-হযরত মাওলানা মুফ্তী মুহম্মদ আব্দুল হালীম
৩২। পীর ছাহেবের সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি উভয়ের মধ্যে স্বীয় খায়ের ও বরকত জানবে।
পীর ছাহেব যদি কোন মুরীদের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন তবে তা মুরীদ নিজের জন্য নিয়ামত মনে করে আল্লাহ্ পাক-এর শোকর আদায় করবে।
সুতরাং যদি কোন কারণে পীর ছাহেব অসন্তুষ্ট হন কিংবা অসন্তুষ্টি বশতঃ ছোহবত ত্যাগ করতে বলেন, তথাপি ছোহ্বত ত্যাগ করবে না। বরং অধিক মাত্রায় তওবা-ইস্তিগ্ফার করতঃ ধৈর্য্যধারণ করবে এবং অসন্তুষ্টির কারণ তালাশ করে তার সঠিক তথ্য পেশ করে ওজরখাহি ও ক্ষমা প্রার্থনা করবে।
আর এটাই হচ্ছে, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম, আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের অনুসৃত পথ।
সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিশিষ্ট তিনজন ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম যাঁরা উল্লেখযোগ্য কোন কারণ ব্যতীতই “তাবুক যুদ্ধে” গমন হতে বিরত থাকেন। এতে তিনি তাঁদের উপর কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন।
সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম “তাবুক যুদ্ধ” হতে প্রত্যাবর্তন করে যখন মসজিদে নববী শরীফে তাশরীফ রাখেন, তখন যাঁরা যুদ্ধে শরীক হননি তাঁরা উপস্থিত হলেন। হযরত কা’ব ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খিদমতে হাজির হয়ে সালাম দিলেন। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃদু হাসলেন যে হাসিতে অসন্তুষ্টির ভাব ফুটে উঠেছিল। বললেন, “তোমার যুদ্ধে যাওয়া হলোনা কেন?” জবাবে তিনি বললেন, “ইয়া রসূল্লাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আল্লাহ্ পাক-এর কছম! পশ্চাতে পড়ার কোন যথার্থ কারণ ছিলনা। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “সে সত্য কথাই বলেছে। উঠো, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ থেকে কোন ফায়সালা না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার ব্যাপার মুলতবী থাকবে।” আমি উঠে গিয়ে বণী সালমা গোত্রের কয়েক ব্যক্তির পিছনে গিয়ে বসলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আমার মত অবস্থা আর কারো হয়েছে কি?” লোকজন বললেন, “হ্যাঁ, আরও দু’ব্যক্তি আপনার মতো জবাব দিয়েছে। তাদের একজন হচ্ছেন, মুরারা ইবনে রবী ও অপরজন হিলাল ইবনে উমাইয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা।”
হযরত কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের তিনজনের সাথে কথা বলতে মুসলমানগণকে বারণ করে দিলেন। সকলেই আমাদেরকে পাশ কেটে চলতে লাগলেন। রাতারাতি অবস্থার এতই পরিবর্তন হলো, যেন এ বিশাল পৃথিবীতে আমাদের চেনাজানা কোন লোকই নেই। আমার অপর দু’জন সাথী যার যার ঘরে বসে অঝোরে কাঁদতে থাকেন। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে নামাযে লোকজনের সাথে শামিল হতাম, তারপর বাজারে ঘুরে বেড়াতাম কিন্তু একটা লোকও আমার সাথে কথা বলত না। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযঅন্তে মসজিদে বসতেন। আমি সে মজলিসে হাজির হতাম। তাঁকে সালাম দিতাম এবং খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করতাম যে, জবাবে তাঁর ঠোট মুবারক নড়ে কিনা! আমি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খুব নিকটেই নামায আদায় করতাম এবং আড়চোখে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আমি যখন নামাযে রত থাকতাম, তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার দিকে তাকাতেন কিন্তু যখন আমি তাঁর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতাম, তখন তিনি মুখ ঘুরিয়ে নিতেন।
অনেক দিন এভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর একদিন আমি হযরত আবূ কাতাদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর বাগানে গেলাম। তিনি ছিলেন আমার চাচাতো ভাই এবং আমাদের মধ্যে অত্যন্ত অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিলো। আমি তাঁকে সালাম দিলাম কিন্তু আল্লাহ্ পাক-এর কছম! তিনি নিরুত্তর রইলেন। তখন আমি বললাম, “হে আবূ কাতাদা! আমি কি আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসি না”? এবারো তিনি নিরুত্তর রইলেন। আমি আবার সে প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলাম। তিনি বললেন, আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা উত্তম জানেন। তাঁর কথা শুনে আমার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো এবং আমি ফিরে চলে এলাম।
হযরত কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আরো বলেন, একদিন আমি মদীনার বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। এমন সময় একজন বণিক লোকজনকে জিজ্ঞেস করলো, কা’ব ইবনে মালিক কে? সকলেই আমার দিকে ইঙ্গিত করে জানিয়ে দিলেন যে, আমিই তার কাঙ্খিত ব্যক্তি। সে ব্যক্তি কাছে এসে আমাকে গাস্সানের বাদশাহ্ পত্র দিল। তাতে লিখা ছিল, “আমি জানতে পেরেছি, আপনার নেতা আপনার প্রতি কঠোর ব্যবহার করেছেন। অথচ আল্লাহ্ পাক তো আপনাকে কম মর্যাদাবান করেননি! আপনি এত অবহেলার পাত্র নন!! আপনি আমাদের দলে যোগদান করলেই স্বীয় মর্যাদার মান স্বচক্ষে দেখতে ও উপলব্ধি করতে পারবেন।” হযরত কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, “আমি পত্রটি পড়েই বললাম, এতো দেখছি আর এক মুছীবত। তারপর পত্রটি আমি চুলোয় নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দিলাম।”
চল্লিশ দিন এভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাসিদ (দূত) এসে জানিয়ে দিলেন যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা বর্জন করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “স্ত্রীকে কি তালাক দিয়ে দিবো?” কাসিদ বললেন, “তালাক দিবেন না, সঙ্গ বর্জন করে চলবেন।” আমার অপর দু’জন সাথীর প্রতিও একই হুকুম জারী হলো। আমি আমার সহধর্মীনিকে বললাম, “এ ব্যাপারে আল্লাহ্ পাক-এর হুকুম না আসা পর্যন্ত তোমার পিত্রালয়ে আপন লোকদের সাথে অবস্থান করো।”
তারপর আরও দশ দিন অতিবাহিত হলো। পঞ্চাশ দিন পূর্ণ হলো। আল্লাহ্ পাক তাঁদের সু-সংবাদ দিয়ে আয়াত শরীফ নাযিল করেন,
وعلى الثلثة الذين خلفوا حتى اذا ضاقت عليهم الارض بمارحبت وضاقت عليهم انفسهم وظنوا ان لاملجا من الله الا اليه ثم تاب عليهم ليتوبوا.
অর্থ: “অপর তিনজনকে (অনুগ্রহ করা হলো) যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল, যখন পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্বেও তাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠলো; আর তারা বুঝতে পারলো যে, আল্লাহ্ পাক ব্যতীত আর কোন আশ্রয় স্থল নেই। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি সদয় হলেন, যাতে তারা ফিরে আসে।” (সূরা তওবা/১১৮)
হযরত কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, “এমনি অবস্থায় একদা হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম, কে যেন সালা পর্বত থেকে বুলন্দ আওয়াজে ঘোষণা করছে, হে কা’ব ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, তোমার জন্য সু-সংবাদ।” আমি তৎক্ষনাৎ সিজদায় পড়ে গেলাম। তারপর সে সু-সংবাদ নিয়ে একের পর এক আসতে লাগলো। কে কার আগে সে সংবাদটুকু দিবে তার জন্যে রীতিমত প্রতিযোগীতা শুরু হয়ে গেলো। পাহাড়ের উপর থেকেও অনেকের আওয়াজ ভেসে আসছিল।
যার আওয়াজ আমি সর্ব প্রথম শুনেছিলাম, সে আসতেই আমি আমার পরিধেয় দুটো বস্ত্রই খুলে তাকে দিয়ে দিলাম। আল্লাহ্ পাক-এর কছম! তখন এ দু’টি কাপড় ছাড়া আর কোন কাপড় ছিলনা। আমি অন্যের থেকে ধার করে এনে কাপড় পরলাম। তারপর ছুটে চললাম হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবার শরীফে। এরপর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সালাম দিলাম। খুশীতে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেহারা মুবারক চাঁদের মত ঝলমল করছিলো। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “হে কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! সু-সংবাদ গ্রহণ কর। মায়ের পেট থেকে প্রসব হওয়ার পর আজকের দিনটিই তোমার জন্যে সবচাইতে শুভ দিন।” (সুবহানাল্লাহ্) (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, তিরমিযী শরীফ, আসাহুম সিয়ার ও সীরাতে ইবনে হিশাম)
উল্লেখ্য যে, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অসন্তুষ্টি তথা সম্পর্ক বিছিন্ন হওয়ার কারণে দুনিয়ার যমীন সংকীর্ণ বোধ করতেন। জীবন অত্যন্ত দূর্বিসহ হয়ে পড়ত। বিচ্ছিদের বিরহ ব্যাথায় তাঁরা হতেন দগ্ধিভুত। সুতরাং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি-রেজামন্দীর প্রত্যাশায় সর্বদা এন্তেজার থাকতেন। বহিঃশত্রু তথা ইহুদী-নাছারাদের দুনিয়াবী মান-সম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তির প্রলোভনের দিকে ফিরে তাকাতেন না তথা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতেন না।
অনুরূপভাবে যারা হাক্বীক্বী সালিক তাদের অবস্থাও ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াআল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের মত হয়ে থাকে। কেননা যে পীর ছাহেবের সন্তুষ্টিই হচ্ছে দুনিয়া আখিরাতের একমাত্র পাথেয় তিনি যদি অসন্তুষ্ট হয়ে যান, তাঁর সাথে মুরীদের সম্পর্কের যদি অবনতি ঘটে তবে মুরীদের বেঁচে থাকাটা মূল্যহীন মনে হয়। জীবন-যাপন হয়ে যায় দূর্বিসহ।
কাজেই তখন তারা এ অবস্থা হতে পরিত্রান পাওয়ার জন্য তথা পীর ছাহেবের সন্তুষ্টি-রেজামন্দি হাছিলের জন্য সবর্দা উদগ্রীব থাকেন। জান-মাল এমনকি দুনিয়ার সবকিছুর বিনিময়ে হলেও তার সন্তুষ্টি কামণা করতে থাকে। আর এ লক্ষে তার দরবার শরীফই একমাত্র আশ্রয়স্থল মনে করতঃ তথায় অবস্থান করতে থাকেন।
উল্লেখ্য যে, পীর ছাহেবের ছোহ্বত বর্জনের জন্য শয়তানী ওয়াস্ওয়াসা আসা স্বাভাবিক। কিন্তু সেদিকে ধাবিত হওয়া উচিত নয়। বরং সর্বদা পীর ছাহেবের সন্তুষ্টি তালাশের কোশেশে লিপ্ত থাকবে।
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৮)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪০)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪১)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪২)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৩)