-পীরে কামিল, হাফিয, ক্বারী, মুফ্তী, আলহাজ্ব হযরত মাওলানা মুহম্মদ শামসুদ্দোহা
وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَا فِي كُلِّ قَرْيَةٍ أَكَابِرَ مُجْرِمِيهَا لِيَمْكُرُوا فِيهَا ۖ وَمَا يَمْكُرُونَ إِلَّا بِأَنفُسِهِمْ وَمَا يَشْعُرُونَ
তরজমা : “এরূপেই প্রত্যেক জনপদে অপরাধীদেরকে সর্দার বা প্রধান করেছি যেন তারা সেখানে চক্রান্ত করে; তারা শুধু তাদের নিজেদের বিরুদ্ধেই চক্রান্ত করে কিন্তু তারা উপলব্ধি করতে পারেনা।” (সূরা আনয়াম/১২৪)
শানে নুযূল : সে যুগে মক্কা শরীফের চারদিকে চারটি রাস্তা ছিল যা দ্বারা লোকেরা ওমরাহ্ ও হজ্জ্ব করতে এবং বাজার-ঘাটসহ অন্যান্য প্রয়োজনে মক্কা শরীফে আগমন করতো। কুরাঈশ দলপতিদের মধ্য হতে চারজন ঐ চার রাস্তায় সর্বক্ষণ পালাক্রমে পাহারা দিত। আর যখনই কোন পথচারীকে আসতে দেখতো তখনই তাকে প্রতারিত করতো এই বলে যে, “দেখ! মক্কায় তো যাচ্ছ, খবরদার, মুহম্মদ (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট যেওনা। কারণ সে যাদুকর, গণক।” (নাউযুবিল্লাহ্) সে সব প্রতারকদের সম্পর্কেই উদ্ধৃত আয়াত শরীফখানা নাযিল হয়েছে। (খাযেন, রুহুল বয়ান, ছোয়াবী ইত্যাদি)
আল্লাহ্ পাক-এর শান এই যে, বদ্ নসীব, হতভাগা, হতচ্ছাড়াদের ঐ অপকৌশলই ইসলামের ইশায়াতের বা প্রচারের মাধ্যম হয়ে গিয়েছিলো। কারণ, যাদেরকেই বারণ করা হতো তাদের অন্তরে এই আকাঙ্খা জাগ্রত হতো যে, তাঁকে তো অবশ্যই দেখা প্রয়োজন। যাঁর কাছে না যাওয়ার জন্য তথাকথিত শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিরা এতোটা তৎপরতা ও প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে অনেক ভাগ্যবান দর্শনার্থী হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রথম দর্শনেই ঈমান আনয়ন করতেন এবং নিজ নিজ গোত্রে ফিরে দ্বীন-ইসলামের প্রচার শুরু করে দিতেন। যার ফলে কুরাঈশ দলপতিদের চক্রান্ত বা প্রতারণা তাদের উপরই বর্তাতো এবং আল্লাহ্ পাক-এর আয়াত শরীফ বাস্তবায়িত হতো।
তাশরীহ্ : এখানে আল্লাহ্ পাক তাঁর একটি মহান কুদরতী কৌশল বর্ণনা করেছেন যে, “প্রত্যেক জনপদ ও নগর পল্লীর ক্ষমতা- মদমত্ত গর্বিত, অত্যাচারী অধিবাসীরা সাধারণতঃ নানারূপ চক্রান্ত বা ছলে-বলে নিরীহ্ লোকদের মধ্যে প্রাধান্য লাভ করে আর নিজেরা অবিরত চক্রান্ত কিংবা ছল-চাতুরী অবলম্বন পূর্বক নিজেদেরই ইহকাল, পরকাল বিনষ্ট করে থাকে। আবহমান কাল ধরে মানব ইতিহাসের প্রতি লক্ষ্য করলেই এ আয়াত শরীফের সত্যতার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পরিদৃষ্ট হয়।
যেহেতু মানুষ সমাজে বসবাস করে। আর মানুষের সমাজ পরিচালিত হয় গোত্রপতি তথা সমাজ নেতাদের দ্বারা। সাধারণতঃ নিরীহ আপামর জনতার পক্ষে ক্ষমতাদর্পী সর্দার-নেতাদের প্রভাব কাটিয়ে উঠা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে জনসাধারণ সর্দার ও ধনী ব্যক্তিদের আপাত মধুর বক্তব্যে মুগ্ধ হয়ে তাদের পিছনে চলা এবং তাদের অনুকরণ করাকেই সৌভাগ্য ও সাফল্যজনক মনে করে। অথচ আল্লাহ্ পাক-এর নির্দেশ হলো, আল্লাহ্ পাক-এর বান্দারা যেন নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালাম-এর অতঃপর ওয়ারিছে নবীগণের একনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে যায়। কারণ মানুষকে সৃষ্টিই করা হয়েছে ইবাদত বা দাসত্ব করার জন্য। আর নবী ও ওয়ারিছদের একনিষ্ঠ অনুসরণ ও অনুকরণেই সত্যিকার ইবাদত নছীব হয়ে থাকে। তাই দেখা যায়- নবী, ওয়ারিছে নবীর অমীয় আহবানে পরিণামদর্শী নিরীহ্ সাধারণ জনতা সাড়া দেয় অকুক্তচিত্তে। আর সমাজের সর্দার, প্রধান ব্যক্তিরা হয়ে যায় প্রতিপক্ষ। কপট বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের পরিণতি যে অনিবার্য ধ্বংস ও ক্ষতি ছাড়া অন্য কিছু নয় সেই চিরন্তন নিয়মটির কথাই জানিয়ে দেয়া হয়েছে আলোচ্য আয়াতে কারীমায়।
বস্তুতঃ দুনিয়া পূজারী, অপরিণামদর্শী লোকেরা কম জ্ঞান, উল্টা বুঝ তথা বুদ্ধির খর্বতার কারণে মানসিক প্রবৃত্তি ও তাদের বন্ধু শয়তান মন্দ কাজকে তাদের দৃষ্টিতে সুশোভিত করে দেয়। ফলে তারা বাস্তব সত্য ও পরিণাম ফল থেকে উদাসীন হয়ে আপাত মধুর আনন্দে বিভোর হয়ে অপরাধকেই নিজের, ক্বওমের ও দেশের উন্নতি তথা সমৃদ্ধির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করতে থাকে।
আয়াতে বর্ণিত مكر (মকর) শব্দটি দ্বারা মূলতঃ ঐ বক্র স্বভাব ও ধারণার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। যার অর্থ প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, চক্রান্ত, বাধাদানের মাধ্যমে কাউকে তার মূল উদ্দেশ্য থেকে ফিরিয়ে দেয়া ইত্যাদি।
এ আয়াত শরীফের মাধ্যমে এক দিকে মুসলিম মাত্রকেই সতর্ক করা হয়েছে। যাতে দুনিয়া পূজারী ধনীদের পদাঙ্ক অনুসরণ না করা হয় এবং অপরদিকে নবী ও ওয়ারিছে নবীকে সান্তনা দেয়া হয়েছে যে, গোত্রপতি সর্দারদের বিরুদ্ধাচরণে মনঃক্ষুন্ন হবার কিছুই নেই, কারণ এটা নতুন ঘটনা নয়। পূর্ববর্তী নবী ও নবীর আশেকদেরও এ ধরণের লোকদের সম্মূখীন হতে হয়েছে।
তাফসীরুল কুরআন: মি’রাজুন্ নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
তাফসীরুল কুরআন: গীবতকারী ও চোগলখোর ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবেনা এবং তাদের দোয়াও কবুল হয়না
তাফসীরুল কুরআন: গীবতকারী ও চোগলখোর ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবেনা এবং তাদের দোয়াও কবুল হয়না