “তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য হতে এমন একজন পয়গম্বর এসেছেন যার নিকট তোমাদের ক্ষতির কথা নিত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়। যিনি তোমাদের অতিশয় হিতাকাঙ্খী, ঈমানদারগণের প্রতি বড়ই স্নেহশীল ও অনুগ্রহপরায়ণ।” (সূরা তওবা/১২৮)
এই শেখ আহমদই নিজের উল্লিখিত কিতাবে হযরত শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বর্ণনা করেছেন, “আমার প্রতিবেশীর মধ্যে এক ব্যক্তির মৃত্যু হলে আমি তাকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ্ পাক তোমার সঙ্গে কিরূপ আচরণ করলেন? সে বললো, তুমি কি জিজ্ঞেস করছো, আমার উপর দিয়ে ভয়ানক ও আশ্চর্যজনক অবস্থা অতিবাহিত হয়েছে। মুনকার-নকিরের প্রশ্নের সময় নেহায়েত লাজুক অবস্থা অতিবাহিত হয়েছে। আমি মনে মনে ভাবলাম হয়তো আমি দ্বীন ইসলামের উপর ইন্তিকাল করিনি। আওয়াজ হলো, তোমার এই আযাব এই জন্য যে, দুনিয়াতে তুমি নিজের জিহ্বাকে বেকার রেখেছ। যখন আযাবের ফেরেশ্তা আমাকে আযাব দেয়ার মনস্থ করলেন তখন একজন সুন্দর, পবিত্র ও সুগন্ধময় ব্যক্তি এর মাঝে এসে দাঁড়ালেন এবং ঈমানের দলীল হিসেবে আমাকে বলে দিলেন। আমি বললাম, আল্লাহ্ পাক আপনার প্রতি রহমত করুন, আপনি কে? তিনি বললেন, “তুমি যে দরূদ শরীফ রসূলে খোদা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর পাঠ করতে আমি তা। আমাকে সেই দরুদ শরীফ হতে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে, তোমার প্রত্যেক দুঃখণ্ডকষ্ট ও ভয়-ভীতির সময় সাহায্য করতে।” উক্ত অধ্যায়ে হযরত খিযির আলাইহিস্ সালাম হতে রেওয়ায়েত আছে, তিনি রসূলে করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে শুনেছেন, যে ব্যক্তি বলবে,
صلى الله على محمد صلى الله عليه وسلم.
(ছল্লাল্লাহু আলা মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার অন্তর মুনাফিকী হতে পবিত্র করা হবে। যেমন, কাপড় পানি দ্বারা পবিত্র করা হয়ে থাকে।
আর ঐ পরিচ্ছেদের মধ্যে একটি হেকায়েত বর্ণনা করা হয়েছে। লোকেরা এক ব্যক্তিকে দেখতো কা’বা ঘরের তাওয়াফ, ছাফা মারওয়ায় দৌঁড়ানো, সমস্ত মাক্বামে এবং হজ্বের রোকনগুলি আদায় করার সময় সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর দরূদ শরীফ পাঠ করা ব্যতীত অন্য কোন দোয়ায় মনোযোগ দিত না। লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি দোয়ায়ে মা’ছুরা পাঠ করনা কেন? অর্থাৎ প্রত্যেক জায়গায় বিভিন্ন দোয়া পাঠ করার কথা হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে, অথচ তুমি সমস্ত দোয়া পাঠ করনা কেন? তখন সে ব্যক্তি বললো, আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর দরূদ শরীফ পাঠ করার সঙ্গে আর অন্য কিছু শরীক করবনা। কারণ যখন আমার পিতা মারা যান তখন তার মুখমন্ডল দেখলাম গাধার আকৃতি হয়েগেছে। এই অবস্থা দেখে আমার মনে খুব চিন্তা হলো। অতঃপর আমি শুয়ে পড়লাম এবং পয়গম্বর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখলাম আমার পিতার হাত ধরলেন এবং তার জন্য শাফায়াত করলেন। আমি তার এই অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করলাম। তিনি উত্তর দিলেন, “তোমার পিতা সুদখোর ছিলো, আর যে ব্যক্তি সুদ খায় তার শাস্তি দুনিয়া ও আখিরাতে এরূপই হয়ে থাকে। কিন্তু তোমার পিতা প্রত্যেক রাত্রে শোয়ার সময় একশত বার আমার উপর দরূদ শরীফ পাঠ করতো এই কারণে আমি তার জন্য শাফায়াত করেছি এবং শাফায়াত কবুল হয়েছে।” অতঃপর আমি জাগ্রত হয়ে আমার পিতার মুখের দিকে তাকালাম। দেখলাম, পূর্নিমার চাঁদের মত তার মুখখানা উজ্জ্বল হয়ে গেছে। তার দাফনের সময় গায়েব হতে আওয়াজ শুনলাম, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর দরূদ শরীফ পাঠ করবার কারণে আল্লাহ্ পাক তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।”