-হযরত মাওলানা মুফ্তী মুহম্মদ আব্দুল হালীম
২৬। পীর ছাহেবের নিকট থেকে প্রস্থান কালে তাঁকে কখনও পিঠ প্রদর্শন করবে না। বরং ফিরে আসার সময় তাঁর দিকে মুখ রেখে পিছনের দিকে হেঁটে আসবে। অতঃপর দৃষ্টির আড়াল হলে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারবে।
সুলতানুল মাশায়িখ, কুতুবুল আকতাব, ছহেবে মিল্লাদুন্না ইল্ম, মাখজানুল মা’আরিফাহ্ হযরত আবুল হাছান খারকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রথম জীবনে সূদীর্ঘ বিশ বৎসর যাবত এ অভ্যাস করে নিয়েছিলেন যে, খারকানে এশার নামায জামায়াতের সাথে আদায় করে দীর্ঘ তিন ক্রোশ বা ছয় মাইল পথ পায়ে হেঁটে সুলতানুল আরিফীন, ইমার্মু রসিখীন হযরত বায়েজিদ বোস্তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মাযার শরীফ জিয়ারত করার নিমিত্তে বোস্তাম শহরে উপণীত হতেন। তথায় পৌঁছে তিনি সারারাত ইবাদত-বন্দেগী, কুরআন শরীফ তিলাওয়াত, যিকির-ফিকির করতঃ পরিশেষে তাঁর উছিলা দিয়ে আল্লাহ্ পাক-এর নিকট এ বলে দোয়া করতেন যে, “আয় আল্লাহ্ পাক! সুলতানুল আরিফীন হযরত বায়েজিদ বোস্তামী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে আপনি যে নিয়ামত ও খিল্য়াত দান করেছেন তাঁর কিছু অংশ আমাকেও দান করুন।” প্রতিনিয়ত তিনি এরূপ দোয়া করে রাতেই খারকানে ফিরে আসতেন এবং এশার নামাযের ওজু দ্বারাই ফজরের নামায আদায় করতেন। (সুবহানাল্লাহ্)
স্মর্তব্য যে, এ বিশ বৎসরে তিনি তাঁর মাযার শরীফের দিকে কখনও স্বীয় পিঠ প্রদর্শন করেননি। অর্থাৎ মাযার শরীফকে কখনও পিছনে রাখেননি। বরং প্রতিদিন জিয়ারত হতে প্রত্যাবর্তনকালে মাযার শরীফের দিকে মুখ রেখে পিছনের দিকে হেঁটে সুদূর খারকানে পৌঁছতেন। (সুবহানাল্লাহ্) (তাযকিরাতুল আওলিয়া, হালাতে মাশায়েখে নক্শবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া)
সুলতানুল ওয়ায়েজীন, কুতুবুল আলম, খাজিনাতুর রহমাহ্ হযরত আবু ওছমান হীরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “শাইখুল উলামা ওয়াল মাশায়িখ, আফজালুল আওলিয়া, মাহবুবে ইলাহী হযরত আবু হাফস্ রহমতুল্লাহি আলাইহি একদা রাগ করে আমাকে তাঁর দরবার শরীফ হতে বের করে দিলেন এবং বললেন, “তুমি দ্বিতীয়বার আমার সামনে আসবে না।” আমি কিছুই বললাম না। তবে মনে মনে খুবই কষ্ট পেলাম। তথাপি ইচ্ছা হলো না যে, আপন শায়খকে ছেড়ে চলে যাই। অগত্যা তাঁর দিকে মুখ করে কাঁদতে কাঁদতে পিছনের দিকে হেঁটে চললাম এবং তাঁর চোখের আড়াল হলাম। আমার মন খুবই বিচলিত হলো, আমি পীর ছাহেবের গৃহের আড়ালে এক স্থানে লুকিয়ে থাকলাম। পরে পার্শ্বের বেড়ায় একটি ছিদ্র করে তার মধ্য দিয়ে পীর ছাহেবের চেহারা মোবারক দেখলাম এবং ভাবলাম আমি চলে যাব না, আর হুকুম ব্যতীত তাঁর সামনেও হাজির হবো না। এমতাবস্থায় কিছুকাল কেটে গেল। আল্লাহ্ পাক-এর রহমতের দৃষ্টি আমার উপর পতিত হলো। একদা তিনি আমাকে দেখে নিকটে ডাকলেন এবং খুশি হয়ে নিজের কন্যাকে আমার সাথে বিবাহ্ দিলেন।” (তাযকিরাতুল আওলিয়া)
২৭। স্বীয় পীর ছাহেবের সোহ্বত বা সংসর্গকে আল্লাহ্ পাক-এর অন্যতম নিয়ামত মনে করতঃ তাঁর সোহ্বত তথা মোলাকাতকেই নিজের জন্য লাজিম করে নিবে।
সমসাময়িক অন্য কোন আওলিয়া-ই-কিরামকে প্রাধান্য দিয়ে তাঁর সোহ্বত হাছিল করা বা প্রত্যাশী হওয়া কিংবা তাঁর ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহ্র প্রয়োজন অনুভব করা বোকামীর নামান্তর। জেনে রাখা আবশ্যক, আল্লাহ্ পাক হচ্ছেন- নিয়ামত দানকারী আর স্বীয় পীর ছাহেব হচ্ছেন- তার উছীলা বা মাধ্যম। অর্থাৎ মুরীদের নছীবে যা থাকবে তা পীর ছাহেবের মাধ্যমেই হাছিল হবে। সেক্ষেত্রে মুরীদের অন্য পীর ছাহেব, ওলী বা মাযার শরীফের দিকে দৃষ্টি দেয়া সময়ের অপচয় এবং নিয়ামত প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অন্তরায় ছাড়া আর কিছুই নয়।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, ইমামুশ্ শরীয়ত ওয়াত্ ত্বরীকত, ইমামুল আইম্মা, মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ্ দ্বীন, খাজায়ে খাজেখাঁ, সাইয়্যিদ বাহাউদ্দীন মুহম্মদ নক্শবন্দ বোখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “একদিন আমি ইমামুল হুদা, শাইখুল মাশায়িখ, ফক্বীহুল আছর, হযরত খাজা সাইয়্যিদ আমীর কুলাল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর দরবার শরীফে হাজির হওয়ার জন্য রওয়ানা হয়েছিলাম। পথিমধ্যে হযরত খিযির আলাইহিস্ সালাম রাখালের বেশে সওয়ারী অবস্থায় আমার সামনে হাজির হলেন। তাঁর মাথায় টুপি এবং হাতে ছড়ি ছিল। তিনি তুর্কী ভাষায় আমাকে “তুমি আমার ঘোড়া দেখেছ?” এ কথা জিজ্ঞেস করে হাতের ছড়ি দ্বারা আমাকে প্রহার করলেন। আমি কিছুই বললাম না। তিনি কয়েকবার আমার পথ আগলে দাঁড়ালেন। কিন্তু আমি আমার পথ চলা বন্ধ না করে বললাম, “আপনাকে আমি চিনি, আপনি হযরত খিযির আলাইহিস্ সালাম।” তিনি মারাহেল সরাইখানা পর্যন্ত আমার পিছনে পিছনে এসে বললেন, “কিছু সময় আমার নিকট অপেক্ষা কর।” আমি তাঁর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলাম না। অতঃপর হযরত সাইয়্যিদ আমীর কুলাল রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর খিদমতে পৌঁছার পর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “পথে হযরত খিযির আলাইহিস্ সালাম-এর সাথে আপনার মোলাকাত হয়েছিল কিন্তু আপনি তাঁর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেননি কেন?” আমি আরজ করলাম, “হযরত! আমি আপনার প্রতি মুতাওজ্জেহ্ ছিলাম। সেজন্যই তাঁর কথায় কর্ণপাত করিনি।” (হালাতে মাশায়িখে নক্শবন্দিয়া মুজাদ্দেদীয়া)
আরো উল্লেখ্য যে, একবার ইস্পাহানের এক তরুণ যুবক সদরুল উলামা ওয়াল মাশায়িখ, বুরহানুল আশিকীন, হযরত আবুল হাছান নূরী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে খালি পায়ে বাগদাদ অভিমুখে রওয়ানা হলেন। হযরত নূরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর এক মুরীদকে নির্দেশ করলেন, “এক ক্রোশ পথ ঝাড়ণ্ড দিয়ে পরিস্কার করে রাখ। কেননা আমার এক খাঁটি ভক্ত খালি পায়ে আমার সাথে দেখা করতে আসছে।” অতঃপর ঐ ব্যক্তি দরবারে হাজির হলে লোকগণ জিজ্ঞেস করলো, “আপনি কোথা থেকে এলেন?” তিনি জবাব দিলেন, “ইস্পাহান থেকে।”তখন হযরত নূরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, যদি ইস্পাহানের বাদশাহ্ তোমার জন্য হাজার দীনার খরচ করে এক বিরাট প্রাসাদ তৈরী করতেন ও হাজার দীনার মূল্যের এক অতি রূপসী বাঁদী খরিদ করে তা সহ অন্যান্য বস্তু তোমাকে দান করতেন এবং বলতেন, তুমি যে উদ্দেশ্যে ইস্পাহান যাত্রা করছ সে উদ্দেশ্য পরিত্যাগ করতঃ এই দান গ্রহণ কর।” তবে তা ছেড়ে কি আমার সাথে দেখা করার ইচ্ছা বহাল রাখতে?” আসলে বাস্তবেই এরূপ ঘটনা ঘটেছিল। ইস্পাহানের বাদশাহ্ তাকে এরূপ প্রস্তাবই দিয়েছিলো। কিন্তু যুবক তা অবহেলা করে বাগদাদ চলে এসেছেন। অতঃপর সে ঘটনা তিনি হযরত নূরী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মুখে শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলে উঠলেন, “দেখুন, সে কথা বলে আমাকে অপ্রস্তুত করবেন না।”
তখন হযরত নূরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “প্রকৃত মুরীদ এরূপই হয়ে থাকে। যদি তাদেরকে কেউ সমগ্র মাখলুক এনে যিকিরের পরিবর্তে উপহার দিতে চায় তবু তারা সে উপহারের দিকে ফিরে চায় না।” (তাযকিরাতুল আওলিয়া) অর্থাৎ পৃথিবীর কোন ধন-দৌলত, টাকা-পয়সা, নারী-বাড়ী,জ্ঞানী-গুণী, সূফী-দরবেশ সকলের উপর স্বীয় পীর ছাহেবকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে ঐ সমস্ত লোক পীর ছাহেবের পরিপূর্ণ সন্তুষ্টি-রেজামন্দি ও আদর-যতœ এবং মনোযোগ পেয়ে থাকে। পক্ষান্তরে যারা স্বীয় পীর ছাহেবের সোহ্বতের উপর অন্যকে প্রাধান্য দিয়ে সেদিকে মনোনিবেশ করে বা তার ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহ্ লাভের প্রত্যাশী হয় তখন সে উক্ত নিয়ামত হতে বঞ্চিত হয় এবং সফলতাও আর নসীব হয় না।
এ প্রসঙ্গে শাইখুশ শুয়ূখ, সাইয়্যিদুল মুজাহিদীন, সুলতানুল ওয়ায়েজীন, হযরত আলী দাক্কাক রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “যে গাছগুলো আপনা থেকে জন্মে, যাতে কোনরূপ যতœাদি করা হয় না, তাতে পত্র পল্লব হয় বটে কিন্তু প্রায়শঃ সে গাছে ফল ধরে না। যদিও বা ধরে, সে ফল তেমন সুস্বাদু হয় না বরং তা হয় বিস্বাদ, ফলও ধরে কম।
ঠিক একই ভাবে পীর ছাহেব বা শায়খের পক্ষ থেকে যে সকল মুরীদগণ আদর-যত্ন বা মনোযোগ প্রভৃতি লাভ করে না তেমন মুরীদগণ কস্মিনকালেও সফলতা লাভে সক্ষম হয় না।” তিনি আরো বলেন, “এ কথাটি কিন্তু আমার নয়। আমি আমার পীর ছাহেব হযরত আবুল কাসেম নছরাবাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মুখে শুনেছি, আবার তিনিও একথা নিজে বলেন নি, তিনি তাঁর পীর ছাহেব হযরত আবু বকর শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কাছে শুনে বলেছেন।”
২৮। স্বীয় পীর ছাহেবের দেয়া সবক বা অযীফা ভিন্ন অন্য কোন নফল ইবাদত করবে না। কোন নফল ইবাদত করতে হলে পীর ছাহেবের নিকট অনুমতি প্রার্থনা করবে। যদি তিনি অনুমতি প্রদান করেন তবে তা আদায় করবে অন্যথায় তা হতে বিরত থাকবে। কেননা অনেক ক্ষেত্রে তাতে উপকারের চেয়ে অপকারই বেশী হয়ে থাকে।
এ প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে যে, শাইখুশ শুয়ূখ, সাইয়্যিদুল মুজতাহিদীন, সুলতানুল ওয়ায়েজীন, হযরত আবু আলী দাক্কাক রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর এক বণিক মুরীদ একবার রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। হযরত আবু আলী দাক্কাক রহমতুল্লাহি আলাইহি তাকে দেখতে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার রোগের কারণ কি বলতো?” সে মুরীদ বললো, “সেদিন রাতে আমি তাহাজ্জুদ নামায পড়ার জন্য ঘুম থেকে উঠে ওজু করে যেই মাত্র নামাযের জন্য দাঁড়িয়ে গেলাম তখন হঠাৎ আমার ভীষণ কোমর ব্যাথা শুরু হয়ে গেল এবং সাথে সাথে মারাত্মাক জ্বর উঠলো।”
সে মুরীদের কথা শুনে হযরত আবু আলী দাক্কাক রহমতুল্লাহি আলাইহি অত্যন্ত ত্রুদ্ধভাবে বললেন, “তোমার তাহাজ্জুদ নামায আদায় করার এমনকি প্রয়োজন ছিল? তোমার জন্য তো এই যথেষ্ট ছিল যে, তুমি দুনিয়াবী লিঞ্ঝা পরিহার করে সৎ পথে থাকবে। এটা তোমার জন্য তাহাজ্জুদ নামায অপেক্ষা বেশী ভাল হত। এরূপ না করার ফলে তো তুমি সর্বদাই কোমর ব্যাথায় ভুগবে। আর দৃষ্টান্ত এই যে, যেমন কোন ব্যক্তির মাথায় বেদনা শুরু হল কিন্তু সে ওষুধ ব্যবহার করলো পায়ে কিংবা কারও হাতে নাপাক লেগেছে সে বসে গেল জামার আস্তিন পরিস্কার করতে। এ ধরনের কাজ একেবারেই অর্থহীন।” (তাযকিরাতুল আওলিয়া)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৫)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৭)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৮)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৯)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪০)