ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৭)

সংখ্যা: ৮৯তম সংখ্যা | বিভাগ:

          -হযরত মাওলানা মুফ্তী মুহম্মদ আব্দুল হালীম

২৯। পীর ছাহেবের ব্যবহৃত কোন বস্ত্র কিংবা অন্য কোন দ্রব্য পেলে তা তাবাররুক বা বকরত মনে করে তার যথাযথ তাযিম-তাকরীম করবে এবং ওজুসহ ব্যবহার করতঃ তার হক্ব আদায় করবে।

          আওলিয়া-ই-কিরামগণের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বস্তুই তাবাররুক তথা বরকতের কারণ। যিনি যত মর্যাদার অধিকারী তাঁর সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও তেমনি মর্যাদা-মর্তবা ও ফযীলতের অধিকারী।

          প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই ইবনে সুলুল ছিল মুনাফিক সরদার। মৃত্যু পর্যন্ত সে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লীল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের সাথে কপটতা করেছিল। যখন তার ইন্তিকাল হলো তখন তার ছেলে, যিনি ছিলেন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিশিষ্ট ছাহাবী। তিনি স্বীয় পিতার প্রতি মুহব্বতের কারণে আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লীল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট জামা মুবারক প্রার্থনা করেছিলেন যাতে কবরের ভয়াবহ আযাব হতে তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই ইবনে সুলুল অব্যহতি লাভ করতে পারে।

          রহমতের নবী, করুণার আঁধার, দয়ার সাগর, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রার্থনা পূরণ করতঃ স্বীয় জামা মুবারক দিলেন একান্ত ছাহাবী আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে। জামা পেয়ে খুশি হয়ে সে জামা মুবারক দিয়েই স্বীয় পিতাকে দাফন করলেন। হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ পরবর্তীতে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্, ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এ জামা মুবারকের বরকতে মুনাফিক সরদার উপকৃত হবে কি-না? তার জাওয়াবে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “যতদিন পর্যন্ত এ জামার একটি সুতা বাকী থাকবে ততদিন সে কবর আযাব হতে নিরাপদ থাকবে।” (সুবহানাল্লাহ্)

          এ সূত্র ধরেই মুরীদগণ তাদের স্ব-স্ব পীর ছাহেবের খিরকা বন্টন করে নেন। যাতে সকলে ফায়দা লাভ করতে পারে। (মাকতুবাতে সাদী)

          ইমামে রব্বানী, গাউছে ছামদানী, মাহবুবে সুবহানী, আফজালুল আওলিয়া, মুজাদ্দিদে আল্ফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বিশ্বখ্যাত কিতাব “মাকতুবাত শরীফ”-এর ভূমিকায় উল্লেখ আছে, “বুরহানুল আশিকীন, সুলতানুল আরিফীন, গাওছে সাকালাইন, হাফিজে মাদারজাত, হযরত মির্জা ছাহেব তিনি তাঁর পীর ছাহেবের টুপি মোবারক তাবাররুক বা বরকত স্বরূপ পেয়েছিলেন। উক্ত টুপি মুবারক তিনি রাতে ভিজিয়ে রাখতেন এবং সকালে তা মর্দন করতঃ তার নিংড়ানো পানিটুকু পান করতেন। পরবর্তীতে তিনি বলেছেন যে, “এ কারণে আমার যেরূপ বাতিনী নিয়ামত প্রাপ্তি তথা উন্নতি হয়েছিল তা অন্য কোন আমল দ্বারা সাধিত হয়নি।” (সুবহানাল্লাহ্)

          একদা ইমামুল আইম্মা, মুজাহিদে আযম, হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি এক ব্যক্তিকে খুশী হয়ে একটি জিনিস দান করেছিলেন। বস্তুটি তেমন মূল্যবান ছিল না। তবুও অন্য এক ব্যক্তি তাঁর নিকট হতে তা অধিক মূল্যে ক্রয় করতে ইচ্ছুক হলো। বললো, “ভাই! তোমার ঐ জিনিসটি আমাকে দাও। আমি তোমাকে তার দ্বিগুণ মূল্য প্রদান করব।” প্রথম ব্যক্তি বললো, “দ্বিগুণ কেন শতগুণ মূল্য দিলেও আমি তা কাউকে দিতে রাজী নই। আমার নিকট হতে ক্রয় করে নিয়ে তুমি যেমন বরকত লাভের আশা কর, আমিও তেমনি তা দ্বারা বরকত হাছিল করতে চাই। সুতরাং দ্বিগুণ কেন শতগুণ, হাজার গুণ বেশী মূল্য দিলেও আমি তা হাত ছাড়া করব না।”

          হযরত ইমাম বায়হাক্বী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর রেওয়ায়েত হতে হযরত ইমাম রবী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইমামুল হুদা ওয়াল আলাম, সাইয়্যিদুল মুজতাহিদীন, হযরত ইমাম শাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি একটি চিঠি দিয়ে আমাকে ইমামুল আইম্মা, হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট প্রেরণ করেন। চিঠি নিয়ে আমি যখন তাঁর খিদমতে উপস্থিত হই তখন তিনি সবেমাত্র ফজরের নামায শেষ করে উঠলেন। যথারীতি সালাম-কালামের পর চিঠিটি আমি তাঁর হাতে সমর্পণ করলাম। হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তা হাতে নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তাতে কি আছে, আপনি পড়ে দেখেছেন কি?” আমি বললাম, “না, আমি পড়িনি।” ইমামুল আইম্মা, হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তখন চিঠিটি খুলে পড়তে শুরু করলেন। পড়তে পড়তে তাঁর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো। তা দেখে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কি ব্যাপার, তাতে কি লেখা আছে?” ইমামুল আইম্মা, হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “ইমাম শাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি লিখেছেন- তিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখেছেন। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বলেছেন যে, “ইমাম আহমদ (রহমতুল্লাহি আলাইহি)কে আমার সালাম জানিয়ে বলো, অনতিবিলম্বে তাঁকে খ¦লকে কুরআনের মহাপরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে। এতে যদি সে সফলকাম হয় তবে পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ্ পাক তাঁর ইল্মকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত টিকিয়ে রাখবেন।

          এ মহা সু-সংবাদ শুনে খুশীর আবেগে ইমামুল আইম্মা, মুজাহিদে আযম, হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজ শরীর মুবারক হতে তাঁর জামা মুবারক খুলে হযরত ইমাম রবী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে দিলেন এবং বললেন, “এটি ইমাম শাফী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে দিবেন আর বলবেন, আমি প্রস্তুত আছি। তিনি যেন আমার জন্য দোয়া করেন।”

          জামা নিয়ে হযরত রবী রহমতুল্লাহি আলাইহি মিশর চলে আসলেন। যথা সময়ে তা তিনি হযরত ইমাম শাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর হাতে সমর্পণ করলেন। ইমামুল আইম্মা, সাইয়্যিদুল মুজাহিদীন, ইমাম শাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি ইমাম রবী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে লক্ষ্য করে বললেন, “জামাটি ভিজিয়ে তার একটু পানি আমাকে দাও। আল্লাহ্ পাক চায় তো তাতেই আমার বরকত হবে।”

৩০। পীর ছাহেবের সম্মুখে উঁচু স্বরে কথা বলবে না। বরং আদব ও শিষ্টতার প্রতি লক্ষ্য রেখে বিনয় ও নম্রতার সাথে কথা বলবে।

          এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন-

ياايها الذين امنوا لاترفعوا اصواتكم فوق صوت النبى ولاتجهروا له بالقول كجهر بعضكم لبعض ان تحبط اعما لكم وانتم لاتشعرون.

অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবী করিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কক্তস্বরের উপর তোমাদের কক্তস্বরকে উঁচু করোনা। এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উচুঁ স্বরে কথা বলো, তাঁর সাথে সেরূপ উচুঁ স্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট হয়ে যাবে, যা তোমরা উপলব্ধি করতে পারবেনা।” (সূরা হুজরাত/২)

          উদ্ধৃত আয়াত শরীফ অবতীর্ণ হওয়ার পর হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের অবস্থার পরিবর্তন হলো। ছিদ্দিকে আকবর, আফযালুন্ নাছ বা’দাল আম্বিয়া, হযরত আবূ বকর ছিদ্দিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আরজ করলেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্, ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আল্লাহ্র কসম! এখন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আপনার সাথে অতি স্বল্প আওয়াজে কথা বলবো।” (বায়হাক্বী শরীফ)

          আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন, লিসানুল্লাহ্, হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এ আয়াত শরীফ নাযিল হওয়ার পর হতে এমন আস্তে আস্তে কথা বলতেন যে, প্রায়শই পুনঃরায় জিজ্ঞেস করতে হতো। (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, তিরমিযী শরীফ, আবু দাউদ শরীফ, নাসায়ী ও ইবনে মাযাহ শরীফ)

          আর ছহেবে রসূলিল্লাহ্ হযরত সাবেত ইবনে কায়েস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর কক্তস্বর স্বভাবতই উচুঁ ছিল। এ আয়াত শরীফ শুনে তিনি ভয়ে সংযত হলেন এবং কক্তস্বর নীচু করলেন। (তাফসীরে দুররে মানসুর)

          আর এ সমস্ত ব্যক্তিবর্গের প্রতি খোশ খবরী প্রদান পূর্বক আল্লাহ্ পাক বলেন,

ان الذين يغضون اصواتهم عند رسول الله اولئك الذين امتحن الله قلوبهم للتقوى لهم مغفرة واجر عظيم.

অর্থঃ- “যারা আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে নিজেদের কক্তস্বর নীচু করে আল্লাহ্ পাক তাদের অন্তরকে তাকওয়া বা পরহেজগারীর জন্য শোধিত করেছেন। আর তাঁদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।” (সূরা হুজরাত/৩)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৮)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৯)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪০)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪১)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪২)