মুহম্মদ মিজানুর রহমান খান লুটন, ইউ,কে।
সুওয়ালঃ “নবীজীর জন্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ তাই মতভেদ সম্পর্কিত বিষয় পালন করা ঠিক নয়। আর ১২ই রবিউল আউয়াল জন্ম দিন এটা সবচেয়ে দুর্বল মত।” জনৈক ব্যক্তির উপরোক্ত কথা সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহ্র ফায়সালা কি? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ “নবীজীর (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ, তাই মতভেদ সম্পর্কিত বিষয় পালন করা ঠিক নয়। আর ১২ই রবিউল আউয়াল জন্মদিন এটা সবচেয়ে দুর্বল মত।” জনৈক ব্যক্তির এ কথার সমর্থনে কুরআন ও সুন্নাহ্র ছহীহ্ কোন দলীল-প্রমাণ নেই। তা সম্পূর্ণ উদ্ভট ও মনগড়া কথা। কাজেই তা গ্রহণযোগ্য নয়।
কারণ, আল্লাহ্ পাক তাঁর কালাম পাকে ইরশাদ করেছেন,
هاتوا بر هانكم ان كنتم صدقين.
অর্থ- “তোমরা সত্যবাদী হলে দলীল পেশ কর।” (সূরা নমল/৬৪) অতএব, কুরআন-সুন্নাহ্র দলীল সম্মত কথা হলো, মতভেদ সম্পর্কিত বিষয় পালন বা আমল করা অবশ্যই ঠিক।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
يايها الذين امنوا اطيعوا الله واطيعوا الرسول واولى الامر منكم فان تناز عتم فى شىء فردوه الى الله والرسول.
অর্থঃ- “হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহ্ পাককে ইতায়াত করো এবং রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ইতায়াত করো এবং তোমাদের মধ্যে যারা উলিল-আমর তাঁদেরকে ইতায়াত করো। অতঃপর যখন কোন বিষয়ে উলিল-আমরগণের মাঝে ইখতিলাফ দেখতে পাবে তখন (সে বিষয়টি ফায়সালার জন্য) তোমরা আল্লাহ্ পাক ও রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিকে প্রত্যাবর্তন করো। অর্থাৎ যে উলিল-আমরের কুরআন-সুন্নাহ্র দলীল বেশি হবে তাঁরটিই গ্রহণ করো।” (সূরা নিসা/৫৯) উল্লেখ থাকে যে, আল্লাহ্ পাক হক্ব-নাহক্ব দু’টি বিষয়ই মানুষের মাঝে বর্ণনা করে দিয়েছেন।
আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
وهدينه النجدين.
অর্থঃ- “আমি দু’টি পথই জানিয়ে দিয়েছি।” (সূরা বালাদ/১০) হক্বতালাশীগণ নাহক্বের বিরোধীতা করেন, আর নাহক্ব পন্থীরা হক্বের বিরোধীতা করে। এমনিভাবে প্রায় প্রতিটি বিষয়, প্রতিটি আমলের ক্ষেত্রেই হক্ব ও নাহক্ব পন্থীদের মধ্যে ইখতিলাফ বা মতবিরোধ রয়েছে। তবে ইখতিলাফ বা মতভেদ দু’ ধরণের হয়ে থাকে। (১) শুধু হক্বের জন্য হক্ব তালাশীগণের ইখতিলাফ। যেমন, ঈমানের শর্ত হিসেবে কেউ উল্লেখ করেছেন,
تصديق با لجنان
অর্থাৎ- “অন্তরের সত্যায়ন।” ও اقرار باللسان
অর্থাৎ- “মৌখিক স্বীকৃতি।” আবার কেউ উল্লিখিত দু’টি শর্তের সাথে তৃতীয় শর্ত হিসেবে عمل با لاركان অর্থাৎ- “ফরযসমূহ আমল করা” উল্লেখ করেছেন। অনুরূপ নামায, রোযা, হজ,¡ যাকাত ইত্যাদি প্রায় প্রতিটি বিষয় বা আমলের ক্ষেত্রে তার মাসয়ালা-মাসায়েল, হুকুম-আহকাম বর্ণনার ব্যাপারে ইখতিলাফ পরিলক্ষিত হয়। এ প্রসঙ্গে কিতাবে বর্ণিত রয়েছে,
اختلاف العلماء رحمة.
অর্থাৎ- “হক্কানী-রব্বানী আলিমগণের ইখতিলাফ রহমতের কারণ।” যেমন, হক্কানী-রব্বানী আলিমগণ ইখতিলাফ করে হানাফী, শাফেয়ী, হাম্বলী, মালেকী ৪টি মাযহাবকেই হক্ব বলে স্বীকার করে নিয়েছেন এবং এর উপরই উম্মতের ইজ্মা হয়েছে। (২) হক্ব ও নাহক্বের মধ্যে হক্বতালাশীগণের সাথে নাহক্ব পন্থীদের ইখতিলাফ বা মতবিরোধ।
আল্লাহ্ পাক এক, আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেষ নবী, মীলাদ-ক্বিয়াম সুন্নতে উম্মত মুস্তাহ্সান এবং তা পালনে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মা’রিফত ও সন্তুষ্টি হাছিল হয় এসব হক্বতালাশীগণের আক্বীদা ও আমল।
কিন্তু নাহক্ব বা বাতিলপন্থীদের আক্বীদা ও আমল হচ্ছে, আল্লাহ্ পাক তিনজন (নাউযুবিল্লাহ) অর্থাৎ তারা ত্রিত্ববাদ বা তিন খোদায় বিশ্বাসী, তাদের কারো আক্বীদা হলো “হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেষ নবী বা রসূল নন।” আবার কারো কারো আক্বীদা ও আমল হচ্ছে, “মীলাদ-ক্বিয়াম বিদয়াত, হারাম, র্শিক ইত্যাদি।”
এখন প্রশ্ন, মতভেদ সম্পর্কিত বিষয় যদি পালন করা ঠিক না হয় তাহলে কি আল্লাহ্, রসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), ইসলাম সব বাদ দিতে হবে?
কাজেই যেখানে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইখতিলাফ সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন যে, “যেখানে ইখতিলাফ হবে সেখানে যে উলিল-আমরের কুরআন-সুন্নাহ্ সম্মত দলীল বেশী হবে তাঁরটিই গ্রহণ করতে হবে। তাই বলার অপেক্ষা রাখেনা, যে ব্যক্তি বলবে মতভেদপূর্ণ বা ইখতিলাফি বিষয় পালন করা ঠিক নয়, সে ব্যক্তি নিঃসন্দেহে মুরতাদ ও কাফির হয়ে যাবে।”
ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের বর্ণনা মতে, কোন্ মুসলমান নামধারী আলিম ও জাহিল নামধারী ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ্ তায়ালার রহমতের পরিবর্তে গযব ও লা’নত এটা বুঝার জন্য নিম্নোক্ত আলামত বা লক্ষণগুলো পর্যায়ক্রমে তার মধ্যে প্রকাশ পায়। প্রথমতঃ সে ইবাদত-বন্দেগীতে অলস হয়ে যাবে।
দ্বিতীয়তঃ কোন মেয়ে লোক অথবা আমরাদের (ক্বারীবুল বুলুগ) তথা অল্প বয়স্ক বালকদের প্রতি আসক্ত হয়ে যাবে। তৃতীয়তঃ ওলী আল্লাহ্গণের বিরোধীতা করবে। চতুর্থতঃ নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের শানের খিলাফ মন্তব্য করবে।
পঞ্চমতঃ খোদ আল্লাহ্ পাক-এর শানের খিলাফ আক্বীদা ও মত পোষণ করবে।
কাজেই আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের বর্ণনা মতে, উক্ত ব্যক্তি লা’নতের তৃতীয় স্তর অতিক্রম করে চতুর্থ স্তরে উপনীত হয়েছে। কেননা আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছানা-ছীফত, ফযীলত-মর্তবা বর্ণনা করা হয় এমন বিষয় ও আমল সম্পর্কে তার বিরূপ চিন্তা, বক্তব্য ও মন্তব্যই তা প্রমাণ করে; যা কুরআন-সুন্নাহ্র সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অতএব, প্রমাণিত হলো যে, “কোন বিষয়ে মতভেদ থাকলে তা পালন করা যাবেনা।” এ বক্তব্য সম্পূর্ণ কুফরী। সঠিক বক্তব্য হচ্ছে এই যে, “কোন বিষয়ে যখন একাধিক মত থাকবে তখন যেই মতটি অত্যাধিক ছহীহ্ ও নির্ভরযোগ্য হবে তা আমল করতে হবে।” মতভেদ আছে বলে মূল বিষয়টির আমলই ছেড়ে দিতে হবে, এ বক্তব্য চরম শ্রেণীর জাহিলের উক্তি বৈ কিছু নয়। এ বক্তব্য কুরআন-সুন্নাহ্র সম্পূর্ণ বিপরীত ও কুফরীর শামীল। আর ১২ই রবিউল আউয়াল আখিরী রসূল, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিলাদত শরীফের দিন এটাই সবচেয়ে ছহীহ্ ও মশহুর মত।
যেমন, এ প্রসঙ্গে হাফিয আবূ বকর ইবনে আবী শায়বাহ ছহীহ্ সনদ সহকারে বর্ণনা করেছেন,
عن عفان ن سعيد بن مينا عن جابر وابن عباس رضى الله تعالى عنهما قالا ولد رسول الله صلى الله عليه وسلم عام الفيل يوم الاثنين الثانى عشر من شهر ربيع الاول.
অর্থঃ- “হযরত আফফান থেকে বর্ণিত। তিনি হযরত সাঈদ ইবনে মীনা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত জাবির ও হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা বলেন, রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিলাদত শরীফ ‘হস্তি বাহিনী বর্ষের ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার হয়েছিল।” (বুলুগুল আমানী শরহিল ফাত্হির রব্বানী, আল বিদায়া ওয়ান্ নিহায়া)
উক্ত হাদীস শরীফ বর্ণনার সনদের মধ্যে প্রথম বর্ণনাকারী হযরত আফফান সম্পর্কে মুহাদ্দিছগণ বলেছেন, “আফফান একজন উচ্চ পর্যায়ের নির্ভরযোগ্য ইমাম, প্রবল স্মরণশক্তি ও দৃঢ়প্রত্যয় সম্পন্ন ব্যক্তি।” (খুলাসাতুত্ তাহযীব)
“দ্বিতীয় বর্ণনাকারী সাঈদ ইবনে মীনা। তিনিও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য।” (খুলাসাহ্,তাক্বরীব) আর তৃতীয় হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। এ দু’জন উচ্চ পর্যায়ের ফক্বীহ্ ছাহাবীর বিশুদ্ধ সনদ সহকারে বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, “১২ই রবিউল আউয়াল হচ্ছে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র বিলাদত দিবস।” এ ছহীহ্ ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনার উপরই ইমামগণের ইজ্মা (ঐক্যমত) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। (সীরাত-ই-হালবিয়াহ, যুরক্বানী আলাল মাওয়াহিব, মাসাবাতা বিস্ সুন্নাহ ইত্যাদি)
উপরোক্ত বিশুদ্ধ বর্ণনা মুতাবিক ১২ই রবিউল আউয়াল হচ্ছে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র বিলাদত দিবস। এটাই ছহীহ্ ও মশহুর মত। এর বিপরীতে যেসব মত ঐতিহাসিকগণ থেকে বর্ণিত রয়েছে তা অনুমান ভিত্তিক ও দুর্বল। তা গ্রহণযোগ্য নয়।
{দলীলসমূহ: (১) রহুল মায়ানী, (২) রুহুল বয়ান, (৩) মাযহারী, (৪) ইবনে কাছীর, (৫) ইবনে আব্বাস, (৬) খাযেন, (৭) বাগবী, (৮) কুরতুবী, (৯) কবীর, (১০) তাবারী, (১১) দুররে মনছুর, (১২) বুলুগুল আমানী শরহিল ফাত্হির রব্বানী, (১৩) আল বিদায়া ওয়ান্ নিহায়া, (১৪) খুলাসাতুত্ তাহযীব, (১৫) খুলাসাহ্, (১৬) তাক্বরীব, (১৭) সীরাত-ই-হালবিয়াহ, (১৮) যুরক্বানী আলাল মাওয়াহিব, (১৯) মাসাবাতা বিস্ সুন্নাহ্, (২০) শামামাহ্-ই-আম্বরিয়াহ্, (২১) ফত্হুর রব্বানী, (২২) আল মাওরেদ আর রাবী, (২৩) হুজ্জাতুল্লাহি আলাল আলামীন, (২৪) মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়াহ্, (২৫) মাদারিজুন নবুওয়াত, (২৬) তাওয়ারীখে হাবীবে ইলাহ্ ইত্যাদি)
মুহম্মদ ইকরামুল হক, মেহেরপুর।
সুওয়ালঃ মাসিক মদীনা মে /১৯৯৭ ঈসায়ী সংখ্যায় নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপানো হয়- প্রশ্নঃ- কুরবানীর কিছুদিন আগে নাকি মাথার চুল, দাঁড়ি, নাভির নিচের লোম কাটা যায় না? কুরবানী করার পর কাটতে হয়! কথাটা কতটুকু সত্য? বিস্তারিত জানাবেন।
উত্তরঃ- যারা কুরবানী দেয়ার নিয়ত রাখেন তাদের পক্ষে যিলহজ্বের চাঁদ ওঠার পর থেকে এই চাঁদের দশ তারিখ কুরবানী করা পর্যন্ত মাথার চুল, হাতের ও পায়ের নখ ইত্যাদি না কাটা মোস্তাহাব। এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক মদীনার উপরোক্ত উত্তর সঠিক হয়েছে কি? সঠিক জাওয়াব দলীলসহ জানাবেন।
জাওয়াবঃ মাসিক মদীনার উপরোক্ত বক্তব্য সঠিক হয়নি। কারণ মদীনার সম্পাদক লিখেছে- যারা কুরবানী দেয়ার নিয়ত রাখেন, তাদের পক্ষে জ্বিলহজ্বের চাঁদ ওঠার পর থেকে এই চাঁদের দশ তারিখ কোরবানী করা পর্যন্ত মাথার চুল হাতের ও পায়ের নখ ইত্যাদি না কাটা মুস্তাহাব। যারা এটাকে মুস্তাহাব বলেন, তাদের দলীল হলো- নিম্নোক্ত হাদীস শরীফ। যেমন ইরশাদ হয়েছে,
عن ام سلمة قالت قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من راى هلال ذى الحجة واراد ان يضحى فلايأخذ شعره ولا من اظفاره.
অর্থঃ- “হযরত উম্মে সালমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত- সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি জ্বিলহজ্ব মাসের চাঁদ দেখলো এবং কুরবানী করার নিয়ত করলো, সে যেন (কুরবানী না করা পর্যন্ত) তার শরীরের চুল, নখ ইত্যাদি না কাটে।” (মুসলিম শরীফ) মূলতঃ সহীহ্ ও গ্রহণযোগ্য মত হলো এই যে, যারা কুরবানী করবে এবং যারা কুরবানী করবেনা, তাদের উভয়ের জন্যই উক্ত আমল মুস্তাহাব ও ফযীলতের কারণ। আর এ ব্যাপারে দলীল হলো এ হাদীস শরীফ- যেমন হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে,
عن عبد الله بن عمرو قال قال رسول الله صلى اله عليه وسلم امرت بيوم الاضحى عيدا جعله الله لهذه الامة قال له رجل يارسول الله ارايت ان لم اجد الا منيحة انثى افاضحى بها قال لا ولكن خذ من شعرك واظفارك وتقص شاربك وتحلق عانتك فذلك تمام اضحيتك عند الله.
অর্থঃ- “হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত- আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আমি কুরবানীর দিনকে ঈদের দিন হিসেবে নির্ধারণ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। আল্লাহ্ পাক উক্ত দিনটিকে এই উম্মতের জন্য ঈদ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এক ব্যক্তি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলো হে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল! আমি যদি একটি মাদী মানীহা (উটনী) ব্যতীত অন্য কোন পশু কুরবানীর জন্য না পাই, তাহলে আপনি কি (আমাকে) অনুমতি দিবেন যে, আমি উক্ত মাদী মানীহাকেই কুরবানী করবো। জবাবে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, না- তুমি উক্ত পশুটিকে কুরবানী করবেনা। বরং তুমি কুরবানীর দিনে তোমার (মাথার) চুল ও হাত-পায়ের নখ কাটবে। তোমার গোঁফ খাট করবে এবং তোমার নাভীর নীচের চুল কাটবে, এটাই আল্লাহ্ পাক-এর নিকট তোমার পূর্ণ কুরবানী অর্থাৎ এর দ্বারা তুমি আল্লাহ্ পাক-এর নিকট কুরবানীর পূর্ণ সওয়াব পাবে।” (আবু দাউদ শরীফ, নাসায়ী, মিশকাত)
তাশরীহ্ ঃ- উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় উল্লেখ আছে যে, যারা কুরবানী করবেনা, তাদের জন্যও জ্বিলহজ্ব মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানী করার আগ পর্যন্ত নিজ শরীরের চুল, নখ ইত্যাদি না কাটা মুস্তাহাব। আর যে ব্যক্তি তা কাটা থেকে বিরত থাকবে, সে একটি কুরবানীর সওয়াব পাবে। (বিঃ দ্রঃ- মাদী মানীহা বলা হয় এমন উটনী বা বকরীকে, যা ঋণ হিসেবে প্রদান করা হয়, যা নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য উক্ত উটনী বা বকরীর দুধ, চুল ও গোবর দ্বারা (উপকৃত) ফায়দা নেয়ার পর আবার মালিককে ফেরৎ দেয়া হয়।
সাধারণতঃ মানীহা বলা হয়- দুধেল পশুকে। আর যে পশুকে কুরবানী করা হবে তার হাক্বীক্বী মালিক হওয়া শর্ত এবং আমানত খিয়ানত করা জায়েয নেই।)
উপরোক্ত হাদীস শরীফ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে এটাই প্রমাণিত হলো যে- মাসিক মদীনাল প্রদত্ত উত্তর শুদ্ধ হয়নি। সহীহ্ মত হলো- যারা কুরবানী করবে এবং করবেনা, তাদের উভয়ের জন্যই উক্ত আমল মুস্তাহাব এবং উক্ত কারণে উভয়েই একটি কুরবানীর সওয়াব পাবে। {দলীলসমূহঃ- (১) নাসাঈ, (২) মিশকাত, (৩) শরহে নববী, (৪) বজলুল মাযহুদ, (৫) মিরকাত, (৬) লুময়াত, (৭) আশয়াতুল লুময়াত, (৮) শরহুত্ ত্বীবী, (৯) তা’লীকুছ্ ছবীহ্, (১০) মুযাহিরে হক্ব ইত্যাদি}
মুহম্মদ কাওছার জামান (বাবলা) মাহিগঞ্জ, রংপুর
সুওয়ালঃ হাটহাজারী মাদ্রাসার মৌলভী আহমদ শফীর সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকায় এক জিজ্ঞাসার সমাধানে বলা হয়েছে, “তাকবীরে তাশরীক একবারের চেয়ে বেশী বলা সুন্নাত পরিপন্থী অর্থাৎ সুন্নতের খিলাফ।” তার এ সমাধান কতটুকু সঠিক? দলীলসহ জানতে ইচ্ছুক। জাওয়াবঃ তাকবীরে তাশরীক সম্পর্কে হাটহাজারী মাদ্রাসার উক্ত জাহিল মৌলভীর প্রদত্ত সমাধান সম্পূর্ণ ভুল, সুন্নতের খিলাফ ও দলীলবিহীন হয়েছে। কারণ তাকবীরে তাশরীক একবার বলা সুন্নত। আর একাধিকবার বলা মুস্তাহাব ও ফযীলতপূর্ণ। একাধিকবার বলা সুন্নতের খিলাফ হবে এমন কথা কোথাও উল্লেখ নেই। বরং সর্বজনমান্য এবং স্বীকৃত ইমাম-মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরামগণ তাঁদের বিশ্ব বিখ্যাত ফতওয়ার কিতাবে একাধিকবার তাকবীরে তাশরীক বলা মুস্তাহাব বা ফযীলতের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন।
যেমন, “দুররুল মুখতার” কিতাবে উল্লেখ আছে যে,
ويجب تكبير التشريق مرة وان زاد عليها يكون فضلا.
অর্থঃ- “তাকবীরে তাশরীক একবার বলা ওয়াজিব, তবে যদি (কেউ) একাধিকবার বলে, তাহলে তা ফযীলতের কারণ হবে।” আর “ফতওয়ায়ে শামীতে” উল্লেখ আছে,
وقيل ثلاث مرات
অর্থঃ- “কেউ কেউ বলেছেন (তাকবীরে তাশ্রীক) তিনবার।”
“গায়াতুল আওতার” “শরহে দুররুল মুখতার” কিতাবে উল্লেখ আছে,
اور واجب ھے تکبیر تشریق صحیح تر قول ھیں ایکبار بسبب اسکے مامور ھونے کے اور اگر زیادہ کھے ایکبار سے توھوگا ثواب.
অর্থঃ- “বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে (আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ থেকে) আদিষ্ট হওয়ার কারণে একবার তাকবীরে তাশ্রীক বলা ওয়াজিব। আর যদি একবারের চেয়ে অতিরিক্ত বলে তবে সওয়াবের অধিকারী হবে।” “মুলতাক্বাল আবহুর” কিতাবে উল্লেখ আছে,
وان زاد عليها يكون نفلا.
অর্থঃ- “যদি “তাকবীরে তাশ্রীক” একাধিকবার বলে তাহলে তা নফল হবে। “মারাকিউল ফালাহ্” কিতাবের ৩৫১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
وما زاد فهو مستحب.
অর্থঃ- “সাধারণভাবে একাধিকবার “তাকবীরে তাশ্রীক” পড়া মুস্তাহাব।” “শরহে নেকায়া” কিতাবের ৩০৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
ويجب قوله مرة والزيادة مستحبة.
অর্থঃ- “তাকবীরে তাশ্রীক” একবার পাঠ করা ওয়াজিব। আর একাধিকবার পাঠ করা মুস্তাহাব।”
উপরোক্ত নির্ভরযোগ্য কিতাবের বর্ণনা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, একবার “তাকবীরে তাশ্রীক” বলা ওয়াজিব এবং তিনবার বলা মুস্তাহাব। {দলীলসমূহঃ (১) আইনী, (২) মারাকিউল ফালাহ্, (৩) মোলতাকাল আবহুর, (৪) শামী, (৫) তানভীরুল আবছার, (৬) রদ্দুল মুহ্তার, (৭) দুররুল মুখতার, (৮) শরহ্ েতোহফা, (৯) গায়াতুল আওতার, (১০) আলমগীরী, (১১) হাশিয়ায়ে তাহ্তাবী, (১২) শরহে নিকায়া ইত্যাদি।}
মুহম্মদ আনোয়ার হুসাইন বাবু
সভাপতি- আঞ্জুমানে বাইয়্যিনাত জুম্মাপাড়া শাখা, রংপুর।
সুওয়ালঃ ঢাকা মুহম্মদপুর জামিয়া রাহমানিয়া থেকে প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকার জুলাই/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসার-জবাব বিভাগে নিম্নোক্ত জিজ্ঞাসা-জবাব ছাপা হয়। জিজ্ঞাসাঃ ক্রিকেট নিজে খেলা বা খেলা দেখা শরীয়তের দৃষ্টিতে কি?
জবাবঃ শরীয়তের দৃষ্টিতে খেলাধুলা কয়েকটি শর্তসাপেক্ষে জায়িয। যথাঃ- ১. খেলাধুলা শরীয়ত অনুমোদিত হওয়া, ২. খেলাধুলায় হারাম বা কোন গুনাহের সংমিশ্রন না থাকা, ৩. খেলাধুলায় মগ্ন থাকার কারণে শরয়ী হুকুম আহকাম পালনে উদাসীনতা বা অবহেলা সৃষ্টি না হওয়া, ৪. খেলাধুলাকে নিছক জীবনের উদ্দেশ্য না বানানো। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য থাকতে হবে যৎ সামান্য বিনোদন বা শারীরিক ব্যায়াম করা। ৫. খেলাধুলায় হার-জিতের উদ্দেশ্য না থাকা। বরং উদ্দেশ্য থাকতে হবে একমাত্র শরীর চর্চা ও আন্তরিক প্রশান্তি লাভ করা। ……. “তবে কেউ যদি উল্লেখিত শর্তসমূহের প্রতি লক্ষ্য রেখে শুধু ব্যায়ামের জন্য… ক্রিকেট খেলে …… তাহলে ক্রিকেট বা ফুটবল খেলা জায়িয ………”
এখন আমার সুওয়াল হলো- ক্রিকেট বা ফুটবল খেলা সম্পর্কে অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? দলীল সহ সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ ক্রিকেট বা ফুটবল খেলা সম্পর্কে অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়নি। বরং কুফরীমূলক হয়েছে। কারণ শরীয়তে খেলা সম্পর্কে যে সুস্পষ্ট বিধান বর্ণিত রয়েছে সে বিধান মতে ক্রিকেট বা ফুটবল খেলা সম্পূর্ণরূপে নাজায়িয ও হারাম। لعب (লায়িব) বা খেলা-এর শাব্দিক অর্থ ও ব্যাখ্যা ঃ
হাদীস শরীফে বর্ণিত لعب(লায়িব) শব্দটি যদিও আম বা সাধারণ অর্থে খেলা হিসেবে ব্যবহৃত হয় কিন্তু হাক্বীক্বী বা প্রকৃত অর্থে তা দু’ধরণের অর্থ প্রদান করে। (১) খুশী করা, স্বাদ গ্রহণ করা তথা এমন আনন্দ করা যা শরীয়তে অনুমোদিত। (২) ক্রীড়া করা, তামাশা করা, কৌতুক ইত্যাদি করা যা শরীয়তে অনুমোদিত নয়। উল্লেখ্য, আরবী লায়িব ও বাংলায় খেলা শব্দটি যখন শরীয়ত সম্মত বা শরীয়ত অনুমোদিত বিষয় সম্পর্কে ব্যবহৃত হবে তখন তার অর্থ খুশী করা, স্বাদ গ্রহণ করা, নির্দোষ আনন্দ করা ইত্যাদি অর্থে আসবে।
আর উক্ত শব্দদ্বয় যখন শরীয়তের খিলাফ কোন বিষয় সম্পর্কে ব্যবহৃত হবে তখন তা ক্রীড়া করা, তামাশা করা, কৌতুক করা, হাসি-ঠাট্টা করা ইত্যাদি অর্থে আসবে। খেলা সম্পর্কে শরীয়তের বিধান
হাদীস শরীফের বিখ্যাত কিতাব, “মুস্তাদরেকে হাকিম”-এর মধ্যে হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
كل لعب حرام الا ثلاثة الخ.
“সর্ব প্রকার খেলা বাতিল তিনটি ব্যতীত- (১) তীর ধনুক চালনা করা, (২) অশ্বকে প্রশিক্ষণ দান করা, (৩) নিজ স্ত্রীর সাথে শরীয়তসম্মত হাসি-খুশী করা।” আরো উল্লেখ্য যে, আবু দাউদ শরীফ, তিরমিযী শরীফ, নাসাঈ শরীফ, ইবনে মাযাহ্ শরীফ ইত্যাদি হাদীস শরীফের কিতাবে হযরত ওকবা ইবনে আমের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে অনুরূপ হাদীস শরীফ বর্ণিত রয়েছে। তবে শব্দের কিছু তারতম্য রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে রিওয়ায়েত আছে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “মুমিনের শ্রেষ্ঠ খেলা সাঁতার কাটা, আর নারীর শ্রেষ্ঠ খেলা সূঁতা কাটা।” “ছহীহ্ মুসলিম” ও “মসনদে আহ্মদ শরীফে” হযরত সালমান ইবনে আকওয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দৌড় অনুশীলনে ইজাযত দিয়েছেন। আর “আবূ দাউদ শরীফে” বর্ণিত আছে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোকনা পাহ্লোয়ানকে কুস্তিতে ধরাশায়ী করেছিলেন।
হাদীস শরীফে উল্লিখিত খেলাগুলো ব্যতীত সর্বপ্রকার খেলাকে হারাম করা হয়েছে। অথচ অখ্যাত পত্রিকাটি হাদীস শরীফকে অস্বীকার করে ক্রিকেট, ফুটবল ইত্যাদি হারাম খেলাধুলাকে জায়িয বা বৈধ বলে কুফরী করেছে। উল্লেখ্য, হাদীস শরীফে তথা শরীয়তে যেসব খেলার অনুমোদন রয়েছে, তা ব্যতীত যত প্রকার খেলা রয়েছে, তার প্রত্যেকটির মধ্যেই, না কোন দ্বীনি ফায়দা রয়েছে এবং না কোন দুনিয়াবী ফায়দা রয়েছে। বরং প্রতিটি খেলা তিনটি অবস্থার কোন এক অবস্থা থেকে খালি নয়। হয় তা কুফরী হবে অথবা হারাম হবে, আর না হয় তা মাকরূহ্ হবে। যে খেলা বিধর্মীদের সাথে তাশাব্বুহ্ বা সাদৃশ্য রাখে অথবা দ্বীন ইসলাম থেকে সরিয়ে দেয়, তা সম্পূর্ণ কুফরী। হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে,
من تشبه بقوم فهو منهم.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” (আবূ দাউদ শরীফ) যে খেলা ইসলামী আক্বীদা থেকে সরিয়ে নেয়না কিন্তু হারাম ও গুণাহ্র কাজে লিপ্ত করে দেয়, তা কুফরী নয়, তবে কবীরা গুণাহ্র কারণ।
আল্লাহ্ পাক ইরশাদ ফরমান,
تعاونوا على البر والتقوى ولا تعاونوا على الاثم والعدوان.
অর্থঃ- “তোমরা পরস্পর পরস্পরকে নেক কাজ ও পরহিযগারীর মধ্যে সাহায্য কর, পাপ ও শত্রুতার মধ্যে সাহায্য করনা।” (সূরা মায়িদা/২) আর যে সমস্ত খেলা কুফরী ও হারাম কোনটিই নয় কিন্তু প্রকাশ্যে তা পাপ বলেও মনে হয়না, মানুষ সাধারণভাবে সে সমস্ত খেলাকে জায়েয মনে করে থাকে, প্রকৃতপক্ষে তাও পাপেরই অন্তর্ভুক্ত। এতে যেমন ইবাদত-বন্দেগীর ব্যাঘাত ঘটে এবং স্বাস্থ্য, সময় ও টাকা-পয়সার অপচয় হয়, তদ্রুপ পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষও পয়দা হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
ان المبذرين كانوا اخوان الشيطين.
অর্থঃ-“নিশ্চয়ই (সর্বপ্রকার) অপচয়কারী শয়তানের ভাই।” (সূরা বণী ইসরাঈল/২৭)
আর হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে,
من حسن اسلام المرء تر كه ما لا يعنيه
অর্থঃ- “কোন ব্যক্তির জন্য দ্বীনের সৌন্দর্য হলো- অহেতুক বা অপ্রয়োজনীয় কাজ-কর্ম থেকে বিরত থাকা।” (তিরমিযী, ইবনে মাযাহ্, মুয়াত্তা) উল্লেখ্য যে, শরীয়তের ফতওয়া হচ্ছে- যে কাজ হারাম ও কুফরী, তাকে হালাল মনে করা কুফরী। অর্থাৎ যে হালাল মনে করবে, সে কাফির হয়ে যাবে। আর যে কাজ হারাম ও কুফরী নয় কিন্তু পাপের কারণ, আর সে পাপকে হালকা বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য মনে করে অর্থাৎ এ ধরণের পাপ করলে কিছু হয়না ইত্যাদি মনে করাটাও কুফরী। হাদীস শরীফ বা শরীয়তে যে সমস্ত খেলাকে জায়িয বলা হয়েছে বা অনুমোদন করা হয়েছে, সে সমস্ত খেলায় যেমন দ্বীনি ফায়দা রয়েছে, তেমনি দুনিয়াবী ফায়দাও নিহিত রয়েছে। যেমন- তীর চালনা করা, অশ্বকে প্রশিক্ষণ দেয়া, সাঁতার কাঁটা, দৌড় অনুশীলন ইত্যাদি জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণের অন্তর্ভুক্ত এবং স্বাস্থ্যকে সুঠাম ও বলিষ্ঠ রাখার কারণ। হাদীস শরীফে উল্লেখ রয়েছে,
العلم علمان علم الاذيان وعلم الابدان.
অর্থঃ- “ইল্ম হচ্ছে- দু’প্রকার। একটি হচ্ছে- দ্বীন সংক্রান্ত আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে- স্বাস্থ্য সংক্রান্ত।”
অর্থাৎ দ্বীনী ইল্ম জরুরত আন্দাজ অর্জন করা যেরূপ ফরযের অন্তর্ভুক্ত তদ্রুপ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ইল্ম জরুরত আন্দাজ শিক্ষা করাও ফরয।
হাদীস শরীফে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
اغتنم خمسا شبابك قبل هرمك فراغك قبل شعلك غنائك قبل فقرك صحتك قبل سقسك حياتك قبل وتك.
অর্থঃ- “পাঁচটি জিনিসকে গণীমত মনে করো- (১) বৃদ্ধ হওয়ার পূর্বে যৌবনকালকে, (২) ব্যস্ততার পূর্বে অবসর সময়কে, (৩) অভাবের পূর্বে স্বচ্ছলতাকে, (৪) অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে এবং (৫) মৃত্যুর পূর্বে হায়াতকে। উল্লেখ্য, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই তার স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিয়ামত ও গণীমত স্বরূপ, যা রক্ষা করা প্রত্যেকেরই দায়িত্ব ও কর্তব্য। অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই তার যৌবন, অবসর সময়, স্বচ্ছলতা, সুস্থতা ও হায়াত এক বিশেষ নিয়ামত ও গণীমতস্বরূপ, যা শরীয়ত সম্মত পদ্ধতিতে যথাযথভাবে ব্যবহার করা ও রক্ষা করা প্রত্যেকেরই দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। আর সুতা কাটা মেয়েদের সাংসারিক কাজের অন্তর্ভুক্ত যা দ্বারা তাদের সংসারের আর্থিক স্বচ্ছলতাও আসে। হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে,
طلب كسب الحلال فريضة بعد الفريضة.
অর্থঃ- “হালাল কামাই করা অন্যান্য ফরযের পরে ফরয।”
আবার স্ত্রীর সাথে শরীয়ত সম্মত হাসি-খুশী করা, বংশ বৃদ্ধির লক্ষ্যকে পূর্ণতা দান করে ও উভয়ের দ্বীন ও ঈমান হিফাযতের ও সুস্থতার কারণ হয়।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
هن لباس لكم وانتم لباس لهن.
অর্থঃ- “তারা (স্ত্রীরা) তোমাদের আবরণ এবং তোমরাও তাদের আবরণ।” (সূরা বাক্বারা/১৮৭)
অর্থাৎ তোমরা পরস্পর পরস্পরের ইজ্জত-আবরু তথা দ্বীন, ঈমান হিফাযতের কারণ।
অখ্যাত পত্রিকায় ক্রিকেট, ফুটবল ইত্যাদি খেলাধুলাকে জায়িয করার জন্য যে শর্ত গুলো উল্লেখ করেছে তার প্রথম শর্ত হলো- “খেলাধুলা শরীয়ত অনুমোদিত হওয়া।” এর জবাবে বলতে হয় যে, শরীয়ত তথা হাদীস শরীফে যে সমস্ত খেলাকে অনুমোদন করেছে তা ব্যতীত সর্বপ্রকার খেলা নাজায়েয ও হারাম। যদি তাই হয় তাহলে ক্রিকেট, ফুটবল ইত্যাদি খেলা কি করে জায়িয হতে পারে। মূলতঃ তা জায়িয নেই। তাদের দ্বিতীয় শর্ত হলো- “খেলাধুলায় হারাম বা কোন গুণাহের সংমিশ্রন না থাকা।” এর জবাবে বলতে হয় যে, ফুটবল ও ক্রিকেট খেলাতে সময় নষ্ট, কাজ নষ্ট, পয়সা নষ্ট, স্বাস্থ্য নষ্ট, বাজি ধরা, হাতে তালি দেয়া, ছতর খোলা ইত্যাদি অনেক হারাম বা গুণাহ্র সংমিশ্রন ঘটে থাকে। সুতরাং তা জায়িয নেই। তাদের তৃতীয় শর্ত হলো- খেলাধুলায় মগ্ন থাকার কারণে শরয়ী হুকুম-আহকাম পালনে উদাসীনতা বা অবহেলা সৃষ্টি না হওয়া। এর জবাবে বলতে হয় যে, ফুটবল ও ক্রিকেট খেলার কারণে নামায ক্বাযা, ছতর খোলা, কুসংসর্গে মেশা ইত্যাদি শরয়ী হুকুম-আহকাম পালনে উদাসীনতা বা অবহেলা সৃষ্টি হয়। তাই তা নাজায়েয। তাদের চতুর্থ শর্ত হলো- খেলাধুলাকে নিছক জীবনের উদ্দেশ্য না বানানো। বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য থাকতে হবে যৎসামান্য বিনোদন বা শারীরিক ব্যায়াম করা। এর জবাবে বলতে হয় যে, শুধুমাত্র ব্যায়ামের জন্য, বিধর্মী, বিজাতি ও বেদ্বীনদের দ্বারা প্রবর্তিত ক্রিকেট বা ফুটবল খেলা জায়িয হতে পারে না। কারণ ব্যায়ামের জন্য হাদীস শরীফে বর্ণিত খেলাগুলো যেমন তীর চালনা করা, অশ্বকে প্রশিক্ষণ দেয়া, সাঁতার কাঁটা, দৌড় অনুশীলন করা ইত্যাদি খেলা গুলোই যথেষ্ট। আর বিনোদন, সেটা যদি নাজায়িয পদ্ধতিতে হয় তাহলে যত সামান্যই হোক তাও সম্পূর্ণ নাজায়িয ও হারাম। এ সম্পর্কে হাফিযে হাদীস, বাহ্রুল উলুম, ফখরুল ফুক্বাহা, রঈসুল মুহাদ্দিসীন, তাজুল মুফাস্সিরীন, মুফ্তীয়ে আ’যম, মুবাহিসে আ’যম, পীরে কামিলে মুকাম্মিল, শাহ্ ছূফী, হযরত মাওলানা মুহম্মদ রুহুল আমীন বশীরহাটি রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “জায়েয কাজ দ্বারা যখন ব্যায়াম করার উপায় আছে, তখন নাজায়েয কাজের দ্বারা কিরূপে জায়েয হবে? খেলার প্রতিযোগীতা করলে কি ফল হবে? কিন্তু লাঠি, তীর ছোড়া, তরবারী ভাঁজা, ঘোড়-দৌড় ইত্যাদিতে শত্রুদের হস্ত হতে কতকটা নিষ্কৃতি লাভের উপায় হতে পারে। পক্ষান্তরে খেলাতে এই প্রকার কোন লাভ হতে পারে না। বরং ওটা খাঁটি খেলবাজি ভিন্ন আর কিছুই নয়। কাজেই ওটা কিছুতেই জায়েয হতে পারে না। কেবল দুনিয়াদার স্বার্থপর আলিম দু’একজন ওটা জায়েয হওয়ার ফতওয়া দিয়েছেন। তাদের ফতওয়া কিছুতেই গ্রহণীয় হতে পারে না।” (ফতওয়ায়ে আমিনিয়া) অতএব, ক্রিকেট, ফুটবল ইত্যাদি প্রত্যেক প্রকার খেলাই নাজায়িয ও হারাম। তাদের পঞ্চম শর্ত হলো- খেলাধুলায় হার-জিতের উদ্দেশ্য না থাকা। বরং উদ্দেশ্য থাকতে হবে একমাত্র শরীর চর্চা ও আন্তরিক প্রশান্তি লাভ করা। এর জবাবে বলতে হয় যে, ফুটবল ও ক্রিকেট খেলায় হার-জিতের উদ্দেশ্য থাকে এবং শরীয়ত সম্মতভাবে শরীর চর্চা ও আন্তরিক প্রশান্তির কিছুই থাকেনা। তাই উক্ত খেলা নাজায়েয। উল্লেখ্য, যারা আশরাফ আলী থানভী সাহেবের “বেহেস্তী জিওরের” এবং মুফ্তী শফী সাহেবের অনুবাদকৃত “আদাবুন্ নবী” কিতাবের বরাত দিয়ে এ সমস্ত খেলাকে মুবাহ বা পছন্দনীয় সাব্যস্ত করতে চায়, তা তাদের কুট উদ্দেশ্য বলেই গণ্য হবে, যা হারাম ও কুফরীর নামান্তর। কেননা কোন ব্যক্তি বিশেষকে চাই আশরাফ আলী থানভী সাহেব হোক বা মুফ্তী শফী সাহেব হোক অথবা অন্য কাউকে শরীয়ত দলীল হিসেবে সাব্যস্ত করেনা। অর্থাৎ আশরাফ আলী থানভী সাহেব ও মুফ্তী শফী সাহেব কোন বিষয়ে জায়িয ফতওয়া দিলেই তা জায়িয হবে অথবা নাজায়িয ফতওয়া দিলেই তা নাজায়িয হবে, তা শরীয়তের কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। বরং শরীয়তের দলীল হচ্ছে- কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ ও তার আলোকে ইজ্মা ও ক্বিয়াস। আশরাফ আলী থানভী সাহেব ও মুফ্তী শফী ছাহেব তাদের উল্লিখিত কিতাবদ্বয়ে ফুটবল, হকি ও ক্রিকেট খেলাকে মুবাহ্ ও পছন্দনীয় বলেছে, তবে তারা তার আগে ও পরে কিছু শর্ত শারায়েতও উল্লেখ করেছে। সে সমস্ত শর্ত শারায়েতের কারণে কোন প্রকার খেলাই কস্মিনকালেও জায়েয হতে পারেনা যা, শরীয়ত নিষেধ করেছে। আশরাফ আলী থানভী সাহেবের প্রদত্ত শর্তগুলো হলো- (১) সময় নষ্ট, (২) পয়সা নষ্ট, (৩) কাজ নষ্ট, (৪) নামায ক্বাযা, (৫) ছতর খোলা, (৬) কুসংসর্গে মেশা ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকতে পারলে মুবাহ্ হবে।
আর মুফ্তী শফী ছাহেবের প্রদত্ত শর্তগুলো হলো- (১) ফরয তরক, (২) হারামে পতিত ও (৩) কাফিরদের নির্ধারিত নিয়মাবলীর মধ্যে খেলা ইত্যাদি থেকে বেঁচে থাকতে পারলে মুবাহ্ বা পছন্দনীয় হবে। মূলতঃ এসব খেলাতে উপরোক্ত শর্ত সমূহের কোন কোনটা থেকে যদিও বেঁচে থাকা সম্ভব হয়, কিন্তু সময় নষ্ট, স্বাস্থ্য নষ্ট, পয়সা নষ্ট, কাজ নষ্ট ইত্যাদি শর্ত থেকে বেঁচে থাকা কখনই সম্ভব হবেনা এরপরেও বলতে হয় যে, উপরোক্ত শর্ত-শারায়েত দিয়েও উল্লিখিত খেলা সমূহকে মুবাহ্ বা পছন্দনীয় বলে উল্লেখ করাটা আশরাফ আলী থানভী সাহেব এবং মুফ্তী শফী ছাহেবের জন্যও সঠিক হয়নি। কেননা তাদের এ ফতওয়ার কারণে অনেকেই ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় হারামের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আর অনেকেই হারামকে হালাল করার পায়তারা করছে। কারণ তাদের উল্লিখিত শর্ত-শারায়েত ছাড়াও খেলা হারাম হওয়া সম্পর্কে আরো অনেক কারণ উল্লেখ করেছেন অন্যান্য ইমাম-মুজ্তাহিদগণ। যেমন- (১) স্বাস্থ্য নষ্ট হয়, (২) খেলায় প্রতিযোগীতা থাকে, (৩) বাজি ধরে, (৪) পরস্পরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পয়দা হয়, (৫) খেলার কারণে সমাজে ফিৎনার সৃষ্টি হয়, (৬) বেদ্বীন ও বদ্দ্বীনী আমল করে, (৭) রং ছিটাছিটি করে, (৮) বেপর্দা হয়, (৯) সমাজ ও দেশ-বিদেশের লোকেরা হারাম কাজে মশগুল হয়, (১০) হারাম কাজে উৎসাহিত করে, (১১) বাহবা দেয়, (১২) হাতে তালি দেয়, (১৩) অভিনন্দন জানায়, (১৪) আর্থিক সহযোগীতা করে, (১৫) খুশী প্রকাশ করে, (১৬) হারামকে হালাল বলে, (১৭) ঈমান নষ্ট করে, (১৮) বিধর্মীদের অনুসরণ করে, (১৯) টেলিভিশন দেখে, (২০) মারামারি কাটাকাটি করে, (২১) খুন খারাবি করে ও (২২) রক্ত প্রবাহিত করে ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, কোন হারামকে শর্ত সাপেক্ষে মোবাহ বলে ফতওয়া দেয়ার অর্থ হলো- হারামকে হালাল বলে সাব্যস্ত করার নামান্তর।
এখন অনেকে বলতে পারে যে, শরীয়তে মৃত গরু, ছাগল, বকরী, ভেড়া ইত্যাদি খাওয়া নাজায়িয। কিন্ত যদি কেউ তিন দিন না খেয়ে থাকে তাহলে তার জন্য জরুরত আন্দাজ উল্লিখিত মৃত প্রাণীর গোশ্ত খাওয়া মোবাহ। তাহলে কি এখানে এ ফতওয়ার দ্বারা হারামকে হালাল বলে সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে? কেননা এখানেও শর্ত দিয়ে মৃত প্রাণীর গোশ্ত খাওয়াকে মোবাহ্ বলা হয়েছে। এর জাওয়াব হচ্ছে, প্রাণ বা জান রক্ষা করা হচ্ছে ফরয। আর প্রাণ রক্ষা করার জন্য খাদ্য গ্রহণ করা বা খাওয়াও ফরয। সুতরাং প্রাণ রক্ষা করার জন্য যদি কেউ হালাল খাদ্যের ব্যবস্থা করতে না পারে এমতাবস্থায় তিনদিন অতীত হয়ে যায় অর্থাৎ তিনদিন অনাহারে কেটে যায় অথচ ফরয পরিমাণ খাদ্য সে সংগ্রহ করতে পারল না, তখন সে মাজুর হয়ে যায় এবং তখনই তার জন্য অর্থাৎ এই মাজুরের জন্য হারাম মোবাহ হয়ে যায়। শরীয়তের দৃষ্টিতে মাজুর ঐ ব্যক্তি যাকে কোন ফরয, ওয়াজিব পালন করার পূর্ব শর্ত হিসেবে শরীয়তের খিলাফ কোন কাজ অনিচ্ছাসত্ত্বেও করতে হয়। আর এ সমস্ত খেলাধুলা কারো জন্য ফরয-ওয়াজিব নয় এবং এ সমস্ত খেলাধুলার জন্য কোন ব্যক্তি কখনই মাজুরও হয় না। কাজেই কোন ব্যক্তি যদি কোন বিষয়ে মাজুর না হয় তাহলে তার জন্য শর্ত শারায়েতের কি প্রয়োজন থাকতে পারে? যেহেতু হাদীস শরীফে এ সমস্ত খেলাধুলাকে সরাসরি হারাম বলে ফতওয়া দেয়া হয়েছে। তবে অবশ্যই যারা ফক্বীহ তারা এ সমস্ত হাদীস শরীফ-এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে খেলাধুলা কেন হারাম বলা হয়েছে তার কিছু কারণ প্রত্যেকেই তাঁর আক্বল অনুযায়ী উল্লেখ করেছেন। সেজন্য এর অর্থ এটা নয় যে, এ সমস্ত কারণগুলো দূরীভূত হলেই উক্ত খেলাধুলা জায়েয হয়ে যাবে। কারণ ইমাম-মুজতাহিদ বা ফক্বীহগণ যে সমস্ত কারণ উল্লেখ করেছেন, তাছাড়া আরো শত সহস্র কারণ রয়েছে। যেমন, আল্লাহ্ পাক বলেন,
وما اوتيتم من العلم الا قليلا.
অর্থঃ-“তোমাদেরকে অল্প জ্ঞান ব্যতীত দেয়া হয়নি। (সূরা বনী ইসরাঈল/৮৫)
অর্থাৎ মানুষকে যেহেতু অল্প ইল্ম দেয়া হয়েছে সেহেতু মানুষ যে কারণ বর্ণনা করবে তা অবশ্যই অল্প হবে। আর আল্লাহ্ পাক-এর ইল্ম যেহেতু অসীম সেহেতু আল্লাহ্ পাক-এর সমস্ত কারণ জানা রয়েছে। তাই আল্লাহ্ পাক এবং তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খেলা হারাম বলে ঘোষণা দিয়েছেন। যেহেতু উক্ত খেলাধুলা হাদীস শরীফে হারাম ফতওয়া দেয়া হয়েছে তাই তা বিনা শর্ত শারায়েতেই হারাম। কারণ হাদীস শরীফে মোবাহ্ হওয়ার জন্য কোন শর্ত শারায়েত উল্লেখ করা হয়নি। অতএব, হাদীস শরীফে যে সকল খেলাকে জায়িয বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তা ব্যতীত অন্য কোন খেলা কস্মিনকালেও জায়িয, মুবাহ্ বা পছন্দনীয় হতে পারেনা। কারণ উপরোল্লিখিত সমস্ত প্রকার খেলাই বিধর্মী, বিজাতি ও বেদ্বীনদের দ্বারা প্রবর্তিত। এছাড়া বর্তমানে সমস্ত প্রকার খেলাই আন্তর্জাতিক বা জাতীয় অথবা সামাজিক বা ব্যক্তিগত পর্যায় বা উদ্যোগেই হোক না কেন তা অবশ্যই বিধর্মীদের নির্ধারিত নিয়মাবলীর মাধ্যমেই হয়ে থাকে। যদিও স্থান ও ক্ষেত্রবিশেষে কিছু নিয়ম পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হয়ে থাকে। অতএব, ক্রিকেট, ফুটবল, হকি ইত্যাদি প্রত্যেক প্রকার খেলাই নাজায়িয ও হারাম। অর্থাৎ গুণাহ্র কাজ যে স্থানেই সংঘটিত হোক না কেন, তাতে যে ব্যক্তি সম্মতি পেশ করবে অথবা সমর্থন করবে, সে ব্যক্তিই সেই গুণায় গুণাহ্গার হবে। সেখানে তার উপস্থিত থাকা বা না থাকা উভয়টাই বরাবর। সুতরাং অখ্যাত পত্রিকাওয়ালারা ব্যায়ামের নামে হাদীস শরীফের বর্ণিত খেলাগুলোকে বাদ দিয়ে বিধর্মীদের দ্বারা প্রবর্তিত ক্রিকেট বা ফুটবল খেলা জায়িয বলে কুফরী করেছে।
{দলীলসমূহঃ- (১) মুসতাদরেকে হাকিম, (২) আবু দাউদ শরীফ, (৩) তিরমিযী শরীফ, (৪) নাসাঈ শরীফ, (৫) ইবনে মাযাহ শরীফ, (৬) মুসলিম শরীফ, (৭) মুসনাদে আহমদ, (৮) কানযুল উম্মাল, (৯) বায়হাক্বী, (১০) নছবুর রায়াহ্, (১১) ফতওয়ায়ে আমিনিয়া, (১২) তাফসীরে মাযহারী, (১৩) তাবারী, (১৪) দুররে মানসুর, (১৫) কবিরী, (১৬) মাআরিফুল কোরআন, (১৭) শরহে ফিক্বহ্ েআকবর, (১৮) শরহে আক্বায়েদে নছফী, (১৯) আক্বায়েদে হাক্কা, (২০) তাকমিলুল ঈমান, (২১) দুররুল মুখতার, (২২) খানিয়াহ্, (২৩) কাজী খান, (২৪) বাহরুর রায়েক, (২৫) আলমগিরী, (২৬) জামিউল ফুছুলিন, (২৭) আল বায্যাযিয়া, (২৮) হিদায়া, (২৯) বেনায়া, (৩০) আন কারোবিয়া, (৩১) আল ফিক্বহু আলা মাযাহিবিল আরবায়া, (৩২) তাফসীরে কুরতুবী, (৩৩) তাফসীরে আহ্কামুল কুরআন, (৩৪) কামূছ আল মুহীত, (৩৫) ওয়াসীত, (৩৬) জাদীদ, (৩৭) লিসানুল আরব, (৩৮) মুনজিদ আরবী, (৩৯) মুনজিদ উর্দূ, (৪০) মিছবাহুল লুগাত, (৪১) লুগাতে হীরা, (৪২) গিয়াছুল লুগাত, (৪৩) লুগাতে সাঈদী, (৪৪) বয়ানুল লিসান, (৪৫) আল কামূসুদ্ দরসী, (৪৬) মিছবাহুল মুনীর, (৪৭) নেহায়া, (৪৮) আল মু’জামুল ওয়াজীয, (৪৯) মু’জামু মাক্বায়ীসুল লুগাত, (৫০) মাগরিব, (৫১) আল মু’জামুল বুলদান, (৫২) আল মুহীত ফিল লুগাত, (৫৩) আল মানার, (৫৪) লুগাতে কিশওয়ারী, (৫৫) তাজুল আরুস, (৫৬) ইফরাতুল মাওয়ারীদ, (৫৭) ফরহঙ্গ-ই রব্বানী, (৫৮) করীমুল লুগাত,(৫৯) আরবী ও বাংলা অভিধান, (৬০) আর রইদ, (৬১) ক্বামুসুল কুরআন, (৬২) ফিরুজুল লুগাত, (৬৩) ফরহঙ্গে আমেরা, (৬৪) আল ক্বামুসুল জাদীদ, (৬৫) বাংলা একাডেমী সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান, (৬৬) সরল বাঙ্গালা অভিধান, (৬৭) আধুনিক বাংলা অভিধান, (৬৮) সংসদ বাঙ্গালা অভিধান, (৬৯) বাঙলা ভাষার অভিধান ইত্যাদি।}
মাওলানা মুহম্মদ মুহসিনুর রহমান
মাওলানা মুহম্মদ মাছূম বিল্লাহ্ মুহম্মদ আসাদুর রহমান,
মুহম্মদ মাইজুর রহমান ভোলাহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
সুওয়ালঃ আমরা মাসিক আল বাইয়্যিনাত ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম এই তিনটি সংখ্যায় প্রদত্ত আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত-এর অনুসরণীয় ইমাম-মুজতাহিদ, মুহাক্কিক-মুদাক্কিক ও হক্কানী উলামা-ই-কিরামগণের ফতওয়া মুতাবিক জানতে পারলাম যে, “প্রাণীর ছবি তৈরী করা, ঘরে রাখা সর্বাবস্থায় হারাম।” অথচ রেযাখানী মুখপত্র নভেম্বর/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় ছবি সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ফতওয়া প্রকাশ করেছে। যা কিনা মানুষের ঈমান-আমল বিনষ্ট করবে নিশ্চিতরূপে। রেযাখানীদের ছবি সম্পর্কিত বক্তব্যের যে বিষয়গুলো আপত্তিকর সেগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো- (ক) রেযাখানীরা ছবি তোলাকে বৈধ বলেছে; কিন্তু দলীল হিসেবে পেশ করেছে ঘরে ছবি রাখা সম্পর্কিত হাদীসসমূহকে। (খ) .. কতেক উলামা যেসব ছবির শরীর ও ছায়া নেই সেসব ছবিকে বৈধ বলেছেন। (গ) হুজুর আকরাম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুরুর দিকে ছবি তৈরী করা ও সংরক্ষণ করাকে নিষেধ করেছিলেন; কিন্তু পরবর্তীতে অনুমতি দেন। (ঘ) পূর্ববর্তীদের কেউ কেউ এবং হাম্বলী, শাফেয়ী, মালেকী এমনকি হানাফীদেরও কেউ কেউ নাকি (গায়রে মুজাস্সাম) শরীরবিহীন ছবিকে বৈধ বলেছেন। (ঙ) সামাজিক, রাজনৈতিক, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের কারণে বিশেষ প্রয়োজনে ছবি তোলা বৈধ যা যুগের চাহিদাও। (চ) প্রত্যেক যুগের ফক্বীহ্, মুফতী, কাজী ও আলিমগণ যুগের চাহিদা অনুযায়ী ফতওয়া দিয়েছেন এবং দেয়া উচিত। (ছ) ছবি হারাম হওয়ার মূলে হলো গায়রুল্লাহ্র সম্মান ও ইবাদত। (জ) প্রয়োজনীয় রেকর্ডের জন্য ফাইল বন্দি ছবিসমূহ এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের নিকট জ্ঞান ও ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য জানার নিমিত্তে সরকারী-বেসরকারী যাদুঘর বা বিশেষ প্রতিষ্ঠানসমূহে পূর্বের নানা মনীষীগণের ছবি সংরক্ষণ/ধারণ করে রাখা বিশেষ প্রয়োজনে মাকরূহ্ হবেনা। এছাড়াও আরো বহু আপত্তিকর বিষয় তাদের উক্ত ছবি সম্পর্কিত বক্তব্যে স্থান পেয়েছে। কুরআন-সুন্নাহ্, ইজমা ও ক্বিয়াসের দৃষ্টিতে তাদের উল্লিখিত আপত্তিকর বক্তব্যগুলোর শরয়ী ফায়সালা কামনা করি। জাওয়াবঃ আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্, নুরে মুজাস্সাম, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রেযাখানীদের ন্যায় এরূপ লোকদের সম্পর্কেই ইরশাদ করেন,
عن ابى هريرة قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يكون فى اخر الزمان دجالون كذابون ياتونكم من الاحاديث بما لم تسمعوا انتم ولا ابائكم فاياكم واياهم لايصلو نكم ولايفتنونكم.
অর্থঃ- “হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত- হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আখিরী যামানায় কিছু সংখ্যক মিথ্যাবাদী দাজ্জাল বের হবে, তারা তোমাদের নিকট এমনসব (মিথ্যা-মনগড়া) কথা উপস্থাপন করবে, যা তোমরা কখনো শুননি এবং তোমাদের বাপ-দাদারাও শুনেনি, সাবধান! তোমরা তাদের কাছ থেকে দূরে থাকবে, তবে তারা তোমাদেরকে গোমরাহ্ করতে পারবে না এবং ফিৎনায় ফেলতে পারবেনা।” (মুসলিম শরীফ)
উল্লিখিত হাদীস শরীফের পূর্ণ মেছদাক বা নমুনা হচ্ছে রেযাখানীরা। তারা ছবির ব্যাপারে এমন সব বক্তব্য প্রদান করেছে যা কিতাবে দেখা তো দূরের কথা কেউ কোন দিন শুনেও নাই। মূলতঃ রেযাখানীরা নিজেদেরকৃত বদ আমলকে ধামা-চাপা দেয়ার উদ্দেশ্যেই মনগড়াভাবে ছবিকে জায়েয করার অপচেষ্টা করেছে। যেমনটি করেছিলো, “ছানী আযান, তাহাজ্জুদের জামায়াত, বাইয়াত হওয়া, দুই সিজদার মাঝখানে পূর্ণ দোয়া পড়া, ধুমপান” ইত্যাদি বিষয়গুলোকে নিয়ে। কিন্তু মাসিক আল বাইয়্যিনাত তাদের সমস্ত ষড়যন্ত্র আর অপতৎপরতাকে নির্ভরযোগ্য দলীলের দ্বারা ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। ইনশাআল্লাহ্ তাদের ছবিকে জায়েয করার সকল ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতাকেও ছিন্নভিন্ন করে দেয়া হবে। রেযাখানীরা ছবি জায়েয করার উদ্দেশ্যে যে সকল মনগড়া, বানোয়াট, জালিয়াতিপূর্ণ ও আপত্তিকর বক্তব্য প্রদান করেছে তা ধারাবাহিকভাবে পর্যায়ক্রমে খন্ডন করার পূর্বে ছবি হারাম হওয়ার দলীলগুলো সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করা হলো- (ধারাবাহিক) শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রাণীর ছবির সঠিক ফায়ছালা
قال ابن عباس قال اخبرتنى ميمونة ان رسول الله صلى الله عليه وسلم اصبح يوما واحما فقالت ميمونة يا رسول الله صلى الله عليه وسلم لقد استنكرت هيئتك منذ اليوم قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان جبرائيل كان وعدنى ان يلقانى الليلة فلم يلقنى لما والله ما اخفنى قال فظل رسول الله صلى الله عليه وسلم يومه ذلك على ذلك ثم وقع فى نفسه جر وكلب تحت فسطاطا لنا فامربه فاخرج ثم اخذ بيده ماء فنضح مكانة فلما امسى لقيه جبر ائيل عليه السلام فقال له قد كنت وعدثنى ان تلقانى البارحة قال اجل ولكنا لاندخل بيتا فيه كلب ولا صورة.
অর্থঃ- “হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হযরত মায়মুনাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণনা করেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন ভোরে চিন্তিত অবস্থায় আসলেন, অতঃপর মায়মুনাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আজকে আপনাকে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম আমার সাথে রাত্রে সাক্ষাৎ করার ওয়াদা করেছিলেন কিন্তু রাত্রে সাক্ষাৎ করলেন না। অথচ আল্লাহ্ পাক-এর কছম তিনি আমার সাথে ওয়াদার খিলাফ করেন না।” হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ দিন ঐ অবস্থায়ই অতিবাহিত করলেন। অতঃপর তাঁর খিয়াল হল চাদরের নীচে একটি কুকুরের বাচ্চা। আল্লাহ্ পাক-এর রসূলের হুকুমে তা বের করে দেয়া হল। অতঃপর পানি দিয়ে ঐ স্থানটি পরিস্কার করে দেয়া হল। যখন সন্ধ্যা হল হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আপনিতো গত রাত্রে আমার সাথে সাক্ষাৎ করার ওয়াদা করেছিলেন।” তিনি বললেন, “হাঁ কিন্তু আমরা রহমতের ফেরেশ্তারা ঐ ঘরে প্রবেশ করিনা, যে ঘরে কুকুর বা প্রাণীর ছবি থাকে।” (মুসলিম, মিশকাত)
عن ابى طلحة انه قال ان رسول اله صلى الله عليه وسلم قال ان الملئكة لا تدخل بيتا فيه صورة قال بسر ثم اشتكى زيد فعدناه فاذا على بابه ستر فيه صورة قال فقلت لعبيد الله الحولانى ربيب ميمونة زوج النبى صلى الله عليه وسلم الم يخبرنا زيد عن الصور يوم الاول فقال عبيد الله الم تسمعه حين قال الا رقما فى ثوب.
অর্থঃ- “হযরত আবু তালহা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয়ই রহমতের ফেরেশ্তারা ঐ ঘরে প্রবেশ করে না, যে ঘরে প্রাণীর ছবি থাকে।” বুসর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, অতঃপর যায়েদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমি তাঁর খিদমত করার জন্য গেলাম, তাঁর ঘরের দরজায় একখানা ছবিযুক্ত পর্দা দেখলাম। এবং উম্মুল মু’মিনীন হযরত মায়মুনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহার পালিত পুত্র হযরত উবাইদুল্লাহ্কে বললাম, হযরত যায়েদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কি আমাদের সর্ব প্রথম ছবি সম্পর্কে সংবাদ দেন নাই? উবায়দুল্লাহ বললেন, আপনি কি তখন তাকে বলতে শুনেন নাই যে, তিনি কাপড়ের লতাপাতার ছবি বাদ দিয়ে বলেছেন। অর্থাৎ কাপড়ে গাছপালা বা প্রাণহীন জিনিসের ছবি নিষেধ করেন নাই।” (মুসলিম, নাসায়ী, আবু দাউদ)
عن ابى طلحة ان النبى صلى الله عليه وسلم قال لا تدخ المئكة بيتا فيه كلب ولا صورة.
অর্থঃ- “হযরত আবু তালহা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “ঐ ঘরে রহমতের ফেরেশ্তা প্রবেশ করেনা, যে ঘরে কুকুর বা প্রাণীর ছবি থাকে।” (নাসায়ী)
عن ميمونة ان رسول الله صلى الله عليه وسلم اصبح يوما واجما وقال ان جبرائيل كان وعدنى ان يلقانى الليلة فلم يلقنى اها والله ما اخلفنى ثم وقع فى نفسة جروكلب تحت فسطاط له فامربه فاخرج تم اخذ بيده ماء فنضح مكاته فلما امسى لقيه جبرائيل فقال لقدكنت وعد تنى ان تلقانى البارحة قال اجل ولكنا لاندخل بيتا فيه كلب ولا صورة.
অর্থঃ- “হযরত মায়মুনাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বলেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন চিন্তিত অবস্থায় আসলেন এবং বললেন, “হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম রাত্রে আমার সাথে দেখা করার ওয়াদা করেছিলেন, কিন্তু রাত্রে দেখা করেন নাই। অথচ আল্লাহ্ পাক-এর কছম, হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম কখনো আমার সাথে ওয়াদা খিলাফ করেন না। অতঃপর খেয়াল হলো, তাঁর চাঁদরের নীচে একটি কুকুরের বাচ্চা, ওটাকে বের করে দেয়া হলো।” অতঃপর নিজ হাতে পানি দিয়ে ঐ স্থানটি পরিষ্কার করে দিলেন। যখন সন্ধ্যা হল, হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম আল্লাহ্ পাক-এর রসূলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, “আপনিতো গত রাত্রে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ওয়াদা করেছিলেন?” হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম বললেন, হাঁ। কিন্তু আমরা রহমতের ফেরেশ্তারা ঐ ঘরে প্রবেশ করিনা, যে ঘরে কুকুর অথবা প্রাণীর ছবি থাকে।” (মিশকাত)
عن خالدبن سعيد قال دعانى ابو مسعود الى طعام فرأى فى البيت صورة فلم يدخل حتى كسرت.
অর্থঃ- “হযরত খালেদ ইবনে সাঈদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, আমাকে হযরত আবু মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু দাওয়াত করলেন। তিনি আবু মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর ঘরে প্রাণীর ছবি দেখতে পেলেন, তিনি ওটা না ভাঙ্গা পর্যন্ত ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলেন না।” (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা)
سعيد بن ابى الحسن قال كنت عند ابن عباس اذ جائه رجل فقال يا ابن عباس انى رجل انما معشتى من صنعة يدى وانى اصنع هذه التصاوير فقال ابن عباس ا احدثك الا ما سمعت من رسول الله صلى الله عليه وسلم سمعته يقول من صور صورة فان الله معذبه حتى ينفخ فيه الروح وليس بنافخ فيها ابدا فربا الرجل ربوة شديدة واصفر وجهة فقال ويحك ان ابيت الا ان تصنع فعليك بهذا الشجر وكل شىء ليس فيه روح.
অর্থঃ- “হযরত সাঈদ ইবনে আবুল হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, আমি হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নিকট ছিলাম। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি তাঁর নিকট আসল এবং বললো, “হে ইবনে আব্বাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! আমি এমন এক ব্যক্তি, যে আমার হাতের কাজের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করি এবং আমি এরকম প্রাণীর ছবি তৈরী করি। হযরত ইবনে আব্বাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, আমি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট যা শুনেছি তা কি তোমাকে বলবনা? আমি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোন প্রাণীর ছবি তৈরী করবে, আল্লাহ্ পাক তাকে ঐ ছবির মধ্যে প্রাণ না দেয়া পর্যন্ত শাস্তি দিতে থাকবেন। কিন্তু সে কখনো ওটার মধ্যে প্রাণ দিতে সক্ষম হবে না।” সুতরাং সে ব্যক্তি খুব লজ্জিত হল এবং তার চেহারা হলুদ হয়ে গেল। অতঃপর হযরত ইবনে আব্বাছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, তোমার যদি ছবি তৈরী করতেই হয় তবে, গাছ-পালা ইত্যাদি অথবা প্রাণহীন বস্তুর ছবি তৈরী করতে পার।” (মিশকাত)
عن جابر ان النبى صلى الله عليه وسلم امر عمربن الخطاب زمن الفتح وهوبالبطحاء ان ياتى الكعبة فيمحو كل صورة فيها فلم يدخلها النبى صى الله عليه وسلم حتى محيت كل صورة فيها.
অর্থঃ- “হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয়ের সময় হযরত ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে হুকুম করলেন, তিনি যেন পাথর দিয়ে ক্বাবা ঘরের সমস্ত মূর্তিগুলো ধ্বংস করে দেন। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্বাবা ঘরের মুর্তিগুলো ধ্বংস না করা পর্যন্ত ক্বাবা ঘরে প্রবেশ করলেন না।” (আবু দাউদ) (চলবে)
সাইয়্যিদ মুহম্মদ মোক্তাদুল ইসলাম (মিলন)
রঈসুল মজলিশ- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত সুবহানীঘাট, সিলেট।
সুওয়ালঃ রেযাখানী মুখপত্র ডিসেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় “তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুনিয়াতুত তালেবীন, রেজভীয়া” কিতাবের বরাত দিয়ে বলেছে, “সহীহ্ মুসলিম শরীফসহ” অনেক নির্ভরযোগ্য কিতাবে নফল নামায বিশেষতঃ ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামাত সহকারে আদায় করা বৈধ….।”
আর আপনারা “মাসিক আল বাইয়্যিনাতে” লিখেছেন, “তারাবীহ, ছলাতুল কুছুফ (সূর্য গ্রহণের নামায), ছলাতুল ইস্তিস্কা (বৃষ্টির নামায) এই তিন প্রকার নামায ব্যতীত যেমন লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতুল বরাত, তাহাজ্জুদ, চাশ্ত, আওয়াবীন ইত্যাদি নফল নামায সমূহ ইমামের সাথে চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্।” কোনটি সঠিক? আর “বুখারী, মুসলিম শরীফে” কি “ক্বদর” ও বরাতের” নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করার কথা উল্লেখ আছে? দয়া করে জানাবেন। জাওয়াবঃ রেযাখানীরা তাদের মুখপত্রে “তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, গুনিয়াতুত্ তালেবীন এবং রেজভীয়া” কিতাবের বরাত দিয়ে নফল নামায বিশেষতঃ “শবে বরাত”, “শবে ক্বদরের” নফল নামায আযান-ইক্বামত ছাড়া জামায়াত সহকারে আদায় করা যে বৈধ বলেছে, তা আমরা আমাদের “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর বিগত সংখ্যাগুলোতে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে প্রমাণ করেছি যে, “তাদের বক্তব্য সম্পূণই ভুল, জিহালতপূর্ণ, জালিয়াতী ও প্রতারণামূলক।” কেননা, রেযাখানীরা কিতাবের নাম দিয়ে যে বক্তব্য প্রদান করেছে, আসলে উক্ত কিতাবসমূহের বক্তব্য সে রকম নয়। বরং তার সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ, তারা কিতাবের ইবারত, সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে মনগড়া বক্তব্য প্রদান করেছে এবং ক্ষেত্র বিশেষ নিজের ভ্রান্ত মতকে টিকিয়ে রাখতে কিতাবের ইবারত কারচুপি করেছে। (ধারাবাহিক) বর্তমান সংখ্যায় রেযাখানীদের দলীলবিহীন ও মনগড়া বক্তব্য খন্ডন করা হলো উল্লেখ্য, রেযাখানীরা বলেছে, “কোন কোন ভন্ড ও প্রতারক ফতোয়ায়ে রেজভীয়ার এসব উদ্বৃতি চুরি করে কোন কোন ফক্বীহ’র মতামতকে পুঁজি করে ঢালাও ভাবে মাকরূহে তাহরীমার গরম গরম ফতোয়া দিয়ে হযরত পীরানে পীর দস্তগীর আব্দুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সহ অনেক মাশায়েখে কেরামের উপর মাকরূহে তাহরীমার অপবাদ দিয়ে নিজের খ্যাতি চমকানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ….” তাদের একথার জবাবে বলতে হয় যে, রেযা খাঁ তার “রেজভীয়া” কিতাবে
…. یہ کر اھت صرف تنزیھی …. رد المحتار میں ھے فی الحلیۃ الظا ھر ان الجماعۃ فیہ غیر مستحبۃ….
এসব ইবারতের যে উদ্বৃতি উল্লেখ করেছে; তা মূলতঃ বিত্র নামায সম্পর্কে। যা আমরা আমাদের মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর বিগত সংখ্যায় অকাট্য দলীল-আদিল্লাহ্র মাধ্যমে দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে দিয়েছি যে, “রেযা খাঁ তার ভ্রান্ত মতকে ছাবেত করার উদ্দেশ্যে বিত্র নামাযের বর্ণনাকে শবে বরাত, শবে ক্বদর, রাগায়িব, তাহাজ্জুদ ইত্যাদি নফল নামাযের সাথে মিলিয়ে দিয়ে “রদ্দুল মুহতারে” বর্ণিত ইবারতের মাঝখান থেকে বিত্র নামায জামায়াতে আদায় করা সম্পর্কিত ইবারতগুলো চুরি করেছে।” দ্বিতীয়তঃ রেযাখানীরা বলেছে, “…….. কোন কোন ভন্ড ও প্রতারক …….. মাকরূহ্ তাহ্রীমার গরম গরম ফতোয়া দিয়ে ……।” এর জবাবে বলতে হয় যে, শবে বরাত, শবে ক্বদর, রাগায়িব, তাহাজ্জুদ ইত্যাদি নফল নামায জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ্ তাহরীমী ফতওয়া দেয়ার কারণেই কেউ যদি ভন্ড ও প্রতারক হয়; তাহলে রেযাখানীদের বক্তব্য মুতাবিক তাদের গুরু রেযা খাঁই চরম ভন্ড ও চরম প্রতারক। কারণ, স্বয়ং রেযা খাঁ-ই তার “রেজভীয়া” কিতাবে শবে বরাত, শবে ক্বদর, রাগায়িব ইত্যাদি নফল নামায জামায়াতের সহিত আদায় করা মাকরূহ্ তাহ্রীমী বলে ফতওয়া দিয়েছে। যেমন, “রেজভীয়া” কিতাবের ৩য় খন্ডের ৪৫৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
نماز شب برات اگرچہ مشائخ کرام قدست اسرارھم نے بجما عت بھی پڑھی … مگر ھمادے ائمہ رضی اللہ تعالی عنھم کا مذھب وھی ھے کہ جماعت بتداعی ھو تو مکروہ ھے.
অর্থাৎ- “শবে বরাতের নামায যদিও কোন কোন মাশায়েখগণ জামায়াতে পড়েছেন … তবে আমাদের আইম্মা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের মাযহাব ওটাই যে জামায়াত تداعى এর সাথে হলে অর্থাৎ জামায়াতে চারজন মুক্তাদী হলে মাকরূহ হবে। “রেজভীয়া” কিতাবের ৩য় খন্ডের ৪৬৫ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ আছে,
ذلک کلہ بدعۃ … ولم ینقل عن النبی صلی اللہ علیہ و سلم ولا عن اصحابہ … دوسرا قول یہ کہ مسا جد میں اس کی جما عت مکروہ ھے.
অর্থাৎ- “ওগুলো প্রত্যেকটি বিদ্য়াত অর্থাৎ ছলার্তু রাগায়িব, শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াতে আদায় করা ইত্যাদি প্রত্যেকটি কাজই বিদ্য়াত।” ….. কেননা, আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদের থেকে ওগুলোর কোন বর্ণনা নেই। বিধায় ওগুলো প্রত্যেকটাই বিদ্য়াত। ……. দ্বিতীয় মতে, মসজিদে এর জামায়াত করা মাকরূহ তাহ্রীমী।” “রেজভীয়া” কিতাবে আরো উল্লেখ আছে যে, “ তারাবীহ্, ছলাতুল কুসূফ (সূর্যগ্রহণের নামায), ছলাতুল ইস্তেস্কা (বৃষ্টির নামায) এই তিন প্রকার নামায ব্যতীত অন্যান্য নফল নামাযসমূহ জামায়াতে পড়া মাকরূহ তাহ্রীমী।” যেমন, “রেজভীয়া”-এর ৩য় খন্ডের ৪৫৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
ھمارے ائمہ کرام رضی اللہ تعالی عنھم کے نزدیک نوافل کی جما عت بتداعی مکروہ ھے اسی حکم میں نماز خسوف بھی داخل کہ وہ بھی تنھا پڑھی جائے اگرچہ امام جمعہ حاضر ھو کما فی الشامی عن اسمعیل عن البر جندی… صرف تراویح وصلاۃ الکسوف وصلاۃ الاستسقاء مسشی ھیں …. تداعی مذھب اصح میں اس وقت متحقق ھو گی جب چار یا زیادہ مقتدی ھوں
অর্থঃ- “আমাদের আইম্মা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের নিকট নফল নামাযসমূহ تداعى-এর সাথে জামায়াতে পড়া মাকরূহ তাহ্রীমী। এই হুকুমের মধ্যে ছলাতুল খুছুফও (চন্দ্রগ্রহণের নামায) অর্ন্তভূক্ত। এই নামাযও একাকী পড়তে হবে। যদিও জুমুয়ার ইমাম উপস্থিত থাকে।” যেমন, শামী কিতাবে, ইসমাঈল এবং বরজুন্দী থেকে বর্ণিত আছে, …….. আর তারাবীহ্, ছলাতুল কুছুফ (সূর্য গ্রহণের নামায), ছলাতুল ইস্তেস্কা (বৃষ্টির নামায), এই হুকুমের অর্ন্তভূক্ত নয়। অর্থাৎ এই তিন প্রকার নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ নয়। …… অধিক ছহীহ মতে চারজন অথবা চারের অধিক মুক্তাদী হওয়াই (تداعى) তাদায়ী অর্থাৎ মাকরূহ তাহ্রীমী।
যেমন, “রেজভীয়া” কিতাবের ৪৬৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
تراویح وکسوف واستسقاء کے سوا جماعت نوافل میر…. اور چار مقتدی ھو تو بالاتفا ق مکروہ.
অর্থাৎ- “তারাবীহ, কুসূফ, (সূর্যগ্রহণের নামায) ইস্তিস্কার (বৃষ্টির) নামায ব্যতীত অন্যান্য নফল নামায সমূহ … ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা সকল ইমাম মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের সর্বসম্মত মতে মাকরূহ তাহরীমী।”
আরো উল্লেখ্য যে, “রেজভীয়া” কিতাবে পরিশেষে এটাও উল্লেখ আছে যে, নফল নামায পড়তে হলে পৃথক পৃথক পড়তে হবে। জামায়াতের সাথে নফল নামায আদায় করা যাবে না। কেননা নফল নামায জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহ্রীমী। আর চারজন মুক্তাদী হলে সকল ইমাম মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের সর্বসম্মত মতে নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করা মাকরূহ তাহ্রীমী। যেমন, “রেজভীয়া” কিতাবের ১০ম খন্ডের ১৭৫, ১৭৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছে,
نفل پڑھیں تو الگ الگ ورنہ نفل جما عت کثیرہ کے ساتھ مکروہ ھے چار مقتدی ھوں تو بالاتفاق.
অর্থঃ- “নফল নামায পড়তে হলে পৃথক পৃথক পড়বে, কেননা নফল নামায বড় জামায়াতের সাথে পড়া অর্থাৎ যদি জামায়াতে চারজন মুক্তাদী হয় তাহলে সকল ইমাম, মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের ঐক্যমতে নফল নামায জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহ্রীমী।” সুতরাং রেযাখানীদের উক্ত বক্তব্য দলীলবিহীন ও মনগড়া বলেই প্রমাণিত হলো এবং সেই সাথে এটাও প্রমাণিত হলো যে, প্রকৃতপক্ষে রেযাখানীরাই ভন্ড ও প্রতারক। কারণ রেযাখানীরাই রেজভীয়া কিতাবের উপরোক্ত ইবারতের উদ্বৃত্তিগুলো চুরি করেছে।
অতএব, রেযাখানীদের জালিয়াতী, ধোকাবাজী, ভন্ডামী, প্রতারণা, মিথ্যা ও ইবারত চুরি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো। (চলবে)
মুহম্মদ আলাউদ্দীন সভাপতি- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত
নরসিংদী সরকারী বিশ্ববিদ্যলয় কলেজ শাখা, নরসিংদী
সুওয়ালঃ দেশের জাতীয় মসজিদ ‘বাইতুল মুর্কারাম’-এ পাঁচ ওয়াক্ত, জুমুয়া, তারাবীহ্ ও ঈদের নামাযের জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সেই জামায়াতে পুরুষের সাথে সাথে মেয়েরাও উপস্থিত হয়ে নামায আদায় করে। উক্ত জাতীয় মসজিদের অনুসরণে অন্য এলাকায়ও এবার মেয়েদেরকে পাঁচ ওয়াক্ত, জুমুয়া, তারাবীহ্ ও ঈদের নামায জামায়াতে পড়তে দেখা গেছে। এমনকি জাতীয় ঈদগাহে মেয়েরা যে নামায পড়েছে তার ছবি পর্যন্ত পেপার-পত্রিকায় প্রচার করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, মেয়েদের মসজিদে ও ঈদগাহে গিয়ে জামায়াতে নামায আদায়ের ব্যাপারে শরীয়তের হুকুম কি? কুরআন-সুন্নাহ্র দলীলের মাধ্যমে সঠিক জাওয়াব জানতে ইচ্ছুক। জাওয়াবঃ আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আম ফতওয়া হলো মহিলাদের পাঁচ ওয়াক্ত, জুমুয়া, তারাবীহ্ ও ঈদের নামাযসহ সকল নামাযের জামায়াতের জন্য মসজিদ, ঈদগাহ ও যে কোন স্থানে যাওয়া মাকরূহ তাহরীমী। আর খাছ ফতওয়া হলো কুফরী। কারণ আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যামানায়, হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর যামানায় এবং হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর খিলাফতের প্রথম যামানায় মহিলাদের জামায়াত জারী ছিল। এতদ্বসত্বেও হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মেয়েদের সর্ব প্রকার নামাযের জামায়াত নিষিদ্ধ ও বন্ধ করে দেন। এ বিষয়টি মহিলারা হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাকে অবগত করলে তিনিও তা সমর্থন করেন। অর্থাৎ তিনিও মেয়েদের সর্ব প্রকার নামাযের জামায়াত নিষিদ্ধ হওয়ার পক্ষে মত দেন এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণও তা সমর্থন করেন। উল্লেখ্য, হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর এই নিষিদ্ধকরণ এবং তা হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাসহ সকল ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের সমর্থনের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে সকল ইমাম-মুজতাহিদগণ ফতওয়া দেন যে, মহিলাদের জন্য সকল নামাযের জন্য মসজিদ, ঈদগাহ ও যে কোন স্থানে যাওয়া মাকরূহ তাহরীমী। আর হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের বিরোধীতা করার কারণে খাছ ফতওয়া হচ্ছে কুফরী। কারণ আল্লাহ্ পাক বলেন,
ليغيظ بهم الكفار.
অর্থঃ- “একমাত্র কাফিররাই হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে।” (সূরা ফাত্হ/ ২৯) এর ব্যাখ্যায় হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
من غاظه اصحاب محمد صلى الله عليه وسلم فهو كافر.
অর্থঃঃ- “যে ব্যক্তি রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছাহাবীগণের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ বা বিরোধীতা করে সে কাফির।” হাদীস শরীফে আরো বর্ণিত হয়েছে,
حب الصحابة ايمان وبغضهم كفر.
অর্থঃ- “হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের মুহব্বত হচ্ছে ঈমান। আর তাঁদের বিরোধীতা বা বিদ্বেষ পোষণ কুফরী।” (কানযুল উম্মাল)
যার পরিপ্রেক্ষিতে আকাঈদের কিতাবে বর্ণনা করা হয়েছে, “হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের মুহব্বত হচ্ছে ঈমানের কারণ। আর বিরোধীতা হচ্ছে কুফরীর কারণ।”আর খাছ ভাবে “বুখারী শরীফে” হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সম্পর্কে বর্ণিত রয়েছে,
حب ابى بكر وعمر ايمان وبغضهما كفر.
অর্থঃ- “হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর প্রতি মুহব্বত পোষণ করা হচ্ছে ঈমান আর তাঁদের প্রতি বিরোধীতা বা বিদ্বেষ পোষণ করা হচ্ছে কুফরী।” অতএব, উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর ফতওয়া, হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর সমর্থন এবং ছাহাবা আজমাঈন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের ইজ্মাকে উপেক্ষা করে যারা মহিলাদের জামায়াত জারী করার কোশেশ করবে তারা মুসলমানের অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারবেনা। তারা কাট্টা কাফির হয়ে যাবে। {দলীলসমূহ ঃ বুখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ, আহমদ, তিরমিযী, ইবনে মাযাহ, দায়লামী, ত্ববারানী, বায়হাক্বী ইবনে হাব্বান, মুয়াত্তা মালিক, কানযুল উম্মাল, মিশকাত, মিরকাত, লুময়াত, আশয়াতুল লুময়াত, ত্বীবী, মুযাহিরে হক্ব, ফতহুল ক্বাদির, গায়াতুল আওতার, তাহ্তাবী, শামী, দুরুল মুখতার, রদ্দুল মুহতার, ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া, হিদায়া, আইনুল হিদায়া, নিহায়া, আলমগীরী, বাহরুর রায়েক, কানযুদ্ দাকায়েক, নূরুল হিদায়া, কিফায়া, নূরুল আনওয়ার, ইমদাদুল আহকাম, ফতওয়ায়ে দেওবন্দ ইত্যাদি)
মাওলানা মুহম্মদ তাহেরুল ইসলাম
ইমাম- ডাংরারহাট জামে মসজিদ, রাজারহাট, কুড়িগ্রাম
মুহম্মদ বেলায়েত হুসাইন, ফেনী।
সুওয়ালঃ আফগান মুসলিম অধিবাসীদের উপর মার্কিন ইহুদী-নাছারাদের নির্মম হামলার কারণে আমাদের মসজিদে ফযরের ফরয নামাযের মধ্যে “কুনুতে নাযেলা” নামক একটি বিশেষ দোয়া পাঠ করা হচ্ছে। এটা পাঠ করার জন্য অনুরোধ করেছে, “জাতীয় সীরাত কমিটি বাংলাদেশ।” তাদের অনুরোধের প্রেক্ষিতে এ দোয়া পাঠ করা কতটুকু শরীয়ত সম্মত? দয়া করে এ ব্যাপারে শরীয়তের সঠিক মাসয়ালা জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের দলীল হলো- কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস। এ চারটিকে শরীয়তের উছূলও বলা হয়। ইসলাম অনুযায়ী চলতে হলে মুসলমান হিসেবে শরীয়তের চারটি উছূলকেই স্বীকার করার পাশাপাশি সে মুতাবিক আমলও করতে হবে। উক্ত চারটি উছূলের একটি উছূলও যদি কেউ অস্বীকার করে বা না মানে তাহলে তারপক্ষে শরীয়তের উপর চলা সম্ভব হবেনা। এ কারণে আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ইমামগণ ফতওয়া দিয়েছেন, শরীয়তের কোন উছূল অস্বীকার করা কুফরী ও গোমরাহী। যেমন, কেউ যদি শুধুমাত্র কুরআন শরীফ মানে কিন্তু হাদীস শরীফ না মানে তাহলে সে কুফরী করলো। শরীয়তের মাসয়ালায় তাকে কাফির বলা হয়েছে। আবার কেউ কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফ মানে, কিন্তু ইজ্মা মানে না সেও কুফরী করলো আর যে ক্বিয়াস মানে না তাকে শরীয়তের মাসয়ালায় গোমরাহ্ বা পথভ্রষ্ট বলা হয়েছে। মোটকথা, শরীয়তের উছূলগুলো একটি অপরটির ব্যাখ্যা। সবগুলো মিলেই পূর্ণাঙ্গ শরীয়ত। কুরআন শরীফের ব্যাখ্যা হাদীস শরীফ আর কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফ উভয়টির ব্যাখ্যা ইজমা ও ক্বিয়াস। অতএব, ফতওয়া দেয়া ও গ্রহণ করার ক্ষেত্রে শরীয়তের চারটি উছূলই দেখতে হবে। কেবল একটা আয়াত শরীফ কিংবা একটি হাদীস শরীফ দেখেই ফতওয়া দেয়া ও আমল করা শরীয়ত সম্মত নয়। কারণ এমন অনেক আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফ রয়েছে যার দ্বারা প্রথমে একটা বিষয়কে হালাল বা বৈধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। কিন্তু পরে তা হারাম বা নিষেধ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ শরাব পান, মুতা (কন্ট্রাক্ট) বিবাহ্ ইত্যাদি। এখন কেউ যদি প্রথম যুগে নাযিলকৃত আয়াত শরীফ উল্লেখ করে শরাব পান করা হালাল ফতওয়া দেয় কিংবা প্রথম যুগের হাদীস শরীফ উল্লেখ করে মুতা বিবাহ্ জায়িয ফতওয়া দেয় তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। কারণ উক্ত হুকুম পরবর্তীতে নাযিলকৃত আয়াত শরীফ এবং বর্ণিত হাদীস শরীফের হুকুম দ্বারা মনসূখ (রহিত) হয়ে গেছে।
অনুরূপ “কুনুতে নাযেলা”-এর বিষয়টি ও হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে, আখিরী রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন এক কাফির সম্প্রদায়ের প্রতি বদ্ দোয়ার জন্য এক মাস ফযরের নামাযে কুনুত পাঠ করেন। অতঃপর তা তিনি পরিত্যাগ করেছিলেন। তার পূর্বে কিংবা পরে তিনি তা কখনো পড়েননি। একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি সারাজীবন ফযরের নামাযে কুনুত পাঠ করতেন এবং খাজেমীর এক কওল মতে চার খলীফা ফযরের নামাযে কুনুত পাঠ করার কথা উল্লেখ আছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে হযরত ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি ফযরের নামাযে কুনুত পাঠের পক্ষে বলেছেন। কিন্ত আমাদের হানাফী মাযহাবের ফতওয়া হলো একমাত্র বিত্র নামায ব্যতীত অন্য কোন নামাযে কুনুত পড়া জায়িয নেই। জমহুর উলামা-ই-কিরামও এ মতেরই প্রবক্তা। শাফেয়ীগণের দলীলের জাওয়াবে হানাফীগণ নিম্নোক্ত দলীল পেশ করেন-
হযরত কায়েছ বিন রবী হযরত আছেম বিন সুলাইমান হতে রেওয়ায়েত করেছেন, তিনি বলেন, আমি হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, কিছু সংখ্যক লোক এরূপ ধারণা পোষণ করে যে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদা ফযরের নামাযে কুনুত পাঠ করতেন, হযরত আনাস রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক মাস ব্যতীত কখনো ফযরে কুনুত পাঠ করেননি। সেই সময় তিনি কোন এক কাফির সম্প্রদায়ের প্রতি বদ্ দোয়া করতেন। অপর এক রেওয়ায়েতে হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু দীর্ঘ সময় দাঁড়ানো অর্থে কুনুত বলেছেন।
যেমন, হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
افضل الصلوة طول القنوت.
অর্থাৎ- “দীর্ঘ ক্বিয়ামের নামাযই উত্তম নামায।” এ কারণে হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নিজেও ফজরের নামাযে কুনুত পড়তেন না। যেমন, এ প্রসঙ্গে তবারাণী শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত গালিব বিন ফারদাক বলেছেন যে, আমি আনাস বিন মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সাথে দু’মাস অবস্থান করেছিলাম। তিনি ফযর নামাযে কখনো কুনুত পড়েননি।” অতএব, যে সকল হাদীস শরীফে আখিরী রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফজরের নামাযে কুনুত পড়েছেন বলে বর্ণনা করা হয়েছে তার অর্থ হচ্ছে দীর্ঘ ক্বিয়াম। মুহাদ্দিসগণের এক জামায়াত এ মতই প্রকাশ করেছেন।
হানাফীগণ কুনুত নাজায়িয হওয়ার স্বপক্ষে নিম্নোক্ত দলীল পেশ করেন- হযরত আবূ মালিক সা’দ বিন তারেক আশজায়ী হতে তিনি তাঁর পিতা হতে রেওয়ায়েত করেছেন। তিনি বলেন যে, আমি রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিছনে নামায পড়েছি, তিনি কুনুত পড়েননি। হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর পিছনে নামায পড়েছি, তিনিও কুনুত পড়েননি। হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর পিছনে নামায পড়েছি, তিনিও কুনুত পড়েননি। হযরত উছমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর পিছনে নামায পড়েছি তিনিও কুনুত পড়েননি এবং হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর পিছনে নামায পড়েছি তিনিও কুনুত পড়েননি। তিনি বললেন, হে বৎস! এটা বিদ্য়াত। এ হাদীস শরীফ ইমাম নাসাঈ, ইবনে মাযাহ্ এবং তিরমিযী রেওয়ায়েত করেছেন এবং বলেছেন যে, এ হাদীস শরীফ হাসান, ছহীহ্।” ইবনে আবী শায়বা হতেও অনুরূপ হাদীস শরীফ বর্ণিত রয়েছে।
সুতরাং এ বর্ণনা দ্বারা খাজেমীর ক্বওল অর্থাৎ চার খলীফা হতে ফযরে কুনুত পড়ার রেওয়ায়েত আছে এ দাবী বাতিল প্রমাণিত হলো। জমহুর উলামাগণ এ মতেরই স্বপক্ষে।
ইবনে আবী শায়বা ছহীহ্ সনদে হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত উসমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে রেওয়ায়েত করেছেন যে, তাঁরা ফযরের নামাযে কুনুত পাঠ করতেননা। হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে রেওয়ায়েত করেছেন যে, হযরত আলী রদ্বিয়ায়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন ফযরের নামাযে দুশমনের বিরূদ্ধে আল্লাহ্ তায়ালার সাহায্য প্রার্থনায় কুনুত পাঠ করেছিলেন তখন উপস্থিত অন্যান্য ছাহাবী ও তাবেয়ীগণ তাঁর বিরোধীতা করেন।
হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত জুবায়ের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে তিনি আরো রেওয়ায়েত করেন যে, “তাঁরা ফজরের নামাযে কুনুত পাঠ করতেন না।” তিনি হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে আরো রেওয়ায়েত করেছেন যে, তিনি বলেছেন, আমি কুনুত দেখিওনি এবং জানিওনা।” গায়ত কিতাবে উল্লেখ আছে, হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ফযরের কুনুত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়েছিলেন। তিনি বলেন, আল্লাহ্ পাক-এর কছম! আমি এ বিষয়ে কিছুই জানিনা।” হযরত সাঈদ বিন জুবায়ের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেছেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নিকট শুনেছি যে, ফযরের নামাযে কুনুত পাঠ করা বিদ্য়াত। উপরোক্ত হাদীস শরীফের সমষ্টিগত বর্ণনা থেকে ফজর নামাযে কুনুতে নাযেলা পাঠ করা সম্পর্কিত বর্ণনা মনসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। তাই বর্তমানে তা পাঠ করা জায়িয নেই। হানাফী মাযহাবের এটাই ফতওয়া। অতএব, হানাফী মাযহাবের অনুসারী কোন ইমাম ও মুক্তাদির জন্য নামাযের মধ্যে কুনুতে নাযেলা পাঠ করা সম্পূর্ণই নিষিদ্ধ। এরপরও কেউ যদি তা ভুলে হোক, জেনে হোক অথবা না জেনে হোক পাঠ করে তাহলে তার নামায ফাসেদ (ভঙ্গ) হয়ে যাবে। তাকে পুনরায় নামায দোহ্রিয়ে আদায় করতে হবে। অন্যথায় সে নামায তরকের গুণায় গুণাহ্গার হবে। আর যাদের ফতওয়ার কারণে মুছল্লীগণের নামায বাতিল হবে তার সমুদয় গুণাহ্র দায়-দায়িত্ব সেসব জাহিল ও গোমরাহ্ ফতওয়াদাতার উপরই বর্তাবে। {দলীলসমূহ: (১) বুখারী, (২) ফতহুল বারী, (৩) উমদাতুল ক্বারী, (৪) ইরশাদুস্ সারী, (৫) শরহুল কিরমানী, (৬) তাইসীরুল বারী, (৭) মুসলিম, (৮) মুসলিম বি শরহিন্ নববী, (৯) শরহুল উবাই ওয়াস্ সিনূসী, (১০) ফতহুল মুলহিম, (১১) আল মুফহিম, (১২) মিশকাত, (১৩) মিরকাত, (১৪) আশয়াতুল লুময়াত, (১৫) শরহুত্ ত্বীবী, (১৬) আত্ তালীকুছ্ ছবীহ্, (১৭) মুযাহিরে হক্ব, (১৮) মিরআতুল মানাযিহ্, (১৯) হিদায়া মায়াদ দিরায়াহ্, (২০) আইনুল হিদায়া, (২১) শরহু বিকায়া, (২২) শরহুন্ নিকায়া, (২৩) নূরুল ঈযাহ্, (২৪) মারাকিউল ফালাহ্, (২৫) কানযুদ্ দাকাইক্ব, (২৬) আল বাহর্রু রায়েক, (২৭) মিনহাতুল খালিক, (২৮) তানবীরুল তাহ্ত্বাবী আলাদ্ দুররিল মুখতার, (২৯) গায়াতুল আওতার, (৩০) আল ফাতাওয়াল আলমগীরী (৩১) আল মাতুন ইত্যাদি} [বিঃ দ্রঃ জরুরতে “কুনুতে নাযেলা”-এর উপর বিস্তারিত ফতওয়া দেয়া হবে ইনশাআল্লাহ্]
মুহম্মদ ফরিদুদ্দীন গ্রীন রোড, ঢাকা।
সুওয়ালঃ মুয়ানাকা বা কোলাকুলি করা কি? আর খাছ করে কোন বিশেষ দিনে যেমন, ঈদের দিনে মুয়ানাকা করা জায়িয কিনা? অনেকে ঈদের দিনে মুয়ানাকা করাকে বিদ্য়াত বলে থাকে। এটা কতটুকু ঠিক?জাওয়াবঃ মুয়ানাকা করা সুন্নত। কোন বিশেষ দিনে হোক আর বিশেষ দিন ছাড়া অন্য দিনেই হোক সব দিনেই মুয়ানাকা করা জায়েয এবং সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
عن عائشة رضى الله تعالى عنها قالت قدم زيد بن حارثة المدينة رسول الله صلى الله عليه وسلم فى بيتى فاتاه فقرع الباب فقام اليه رسول الله صلى الله عليه وسلم عريانا يجر ثوبه والله مارايته عريانا قبله ولابعده فاعتنقه وقبله.
অর্থঃ- “হযরত আয়িশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত যায়িদ ইবনে হারিছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মদীনা শরীফে আগমন করতঃ রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আমার ঘরে আসলেন এবং দরজায় করাঘাত করলেন। তখন রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার ঘরে ছিলেন। রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনাবৃত শরীর মুবারকে চাদর টানতে টানতে তাঁর কাছে গেলেন। আল্লাহ্ পাক-এর কছম! আমি তাঁকে এর পূর্বে বা পরে কখনো অনাবৃত শরীর মুবারকে দেখিনি। তিনি (মুহব্বতের আতিশয্যে) তাঁর সাথে মুয়ানাকা করলেন এবং তাঁকে চুম্বন করলেন।” (তিরমিযী শরীফ)
উল্লেখ্য, শরীয়তের ফতওয়া হলো- “কোন সুন্নতকে বিদ্য়াত বলা কুফরী।” যারা ঈদের দিনে মুয়ানাকা করাকে বিদ্য়াত বলে তারা বিনা দলীলে, মনগড়া এবং হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা ও মাসয়ালা না জানার কারণেই বলে থাকে। আবার যারা শুধু একবার বা একদিকে মুয়ানাকা করার কথা বলে, তারাও ঠিক একই কারণে বলে থাকে। মূলতঃ ঈদের দিনে মুয়ানাকা করার সঠিক ইতিহাস হলো, পূর্ববর্তী যামানায় বর্তমান যামানার ন্যায় এলাকা ভিত্তিক এত ঘন ঘন ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত হতোনা। বরং কোন স্থানে ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত হলে সেখানে অনেক দূর দূরান্ত হতে লোক জামায়াত হয়ে নামায আদায় করতো। অতঃপর নামায শেষে অনেকের সাথে দীর্ঘ দিন পর দেখা-সাক্ষাৎ হতো, তারপর খোজ-খবর ও পরিচয় নেয়ার পাশাপাশি সালাম বিনিময়, মুছাফাহা ও মুয়ানাকা করতো। তখন থেকে ঈদের দিনে পরিচিত-অপরিচিত সবার সাথে সালাম-কালাম, মুছাফাহা, মুয়ানাকার ব্যাপক প্রচলন হয়ে আসছে। উপরোল্লিখিত প্রত্যেকটি আমলই খাছ সুন্নত এবং মুসলমান পরস্পর পরস্পরের প্রতি মুহব্বত বৃদ্ধি এবং আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টির কারণ। সুতরাং খালিছ বা নেক উদ্দেশ্যে মুয়ানাকা করা খাছ সুন্নত এবং আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টির কারণ। তবে ফিৎনার আশংকা থাকলে তথা কামভাবে মুয়ানাকা করা হলে তা নাজায়িয ও হারাম হবে। মুয়ানাকা করার নিয়মঃ প্রথমে উভয়ের ডান দিকে গলায় গলায় মিলাবে এরপর একইভাবে বাম দিকে মিলিয়ে পুনরায় ডান দিকে মিলাবে এবং নিম্নোক্ত দোয়াটি বলবে,
اللهم زد محبتى لله ورسوله.
অর্থঃ- “আয় আল্লাহ্ পাক! আপনি আমার মুহব্বত বৃদ্ধি করে দিন আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টির জন্য।” (তিরমিযী শরীফ) হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن الوتيراء.
অর্থঃ- “হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছোট বেজোড় থেকে নিষেধ করেছেন।”(ইবনে আব্দিল বার)
সুতরাং একবার গলা মিলানো সুন্নত পরিপন্থী।
{দলীলসমূহঃ (১) বুখারী, (২) উমদাতুল ক্বারী, (৩) ফতহুল বারী, (৪) ইরশাদুছ্ ছারি, (৫) ফয়জুল বারী, (৬) তাইসীরুল কারী, (৭) তিরমিযী, (৮) শরহে তিরমিযী, (৯) শরহে নববী, (১০) মিশকাত, (১১) মিরকাত, (১২) আশয়াতুল লুময়াত, (১৩) লুময়াত, (১৪) শরহুত ত্বীবী, (১৫) তালীক্বুছ ছবীহ্, (১৬) মুযাহিরে হক্ব, (১৭) শরহুস্ সুন্নাহ্, (১৮) মাকতুবাত শরীফ, (১৯) হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা ইত্যাদি।}
মুহম্মদ আলী ওয়াক্কাস সভাপতি,
আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত পানছড়ি বাজার, খাগড়াছড়ি।
সুওয়ালঃ কুরবানী কার উপর ওয়াজিব?
জাওয়াবঃ যিলহজ্ব মাসের দশ, এগার, বার অর্থাৎ দশ তারিখের সুবহে সাদিক হতে বার তারিখের সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যদি কেউ মালিকে নিসাব হয় অর্থাৎ হাওয়ায়েজে আসলিয়াহ্ (নিত্য প্রয়োজনীয় ধন-সম্পদ) বাদ দিয়ে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপা বা তার সমপরিমাণ মূল্যের মালিক হয়, তাহলে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব। উল্লেখ্য যে, যদি কারো নিকট প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থাকে এবং তা যদি নিসাব পরিমাণ হয়, যেমন- কারো পাঁচটি ঘর আছে, একটির মধ্যে সে থাকে আর তিনটির ভাড়া দিয়ে সে সংসার চালায় আর একটি অতিরিক্ত, যার মূল্য নিসাব পরিমাণ। এ ক্ষেত্রে তার উপরে কুরবানী ওয়াজিব হবে। দলীলসমূহঃ- (১) আলমগীরী, (২) শামী, (৩) আইনুল হিদায়া, (৪) ফতহুল কাদীর, (৫) গায়াতুল আওতার, (৬) শরহে বিকায়া, (৭) বাহর, (৮) দুররুল মুখতার, (৯) কাজীখান, (১০) এনায়া ইত্যাদি।
মুহম্মদ শহীদুল ইসলাম পুরাতন বিমান বন্দর, তেজগাঁও, ঢাকা।
সুওয়ালঃ বর্তমান সময়ে কোন ব্যক্তি যদি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নামে ছাগল, বকরী, ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি কুরবানী দেয় অথবা গরু, মহিষ, উটের সাত নামের মধ্যে যদি এক নাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম মুবারকে দেয়, তবে উক্ত নামের গোশ্তের হুকুম কি? এটা কি সকলে খেতে পারবে? অথবা এ গোশ্ত অছিয়তকৃত গোশ্তের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত হবে কি না?
জাওয়াবঃ হ্যাঁ, উক্ত কুবানীকৃত গোশ্ত সকলে খেতে পারবে। আর এটা অছিয়তকৃত গোশ্তের হুকুমের অন্তর্ভূক্ত হবে না। কেননা হাদীস শরীফে আছে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে বিশেষভাবে কুরবানী করার জন্যে যে নির্দেশ দিয়েছেন এটা তাঁর জন্যই খাছ। বর্তমান সময়ে কোন ব্যক্তি যদি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তরফ থেকে কুরবানী দেয়, তবে এটা তার ফযীলত, তথা বারাকাত, ফুয়ুজাত, নিয়ামত, রহ্মত, মাগফিরাত, নাজাত সর্বোপরি আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি লাভ করা ও তার কুরবানী কবুল হওয়ার একটি উসীলা।
কাজেই আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তরফ থেকে যদি কেউ কুরবানী দেয়, তবে উক্ত কুরবানীকৃত গোশ্ত সকলেই খেতে পারবে। {দলীলসমূহঃ- (১) আবূ দাউদ, (২) তিরমিযী, (৩) বজলুল মাযহুদ, (৪) শরহে তিরমিযী, (৫) মিশকাত, (৬) মিরকাত , (৭) লুময়াত, (৮) আশয়াতুল লুময়াত, (৯) ত্বিবী, (১০) তালিক, (১১) মুযাহির ইত্যাদি।}
মুহম্মদ আব্দুল্লাহিল মাসুদ
সভাপতি- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত ডোমার শাখা, নিলফামারী।
সুওয়ালঃ কুরবানী করার সুন্নতী পদ্ধতি এবং নিয়ত জানালে খুশি হবো।
জাওয়াবঃ কুরবানীর পশুর মাথা দক্ষিণ দিকে এবং পা পশ্চিম দিকে রেখে অর্থাৎ ক্বিবলামুখী করে শোয়ায়ে পূর্ব দিক থেকে চেপে ধরতে হবে, তারপর কুরবানী করতে হবে। আর কুরবানী করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে, সীনার উপরিভাগ এবং কক্তনালীর মাঝামাঝি স্থানে যেন জবেহ করা হয়। আরো উল্লেখ্য যে, গলাতে চারটি রগ রয়েছে, তন্মধ্যে গলার সম্মূখভাগে দু’টি- খাদ্যনালী ও শ্বাসনালী এবং দু’পার্শ্বে দু’টি রক্তনালী। এ চারটির মধ্যে খাদ্যনালী, শ্বাসনালী এবং দু’টি রক্তনালীর মধ্যে একটি অবশ্যই কাটতে হবে। অর্থাৎ চারটি রগ বা নালীর মধ্যে তিনটি অবশ্যই কাটতে হবে, অন্যথায় কুরবানী হবেনা। যদি সম্ভব হয়, তবে ছুরি চালানোর সময় বেজোড় সংখ্যার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে।
কুরবানীর নিয়ত:- (জবেহ্ করার পূর্বে)
انى وجهت وحهى للذى فطر السموت والارض حنيفا وما انا من المشركين. ان صلاتى ونسكى ومحياى ومماتى لله رب العلمين لاشريك له وبذلك امرت وانا من المسلمين اللهم منك ولك.
উচ্চারণঃ- “ইন্নী ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাজি ফাত্বারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন। ইন্না ছলাতী ওয়া নুসুকী ওয়া মাহ্ইয়া ইয়া ওয়া মামাতী লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। লা শারীকাল্লাহু ওয়া বি যালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমীন। আল্লাহুম্মা মিনকা ও লাকা।” এ দোয়া পড়ে بسم الله الله الكبر বিস্মিল্লাহি আল্লাহু আকবর বলে জবেহ করতে হবে। জবেহ করার পর এ দোয়া পড়বে
اللهم تقبله منى كما تقبلت من حبيبك سيدنا محمد صلى الله عليه وسلم وخليلك ابراهيم عليه السلام.
উচ্চারণঃ-“ আল্লাহুম্মা তাক্বাব্বালহু মিন্নী কামা তাক্বাব্বালতা মিন হাবীবিকা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও খালীলিকা ইব্রাহীমা আলাইহিস সালাম।” যদি নিজের কুরবানী হয়, তবে منى (মিন্নী) বলতে হবে। আর যদি অন্যের কুরবানী হয়, তবে من (মিন) শব্দের পর যার বা যাদের কুরবানী, তার বা তাদের নাম উল্লেখ করতে হবে। আর যদি অন্যের সাথে শরীক হয়, তাহলে منى (মিন্নী)ও বলবে, অতঃপর من (মিন) বলে অন্যদের নাম বলতে হবে। কেউ যদি উপরোক্ত নিয়ত না জানে, তাহলে জবেহ করার সময় শুধু “বিস্মিল্লাহি আল্লাহু আকবর” বলে কুরবানী করলেও শুদ্ধ হয়ে যাবে। কারণ নিয়ত অন্তরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তবে অবশ্যই প্রত্যেক জবেহকারীর উচিৎ উপরোক্ত নিয়ত শিক্ষা করা। কেননা উপরোক্ত নিয়ত পাঠ করে কুরবানী করা সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। {দলীলসমূহঃ- (১) আহমদ, (২) আবূ দাউদ, (৩) তিরমিযী, (৪) দারিমী ইবনে মাযাহ্, (৫) বজলূল মযহুদ, (৬) মিশকাত, (৭) মিরকাত, (৮) মুযাহিরে হক্ব, (৯) লুময়াত, (১০) ত্বীবী, (১১) তালিক্ছ্ ুছবীহ্, (১২) আশয়াতুল লুময়াত, (১৩) আলমগীরী, (১৪) শামী, (১৫) দুররুল মুখতার, (১৬) আইনুল হিদায়া, (১৭) বাহর ইত্যাদি।}
মুহম্মদ ইকরামুল হক কোর্টপাড়া, মেহেরপুর।
সুওয়ালঃ হালাল পশুর কোন কোন অংশ খাওয়া নিষিদ্ধ? জাওয়াবঃ কুরবানী বা হালাল পশুর ৮টি জিনিস খাওয়া যাবেনা। (১) দমে মাছফুহা বা প্রবাহিত রক্ত হারাম, (২) অন্ডকোষ, (৩) মুত্রনালী, (৪) পিত্ত, (৫) লিঙ্গ, (৬) যোনি, (৭) গদুদ বা গুটলী মাকরূহ্ তাহ্রীমী, (৮) শিরদাড়ার ভিতরের মগজ, এটা কেউ মাকরূহ্ তাহ্রীমী, আবার কেউ মাকরূহ্ তান্যিহী বলেছেন। {দলীলসমূহঃ- (১) শামী, (২) মাতালেবুল মু’মিনীন, (৩) উমদাতুল কালাম, (৪) কিতাব- শাইখুল ইসলাম ইত্যাদি।}
মুহম্মদ আবু সালেহ
সভাপতি- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত সিরাজগঞ্জ।
সুওয়ালঃ যে সকল মাদ্রাসার লিল্লাহ্ বোডিংয়ে যাকাত, ফিৎরা ও কুরবানীর চামড়া তোলা হয়, সে লিল্লাহ্ বোডিংয়ে উক্ত মাদ্রাসার শিক্ষকগণ খেতে পারবে কিনা? এবং সে টাকা দ্বারা শিক্ষকদের বেতন দেয়া ও ছাত্রদের থাকা ও পড়ার জন্য মাদ্রাসা ঘর তৈরী করা জায়েয হবে কিনা? বিস্তারিত জানিয়ে উপকৃত করবেন।
জাওয়াবঃ যাকাত, ফিৎরা, কুরবানীর চামড়া বা তার মূল্য ইত্যাদি গরীব, মিস্কীন ও ইয়াতীমদের হক্ব অর্থাৎ ওয়াজিব সদ্কা (আদায় হওয়ার জন্য) গরীব, মিস্কীন ও ইয়াতীমদেরকে তার (সদ্কার) মালিক করে দেয়া শর্ত। তাই যে সকল মাদ্রাসায় লিল্লাহ্ বোডিং অর্থাৎ গরীব, মিস্কীন ও ইয়াতীম ছাত্র রয়েছে, সে সকল মাদ্রাসায় যাকাত, ফিৎরা ও কুরবানীর চামড়া বা তার মূল্য দেয়া যেরূপ জায়িয, তদ্রুপ মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের জন্য তা লিল্লাহ্ বোডিংয়ে গ্রহণ করাও জায়িয। উল্লেখ্য, উক্ত সদ্কার টাকা দিয়ে শুধুমাত্র ছাত্রদেরকে খাওয়ালেই চলবেনা বরং ছাত্রদেরকে তা’লীম দেয়ার জন্য ওস্তাদ বা শিক্ষকের প্রয়োজন রয়েছে এবং ছাত্রদের থাকার জন্য ঘরের দরকার রয়েছে, আর তার জন্যে টাকা-পয়সারও জরুরত রয়েছে। তাই সম্মানিত ফক্বীহ্গণ এরূপ সদ্কার ব্যাপারে একটি সুন্দর সমাধান বা ফায়সালা দান করেছেন। অর্থাৎ তাঁরা বলেছেন, “সদ্কার টাকা হিলা করা হলে, তা দ্বারা ওস্তাদদের বেতন দেয়া, খাওয়ার ব্যবস্থা করা ও মাদ্রাসার জন্য ঘর তৈরী করা সবই জায়িয।” আর হিলার পদ্ধতি হলো- মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কোন গরীব, মিস্কীন বা ইয়াতীমকে উক্ত সদ্কার টাকাগুলোর মালিক করে দিবে। অতঃপর উক্ত গরীব, মিস্কীন ও ইয়াতীম সে টাকাগুলো মাদ্রাসায় দান করে দিবে। অতএব, শুধুমাত্র উক্ত ছূরতেই সদ্কার টাকা দিয়ে ওস্তাদদের বেতন দেয়া, খাওয়ার ব্যবস্থা করা ও মাদ্রাসার জন্য ঘর তৈরী করা জায়িয ও শরীয়তসম্মত।
{দলীলসমূহঃ- (১) শামী, (২) দুররুল মুখতার, (৪) আলমগীরী, (৫) আইনুল হিদায়া, (৬) নাওয়াদিরুল ফতওয়া ইত্যাদি।}