সম্পাদকীয়

সংখ্যা: ৮৬তম সংখ্যা | বিভাগ:

সমস্ত ছানা ছিফত মহান অল্লত্ পাক- এর জন্য, যিনি পৃথিবীকে মানুষের জন্য বাসস্থান করেছেন এবং আকাশকে করেছেন ছাদ। সাইয়িদুল মুরছালীন, ইমামুল মুরছালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম- এর প্রতি বেশুমার দরূদ ও সালাম, যিনি সারা কায়েনাতের পথপ্রদর্শক। নভোমন্ডল- ভূমন্ডলে এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে যা আছে তা আল্লাহ পাক ভাৎপর্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। (সূরা হিজর) অথবা ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করেননি। (সূরা আধিয়া) কান্দা হিসেবে তাই উচিৎ নয় জীবনটাকে ক্রীড়াচ্ছলে গ্রহণ করা বা ক্রীড়ামোদী হওয়া। মুসলিম মূল্যবোধ অন্তত এরকমই হওয়া বাঞ্ছনীয়। সম্প্রতি সারা বিশ্বে অলিম্পিকের নামে যে ক্রীড়াযজ্ঞ সাধিত হচ্ছে, তাতে করে ক্রীড়া বর্তমান মানসিকতায় কিরূপ গভীর স্থান করে নিয়েছে তা প্রমাণ করে। সূত্রমতে, ২০০ দেশের ১০,২০০ ক্রীড়াবিদের ২৮ টি খেলায় মোট ২৯৭ ইভেন্টে ১৭ দিনেরও বেশী সময় ধরে এ খেলা চলার কথা। আকাশ মাধ্যম সহ বেলার দর্শক ৩৭০ কোটিরও বেশী বলে জানা গেছে। এ কথা ঠিক যে, অলিম্পিক একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা। তবে এর ইতিহাস ইসলাম সম্পৃক্ত নয়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আয় ঐতিহাসিক বিবরণের মাধ্যমে জানা যায়, হেলেনিক সভ্যতার যুগে গ্রীকগণ বহু দেব-দেবীর অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিল। যারা বিশ্বাস করত যে, অলিম্পাস পর্বতমালার শীর্ষদেশে এসব দেব-দেবীর অবস্থান। তখনকার দিনে গ্রীক রাজ্যগুলো ছিল নগরকেন্দ্রীক। পাশাপাশি রাজাগুলোতে যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকত। এসবের ইতি টানতে ‘ইপিস’ রাত্র ইফিটোস’ এক সম্মেলন আহ্বান করে, উপস্থিত বাজাদের নিয়ে এক শান্তি সনদ স্বাক্ষর করে। সিদ্ধান্ত হয় যে, প্রতি বছর নগরগুলোর ক্রীড়াবিদদের নিয়ে এক প্রতিযোগীতা হবে এবং কোন প্রকার যুদ্ধ হবেনা, আর উভয়টিই করা হবে তাদের দেবতাদের তুষ্টি অর্জনার্থে। অলিম্পাস পর্বতের পাদদেশে অনুষ্ঠিত হয় বলে এই ক্রীড়া অলিম্পিক নাম পরিগ্রহ করে। গ্রীকদের কাছে অলিম্পিক শুধু ক্রীড়ার বিষয় ছিলনা, এটা ছিল তাদের আধ্যাত্মিক তথা ধর্মীয় অনুষঙ্গ। খ্রীস্টপূর্ব ৭৭৬ অক্ষে এর প্রথম চল হয় এবং ৩৯৩ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত চলে। এরপর গত ২৩৩ বছর আগে” রিচার্ড চ্যান্ডলারের” গবেষণা ধরে “দ্যা কুবার্তাব” চেষ্টায় ১৮৯৬ সালে এথেন্সে পুরনো সেই অলিম্পিকে মশাল জ্বলে উঠে। অলিম্পিকের মশাল ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। গ্রীসেব অলিম্পিয়াতে ‘জিউস’ দেবের মন্দিরে পুরোহিতের উপস্থিতিতে আতস কাঁচের সাহায্যে সূর্যরশ্মি থেকে আগুন জ্বালিয়ে ক্রীড়াবিদদের হাতে হাতে নিয়ে যাওয়া হত মূল ক্রীড়াভূমিতে। আধুনিক অলিম্পিকও সেই ঐতিহ্য বহন করে চলছে। অলিম্পিক ভক্তরা অলিম্পিকের মাঝে অনেক ফায়দার উৎস খুঁজতে চেষ্টা করেন। ঐক্যবদ্ধ বিশ্ব দেখার চেতনাকে চিহ্নিত করেন। কিন্তু বাস্তবতার নিবিশ্বে এটি আপাতমুখর প্রচারণা বৈ কিছুই নয়। যুগ যুগ ধরে মূলতঃ আন্ত কজ্যাতির হাতিয়ার রূপে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৮০ ও ৮৪ সালের অলিম্পিকে বৃহৎ শক্তির কৌশলগত কায়দায় একে অপরকে জব্দ করার প্রক্রিয়ায় ‘অলিম্পিকের মাধ্যমে বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও শান্তির আবেদন’ ঠুনকো প্রমাণিতছ। গায়ের বর্ণ কালো বলে অসাধারণ এ্যাথলেটের সাথে করমর্দনে অস্বীকার, ‘অলিম্পিক সুস্থ মানবসমাজের ভালবাসার নিকেতন’ এই বোধের অসারতা প্রমাণ করেছে। বিজয়মঞ্চে দাঁড়িয়ে জুতোর মধ্যে পদক ঝুলিয়ে সেই জুতো উঁচুর মাধ্যমে, ‘অলিম্পিক শিল্পবোধ, রুচি, সংস্কৃতি ও সহনশীল এক সভ্যতার উন্মেষ ঘটায়’- এই দাবীর অসভ্যতা প্রমাণ করেছে। তদুপরি অলিম্পিকের মটো সিটিয়াস- অলটিয়ার্স- ফটিয়াস অর্থাৎ দ্রুততর, উচ্চতর, শক্তিধর এই বোধ অংশগ্রহণকারীদের মাঝে সীমালঙ্গনের প্রবৃত্তি জাগিয়েছে। নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য সেবন, অথবা নিষিদ্ধ ঔষধ সেবনের মাধ্যমে জয়ী হওয়ার প্রবণতা সে সত্যতাকেই তুলে ধরে। বলাবাহুল্য, উপরোক্ত উদাহরণ অলিম্পিকের জন্য বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। যদিও অলিম্পিককে সুস্থ আদর্শভিত্তিক প্রতিযোগীতা বলা হয় কিন্তু আসলে এ প্রক্রিয়াটির মাঝেই গভীর গলদ রয়েছে। উপরের ঘটনা প্রবাহ তারই একটি নিদর্শন মাত্র। পাশাপাশি অলিম্পিকের জৌলুসের অন্তরালে মানবতার উপেক্ষাও বিশেষ আক্ষেপের বিষয়। সূত্রমতে, এবারের অলিম্পিকের ব্যয় হচ্ছে ১৬৫ কোটি মার্কিন ডলার। অথচ প্রাপ্ত তথ্য মতে, বিশ্বে ৮০ কোটি লোক খাদ্যাভাবে জর্জরিত এবং প্রতিদিন ৬০ হাজার শিশু অনাহারে মারা যায়। সুতরাং অনাহারে জনতার করুণ মৃত্যুর কাছে এই চোখ কলসানো অলিম্পিকের কি সার্থকতা থাকতে পারে? কি করে তা “ড্রেটেস্ট ইভেন্ট অন আর্থ” হতে পারে? এ ক্ষেত্রে ইসলামী মূল্যবোধ বড়ই অনিবার্য ও যুক্তিযুক্ত। হাদীস শরীফে তাই তীর-ধনুক চালানো, অশ্ব প্রশিক্ষণ, স্ত্রীর সাথে খুশী প্রকাশ তথা সাতার কাটা এগুলো বাতীত সব খেলাধূলাকেই নিষেধ করা হয়েছে। বলাবাহুল্য, এই আদর্শ যদিও কোন কোন মহলের কাছে বিরূপ মনোভাবের উদ্রেক করতে পারে, কিন্তু আসলে সেটি তাদের অদূরদর্শ ও অজ্ঞ মনেরই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। আর মুসলিম মাত্রেই নিজের ভেতরে নফস এবং রহ পরস্পর বিরোধী এ দু শক্তির অবস্থানকে অকাট্যভাবে গ্রহণ করতে হয়। খেলা-ধূলা, গান- বাজনা ইত্যাদি নফসকে উত্তেজিত করে, উদ্বেলিত করে, আনন্দিত করে। কিন্তু এর কোন সুশৃংখল গতিপথ নেই, শেষ নেই, তৃপ্তি নেই। তদুপরি তা মানবাত্মার জন্য অবমাননাকর এবং লাঞ্ছনাদায়ক বটে। পক্ষান্তরে রূহানী জিকির তথা কামিল পীর সাহেবের হাতে বায়াত হয়ে কূলবী জিকিরই দিতে পারে যাবতীয় কামনা-বাসনার পরিশুদ্ধি ও পরিতৃপ্তি। আল্লাহ পাক বলেন- “সাবধান। (কূলবী) জিকির দ্বারাই দিল এতমিনান হয়।” (সূরা রাদ/২৮) বলাবাহুল্য, বর্তমান বিশ্ব এই স্কুলী জিকির থেকে দূরে বিধায়-ই তাদের অতৃপ্ত মন অলিম্পিত, বিশ্বকাপ ফুটবল, বিশ্বকাপ ক্রিকেট, বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগীতা ইত্যাদি হাজারো অনৈসলামিক কায়দায় আনন্দ অন্বেষণ করে লাখো অনৈতিক এবং অমানবিক কাজে লিপ্ত হচ্ছে। সঙ্গত কারণে সাধারণের এই বিপথগামীতার পেছনে ধর্মব্যবসায়ীদেরকেই বিশেষভাবে দায়ী করতে হয়। ধর্মের প্রাণ- কূলবী জিকিরের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া থেকে তারা ন্যাক্কারজনকভাবে যে পিছিয়ে রয়েছে কেবল তাই নয়, বরং সে চেতনাবোধও তাদের থেকে অবলুপ্ত হয়েছে। তাই সাধারণের মাঝে সে মূল্যবোধের জাগরণ ঘটাতে তারা লজ্জাস্করভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। উল্লেখ্য, চোখধাঁধানো আতশবাজী, আদিবাসী নৃত্য, এবং প্রায় নগ্ন শারীরিক কসরত ইত্যাদির সমাহারে অলিম্পিকের মত মহা-হারাম কাজের প্রতি নিরুৎসাহিত করার জন্য আমাদের তথাকথিত শাইখুল হাদীস, মুফাসসিরে কোরআন তথ ইসলামী পত্রিকার সম্পাদকদের কোন আওয়াজ নেই। বরং এ ব্যাপারে পুরোই নিষ্ক্রিয় ও নিরব থেকে তার দিব্যি বোবা শয়তানের ভূমিকা পালন করছে। পক্ষান্তরে, ছবি ভোলা, লংমার্চ, হরতাল, মৌলবাদ, ব্লাসফেমী, ইসলামের নামে নির্বাচন, শয়তান প্রসূত এসব হারাম কাজে ঠিকই তাদের অর্থ বড়ই জোরদার। অথচ জীবনের যা দ্বাৰী, ঈমানের দাবী তা নয়। আল্লাহ পাক বলেন- “আমি নভোমন্ডল, ভূ-মন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। আমি এগুনো “শাবাদ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছি কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা বোঝেন।” (সর দুখান)

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়