-হযরত মাওলানা মুফ্তী মুহম্মদ আব্দুল হালীম
প্রসঙ্গঃ অধিক জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকবে। তবে কোন বিষয়ে নিতান্ত জরুরী হলে পীর ছাহেবের অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন করবে।
উল্লেখ্য যে, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ ছিলেন জাহির ও বাতিন সবদিক থেকে উত্তম শিষ্টাচারের ধারক ও বাহক। তাঁরা অপ্রয়োজনীয়, অনর্থক এবং অধিক জিজ্ঞাসাবাদ থেকে মুক্ত ছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদ তথা ইল্ম হাছিলের উপর এবং অর্জিত ইল্ম অনুযায়ী আমলকেই বেশী গুরুত্ব দিতেন। আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাস্সাম, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মারিফাত-মুহব্বত, সন্তুষ্টি-রেজামন্দী হাছিলের পথে যখন প্রতিবন্ধকতা কিংবা কোন সমস্যার সম্মুখীন হতেন কেবল তখনই তা নিরসন কল্পে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ্, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সুওয়াল করতেন। মোদ্দাকথা, তাঁদের আমলের ভিত্তিই ছিল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরিপূর্ণ অনুসরণ-অনুকরণ করা। আর ইল্মে তাছাউফের শিক্ষাও হচ্ছে সেটাই। অর্থাৎ স্বীয় পীর ছাহেবের পরিপূর্ণ অনুসরণ-অনুকরণ। আর অনুসরণ-অনুকরণের ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসাবাদের তেমন প্রয়োজন পড়েনা।
ইমামুল মুহাদ্দিসীন, ফক্বীহুল উম্মত, শাইখুল উলামা ওয়াল মাশায়িখ, হুজ্জাতুল ইসলাম, আল্লামা শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিশ্ববিখ্যাত কিতাব “আল ইনসাফ ফি বয়ানী আসবাবিল ইখতিলাফ” কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, “হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের তরীক্বা ছিল- সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ্, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমল করতেন, তাঁরা তা প্রত্যক্ষ করতেন। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে নিয়মে ওজু করতেন তাঁরা তা দেখে ওজু দেখে দেখে তাঁর তরীক্বা অনুযায়ী ওজু করতেন। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে নামায আদায় করতেন, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ সে তরীক্বা দেখে নামায আদায় করতেন।
একবার ইব্রাহীম ইবনে রাবীয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নিকট আসলেন। হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একখানা কাপড়ের একপাশ পরে অন্য পাশ গায়ে জড়িয়ে নামাযে মশগুল ছিলেন। নামায শেষ হলে হযরত ইব্রাহীম রহমতুল্লাহি আলাইহি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি এভাবে এক কাপড়ে নামায আদায় করেন?” হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, “হ্যাঁ, আমি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাস্সাম হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এভাবে নামায আদায় করতে দেখেছিলাম।”
উল্লেখ্য যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাস্সাম, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনের সর্বশেষ নামায- যে নামায খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন, ছিদ্দীকে আকবর হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর পিছনে আদায় করেছিলেন তা এক কাপড়েই ছিল। (মুসনাদ ৩/১৫৯, আসহাবে রসূলের জীবনকথা ৩/১৯৮)
হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামায আদায় করা দেখে দেখে হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ সেই তরীক্বা অনুযায়ী নামায আদায় করতেন। লোকেরা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হজ্বের রীতি-নীতি অবলোকন করে সে অনুযায়ী হজ্ব পালন করতে শুরু করেন।
হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ্, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খুবই কম সুওয়াল করেছেন। রঈসুল মুফাস্সিরীন, হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, “আমি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছাহাবী বা সাথীগণের চেয়ে উত্তম কোন মানব দল কখনো দেখিনি। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গোটা জিন্দেগীতে তাঁরা তাঁকে খুব কমই সুওয়াল করেছেন। এর সবকিছু পবিত্র কুরআন শরীফে উল্লেখ আছে। যেমন,
يسئلونك عن الشهر الحرام قتال فيه.
অর্থঃ- “হে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! তারা আপনাকে হারাম মাসগুলোতে যুদ্ধ সংক্রান্ত বিধান জিজ্ঞেস করছে।”
يسئلونك عن الاهلة.
অর্থঃ- “হে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! তারা আপনাকে চন্দ্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে” ইত্যাদি।
হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, “তোমরা এমন কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করনা যা বাস্তবে সংঘটিত হয়নি।” কারণ আমি আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন, ফারুকে আযম, হযরত উমর ইবনে খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে এ ধরণের প্রশ্নকর্তাদের প্রতি অভিসম্পাত করতে দেখেছি।
হযরত উমর ইবনে ইসহাক রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ্, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অর্ধেকের বেশী ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের সঙ্গে আমার সাক্ষাত লাভের সৌভাগ্য হয়েছে। আমি তাঁদের চেয়ে অধিক জটিলতামুক্ত এবং কঠোরতা বর্জনকারী মানব গোষ্ঠীর সাক্ষাত পাইনি।”
হযরত উবাদা ইবনে বসরকান্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে এই ফতওয়াও চাওয়া হয়েছিল যে, “কোন নারী যদি এমন কোন স্থানে মৃত্যুবরণ করে সেখানে তার কোন ওলী পাওয়া যাবেনা, সে অবস্থায় তাকে গোছল দেয়া হবে কিভাবে?” জাওয়াবে তিনি বলেছিলেন, “আমি এমন লোকদের সাক্ষাত লাভ করেছি যারা তোমাদের মত কঠোরতা এবং জটিলতা অবলম্বন করতেননা। তাঁরা তোমাদের মত (ধরে নেয়া বিষয়ে) জিজ্ঞাসাবাদ করতেননা।” (আল ইনসাফ ফি বয়ানী আসবাবিল ইখতিলাফ)
রঈসুল মুফাস্সিরীন, হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আরো বলেন, “হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ কেবল সেই সব সুওয়াল করতেন যা ছিল তাঁদের জন্য উপকারী।” অর্থাৎ একান্ত জরুরী এবং যা উপকারী সে সকল জরুরী মাসয়ালা-মাসায়েল জিজাসা করা উচিত। তার দ্বারা যেমন নিজে উপকৃত হবে তদ্রুপ অন্যান্যরাও ফায়দা হাছিল করবে। আর এটা নিন্দনীয় নয় বরং প্রশংসনীয়।
কেননা, আল্লাহ্ পাক বলেন,
فسئلوا اهل الذكر ان كنتم لاتعلمون.
অর্থঃ- “তোমরা যদি না জান তাহলে আহ্লে যিকির-এর কাছে জিজ্ঞেস করে জেনে নাও।” (সূরা আম্বিয়া/৭)
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে,
العلم خزائن مفاتيحها السوال الا فاسئلوا فانه يوجر اربعة السائل والعالم والمستمع والمحب لهم.
অর্থঃ-“সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ্, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ইল্ম খনি স্বরূপ; আর সুওয়াল হচ্ছে তার চাবি। সুতরাং তোমরা প্রশ্ন কর- কেননা, তার দ্বারা চার ব্যক্তি উপকৃত হয়- ১. প্রশ্নকারী, ২. আলিম তথা জাওয়াব দানকারী, ৩. শ্রবণকারী এবং ৪. তাঁদেরকে মুহব্বতকারী।” (ইহ্ইয়াউ উলুমুদ্দীন)
তবে প্রশ্ন করার পূর্বে পীর ছাহেবের সময় ও সুযোগের প্রতি লক্ষ্য রাখা আবশ্যক। শুধু ইল্ম অর্জনের জন্য প্রশ্ন করা বাঞ্ছনীয়। নিজের পান্ডিত্য জাহির করা কিংবা পীর ছাহেবের ইল্ম যাচাই করার জন্য কোন প্রশ্ন করা মূর্খতার পরিচায়ক। সুতরাং অসময়ে এবং এরূপ মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন করা অবশ্যই বর্জনীয়। কেননা তা ক্ষতিকারক।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, একবার কুতুবুল আলম, হুজ্জাতুল আশিকীন, বুরহানুদ্দীন হযরত খাজা আবূ ইউছুফ হামদানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বাগদাদ শরীফের মাদ্রাসা নিজামিয়ায় ওয়াজ করছিলেন। সে সময় ইবনে সাকা নামে এক ফক্বীহ্ (ফিক্বাহ্ শাস্ত্র বিশারদ আলিম) তাঁকে একটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলেন। কুতুবুল আলম হযরত খাজা আবূ ইউছুফ হামদানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর প্রশ্ন শুনে বললেন, “তোমার উক্তি হতে কুফরীর গন্ধ আসছে। তুমি বেদ্বীন হয়ে মারা যাবে।”
এ ঘটনার কিছুদিন পরে রোম হতে জনৈক খৃষ্টান বাগদাদের খলীফার নিকট কার্য উপলক্ষ্যে হাযির হলো। ইব্নে সাকা তাঁর সাথে মেলামেশা শুরু করলো। একদিন ইবনে সাকা তাকে বললো, “আমি ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করার ইচ্ছা করেছি।” এটা শুনে উক্ত খৃষ্টান খুশি হয়ে তাকে রোম দেশে নিয়ে গিয়ে সম্রাটের সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দিলো। ইবনে সাকা খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করলো এবং খৃষ্টান থাকা কালে তার মৃত্যু হলো।” (নাউযুবিল্লাহ্) (হালাতে মাশায়েখে নক্শবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া, ১ম খন্ড, ১৭৬ পৃষ্ঠা)
স্মর্তব্য যে,অপরাপর আউলিয়া-ই-কিরামগণের আদব রক্ষা না করে প্রশ্ন করা বা অযথা প্রশ্ন করে তাঁদেরকে কষ্ট দেয়ার কারণে যদি এমন ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হতে হয় তবে স্বীয় পীর ছাহেবের ক্ষেত্রে কিরূপ অবস্থা হতে পারে তা ফিকিরযোগ্য।
আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে অনর্থক প্রশ্ন করা হতে হিফাযত করুর। (আমীন)
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২৬২)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৪)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৫)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৬)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৭)