-হযরত মাওলানা মুফ্তী মুহম্মদ আব্দুল হালীম
৩৮। পীর ছাহেবের জাহিরী অবস্থা বা ছিফতের প্রতি লক্ষ্য করবেনা। বরং তাঁর বাতিনী অবস্থা বা ছিফতের প্রতি সর্বদা মুতাওয়াজ্জেহ্ বা রুজু থাকবে।
(এ কথার অর্থ এটা নয় যে, পীর ছাহেবগণ জাহিরীভাবে শরীয়তের খিলাফ কাজ করবেন। আর বাতিনীভাবে ওলী আল্লাহ্ থাকবেন। বরং যিনি পীর ছাহেব হবেন তিনি জাহিরী ও বাতিনী উভয় অবস্থায় শরীয়তের পূর্ণ পাবন্দ হবেন। যে ব্যক্তি জাহিরী ও বাতিনী উভয় দিক থেকে শরীয়তের পাবন্দ নয় সে ওলী আল্লাহ্ নয়, বরং তার বিপরীত হবে। মূলতঃ একথার দ্বারা ঐ কথার প্রতি ইশারা করা হয়েছে যে, কাফিররা আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জাহিরী অবস্থা (যমীনে চলাচল) লক্ষ্য করে বলতো, “তিনি কেমন রসূল! খাদ্য খান, বাজারে যান।” অর্থাৎ কাফিররা আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জাহিরী অবস্থা লক্ষ্য করেছে কিন্তু বাতিনী বা হাক্বীক্বী অবস্থা লক্ষ্য করেনি। তার ব্যাখ্যা সম্পর্কে এ আলোচনা।)
যেমন, এ প্রসঙ্গে কিতাবে বর্ণিত রয়েছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “আকৃতির দ্বারাই যদি মানুষ মনুষত্ব লাভ করতো তাহলে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবূ জেহেলের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকতোনা। এটা (বাহ্যিক) যা দেখ তা মনুষত্বের গিলাফ, মনুষত্ব নয় বরং মনুষত্বের খিলাফ।”
আফজালুল আউলিয়া, মাহবুবে সুবহানী, ইমামে রব্বানী শায়খ আহমদ ফারুকী সেরহিন্দী মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “আউলিয়া-ই-কিরাম-এর বাতিনী (আভ্যন্তরীণ) অবস্থা হযরত খিযির আলাইহিস্ সালাম-এর আবে হায়াতের মত। যে ব্যক্তি এ বারি ধারার এক কাতরা পান করেন, তিনি হায়াতে আবাদী (অমর জীবন) লাভ করেন। আর তাঁদের জাহিরী হাল (বাহ্যিক অবস্থা) সাম্মে কাতিল বা হত্যাকারী বিষ তুল্য। সুতরাং যে ব্যক্তি তাঁদের জাহিরী অবস্থা দেখবে সে মউতে আবাদী অর্থাৎ চির মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। এই সমস্ত সৌভাগ্যবান ব্যক্তিবর্গের বাতিনী (আভ্যন্তরীণ) অবস্থা দর্শন রহমত এবং জাহির (বাহ্যিক) অবস্থা দর্শন জহ্মত স্বরূপ। তাঁদের বাতিনির প্রতি খেয়ালকারীগণ আউলিয়া-ই-কিরাম-এর অন্তর্র্ভুক্ত। পক্ষান্তরে জাহিরী অবস্থা অবলোকনকারীগণ হতভাগা। কারণ আউলিয়া-ই-কিরামগণের জাহিরী ছূরত যবের ন্যায় এবং বাতিনী ছূরত গমের মত। জাহিরী ছূরতে তাঁরা সাধারণ মানুষ; কিন্তু বাতিনী পর্যায়ে ফেরেশ্তাগণের পর্যায়ভুক্ত।
জাহিরী ছূরতে তাঁরা যমীনে পদ সঞ্চালনকারী অপরদিকে বাতিনী ছূরতে আসমানে বিচরণকারী। তাঁদের ছোহ্বত লাভ করে যারা ধন্য হন তাঁরা বদ্বখতি হতে নেক বখ্তিতে রূপান্তরিত হয়ে থাকেন। কারণ তাঁদের প্রেমাস্পদ (পীর ছাহেব) সৌভাগ্যের পরশ পাথর দ্বারা বিজড়িত। এ সকল ব্যক্তিই অর্থাৎ আউলিয়া-ই-কিরাম আল্লাহ্ পাক-এর দলভুক্ত। আল্লাহ্ পাক বলেন,
اولئك حزب الله الا ان حزب الله هم المفلحون.
অর্থঃ- “তাঁরা হচ্ছেন আল্লাহ্ পাক-এর দলভূক্ত। জেনে রাখ, আল্লাহ্ পাক-এর দলভুক্তরাই সফলকাম তথা মুক্তিপ্রাপ্ত।” (সূরা মুজাদালাহ্/২২)
সুতরাং ঐ ব্যক্তি ভাগ্যবান, যিনি আউলিয়া-ই-কিরাম ও আহ্লুল্লাহ্গণের জাহিরী অবস্থা ও ছিফতের প্রতি লক্ষ্য না করে তাঁদের বাতিনী হালের প্রতি মুতাওয়াজ্জেহ্ হন এবং বাতিনী ছিফতের প্রতি নিজের দিল ও দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখেন। (মাবদা ওয়া মা’আদ/৭৭, হালাতে মাশায়েখে নক্শবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া-২/১১৭))
স্মর্তব্য যে, পীর ছাহেবের বাতিনী (আভ্যন্তরীণ) অবস্থা এবং ছিফতের প্রতি লক্ষ্য রেখেই নিজের আমল-আখলাক, ছিরত-ছূরত গঠন করা বিশেষতঃ বাতিনী ছিফতের রঙ্গে রঞ্জিত হওয়ার কোশেশ করা আবশ্যক। কেননা নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের ছিনা মুবারক থেকে ধারাবাহিকভাবে আগত মহান নিয়ামত যারা লাভ করেছেন তারা সকলেই ছিলেন বাতিনী অবস্থার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধকারী। পরবর্তী পর্যায়ে আউলিয়া-ই-কিরাম-এর ছিনা মুবারকে যা স্থাপিত আছে, সে পরম প্রত্যাশিত নিয়ামত লাভ করতে হলে বাতিনী (আভ্যন্তরীণ) অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখাই বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় তা ব্যহত হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক।
ছালিক বা “খোদা প্রাপ্তির” পথ যাত্রীগণের সকলের জন্য বিশেষভাবে যারা মধ্যপথে অবস্থানকারী তাদের জন্য এ বিষয়টি অতীব জরুরী যে, স্বীয় পীর ছাহেবের বাতিনী কামালত এবং বাতিনী ছিফত বা গুণাবলী তথা কামালত ও বিলায়েতের প্রতি লক্ষ্য রাখা। কেননা এটা ছালিকের পদঙ্খলনের একটি মাকাম বা স্থান।
সুতরাং যারা আউলিয়া-ই-কিরামগণের জাহিরী বা বাহ্যিক রূপ ও ছিফতের (গুণাবলীর) প্রতি নজর রাখবে তারা তাঁদের বরকত হতে মাহরূম বা বঞ্চিত হবে এবং হাতে হাতেই দুনিয়া ও আখিরাতের অকল্যাণ দেখতে পাবে। কারণ আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জাহিরী অবস্থা ও গুণাবলী দেখার কারণেই আবূ জাহিল, আবূ লাহাব প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ইসলাম ও ঈমানী দৌলত হতে মাহরূম হয়েছে। আবাদুল আবাদের(অনন্তকালের) জন্য জাহান্নামী হয়েছে। তারা সাইয়্যিদুল বাশার, শাফিউল উমাম, হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমাদের মত রক্তে- গোস্তে গড়া সাধারণ মানুষ হিসেবে ধারণা করতো” তারা আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জাহিরী ছূরত বা বাহ্যিক অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখেই বলতো,
مال هذا الرسول ياكل الطعام ويمشى فى الاسواق.
অর্থঃ- “তিনি কেমন রসূল? যিনি খাদ্য খান আবার বাজারেও যান।” (সূরা ফুরক্বান/৭)
আবূ জাহিল, আবূ লাহাবের সমমনা লোক যারা ফখরে মওজুদাত, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জাহিরী অবস্থার প্রতি সম্পূর্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছে তাদের দ্বারাই পরবর্তীতে বাতিল ফিরকার উদ্ভব হয়েছে। ওহাবী, খারিজী, মুতাজিলা ইত্যাদি ফিরকার সুত্রপাত ঘটেছে। আজ যারা আখিরী রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ‘নূরে মুজাস্সাম” হিসেবে মানতে পারেনা, বরং আমাদের মত সাধারণ মানুষ বলে বিশ্বাস করে, তারা তাঁর বাহ্যিক অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখার কারণেই এরূপ আক্বীদা পোষণ করে থাকে। পক্ষান্তরে মুশাব্বিহা ফিরক্বার অন্তর্ভূক্ত যারা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ্ পাক-এর “জাতী নূরের” অংশ হিসেবে প্রচার করে তারাও যে, প্রকৃতপক্ষে সে জাহিরী অবস্থা দর্শনেই বলে থাকে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
ফখরে মওজুদাত, নূরে মুজাস্সাম, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মহিমাময় জীবনে জাহিরী অবস্থা ও গুণাবলীর বিকাশ ঘটেছিল। ঘর-সংসার, খানা-পিনা, আচার-ব্যবহার, লেন-দেন ইত্যাদির সাথে একান্তভাবেই তিনি জড়িত ছিলেন। আর কাফিরদের দাবী ছিল যে, “তিনি এসব জাহিরী অবস্থা হতে মুক্ত থাকবেন।” কিন্তু আল্লাহ্ পাক-এর অভিপ্রায় ভিন্নরূপ। আল্লাহ্ পাক তাঁর প্রিয় হাবীব, সাইয়্যিদুল কাওনাইন, নূরে মুজাস্সাম হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সান্তনা দান করতঃ কাফিরদের সে অযৌক্তিক মিথ্যা দাবী খন্ডন করে বলেন,
وما ارسلنا قبلك من المرسلين الا انهم لياكلون الطعام ويمشون فى الاسواق وجعلنا بعضكم لبعض فتنة.
অর্থঃ- “(হে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনার পূর্বে যত রসূল প্রেরণ করেছি, তারা সকলেই খাদ্য গ্রহণ করতেন এবং হাটে বাজারে গমন করতেন। আর আমি তোমাদের একজনকে অপরজনের জন্য পরীক্ষার উপকরণ করেছি।” (সূরা ফুরক্বান/২০)
নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালাম ও আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম-এর জাহিরী বা বাহ্যিক অবস্থাটি নিতান্তই পরীক্ষার বিষয়। নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণ নুবুওওয়ত ও রিসালতের সীমাহীন মর্যাদা-মর্তবায় উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও জাহিরী বা বাহ্যিক অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত থাকার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক-এর বিরাট হিকমত নিহিত।
সুতরাং হাটে-বাজারে গমনাগমন করা যেমন নুবুওওয়াত ও রিসালতের পরিপন্থী নয়; তেমনিভাবে বাহ্যিক অবস্থা অবলোকন করে হিদায়েত হতে মাহরূম থাকাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ বাহ্যিক অবস্থা পরীক্ষার বিষয় স্বরূপ। অর্থাৎ যাদের অন্তরে কুফরী ও নিফাকীর বীজ রয়েছে তা জাহির বা প্রকাশ করার জন্য জাহিরী অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত ঘটনাবলীর বহিঃপ্রকাশ হয়ে থাকে। কুফরী ও নিফাকী লালনকারী ব্যক্তিরাই তা নিয়ে অযথা ঘাটাঘাটি করে থাকে।
আর যাদের অন্তরে নিফাকী ও কুফরীর বীজ থাকে তারা যেমন আউলিয়া-ই-কিরাম তথা পীর ছাহেবের জাহিরী অবস্থার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বিভিন্ন মন্তব্য করার অবকাশ পায়; সাথে সাথে তারা আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বরকতময় জীবনের বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করে বিরূপ মন্তব্য করে জান্নামের ইন্ধনে পরিণত হয়। এমনকি তাদের এ বদ খাছলত আল্লাহ্ পাক পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে যায়।
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৬)
ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৮)
পীর ছাহিব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৯)
ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৫১)