সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ:

সংখ্যা: ৮৯তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ মশীউজ্জামান

পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম

সুওয়ালঃ মাসিক আল বাইয়্যিনাত ৮৫তম সংখ্যায় “সুওয়াল-জাওয়াব” বিভাগে এক জাওয়াবের পরিপ্রেক্ষিতে মাসিক তরজুমান সেপ্টেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নামাজে দু’সিজদার মধ্যে দোয়া পাঠ করা সম্পর্কে যে বক্তব্য প্রদান করেছে তা কতটুকু সত্য? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ মাসিক তরজুমানের উক্ত উত্তরটি সম্পূর্ণ অশুদ্ধ, মিথ্যা, প্রতারণামূলক, জালিয়াতি, ধোকাপূর্ণ, ইবারতচুরি, অনুবাদে ভুল এবং এ ধরণের “প্রায় ৩৫টি ত্রুটিতে ত্রুটিপূর্ণ থাকায় মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

          উক্ত বিবিধ ত্রুটিপূর্ণ উত্তরটি নির্ভরযোগ্য দলীলের ভিত্তিতে খন্ডন করে তার সহীহ জাওয়াব ধারাবাহিকভাবে পেশ করা হচ্ছে।

(ধারাবাহিক)

২২. তারা শামী কিতাবের ইবারতের অর্থের শেষে বলেছে ‘‘অবশ্য দুই সিজ্দার মাঝখানে মাগফিরাতের দোয়া পড়া মুস্তাহাব ও উত্তম….।’’

          অথচ এর আরবী ইবারত তারা তাদের তরজুমানে উল্লেখ করেনি। কারণ মাগফিরাত শব্দের অর্থে এমন একটি বাক্য লুকায়িত আছে, যার অর্থ করলে তাদের ধোকাবাজী ধরা পড়বে। কেননা তারা মাগফিরাত বলতে সম্পূর্ণ দোয়াটি অর্থাৎ اللهم اغفرلى وارحمنى واهدنى وعافنى وارزقنى. এই সম্পূর্ণ দোয়াটি ফরয নামাযে বৈধ করার অপপ্রয়াস ও কূট কৌশল করেছিল কিন্তু মাসিক আল বাইয়্যিনাত- এর ফেরাসাতে, সূক্ষèদৃষ্টিতে তাদের কূট কৌশল ধরা পড়ল। কারণ মাসিক আল বাইয়্যিনাত তাদের মুখোশ উন্মোচন করে বললো যে, মাগফিরাত বলতে ফরয নামাযে শুধুমাত্র اللهم اغفرلى পর্যন্ত পড়া বৈধ। মাগফিরাত বলতে ফরয নামাযে সম্পূর্ণ দোয়াটি অর্থাৎ اللهم اغفرلى وارحمنى واهدنى وعافنى وارزقنى. এই সম্পূর্ণ দোয়াটি ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝখানে পড়া যাবেনা।

তারা মাগফিরাত শব্দের অর্থ না করে মাগফিরাতের দোহাই দিয়ে যে জালিয়াতি করেছে ইহা তাদের ২২ তম জালিয়াতি ও প্রতারণা।

২৩. তারা বলেছে, ‘‘কোন বৈধ মাসয়ালাকে, মনগড়া অবৈধ প্রমাণ করার জন্য বা স্বীয় স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ফিকাহ- এর কোন কোন ইবারতকে বাদ দিয়ে মুসলিম সমাজকে বিভ্রান্ত করা তার চাইতে বড় চোর, জ্ঞানপাপী ও বড় প্রতারক আর কে হতে পারে?’’

তরজুমান গং! দলীল পেশ করুক। মাসিক আল বাইয়্যিনাতে কোন্ বৈধ মাসয়ালাকে অবৈধ বলা হয়েছে?

          মাসিক আল বাইয়্যিনাতে বৈধ মাসয়ালাকে বৈধ মাসয়ালাই বলা হয়েছে। যেমন, মাসিক আল বাইয়্যিনাতে বলা হয়েছে- তরজুমানে উল্লেখিত দোয়াটি অর্থাৎ ‘আল্লাহুম্মারযুকনী ওয়ারহামনী ওয়াশ্ফাআনী ওয়াহ্দিনী’’ এই সম্পূর্ণ দোয়াটি নফল নামাজে বৈধ।

          আর মাসিক আল বাইয়্যিনাতে অবৈধ মাসয়ালাকে অবৈধ বলা হয়েছে। যেমন, মাসিক আল বাইয়্যিনাতে বলা হয়েছে, আমাদের হানাফী মাযহাব মোতাবিক তরজুমানে উল্লেখিত ‘‘আল্লাহুম্মারযুকনী ওয়ারহামনী ওয়াশ্ফাআনী ওয়াহ্দিনী’’ এই সম্পূর্ণ দোয়াটি ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝখানে পড়া যাবেনা। পড়লে সাহু সিজদা ওয়াজিব হবে এবং সাহু সিজদা ইচ্ছাকৃত না দিয়ে নামায শেষ করলে ওয়াজিব তরকের কারণে নামাজ বাতিল বলে গণ্য হবে এবং পুনরায়  উক্ত নামাজ দোহ্রানো ওয়াজিব হবে।”

          অতএব তরজুমান গংরাই মূলতঃ অবৈধ মাসয়ালাকে বৈধ বলেছে। যেমন- তাদের তরজুমানে উল্লেখিত ‘‘আল্লাহুম্মারযুকনী ওয়ারহামনী ওয়াশ্ফাআনী ওয়াহ্দিনী’’ এই সম্পূর্ণ দোয়াটি ফরয নামাযের দুই সিজ্দার মাঝখানে পড়া অবৈধ। আর এই অবৈধতাকে তারা ফরয নামযে পড়া বৈধ ও উত্তম বলেছে। ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝখানে সম্পূর্ণ দোয়াটি পড়া অবৈধ। এই অবৈধতাকে তারা ফরয নামাযে পড়া বৈধ করার জন্য যে সকল প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে, ইহা তাদের ২৩ তম জালিয়াতি ও প্রতারণা।

২৪. তারা বলেছে- “ফিকাহ-এর কোন কোন ইবারতকে বাদ দিয়ে…..।”

          অথচ তরজুমান গংরাই মূলতঃ শামী কিতাবের اللهم اغفرلى -সম্পর্কিত ইবারতকে বাদ দিয়ে পরবর্তী  ইবারত উল্লেখ করেছে। আর اللهم اغفرلى এর  ইবারতকে কারচুপি করে মাগফিরাতের দোহাই দিয়ে اللهم اغفرلى সহ وارحمنى واهدنى وعافنى وارزقنى.  পর্যন্ত সম্পূর্ণ দোয়াটি ফরয নামাযে বৈধ করার কূটকৌশল চালিয়েছে।

          অতএব প্রমাণিত হলো- তরজুমান গংরাই ফরয নামাযে শুধুমাত্র اللهم اغفرلى সম্পর্কিত ফিক্বাহ-এর  ইবারতকে  বাদ দিয়ে যে প্রতারণা করেছে। ইহা তাদের ২৪ তম জালিয়াতি ও প্রতারণা।

২৫. তারা বলেছে- “মুসলিম সমাজকে বিভ্রান্তি করা, তার চাইতে বড় চোর, জ্ঞানপাপী ও বড় প্রতারক আর কে হতে পারে?”

          তাদের এ বক্তব্যানুযায়ী তরজুমান গংরাই বড় চোর, জ্ঞানপাপী ও বড় প্রতারক। তরজুমান গংদের চেয়ে বড় চোর, জ্ঞানপাপী ও বড় প্রতারক আর কেউ নেই। কারণ তারা মাগফিরাতে দোহাই দিয়ে اللهم اغفرلى সহ وارحمنى واهدنى وعافنى وارزقنى.  পর্যন্ত সম্পূর্ণ দোয়াটি ফরজ নামাযের দুই সিজদার মাঝখানে পড়া বৈধ ও উত্তম বলে মুসলিম সমাজকে বিভ্রান্ত করার জন্য যে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে ইহা তাদের ২৫ তম জালিয়াতি ও প্রতারণা।

২৬. তারা বলেছে- ‘‘হযরত ইমাম আবু ইউসুফ (রাঃ), ইমাম আজম আবু হানিফা (রাঃ)-এর নিকট প্রশ্ন করেছিলেন যে, দুই সিজদার মাঝখানে ও রুকু থেকে দাঁড়ানোর পর ‘আল্লাহুম্মাগ ফিরলী’ বলা যাবে কিনা? তদোত্তরে হযরত ইমাম আবু হানিফা (রাঃ) ইস্তেগফার বা মাগফিরাতের দোয়া করা সম্পর্কে নিষেধ করেন নাই।’’

          অথচ তরজুমান গংদের মত জ্ঞানপাপী আল্লাহ্ পাক- এর জমীনে আর কেউ নেই। কারণ তারা শামী কিতাবের প্রথম বক্তব্যগুলো বাংলায় অনুবাদ করে শেষে উল্লেখ করেছে। আর শামী কিতাবের দ্বিতীয় বক্তব্যের প্রথম ইবরাতগুলো কারচুপি করে বাদ দিয়ে মাঝখানের ইবারতগুলো আগে উল্লেখ করেছে।

          আর ইমাম আযম আবূ হানীফা রহ্মতুল্লাহি আলাইহিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল ‘اللهم اغفرلى’ পড়া সম্পর্কে, যা ইস্তিগফারের দোয়া। ইমাম আযম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি ইস্তিগফারের দোয়া অর্থাৎ اللهم اغفرلى পড়তে নিষেধ করেন নাই।

          অথচ জ্ঞানপাপী তরজুমান গং ইস্তিগফারের সরাসরি অর্থ اللهم اغفرلى না করে আবারো কূটকৌশলে ইস্তিগফার বা মাগফিরাতের দোহাই দিয়েছে। অর্থাৎ ফরজ নামাযে শুধুমাত্র اللهم اغفرلى পড়তে নিষেধ করেননি। অর্থাৎ শুধুমাত্র اللهم اغفرلى পড়া ফরয নামাযে বৈধ। কিন্তু اللهم اغفرلى وارحمنى واهدنى وعافنى وارزقنى. এই সম্পূর্ণ দোয়াটি ফরয নামাযে বৈধ নয়।

          ইস্তিগফার বা মাগফিরাতের সরাসরি অর্থ না করে যে প্রতারণা করেছে, ইহা তাদের ২৬তম জালিয়াতি ও প্রতারণা। (চলবে)

মুহম্মদ মাহবুবউজ্জামান

পাহাড়তলী, ঝাউতলা, চট্টগ্রাম।

সুওয়ালঃ- মাসিক তরজুমান জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী ২০০০ ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে সিনেমা, টিভির অনুষ্ঠানাদি দেখা সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, “সিনেমা ও টিভির … অবশ্য যদি অনুষ্ঠানাদি শিক্ষনীয় হয় এবং আপত্তিকর ও গুণাহজনক না হয় তাহলে তা দেখা যে কোন সময়েই দোষণীয়তা মুক্ত।”

          এখন আমার সুওয়াল হলো- সিনেমা ও টিভির অনুষ্ঠানাদি দেখা সম্পর্কে তরজুমান পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? আর সিনেমা ও টিভির অনুষ্ঠানাদি যদি শিক্ষণীয় হয়, তাহলে সিনেমা ও টিভি দেখা সত্যিই কি জায়েয হবে? অথচ আমরা জানি সিনেমা ও টিভি দেখলে পাপ হয়, দয়া করে দলীলসহ সঠিক জাওয়াব জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ- সিনেমা ও টিভির অনুষ্ঠানাদি দেখা সম্পর্কে রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্র মাসিক তরজুমান পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণই মনগড়া, মিথ্যা, দলীলবিহীন এবং কুরআন-সুন্নাহ তথা শরীয়তের খিলাফ হওয়ায় কুফরী হয়েছে।

          তরজুমান-এর এ বক্তব্যের জবাবে বলতে হয় যে, তরজুমান গং-এর এ বক্তব্য সম্পূর্ণই কুফরী হয়েছে। কেননা সিনেমা ও টিভির অনুষ্ঠানাদি যতই শিক্ষণীয় হোক না কেন সিনেমা ও টিভির অনুষ্ঠানাদিতে বাহ্যিকভাবে কিছু শিক্ষণীয় বিষয় বা উপকারিতা থাকলেও যেহেতু সিনেমা ও টিভির অনুষ্ঠানাদি শিক্ষণীয় হওয়া মূল কথা নয়। মূল কথা হলো- ছবি নিয়ে। আর সিনেমা ও টিভির মূলেই হচ্ছে ছবি যাতে ফায়দার চেয়ে গুণাহ্ই বড়। যেমন, আল্লাহ্ পাক বলেন,

يسئلونك عن الخمر والميسر قل فيهما اثم كبير ومنافع للناس.

অর্থঃ- “হে হাবীব! আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয়, মদ ও জুয়া সম্পর্কে। আপনি বলে দিন, মদ ও জুয়ার মধ্যে মানুষের জন্য ফায়দা রয়েছে। তবে ফায়দার চেয়ে গুণাহ্ই বড়।” (সূরা বাক্বারা/২১৯)

          এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, আল্লাহ্ পাক নিজেই স্বীকার করেছেন যে, মদ ও জুয়ার মধ্যে ফায়দা রয়েছে। মদ পান করলে স্বাস্থ্য ভাল হয়, জুয়া খেললে রাতারাতি অনেক টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলোর মধ্যে ফায়দার চেয়ে গুণাহ্ বেশী বলে এগুলোকে হারাম করা হয়েছে। মদ ও জুয়ার মধ্যে উপকারীতার জন্য কেউ যদি তা জায়েয মনে করে, সে কুফরী করলো। তদ্রুপ সিনেমা ও টিভিতে প্রাণীর ছবির মাধ্যমে প্রচারিত শিক্ষণীয় বিষয়কে কেউ যদি জায়েয মনে করে তবে সেও কুফরী করলো।

          এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

ان اشد الناس عذابا عند الله المصورون.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই মানুষের মধ্যে ঐ ব্যক্তিকে আল্লাহ্ পাক কঠিন শাস্তি দিবেন, যে প্রাণীর ছবি তোলে বা আঁকে।” (বুখারী শরীফ)

          “বাহারে শরীয়ত” কিতাবের ৩য় খন্ডের ১২৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

উর্দু কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “প্রাণীর ছবি তৈরী করা বা তৈরী করানো সর্বাবস্থায়ই হারাম। চাই হাতে হোক অথবা ক্যামেরায়, উভয়ের একই হুকুম।”

          দ্বিতীয়তঃ তারা বলেছে, “আপত্তিকর ও গুণাহজনক না হয়, তাহলে তা দেখা যে কোন সময়েই দোষণীয়তা মুক্ত।”

          তাদের এ বক্তব্যও কুফরীমূলক হয়েছে। কারণ সিনেমা ও টিভির অনুষ্ঠানাদিকে আপত্তিকর ও গুণাহ্জনক মনে না করার অর্থ হচ্ছে, সেগুলো সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞানের পুরোই অভাব থাকা বা একেবারেই জ্ঞানশুণ্য হওয়া। বলার অপেক্ষা রাখে না, যে কোন সিনেমাই নাচ-গান ইত্যাদি অশ্লীল কাজ তথা বেপর্দা থেকে খালি নয়। পাশাপাশি টিভির ক্ষেত্রেও একই কথা। সুতরাং এরূপ একটি স্পষ্ট নাজায়েয বিষয়কে আপত্তিকর ও গুনাহ্জনক না বলে কল্পনা করা বাস্তব জ্ঞান সম্পর্কে গন্ড মূর্খ হওয়া বা বিকারগ্রস্থ হওয়া অথবা শরীয়তের জ্ঞান সম্পর্কে চরম জাহিল হওয়া কিংবা সবকিছু জেনেও নফসানিয়তের বশবর্তী হয়ে চরম ভন্ডামী, মুনাফিকী ও গোমরাহীর পরিচয় দেয়া। সঙ্গতকারণেই এসব গোমরাহ্দের জন্য ফতওয়া দেয়া যেমন নাজায়েয তেমনি এদের ফতওয়া পালন করাও বিলকুল নাজায়েয।

উল্লেখ্য, কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস তথা আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা মোতাবিক সমস্ত প্রাণীর ছবি তোলা, আঁকা, রাখা, দেখা, দেখানো তৈরী করা, ছাঁপা ইত্যাদি সবই হারাম ও নাজায়েয।

আর হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, لعن الله الناظر والمنظور اليه.

অর্থঃ- “যে দেখে এবং যে দেখায়, উভয়ের প্রতি আল্লাহ্ পাক-এর লা’নত।” (বায়হাক্বী, মিশকাত)

          কাজেই কোন অবস্থাতেই সিনেমা ও টিভিতে প্রাণীর ছবি সংক্রান্ত অনুষ্ঠানাদি দেখা, শোনা ও উপভোগ করা জায়েয হবেনা।

          অতএব তরজুমান কর্তৃপক্ষের উচিত এ ধরণের কুফরী ফতওয়া প্রদান হতে খালিছ তওবা করা এবং সে ফতওয়ার সংশোধনী দেয়া। নচেৎ এধরণের কুফরী ফতওয়ার জন্য তাদের নিজেদের এবং উক্ত ফতওয়া আমলকারীদের জন্য জাহান্নামের পথই প্রশস্ত হবে।

          (বিঃ দ্রঃ- ছবি, সিনেমা, টিভি, ভিসিআর, ভিডিও ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে আমাদের মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকার ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম সংখ্যাগুলো পড়ৃন। যাতে তিন শতাধিক অকাট্য ও নির্ভরযোগ্য দলীল-আদিল্লার মাধ্যমে ছবি সংক্রান্ত বিষয়াদি হারাম ও নাজায়েয প্রমাণ করা হয়েছে।)

সাইয়্যিদ মুহম্মদ মোক্তাদুল ইসলাম (মিলন)

সুবহানী ঘাট, সিলেট।

সুওয়ালঃ- মাসিক তরজুমান ডিসেম্বর/২০০০ঈঃ সংখ্যায় তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুনিয়াতুত তালেবীন, রেজভীয়া কিতাবের বরাত দিয়ে বলেছে, “সহীহ্ মুসলিম শরীফ সহ অনেক নির্ভর যোগ্য কিতাবে নফল নামায বিশেষতঃ ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামাত সহকারে আদায় করা বৈধ…….।”

          আর আপনারা মাসিক আল বাইয়্যিনাতে লিখেছেন তারাবীহ, ছলাতুল কুছুফ, (সূর্য গ্রহণের নামায) ছলাতুল ইস্তেস্কা, (বৃষ্টির নামায) এইতিন প্রকার নামায ব্যতীত যেমন লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতুল বরাত, তাহাজ্জুদ, চাশ্ত, আওয়াবীন ইত্যাদি নফল নামায সমূহ ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্। কোনটি সঠিক? আর বুখারী, মুসলিম শরীফে কি ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করার কথা উল্লেখ আছে? দয়া করে জানাবেন।

জাওয়াবঃ- নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করা সম্পর্কে মাসিক আল বাইয়্যিনাতের মাধ্যমে যা জানতে পেরেছেন তাই সঠিক, দলীল ভিত্তিক, গ্রহণযোগ্য ও ফতওয়াগ্রাহ্য মত। নফল নামায বিশেষতঃ শবে বরাত, শবেক্বদরের নামায জামায়াতে আদায় করা সম্পর্কে তরজুমানের উক্ত বক্তব্য অশুদ্ধ, মিথ্যা প্রতারণা মূলক, জালিয়াতি, ধোকাপূর্ণ, নিজহাতে ইবারত লিখে কিতাবের নামে চালিয়ে দেয়া, অনুবাদে ভুল ইত্যাদি ক্রটিতে ক্রটিপূর্ণ থাকায় মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

          ইতোপূর্বে তরজুমানের বক্তব্যকে আমরা ৭৬টি নির্ভরযোগ্য বিশ্বখ্যাত ফতওয়ার কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে দলীলের মাধ্যমে খন্ডন করে দিয়েছি। কিন্তু আমাদের উক্ত খন্ডনের জবাবে তারা কিছুই লিখতে পারেনি। বরং তারা আবারো কিছু কিতাবের বরাত দিয়ে বক্তব্য পেশ করেছে অথচ উক্ত কিতাবগুলোতে আযান ইক্বামত ছাড়া ইমাম ব্যতীত চারজন মুক্তাদী সহ শবে বরাত, শবে ক্বদর, তাহাজ্জুদ, চাশ্ত, আওয়াবীন ইত্যাদি নফল নামায সমূহ জামায়াতে আদায় করা বৈধ বলা হয়নি। আর বুখারী, মুসলিম শরীফে শবে ক্বদর, শবে বরাতের নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করার প্রশ্নই আসে না। আমরা পর্যায় ক্রমে উক্ত কিতাবের বক্তব্য খন্ডন করবো ইন্শাআল্লাহ্।

কিতাবের বক্তব্য খন্ডন করার আগে নিম্নে তরজুমানের

দলীলবিহীন, মনগড়া বক্তব্য খন্ডন করা হলো-

          যেমন, তারা বলেছে, “ফুক্বাহায়ে কিরামের কেহ কেহ নফল নামায জামাত সহকারে আদায় করাকে মাকরূহ বলে মত ব্যক্ত করেছেন। সে হিসেবে শব-এ বরাত ও শব-এ ক্বদরের নফল নামায ও জামাত সহকারে আদায় করাকে মাকরূহ বলে থাকেন।”

          তরজুমানের এ বক্তব্যের জবাবে বলতে হয়, তাদের মনগড়া এ বক্তব্য ভূল হয়েছে, “কারণ নফল নামায জামায়াতে আদায় করার ব্যাপারে ফুক্বাহা-ই-কিরামের কেউ কেউ মাকরূহ বলেননি। বরং সমস্ত ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ বলেছেন যে, “ইমাম ব্যতীত চারজন মুক্তাদী ইক্তেদা করে নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করা মাকরূহ তাহ্রীমী।

          যেমন, হযরত শামসুল আইম্মা ইমাম শামসুদ্দীন ছরুখছী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য “মাবছুত” কিতাবে বর্ণনা করেন, وان اقتدى اربعة بواحد كره اتفاقا.

অর্থঃ- আর যদি ইমামের সাথে চারজন মুক্তাদী ইক্তেদা করে নফল নামায জামায়াতে আদায় করে, তাহলে সকল ইমাম ও ফক্বীহ্গণের সর্বসম্মত মত হলো- ‘মাকরূহ্ তাহ্রীমী’ হবে।

          “ফতওয়ায়ে রেজভীয়ার” ১০ খন্ডের ১৭৫, ১৭৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, ﭼار مقتدى هور تو بالاتفاق.

অর্থঃ- “যদি জামায়াতে চারজন মুক্তাদী হয় তাহলে সকল ইমাম ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের ঐক্যমতে মাকরূহ।”

          অনুরূপ ফতওয়ায়ে আলমগীরী, বাহরুর রায়েক, মিনহাতুল খালিক, শরহে মুনিয়া, আইনী শরহে হেদায়া, শরহে নেক্বায়া, শরহে ইলিয়াস, ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া, দুরার, ফতওয়ায়ে সা’দিয়াহ, খোলাছাতুল ফতওয়া, হাশিয়ায়ে তাহতাবী, ফতওয়ায়ে তাতারখানিয়া, মাকতুবাতে ইমাম রব্বানী ইত্যাদি কিতাবেও সকল ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ চারজন মুক্তাদীসহ নফল নামায জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহ্রীমী বলেছেন।

          সুতরাং প্রমাণিত হলো সকল ফুকাহা-ই-কিরামের মতে চারজন মুক্তাদী হলে নফল নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ তাহরীমী। সে হিসেবে শবে বরাত, শবে ক্বদরের নামাযও জামায়াত সহকারে আদায় করা মাকরূহ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্।

যেমন, “আশবাহ্ ওয়ান্ নাজায়ের” কিতাবের ১ম খন্ডের ২১৯ পৃষ্ঠায় ও “শরহুল মুনিয়ায়” উল্লেখ আছে,

وقال الحلبى- واعلم ان النفل بالجماعة على سبيل التداعى مكروه ماعدا التراويح- وصلوة الكسوف والا ستسقاء فعلم ان كلا من الرغائب ليلة اول جمعة من رجب وصلوة البرأة وصلاة القدر ليلة السبع والعشرين من رمضان بالجماعة بدعة مكروهة.

অর্থঃ- “ইমাম হালাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, জেনে রাখ! নিশ্চয় নফল নামায ঘোষণা দিয়ে জামায়াতে পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী। তবে তারাবীহ্, কুছুফ (চন্দ্রগ্রহণ) ও ইস্তেস্কার (বৃষ্টির) নামায ব্যতীত। সুতরাং ছালার্তু রাগায়িব (অর্থাৎ রজব মাসের প্রথম জুমুয়ার রাত্রির নামায), শবে বরাতের রাত্রির নফল নামায এবং শবে ক্বদরের রাত্রির নফল নামায জামায়াতে পড়াও মাকরূহ্ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিাহ্।

          অতএব তরজুমানের কিতাব বিহীন, দলীল বিহীন, মনগড়া বক্তব্য ভুল বলেই প্রমাণিত হলো। পরবর্তী সংখ্যায় তাদের উদ্ধৃত কিতাবের বক্তব্য খন্ডন করবো। (ইনশ্আল্লাহ্) (চলবে)

মুহম্মদ আল আমীন

রামপুরা, ঢাকা।

সুওয়াল ঃ এক অখ্যাত পত্রিকায় বলা হয়েছে, আপনারা নাকি নিম্নে বর্ণিত-

روى عن عمر رضى الله تعالى عنه انه كان يوكل رجالا باقامة الصفوف فلايكبر حتى يخبر ان الصفوف قداستوت.

এই হাদীস শরীফ খানার অনুবাদ ও ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ উল্টা করেছেন? ইহা কতটুকু সত্য?

জাওয়াবঃ হাদীস শরীফের উল্টা অনুবাদ করা, হাদীস শরীফের মনগড়া ও সম্পূর্ণ উল্টা ব্যাখ্যা করা উক্ত অখ্যাত ও অবৈধ পত্রিকাওয়ালাদেরই মজ্জাগত ও সিলসিলাগত বদ অভ্যাস। মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর প্রতি হাদীস শরীফের অনুবাদ উল্টা করার যে অভিযোগ অখ্যাত ও অবৈধ পত্রিকাওয়ালারা করেছে, তা সম্পূর্ণ ডাহা মিথ্যা ও জিহালতপূর্ণ বৈ কিছুই নয়। আর হাদীস শরীফের অনুবাদ উল্টা করা তখনই হতো, যখন হাদীস শরীফের শাব্দিক অনুবাদ হুবহু উল্লেখ না করে বিপরীত অনুবাদ করা হতো। হাদীস শরীফে যেভাবে শব্দ রয়েছে হুবহু সেই শব্দেরই অনুবাদ করা হয়েছে। এখানে হাদীস শরীফের অনুবাদ উল্টা করা হলো কিভাবে? তারা কি প্রমাণ করতে পারবে যে, হাদীস শরীফে যেভাবে শব্দ রয়েছে সে শব্দের হুবহু অনুবাদ না করে উল্টা অনুবাদ করেছেন? কস্মিন কালেও তারা তা পারবে না।

          অতএব অখ্যাত ও অবৈধ পত্রিকাওয়ালাদের উক্ত অভিযোগ সম্পূর্ণই ডাহা মিথ্যা, কুটকৌশল ও উদ্দেশ্যে প্রণোদিত বলেই প্রমাণিত হলো।

          অখ্যাত ও অবৈধ পত্রিকাওয়ালাদের উচিত ছিল, এ ধরণের ডাহা মিথ্যা অভিযোগ না তুলে মাসিক আল বাইয়্যিনাতে প্রদত্ত হাদীস শরীফের অনুবাদটি খন্ডন করে দেয়া যে, আল বাইয়্যিনাত হাদীস শরীফের যে অনুবাদ করেছে তা সঠিক নয় বরং অখ্যাত ও অবৈধ পত্রিকাওয়ালাদের অনুবাদই সঠিক। কিন্তু অখ্যাত ও অবৈধ পত্রিকাওয়ালাদের একথা বলার সাহস হয়নি।

          অতএব আবারো প্রমাণিত হলো, মাসিক আল বাইয়্যিনাত হাদীস শরীফ খানার যে অনুবাদ করেছে সেটাই সঠিক। আর অখ্যাত ও অবৈধ পত্রিকাওয়ালাদের বক্তব্য ভুল।

          দ্বিতীয়তঃ অখ্যাত ও অবৈধ পত্রিকাওয়ালারা হাদীস শরীফের ব্যাখ্যা উল্টা করার যে অভিযোগ তুলেছে সেটাও ডাহা মিথ্যা। কারণ মাসিক আল বাইয়্যিনাতে হাদীস শরীফ খানা উল্লেখ করে শুধুমাত্র তার অর্থই করা হয়েছে। অর্থের পর হাদীস শরীফের কোন ব্যাখ্যা করা হয়নি। সুতরাং হাদীস শরীফের যেখানে ব্যাখ্যাই করা হয় নাই সেখানে উল্টা ব্যাখ্যা করার প্রশ্নই আসেনা। তাই তাদের মিথ্যা অভিযোগ খন্ডন করার জন্য পুনরায় হাদীস শরীফ খানা অর্থসহ উল্লেখ করা হলো-

روى عن عمر رضى الله تعالى عنه انه كان يوكل رجالا باقامة الصفوف فلايكبر حتى يخبر ان الصفوف قداستوت.

অর্থঃ-“হযরত ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি কাঁতার সোজা করার জন্য লোক নিয়োগ করতেন এবং কাতার সোজা হওয়ার খবর যতক্ষণ পর্যন্ত না দেয়া হতো ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি নামাযের তাকবীর বলতেন না। ”

অতএব আবারোও প্রমাণিত হলো যে, অখ্যাত, অবৈধ পত্রিকাওয়ালাদের হাদীস শরীফের উল্টা অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করার অভিযোগ ডাহা মিথ্যা।

তৃতীয়তঃ “অধিকাংশ উলামা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের মতে মুয়াজ্জিন যখন ইক্বামত শুরু করবেন তখন সকল মুছল্লী দাঁড়িয়ে যাওয়া মুস্তাহাব।” ইহা শুধু তানজীমুল আশতাত কিতাবেই নয়। বরং তানজীমুল আশতাত কিতাব ছাড়াও শাইখুল ইমাম আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বুখারী শরীফের বিশ্ববিখ্যাত শরাহ উমদাতুল ক্বারী কিতাবে, ইমাম নববী রহতুল্লাহি আলাইহি-এর মুসলিম শরীফের শরাহ শরহে নববীতেও উল্লেখ আছে। আর হাফেজ ইবনে হাজার আসক্বালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তার বিশ্ববিখ্যাত কিতাব ফতহুল বারীতে এ সম্পর্কে একখানা হাদীস শরীফও বর্ণনা করেছেন।

           যেমন, “ফতহুল বারী” কিতাবের ২য় খন্ডের ১২০পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

عن ابن شهاب ان الناس كانوا ساعة يقول المؤذن الله اكبر يقومون الى الصلاة فلا يأتى النبى صلى الله عليه وسلم مقامه حتى تعتدل الصفوف.

অর্থঃ- “হযরত ইবনে শিহাব রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত আছে, মুয়াজ্জিন যে সময় “আল্লাহু আকবার” বলতেন, তখন লোকেরা নামাযের জন্য দাঁড়িয়ে যেতেন। আর হুজুর পাক পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাতার সোজা না হওয়া পর্যন্ত তাঁর স্থানে তাশরীফ আনতেন না।”

          “উমদাতুল ক্বারী” কিতাবের ৫ম খন্ডের ১৫৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

وقد اختلف السلف متى يقوم الناس الى الصلوة فذهب مالك وجمهور العلماء الى انه ليس لقيامهم حد ولكن استحب عامتهم القيام اذا اخذ المؤذن فى الاقامة-

অর্থঃ- “মুছল্লী নামাযে কখন দাঁড়াবে (ইক্বামতের শুরুতে না শেষে) এ ব্যাপারে সলফে সালেহীন, ইমাম মুজতাহিগণ ইখতিলাফ বা মতভেদ করেছেন। ইমাম মালেক ও জমহুর উলামায়ে কিরাম রহ্মতুল্লাহি আলাইহিমগণ বলেছেন- (ইক্বামতের শুরু বা শেষে) নামাযে দাঁড়ানোর ব্যাপারে কোন সময়সীমা নির্দিষ্ট নেই। তবে অধিকাংশ সলফে সালেহীন, ইমাম-মুজতাহিদ, ও উলামা-ই-কিরাম রহ্মতুল্লাহি আলাইহিমগণ বলেছেন যে, মুয়াজ্জিন যখন ইক্বামত শুরু করবেন তখনই দাঁড়িয়ে যাওয়া মুস্তাহাব।

সহীহ্ মুসলিম শরীফের শরাহ “শরহে নববী” কিতাবের ৫ম খন্ডের ১০৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

وعامة العلماء انه يستحب ان يقوموا اذا اخذ المؤذن فى الاقامة.

অর্থঃ- “অধিকাংশ ওলামা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের মতে, মুয়াজ্জিন যখন ইক্বামত শুরু করবেন তখন মুছল্লীগণের দাঁড়ানো মুস্তাহাব।”

          এখানে বিশেষ ভাবে লক্ষনীয় যে, আমরা “তানজীমুল আশতাতের” উদ্ধৃতি দিয়ে যে বক্তব্য পেশ করেছি তা “তানজীমুল আশতাতের” লেখকের নিজস্ব বক্তব্য নয় বরং অনুস্বরণীয় ইমাম মুজতাহিদ সলফে সালেহীনগণেরই বক্তব্য। যেমন, জগতখ্যাত নির্ভরযোগ্য “বুখারী শরীফের শরাহ ফতহুল বারীর” লেখক হাফেজ ইবনে হাজার আসক্বালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি, বিশ্বখ্যাত বুখারী “শরীফের শরাহ উমদাতুল ক্বারীর” লেখক শাইখুল ইমাম আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রহমতুল্লাহি আলাইহি, “মুসলিম শরীফের শরাহ শরহে নববীর” লেখক ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি ইত্যাদি ইমাম মুজতাহিদ সলফে সালেহীন রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণেরই বক্তব্য। কাজেই “তানজীমুল আশতাত” থেকে উক্ত বক্তব্য উদ্ধৃতি দেয়ার কারণেই কেউ যদি ওহাবী হয় তাহলে উপরোক্ত ইমাম-মুজতাহিদ সলফে সালেহীন রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণও ওহাবী। (নাউযুবিল্লাহ্)

চতুর্থতঃ মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ৮৬তম সংখ্যায় সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগে ৩২ পৃষ্ঠায় সর্বজনমান্য ও বিশ্ববিখ্যাত ফতওয়ার কিতাব “ফতওয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবের ১ম খন্ডের ৫৭ পৃষ্ঠার উদ্ধৃতি দিয়ে অর্থসহ আরবী ইবারত উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে ফতওয়ায়ে আলমগীরীতে حى على الفلاح বলার সময় দাঁড়ানোর কথা যে বলা হয়েছে এটা আম ফতওয়া কিন্তু তাও আবার শর্ত সাপেক্ষে।

          অথচ উক্ত অখ্যাত ও অবৈধ পত্রিকাওয়ালারা আমাদের বাইয়্যিনাতে উল্লিখিত ফতওয়ায়ে আলমগীরীর অর্থটি চুরি করে তাদের অখ্যাত ও অবৈধ পত্রিকায় শুধুমাত্র চুরি করা অর্থটিই উল্লেখ করেছে। আর বাইয়্যিনাতে পৃথকভাবে যে শর্ত গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সে শর্তগুলো তারা কারচুপি করে উল্লেখ করেনি। আর বাইয়্যিনাতের অর্থ চুরি না করে তাদের কোন উপায়ও নেই। কারণ তারা তো আরবী পড়তে পারে না অর্থ করবে কিভাবে? সেহেতু তারা “বাংলা ফতওয়ায়ে আলমগীরী” থেকে দলীল দিয়েছে। এখন অখ্যাত ও অবৈধ পত্রিকার কুখ্যাত জাহিল গংরা দেখে নিক হাক্বীক্বী জিহালত কাদের।

          মূলকথা হলো- ইমাম ছাহেবের দাঁড়ানো অবস্থায় মুক্তাদীদের জন্য বসে থাকা মাকরূহ্ ও আদবের খেলাফ। কাজেই حى على الصلاة বা حى على الفلاح বলার সময় না দাঁড়িয়ে ইক্বামত বলার পূর্বে দাঁড়িয়ে কাতার সোজা করা, যাতে সকলেই কাতার সোজা করা ও ফাঁক বন্ধ করা যে ওয়াজিব তার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে।

          বিঃ দ্রঃ- বিস্তারিত জানার জন্য মাসিক আল বাইয়্যিনাতের ৮৬ তম সংখ্যার সুওয়াল জাওয়াব বিভাগ পাঠ করুন। সেখানে ৪৮টি কিতাবের দলীল পেশ করা হয়েছে। এছাড়াও আমাদের কাছে আরো অসংখ্য দলীল মওজুদ আছে প্রয়োজনে পরবর্তীতে আমরা ক্রমান্বয়ে পেশ করবো ইন্শাআল্লাহ্।

 সাইয়্যিদ মুহম্মদ ইউসুফ

মধ্য বাসাবো, ঢাকা।

সুওয়ালঃ মাসিক মদীনা অক্টোবর/২০০০ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপা হয়।

প্রশ্নঃ- অনেক জায়নামাযে কাবাশরীফ, মসজিদে নববী ইত্যাদির ছবি থাকে। জিজ্ঞাস্য, মসজিদের ছবি বিশিষ্ট জায়নামাযে নামায পড়া জায়েয হবে কিনা?

উত্তরঃ- মসজিদে নববী, খানায়ে কাবা, বাইতুল মুকাদ্দাসসহ যে কোন মসজিদের ছবি বা নকশা বিশিষ্ট জায়নামাযে নামায পড়া। তাতে বসা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয আছে। কেননা আসল কাবা শরীফসহ যে কোন মসজিদে নামায পড়া তাতে বসা ইত্যাদি যেহেতু সবই জায়েয, অতএব, মসজিদের নকশা বিশিষ্ট জায়নামাযে বসা, পা রাখা নাজায়েয হবে কেন? হ্যাঁ, মসজিদের নকশামুক্ত জায়নামায হওয়া উত্তম।

          এখন আমার সুওয়াল হলো- আপনারা মাসিক আল বাইয়্যিনাতে বলেছেন, মসজিদে নববী বা রওজা শরীফের ছবিযুক্ত জায়নামাযে নামায পড়া হারাম। আর কা’বা শরীফের ছবিযুক্ত জায়নামাযে নামায পড়া মাকরূহ এবং আমভাবে নক্শা খচিত জায়নামাযে নামায পড়া সুন্নতের খেলাফ বা মাকরূহ এবং হুজুরী বিনষ্ট হওয়ার কারণ।

          অথচ মাসিক মদীনা বলেছে জায়েয। কোনটি গ্রহণযোগ্য? দয়া করে দলীলসহ গ্রহণযোগ্য মতটি জানিয়ে প্রশান্তি দান করবেন।

জাওয়াবঃ মসজিদে নববী বা রওজা শরীফ ও কা’বা শরীফের” ছবিযুক্ত এবং আমভাবে নক্শা খচিত জায়নামাযে নামায পড়া সম্পর্কে “মাসিক আল বাইয়্যিনাতে” যা বলা হয়েছে তাই গ্রহণযোগ্য, সঠিক ও দলীলভিত্তিক।

          আর মাসিক মদীনার উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণ মনগড়া, মিথ্যা, বেয়াদবীমূলক, জিহালতপূর্ণ এবং দলীলবিহীন হওয়ায় মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ পবিত্র কা’বা শরীফ, মসজিদে নববী শরীফ এবং বাইতুল মুকাদ্দাস হচ্ছে, আল্লাহ্ পাক-এর শেয়ার বা নিদর্শন সমূহের অন্তর্ভূক্ত। যার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং অশেষ কল্যাণের কারণও বটে।

          এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,

ومن يعظم شعائر الله فانها من تقوى القلوب.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাক-এর নিদর্শন সমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে, নিশ্চয় তা তার জন্য অন্তরের তাক্বওয়া বা পবিত্রতার কারণ।” (সূরা হজ্ব/৩২)

          আল্লাহ্ পাক অন্যত্র আরো বলেন,

ومن يعظم حرمة الله فهو خيرله عند ربه.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক যে সকল বস্তুকে সম্মানিত করেছেন, তাকে যে ব্যক্তি সম্মান করলো, এটা তার জন্য কল্যাণ বা ভালাইয়ের কারণ।” (সূরা হজ্ব/৩০)

          অতএব, উপরোক্ত আয়াত শরীফসমূহ দ্বারা এটাই ছাবেত হলো যে, মহান আল্লাহ্ পাক-এর নিদর্শন সমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা সকলের জন্যই ফরজ। আর সেগুলোর অবমাননা করা সম্পূর্ণই হারাম ও নাজায়েয।

          কাজেই “পবিত্র কা’বা শরীফ, মসজিদে নববী শরীফ, বাইতুল মুকাদ্দাস” যেহেতু মহান আল্লাহ্ পাক-এর নিদর্শন সমূহের অন্তর্ভূক্ত, সেহেতু উক্ত নিদর্শন সমূহকে পায়ের নিচে রাখা বা সেগুলোকে পদদলিত করা আল্লাহ্ পাক-এর নিদর্শন সমূহকে অবমাননা করার শামিল। যা শুধু আদবের খেলাফই নয় বরং স্থান ও ক্ষেত্র বিশেষে নাজায়েয, হারাম ও কুফরী।

          তাই মহান আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন,

ياايها الذين امنوا لاتحلوا شعائر الله.

অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ পাক-এর নিদর্শন সমূহের অবমাননা করোনা।” (সূরা মায়েদা/২)

          উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যেমন, ছবি তোলা হারাম। এরপরেও যদি কোন ব্যক্তি তার পিতার ছবি তোলে, সেই ছবি যদি তৃতীয় কোন ব্যক্তি পা দিয়ে মাড়ায় তাহলে যার পিতার ছবি মাড়ানো হলো সে ব্যক্তি কি সেটা সম্মানজনক হিসেবে মেনে নিবে? কখনই সেটা সম্মানজনক হিসেবে গ্রহণ করবে না। বরং যার পিতার ছবি, সে ঐ ব্যক্তির উপর গোস্বা করবে, যে তার পিতার ছবিকে মাড়িয়েছে। কারণ তার পিতার ছবিকে পা দিয়ে মাড়ানোর কারণে তার পিতাকে এহানতই করা হয়েছে। ইজ্জত, সম্মান করা হয়নি।

          উল্লেখ্য, কারো পিতার ছবি যদি পা দিয়ে মাড়ানোর কারণে এহানত হয় তাহলে পবিত্র কা’বা শরীফ, মদীনা শরীফ ও বাইতুল মুকাদ্দাস যা আল্লাহ্ পাক-এর শেয়ার, তাঁর ছবিকে পা দিয়ে মাড়ালে কি পবিত্র কা’বা শরীফ, মদীনা শরীফ ও বাইতুল মুকাদ্দাসের এহানত হবে না? অবশ্যই হবে।

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, الكفر ملة واحدة

অর্থঃ- “সমস্ত কাফিররা, বিধর্মীরা মিলে এক দল।”

          তারা সম্মিলিত চক্রান্ত বা কৌশলের মাধ্যমে মুসলমানদের পবিত্র ও সম্মানিত স্থান- পবিত্র কা’বা শরীফ ও রওজা শরীফ সংলগ্ন মসজিদে নববী শরীফ, বাইতুল মুকাদ্দাস ইত্যাদির ছবি জায়নামাজে সংযুক্ত করেছে। অর্থাৎ সম্মানিত স্থানসমূহকে মানুষের পায়ের নিচে এনে দিয়েছে। যার ফলে মুসলমানগণ সেগুলোকে পদদলিত করবে এবং ধীরে ধীরে সেগুলোর থেকে মুসলমানের শ্রদ্ধা-ভক্তি, তা’যীম-তাকরীম উঠে যাবে। কাজেই বিধর্মীদের এ ধোকা থেকে নিজ ঈমানকে হিফাযত করা এবং মক্কা শরীফ, মদীনা শরীফ ও বাইতুল মুকাদ্দাসের তা’যীম-তাকরীম রক্ষা করা আর সেগুলোকে অবমাননা করা হতে বিরত থাকা সকলের জন্যই দায়িত্ব ও কর্তব্য তথা ফরজ।

          উপরোক্ত আলোচনা সাপেক্ষে সাব্যস্ত হলো যে, সাধারণভাবে পবিত্র কা’বা শরীফ ও বাইতুল মুকাদ্দাসের ছবিযুক্ত জায়নামাজে নামাজ পড়া মাকরূহ্ তান্যীহী ও আদবের খেলাফ আর খাছভাবে মাকরূহ তাহ্রীমী। আর মসজিদে নববীর ছবি যদি রওজা শরীফসহ হয়, তবে তাতে নামাজ পড়া সম্পূর্ণই হারাম। এগুলো আল্লাহ্ পাক-এর শেয়ার বা নিদর্শন সমূহের অন্তর্ভূক্ত। এগুলোকে তা’যীম-তাকরীম করা সকলের উপরই অপরিহার্য কর্তব্য।

          তাছাড়া আমভাবে সকলের মতেই মসজিদের ছবিযুক্ত বা নক্শা খচিত জায়নামাজে নামাজ পড়া সুন্নতের খেলাফ বা মাকরূহ্ এবং হুজুরী বিনষ্ট হওয়ার কারণ। এটাই কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াস সম্মত, সহীহ্ ও গ্রহণযোগ্য মত।

মাহিউদ্দিনের ক্বিয়াস খন্ডন

দ্বিতীয়তঃ মাসিক মদীনা সম্পাদক, মাহিউদ্দিন বলেছে, “আসল কা’বা শরীফসহ যে কোন মসজিদে নামায পড়া, তাতে বসা ইত্যাদি যেহেতু সবই জায়েয। অতএব, মসজিদের নক্শা বিশিষ্ট জায়নামাযে বসা, পা রাখা নাজায়েয হবে কেন?”

          এর জবাবে বলতে হয় যে, মাহিউদ্দীনের দেয়া উদাহরণ অনুযায়ী কেবল মসজিদের ভিতরের অর্থাৎ মেঝের নকশা বিশিষ্ট জায়নামাজের উপর নামাজ পড়া জায়েয হতে পারত। কিন্তু মসজিদের মেঝে আর পুরো মসজিদ কখনই এক কথা নয়। সুতরাং পবিত্র কা’বা শরীফ, মসজিদে নববী শরীফ, বাইতুল মুকাদ্দাসসহ ইত্যাদি মসজিদের ভিতরে নামায পড়া আর উল্লিখিত মসজিদসমূহের ছবিযুক্ত জায়নামাযের উপর নামায পড়া, বসা, পা রাখা সমান নয়। কারণ পবিত্র কা’বা শরীফের ভিতরে নামায পড়তে নিষেধ করা হয়নি। কিন্তু পবিত্র কা’বা শরীফের ছাদে নামায পড়া মাকরূহ তাহরীমি বলা হয়েছে।

          কেননা, পবিত্র কা’বা শরীফের ছাদে নামায পড়লে পবিত্র কা’বা শরীফের তা’যীম বা সম্মান রক্ষা করা হয়না। বরং পবিত্র কা’বা ঘরের এহানতই করা হয়।

          এ প্রসঙ্গে “ফতওয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবের ১ম খন্ডের ১০৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

وتكره الصلاة على سطح الكعبة لما فيه من ترك التعظيم.

অর্থঃ- “কা’বা ঘরের ছাদের উপর নামায পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী। কেননা কা’বা ঘরের ছাদে নামাজ পড়লে কা’বা ঘরের এহানত করা হয়।”

           আর বেয়াদব আল্লাহ্ পাক-এর রহমত থেকে বঞ্চিত।” যেমন, কিতাবে আছে,

উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “বেয়াদব আল্লাহ্ পাক-এর রহমতে থেকে বঞ্চিত। আর বেয়াদব আল্লাহ্ পাক-এর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়ে আল্লাহ্ পাক-এর আযাব-গযবে পতিত হবে।

          কিতাবে আরো উল্লেখ আছে, বিনা জরুরত সাধারণ মসজিদের ছাদে উঠাও মাকরূহ। আর ছবিযুক্ত হওয়ার কারণেই উক্ত মসজিদসমূহের দেয়ালে বা ছাদে পা রাখা হয় যা মাকরূহের অন্তর্ভূক্ত।

          সুতরাং মসজিদের ছবিযুক্ত জায়নামাযে নামায পড়া মাকরূহ। অতএব, মাহিউদ্দিনের ক্বিয়াসও ভুল, বাতিল প্রমাণিত হলো। কেননা, ভিতরে নামায পড়া, আর দেয়ালে বা ছাদে পা রাখা সমান নয়। কারণ উল্লিখিত মসজিদসমূহের ছবিযুক্ত জায়নামায হওয়ার কারণেই দেয়ালে বা ছাদেই পা রাখা, বসা ও নামায পড়া হয়। যা মাকরূহ তাহরীমী, হারাম ও ক্ষেত্র বিশেষে কুফরী।

          এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাতের ৪৭তম সংখ্যার সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ পাঠ করুন।

{দলীলসমূহ ঃ- (১) বুখারী, (২) মুসলিম, (৩) নাসাঈ, (৪) মিশকাত, (৫) ফতহুল বারী, (৬) ওমদাতুল ক্বারী, (৭) এরশাদুস্ সারী, (৮) তাইসীরুল ক্বারী, (৯) শরহে নববী, (১০) মিরকাত, (১১) লুময়াত, (১২) আশয়াতুল লুময়াত, (১৩) শরহুত্ ত্বীবী, (১৪) তা’লীকুছ ছবীহ্, (১৫) মোযাহেরে হক্ব, (১৬) মিরআতুল মানাযীহ্, (১৭) তাফসীরে খাযেন, (১৮) বাগবী, (১৯) আহ্কামুল কুরআন, (২০) কবীর, (২১) দুররে মান্ছূর, (২২) যাদুল মাসীর, (২৩) ফাতহুল ক্বাদীর, (২৪) আবী সাউদ, (২৫) তাবারী, (২৬) ইবনে কাছীর, (২৭) মা’আরফুল কুরআন, (২৮) ফতওয়ায়ে আলমগীরী, (২৯) তাতার খানিয়া, (৩০) বাজ্জাজিয়া, (৩১) কাজীখান (৩২) খোলাছাতুল ফতওয়া, (৩৩) মাবছুত, (৩৪) হেদায়া, (৩৫) নেহায়া, (৩৬) এনায়া, (৩৭) বেক্বায়া, (৩৮) সেক্বায়া, (৩৯) বাহ্রুর রায়েক, (৪০) মারাকিউল ফালাহ্, (৪১) তাহ্তাবী, (৪২) কিতাবুশ্ শিফা, (৪৩) উছূলুশ শাশী, (৪৪) নুরুল আনোয়ার, (৪৫) আক্বায়িদে নস্ফী, (৪৬) ফিক্বহুল আকবার, (৪৭) তাকমীলুল ঈমান, (৪৮) ইমদাদুল আহ্কাম, (৪৯) দুররুল মুখতার ইত্যাদি}

মুহম্মদ আরিফুল খবীর

উপশহর, দিনাজপুর।

সুওয়ালঃ মৌলভী আজিজুল হকের অখ্যাত পত্রিকার নভেম্বর/২০০০ঈঃ সখ্যায় জিজ্ঞাসার-জবাব বিভাগে নিম্নোক্ত ৬৮২ নং জিজ্ঞাসা-জবাব ছাপা হয়।

জিজ্ঞাসাঃ তারাবীহ নামাযে কেউ যদি ইমাম সাহেবের সাথে ১০/১২ রাক্আত পায়, তবে তার ছুটে যাওয়া নামায আগে পড়বে, নাকি জামা’আতের সাথে বিতর নামায পড়বে, অতঃপর একা একা অবশিষ্ট তারাবীহ পড়বে।

জবাবঃ বিতর নামায জামা’আতের সাথে পড়ে নিবে। তারপর ছুটে যাওয়া তারাবীহ নামায আদায় করবে। অবশ্য ছুটে যাওয়া তারাবীহ নামায সুযোগ পেলে তারাবীহের জামা’আতের ফাঁকে ফাঁকেও পড়ে নিতে পারবে।

এখন আমার সুওয়ার হলো- ছুটে যাওয়া তারাবীহ্র নামায আদায় করা সম্পর্কে অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? দলীল সহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ ছুটে যাওয়া তারাবীহ্র নামায আদায় করা সম্পর্কিত উক্ত অখ্যাত পত্রিকার বক্তব্য অসম্পূর্ণ হয়েছে। বিত্র নামায রমজান শরীফে জামায়াতে আদায় করা মুস্তাহাব। যদি কেউ বিত্র নামায জামায়াতে আদায় করে তবে সেটা উত্তম হবে আর যদি কেউ জামায়াতে আদায় না করে তাতেও তার নামায সহীহ্ হয়ে যাবে এবং তাকে কোনরূপ দোষারোপ করা যাবেনা। তাই ছুটে যাওয়া তারাবীহ্র নামায, বিত্রের নামায জামায়াতের সাথে পড়ার পরে আদায় করাও যাবে অথবা বিত্র নামায জামায়াতের সাথে না পড়ে ছুটে যাওয়া তারাবীহ্র নামায আগে আদায় করাও যাবে। অথচ উক্ত পত্রিকায় শুধুমাত্র বিত্র নামায জামায়াতে পড়ার কথা বলা হয়েছে।

          উল্লেখ্য, তারাবীহ্র নামাযের ওয়াক্ত সম্পর্কে বিশ্ব বিখ্যাত ফতওয়ার কিতাবসমূহে যেমন, বাহরুর রায়েক, ফতওয়ায়ে কাজীখান, তাতারখানিয়া, শামী, জাওহারাতুন নাইয়্যারাহ্, নুরুল ইজাহ্ কিতাবের হাশিয়ায়, হেদায়া মা’আদ দেরায়া কিতাবের হাশিয়ায়, গায়াতুল আওতার ইত্যাদি কিতাবে মোট তিনটি মত উল্লেখ করা হয়েছে; যথাক্রমে- (১) সূর্য অস্ত যাওয়ার পর হতে সুবহে সাদিক পর্যন্ত, অর্থাৎ তারাবীহ্র নামাযের ওয়াক্ত হলো, ইশার নামাযের পূর্ব এবং পরে এবং বিত্র নামাযের পূর্বে ও পরে সুবহে সাদিক পর্যন্ত। (২) ইশার নামাযের পর হতে বিত্রের নামাযের পূর্ব পর্যন্ত এবং (৩) ইশার নামাযের পর হতে সুবহে সাদিক পর্যন্ত বিতরের নামাযের পূর্বে এবং পরে তারাবীহ্র নামাযের ওয়াক্ত।

          আরো উল্লেখ্য যে, “বাহরুর রায়েক, শামী, গায়াতুল আওতার” ইত্যাদি কিতাবে উল্লেখ আছে, “প্রথম মতটি কেউই গ্রহণ করেন নাই।”

          “খোলাছাতুল ফতওয়া” কিতাবে ২য় মতটিকে সহীহ্ বলে উল্লেখ  করা হয়েছে।

          আর ফতওয়ায়ে কাফী, বাহরুর রায়েক, আলমগীরী, খানিয়া, মুহীত, মারাকিউল ফালাহ্ আদদুররুল মুখতার, শামী, মাজালেছুল আবরার ইত্যাদি কিতাব সমূহে তৃতীয় মতটিকে সকল ওলামা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের মতে সহীহ্, বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

          কাজেই বিত্র নামায জামায়াতে আদায় করার পর যেরূপ ছুটে যাওয়া তারাবীহ্ নামায আদায় করা জায়েয তদ্রুপ বিত্র নামায জামায়াতে না আদায় করে ছুটে যাওয়া তারাবীহ্র নামায আদায় করার পরও বিত্র নামায পড়া জায়েয রয়েছে।

          {দলীলসমূহ :-(১) জখীরা, (২) কুনিয়া, (৩) ক্বিফায়া, (৪) কাফি,(৫) এনায়া, (৬) বেনায়া,

(৭) হেদায়া, (৮) কুদূরী, (৯) শরহে বেকায়া,  (১০) কানজুদ দাকায়েক, (১১) মা’দানুল হাকায়েক, (১২) মুহীত, (১৩) বদরুল মুত্তাকা, (১৪) শরহুল মুলতাকা, (১৫) তাবয়্যীন, (১৬) তানবীরুল আবছার, (১৭) মাবসুত, (১৮) হেদায়া মা’আদ দেরায়া, (১৯) বাহরুর রায়েক,

(২০) মাজমাউল আনহুর, (২১) মুলতাকাল আবহুর, (২২) আলমগীরী, (২৩) আদ্ দুররুল মুখতার, (২৪) খোলাছাতুল ফতওয়া, (২৫) ফতওয়ায়ে মজমুয়া, (২৬) কাজীখান, (২৭) সিরাজুল ওহহাজ, (২৮) গায়াতুল আওতার, (২৯) হাশিয়াতুত তাহতাবী আলা দুররিল মুখতার, (৩০) জাওহারাতুন নাইয়ারাহ, (৩১) ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া, (৩২) শামী, (৩৩) নূরুল হেদায়া, (৩৪) দুররুল হেকাম, (৩৫) আইনুল হেদায়া, (৩৬) তাতারখানিয়া, (৩৭) ফতহুল ক্বাদির, (৩৮) রদ্দুল মোহতার, (৩৯) গায়াতুল বয়ান, (৪০) নুরুল ইজাহ, (৪১) নুরুল ইছবাহ, (৪২) মারাকিউল ফালাহ্, (৪৩) আইনী,(৪৪) মাজালেছুল আবরার ইত্যাদি।}

          (বিঃ দ্রঃ- বিস্তারিত জানতে হলে- মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ৮০তম সংখ্যার সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ পাঠ করুন। সেখানে বিশ্ববিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য ফতওয়ার কিতাব থেকে পৃষ্ঠা নম্বর সহ ৩১টি আরবী ইবারত উল্লেখ করে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।)

মুছাম্মত কামরুন্নাহার (হালিমা)

চিলমারী, কুড়িগ্রাম।

সুওয়ালঃ- হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে মৌলভী আহ্মদ শফী সম্পাদনায় প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকার নভেম্বর/২০০০ঈঃ সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-সমাধান বিভাগে ৩০৯৫ নং জিজ্ঞাসার-সমাধানে বলা হয়েছে “শরীয়তে পা ছুঁয়ে সালাম বা কদমবুছী করা নিষিদ্ধ …….।”

          এখন আমার সুওয়াল হলো- কদমবুছী করা সর্ম্পকে অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? আর সত্যিই কি শরীয়তে কদমবুছী করা নিষিদ্ধ? অথচ আমরা জানি কদমবুছী করা সুন্নত। দয়া করে দলীলসহ সঠিক জাওয়াব জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ- কদমবুছী করা সম্পর্কে আহ্মক শফীর অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য ডাহা মিথ্যা, দলীল বিহীন ও কুফরীমূলক হয়েছে। কারণ কদমবুছীর মত একটি শরীয়তসম্মত তথা সুন্নত আমলকে বিনা দলীলে শরীয়তে নিষেধ বলে আখ্যায়িত করেছে।

          অথচ ইসলামী আকাঈদের ফতওয়া হচ্ছে- কোন সুন্নতকে অস্বীকার করা, অবজ্ঞা করা, অপছন্দ করা ইত্যাদি কুফরীর অন্তর্ভূক্ত। এমনকি সুন্নত তো দূরের কথা শরীয়তে কোন জায়েয ও হালাল বিষয়কে নাজায়েয ও হারাম অভিহিত করাও কুফরী। আসলে আহমক ছাহেব শরীয়ত সম্পর্কে চরম পর্যায়ের মূর্খ হওয়ার কারণেই এবক্তব্য পেশ করেছে। এরূপ চরম মূর্খদের মূর্খতা নিরসনের উদ্দেশ্যে “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” পত্রিকার ফতওয়া, মাসয়ালা-মাসায়েল ভালভাবে পাঠ করা, অনুধাবণ করা উচিত এবং আলোচ্য মাসয়ালার ক্ষেত্রে জানা উচিত যে, কদমবুছী স্বয়ং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুমগণের মধ্যকার খাছ আমলের অন্তর্ভূক্ত। অর্থাৎ হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুমগণ আল্লাহ্র রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তা’যীম বা সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে কদমবুছী করেছেন। আর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা কবুল ও পছন্দ করেছেন। মূলতঃ আমলটি করার পিছনে হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুমগণের উদ্দেশ্য ছিল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি হাছিল করা। কেননা তাঁকে সন্তুষ্ট করার মধ্যেই আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টি নিহিত। আর তাঁরা তাঁকে সর্ববিধ আমলের দ্বারা পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট করেছেন এবং আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টি লাভ করেছেন। তাঁদের শানে ইরশাদ হয়েছে,

رضى الله عنهم ورضوا عنه-

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক তাঁদের (হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের) প্রতি সন্তুষ্টি হয়েছেন এবং তাঁরাও তাঁর (আল্লাহ্ পাক-এর) প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।”

          কাজেই আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি হাছিলের নিমিত্তে হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুমগণের যে আমলটি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট কবুলকৃত ও পছন্দনীয় সেই আমলকে জায়েয ও সুন্নতের পরিবর্তে নিষিদ্ধ তথা হারাম বলে ফতওয়া দেয়া সুস্পষ্ট কুফরী। এ কুফরী ফতওয়া থেকে সকলের সতর্ক ও বিরত থাকা ফরয। নিম্নে দলীল সহ সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো। কেননা কদমবুছী করা যে শরীয়ত সম্মত তথা সুন্নত তা খোদ সিহাহ্ সিত্তাহ্ শরীফের মধ্যেই উল্লেখ আছে। যেমন, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদি¦য়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুমগণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কদমবুছী করেছেন।

          এ প্রসঙ্গে সহীহ্ “আবু দাউদ শরীফের” ২ জিঃ ৭০৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

عن الوازع بن زارع عن جدها وكان فى وفد عبد القيس قال لما قدمنا المدينة فجعلنا نتبادر من رواحلنا فنقبل يد رسول الله صلى الله عليه وسلم ورجله.

অর্থঃ- “হযরত ওযায়ে ইবনে যারে, তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন- তিনি বলেন, আমরা আব্দুল কায়েস গোত্রে থাকা অবস্থায় যখন মদীনা শরীফে আসতাম, তখন আমরা ছাওয়ারী হতে তাড়াতাড়ি অবতরণ করে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাত ও পা মুবারকে বুছা (চুম্বন) দিতাম।” অনুরূপ বযলুল মাজহুদ জিঃ৬ পৃঃ৩২৮, ফতহুল বারী জিঃ১১ পৃঃ৫৭, মেশকাত শরীফ, মেরকাত জিঃ৭ পৃঃ৮০, আশয়াতুল লুময়াত, মোযাহেরে হক্ব, এলাউস সুনান জিঃ১৭, ৪২৬ পৃষ্ঠা ইত্যাদি কিতাব সমূহেও উল্লেখ আছে।

          শুধু তাই নয় বরং হাদীস শরীফে কদমবুছী করার নির্দেশ রয়েছে এবং বিশেষ করে মাকে কদমবুছী করার ফযীলতও বর্ণিত হয়েছে। যেমন, এ প্রসঙ্গে ফিক্বাহ্রে বিখ্যাত কিতাব “মাব্সূত লিস্ সারাখসী” ১ম জিঃ ১৪৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে,

روى عن النبى صلى الله عليه وسلم كان يقبل فاطمة- ويقول اجدمنها ريح الجنة وقبل ابوبكر رأس عائشة- وقال صلى الله عليه وسلم من قبل رجل امه فكانما قبل عتبة الجنة.

অর্থঃ- “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুজুরে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি হযরত ফাতেমা রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহাকে বুছা (চুম্বন) দিতেন এবং বলতেন, “আমি তার থেকে বেহেস্তের সুঘ্রাণ পাই। এবং হযরত আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহা-এর মাথায় বুছা (চুম্বন) দিতেন।”

 আল্লাহ্ পাক-এর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, “যে ব্যক্তি তার মায়ের কদমবুছা দিল, (অর্থাৎ পা চুম্বন করল) সে ব্যক্তি মূলতঃ বেহেশ্তের চৌকাঠের উপর চুম্বন করলো।”

 তাছাড়া এক ছাহাবী অপর ছাহাবীকেও কদমবুছী করেছেন। যেমন, এ প্রসঙ্গে কিতাবে উল্লেখ আছে,

عن زيد بن ثابت انه قبل يد انس- واخرج ايضا ان عليا قبل يد العباس ورجله.

অর্থঃ- “হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি হযরত আনাস ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর হাত মোবারকে বুছা (চুম্বন) দিয়েছেন।” তিনি এটাও বর্ণনা করেন যে, “হযরত আলী ইবনে আবী তালিব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর হাত ও পা মুবারকে বুছা (চুম্বন) দিয়েছেন।” (ফতহুল বারী জিঃ১১ পৃঃ৫৭, তোহ্ফাতুল আহ্ওয়াযী শরহে তিরমিযী জিঃ৭ পৃঃ৫২৮)

          উল্লেখ্য যে, আহ্মক ছাহেব তার আহ্মকীর কারণেই কদমবুছীর অর্থ বুঝতে পারেনি। কারণ হাত দিয়ে পা  ছোঁয়াকে বা পা স্পর্শ করাকে সালাম বা কদমবুছী বলে না বরং হাত দিয়ে পা ছুঁয়ে বা পা স্পর্শ করে হাতে চুমো দেয়াকে দস্তবুছী বলে।

কদমবুছীর সংজ্ঞা

(قدم بوسى) কদমবুছীর (قدم) কদম শব্দটি আরবী। এর  অর্থ হলো পা, আর (بوسى) বুছী ফার্সী শব্দ যার অর্থ হলো চুম্বন। সুতরাং (قدم بوسى) কদমবুছীর অর্থ হলো পা চুম্বন বা পদ চুম্বন করা। অর্থাৎ সরাসরি মুখ দিয়ে পায়ে চুমা দেয়াকে কদমবুছী বলে। আর দস্তবুছী শব্দের অর্থ হলো হাত দিয়ে পা ছুঁয়ে বা স্পর্শ করে হাতে চুমা দেয়া। সুতরাং বর্তমানে যা করা হয় তা কদমবুছী নয় দস্তবুছী। কাজেই বর্তমানে প্রচলিত দস্তবুছী জায়েয সুন্নত এবং শরীয়তেরই নির্দেশ।

          অতএব প্রমাণিত হলো সালাম ও কদমবুছীর সাথে হাত দিয়ে পা ছোঁয়ার কোন সম্পর্ক  নেই। তেমনি সালামের সাথে কদমবুছীরও কোন সম্পর্ক নেই। কেননা সালাম ও কদমবুছী সম্পূর্ণ পৃথক। সালাম দেয়ার এক হুকুম। আর কদমবুছী করার অন্য হুকুম। সালাম দেয়া হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খাছ সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত এবং সালামের জাওয়াব দেয়া ওয়াজিব। আর কদমবুছী হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুমগণের খাছ সুন্নত যা করা হয় তা’যীম, আদব, শ্রদ্ধা-ভক্তি, মুহব্বত ও বরকত হাছীলের উদ্দেশ্যে। এ উদ্দেশ্যে হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদি¦য়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুমগণ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কদম মুবারকে চুম্বন দিতেন এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদি¦য়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুমগণও একজন অপরজনের কদমবুছী করেছেন যা উপরোক্ত হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত হলো। তাই হাদীস শরীফের দৃষ্টিতে ফুকাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ ফতওয়া দেন যে, পীর বুযুর্গ, পরহেজগার আলিম, ওস্তাদ, মুরুব্বী, পিতা-মাতা ও শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্মানের অধিকারী ব্যক্তিদের কদমবুছী করা সুন্নত, সুন্নতে ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম, তাবেয়ী ও আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের অন্তর্ভূক্ত। কদমবুছীর ন্যায় উপরোক্ত ব্যক্তিদের দস্তবুছী অর্থাৎ হাত চুম্বন করাও সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত ও হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত।

          উল্লেখ্য, হাটহাজারী মাওলানাদের ইল্মের পরিধি এতই কম যে, তারা নিজেদের (দেওবন্দী) সিলসিলার কিতাব সমূহেরও খবর রাখেনা।

          কারণ তারা ও দেওবন্দী মাওলানারা যাদেরকে বুযুর্গ মনে করে, তাদের লিখা কিতাব যেমন ইমদাদুল আহ্কাম, ফতওয়ায়ে রশীদিয়া, মাওয়ায়েযে আশরাফিয়া, ফতওয়ায়ে মাহ্মুদিয়া, জাওয়াহিরুল ফিক্বাহ্, ইলাউস সুনান, আহ্সানুল ফতওয়া ইত্যাদি কিতাব সমূহেও উল্লেখ আছে যে, সম্মান প্রদর্শনার্থে পীর, বুযুর্গ, আলেম, ওস্তাদ ও পিতা-মাতাকে কদমবুছী করা সুন্নতে সাহাবা, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন ও আওলিয়া-ই-কিরাম।

          (বিঃদ্রঃ- এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাতের ১২ তম সংখ্যা পাঠ করুন। সেখানে ১১৭ টি দলীলের দ্বারা প্রমাণ করা হয়েছে যে, সম্মান ও তা’যীমার্থে পীর ছাহেব, বুযুর্গ, ওস্তাদ, আলেম ও পিতা-মাতাকে কদমবুছী করা সুন্নতে সাহাবা, তাবেঈন ও আউলিয়া-ই-কিরাম।

মুহম্মদ মোখলেছুর রহমান

সম্পাদক- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত

লোহাকুচি, কালীগঞ্জ, লালমনিরহাট।

সুওয়ালঃ  আমাদের এলাকায় এক লোক বিবাহ্ করার পর ৪/৫ বছর তার স্ত্রীর সহিত ঘর-সংসার করার পর তার স্ত্রীকে তিন তালাক প্রদান করে ও দেন মোহরসহ স্ত্রীকে বিদায় করে দেয়। এ অবস্থায় ২/৩ বছর গত হওয়ার পর একদিন রাতে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর ভাইয়েরা তাদের বাড়িতে সেই তালাকদাতাকে আটক করে, পরে স্থানীয় লোকজন উক্ত তালাকদাতা পুরুষ ও মহিলার বিবাহ্ পড়ানোর লক্ষ্যে কাবিননামা রেজিষ্ট্রারী করে ও সেই মজলিসে আমাদের সমাজের ইমাম ছাহেব বিবাহ্ পড়িয়ে দেয়। পরে সমাজের কিছু সংখ্যক লোক ইমাম ছাহেবের কাছে জানতে চায় যে, আপনি কিভাবে এই বিবাহ্ পড়ালেন? তখন ইমাম ছাহেব সঠিক জবাব দিতে না পেরে ফতওয়া তালাশ শুরু করে। অতপর ইমাম ছাহেব মৌখিক ফতওয়া নিয়ে এসে ফতওয়া অনুযায়ী নিজ স্ত্রীর সহিত বিবাহ্ দোহরায়ে নিয়েছে এবং তওবাহ ও কাফ্ফারা আদায় করেছে এবং উক্ত তালাকদাতা পুরুষ ও তালাকপ্রাপ্তা মহিলার বিবাহ্ শুদ্ধ হয় নাই মর্মে ঘোষণা দিয়েছে। আর উক্ত বিবাহ্ মজলিসে যে সমস্ত লোক উপস্থিত ছিল তাদের বিবাহ্ নতুন করে দোহ্রানোর জন্য ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু ইমাম ছাহেব নিজ স্ত্রীর সহিত বিবাহ্ দোহরানো, কাফ্ফারা আদায় ও তওবা এ সমস্ত কাজ একাই করেছেন এবং সমাজের কাছে ভুল স্বীকার করেছেন। বর্তমানে আমরা এই ইমাম ছাহেবের পিছনে নামায পড়ে আসছি।

এখন আমার প্রশ্ন- এই ইমামের পিছনে নামাজ ছহীহ্ শুদ্ধ হবে কি-না? ও নামাজ পড়া যাবে কি-না?

জাওয়াবঃ সুওয়ালের বিবরণ অনুযায়ী বুঝা যায় যে,  প্রথমে ইমাম সাহেবের মাসয়ালা তাহ্ক্বীক্ব না থাকার কারণে তিনি উক্ত স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিবাহ্ পড়িয়ে দেন। পরে মাসয়ালা তাহক্বীক করে দেখলেন যে, তাঁর বিবাহ্ পড়ানো শুদ্ধ হয়নি। তাই তিনি তওবা-ইস্তেগ্ফার করেন এবং সতর্কতামূলক নিজ স্ত্রীর বিবাহ্ও দোহরায়ে নেন। আর সাথে সাথে এ ঘোষণাও দেন যে, উক্ত স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার বিবাহ্ শুদ্ধ হয়নি এবং যারা এ বিবাহ্তে জড়িত ছিল তারা যেন নিজ নিজ বিবাহ্ দোহরায়ে নেয়।

          অর্থাৎ যারা এ বিবাহ্কে জায়েয মনে করবে তাদেরকে তওবা-ইস্তেগ্ফার করার সাথে সাথে নিজ স্ত্রীর বিবাহ্ও দোহরাতে হবে। আর জায়েয মনে না করে থাকলে শুধু তওবা-ইস্তেগ্ফার করতে হবে।

          মূলকথা হলো যে, ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, জেনে হোক কিংবা না জেনে হোক যারা এ বিবাহ্তে জড়িত ছিল তাদের প্রত্যেকের উচিত উক্ত বিবাহ্ বাতিল করে দেয়া এবং খালিছ তওবা-ইস্তেগ্ফার করা।

          আর ইমাম সাহেব যেহেতু উক্ত বিবাহ্ শুদ্ধ হয়নি মর্মে ঘোষণা দিয়েছেন এবং তওবা-ইস্তেগ্ফার করেছেন সুতরাং তিনি নিঃসন্দেহে হক্ব তালাশী, তাঁর পিছনে নামাজ পড়তে কোনই অসুবিধা নেই। বরং নামাজ সহীহ্-শুদ্ধভাবেই আদায় হবে।

          {দলীলসমূহঃ- (১) আলমগীরী, (২) আইনুল হেদায়া, (৩) নূরুল হেদায়া, (৪) শরহে বেকায়া, (৫) ফতহুল ক্বাদীর, (৬) গায়াতুল আওতার, (৭) কানজুদ্ দাক্বায়েক্ব, (৮) তাবয়ীনুল হাক্বায়েক্ব, (৯) বাহ্রুর রায়েক্ব, (১০) বেনায়া, (১১) মাজমাউল আনহুর, (১১) সিরাজুল ওয়াহ্হাজ ইত্যাদি।}

মুহম্মদ রহমতুল্লাহ্

টেকপাড়া, সোনারগাঁ।

সুওয়ালঃ  আমাদের জানা মতে, পবিত্র কালামুল্লাহ্ শরীফে ১৪টি সিজদা রয়েছে। এ সিজদাগুলি আদায় করা কি? কখন থেকে সিজ্দা আদায় করা শুরু হয়েছে? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ  কালামুল্লাহ্ শরীফে আমাদের হানাফী মাযহাব মোতাবেক তিলাওয়াতে সিজদা ১৪টি। প্রত্যেকটি সিজদার আয়াত তিলাওয়াত করলে তা আদায় করা ওয়াজিব হয়ে যায়। আর প্রতিটি তিলাওয়াতে সিজদাই হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত। অর্থাৎ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশেই উল্লিখিত সিজদাগুলি আদায় করতে হবে।

তিলাওয়াতে সিজদাসমূহ কোন্ কোন্

সূরায় রয়েছে নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো-

(১) সূরা আ’রাফ-এর শেষ আয়াতে, (২) সূরা রা’দে, (৩) সূরা নহলে, (৪) সূরা বণী ইসরাঈলে, (৫) সূরা মরইয়মে, (৬) সূরা হজ্বে, (৭) সূরা ফুরক্বানে, (৮) সূরা নমলে, (৯) সূরা সিজদায়ে, (১০) সূরা ছোয়াদে, (১১) সূরা হা-মীম সিজদায়ে, (১২) সূরা নজমে, (১৩) সূরা ইন্শিক্বাক্বে, (১৪) সূরা ইক্বরায়ে।

তিলাওয়াতে সিজ্দার শর্ত

          তিলাওয়াতে সিজদা নামাজের যাবতীয় শর্ত সমূহের আওতাধীন দু’ তাকবীরের মধ্যবর্তী একটি সিজ্দা মাত্র। উহাতে হাত উঠাতে হয়না। তাশাহুদ পড়তে ও সালাম ফিরাতেও হয় না। নামাজের সিজ্দায় যা পাঠ করা হয় উহাতেও তাই পাঠ করতে হবে।

          উল্লেখ্য, সিজদার আয়াত বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ সূরা পাঠ করা মাকরূহ। আর যদি সম্পূর্ণ সূরা বাদ দিয়ে শুধু সিজ্দার আয়াত পাঠ করে তা যদিও মাকরূহ হবে না তবে উহার সাথে দু/এক আয়াত মিলিয়ে পাঠ করা মুস্তাহাব।

          আরো উল্লেখ্য যে, যদি কোন ব্যক্তি আওয়াজ করে কুরআন শরীফ তিলাওয়াতকালীন সিজ্দার আয়াত এসে  যায় তখন সিজদার আয়াত অনুচ্চ স্বরে (চুপে চুপে) তিলাওয়াত করা মুস্তাহাবের অন্তর্ভূক্ত।

          {দলীলসমূহঃ- (১) কুদুরী, (২) হেদায়া, (৩) নূরুল হেদায়া, (৪) আইনুল হেদায়া, (৫) ফতহুল ক্বাদীর, (৬) আলমগীরী, (৭) বাহরুর রায়েক, (৮) কাজীখান, (৯) তাতারখানিয়া, (১০) শামী, (১১) নেহায়া, (১২) এনায়া, (১৩) গায়াতুল আওতার (১৪) আল ফিক্বহু আলা মাযাহিবিল আরবায়া ইত্যাদি।}

ফিক্বাহ্র কিতাব ছাড়াও হাদীস শরীফ এবং তাফসীরের কিতাবেও তিলাওয়াতে সিজদার বর্ণনা রয়েছে।

মাওলানা মুহম্মদ হারুনুর রশীদ

খতীব- সেনপাড়া জামে মসজিদ, রংপুর।

সুওয়ালঃ বর্তমানে আমাদের দেশে ডেঙ্গু জ্বরের ব্যাপক প্রাদূর্ভাব ঘটে। এ নিয়ে অনেকে পত্র-পত্রিকায় লিখে থাকে এবং অনেকে মৌখিকভাবে বলে থাকে যে, “ইহা নাকি খোদায়ী গযব।”

          এ কথা কতটুকু শরীয়তসম্মত? আর সত্যিই কি ইহা খোদায়ী গযব? দয়া করে কুরআন-সুন্নাহ্র দৃষ্টিতে জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ আল্লাহ্ পাক মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন যেন তারা আল্লাহ্ পাক-এর ইবাদত-বন্দেগী করে তাঁর মুহব্বত-মা’রিফাত, রেজামন্দী হাছিল করে।

          এ প্রসঙ্গে  আল্লাহ্ পাক বলেন,

وما خلقت الجن والانس الا ليعبدون.

অর্থঃ- “আমি জ্বিন ও মানব জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদত-বন্দেগীর জন্য সৃষ্টি করেছি।” (সূরা জাারিয়াত/৫৬)

          এর ব্যাখ্যায় বলা হয়, আল্লাহ্ পাক-এর মুহব্বত-মা’রিফাত হাছিল করার জন্য। অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক মানব জাতিকে তাঁর মুহব্বত-মা’রিফাত  দেয়ার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। এখন কে কতটুকু মুহব্বত-মা’রিফাত লাভের উপযুক্ত সেটা অবশ্যই আল্লাহ্ পাক পরীক্ষা করে দান করেন। এ প্রসঙ্গে  আল্লাহ্ পাক বলেন,

ولنبلونكم بشيئى من الخوف والجوع ونقص من الاموال والانفس والثمرات وبشر الصبرين الذين اذا اصابتهم مصيبة قالوا انا لله وانا اليه راجعون اولئك عليهم صلوت من ربهم ورحمة واولئك هم المهتدون.

অর্থঃ-  “নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু বিষয় দিয়ে। যেমন- ভয়, ক্ষুধা, মালের ক্ষতি করে, জানের ক্ষতি করে এবং ক্ষেত-খামার, ফল-ফলাদির ক্ষতি করে। আর ধৈর্য্যশীলদেরকে সুসংবাদ দান করুন। যখন তাদের উপর আপদ-বিপদ, মুছীবত পৌঁছে তখন তারা বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহ্ পাক-এর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করব। তাদের প্রতিই আল্লাহ্ পাক-এর ছলাত ও রহমত এবং তারাই হেদায়েতপ্রাপ্ত।” (সূরা বাক্বারা/৫৫, ৫৬, ৫৭)

          উপরোক্ত আয়াত শরীফসমূহের ব্যাখ্যায় যারা মুহাক্কিক মুদাক্কিদ মুফাছ্ছিরে কিরাম তাঁরা বলেন, আল্লাহ্ পাক বান্দাদেরকে যে পরীক্ষা করে থাকেন তা হচ্ছে তিন প্রকার।

প্রথম প্রকার হচ্ছে- “তার মর্যাদা বৃদ্ধি করার জন্য।”

          দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে- “তার গুণাহ্-খতা ক্ষমা করার জন্য।”

          তৃতীয় প্রকার হচ্ছে- “তার প্রতি আযাব-গযব নাযিল করে তাকে শাস্তি দেয়ার জন্য।”

          এর ব্যাখ্যায় গাওছুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আওলিয়া, হযরত বড় পীর সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “উপরোক্ত তিন প্রকার পরীক্ষার তিনটি লক্ষণ রয়েছে।”

          প্রথম প্রকারের লক্ষণ হলো- “আল্লাহ্ পাক যার মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য বিপদাপদ দিয়ে থাকেন সে ব্যক্তি বিপদগ্রস্থ হওয়া মাত্রই ইস্তেগ্ফার, তওবার মধ্যে মশগুল হয়ে যায় এবং ওজরখায়ী করে, বিনয় প্রকাশ করে। তবে সে ক্ষতিগ্রস্থও হয়।

          এ প্রসঙ্গে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যখন বিপদাপদ, মুছীবত আসে তখন ভাল-মন্দ সব একাকার করে দেয়। তখন হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদিয়াল্লাহু আনহা জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! খারাপ লোক যে পাপ করেছে সে বিপদগ্রস্থ হবে, কিন্তু যে নেক্কার সে কেন ক্ষতিগ্রস্থ হবে? তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, প্রত্যেকেই তার আমল অনুযায়ী বদলা পাবে। বদকার বদ আমলের জন্য শাস্তি ভোগ করবে। আর যে নেক্কার, কোন ত্রুটি করেনি সে এর বিনিময়ে মর্যাদা লাভ করবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,

الا من تاب وامن وعمل عملا صالحا فاولئك يبدل الله سياتهم حسنت.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি তওবা করে এবং ঈমান গ্রহণ করে এবং নেক আমল করে আল্লাহ্ পাক ঐ সকল লোকের গুণাহ্সমূহ নেকীতে পরিবর্তন করে দেন।”  অর্থাৎ মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। (সূরা ফুরকান/৭০)

          দ্বিতীয় প্রকারের লক্ষণ হলো- “আল্লাহ্ পাক যার গুণাহ্-খতা ক্ষমা করার জন্য বিপদাপদ দিয়ে থাকেন, সে ব্যক্তি বিপদগ্রস্থ হওয়া মাত্রই ধৈর্য্যধারণ করে এবং লা-জাওয়াব হয়ে যায়।

          এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,

ان تجتنبوا كبائر ما تنهون عنه نكفر عنكم سيئاتكم وندخلكم مدخلا كريما.

অর্থঃ- “যদি তোমরা কবীরা গুণাহ্সমূহ হতে বিরত থাক যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে, তাহলে আমি তোমাদের ছগীরা গুণাহ্সমূহ ক্ষমা করে দিব এবং সম্মানিত প্রবেশস্থলে প্রবেশ করাবো অর্থাৎ জান্নাতি করে দিব।” (সূরা নিসা/৩১)

          আর তৃতীয় প্রকারের লক্ষণ হলো- “আল্লাহ্ পাক যাকে শাস্তি দিতে চান তার উপর বিপদাপদ নাযিল করেন, সে ব্যক্তি বিপদগ্রস্থ হয়ে তওবা-ইস্তেগ্ফার তো করেই না, এমন কি ধৈর্য্যধারণও সে করেনা। বরং সে ব্যক্তি বিপদগ্রস্থ হওয়া মাত্রই আল্লাহ্ পাককে গালি-গালাজ করা শুরু করে দেয়।

          এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,

ظهر الفساد فى البر والبحر بما كسبت ايدى الناس ليذقهم بعض الذى عملوا لعلهم يرجعون.

অর্থঃ- “যমীনে, পানিতে ফিৎনা-ফাসাদ, আযাব-গযব, বিপদাপদ এসে থাকে মানুষের (বদ) আমলের কারণে যেন তারা তাদের আমলের সাধ গ্রহণ করে। আশা করা যায় তারা ফিরে আসবে।” (সূরা রূম/৪১)

          উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা ইহা পরিস্ফুটিত হলো যে, কোন আপদ-বিপদ, বালা-মুছিবত, রোগ-শোক, অসুখ-বিসুখ, মহামারি ইত্যাদি নাযিল হলেই সেটা গযব বলে উল্লেখ করা যাবে না। কারণ বিভিন্ন শ্রেণীর লোকের বিভিন্ন হুকুম। কারো জন্য রহমত স্বরূপ, কারো জন্য গযব স্বরূপ।

          এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফত কালে আমওয়াছের মহামারীতে আশারায়ে মুবাশ্শারা-এর অন্যতম ব্যক্তিত্ব হযরত আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ্ রদিয়াল্লাহু আনহুসহ আরো অনেক ছাহাবী রদিয়াল্লাহু আনহুম শাহাদত বরণ করেন। এই মহামারী তাঁদের জন্য রহমতের কারণ স্বরূপ নাযিল হয়েছে।

          আরো উল্লেখ্য, হযরত মূসা আলাইহিস্ সালাম-এর যুগে যে মহামারি এসেছিল তা তাঁর ক্বওমের জন্য গযব স্বরূপ নাযিল হয়েছিল।

          অতএব, আমাদের দেশে যে ডেঙ্গু জ্বর দেখা দিয়েছে তা সকলের জন্য গযবের কারণ নয়। বরং কারো জন্য তা গযবের কারণ আর কারো জন্য তা রহমতের কারণ। তবে তা কার জন্য রহমত ও কার জন্য গযব তা তার লক্ষণই বর্ণনা করবে।

{দলীলসমূহঃ- (১)  আহকামুল কুরআন জাস্সাস, (২) কুরতুবী, (৩) মাযহারী, (৪) খাযেন, (৫) বাগবী, (৬) রুহুল মায়ানী, (৭) রুহুয় বয়ান, (৮) ইবনে কাছীর, (৯) তাবারী, (১০) ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, (১১) ফতহুল গায়ব, (১২) উসদুল গাবাহ, (১৩) বেদায়া ওয়াল নেহায়া, (১৪) তাবাকাতে ইবনে সা’দ, (১৫) ইছাবা, (১৬) তাহজিবুত্ তাহ্জিব, (১৭) আল্ কামিল, (১৮) হায়াতে ছাহাবা, (১৯) হিলইয়াতুল আওলিয়া, (২০) তারীখে ইবনে খালদূন ইত্যাদি।}

মাওলানা নেছার আহমদ মুনিরী

ঘোড়াশাল, নরসিংদী।

সুওয়ালঃ মসজিদের ভিতর জানাযার নামায পড়ার ব্যাপারে শরীয়তের ফায়ছালা কি? দলীলসহ জানতে বাসনা রাখি।

জাওয়াবঃ হানাফী মাযহাব মোতাবিক মসজিদের ভিতরে জানাযার নামায পড়া মাকরূহ তাহরীমী। চাই লাশ মসজিদের ভিতরে থাকুক অথবা বাইরে থাকুক।

          এ প্রসঙ্গে হানাফী মাযহাবের বিখ্যাত ফিক্বাহ্র কিতাব “ফতওয়ায়ে আলমগীরী”১ম খন্ড ১৬৫পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

وصلاة الجنازة فى المسجد الذى تقام فيه الجماعة مكروهة سواء كان الميت والقوم فى المسجد او كان الميت خارج المسجد والقوم فى المسجد …….. هو المختار.

অর্থঃ- “যে মসজিদে জামায়াত হয় সেই মসজিদে জানাযার নামায পড়া মাকরূহ তাহরীমী। চাই লাশ ও মুক্তাদী মসজিদের ভিতরে হোক অথবা লাশ মসজিদের বাইরে ও মুক্তাদী মসজিদের ভিতরে। উভয়ের একই হুকুম। ……… এটাই ফতওয়াগ্রাহ্য অভিমত।”

          অনুরূপ নিম্নোক্ত সকল বিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য ফিক্বাহ্র কিতাবে উল্লেখ আছে। যেমন, খোলাছা, রদ্দুল মুহতার, দুররুল মুখতার, শামী, বাহরুর রায়েক, ফতহুল ক্বাদির, মারাকিউল ফালাহ্, বাহারে শরীয়ত ইত্যাদি।

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব