জুমাদাল উখরা মাসের ফযীলত

সংখ্যা: ৮৫তম সংখ্যা | বিভাগ:

হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ শোয়াইব আহমদ

জুমাদা নামের দু’টি মাসের দ্বিতীয় মাসটি তথা আরবী মাস সমূহের ষষ্ঠ মাস হচ্ছে “জুমাদাল উখরা”। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, জুমাদা শব্দটি মুয়ান্নাছ (স্ত্রী লিঙ্গ) এবং তার অর্থ জমাট পানি বা বরফ। সে হিসেবে তার পরে “উখরা” শব্দটিও আখির শব্দ থেকে মুয়ান্নাছ এবং এর অর্থ শেষ।

          উল্লেখ্য, আরবী মাস সমূহের মধ্যে জুমাদা নামের মাস দু’টিই শব্দগতভাবে মুয়ান্নাছ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

          যা হোক, এ মাসটি মর্যাদা ও ফযীলত লাভের অনেক কারণের মধ্যে একটি বিশেষ কারণ হলো, ১৩ হিজরীর ২২শে জুমাদাল উখরা সোমবার দিবাগত রাত্রিতে ছিদ্দীকে আকবর রদিয়াল্লাহু আনহু -এর ওফাত মোবারক সংঘটিত হয়।

পরিচিতিঃ তাঁর নাম- আব্দুল্লাহ্। উপনাম- আবু বকর। লক্বব (উপাধি)- আতীক ও ছিদ্দীক। পিতার নাম- ওসমান। উপনাম- আবু কুহাফা। মাতার নাম- সালমা, উপনাম-উম্মুল খায়ের। পিতা মাতা মুসলমান তথা ছাহাবী ছিলেন এবং তাঁরা উভয়েই ছিলেন কুরাঈশ।

          পৃথিবীর ইতিহাসে যে কয়েকটি বংশ সবার্ধিক পরিচিত, তাদের মধ্যে আরবের কুরাঈশ বংশ অন্যতম। এ বংশেই সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আফজালুন্ নাস বা’দাল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন হযরত আবু বকর ছিদ্দীক রদিয়াল্লাহু আনহু আগমণ করেন। অর্থাৎ তাঁদের দু’জনেরই উপগোত্র দুটি হাশিম ও তায়িম উর্ধ্বতন সপ্তম পুরুষ মোররাহ-এর সাথে মিলে যায়।

জন্মকালঃ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৫৭০ ঈসায়ীতে জমিনে তাশরীফ নেন। এর দু’বছর কয়েক মাস পরে হযরত আবু বকর ছিদ্দীক রদিয়াল্লাহু আনহু তাশরীফ গ্রহণ করেন। আবার হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৬৩২ ঈসায়ীতে জমিন থেকে বিদায় নেয়ার পর হযরত আবু বকর ছিদ্দীক রদিয়াল্লাহু আনহু দু’বছর কয়েক মাসের মধ্যেই বিদায় গ্রহণ করেন। অর্থাৎ উভয়ের পবিত্র হায়াতকাল ছিল ৬৩ বছর।

ইসলাম গ্রহণঃ তাঁর ইসলাম গ্রহণের সঠিক বর্ণনা হল এই যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর সর্ব প্রথম যখন ওহী নাযিল হয় তখন হযরত আবু বকর রদিয়াল্লাহু আনহু বানিজ্যের উদ্দেশ্যে ইয়েমেনে ছিলেন। যখন তিনি প্রত্যাবর্তন করেন তখন কুরাঈশ নেতৃবৃন্দ তাঁর সাথে দেখা করতে যায়। তিনি তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেন, “কোন নতুন খবর আছে কি?” তারা উত্তর দেয় “হ্যাঁ, এক নতুন খবর আছে তা হলো, আবু তালিবের ইয়াতিম সন্তান নুবুওওয়াতের দাবী করছেন।” এটা শুনে হযরত আবু বকর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর অন্তর দুলে উঠলো। কুরাঈশ নেতৃবৃন্দ তাঁর নিকট থেকে চলে যাওয়ার সাথে সাথে তিনি সোজা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খিদমতে গিয়ে হাযির হন এবং তাঁকে তাঁর নুবুওওয়াত ও আর্বিভাব সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করেন। অতঃপর ঐ বৈঠকেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গে একদা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, “আমি যার নিকটই ইসলামের দাওয়াত পেশ করেছি তিনিই কম-বেশী চিন্তা-ভাবনা বা ইতস্তত করেছেন, কিন্তু যখনই আমি হযরত আবু বকর রদিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট ইসলাম-এর দাওয়াত পেশ করি, তিনি কোন রূপ চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই সংগে সংগে তা গ্রহণ করেন। (সুবহানাল্লাহ্) অর্থাৎ স্বাধীন পুরুষদের মধ্যে তিনিই সর্ব প্রথম ইসলাম গ্রহণ কারী।

          তাঁর বুযুর্গী ও ফযীলত বর্ণনার অপেক্ষা রাখেনা। কালামে পাকে স্বয়ং আল্লাহ্ পাক একাধিক স্থানে তাঁর ছানা-ছিফত করেছেন। তাঁর প্রশংসায় অসংখ্য হাদীস শরীফ বর্ণিত হয়েছে। মুদ্দা কথা, নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালাম-এর পরে যিনি একক মর্যাদার অধিকারী তিনিই ছিদ্দীকে আকবর রদিয়াল্লাহু আনহু। তাঁর মর্যাদা স্বল্প পরিসরে উল্লেখ করা দুস্কর। এমন কোন ভাষা নেই যে ভাষায় তাঁর জীবনী গ্রন্থ রচিত হয়নি।

          দশ বছর মদীনা শরীফের বুকে কর্মবহুল জীবন-যাপনের পর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্তিমক্ষণ ঘনিয়ে এল। ১১ হিজরীর ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার তিনি বিদায় নেন। তাঁর মহান ব্যক্তিত্বের জন্যে তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর কোন উত্তরাধিকারের কথা কেউ চিন্তাই করেননি বা করতে পারেননি। তাই তাঁর বিদায়ে সমগ্র আরবের অবস্থা দাঁড়ায় রাখাল বিহীন এক মেষপালের ন্যায়। সারা মদীনা, সারা আরব হা-হা করে উঠল। নবীর শহর আজ নবী বিহীন। তিনি আজ নীরব, তাঁর রব আল্লাহ্ পাকও যেন নীরব। এক কথায় কায়েনাতের সবকিছুই নীরব। ওহীর দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ হল। সকলেই আজ জ্ঞান হারা, অভিভাবক হারা। এমনকি হযরত ওমর রদিয়াল্লাহু আনহু -এর মত ছাহাবীও আজ জ্ঞানহারা। এই মহাক্ষণে যিনি ডুবন্তপ্রায় কিস্তির কান্ডারীরূপে দাঁড়ান, তিনিই হযরত আবু বকর ছিদ্দীক রদিয়াল্লাহু আনহু। এই চরম মূর্হুতে তিনি নবীরূপে দেখা দিতে না পারলেও নবরূপে দেখা দিলেন। শোকে-দুঃখে মুহ্যমান হযরত ওমর রদিয়াল্লাহু আনহুসহ সকলকেই সম্বোধন করে বললেন, “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি মুহম্মদুর রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইবাদত করত সে জানুক, নিশ্চয়ই তিনি বিদায় নিয়েছেন। আর তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ্ পাক-এর ইবাদত করত, তাঁরা জানুক, নিশ্চয়ই তিনি চিরজীবী, তিনি কখনও ওফাত লাভ করেন না।

মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন, “হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি একজন রসূল ব্যতীত কেউ নন। উনার পূর্বেও বহু রসূল অতীত হয়ে গেছেন। যদি তিনি ওফাত হন অথবা শহীদ হন, তাহলে কি তোমরা মহান আল্লাহ পাক উনার পথ থেকে মিমূখ হবে? কেননা প্রত্যেক প্রাণীই মরণশীল।”

এ কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে সকলেরই জ্ঞান ফিরে এল। সমগ্র আরব হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনার জবান মুবারকে উচ্চারিত কুরআন শরীফ-এর উক্ত আয়াতে কারীমাগুলো যেন নতুনভাবে অনুধাবন করল। নবী না হয়েও নবীর গুরুভার ও গুরু দায়িত্বকে কাঁধে নেয়ার এক জলন্ত দৃষ্টান্ত ছিদ্দীকে আকবর হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম। একটি মানুষের মধ্যে অসংখ্য গুণাবলীর সমাবেশ ঘটলে, মহান আল্লাহ পাক উনার অকুণ্ঠ রহমত প্রাপ্ত হলে, তবেই তিনি এহেন নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম তিনি তাই ইসলাম জগতে এক নজিরবিহীন বিরল ব্যক্তিত্ব।

নুবুওওয়াতের পর উনার ইমামত ও খিলাফত সকলেই বিনা দিধায় মেনে নেন। হাদীছ শরীফ-এ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, যেই জামায়াতের হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম তিনি উপস্থিত থাকবেন। সেখানে তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইমামতি করা উচিত হবে না। (তিরমিযী শরীফ)

তিনি আরো ইরশাদ করেন, আমি আমার রব (মহান আল্লাহ পাক তিনি) ছাড়া যদি আর কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম তাহলে হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনাকেই বন্ধু রূপে গ্রহণ করতাম। (মুয়াত্তা)

মুয়াত্তা শরীফ-এ আরো বর্ণিত হয়েছে, একদা জনৈক মহিলা হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট এসে কোন বিষয়ে কথাবার্তা বলল, তিনি তাকে পুনরায় আসতে বললেন, তখন মহিলাটি বলল, ইয়া রসূলাল্লাহু ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি আবার এসে যদি আপনাকে না পাই, তখন কি করব? উত্তরে তিনি বললেন, তুমি যদি আমাকে না পাও, তবে হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনার নিকট এসো।

রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তুমি আমার (সত্তর) গুহার সঙ্গি এবং হাউযে কাওছারে আমার সাথী। (তিরমিযী শরীফ)

উনার সওর গুহার সঙ্গি হওয়ার বিষয়টি মহান আল্লাহ পাক উনার কালাম পাকে উল্লেখ করেছেন। এর পযীলত বর্ণনা প্রসঙ্গে স্বয়ং হযরত ওমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, আমি আন্তরিকভাবে এই আকাঙ্খা পোষণ করি যে, আমার গোটা জীবনের আমল যদি হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনার জীবনের এক রাত্রির আমলের সমান হত! তা সেই রাত্রি, যেই রাত্রিতে তিনি (হিজরতের সফরে) হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সঙ্গে সওর গুহার দিকে রওনা হন। (রযীন)

তিনি উনার সবকিছু মহান আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জন্য কুরআন করে উম্মতের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত এক উজ্জ্বল আদর্শ স্থাপন করে গেছেন।

রজব মাসের ফযীলত

শা’বান মাস ও শবে বরাতের ফযীলত

পবিত্র রমাদ্বান মাসের ফযীলত

পবিত্র শাওয়াল মাসের ফযীলত

পবিত্র যিলক্বদ মাসের ফযীলত