-হযরত মাওলানা মুফ্তী মুহম্মদ আব্দুল হালীম
৩৬। পীর ছাহেব কোন বিষয়ে তলব করলে তৎক্ষনাৎ তাঁর ডাকে সাড়া দিবে।
সালিক দুনিয়াবী যত গুরুত্বপূর্ণ কাজে লিপ্ত থাকুক না কেন স্বীয় পীর ছাহেব আহবান করার সাথে সাথে তা হতে বিরত হয়ে তাঁর ডাকে সাড়া দেয়া আবশ্যক তো বটেই এমনকি যদি সে কোন ইবাদতে লিপ্ত থাকে তা হতে বিরত হয়ে পীর ছাহেবের ডাকে সাড়া দেয়া শরাফত, ভদ্রতা, আদব ও শিষ্টতার অন্তর্ভূক্ত।
যে সমস্ত মহান ব্যক্তিত্ব আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চরম সন্তুষ্টি, রেজামন্দী হাছিল করতঃ কামিয়াবীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন; যাঁদের প্রশংসা গাঁথা সারা জাহানে বিরাজমান। ক্বিয়ামত পর্যন্ত যাঁরা স্মরণীয়, বরণীয় হয়ে বিরাজ করছেন ও করবেন, তাঁদের মহিমাময় জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে বর্ণিত আদবের যথার্থ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। পীর ছাহেবের ডাক শুনতে পেলে তাঁরা উৎকক্তিত হয়ে যেতেন। যত গুরুত্বপূর্ণ কাজেই লিপ্ত থাকতেন না কেন তা হতে বিরত হয়ে পীর ছাহেবের ডাকে সাড়া দিতেন।
“জুবদাতুল মাকামাত” কিতাবে বর্ণিত আছে যে, তাজুল আশেকীন, বুরহানুদ্দীন হযরত হুসামুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, একদা সাইয়্যিদুল আউলিয়া, মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত খাজা বাকীবিল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি, আফজালুল আউলিয়া, ইমামে রব্বানী হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে তলব করলেন। আমি গিয়ে তাঁকে সংবাদ দেয়ার সাথে সাথে তাঁর চেহারা মুবারক বিবর্ণ হয়ে যায় এবং ভয়ে তাঁর শরীর মুবারক থর থর করে কাঁপতে থাকে। তখন আমি মনে করলাম, এতদিন শুনে আসছিলাম, প্রিয়জনের কথা শুনা মাত্রই তাঁরা হয়রান-পেরেশান হয়ে পড়েন। আজ স্ব-চক্ষে তা দেখতে পেলাম।” (হালাতে মাশায়েখে নক্শবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া- ২/২০)
“ফাওয়ায়েদুস্ সালেকীন” কিতাবে উল্লেখ আছে, “কুতুবুল আলম, হুজ্জাতুল ইসলাম, খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাক্বী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, নফল নামায ত্যাগ করে পীর ছাহেবের ডাকে সাড়া দেয়া কল্যাণকর এবং তার ছওয়াব অনেক বেশী।
কেননা একদা আমি নফল নামাযে রত থাকাকালীন আমার পীর ছাহেব ইমামুশ্ শরীয়ত ওয়াত্ তরীক্বত, গরীবে নেওয়াজ, হাবীবুল্লাহ্ খাজা মুঈনুদ্দীন হাসান চিশ্তী রহমতুল্লাহি আলাইহি আমাকে ডাকলেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে নামায ছেড়ে দিয়ে তাঁর ডাকে সাড়া দিলাম। তিনি বললেন, এসো- আমি তাঁর পবিত্র খিদমতে হাযির হলাম। তিনি ইরশাদ করলেন, “কি করছিলে?” আমি বললাম, “নফল নামাযে লিপ্ত ছিলাম, আপনি ডাকলেন তাই খিদমতে হাযির হলাম।” তিনি সব শুনে বললেন, “খুব ভালই করেছ। নিজের পীর ছাহেবের আদেশ পালন করা নফল নামায হতে উত্তম।” (সুবহানাল্লাহ্)
আউলিয়া-ই-কিরামগণের মুবারক জীবনে এরূপ অসংখ্য, অগণিত ঘটনা সন্নিবেশিত আছে যে, তাঁরা দুনিয়া ও আখিরাতে সকল কাজে স্বীয় পীর ছাহেবের আদেশ-নিষেধকে প্রাধান্য দিতেন তথা পীর ছাহেবের ডাকে সাড়া দিতেন।
যথাসময়ে পীর ছাহেবের ডাকে সাড়া দেয়া মুরীদের জন্য ফরয-ওয়াজিবের পর্যায়ভুক্ত। কথিত আছে যে,
الشيخ يحيى ويميت.
অর্থাৎ- “শায়খ বা পীর ছাহেব জীবিত করেন আবার মৃত্যুও দান করেন।”
তার ব্যাখ্যায় ইমামে রব্বানী, গাউসে সামদানী, মুজতাহিদে মিল্লাত ওয়াদ্ দ্বীন হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “জীবিত করা এবং মৃত্যু দেয়া উভয়ই পীর ছাহেবের মাকামের অত্যাবশ্যকীয় বিষয়সমূহের অন্তর্ভূক্ত। يحيى শব্দের অর্থ হলো, রূহানী জীবন দান করা এবং يميت এর অর্থ হলো, রূহানী মৃত্যুদান। শারীরিক জীবন কিংবা মৃত্যু নয়। এ স্থানে হায়াত ও মউতের অর্থ বিশেষভাবে ফানা ও বাকা। যা মুরীদকে বেলায়েত ও কামালতের মাকামে পৌঁছিয়ে দেয়। শায়খে মুকতাদা বা পথ প্রদর্শক পীর ছাহেব আল্লাহ্ পাক-এর আদেশে এ দুই বিষয়েরই জামীন।” (মাকতুবাত শরীফ, হালাতে মাশায়েখে নক্শবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া-২/১১১)
ইমামে রব্বানী, গাউসে সামদানী, আফজালুল আউলিয়া, হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি আরো বলেন, “মুরীদের বাতেনী নাজাসাত বা নাপাকী বিদূরিত করার মূলই হচ্ছেন পীর ছাহেব। যিনি স্বয়ং বাতেনী ফয়েজের ঝাড়ণ্ড দ্বারা তার বাতেনী নাজাসাত (নাপাকী) পরিস্কার করেন এবং বাতেনী ছেদন যন্ত্রের সাহায্যে মুরীদের আভ্যন্তরীণ ময়লা দূর করে তাকে পবিত্র করেন। যতদিন পর্যন্ত মুরীদের বাতেনী নাপাক বা ময়লা বিদ্যমান থাকে ততদিন পীর ছাহেবের উসীলায়ই তাকে আল্লাহ্ পাক নৈকট্যের দিকে টেনে নিয়ে যান। যা দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত কল্যাণ ও সুখ-শান্তি হতে সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম। পীর ছাহেবই একমাত্র উসীলা যা মুরীদের নফসে আম্মারাকে নফসে মুত্মাইন্নায় পরিণত করেন। জাবালী বা আত্মগর্বী কুফর হতে হাক্বীক্বী ইসলামে পরিবর্তন করেন।” (হালাতে মাশায়েখ নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া-২/১১৩)
উল্লেখ্য যে, স্বীয় পীর ছাহেব যেহেতু মুরীদের জীবন-মরণদানকারী সেহেতু তাঁর আদেশ-নিষেধ মুরীদের জীবন রক্ষাকারী ঔষধস্বরূপ। কাজেই মুরীদ দুনিয়া-উখরুবী যে কোন কাজে লিপ্ত থাকুক না কেন আহবানের সাথে সাথে তাঁর ডাকে সাড়া দেয়া আবশ্যক। মুরীদ যদি নফল নামাযে রত থাকে আর পীর ছাহেব যদি কোন জরুরী কাজে তাকে তলব করেন তখন নফল নামায তো অবশ্যই ছেড়ে দিবে এমনকি ফরয নামায ছেড়ে দিয়ে হলেও পীর ছাহেবের ডাকে সাড়া দেয়া অপরিহার্য। কেননা, এটা আল্লাহ্ পাক-এরই নির্দেশ। তিনি কালামে পাকে নির্দেশ করেন,
يايها الذين امنوا اطيعوا الله واطيعوا الرسول واولى الامر منكم.
অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুগত হও। আর তোমাদের মধ্যে যারা উলিল আমর রয়েছেন তাদেরও অনুগত হও, অনুসরণ-অনুকরণ কর।” (সূরা নিসা/৫৯)
অতএব, দ্বীনি সকল কাজের মধ্যে পীর ছাহেবের ডাকে সাড়া দেয়া সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি কাজ। কারণ তাঁর প্রতিটি আদেশ-নিষেধই মুরীদের জন্য বাতেনী জীবন দানকারী ও বাতেনী জীবন হরণকারী। কুরআন শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে,
يايها الذين امنوا استجيبوا لله وللرسول اذا دعاكم لما يحييكم.
অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদেরকে যখন আহবান করেন এমন বিষয়ের প্রতি যা তোমাদের জীবন দান করবে। তখন তোমরা সে আহবানে সাড়া দাও।” (সূরা আনফাল/২৪)
স্মর্তব্য যে, উল্লিখিত আয়াত শরীফ এবং অনুরূপ অন্যান্য আয়াত শরীফসমূহ যদিও আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে নাযিল হয়েছে তথাপিও ঐ সমস্ত আয়াত শরীফসমূহ হক্কানী-রব্বানী আলিম তথা পীর-মাশায়েখগণ অর্থাৎ উলিল আমরগণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। কারণ হক্কানী-রব্বানী আউলিয়া-ই-কিরামগণ হচ্ছেন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি-এর নায়েব বা ওয়ারিছ।
এর উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহ্ পাক তাঁর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে ইরশাদ করেন,
يايها الذين امنوا لاتقدموا بين يدى الله ورسوله.
অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা কোন ক্ষেত্রে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অগ্রগামী হয়োনা।” (সূরা হুজরাত/১)
অর্থাৎ আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বর্তমানে তাঁর নির্দেশ ব্যতীত সামনে সামনে চলা, তিনি কোন কাজ করার পূর্বে কাজ করা, কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ইত্যাদি নিষেধ। এই আয়াত শরীফের হুকুম, তিনি তাঁর উম্মত তথা হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের উপর প্রয়োগ করে মুসলিম উম্মাহ্কে জানিয়ে দিলেন যে, “আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অবর্তমানে যাঁরা উলিল আমর হবেন তাঁদের শানেও একই হুকুম প্রযোজ্য হবে।
এ প্রসঙ্গে ছাহেবে রসূলিল্লাহ্ হযরত আবূ দারদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন,
رانى رسول الله صلى الله عليه وسلم امشى امام ابى بكر رضى الله تعالى عنه فقال تمشى امام من هو خير منك فى الدنيا والاخرة ماطلعت شمس ولاغربت على احد بعد النبيين والمرسلين خيرا وافضل من ابى بكر رضى الله تعالى عنه.
অর্থঃ- “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদা আমাকে আফযালুন্ নাছ বা’দাল আম্বিয়া হযরত আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সামনে চলতে দেখে বললেন, ‘তুমি এমন ব্যক্তির অগ্রে চলছো যিনি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে তোমার থেকে শ্রেষ্ঠ।’
তিনি আরো বলেন, ‘নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের পর পৃথিবীতে এমন কোন ব্যক্তির উপর সূর্যোদয় হয়নি ও সূর্যাস্ত যায়নি। যে আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে শ্রেষ্ঠ। অর্থাৎ তাঁর সামনে চলা অনুচিত।” (কাশফুল আছরার, তাফসীরে রুহুল বয়ান ৯ খন্ড, ৬২ পৃষ্ঠা, তারিখুল খুলাফা ৪৬ পৃষ্ঠা)
সুতরাং বলার অপেক্ষাই রাখেনা যে, নামায হতে বিরত হয়ে আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ডাকে সাড়া দেয়া যেরূপ ফরয-ওয়াজিবের অন্তর্ভূক্ত; তদ্রুপ তাঁর ওয়ারিছ, নায়েবে নবী, হক্কানী-রব্বানী আউলিয়া-ই-কিরাম তথা পীর ছাহেবের ডাকে সাড়া দেয়াও ফরয-ওয়াজিবের অন্তর্ভূক্ত।
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৫)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৬)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৭)
ফিক্বহুল হাদীছ ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৮)