ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর সাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৩)

সংখ্যা: ৮৫তম সংখ্যা | বিভাগ:

          -মাওলানা মুহম্মদ আব্দুল হালীম

২৪। পীর সাহেবের সম্মুখে অন্য কোন পীর সাহেবের প্রশংসা করবে না। “তামহীদ” কিতাবে উল্লেখ আছে, “স্বীয় পীর সাহেবের সম্মুখে অন্য পীর সাহেবের প্রশংসা করা নেহায়েত বেয়াদবী।

          পীর সাহেব হচ্ছেন মুরীদের জন্য শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। কেননা নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের তিরোধানের পর পীর সাহেব হচ্ছেন, আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মা’রিফাত ও মুহব্বত লাভের একমাত্র  উছীলা বা মাধ্যম। মুরীদের জীবনের সমস্ত কামনা-বাসনা, চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাঙ্খা ও মা’রিফাত-মুহব্বতের কেন্দ্রস্থল হচ্ছেন- স্বীয় পীর সাহেব।

          কাজেই মুরীদের অন্তরের কানায় কানায় বিরাজ থাকবে স্বীয় পীর সাহেবের মুহব্বত। যার জজবা থাকবে শিরা-উপশিরা, ধমনীতে, রক্তের প্রতিটি কণায়। উঠা-বসা, খাওয়া-দাওয়া সব সময় উদ্ভাসিত হবে তাঁর মুখচ্ছবি।

তাঁর মুহব্বত-ভালবাসা ও সন্তুষ্টি পাওয়ার আশাই থাকবে দায়েমীভাবে অন্তরে বদ্ধমূল। পৃথিবীর সবকিছুর উর্ধ্বে থাকবেন তিনি। সর্বোপরি তাঁর মুহব্বতেই সে পাবে অন্তরের প্রশান্তি, পাবে পরম এত্মিনান।

          এরূপ অবস্থাকে আফজালুল আওলিয়া, মাহবুবে সোবহানী, কুতুবে রব্বানী, সাইয়্যিদুল মুজতাহিদীন, শায়িখ আহমাদ ফারুকী সিরহিন্দী হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি “কাল্বের ফানা” বলে অভিহিত করেছেন। যা মা’রিফাত-মুহব্বত লাভের প্রথম পদক্ষেপ।”

          সুতরাং স্বীয় পীর সাহেব ভিন্ন অন্য কারো গুণাবলী বর্ণনা করা বা দেখার সময় কোথায়? নিজ পীর সাহেবের সম্মুখে অন্যের সানা-সীফাত বর্ণনা করার অর্থই হচ্ছে- স্বীয় পীর সাহেবের উপর তাকে প্রাধান্য দেয়া, পীর সাহেবের চেয়ে তাকে বেশী মুহব্বত করার বহিঃপ্রকাশ।

          তিনি আরো বলেন, “মুরীদের লক্ষ্য একদিকে রাখা শর্ত। বিভিন্ন দিকে লক্ষ্য রাখার অর্থই হচ্ছে ক্ষতির দিকে নিজেকে পরিচালনা করা। অর্থাৎ সর্ব বিষয়ে স্বীয় পীর সাহেবকে প্রাধান্য দেয়া মুরীদের জন্য আবশ্যক। কেননা যে ব্যক্তি একস্থানে সে মূলতঃ সর্বস্থানে এবং যে সর্বস্থানে তার কোন স্থানই নেই। ইহা বিলায়েতের মর্তবার পূর্ণতাসমূহের সুসংবাদদাতা। যা যোগ্যতার তারতম্যানুযায়ী তালিব বা সালিকগণ পেয়ে থাকে।” (মাকতুবাত শরীফ)

          আওলিয়া-ই-কিরামগণের পবিত্র জীবন মোবারকে এ বাস্তব রূপটি খুবই গভীরভাবে ফুটে উঠেছিল। তারা নিজ পীর সাহেবের নিকট অন্যের প্রশংসা করাতো দুরের কথা পীর সাহেবের সামনেও যদি কোন বুযুর্গ ব্যক্তিই উপস্থিত হতেন, তারা তার প্রতি কোন প্রকার দৃষ্টিপাতও করতেন না। যদিও বা তিনি অনেক গুণে গুণান্বিত থাকতেন।

          এ প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে যে, একদা ইমামুশ্ শরীয়ত ও ত্বরীকাত, ইমামুর রাসিখীন, সুলতানুল হিন্দ, গরীবে নেওয়াজ, হাবীবুল্লাহ্ খাজা মুঈনুদ্দীন চিশ্তী আজমিরী, সানজিরী রহমতুল্লাহি আলাইহি দিল্লীতে তাশরীফ আনলেন। একান্ত মুরীদ ও প্রধান খলীফা সুলতানুল আরিফীন খাজা কুতুবুদ্দীন বখ্তিয়ার কাক্বী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে সাথে নিয়ে শাইখুল ইসলাম হযরত শায়খ ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শকর রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর হুজরা শরীফে গেলেন এবং শাইখুল ইসলাম, বাবা ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শকর রহমতুল্লাহি আলাইহিকে উভয়ের মাঝখানে রেখে দীর্ঘক্ষণ ধরে এ বলে দোয়া করলেন যে, “আয় আল্লাহ্ পাক! আপনি ফরীদকে কবুল করুন।” সে সময় গায়েব হতে আওয়াজ আসলো, আমি ফরীদকে কবুল করলাম। (সুবহানাল্লাহ্)

          অতঃপর তাঁরা উভয়েই তাঁকে প্রচুর পরিমাণে রূহানী ফয়েজ দান করলেন এবং বললেন, “ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শকর রহতুল্লাহি আলাইহি এমন একটি প্রদীপ  যা আমাদের সিলসিলাকে উজ্জ্বল করবে এবং যুগের অদ্বিতীয় হবে।” হযরত সুলতানুল হিন্দ, হাবীবুল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁকে “বাবা” বলে সম্বোধন করতেন। এ বরকতেই আজ পর্যন্ত তাঁকে এ লক্বব বা উপাধিতে স্মরণ করা হয়। উভয়ে ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শকর রহতুল্লাহি আলাইহিকে ফয়েজ-তাওয়াজ্জু প্রদানের পর হযরত কুতুবুল আক্তাব, বখ্তিয়ার কাক্বী রহমতুল্লাহি আলাইহি ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শকর রহতুল্লাহি আলাইহিকে লক্ষ্য করে বললেন, “তোমার দাদা পীর সাহেব তথা সুলতানুল হিন্দ, হাবীবুল্লাহ্, গরীবে নেওয়াজ খাজা মুঈনুদ্দীন চিশ্তী রহতুল্লাহি আলাইহি-এর কদমবুছী কর।” তখন ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শকর রহতুল্লাহি আলাইহি স্বীয় পীর সাহেব খাজা বখ্তিয়ার কাক্বী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কদমবুছী করলেন।” তিনি আবার বললেন, “তোমার দাদা পীর সাহেবের কমদবুছী কর।” এবারও তিনি স্বীয় পীর সাহেব, কুতুবুল আকতাব হযরত বখতিয়ার কাক্বী রহমাতুল্লাহি আলাইহির কদমবুছী করলেন। এমনিভাবে তিনি পর পর তিনবার স্নেহের একান্ত মুরীদ বাবা হযরত ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শকর রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে তাঁর দাদা পীর সাহেব-এর কদমবুছী করতে বললেন; কিন্তু প্রতিবারই ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শকর রহতুল্লাহি আলাইহি স্বীয় পীর সাহেবেরই কদমবুছী করলেন।

          ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শকর রহতুল্লাহি আলাইহি-এর এহেন আচরণ দেখে খাজা বখ্তিয়ার কাক্বী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “আমি তোমাকে বললাম,  তোমার দাদা পীর সাহেবের কদমবুছী কর, তুমি তা না করে আমার কদমবুছী করলে কেন?”

          ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শকর রহতুল্লাহি আলাইহি উত্তর দিলেন, “আমি তো কেবলমাত্র একজোড়া কদম মোবারক ব্যতীত আর কোন কদমই দেখতে পাইনি।” এ জবাব শুনে সুলতানুল হিন্দ, হাবীবুল্লাহ্ খাজা মুঈনুদ্দীন চিশ্তী আজমিরী, সানজিরী রহমতুল্লাহি আলাইহি খুশী হয়ে বললেন, “হে কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি! ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শকর রহতুল্লাহি আলাইহি ঠিকই বলছে। সে মঞ্জিলের দরজায় পৌঁছে গেছে, সেখানে এক ভিন্ন দ্বিতীয়র কোন অস্তিত্ব নেই। কাজেই তথায় তুমি ভিন্ন আমি তাঁর দৃষ্টিপথে আসব কেন?”

          স্মর্তব্য যে, আওলিয়া-ই-কিরাম, ইমাম-মুজতাহিদগণ এ পরম নিয়ামত, এ শিক্ষা  “সীনা ‘ব’ সীনা” যোগে খোদ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রাপ্ত হয়েছেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে,

عن جابر رضى الله عنه قال حين اتاه عمر بن الخطاب رضى الله عنه قال انا نسمع احاديث من يهود تعجبنا افترى ان نكتب بعضها فقال امتهوكون انتم كما تهوكت اليهود والنصارى لقد جئتكم بها بيضاء نقية ولو كان موسى حيا ماوسعه الا اتباعى.

অর্থঃ- “হযরত জাবির রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একদিন হযরত ওমর ফারুক রদিয়াল্লাহু আনহু হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমরা ইহুদীদের নিকট থেকে এমন কিছু কথা শুনি যাতে আশ্চর্য্যবোধ করি। তা থেকে কিছু কি আমরা লিখে রাখব? তখন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুম! তোমরা কি ইহুদী-নাসারাদের মত ইসলাম সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্থ রয়েছ? নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ, উজ্বল দ্বীন নিয়ে এসেছি। এমনকি যদি ইহুদীদের নবী হযরত মূসা আলাইহিস্ সালামও জীবিত থাকতেন তবে তাঁর উপরও আমার দ্বীন মানা ওয়াজিব হতো।” (আহমদ, বায়হাকী, মিশকাত শরীফ/৩০)

          আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হচ্ছেন, সমস্ত নবীগণের নবী, রসূলগণের রসূল। তাঁর পৃথিবীতে শুভাগমণের সাথে সাথে পূর্ববর্তী সমস্ত ধর্ম বাতিল হয়েছে। পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবের হুকুম রহিত হয়ে গেছে।

          সুতরাং তাঁর উপর পূর্ববর্তী নবী-রসূলগণকে প্রাধান্য দেয়া কিংবা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনীত বিধানাবলীর উপর অন্য বিধানাবলীকে প্রাধান্য দেয়া এবং সে বিধানাবলীর প্রতি মনোনিবেশ করা যেমন অনুচিত, তেমনি স্বীয় পীর সাহেবের উপর অন্য কাউকে প্রাধান্য দেয়া, তার রীতি-নীতি তর্জ-ত্বরীকা পরিত্যাগ করে অন্য পীর সাহেবের রীতি-নীতি, মত-পথ বা আদর্শ গ্রহণ করা এবং তার প্রতি আগ্রহান্বিত হওয়া চরম বেয়াদবীর নামান্তর।

          আর স্বীয় পীর সাহেবের সাথে বেয়াদবীমূলক আচরণ করে তাঁরই দরবার শরীফে  বা সোহ্বতে থাকা-না থাকা বরাবর। বরং অনেক ক্ষেত্রে মারাত্মক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে প্রবল। কেননা তাসাউফ তথা আল্লাহ্ পাক-এর মা’রিফাত-মুহব্বতের পথটি “আদব” দ্বারা পরিবেষ্টিত।

          তাই জনৈক বুযুর্গ বলেছেন,

ادبوا النفس ايها الاصحاب طرق العشق كلها اداب.

অর্থঃ- “হে বন্ধুগণ! নিজেকে আদবের অলংকারে ভূষিত কর। কেননা ইশ্ক বা মুহব্বতের রাস্তাগুলো আদবের সাথে সংশ্লিষ্ট।”

          ইমামুশ্ শরীয়ত ওয়াত্ ত্বরীকত, হযরত জুন্নুন মিসরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,

اذا خرج المريد عن استعمال الادب فانه يرجع من حيث جاء.

অর্থঃ- “মুরীদ যখন আদব বা শিষ্টাচার বহির্ভূত আমল করবে তখন সে যেখান থেকে এসেছে সেখানেই প্রত্যাবর্তন করবে। অর্থাৎ আদব বিহীন আমল দ্বারা কামিয়াবীর আশা করা সুদূঢ় পরাহত।” (মাদারিজুস্ সালেকীন-২/৩৯০)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর সাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৪)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৫)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৬)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৭)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৮)