মুহম্মদ সালাহ্ উদ্দীন সিকদার সোহেল
لقد صدق الله رسوله الرئيا بالحق.
অর্থঃ “অবশ্যই আল্লাহ পাক তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সত্য স্বপ্ন দেখিয়েছেন।” (সূরা ফাত্হ-২৭)
আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবীয়্যীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র স্বভাব ছিল তিনি ফজরের নামায আদায়ের পর ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসতেন এবং বলতেন, কেউ আজ রাতে কোন স্বপ্ন দেখে থাকলে বল। কেউ স্বপ্নের কথা না বললে তিনি নিজের দেখা স্বপ্নের কথা বলতেন। তাঁর দেখা কিছু মুবারক স্বপ্ন নিম্নে তুলে দেয়া হল-
আনুষ্ঠানিকভাবে নুবুওওয়াত লাভের পূর্বে সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন, শাফিউল মুজনিবীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিরিশতাগণকে দেখতেন। নবুওওয়াতের শুভলগ্নে তিনজন ফিরিশতা নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট হাজির হয়েছিলেন। তিনি অন্যান্য লোকদের সাথে কা’বা শরীফের পাশে শয়ন করেছিলেন। একজন ফিরিশতা জিজ্ঞেস করলেন, এদের মাঝে ঐ ব্যক্তি কে? মধ্যবর্তী ফিরিশতা উত্তর করলেন, তিনি ঐ ব্যক্তি যিনি সবচাইতে উত্তম। পিছনের ফিরিশতা বললেন, তাহলে এদের সর্বোত্তম ব্যক্তিকে চয়ন করে নাও। এরপর তারা সকলেই অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাইয়্যিদুস্ সাক্বালাইন, সিরাজুম্ মূনীরা, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ঘুমন্ত ব্যক্তি ঘুমের ঘোরে যেভাবে স্বপ্ন দেখে-এক রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম, যেন আমি আমার ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ সমবেত হযরত ওকবা ইবনে রা’ফে রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর গৃহে অবস্থিত। তখন আমাদের সম্মুখে কিছু তাজা পাকা খেজুর হাযির করা হল। যাকে রোতাব ইবনে তাব বলা হয়। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই স্বপ্নের তা’বীরে বলেছেন, দুনিয়াতে আমার ও আমার সঙ্গীদের মর্যাদা বুলন্দ করা হবে এবং আমাদের পরকাল হবে সুখময়। আমার দ্বীন হল সর্বোত্তম। (সুবহানাল্লাহ) মুসলিম শরীফ।
আফজালুল কায়েনাত, ফখরে আম্বিয়া, হাবীবুল্লাহ, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দেখা মুবারক স্বপ্নগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি স্বপ্ন দুধ দেখা। হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি নিদ্রিত ছিলাম। আমার নিকট একটি দুধের পেয়ালা আনা হল। আমি সে পেয়ালা থেকে এত বেশী দুধ পান করলাম যে, আমার মুখে পরিতৃপ্ততা দৃষ্টি গোচর হচ্ছিল। (বুখারী শরীফ)
অন্য এক বর্ণনায় আছে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি এত বেশি পরিমাণে দুধ পান করলাম যে, দেখতে পেলাম আমার দেহের রগরেশাতে পর্যন্ত দুধ দৌড়া-দৌড়ি করছে। সেখান থেকে যা অবশিষ্ট ছিল, তা আমি হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কে দিয়েছিলাম। হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম আরয করলেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহু ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তাবীর কি? তিনি বললেন, এর অর্থ “দ্বীনের ইলম।”
শাফিউল উমাম, নূরে মুজাস্সাম, রহমতে আলম, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরেকবার স্বপ্নে দেখেছিলেন একটি কামিছ। রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমি একদা নিদ্রিত ছিলাম। দেখি, আমার সামনে কিছুলোক, তাদের গায়ে বিভিন্ন আকারের কামিছ। কারও কামিছ বুক পর্যন্ত। কারও কামিছ সংকীর্ণ যা গায়ে দেয়ার সময় গলায় আটকে যায়। আমার সামনে দিয়ে হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে হেঁটে যেতে দেখলাম। তাঁর কামিছটি ছিল অত্যন্ত লম্বা। যা যমীন স্পর্শ করছিল। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই স্বপ্নের তাবীর করেছেন, দ্বীন অর্জনের নিদর্শন রূপে। যার কামিছ যতটুকু লম্বা, তার মধ্যে “দ্বীন হাসিল হবে সে পরিমাণে।”
হযরত আবু মুসা আশয়ারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তাজেদারে মদীনা, ছহেবুল কাওসার, সাইয়্যিদুল আলামীন, তিনি বলেন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “স্বপ্নে দেখলাম আমি মক্কা মুকাররমা থেকে এমন স্থানে হিজরত করে যাচ্ছি, যেখানে রয়েছে অসংখ্য খেজুরের বাগান। আমি মনে করলাম সে স্থানটি হয়তো ইয়ামামা হবে না হয় খায়বর। কেননা সেখানে খেজুরের বাগান ছিল অনেক। তারপর আমাকে জানিয়ে দেয়া হল সে স্থানটি “মদীনা মুনাওওয়ারা।”
ছহেবে আলক্বাব, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো অনেক মুবারক স্বপ্ন দেখেছেন।
হযরত উবাদা ইবনুস সামিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত সাইয়্যিদুল জিন্নে ওয়াল ইন্স, ছহেবু শাফায়াতুল কুবরা, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মুমিন ব্যক্তির স্বপ্ন হল নুবুওওয়াতের ছিচল্লিশ ভাগের এক ভাগ। (বুখারী শরীফ, মিশকাত শরীফ)
হযরত আবু সাইদ খুদরী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আকরামুল আউয়ালীন ওয়াল আখিরীন, সাইয়্যিদুল বাশার, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “ভোর রাতের স্বপ্নই অধিক সত্য হয়।” হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, আমি আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, সুসংবাদ প্রদানকারী জিনিষসমুহ ছাড়া নুবুওওয়াতের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, সুসংবাদ প্রদানকারী জিনিষসমুহ কি? তিনি বললেন, “ভাল স্বপ্ন।” (মিশকাত, মিরকাত)
আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে ভাল স্বপ্ন দেখার তৌফিক দান করুন। (আমিন)