ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৮)

সংখ্যা: ৯০তম সংখ্যা | বিভাগ:

-হযরত মাওলানা মুফ্তী মুহম্মদ আব্দুল হালীম

৩১। পীর ছাহেবের শান-মান, মর্যাদা-মর্তবার খেলাফ কোন কাজ-কর্ম, কথা-বার্তা কিংবা অন্য কোন মন্তব্য করবে না।

          কেননা তা ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহ্ হাছিলের ক্ষেত্রে বিরাট অন্তরায়। কোন কোন ক্ষেত্রে ঈমান ও আমল বিনষ্টের কারণও বটে। যেমনিভাবে নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের বেলায় ঈমান ধ্বংসের কারণ তথা কুফরী এবং মুনাফিকীর অন্তর্ভূক্ত।

          সীরতে ইবনে হিশামসহ অন্যান্য সীরাত গ্রন্থসমূহে উল্লেখ আছে যে, নবম হিজরীতে তাবুকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে যাওয়ার পথে একস্থানে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতমুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আ’লামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উট হারিয়ে যায়। হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উট খুঁজতে বের হলেন। এ সময় হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট হযরত আমর ইবনে হাযম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উপস্থিত ছিলেন। যিনি আকাবার বাইয়াত ও বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন বনু আমরের বিশিষ্ট ও প্রবীণ ব্যক্তি। তাঁর দলের ভিতরে যায়িদ ইবনে লুছাইত নামক বনু কাইনুকা গোত্রের জনৈক মুনাফিক ছিল। যে ছিল ছাহাবীর ছদ্মাবরণে মুনাফিক সরদার আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইয়ের সমমনা।

          হযরত আমর ইবনে হাযম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত থাকা অবস্থায় তাঁর দলবলের কাছে বসে উক্ত মুনাফিক যায়িদ ইবনে লুছাইত বললো, “আচ্ছা, মুহম্মদ (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তো দাবী করেন যে, তিনি নবী এবং তিনি তোমাদেরকে আকাশের খবর জানান। কিন্তু তিনি এতটুকু জানেন না যে, তাঁর উটটি কোথায়?” ঠিক সেই মুহুর্তে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আমর ইবনে হাযম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর উপস্থিতিতেই বললেন, একজন লোক বলতেছে যে, “মুহম্মদ (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেকে নবী বলে দাবী করে থাকেন এবং তোমাদেরকে আকাশের খবরাদি জানান, কিন্তু তিনি কেন তাঁর উটটি এখন কোথায় তা জানেন না?” “আল্লাহ্ পাক-এর কছম! আল্লাহ্ পাক আমাকে যা জানিয়েছেন আমি তাই জানি। আল্লাহ্ পাক আমাকে উটের সন্ধান দিয়েছেন। এই উপত্যকার ভিতরেই তা অমুক জায়গায় রয়েছে। একটি গাছের সাথে তার লাগাম আটকে গেছে। তোমরা গিয়ে উটটিকে নিয়ে এসো।” হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ গিয়ে উট ধরে আনলেন। অতঃপর হযরত আমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তাঁর দলবলের কাছে ফিরে গেলেন। গিয়ে বললেন, “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এইমাত্র আমাদের কাছে এক বিস্ময়কর খবর জানালেন। আমাদের বাহিনীর মধ্যে কে নাকি এরূপ কথা বলেছে যা আল্লাহ্ পাক তাঁকে জানিয়ে দিয়েছেন।” এই বলে তিনি যায়িদ ইবনে লুছাইতের কথা ব্যক্ত করলেন। তখন হযরত আমর ইবনে হাযম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর বাহিনীর একজন- যিনি দলের অভ্যন্তরেই ছিলেন এবং সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট যাননি- বললেন, “আল্লাহ্ পাক-এর কছম! যায়িদই এ কথা বলেছে।” তখন হযরত আমর ইবনে হাযম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যায়িদের কাছে এগিয়ে গিয়ে তার ঘাড়ে আঘাত করে বললেন,“ হে আল্লাহ্ পাক-এর বান্দা, আমার কাছে এসো। আমার কাফেলায় একটি সাপ লুকিয়ে আছে আমি তা জানতেও পারিনি। হে আল্লাহ্ পাক-এর দুশমন, বেরিয়ে যাও আমার কাফেলা থেকে। আমার সাথে থাকতে পারবে না।”

          উল্লেখ্য যে, মুনাফিক সরদার আব্দুল্লাহ্ ইবনে  উবাই এবং যায়িদ ইবনে লুছাইয়ের মত একদল লোক সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সোহবত বা সান্নিধ্যে ছিল যারা সূরতান অনেক ভাল কাজ করেছে, বিভিন্ন যুদ্ধ-জ্বিহাদে শরীক ছিল তবু হিদায়েতের আলো পায়নি। কারণ তাদের অন্তর ছিল কুফরী ও নেফাকীতে ভরপুর। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,

كلا بل ران على قلوبهم ماكانوا يكسبون.

অর্থঃ- “কখনও এরূপ নহে, বরং তাদের অন্তরসমূহে তাদের (গর্হিত) কার্যকলাপের দরুন মরিচা ধরেছে।” (সূরা আল মুতাফ্ফিফীন/১৪)

          তাদের সে গর্হিত কার্যকলাপে লালিত কুফরী, শিরকী ও মুনাফিকীর কারণে চিরতরের জন্য তাদের অন্তরে মোহর পড়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,

ختم الله على قلوبهم وعلى سمعهم وعلى ابصارهم غشاوة ولهم عذاب عظيم.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক মোহর মেরে দিয়েছেন তাদের অন্তরসমূহের উপর ও তাদের কর্ণসমূহের উপর এবং তাদের চোখের উপর পর্দা রয়েছে। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।” (সূরা বাক্বারা/৭)

          যায়িদ ইবনে লুছাইতের অন্তরে নিফাকী তথা কপটতা লালিত থাকার কারণে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্রতম সোহবতে থাকার পরেও তাঁর শান-মান, মর্যাদা-মর্তবাকে উপলব্ধি করতে পারেনি। বিধায় বিরূপ মন্তব্য পেশ করতে দ্বিধা করেনি। আল্লাহ্ পাক বলেন,

ولقد ذرانا لجهنم كثيرا من الجن والانس لهم قلوب لا يفقهون بها ولهم اعين لايبصرون بها ولهم اذان لايسمعون بها اولئك كالانعام بل هم اضل اولئك هم الغفلون.

অর্থঃ- “আর আমি এমন অনেক জ্বিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি যাদের অন্তর আছে কিন্তু তাদ্বারা তারা হক্ব বুঝে না এবং তাদের চোখ আছে কিন্তু তারা দেখতে পায়না। আর তাদের কান আছে কিন্তু তারা শুনতে পায়না। এ সমস্ত লোক হচ্ছে চতুস্পদ জন্তুর ন্যায় বরং তারা তার চেয়ে অধিক নিকৃষ্ট। আর এ সমস্ত লোকই হচ্ছে গাফিল।” (সূরা আরাফ/১৭৯)

          সুতরাং বর্তমান প্রেক্ষাপটে যারা নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালাম, ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম এবং আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম গণের শান-মান, মর্যাদা-মর্তবার খেলাফ বিরূপ মন্তব্য অথবা করে হক্বানী-রব্বানী আলেম তথা পীর ছাহেবের হাতে বাইয়াত হয়ে তার পবিত্র সোহ্বত বা সান্নিধ্য পাওয়ার পরেও সালিক বা সূফী- নাম ধারণ করে স্বীয় পীর ছাহেবের শান-মান, মর্যাদা-মতর্বার পরিপন্থী কাজ-কর্ম, কথা-বার্তা বা মন্তব্য পেশ করে থাকে। তারা যে সে যায়িদ ইবনে লুছাইতের যোগ্য উত্তরসূরী তা বলাই বাহুল্য।

          আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই, যায়িদ ইবনে লুছাইতের মত মুনাফিকের দল মুসলমানদের দলে থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি সাধনে সর্বদা তৎপর থাকতো; তদ্রুপ আউলিয়া-ই-কিরামগণের দরবার শরীফে তাদেরই উত্তরসূরী এক শ্রেণীর ব্যক্তি পীর ছাহেব এবং তাদের দ্বীনি কাজের বিরাট ক্ষতি সাধন করে থাকে। তারা হক্কানী-রব্বানী পীর ছাহেবের সোহ্বতে থেকেও অন্তর বা দিল ইছলাহ্ করা তো দূরের কথা হিদায়েতের আলো হতে চিরতরে বঞ্চিত থাকে।

          সুলতানুল আরিফীন, তাজুল আশিকীন, ছহেবে মিল্লাদুন্না ইল্ম হযরত আবুল হাসান খারকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি একদিন রাত্রে হঠাৎ তাঁর মুরীদগণকে লক্ষ্য করে বলে উঠলেন, হায়! এখন অমুক জঙ্গলে একদল ডাকাত এক বণিক কাফেলার সব ধন-সম্পদ লুট করে নিয়ে গেল এবং অনেক লোককে আহত করে গেল। পরবর্তীতে খবর নিয়ে দেখা গেল সুলতানুল আরিফীন, হযরত আবুল হাসান খারকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি যা বলেছেন তা বাস্তব। ঘটনাক্রমে সে একই রাতে দুস্কৃতিকারীগণ তাঁর গৃহের দরজায় বসে তাঁর ছেলেকে হত্যা করে লাশ গৃহের চৌকাঠের উপর ফেলে রেখে যায়। সুলতানুল আরিফীন, হযরত আবুল হাসান খারকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি কিন্তু এ বিষয়টি আঁচ করতে পারেননি। তা দেখে স্বয়ং সুলতানুল আরেফীন আবুল হাসান খারকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর স্ত্রীই তাঁর মর্যাদা-মর্তবা, বুজর্গী-সম্মান তথা বেলায়েত সম্পর্কে এলোমেলো মন্তব্য করেছে। অথচ এটা সম্পূর্ণ নিষেধ। কেননা আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম গণের বৈচিত্রপূর্ণ জীবন প্রবাহে নানা রহস্যময় ঘটনাই সংঘটিত হয়ে থাকে। যা কোন কোন সময় সাধারণ লোকজন পর্যন্ত উপলব্ধি করতে পারে। আবার কোন সময় তার ব্যতিক্রমও হয়ে থাকে। কিন্তু তার অর্থ এ নয় যে, তাদের বেলায়েত নাকিছ বা অপূর্ণাঙ্গ কিংবা বেলায়েত হাছিল হয়নি। মূলতঃ আল্লাহ্ পাক-এর যা অভিপ্রায় তাই আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ করে থাকেন।

          সুলতানুল আরিফীন, ছহেবে মিল্লাদুন্না ইল্মা হযরত আবুল হাসান খারকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি সেটাই তাঁর স্ত্রীর বিরূপ মন্তব্যের জবাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “যখন দূরবর্তী কাফেলাটি লুণ্ঠিত হচ্ছিল, তখন আমার অন্তর চক্ষুর সম্মুখ হতে সমস্ত যবনিকা গুলো অপসারিত ছিল। কিন্তু যখন আমার পুত্রকে হত্যা করা হয়েছিল, তখন আমার চোখের সামনে যবনিকা ছিল সে কারণে আমার পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি।”

          মূলতঃ হক্কানী-রব্বানী ওলী আল্লাহ্গণ সবক্ষেত্রেই আল্লাহ্ পাক-এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকেন।

          কাজেই সর্বক্ষেত্রেই বিরূপ মন্তব্য করা হতে বিরত থাকা মুরীদের জন্য ফরয ওয়াজিব।

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৯)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪০)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪১)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪২)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৩)