সাইয়্যিদ মুহম্মদ মোক্তাদুল ইসলাম (মিলন)
রঈসুল মজিলশ- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত
সুবহানী ঘাট, সিলেট।
সুওয়ালঃ রেযাখানী মাযহাবের মূখপত্র ডিসেম্বর/২০০০ঈঃ সংখ্যায় তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুনিয়াতুত তালেবীন, রেজভীয়া কিতাবের বরাত দিয়ে বলেছে, “সহীহ্ মুসলিম শরীফ সহ অনেক নির্ভরযোগ্য কিতাবে নফল নামায বিশেষতঃ ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামাত সহকারে আদায় করা বৈধ…….।”
আর আপনারা মাসিক আল বাইয়্যিনাতে লিখেছেন তারাবীহ, ছলাতুল কুছুফ (সূর্য গ্রহণের নামায), ছলাতুল ইস্তেস্কা (বৃষ্টির নামায) এইতিন প্রকার নামায ব্যতীত যেমন লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতুল বরাত, তাহাজ্জুদ, চাশ্ত, আওয়াবীন ইত্যাদি নফল নামায সমূহ ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্। কোনটি সঠিক?
আর বুখারী, মুসলিম শরীফে কি ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করার কথা উল্লেখ আছে? দয়া করে জানাবেন।
জাওয়াবঃ রেযাখানী মুখপত্রের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল, জিহালতপূর্ণ ও প্রতারণামূলক; যা শরীয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা “তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, মুসলিম, গুনিয়াতুত্ তালেবীন” কিতাবের নাম দিয়ে যে বক্তব্য প্রদান করেছে আসলে উক্ত কিতাবসমূহের বক্তব্য সে রকম নয়। বরং তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
তারা “তাফসীরে রুহুল বয়ান-এর ইবারতের অর্থে “শরহে নেকায়া ও মুহিত” কিতাবের এবং “বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ ও গুনিয়াতুত্ তালেবীন”-এর বরাত দিয়ে নফল নামায বিশেষতঃ “শবে বরাত, শবে ক্বদরের” নফল নামায আযান ইক্বামত ছাড়া জামায়াত সহকারে আদায় করা যে বৈধ বলেছে, তা আমরা আমাদের “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” এর বিগত সংখ্যাগুলোতে বিস্তারিত ভাবে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে প্রমাণ করেছি যে, তাদের বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল, জিহালতপূর্ণ, জালিয়াতী ও প্রতারণামূলক।
কারণ তারা কিতাবের ইবারত, সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে ইবারত কারচুপি করে “তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ ও গুনিয়াতুত্ তালেবীন”-এর বরাত দিয়ে যেটা বলতে চেয়েছে আসলে উক্ত কিতাবসমূহের বক্তব্য সে রকম নয়।
কেননা, রেযাখানীরা “বুখারী ও মুসলিম শরীফের” ১ম খন্ডের বরাত দিয়ে যে হাদীস শরীফ দু’খানা উল্লেখ করেছে উক্ত হাদীস শরীফদ্বয়ে “শবে বরাত ও শবে ক্বদরের” নামায জামায়াত সহকারে আদায় করার কোন বর্ণনাই নেই।
তাছাড়া রেযাখানীরা পীরানে পীর, দাস্তগীর, গাউসুল আযম, হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর “গুনিয়াতুত্ তালেবীন” কিতাবের বরাত দিয়ে যে উর্দূ ইবারতটুকু উল্লেখ করেছে উক্ত ইবারতেও “শবে ক্বদরের” নামাযের কোনই উল্লেখ নেই। আর “গুনিয়াতুত্ তালেবীন”-এর উর্দূ অনুবাদ কিতাবেও উল্লেখ আছে যে, নফল নামায জামায়াতের সহিত আদায় করা মাকরূহ। অথচ রেযাখানীরা “গুনিয়াতুত তালেবীন” এর উর্দূ অনুবাদ কিতাবটি থেকে ইবারত কারচুপি করে নফল নামায জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ সম্পর্কিত ইবারত উল্লেখ করেনি। সুতরাং রেযাখানীরা কিতাবের নাম ব্যবহার করে যে প্রতারণা করেছে এবং বিশেষ করে হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি এর “গুনিয়াতুত তালেবীন” এর নামে সাধারণ মানুষকে ধোকা দেয়ার জন্যই হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি এর নামে যে অপবাদ দিয়েছে, “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর বিগত সংখ্যাগুলোর আলোচনা দ্বারাই তা প্রমাণিত হয়েছে। এরপরেও যদি প্রয়োজন হয় তাহলে পরবর্তীতে আরো বিস্তারিতভাবে দলীল-আদিল্লাহ্সহ “তাফসীরে রহুল বয়ান, বুখারী, মুসলিম শরীফ ও গুনিয়াতুত্ তালেবীন”-এর বক্তব্য ধারাবাহিকভাবে পর্যালোচনা করা হবে। (ইনশাআল্লাহ্)
(ধারাবাহিক)
বর্তমান সংখ্যায় “রেজভীয়া” কিতাবের বক্তব্য
বিস্তারিত ভাবে পর্যালোচনা করা হলো-
উল্লেখ্য, রেযাখানীরা আযান-ইক্বামত ছাড়া নফল নামায বিশেষতঃ “শবে বরাত, শবে ক্বদরের” নফল নামায জামায়াত সহকারে আদায় করা বৈধ বলে “রেজভীয়া” কিতাবের বরাত দিয়ে যে ইবারত উল্লেখ করেছে। সেই “রেজভীয়া” কিতাবের উক্ত ইবারতেই উল্লেখ আছে যে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থাৎ- “শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করাকে পরবর্তী ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ অস্বীকার বা প্রত্যাখান করেছেন।”
সুতরাং পরবর্তী ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ “শবে বরাত, শবে ক্বদরের” নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করাকে অস্বীকার বা প্রত্যাখান করায় তা দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা।
দ্বিতীয়তঃ রেযাখানীরা “রেজভীয়া” কিতাবের বরাত দিয়ে বলেছে, “এ কাজ (এসব রাতে অর্থাৎ ছলার্তু রাগায়িব, শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায) জামায়াতের সাথে পড়া ….. একদল তাবেঈ ও মুজতাহিদ ইমাম দ্বারা প্রমাণিত।”
এর জবাবে বলতে হয় যে, রেযাখানীরা যে “রেজভীয়া” কিতাবের বরাত দিয়ে উক্ত বক্তব্য পেশ করেছে সেই “রেজভীয়া” কিতাবের পরবর্তী ইবারতে এটাও উল্লেখ আছে যে, ঐগুলি অর্থাৎ শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াতের সহিত আদায় করাসহ ইত্যাদি প্রত্যেকটি কাজই বিদ্য়াত। কেননা, আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে “শবে বরাত, শবে ক্বদরের” নফল নামায জামায়াতের সহিত আদায় করার কোন বর্ণনাই নেই এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের থেকেও কোন বর্ণনা নেই। বিধায় ঐ গুলো প্রত্যেকটাই বিদ্য়াত।
যেমন, “রেজভীয়া” কিতাবের ৩য় খন্ডের ৪৬৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থাৎ- ঐগুলো প্রত্যেকটি বিদ্য়াত অর্থাৎ ছলার্তু রাগায়িব, শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াতে আদায় করা ইত্যাদি প্রত্যেকটি কাজই বিদ্য়াত।” …
কেননা, আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদের থেকে ঐগুলোর কোন বর্ণনা নেই। বিধায় ঐগুলি প্রত্যেকটাই বিদ্য়াত। …. দ্বিতীয় মতে, মসজিদে এর জামায়াত করা মাকরূহ।
তৃতীয়তঃ শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াতের সাথে পড়া কোন মাযহাবের ইমাম ও মুজতাহিদ দ্বারা প্রমাণিত তা রেযাখানীরা স্পষ্ট করে উল্লেখ করেনি।
অথচ “রেজভীয়া” কিতাবের ৩য় খন্ডের ৪৫৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থাৎ- “শবে বরাতের নামায যদিও কোন কোন মাশায়েখগণ জামায়াতে পড়েছেন … তবে আমাদের আইম্মা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের মাযহাব ওটাই যে জামায়াত تداعى এর সাথে হলে অর্থাৎ জামায়াতে চারজন মুক্তাদী হলে মাকরূহ হবে।
“রেজভীয়া” কিতাবে আরো উল্লেখ আছে যে, “নফল নামাযসমূহ জামায়াতে পড়া মাকরূহ।”
যেমন, “রেজভীয়া”-এর ৩য় খন্ডের ৪৫৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “আমাদের আইম্মা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের নিকট নফল নামাযসমূহ ঘোষণা দিয়ে বা تداعى -এর সাথে জামায়াতে পড়া মাকরূহ। এই হুকুমের মধ্যে ছলাতুল খুছুফও (চন্দ্রগ্রহণের নামায) অর্ন্তভূক্ত। এই নামাযও একাকী পড়তে হবে। যদিও জুময়ার ইমাম উপস্থিত থাকে। ”
যেমন, শামী কিতাবে, ইসমাঈল এবং বরজুন্দী থেকে বর্ণিত আছে, …….. আর তারাবীহ্, ছলাতুল কুছুফ (সূর্য গ্রহণের নামায), ছলাতুল ইস্তেস্কা (বৃষ্টির নামায), এই হুকুমের অর্ন্তভূক্ত নয়। অর্থাৎ এই তিন প্রকার নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ নয়। …… অধিক ছহীহ মতে চারজন অথবা চারের অধিক মুক্তাদী হওয়াই (تداعى) তাদায়ী অর্থাৎ মাকরূহ। দু’জন অথবা তিনজন মুক্তাদী হলে মাকরূহ নয়। তবে তিনজন মুক্তাদী হলে মাকরূহ হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে।
যেমন- “রেজভীয়া” কিতাবের ৪৬৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “তিনজন মুক্তাদী হলে মাকরূহ হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। তবে চারজন মুক্তাদী হলে, সকল ইমাম, মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের সর্বসম্মত মতে নফল নামায জামায়াতের সহিত আদায় করা মাকরূহ।
মৌলভী আমজাদ আলী তার “বাহারে শরীয়ত” কিতাবের ৪র্থ খন্ডের ২৫ ও ২৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “রাগায়িবের নামায যা রজবের প্রথম জুমুয়ার রাত্রি ও শা’বানের ১৫ই রাত্রি অর্থাৎ শবে বরাত এবং শবে ক্বদরে জামায়াতের সাথে কিছু লোক নফল নামায আদায় করে থাকে। ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উক্ত নফল নামাযগুলো জামায়াতের সাথে আদায় করাকে নাজায়েয, মাকরূহ তাহরীমী এবং বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্ বলেছেন, আর লোকেরা এর স্বপক্ষে যে হাদীস শরীফ বর্ণনা করে থাকে, মুহাদ্দিসীন-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উক্ত হাদীস শরীফকে মওজু বলেছেন। তবে সম্মানিত আকাবিরে আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ থেকে ছহীহ্ সনদে রেওয়ায়েত আছে। সুতরাং এর নিষেধে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। যদি জামায়াতে তিনের অধিক মুক্তাদী না হয় তখন কোন অসুবিধা নেই।”
উপরোক্ত ইবারতে যা প্রমাণিত হলো, (১) ছলাতুর রাগায়িব, শবে বরাত, শবে ক্বদর ইত্যাদি নফল নামায জামায়াতে আদায় করা নাজায়েয, মাকরূহ্ তাহরীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্। (২) উক্ত নফল নামায জামায়াতে আদায় করার স্বপক্ষে যে হাদীস শরীফ বর্ণনা করা হয়, মুহাদ্দিসীন-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উক্ত হাদীস শরীফকে মওজু বলেছেন। (৩) জামায়াতে তিনের অধিক মুক্তাদী না হলে অসুবিধা নেই। তবে তিনজন মুক্তাদী হলে মাকরূহ হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। যেমন, “বাহরুর রায়েক, ফতওয়ায়ে আলমগীরী, খুলাছাতুল ফতওয়া, আদদুররুল মুখতার, গায়াতুল আউত্বার, রদ্দুল মুহতার, শামী, আল কুহেস্তানী, শরহুল মুনিয়া, শরহুন নিক্বায়া, শরহে ইলিয়াস, মিনহাতুল খলিক্ব, ফতওয়ায়ে তাতারখানিয়া, হাশিয়ায়ে তাহতাবী আলা মারাকিউল ফালাহ্, আইনী শরহে হিদায়া, হাশিয়ায়ে শরহে বেকায়া লি চলপী, ফতওয়ায়ে মা’দিয়াহ, ইলমুল ফিক্বাহ,মাকতুবাত শরীফ” ইত্যাদি কিতাবের ভাষ্য হলো,
اما لو اقتدى ثلثة بواحد اختلف فيه.
অর্থঃ- “আর যদি ইমামের সহিত তিনজন মুক্তাদী ইক্তিদা করে তাহলে মাকরূহ হওয়ার মধ্যে মতভেদ রয়েছে।”
“শরহুল মুনিয়া” কিতাবে উল্লেখ আছে,
ان النفل بالجماعة على سبيل التداعى مكروه ما عدا التراويح وصلوة الكسوف والاستسقاء فعلم ان كلا من الرغائب ليلة اول جمعة من رجب وصلوة البرأة وصلاة القدر ليلة السبع والعشرين من رمضان بالجماعة بدعة مكروهة.
অর্থঃ- “নিশ্চয় নফল নামায ঘোষণা দিয়ে জামায়াতে পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী। তবে তারাবীহ্, কুছুফ (সূর্যগ্রহণ) ও ইস্তেস্কার (বৃষ্টির) নামায ব্যতীত। সুতরাং ছলার্তু রাগায়িব (অর্থাৎ রজব মাসের প্রথম জুমুয়ার রাত্রির নামায), শবে বরাতের রাত্রির নফল নামায এবং শবে ক্বদরের রাত্রির নফল নামায জামায়াতে পড়াও মাকরূহ্ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিাহ্।
আরো উল্লেখ্য যে, “রেজভীয়া” কিতাবে পরিশেষে এটাও উল্লেখ আছে যে, নফল নামায পড়তে হলে পৃথক পৃথক পড়তে হবে। জামায়াতের সাথে নফল নামায আদায় করা যাবে না। কেননা নফল নামায জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ। আর চারজন মুক্তাদী হলে সকল ইমাম মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের সর্বসম্মত মতে নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করা মাকরূহ।
যেমন- “রেজভীয়া” কিতাবের ১০ম খন্ডের ১৭৫, ১৭৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “নফল নামায পড়তে হলে পৃথক পৃথক পড়বে, কেননা নফল নামায বড় জামায়াতের সাথে পড়া অর্থাৎ যদি জামায়াতে চারজন মুক্তাদী হয় তাহলে সকল ইমাম, মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের ঐক্যমতে নফল নামায জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ।”
উপরোক্ত পর্যালোচনা থেকে দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট ভাবে এটাই প্রমাণিত হলো যে, রেযাখানীরা আযান-ইক্বামত ছাড়া নফল নামায বিশেষতঃ শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াত সহকারে আদায় করা বৈধ বলে যে “রেজভীয়া” কিতাবের বরাত দিয়েছে উক্ত “রেজভীয়া” কিতাবের বরাত দ্বারাই প্রমাণিত হলো যে, তারাবীহ্, ছলাতুল কূসূফ (সূর্যগ্রহণের নামায), ছলাতুল ইস্তেস্কা (বৃষ্টির নামায) এই তিন প্রকার নামায ব্যতীত অন্যান্য নফল নামায সমূহ ইমামের সাথে চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ। আর বিশেষ করে ছলাতুর রাগায়িব, শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াতে আদায় করা নাজায়েয, মাকরূহ তাহরীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ। কেননা পরবর্তী ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করাকে অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আর আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমদের থেকে শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করার কোনই প্রমাণ নেই।
পরিশেষে “রেজভীয়া” কিতাবে এটাও বলা হয়েছে যে, নফল নামায পড়তে হলে পৃথক, পৃথক, আলাদা আলাদা একা-একা পড়তে হবে। নফল নামায জামায়াতে আদায় করা যাবে না। আর চারজন মুক্তাদী হলে সকল ইমাম, মুজতাহিদ, ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের সর্বসম্মত মতানুযায়ী নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করা মাকরূহ।
অতএব, রেযাখানীদের জালিয়াতি, ধোঁকাবাজী, প্রতারণা, মিথ্যা ও ইবারত কারচুপি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো। (চলবে)
মুহম্মদ আবজর আলী
জুরী, মৌলভীবাজার।
সুওয়ালঃ মাসিক মদীনা জুলাই/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপা হয়।
প্রশ্ন ঃ ফেব্রুয়ারী/১৯৯৯ সংখ্যা মাসিক মদীনার ২৬ নং প্রশ্নের উত্তরে আপনি লিখেছেন রমজান মাসে প্রাকৃতিক কারণে মেয়েদের যেসব রোযা কাজা হয় শাওয়াল মাসে নফল রোযার সাথে উক্ত কাজা ফরজ রোযার নিয়ত করলে তা একই সাথে আদায় হয়ে যায়। এটা জানার পর আমি অনেক মহিলাকে এই ফয়সালা জানিয়ে দিয়েছি এবং তারা সেই অনুযায়ী রোযা আদায় করেছে।
কিন্তু আপনি আবার মে/২০০১ সংখ্যা মদীনাতে ২৫নং প্রশ্নের উত্তরে লিখেছেন, শাওয়াল মাসের নফল ছয়টি রোযা রাখার দ্বারা রমজান মাসের ছুটে যাওয়া ফরজ রোযা আদায় হবে না। এ রোযা পৃথকভাবে রাখতে হবে। দুই বছরের ব্যবধানে একই প্রশ্নের দুই রকম উত্তর কেন হল? এর মধ্যে কোনটি ঠিক?
উত্তর ঃ সম্ভবতঃ বিষয়টি পরিপূর্ণরূপে বুঝিয়ে বলা সম্ভব হয়নি বলেই এরূপ বিপত্তির সৃষ্টি হয়েছে। মাসআলাটি হচ্ছে; রমযান মাসে প্রাকৃতিক কারণে মহিলাদের যেসব রোযা ছুটে যায়, তাঁরা যদি শাওয়াল মাসের মধ্যেই সেসব ছুটে যাওয়া ফরয রোযা আদায় করেন এবং একই সঙ্গে নফল ছয় রোযারও নিয়ত করেন তবে উভয় রোযাই আদায় হয়ে যাবে এবং তিনি দুই ধরণের রোযারই ছওয়াব পাবেন। অপর দিকে, যদি তিনি শুধু নফল ছয় রোযার নিয়ত করেন, ছুটে যাওয়া ফরয রোযাগুলির নিয়ত না করেন, তাহলে তাঁর শুধু নফল আদায় হবে; ছুটে যাওয়া ফরযগুলি আদায় হবে না।
এখন আমার সুওয়াল হলো- মাসিক মদীনার ফেব্রুয়ারী/১৯৯৯ ঈসায়ী সংখ্যার উত্তর এবং বর্তমান জুলাই/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যার উক্ত উত্তর সঠিক হয়েছে কি? আর সত্যিই কি রমজান মাসে ছুটে যাওয়া রমজানের কাযা রোযা এবং শাওয়াল মাসের নফল রোযা শাওয়াল মাসের মধ্যে একই দিনে একত্রে উভয় রোযার নিয়ত করে রাখলে, একই সঙ্গে উভয় রোযা আদায় হয়ে যাবে? এবং একই সঙ্গে উভয় রোযার ছওয়াব পাবেন কি? দয়া করে দলীল-আদিল্লাহসহ সঠিক জাওয়াব জানিয়ে আমাদের সন্দেহ দূর করবেন।
জাওয়াবঃ না, ছুটে যাওয়া রমজানের ক্বাযা রোযা এবং শাওয়ালের নফল রোযা একই সঙ্গে আদায় করা সম্পর্কে মাসিক মদীনার উক্ত উত্তর সঠিক হয়নি। বরং সম্পূর্ণ ভুল, অশুদ্ধ ও দলীলবিহীন হয়েছে। কারণ রমজানের ক্বাযা রোযা এবং শাওয়ালের নফল রোযা একই দিনে একত্রে নিয়ত করে রাখলে কস্মিনকালেও একই সঙ্গে উভয় রোযা আদায় হবে না এবং একইসঙ্গে উভয় রোযার ছওয়াবও পাবেনা।
বরং শুধুমাত্র রমজানের ক্বাযা রোযা আদায় হবে। শাওয়ালের নফল রোযা আদায় হবে না। কেননা রমজান মাসের ছুটে যাওয়া ফরয রোযার ক্বাযা আদায় করা ফরয। আর শাওয়াল মাসের রোযা হলো নফল।
কারণ, আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেছেন,
من كان مريضا او على سفر فعدة من ايام اخر.
অর্থঃ- “অতঃপর যে ব্যক্তি অসুস্থ অথবা সফরে থাকবে সে ব্যক্তি অন্য সময় ক্বাযা আদায় করবে। অর্থাৎ রমজানের ক্বাযা রোযা আদায় করাও ফরয।” (সূরা বাক্বারা/১৮৫)
অতএব রমজান মাসে মহিলাদের প্রাকৃতিক কারণে অথবা অসুস্থতার কারণে অথবা সফরে থাকার কারণে রমজানের রোযা আদায় করতে না পারলে রমজান ব্যতীত অন্য মাসে ক্বাযা আদায় করা ফরয।
দ্বিতীয়তঃ শাওয়াল মাসের নফল রোযা হল ছয়টি যা রাখলে অধিক ফযীলত হাছিল হয়। যেমন, হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
من صام رمضان ثم اتبعه ست من شوال كان كصيام الدهر.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি রমজানের রোযা রাখার পরে শাওয়ালের ছয় রোযা রাখবে সে যেন সারা বছরই রোযা রাখল।” (মুসলিম শরীফ, শরহে নববী, ফতহুল মুলহিম)
সুতরাং এটাই প্রমাণিত হয় যে, রমজানের ক্বাযা রোযা আদায় করা ফরয যা কুরআন শরীফ দ্বারা ছাবেত বা প্রমাণিত। আর শাওয়ালের ছয় রোযা আদায় করা নফল যা রমজানের ফরয রোযা আদায় করার পর রাখতে হয়, তা হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত।
অতএব, রমজানের ক্বাযা রোযা এবং শাওয়ালের নফল রোযা একত্রে নিয়ত করে একই দিনে রাখলে রমজানের ক্বাযা রোযা আদায় হবে কিন্তু শাওয়ালের নফল রোযা আদায় হবে না।
যেমন, এ প্রসঙ্গে “ফতওয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবের ১ম খন্ডের ১৯৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
واذا نوى قضاء بعض رمضان والتطوع يقع عن رمضان.
অর্থঃ- “যদি একই রোযার মধ্যে রমজানের কোন ক্বাযা রোযা এবং শাওয়াল মাসের বা অন্যান্য মাসের নফল রোযার নিয়ত একত্রে করে একই দিনে রাখে তাহলে রমজানের ক্বাযা রোযা আদায় হবে (নফল আদায় হবে না)।”
আর রমজানের ক্বাযা রোযার সঙ্গে শাওয়ালের নফল রোযা আদায় হওয়া তো দূরের কথা এমনকি রমজানের ক্বাযা রোযার সঙ্গে যদি মান্নতের রোযার নিয়ত করা হয় তাহলে সেক্ষেত্রেও রমজানের ক্বাযা রোযা আদায় হবে। মান্নতের রোযা আদায় হবে না।
যেমন, “ফতওয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবের ১ম খন্ডের ১৯৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে,
فاذا نوى عن قضاء رمضان والنذر كا عن قضاء رمضان استحسانا.
অর্থঃ- “যদি কেউ একই রোযার মধ্যে রমজানের ক্বাযা রোযা এবং মান্নতের রোযার নিয়ত করে তবে ইস্তেহ্সান হিসেবে রমজানের ক্বাযা রোযা আদায় হবে।”
এমনিভাবে যদি কেউ রমজানের ক্বাযা রোযার সঙ্গে জিহারের কাফ্ফারার রোযার নিয়ত করে এক্ষেত্রেও রমজানের ক্বাযা রোযা আদায় হবে, জিহারের কাফ্ফারার রোযা আদায় হবে না।
যেমন, “ফতওয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবের ১ম খন্ডের ১৯৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
ولو نوى قضاء رمضان وكفارة الظهار كان عن القضاء استحسانا.
অর্থাৎ- “যদি কেউ একই রোযার মধ্যে রমজানের ক্বাযা রোযা এবং জিহারের কাফ্ফারার রোযার নিয়ত একই সঙ্গে করে তাহলে এক্ষেত্রে ইস্তেহ্সান হিসেবে রমজানের ক্বাযা রোযা আদায় হবে।”
আর দু’টি সমান মর্যাদার রোযার নিয়ত একই দিনে করলে কোনটিই আদায় হবে না বরং রোযা নফল হয়ে যাবে। যেমন, রমজানের ক্বাযা এবং হত্যার কাফ্ফারার রোযার নিয়ত অথবা জেহারের কাফফ্ারার রোযা এবং হত্যার কাফ্ফারার রোযার নিয়ত একই দিনে করা হলে রোযা কোনটিই আদায় হবে না। রোযা নফল হয়ে যাবে।
যেমন, “ফতওয়া হিন্দিয়া” কিতাবের ২য় খন্ডের ৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
اور اكر كفاره ظهار اور كفاره قتل كى نيت كى يا قضاء رمضان اور كفاره قتل ك نيت كى تو بالاتفاق روزه نفل هوكا.
অর্থঃ- “আর যদি কেউ একটি রোযার মধ্যে জেহারের কাফ্ফারার রোযা এবং হত্যার কাফ্ফারার রোযার নিয়ত করে অথবা রমজানের ক্বাযা রোযা এবং হত্যার কাফ্ফারার রোযার নিয়ত করে তাহলে সকলের ঐক্যমতে রোযা নফল হয়ে যাবে।”
উল্লেখ্য, যদি দু’টি রোযার মধ্যে গুরুত্ব ও মর্যাদা হিসেবে একটি বড় হয় তবে বড়টিই আদায় হবে অন্যটি আদায় হবে না। যেমন রমজানের ক্বাযা রোযা এবং শাওয়াল মাসের বা অন্যান্য মাসের নফল রোযা অথবা নির্দিষ্ট মান্নতের রোযা ও অন্যান্য নফল রোযার নিয়ত একত্রে একই দিনে করলে রমজানের ক্বাযা রোযা অথবা নির্দিষ্ট মান্নতের রোযা আদায় হবে। কিন্তু নফল রোযা আদায় হবে না।
এ প্রসঙ্গে “ফতওয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবের ১ম খন্ডের ১৯৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে,
ومتى نوى شيئين مختلفين متساويين فى الوكادة والفريضة ولارججان لاحدهما على الاخر بطلا ومتى ترجح احدهما على الاخر ثبت الراجح.
অর্থাৎ- “যখন একই রোযার মধ্যে দু’টি সমমর্যাদা সম্পন্ন ভিন্ন ভিন্ন রোযার নিয়ত করা হয় যা ফরয ও তাকিদ সম্পন্ন তখন উক্ত রোযা দু’টি যদি একটি অপরটির উপর গুরুত্ব ও মর্যাদা হিসেবে প্রাধান্য না পায় বরং দু’টিই গুরুত্ব ও মর্যাদা হিসেবে সমান মর্যাদার হয় তাহলে দু’টি রোযাই বাতিল বলে গণ্য হবে। আর যখন দু’টি ভিন্ন ভিন্ন রোযা একটি অপরটির উপর গুরুত্ব ও মর্যাদা হিসেবে প্রাধ্যন্য পাবে তখন যেটি প্রাধান্য পাবে সেটি আদায় হয়ে যাবে।”
উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটাই প্রমাণিত হলো যে, একই দিনে একত্রে দু’টি রোযার নিয়ত করলে একটি রোযা দ্বারা একই সঙ্গে কস্মিনকালেও দু’টি রোযা আদায় হবে না। বরং যে রোযাটি গুরুত্ব ও মর্যাদা হিসেবে বড় হবে সেটি আদায় হবে। আর উভয় রোযা যদি গুরুত্ব ও মর্যাদা হিসেবে সমান সমান হয় তাহলে কোনটিই আদায় হবে না। বরং রোযা নফল হিসেবে আদায় হবে।
সুতরাং রমজানের ক্বাযা রোযা এবং শাওয়ালের নফল রোযা একত্রে নিয়ত করে একই দিনে রাখলে শুধু রমজানের ক্বাযা রোযা আদায় হবে, শাওয়ালের নফল রোযা আদায় হবে না। উপরের বিস্তারিত ও দলীলসমৃদ্ধ আলোচনা দ্বারা তা বর্ণনা করা হয়েছে।
কাজেই নফলের নিয়ত দ্বারা ফরয অথবা ফরজের নিয়ত দ্বারা নফল আদায় হয় এ কথা বলা চরম জিহালত ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে একই সঙ্গে ফরয ও নফল উভয়ের নিয়ত করলে ফরয আদায় হবে, নফল আদায় হবে না এবং ছওয়াবও পাবেনা। এটাই মূল ফতওয়া। এর বিপরীত মত পোষণ করা গোমরাহী।
আরো উল্লেখ্য যে, মাসিক মদীনার সম্পাদক তার মূর্খতার কারণে বারংবার এরূপ ভুল মাসয়ালা দিয়ে থাকে। যার কারণে তার দেয়া ফতওয়া বা উত্তর শ্রবণ ও পালন করা থেকে বিরত থাকা ও পরহেয করা সকল মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য।
অতএব, মাসিক মদীনার উক্ত মাসয়ালা সঠিক হয়নি এবং সে অনুযায়ী আমল করা জায়েয হবে না।
{দলীলসমূহঃ (১) আহকামুল কুরআন জাস্সাস, (২) কুরতুবী, (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) মাযহারী, (৫) আহমদী, (৬) রুহুল বয়ান, (৭) খাযেন, (৮) বাগবী, (৯) যাদুল মাসীর, (১০) তাবারী, (১১) মুসলিম শরীফ, (১২) শরহে নববী, (১৩) ফতহুল মুলহীম, (১৪) মিশকাত, (১৫) মিরকাত, (১৬) আশয়াতুল লুময়াত, (১৭) লুময়াত, (১৮) তালীক্ব, (১৯) তীবি, (২০) মুযাহেরে হক্ব, (২১) ফতওয়ায়ে আলমগীরী, (২২) জখীরা, (২৩) সিরাজুল ওহ্হাজ, (২৪) মুহীত, (২৫) ছরখছি (২৬) কাজীখান (২৭) হিন্দিয়া ইত্যাদি।}
মুহম্মদ মুসাদ্দিক হোসেন (নিপু)
মুহম্মদ আরিফুল খবীর
উপশহর, দিনাজপুর।
সুওয়ালঃ মাসিক মদীনা জুলাই/ ২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে এক প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, “ইনজেকশনের ঔষধ যেহেতু পাকস্থলী কিংবা মস্তিস্ক পর্যন্ত পৌঁছে না রবং উহা রগ বা শিরা পর্যন্ত পৌঁছে থাকে তাই ইনজেকশন দ্বারা রোযা ভঙ্গ হবেনা।”
ঢাকা মুহম্মদপুর জামিয়া রাহমানিয়া থেকে প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকা জুন/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসার-জবাব বিভাগে এক জিজ্ঞাসার-জবাবে বলা হয়েছে, “ইনজেকশন দ্বারা কোন দ্রব্য শরীরের ভিতরে ঢুকলে তা শরীরের স্বাভাবিক রাস্তা দিয়ে না ঢোকার কারণে রোযা নষ্ট হয়না।”
আর হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে মৌলভী আহমদ শফীর সম্পাদনায় প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকা এপ্রিল/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-সমাধান বিভাগে এক জিজ্ঞাসার-সমাধানে বলা হয়েছে, “রোযা রাখা অবস্থায় ইনজেকশন করলে রোযা নষ্ট হয়না।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- রোযা রাখা অবস্থায় ইনজেকশন নেয়া সম্পর্কে উক্ত পত্রিকাত্রয় যে বক্তব্য পেশ করেছে তা সঠিক হয়েছে কি? আর সত্যিই কি ইনজেকশন দ্বারা রোযা ভঙ্গ হয়না? দলীল-আদিল্লাহ্সহ সঠিক জাওয়াব জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ না, রোযা রাখা অবস্থায় ইনজেকশন নেয়া সম্পর্কে উক্ত পত্রিকাত্রয়ের বক্তব্য সঠিক হয়নি।
কারণ ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাবসমূহে স্পষ্টরূপে উল্লেখ রয়েছে যে, “রোযা রাখা অবস্থায় ইন্জেকশন নিলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে।” যেমন, “হেদায়া মা’য়াদ দেরায়া” কিতাবের ১ম খন্ডের ২২০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
ومن احتقن ….. الفطر لقوله صلى الله عليه وسلم الفطر مما دخل.
অর্থঃ- “এবং যদি কোন ব্যক্তি ইনজেকশন নেয় … তাহলে রোযা ভঙ্গ হবে। কারণ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কিছু ভিতরে প্রবেশ করলে রোযা ভঙ্গ হবে।”
“বাহরুর রায়েক” কিতাবের ২য় খন্ডের ২৭৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
واذا احتقن …. افطر لقوله عليه السلام الفطر مما دخل وليس مما خرج.
অর্থঃ- “যদি কোন ব্যক্তি ইনজেকশন নেয় … তাহলে রোযা ভঙ্গ হবে। কারণ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কিছু ভিতরে প্রবেশ করলে রোযা ভঙ্গ হবে এবং বের হলে রোযা ভঙ্গ হবেনা।”
“ফতওয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবের ১ম খন্ডের ২০৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, ومن احتقن …. افطر.
অর্থঃ- “এবং যদি কোন ব্যক্তি ইন্জেকশন নেয় … তাহলে রোযা ভঙ্গ হবে।” অনুরূপ “ফতওয়ায়ে শামীতে”ও উল্লেখ আছে।
অতএব, উপরোক্ত দলীলভিত্তিক আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, ইন্জেশন নিলে রোযা ভঙ্গ হবে। এখানে সংক্ষিপ্ত ভাবে লিখা হলো প্রয়োজনে বিস্তারিতভাবে লিখা হবে। (ইনশাআল্লাহ্)
মুহম্মদ তাজুল ইসলাম
কাউনিয়া ডিগ্রী মহাবিদ্যালয়
কাউনিয়া, রংপুর।
সুওয়ালঃ হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে মৌলভী আহমদ শফীর সম্পাদনায় প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকার ফেব্রুয়ারী’ ২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় নিম্মোক্ত জিজ্ঞাসা-সমাধান ছাপা হয়।
জিজ্ঞাসাঃ আযান ও ইক্বামতের জবাব দেওয়া কি? এবং সে জবাব দেওয়ার নিয়ম কি?
সমাধান: ফিক্বাহ শাস্ত্রের ভাষ্যমতে প্রতীয়মান হয় যে, আযান ও ইক্বামতের মৌখিক জবাব দেয়া মুস্তাহাব। …..(মুসলিম শরীফ১/১৬৭, ফাত্ওয়ায়ে হিন্দিয়া-১/৫৭, ফাত্ওয়ায়ে শামী-১/৩৯৬)
এখন আমার সুওয়াল হলো- সত্যিই কি ফিক্বাহ শাস্ত্রের ভাষ্যমতে আযানের মৌখিক জবাব দেয়া মুস্তাহাব?
জাওয়াবঃ হাটহাজারীর মৌলভী আহমক শফীর উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল, মিথ্যা, ধোকাপূর্ণ ও ইবারতের অর্থ কারচুপি সম্পন্ন। তার জাজ্বল্য প্রমাণ হলো ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া কিতাবের ১ম খন্ডের ৫৭ পৃষ্ঠার ইবারত। তাতে উল্লেখ আছে যে, “মৌখিকভাবে আযানের জবাব দেয়া ওয়াজিব।” ফতওয়ায়ে আলমগীরী আল মা’রুফ বিল “ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া” কিতাবের ১ম খন্ডের ৫৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
يجب على السامعين عند الاذان الاجابة وهى ان يقول مثل ما قال المؤذن.
অর্থঃ-“আযানের সময় শ্রোতাদের জন্য আযানের জবাব দেয়া ওয়াজিব। আর আযানের জবাব এভাবে দিবে যে, মুয়ায্যিন (মুখে) যা বলে অনুরূপ শ্রোতাগণও (মুখে) তা বলবে।”
অর্থাৎ ফতওয়ায়ে হিন্দিয়ার উক্ত ইবারতের প্রথমাংশে আযানের জবাব দেয়ার আহকাম বর্ণনা করা হয়েছে এবং দ্বিতীয়াংশে আযানের জবাব দেয়ার নিয়ম বা পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে।
যেমন, আহ্কাম সম্পর্কে বলা হয়েছে যে,
يجب على السامعين عند الاذان الاجابة.
অর্থাৎ-“শ্রবণকারীদের জন্য আযানের জবাব দেয়া ওয়াজিব।”
আর জবাব দেয়ার নিয়ম সম্পর্কে বলা হয়েছে যে,
وهى ان يقول مثل ما قال المؤذن.
অর্থাৎ- “মুয়ায্যিন (মুখে) যা বলে অনুরূপ শ্রোতাগণও (মুখে) তাই বলবে।”
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে এটাই প্রমাণিত হলো যে, আযানের জবাব দেয়া ওয়াজিব। আর জবাব দেয়ার নিয়ম হলো মুয়ায্যিনের ন্যায় আযানের শব্দগুলো মুখে উচ্চারণ করতঃ জবাব দেয়া। সুতরাং “ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া” কিতাবের উক্ত ইবারতের দ্বারা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হলো যে, “মৌখিক আযানের জবাব দেয়া ওয়াজিব।”
উক্ত কিতাবের একই পৃষ্ঠায় পরবর্তী ইবারতে আরো উল্লেখ আছে যে,
ولاينبغى يتكلم السامع فى خلال الاذان والاقامة ولا يشتغل بقرائة القران ولا بشيئ من الاعمال سوى الاجابة.
অর্থঃ- “আর আযান ও ইক্বামতের সময় শ্রোতাদের কথা বলা উচিত হবেনা এবং কুরআন শরীফ পাঠ করবেনা এবং আযান ও ইক্বামতের জবাব দেয়া ব্যতীত কোন কাজই করা যাবেনা।”
আর “ফতওয়ায়ে শামী” কিতাবের ১ম খন্ডের ৩৯৬ পৃষ্ঠার পরবর্তী ৩৯৯ পৃষ্ঠায় “দুররুল মুখতার” ও “শামী” কিতাবের ইবারতে উল্লেখ আছে, মৌখিকভাবে আযানের জবাব দেয়া ওয়াজিব। যেমন, “শামী” কিতাবের ১ম খন্ডের ৩৯৯ পৃষ্ঠায় “দুররুল মুখতার” কিতাবের ইবারতে উল্লেখ আছে,
والظاهر وجوبها باللسان لظاهر الامر فى حديث. (اذا سمعتم المؤذن فقولوا مثل ما يقول) كما بسط فى البحر واقره المصنف وقواه فى النهر ناقلا عن المحيط وغيره بانه على الاول لايرد السلام ولا يسلم ولا يقرأ بل يقطعها ويجيب ولا يشتغل بغير الاجابة.
অর্থঃ- “আর জাহির রেওয়ায়েত মুতাবিক মৌখিকভাবে আযানের জবাব দেয়া ওয়াজিব। কেননা হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুস্পষ্টভাবে আদেশ করেছেন যে, “যখন তোমরা মুয়ায্যিনের আযান শুনবে, তখন মুয়ায্যিন যা বলে তোমরাও তাই বল।” এ সম্পর্কে ফিক্বাহ শাস্ত্রের বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য কিতাব “বাহ্রুর রায়েকে” বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে এবং মুছান্নেফ এটাকেই স্বীকৃতি দিয়েছেন যে, “মৌখিকভাবে আযানের জবাব দেয়া ওয়াজিব।”
আর “নাহ্রুল ফায়েকে, “মুহীত” এবং অন্যান্য কিতাব থেকে বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে, মৌখিকভাবে আযানের জবাব দেয়া ওয়াজিব, এটিই শক্তিশালী মত। তবে প্রথম মতে অর্থাৎ মৌখিকভাবে আযানের জবাব দেয়া যেহেতু ওয়াজিব সেহেতু আযান অবস্থায় সালামের জবাব দিবেনা, অন্য কাউকে সালাম দিবেনা, কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা যাবেনা। বরং কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা বন্ধ করে আযানের জবাব দিবে। আযানের জবাব দেয়া ব্যতীত অন্য কোন কাজে মশগুল হওয়া যাবেনা।”
এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
اذا سمعتم النداء فقولوا مثل ما يقول المؤذن.
অর্থঃ- “যখন তোমরা আযান শোন, তখন মুয়ায্যিন যা বলে তোমরাও তাই বল।” (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, আবু দাউদ)
এছাড়াও কিছু শব্দের তারতম্যে অনুরূপ বর্ণনা ইবনে মাযাহ্, মিশকাত, মিরকাত, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, শরহুত ত্বীবী, তালিকুছ ছাবী, মুযাহেরে হক্ব ইত্যাদি হাদীস শরীফ ও তার ব্যাখ্যাগ্রন্থে উল্লেখ আছে।
আর “শামী” কিতাবের উক্ত পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে,
القول بوجوب الاجابة باللسان.
অর্থাৎ- “মৌখিকভাবে জবাব দেয়াই ওয়াজিব হিসেবে সাব্যস্ত।”
অতএব, হাটহাজারীর মৌলভী আহমক শফী যে ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া ও ফতওয়ায়ে শামী কিতাবের বরাত দিয়ে মৌখিক আযানের জবাব দেয়া মুস্তাহাব বলেছে তা সম্পূর্ণরূপে ইবারত কারচুপি সম্পন্ন প্রতারণার শামীল। আর উক্ত “ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া ও ফতওয়াযে শামী” কিতাবের ইবারতের দ্বারাই হাটহাজারীর বক্তব্য খন্ডন হয়ে প্রমাণিত হলো যে, মৌখিক আযানের জবাব দেয়া ওয়াজিব। আর সাথে সাথে এটাও প্রমাণিত হলো যে, মৌলভী আহমক শফীর বক্তব্য মিথ্যা, ভুল, গোমরাহী জিহালতি ও ধোকাপূর্ণ।
মুহম্মদ আব্দুল্লাহ্ আল মারুফ
সান্তাহার, বগুড়া।
সুওয়ালঃ জনৈক মহিলা স্বামীর অবাধ্য হয়ে তার বিনা অনুমতিতে তার বাড়ী থেকে চলে যাওয়ায় স্বামী এক সালিশী বৈঠকের মাধ্যমে স্ত্রীকে মোহর পরিশোধ করতঃ তিন তালাক প্রদান করে। তালাক দেয়া কালে স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিল। এ বর্ণনার পরিপ্রেক্ষিতে শরীয়তের ফতওয়া মুতাবিক তালাক কার্যকরী হবে কিনা? কারণ কেউ কেউ বলেছে যে, গর্ভবতী অবস্থায় তালাক দিলে তালাক হয়না। আবার কেউ বলেছে যে, এক সাথে তিন তালাক দিলে এবং রাগের মাথায় তালাক দিলে তালাক কার্যকরী হয় না। এক্ষেত্রে কেবল বিয়ে দোহরানো হলেই আবার সংসার বৈধ হবে।
বর্তমানে স্বামী উক্ত স্ত্রীকে পুনরায় গ্রহণ করতে রাজী আছে। আর স্ত্রীর অভিভাবকের পক্ষ থেকে স্ত্রীকে স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ সমূদয় বিষয়াদি নিরীক্ষণপূর্বক শরীয়তের ছহীহ্ ফতওয়া জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ স্বামী রাগের বশবর্তী হয়ে অথবা খুশী অবস্থায় তালাক প্রদান করুক, সুস্থ অবস্থায় অথবা অসুস্থ অবস্থায় তালাক প্রদান করুক, স্ত্রী যদি মাদখুলা হয় তবে এক সাথে তিন তালাক প্রদান করুক অথবা আলাদা আলাদা তিন তালাক প্রদান করুক, স্ত্রীকে গর্ভবতী অবস্থায় তালাক প্রদান করুক অথবা গর্ভবতী অবস্থা ব্যতীত স্বাভাবিক অবস্থায় তালাক প্রদান করুক ইত্যাদি সকল অবস্থায় স্ত্রীর প্রতি তিন তালাক পতিত ও কার্যকরী হবে। এটাই কুরআন ও সুন্নাহ্র ছহীহ্ ফতওয়া। এ ফতওয়ার উপরই সকল মাযহাবের সকল ইমাম এক মত। এর বিপরীত ফতওয়া দেয়া সম্পূর্ণ কুরআন-সুন্নাহ্র খিলাফ, নাজায়েয ও কুফরী।
আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
فان طلقها فلاتحل له من بعد حتى تنكح زوجا غيره فان طلقها فلا جناح عليهما ان يتراجعا.
অর্থঃ- “অতঃপর স্বামী যদি স্ত্রীকে (তিন) তালাক দেয় তাহলে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী উক্ত তালাক দাতা স্বামীর জন্য বিনা তাহলীলে হালাল হবেনা। অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত অন্য স্বামী গ্রহণ না করবে। অতঃপর দ্বিতীয় স্বামী যদি উক্ত স্ত্রীকে তালাক দেয় তখন প্রথম স্বামী ও উক্ত স্ত্রী যদি পূনঃরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় তাতে কোন গুণাহ্ হবেনা।” (সূরা বাক্বারা/২৩০)
উপরোক্ত আয়াত শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, স্ত্রীকে তিন তালাক দিলেই তিন তালাক পতিত হবে। তালাক যদিও গোস্বা অবস্থায় দেয়।
এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে উল্লেখ রয়েছে,
ثلث جدهن جد هزلهن جد النكاح والطلاق والرجعة.
অর্থঃ- “তিনটি বিষয় এমন রয়েছে যা গোস্বায় হোক বা হাসি ঠাট্টায় হোক সর্বাবস্থায় কার্যকরী হয়ে থাকে। বিবাহ্, তালাক ও রাজ্য়াত।” (তিরমিযী, আবূ দাউদ,মিশকাত)
উপরোক্ত আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় তাফসীরে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, যদি কোন স্বামী তার স্ত্রীকে তিন তালাক দেয় তাহলে তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী তালাকদাতা স্বামীর জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যায়। এখন যদি তালাকদাতা স্বামী তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে গ্রহণ করতে চায় তাহলে শরীয়তের ফয়সালা হলো, তালাক প্রাপ্তা স্ত্রী তার ইদ্দত পালন করবে অতঃপর অন্যত্র বিবাহ্ বসবে। বিবাহ্রে পর যদি দ্বিতীয় স্বামী উক্ত স্ত্রীকে স্ত্রী হিসেবে ব্যবহার করে তালাক দিয়ে দেয় এরপর তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী ইদ্দত পালন করে তখন প্রথম স্বামীর জন্য এই স্ত্রীকে বিবাহ্রে মাধ্যমে গ্রহণ করা জায়েয বা হালাল হবে। এ পদ্ধতিকেই হিলা বলা হয়।
সুতরাং লক্ষ-কোটিবার তওবা-ইস্তিগফার করলেও এবং লক্ষ-কোটি টাকা কাফ্ফারা আদায় করলেও কোন অবস্থাতেই হিলা ব্যতীত তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী তালাকদাতা স্বামীর জন্য জায়েয হবে না। হিলা ব্যতীত ঘর-সংসার করা উভয়ের জন্য হারাম।
যদি কেউ তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে নিয়ে হিলা ব্যতীত সংসার করে এবং স্ত্রীও তাতে সম্মতি প্রকাশ করে তাহলে তারা উভয়েই যিনার গুণাহ্ েগুনাহ্গার হবে। এ অবস্থায় সন্তান জন্মগ্রহণ করলে শরীয়তে অবৈধ সন্তান হিসেবে সাব্যস্ত হবে। আর যারা এই হারাম কাজে চাপ সৃষ্টি ও সহযোগীতা করবে তারা সকলেই একই গুণাহ্ েগুনাহ্গার হবে। অর্থাৎ প্রত্যেকেই যিনার কাজে সাহায্যকারী হিসেবে সাব্যস্ত হবে।
আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
تعاونوا على البر والتقوى ولاتعاونوا على الاثم والعدوان.
অর্থঃ- “তোমরা নেকী ও পরহেযগারীর মধ্যে সাহায্য কর। আর পাপ ও শত্রুতার মধ্যে সাহায্য করোনা।” (সূরা মায়িদা/২)
আর এটা যদি কেউ হালাল জেনে করে তাহলে সে কাফির হিসেবে সাব্যস্ত হবে। তার যিন্দেগীর সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যাবে। তার উপর মুরতাদের হুকুম বর্তাবে।
আর মুরতাদের ফায়সালা হচ্ছে- তার স্ত্রী তালাক হবে (যদি বিয়ে করে থাকে) এবং এক্ষেত্রে পুনরায় তওবা না করে, বিয়ে না দোহরানো ব্যতীত তার স্ত্রীর সাথে বসবাস করা বৈধ হবেনা। আর এই অবৈধ অবস্থায় সন্তান হলে সেই সন্তানও অবৈধ হবে। হজ্ব বাতিল হয়ে যাবে (যদি হজ্ব করে থাকে), সমস্ত নেক আমল বরবাদ হয়ে যাবে, তার ওয়ারিশ সত্ব বাতিল হবে। তাকে তিন দিন সময় দেয়া হবে তওবা করার জন্য এবং যদি তওবা করে, তবে ক্ষমা করা হবে। অন্যথায় একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড। কেননা হাদীস শরীফে রয়েছে, তিন কারণে মৃত্যুদন্ড দেয়া জায়েয। যথা- (ক) ঈমান আনার পর কুফরী করলে অর্থাৎ মুরতাদ হলে। (খ) ঐ যিনাকার বা যিনাকারিনী, যারা বিবাহিত বা বিবাহিতা। (গ) যে অন্যায়ভাবে কাউকে ক্বতল করে, তাকে। (তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাযাহ্, মুসনদে শাফেয়ী, মুসনদে বাজ্জার, মুস্তাদরেকে হাকেম)
আর মুরতাদ মারা যাবার পর যারা জানাযার নামায পড়ে বা পড়ায় বা জানাযার নামাযে সাহায্য-সহযোগীতা করে, তাদের সকলের উপরই মুরতাদের হুকুম বর্তাবে এবং এ সকল মুরতাদ মরলে বা নিহত হলে তাকে মুসলমানগণের কবরস্থানে দাফন করা যাবেনা। এমনকি মুসলমানের ন্যায়ও দাফন করা যাবেনা। বরং তাকে কুকুরের ন্যায় একটি গর্তের মধ্যে পুঁতে রাখতে হবে।
কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
ان الذين كفروا وماتوا وهم كفار فلن يقبل من احدهم ملء الارض ذهبا ولو افتدى به اولئك لهم عذاب اليم وما لهم من نصرين.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই যারা কাফির এবং কুফরী অবস্থায় মারা গেছে, তারা যদি যমীন পরিপূর্ণ স্বর্ণ (কুফরীর পরিবর্তে) কাফ্ফারা বাবদ দেয় (আমার থেকে বাঁচার জন্য), তাদের থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবেনা। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি বা আযাব এবং তাদের জন্য কোন সাহায্যকারীও থাকবে না।” (সূরা আলে ইমরান/৯১)
অতএব, এধরণের কাজে সহযোগীতা ও চাপ সৃষ্টি করা হতে সকলকে বিরত থাকতে হবে।
{দলীলসমূহঃ (১) তাফসীরে মাযহারী, (২) রুহুল বয়ান, (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) খাযেন, (৫) বাগবী, (৬) ইবনে কাছীর, (৭) তাবারী, (৮) কুরতুবী, (৯) কবীর, (১০) আহকামুল কুরআন, (১১) আহমদী, (১২) বায়যাভী, (১৩) শায়েখযাদাহ, (১৪) বুখারী, (১৫) তিরমিযী, (১৬) আবূ দাউদ, (১৭) দারেমী, (১৮) ইবনে মাযাহ্, (১৯) মিশকাত, (২০) বযলুল মাজহুদ, (২১) আউনুল মা’বুদ, (২২) উরফুশ শাজী, (২৩) ফতহুল বারী, (২৪) উমদাতুল ক্বারী, (২৫) মিরকাত, (২৬) আশয়াতুল লুময়াত, (২৭) লুময়াত, (২৮) ত্বীবী, (২৯) তালীক্ব, (৩০) মুযাহিরে হক্ব, (৩১) দুররুল মুখতার, (৩২) খানিয়া, (৩৩) ফতওয়ায়ে কাজীখান, (৩৪) বাহরুর রায়েক, (৩৫) ফতওয়ায়ে আলমগীরী, (৩৬) ফতওয়ায়ে আল বারুরিয়া, (৩৭) জামিউল ফুছুলিন, (৩৮) আল্ বায্যাজিয়া, (৩৯) শামী, (৪০) মাবসূত, (৪১) ফতহুল ক্বাদীর, (৪২) হেদায়া, (৪৩) এনায়া, (৪৩) গায়াতুল আওতার, (৪৪) কানযুদ দাক্বায়েক্ব, (৪৫) শরহে বেকায়া, (৪৬) নেহায়া, (৪৭) আইনুল হেদায়া, (৪৮) আইনী, (৪৯) ফতওয়ায়ে আমীনিয়া, (৫০) শরহে আকাঈদে নছফী, (৫১) আকাঈদে হাক্কা, (৫২) তাক্মীলুল ঈমান, (৫৩) আল্ ফিক্বহুল আক্বার ইত্যাদি।}
মাওলানা মুহম্মদ আফজালুল হক,
মৌলভী মুহম্মদ তসলিমুদ্দীন বসুনিয়া,
নাজিমখান, কুড়িগ্রাম।
সুওয়ালঃ বর্তমানে অনেক দল ও মতাদর্শের অনুসারীরা যেমন- ওহাবী, খারিজী, অতি সুন্নী, রেযাখানী, জামাতী, তাবলীগী, লা-মাযহাবী, দেওবন্দী ইত্যাদি ফেরক্বাবন্দী লোকেরা তাদের নিজস্ব আক্বাইদ-ইবাদত, আমল-আখলাক, বক্তব্য-লিখনীর স্বপক্ষে মুরুব্বীদেরকে দলীল হিসেবে পেশ করে থাকে। কেউ তাদের আক্বইদ-ইবাদত, আমল-আখলাক, বক্তব্য-লিখনীর ভুল দর্শিয়ে কুরআন-সুন্নাহ্র দলীল পেশ করলে তা তারা গ্রহণ তো করেই না এবং কুরআন-সুন্নাহ্র দলীল পেশ করতে বললে তাও তারা করেনা শুধুমাত্র মুরুব্বীদের দোহাই দিয়ে থাকে অর্থাৎ মুরুব্বীরা করেছে বলেই তারা তা করে। প্রকৃতপক্ষে তাদের কুরআন-সুন্নাহ্র কোন দলীল নেই।
এখন আমার জিজ্ঞাসা যে, কুরআন-সুন্নাহর দলীল ব্যতীত কোন মুরুব্বীর দলীল গ্রহণযোগ্য হবে কি? আর এভাবে দলীল পেশ করা কতটুকু শরীয়ত সম্মত?
জাওয়াবঃ কুরআন-সুন্নাহ্র দৃষ্টিতে সাধারণতঃ মুসলমান দু’ প্রকার। প্রথম প্রকার হচ্ছে- আলিম। আর দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে- ত্বলেবে ইল্ম।
যারা ত্বলেবে ইল্ম তারা প্রশ্ন করে জেনে নিবে। তাদের শানে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
فاسئلوا اهل الذكر ان كنتم لا تعلمون.
অর্থঃ- “তোমরা যারা জাননা তারা যারা আহ্লে যিক্র (জানেন) তাদেরকে জিজ্ঞেস করে জেনে নাও।” (সূরা আম্বিয়া/৭)
আর যারা আলিম তাদের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষদেরকে সকল বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ্র দলীল অবগত করানো। তাদের শানে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
هاتوا برهانكم ان كنتم صدقين.
অর্থঃ- “তোমরা সত্যবাদী হলে দলীলসমূহ পেশ কর।” (সূরা বাক্বারা/১১১)
বিশেষভাবে স্মরণীয় যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন মুরুব্বীই দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবেনা ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ পর্যন্ত সে মুরুব্বীর আকাইদ, ইবাদত, আমল-আখলাক, বক্তব্য লিখনী ইত্যাদির দলীল কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াস দ্বারা প্রমাণিত না হবে। কারণ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের দলীল হচ্ছে- কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াস। শরীয়তের এ চারটি দলীল ব্যতীত মুরুব্বীদেরকে দলীল হিসেবে পেশ করা কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।
এ প্রসঙ্গে কুরআন শরীফে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
واذا قيل لهم اتبعوا ما انزل الله قالوا بل نتبع ما الفينا عليه ابائنا. او لوكان اباؤهم لايعقلون شيئا ولا يهتدون.
অর্থঃ- “যখন তাদেরকে বলা হয় যে, ইত্তেবা (অনুসরণ) কর আল্লাহ্ পাক যা নাযিল করেছেন। তারা বলে, বরং আমরা ঐ বিষয়ের (হুকুমের) উপর আমল করবো যার উপর আমাদের বাপ-দাদা (মুুরুব্বীদের)কে পেয়েছি। যদিও তাদের বাপ-দাদা তথা মুরুব্বীরা আক্বল মন্দ, জ্ঞানী ও হিদায়েতপ্রাপ্ত ছিলনা।” (সূরা বাক্বারা/১৭০)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে,
واذا قيل لهم اتبعوا ما انزل الله قالوا بل نتبع ماوجدنا عليه ابائنا او لوكان الشيطن يدعوهم الى عذاب السعير.
অর্থঃ- “তাদেরকে যখন বলা হয়, আল্লাহ্ পাক যা নাযিল করেছেন, তোমরা তার অনুসরণ কর। তখন তারা বলে, বরং আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে (মুরুব্বীদের) যার উপর পেয়েছি, তাই অনুসরণ করবো। যদিও শয়তান তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির দিকে আহবান করে।” (সূরা লুক্বমান/২১)
উল্লেখ্য, কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে যে, ইবলীস শয়তান ও তার অনুসারীরা (জিন-ইনসান থেকে) মানুষের মধ্যে ফিৎনা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য ইসলাম সম্পর্কে বানিয়ে বানিয়ে নিজেদের মনগড়া বক্তব্য কুরআন-সুন্নাহ্র সাথে মিশ্রিত করে প্রচার করে থাকে, সাধারণ মানুষ বা শ্রোতারা সে সমস্ত কথাকে কুরআন-সুন্নাহ্ মনে করে গ্রহণ করে থাকে এবং তা তারাও প্রচার করে থাকে। যদি কখনো ঐ সমস্ত লোকদের কাছে দলীল তলব করা হয় তারা দলীলের বরাত না দিয়ে বলে থাকে যে, আমরা দলীল জানিনা, তবে মুরুব্বীদের কাছ থেকে শুনেছি।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে ইরশাদ করেন,
وكذلك جعلنا لكل نبى عدوا شيطين الانس والجن يوحى بعضهم الى بعض زخرف القول غرورا.
অর্থঃ- “এমনিভাবে আমি প্রত্যেক নবীর জন্য শত্রু করেছি শয়তানরূপী মানব ও জিনকে। তারা (জ্বিন-ইনসানকে) ধোঁকা দেয়ার জন্য পরস্পর পরস্পরকে কারুকার্যখচিত, মনগড়া, বানানো কথাবার্তা শিক্ষা দেয়।” (সূরা আনয়াম/১১২)
এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
عن ابن مسعود قال ان الشيطان ليتميث فى صورة الرجل فياتى القوم فيحدثهم بالحديث من الكذب فيتفرقون فيقول الرجل منهم سمعت رجلا اعرف وجهث ولا ادرى مااسمه يحدث.
অর্থঃ- “হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, শয়তান কোন মানুষের আকৃতি ধারণ করে কোন জামায়াতের কাছে আসে এবং তাদেরকে মিথ্যা কথা বলে। অতঃপর যখন সে জামায়াতটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, তখন তাদের মধ্য হতে কোন এক লোককে বলে, আমি এক ব্যক্তির নিকট হতে এই কথা শুনেছি কিন্তু তাকে দেখলে চিনি, তবে তার নাম জানিনা।” (মুসলিম, শরহে নববী, ফতহুল মুলহিম)
উপরোক্ত আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, ইত্তেবা বা অনুসরণ করতে হবে আল্লাহ্ পাক যা নাযিল করেছেন তার। অর্থাৎ কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াসকে। বাপ-দাদা বা পূর্বপুরুষ তথা মুরুব্বীদের অনুসরণ-অনুকরণ অথবা তাদের কথাকে দলীল হিসেবে পেশ করা ততক্ষণ পর্যন্ত জায়েয হবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের কথা বা আমল কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াস সম্মত না হবে।
কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াস সম্মত না হওয়া সত্ত্বেও যদি কেউ মুরুব্বী বা বাপ-দাদাকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে তাহলে তা সম্পূর্ণ নাজায়েয, হারাম ও কুফরী হবে।
কাজেই ওহাবী, খারিজী, অতি সুন্নী, রেযাখানী, জামাতী, তাবলীগী, লা মাযহাবী, দেওবন্দী ইত্যাদি ফিরক্বাবন্দী লোকদের কখনোই উচিৎ হবেনা, তাদের কোন বিষয়ে বাপ-দাদা বা মুরুব্বীদের কথা বা কাজকে দলীল হিসেবে পেশ করা এবং গ্রহণ করা। কারণ আল্লাহ্ পাক তা নিষেধ করেছেন।
অতএব, সকলের জন্যই এ থেকে বিরত থাকা ফরয-ওয়াজিবের অন্তর্ভূক্ত।
{দলীলসমূহঃ (১) আহ্কামুল কুরআন লি ইবনিল আরাবী, (২) কুরতুবী, (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) মাযহারী, (৫) তাবারী, (৬) কবীর, (৭) বায়যাবী, (৮) শায়খ যাদাহ্, (৯) আবী সাউদ, (১০) মায়ানিউত তানযীল, (১১) মাদারিকুত্ তানযীল, (১২) জালালাইন, (১৩) মুয়ালিমুত্ তান্যীল, (১৪) যাদুল মাসীর, (১৫) নিশাপুরী, (১৬) রুহুল বয়ান, (১৭) ক্বাদেরী, (১৮) মাওয়ারেদী, (১৯) নাযমুদ্দুরার, (২০) মুদ্বীহুল কুরআন, (২১) দুররুল মানছুর, (২২) দুররুল মাছূন, (২৩) আল জাওয়াহির, (২৪) আত্ তাসহীল, (২৫) ফাতহুল ক্বাদীর, (২৬) হাশিয়াতুশ্ শিহাব, (২৭) মাওয়াহেবুর রহমান, (২৮) হাক্কানী, (২৯) মাজেদী, (৩০) কাশফুর রহমান, (৩১) ওছমানী, (৩২) খাযায়েনুল ইরফান, (৩৩) জিয়াউল কুরআন, (৩৪) ক্বাসেমী, (৩৫) আলী হাসান, (৩৬) তাহেরী, (৩৭) নূরুল কুরআন, (৩৮) কামালাইন, (৩৯) কাশ্শাফ, (৪০) ইবনে কাছির, (৪১) আহ্কামুল কুরআন জাস্সাস, (৪২) মুসলিম, (৪৩) শরহে নববী, (৪৪) ফতহুল মুলহিম, (৪৫) বাহ্রুর রায়েক, (৪৬) কাযীখান, (৪৭) আলমগীরী, (৪৮) শামী, (৪৯) ফিক্বাহুল আকবর, (৫০) শরহে আক্বাঈদে নছফী, (৫১) আকাঈদে হাক্কা, (৫২) তাকমীলুল ঈমান, (৫৩) নূরুল আনোয়ার, (৫৪) উছূলুশ্ শাশী ইত্যাদি।}
হাফিয মুহম্মদ আব্দুল কবীর
সভাপতি- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত
ঘোড়াশাল, নরসিংদী।
সুওয়ালঃ এক মাদ্রাসার জনৈক মুহাদ্দিস বলেছে যে, “বিবাহে ছেলে পক্ষ মেয়ে পক্ষের নিকট থেকে পণ বা যৌতুক নিতে পারবে। কেননা এ ব্যাপারে নাকি صراحة (ছরাহাতান) বা স্পষ্ট নিষেধের কোন দলীল নেই।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- উক্ত মুহাদ্দিসের কথা কতটুকু শরীয়তসম্মত? দয়া করে দলীল-আদিল্লাহ্সহ জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ উক্ত মুহাদ্দিস ছাহেবের বক্তব্য সম্পূর্ণ শরীয়তের খিলাফ হয়েছে। শরীয়তের দলীল হচ্ছে- কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস। صريح (ছরীহ্) স্পষ্ট, (২) كناية (কেনায়া) ইশারা বা ইঙ্গিতসূচক হিসেবে প্রতিটি দলীলই দু’প্রকার।
“বিবাহে পণ বা যৌতুক নেয়ার ব্যাপারে ছরাহাতান বা স্পষ্ট কোন নিষেধের দলীল নেই” তার এ কথার জবাব হলো, শরীয়তে কোন বিষয় প্রমাণিত বা কার্যকরী হওয়ার জন্য কেবল ছরাহাতান বা স্পষ্ট বর্ণনা থাকতে হবে তা শুদ্ধ নয়। কারণ কেনায়া বা ইশারা-ইঙ্গিত করে এমন বর্ণনা দ্বারাও শরীয়তের হুকুম কার্যকরী হয়ে থাকে। যেমন- দাদী, নানী ও নাতনীকে বিবাহ্ করা হারাম। শরীয়তের এ মাসয়ালাটি কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে ছরাহাতান উল্লেখ নেই বরং কেনায়া হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। এবং এ উল্লেখ থাকার কারণে ইমাম-মুজতাহিদগণ ইজতিহাদ করতঃ রায় বা ফতওয়া প্রদান করেন যে, “দাদী, নানী ও নাতনীকে বিবাহ্ করা হারাম” যা শরীয়তের তৃতীয় ও চতুর্থ দলীল- ইজমা ও ক্বিয়াসের অন্তর্ভূক্ত।
পণ বা যৌতুক গ্রহণ করা সম্পর্কে শরীয়তের প্রথম ও দ্বিতীয় দলীলে ছরাহাতান (স্পষ্ট) নিষেধের দলীল না থাকলেও আদেশও নেই। তবে কেনায়া বা ইশারা ইঙ্গিত হিসেবে দলীল রয়েছে যা তৃতীয় ও চতুর্থ দলীলে ছরাহাতান বা স্পষ্টই উল্লেখ রয়েছে যে, “পণ বা যৌতুক গ্রহণ করা নাজায়েয ও হারাম।” এ ফতওয়া ফিক্বাহ্র বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য কিতাব “আলমগীরী, শামী, দুররুল মুখতার, মজমুয়া ফতওয়া” ইত্যাদিতে বর্ণিত রয়েছে।
কুরআন শরীফে ছরাহাতান (স্পষ্ট) ছেলে পক্ষ থেকে মেয়েকে দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। আর মেয়ে পক্ষকেও ছেলের পক্ষ হতে নেয়ার জন্য বলা হয়েছে। এছাড়া হাদীস শরীফেও অনুরূপ বলা হয়েছে। কিন্তু কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস শরীয়তের এ চার দলীলের কোন দলীলেই ছরীহ্ ও কেনায়া কোনভাবেই ছেলের পক্ষকে বলা হয়নি মেয়ে পক্ষ থেকে নেয়ার জন্য আর মেয়ে পক্ষকেও বলা হয়নি ছেলে পক্ষকে দেয়ার জন্য।
আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
واتوا النساء صدقيهن نحلة.
অর্থঃ- “তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে স্ত্রীদের মোহরানা আদায় করে দাও।” (সূরা নিসা/৪)
তিনি আরো ইরশাদ করেন,
ولايحل لكم ان تاخذوا مما اتيتموهن شيئا.
অর্থঃ- “স্ত্রীগণকে তোমাদের দেয়া অর্থ-সম্পদ ফেরৎ নেয়া বৈধ নয়।” (সূরা বাক্বারা/২২৯)
এমনিভাবে আরো অনেক আয়াত শরীফে স্বামীকে স্ত্রীর মোহরানা আদায় করার ব্যাপারে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আর স্ত্রীকে মোহরানা গ্রহণ করার জন্য আদেশ করা হয়েছে।
বুখারী, মুসলিম, নাসাঈ, আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাযাহ্, মিশকাত, মিরকাত ইত্যাদি হাদীস শরীফের কিতাবে বর্ণিত রয়েছে যে, “স্বয়ং আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মুল মু’মিনীন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুন্নাগণকে মোহর প্রদান করেছেন এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের প্রতি স্ত্রীদের মোহর প্রদান করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছেন।”
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
عن ابى سلمة بن عبد الرحمن انه قال سألت عائشة زوج النبى صلى الله عليه وسلم كم كامن صداق رسول الله صلى الله عليه وسلم قالت كان صداقه لازواجه ثنتى عشرة اوقية ونشا قالت اتدرى ما النش قال قلت لا قالت نصف اوقية فتلك خمس مأة درهم فهذا صداق رسول الله صلى الله عليه وسلم لازواجه.
অর্থঃ- “হযরত আবূ সালমা বিন আব্দুর রহমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রী হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রীগণের মোহরের পরিমাণ কত ছিল? তিনি বললেন, “তাঁর স্ত্রীগণের মোহরের পরিমাণ ছিল বার আউকিয়া এবং এক নাশ্শা।” তিনি বললেন, “নাশ্শা কি জানো?” রাবী বলেন, “আমি বললাম, জানিনা।” হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বললেন,“ এক আউকিয়ার অর্ধেক। তা হচ্ছে পাঁচশত দিরহাম। এটাই ছিল উম্মুল মু’মিনীনগণের মোহরের পরিমাণ।”(মুসলিম)
অর্থাৎ উম্মুল মু’মিনীনগণের মোহরের পরিমাণ ছিল সাড়ে বার আউকিয়া। (এক আউকিয়া = সাড়ে দশ তোলা রূপা। অর্থাৎ মোহ্র হলো রূপা হিসেবে একশত সোয়া একত্রিশ তোলা।)
আরো ইরশাদ হয়েছে,
عن انس بن مالك ان رسول الله صلى الله عليه وسلم اعتق صفية وجعل عتقها صداقها.
অর্থঃ- “হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছফিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাকে আযাদ করে বিবাহ করেন এবং এই আযাদকে তাঁর মোহর নির্ধারণ করেন।” (তিরমিযী)
সীরাত গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, হযরত ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর সাথে হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর বিয়ে ঠিক হলে আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “বিয়েতে মোহ্র আদায় করার মত কিছু আছে কি-না?” হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার অবস্থা আপনার অপেক্ষা আর কেউই ভাল জানেন না। আমার কাছে একটি তরবারী, একটি বর্ম এবং বদর জিহাদে গণীমত হিসেবে পাওয়া একটি অশ্ব ব্যতীত কিছু নেই।” আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “অশ্ব ও তরবারীটি তোমার খুবই দরকার যেহেতু তুমি একজন বীর মুজাহিদ। ও দু’টি তোমার কাছেই থাক। কেবল বর্মটি হলেই চলবে। এটাকে বিক্রি করে এর মূল্য নিয়ে এসো।”
অতঃপর হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তাঁর বর্মটিকে বিক্রি করার জন্য বহু স্থানে গেলেন কিন্তু বিক্রি হলোনা। অবশেষে হযরত উছমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নিকট গিয়ে বিক্রির প্রস্তাব দিলে তিনি ক্রয় করতে সম্মত হয়ে চারশত আশি দিরহাম ছহীহ্ মতে পাঁচ শত দিরহাম মূল্যে ক্রয় করলেন। লেনদেন শেষে হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আসার জন্য যখন উঠে দাঁড়ালেন তখন হযরত উছমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উঠে দাঁড়ালেন এবং উক্ত বর্মটি হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর হাত মুবারকে দিয়ে বললেন, “হে বীর! এই বর্মটি আপনার মত বীরের অঙ্গেই শোভাবর্ধন করবে। আমি আপনাকে এটা হাদীয়া দিলাম। আপনি নিঃসংকোচে এ হাদীয়া গ্রহণ করুন।” হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বন্ধুর অনুরোধ উপেক্ষা করতে না পেরে বর্মটিকে গ্রহণ করলেন।
অতঃপর আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট দিরহামগুলো দিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন। তিনি তা শুনে অত্যন্ত খুশী হলেন এবং হযরত উছমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর জন্য দোয়া করলেন। উক্ত দিরহাম হতে কিছু দিরহাম হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর হাতে দিলেন বিবাহ্ উপলক্ষ্যে কিছু সামগ্রী কেনার জন্য। তাঁর সাথে হযরত সোলায়মান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত বেলাল রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে দিলেন। তাঁরা একটি মিশর দেশীয় সজ্জা, একটি চামড়ার গদি, একটি খাবিরের কম্বল, কিছু মাটির জিনিসপত্র ও সিল্কের পর্দা কিনলেন। হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এগুলো এনে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট হাযির করলে তিনি আল্লাহ্ পাক-এর নিকট এই বলে প্রার্থনা করলেন, “আয় আল্লাহ্ পাক! মাটির জিনিসই যাদের প্রিয় সামগ্রী আপনি তাঁদের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন।” অতঃপর তিনি কিছু প্রয়োজনীয় সুগন্ধি দ্রব্য কেনার জন্য কিছু দিরহাম হযরত উম্মে সালমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর নিকট অর্পণ করলেন। তিনি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ মত কিছু সুগন্ধি দ্রব্য এনে হাযির করলেন। তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত ফাতিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর বিবাহ্ সম্পাদনের জন্য বিশিষ্ট মুহাজির ও আনছার ছাহাবাগণকে আমন্ত্রণ জানাতে নির্দেশ দিলেন। অতঃপর সকলের উপস্থিতিতে বিবাহ্ কার্য সম্পাদন করলেন।
বর্ণিত ঘটনা থেকে প্রতিভাত হয় যে, স্বয়ং আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মেয়ের বিয়েতে তার জামাতা হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে মোহর দিতে হয়েছিল। তাঁকে কোন পণ বা যৌতুক দেয়া হয়নি।
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
قال النبى صلى الله عليه وسلم ولو خاتما من حديد.
অর্থঃ- “হযরত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, (স্ত্রীকে মোহর প্রদান কর) যদিও তা লোহার আংটি হোক।” (বুখারী)
স্মর্তব্য যে, পরবর্তীতে লোহার অলংকার পড়া নিষেধ হয়ে যায় এবং যা জাহান্নামীদের অলংকার বলে অভিহিত করা হয়।
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
لا يكون نكاح الا بولى وشاهدين ومهر ماكان قل او كثر.
অর্থঃ- “অলী, দু’জন স্বাক্ষী এবং মোহর তা অল্প কিংবা বেশী হোক এ তিনটি ব্যতীত বিবাহ্ শুদ্ধ হয়না।” (তবারানী) আরো ইরশাদ হয়েছে,
من اصدق امراة صداقا وهو مجمع على الا يوفيها اياه لقى الله تعالى وهو زان.
অর্থঃ- “কোন ব্যক্তি স্ত্রীর মোহর নির্ধারণ করতঃ মনঃস্থির করলো যে, স্ত্রীকে মোহ্র পরিশোধ করবেনা, সে জিনাখোর হিসেবে আল্লাহ্ তায়ালার সাক্ষাতে হাযির হবে।” (তবারানী)
সুতরাং স্বামীর জন্য স্ত্রীকে মোহ্র প্রদান করতে হবে তা টাকা-পয়সা, ঘর-বাড়ী, জমি, দোকান, যানবাহন, গৃহপালিত পশু ইত্যাদি যাই হোক না কেন মোহর বাবদ দিতে পারে এবং স্ত্রীও তা গ্রহণ করতে পারে। আর পাশাপাশি কর্তব্য হিসেবে স্বামীকে স্ত্রীর খোরপোষ বা ভরণ-পোষণের দায়িত্বও গ্রহণ করতে হবে।
পক্ষান্তরে স্বামীর জন্য স্ত্রী বা স্ত্রীর পক্ষ হতে যৎ সামান্য কিছু নেয়ার ব্যাপারে কুরআন শরীফ এবং হাদীস শরীফে কোন আদেশ বা সমর্থন নেই।
উল্লেখ্য, বিবাহ্রে শর্ত তিনটি। যথা- (১) ইজাব-কবুল, (২) সাক্ষী, (৩) মোহর।
হানাফী মাযহাবের ইমাম হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি মোহ্রের সর্বনিম্ন পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন দশ দিরহাম। সুতরাং এর চাইতে কম মোহর নির্ধারণ করা যাবেনা। নির্ধারণ করা হলেও দশ দিরহামই মোহ্র আদায় করা ওয়াজিব হবে। আর অধিক মোহ্রের কোন পরিমাণ নির্দিষ্ট নেই। তবে পরিশোধ করতে পারে সে সামর্থ অনুযায়ী মোহ্র নির্ধারণ করতে হবে। কোন ক্ষেত্রে যদি মোহ্র নির্ধারণ করা না হয় সেক্ষেত্রে মেছলে মোহ্র ওয়াজিব হবে। মেছলে মোহর অর্থ, মোহরের যে পরিমাণ সাধারণত তার বংশ ও পরিবারস্থ অপরাপর মহিলার জন্য ধার্য করা হয়ে থাকে। এখানে বংশ ও পরিবার বলতে স্ত্রীর পৈত্রিক দিকের মহিলা। যেমন, ফুফু, আপন অথবা চাচাতো বোন ইত্যাদি।
অতএব, বিবাহ্শাদীতে ছেলের পক্ষ মেয়ের পক্ষের নিকট থেকে পণ বা যৌতুক নেয়া কুরআন-সুন্নাহ্র ছরীহ্ ও কেনায়া উভয় প্রকার বর্ণনা দ্বারাই সম্পূর্ণরূপে হারাম।
{দলীলসমূহঃ- (১) কুরতুবী, (২) আহকামুল কুরআন, (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) তাফসীরে মাযহারী, (৫) আহমদী, (৬) তাফসীরে তাবারী, (৭) ইবনে কাসীর, (৮) মা’রেফুল কুরআন, (৯) তাফসীরে ইবনে আব্বাস, (১০) যাদুল মাসির, (১১) রুহুল বয়ান, (১২) নিশাপুরী, (১৩) খাযেন, (১৪) বাগবী, (১৫) মুনিরী, (১৬) ইবনে আবি হাতিম, (১৭) শায়খ যাদাহ্, (১৮) কাসেমী, (১৯) ইবনে মাযাহ্, (২০) দারেমী, (২১) বুখারী, (২২) মুসলিম, (২৩) আবূ দাউদ, (২৪) নাসাঈ, (২৫) তিরমিযী, (২৬) মিশকাত, (২৭) ফতহুল বারী, (২৮) উমদাতুল ক্বারী, (২৯) শরহে নববী, (৩০) ফতহুল মুলহিম, (৩১) উরফুশ্ শাযী, (৩২) বযলুল মাযহুদ, (৩৩) তবারানী, (৩৪) মিরকাত, (৩৫) আশয়াতুল লুমুয়াত, (৩৬) লুমুয়াত, (৩৭) তালিকুছ্ ছবীহ্, (৩৮) ত্বীবী, (৩৯) মোযাহেরে হক্ব, (৪০) আলমগীরী, (৪১) শামী, (৪২) আইনুল হেদায়া, (৪৩) দুররুল মুখতার, (৪৪) বাহরুর রায়েক, (৪৫) হেদায়া, (৪৬) শরহে বেকায়া, (৪৭) কানযুদ্দাকায়েক্ব, (৪৮) নেহায়া, (৪৯) এনায়া, (৫০) নূরুল আনওয়ার, (৫১) রদ্দুল মুহতার, (৫২) গায়াতুল আওতার, (৫৩) কাযীখান, (৫৪) শামী, (৫৫) মজমুয়ায়ে ফতওয়া, (৫৫) আল ফিক্বহু আলা মাযাহিবিল আরবায়া, (৫৬) জামিউর রুমুজ, (৫৭) বায্যাযিয়া, (৫৮) ফতহুল ক্বাদীর, (৫৯) কেফায়া, (৬০) মা’দানুল হাক্বায়েক, (৬১) ফতওয়ায়ে আমিনীয়া ইত্যাদি।}