জুমাদাল উলা মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

সংখ্যা: ৯৬তম সংখ্যা | বিভাগ:

-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ শোয়াইব আহমদ

          আরবী পঞ্চম মাসের নাম জুমাদাল উলা। অভিধানে “জুমাদা” শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে জমাট পানি বা বরফ। আর ‘‘উলা’’ শব্দের অর্থ প্রথম। কাওয়ায়েদ অনুসারে ‘‘জুমাদা’’ শব্দটি মুয়ান্নাছ (স্ত্রী লিঙ্গ) হওয়ায় তার সাথে মিল রেখে আউয়াল শব্দের মুয়ান্নাছ ‘উলা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।

          জুমাদাল উলা মাসের অনেক ফাযায়েল-ফযীলতের মধ্যে একটি আলোচিত দিক হচ্ছে যে, এ মাসে জলীলুল ক্বদর ছাহাবী হযরত সালমান ফারসী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ইন্তিকাল করেন। তিনি ছিলেন, আল্লাহ্ পাক-এর রাস্তায় ক্রমাগত কোশেশে এক অত্যুজ্জ্বল নিদর্শণ।

মহান আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,

والذين جاهدوا فينا لنهدينهم سبلنا.

অর্থঃ- “যারা আমার রাস্তায় কোশেশ করে আমাকে পাওয়ার জন্য অবশ্য অবশ্যই আমি তাদেরকে আমাকে পাওয়ার রাস্তা দেখিয়ে থাকি।” (সূরা আনকাবুত/৬৯)

          এ আয়াতে কারীমার বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত সালমান ফারসী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর হায়াত মুবারকে। তাঁর দ্বীন ইসলাম গ্রহণ আলোচ্য আয়াতে কারীমার এক অনুপম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

          বর্ণিত আছে যে, হযরত সালমান ফারসী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ছিলেন ইরানের এক মজুসীর (অগ্নি উপাসক) সন্তান। তিনি মজুসী ধর্ম ছেড়ে খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেন। সেই মুসেল, নাসিবাইন ইত্যাদি এক স্থানের পর আরেক স্থান এভাবে পর্যায়ক্রমে ছফর করতে করতে অনেক পাদ্রীর নিকট তিনি হক্ব তালাশের জন্য গমণ করেন। কিন্তু সর্বশেষ যে পাদ্রীর নিকট তিনি ছিলেন, সেই পাদ্রী বললো, “হে সালমান! আমার পর তুমি আর হক্ব পাদ্রী পাবেনা। কাজেই তুমি আখিরী নবী, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমণের অপেক্ষায় থাক।” সে তাঁর আগমণের স্থান ও কিছু আলামত বলে দিল যে, “তিনি জন্ম গ্রহণ করবেন মক্কা শরীফে এবং হিজরত করবেন মদীনা শরীফে। যে স্থানটি হবে কঙ্করময় এবং খেজুর গাছে পরিপূর্ণ। তাঁর আলামত বা লক্ষণ হচ্ছে- (১) তিনি হাদিয়া গ্রহণ করবেন বা খাবেন, (২) ছদকা, যাকাত-ফিৎরা খাবেন না এবং (৩) তাঁর পিঠ মুবারকে মহরে নুবুওওয়াত থাকবে।”

          সেই পাদ্রী ইন্তিকাল করার পর হযরত সালমান ফারসী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মক্কা-মদীনা শরীফ আসার জন্য কোশেশ করছিলেন, এক আরবীয় কাফিলার সাথে তিনি আসলেন, কিন্তু কাফিলার লোকজন দুষ্টমী করে তাঁকে মদীনা শরীফের এক ইহুদীর নিকট বিক্রি করে ফেললো। একদিন তিনি মুনীবের খেজুর গাছের উপরে উঠে গাছ পরিস্কার করছিলেন; তখন মুনীব ঐ গাছের গোড়ায় বসা ছিল। হঠাৎ এক লোক এসে মুনীবকে সংবাদ জানালো যে, যিনি আখিরী নবী দাবী করেছেন তিনি মদীনা শরীফে (ইয়াসরিবে) এসেছেন। তাঁকে দেখা দরকার, পরীক্ষা করা দরকার। হযরত সালমান ফারসী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কথাগুলো গাছের উপর থেকে শুনে ফেললেন।

          অতঃপর তিনি চুপে চুপে একদিন কিছু খেজুর নিয়ে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবার শরীফে উপস্থিত হয়ে বললেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এগুলো ছদক্বা এনেছি।” হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খেজুর গুলো নিয়ে যারা গরীব ছাহাবী ছিলেন তাঁদেরকে দিয়ে বললেন, “তোমরা খেয়ে ফেল, আমার জন্য এগুলো জায়েয নেই।”

          তিনি আরেক দিন আবার কিছু খেজুর নিয়ে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খিদমতে পেশ করে বললেন, “হুজুর! এগুলো আমার হালাল কামাই থেকে আপনার জন্য হাদীয়া এনেছি।” হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা থেকে নিজে খেলেন এবং সবাইকে খাওয়ালেন।

          তৃতীয় আলামত দেখার জন্য তিনি আরেকদিন দরবারে নববীতে হাযির হলেন এবং মহরে নুবুওওয়াত দেখার জন্য হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিছনে পিছনে হাঁটতে লাগলেন। সেদিন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শরীর মুবারকের উপর চাদর ছিল। তিনি হযরত সালমান ফারসী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে পিছন থেকে চাদরের কিয়দাংশ ফেলে দিলেন। তিনি মহরে নুবুুওওয়াত দর্শন করতঃ তাতে চুমু খেলেন এবং খুব কাঁদলেন; যেহেতু দু’ তিনশত বছর কোশেশ করার পর তিনি আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পেয়েছেন। কান্নাকাটি করার পর বললেন, “ইয়া রসুলাল্লাহ! ইয়া হাবীবাল্লাহ্! ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আজকে অনেকদিন থেকে আমি কোশেশ করছি। আমার জীবনের সমস্ত আয়ু, সমস্ত ধন-সম্পদ, বাড়ী-ঘর, আত্মীয়-স্বজন সবকিছু আমি ত্যাগ করেছি একমাত্র হক্ব তালাশের জন্য। আজকে আমি আপনাকে পেয়েছি। আমাকে এখনই তওবা করিয়ে মুসলমান করে নিন।” হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে তওবা করিয়ে মুসলমান করে নিলেন। তিনি ছাহাবীর মর্যাদা লাভ করলেন। (সুবহানাল্লাহ)

          হযরত সালমান ফারসী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর মুবারক জীবনার্দশ আমাদেরকে এ নছীহতই শিক্ষা দেয় যে, হক্ব তালাশের তথা আল্লাহ্ পাককে পাওয়ার কোশেশ করলে অবশ্যই তা লাভ করা যায়। আল্লাহ্ পাক আমাদের হক্ব মত ও পথে ইস্তিকামত থাকার দ্বারা আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি-রেযামন্দী দান করুন। (আমীন)

জুমাদাল উখরা মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

রজব মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

মাসের ফযীলত

রমাদ্বান মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

শাওয়াল মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা