শা’বান মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা
-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ শোয়াইব আহমদ
হিজরী সনের অষ্টম মাস শা’বান। “শা’বান” শব্দটি আরবী এবং এটি “শু’বুন” মাছদার বা ক্রিয়ামূল হতে এসেছে। যার অর্থ হচ্ছে শাখা-প্রশাখা।
বর্ণিত হয়েছে, অন্যান্য মাস অপেক্ষা এ মাসে নেক আমলের শাখা-প্রশাখা বৃদ্ধি হওয়ায় এ মাসটিকে শা’বান নামে নামকরণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সোমবার দিন, জুমুয়ার দিন, আরাফার দিন, ঈদুল ফিতরের দিন ও ঈদুল আযহার দিন এ পাঁচটি সর্বাধিক ফযীলতপূর্ণ ও সম্মানিত দিনের ন্যায় উম্মতে মুহম্মদীকে পাঁচটি রাত্রি এমন দেয়া হয়েছে যা ফযীলত ও সম্মানের দিক থেকে সকল রাত্রি থেকে শ্রেষ্ঠ এবং সে সকল রাত্রিতে আল্লাহ্ পাক উম্মতে মুহম্মদীর দোয়া বিশেষভাবে কবুল করে থাকেন।
এ মর্মে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
ان الدعاء يستجاب فى خمس ليال اول ليلة من رجب وليلة النصف من شعبان وليلتى العيدين وليلة القدر المباركة.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই পাঁচ রাত্রিতে (বিশেষভাবে) দোয়া কবুল হয়। রজব মাসের পয়লা রাত্রি, শা’বানের মধ্য রাত্রি অর্থাৎ শা’বানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত্রি, ঈদুল ফিত্র ও ঈদুল আযহার দু’রাত্রি এবং বরকতপূর্ণ ক্বদরের রাত্রি।”
এছাড়া রজব মাসের পয়লা শুক্রবার লাইলার্তু রাগায়িব এবং সাতাশ তারিখ লাইলাতুল মি’রাজ-এর রাত্রি দু’টিও বিশেষ ফযীলতপূর্ণ।
বলার অপেক্ষা রাখেনা, উল্লিখিত রাত্রিগুলো সম্মানিত ও ফযীলতপূর্ণ হওয়ার পিছনে অবশ্যই বিশেষ কোন কারণ নিহিত রয়েছে। তবে এখানে আলোচিত শা’বান মাসটির সম্মান ও ফযীলতের কারণই কেবল উল্লেখ করা হলো।
আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
انا انزلنه فى ليلة مبركة انا كنا منذرين فيها يفرق كل امر حكيم.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আমি কুরআন শরীফ নাযিল করেছি এক বরকতময় রাত্রিতে। নিশ্চয়ই আমি ভীতি প্রদর্শনকারী। উক্ত রাত্রিতে প্রতিটি প্রজ্ঞাসম্পন্ন বিষয় ফায়ছালা করা হয়।” (সূরা দু’খান/৩,৪)
বর্ণিত এআয়াত শরীফে “লাইলাতুম্ মুবারাক্বা” হচ্ছে লাইলাতুন্ নিছফি মিন শা’বান বা বরাতের রাত্রি। এ রাত্রিতে আল্লাহ্ পাক তাঁর কালাম “কুরআন শরীফ” তাঁর পিয়ারা হাবীব আখিরী রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি নাযিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
আর এ রাত্রিতে আরো যে সকল প্রজ্ঞাসম্পন্ন বিষয়ের ফায়ছালা করা হয় সে সম্পর্কে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
فيها ان يكتب كل مولود من بنى ادم فى هذه السنة وفيها ان يكتب كل هالك من بنى ادم فى هذه السنة وفيها ترفع اعمالهم وفيها تنزل ارزاقهم.
অর্থঃ- “এ রাত্রিতে(আগামী এক বছরে) যে সকল আদম সন্তান জন্মগ্রহণ করবে এবং ইন্তিকাল করবে তাদের তালিকা লিপিবদ্ধ করা হয়, তাদের রিযিকের ফায়ছালা করা হয় এবং তাদের (বিগত এক বছরের) আমলনামা আল্লাহ্ পাক-এর নিকট পেশ করা হয়।” (বাইহাক্বী শরীফ)
তাই এ মুবারক রাত্রিতে ইবাদত-বন্দেগী করা, দিনে রোযা রাখার ব্যাপারে এবং আখিরী রসূল হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “যখন শা’বান মাসের ১৫ তারিখ উপস্থিত হয় তখন ঐ রাত্রিতে তোমরা নামায পড় এবং দিনে রোযা রাখ। কেননা আল্লাহ্ পাক ঐ দিন সূর্যাস্তের পর থেকে পৃথিবীর আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ ক্ষমাপ্রার্থী আছ কি? তাকে আমি ক্ষমা করে দিব। কেউ রিযিকপ্রার্থী আছ কি? তাকে রিযিক দান করব। কেউ বিপদগ্রস্থ আছ কি? তার বিপদ দূর করে দিব। আল্লাহপাক ফজর পর্যন্ত এভাবে প্রত্যেক হাজতমান্দকে ডেকে বলতে থাকেন।” (ইবনে মাজাহ্ শরীফ)
অপর রেওয়ায়েতে এসেছে, “যে ব্যক্তি শবে বরাতের রোযা রেখে ইফতার করার সময় আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি তিনবার দরূদ শরীফ পাঠ করবে আল্লাহ্ পাক তার পূর্বের সমস্ত গুণাহ্ ক্ষমা করে দিবেন এবং তার রিযিকে বরকত দান করবেন।”
কাজেই এ বরকতপূর্ণ ক্ষমার রাত্রিতে প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উচিত হবে সারা রাত্রি জেগে ইবাদত-বন্দেগী করা, ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং দিনের বেলায় রোযা রাখা।
আল্লাহ্ পাক আমাদের সকলকে তাওফিক দান করুন। (আমীন)
রমাদ্বান শরীফের ফযীলত
-হাফিযে হাদীস, হযরত মাওলানা মুহম্মদ ফজলুল হক।
মহান আল্লাহ্ পাক অন্যান্য মাসের তুলনায় রমাদ্বান মাসকে আলাদা খুছুছিয়ত ও বৈশিষ্ট্য দান করেছেন।
হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, “আল্লাহ্ পাক হচ্ছেন সমস্ত কায়েনাতের খালিক্ব বা সৃষ্টিকর্তা। সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মাখলুকের তুলনায় আল্লাহ্ পাক-এর যেরূপ ফযীলত, মর্যাদা ও মর্তবা রয়েছে অন্যান্য মাসের তুলনায় রমাদ্বান শরীফেরও তদ্রুপ ফযীলত, মর্যাদা ও মর্তবা রয়েছে। (সুবহানাল্লাহ্)
পবিত্র রমাদ্বান শরীফের ফযীলত সম্পর্কে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-
عن سلمان الفارسى رضى الله عنه قال خطبنا رسول الله صلى الله عليه وسلم فى اخر يوم من شعبان فقال يايها الناس قد اظلكم شهر عظيم شهر مبارك شهر فيه ليلة خير من الف شهر جعل الله صيامه فريضة وقيام ليله تطوعا من تقرب فيه بخصلة من الخير كان كمن ادى فريضة فيما سواه ومن ادى فريضة فيه كان كمن ادى سبعين فريضة فيما سواه وهو شهر الصبر والصبر ثوابه الجنة وشهر المواسة وشهر يزاد فيه رزق المؤمن من فطر فيه صائما كان له مغفرة لذنوبه وعتق رقبته من النار وكان له مثل اجره من غير ان ينتقص من اجره شئ قلنا يا رسول الله صلى الله عليه وسلم ليس كلنا نجد ما نفطربه الصائم فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم يعطى الله هذا الثواب من فطر صائما على مذقة لبن اوتمرة او شربة من ماء ومن اشبع صائما سقاه الله من حوضى شربة لايظمأ حتى يدخل الجنة وهو شهر اوله رحمة واوسطه مغفرة واخره عتق من النار ومن خفف عن مملوكه فيه غفر الله له واعتقه من النار.
অর্থঃ- “হযরত সালমান ফারসী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি শা’বান মাসের শেষ তারিখে আমাদের উদ্দেশ্যে খুৎবা দান করতঃ বলেন, একটি মহান ও কল্যাণময় মাস তোমাদের উপর ছায়া বিস্তার করেছে। এটা এমন একটি মাস যাতে এমন একটি রাত্র রয়েছে, যা হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ্ পাক এ মাসের রোযাসমূহ (তোমাদের জন্য) ফরয করেছেন এবং এর রাত্রিতে নামায আদায় করাকে নফল করেছেন। যে ব্যক্তি এ মাসে আল্লাহ্ পাক-এর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে একটি নফল কাজ করলো সে যেন অন্য মাসে একটি ফরয কাজ সম্পন্ন করলো। আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরয কাজ সম্পন্ন করলো সে যেন অন্য মাসে সত্তরটি ফরয কাজ সম্পন্ন করলো। এটা ধৈর্যের মাস। আর ধৈর্য এমন একটি গুণ যার প্রতিদান হলো “জান্নাত”। এটা পারস্পরিক সহানুভূতির মাস। এটা এমন মাস যাতে মু’মিনের রিযিক বৃদ্ধি করা হয়। এ মাসে যে ব্যক্তি একজন রোযাদারকে ইফ্তার করাবে এটা তার গুণাহ্সমূহের ক্ষমা স্বরূপ হবে এবং তার জন্য জাহান্নামের আগুন হতে মুক্তির কারণ হবে এবং তাকে রোযাদার ব্যক্তির সমান ছওয়াব দান করা হবে। অথচ রোযাদারের সওয়াব হতে বিন্দুমাত্রও কমানো হবেনা। আমরা বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাদের প্রত্যেক ব্যক্তি তো এমন সামর্থ রাখেনা, যাদ্বারা সে কোন রোযাদারকে ইফতার করাতে পারে? তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, মহান আল্লাহ্ পাক এই ছওয়াব ঐ ব্যক্তিকেও দান করবেন যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে এক চুমুক দুধ দ্বারা অথবা একটি খেজুর দ্বারা অথবা এক চুমুক পানি দ্বারা ইফতার করায়। আর যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে পরিতৃপ্তির সহিত খানা খাওয়ায় মহান আল্লাহ্ পাক তাকে আমার হাউজে কাওসার হতে পানিয় পান করাবেন। ফলে বেহেশ্তে প্রবেশ করা পর্যন্ত সে কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। এটা এমন একটি মাস যার প্রথম অংশ রহমত, মধ্যম অংশ ক্ষমা এবং শেষ অংশ জাহান্নাম হতে নাযাতের। যে ব্যক্তি এ মাসে আপন দাস-দাসীদের (অধীনস্থদের) কর্মভার হালকা করে দিবে আল্লাহ্ পাক তাকে মাফ করে দিবেন এবং তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবেন।” (বায়হাক্বী, মিশকাত)
আল্লাহ্ পাক আমাদের সকলকে উপরোক্ত হাদীস শরীফ অনুযায়ী আমল করে রমাদ্বান শরীফ-এর বারাকাত, ফুয়ুজাত, নিয়ামত, বরকত ও রহমত হাছিল করার তৌফিক দান করুন। (আমীন)
রমাদ্বান মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা
শাওয়াল মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা