-হযরত মাওলানা মুফ্তী মুহম্মদ আব্দুল হালীম
প্রসঙ্গঃ পীর ছাহেব কোন বিষয়ে তলব করলে তৎক্ষনাত তাঁর ডাকে সাড়া দিবে।
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
عن ابى هريرة رضى الله تعالى عنه ان رسول الله صلى الله عليه وسلم خرج على ابى بن كعب وهو يصلى فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم يا ابى فالتفت ابى ولم يجبه وصلى ابى وخفف ثم انصرف الى رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال السلام عليك يا رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم وعليك السلام مامنعك يا ابى ان تجيبنى اذ دعوتك فقال يا رسول الله صلى الله عليه وسلم انى كنت فى الصلاة فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم افلم تجد فيما اوحى الله الى “استجيبوا لله وللرسول اذا دعاكم لما يحييكم” فقال بلى ولا اعود ان شاء الله تعالى.
অর্থঃ- “হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উবাই ইবনে কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর উদ্দেশ্যে বের হলেন এবং তাঁকে সম্বোধন করে বললেন, ‘হে উবাই (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু)! হযরত উবাই ইবনে কাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তখন সেদিকে তাকালেন; কিন্তু তাঁর ডাকে সাড়া দিলেননা। পরে হযরত উবাই ইবনে কাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তাড়াতাড়ি নামায শেষ করে আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট আসলেন এবং বললেন, السلام عليك আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, وعليك السلام. হে উবাই! আমার ডাকে সাড়া দিতে তোমাকে কিসে বারণ করলো? হযরত উবাই ইবনে কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি সে সময়ে নামাযে রত ছিলাম। তখন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি কি এ ব্যাপারে অবগত নও যে, এ সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক আমার উপর আয়াত শরীফ নাযীল করেছেন? “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদেরকে যখন আহবান করেন এমন বিষয়ের প্রতি যা তোমাদের জীবন দান করবে। তখন তোমরা সে আহবানে সাড়া দাও।” (সূরা আনফাল/২৪) তখন হযরত উবাই ইবনে কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, জ্বি-হ্যাঁ। ইনশাআল্লাহ্ পরবর্তীতে আর এরূপ হবেনা।”(তাফসীরে খাযেন-১/১৭৭, মাযহারী-৪/৪৬, রুহুল মায়ানী- ৫/১৯১, কুরতুবী- ৭/৩৯০, বুখারী শরীফ- ২/৬৬৯)
উল্লেখ্য যে, কেউ কেউ বলেন যে, আলোচ্য হাদীস শরীফের হুকুম আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য খাছ। অর্থাৎ তিনি কোন বিষয়ে আহবান করলে নামায ভঙ্গ করে তাঁর ডাকে সাড়া দেয়া আবশ্যক।
তবে বিশুদ্ধ মতে আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ডাকে সাড়া দেয়া তো অবশ্যই ফরয; সাথে সাথে তাঁর নায়েব, হক্কানী-রব্বানী আলিম তথা হক্কানী পীর ছাহেবের ডাকেও সাড়া দেয়া আবশ্যক। কেননা, পীর ছাহেবের আদেশ-নিষেধ পালন করা মুরীদের জন্য ফরয এবং জীবন দানকারী।”
স্মর্তব্য যে, পীর ছাহেবের ইচ্ছা বা মর্জির নিকট নিজেকে ফানা বা বিলীন করে দেয়া তরীক্বতের পথে সালিকের সর্ব প্রথম ও প্রধান কাজ। তাঁর সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা অতীব জরুরী। সেক্ষেত্রে পীর ছাহেব যদি কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে মুরীদকে তলব করেন কিন্তু মুরীদ তার গুরুত্ব না দেয়ার কারণে সে কাজ ব্যহত হয় সেক্ষেত্রে পীর ছাহেবের সন্তুষ্টির পরিবর্তে অসন্তুষ্টির পথ সুগম হয়ে যায়। যার ফলশ্রুতিতে মুরীদের আত্মার অপমৃত্যু ঘটে। রূহানী সম্পর্কের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহ্ আসার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। আক্বীদা-আমলের মধ্যে সৃষ্টি হয় মহাবিপর্যয়। যা হালাক্বী বা ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইমামে রব্বানী, গাউসে সামদানী, মুজতাহিদে মিল্লাত ওয়াদ্ দ্বীন, মাহবুবে সুবহানী, খলীফাতুল্লাহি ফিল্ আরদ, আফজালুল আউলিয়া, শায়খ আহমদ ফারুকী সেরহিন্দী মুজাদিদ্দে আল্ফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিশ্ববিখ্যাত কালজয়ী অমর গ্রন্থ “মাকতুবাত শরীফে” উল্লেখ করেছেন, “পীর ছাহেবের সন্তুষ্টির মধ্যে আল্লাহ পাক-এর সন্তুষ্টি নিহিত। মুরীদ যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের পীর ছাহেবের মর্জির নিকট নিজেকে ফানাহ্ করে দিতে না পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্ তায়ালার মর্জির দরজায় পৌঁছতে পারবেনা। পীর ছাহেবের মর্জির খিলাফ কাজ করে তাঁকে কষ্ট দেয়াই মুরীদের উন্নতির পথে কন্টক স্বরূপ। এ পথের প্রতিটি পদস্খলন বা ভুল-ত্রুটির সংশোধন করা সম্ভব কিন্তু পীর ছাহেবের মনে কষ্ট দেয়া কোনক্রমেই সংশোধন হতে পারেনা। পীর ছাহেবকে তাক্বলীফ বা কষ্ট দেয়াই মুরীদের বদ্ বখতির মূল কারণ।
কেননা, পীর ছাহেবকে কষ্ট দেয়ার ফলে মুরীদের ইসলামী আক্বীদাসমূহের মধ্যে ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং শরীয়তের হুকুম-আহ্কাম পালনে গাফলতি দেখা দেয়। ওজ্দ (প্রেম স্পন্দন) এবং বাতেনী হাল সমূহ এর ফলে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। কারণ এই সমস্ত বিষয় মুরীদের বাতেনী হালের সাথে জড়িত। সুতরাং পীর ছাহেবকে কষ্ট দেয়া এবং তাঁর অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও যদি মুরীদের হাল (বাতেনী অবস্থা) বাকি থাকে তাহলে এটাকে “এস্তেদরাজ” মনে করবে। যা পরে বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং যার পরিণতি ক্ষতি ছাড়া আর কিছু নয়।” (হালাতে মাশায়েখে নক্শবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া ২য় খন্ড, ১১৩ পৃষ্ঠা)
কাজেই স্বীয় পীর ছাহেব যেন কষ্ট না পান এবং অসন্তুষ্ট হয়ে না পড়েন মুরীদের সেদিকে গভীর লক্ষ্য রাখা বাঞ্ছণীয়। আর পীর ছাহেব আহবান করার সাথে সাথে তাঁর ডাকে সাড়া দিলে কোন ক্ষতির সম্ভাবনা থাকেনা। বরং তা সমূহ নিয়ামত ও রেজামন্দি লাভের পথকে সুগম করে।
৩৭। পীর ছাহেবের মজলিসে যেখানে জায়গা খালি পাবে সেখানেই বসে পড়বে। কেননা, আগতদের জন্য শুণ্যস্থানই নির্দিষ্ট থাকে। (ফাওয়ায়েদুস্ সালেকীন)
উল্লেখ্য যে, তাছাউফ তথা আল্লাহ্ পাক ও তাঁর প্রিয় হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মা’রিফাত ও মুহব্বত হাছিলের পথে বিশেষ দুটি অবলম্বন হচ্ছে, নিয়মিত পীর ছাহেবের দরবার শরীফে হাযিরা দেয়া তথা সোহ্বত লাভ করা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, পীর ছাহেবের নির্দেশিত যিকির-ফিকির করা। এ দু’টির সম্পর্ক একান্ত নিবিড়। পরস্পর অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। একটি ব্যতীত অন্যটি অঙ্গহানী সদৃশ্য। এ দু’টি হতে যে যত দূরে থাকে সে তত বেশি শয়তানের নিকটবর্তী হয়। ইবলিসের গভীর ষড়যন্ত্রের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে পীর ছাহেবের সোহ্বত ও তার মজলিসের গুরুত্ব কত অর্থবহ তা সহজেই অনুমেয়।
মনে রাখা বাঞ্ছনীয় যে, মুরীদের জন্য সোহ্বত বা পীর ছাহেবের সাহচর্য অমূল্য সম্পদ। সাহচর্য স্বভাবের উপর প্রতিক্রিয়াশীল। বাজপাখি সংসর্গে থেকে জ্ঞান সঞ্চয় করে, তোতা পাখি কথা বলে, ঘোড়া পশুত্ব পরিত্যাগ করে মানুষের স্বভাব অর্জন করে। এটা সাহচর্যের ফল। (মাকতুবাতে সাদী)
সাইয়্যিদুশ্ শুয়ারা, হুজ্জাতুল আশেকীন, ইমার্মু রাসেখীন, ফখরুল উলামা ওয়াল মাশায়িখ, হুজ্জাতুল ইসলাম, হযরত মাওলানা জালালুদ্দীন রূমী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন,
هركه خواهد همنشيند باخدا كونشيند درحضور اولياء.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাক-এর সঙ্গ লাভ করতে চায় সে যেন ওলী আল্লাহ্গণের সঙ্গ লাভ করে।”
সুতরাং আউলিয়া-ই-কিরামগণের মজলিসের ফাযায়েল-ফযীলত কত বেশী তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। কাজেই কোন ব্যক্তি যদি শয়তানের প্ররোচনা, নফ্সের ধোকা ইত্যাদি নানা প্রতিকুলতাকে অতিক্রম করে পীর ছাহেবের দরবারে গমন করে তাঁর মজলিসে সামান্যতম ঠাই পায় সেটাই তার জন্য গণিমত স্বরূপ। তারজন্য শোকর গোজার করা কর্তব্য।
উল্লেখ্য, এ ক্ষেত্রে মজলিসের শেষেও যদি কেউ স্থান পায় তবে সেখানেই বসে পড়া শোকর গোযারের লক্ষণ। কিন্তু কেউ যদি তা ভঙ্গ করে সামনে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করে তবে তা হবে মজলিসের আদবের খিলাফ এবং না শোকর গোযারির লক্ষণ।
সেক্ষেত্রে মুরীদ যদি তাকে গুরুত্ব না দেয়, অনীহা প্রদর্শন করে তা বদ্ বখতির লক্ষণ বৈ কিছু নয়।
এ প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে যে, কুতুবুল আলম, সুলতানুল আউলিয়া, শাইখুল ইসলাম হযরত কুতুবুদ্দীন বখ্তিয়ার কাক্বী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন যে, হযরত আবূ লাইছ প্রণীত “তাম্বীহ্” কিতাবে উল্লেখ আছে যে, যে ব্যক্তি মজলিস পাবে অথচ বসবে না সে অভিশপ্ত (মালউন)।” (ফাওয়ায়েদুস্ সালেকীন)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৪)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৬)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৭)
ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৮)