সম্পাদকীয়

সংখ্যা: ১০১তম সংখ্যা | বিভাগ:

          সমস্ত প্রশংসা রাব্বুল আলামীনের জন্য। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য অফুরন্ত দরূদ ও ছালাম। মহান আল্লাহ্ পাক ও তাঁর পিয়ারে হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই সন্তুষ্টি পাবার অধিক হক্বদার। রব তায়ালা কেবলমাত্র তার ইবাদত-বন্দেগী করার জন্যই জ্বীন-ইনছানকে সৃষ্টি করেছেন। কুরআন শরীফে বর্ণিত এই “ইবাদত-বন্দেগী’ বা ‘লি-ইয়াবুদুন’ শব্দের তাফসীরে লিখা হয়েছে “লি-ইয়ারীফুন’ অর্থাৎ মুহব্বত-মারিফাত অর্জন বা ইল্মে তাসাউফ অনুধাবন। মহল বিশেষ সংশয় প্রকাশ করে থাকে যে, ইল্মে তাসাউফের কথা কুরআন শরীফে নেই। উল্লেখ্য, গুঢ় অর্থে কুরআন শরীফের প্রতিটি আয়াত শরীফই তাসাউফ সম্পৃক্ত। এছাড়া অন্য সব বাদে খোদ সূরা ফাতিহাতেই রয়ে গেছে ইল্মে তাসাউফের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা।

          সূরা ফাতিহা মূলতঃ একটি দোয়াও বটে। যাতে আমরা সরল পথে পরিচালিত হওয়ার দোয়া করে থাকি। আর সরল পথের পথিক বলতে তাদের কথাই বলা হয়েছে যাঁেদর নিয়ামত দেয়া হয়েছে। নিয়ামত প্রাপ্তদের ব্যাখ্যায় অন্য আয়াত শরীফে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ পাক নিয়ামত দিয়েছেন নবী, ছিদ্দীক শহীদ এবং ছলেহীনগণকে।

          মুহাক্কীক তাফসীরকারকগণ এক্ষেত্রে দুটি পর্যায় ব্যক্ত করেছেন। এক নবী-আলাইহিমুস্ সালামগণ এর পথ, দুই- ছিদ্দীক, শহীদ ও ছলেহীনগণ তথা আউলিয়া-ই-কিরামগণের পথ। অর্থাৎ কিনা শুধুমাত্র নবী-আলাইহিমুস্ সালামগণের পথ চেয়ে বসে থাকলেই চলবেনা, সে পথে উপনীত হবার জন্য চাই সংযোগ সাধনকারী মাধ্যম বা উসীলা  অর্থাৎ হক্কানী-রব্বানী আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ তথা হক্ব পীর ছাহিবগণ-এর ছোহবত।

          সংশয়বাদী মহল এও ব্যক্ত করে থাকে যে, আল্লাহ্ পাককে পাবার জন্য মাধ্যম বা উসীলা কি দরকার? মূলতঃ এ প্রশ্ন যে কতটা অজ্ঞতার পরিচয় বহন করে তা বোধ করি প্রশ্ন কারীরা নিজেরাও জানেনা। মহান আল্লাহ্ পাক উনার সব কিছুই যে উসীলা বা মাধ্যমের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তা কি এরা গোটা সৃষ্টিজগতের সবকিছুতেই দেখতে পায়না?

          মহান আল্লাহ্ পাক সরাসরি বান্দাদেরকে তার বন্দেগী করার নির্দেশ দিতে পারতেন কিন্তু তা না করে নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের মাধ্যমে তা করিয়েছেন। এমনিভাবে ওহী প্রেরণের জন্য- হযরত জীব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম; জান কবযের জন্য হযরত আজ্রাঈল আলাইহিস্ সালাম, রিযিক বন্টনের জন্য হযরত মীকাঈল আলাইহিস্ সালাম, শিঙ্গায় ফুঁক দেয়ার জন্য হযরত ইস্রাফীল আলাইহিস্ সালামসহ বিভিন্ন কাজের জন্য অগণিত ভিন্ন ভিন্ন ফেরেশ্তা নিয়োজিত করেছেন। আল্লাহ্ পাক আসমান থেকে ফসল নিক্ষেপ করেননা, গাছ লাগিয়ে উৎপাদন করতে হয়। মানব সন্তান সরাসরি আগত হয়না, বাবা-মায়ের মাধ্যমে আসে। অতঃপর বাবা-মা কেবল নিজেদের শিক্ষাদানের মধ্যেই সন্তানকে সীমাবদ্ধ রাখেননা, অধিকতর শিক্ষা লাভের জন্য অন্যত্র পাঠান। সুতরাং এক্ষেত্রে যেমন বাবা-মা ভিন্ন অন্য শিক্ষকের প্রয়োজন হয় তেমনি সন্তানকে ইল্মে তাসাউফ শিক্ষা দেবার জন্যও চাই যোগ্য ও হক্ব পীর ছাহেবের ছোহবত। তাই “বাবা-মাই বড় পীর ছাহিব” এই অজ্ঞতাপ্রসূত আপ্ত বাক্যে ব্যাপৃত না থেকে প্রত্যেক বাবা-মায়েরই উচিত স্বীয় সন্তানকে হক্ব পীর ছাহেবের ছোহবতে পাঠানো। শেখ সাদী রহমতুল্লাহি আলাইহিসহ আউলিয়া-ই-কিরামগণের তাই অভিমত, ‘তোমাদের সন্তানদের শিশু অবস্থা থেকেই আউলিয়া-ই-কিরামগণের কাছে পৌঁছে দাও।’

          সূরা আছরে আল্লাহ্ পাক সময়ের কছম করে উল্লেখ করেন, “নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ। কেবল মাত্র তারা ব্যতীত যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে।” কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য কষ্টকর যে, তারা সময়ের চলমান প্রবাহের অনৈসলামিক অনুসঙ্গ হতে বিরত থেকে পূর্ণ ইসলামিক আবহে নিজেদের আবৃত করে। যে কারণে আমাদের চারপাশের সমাজটা গুণাহ্র ভারে নূব্জ থাকার ফলে অনেকে তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তারা সন্দেহে ভোগেন এ সমাজে কি কোন হক্কানী অলী আল্লাহ্ আছেন? তাদের এ সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয় যখন তারা পীর ছাহিব অন্বেষণে তথাকথিত পীর ছাহিবদের ব্যবসায়ীক ও রাজনৈতিক স্বার্থপ্রনোদিত ঘৃণ্য কর্মকান্ড অবলোকন করেন।

          সুদ, ঘুষ, দায়িত্বে অবহেলা, অসততা, খাদ্যে ভেজাল, মাপে কারচুপি, বেপর্দা, বেহায়া, বেশরা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, রাহাজানিসহ টিভি-ভি সি আর, সিনেমা, গান-বাজনা, নাটক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি হাজারো অনৈসলামিক কাজের সাথে কোন না কোনোভাবে সাধারণ মানুষ সংশ্লিষ্ট রয়েছে। আর এদের যেকোনটির সাথে সংশ্লিষ্টতা সাধারণ মানুষকে পূর্ণ ইসলামিক জীবনবোধ থেকেই কেবল বঞ্চিত করেনা বরং এক গুণাহ্ তাকে আরো দশ গুণাহ্র সাথে সম্পৃক্ত করে অনেকটা গুণাহ্গারই করে তোলে।

          প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, একই সময়কে, একই সমাজকে, একই অবস্থাকে বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে দেখেন। নির্দিষ্ট সময়, সমাজ বা অবস্থা আশি বছরের বৃদ্ধ যতটুকু অভিজ্ঞতা দিয়ে মূল্যায়ন করেন বিগত জীবনের চাওয়া-পাওয়ার যে হিসেব কষেণ, একজন তরুণ সে একই সময়কে সমূহ সম্ভাবনার আশা নিয়ে পর্যালোচনা করেন। তদুপরি একই সময় বা সমাজ ইতিহাসবিদদের নিকট একরূপ, রাজনীতিবিদদের কাছে একরকম, মুছল্লীদের কাছে ভিন্নরূপ, মাওলানা-মুফতীদের কাছে অন্য রকম আবার ছূফী- ছাহিব তথা হক্কানী-রব্বানী অলী আল্লাহ্দের কাছে তথা তাঁদের সাথে সম্পৃক্তদের কাছে ভিন্ন প্রকার হিসেবে প্রতীয়মান হয়।

          স্মর্তব্য ‘এ যুগে কি হক্ব অলী আল্লাহ্ আছে? ’ সাধারণ মানুষের এ শঙ্কাযুক্ত জিজ্ঞাসার বিপরীতে প্রত্যেক যুগেই অনেক হক্ব অলী আল্লাহ্ থাকেন, এটাই ইল্মে তাসাউফে স্বীকৃত কথা। তবে প্রনিধান যোগ্য যে, কেবল এবং কেবলমাত্র যারা খাছ লোক তাঁরাই হক্ব অলী আল্লাহ্র সন্ধান পেতে পারেন।

          নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের পরে আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম-এর বেলায়েতের ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ্। তবে কেবলমাত্র সংশ্লিষ্টরাই এর ব্যাপকতা ও বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারেন। তাই সাধারণ মানুষকে সাধারণভাবে না থেকে খাছ হওয়ার মানসিকতা গড়তে হবে। তবেই হক্কানী আউলিয়া-ই-কিরাম-এর ছোহবত নসীব হবে।

          আর হক্কানী অলী আল্লাহ্র ছোহবতেই কেবলমাত্র যামানার চলমান পাপাচারের পাপ আনন্দের কুৎসিত রূপ অনুধাবন করা সম্ভব, স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের সাথে দ্বীনি কাজে সম্পৃক্ত হওয়া সম্ভব। সম্ভব সরল পথে চলা। সম্ভব নবী, ছিদ্দীক, শহীদ, ছলেহ্গণের পথে চলা তথা নিয়ামত প্রাপ্ত হওয়া। অন্যথায় গোমরাহ ও গযবপ্রাপ্তদের পথে চলে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হওয়া হবে অনিবার্য পরিণতি। আজকের লংমার্চ, হরতাল, মৌলবাদ, ব্লাসফেমী, ইসলামের নামে নির্বাচন, ছবি তোলা, কুশপুত্তলিকা দাহ ইত্যাকার ইহুদী-খ্রীষ্টানদের কর্মসূচী অনুযায়ী চালিতরা এরূপ গোমরাহরই অর্ন্তভূক্ত।

          উল্লেখ্য, গোমরাহ নেতা ও কর্মী বেশী হলেও হক্ব অলী আল্লাহ্র জৌলুষই সুতীব্র ও চির অম্লান। এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “ইসলাম অল্প সংখ্যক লোকের দ্বারা শুরু হয়েছে এবং অল্প সংখ্যকের দ্বারাই শেষ হবে।” মহান আল্লাহ্ পাক আমাদের সকলকে সে হক্ব জামায়াতের অন্তর্ভূক্ত করুন। (আমীন)

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়