-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ শোয়াইব আহমদ
শরীয়ত অনুযায়ী প্রত্যেক ফরয ও ওয়াজিব নামাযের জন্য সময় নির্দিষ্ট আছে। সেই নির্দিষ্ট সময়ে নামায না আদায় করে পরে সেই নামায আদায় করাকে ক্বাযা নামায বলা হয়। বিশেষ কোন কারণ ব্যতীত ফরয বা ওয়াজিব নামায নির্দিষ্ট সময়ে আদায় না করা কবীরা গুণাহ্।
অতএব, ইচ্ছাকৃত বা ভুলক্রমে বা নিদ্রা যাওয়ার কারণে যদি কোন ফরয বা ওয়াজিব ছুটে যায় তবে স্মরণ হওয়া মাত্রই বা সময় পাওয়া মাত্রই তা আদায় করে নিতে হবে এবং যথাসময় আদায় না করার কারণে যে গুণাহ্ হয়েছে তা ক্ষমা লাভের জন্য বারংবার তওবা করতে হবে। কোন ফরয বা ওয়াজিব নামায ছুটে গেলে তার ক্বাযা আদায় না করে পরবর্তী ওয়াক্তিয়া নামায আদায় করলে তা আদায় হবেনা।
যদি কারো পাঁচ ওয়াক্তের নামায ও বিত্রের নামায ছুটে গিয়ে থাকে তবে তার এ নামাযগুলো তরতীবানুযায়ী ক্বাযা আদায় করে পরের দিনের ওয়াক্তিয়া নামায আদায় করতে হবে অর্থাৎ প্রথম ফযর, তারপর যোহ্র, তারপর আছর, মাগরীব, ইশা ও বিত্র এই তরতীবানুযায়ী ক্বাযা আদায় করার পর, পরের দিনের ওয়াক্তিয়া নামায আদায় করতে হবে। এই তরতীবানুযায়ী ক্বাযা আদায় না করলে ওয়াক্তিয়া নামায আদায় হবেনা। এরূপ ব্যক্তিকে ছাহিবে তরতীব বলা হয়। এই তরতীব ফরয।
ছাহিবে তরতীব, ক্বাযা নামায ছেড়ে ওয়াক্তিয়া নামায আদায় করলে সেই ওয়াক্তিয়া নামায পুনঃ দোহ্রিয়ে আদায় করতে হবে। না দোহ্রালে তাও ক্বাযা নামাযের মধ্যে শামীল হয়ে যাবে। তিনটি কারণে উপরোক্ত তরতীব রহিত হয়ে যায়। যথা- (১) সময়ের সংকীর্ণতা অর্থাৎ ক্বাযা আদায় করে ওয়াক্তিয়া নামায আদায় করতে গেলে যদি ওয়াক্তিয়া নামাযের সময় চলে যায় তবে ওয়াক্তিয়াই আগে আদায় করতে হবে।
(২) যদি ক্বাযা নামাযের কথা স্মরণে না থাকে ওয়াক্তিয়া নামায আদায় করার পর যদি ক্বাযা নামাযের কথা স্মরণ হয় তবে ওয়াক্তিয়া নামায আর দোহ্রাতে হবেনা। আদায় হয়ে যাবে। (৩) ছয় ওয়াক্ত বা ততোধিক নামায ক্বাযা হলে অর্থাৎ কারো যদি ছয় ওয়াক্ত নামায বা তার চেয়ে বেশী নামায ছুটে গিয়ে থাকে তবে তার পক্ষে ক্বাযা আদায় না করে ওয়াক্তিয়া আদায় করলেও নামায শুদ্ধ হবে এবং ক্বাযা নামাযগুলো তরতীব মত আদায় না করলেও কোন ক্ষতি হবেনা।
কোন ব্যক্তির যোহ্র ও আছর দুই ওয়াক্তের নামায ক্বাযা হয়ে গেলে, এমতবস্থায় মাগরিবের সময় এত কম রয়েছে যে, যদি যোহ্র ও আছরের দুই ওয়াক্তের ক্বাযা আদায় করতে যায় তবে মাগরিবের সময় চলে যাবে; কিন্তু এক ওয়াক্তের ক্বাযা আদায় করলে কোন মতে মাগরিব আদায় করতে পারবে। এমতাবস্থায় যোহ্রের ক্বাযা আদায় করে মাগরিব আদায় করবে। আছরের ক্বাযা পরে আদায় করবে।
নাবালেগ ছেলে মেয়ে যদি ইশার নামায না আদায় করে ঘুমিয়ে পড়ে, নিদ্রা ত্যাগ করার পর বালেগ হবার কোন আলামত প্রকাশ হলে তাদের ইশা ও বিত্রের নামায ক্বাযা আদায় করতে হবে।
ভুলক্রমে ইশার নামায যদি কেউ ওজু বিহীন অবস্থায় আদায় করে, সুন্নত ও বিত্র আদায় করে ওজু করা অবস্থায় তবে ইশার ফরযের সাথে সুন্নতও পুনরায় আদায় করতে হবে।। তবে বিত্র আদায় করতে হবেনা। এটা হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মত। ছাহেবাইনের মতে বিত্রও পুনরায় আদায় করতে হবে। ক্বাযা নামাযের নিয়তে “ছলাতি ফাওতিল ফায্রি বা উমরী ক্বাযা যুহ্রী” ইত্যাদি শব্দ সংযুক্ত করতে হবে।
যে ক্বাযা নামাযের কথা নিশ্চিত জানা নেই অর্থাৎ সাবালেগ অবস্থায় নামায ক্বাযা ও নষ্ট হয়েছে কিনা এ সন্দেহ দূর করার জন্য যে নামায আদায় করা হয় তাকে উমরী ক্বাযা বলে। যা যথাশীঘ্র আদায় করা ওয়াজিব।
নফল নামায আদায় করার চেয়ে উমরী ক্বাযা আদায় করা শ্রেয় যদিও তা নফলের পর্যায়ভুক্ত হয়ে যায়, ফরয ও ওয়াজিব থাকেনা। ক্বাযা নামায ঘরে আদায় করা উত্তম।
ক্বাযা নামাযের বর্ণনায় “ফতওয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবে উল্লেখ আছে, “বিত্রের উমরী ক্বাযা আদায়কালে তিন রাকায়াত যথারীতি আদায় করে (শেষ রাকায়াতে দোয়ায়ে কুনুত পড়ার পর তৃতীয় রাকায়াতের তাশাহ্হুদে বসার পর) সালাম না ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে এবং সূরা ফাতিহা ও তৎসঙ্গে যে কোন সূরা পড়ে রুকু, সিজদাহ্ করে (এক রাকায়াত যোগ করে) বসে তাশাহ্হুদ, দরূদ শরীফ ও দোয়ায়ে মাছূরা পাঠ করতঃ সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করবে।
মাগরিবের নামাযেও এরূপ তিন রাকায়াত আদায় করে সালাম না ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে এবং সূরা ফাতিহা ও কোন সূরা মিলিয়ে যথারীতি বাকি এক রাকায়াত আদায় করে সালাম ফিরাবে।
কারণ উমরী ক্বাযা, নফল আকারে আদায় করতে হবে আর নফল বেজোড় হয়না। নিয়তে রাকায়াত সংখ্যা জরুরী নয়। “আমার জিম্মায় যত ফযরের বা যোহ্রের বা আছরের ইত্যাদি নামায আছে তন্মধ্যে সর্বপ্রথম যে ওয়াক্ত রয়েছে সেই ওয়াক্তের নিয়ত করলাম।” এভাবে প্রত্যেক ওয়াক্তের নিয়ত করতে থাকবে আর ক্বাযা নামায আদায় করতে থাকবে।
ক্বাযা নামায নিষিদ্ধ তিন ওয়াক্ত (সূের্যাদয়, দ্বিপ্রহর ও সূর্যাস্ত) ছাড়া যে কোন সময় আদায় করা যায়।
ফিক্বহুস সুনান মুদরেক, মাসবুক ও লাহেকের নামায আদায়ের বয়ান
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৫৩)
ফিক্বহুস সুনান নামায ভঙ্গকারী বিষয়সমূহের বয়ান