মুহম্মদ আলী হায়দার
সভাপতি- আনজুমানে আল বাইয়্যিনাত
পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম।
সুওয়াল : মাসিক আল বাইয়্যিনাত ৯৮তম সংখ্যায় আপনারা লিখেছেন যে, “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আপাদমস্তক নূরের তৈরি।”
কিন্তু আহমদ রেযা খা বেরেলী তার “ফতওয়ায়ে আফ্রিকায়” বলেছে যে, “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শরীর মুবারক যেই পবিত্র মাটি দ্বারা তৈরি হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম এবং হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনারা সেই মাটি দিয়ে তৈরি।” রেযা খার বক্তব্য অনুযায়ী বুঝা যাচ্ছে যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শরীর মুবারক মাটির তৈরি।
এখন আমাদের সুওয়াল হলো- আপনাদের বক্তব্য সঠিক? না রেযা খার বক্তব্য সঠিক? দয়া করে জানাবেন।
জাওয়াব : সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তোন আলাদা কথা একমাত্র হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি ব্যতীত কোন মানুষকেই মাটির দ্বারা সৃষ্টি করা হয়নি এবং হয়না। সকলকে মায়ের রেহেম শরীফ উনার মধ্যে কুদরতীভাবে সৃষ্টি করা হয়।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক উনার কালাম পাক উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন,
يصوركم فى الارحام كيف يشاء.
অর্থ: “তিনি (মহান আল্লাহ পাক) মায়ের রেহেম শরীফ উনার মধ্যে তোমাদের আকৃতি গঠন করে থাকেন যেভাবে চান সেভাবে।” (পবিত্র সূরা আলে ইমরান/৬)
রেযা খার “ফতওয়ায়ে আফ্রিকার” উল্লিখিত বক্তব্য কুফরী হয়েছে। কারণ সে কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ উনার হাক্বীক্বী ব্যাখ্যা বুঝতে না পেরে শুধু শাব্দিক অর্থের উপর ভিত্তি করে উক্ত বক্তব্য প্রদান করেছে, যার ফলে তার বক্তব্য ভুল হয়েছে যা সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য। নি¤েœ সঠিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ উল্লেখ করা হলো-
আহমদ রেযা খা তার জাওয়াবে প্রথম যে ভুল করেছে সেটা হলো, সে “পবিত্র সূরা ত্বহা উনার ৫৫নং” আয়াত শরীফ- منها خلقنكم الاية.
“আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি এবং মাটিতে তোমাদেরকে ফিরিয়ে নিবো এবং মাটি থেকে পুনরায় তোমাদেরকে বের করবো” এর ব্যাখ্যায় সে বুঝাতে চেয়েছে যে, মানুষ মাত্রই মাটির তৈরি। তার ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ভুল।
যারা আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে মাটির তৈরি প্রমাণ করতে গিয়ে “পবিত্র সূরায়ে ত্বহা” উনার উক্ত আয়াত শরীফ উনাকে দলীল হিসেবে পেশ করে থাকে; এটা তাদের চরম জিহালতি বৈ কিছুই নয়। কারণ উক্ত আয়াত শরীফ উনার মধ্যে যদিও “خلقنكم” তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি” বলা হয়েছে। কিন্তু মুফাসসিরীনয়ে কিরামগণ উনাদের মতে كم দ্বারা হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকেই বুঝানো হয়েছে। বিশ্ববিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য সকল তাফসীরের কিতাবেই একথা উল্লেখ আছে।
যেমন- বিখ্যাত মুফাসসির, ইমামুল মুফাসসিরীন আল্লামা জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি “তাফসীরে জালালাইন” কিতাবে লিখেন,
(منها) اى من الارض (خلقنكم) خلق ابيكم ادم منها.
অর্থ: “(উহা থেকে) অর্থাৎ মাটি থেকে (তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি) অর্থাৎ তোমাদের পিতা হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে মাটি থেকে সৃষ্টির মাধ্যমে।” অনুরূপ ব্যাখ্যা ‘তাফসীরে যাদুল মাসীর, ফতহুল ক্বাদীর, ইবনে কাসীর, তাফসীরে কাসেমী’ ইত্যাদি তাফসীরসমূহে উল্লেখ আছে।
আয়াত শরীফ উনারা উপরোক্ত ব্যাখ্যা দ্বারা এটাই প্রমাণিত হলো যে, উক্ত আয়াত শরীফ দ্বারা সকল মানুষ মাটির তৈরি একথা বুঝানো হয়নি বরং হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি মাটির তৈরি একথাই বুঝানো হয়েছে। কারণ শুধুমাত্র হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকেই সরাসরি মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর সমস্ত আদম সন্তান হযরত আদম সন্তান হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার থেকে কুদরতীভাবে সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং “পবিত্র সূরা ত্বহা” উনার উক্ত আয়াত শরীফ উনার মূল অর্থ হলো- “আমি হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, সে মাটিতেই উনাকে ফিরাবো এবং সেখানে থেকেই তাকে পুনরায় উঠাবো।”
আহমদ রেযা খা দ্বিতীয় ভুল করেছে হাদীছ শরীফ উনার ব্যাখ্যায়। নি¤েœ তা আলোচনা করা হলো-
যেমন, আল্লামা জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “শরহুছ ছুদুর” নামক কিতাবে উল্লেখ করেন, হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে রয়েছে,
اخرج ابو نعيم عن ابى هريرة رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ما من مولود الا وقد ذر عليه من تراب حفرته.
অর্থ: “হযরত ইমাম আবূ নঈম রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাদের হতে বর্ণনা করেন, আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, ‘এমন কোন সন্তান নেই যার উপর তার কবরের মাটি ছিটিয়ে দেয়া হয়না।”
আল্লামা শা’রানী রহমতুল্লাহি আলাইহি “তাযকেরায়ে কুরতুবী” কিতাবে উল্লেখ করেন,
روى الديلمى مرفوع كل مولود ينشر على سرته من تراب حفرته فاذا مات رد الى تربته.
অর্থ: “ইমাম দায়লামী হতে মরফু’ হিসেবে বর্ণিত। আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, প্রতিটি সন্তানের নাভীর উপর (মাতৃগর্ভে) তার কবরের মাটি ছিটিয়ে দেয়া হয় এবং মৃত্যুর পর তাকে উক্ত মাটিতেই ফিরিয়ে নেয়া হয়।”
হযরত আবূ আব্দুল্লাহ মুহম্মদ ইবনে আহমদ আল আনছারী আল কুরতুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “তাফসীরে কুরতুবী শরীফ উনার ৩য় জিঃ ৩৮৭ পৃষ্ঠায় লিখেন,
عن ابن مسعود ان الملك الموكل بالرحم يأخذ النطفة فيضعها على كفه ثم يقول يارب مخلقة او غير مخلقة؟ فان قال مخلقة قال يارب ما الرزق ما الاثر ما الاجل؟ فيقول انظر فى ام الكتاب فينظر فى اللوح المحفوز فيجد فيه رزقه وأثره والجله وعمله ويأخذ التراب الذى يدفن فى بقعته ويعجن به نطفته.
অর্থ: “হযরত আবূ নঈম হাফিয মুররা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণনা করেন যে, নিশ্চয়ই রেহেম অর্থাৎ গর্ভের জন্য নির্ধারিত ফেরেশতা (মাতৃগর্ভে) নুতফা বা মনিকে নিজ হাতের তালুতে রাখেন। অতঃপর বলেন, “হে প্রতিপালক! এই মনি দ্বারা সন্তান সৃষ্টি হবে কি হবে না?” যখন মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, “এটা দ্বারা সন্তান সৃষ্টি হবে।” তখন ফেরেশতা বলেন, “তার রিযিকের ব্যবস্থা, মৃত্যুর আলামত কি ও মৃত্যু কোথায় হবে?” প্রশ্নের উত্তরে মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, “লওহে মাহফুজে দেখে নাও।” ফেরেশতা লাওহে মাহফুজ দেখে সেখানে তার রিযিক, মৃত্যুর আলামত, মৃত্যুর স্থান ও আমল সম্পর্কে জেনে নেন। অতঃপর যেখানে তাকে দাফন করা হবে সেখান থেকে একটু মাটি নিযে তা নুতফা বা মনির সঙ্গে মিশিয়ে দেন।”
হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
عن عبد الله بن مسعود رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ما من مولود الا وفى سرته من تربته التى خلق منها حتى يدفن فيها وانا وابو بكر وعمر خلقنا من تربة واحدة وفيها ندفن.
অর্থ: “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত। আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি, প্রত্যেক সন্তানের নাভীমূলে (খামিরকৃত) মাটির একটা অংশ রাখা হয়েছে। যে স্থানের মাটির খামির তার সৃষ্টিতে ব্যবহার করা হয়েছে (অর্থাৎ যে মাটি সৃষ্টির শুরু থেকে তার নাভীমূলে রাখা হয়েছে) সে স্থানেই তার দাফন হবে। আমি, হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম ও হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনারা একই স্থানের মাটি থেকে সৃষ্টি হয়েছি। (অর্থাৎ তিনজনের নাভীমূলে একই স্থানের মাটি খামির করে রাখা হয়েছে কবর স্থান চিহ্নিত করার জন্য)। যে স্থান থেকে মাটির নিয়ে খামির করে নাভীমূলে রাখা হয়েছে সে স্থানেই দাফন করা হবে।” (মাযহারী, আল মুত্তাফিক ওয়াল মুফতারিক) এর ব্যাখ্যায় অন্য বর্ণনায রয়েছে, মাতৃগর্ভে সন্তানের বয়স যখন চার মাস হয়, তখন নিয়োজিত ফেরেশতা উক্ত সন্তানের হায়াত-মউত ও মৃত্যুস্থান সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট জিজ্ঞাসা করেন, তখন মহান আল্লাহ পাক তিনি লওহে মাহফুজ দেখে যেখানে তার কবর হবে সেখান থেকে সামান্য খামিরকৃত মাটি এনে সন্তানের নাভীতে দিয়ে নেন। এটা মূলতঃ প্রতিটি মানুষের “কবরের স্থান” নির্ধারণের জন্য দেয়া হয়। দেহ সৃষ্টির জন্য নয়।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় তা হলো, এক হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে যদিও বলা হয়েছে যে, “কবরের মাটি নাভীমূলে রেখে দেয়া হয়, অর্থাৎ সন্তানের বয়স যখন মাতৃগর্ভে চার মাস হয় তথা সন্তানের দেহ বা আকার-আকৃতি যখন সৃষ্টি হয়ে যায়, তখন রূহ ফুঁকে দেয়ার সময় ফেরেশতা তার কবরস্থান থেকে মাটি এনে নাভীমূলে রেখে দেন।” কিন্তু অন্য হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বলা হয়েছে, “নুতফার সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়।”
এতে বুঝা গেল যে, উক্ত মাটি মূলতঃ দেহ সৃষ্টির জন্য নয় বরং কবরস্থান নির্ধারণের জন্য। যদি দেহ সৃষ্টির জন্যই হতো তবে দেহ সৃষ্টির পরে উক্ত মাটি নাভীতে রাখা হলো কেন? উক্ত মাটি রাখার পূর্বেই তো দেহ সৃষ্টি হয়ে গেছে তাই এখন রূহ ফুঁকে দেয়া হবে। সুতরাং বলার আর অপেক্ষাই রাখেনা যে, কবরের মাটি নাভীমূলে রেখে দেয়া হোক বা নুতফার সাথে মিশিয়ে দেয়া হোক তা দেহ সৃষ্টির জন্য নয় বরং কবরের স্থান নির্ধারণের জন্য।
এর ব্যাখ্যায় বলা হয়, নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগণ উনাদের রওজা শরীফ চিহ্নিত করার জন্য নির্দিষ্ট স্থান থেকে মাটি যা তার হাক্বীক্বী ছূরতে এনে বা নূর বানিয়ে নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগণ উনাদের (নুতফার সঙ্গে মিশিত করা হয় না বরং তা) নাভী মুবারক উনার উপর রাখা হয়। এর মেছালস্বরূপ বলা হয়, হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম যারা বিনা নুতফাতে কুদরতীভাবে সৃষ্টি হয়েছেন। এছাড়াও হযরত হাওয়া আলাইহাস সালামও বিনা নুতফায় কুদরতীভাবে সৃষ্টি হয়েছেন।
আর আখিরী রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সৃষ্টি মুবারক উনাদের চাইতেও অনেক বেশি রহস্যময় ও কুদরতের অন্তর্ভুক্ত।
এছাড়াও মহান আল্লাহ পাক উনার কিছু খাছ বান্দা বা বান্দী রয়েছেন যাদের কবরস্থান চিহ্নিত করার জন্য উনাদেরও নাভীমূলে মাটি রাখা হয়েছে।
আর আওয়ামুন নাস বা সাধারণ লোকদের কবরস্থান চিহ্নিত করার জন্য তাদের নির্দিষ্ট স্থান থেকে মাটি এনে নুতাফার সাথে মিশ্রিত করা হয়।
কাজেই “হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম, হযরত ওমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাদের এবং (সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিনি একই স্থানের মাটির খামির দ্বারা”-এ কথার অর্থ হলো “উনাদের তিনজনের নাভী মুবারক উনার মধ্য একই স্থানের মাটির খামির রাখা হয়েছে, তাই তারা একই স্থান শায়িত রয়েছেন।”
শুধু তাই নয়, হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম তিনিও সেই একই স্থানে শায়িত হবেন। তাই রওজা শরীফ উনার পাশে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম উনার জন্য জায়গা খালি রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রতিটি সন্তানের কবরের স্থান নির্ধারণের জন্যে যেরূপ তাদের কবরের স্থান থেকে মাটি এনে নাভীতে দিয়ে দেয়া হয় ঠিক; তদ্রুপ আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার “রওজা শরীফ” নির্ধারণের জন্যও উনার নাভী মুবারক উনার মধ্যে রওজা শরীফ উনার যে নূরানী পবত্রি মাটি মুবারক রাখা হয়েছে প্রৃকতপক্ষেতা বেহেশতের পানি দ্বারা ধৌত করে এবং তার হাক্বীক্বী ছূরত অর্থাৎ নূরে পরিণত করে রাখা হয়েছে। তাই হাদীছ শরীফ উনার মধ্যেও রওজা শরীফ উনার উক্ত মাটির মুবারক উনাকে “নূর” বলা হয়েছে। যেমন, এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
عن كعب الاحبار قال لما اراد الله تعالى ان يخلق محمدا صلى الله عليه وسلم امر جبريل ان ياتيه بالطينة التى هى قلب الارض وبهائها ونورها قال فهبط جبريل فى ملائكة الفردوس وملائكة الرفيع الاعلى فقبض قبضة رسول الله صلى الله عليه وسلم من موضع فبره الشريف وهى بيضاء منيرة فعجنت بماء التسنيم فى معين انهار الجنة حتى صارت كالدرة البيضاء …
অর্থ: “হযরত কা’বা আহবার রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, যখন মহান আল্লাহ পাক তিনি আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সৃষ্টি করার ইচ্ছা করলেন, তখন হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম উনাকে (উনার নাভী মুবারক উনার মধ্যে রাখার জন্য) এমন খামীর নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন যা মূলতঃ যমীনের আত্মা, ঔজ্জল্য ও ‘নূর’। এ নির্দেশ পেয়ে হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালাম জান্নাতুল ফিরদাউস ও সর্বোচ্চ আসমানের ফেরেশতাদেরকে নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। অতঃপর রওজা শরীফ উনার স্থান থেকে এক মুষ্ঠি স্বচ্ছ নূরানী মাটি নেন। উক্ত মাটিকে বেহেশতের প্রবাহিত ঝরণা সমূহের মধ্যে ‘তাসনীম’ নামক ঝরণার পানি দ্বারা ধৌত করার পর তা একখানা শুভ্র মুক্তার আকার ধারণ করে; অর্থাৎ নূরে পরিণত হয়ে যায়। …”
অতএব, প্রমাণিত হলো যে, আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাভী মুবারক উনার মধ্যে যে মাটি রাখা হয়েছে তা মাটির ছূরতে রাখা হয়নি। কারণ উনার নূরে মুজাসসাম শরীর মুবারক উনার মধ্যে মাটিকে মাটির ছূরতে রাখা সম্ভব নয় বা রাখার কোন অবকাশ নেই। তাই তা পুনরায় তার পূর্বের হাক্বীক্বী ছূরতে পরিবর্তন করে অর্থাৎ মাটিকে নূর বানিয়ে সেই নূরকে নাভী মুবারক উনার মধ্যে রাখা হয়। সত্যিকার অর্থে তা হলো নূরে মুহম্মদী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারই একটা অংশ যা প্রকৃতপক্ষে “নূর”।
শুধু তাই নয়, বরং আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার জিসম বা শরীর মুবারক উনার সব কিছুই যেমন রক্ত মুবারক, ইস্তিঞ্জা মুবারক, কেশ মুবারক ইত্যাদি সবই ‘নূর’। যার কারণে “দুররুল মুখতার” কিতাবে ফতওয়া দেয়া হয়েছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সমস্ত কিছু পাক বা পবিত্র। শুধু পাক বা পবিত্রই নয় বরং তা পান করলে বা খেলে যে পান করবে বা খাবে সে জান্নাতী হবে বা তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হবে।
তাই কবি বলেছেন, “আমরা যা খাই তা মল-মূত্র হয়ে বের হয়ে যায়। আর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যা খান তা ‘নূর হয়ে যায়।”
সুতরাং আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মাটির তৈরি হওয়ার প্রশ্নই আসেনা। কারণ উনার সৃষ্টি, আগমন ও অবস্থান প্রত্যেকটিই ‘নূর’ হিসেবে। আর মাটিসহ সব কিছুই উনার সৃষ্টির পর উনারই ‘নূর মুবারক’ থেকে সৃষ্টি হয়েছে।
অতএব, “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনারা একই স্থানের মাটি দ্বারা সৃষ্টি” এর সরাসরি অর্থ গ্রহণ করলে আখিরী রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শান ও মানের খিলাফ হবে যা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। তাই এর ছহীহ ও গ্রহণযোগ্য তা’বীল বা ব্যাখ্যা হলো, “রওজা শরীফ উনার স্থান নির্ধারণের জন্য নাভী মুবারক উনার মধ্যে যা রাখা হয়েছে। তা পূনারায় তার পূর্বের হাক্বীক্বী ছূরতে পরিবর্তন করে অর্থাৎ মাটিকে নূরে বানিয়ে সেই নূরকে নাভী মুবারক উনার মধ্যে রাখা হয়। সত্যিকার অর্থে তা হলো নূরে মুহম্মদী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারই একটা অংশ যা প্রকৃতপক্ষে “নূর”।
মূলকথা হলো, আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সৃষ্টি, আগমন, অবস্থান, বিদায় ও বর্তমান অবস্থান সর্বাবস্থায়ই তিনি নূর বা নূরে মুজাসসাম। এটাই আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা। আর এই আক্বীদাই পোষণ করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরয।
{দলীলসমূহ : (১) আহকামুল কুরআন লি ইবনিল আরাবী (২) কুরতুবী (৩) রুহুল মায়ানী (৪) মাযহারী (৫) তাবারী (৬) কবীর (৭) বায়যাবী (৮) শায়খ যাদাহ (৯) আবী সাউদ (১০) মায়ানিউত তানযীল (১১) মাদারিকুত তানযীল (১২) জালালাইন (১৩) মুয়ালিমুত তানযীল (১৪) যাদুল মাসীর (১৫) নিশাপুরী (১৬) রুহুল বয়ান (১৭) ক্বাদেরী (১৮) মাওয়ারেদী (১৯) নাযমুদদুরার (২০) মুদ্বীহুল কুরআন (২১) দুরুরুল মানছুর (২২) দুররুল মাছূন (২৩) আল জাওয়াহির (২৪) আত তাসহীল (২৫) ফাতহুল ক্বাদীর (২৬) হাশিয়াতুশ শিহাব (২৭) মাওয়াহিবুর রহমান (২৮) হাক্কানী (২৯) মাজেদী (৩০) কাশফুর রহমান (৩১) ওছমানী (৩২) খাযায়িনুল ইরফান (৩৩) জিয়াউল কুরআন (৩৪) ক্বাসেমী (৩৫) আলী হাসান (৩৬) তাহেরী (৩৭) নূরুল কুরআন (৩৮) কামালাইন (৩৯) হাশিয়ায়ে জামাল (৪০) মুছান্নিফে আব্দুর রাজ্জাক (৪১) দালায়িলুন নুবুওওয়াত (৪২) ফিরদাউস লিদ দাইলামী (৪৩) আবু নাঈম (৪৪) মুসনদে আহমদ (৪৫) হাকিম (৪৬) শরহুস সুন্নাহ (৪৭) মিশকাত (৪৮) মিরকাত (৪৯) আশয়াতুল লুময়াত (৫০) মুযাহিরে হক্ব (৫১) ফয়জুল ক্বাদীর (৫২) মাওজয়াতুল কবীর (৫৩) খাছায়িছুল কুবরা (৫৪) মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া (৫৫) শরহে মাওয়াহিব (৫৬) সীরতে হালবীয়া (৫৭) নি’মাতুল কুবরা (৫৮) বুলুগুল আমানী (৫৯) ইবনুল আসাকির (৬০) জাওয়াহিরুল বিহার (৬১) তাহক্বীকুল মাকাম (৬২) শরফুল আলম (৬৩) তাওয়ারিখে মুহম্মদী (৬৪) উমদাতুন নুকূল (৬৫) বিদায়া ওয়ান নিহায়া (৬৬) আনওয়ায়ে মাহমুদীয়া (৬৭) নুযহাতুস মাজালিশ (৬৮) মাদারিজুন নুবুওওয়াত (৬৯) হাদিয়াতুল মাহদী (৭০) আল আনওয়ার ফী মাওলিদিন নাবিয়্যীল মুহম্মদ (৭১) নূরে মুহম্মদী (৭২) মকতুবাত শরীফ (৭৩) হাদিকায়ে নাদিয়া শরহে তরীকায়ে মুহম্মদীয়া (৭৪) মায়ারিফে মুহম্মদী (৭৫) ইওয়াকীত ইত্যাদি।}
মুহম্মদ মিজানুর রহমান খান
লুটন, ইউ.কে।
সুওয়াল : “ইসলামী শরীয়তে ঈদ দু’টি। যথা- ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা। এতে তৃতীয় ঈদের অস্তিত্ব নেই, এটা বিদয়াত।”
জনৈক লিখকের এ বক্তব্য কতটুকু ঠিক? দলীলসহ জানার জন্য অনুরোধ করছি।
জাওয়াব : উল্লিখিত বক্তব্য লিখকের কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ উনার ইলম সম্পর্কে চরম জিহালতি ও অজ্ঞতার ফসল। তার বক্তব্য আদৌ ঠিক তো নয়ই কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ উনার খিলাফ হওয়ার কারণে তা নাযায়েয হয়েছে। আর হাদীছ শরীফ অস্বীকার করার কারণে কুফরী হয়েছে। কারণ শরীয়তে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা এ দু’টি ঈদ ছাড়াও আরো ঈদের অস্তিত্ব রয়েছে। যেমন, হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
عن عبيد بن السباق مرسلا قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم فى جمعة من الجمع يا معشر المسلمين ان هذا يوم جعله الله عيدا.
অর্থ: “হযরত ওবায়েদ বিন সাব্বাক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মুরসাল সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এক জুমুয়ার দিনে বলেন, হে মুসলমান সম্প্রদায়! এটি এমন একটি দিন যাকে মহান আল্লাহ পাক তিনি ঈদ স্বরূপ নির্ধারণ করেছেন।” (ইবনে মাযাহ, মুয়াত্তা মালিক, মিশকাত)
হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
عن ابن عباس رضى الله تعالى عنه انه قرأ “اليوم اكملت لكم دينكم” الاية وعنده يهودى فقال لونزلت هذه الاية علينا لاتخذناها عيدا فقال ابن عباس فانها نزلت فى يوم عيدين فى يوم جمعة ويوم عرفة.
অর্থ: “হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদা
اليوم اكملت لكم دينكم الاية.
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম” এ আয়াত শরীফটি শেষ পর্যন্ত পাঠ করলেন। তখন উনার নিকট এক ইহুদী ছিল সে বলে উঠলো, “যদি এই আয়াত শরীফ আমাদের ইহুদী সম্প্রদায়ের প্রতি নাযিল হতো আমরা আয়াত শরীফ নাযিল উনার দিনটিকে “ঈদ” বলে ঘোষণা করতাম।” এটা শুনে হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তায়ালা আনহু বললেন, এ আয়াত শরীফ সেই দিন নাযিল হয়েছে যেদিন এক সাথে দু’ঈদ ছিল- (১) জুমুয়ার দিন এবং (২) আরাফার দিন।” (তিরমিযী)
হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ হয়েছে,
عن طارق بن شهاب قالت اليهود لعمر انكم تقرئون اية لونزلت فينا لاتخذناها عيدا فقال عمر انى لاعلم حيث انزلت واين انزلت واين رسول الله صلى الله عليه وسلم حين انزلت يوم عرفة وانا والله بعرفة.
অর্থ: “হযরত তারিক বিন শিহাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, ইহুদীরা হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে বললো যে, আপনারা এমন একটি আয়াত শরীফ পাঠ করেন যদি তা আমাদের ইহুদী সম্প্রদায়ের দিনটিকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করতাম। তখন হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, আমি নিশ্চিতরূপে জানি যে, উক্ত আয়াত শরীফ কখন নাযিল হয়েছে, কোথায় নাযিল হয়েছে। এবং আরাফার দিন এ আয়াত শরীফ যখন নাযিল হয় তখন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কোথায় অবস্থান করছিলেন। মহান আল্লাহ পাক উনার কছম! নিশ্চয়ই সেদিনটি ছিল আরাফার দিন।” (ইবনে মাযাহ)
হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
عن ابن عباس رضى الله تعالى عنه ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قدم المدينة فوجد اليهود صياما يوم عاشوراء فقال لهم رسول الله صلى الله عليه وسلم ما هذا اليوم الذى تصومونه فقالوا هذا يوم عظيم انجى الله فيه موسى وقومه وغرق فرعون وقومه فصامه موسى شكرا فنحن نصومه فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم فنحن احق واولى بموسى منكم فصامه رسول الله صلى الله عليه وسلم وامر بصيامه.
অর্থ: “হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আখিরী নবী, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন মদীনা শরীফ উনার মধ্যে তাশরীফ আনলেন তখন তিনি ইহুদীদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, তোমরা এই দিন কেন রোযা রাখ? তারা বললো, এটা একটি মহান দিন, যেদিন মহান আল্লাহ পাক হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও উনার ক্বওমকে নাযাত দিয়েছিলেন আর ফিরআউন এবং তার সম্প্রদায়কে লোহিত সাগরে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। সেজন্য হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তিনি শুকরিয়া স্বরূপ রোযা রাখেন তাই আমরাও রোযা রাখি। অতঃপর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, আমরাই হযরত মূসা আলাইহিস সালাম উনার বেশি হক্বদার ও নিকটবর্তী তোমাদের চাইতে। অতঃপর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজেও রোযা রাখলেন এবং অন্যান্যদেরকেও রোযা রাখতে আদেশ করলেন।” (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, মিশকাত শরীফ/১৮০)
উপরোক্ত হাদীছ শরীফসমূহ দ্বারা জানা গেল যে, শুক্রবার দিনটি এবং আরাফার দিনটি হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর জন্য ঈদ তথা খুশির দিন। অর্থাৎ ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর এ দুই ঈদ যেভাবে হাদীছ শরীফ উনার দ্বারা প্রমাণিত ঠিক সেভাবেই তৃতীয় ঈদ হিসেবে জুমুয়ার দিন আর চতুর্থ ঈদ হিসেবে আরাফার দিন হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত।
অতএব, যারা বলে শরীয়তে দুই ঈদ ব্যতীত তৃতীয় ঈদের কোন অস্তিত্ব নেই তাদের কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ উনাদের খিলাফ বলে প্রমানিত হলো।
স্মরণীয়, “পবিত্র সূরা মায়িদা উনার ৩ নং আয়াত শরীফ” নাযিল হওয়ার কারণে আয়াত শরীফ নাযিল হওয়ার দিনটি যদি ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণীয় হয় আর হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও উনার উনার ক্বওম যদি ফিরআউনের কবল থেকে নাযাত পাওয়ার কারনে আশুরার দশ তারিখ শুকরিয়া আদায় ও সম্মানিত দিন হিসেবে গ্রহণীয় হতে পারে তাহলে যিনি পবিত্র সূরা মায়িদা অর্থাৎ কুরআন শরীফ নাযিল হওয়ার কারণ ও হযরত মূসা আলাইহিস সালাম উনার আগমণের কারণ, উনার আগমনের দিনটি কেন সম্মানের দিন এবং খুশির দিন হবে না? অবশ্যই হবে। শরীয়তের কোথাও সেদিনকে দুঃখের দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি বরং সর্বশ্রেষ্ঠ খুশির দিন হিসেবেই গ্রহণ করা হয়েছে ও করতে বলা হয়েছে।
কাজেই আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আগমনের দিনই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ দিন যা সর্বোত্তম ঈদ আর প্রকৃতপক্ষে এটাই প্রথম ঈদ।
অতএব, কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ উনাদের দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, দুটি ঈদ ছাড়া আরো একাধিক ঈদের অস্তিত্ব শরীয়তে বিদ্যমান তা বিদয়াত কিংবা অন্য কিছু নয়। যারা বলে দু’টি ঈদ ছাড়া অন্য তৃতীয় কোন ঈদের অস্তিত্ব শরীয়তে নেই তারা মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য একথা বলে থাকে। অথচ দু’টি ঈদ ছাড়াও আরো একাধিক ঈদের অস্তিত্ব কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ তথা শরীয়ত কর্তৃক স্বীকৃত। তাই যারা সেই ঈদকে বিদয়াত বলবে তারা কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ অস্বীকারকারী হিসেবে সাব্যস্ত হবে। আর যারা কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ অস্বীকার করে তারা কাফির হয়ে থাকে।
{দলীলসমূহ: (১) বুখারী (২) মুসলিম (৩) তিরমিযী (৪) ইবনে মাযাহ (৫) মুয়াত্তা মালিক, (৬) মিশকাত (৭) ফতহুল বারী (৮) উমদাতুল ক্বারী (৯) ইরশাদুস সারী (১০) তাইসীরুল বারী (১১) শরহে কিরমানী (১২) ফতহুল মুলহিম (১৩) শরহে নব্বী (১৪) মুফহিম (১৫) তুহফাতুল আহওয়াজী (১৬) আরিদাতুল আহওয়াজী (১৭) উরফুশ শাজী (১৮) মিরকাত (১৯) আশয়াতুল লুময়াত (২০) লুময়াত (২১) শরহুত ত্বীবী (২২) তালীকুছ ছবীহ (২৩) মুযাহিরে হক্ব (২৪) মিরআতুল মানাযীহ (২৫) দর্সে মিশকাত ইত্যাদি।
মুহম্মদ মিজানুর রহমান খান
লুটন, ইউ, কে।
সুওয়াল : “ঈদ-ই-মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে” সর্বশ্রেষ্ঠ ঈদ বলা জায়েয কি না?
জাওয়াব : ঈদ-ই-মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সর্বশ্রেষ্ঠ ঈদ ও সর্বশ্রেষ্ঠ দিন বলা অবশ্যই জায়েয। এটাই কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ সম্মত মত। এর বিপরীত মত পোষণ করাই নাজায়েয।
কারণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যেদিন যমীনে তাশরীফ এনেছেন সে দিনটিই হচ্ছে সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ দিন, বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন ও সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন যা শবে ক্বদর শবে বরাত, ঈদুল আযহা, ঈদুল ফিতর, জুমুয়া ইদ্যাদি সকল দিনসমূহ থেকে শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত।
উল্লেখ্য, স্বয়ং মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি জুমুয়ার দিনকে সাইয়্যিদুল আইয়্যাম অর্থাৎ দিনসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বা সর্দার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শুধু তাই নয় জুমুয়ার দিনকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার চেয়েও শ্রেষ্ঠ ও মহান বলে উল্লেখ করেছেন। তার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার সৃষ্টি, যমীনে আগমন ও ইন্তিকাল এছাড়া জুমুয়ার দিন দোয়া কবুলের একটা নির্দিষ্ট সময় রয়েছে এবং জুমুয়ার দিনে ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে ইত্যাদি।
এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
عن ابى ليلة بن عبد المنذر قال قال النبى صلى الله عليه وسلم ان يوم الجمعة سيد الايام واعظمها عند الله وهو اعظم عند الله من يوم الاضحى ويوم الفطر فيه خمس خلال خلق الله فيه ادم واهبط الله فيه ادم الى الارض وفيه توفى الله ادم وفيه ساعة لايسأل العبد فيها شيئا الا اعطاه ما لايسأل حراما وفيه تقوم الساعة ما من ملك مقرب ولا سماء ولا ارض ولا رياح ولا جبال ولا بحر الا هو مشفق من يوم الجمعة.
অর্থ: “হযরত আবূ লায়লা ইবনে আব্দুল মুনযির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন যে, হযরত রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেছেন, জুমুয়ার দিন সকল দিনের সর্দার এবং সকল দিন অপেক্ষা মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট অধিক শ্রেষ্ঠ সম্মানিত। এটি ঈদুল আযহার দিন ও ঈদুল ফিতরের দিন অপেক্ষাও মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট অর্ধক শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত। এ দিনটিতে পাঁচটি (গুরুত্বপূর্ণ) বিষয় রয়েছে, (১) এ দিনে মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনাকে সৃষ্টি করেনে, (২) এ দিনে উনাকে যমীনে প্রেরণ করেছেন, (৩) এ দিনে উনাকে ওফাত দান করেছেন, (৪) এ দিনটিতে এমন একটি সময় রয়েছে যে সময়টিতে বান্দা মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট কিছু চাইলে তিনি অবশ্যই তাকে তা দান করেন যে পর্যন্ত না সে হারাম কিছু চায় এবং (৫) এ দিনেই ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে। এমন কোন ফেরেশতা নেই, আসমান নেই, যমীন নেই, বাতাস নেই, পহাড় নেই, সমুদ্রা নেই, যে জুমুয়ার দিন সম্পর্কে ভীত নয়।” (ইবনে মাযাহ মিশকাত)
জুমুয়ার দিনের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে স্বয়ং আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি জুমুয়ার দিনকে ঈদের দিন বলে বর্ণনা করেছেন।
এ সম্পর্কে হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে,
عن عبيد بن السباق مرسلا قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم فى جمعة من الجمع يا معشر المسلمين ان هذا يوم جعله الله عيدا.
অর্থ: “হযরত ওবায়েদ বিন সাব্বাক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি মুরসাল সূত্রে বর্ণনা করেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এক জুমুয়ার দিনে বলেন, হে মুসলমান সম্প্রদায়! এটি এমন একটি দিন যাকে মহান আল্লাহ পাক তিনি ঈদস্বরূপ নির্ধারণ করেছেন।” (ইবনে মাযাহ, মুয়াত্তা মালিক, মিশকাত)
অর্থাৎ জুমুয়ার দিন ঈদের দিন যা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা থেকেও শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত।
স্মরণীয়, হযরত আদম আলাইহিস সালাম উনার সাথে সম্পর্কযুক্ত থাকার কারণে যদি জুমুয়ার দিন ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার চেয়েও সম্মানিত, ফযীলতপ্রাপ্ত ও মহান হয় তাহলে যে মহান ব্যক্তিত্বের উছীলায় হযরত আদম আলাইহি সালাম উনার যমীনে আগমন ঘটলো সেই মহান ব্যক্তির সাথে যেই দিনই সম্পর্কযুক্ত সেই দিনটির সম্মান, ফযীলত ও মহত্ত্ব কতটুকু হবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ উনার বিশুদ্ধ কিতাব “মুস্তাদরেকে হাকিমে” বর্ণিত হয়েছে, “হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি যখন যমীনে আসলেন, মুখতালিফ রেওয়ায়েত তিনি যমীনে এসে দু’শ থেকে তিনশ বছর পর্যন্ত মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট কান্নাকাটি, দোয়া ইস্তিগফার করলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি এই বলে দোয়া করলেন যে,
اغفرلى بحق محمد صلى الله عليه وسلم قال الله تعالى كيف عرفت محمدا صلى الله عليه وسلم قال ادم عليه السلام لما خلقتنى بيدك ونفخت فى منى روحك رفعت رأسى فرأيت على قوام العرش مكتوبا لا اله الله محمد رسول الله فعلمت انك لم تضف الى اسمك الا احب الخلق اليك قال الله صدقت يا ادم لولاه ما خلقتك وفى رواية اخرى ماخلقت سماء ولا ارضا ولاجنا ولا انسا. الخ
অর্থ: “আয় মহান আল্লাহ পাক! সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উছীলায় আমার দোয়া কবুল করুন।” মহান আল্লাহ পাক তিনি বললেন, “হে আদম আলাইহিস সালাম! আপনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে কিভাবে চিনলেন? হযরত আদম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, “আয় মহান আল্লাহ পাক! যখন আপনি আপনার কুদরতী হাতে আমাকে সৃষ্টি করলেন এবং আমার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিলেন, তখন আমি আমার মাথা উপরের দিকে উত্তোলন করি এবং আরশের স্তম্ভের মধ্যে লেখা দেখি, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ’ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি, তখন আমি বুঝলাম যে, যাঁর নাম মুবারক আপনার মুবারক নামের সাথে সংযুক্ত করেছেন তিনি আপনার খুব প্রিয়।” মহান আল্লাহ পাক তিনি বললেন, “আপনি সত্য কথাই বলেছেন। কারণ তিনি যদি না হতেন অর্থাৎ আমি যদি উনাকে সৃষ্টি না করতাম তবে আপনাকেও সৃষ্টি করতাম না।”
অন্য বর্ণনায় এসেছে, “বেহেশত-দোযখ, আসমান-যমীন, লৌহ-কলম, জ্বিন-ইনসান ইত্যাদি কিছুই সৃষ্টি করতাম না।”
অতএব, উল্লিখিত পাঁচটি কারণে জন্য জুমুয়ার দিন ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা অপেক্ষা যদি শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত হয় তাহলে যাঁকে সৃষ্টি না করলে উল্লিখিত পাঁচটি কারণ সংঘটিত হতোনা; অর্থাৎ হযরত আদম আলাইহিস সালামসহ কায়েনাতের কোন কিছুই সৃষ্টি করা হতনা, দোয়া কবুল হওয়া এবং ক্বিয়ামত সংঘটিত হওয়া তো পরের প্রশ্ন। সেই নবী ও রসূলগণ উনাদের সর্দার, উম্মুল খলায়িক্ব, হাবীবে খোদা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যেদিন যমীনে তাশরীফ নেন, আগমন করেন ও বিদায় গ্রহণ করেন সেদিনের সম্মান, ফযীলত ও মহত্ত্ব যে, সমস্ত বার ও তারিখ থেকে লক্ষ-কোটি গুণ বেশি এতে কোনরূপ সন্দেহের অবকাশ নেই।
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি স্বয়ং নিজেই উনার কালাম পাকে বলেন, “তিনি উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সর্ববিষয়ে, সর্বকালের, সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামতসমূহ দান করেছেন।”
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন,
انا اعطينك الكوثر.
অর্থ: “নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাওছার দান করেছি।” (পবিত্র সূরা কাওছার/১)
“কাওছার”-এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়- প্রথমত : কাওছার বলা হয়েছে, হাউজে কাওছারকে। যা খাছ করে মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে দান করেছেন। যা পান করলে জান্নাতে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পানির পিপাসা লাগবে না।
দ্বিতীয়ত : কাওছার বলা হয়েছে খাইরে কাছীর। অর্থ যা অতি উত্তম, অনেক ভাল।
হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
انا اكرم الاولين والاخرين على الله.
অর্থ: “আমিই মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের চাইতে বেশি সম্মানিত।” (তিরমিযী, দারিমী)
অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে যিনি সর্বকালের জন্য সকলের চেয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে সম্মানিত উনাকে যা দিয়েছেন তা সর্বকালের জন্য, সবদিক থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ ও উত্তম। যেমন, তিনি যা ব্যবহার করেছেন বা যা উনার ব্যবহারে এসেছে। তিনি যা খেয়েছেন, পান করেছেন, পরিধান করেছেন, যেখানে অবস্থান করেছেন, যে দিনে ও যে মাসে আগমন করেছেন এবং বিদায় নিয়েছেন, তিনি যা আদেশ-নিষেধ করেছেন এক কথায় মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে যা কিছু সংশ্লিষ্ট ও সম্পর্কযুক্ত ইত্যাদি সমস্ত কিছুই সর্বকালের জন্য, সর্বদিক থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ তাই উনার আগমনের দিন ও বিদায়ের দিন সর্বকালের জন্য সবচেয়ে সম্মানিত ও সর্বশ্রেষ্ঠ। খুশির দিন বা ঈদের দিন।
কারণ তিনি নবী উনাদের নবী, রসূল উনাদের রসূল। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কালাম পাক উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন,
واذ اخذ الله ميثاق النبين لما اتيتكم من كتب وحكمة ثم جاءكم رسول مصدق لما معكم لتؤمنن به ولتنصرنه قال ءاقررتم واخذاتم على ذلكم اصرى قالوا اقررنا قال فاشهدوا وانا معكم من الشهدين.
অর্থ: “আর যখন মহান আল্লাহ পাক তিনি নবীগণ উনাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন, আমি আপনাদেরকে কিতাব ও হিকমত দান করবো, অতহঃপর যখন সেই রসূল আগমন করে আপনাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তা সত্যে প্রতিপাদন করবেন। (আপনারা উনাকে পেলে) অবশ্যই উনার প্রতি ঈমান আনবেন এবং উনাকে সাহায্য করবেন। মহান আল্লাহ পাক তিনি তাদেরকে বললেন, আপনারা কি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রিসালতকে স্বীকার করে নিলেন? এবং আপনাদের প্রতি আমার এ অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন উনারা (নবীগণ) বললেন, আপনারা স্বাক্ষী থাকুন এবং আমিও আপনাদের সাথে স্বাক্ষী রইলাম।” (পবিত্র সূরা আলে ইমরান/৮১)
আর হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন,
انا سيد ولد ادم يوم القيامة- انا قائد المرسلين- انا حبيب الله- كنت امام النبيين.
অর্থ: “ক্বিয়ামতের দিন আমিই আদম সন্তানদের সর্দার হবো, আমিই মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের চাইতে বেশি সম্মানিত, আমিই রসূলগণ উনাদের পরিচালক বা অগ্রগামী, আমিই মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমিই নবীগণ উনাদের ইমাম।” (মুসলিম, তিরমিযী, দারিমী)
অতএব, উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এটাই প্রমাণিত হলো যে, আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আগমন ও বিদায়ের দিনই সর্বশ্রেষ্ঠ ঈদ যা ঈদ-ই-মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিসেবে মশহুর।
{দলীলসমূহ : (১) রুহুল মায়ানী (২) রুহুল বয়ান (৩) মাযহারী (৪) ইবনে কাছীর (৫) ইবনে আব্বাস (৬) খাযেন (৭) বাগাবী (৮) কুরতুবী (৯) কবীর (১০) তাবারী (১১) দুররে মনছুর (১২) ছফওয়াতুত তাফাসীর (১৩) মুসলিম (১৪) তিরমিযী (১৫) ইবনে মাযাহ (১৬) মুয়াত্তা মালিক (১৭) দারিমী (১৮) মুস্তাদরেকে হাকিম (১৯) মিশকাত (২০) তুহফাতুল আহওয়াজী (২১) উরফুশ শাজী (২২) আরিদাতুল আহওয়াজী (২৩) ফতহুল মুলহিম (২৪) মুফহিম (২৫) শরহে নব্বী (২৬) মিরকাত (২৭) মুযাহিরে হক্ব (২৮) আশয়াতুল লুময়াত (২৯) লুময়াত (৩০) শরহুত ত্বীবী (৩১) তালীকুছ ছবীহ ইত্যাদি।
১। মাওলানা মুহম্মদ মাহমুদ বিন হাসান, ছাতক, সুনামগঞ্জ।
২। মাওলানা মুহম্মদ জাকিউদ্দীন, দিরাই, সুনামগঞ্জ।
৩। মাওলানা মুহম্মদ আযীযুল হক (জামী) জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।
৪। মুহম্মদ সোহেল রানা, গাজীনগর, সুনামগঞ্জ।
৫। মুহম্মদ ফারুক আহমদ, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।
৬। মুহম্মদ শামছুল ইসলাম (রিপন), দিরাই, সুনামগঞ্জ।
৭। মুহম্মদ হাবিবুর রহমান মুন্সী, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।
৮। মুহম্মদ আব্দুল মালিক (মানিক মিয়া) জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।
৯। মুহম্মদ শাহানুর আলম, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।
১০। মুহম্মদ আল মামুন, শ্রীহাইল শাল্লা, সুনামগঞ্জ।
১১। মুহম্মদ শাহাদত হুসাইন, বন্দর, চট্টগ্রাম।
১২। মুহম্মদ নূরুল গণী, খুলসী, চট্টগ্রাম।
১৩। মুহম্মদ মশিউজ্জামান, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম।
১৪। মুহম্মদ ছিদ্দীকুল ইসলাম, ঝাউতলা, চট্টগ্রাম।
১৫। মুহম্মদ ওহীদুল হক্ব, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম।
১নং সুওয়াল
সুওয়াল : ওহাবী, খারিজী, অতি সুন্নী, বিদয়াতী ইত্যাদি বাতিল ফিরক্বার লোকেরা মাসিক আল বাইয়্যিনাত পড়তে নিষেধ করে থাকে। শরীয়তের দৃষ্টিতে এদের সম্পর্কে হুকুম কি হবে?
জাওয়াব : হ্যাঁ- ওহাবী, খারিজী, অতি সুন্নী, বিদয়াতী ইত্যাদি বাতিল ফিরক্বার লোকেরা মাসিক আল বাইয়্যিনাত পড়তে নিষেধ করবে এটাই স্বাভাবিক।
কারণ মাসিক আল বাইয়্যিনাতে ওহাবী, খারিজী, অতি সুন্নী, বিদয়াতী ইত্যাদি বাতিল ফিরক্বার হাক্বীক্বত উন্মোচন করা হয় কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ উনার আলোকে।
আর এটাই খাছ সুন্নত যে, “বাতিল ফিরক্বার লোকেরা হক্বের বিরোধীতা করবে।”
উদাহরণ স্বরূপ বলা হয়, মহান আল্লাহ পাক তিনি যখন কালামুল্লাহ শরীফ নাযিল করলেন তখন কাফিররা কালামুল্লাহ শরীফ বা কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করতে, শ্রবণ করতে ও প্রচার করতে নিষেধ করতো। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন,
قال الذين كفروا لاتسمعوا لهذا القران والغوا فيه لعلكم تغلبون.
অর্থ: “কাফিররা বলে, তোমরা কুরআন শরীফ শ্রবণ করোনা। (কুরআন শরীফ তিলাওয়াতের সময়) হট্টগোল বা হৈ চৈ করো, হয়তবা এতে তোমরা গালেব (জয়ী) হবে।” (পবিত্র সূরা হা-মীম সিজদা/২৬)
অর্থাৎ কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করার সময় হট্টগোল, হৈ চৈ করলে মানুষ তা শুনতে পারবেনা আর শুনতে না পারলে তা অনুধাবন করতে ও বুঝতে পারবেনা। আর অনুধাবন করতে ও বুঝতে না পারলে হিদায়েত গ্রহণ তথা মহান আল্লাহ পাক ও উনার রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মত ও পথে আসতেও পারবেনা। এতে কাফির ও বাতিল ফিরক্বার কর্তৃত্ব ও অস্তিত্ব বজায় থাকবে।
আর যদি হট্টগোল করা না হয় তাহলে মানুষ কুরআন শরীফ শুনে তা অনুধাবন করে ও বুঝে হিদায়েত লাভ করবে। আর তখন কাফিরদের কর্তৃত্ব যেমন নষ্ট হয়ে যাবে তেমনি কুফরীও মিটে যাবে। তাই তাদের ভূমিকা ছিল যে, কেউ যেন কুরআন শরীফ না শুনতে পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
ঠিক একইভাবে মানুষ যদি বর্তমান ও ভবিষ্যত কালের কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ ছহীহ মতাদর্শ ভিত্তিক পত্রিকা “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” পড়ে, শুনে হক্ব বুঝতে পারে তাহলে ওহাবী, খারিজী, অতি সুন্নী, বিদয়াতী সর্বপ্রকার বাতিল ফিরক্বার গোমরাহীমূরক আক্বীদা, আমল জেনে নিজেরাও বাঁচবে এবং অন্যান্য মানুষদেরকেও বাঁচাবে। তাতে বাতিল ফিরক্বার একদিকে যেমন কর্তৃত্ব নষ্ট হবে অন্য দিকে তাদের অস্তিত্বও মিটে যাবে। তাই তারা “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” পড়তে, শুনতে ও প্রচার করতে সর্বাত্মকভাবে বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করে থাকে। আর এজন্যই কিতাবে বর্ণিত হয়েছে,
لكل موسى فرعون ولكل فرعون موسى.
অর্থ: “প্রত্যেক মুসা আলাইহিস সালাম উনার জন্য ফিরআউন থাকবে আর প্রত্যেক ফিরআউনের জন্য মুস আলাইহিস সালাম উনার আগমন ঘটবে।”
অর্থাৎ প্রত্যেক যুগেই হক্ব ও বাতিল দু’শ্রেণীর লোক থাকবে। হক্বপন্থীগণ আসবেন বাতিলকে হিদায়েত করার জন্য। আর বাতিলপন্থীরা থাকবে হক্বপন্থীগণ উনাদেরকে কষ্ট দিয়ে উনাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করার জন্য।
অতএব, কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ উনার আলোকে লিখিত ছহীহ, অকাট্য, নির্ভরযোগ্য, দলীলভিত্তিক, অনুসরণীয়, যামানার তাজদীদী মুখপত্র “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” পত্রিকার বিরোধীতা করবে বাতিল ফিরক্বার লোকেরা; এতে হক্বপন্থীগণ উনাদের দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হওয়ার কোনই কারণ নেই।
কেননা এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন,
قل جاء الحق و زهق الباطل ان الباطل كان زهوقا.
অর্থ: “বলুন! সত্য এসেছে, মিথ্যা অপসৃত বা দূরীভূত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা অপসৃত বা দূরীভূত হওয়ারই যোগ্য।” (পবিত্র সূরা বণী ই¯্রাঈল/৮১)
এটাই স্বাভাবিক যে, আলো আসলে অন্ধকার দূরীভুক্ত হয়ে যায়। মহান আল্লাহ পাক উনার রহমতে সমাজে যখন “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” এর প্রকাশ ঘটেছে তখন অবশ্যই বাতিল দূর হয়ে হক্ব জাহির হবে ইনশাআল্লাহ। বাতিল ফিরক্বা যতই তৎপর হোক না কেন চিন্তার কোন কারণ নেই। তবে আমাদেরকে মহান আল্লাহ পাক উনার ঐ আয়াত শরীফ উনার প্রতি দৃঢ় থাকতে হবে যে আয়াত শরীফ উনার মধ্যে মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন,
ولاتهنوا ولاتحزنوا وانتم الاعلون ان كنتم مؤمنين.
অর্থ: “তোমরা চিন্তিত হয়োনা, পেরেশান হয়োনা, তোমরাই কামিয়াবী লাভ করবে যদি তোমরা মু’মিন হতে পার।” (পবিত্র সূরা আলে ইমরান/১৩৯)
মহান আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে হক্ব ও বাতিল জেনে ও চিনে হক্বের পথে ক্বায়েম থাকা এবং বাতিলকে মিটিয়ে তা হতে দূরে থাকার তাওফিক দান করুন। (আমীন)
{দলীলসমূহ : (১) আহকামুল কুরআন জাসসাস (২) কুরতুবী (৩) রুহুল মায়ানী (৪) মাযহারী (৫) ইবনে কাছীর (৬) রুহুল বয়ান (৭) খাযেন (৮) বাগবী (৯) যাদুল মাসীর (১০) তাবারী (১১) বুখারী (১২) ফতহুল বারী (১৩) উমদাতুল ক্বারী (১৪) তাইসীরুল বারী (১৫) মিশকাত (১৬) মিরকাত (১৭) আশয়াতুল লুময়াত (১৮) লুময়াত (১৯) ত্বীবী (২০) তালীক্ব (২১) মুযাহিরে হক্ব ইত্যাদি।}
২নং সুওয়াল
সুওয়াল : আমাদের এলাকায় কিছু ওহাবী, খারিজী, বিদয়াতী ইত্যাদি বাতিল ফিরক্বার লোকেরা প্রশ্ন করেছে, “মাসিক আল বাইয়্যিনাতে” নাকি লিখা হয়েছে, “আওলাদে রসূল” হওয়ার জন্য হযরত ফাতিমাতুয যাহারা আলাইহাস সালাম উনার বংশধর হওয়ার দরকার নেই। শুধু সাইয়্যিদ হলেই নাকি আওলাদে রসূল হওয়া যায়। তারা আরো বলে, আবূ তালিব, আবূ লাহাব অর্থাৎ সমস্ত হাশেমীরা সাইয়্যিদ।
ইহা কতটুকু সঠিক? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াব : ইহা কাট্টা মিথ্যা কথা। মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকার কোন সংখ্যাতেই এ কথা বলা হয়নি যে, “আওলাদে রসূল হাওয়ার জন্য হযরত ফাতিমাতুয যাহারা আলাইহাস সালাম উনার বংশধর হওয়ার দরকার নেই।” বরং বলা হয়েছে যে, “আওলাদে রসূল হওয়ার জন্য শর্তই হচ্ছে, হযরত ফাতিমাতুয যাহারা আলাইহাস সালাম উনার দু’জন সম্মানিত সন্তান “হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম এবং হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার বংশধর হওয়া।
হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,
ان حضرت فاطمة عليها السلام تعالى عنها سيدة النساء اهل الجنة وان حضرت الحسن عليه السلام و حضرت الحسين عليه السلام تعالى عنهما سيدا شباب اهل الجنة.
অর্থ: “হযরত ফাতিমাতুয যাহারা আলাইহিস সালাম তিনি হলেন, জান্নাতবাসী মেয়েদের সাইয়্যিদ বা সর্দার। হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম এবং হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনারা হলেন জান্নাতবাসী যুবকদের সাইয়্যিদ বা সর্দার।” (তিরমিযী, মিশকাত, মিরকাত, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, শরহুত ত্বীবী, তালিকুছ ছবীহ, মুযাহিরে হক্ব)
অন্য রেওয়ায়েতে “বুখারী ও মুসলিম” শরীফ উনার মধ্যেও বর্ণিত রয়েছে।
উনাদের বংশ পরস্পরায় যে সকল সন্তান যমীনে আগমন করেন উনারাই সাইয়্যিদ এবং উনারাই আওলাদে রসূল উনার অন্তর্ভুক্ত।
উল্লেখ্য, ওহাবী, খারিজী, বিদয়াতী ইত্যাদি বাতিল ফিরক্বার লোকেরা এতই মূর্খ যে, কারা আওলাদে রসূল আর কারা সাইয়্যিদ সেটাই তারা জানেন। যারা এত গ-মূর্খ তারা কিভাবে ফতওয়া দিতে পারে? আর তাদের দেয়া ফতওয়া শরীয়তে কতটুকুইবা গ্রহণযোগ্য হতে পারে? প্রকৃতপক্ষে যারা সাইয়্যিদ উনারাই আওলাদে রসূল এবং যাঁরা আওলাদে রসূল উনারই সাইয়্যিদ।
বাতিল ফিরক্বার আরো জিহালতী ও মূর্খতা হলো যে, তারা আবূ তালিব, আবূ লাহাব অর্থাৎ হাশিমীরা যে সাইয়্যিদ নয় সেটাও জানেনা। বাতিল ফিরক্বার লোকেরা কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ উনার দ্বারা এটা কস্মিনকালেও প্রমাণ করতে পারবে না যে, “আবূ লাহাব, আবূ তালিব অর্থাৎ হাশিমীরা সাইয়্যিদ।” বরং কুরআন শরীফ, সুন্নাহতে এর বিপরীত মত রয়েছে যে, “তারা সাইয়্যিদ বা আওলাদে রসূল নয়।”
উল্লেখ্য, সাইয়্যিদ হওয়ার জন্য শরীয়ত যে শর্ত আরোপ করেছে- পর্যায়ক্রমে প্রথম শর্ত হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব, আখিরী নবী, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আওলাদ বা সন্তান হওয়া। দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে হযরত ফাতিমাতুয যাহারা আলাইহাস সালাম উনার আওলাদ বা সন্তান হওয়া। তৃতীয় শর্ত হচ্ছে হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম ও হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনাদের যে কোন একজনের আওলাদ বা সন্তান হওয়া। তাহলে আবূ তালিব, আবূ লাহাব বা সমস্ত হাশিমীরা কি করে সাইয়্যিদ হতে পারে?
আবূ লাহাব, আবূ তালিব বা সমস্ত হাশিমীরা সাইয়্যিদ বলে বাতিল ফিরক্বার লোকেরা যে বক্তব্য পেশ করেছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, মনগড়া, দলীলবিহীন ও মূর্খতাসূচক।
হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত হয়েছে, “যে মিথ্যাভাবে বংশ পরিবর্তন করে সে জাহান্নামী।”
উল্লেখ্য, মানুষের বংশ জারী হয় পিতার মাধ্যমে। কিন্তু আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বংশ জারী থাকার মাধ্যম হচ্ছেন উনার একমাত্র মেয়ে সাইয়্যিদাতুন নিসা আহলিল জান্নাহ হযরত ফাতিমাতুয যাহারা আলাইহাস সালাম এবং উনার দু’সন্তান সাইয়্যিদা শাবাবি আহলিল জান্নাহ হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম এবং হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম। উনাদের বংশধরগণই আওলাদে রসূল এবং উনারাই সাইয়্যিদ।
এমনকি হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু উনার অন্য স্ত্রীগণ উনাদের ঘরে যে সমস্ত সন্তান জন্মগ্রহণ করেছেন উনারাও সাইয়্যিদ বা আওলাদে রসূল নন। উনাদের বংশ পরিচয় হচ্ছে আলবী।
{দলীলসমূহ : (১) রুহুল মায়ানী (২) রুহুল বয়ান (৩) খাযেন (৪) বাগবী (৫) কুরতুবী (৬) বুখারী (৭) মুসলিম (৮) তিরমিযী (৯) মিশকাত (১০) ফতহুল বারী (১১) উমদাতুল ক্বারী (১২) ইরশাদুস সারী (১৩) উরফুশ শাজী (১৪) তুহফাতুল আহওয়াযী (১৫) মিরকাত (১৬) আশয়াতুল লুময়াত (১৭) লুময়াত (১৮) মুযাহেরে হক্ব (১৯) শরহুত ত্বীবী (২০) তালিকুছ ছবীহ (২১) সিররুশ শাহাদাতাইন ইত্যাদি।}
৩নং সুওয়াল
সুওয়াল : লক্বব ব্যবহার করা কি? ওহাবী, খারিজী, অতি সুন্নী, বিদয়াতী ইত্যাদি বাতিল ফিরক্বার লোকেরা বলে, লক্বব ব্যবহার করা নাকি অহংকারের লক্ষণ।
এখন আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, লক্বব ব্যবহার করা সত্যিই অহংকারের লক্ষণ কিনা? দলীল-আদিল্লাহ উনাদের মাধ্যমে জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াব : মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন,
ولله الاسماء الحسنى فادعوه بها.
অর্থ: “মহান আল্লাহ পাক উনার সুন্দর সুন্দর অনেক নাম মুবারক রয়েছে। তোমরা সেই নাম মুবারক দ্বারা উনাকে ডাক।” (পবিত্র সূরা আ’রাফ/১৮০)
এ আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে,
وللرسول الاسماء الحسنى فادعوه بها
অর্থ: “মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুন্দর সুন্দর অনেক নাম মুবারক রয়েছে। তোমরা তা দ্বারা উনাকে ডাক।
মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন,
اطيعوا الله واطيعوا الرسول واولى الامر منكم.
অর্থ: “তোমরা মহান আল্লাহ পাক উনার অনুসরণ কর, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অনুসরণ কর এবং উলিল আমরগণ উনাদের অনুসরণ কর।” (পবিত্র সূরা নিসা/৫৯)
অর্থাৎ লক্বব ব্যবহার করা সুন্নতল্লাহ, সুন্নতে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সুন্নতে আউলিয়ায়ে কিরামগণ উনাদের অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং লক্বব ব্যবহার করা যেহেতু সুন্নত, তাই আমরা সুন্নত হিসেবে লক্বব ব্যবহার করে থাকি।
আর যারা লক্বব ব্যবহার করা অহঙ্কারের লক্ষণ বলে সেই ওহাবী, খারিজী, দেওবন্দী, অতি সুন্নী, বিদয়াতীদের কতিপয় মুরুব্বীর লক্ববসহ তাদের নাম উল্লেখ করা হলো-
১। দেওবন্দী উলামাদের ইমাম, ইবনে তাইমিয়ার লক্বব ৩৮টি। (মুকাদ্দিমায়ে মজমুয়ায়ে ফতওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া)
২। দেওবন্দী আশরাফ আলী থানবীর লক্বব ৬১টি।
(আহকামুল কুরআন লি জাফর আহমদ ওসমানী ১/২, মুকাদ্দিমায়ে ইলাউস সুনান-১১, ইমদাদুল আহকাম, তাবলীগে দ্বীন, বযলুল মাজহুদ শরহে আবু দাউদ, ইমদাদুল ফতওয়া-১ম জিঃ, আত তামবিহুত ত্ববারী)
৩। দেওবন্দী রশীদ আহমদ গাঙ্গুহীর লক্বব ৩২টি। (আল হিল্লুল মুফহিম, বযলুল মাযহুদ, আওযাজুল মাসালিক/৭, ইমদাদুল ফতওয়া ১০/৭, ফতওয়ায়ে দেওবন্দ/৭০)
৪। দেওবন্দী জাফর আহমদ ওসমানীর লক্বব ২৩টি। (মুকাদ্দিমাতু ইলাউস সুনান জিঃ ১,২ পৃষ্ঠা ১২, ১৯)
৫। হুসাইন আহমদ মাদানীর লক্বব ২৭টি। (বযলুল মাযহুদ, ময়ারেফে মাদানীয়া-২০২, তাকবীরুল মাদানী-১/১৮)
৬। দেওবন্দী মুফতী শফীর লক্বব ৮টি। (মুকাদ্দিমায়ে ইলাউস সুনান)
৭। দেওবন্দ মাদরাসার মুহতামিম আহমদ দেওবন্দীর লক্বব ১২টি। (ছীরাতে মুহম্মদীয়া শরহে মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া)
৮। হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিম দেওবন্দী আহমদ শফীর লক্বব ১২টি। (দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম, মুনিয়াতুল আদব/৩)
৯। মেখল মাদরাসার মুহতামিম মুজাফফর আহমদ দেওবন্দীর লক্বব ৮টি। (রিয়াজুন নাহু)।
১০। হদস আজিজুল হক দেওবন্দীর লক্বব ২৫টি। (রাহমানী পয়গাম, আগস্ট/১৯৯৭/৩১, মাসিক আদর্শ নারী, নভেম্বর ১৯৯৭/২১-২৩)
১১। আহমদ রেযা খার লক্বব ৩২টি। (ফতওয়ায়ে রেযভিয়া ১ম, আহকামে শরীয়ত ৮-৯)
১২। নকী আলী খার লক্বব ১৩টি। (আল কালামুল আওযাহ)
১৩। শাহ ইয়ার আলীর লক্বব ১৪টি। (ফতোয়ায়ে ফয়জুর রসূল ১ম/১৪-১৬)
১৪। আযিযুল হক্ব চাটগামীর (তথাকথিত শেরে বাংলা) লক্বব ৩৯টি। (দেওয়ানে আযীয, মজমুয়ায়ে ফতওয়ায়ে আযীযিয়া)
ওহাবী, খারিজী, অতি সুন্নী, বিদয়াতীরা যে বলেছে, “লক্বব ব্যবহার করা অহঙ্কারের লক্ষণ।” যদি তাই হয় তাহলে তাদের মুরুব্বীরা যে লক্বব ব্যবহার করেছে তা নিশ্চয়ই অহঙ্কারের জন্যই করেছে। আর অহঙ্কার করা হচ্ছে শয়তানের খাছ খাছলত। এ অহঙ্কারের জন্যই শয়তান গোমরাহ হয়ে মরদুদ হয়েছে। তাহলে তাদের ভাষায় বলতে হয় যে, প্রথমে তাদের মুরুব্বীরাই লক্বব ব্যবহার করে অহঙ্কারের কারণে গোমরাহ হয়ে মরদুদ হয়েছে।
মূলত: শরয়ী ফতওয়া যা আমাাদেরও ফতওয়া তা হচ্ছে, “লক্বব ব্যবহার করা খাছ সুন্নত।” আকাঈদের কিতাবে উল্লেখ আছে, اهانة السنة كفر
অর্থ: “সুন্নতকে ইহানত করা হচ্ছে কুফরী।”
কাজেই সুন্নতকে যদি কেউ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, অবজ্ঞা-ইহানত করে ও সুন্নত পালনকে অহঙ্কারের লক্ষণ বলে বর্ণনা করে তাহলে সেটা কুফরী হবে। যেমন, আকাঈদের কিতাব উল্লেখ রয়েছে, “কদু খাওয়া সুন্নত।” যদি কদুকে কেউ ইহানত করে সে কুফরী করলো। আর যে কুফরী করে সে কাফির হয়। আর যে কাফির হয় সে চির জাহান্নামী হয়।
{দলীলসমূহ : (১) আহকামুল কুরআন জাসসাস (২) কুরতুবী (৩) রুহুল মায়ানী (৪) মাযহারী (৫) ইবনে কাছীর (৬) রুহুল বয়ান (৭) খাযেন (৮) বাগবী (৯) যাদুল মাসীর (১০) তাবারী (১১) বুখারী (১২) মুসলিম (১৩) মিশকাত (১৪) ফতহুল বারী (১৫) উমদাতুল ক্বারী (১৬) ইরশাদুস সারী (১৭) শরহে কিরমানী (১৮) তাইসীরুল বারী (১৯) ফতহুল মুলহিম (২০) শরহে নব্বী (২১) মিরকাত (২২) আশয়াতুল লুময়াত (২৩) লুময়াত (২৪) মুযাহিরে হক্ব (২৫) তালীকুছ ছবীহ (২৬) ত্বীবী (২৭) মুকাদ্দিমায়ে মজমুয়ায়ে ফতওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া (২৮) আহকামুল কুরআন লি জাফর আহমদ ওসমানী (২৯) মুকাদ্দিমায়ে ইলাউস সুনান (৩০) ইমদাদুল আহকাম (৩১) তাবলীগে দ্বীন (৩২) বযলুল মাজহুদ শরহে আবু দাউদ (৩৩) ইমদাদুল ফতওয়া (৩৪) আত তামবিহুত ত্ববারী (৩৫) আল হিল্লুল মুফহিম (৩৬) আওযাজুল মাসালিক (৩৭) ফতওয়ায়ে দেওবন্দ (৩৮) মুকাদ্দিমাতু ইলাউস সুনান (৩৯) ছীরাতে মুহম্মদীয়া শরহে মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া (৪০) মুনিয়াতুল আদব (৪১) রিয়াজুন নাহু (৪২) ফতওয়ায়ে রেযভিয়া (৪৩) আহকামে শরীয়ত (৪৪) আলকামুল আওযাহ (৪৫) ফতওয়ায়ে ফয়জুর রসূল (৪৬) দেওয়ানে আযীয (৪৭) মজমুয়ায়ে ফতওয়ায়ে আযীযিয়া, (৪৮) আনওয়ায়ে মাহমুদাহ (৪৯) আল মেছবাহ নূরী শরহে কুদূরী ইত্যাদি}
৪ নং সুওয়াল
সুওয়াল : ওহাবী, খারিজী, লা-মাযহাবী, বিদয়াতী ইত্যাদি বাতিল ফিরক্বার লোকেরা বলে, কদমবুছী করা নাকি শিরক ও হারাম। অথচ আমরা আমাদের পীর ছাহেব, ওস্তাদ ও পিতা-মাতাকে কদমবুছী করে থাকি।
সত্যিই কি কদমবুছী করা শিরক ও হারাম? দয়া করে বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াব : কদমবুছী করা খাছ সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। স্বয়ং আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজেই অনুমতি দিয়েছেন কদমবুছী করার জন্য। আর হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ নিজেরাই আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কদমবুছী করেছেন। পরবর্তীতে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ পরস্পর পরস্পরকে কদমবুছী করেছেন। যেমন, এ প্রসঙ্গে ছহীহ “আবূ দাউদ শরীফ উনার” ২য় জিঃ ৭০৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে,
عن وازع بن زارع عن جدها وكان فى وفد عبد القيس قال لما قدمنا المدينة فجعلنا نتبادر من رواحلنا فنقبل يد رسول الله صلى الله عليه وسلم ورجله.
অর্থ: হযরত ওযায়ে ‘ইবনে যারে’ উনার দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমরা আব্দুল কায়স গোত্রে থাকা অবস্থায় যখন মদীনা শরীফ আসতাম, তখন আমরা সাওয়ারী হতে তাড়াতাড়ি অবতরণ করে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হাত ও পা মুবারক উনারকে বুছা (চুম্বন) দিতাম।
অনুরূপ বযলুল মাজহুদ জিঃ ৬ পৃষ্ঠা ৩২৮, ফতহুল বারী জিঃ ১১ পৃষ্ঠা ৫৭, মিশকাত শরীফ, মিরকাত জিঃ ৭ পৃষ্ঠা ৮০, আশয়াতুল লুময়াত, মুযাহিরে হক্ব, ইলাউস সুনান জিঃ ১৭, ৪২৬ পৃষ্ঠা ইত্যাদি কিতাবসমূহেও উল্লেখ আছে।
এ প্রসঙ্গে আরো বর্ণিত হয়েছে যে,
عن زيد بن ثابت انه قبل يد انس واخرج ايضا ان عليا قبل يد العباس ورجله.
অর্থ: হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত। তিনি হযরত আনাস ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হাত মুবারক উনাকে বুছা (চুম্বন) দিয়েছেন। তিনি এটাও বর্ণনা করেন যে, হযরত আলী ইবনে আবী তালিব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হাত ও পা মুবারক উনাকে বুছা (চুম্বন) দিয়েছেন। (ফতহুল বারী জিঃ ১১ পৃষ্ঠা ৫৭, তোহফাতুল আহওয়াযী শরহে তিরমিযী জিঃ ৭ পৃষ্ঠা ৫২৮)
উপরোক্ত হাদীছ শরীফ এবং উনার ব্যাখ্যাগ্রন্থ সমূহ ছাড়াও আরো অনেক হাদীছ শরীফ ও ব্যাখ্যাগ্রন্থ সহ ফিক্বাহ ও ফতওয়ার ছহীহ, নির্ভরযোগ্য ও বিশ্ববিখ্যাত কিতাব যেমন- আলমগীরী, দুররুল মুখতার, রদ্দুল মুহতার, গায়াতুল আওতার, তাতারখানিয়া, মুহিত, আইনী ইত্যাদি কিতাবসমূহে উল্লেখ রয়েছে যে, “কদমবুছী জায়েয ও সুন্নত।”
এছাড়াও যারা কদমবুছী করাকে শিরক হারাম বলে মন্তব্য করে তাদের মুরুব্বীদের লিখিত কিতাবসমূহেও উল্লেখ রয়েছে যে, “কদমবুছী জায়েয ও সুন্নত।”
নিম্নে তাদের মুরুব্বীদের লিখিত কতিপয় কিতাবের দলীল ইবারতসহ উল্লেখ করা হলো।
(১)
আশরাফ আলী থানবীর “ইমদাদুল ফতওয়া” ৫ জিঃ, ৩৪৫ পৃষ্ঠা ও “মাওয়ায়েজে আশ্রাফিয়া” কিতাবে উল্লেখ আছে যে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থ: “সুতরাং ছহীহ মত হলো, মূল কদমবুছী জায়েয।”
(২)
আশরাফ আলী থানবীর “ইমদাদুল আহকাম” ১ জিঃ ১৩৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থ: “আলিম, পিতা-মাতার দস্তবুছী (হাত চুম্বন) এবং কদমবুছী (পা চুম্বন) করা জায়েয।”
(৩)
রশীদ আহমদ গাঙ্গুহীর “ফতওয়ায়ে রশীদিয়া কামেল” ৪৫৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থ: “দ্বীনদার আলিমদের সম্মানার্থে দাঁড়ানো জায়েয এবং উনাদের কদমবুছী করাও জায়েয। এটা হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত।”
(৪)
মুফতী শফী দেওবন্দীর (“জাওয়াহিরুল ফিক্বাহ” ১ জিঃ ২০২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
بلاشبه دست بوسى قدم بوسى معانقه مصافحه سب جائز بلكه سنت ومستحب هين.
অর্থ: “নিঃসন্দেহে দস্তবুছী (হাত চুম্বন) কদমবুছী (পা চুম্বন), মুয়ানাকা, মুছাফাহা সবই জায়েয বরং সুন্নত ও মুস্তাহাবের অন্তর্ভুক্ত।”
(৫)
মাহমুদুল হাসান দেওবন্দীর (ফতওয়ায়ে মাহমুদিয়া” ১ জিঃ ১৭৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থ: (শরীয়তের দৃষ্টিতে) যিনি সম্মানের অধিকারী, উনার কদমবুছী করার অনুমতি রয়েছে।”
“কদমবুছী” ‘কদম’ শব্দটি আরবী, উর্দূ, ফার্সী, বাংলা সব ভাষাতেই ব্যবহার হয়ে থাকে। যার অর্থ হচ্ছে পা। আর ‘বুছী’ শব্দটি হচ্ছে ফার্সী। এটি ‘বুছীদান’ শব্দমূল হতে এসেছে। যার অর্থ হচ্ছে ‘চুম্বন’ করা। (“কদমবুছী” শব্দের এক কথায় অর্থ হলো মুখ দিয়ে সরাসরি পায়ে চুম্বন করা।
বর্তমানে যা করা হয়ে থাকে তা হচ্ছে দস্তবুছী। দস্ত শব্দটি ফার্সী। দস্ত শব্দের অর্থ হচ্ছে হাত। অর্থাৎ হাত দিয়ে পা স্পর্শ করে হাত চুমা দেয়া হয় তা হচ্ছে দস্তবুছী। আর সরাসরি হাতে চুমা দেয়াও দস্তবুছীর অন্তর্ভুক্ত। মূলতঃ কদমবুছী, দস্তবুছী উভয়ই সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।
ওহাবী, খারিজী, বিদয়াতী, লা-মাযহাবী ইত্যাদি বাতিল ফিরক্বার লোকেরা যে বলে, কদমবুছী করা শিরক ও হারাম; তাদের এ কথা সম্পর্ণরূপেই কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। কারণ কদমবুছী স্বয়ং সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজেই গ্রহণ করেছেন এবং করারও অনুমতি তিনিই দিয়েছেন। তাহলে যে বা যারা মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আমলকে, শিরক ও হারাম বলবে তাদের ঈমান কি করে থাকতে পারে? এবং তারা কি করে উম্মত দাবী করতে পারে?
শরীয়তের ফতওয়া মুতাবিক তারা কাট্টা কাফির ও চির জাহান্নামী। আরো উল্লেখ্য, যদি কোন মুসলমান কদমবুছীকে শিরক ও হারাম বলে তাহলে সে মুরতাদ হয়ে জাহান্নামী হবে।
আর সাধারণভাবে শরীয়তের ফতওয়া হচ্ছে, সুন্নতকে অবজ্ঞা করা ও সুন্নতকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা কাট্টা কুফরী। আর যে কুফরী করে সে কাফির হয়ে যায়। আর যে কাফির হয় সে চির জাহান্নামী হয়ে যায়।
অতএব, মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ফতওয়াই বিশুদ্ধ যে, “কদমবুছী করা সুন্নত।”
বিঃদ্রঃ এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ১২তম সংখ্যা পাঠ করুন। সেখানে ১১৭টি দলীলের দ্বারা প্রমাণ করা হয়েছে যে, সম্মান ও তা’যীমের অধিকারী ব্যক্তিদের যেমন-পীর ছাহেব, বুযুর্গ, ওস্তাদ, আলিম ও পিতা-মাতাকে কদমবুছী করা সুন্নতে ছাহাবা, তাবিঈন ও আউলিয়ায়ে কিরাম।
{দলীলসমূহঃ (১) আবূ দাউদ (২) বযলুল মাজহুদ (৩) ফতহুল বারী (৪) মিশকাত (৫) মিরকাত (৬) আশয়াতুল লুময়াত (৭) লুময়াত (৮) মুযাহিরে হক্ব (৯) তুহফাতুল আহওয়াযী (১০) শরহে তিরমিযী (১১) মাবসূত লিস সারাখুসী (১২) আল কিরামাতু ওয়াত তাক্ববীল লিশ শায়খ আবেদ সিন্ধ, (১৩) ইলাউস সুনান (১৪) রদ্দুল মুহতার (১৫) মুহীত (১৬) যাহেদী (১৭) শেফা লি কাজী আয়ায (১৮) মকতুবাতে ইমাম রব্বানী (১৯) আহসানুল ফতওয়া (২০) জাওয়াহিরুল ফিক্বাহ (২১) ইমদাদুল আহকাম (২২) ফতওয়ায়ে মাহমুদিয়া (২৩) ফতওয়ায়ে রশীদিয়া (২৪) মাওয়ায়েযে আশরাফিয়া ইত্যাদি}
সাইয়্যিদ মুহম্মদ মোক্তাদুল ইসলাম (মিলন) রঈসুল মজলিশ- ছাত্র আনজুমানে আল বাইয়্যিনাত
সুবহানী ঘাট, সিলেট।
সুওয়াল : রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্র ডিসেম্বর/২০০০ ঈসায়ী সংখ্যায় “তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুনিয়াতুত তারেবীন, রেজভীয়া” কিতাবের বরাত দিয়ে বলেছে, “সহীহ মুসলিম শরীফসহ” অনেক নির্ভরযোগ্য কিতাবে নফল নামায বিশেষতঃ ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামাত সহকারে আদায় করা বৈধ ….।”
আর আপনারা “মাসিক আল বাইয়্যিনাতে” লিখেছেন, “তারাবীহ, ছলাতুল কুছুফ (সূর্য গ্রহণের নামায), ছলাতুল ইস্তেস্কা (বৃষ্টির নামায) এই তিন প্রকার নামায ব্যতীত যেমন লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতুল বরাত, তাহাজ্জুদ, চাশত, আওয়াবীন ইত্যাদি নফল নামায সমূহ ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহরীমী ও বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহ।” কোনটি সঠিক?
আর “বুখারী, মুসলিম শরীফ উনার মধ্যে” কি “ক্বদর ও বরাতের নফল নামায” জামায়াতের সাথে আদায় করার কথা উল্লেখ আছে? দয়া করে জানাবেন।
জাওয়াব: রেযাখানীরা তাদের মুখপত্রে “তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, গুনিয়াতুত তারেবীন এবং রেজভীয়া” কিতাবের বরাত দিয়ে নফল নামায বিশেষত: “শবে বরাত, শবে ক্বদরের” নফল নামায আযান-ইক্বামত ছাড়া জামায়াত সহকারে আদায় করা যে বৈধ বলেছে, তা আমরা আমাদের “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর বিগত সংখ্যাগুলোতে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে প্রমাণ করেছি যে, “তাদের বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল, জিহালতপূর্ণ, জালিয়াতী ও প্রতারণামূলক।”
কেননা, রেযাখানীরা কিতাবের নাম দিয়ে যে বক্তব্য প্রমান করেছে, আসলে উক্ত কিতাবসমূহের বক্তব্য সে রকম নয়। বরং তার সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ, তারা কিতাবের ইবারত, সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে ইবারত কারচুপি করেছে।
(ধারাবাহিক)
বর্তমান সংখ্যায় রেযাখানীদের ইবারত কারচুপি সম্পর্কে পর্যালোচনা করা হলো
উল্লেখ্য, রেযাখানীরা কিতাবের ইবারত অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে তাদের গুরু রেযা খার অনুসরণ করে বলেছে, “এসব গুরুত্বপূর্ণ রাতে (অর্থাৎ শবে বরাত, শবে ক্বদর রাতে) আযান ও ইক্বামত ছাড়া নফল নামায (অর্থাৎ বিশেষতঃ শবে বরাত, শবে কদরের নফল নামায) জামায়াত সহকারে আদায় করা …. মাকরূহে তানযীহী।”
রেযাখাকে অনুসরণ করে রেযাখার লিখিত “রেজভীয়া” কিতাবের বরাত দিয়ে বলেছে,
يه كراهت صرف تنزيهى.
এর জবাবে বলতে হয়, প্রথমতঃ “রেজভীয়া” কিতাবের উক্ত ইবারত দ্বারা মাকরূহ তানযীনী বলতে শবে বরাত, শবে ক্বদরের নামায জামায়াতের সহিত আদায় করাকে বুঝানো হয়নি, বরং মাকরূহ তানযীনী বলতে বিতর নামাযকে বুঝানো হয়েছে। কেননা, রমযান মাস ব্যতীত অন্যান্য সময় বিতর নামায জামায়াতের সহিত আদায় করা মাকরূহ তানযীহী।
সুতরাং “রেজভীয়া” কিতাবে মাকরূহ তানযীহী বলতে রমযান মাস ব্যতীত অন্যান্য সময় বিতর নামায জামায়াতের সহিত আদায় করাকে বুঝানো হয়েছে।
দ্বিতীয়ত : রেযা খা তার লিখিত “রেজভীয়া” কিতাবে মাকরূহ তানযীহী বলে দলীল হিসেবে “রদ্দুল মুহতার” কিতাবের বরাত দিয়ে যে ইবারতগুলো উল্লেখ করেছে উক্ত ইবারতগুলো “শবে বরাত, শবে ক্বদরের নামায জামায়াতের সহিত আদায় করা সম্পর্কে নয়।” বরং উক্ত ইবারতগুলো “রমযান মাস ব্যতীত অন্যান্য সময় বিতর নামায জামায়াতে আদায় করা সম্পর্কে।”
তৃতীয়ত : রেযা খা তার “রেজভীয়া” কিতাবে মাকরূহ তানযীহী বলে “রদ্দুল মুহতার” কিতাবের বরাত দিয়ে যে ইবারতগুলো উল্লেখ করেছে উক্ত ইবারতেই উল্লেখ আছে যে, غير رمضان
অর্থাৎ “রমযান মাস ব্যতীত অন্যান্য সময় বিতর নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ তানযীহী।”
অথচ ইবারত চোর রেযা খার যোগ্য শাগরিদ রেযাখানীরা উক্ত ইবারতগুলো কারচুপি করেছে।
চতুর্থত : রেযা খা বিতর নামায সম্পর্কিত ইবারতগুলো কারচুপি করে বিতর নামাযকে নফল নামাযের সাথে মিলিয়ে দিয়েছে। সেহেতু সে বিতর নামায সম্পর্কিত ইবারতগুলো তার “রেজভীয়া” কিতাবে উল্লেখ করেনি।
পঞ্চমত : রেযা খা বিতর নামায সম্পর্কিত ইবারতগুলো কারচুপি করে এটাই বুঝাতে চেয়েছে যে, “মাকরূহ তানযীহী দ্বারা যে রমযান মাস ব্যতীত অন্যান্য সময় বিতর নামায জামায়াতে আদায় করাকে বুঝানো হয়েছে, এটা পাঠক যেন বুঝতে না পারে।”
ষষ্ঠত : রেযাখানীরা রেযা খার এমনই অন্ধ অনুসারী যে, রেযা খা তার “রেজভীয়া” কিতাবে মাকরূহ তানযীহী বলে দলীল হিসেবে যে “রদ্দুল মুহতার” কিতাবের বরাত দিয়েছে উক্ত মূল “রদ্দুল মুহতার” কিতাবের ইবারতের সঙ্গে রেজভীয়া কিতাবের উল্লিখিত ইবারতকে মিলিয়ে দেখার প্রয়োজনও তারা অনুভব করেনি। সেহেতু রেযাখানীরা রেযা খার কারচুপি ধরতে পারেনি। কেননা মূল “রদ্দুল মুহতার” কিতাবে “হিলইয়া” কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লিখিত ইবারতগুলো বিতর নামায সম্পর্কে বলা হয়েছে।
অথচ রেযা খা বিতর নামায সম্পর্কিত ইবারত গুলো কারচুপি করে উল্লেখ করেনি।
নিম্নে আমরা রেযা খার ইবারতের কারচুপিগুলো পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করে প্রমাণ করবো যে, “মাকরূহ তানযীহী বলতে শবে বরাত, শবে ক্বদরের নামায জামায়াতের সাথে আদায় করাকে বুঝানো হয়নি। বরং মাকরূহ তানযীহী বলতে বিতর নামাযকেই বুঝানো হয়েছে। কেননা রমযান মাস ব্যতীত অন্যান্য সময় বিতর নামায জামায়াতের সাথে আদায় করা মাকরূহ তানযীহী।”
যেমন, রেযা খা তার “রেজভীয়া” কিতাবে মাকরূহ তানযীহী বলে দলীল হিসেবে “রদ্দুল মুহতার” কিতাবে উল্লিখিত “হিলইয়া” কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অথচ হিলইয়া কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে মূল “রদ্দুল মুহতার” কিতাবে যে ইবারতগুলো উল্লেখ আছে তাতে বলা হয়েছে যে, “হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি রমযান মাস ব্যতীত অন্য সময় বিতর নামায জামায়াতের সাথে পড়েছেন।” অথচ রেযা খা বিতর নামায সম্পর্কিত উক্ত ইবারতগুলো কারচুপি করে তার লিখিত “রেজভীয়া” কিতাবে উল্লেখ করেনি। (চলবে)
মুহম্মদ আমিনুর রহমান
আসাদগেট, ঢাকা।
সুওয়াল : ঢাকা মুহম্মদপুর জামিয়া রাহমানিয়া থেকে প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকা এপ্রিল/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যার জিজ্ঞাসা-জবাব বিভাগে নিম্নোক্ত জিজ্ঞাসা-জবাব ছাপা হয়।
জিজ্ঞাসা : মাথা মুন্ডান সারা বছর, সারাজীবন সুন্নাত, নাকি শুধু হজ্জের সময় সুন্নাত?
জবাব : হজ্জ ছাড়া মাথা মুন্ডানো সুন্নাত কিনা এতে মতানৈক্য রয়েছে ….. আল্লামা ত্বাহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি অন্য সময়ও তা সুন্নাত বলেছেন।..
এখন আমার সুওয়াল হলো- মাথা মুন্ডানো সম্পর্কে অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? দলীল-আদিল্লাহসহ সঠিক জাওয়াব জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াব : হজ্জ ছাড়া অন্য সময় মাথা মন্ডন করা সম্পর্কে অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়নি; বরং ভুল হয়েছে। কারণ কেউ এমন একখানা হাদীছ শরীফ উল্লেখ করতে পারবে না, যেখানে উল্লেখ আছে যে, “মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হজ্জ ও ওমরা ব্যতীত অন্য সময় নিজ মাথা মুবারক উনার চুল মুবারক মুন্ডন করেছেন।”
বরং অসংখ্য ছহীহ হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত যে, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সব সময় বাবরী চুল মুবারক রাখতেন। সেহেতু সকল উম্মতে মুহম্মদীর জন্য সর্বদা বাবরী চুল রাখাই দায়েমী সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।
যেমন, এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে, “ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি চার ধরণের বাবরী চুল মুবারক রাখতেন, যাকে হাদীছ শরীফ উনার বর্ণনায় জুম্মা, লিম্মা, ওফরা ও নিছফু উযুনাইহি বলে।
অর্থাৎ (১) কানের লতি বরাবর, (২) কাঁধ ও কানের লতির মাঝামাঝি, (৩) কাধের কাছাকাছি (৪) আবার কোন কোন সময় দু’কানের মাঝামাঝি চুল মুবারকও রাখতেন, যাকে নিছফু উযুনাইহি বলা হয়।
সুতরাং হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লিখিত সুন্নতি পরিমাপ ব্যতীত অন্য কোন প্রকারে তিনি চুল মুবারক রাখেননি। অর্থাৎ হজ্জ ও ওমরা ব্যতীত অন্য সময় আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নুবুওওয়াতী যিন্দেগী মুবারক উনার শুরুতে কিংবা শেষে কখনই চুল মুবারক সুন্নতি পরিমাপের চেয়ে বড় করেও রাখেননি এবং ছোট বা মুন্ডন করেও রাখেননি। (আবু দাউদ শরীফ, তিরমিযী শরীফ, বযলুল মাযহুদ, জামউল ওসায়িল, শামায়েলে তিরমিযী ও সমূহ সীরাতের কিতাব)
উল্লেখ্য, ইমাম ত্বহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যে হজ্জ ব্যতীত অন্য সময় মাথা মুন্ডন করাকে সুন্নত বলেছেন তা মূলতঃ ইমাম ত্বহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হজ্জের উপর ক্বিয়াস করেই মাথা মুন্ডন করাকে সুন্নত বলেছেন।
কেননা, হজ্জ সম্পর্কে হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ আছে যে,
دعا رسول الله صلى الله عليه وسلم للمحلقين ثلاث مرات وللمقصرين مرة واحدة.
অর্থ: “ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, (হজ্জের মধ্যে) যারা চুল মুন্ডন করবে, তাদের জন্য তিনবার দোয়া করেছেন। আর যারা চুল ছোট করবে, তাদের জন্য একবার দোয়া করেছেন।” (মিশকাত শরীফ, মুসলিম শরীফ শরহে নব্বী শরীফ, ফতহুল মুলহিম শরীফ মিরকাত শরীফ, আশয়াতুল লুময়াত শরীফ, লুময়াত শরীফ, শরহুত ত্বীবী, তা’লীকুছ ছবীহ মোযাহিরে হক্ব ইত্যাদি।
হযরত ইমাম ত্বহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যে শুধু হজ্জের উপর ক্বিয়াস করে মাথা মুন্ডন করাকে সুন্নত বলেছেন নি¤েœ তার প্রমাণ পেশ করা হলো-
“বুখারী শরীফ উনার” বিখ্যাত শরাহ “ফতহুল বারী” কিতাবের ১ম খন্ডের ৩৪৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে,
وقدرجح الطحاوى الحلق على القص بتفضيله صلى الله عليه وسلم الحلق على التقصير فى النسك.
অর্থ: “ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হজ্জের মধ্যে চুল মুন্ডন করাকে ছোট করার উপর ফযীলত দিয়েছেন বিধায় হযরত ইমাম ত্বহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মুন্ডন করাকে ছোট করার উপর প্রাধান্য দিয়েছেন।”
অতএব, সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হলো যে, ইমাম ত্বহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হজ্জের উপর ক্বিয়াস করে মাথা মুন্ডন করাকে সুন্নত বলেছেন। তবে এটা অবশ্যই ইমাম ত্বহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ব্যক্তিগত ক্বিয়াস।
মূলতঃ হযরত ইমাম ত্বহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার উক্ত ক্বিয়াস গ্রহণযোগ্য নয়, কেননা হজ্জের হুকুম-আহকাম সম্পূর্ণই ভিন্ন ও আলাদা। হজ্জের সময় চুল মুন্ডন করা খাছ সুন্নতে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু অন্য সময় চুল মুন্ডন করা সুন্নতে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খেলাফ। কারণ আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হজ্জ ও ওমরাহ ব্যতীত কখনো চুল মুবারক মুন্ডন করেননি বরং সর্বদাই বাবরী রেখেছেন।
গ্রহণযোগ্য কথা হলো- শুধুমাত্র হজ্জের সময় চুল মুন্ডন করলে সুন্নত এবং ওয়াজিব উভয়ই আদায় হয়। আর ছোট করলে ওয়াজিব আদায় হবে, সুন্নত আদায় হবেনা। যারা ওয়াজিবের সাথে সাথে সুন্নতও আদায় করবে অর্থাৎ হজ্জের সময় মাথা মুন্ডন করবে, তাদের জন্য সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তিনবার দোয়া করেছেন, আর যারা শুধুমাত্র ওয়াজিব আদায় করবে, সুন্নত আদায় করবেনা অর্থাৎ চুল ছোট করবে, তাদের জন্য একবার দোয়া করেছেন। আর এর দ্বারা আরো প্রমাণিত হয় যে, সুন্নতের গুরুত্ব ও ফযীলত অপরিসীম।
সুতরাং সুন্নত যথাযথভাবে পালনার্থেই গভীরভাবে স্মরণ রাখা দরকার যে, শুধুমাত্র হজ্জের উপর ক্বিয়াস করে হজ্জ ব্যতীত অন্য সময় চুল মুন্ডন করা খেলাপে সুন্নত। তাছাড়া যেখানে অসংখ্য ছহীহ হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত যে, বাবরী চুল রাখা সুন্নত, আর মুন্ডন করা খেলাফে সুন্নত; সেখানে শুধুমাত্র হযরত ইমাম ত্বহারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার উক্ত বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা।
দ্বিতীয়তঃ হজ্জ ছাড়া অন্য সময় মাথা মুন্ডন করা সম্পর্কে হযরত ইমাম ত্বহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি ওয়া সা উনার উক্ত বক্তব্য যে বিশুদ্ধ নয় তার সুস্পষ্ট প্রমাণ হলো “ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া” কিতাবের নি¤েœাক্ত ইবারত।
যেমন, “ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া” কিতাবে উল্লেখ আছে,
وانما صح عند المترجم الفرق فقط ولم يصح ان الحلق سنة.
অর্থ: “আর মুতারজিম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট নিশ্চয় ছহীহ (বিশুদ্ধ) মত হল, শুধুমাত্র বাবরী চুল রাখাই সুন্নত। মাথা মুন্ডন করা সুন্নত, এ মতটি ছহীহ বা গ্রহণযোগ্য নয়।”
অতএব, গ্রহণযোগ্য কথা হলো যে, মাথা মুন্ডন করা সম্পর্কিত হযরত ইমাম ত্বহারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মতটি ছহীহ নয়। বরং ছহীহ ও গ্রহণযোগ্য মত হলো, “শুধুমাত্র বাবরী চুল রাখাই সুন্নত।”
মহান আল্লাহ পাক উনার খাছ রহমতে আমাদের “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” পত্রিকার ফতওয়া বিভাগ হতে এ পর্যন্ত যতগুলো “ফতওয়া” দেয়া হয়েছে এবং “সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগে” যতগুলো সুওয়ালের জাওয়াব দেয়া হয়েছে, তার প্রত্যেকটিই পূর্ণ তাহক্বীক্বসহ অসংখ্য, অকাট্য ও নির্ভরযোগ্য দলীলের ভিত্তিতেই দেয়া হয়েছে। যার কারণে সকলেই তা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় মেনে নিয়েছেন ও নিচ্ছেন।
উপরোক্ত দলীল ভিত্তিক আলোচনা দ্বারা এটাই প্রমাণিত হলো যে, হজ্জ ও ওমরা ব্যতীত অন্য সময় বাবরী চুল রাখা দায়েমী সুন্নত। আর উল্লিখিত অখ্যাত পত্রিকার মাথা মুন্ডন সম্পর্কিত বক্তব্য বিভ্রান্তিকর, দলীল বিহীন, খেলাফে সুন্নত ও বিদয়াতের অন্তর্ভুক্ত।
বিশেষভাবে স্মরণীয় যে, অধিক মাত্রায় মাথা মুন্ডন করা খারিজীদের আলামত।
{এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ১২, ২৮, ৩৭, ৪৪, ৪৭, ৫২, ৫৪তম সংখ্যাগুলো পাঠ করুন।}
{দলীলসমূহ : (১) আবূ দাউদ শরীফ, (২) তিরমিযী শরীফ, (৩) শামায়িলে তিরমিযী শরীফ (৪) নাসাঈ শরীফ (৫) জামিউল উছূল শরীফ (৬) শরহে সুন্নাহ শরীফ (৭) বজলুল মাযহুদ (৮) আওনুল মা’বাদ শরীফ (৯) শরহে আবূ দাউদ লি বদরিদ্দীন আইনী (১০) তুহফাতুল আহওয়াজী শরীফ (১১) আরিদাতুল আহওয়াজী (১২) জামউল ওসায়িল (১৩) আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া আলাশ শামায়িলে মুহম্মদিয়া শরীফ (১৪) শামায়িলু বি শরহিল মানাবী শরীফ (১৫) খাছায়িলে নব্বী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শরীফ (১৬) নাসাঈ বি শরহিস সুয়ূতী শরীফ (১৭) আসসুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ শরীফ (১৮) মিশকাত শরীফ (১৯) মিরকাত শরীফ (২০) শরহুত ত্বীবী (২১) আত তালীকুছ ছবীহ (২২) আশয়াতুল লুময়াত (২৩) লুময়াত (২৪) মুযাহিরে হক্ব (২৫) মিরআতুল মানাজিহ (২৬) ফতহুল বারী শরীফ (২৭) ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া ইত্যাদি।}
মুহম্মদ মুহসিন উদ দৌলা খান
রাউজান, চট্টগ্রাম।
সুওয়াল : হাটহাজারী মাদরাসা থেকে মৌলভী আহমদ শফীর সম্পাদনায় প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকার সেপ্টেম্বর/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-সমাধান বিভাগে নি¤েœাক্ত জিজ্ঞাসা-সমাধান ছাপা হয়।
জিজ্ঞাসা : আযানের পর মুনাজাত করা কি? …….
সমাধান : “আযানের পর হাত তুলে মুনাজত করার কথা হাদীছ বা ফিক্বাহ শাস্ত্রের গ্রহণযোগ্য কোন কিতাবে উল্লেখ নাই। … কাজেই … আযানের দোয়ার সময় হাত উঠানো থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।”
আর মাসিক মদীনা জানুয়ারী/২০০০ ঈসায়ী সংখ্যার প্রশ্নোত্তর বিভাগে এক প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, “আযানের পর দোয়া করতে হাত উঠানোর প্রয়োজন নাই। মুখে দোয়া পাঠ করলেই চলবে।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- আযানের পর হাত তুলে দোয়া ও মুনাজাত করা সম্পর্কে মৌলভী আহমদ শফী ও মাসিক মদীনার উপরোক্ত বক্তব্যদ্বয় সঠিক হয়েছে কি? দলীল-আদীল্লাসহ জানাবেন।
জাওয়াব : আযানের পর হাত উঠিয়ে দোয়া বা মুনাজাত করা সম্পর্কে মৌলভী আহমক শফী ও মাহিউদ্দীনের মাসিক মদীনার উক্ত বক্তব্যদ্বয় সম্পূর্ণই ভুল, মনগড়া ও দলীলবিহীন হয়েছে। কেননা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আযানের পর হাত উঠিয়ে মুনাজাত করা মুস্তাহাব সুন্নত।
কারণ কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ উনার কোথাও আযানের পর হাত উঠিয়ে মুনাজাত করতে নিষেধ করা হয়নি। বরং হাত উঠিয়ে দোয়া ও মুনাজাত করা সম্পর্কিত হাদীছ শরীফ উনার ব্যাখ্যায় হাদীছ শরীফ উনার শরাহগুলোতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, “নামাযের বাইরে যে কোন দোয়া ও মুনাজাতে হাত উঠানো সুন্নত।”
যেমন, বিশ্ববিখ্যাত কিতাব “মিশকাত শরীফ উনার শরাহ মিরকাত শরীফ উনার মধ্যে” উল্লেখ আছে,
استفيد من هذا الحديث والذى قبله انه يسن رفع اليدين الى السماء فى كل دعاء.
অর্থ: “(দোয়ায় হাত উঠানো সম্পর্কিত) হাদীছ শরীফ দ্বারা এটাই প্রমানিত হয় যে, (নামাযের বাইরে) সকল দোয়াতেই হাত উঠানো সুন্নত।”
“ফতওয়ায়ে শামীতে” উল্লেখ আছে,
يرفع هما المطلق الدعاء فى سائر الامكنة والازمنة على طبق ما وردت به السنة.
অর্থ: “হাদীছ শরীফ উনার বর্ণনা মতে সর্বস্থানে, সকল সময়, সমস্ত দোয়াতে হাত উঠানো প্রমাণিত হয়।”
“ফতহুল ক্বাদীর” কিতাবে উল্লেখ আছে,
ووجهه عموم دليل الرفع للدعاء ويجاب بانه مخصوصة بما ليس فى الصلوة لاجماع على ان لا رفع فى دعاء التشهد.
অর্থ: “দোয়ার মধ্যে হাত উঠানোর দলীল কোন দোয়ার জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট নয়। সকল দোয়াতেই হাত উঠানো জায়েয। তবে নামাযের মধ্যস্থিত দোয়ায় হাত উঠানো বিধেয় নয়, কেননা সর্বসম্মত মত হলো তাশাহহুদের দোয়াতে হাত উঠানো জায়েয নয়।”
দ্বিতীয়ত : মৌলভী আহমক শফী, জাহিল মাহিউদ্দীন এবং তাদের সমগোত্রীয়রা তাদের দেওবন্দী সিলসিলার কিতাবগুলোরও খবর রাখেনা। কারণ তাদের দেওবন্দী সিলসিলার কিতাবগুলোতেই উল্লেক আছে যে, “আযানের পর হাত উঠিয়ে দোয়া ও মুনাজাত করা সুন্নত।”
“ইমদাদুল ফতওয়া” কিতাবের ১ম জিঃ, ১০২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
সুওয়াল : “আযানের পর হাত উঠিয়ে মুনাজাত করা সম্পর্কে ওলামায়ে দ্বীনের রায় কি?”
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
জাওয়াব : “…. তবে সাধারণভাবে (যে কোন) মুনাজাতের সময় হাত উঠানো সম্পর্কে বহু ক্বওলী, ফে’লী, মরফূ, মওকূফ ও বহু প্রসিদ্ধ হাদীছ শরীফ বিদ্যমান রয়েছে। কোন দোয়াকে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। সুতরাং আযানের পর হাত উঠিয়ে মুনাজাত করাও সুন্নত প্রমানিত হয়। কেননা এতদসম্পর্কিত দলীলসমূহ ব্যাপক।”
“ফতওয়ায়ে দেওবন্দ” কিতাবে উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
সুওয়াল : “আযানের পর হাত উঠিয়ে মুনাজাত করবে কি? সুন্নত তরীক্বা কোনটি?
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
জাওয়াব : “প্রত্যেক অবস্থায় জায়েয আছে। অর্থাৎ হাত উঠানো এবং না উঠানো উভয়ই জায়েয।”
(তবে হাত উঠানোই উত্তম, কেননা দোয়ায় হাত উঠানো মুস্তাহাব ও আদবের অন্তর্ভুক্ত)।
“ফতওয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ” কিতাবের ২য় জিঃ ১১০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
সুওয়াল : আযানের পর হাত উঠিয়ে মুনাজাত করা প্রমাণিত আছে কি?
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
জাওয়াব : “…. তবে সাধারণভাবে যেহেতু মুনাজাতের মধ্যে হাত উঠানো মুস্তাহাব, তাই আযানের পর হাত উঠিয়ে মুনাজাত করা মুস্তাহাব হওয়ার প্রমাণই বহন করে।
সুতরাং আযানের দোয়াতেও হাত উঠানো জায়েয ও সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত হবে।”
“ফতওয়ায়ে রহীমিয়া” কিতাবের ৩য় জিঃ ১৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থ : “আযানের পর হাত উঠিয়ে মুনাজাত করা (আমল দ্বারা) বর্ণিত নেই। তবে সাধারণভাবে মুনাজাত হাত উঠানো ক্বওলী এবং ফে’লী উভয় প্রকার হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত রয়েছে। তাই আজানের পর হাত উঠিয়ে মুনাজাত করাকে সুন্নতের খেলাফ বলা যাবেনা।”
“কেফায়াতুল মুফতী” কিতাবের ৩য় জিঃ ৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
“সুওয়াল : আযানের পর হাত উঠিয়ে মুনাজাত করা কিরূপ?”
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
জাওয়াব : “আযানের পর যে সকল শব্দসমূহ পড়া হয়, সেগুলো দোয়ার শব্দ। আর দোয়ার সময় উভয় হাত উঠানো আদবের অন্তর্ভুক্ত। তাই হাত উঠিয়ে মুনাজাত করাতে কোন ক্ষতি নেই।”
“ফতওয়ায়ে মাহমুদিয়া” কিতাবের ২য় জিঃ ৩২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
“সুওয়াল : “আযানের পর মুনাজাত করা কি?”
জাওয়াব : “আযানের পর দোয়ায়ে উছীলা পড়া (অর্থাৎ মুনাজাত করা) মুস্তাহাব। অনুরূপ “দুররুল মুখতার” ১ম জিঃ ৪১২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে।”
কুতুবুল ইরশাদ, হাফিযে হাদীছ, বাহরুল উলূম, ফক্বীহুল উম্মত, সাইয়্যিদুল মুনাজিরীন, রঈসুল মুহাদ্দিসীন, তাজুল মুফাসসিরীন, শায়খুল মাশায়েখ, আমীরুশ শরীয়ত ওয়াত তরীক্বত, শাহ ছূফী, শায়খ, হযরতুল আল্লামা মুহম্মদ রুহুল আমীন বশীরহাটী রহমতুল্লাহি আলাইহি (খলীফায়ে ফুরফুরা শরীফ) উনার লিখিত “জরুরী মাসায়েল” কিতাবে উল্লেখ করেন, “আযানের পর হাত উঠিয়ে দোয়া করা জায়েয।”
আযানের পর মুয়াজ্জিন ও শ্রোতাদের হাত উঠিয়ে মুনাজাত করা মুস্তাহাব। শুধু আযানের পর নয়, নামাযের মধ্যস্থিত (দোয়া কুনূত, দোয়ায়ে মাছূরা ইত্যাদি) দোয়া ব্যতীত সকল দোয়ার জন্য হাত উঠানো এবং উক্ত হাত মুখম-লে মাসেহ করাও মুস্তাহাব। (ফতওয়ায়ে ছিদ্দীক্বিয়া/১৪৫)
অতএব, প্রমাণিত হয় যে, আযানের পর হাত উঠিয়ে মুনাজাত করা জায়েয, মুস্তাহাব-সুন্নত এবং আদবের অন্তর্ভুক্ত। কিতাবের উল্লেখ আছে,
الادب خير من الذهب والفضة.
অর্থ: “আদব স্বর্ণ-রৌপ্যের চেয়েও উত্তম।” কিতাবে আরো উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থ: “বেয়াদব মহান আল্লাহ পাক উনার রহমত থেকে বঞ্চিত।”
সুতরাং সুন্নত, মুস্তাহাব ও আদবের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে আযানের পর দোয়াতে হাত উঠিয়ে দোয়া বা মুনাজাত করা উচিত।
অতএব, মৌলভী আহমক শফী ও মাহিউদ্দীনের পত্রিকার উক্ত বক্তব্যদ্বয় অশুদ্ধ, ভুল ও দলীলবিহীন বলে প্রমাণিত হলো।
{দলীলসমূহ : (১) মিরকাত শরহে মিশকাত শরীফ (২) আলমগীরী (৩) ফতওয়ায়ে গিয়াসিয়া (৪) ফতহুল ক্বাদীর (৫) দুররুল মুখতার (৬) ফতওয়ায়ে শামী (৭) ফতওয়ায়ে ছিদ্দীক্বিয়া (৮) জরুরী মাসায়েল (৯) ফতওয়ায়ে দারুল উলূম দেওবন্দ (১০) ফতওয়ায়ে দেওবন্দ (১১) ইমদাদুল ফতওয়া (১২) কেফায়াতুল মুফতী (১৩) ফতওয়ায়ে রহীমিয়া (১৪) ফতওয়ায়ে মাহমুদিয়া ইত্যাদি।}