মুহম্মদ মিজানুর রহমান খাঁন
লুটন, ইউ. কে
সুওয়ালঃ কুরআন-হাদীসের মধ্যে মীলাদুন্ নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুষ্ঠানিকতার বর্ণনা নেই। জনৈক ব্যক্তির উপরোক্ত বক্তব্য সঠিক কি-না? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ না, জনৈক ব্যক্তির উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়নি। বরং ভুল ও অশুদ্ধ হয়েছে। কুরআন শরীফ এবং হাদীস শরীফে মীলাদ শরীফ ও তার আনুষ্ঠানিকতার বর্ণনা অবশ্যই রয়েছে। কেননা যেখানে মীলাদ মাহ্ফিল বা মীলাদ শরীফের ব্যবহারিক ও পারিভাষিক অর্থই হচ্ছে আখিরী নবী, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছানা-ছীফত বর্ণনা করা। আর তাঁর ছানা-ছীফতের মূল উৎসই হচ্ছে কুরআন শরীফ।
এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
كان خلقه القران.
অর্থঃ- “হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চরিত্র মুবারকই হচ্ছে কুরআন শরীফ।” (তাফসীরে মাযহারী)
কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে, محمد رسول الله
অর্থঃ- “মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্ পাক-এর রসূল।” (সূরা ফাত্হ/২৯)
ولكن رسول الله وخاتم النبين.
অর্থঃ- “বরং তিনি আল্লাহ্ পাক-এর রসূল এবং শেষ নবী।” (সূরা আহ্যাব/৪০) ورفعنالك ذكرك.
অর্থঃ- “আমি (আল্লাহ্ পাক) আপনার আলোচনাকে বুলন্দ করেছি।” (সূরা আলাম নাশরাহ্/৪)
আল্লাহ্ পাক আরো ইরশাদ করেন,
واذ اخذ الله ميثاق النبين لما اتيتكم من كتب وحكمة ثم جاءكم رسول مصدق لما معكم لتؤمنن به ولتنصرنه قال ءاقررتم واخذتم على ذلكم اصرى قالوا اقررنا قال فاشهدوا وانا معكم من الشهدين.
অর্থঃ- “আর যখন মহান আল্লাহ্ পাক নবীগণের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন, আমি তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত দান করবো, অতঃপর যখন সেই রসূল আগমন করে তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তা সত্যে প্রতিপাদন করবেন। (তোমরা তাঁকে পেলে) অবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে। তিনি (আল্লাহ্ পাক তাদেরকে) বললেন, তোমরা কি (হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রিসালতকে) স্বীকার করে নিলে? এবং তোমাদের প্রতি আমার এ অঙ্গীকার গ্রহণ করলে? তাঁরা (নবীগণ) বললেন, আমরা স্বীকার করে নিলাম। তিনি (আল্লাহ্ পাক) বললেন, তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী রইলাম।” (সূরা আলে ইমরান/৮১)
এরূপ অনেক অনেক আয়াত শরীফে আলাদাভাবে আখিরী নবী হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছানা-ছীফত, ফযীলত-মর্তবা প্রকাশ্যভাবে বর্ণনা তো করা হয়েছেই তবে মুফাস্সিরীন-ই-কিরামগণ বলেছেন, মূলতঃ কুরআন শরীফের প্রতিটি পারা, সূরা, রুকু, আয়াত, কালেমা, হরফ এমনকি নুক্তা ও হরকতে আখিরী নবী, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছানা-ছীফত করা হয়েছে।” (সুবহানাল্লাহ্)
আর হাদীস শরীফে আখিরী নবী, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছানা-ছীফত সম্পর্কে যে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে তা তো বলার অপেক্ষাই রাখেনা।
যেমন এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে,
عن ابن عباس رضى الله تعالى عنه قال جلس ناس من اصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم فخرج حتى اذا دنا منهم سمعهم يتذاكرون قال بعضهم ان الله اتخذ ابراهيم خليلا وقال اخر موسى كلمه تكليما وقال اخر فعيسى كلمة الله وروحه وقال اخر ادم اصطفاه الله فخرج عليهم رسول الله صلى الله عليه وسلم وقال قد سمعت كلامكم وعجبكم ان ابرهيم خليل الله وهو كذلك وموسى نجى الله وهو كذلك وعيسى روحه وكلمته وهو كذلك وادم اصطفاه الله وهو كذلك الا وانا حبيب الله ولا فخر وانا حامل لواء الحمد يوم القيمة تحته ادم فمن دونه ولا فخر وانا اول شافع واول مشفع يوم القيمة ولا فخر وانا اول من يحرك حلق الجنة فيفتح الله لى فيدخلنيها ومعى فقراء المؤمنين ولا فخر وانا اكرم الاولين والاخرين على الله ولا فخر.
অর্থঃ- “হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, একদিন রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কতিপয় ছাহাবী এক স্থানে বসে কথাবার্তা বলছিলেন। এই সময় হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই দিকে যাচ্ছিলেন এবং তাঁদের নিকটে পৌঁছে তাঁদের কথাবার্তা ও আলোচনাগুলো শুনলেন। তাঁদের একজন বললেন, আল্লাহ্ পাক হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালামকে খলীল বানিয়েছেন। আরেকজন বললেন, হযরত মূসা আলাইহিস্ সালাম কালীমুল্লাহ্ ছিলেন, আল্লাহ্ তায়ালা যাঁর সাথে সরাসরি কথা বলেছেন। অপর একজন বললেন, হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম ছিলেন কালেমাতুল্লাহ্ ও রূহুল্লাহ্ এবং আরেকজন বললেন, হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে আল্লাহ্ তা’য়ালা ছফীউল্লাহ্ বানিয়েছেন।
এই সময় রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে বললেন, আমি তোমাদের কথাবার্তা এবং তোমরা যে বিস্ময় প্রকাশ করেছ তা শুনেছি। ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম যে খলীলুল্লাহ্ ছিলেন এটা ঠিক। মুসা আলাইহিস্ সালাম যে সরাসরি আল্লাহ্ পাক-এর সাথে কথাবার্তা বলেছেন এটাও সত্য কথা। ঈসা আলাইহিস্ সালাম যে রূহুল্লাহ্ ও কালেমাতুল্লাহ্ ছিলেন এটাও প্রকৃত কথা এবং আদম আলাইহিস্ সালাম যে আল্লাহ্ পাক-এর মনোনীত, মর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন এটাও সম্পূর্ণ বাস্তব। তবে জেনে রাখ, আমি হলাম “আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব’, এতে গর্ব নেই এবং ক্বিয়ামতের দিন আমিই হাম্দের ঝান্ডা উত্তোলন ও বহনকারী হব। আদম আলাইহিস্ সালাম ও অন্যান্য নবীগণ উক্ত ঝান্ডার নীচেই থাকবেন, এতে গর্ব নেই। ক্বিয়ামতের দিন আমিই হব সর্বপ্রথম শাফায়াতকারী এবং সর্বপ্রথম আমার সুপারিশই কবুল করা হবে, এতে গর্ব নেই। আমিই সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজার কড়া নাড়া দিব এবং আল্লাহ্ তায়ালা আমার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দিবেন এবং আমাকে প্রবেশ করাবেন। আর আমার সঙ্গে থাকবে গরীব ঈমানদারগণ, এতে গর্ব নেই। পরিশেষে কথা হল, আর আমিই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের চেয়ে সম্মানিত, এতেও গর্ব নেই।” (তিরমিযী, দারেমী)
হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে, “হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ক্বিয়ামতের দিন যখন মানুষদেরকে কবর হতে উত্থিত করা হবে, তখন আমিই সর্ব প্রথম কবর হতে বের হয়ে আসব। আর যখন লোকেরা দলবদ্ধ হয়ে আল্লাহ্ পাক-এর দরবারে উপস্থিত হওয়ার জন্য রওয়ানা হবে, তখন আমিই হব তাদের অগ্রগামী ও প্রতিনিধি। আর আমিই হব তাদের মুখপাত্র, যখন তারা নীরব থাকবে। আর যখন তারা আটকা পড়বে, তখন আমি হব তাদের সুপারিশকারী। আর যখন তারা হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়বে, তখন আমি তাদেরকে সুসংবাদ প্রদান করব। মর্যাদা এবং কল্যাণের চাবিসমূহ সেই দিন আমার হাতে থাকবে। আল্লাহ পাক-এর প্রশংসার ঝান্ডা সেই দিন আমার হাতেই থাকবে। আমার পরওয়ারদিগারের কাছে আদম সন্তানদের মধ্যে আমিই সর্বাপেক্ষা অধিক মর্যাদাবান ও সম্মানিত ব্যক্তি হবো। সেই দিন হাজার হাজার খাদিম আমার চারপাশে ঘোরাফেরা করবে। যেন তারা সুরক্ষিত ডিম কিংবা বিক্ষিপ্ত মুক্তা।” (তিরমিযী, দারেমী)
স্বয়ং সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপস্থিতিতে হযরত হাস্সান বিন সাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদে নববী শরীফে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে না’ত, কাছীদা, কবিতা আবৃত্তি করে শুনাতেন।
হযরত আবূ দারদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, “তিনি একদিন সাইয়্যিদুল আম্বিয়া, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে হযরত আবূ আমের আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর ঘরে গেলেন। তিনি সেখানে দেখতে পেলেন যে, হযরত আবূ আমের আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তাঁর নিজ সন্তানাদি ও আত্মীয়-স্বজনদের একত্রিত করে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদ শরীফ (জন্ম বৃত্তান্ত) আলোচনা করছেন। এটা দেখে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত খুশি হলেন এবং বললেন, “হে আমের! নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক তোমার জন্য তাঁর রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করেছেন এবং সকল ফেরেশ্তাগণ তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। আর যারা তোমার ন্যায় এরূপ আমল করবে, তারাও তোমার ন্যায় নাযাত পাবে।” (কিতাবুত তানবীর ফী মাওলুদিল বাশীর ওয়ান্ নাযীর, সুবুলুল হুদা ফী মাওলুদিল মুস্তফা)
আরো বর্ণিত আছে যে, “একদিন হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সেখানকার সকল লোকদেরকে তাঁর নিজ ঘরে একত্রিত করে, সাইয়্যিদুল আম্বিয়া, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদ শরীফ বা জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা করেন, যা শুনে উপস্থিত সকলেই আনন্দচিত্তে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর ছলাত-সালাম পাঠ করেন। এমন সময় রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে উপস্থিত হলেন এবং তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, حلت لكم شفاعتى.
অর্থাৎ “তোমাদের জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে গেল।” (মাওলুদুল কবীর, দুররুল মুনাজ্জাম, সুবুলুল হুদা ফী মাওলুদিল মুস্তফা)
উল্লেখ্য,স্বয়ং আল্লাহ্ পাক নিজেই আনুষ্ঠানিকভাবে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছানা-ছীফত করেছেন, ফেরেশ্তাগণও করেছেন। আর পূর্ববর্তী নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণও আনুষ্ঠানিকভাবে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছানা-ছীফত করেছেন। এমনকি স্বয়ং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের ছানা-ছীফত করেছেন এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকেও আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর ছানা-ছীফত করার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। যার কারণে হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণও আনুষ্ঠানিকভাবে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছানা-ছীফত বর্ণনা করেছেন।
এর অনুসরণে পরবর্তীতে ইমাম-মুজতাহিদ এবং আউলিয়া-ই-কিরামগণও হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুষ্ঠানিকভাবে ছানা-ছীফত বর্ণনা করেন যা মীলাদ শরীফের প্রচলিত রূপ লাভ করে।
সুতরাং মীলাদুন্ নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার আনুষ্ঠানিকতা সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহ্র এত সুস্পষ্ট বর্ণনা থাকার পরও যে ব্যক্তি বলে যে মীলাদুন্ নবীর আনুষ্ঠানিকতার বর্ণনা কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে নেই সে চরম জাহিল ও গোমরাহ্ ব্যতীত অন্য কিছু নয়।
{দলীলসমূহ ঃ (১) আহকামুল কুরআন জাস্সাস, (২) রুহুল মায়ানী, (৩) রুহুল বয়ান, (৪) কুরতুবী, (৫) কবীর, (৬) তাবারী, (৭) যাদুল মাছীর, (৮) মাযহারী, (৯) ইবনে কাছীর, (১০) খাযেন, (১১) বাগবী, (১২) দুররুল মনছূর, (১৩) ইবনে আব্বাস, (১৪) তিরমিযী, (১৫) দারিমী, (১৬) মিশকাত, (১৭) শরহে তিরমিযী, (১৮) মিরকাত, (১৯) আশয়াতুল লুময়াত, (২০) লুময়াত, (২১) শরহুত্ ত্বীবী, (২২) তালিকুছ্ ছবীহ্, (২৩) মুযাহিরে হক্ব, (২৪) কিতাবুত্ তানবীর ফী মাওলিদিল বাশীর ওয়ান্ নাযীর, (২৫) সুবুলুল হুদা ফী মাওলিদিল মুস্তফা, (২৬) মাওলুদুল কবীর, (২৭) দুররুল মুনাজ্জাম ইত্যাদি।}
সাইয়্যিদ মুহম্মদ আখতারুজ্জামান
মুহম্মদ সাইফুল্লাহ্ আল মুনীর
রাজারহাট সিনিয়ার মাদ্রাসা, কুড়িগ্রাম।
সুওয়ালঃ সম্প্রতি কিছু সংখ্যক লোক দাবী করছে যে, “কুরআন শরীফের সঠিক আয়াত সংখ্যা ৬,২৩৬টি। এছাড়া আয়াতের সংখ্যা সম্পর্কে অন্যান্য যে সমস্ত মত বর্ণিত রয়েছে তা সম্পূর্ণ ভুল।” এতে আমাদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, তবে কি কোন কোন কুরআন শরীফে আয়াত শরীফ কম-বেশী করা হয়েছে? অথবা কুরআন শরীফ কি পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয়েছে? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ কুরআন শরীফের আয়াতসমূহের সংখ্যা নিয়ে যে সমস্ত মত বর্ণিত রয়েছে তার প্রত্যেকটিই ছহীহ্ ও গ্রহণযোগ্য। কোনটিই ভুল কিংবা অগ্রহণীয় নয়। তবে ছয় হাজার দু’শত ছত্রিশটি আয়াত শরীফের সংখ্যা সম্পর্কে যে মতটি মাছহাফে উসমানীতে (বর্তমানে প্রায় কুরআন শরীফের কিতাবে) লক্ষ্য করা যায় তা চতুর্থ খলীফা হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর ইজতিহাদ ও বর্ণনা। এ বর্ণনাটিকে কুফাবাসীগণ প্রাধান্য দেয়ার কারণে তা কুফী মত হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এবং এ মতটি মুখতার ও তরজীহ্প্রাপ্ত মত হিসেবে গৃহীত হয়।
আর ছয় হাজার ছয় শত ছেষট্টি (৬,৬৬৬) আয়াত শরীফের সংখ্যা সম্পর্কে যে মতটি রয়েছে তা উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর ইজতিহাদ ও বর্ণনা। এ বর্ণনাটি সর্বসাধারণের নিকট মশহুর বা প্রসিদ্ধ মত হিসেবে গৃহীত হয়।
এছাড়া আয়াত শরীফের সংখ্যা সম্পর্কে বাকী যে সমস্ত মত রয়েছে সেগুলোও হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম থেকে বর্ণিত। তাই সে মতগুলোও ছহীহ্ ও গ্রহণযোগ্য। সেগুলোকেও ভুল বলা কুফরী। কারণ এতে ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের প্রতি তোহ্মত দেয়া হয় এবং তাঁদেরকে দোষারোপ করা হয়।
আর কুরআন শরীফে যা নাযিল করা হয়েছে তা সম্পূর্ণই অপরিবর্তিত অবস্থায় আমাদের কাছে এসেছে। এর কোন বিষয় সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা সম্পূর্ণ কুফরী।
আর আয়াত শরীফ কম-বেশী হওয়া সেটা কুরআন শরীফ পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের কারণে নয়। বরং কেউ কুরআন শরীফে ছোট কয়েকখানা আয়াত শরীফ মিলিয়ে বড় এক আয়াত শরীফ হিসেবে গণনা করেছেন। আর কেউ বড় এক আয়াত শরীফকে ওয়াক্ফের দিকে খেয়াল করে ও অর্থের দিকে খেয়াল করে ছোট কয়েকখানা আয়াত শরীফ হিসেবে গণনা করেছেন।
কাজেই কুরআন শরীফ পরিবর্তিত হয়েছে বা পরিবর্ধিত হয়েছে এ আক্বীদা পোষণ করা কাট্টা কুফরী।
আল্লাহ্ পাক কালামুল্লাহ্ শরীফে যা নাযিল করেছেন হুবহু তাই রয়েছে এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাই থাকবে।
কালামুল্লাহ্ শরীফের সত্যতা সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক বলেন,
ذلك الكتب لا ريب فيه هدى للمتقين.
অর্থঃ- “এটি এমন এক কিতাব যার মধ্যে কোনরূপ সন্দেহের অবকাশ নেই। এটি মুত্তাক্বীনদের জন্য পথ প্রদর্শক।” (সূরা বাক্বারা/২)
এ প্রসঙ্গে কালাম পাকে ইরশাদ হয়েছে,
تنزيل من رب العلمين.
অর্থঃ- “এটি সমগ্র আলমের রবের নিকট হতে অবতীর্ণ।” (সূরা হাক্কাহ্/৪৩)
আল্লাহ্ পাক আরো ইরশাদ করেন,
ولو كان من عند غير الله لوجدوا فيه اختلافا كثيرا.
অর্থঃ- “আর যদি কুরআন শরীফ আল্লাহ্ পাক ছাড়া অন্য কারো নিকট হতে নাযিল হতো তাহলে তারা তার মধ্যে অনেক ইখতিলাফ (মতবিরোধ) দেখতে পেত।” (সূরা নিসা/৮২)
কাজেই কালামুল্লাহ্ শরীফ শুরুতেই যেভাবে নাযিল হয়েছে বর্তমানে সেভাবেই রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সেভাবেই থাকবে। এর মধ্যে কোন প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন হয়নি এবং কস্মিনকালেও হবে না। কেননা, আল্লাহ্ পাক স্বয়ং নিজে তাঁর হিফাযতের ভার গ্রহণ করেছেন।
আল্লাহ্ পাক স্বীয় কালাম পাক সম্পর্কে ইরশাদ করেন,
بل هو قران مجيد فى لوح محفوظ.
অর্থঃ- “বরং এটি মহান কুরআন, লওহে মাহ্ফুযে রয়েছে।” (সূরা বুরূজ/২১,২২)
উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী নাযিলকৃত আসমানী কিতাবসমূহের হিফাযতের জিম্মাদারী স্ব-স্ব নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণ এবং তাঁদের উম্মতদের প্রতি ছিল। যেমন,
এ প্রসঙ্গে কালামুল্লাহ্ শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
استحفذوا من كتب الله وكانوا عليه شهداء.
অর্থঃ- “তাদের এ (তাওরাত) খোদায়ী কিতাবের হিফাযত বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এবং তারা এর দেখাশোনার জন্য নিযুক্ত ছিল।” (সূরা মায়িদা/৪৪)
কিন্তু নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের বিদায়ের পর তাঁদের উম্মতরা তা বিকৃত করে ফেলে।
আর আল্লাহ্ তায়ালা যে কালাম পাক তাঁর প্রিয় হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি নাযিল করেছেন তার হিফাযতের জিম্মাদারী স্বয়ং তিনি নিজে গ্রহণ করেছেন। এ কালামুল্লাহ্ শরীফ যমীনে নাযিল হওয়ার পূর্বে আসমানে “লওহে মাহ্ফুযে” হিফাযত করেছেন। অতঃপর সেখান থেকে পৃথিবীর আকাশে “বাইতুল ইজ্জতে” অতঃপর সেখান হতে কোন রূপ পরিবর্তন-পরিবর্ধন ব্যতিরেকে সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত অবস্থায়, হুবহু আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি নাযিল করেন।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
انا نحن نزلنا الذكر وانا له لحفظون.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আমি কুরআন শরীফ নাযিল করেছি এবং আমিই তার হিফাযতকারী।” (সূরা হিজর/৯)
অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফ নাযিল করে যেভাবে “লওহে মাহ্ফুযে” রেখে দিয়েছেন ঠিক সেভাবেই যমীনে নাযিল করেছেন এবং সেভাবেই অনাদি-অনন্তকাল পর্যন্ত বহাল থাকবে।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, খলীফা মামুন তার শাহী দরবারে দিন ধার্য করে ইল্মি মজলিশের ব্যবস্থা করতেন। সেই মজলিশে উপস্থিত থাকতেন তার সভাসদ, আলিম-ওলামা, অন্যান্য জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিবর্গ। একদিন এক নতুন ব্যক্তি উক্ত মজলিশে উপস্থিত হলো। যে ছিল খৃষ্টান ধর্মাবলম্বি। সে ছিল একজন ভাষাবিদ, যে ভাষাই আলোচনা করা হতো সে ভাষাই সে বুঝতো ও আলোচনা করতো। এছাড়া সে তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও কুরআন শরীফসহ সব আসমানী কিতাব সম্পর্কে খুব ভাল জ্ঞান রাখতো এবং সে ছিল একজন হস্ত লিখা বিশারদ। অর্থাৎ তার হাতের লিখা অত্যন্ত ভাল ছিল। এসব জেনে খলীফা মামুনের পক্ষ থেকে উক্ত ব্যক্তির নিকট প্রস্তাব পেশ করা হলো, সে যদি মুসলমান হয়ে তার দরবারে থাকে তবে তাকে বেশ সুযোগ-সুবিধা দেয়া হবে। প্রস্তাব শুনে উক্ত ব্যক্তি হ্যাঁ কিংবা না কোন জবাবই দিলনা। মজলিশ শেষে তার অবস্থানে সে চলে গেল। দীর্ঘ এক বছর অনুপস্থিতির পর আবার সে উক্ত মজলিশে এসে উপস্থিত হলো। কিন্তু এবার সে খৃষ্টান নয় মুসলমান হয়ে এসেছে।
তাকে তার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, “ইতোপূর্বে তোমাকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল তুমি মুসলমান হয়ে খলীফার দরবারে থাকলে তোমাকে রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা দেয়া হবে। কিন্তু তুমি সে প্রস্তাব ও সুযোগ গ্রহণ না করে চলে গেলে। অতঃপর কোন কারণে তুমি তোমার বাপ-দাদার খৃষ্ট ধর্ম ছেড়ে অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ না করে একমাত্র দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হলে?”
সে জবাব দিলো, খলীফা মামুনের পক্ষ হতে তাকে মুসলমান হয়ে তার দরবারে থাকার প্রস্তাব দেয়ার পর সে নিজ আবাস স্থলে চলে যায়। গিয়ে সে প্রতিটি আসমানী কিতাব- তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও কুরআন শরীফ নিজ হাতে তিন কপি করে সুন্দর করে লিপিবদ্ধ করে এবং প্রতিটি কপির মধ্যে কিছু কাট-ছাট সংযোজন-বিয়োজন, পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে; যার ফলে একটা কপির সাথে অন্য কপির হুবহু মিল নেই, তবে প্রতিটি কপির লেখা খুবই সুন্দর ও মনোরম।
সে তার লিখিত কপিগুলো নিয়ে স্ব স্ব সম্প্রদায়ের নিকট গেলো বিক্রির জন্য। অর্থাৎ প্রথমে তাওরাতের কপিগুলো নিয়ে ইহুদীদের নিকট উপস্থিত হলো। তারা কপিগুলোর সুন্দর মনোরম লিখা দেখে বেশী দামে ক্রয় করে নিল কিন্তু তার মধ্যে যে হেরফের করা হয়েছে, পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা হয়েছে তারা সেটা যাচাই-বাছাই করলোনা। একইভাবে খৃষ্টানরাও ইঞ্জিল কিতাবের কপি গুলো সুন্দর মনোরম লিখা দেখে কোনরূপ যাচাই-বাছাই না করেই বেশী মূল্যে ক্রয় করে নিলো। যবুর কিতাবের কপির ক্ষেত্রেও ঠিক একই অবস্থা। সেগুলোও বেশী মূল্যে বিক্রি হয়ে গেল।
কিন্তু যখন কুরআন শরীফের কপিগুলো নিয়ে সে মুসলমানদের নিকট উপস্থিত হলো, তারা তার মধ্যে হেরফের, পরিবর্তন-পরিবর্ধন, কাঁট-ছাট দেখে সেগুলো ক্রয় করা তো দূরের কথা তারা তাকে সাবধান বাণী শুনিয়ে দিল। তখন সে উপলব্ধি করলো যে, সত্যিই কুরআন শরীফের মধ্যে কোনরূপ পরিবর্তন-পরিবর্ধন, কাঁট-ছাট করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। অতঃপর সে কুরআন শরীফ এবং তা যে ধর্মে তথা দ্বীনে নাযিল হয়েছে অর্থাৎ দ্বীন ইসলাম তার সত্যতা বুঝতে পেরে মুসলমান হয়ে গেল।
কালামুল্লাহ্ শরীফের সূরা, আয়াত, শব্দ যা আছে হুবহু তাই এবং এ রকমই নাযিল হয়েছে। এর উপরই ইজমা হয়েছে আর এর উপরই বিশ্বাস স্থাপন করা প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
আল্লাহ্ পাক যেমন অসীম, আল্লাহ্ পাক-এর কালাম পাক-এর শান, ফযীলত, মর্যাদা তার মর্ম, ব্যাখ্যা, তাৎপর্য ইত্যাদিও তেমন অসীম এবং তা গায়রে মাখলুক।
আর আকাঈদের কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে,
القران غير مخلوق من قال القران مخلوق فهو كافر.
অর্থঃ- “কুরআন শরীফ গায়রে মাখলুক তথা সৃষ্ট বস্তু নয়। যে ব্যক্তি বলবে কুরআন শরীফ মাখলুক বা সৃষ্ট বস্তু সে কাফির।” (আকাঈদে নছফী)
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
انزل القران على سبعة احرف.
অর্থঃ- “কুরআন শরীফ সাত হরফে (ভাষায়) অবতীর্ণ হয়েছে।” (নাসাঈ, শরহুস্ সুন্নাহ্, মিশকাত, দায়লামী, বায্যার, মাজমাউয্ যাওয়ায়েদ, আল মুতালিয়াতুল আলিয়া, কাশফুল খিফা, মিরকাত)
ইমাম সুয়ূতী, ইমাম বদরুদ্দীন আইনী, ইমাম বুখারী, আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহি আলাইহিম প্রমূখ উলামা-ই-কিরাম এ হাদীস শরীফ দ্বারা سبع لغات বা সাতটি ভাষা যেমন, (১) কুরাঈশ, (২) ত্বয়, (৩) তামীম, (৪) হুযাইল, (৫) ছাক্বীফ, (৬) ইয়েমেন এবং (৭) হাওয়াযিনকে বুঝিয়েছেন।
আবার কেউ কেউ سبع لغات বা সাতটি ভাষা দ্বারা সাত ক্বিরয়াতকে বুঝিয়েছেন।
সুতরাং এই অসীম কালাম পাক-এর (মাহাত্ম ও হাক্বীক্বত) মাখলুক তথা জ্বিন-ইনসান কতটুকুই বুঝবে ও ব্যাখ্যা করবে। আল্লাহ্ পাক তাঁর কালাম পাকে ইরশাদ করেন,
وما اوتيتم من العلم الا قليلا.
অর্থঃ- “মানুষকে যৎসামান্য ইল্ম ব্যতীত প্রদান করা হয়নি।”(সূরা বণী ইসরাঈল/৫৮)
এ আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, একটা সমুদ্রের মধ্যে একটা সুঁচ ডুবিয়ে তুললে সুঁচ-এর মাথায় যতটুকু পানি উঠবে সমস্ত জ্বিন-ইনসানকে প্রদত্ত ইল্ম ও নিয়ামতের পরিমাণ ততটুকু। তবে আল্লাহ্ পাক সদয় হয়ে নিজ ইচ্ছায় যাকে যতটুকু ইল্ম দান করেন সে ততটুকু ইল্মের অধিকারী হয়ে থাকে। এ মর্মে কালাম পাকে ইরশাদ হয়েছে,
قالوا سبحنك لا علم لنا الا ما علمتنا.
অর্থঃ- “ফেরেশ্তারা বললেন, আমরা আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি, আমাদের কোন ইল্মই নেই ততটুকু ব্যতীত যতটুকু আপনি আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন।” (সূরা বাক্বারা/৩২)
কাজেই মুফাস্সিরগণ কুরআন-সুন্নাহ্র প্রদত্ত ইল্ম ও সমঝ অনুযায়ী কালাম পাক-এর তাফসীর বা ব্যাখ্যা অতীতে করেছেন, বর্তমানে করছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন কিন্তু তবুও তার ব্যাখ্যা শেষ হবেনা।
স্মরণীয় যে, কালামুল্লাহ্ শরীফের শত শত তাফসীর (ব্যাখ্যা) হবে এবং তার মধ্যে কোন কোনটি তাফসীর (ব্যাখ্যা) যদিও বেশী ছহীহ্ ও মশহুর (প্রসিদ্ধ) তবে সমস্ত তাফসীর বা ব্যাখ্যাই গ্রহণযোগ্য একমাত্র তাফসীর বিররায় অর্থাৎ মনগড়া তাফসীর ব্যতীত।
এখানে প্রশ্ন করা হয়েছে যে, “আয়াত সংখ্যা কম-বেশী করা হয়েছে কি?”
এর জবাব হলো যে, রাবীগণের মত পার্থক্য অর্থাৎ যারা বেশী বলে উল্লেখ করেছেন তারা একটি দীর্ঘ আয়াত শরীফকে অনেকগুলো ছোট আয়াত শরীফে ভাগ করেছেন। আর যারা কম বলে উল্লেখ করেছেন তারা অনেকগুলো ছোট আয়াত শরীফকে একটি বড় আয়াত শরীফ হিসেবে গণ্য করেছেন। আবার কেউ কেউ তাসমিয়া অর্থাৎ বিসমিল্লাহির রহমানির রহীমকে আলাদা আয়াত হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন ফলে সঙ্গত কারণেই আয়াতের সংখ্যা কম-বেশী হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে কিতাবে বর্ণিত রয়েছে যে, কুফাবাসীগণ হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর বর্ণনা উল্লেখ করে বলেন, “কুরআনুল কারীমের আয়াত শরীফের সংখ্যা “ছয় হাজার দু’শত ছত্রিশ।” এ মতটি মুখতার ও তরজীহ্প্রাপ্ত।
হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর মতে, “ছয় হাজার দু’শত ষোল।” এটা বছরীগণের মত।
শামদেশীয়গণের মতে, “ছয় হাজার দু’শত পঞ্চাশ।”
ইসমাঈল ইবনে জাফর মাদানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বর্ণনায়, “ছয় হাজার দু’শত চৌদ্দ।” এটি ইরাক্বীগণের মত।
মক্কাবাসীগণের মতে, “ছয় হাজার দু’শত বার।”
হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর মতে, “ছয় হাজার দু’শত আঠারো।”
হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বর্ণনা করেন, “ছয় হাজার ছয়শত ছেষট্টি।”
এ প্রসঙ্গে “তাফসীরে কাশ্শাফ, হাশিয়ায়ে মারাকিউল ফালাহ্, হাশিয়ায়ে তাহতাবী আলা দুররিল মুখতার” ইত্যাদি কিতাবে উল্লেখ আছে,
وجميع ايات القران ستة الاف وست مائة وستون اية الف وعد والف وعيد والف امر والف نهى والف قصص والف خبر وخمس مأة حلال وحرام مائة دعاء وتسبيح وستة ناسخ ومنسوخ.
অর্থঃ- “কুরআন শরীফের মধ্যে মোট “ছয় হাজার ছয় শত ছেষট্টি” আয়াত আছে। তার এক হাজার আয়াত ওয়াদাপূর্ণ, এক হাজার আয়াত ভয়সূচক, এক হাজার আয়াত আদেশসূচক, এক হাজার আয়ত নিষেধসূচক, এক হাজার আয়াত কাহিনীমূলক, এক হাজার আয়াত সু-সংবাদপূর্ণ, পাঁচশত আয়াত হালাল-হারাম সম্পর্কে, একশত আয়াত দোয়া ও তাছবীহ্ বিশিষ্ট এবং ছেষট্টি আয়াত নাসেখ-মনসুখ।”
আর এ মতটিই “আয়াতে আ’ম্মাহ” বা সর্ব সাধারণের গ্রহণীয় ও মশহুর মত।
রাবীগণের উল্লিখিত প্রতিটি বর্ণনা ও মতই ছহীহ্ ও গ্রহণযোগ্য। তবে হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যে মতটি বর্ণনা করেছেন অর্থাৎ “ছয় হাজার দু’শত ছত্রিশ,” কুফাবাসীগণ তা গ্রহণ করার কারণে তা কুফী মত হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এবং এ মতটি মুখতার ও তরজীহ্প্রাপ্ত মত বলে উল্লেখ করা হয়।
আর হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা যে মতটি বর্ণনা করেছেন অর্থাৎ “ছয় হাজার ছয়শত ছেষট্টি,” তা সর্বসাধারণের নিকট মশহুর মত হিসেবে গৃহীত হয়।
সুতরাং উল্লিখিত রাবীগণের বর্ণনাকে প্রচার করা কারো নতুন কোন তাজদীদ (সংস্কার) কিংবা ইজতিহাদ নয়। বরং তা আগে থেকেই বর্ণিত ও প্রচারিত হয়ে আসছে। যেমন, ছয় হাজার দু’শত ছত্রিশটি আয়াত শরীফের সংখ্যা, এটা হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেছেন এবং এ বর্ণনাকে কুফাবাসীগণ নিজেদের মত হিসেবে উল্লেখ করেন। এ মতটিই মুখতার ও তারজীহ্ প্রাপ্ত মত বলে গ্রহণ করা হয় এবং মাছহাফে উসমানীতে এটাই লক্ষ্য করা যায়।
আর ছয় হাজার ছয় শত ছেষট্টি আয়াত শরীফের সংখ্যা এটা হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বর্ণনা করেছেন এবং এ বর্ণনাটি রাবীগণের জামানা থেকে অদ্যাবধি সর্বসাধারণের নিকট মশহুর (প্রসিদ্ধ) মত হিসেবে প্রচার ও গৃহীত হয়ে আসছে। আর এ বর্ণনার ক্ষেত্রে বড় আয়াতগুলোকে অনেকগুলো ছোট ছোট আয়াতে বিভক্ত করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
এখানে স্মরণযোগ্য যে, হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণিত “ছয় হাজার দু’শত ছত্রিশ” এবং হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বর্ণিত “ছয় হাজার ছয় শত ছেষট্টি” এ মত দু’টি যথাক্রমে মুখতার, তরজীহ্প্রাপ্ত এবং মশহুর ও আম বা সর্বসাধারণের মত হিসেবে সাব্যস্ত হলেও অন্যান্য ছাহাবী ও রাবীগণের বর্ণিত মতগুলো ভুল কিংবা অশুদ্ধ নয়। সেগুলোকে ভুল বলা হলে রাবী তথা ছাহাবীগণের বর্ণনাকে ভুল সাব্যস্ত করা হয় যা তাঁদেরকে দোষারোপ করার শামীল।
আর ছাহাবীগণকে দোষারোপ করা কুফরী। এর পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক তাঁর কালাম পাকে ইরশাদ করেন,
ان الذين يؤذون الله ورسوله لعنهم الله فى الدنيا والاخرة واعدلهم عذابا مهينا.
অর্থঃ- “নিশ্চয় যারা আল্লাহ্ পাক এবং তাঁর রসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে কষ্ট দেয়, তাদের জন্য দুনিয়া এবং আখিরাতে আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ থেকে অভিসম্পাত এবং তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।” (সূরা আহ্যাব/৫৭)
এ আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
الله الله فى اصحابى لاتتخذوهم غرضا من بعدى فمن احبهم فبحبى احبهم ومن ابغضهم فببغضى ابغضهم ومن اذاهم فقد اذانى ومن اذانى فقد اذى الله ومن اذى الله يوشك ان يأخذه.
অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাককে ভয় কর, আল্লাহ্ পাককে ভয় কর, আমার ছাহাবা-ই-কিরাম সম্পর্কে। আমার পরে তাঁদেরকে তিরস্কারের লক্ষ্যস্থল করোনা। তাঁদেরকে যারা মুহব্বত করলো, তা আমাকে মুহব্বত করার কারণেই। এবং তাঁদের প্রতি যারা বিদ্বেষ পোষণ করলো, তা আমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করার কারণেই। তাঁদেরকে যারা কষ্ট দিল, তারা আমাকেই কষ্ট দিল। আর আমাকে যারা কষ্ট দিল, তারা আল্লাহ্ পাককেই কষ্ট দিল। আর যারা আল্লাহ্ পাককে কষ্ট দিল, তাদেরকে আল্লাহ্ পাক অতি শীঘ্রই পাকড়াও করবেন।” (বুখারী, ফতহুল বারী, ওমদাতুল ক্বারী, মিশকাত, মিরকাত, মুযাহিরে হক্ব, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, শরহে তীবী, মিরয়াতুল মানাযীহ্ ইত্যাদি)
অতএব, আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ফতওয়া হচ্ছে ছাহাবা-ই-কিরামগণকে দোষারোপ করা হারাম ও কুফরী। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
ليغيظبهم الكفار.
অর্থঃ- “কাফিররাই তাঁদের (হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের) প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে থাকে।” (সূরা ফাত্হ্/২৯)
আর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
من غاظه اصحاب محمد صلى الله عليه وسلم فهو كافر.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, সে কাফির।”
সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো ইরশাদ করেন,
لا تسبوا اصحابى فلو ان احدكم انفق مثل احد ذهبا مابلغ مد احدهم ولا نصيفه.
অর্থঃ- “তোমরা আমার ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে গালী দিওনা। কেননা যদি তোমাদের কেউ উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ আল্লাহ্ পাক-এর রাস্তায় দান কর, তবুও ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের এক মূদ্ বা অর্ধ মূদ্ গম দান করার ফযীলতের সমপরিমাণ ফযীলত অর্জন করতে পারবে না।” (বুখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ, তিরযিযী, ইবনে মাযাহ্, আহমদ, কানযুল উম্মাল)
হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে,
فمن سبهم فعليه لعنة الله والملئكة والناس اجمعين ولايقبل الله منهم صرفا ولاعدلا.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে গালী দেয়, তাদের প্রতি ফেরেশ্তা, মানুষ ও সকল মাখলুকাতের লা’নত এবং তাদের কোন ফরয ও নফল ইবাদত আল্লাহ্ পাক কবুল করবেন না।” (মুযাহিরে হক্ব)
আরো ইরশাদ হয়েছে,
اذا رأيتم الذين يسبون اصحابى فقولوا لعنة الله على شركم.
অর্থঃ- “যখন তোমরা কাউকে আমার ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে গালী দিতে দেখবে, তখন তোমরা বলো, তোমাদের এ নিকৃষ্ট কাজের জন্য আল্লাহ্ পাক-এর লা’নত বর্র্ষিত হোক।” (তিরমিযী শরীফ)
আরো ইরশাদ হয়েছে,
سيأتى قوم يسبونهم ويستنقصونهم فلاتجالسوهم ولاتأكلوهم ولاتشاربوهم ولاتناكحوهم وفى رواية اخرى ولاتصلوا معهم ولاتدعولهم.
অর্থঃ- “অতি শীঘ্রই একটি দল বের হবে, যারা আমার ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে গালী দিবে, তাঁদেরকে নাকেস বা অপূর্ণ বলবে, সাবধান! তোমরা তাদের মজলিশে বসবেনা, তাদের সাথে পানাহার করবেনা, তাদের সাথে বিবাহশাদীর ব্যবস্থা করবেনা।”
আর এজন্যেই হানাফী মায্হাবের ইমাম, ইমামে আ’যম হযরত আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিশ্ব বিখ্যাত কিতাব “ফিক্বহুল আকবরের” মধ্যে উল্লেখ করেন,
لا نذكر احدا من اصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم الا بخير.
অর্থঃ- “আমরা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রত্যেক ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ সম্পর্কেই সুধারণা পোষণ করি।”
সুতরাং কোন ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর প্রতিই মিথ্যা বা ভুলের তোহ্মত দেয়া, তাঁদেরকে দোষারোপ করা প্রকাশ্য কুরআন-সুন্নাহ্র খেলাফ। তাঁদের সম্পর্কে সাবধানে কথা বলতে হবে। মূলতঃ তাঁদের সকলের প্রতিই সুধারণা পোষণ করতে হবে, মুহব্বত করতে হবে এবং তাঁদেরকে অনুসরণ-অনুকরণও করতে হবে।
আল্লাহ্ পাক হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ সম্পর্কে তাঁর কালাম পাকে ইরশাদ করেন, رضى الله عنهم ورضوا عنه.
অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তাঁরাও আল্লাহ্ পাক-এর প্রতি সন্তুষ্ট।” (সূরা মায়িদা/১১৯)
তিনি আরো ইরশাদ করেন,
والذين اتبعوهم باحسان رضى الله عنهم.
অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক ঐ সকল বান্দাগণের প্রতিও সন্তুষ্ট যারা হযরত ছাহাবা-ই-কিরামকে উত্তম রূপে অনুসরণ করেন।” (সূরা তওবা/১০০)
আর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
الصحابة كلهم عدول.
অর্থঃ- “সকল ছাহাবীগণই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত।” (কানযুল উম্মাল)
আর হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের ইখতিলাফ সঠিক এবং প্রত্যেকেই অনুসরণীয়।
এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
عن عمر بن الخطاب رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم- سألت ربى عن اختلاف اصحابى من بعدى فاوحى الى يا محمد ان اصحابك عندى بمنزلة النجوم بعضها اقوى من بعض لكل نور فمن اخذ بشئ مماهم عليه من اختلافهم فهو عندى على هدى فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم اصحابى كالنجوم بايهم اقتديتم اهتديتم.
অর্থঃ- হযরত উমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আমি আমার ওফাতের পরে আমার ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের ইখতিলাফ (মতবিরোধ) সম্পর্কে আল্লাহ্ পাককে জিজ্ঞাসা করেছি।” আল্লাহ্ পাক আমাকে বললেন, “হে হাবীব (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) নিশ্চয়ই আপনার ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ আমার নিকট তারকা সমতুল্য। কারো আলোর চেয়ে কারো আলো বেশী, তবে প্রত্যেকেরই আলো আছে। সুতরাং তাঁদের যে কোন ইখতিলাফকে যারা আঁকড়িয়ে ধরবে, তারা হিদায়েত পেয়ে যাবে। কারণ তাঁদের ইখতিলাফগুলো আমার নিকট হিদায়েত হিসেবে গণ্য।” আর তাই আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “আমার ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ প্রত্যেকেই তারকা সাদৃশ্য, তাঁদের যে কাউকে তোমরা অনুসরণ করবে, হিদায়েত প্রাপ্ত হবে।”
অতএব, আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি লাভ করতে চাইলে অবশ্যই ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে অনুসরণ-অনুকরণ করতে হবে এবং তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা, সমালোচনা করা ও নাকেস বলা হতে বিরত থাকতে হবে।
উল্লেখ্য, দ্বীনি বিষয় সম্পর্কে মানুষের ইল্ম, আক্বল ও সমঝের এতই অভাব যে, কোনটা দ্বীনি তাজদীদ (সংস্কার) আর কোনটা দ্বীনি তাজদীদ(সংস্কার) নয় সেটাও তারা উপলব্ধি করতে অক্ষম।
মূলতঃ কুরআন শরীফের আয়াতের সংখ্যা বর্ণনার ক্ষেত্রে যে বিভিন্ন মত তা হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের ইজতিহাদ এবং তাঁদের যামানা থেকেই তা বর্ণিত হয়ে এসেছে। সে সমস্ত বর্ণনা থেকে একেকজন একেক বর্ণনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন ও গ্রহণ করেছেন। কিন্তু কেউই কোন বর্ণনাকে অস্বীকার করেননি বা ভুল বলে অভিহিত করেননি। শুধু আয়াত শরীফের সংখ্যা বর্ণনার ক্ষেত্রেই নয়, সূরা ও শব্দের সংখ্যা বর্ণনার ক্ষেত্রেও রাবী বা ছাহাবীগণের মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে।
অতএব, কুরআন শরীফের আয়াত শরীফের সংখ্যা ছয় হাজার দু’শত ছত্রিশ কেবল এ মতটি সঠিক। আর ছয় হাজার ছয় শত ছেষট্টি, ছয় হাজার দু’শত আঠার, ছয় হাজার দু’শ পঞ্চাশ, ছয় হাজার দু’শত চৌদ্দ, ছয় হাজার দু’শত বার ইত্যাদি মতগুলো ভুল এ বক্তব্য পেশ করা কুফরী।
আর কুরআন শরীফের কোন বিষয় সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা অথবা কুরআন শরীফে পরিবর্তন, পরিবর্ধন করা হয়েছে এ আক্বীদা পোষণ করা ইত্যাদি সবই কুফরী।
আল্লাহ্ পাক আমাদের সকলকে এ কুরআন শরীফ সম্পর্কে যাবতীয় কুফরী আক্বীদা ও আমল থেকে হিফাযত করুন।
{দলীলসমূহ ঃ (১) আহকামুল কুরআন, (২) রুহুল বয়ান, (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) খাযেন, (৫) বাগবী, (৬) ইবনে কাছীর, (৭) তাবারী, (৮) কুরতুবী, (৯) কবীর, (১০) তাফসীরে মাযহারী, (১১) বুখারী, (১২) মুসলিম, (১৩) আবূ দাউদ, (১৪) তিরমিযী, (১৫) নাসাঈ, (১৬) ইবনে মাযাহ্, (১৭) মিশকাত, (১৮) মিরকাত, (১৯) আশয়াতুল লুময়াত, (২০) লুময়াত, (২১) ত্বীবি, (২২) শরহুত্ ত্বীবি, (২৩) তালিকুছ্ ছবীহ্, (২৪) মুযাহেরে হক্ব, (২৫) ফতহুল বারী, (২৬) উমদাতুল ক্বারী, (২৭) শরহুস্ সুন্নাহ্, (২৮) দায়লামী, (২৯) বায্যার, (৩০) মাজমাউয্ যাওয়ায়েদ, (৩১) আল মুতালিয়াতুল আলিয়া, (৩২) কাশফুল খিফা, (৩৩) মিরয়াতুল মানাযীহ্, (৩৪) হাশিয়ায়ে মারাকিউল ফালাহ্, (৩৫) হাশিয়ায়ে তাহতাবী আল দুররিল মুখতার, (৩৬) আকাঈদে নছফী, (৩৭) ফিক্বহুল আকবর, (৩৮) তরীক্বুল ইসলাম, (৩৯) বুস্তানুল আরিফীন, (৪০) আল ইতকান ফী উলূমিল কুরআন, (৪১) ঝিনাতুল ক্বারী, (৪২) নুযহাতুল ক্বারী ইত্যাদি।}
সাইয়্যিদ মুহম্মদ মোক্তাদুল ইসলাম (মিলন)
রঈসুল মজলিশ- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত
সুবহানীঘাট, সিলেট।
সুওয়ালঃ রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্র ডিসেম্বর/২০০০ঈঃ সংখ্যায় “তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুনিয়াতুত তালেবীন, রেজভীয়া” কিতাবের বরাত দিয়ে বলেছে, “সহীহ্ মুসলিম শরীফসহ” অনেক নির্ভরযোগ্য কিতাবে নফল নামায বিশেষতঃ ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামাত সহকারে আদায় করা বৈধ….।”
আর আপনারা “মাসিক আল বাইয়্যিনাতে” লিখেছেন, “তারাবীহ, ছলাতুল কুছুফ (সূর্য গ্রহণের নামায), ছলাতুল ইস্তেস্কা (বৃষ্টির নামায) এই তিন প্রকার নামায ব্যতীত যেমন লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতুল বরাত, তাহাজ্জুদ, চাশ্ত, আওয়াবীন ইত্যাদি নফল নামায সমূহ ইমামের সাথে চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্।” কোনটি সঠিক?
আর “বুখারী, মুসলিম শরীফে” কি “ক্বদর” ও বরাতের” নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করার কথা উল্লেখ আছে? দয়া করে জানাবেন।
জাওয়াবঃ রেযাখানীরা তাদের মুখপত্রে “তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, গুনিয়াতুত্ তালেবীন এবং রেজভীয়া” কিতাবের বরাত দিয়ে নফল নামায বিশেষতঃ “শবে বরাত”, “শবে ক্বদরের” নফল নামায আযান-ইক্বামত ছাড়া জামায়াত সহকারে আদায় করা যে বৈধ বলেছে, তা আমরা আমাদের “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর বিগত সংখ্যাগুলোতে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে প্রমাণ করেছি যে, “তাদের বক্তব্য সম্পূণই ভুল, জিহালতপূর্ণ, জালিয়াতী ও প্রতারণামূলক।”
কেননা, রেযাখানীরা কিতাবের নাম দিয়ে যে বক্তব্য প্রদান করেছে, আসলে উক্ত কিতাবসমূহের বক্তব্য সে রকম নয়। বরং তার সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ, তারা কিতাবের ইবারত, সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে মনগড়া বক্তব্য প্রদান করেছে এবং ক্ষেত্র বিশেষ নিজের ভ্রান্ত মতকে টিকিয়ে রাখতে কিতাবের ইবারত কারচুপি করেছে।
(ধারাবাহিক)
বর্তমান সংখ্যায় রেযা খাঁর ইবারত
কারচুপির বিষয়টি পর্যালোচনা করা হলো
উল্লেখ্য, রেযা খাঁ “রদ্দুল মুহতারের” বর্ণিত বিত্র নামায জামায়াতে আদায় করা সম্পর্কিত ইবারতগুলো কারচুপি করে তার লিখিত “রেজভীয়া” কিতাবে এভাবে উল্লেখ করেছে,
….. يه كراهت صرف تنزيهى …. ثم ان كان ذلك احيانا كان مباحا غير مكروه.
অথচ রেযা খাঁ উক্ত ইবারতটুকুর মাঝখান থেকে
كما فعل عمر (رضى الله تعالى عنه)
এই ইবারতটি কাট-ছাট বা কারচুপি করেছে। যার বাস্তব প্রমাণ হলো, মূল “রদ্দুল মুহতার” কিতাব।
কেননা, মূল “রদ্দুল মুহতার” কিতাবের ২য় খন্ডের ৪৮ পৃষ্ঠার ইবারত হলো,
ثم ان كان ذلك احيانا كما فعل عمر (رضى الله تعالى عنه) كان مباحا غير مكروه.
অর্থাৎ- “অতঃপর যদি এই বিত্র নামায (রমযান মাস ব্যতীত) অন্য সময় কখন জামায়াতের সাথে আদায় করে যেমন হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু করেছেন (অর্থাৎ যেমন হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর দাফনের রাত্রিতে বিত্র নামায জামায়াতের সাথে পড়েছেন) তা মুবাহ, মাকরূহ তাহরীমী নয়।”
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, রেযা খাঁ ইবারতের মাঝখান থেকে
كما فعل عمر (رضى الله تعالى عنه.)
এই ইবারতটি কারচুপি করেছে।
মূলতঃ এই ইবারতটিই প্রমাণ করে যে, উক্ত ইবারতের আলোচনাগুলো হলো বিত্র নামায সম্পর্কে। কেননা, আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন, হযরত উমর বিন খাত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু রমযান মাস ব্যতীত অন্য সময় অর্থাৎ আফযালুন নাস বা’দাল আম্বিয়া, নবীদের পরে শ্রেষ্ঠ মানুষ, হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর দাফনের রাত্রিতে বিত্র নামায জামায়াতের সাথে আদায় করেছিলেন। আর উক্ত ইবারতে সেদিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে যে,
كما فعل عمر (رضى الله تعالى عنه)
যেমন, “হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু করেছেন।”
আর ইবারতে সেটাই বলা হয়েছে যে, যেমন হযরত ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বিত্র নামায জামায়াতের সাথে পড়েছেন, অনুরূপ ভাবে যদি হঠাৎ করে কখনও কখনও বিত্র নামায জামায়াতের সাথে পড়া হয় তাহলে তা মুবাহ্ হবে। মাকরূহ তাহরীমী হবে না।
তৃতীয়তঃ রেযা খাঁ তার “রেজভীয়া” কিতাবে মাকরূহ তানযীহী বলে “রদ্দুল মুহতার” কিতাবের বরাত দিয়ে যে ইবারত গুলো উল্লেখ করেছে উক্ত ইবারত দ্বারা যে বিত্র নামাযকেই বুঝানো হয়েছে, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ হলো পরবর্তী ইবারতগুলো। কেননা পরবর্তী ইবারতে বলা হয়েছে, বিত্র নামাযও নফল। সুতরাং রমযান মাস ব্যতীত বিত্র নামায জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তানযীহী।
অথচ রেযাখানীরা উক্ত ইবারতগুলো কারচুপি করেছে। যেমন পরবর্তী ইবারতে বলা হয়েছে,
بان الوتر نفل من وجه حتى وجبت القراءة فى جميعها- وتؤدى بغير اذان واقامة والنفل بالجماعة غير مستحب لانه لم تفعله الصحابة فى غير رمضان وهو كالصريح فى انها كراهة تنزيه.
অর্থাৎ- “নিশ্চয়ই বিত্র নামাযও নফল কারণ এই যে, এর প্রত্যেক রাকায়াতে ক্বিরয়াত পড়া ওয়াজিব এবং আযান ও ইক্বামত ছাড়া আদায় করা হয়। সুতরাং রমযান মাস ব্যতীত নফল অর্থাৎ বিত্র নামায জামায়াতে আদায় করা মুস্তাহাব নয়। কেননা হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ রমযান মাস ব্যতীত বিত্র নামায জামায়াতে আদায় করেননি। তবে এটা সুস্পষ্ট যে, রমযান মাস ব্যতীত বিত্র নামায জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তানযীহী।”
অতএব, প্রমাণিত হলো যে, রেযাখানীরা রেযা খাঁর যোগ্য শাগরিদ। কারণ রেযা খাঁ যেমন তার “রেজভীয়ায়” মাকরূহ্ তানযীহী বলে “রদ্দুল মুহতার” কিতাবের বরাত দিয়ে বিত্র নামায সম্পর্কিত ইবারতগুলো কারচুপি করেছে;
অনুরূপ তার যোগ্য শাগরিদ ইবারত চোর রেযাখানীরা তাদের গুরু রেযা খাঁকে অনুসরণ করে মাকরূহ তানযীহী বলে “রেজভীয়ার” বরাত দিয়ে রমজান মাস ব্যতীত বিত্র নামায জামায়াতের সাথে আদায় করা মাকরূহ্ তানযীহী সম্পর্কিত পরবর্তী ইবারতগুলো কারচুপি করেছে।
সে জন্যই বর্ণিত রয়েছে,
كل شيئ يرجع الى اصله.
অর্থাৎ- “প্রত্যেক বস্তু তার মূলের দিকেই প্রত্যাবর্তন করে।”
সুতরাং উপরোক্ত পর্যালোচনা থেকে এটাই প্রমাণিত হলো যে, মাকরূহ তানযীহী দ্বারা শবে বরাত, শবে ক্বদরের নামাযকে বুঝানো হয়নি। বরং মাকরূহ তানযীহী দ্বারা বিত্র নামাযকে বুঝানো হয়েছে। সেহেতু রেযা খাঁ বিত্র নামায সম্পর্কিত ইবারতগুলো কারচুপি করে শবে বরাত, শবে ক্বদর, রাগায়িব, তাহাজ্জুদ ইত্যাদি নফলের সাথে মিলিয়ে দিয়ে নিজেকে চরম প্রতারক হিসেবেই সাব্যস্ত করেছে। (চলবে)
মুহম্মদ মেজবাহ্ উদ্দীন (সুমন)
সভাপতি- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত
মহানগরী শাখা, চট্টগ্রাম।
সুওয়ালঃ “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে, রোজা অবস্থায় যে কোন ধরণের ইনজেকশন বা স্যালাইন নিলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়।
অথচ রেযাখানীদের অন্যতম মুরুব্বী মুফতী আহমদ ইয়ার খান তার “মিরআতুল মানাজীহ্” কিতাবের ৩য় খন্ডের ১৬৬ পৃষ্ঠায় লিখেছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থাৎ- “টিকা বা ইনজেকশনের দ্বারা রোজা ভঙ্গ হয়না। যেরূপ সাপ, বিচ্ছু ইত্যাদি কাটলে বা কামড় দিলে রোজা ভঙ্গ হয়না।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- আহমদ ইয়ার খানের সাপের উপর ইনজেকশনকে ক্বিয়াস করা ছহীহ্ হয়েছে কিনা? দলীল দ্বারা জাওয়াব দিয়ে ঈমান-আমল হিফাযত করবেন বলে আমি আশা করি।
জাওয়াবঃ ইনজেকশন সম্পর্কে মাসিক আল বাইয়্যিনাতে যা লিখা হয়েছে তাই সঠিক, গ্রহণযোগ্য ও দলীলভিত্তিক।
মুফতী আহমদ ইয়ার খান ইনজেকশন সম্পর্কে তার উক্ত কিতাবে যে মত পেশ করেছে তা মূলতঃ তার নিজস্ব মত নয় বরং উক্ত মতটি হচ্ছে দেওবন্দী মুরুব্বী আশরাফ আলী থানবীর। সে মূলতঃ এক্ষেত্রে থানবীকেই অনুসরণ করেছে।
উল্লেখ্য, ইনজেকশন সম্পর্কিত থানবীর বক্তব্য যে ভুল ও অশুদ্ধ তা মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ২১, ২২তম সংখ্যায় দলীলের দ্বারা অকাট্য ভাবেই প্রমাণ করা হয়েছে।
অতএব, বলার অপেক্ষাই রাখেনা যে, ইনজেকশন সম্পর্কিত আহমদ ইয়ার খানের উক্ত বক্তব্যও সম্পূর্ণ ভুল ও অশুদ্ধ।
কারণ আহমদ ইয়ার খান ইনজেকশনকে যে সাপ, বিচ্ছুর উপর ক্বিয়াস করেছে তার সে ক্বিয়াস মোটেও গ্রহণযোগ্য নয় বরং বাতিল ও পরিত্যাজ্য।
যারা সাপে কাটার সাথে ইনজেকশনকে তুলনা করে তাদের যুক্তি হলো, সাপে কাঁটলে যেমন বিষ ভিতরে প্রবেশ করা সত্যেও রোজা ভঙ্গ হয়না, তদ্রুপ ইনজেকশনেও রোজা ভাঙ্গবে না।
মূলতঃ ইনজেকশনের দ্বারা যে ওষুধ শরীরে প্রবেশ করানো হয়, তার সাথে সাপের বিষকে কখনো মিলানো যাবেনা, কেননা এ বিষ প্রবেশের ঘটনাটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। এ ব্যাপারে আরো বলা যেতে পারে, যেমন- রোজা রেখে আগরবাতী জ্বালালে, ধুমপান করলে, কোন গ্যাস নাক দিয়ে গ্রহণ করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়। কেননা এক্ষেত্রে সবগুলো কাজ ইচ্ছা শক্তির নিয়ন্ত্রনে। অথচ আমরা রাস্তায় চলা-ফেরার ও রান্না-বান্নার সময় যে ধোঁয়া গ্রহণ করি, তাতে রোজা ভঙ্গ হয়না। কেননা এটা আমাদের নিয়ন্ত্রনের বাইরে। অতএব, ইনজেকশনের সাথে সাপের বিষের সাথে কিয়াস করা সম্পূর্ণই ভুল। কারণ ইনজেকশন ইচ্ছাকৃতভাবেই দেয়া হয়।
অনুরূপ যদি কেউ ভুলে পেট ভরেও খাদ্য খায়, তবে তার রোজা ভঙ্গ হবেনা। কেননা হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من نسى وهو صائم فاكل او شرب فليتم صومه فانما اطعمه الله وسقاه.
অর্থঃ- “হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি রোজা অবস্থায় খেল অথবা পান করলো, সে যেন তার রোজা পূর্ণ করে নেয়। কেননা আল্লাহ্ পাকই তাকে খাদ্য খাইয়েছেন ও পান করায়েছেন।”
অতএব, এতে কোন সন্দেহ নেই যে, রোযা অবস্থায় ইনজেকশন নিলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। কেননা, চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে ইনজেকশনের দ্বারা প্রবেশকৃত ঔষধ পাকস্থলী ও মগজে পৌঁছে থাকে। আর শরীয়তের বিধান হলো, পাকস্থলী বা মগজে কিছু প্রবেশ করলেই রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। তা যে ভাবে এবং যে স্থান দিয়েই প্রবেশ করুন না কেন।
কারণ এর স্বপক্ষে ফিক্বাহ্ ও ফতওয়ার নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের অসংখ্য দলীল বিদ্যমান রয়েছে। যেমন, “হেদায়া মা’য়াদ দেরায়া” কিতাবের ১ম খন্ডের ২২০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
ومن احتقن … افطر لقوله صلى الله عليه وسلم الفطر مما دخل.
অর্থঃ- “এবং যদি কোন ব্যক্তি ইন্জেকশন নেয় … তাহলে রোযা ভঙ্গ হবে। কারণ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কিছু ভিতরে প্রবেশ করলে রোযা ভঙ্গ হবে।”
“বাহরুর রায়েক” কিতাবের ২য় খন্ডের ২৭৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
واذا احتقن … افطر لقوله عليه السلام الفطر مما دخل وليس مما خرج.
অর্থঃ- “যদি কোন ব্যক্তি ইন্জেকশন নেয় … তাহলে রোযা ভঙ্গ হবে। কারণ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কিছু ভিতরে প্রবেশ করলে রোযা ভঙ্গ হবে এবং বের হলে রোযা ভঙ্গ হবেনা।”
“ফতওয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবের ১ম খন্ডের ২০৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, ومن احتقن ….. افطر.
অর্থঃ- “এবং যদি কোন ব্যক্তি ইন্জেকশন নেয় … তাহলে রোযা ভঙ্গ হবে।” অনুরূপ “ফতওয়ায়ে শামীতে”ও উল্লেখ আছে।
অতএব, উপরোক্ত দলীলভিত্তিক আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, ইন্জেকশন নিলে রোযা ভঙ্গ হবে। সাথে সাথে এটাও প্রমাণিত হলো যে, আহমদ ইয়ার খানের বক্তব্য ও ক্বিয়াস সম্পূর্ণই ভুল, বিভ্রান্তিকর ও দলীলবিহীন।
{বিঃ দ্রঃ এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে, মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ২১, ২২, ৪৬ ও ৪৭তম সংখ্যা পাঠ করুন।}
{দলীলসমূহঃ (১) বুখারী, (২) মুসলিম, (৩) মিশকাত, (৪) ফতহুল বারী, (৫) উমদাতুল ক্বারী, (৬) ইরশাদাছ্ ছারী, (৭) শরহে নববী, (৮) ফতহুল মুলহিম, (৯) মুফহিম, (১০) মিরকাত, (১১) আশয়াতুল লুময়াত, (১২) লুময়াত, (১৩) শরহুত্ ত্বীবী, (১৪) তালিক্বুছ্ ছবীহ্, (১৫) মুযাহিরে হক্ব, (১৬) মাবছুত, (১৭) মাবছুত্ লি সারাখসী, (১৮) ফতহুল ক্বাদীর, (১৯) আলমগীরী, (২০) বাহরুর রায়েক্ব, (২১) ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া, (২২) হেদায়া মায়াদ দেরায়া, (২৩) শামী, (২৪) বাদায়েউছ্ ছানায়ে, (২৫) খুলাছুতল ফতওয়া, (২৬) Biopharmaceuties & Semisolids Chapter from the theory and practice of Industrial Pharmacy by leon Lachman/Herbert. A. Lieberman/Joseph L. Kanig. (২৭) Guyton’s medical physiology. (২৮) Remington’s pharmaceutical. (২৯) Goodman Gilman pharmacology. (৩০ Cunningham’s manuals of practical anatomy (৩১) Martindate Extra Pharmacopoeia. ইত্যাদি।
মাওলানা মুহম্মদ মুহসিনুর রহমান
মাওলানা মুহম্মদ মাছূম বিল্লাহ্
মুহম্মদ আসাদুর রহমান, মুহম্মদ মাইজুর রহমান
ভোলহাট, চাপাইনবাবগঞ্জ।
সুওয়ালঃ আমরা মাসিক আল বাইয়্যিনাত ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম এই তিনটি সংখ্যায় প্রদত্ত আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত-এর অনুসরণীয় ইমাম-মুজতাহিদ, মুহাক্কিক-মুদাক্কিক ও হক্কানী উলামা-ই-কিরামগণের ফতওয়া মুতাবিক জানতে পারলাম যে, “প্রাণীর ছবি তৈরী করা, ঘরে রাখা সর্বাবস্থায় হারাম।”
অথচ রেযাখানী মুখপত্র নভেম্বর/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় ছবি সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ফতওয়া প্রকাশ করেছে। যা কিনা মানুষের ঈমান-আমল বিনষ্ট করবে নিশ্চিতরূপে। রেযাখানীদের ছবি সম্পর্কিত বক্তব্যের যে বিষয়গুলো আপত্তিকর সেগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
(ক) রেযাখানীরা ছবি তোলাকে বৈধ বলেছে; কিন্তু দলীল হিসেবে পেশ করেছে ঘরে ছবি রাখা সম্পর্কিত হাদীসসমূহকে।
(খ) .. কতেক উলামা যেসব ছবির শরীর ও ছায়া নেই সেসব ছবিকে বৈধ বলেছেন।
(গ) হুজুর আকরাম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুরুর দিকে ছবি তৈরী করা ও সংরক্ষণ করাকে নিষেধ করেছিলেন; কিন্তু পরবর্তীতে অনুমতি দেন।
(ঘ) পূর্ববর্তীদের কেউ কেউ এবং হাম্বলী, শাফেয়ী, মালেকী এমনকি হানাফীদেরও কেউ কেউ নাকি (গায়রে মুজাস্সাম) শরীরবিহীন ছবিকে বৈধ বলেছেন।
(ঙ) সামাজিক, রাজনৈতিক, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের কারণে বিশেষ প্রয়োজনে ছবি তোলা বৈধ যা যুগের চাহিদাও।
(চ) প্রত্যেক যুগের ফক্বীহ্, মুফতী, কাজী ও আলিমগণ যুগের চাহিদা অনুযায়ী ফতওয়া দিয়েছেন এবং দেয়া উচিত।
(ছ) ছবি হারাম হওয়ার মূলে হলো গায়রুল্লাহ্র সম্মান ও ইবাদত।
(জ) প্রয়োজনীয় রেকর্ডের জন্য ফাইল বন্দি ছবিসমূহ এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের নিকট জ্ঞান ও ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য জানার নিমিত্তে সরকারী-বেসরকারী যাদুঘর বা বিশেষ প্রতিষ্ঠানসমূহে পূর্বের নানা মনীষীগণের ছবি সংরক্ষণ/ধারণ করে রাখা বিশেষ প্রয়োজনে মাকরূহ্ হবেনা।
এছাড়াও আরো বহু আপত্তিকর বিষয় তাদের উক্ত ছবি সম্পর্কিত বক্তব্যে স্থান পেয়েছে। কুরআন-সুন্নাহ্, ইজমা ও ক্বিয়াসের দৃষ্টিতে তাদের উল্লিখিত আপত্তিকর বক্তব্যগুলোর শরয়ী ফায়সালা কামনা করি।
জাওয়াবঃ আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্, নুরে মুজাস্সাম, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রেযাখানীদের ন্যায় এরূপ লোকদের সম্পর্কেই ইরশাদ করেন,
عن ابى هريرة رضى الله تعالى قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يكون فى اخر الزمان دجالون كذابون ياتونكم من الاحاديث بما لم تسمعوا انتم ولا ابائكم فاياكم واياهم لايضلونكم ولايفتنونكم.
অর্থঃ- “হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত- হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আখিরী যামানায় কিছু সংখ্যক মিথ্যাবাদী দাজ্জাল বের হবে, তারা তোমাদের নিকট এমনসব (মিথ্যা-মনগড়া) কথা উপস্থাপন করবে, যা তোমরা কখনো শুননি এবং তোমাদের বাপ-দাদারাও শুনেনি, সাবধান! তোমরা তাদের কাছ থেকে দূরে থাকবে, তবে তারা তোমাদেরকে গোমরাহ্ করতে পারবে না এবং ফিৎনায় ফেলতে পারবেনা।” (মুসলিম শরীফ)
উল্লিখিত হাদীস শরীফের পূর্ণ মেছদাক বা নমুনা হচ্ছে রেযাখানীরা। তারা ছবির ব্যাপারে এমন সব বক্তব্য প্রদান করেছে যা কিতাবে দেখা তো দূরের কথা কেউ কোন দিন শুনেও নাই। মূলতঃ রেযাখানীরা নিজেদেরকৃত বদ আমলকে ধামা-চাপা দেয়ার উদ্দেশ্যেই মনগড়াভাবে ছবিকে জায়েয করার অপচেষ্টা করেছে। যেমনটি করেছিলো, “ছানী আযান, তাহাজ্জুদের জামায়াত, বাইয়াত হওয়া, দুই সিজদার মাঝখানে পূর্ণ দোয়া পড়া, ধুমপান” ইত্যাদি বিষয়গুলোকে নিয়ে। কিন্তু মাসিক আল বাইয়্যিনাত তাদের সমস্ত ষড়যন্ত্র আর অপতৎপরতাকে নির্ভরযোগ্য দলীলের দ্বারা ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। ইনশাআল্লাহ্ তাদের ছবিকে জায়েয করার সকল ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতাকেও ছিন্নভিন্ন করে দেয়া হবে।
রেযাখানীরা ছবি জায়েয করার উদ্দেশ্যে যে সকল মনগড়া, বানোয়াট, জালিয়াতিপূর্ণ ও আপত্তিকর বক্তব্য প্রদান করেছে তা ধারাবাহিকভাবে পর্যায়ক্রমে খন্ডন করার পূর্বে ছবি হারাম হওয়ার দলীলগুলো সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করা হলো-
শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রাণীর ছবির
সঠিক ফায়ছালা
عن ابى كريب عن ابى معاوية رضى الله تعالى ان من اشد اهل النار يوم القيمة عذابا المصورون.
অর্থঃ “হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত, “নিশ্চয় ক্বিয়ামতের দিন দোযখবাসীদের মধ্যে ঐ ব্যক্তির কঠিন আযাব হবে, যে ব্যক্তি প্রাণীর ছবি আঁকে বা তোলে।” (মুসলিম শরীফ)
عن سعيد قال جاء رجل الى ابن عباس فقال انى رجل اصور هذه الصور فافتنى فيها فقال له ادن منى فدنا منه ثم قال ادن منى فدنا حتى وضع يده على رأسه وقال انبئك بما سمعت من رسول الله صلى الله عليه وسلم وسمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول كل مصور فى النار يجعل له بكل صورة صورها نفسا فتعذبه فى جهنم وقال ان كنت لابد فاعلا فاصنع الشجر ومالا نفس له.
অর্থঃ “হযরত সাঈদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, এক ব্যক্তি হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নিকট এসে বললো, “আমি এমন এক ব্যক্তি যে প্রাণীর ছবি অংকন করি, সুতরাং এ ব্যাপারে আমাকে ফতওয়া দিন।” হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তাকে বললেন, “তুমি আমার নিকটবর্তী হও।” সে ব্যক্তি তাঁর নিকটবর্তী হলো। পুনঃরায় বললেন, “তুমি আরো নিকটবর্তী হও।” সে আরো নিকটবর্তী হলে হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তার মাথায় হাত রেখে বললেন, “আমি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ ব্যাপারে যা বলতে শুনেছি তোমাকে তা বলবো। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক প্রাণীর ছবি তৈরীকারীই জাহান্নামে যাবে। এবং আল্লাহ্ পাক প্রত্যেকটি ছবিকে প্রাণ দিবেন এবং সেই ছবিগুলো তাদেরকে জাহান্নামে শাস্তি দিতে থাকবে।” এবং ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, “তোমার যদি ছবি আঁকতেই হয় তবে, গাছ-পালা বা প্রাণহীন বস্তুর ছবি আঁক।” (মুসলিম ২য় জিঃ, ২০২ পৃষ্ঠা)
عن ابى زرعة قال دخلت مع ابى هريرة دار بالمدينة فراها اعلاها مصورا يصور قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول ومن اظلم ممن ذهب يخلق كخلقى فليخلقوا حبة اوليخلقوا ذرة.
অর্থঃ “হযরত আবু যুরয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, আমি হযরত আবু হুরাইরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর সঙ্গে মদীনা শরীফের এক ঘরে প্রবেশ করলাম, অতঃপর তিনি ঘরের উপরে এক ছবি অংকনকারীকে ছবি অঙ্কন করতে দেখতে পেলেন, এবং বললেন আমি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেছেন, মানুষের মধ্যে ঐ ব্যক্তি অধিক অত্যাচারী, যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাক-এর সাদৃশ্য কোন প্রাণীর ছূরত সৃষ্টি করে। তাকে বলা হবে একটি দানা সৃষ্টি করো অথবা একটি কনা সৃষ্টি করো।” (বুখারী ২য় জিঃ, ৮৮০ পৃষ্ঠা, মুসলিম ২য় জিঃ, ২০২ পৃষ্ঠা)
قال حدثنا الاعمش عن مسلم قال كنا مع مسروق فى دار يسار بن نمير فرأى فى صفته تماثيل فقال سمعت عبد الله قال سمعت النبى صلى اله عليه وسلم يقول ان اشد الناس عذابا عند الله المصورون.
অর্থঃ “হযরত আ’মাশ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হযরত মুসলিম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেন- তিনি বলেন, আমি হযরত মাসরুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর সঙ্গে ইয়াসার ইবনে নুমাইরের ঘরে ছিলাম, তিনি তাঁর ঘরের মধ্যে প্রাণীর ছবি দেখতে পেলেন। অতঃপর বললেন, আমি হযরত আব্দুল্লাহ্র নিকট শুনেছি, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয় মানুষের মধ্যে ঐ ব্যক্তিকে আল্লাহ্ পাক কঠিন শাস্তি দিবেন, যে ব্যক্তি প্রাণীর ছবি তোলে বা আঁকে।” (বুখারী ২য় জিঃ, ৮৮০ পৃষ্ঠা)
عن عبد الله بن عمر اخبره ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال ان الذين يصنعون هذه الصور يعذبون يوم القيمة يقال لهم احيوا ما خلقتم.
অর্থঃ “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “যারা প্রাণীর ছবি তৈরী করবে, ক্বিয়ামতের দিন তাদের কঠিন শাস্তি দেয়া হবে এবং তাদেরকে বলা হবে, যে ছবিগুলো তোমরা তৈরী করেছ, সেগুলোর মধ্যে প্রাণ দান কর।” (বুখারী ২য় জিঃ, ৮৮০ পৃষ্ঠা, মুসলিম ২য় জিঃ, ২০১ পৃষ্ঠা)
عن عائشة قالت قدم رسول الله صلى الله عليه وسلم من سفر وسترت بقرام لى على سهوة لى فيها تماثيل فلما رأه رسول الله صلى الله عليه وسلم هتكه وقال اشد الناس عذابا يوم القيامة الذين يضاهون بخلق الله.
অর্থঃ- “হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন এক সফর থেকে ঘরে আসলেন, আর আমি আমার ঘরের আঙ্গিনায় প্রাণীর ছবিযুক্ত একখানা পর্দা ঝুলিয়েছিলাম। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওটা দেখে ছিঁড়ে ফেললেন এবং বললেন, “মানুষের মধ্যে ঐ ব্যক্তির ক্বিয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি হবে, যে আল্লাহ্ পাক-এর সৃষ্টির সাদৃশ্য কোন প্রাণীর ছূরত তৈরী করে।”
(ফত্হুল বারী ১০ম জিঃ ৩৮৬ পৃষ্ঠা, মুযাহিরে হক্ব ৪র্থ জিঃ ২৪৬ পৃষ্ঠা, রিয়াজুস সলেহীন ৬১০ পৃষ্ঠা, আশয়াতুল লুমআত ৩য় জিঃ ৫৯২ পৃষ্ঠা, ফিকহুস সুন্নাহ ৩য় জিঃ ৫০২ পৃষ্ঠা, তরজুমানুস সুন্নাহ ৩য় জিঃ ৩৪৮ পৃষ্ঠা, শরহে সুয়ূতী নাসাঈ ৮ম জিঃ ২১৪ পৃষ্ঠা, হাশিয়ায়ে সিন্দী নাসাঈ ৮ম জিঃ ২১৪ পৃষ্ঠা, মু’য়জামুল মুফহারিস ৩য় জিঃ ৪৪০ পৃষ্ঠা, নাসাঈ ২য় জিঃ ৩০০ পৃষ্ঠা, ইবনে মাযাহ্ ২৬৮ পৃষ্ঠা, মুসলিম ২য় জিঃ ২০১ পৃষ্ঠা ইত্যাদি।)
عن عائشة رضى الله عنها قالت دخل على رسول الله صلى الله عليه وسلم وانا مسترة بقرام فيه صورة فتلون وجهه ثم تناول الستر فهتكه ثم قال ان من اشد الناس عذابا يوم القيامة الذين يشبهون بخلق الله.
অর্থঃ “হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার নিকট আসলেন, আর আমি (প্রাণীর ছবিযুক্ত) একটি চাদর গায়ে দেয়া ছিলাম। (ওটা দেখে) হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেহারা মুবারক রঙ্গিন হয়ে গেল। অতঃপর তিনি ওটা টেনে নিয়ে ছিঁড়ে ফেললেন। এবং বললেন, “নিশ্চয় মানুষের মধ্যে ক্বিয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তির কঠিন শাস্তি হবে, যে আল্লাহ্ পাক-এর সৃষ্টির সাদৃশ্য কোন প্রাণীর ছূরত তৈরী করবে।”
(শরহে নববী ৭ম জিঃ ৮৯ পৃষ্ঠা, মুযাহিরে হক্ব ৪র্থ জিঃ ২৪৬ পৃষ্ঠা, মুসনদে আহমদ ২য় জিঃ ২১৭ পৃষ্ঠা, তাহাবী ২য় জিঃ ৩৬৩ পৃষ্ঠা, তোহফায়ে খাওয়াতীন ৯১১ পৃষ্ঠা, মু’য়জামুল মুফহারিস ৩য় জিঃ৪৩৮ পৃষ্ঠা ইত্যাদি।)
উল্লিখিত হাদীস শরীফসমূহ দ্বারা সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হলো যে, প্রাণীর ছবি তৈরী করা বা করানো সম্পূর্ণই হারাম ও নাজায়েয। (চলবে)
(পরবর্তী সংখ্যা পর্যন্ত ধৈর্য্য ধারণ করুন)
মুহম্মদ আমিনুজ্জামান
পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম।
সুওয়ালঃ হাটহাজারী মাদ্রাসা-থেকে প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকার আগষ্ট/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-সমাধান বিভাগে নিম্নোক্ত জিজ্ঞাসা-সমাধান ছাপা হয়।
জিজ্ঞাসাঃ- …….. আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাটি’র তৈরী না নূরের তৈরী?
সমাধানঃ- ……… কুরআন, হাদীস, তাফসীর, ফিক্বাহ প্রভৃতি গ্রন্থাদির আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষ। আর মানুষ মাটির তৈরী। সুতরাং হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নূরের তৈরী বলা মারাত্মক বেআদবী।
এখন আমার সুওয়াল হলো- হাটহাজারীর মুখপত্র অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি?
জাওয়াবঃ না, হাটহাজারীর মুখপত্রের উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়নি। বরং ভুল ও অশুদ্ধ হয়েছে। কারণ আখিরী রসূল নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাটির তৈরী নন। তিনি নূরের তৈরী। তাই বলা হয় তিনি নূরে মুজাস্সাম। অর্থাৎ তিনি আপাদমস্তক নূর।
কেননা স্বয়ং মহান আল্লাহ্ পাক তাঁর কালামে পাকে ‘রসূলকে’ নূর বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন মহান আল্লাহ পাক “সূরায়ে মায়েদা” -এর ১৫ নং আয়াত শরীফে ইরশাদ করেন,
قد جاءكم من الله نور.
অর্থঃ- “নিশ্চয় তোমাদের নিকট আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে ‘নূর’ এসেছেন। (সূরা মায়িদা/১৫)
উল্লেখ্য, এ আয়াত শরীফে মহান আল্লাহ্ পাক “নূর” শব্দ দ্বারা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেই বুঝিয়েছেন, যেহেতু তিনি আপাদমস্তক “নূর বা নূরের তৈরী।”
আর “মুফাস্সিরীন-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ বলেন, উক্ত ‘নূর’ হচ্ছেন- ‘নূরে মুজাস্সাম হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।”
যেমন ক্বাজিউল কুজাত ইমাম আবূ সাউদ মুহম্মদ ইবনে মুহম্মদ ইমাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর মশহুর তাফসীর “তাফসীরে আবী সাউদ”-এর ৩য় জিঃ ১৮ পৃষ্ঠায় লিখেন,
(قد جاء كم من الله نور) …… المراد بالاول هو الرسول صلى الله عليه وسلم.
অর্থঃ- “বর্ণিত আয়াত শরীফের প্রথম শব্দ অর্থাৎ নূর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম।”
হাদীস শরীফে স্বয়ং আখিরী রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজেই নিজেকে নূরের তৈরী বলে উল্লেখ করেছেন বলে অসংখ্য হাদীস বিদ্যমান রয়েছে। যেমন, ইরশাদ হয়েছে,
عن جابر رضى الله تعالى عنه قال …….. اخبرنى عن اول شيئ خلق الله تعالى قبل الاشياء قال ياجابر! ان الله تعالى قد خلق قبل الاشياء نور نبيك.
অর্থঃ- “হযরত জাবের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত …… আমাকে জানিয়ে দিন যে, আল্লাহ্ পাক সর্বপ্রথম কোন জিনিস সৃষ্টি করেন? তিনি বললেন, হে জাবের! আল্লাহ্ পাক সব কিছুর পূর্বে তোমার নবীর নূরকে সৃষ্টি করেন ……।”
অন্য হাদীস শরীফে আরো সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, রসূল ‘নূরের তৈরী। যেমন, এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
عن على رضى الله عنه …….. قلت يارب مم خلقتنى قال الله تعالى يامحمد نظرت الى صفاء بياض نورى الذى خلقته بقدرتى وابدعته بحطمى واضفته تشريفا الى عظمتى فستخرجت منه جزأ فقسمته ثلاثة اقسام فخلقتك واهل بيتك من القسم الاول وخلقت ازواجك واصحابك من القسم الثانى وخلقت من احبك من القسم الثالث …..
অর্থঃ- “হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। সাইয়্যিদুল মুরসালীন ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- হে আমার রব! আমাকে কি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন? জবাবে আল্লাহ্ পাক বলেন, হে মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমি আমার (সৃষ্টিকৃত) সাদা নূর (যা নূরে মুহম্মদী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর স্বচ্ছতা ও নির্মলতার প্রতি লক্ষ্য করলাম, যে নূরকে আমি কুদরতের দ্বারা আমার হুকুমে প্রথমেই সৃষ্টি করে রেখেছিলাম। আমি সম্মান প্রকাশার্থে উক্ত নূরকে من نورى অর্থাৎ আমার নূর বলে সম্বোধন করি। অতঃপর উক্ত নূর থেকে একটি অংশ বের করে নিলাম অর্থাৎ “নূরে মুহম্মদী” ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তিন ভাগে ভাগ করলাম। প্রথম ভাগ দ্বারা আপনাকে অর্থাৎ আপনার আকৃতি মুবারককে ও আপনার আহলে বাইতকে সৃষ্টি করি, দ্বিতীয় ভাগ দ্বারা আপনার স্ত্রী ও ছাহাবীগণকে সৃষ্টি করি, আর তৃতীয় ভাগ দ্বারা যারা আপনার প্রতি মুহব্বত রাখেন তাঁদেরকে সৃষ্টি করেছি”…..(নূরে মুহম্মদী পৃষ্ঠা- ৪৭)”
অনুসরণীয় সকল ইমাম-মুজতাহিদগণের অভিমত হলো- রসূল ‘নূর।’ এ প্রসঙ্গে বাহ্রুল উলুম আল্লামা ইবনে সাবা রহমতুল্লাহি আলাইহি ‘শেফাউছ ছুদূরে’ লিখেন, لانه كان نورا.
অর্থঃ- “…….. সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন ‘নূর’ অর্থাৎ ‘নূরে মুজাস্সাম।”
আল্লামা জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি “খাছায়েছুল হাবীব” কিতাবে লিখেন,
لانه كان نورا.
অর্থঃ- “…….. কেননা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘নূর’ অর্থাৎ নূরে মুজাস্সাম।”
বিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা শিহাবুদ্দীন খাফফাজী রহমতুল্লাহি আলাইহি “নাসীমুর রিয়াজ” নামক গ্রন্থে লিখেন, لانه صلى الله عليه وسلم نورا.
অর্থঃ- “…….. কেননা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘নূর’ অর্থাৎ নূরে মুজাস্সাম” অনুরূপ আরো অনেকই তাঁদের নিজ নিজ কিতাবে “রসূলকে নূর বা নূরের তৈরী বলেছেন।
দ্বিতীয়তঃ- হাটহাজারীর মুখপত্রে লিখেছে, “নবী কারীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষ। আর মানুষ মাটির তৈরী।”
এর জবাবে বলতে হয় যে, হাটহাজারীর মুখপত্রের উক্ত বক্তব্যও ভুল হয়েছে। কারণ মানুষ মাটির তৈরী বলতে সকল মানুষকে বুঝানো হয়নি। বরং কুরআন শরীফে বাশার, ইনসান বা মানুষ মাটির তৈরী বলতে একমাত্র আদম আলাইহিস্ সালামকে বুঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ্ পাক বলেছেন,
اذ قال ربك للملئكة انى خالق بشرا من طين.
অর্থঃ- “যখন আপনার পালনকর্তা ফেরেশ্তাদেরকে বললেন, আমি মাটির মানুষ সৃষ্টি করবো। (সূরা ছোয়াদ/৭১)
আল্লামা আবুল লাইছ সামারকান্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি “তাফসীরে সামারকান্দী”-এর ৩য় জিঃ, ১৪১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
(انى خالق بشرا من طين) يعنى ادم عليه السلام.
অর্থঃ- “(নিশ্চয়ই আমি সৃষ্টি করবো মাটি থেকে বাশার) অর্থাৎ হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে।”
আল্লাহ্ পাক আরো বলেন,
ولقد خلقنا الانسان من صلصال من حما مسنون.
অর্থঃ- “আমি মানুষকে পচা কাঁদা থেকে তৈরী শুকনো ঠন ঠনে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছি।” (সূরা হিজর/২৬)
আল্লামা ইমাম বাগবী রহমতুল্লাহি আলাইহি “তাফসীরে বাগবী”-এর ৩য় জিঃ, ৯৪ পৃষ্ঠায় লিখেন,
(ولقد خلقنا الانسان) اى ادم عليه السلام (من صلصال) طين يابس.
অর্থঃ- “নিঃসন্দেহে আমি ইনসানকে অর্থাৎ হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে শুকনো মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি।”
আল্লামা ইমাম কুরতুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি “তাফসীরে কুরতুবী”-এর ৫ম জিঃ, ২১ পৃষ্ঠায় লিখেন,
(ولقد خلقنا الانسان) يعنى ادم عليه السلام (من صلصال) اى طين يابس عن ابن عباس وغيره.
অর্থঃ- “(নিঃসন্দেহে আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি) অর্থাৎ হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে সৃষ্টি করেছি শুকনো মাটি থেকে। হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুও অন্যান্য মুফাস্সিরগণ থেকে এরূপ ব্যাখ্যাই বর্ণিত হয়েছে।”
উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, একমাত্র আদম আলাইহিস্ সালাম ব্যতীত কোন মানুষকেই মাটির দ্বারা সৃষ্টি করা হয়নি এবং হয় না। সকলকে মায়ের রেহেম শরীফে কুদরতীভাবে সৃষ্টি করা হয়।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক তাঁর কালাম পাকে ইরশাদ করেন, يصوركم فى الارحام كيف يشاء.
অর্থঃ- “তিনি (আল্লাহ্ পাক) মায়ের রেহেম শরীফে তোমাদের আকৃতি গঠন করে থাকেন যেভাবে চান সেভাবে।” (সূরা আলে ইমরান/৬)
মাটি মূলতঃ নূর থেকে সৃষ্টি
উল্লেখ্য, কুরআন শরীফে মাটির তৈরী বলতে একমাত্র আদম আলাইহিস্ সালামকে বুঝানো হয়েছে। কুরআন শরীফে কোথাও হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মাটির তৈরী বলে উল্লেখ করা হয়নি। বরং কুরআন শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নূর বলা হয়েছে। অর্থাৎ নূরে মুজাস্সাম হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আর মাটিসহ সমস্ত কিছুই তাঁর নূর থেকে সৃষ্টি। যেমন, হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
كل شئ من نورى.
অর্থঃ- “আমার নূর অর্থাৎ নূরে মুহম্মদি থেকে সব সৃষ্টি হয়েছে।”
আর হযরত জাবের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত হাদীস শরীফেও তাঁর প্রমাণ পাওয়া যায়।
যেমন, হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
فلما اراد الله تعالى ان يخلق الخلق قسم ذالك النور اربعة اجزاء يخلق من الجزء الاول القلم ومن الثانى اللوح ومن الثالث العرش ثم قشم الرابع اربعة اجزاء يخلق من الاول حملة العرش ومن الثانى الكرسى ومن الثالث باقى الملئكة ثم قسم الرابع اربعة اجزاء يخلق من الاول السموت ومن الثانى الارضين.
অর্থঃ- “….. অতঃপর যখন মহান আল্লাহ্ পাক ‘মাখলুকাত’ সৃষ্টি করার ইচ্ছা পোষণ করলেন তখন সেই ‘নূর’ মুবারক (অর্থাৎ “নূরে মুহম্মদী থেকে একটি অংশ নিয়ে তাঁকে) চার ভাগ করলেন। প্রথম ভাগ দ্বারা ‘কলম’ দ্বিতীয় ভাগ দ্বারা ‘লওহে মাহ্ফুজ’ তৃতীয় ভাগ দ্বারা ‘আরশে মুয়াল্লা’ সৃষ্টি করলেন। চতুর্থ ভাগকে আবার চার ভাগ করেন। প্রথম ভাগ দ্বারা ‘আরশ বহনকারী ফেরেশ্তা, দ্বিতীয় ভাগ দ্বারা ‘কুরসী’ আর তৃতীয় ভাগ দ্বারা অন্যান্য সব ফেরেশ্তাদেরকে সৃষ্টি করেন। অতঃপর এ চতুর্থ ভাগকে আবার চার ভাগ করেন। প্রথম ভাগ দ্বারা ‘আসমান’ আর দ্বিতীয় ভাগ যমীন অর্থাৎ মাটি সৃষ্টি করেন ….।”
উপরোক্ত ছহীহ্ হাদীস শরীফের বর্ণনা দ্বারা সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হলো যে, মাটিসহ সমস্ত কিছু তাঁর নূর থেকে সৃষ্টি। এতে বুঝা যাচ্ছে মাটিও নূরের একটা অংশ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পানির তিনটি ছূরত। (১) পানির সাধারন অবস্থা তরল, (২) পানিকে তাপ দিলে তা বাতাস বা বায়বীয় পদার্থ হয়ে যায়, (৩) পানিকে ঠান্ডা করলে তা বরফ বা শক্ত পদার্থে পরিণত হয়ে যায়।
এখন যদি উক্ত বায়বীয় পদার্থকে ঠান্ডা করা হয় তাহলে তা পূর্বের মত তরল পদার্থ বা পানিতে পরিণত হবে। একইভাবে যদি বরফকে তাপ দেয়া হয় তাহলে উক্ত বরফ বা শক্ত পদার্থটিও তরল পদার্থে বা পানিতে পরিণত হয়ে যাবে।
উল্লেখ্য, যেই পানি নূর থেকে সৃষ্টি সেই পানির যদি তিন তিনটি ছূরত হতে পারে তাহলে নূরে মুহম্মদি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা থেকে সবকিছু সৃষ্টি তাঁর কত ছূরত হতে পারে সেটা চিন্তা-ফিকিরের বিষয়। অর্থাৎ মাটি নূরের একটা ছূরত ও তার অংশ।
তৃতীয়তঃ হাটহাজারীর মুখপাত্ররা তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে দলীল হিসেবে সূরা কাহাফ-এর ১১০ আয়াত শরীফের বরাত দিয়েছে।
এর জবাবে বলতে হয় যে, প্রকৃত পক্ষে তাদের উক্ত আয়াত শরীফের শানে নুযূল এবং তার সঠিক ব্যাখ্যা নাজানার কারণেই উক্ত আয়াত শরীফকে দলীল হিসেবে পেশ করেছে। কারণ উক্ত আয়াত শরীফে انا بشر مثلكم অর্থাৎ আমি তোমাদের মত বাশার একথার অর্থ এই নয় যে, “আমি তোমাদের মত মাটির মানুষ” আর উক্ত আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় তাফসীরের নির্ভরযোগ্য কোন কিতাবেই এধরণের কথা উল্লেখ নেই। যেখানে আমরা প্রথমেই প্রমাণ করেছি যে, হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম ব্যতীত কোন মানুষই মাটির তৈরী নয়। সেখানে উক্ত আয়াত শরীফের অর্থ- “আমি তোমাদের মতই মাটির তৈরী” কি করে শুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে? মূলতঃ এরূপ অর্থ মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ তা অনুসরণীয় মুফাস্সিরগণ সর্বসম্মত মতের সম্পূর্ণই বিপরীত।
আমরা যদি উক্ত আয়াত শরীফের “শানে নূযুল” ও সঠিক তাফসীর পর্যালোচনা করি তবে সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হবে যে, তাদের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণই অশুদ্ধ ও অজ্ঞতামূলক।
যেমন আল্লাহ্ পাক বলেন,
قال انما انا بشر مثلكم يوحى الى.
অর্থঃ- “(হে হাবীব) আপনী বলুন, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মত বাশার (তবে) আমার প্রতি ওহী নাযিল হয়।” (সূরা কাহ্ফ/১১০)
আয়াত শরীফের শানে নুযুল
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
فضلت على الانبياء بست اعطيت بجوامع الكلم، نصرت بالرعب، احلت لى الغنائم، جعلت لى الارض مسجدا وطهورا، ارسلت الى الخلق، وختم بى النبيون.
অর্থঃ- “আমাকে অন্যান্য নবীগণের উপর ছয়টি বিশেষ ফযীলত দেয়া হয়েছে (১) আমাকে (সৃষ্টি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত) সকল বিষয়ে ইল্ম দান করা হয়েছে, (২) আমাকে রো’ব বা ভীতি সঞ্চারক শক্তি দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে, (৩) আমার জন্যে গণীমতের মাল হালাল করা হয়েছে, (৪) আমার জন্যে সমস্ত জমিনকে মসজিদ ও পবিত্র করে দেয়া হয়েছে, (৫) আমাকে সকল মাখলুকাতের জন্যে নবী হিসেবে পাঠানো হয়েছে, (৬) এবং আমার দ্বারা নুবুওওয়াত খতম করা হয়েছে।” (মিশকাত, মিরকাত, লুময়াত, ত্বীবী)
স্মর্তব্য যে, উল্লিখিত ৬টি বিশেষ ফযীলতের মধ্যে অন্যতম একটি ফযীলত হচ্ছে ‘রোব’। অর্থাৎ ভীতি সঞ্চারক শক্তি।” এ রো’বের কারণেই কাফেররা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম মুবারক শুনলে এক মাসের দূরের রাস্তা থেকে ভয়ে থর থর করে কাঁপতো। এমনকি হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণও মাঝে মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থা হারিয়ে ফেলতেন। তখন তাদেরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্যে এবং সাধারণ লোক যেন সেই রো’ব-এর কারণে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে ইসলাম গ্রহণ করা হতে বিরত না থাকে এবং তাঁর ছোহবত থেকে দূরে না থাকে সেজন্যই মহান আল্লাহ্ পাক উক্ত আয়াত শরীফ নাযিল করেন।
কেউ কেউ বলেন, হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম-এর অসংখ্য মু’জিযা দর্শন করে খ্রীষ্টানরা যেরূপ হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালামকে আল্লাহ্ পাক-এর বেটা সাব্যস্ত করেছিল, ঠিক তদ্রুপ আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মু’জিযা সমূহ দর্শন করে কাফিররা যেন শিরক না করে। তাই মহান আল্লাহ্ পাক উক্ত আয়াত শরীফ নাযিল করেন। আবার কেউ কেউ বলেন, মহান আল্লাহ্ পাক সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিনয় প্রকাশার্থেই উক্ত আয়াত শরীফ নাযিল করেন।
আয়াত শরীফের তাফসীর
মূলতঃ উক্ত আয়াত শরীফ দ্বারা একথাই প্রমাণ করা হয়েছে যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবশ্যই ‘বাশার’ আর তিনি বাশার বলেই ‘মানুষ হয়েছে আশরাফুল মাখলুকাত। তিনি যদি ফেরেশ্তার অন্তর্ভূক্ত হতেন তবে অবশ্যই ফেরেশ্তা হয়ে যেত আশরাফুল মাখলুকাত। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ‘বাশার’ হিসেবে অস্বীকার করা মূলতঃ কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফকে অস্বীকার নামান্তর এবং আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদার খিলাফ।
কারণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামসহ হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম পর্যন্ত যত নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালাম পৃথিবীতে তাশরীফ এনেছেন তারা সবাই বাশার ছিলেন। যেমন- এ প্রসঙ্গে “শরহে আক্বাইদে নসফীতে” উল্লেখ আছে,
الرسول انسان بعثه الله تعالى الى الخلق لتبليغ الاحكام.
অর্থঃ- “শরীয়তের পরিভাষায় রসূল এমন একজন বাশারকে বলা হয়, যাকে আল্লাহ্ তায়ালা মানবজাতির নিকট তাঁর বিধান পৌঁছিয়ে দেয়ার জন্য পাঠিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে শরহে আক্বাইদে নসফীতে আরো উল্লেখ আছে,
وقد ارسل الله تعالى رسلا من البشر الى البشر مبشرين ومنذرين اولهم ادم واخرهم محمد صلى الله عليه وسلم.
অর্থঃ- “আল্লাহ্ তায়ালা মানুষের মধ্য হতে কিছু মানুষকে মানব জাতির নিকট রসূলরূপে প্রেরণ করেছেন, যাঁরা ছিলেন বেহেস্তের সুসংবাদদাতা ও দোযখের ভয় প্রদর্শনকারী। তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রথম হলেন হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম এবং সর্বশেষ হলেন মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।”
অতএব, প্রমাণিত হলো যে, আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত-এর আক্বীদা এটাই যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সহ সকল নবী-রসূল আলাইহিস্ সালামগণই ‘বাশার’ ছিলেন। তবে তাঁদেরকে “অন্যান্য মানুষের মত” সাধারণ ‘বাশার’ মনে করা যাবেনা, কেননা এটা কাফিরদেরই রীতি। কারণ কাফিররাই নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণকে সাধারণ মানুষ মনে করতো। এর বহু প্রমাণ পবিত্র কালামে পাকে রয়েছে। যেমন- এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ পাক “সূরায়ে ফুরকান” -এর ৭ নং আয়াত শরীফে ইরশাদ করেন,
وقالوا مال هذا الرسول يأكل الطعام ويمشئ فى الاسواق.
অর্থঃ- “তারা (কাফিররা) বলে যে, এ কেমন রসূল যে খাবার খায় এবং বাজারে চলাফেরা করে।”
মহান আল্লাহ্ পাক “সূরা আম্বিয়া”-এর ৩ নং আয়াত শরীফে আরো ইরশাদ করেন,
واسروا النجوى الذين ظلموا هل هذا الا بشر مثلكم افتأتون السحر والنتم تبصرون.
অর্থঃ- “এ জালিমরা পরস্পরে এ বলে কানা ঘুষা করে যে, এ লোকটি (মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদের মত মানুষ ছাড়া আর কি? তা সত্ত্বেও তোমরা কি দেখে শুনে যাদুর শিকার হবে?”
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, কাফিররাই তাদের প্রতি প্রেরিত নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণকে “তাদের মত” সাধারণ মানুষ মনে করতো। তাই তারা তাঁদের প্রতি ঈমান আনা থেকে বিরত ছিল। কাজেই সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কখনোই “আমাদের মত” সাধারণ মানুষ মনে করা যাবেনা।
এখন কেউ বলতে পারেন, মহান আল্লাহ্ পাক তো নিজেই বলেছেন, “হে হাবীব! আপনি বলুন, “আমি তোমাদের মত বাশার”। তাহলে রসূলকে “আমাদের মত” মনে করা যাবেনা কেন? মূলতঃ উক্ত আয়াত শরীফ দ্বারা “রসূল আমাদের মত সাধারণ মানুষ” একথা বুঝানো হয় নাই। বরং এটাই বুঝানো হয়েছে যে, “রসূল বাশার তবে তোমাদের মত সাধারণ মানুষ নন। কারণ রসূলের প্রতি ওহী নাযিল হয়। তোমাদের প্রতি ওহী নাযিল হয়না। অর্থাৎ ‘ছূরতান’ তিনি তোমাদের মত হলেও “হাক্বীক্বতান” তিনি তোমাদের মত নন। উক্ত আয়াত শরীফের তাফসীরে মুফাস্সিরীন-ই-কিরামগণ এ দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। যেমন- আল্লামা আলাউদ্দীন আলী ইবনে মুহম্মদ ইবনে ইব্রাহীম বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “তাফসীরে খাযেন”-এর ৩য় জিঃ, ১৯৩ পৃষ্ঠায় লিখেন,
قل انما انا بشر مثلكم قال ابن عباس رضى الله عنه علم الله تعالى رسوله صلى الله عليه وسلم التواضع لئلا يزهى على خلقه فامره الله ان يقر فيقول انا ادمى مثلكم الا انى خصصت بالوحى واكرمنى الله تعالى به وهو قوله تعالى يوحى الى.
অর্থঃ- “হে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনি লোকদেরকে বলে দিন যে, আমি তোমাদের মতই বাশার। এ আয়াতের তাফসীরে হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন যে, আল্লাহ্ তায়ালা আপন নবীকে বিনয়ী হওয়ার তা’লীম দিয়েছেন, যেন তিনি মানুষের সাথে অহংকার না করেন এবং তাঁকে একথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি তোমাদের মতই একজন বাশার। তবে তোমাদের উপর আমাকে ওহীর দ্বারা বৈশিষ্ট্য (ফযীলত) প্রদাণ করা হয়েছে এবং উক্ত ওহীর দ্বারা আল্লাহ্ আমাকে সম্মানিত করেছেন। “আমার নিকট ওহী নাযিল করা হয়” একথা দ্বারা অন্যান্য বাশারের চেয়ে তাঁর (বিশাল) মর্যাদার বিষয়টি বুঝানো হয়েছে।”
উপরোক্ত বিস্তারিত আলোচনা দ্বারা মূলতঃ তিনটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠলো-
(১) সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘বাশার’ তিনি জ্বিন, ফেরেশ্তা, খোদার বেটা, খোদার জাতের অংশ ও খোদার অবতার নন।
(২) নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণকে সাধারণ মানুষের ন্যায় ‘বাশার’ মনে করা কাফির মুশরিকদের রীতি। কারণ প্রত্যেকে যুগের কাফির মুশরিকদেরই নবী-রসূলগণকে সাধারণ মানুষের মত মনে করে ঈমান আনা থেকে বিরত রয়েছে।
(৩) উক্ত আয়াত শরীফের তাফসীরে থেকেও একথা উল্লেখ নেই যে, “مثلكم” শব্দ দ্বারা মাটির তৈরীর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বরং বাহ্যিক সাদৃশ্যতাই বর্ণনা করা হয়েছে।
মূলতঃ তিনি ছুরত বা আকৃতি ও সিফাতে বাশারীর দিক থেকে আমাদের মত অর্থাৎ আমাদের যেরূপ হাত, পা, নাক, কান, চোখ, মুখ ইত্যাদি রয়েছে এবং আমরা যেরূপ খাদ্য খাই, ঘর সংসার করি বাহ্যিক দৃষ্টিতে তিনিও তদ্রুপ। হাক্বীক্বতান বা প্রকৃতপক্ষে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কারো মত নন। আর তাই সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لست كاحدكم.
অর্থঃ- “আমি তোমাদের কারো মত নই।” (বুখারী, মুসলিম)
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, আল্লাহ্ পাক পবিত্র কুরআন শরীফে বলেন, “আপনি বলুন, আমি তোমাদের মত বাশার।”
আর “মুসলিম শরীফের” হাদীসে স্বয়ং আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আমি তোমাদের কারো মত নই।” তবে এ উভয় বর্ণনার ফায়সালা কি? এর ফায়সালা হলো- মহান আল্লাহ্ পাক কালামুল্লাহ্ শরীফে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জাহিরান ও ছুরতান দিকটি বর্ণনা করেছেন। আর স্বয়ং আল্লাহ্ পাক-এর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীস শরীফে নিজের বাতিনী বা হাক্বীক্বী অবস্থা বর্ণনা করেছেন। কেননা জাহিরান বা ছূরতান আমাদের সাথে কিছুটা মিল থাকলেও হাক্বীক্বতান আমাদের সাথে আসমান-যমিন এমনকি তাঁর চাইতেও বেশী পার্থক্য রয়েছে।
অতএব, কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, তাফসীর, আক্বাঈদ দ্বারা অকাট্য ভাবে প্রমাণিত হলো যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নূরের তৈরী।
শুধু তাই নয়, পৃথিবীর প্রায় সকল বিখ্যাত ও অনুসরণীয় হক্কানী ওলামা-ই-কিরামগণ যেমন, রঈসুল মুহাদ্দিসীন, আল্লামা হযরত জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমামুল মুফাস্সিরীন, আল্লামা হাফেজ ইবনে জাওযী রহমতুল্লাহি আলাইহি, বাহরুল উলূম, আল্লামা ইবনে সাবা রহমতুল্লাহি আলাইহি, শায়খুল ওলামা, আল্লামা শায়খ ইব্রাহীম বেজোরী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমামুল মুহাদ্দিসীন, আল্লামা মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হাফিজুল হাদীস, আওলাদে রসূল আল্লামা সাইয়্যিদ যুরকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ওলীয়ে কামিল আল্লামা হুসাইন ইবনে মুহম্মদ দিয়ারে বিরকী রহমতুল্লাহি আলাইহি, আশেকে রসূল, আল্লামা সুলায়মান জামাল রহমতুল্লাহি আলাইহি, ফক্বীহুল উম্মত শায়খ মুহম্মদ তাহের রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমামুল জলীল আল্লামা কাজী আয়াজ রহমতুল্লাহি আলাইহি, আলিমুল ফাযিল আল্লামা মুহম্মদ বিন সিবান রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমামুল আইম্মা আল্লামা আহমদ বিন মুহম্মদ কুস্তলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি, বিখ্যাত বুযুর্গ ইমাম ইবনে হাজর মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি, তাজুল মুফাস্সীরিন, আল্লামা মাহমূদ নাসাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি, কাইয়্যূমুজ্জামান হযরত মুজাদ্দিদে আলফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি, শায়খুল মুহাদ্দিসীন শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ফক্বীহুল আছর, আল্লামা শাহ্ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ও বিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা শিহাবুদ্দীন খাফফাজী রহমতুল্লাহি আলাইহিসহ আরো অনেকে তাঁদের নিজ নিজ কিতাবসমূহে উল্লেখ করেন যে, “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘নূর’ তথা নূরে মুজাস্সাম অর্থাৎ তিনি আপাদমস্তক নূর। এটাই আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা। আর এই আক্বীদাই পোষণ করা প্রত্যেক নর-নারীর জন্য ফরয।
সুতরাং হাটহাজারীর মুখপাত্ররা যে বলেছে, হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নূরের তৈরী বলা মারাত্মক বেআদবী। তাদের এ বক্তব্যই মারাত্মক বেআদবী, ভুল, ডাহা মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, দলীল বিহীন ও কুফরী। এ প্রকারের কুফরী আক্বীদা থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মুসলমান নর ও নারীর জন্য ফরয ও ওয়াজিব।
উল্লেখ্য, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নূরে মুজাস্সাম অর্থাৎ নূরের তৈরী, মাটির তৈরী নন। অথবা নূর ও মাটি মিশ্রিতও নন।
এ সম্পর্কে ২৪১টি কুরআন-সুন্নাহ্র দলীলসহ বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকার ফতওয়া বিভাগ “৬০তম থেকে ৮২তম সংখ্যা পর্যন্ত দেখুন। এছাড়াও ৯৪তম সংখ্যার সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ দেখুন।
মুহম্মদ জাকির হুসাইন
কলিত পদার্থ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সুওয়ালঃ মাসিক মদীনা জুলাই/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপা হয়-
প্রশ্নঃ তারাবীহ নামায পড়া সুন্নত, জিজ্ঞাসা হলো খতমে তারাবীহ পড়া কি?
উত্তরঃ তারাবীহ নামায পড়া সুন্নত। তারাবীহ নামাযে কমপক্ষে এক খতম কোরআন পাঠ করাও পৃথক আরেকটি সুন্নত।
এখন আমার সুওয়াল হলো- “খত্মে তারাবীহ্ পড়া” সম্পর্কে “মাসিক মদীনার” উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? কারণ “মাসিক মদীনার” উক্ত বক্তব্য দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, “খত্মে তারাবীহ্ পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদা।”
অথচ আমি জানি খত্মে তারাবীহ্ পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া। কোনটি সঠিক? দয়া করে সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ “খত্মে তারাবীহ্ বা তারাবীহ্ নামাযে কুরআন শরীফ খত্ম করা সম্পর্কে মাসিক মদীনার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়নি। বরং সম্পূর্ণ ভুল ও অশুদ্ধ হয়েছে। কারণ মাসিক মদীনা খত্মে তারাবীহ্কে, তারাবীহ্ নামায এর সঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে উভয়টিকে সুন্নতে মুয়াক্কাদা সাব্যস্ত করেছে। অর্থাৎ মাসিক মদীনা এটাই বুঝাতে চেয়েছে যে, তারাবীহ্ নামায যেমন সুন্নতে মুয়াক্কাদা অনুরূপ খত্মে তারাবীহ্ও সুন্নতে মুয়াক্কাদা।
অথচ তারাবীহ্ নামায এবং খত্মে তারাবীহ্ এর হুকুম এক নয়। বরং উভয়ের হুকুম ভিন্ন ভিন্ন। কারণ তারাবীহ্ নামায পড়া ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক পুরুষ ও মহিলার জন্যই সুন্নতে মুয়াক্কাদা। কিন্তু খত্মে তারাবীহ্ বা তারাবীহ্ নামাযে কুরআন শরীফ খত্ম করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা নয়। বরং সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া।
যেমন, বিশ্বখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য ফিক্বাহ্ ও ফতওয়ার কিতাব সমূহে বলা হয়েছে,
التراويح سنة مؤكدة للرجال والنساء.
অর্থাৎ- পুরুষ ও মহিলা সকলের জন্যই তারাবীহ্ নামায পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদা।
আর বিশ্বখ্যাত ফতওয়ার কিতাবসমূহে তারাবীহ্র জামায়াতকে সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া বলা হয়েছে।
যেমন, কিতাবে উল্লেখ আছে, وصلوتها بالجماعة سنة كفاية
অর্থাৎ- “তারাবীহ্র নামায জামায়াতের সাথে আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া।”
কোন কোন কিতাবে উল্লেখ আছে,
والجماعة فيها سنة على الكفاية.
অর্থাৎ- “তারাবীহ্র নামাযের জামায়াত সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া। আর তারাবীহ্র নামায জামায়াতে আদায করা শুধুমাত্র পুরুষের জন্য সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া। মহিলাদের জন্য নয়। কারণ মহিলাদের জন্য তারাবীহ্সহ সকল প্রকার নামাযের জামায়াতে যাওয়া মাকরূহ তাহরীমীর অন্তর্ভূক্ত।”
সুতরাং তারাবীহ্র জামায়াত যেহেতু সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া, সেহেতু “তারাবীহ্র জামায়াত” অর্থাৎ মহল্লায়, গ্রামে, শহরের কোন মসজিদে তারাবীহ্র জামায়াত কায়েম হলে এবং তাতে কিছু লোক উক্ত জামায়াতে নামায আদায় করলে অন্যান্য সকলের পক্ষ হতে সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে ক্বিফায়ার হক্ব আদায় হয়ে যাবে।
অনুরূপভাবে কুরআন শরীফের হাফেয হওয়াও সকলের জন্য ফরয, ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা কোনটিই নয়। বরং তা হচ্ছে- জানাযার নামাযের ন্যায় ফরযে ক্বিফায়ার অন্তর্ভূক্ত। অর্থাৎ এলাকার কেউ বা কতক লোক হাফেয হলে অন্যান্য সকলের পক্ষ হতে তার হক্ব আদায় হয়ে যাবে।
এখন মাসয়ালা হলো- তারাবীহ্র জামায়াত যেখানে সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে ক্বিফায়া এবং হাফেজে কুরআন হওয়া ফরযে ক্বিফায়া সেখানে তারাবীহ্র নামাযে খত্মে কুরআন বা কুরআন শরীফ খতম করা কি করে সুন্নতে মুয়াক্কাদা হতে পারে?
উল্লেখ্য, যদি খত্মে তারাবীহ্ সুন্নতে মুয়াক্কাদা হয় তাহলে তারাবীহ্ নামাযের জামায়াতকেও সুন্নতে মুয়াক্কাদা বলতে হবে। কিফায়া বলা যাবে না। কারণ কিফায়া হলে তো কিছু লোক একাও নামায পড়তে পারেন।
অতএব, প্রথমতঃ যারা একা নামায পড়বেন, তারা যদি হাফেযে কুরআন না হন, তবে খত্মে তারাবীহ্ কি করে পড়বেন? খত্মে কুরআন যদি মুয়াক্কাদা হয়, তবে প্রত্যেককেই তো তা আদায় করতে হবে।
দ্বিতীয়তঃ খত্মে তারাবীহ্ যদি সুন্নতে মুয়াক্কাদা হয়, তাহলে পৃথিবীর প্রতিটি মসজিদে তারাবীহ্ নামাযে অবশ্যই কুরআন শরীফ খত্ম করতে হবে। অন্যথায় সুন্নতে মুয়াক্কাদা তরকের গুণাহে গুণাহ্গার হবে। অথচ পৃথিবীতে এমন অনেক স্থান, এমন অনেক গ্রাম-গঞ্জ রয়েছে, যেখানে কুরআন শরীফের হাফেয পাওয়া অসম্ভব, সেখানে কি করে কুরআন শরীফ খতম করা হবে?
তৃতীয়তঃ যদি খত্মে তারাবীহ্ সুন্নতে মুয়াক্কাদা হয়, তাহলে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক পুরুষও মহিলাকে কুরআন শরীফের হাফেয হতে হবে। অন্যথায় পুরুষ হোক কিংবা মহিলা হোক তারাবীহ্র নামাযে কুরআন শরীফ খতম না করলে সুন্নতে মুয়াক্কাদা তরক করার কারণে ওয়াজিব তরকের গুণাহে গুণাহ্গার হতে হবে।
চতুর্থতঃ যদি খত্মে তারাবীহ্ সুন্নতে মুয়াক্কাদা হয় তাহলে পুরুষ মহিলা সকলকে তারাবীহ্র জামায়াতে নামায আদায় করতে হবে। অথচ মহিলাদের জন্য তারাবীহ্সহ সকল প্রকার নামাযের জামায়াতে যাওয়া মাকরূহে তাহ্রীমীর অন্তর্ভূক্ত।
পঞ্চমতঃ যদি কোন ব্যক্তি যে হাফেজ নয় সে খতমে তারাবীহ্র জামায়াতে নামায পড়া শুরু করলে হঠাৎ কোন কারণবশতঃ সে ২ রাকয়াত বা ৪ রাকায়াত বা তার চেয়ে কম বা বেশী রাকায়াত নামায জামায়াতের সাথে পড়তে পারলো না। এখন সে কি করবে? সে যে কয় রাকায়াত নামায পড়তে পারল না তা পড়বে কি পড়বে না? যদি পড়ে তা কিভাবে পড়বে?
যদি সূরা তারাবীহ্ পড়ে তাহলে তো তার খতম হল না। শুধু তাই নয় পুরা রমজান শরীফে তারাবীহ্র ২০ রাকায়াতের এক রাকায়াতও যদি জরুরতবশতঃ পড়তে না পারে তাহলে তার খতম হবে না।
ষষ্ঠতঃ যদি খত্মে তারাবীহ্ বা তারাবীহ্ নামাযে কুরআন শরীফ খত্ম করা সুন্নতে মুয়াক্কাদাই হয়, তাহলে সূরা তারাবীহ্ পড়লে সুন্নত মুয়াক্কাদা তরক করার কারণে গুণাহ্ হবে না?
সপ্তমতঃ যদি খত্মে তারাবীহ্ সুন্নতে মুয়াক্কাদা হয় তাহলে সূরা তারাবীহ্র প্রশ্নই উঠতে পারে না। অথচ বিশ্বখ্যাত ফতওয়ার কিতাব সমূহে সূরা তারাবীহ্কে উত্তম বলা হয়েছে।
যেমন কিতাবে উল্লেখ আছে,
اختار قراءة سورة الفيل الى اخر القران وهذا احسن.
অর্থাৎ- তারাবীহ্ নামাযে (সূরা তারাবীহ্ অর্থাৎ) সূরা ফীল থেকে কুরআন শরীফের শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ সূরা ফীল থেকে সূরা নাস পর্যন্ত পড়াকে পছন্দ করেছেন এবং এটাই উত্তম।
অতএব, প্রমাণিত হলো যে, খত্মে তারাবীহ্ বা তারাবীহ্ নামাযে কুরআন শরীফ খত্ম করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা নয়। বরং সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া। তাছাড়া সকলের মতেই রমযান মাসে সূরা তারাবীহ্ পড়া জায়েয, ও সুন্নতে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
মূলতঃ সঠিক ফতওয়া হলো এই যে, যাদের প্রতি রমজান শরীফের রোযা ফরয তাদের জন্য এককভাবে তারাবীহ্ পড়া হচ্ছে সুন্নতে মুয়াক্কাদা। আর কুরআন শরীফের হাফেয হওয়া ফরযে ক্বিফায়া এবং তারাবীর নামাযের জামায়াত সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে ক্বিফায়া। অএতব কেউ ইচ্ছা করলে খতম তারাবীহ্ পড়তে পারে। আবার কেউ ইচ্ছা করলে সূরা তারাবীহ্ পড়তে পারে। আর খতমে তারাবীহ্ কিংবা তারাবীহ্র জামায়াত কোনটিই সুন্নতে মুয়াক্কাদা নয়। বরং উভয়টি সুন্নতে মুয়াক্কাদয়ে ক্বিফায়া। যা কিছু সংখ্যক লোকের পক্ষ হতে আদায় করা হলে অন্যান্য সকলের পক্ষ হতে তার হক্ব আদায় হয়ে যাবে।
{দলীলসমূহ ঃ (১) বাহরুর রায়েক, (২) হিদায়া, (৩) আলমগীরী, (৪)ফতহুল কাদীর, (৫) এনায়া, (৬) শরহে মুনীয়া, (৭) মুহীত, (৮) জখীরা, (৯) খানীয়া, (১০) আল ইখতিয়ার, (১১) আল মুজতাবী (১২) তাজনীস, (১৩) জাহেদী, (১৪) শরহুন নিক্বায়া, (১৫) জাওহারাতুন্ নাইয়্যারাহ, (১৬) আইনুল হিদায়া, (১৭) শরহে বিকায়া, (১৮) দুররুল মুখতার, (১৯) রদ্দুল মুহতার, (২০) নূরুল ইজাহ্, (২১) মারাকিউল ফালাহ্, (২২) হাশিয়ায়ে তাহতাবী, (২৩) গায়াতুল আওতার, (২৪) ফতওয়ায়ে বায্যাযিয়াহ, (২৫) ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া, (২৬) আল আশবাহ ওয়ান্ নাযায়ির, (২৭) আন ওয়ারুস্ সাভিয়া, (২৮) আওয়াযুল মাসালিক, (২৯) নাইলুল মায়ারিব, (৩০) রওজুর রিয়াজ, (৩১) আল মুগনী ইত্যাদি।}
মুহম্মদ কাওছার জামান (বাবলা)
মাহিগঞ্জ, রংপুর।
সুওয়ালঃ ঢাকা মুহম্মদপুর জামিয়া রাহমানিয়া থেকে প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকা সেপ্টেম্বর/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যার জিজ্ঞাসার-জবাব বিভাগে এক জিজ্ঞাসার জবাবে বলা হয়েছে,
“পোশাকের ব্যাপারে শরীয়তের কোন একক আকৃতির পাবন্দী (সীমাবদ্ধতা) নেই যে, সে আকৃতির খেলাফ হলেই পোশাক না জায়িয বা খেলাফে সুন্নাত হয়ে যাবে। বরং প্রাকৃতিক অবস্থা ও মৌসুমের চাহিদা এবং মানুষের অভ্যাসের বিভিন্নতার কারণে পোশাকের বিভিন্নতার অবকাশ শরীয়তে রয়েছে।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- পোশাক সম্পর্কে অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি?
জাওযাবঃ পোশাক সম্পর্কে অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য কুফরীমূলক হয়েছে। কারণ তাদের উক্ত বক্তব্য একথাই প্রমাণ করে যে, দ্বীন ইসলাম তথা শরীয়ত নাক্বেছ বা অপূর্ণ, সেহেতু অখ্যাত পত্রিকা ওয়ালারা বলেছে যে, শরীয়ত পোশাকের ব্যাপারে সীমাবদ্ধতা করে দেয়নি। অথচ আল্লাহ্ পাক দ্বীন ইসলাম তথা শরীয়তকে কামিল বা পরিপূর্ণ করেছেন।
যেমন, এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে ইরশাদ করেন, اليوم اكملت لكم دينكم.
অর্থঃ- “আজকে আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য কামিল বা পরিপূর্ণ করলাম।” (সূরা মায়িদা/৩)
অর্থাৎ ইসলাম তথা শরীয়ত পরিপূর্ণ করে দেয়া হয়েছে। আর এমন কোন বিষয় নেই যে ইসলামে তথা শরীয়তে তা বর্ণনা করা হয়নি। সে প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন, كل فى كتب مبين.
অর্থঃ- “(এই) প্রকাশ্য কিতাবে সব কিছুই রয়েছে।” (সূরা হুদ/৬)
আল্লাহ্ পাক আরো বলেন, ما فرطنا فى الكتب من شئ.
অর্থঃ- “(এই) কিতাবে কোন কিছুরই বর্ণনা তরক করিনি।” (সূরা আনয়াম/৩৮)
আল্লাহ্ পাক এ প্রসঙ্গে আরো ইরশাদ করেন,
ولا رطب ولا يابس الا فى كتب مبين.
অর্থঃ- “শুকনা এবং ভিজা এমন কিছুই নেই, যা এ স্পষ্ট কিতাবে উল্লেখ করা হয় নাই।” (সূরা আন্য়াম/৫৯)
অর্থাৎ, ইসলামে তথা শরীয়তে সব কিছুরই বর্ণনা রয়েছে, যারা জানেনা তারা যেন যারা জানেন, তাদের কাছে জিজ্ঞেস করে জেনে নেয়।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
فاسئلوا اهل الذكر ان كنتم لاتعلمون.
অর্থঃ- “যদি তোমাদের জানা না থাকে, তাহলে যারা আহ্লে যিকির তাদের নিকট জিজ্ঞেস করে জেনে নাও।” (সূরা নহল/৪৩) অর্থাৎ, যারা জানেনা তারা যেন বিনা তাহ্ক্বীক্বে মিথ্যা না বলে।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
ولا تقولوا لماتصف السنتكم الكذب هذا حلل وهذا حرام لتفتروا على الله الكذب ان الذين يفترون على الله الكذب لايفلحون.
অর্থঃ- “তোমাদের মুখে যা আসে, তাকে তোমরা মিথ্যামিথ্যি ইহা হালাল, ইহা হারাম বলে অভিহিত করোনা। এতে তোমাদের দ্বারা মহান আল্লাহ্ তায়ালা উনার প্রতি মিথ্যারোপ করা হয়। নিশ্চয়ই যারা মহান আল্লাহ্ পাক উনার নামে মিথ্যারোপ করে, তারা কামিয়াবী হাছিল করবেনা।” (সূরা নহল/১১৬)
উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, “দ্বীন ইসলাম তথা শরীয়ত পরিপূর্ণ অর্থাৎ পোশাক সহ সকল বিষয়ের সীমাবদ্ধতা ও সুস্পষ্ট ফায়সালা শরীয়তে রয়েছে।
শুধু তাই হিন্দু, বৌদ্ধ, ইহুদী, খৃষ্টান, বিজাতীয় বিধর্মীদের মধ্যেও পোশাকের সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়।
এছাড়া অনেক সংস্থারও আলাদা পোশাক রয়েছে। বিশেষ করে যেমন- আর্মি অর্থাৎ স্থলবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, পুলিশ বাহিনী ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, ইংল্যান্ডের সংবিধানে রয়েছে যে, ইংল্যান্ডের কোন সৈন্য যদি অন্য কোন দেশের সৈন্যদের পোশাক পরিধান করে তাহলে তার শাস্তি হলো মৃত্যুদন্ড। এ আইনের দ্বারা সহজেই অনুধাবন করা যায় যে বিজাতীয়রা পোশাকের ব্যাপারে কতটুকু সীমাবদ্ধতা করে দিয়েছে। আর শরীয়তে পোশাকের ব্যাপারে কোন সীমারেখা নেই, একথাটা যে কতটুকু ধৃষ্টতাপূর্ণ, ন্যাক্কারজনক এবং কুফরী মূলক তা বলারই অপেক্ষা রাখেনা।
যদি বলা হয়, ইসলাম কারো জন্য কোন বিশেষ প্রকার পোশাককে ফরয করে দেয়নি। শুধুমাত্র ছতর আবৃত করাকেই ফরয করা হয়েছে, তাহলে এটা বলাও শুদ্ধ নয়। কারণ ইসলাম যদিও কারো জন্য কোন বিশেষ প্রকার পোশাককে ফরজ করে দেয়নি, তথাপিও কিছু নিয়ম-নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে।
যেমন- এ প্রসঙ্গে “সূরা বাক্বারার” ৬নং আয়াত শরীফে আল্লাহ্ পাক বলেন, ان الذين كفروا (নিশ্চয়ই যারা কাফির) এর ব্যাখ্যায় তাফসীরে বায়জাভী শরীফে বলা হয়েছে,
لبس الغيار وشد الزنار ونحوهما كفر.
অর্থঃ- গিয়ার (লম্বা টুপি) পরিধান করা ও পৈতা বাঁধা এবং এর অনুরূপ (কাফেরদের সাথে তাশবীহ্ হয়, এমন পোশাক) পরিধান করা কুফরী।”
এর ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,
من تشبه بقوم فهو منهم.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদেরই দলভুক্ত বা অন্তর্ভূক্ত।” (আবূ দাউদ, মুসনদে আহমদ)
উপরোক্ত আয়াত শরীফ এবং হাদীস শরীফ দ্বারা একথা স্পষ্ট প্রমাণিত হলো যে, মুসলমানদের জন্য বেদ্বীন-বদ্দ্বীনদের অর্থাৎ হিন্দু, বৌদ্ধ, ইহুদী, খৃষ্টানদের নিয়মনীতি, তর্জ-তরীক্বা অনুসরণ করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম।
তাই জ্বীন ও মানব জাতির জন্যে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হুকুম মুতাবিক চলতে হলে যা কিছুর দরকার অর্থাৎ তার ব্যক্তিগত, সামাজিক ইত্যাদি প্রত্যেক পর্যায় তার পায়ের তলা হতে মাথার তালু পর্যন্ত, তার হায়াত হতে মৃত্যু পর্যন্ত, এক কথায় ক্বিয়ামত পর্যন্ত যত সমস্যারই উদ্ভব হোক না কেন, সকল বিষয়েরই ফায়সালা বা সমাধান দ্বীন-ইসলাম তথা শরীয়তের মধ্যে অর্থাৎ কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াসের মধ্যে রয়েছে।
আর আখিরী রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা করেছেন, করতে বলেছেন এবং করার সম্মতি দিয়েছেন সেটাই ইসলাম বা শরীয়ত। এর খিলাফ যা কিছু রয়েছে, সেটাই বেদ্বীনি ও বদদ্বীনি।
সুতরাং মুসলমানদেরকে পোশাক পরিধান করতে হলে বা সুন্নতী পোশাকই পরিধান করতে হবে। কোন বেদ্বীনি, বদ্দ্বীনি পোশাক পরিধান করা জায়েয নেই। আর যা জায়েয নেই, সেটাই হারাম।
অনেকে বলতে পারে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পোশাক পরিধান করেছেন, সেটা সুন্নত, ফরয নয়। হ্যাঁ, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পোশাক পরিধান করেছেন এবং পরিধান করতে বলেছেন, সেটা ছুরতান সুন্নত, হাক্বীক্বতান ফরয।
এ প্রসঙ্গে বলা হয় যে, একবার হযরত ইমাম আহ্মদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি ফতওয়া দিলেন যে, সমস্ত সুন্নতগুলো পালন করা ফরজ। তখন ওনার সমসাময়িক ইমাম-মুজতাহিদগণ এর দলীল তলব করলেন। তখন তিনি দলীল স্বরূপ নিম্মের আয়াত শরীফ পেশ করলেন,
وما اتكم الرسول فخذوه ومانهكم عنه فانتهوا واتقوا الله ان الله شديد العقاب.
অর্থঃ- “তোমাদের রসূল যা এনেছেন, সেটা আঁকড়িয়ে ধর এবং যা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন, সেটা থেকে বিরত থাক। এ বিষয়ে আল্লাহ্ পাককে ভয় কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক কঠিন শাস্তি দাতা।” (সূরা হাশর/৭)
অতএব, মুসলমানী পোশাক বা সুন্নতী পোশাক হলো আখিরী রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পোশাক পরিধান করেছেন বা ব্যবহার করেছেন সেটাই সুন্নতী পোশাক। এর খিলাফ হলে সেটা খিলাফে সুন্নত হবে।
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা অকাট্ট্যভাবেই প্রমাণিত হলো যে, দ্বীন ইসলাম তথা শরীয়ত পরিপূর্ণ, অর্থাৎ পোশাকসহ সকল বিষয়ের সুনিিির্দষ্ট ও সুস্পষ্ট ফায়সালা শরীয়তে রয়েছে। কাজেই যারা বলে শরীয়তে পোশাকের ব্যাপারে সীমাবদ্ধতা নেই, তাদের এ বক্তব্য সম্পুর্ণই মিথ্যা ও কুফরীমূলক। এ ধরণের বক্তব্য থেকে সংশ্লিষ্ট সকলের খালিছ তওবা করা ফরজ/ওয়াজিব।
উল্লেখ্য, শরয়ী পোশাক তথা গুটলীওয়ালা গোল কোর্তা, ফাড়া লুঙ্গী, চার টুকরা বিশিষ্ট গোলটুপী, পাগড়ী, রুমাল ইত্যাদি পরিধান যে সুন্নত তা জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাতের ৮, ৩৬, ৪৭, ৫১, ৫৩, ৫৭, ৫৯ ও ৯৬তম ইত্যাদি সংখ্যাগুলি পাঠ করুন।
মাওলানা মুহম্মদ হারুনুর রশীদ
খতীব- সেনপাড়া জামে মসজিদ, রংপুর।
সুওয়ালঃ “খুৎবা দানকালে হাতে লাঠি নেয়া সুন্নত” তা আমরা মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর মাধ্যমে বহু পূর্ব থেকেই জেনে এসেছি।
অথচ কেউ কেউ দু’একটি ফিক্বাহ্র কিতাবের উদ্বৃতি দিয়ে বলে থাকে যে, “খুৎবার সময় লাঠি ব্যবহার করা মাকরূহ্।”
এখন আমার সুওয়াল হলো- খুৎবার সময় লাঠি ব্যবহার করা সুন্নত না মাকরূহ্? নির্ভরযোগ্য ও অকাট্য দলীলের ভিত্তিতে জাওয়াব দিয়ে আমাদের ঈমান-আমল হিফাযত করবেন বলে আমরা আশাবাদী।
জাওয়াবঃ খুৎবা দানকালে হাতে লাঠি নেয়া সুন্নত। মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর উক্ত বক্তব্যই সঠিক, দলীলভিত্তিক ও গ্রহণযোগ্য। কেননা, “কুতুবে সিত্তার” অন্যতম কিতাব “ছহীহ্ আবূ দাউদ শরীফ ও ইবনে মাযাহ্ শরীফে” স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুৎবা দানকালে হাত মুবারকে লাঠি নিয়েছেন। যেমন, “আবু দাউদ শরীফে” ইরশাদ হয়েছে,
ان النبى صلى الله عليه وسلم قام اى متوكئا على عصا اوقوس.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (খুৎবা দানকালে) লাঠি অথবা ধনুকের উপর ভর করে দাঁড়াতেন।”
আর হাদীস শরীফের কিতাব “ইবনে মাযাহ্ শরীফে” ইরশাদ হয়েছে,
ان رسول الله صلى الله عليه وسلم كان اذا خطب فى الحرب خطب على قوس واذا خطب فى الجمعة خطب على عصا.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই রসুলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন জ্বিহাদে খুৎবা দিতেন তখন খুৎবার সময় ধনুক ব্যবহার করতেন। আর যখন জুমুয়ার নামাযে খুৎবা দিতেন তখন লাঠি ব্যবহার করতেন।”
ইমামুল মুফাস্সিরীন, ফক্বীহুল আছর আল্লামা ইমাম কুরতুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ “তাফসীরে কুরতুবী”-এর ৯ম জিঃ, ১১৪ পৃষ্ঠায় “সুরায়ে জুমুয়ার” তাফসীরে উক্ত হাদীস শরীফের বরাতে লিখেন,
يخطب متوكئا على قوس اوعصا.
অর্থঃ- “খতীব ছাহেব খুৎবা দানকালে ধনুক অথবা লাঠি ভর করে বা হাতে নিয়ে খুৎবা দিবে।”
অন্য হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
ان انبى صلى الله عليه وسلم كان اذا خطب يعتمد على عنزته اعتمادا.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন খুৎবা দিতেন, তখন তিনি বর্শার উপর ভর করে খুৎবা দিতেন।” (মিশকাত, মিরকাত, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, মুযাহিরে হক্ব, শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ্ ছবীহ্)
আর ফিক্বাহ্র নির্ভরযোগ্য ও বিশ্ববিখ্যাত কিতাব “গায়াতুল আওতারে” উল্লেখ আছে যে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “(জুমুয়ার) খুৎবার মধ্যে দাঁড়ানো যেরূপ সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত তদ্রুপ খুৎবার সময় লাঠি মুবারক ব্যবহার করাও সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত।”
এছাড়া “শরহে বেকায়াতে” উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- নামাযের মত খুৎবাতে হাত বাঁধতে হবে না বরং লাঠি বা ধনুক হাতে (ভর করে) দাঁড়ানো অধিকতর উত্তম। (শরহে বেকায়া ১ম জিঃ পৃঃ ২৮৪ (উর্দূ তরজমা)
তাছাড়া ফিক্বাহ্-এর প্রায় সব কিতাবসমূহেই খুৎবার সময় লাঠি ব্যবহার করা খাছ সুন্নতের অন্তর্ভূক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অথচ কেউ কেউ আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ আমল তথা খাছ সুন্নতি আমলকে ফিক্বাহ্বিদগণের মধ্যে মতপার্থক্য থাকার অজুহাত দিয়ে খুৎবা প্রদানকালে হাতে লাঠি না নেয়া উত্তম বা মাকরূহ্ বলে ফতওয়া দিয়ে থাকে যা আদৌ শুদ্ধ নয়। কারণ দ্বীন ইসলামের অনেক বিষয়ই এমন রয়েছে, যার সম্পর্কে ফিক্বাহ্বিদগণের কেউ ফরয, কেউ ওয়াজিব, কেউ সুন্নত কেউ মুস্তাহাব আবার কেউ শুধু জায়েয বলে ফতওয়া দিয়েছেন। সেজন্য সে বিষয়গুলো করা যাবেনা বা তা মাকরূহ্ কিংবাা অনুত্তম হবে, তা নয়। বরং যাবতীয় বিষয় বা আমলগুলোকে স্ব স্ব মায্হাবে স্বীকৃত দলীল ভিত্তিক ফতওয়া মুতাবিক আমল করাই হচ্ছে শরীয়তের নির্দেশ।
কাজেই খুৎবায় লাঠি ব্যবহার সম্পর্কে ফিক্বাহ্বিদগণের কেউ কেউ কিছুটা চু-চেরা করলেও অধিকাংশ ফিক্বাহ্বিদগণই তা সুন্নত ও জায়েয বলে ফতওয়া প্রদান করেছেন এবং এ ফতওয়াই সঠিক ও নির্ভুল।
কেউ বলে থাকে যে, “কেউ যদি হাতে লাঠি নেয়াকে জরুরী মনে করে তার উপর আমল করে, তাহলে মাকরূহ্ হবে।”
মূলতঃ এ বক্তব্যও সঠিক নয়। কারণ সুন্নতকে সুন্নত হিসেবে জরুরী মনে করা আদৌ দোষণীয় নয় এবং তা মাকরূহ্ বা অপছন্দনীয় হওয়ার কারণ কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। বরং সুন্নতকে সুন্নত হিসেবে জরুরী মনে করে গুরুত্বের সাথে পালন করার ব্যাপারে হাদীস শরীফে নির্দেশ করা হয়েছে। যেমন- আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
عليكم بسنتى وسنة الخلفاء الراشدين المهديين تمسكوابها وعضوا عليها بنواجز.
অর্থঃ- “তোমাদের উপর আমার সুন্নত এবং হিদায়েত প্রাপ্ত খোলাফা-ই-রাশেদীনগণের সুন্নত পালন করা অপরিহার্য। তোমরা তা মাড়ির দাঁত দিয়ে শক্তভাবে আঁকড়িয়ে ধর।” (আহ্মদ, আবূ দাউদ, ইবনে মাযাহ্, মিশকাত)
মূলতঃ আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কোন আমলকে মাকরূহ্ বা অপছন্দনীয় বলা এবং উত্তম নয় বলে উল্লেখ করা কাট্টা কুফরী। যেমন এ সম্পর্কে আক্বাইদের কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কদু খাওয়া সুন্নত এবং আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কদু খেতে পছন্দ করতেন। অতএব কেউ যদি বলে- আমি কদু পছন্দ করিনা, তবে সে ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে। কারণ সে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আমল তথা সুন্নতকে ইহানত ও অপছন্দ করেছে।
অতএব, যেখানে ছহীহ্ হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত যে, আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজেই খুৎবাদান কালে হাত মুবারকে লাঠি মুবারক নিয়েছেন এবং অসংখ্য ইমাম-মুজতাহিদগণ এটাকে সুন্নত বলে রায় দিয়েছেন; সেখানে দু’একটি ফিক্বাহ্র কিতাবের বক্তব্যের সঠিক মর্ম উপলব্ধি না করে খুৎবার সময় লাঠি ব্যবহার করাকে বিদ্য়াত বা মাকরূহ্ বলা গোমরাহী বৈ কিছুই নয়।
সুতরাং কেউ যদি লাঠি ব্যবহারকে নাজায়েয বা মাকরূহ্ প্রমাণ করতে চায় তবে তাকে প্রথমতঃ এরূপ একখানা হাদীস শরীফ দেখাতে হবে যেখানে লাঠি ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ লাঠি ব্যবহার করা জায়েয বা সুন্নত হওয়ার স্বপক্ষে যতগুলো দলীল রয়েছে মাকরূহ্ হওয়ার পক্ষেও ঠিক ততগুলো দলীল পেশ করতে হবে; কিন্তু তারা তা ক্বিয়ামত পর্যন্ত কোশেশ করলেও পারবেনা।
মূলকথা হলো, খুৎবা দান কালে লাঠি ব্যবহার করা সুন্নত, জায়েয তো অবশ্যই। দু’একটি কিতাবে যদি মাকরূহ্ লিখেও থাকে তবে তা অবশ্যই ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। অথবা তা গ্রহণযোগ্য বা ফতওয়াগ্রাহ্য মত নয়। কাজেই উক্ত ফতওয়ার উপর আমল করা যাবেনা।
{দলীলসমূহঃ তাফসীরে কুরতুবী, আবূ দাউদ, ইবনে মাযাহ্, মিশকাত, মিরকাত, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, তা’লীকুছ্ ছবীহ্, শরহুত্ ত্বীবী, মুযাহিরে হক্ব, গায়াতুল আওতার, শরহে বেক্বায়া, রদ্দুল মুহতার, শামী, মুহীত, সিফরুস সায়াদাত, মাজমাউল বিহার, মারাক্বিউল ফালাহ্, বাহ্রুর রায়েক, কিতাবুল মাদখাল, ফতওয়ায়ে রহীমিয়া, ইমাদাদুল ফতওয়া ও ইমদাদুল আহ্কাম ইত্যাদি।}
মাওলানা মুহম্মদ হাবীবুর রহমান
নবীনগর জামে মসজিদ, রাজশাহী।
সুওয়ালঃ আমরা জানি যে, তারাবীহ্র নামায ২০ রাকায়াত এবং তা আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ্। অথচ কেউ কেউ বলে ৮ রাকায়াত পড়াই সুন্নত। আবার কেউ কেউ বলে ১২ রাকায়াত পড়াই সুন্নত।
এখন আমরা কোন্ মতের উপর আমল করবো এবং কোন্ মতটি ছহীহ্?
জাওয়াবঃ আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ফতওয়া মুতাবিক তারাবীহ্র নামায ২০ রাকায়াত পড়াই সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ্। অতএব, কেউ যদি ২০ রাকায়াত থেকে এক রাকায়াতও কম পড়ে, তবে তার সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ্ তরক্ব করার গুণাহ্ হবে। অর্থাৎ তারাবীহ্র নামায ২০ রাকায়াতই পড়তে হবে এবং এর উপরই ইজ্মা হয়েছে।
যারা তারাবীহর নামায ৮ রাকায়াত বলে থাকে, তারা বুখারী শরীফে বর্ণিত হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর হাদীস শরীফখানা দলীল স্বরূপ পেশ করে থাকে। যাতে বর্ণিত আছে যে, “আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান মাসে এবং রমজান ব্যতীত অন্যান্য মাসে (বিত্র সহ) ১১ রাকায়াত নামায আদায় করতেন।”
মূলতঃ এটি হচ্ছে তাহাজ্জুদ নামাযের বর্ণনা, তারাবীহ্র নামাযের বর্ণনা নয়। কারণ তারাবীহ্র নামায শুধু রমজান মাসের জন্যই নির্দিষ্ট। রমজান ব্যতীত অন্যান্য মাসে তারাবীহ্র নামায নেই। আর তাহাজ্জুদ নামায সারা বৎসরই পড়তে হয়।
এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে আমাদের প্রকাশিত মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকার ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩০তম সংখ্যা পাঠ করুন। সেখানে ৩০৪ খানা অকাট্য ও নির্ভরযোগ্য দলীলের ভিত্তিতে ছাবেত করা হয়েছে যে, তারাবীহ্র নামায ২০ রাকায়াত পড়াই সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ্ এবং এটাই গ্রহণযোগ্য ও ছহীহ্ মত।
{দলীলসমূহঃ (১) মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, (২) সুনানুল কোবরা লিল বায়হাক্বী, (৩) আল কবীর লিত্ তিবরানী, (৪) আল জাওহারুন্নাকী, (৫) নাইনুল আওতার, (৬) ইরশাদুস্ সারী, (৭) মিরকাত, আওজাজুল মাসালিক, (৮) মা’আরেফে মাদানীয়া, (৯) ফতহুল বারী, (১০) উমদাতুল ক্বারী, (১১)বজলুল মাযহুদ, (১২) ফিক্হুস্ সুনান ওয়াল আছার, (১৩) নছবুর রাইয়াহ, (১৪) আইনী শরহে বুখারী, (১৫) আত্ তা’লীকুল হাছানাহ, (১৬) মুজাহিরে হক্ব, (১৭) আশয়াতুল লুময়াত, (১৮) ইলাউস্ সুনান, (১৯) ফতওয়ায়ে আলমগীরী, (২০) খুলাসাতুল ফতওয়া, (২১) মজমুয়াতুল ফতওয়া, (২২) বাহ্রুর রায়েক, (২৩) মারাকিউল ফালাহ্, (২৪) ইহ্ইয়াউ উলুমুদ্দীন, (২৫) গুন্ইয়াতুত্ ত্বলেবীন ইত্যাদি}
মুহম্মদ আব্দুল মাতিন
বশিরহাট, চব্বিশ পরগণা, ভারত।
সুওয়ালঃ অনেকেই নামায পড়েনা কিন্তু রমজান মাসে রোজা রাখে, এই রোজার কি কোন ফযীলত পাওয়া যাবে? জানাবেন।
জাওয়াবঃ আল্লাহ্ পাক কালামুল্লাহ্ শরীফে ইরশাদ করেছেন,
فمن يعمل مثقال ذرة خيرايره ومن يعمل مثقال ذرة شرايره.
অর্থঃ- “যদি কেউ একবিন্দু নেকী করে, তার প্রতিদান সে পাবে। আর একবিন্দু বদী করলেও তার বদলা তাকে গ্রহণ করতে হবে।” (সূরা যিলযাল/৭,৮)
আরো অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে-
انى لااضيع عمل عامل منكم من ذكر او انثى.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মধ্যে কোন আমলকারী পুরুষ ও মহিলার আমলকে নষ্ট করিনা।” (সূরা আলে ইমরান/১৯৫)
কাজেই যে নেক কাজ করবে, সে নেকীর বদলা পাবে। আর যে বদ কাজ বা গুণাহ্র কাজ করবে, সে তারও বদলা পাবে।
রমজান শরীফে রোজা রাখা ফরয এবং নামায পড়াও ফরয। যে উভয়টি করবে, সে পূর্ণ ফায়দা হাসিল করবে। আর যদি কেউ শুধু রমজান শরীফে রোজা রাখে, নামায না পড়ে, তবে তার রোজা রাখার ফরয আদায় হবে কিন্তু নামায না পড়ার গুণাহ্ তার উপর বর্তাবে।
কারণ আল্লাহ্ পাক অন্য আয়াত শরীফে বলেন,
من عمل صالحا فلنفسه ومن اساء فعليها وما ربك بظلام للعبيد-
অর্থঃ- “যে নেক কাজ করে, সে তার নিজের জন্য করে। অর্থাৎ সে তার সওয়াব পাবে, আর যে পাপ কাজ করে, সেটা তার উপর বর্তাবে। অর্থাৎ গুণাহ্র শাস্তি তাকে ভোগ করতে হবে। আর আপনার রব বা প্রতিপালক বান্দার প্রতি জুলুম করেন না। অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক কোন বান্দার প্রতি জুলুম করেন না।” (সূরা হা-মীম সিজদা/৪৬)
সুতরাং যে ব্যক্তি নামায আদায় করা ব্যতীত শুধু রমজান শরীফে রোজা রাখবে, সে রোজা রাখার সওয়াব পাবে এবং অবশ্যই সে নামায তরক করার গুণাহে গুণাহ্গার হবে। (মাযহারী, কুরতুবী, খাযেন, বাগবী, কবীর ইত্যাদি সমূহ তাফসীরের কিতাব)
মুহম্মদ মফিজুল ইসলাম
রোমা, ইতালী।
সুওয়ালঃ রোজা রাখা অবস্থায় বমি করলে রোজার কোন ক্ষতি হবে কি?
জাওয়াবঃ রোজা রাখা অবস্থায় বমি করার ব্যাপারে কয়েকটি সূরত কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। বমি করাটা সাধারণতঃ দু’প্রকারের হয়ে থাকে- (১) ইচ্ছাকৃত, (২) অনিচ্ছাকৃত।
কেউ যদি ইচ্ছাকৃত মুখ ভরে বমি করে, তাহলে রোজা ভঙ্গ হবে। আর ইচ্ছাকৃত অল্প বমি করলে রোজা ভঙ্গ হবেনা। অনিচ্ছাকৃতভাবে মুখ ভরে বমি হোক অথবা অল্প বমি হোক, তাতে রোজা ভঙ্গ হবেনা। কেউ যদি ইচ্ছাকৃত মুখ ভরে অথবা অল্প বমি গিলে ফেলে, তাতে তার রোজা ভঙ্গ হবে। আর যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে অল্প বমি ভিতরে চলে চায়, তাতে রোজা ভঙ্গ হবেনা। কিন্তু মুখ ভরা বমি অনিচ্ছাকৃতভাবেও ভিতরে চলে গেলে রোজা ভঙ্গ হবে।
উপরোল্লিখিত কোন কারণে রোজা ভঙ্গ হলে সেটার কাযা আদায় করতে হবে কিন্তু কাফ্ফাারা দিতে হবেনা। (আলমগীরী)
মুহম্মদ আব্দুস্ সবুর
বাংলাদেশ হাই কমিশন, অটোয়া, কানাডা।
সুওয়ালঃ রোজা রেখে টুথপেষ্ট, দাঁতের মাজন, কয়লা বা ছাই ইত্যাদি দ্বারা দাঁত মাজলে রোজার কোন ক্ষতি হবে কি?
জাওয়াবঃ উপরে উল্লিখিত মাজনের দ্বারা দাঁত মাজলে রোজা মাকরূহ্ হবে। তবে যদি মাজনের সামান্য পরিমাণ ভিতরে চলে যায়, তাহলে রোজা ভঙ্গ হবে এবং কাযা করা ওয়াজিব হবে, কাফ্ফারা আদায় করতে হবে না। (আলমগীরী)
সাইয়্যিদ মুহম্মদ আবূ সাদিক (তানিম)
কৃষ্ণপুর, মোমেনশাহী।
সুওয়ালঃ রোজা রেখে নাকে পানি দেয়া ও গড়গড়া করা যাবে কিনা?
জাওয়াবঃ রোজা অবস্থায় নাকে পানি দিয়ে উপরের দিকে টান দেয়া ও কুলি করার সময় গড়গড়া করার হুকুম নেই। বরং নিষেধ রয়েছে। (সমূহ ফিক্বহ্রে কিতাব)
মুছাম্মত তানজিমা খাতুন
দলদলিয়া, উলিপুর, কুড়িগ্রাম।
সুওয়ালঃ তরকারী পাক করার সময় লবন হয়েছে কিনা, তা দেখার জন্য জিহ¡ার অগ্রভাগ দিয়ে স্বাদ পরীক্ষা করা জায়েয আছে কিনা?
জাওয়াবঃ সাধারণভাবে এরূপ করা জায়েয নেই। হ্যাঁ, যদি কেউ সতর্কতার সাথে এরূপ করে, তবে তা মাকরূহের সহিত জায়েয রয়েছে, না করাই উচিৎ। তবে কারো স্বামী যদি এমন জালিম হয় যে, তরকারীতে লবন কম বা বেশী হলে মারধর, জুলুম ইত্যাদি করে, তাহলে জালিমের জুলুম হতে বাঁচার জন্য জিহ¡ার অগ্রভাগ দিয়ে তরকারীর স্বাদ পরীক্ষা করা জায়েয রয়েছে। এক্ষেত্রে মাকরূহ্ হবেনা।
লক্ষ্যণীয় যে, তরকারীযুক্ত থুথু কোন ক্রমেই যেন ভিতরে প্রবেশ না করতে পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। (সমূহ ফিক্বাহ্র কিতাব)
সূফী মুহম্মদ আবূ জাফর
বুড়িরচর, বরগুণা।
সুওয়ালঃ অনেকে দেখা যায়, রোজা রেখে বার বার থুথু ফেলে থাকে। এই থুথু না ফেলে গিলে ফেললে রোজার কোন ক্ষতি হবে কি?
জাওয়াবঃ রোজা রেখে মুখের থুথু বার বার না ফেলে গিলে ফেললে রোজার কোন ক্ষতি হবে না। (আলমগীরী)
মুছাম্মত নুরুন্ নাহার বেগম
হবিগঞ্জ, সিলেট।
সুওয়ালঃ রোজা অবস্থায় সন্তানকে দুধ পান করালে মায়ের রোজা ভঙ্গ হবে কি?
জাওয়াবঃ না, রোজা অবস্থায় সন্তানকে দুধ খাওয়ালে মায়ের রোজা ভঙ্গ হবে না, এমন কি ওযুও ভঙ্গ হবে না। (আলমগীরী)
মুহম্মদ হাসানুল ইসলাম
উত্তর শাহ্জাহানপুর, ঢাকা।
সুওয়ালঃ রোযা রাখা অবস্থায় চোখে ওষুধ বা সুরমা দিলে রোজা ভঙ্গ হবে কি?
জাওয়াবঃ না, রোজা রাখা অবস্থায় চোখে ওষুধ বা সুরমা দিলে রোজা ভঙ্গ হবে না। এমনকি যদি ওষূধের স্বাদ গলায় অনুভব হয় বা সুরমার রং যদি থুথুর সাথে দেখা দেয়, তাতেও রোজা ভঙ্গ হবেনা। (আলমগীরী, মাবছূত, আইনুল হেদায়া)
মুহম্মদ মশফিকুর রহমান
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট হাইস্কুল, চট্টগ্রাম।
সুওয়ালঃ কেউ যদি রোজা অবস্থায় দিনে ঘুমায় এবং ঘুমের মধ্যে গোসল ফরয হয়, তাতে রোজার কি কোন ক্ষতি হবে?
জাওয়াবঃ রোজা রেখে দিনে ঘুমালে এবং ঘুমের মধ্যে গোসল ফরয হলে, রোজার কোন ক্ষতি হবেনা। (আলমগীরী)
মুহম্মদ শহীদুল ইসলাম (শামীম)
তেজগাও, ঢাকা।
সুওয়ালঃ কোন ব্যক্তি যদি রোজা রেখে স্বপে¦ অথবা জাগ্রত অবস্থায় ভুলে কিছু পান করে অথবা খেয়ে ফেলে, তবে রোজা ভঙ্গ হবে কি?
জাওয়াবঃ না, রোজা রাখা অবস্থায় স্বপে¦ কিছু পান করলে বা খেলে রোজা ভঙ্গ হবে না। আর জাগ্রত অবস্থায় ভুলে পেট ভরে পানাহার করলেও রোজা ভঙ্গ হবেনা। তবে অবশ্যই রোজার কথা স্মরণ হওয়ার সাথে সাথেই পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে। রোজার কথা স্মরণ হওয়ার পরও যদি সামান্য খাদ্য বা পানীয় গিলে ফেলে, তবে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। এতে শুধু উক্ত রোজার কাযা আদায় করতে হবে, কাফ্ফারা দিতে হবেনা। (দুররুল মুখতার, শামী)
হাফিয মুহম্মদ আব্দুল্লাহিল মাসুদ,
ডোমার, নিলফামারী।
সুওয়াল ই’তিকাফ করার ফযীলত কতটুকু?
জাওয়াবঃ হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, যে ব্যক্তি রমজান শরীফের শেষ দশ দিন (সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে ক্বিফায়া) ই’তেকাফ করবে, আল্লাহ্ পাক তাকে দু’টি হজ্ব ও দু’টি ওমরাহ্ করার সমতুল্য সওয়াব দান করবেন।
আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহ্ পাক তার পিছনের গুণাহ্খতা ক্ষমা করে দিবেন।
আরো বর্ণিত রয়েছে, যে ব্যক্তি একদিন ই’তেকাফ করবে, আল্লাহ্ পাক তাকে জাহান্নাম থেকে তিন খন্দক দূরে রাখবেন। প্রতি খন্দকের দূরত্ব পাঁচশত বছরের রাস্তা।
মুহম্মদ ছিদ্দিকুল আলম (বাদশা)
চান্দিনা, কুমিল্লা।
সুওয়ালঃ অনেকে বলে থাকে, রমজান শরীফের শেষে তিনদিন বা একদিন ই’তিকাফ করলেই সুন্নাতে মুয়াক্কায়ায়ে ক্বিফায়া ই’তিকাফ হয়ে যায়, এটা কতটুকু সত্য?
জাওয়াবঃ রমজান মাসের শেষ দশদিন অর্থাৎ ২০ তারিখ বাদ আছর ও ২১ তারিখ মাগরীবের পূর্ব হতে ঈদের বা শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা পর্যন্ত ই’তিকাফ করলে সুন্নাতে মুয়াক্কাদায়ে ক্বিফায়া ই’তিকাফ আদায় হবে। অন্যথায় একদিন, তিনদিন, পাঁচদিন এবং সাতদিন ই’তেকাফ করলেও সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ক্বিফায়া ই’তেকাফ আদায় হবেনা। অর্থাৎ ৩০শে রমজানের দশদিন কিংবা ২৯শে রমজানের নয়দিনের এক মিনিট কম হলেও সুন্নাতে মুয়াক্কাদায়ে ক্বিফায়া ই’তেকাফ আদায় হবেনা।
মাওলানা মুহম্মদ মুজাফ্ফর হুসাইন
পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও।
সুওয়ালঃ ই’তিকাফের আহ্কাম সম্বন্ধে জানালে কৃতজ্ঞ হবো?
জাওয়াবঃ ই’তিকাফের অর্থ হলো- (১) গুণাহ হতে বেঁচে থাকা, (২) অবস্থান করা, (৩) নিজেকে কোন স্থানে আবদ্ধ রাখা, কোণায় অবস্থান করা।
আর শরীয়তের পরিভাষায় রমজান মাসের শেষ দশ দিন দুনিয়াবী যাবতীয় কার্যকলাপ ও পরিবার-পরিজন হতে ভিন্ন হয়ে, আলাদাভাবে পুরুষের জন্য জামে মসজিদে ও মহিলাদের জন্য ঘরে ইবাদত কার্যে মশগুল থাকাকে ই’তিকাফ বলে।
ই’তিকাফ তিন প্রকার- (১) ওয়াজিব, (২) সুন্নাতে মুয়াক্বাদাহ, (৩) নফল। যিনি ই’তিকাফ করেন, তাকে বলে মু’তাকিফ। রমজানের শেষ দশ দিন ই’তেকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ্ ক্বেফায়া। প্রতি মসজিদে এলাকার তরফ হতে একজন মুতাকিফ হলেই সকলের আদায় হয়ে যাবে, আর যদি কেউ ই’তিকাফ না করে, তাহলে সকলেরই সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ তরক করার গুণাহ্ হবে।
ই’তিকাফের শর্ত তিনটি- (১) পুরুষের জন্য মসজিদে, মহিলাদের জন্য ঘরের মধ্যে। (২) ই’তিকাফের জন্য নিয়ত করা, হদসে আক্বর হতে পাক হওয়া। (৩) রোজা রাখা। ই’তিকাফের জন্য বালেগ হওয়া শর্ত নয়। ই’তিকাফ অবস্থায় জাগতিক ফায়দাদায়ক কাজ করা অবস্থাভেদে হারাম ও মাকরূহ্ তাহ্রীমী হবে।
মুতাকিফ ব্যক্তি মসজিদে এসে কোন বেহুদা কথা বা কাজ করবে না বা চুপ করে বসে থাকবে না। বরং ঘুম ব্যতীত বাকি সময় ইবাদত কার্যে মশগুল থাকতে হবে। যেমন- নফল নামায, কুরআন শরীফ তিলাওয়াত, যিকির, ইল্ম অর্জন ইত্যাদি। ই’তিকাফকারী বাইরে বের হওয়ার দু’টি জরুরত হতে পারে- (১) শরয়ী, (২) তবঈ।
শরয়ী জরুরত হলো- যে মসজিদে ই’কিাফ করছে, সেখানে জুমুয়া হয় না, অন্য কোন মসজিদে যেখানে জুমুয়া হয়, সেখানে জুমুয়ার নামায পড়তে যাওয়া এবং নামায পড়ে চলে আসা। মুতাকিফ যদি অহেতুক এক সেকেন্ডের জন্য মসজিদের বাইরে অবস্থান করে, তাহলে ই’তেকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় তবঈ জরুরত হলো- পায়খানা-প্রস্রাব ইত্যাদির জন্য বের হওয়া এবং কাজ সেরে চলে আসা।
হাদীস শরীফে আছে, “যে ব্যক্তি রমজানের শেষ দশ দিন ই’তিকাফ করবে, সে দু’হজ্ব ও দু’ওমরার সমপরিমাণ সওয়াব পাবে। (যাবতীয় ফিক্বহ্রে কিতাব দ্রষ্টব্য)
সেলিম আহমদ
পাহাড় কাঞ্চনপুর, টাঙ্গাইল।
সুওয়ালঃ যাকাত দেয়ার সময় নিয়ত করা শর্ত কিনা?
জাওয়াবঃ যাকাত আদায় করার সময় অথবা যাকাতের মাল অন্যান্য মাল হতে আলাদা করার সময় নিয়ত করতে হবে। বিনা নিয়তে দিলে যাকাত আদায় হবেনা। অর্থাৎ উক্ত আলাদাকৃত মাল সম্পর্কে কেউ জিজ্ঞাসা করলে বিনা চিন্তায় যেন বলতে পারে যে, এটা যাকাতের মাল।
এমনকি নিয়ত ব্যতীত সারা বছর দান করল, অতঃপর দানকৃত মাল দ্বারা যাকাত আদায়ের নিয়ত করল, তাতে যাকাত আদায় হবেনা। (আলমগীরী)
মুহম্মদ নুরুল ইসলাম
সভাপতি- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত, সাতক্ষীরা।
সুওয়ালঃ যাকাত কাদের উপর ফরয?
জাওয়াবঃ যারা মালেকে নেছাব বা ছাহেবে নেছাব, তাদের উপর যাকাত ফরয। আর মালেকে নেছাব বা ছাহেবে নেছাব বলতে বুঝায়, যে মুসলমান, স্বাধীন, বালেগ বা বালেগার নিকট ‘হাওয়ায়েজে আছলিয়াহ্ (নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, মাল-সামানা) বাদ দিয়ে কর্জ ব্যতীত নিজ মালিকানাধীনে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রৌপ্য বা তার সমপরিমাণ মূল্য পূর্ণ এক বছর থাকে, তাহলে তার উপর যাকাত ফরয। অর্থাৎ নিম্ন বর্ণিত দশ প্রকার গুণ সম্পন্ন লোকের উপর যাকাত ফরয-
(১) মুসলমান হওয়া। (২) বালেগ হওয়া। (৩) জ্ঞানবান হওয়া। (৪) স্বাধীন হওয়া। (৫) নেছাব পরিমান মালের মালিক হওয়া (৬) যাকাতের মালের পূর্ণ মালিকানা থাকা। (৭) নেছাব করমুক্ত হওয়া (৮) নেছাব পরিমান মাল হাওয়ায়েজে আছলিয়ার অতিরিক্ত হওয়া। (৯) মাল বর্ধনশীল হওয়া। (১০) নেছাবের মালের বৎসর শেষ হওয়া।
(দলীলসমূহঃ আলমগীরী, আইনুল হেদায়া, বাহরুর রায়েক, ফতওয়ায়ে আমিনীয়া ইত্যাদি।)
মুহম্মদ তৈয়বুল মওলা রাব্বানী
সভাপতি- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত, সন্দীপ।
সুওয়ালঃ যাকাত কে কে গ্রহণ করতে পারে? কাদেরকে যাকাত দেয়া উত্তম? জানাবেন।
জাওয়াবঃ যাকাত কাদেরকে দিতে হবে, এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ পাক তাঁর কালাম পাকে ইরশাদ করেন,
انما الصدقت للفقراء والمسكين والعملين عليها والمؤلفة قلوبهم وفى الرقاب والغرمين وفى سبيل الله وابن السبيل فريضة من الله والله عليم حكيم.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই সদ্কা তথা যাকাত ফকির, মিসকীন, যাকাত আদায়কারী কর্মচারী, নও মুসলিম, গোলামদের আযাদকার্যে, ঋণগ্রস্থ, জ্বিহাদে লিপ্ত ব্যক্তি এবং মুসাফিরের জন্য। এটা আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আর আল্লাহ্ পাক সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।” (সূরা তওবা/৬০)
মূলতঃ এ আয়াত শরীফের দ্বারাই যাকাত প্রদানের ৮টি খাত নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।
আর যেহেতু যাকাত প্রদানের সব খাতগুলি একই সাথে পাওয়া সম্ভব নয়, সেহেতু যে কোন একটি খাতে যাকাত প্রদান করলেই যাকাত আদায় হয়ে যাবে। এটাই ইমামে আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর অভিমত।
উল্লেখ্য যে, বর্তমানে যেহেতু দেশে খিলাফত কায়েম নেই। যাকাত বায়তুল মালেও জমা দেয়া হচ্ছে না এবং কুরআন শরীফে উল্লিখিত সর্ব প্রকার খাতও পাওয়া যাচ্ছে না। আর অনেক যাকাত দাতার গরীব আত্মীয়-স্বজন ও গরীব প্রতিবেশী রয়েছে এবং অনেক মাদ্রাসা রয়েছে যেখানে এতিমখানাও আছে। তাই যাকাত দেয়ার সহজ ও উত্তম পদ্ধতি হলো- যাকাতের মালকে তিনভাগ করে একভাগ গরীব আত্মীয়-স্বজন, একভাগ গরীব প্রতিবেশী ও একভাগ মাদ্রাসার এতিমখানায় প্রদান করা।
আর যদি গরীব আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী না থাকে, তবে সবটাই মাদ্রাসার এতিমখানায় দেয়া আফযল ও উত্তম।
এ সম্পর্কে আফজালুল আউলিয়া, কাইউমে আউয়াল হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যাকাত, ফেৎরা ইত্যাদি সর্ব প্রকার দান ছদকা অন্যান্য খাতে না দিয়ে কোন মাদ্রাসার এতিম গরীব ছাত্রদেরকে দান করলে অন্যান্য খাতের চেয়ে লক্ষ্যগুণ ছওয়াব বেশী হবে। কারণ উহাতে তাদের ইল্মে দ্বীন অর্জনের সহায়তা করা হয়।
হ্যাঁ, এ তিন প্রকার ব্যতীত যদি কোরআন শরীফে উল্লেখিত যাকাতের হক্বদারদের মধ্যে আরো কাউকে পাওয়া যায়, তবে তাদেরকেও যাকাত দিয়ে কোরআন শরীফের উপর আমল করা উত্তম। (সমূহ ফিক্বহ্রে কিতাব)
মাওলানা মুহম্মদ ফারুক হুসাইন
সভাপতি- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত, এন, গঞ্জ ।
সুওয়ালঃ আপন আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে কাকে কাকে যাকাত দেয়া যাবে?
জাওয়াবঃ নিজের পিতা, দাদা, পুত্র, নাতী, স্ত্রী, স্বামী ইত্যাদি পরস্পর পরস্পরকে যাকাত দিতে পারবে না।
তবে পুত্রবধু, জামাতা, বিমাতা, স্ত্রীর অন্য ঘরের সন্তান অথবা স্বামীর অন্যান্য স্ত্রীর সন্তানদেরকে যাকাত দেয়া যায়। আর পিতা-মাতা যদি অভাবগ্রস্থ হয়, তবে হিলা করে তাদেরকে যাকাতের টাকা দেয়া জায়েয, তবে তা মাকরূহ্। অনুরূপভাবে হিলা করে নিজের সন্তানকেও যাকাত দেয়া মাকরূহের সাথে জায়েয। (দুররুল মুখতার, রদ্দুল মুহতার, আলমগীরী)
মীর মুহম্মদ আমজাদ আলী
কুমারখালী, কুষ্টিয়া।
সুওয়ালঃ ধনী লোকের আপন আত্মীয় ও স্বামীহীন ধনী মহিলার সন্তানকে যাকাত দেয়া জায়েয হবে কিনা?
জাওয়াবঃ ধনী লোকের নাবালেগ সন্তানকে যাকাত দেয়া জায়েয নেই। কিন্তু ধনী লোকের বালেগ সন্তান যদি ফকির হয়, তাহলে তাকে যাকাত দেয়া জায়েয। এমনকি ধনী লোকের স্ত্রী ও পিতা যদি নেছাবের মালিক না হয়, তবে তাদেরকেও যাকাত দেয়া জায়েয আছে।
আর পিতৃহীন শিশুর মাতা যদি নেছাবের মালিকও হয়, তবে সে শিশুকে যাকাত দেয়া জায়েয আছে। (দুররুল মুখতার, আলমগীরী, জাওহারাতুন্ নাইয়্যারা)
মুহম্মদ সাইফুল হাবীব
সভাপতি- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত, বগুড়া।
সুওয়ালঃ যাকাতের টাকা মসজিদ, মাদ্রাসা ও কাফন-দাফনের কাজে ব্যবহার করা যাবে কিনা?
জাওয়াবঃ যাকাতের টাকা মসজিদ, মাদ্রাসা ও কাফন-দাফনের কাজে ব্যবহার করতে পারবেনা। তবে মাদ্রাসার লিল্লাহ্ বোডিংয়ে ব্যবহার করতে পারবে। কারণ যাকাতের টাকা গরীব-মিসকিনের হক্ব। যদি তা মসজিদ, মাদ্রাসা বা কাফন-দাফনের কাজে ব্যবহার করতে চায়, তবে প্রথমে উক্ত টাকা কোন গরীব-মিসকিনকে দান করে তাকে এর মালিক করে দিবে। অতঃপর সে ব্যক্তি তা মসজিদ-মাদ্রাসা অথবা কাফন-দাফনের জন্য দান করে দিবে। তখন তা উক্ত কাজে ব্যবহার করতে পারবে। অন্যথায় তা ব্যবহার করা জায়েয হবেনা।
এরূপক্ষেত্রে যাকাত দাতা ও উক্ত মিসকিন ব্যক্তি উভয়ই সমান সওয়াব পাবে। হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “শত হাত ঘুরেও যদি কোন দান-ছদ্কা করা হয়, তাতে প্রত্যেকেই সমান সওয়াব লাভ করবে।” (রদ্দুল মুহ্তার)
মুহম্মদ আবু ইয়াকুব ইসহাক
সভাপতি- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত, শেরপুর।
সুওয়ালঃ কোন কাফিরকে যাকাত দেয়া জায়েয আছে কিনা?
জাওয়াবঃ কোন কাফিরকেই ওয়াজিব সদ্কা যেমন যাকাত, ফিৎরা, ছদ্কা, মান্নত, কাফ্ফারা ইত্যাদি কোনটাই দেয়া জায়েয নেই। আর হরবী কাফিরকে কোন রকমের দান-খয়রাত দেয়াই জায়েয নেই। যদিও সে দারুল ইসলামে মুসলমান বাদশাহ্ হতে আমান এনে থাকে।
উল্লেখ্য, হরবী কাফির হলো যে সমস্ত কাফের দেশের সাথে মুসলমানদের জ্বিহাদ হচ্ছে, সেই দেশের কাফের নাগরিককে হরবী কাফির বলা হয়।
মুহম্মদ শফিকুল আলম
ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর।
সুওয়ালঃ খাঁদযুক্ত সোনা-চান্দির যাকাতের হুকুম কি?
জাওয়াবঃ সোনা-চান্দির মধ্যে খাঁদ থাকলে এবং সোনা-চান্দীর পরিমাণ বেশী হলে একে সোনা-চান্দী হিসাবেই যাকাত দিতে হবে, যদি তা নেছাব পরিমাণ হয়। আর যদি নেছাব পরিমাণ না হয়, তবে এর মূল্য হিসাব করে অন্যান্য মালের সাথে মিলিয়ে নেছাব পূর্ণ হলে যাকাত আদায় করতে হবে। যদি সোনা-চান্দী কম হয় ও খাঁদ বেশী হয় এবং উভয় মিলে যদি এক নেছাব বা তার চেয়ে বেশী হয়, তবুও যাকাত দিতে হবে। খাদযুক্ত সোনা-চান্দী এত কম হয় যে, উভয়টি মিলেও এক নেছাব হয়না কিন্তু তার দ্বারা ব্যবসা করা হয়, তবে উহা ব্যবসার মালের নেছাব হিসাবে হলে যাকাত দিতে হবে; অন্যথায় যাকাত দিতে হবেনা। (দুররুল মুখতার)
মুহম্মদ তাজুল ইসলাম
জুরি, মৌলভীবাজার।
সুওয়ালঃ জনৈক ব্যক্তির প্রায় দশ লক্ষাধিক টাকার মুরগীর ফার্ম আছে। সে প্রতিদিন তিন/চার হাজার টাকার ডিম বিক্রি করে। অথচ সে কোনদিন এক টাকাও যাকাত দেয়না। তাকে যাকাত দেয়ার কথা বললে সে বলে, মুরগীর ফার্মের যাকাত দিতে হয়না।
এখন আমার সুওয়াল হলো- উক্ত মুরগীর ফার্মের ব্যবসায় লভ্যাংশ টাকার যাকাত দিতে হবে কি না? দলীল দ্বারা জবাবদানে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ যাকাত ফরয হয়- (১) নগদ (২) মালে তেজারত ও (৩) ছায়েমা।
(১) নগদ হলো- স্বর্ণ, চান্দি ও টাকা-পয়সা ইত্যাদি নেছাব পরিমাণ এক বৎসর কারো মালিকানাধীনে থাকলে, তার উপর যাকাত ফরয হবে। (২) মালে তেজারত বা ব্যবসার মাল অর্থাৎ যে মালের ব্যবসা করা হয়, তা যদি নেছাব পরিমাণ হয় এবং এক বৎসর কারো মালিকানাধীনে থাকে, তবে তার উপর যাকাত ফরয হবে। (৩) ছায়েমা হলো- যে কোন পশু অর্থাৎ গরু, মহিষ, ছাগল, বকরী, ভেড়া, উট, দুম্বা, মেষ ইত্যাদি যদি চারণভূমিতে ছয় মাসের অধিককাল বিচরণ করে অর্থাৎ ফ্রি খায়, আর তা যদি নেছাব পরিমাণ হয়, তবে তার মালিকের উপর যাকাত ফরয হবে।
উল্লেখ্য, উল্লিখিত ব্যক্তির ফার্মের মুরগীর কোন যাকাত দিতে হবেনা যেহেতু সে মুরগীর ব্যবসা করেনা, বরং মুরগীর থেকে ডিম উৎপাদন করে ডিমের ব্যবসা করে থাকে। এখন উক্ত ব্যক্তি ডিমের ব্যবসা করে যে টাকা উপার্জন করবে, তা যদি নেছাব পরিমাণ হয় এবং তার নিকট এক বৎসর থাকে তখনই তার উপর উক্ত টাকার যাকাত আদায় করা ফরয হবে।
আর যদি কোন মুরগীর ফার্মের মালিক মুরগী বেচা-কেনা করে, তবে যত টাকার মুরগী রয়েছে তা যদি নেছাব পরিমাণ হয়, আর এক বৎসর মালিকানাধীনে থাকে, তাহলে যত টাকার মুরগী রয়েছে, তত টাকারই যাকাত দিতে হবে।
(আলমগীরী, শামী ইত্যাদি)
সাইয়্যিদ মুহম্মদ নাজিরুল ইসলাম
কালকিনী, মাদারীপুর।
সুওয়ালঃ জমির ফসলের যাকাত বা ওশর আদায় করার জন্য বৎসর পূর্ণ হওয়া ও নেছাব পরিমাণ মাল হওয়া শর্ত কিনা?
জাওয়াবঃ ওশর বা জমির যাকাত আদায় করার জন্য বৎসর পূর্ণ হওয়া ও নেছাব পরিমাণ মাল হওয়া শর্ত নয়। বরং একই জমিতে প্রতি মৌসুমে যে পরিমাণ ফসলই হোক তার দশ ভাগের একভাগ যাকাত আদায় করা ফরয। তবে যদি পরিশ্রম করে ফসল ফলানো হয়, তবে বিশ ভাগের এক ভাগ ফসলের যাকাত দিতে হবে। (দুররুল মুখতার)
খন্দকার মুহম্মদ আব্দুল হান্নান
মাদারটেক, ঢাকা।
সুওয়ালঃ খাজনা দেয়া হয়, এমন জমির যাকাত দিতে হবে কিনা?
জাওয়াবঃ যে জমির খাজনা দেয়া হয়, উক্ত জমির ফসলের যাকাত দিতে হবে। এমনকি উক্ত জমি বিক্রি করলেও বিক্রিত টাকা নেছাব পরিমাণ হলে এবং উক্ত টাকা পূর্ণ এক বছর হাতে থাকলে অথবা অন্যান্য টাকার সাথে মিলিয়ে নেছাব পূর্ণ হলে তার যাকাত দিতে হবে। (ফতওয়ায়ে আলমগীরী)
মুহম্মদ ইসমাঈল হুসাইন
প্যারিদাস রোড, ঢাকা।
সুওয়ালঃ এ বছর সদ্কাতুল ফিত্র কত?
জাওয়াবঃ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সদ্কাতুল ফিত্রের পরিমাণ সম্পর্কে ইরশাদ করেন,
صاع من بر على كل اثنين.
অর্থঃ- “প্রতি দু’জনের জন্য এক ‘সা’ অর্থাৎ একজনের জন্য অর্ধ ‘সা’।” (আবূ দাউদ, বযলুল মাযহুদ)
আমাদের হানাফী মায্হাব মুতাবিক অর্ধ ‘সা’ বলতে এক সের সাড়ে বার ছটাক বুঝানো হয়েছে, যা গ্রাম হিসাবে ১৬৫৭ গ্রাম (প্রায়) হয়। কাজেই যাদের উপর সদ্কাতুল ফিত্র ওয়াজিব অর্থাৎ ঈদের দিন সুব্হে সাদিকের সময় নেসাব পরিমাণ (সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা অথবা সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সমপরিমাণ টাকা) সম্পদ থাকে, তাদের প্রত্যেকক্যেই উল্লিখিত একসের সাড়ে বার ছটাক বা ১৬৫৭ গ্রাম আটা বা তার মূল্য দান করতে হবে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় আটার দাম বিভিন্ন রকম। কাজেই যাদের উপর সদ্কাতুল ফিত্র ওয়াজিব, তাদেরকে তাদের নিজ নিজ এলাকার বর্তমান মূল্য হিসাবে একসের সাড়ে বার ছটাক বা ১৬৫৭ গ্রাম আটার মূল্য দিতে হবে।
এ বছর ঢাকা শহরে ১৫.০০ টাকা কেজি হিসাবে একসের সাড়ে বার ছটাক বা ১৬৫৭ গ্রাম আটার মূল্য- ২৪.৮৬ টাকা (প্রায়)। এর কম দেয়া যাবেনা, তবে ইচ্ছা করলে বেশী দিতে পারবে।
মুহম্মদ ফযলুর রহমান
বাশার, বানারীপাড়া, বরিশাল।
সুওয়ালঃ ঈদের রাতের ফযীলত কি?
জাওয়াবঃ বছরে পাঁচ রাতে দোয়া বিশেষভাবে কবুল হয়। তার মধ্যে দু’ঈদের দু’রাত। এ রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত-বন্দেগী, তাস্বীহ্ পাঠ, কোরআন শরীফ তিলাওয়াত, দরূদ শরীফ ও যিকির-আয্কার করে রাত অতিবাহিত করা অতি উত্তম। দিলের নেক মকসুদসমূহ আল্লাহ্ পাক-এর নিকট জানালে আল্লাহ্ পাক তা কবুল করবেন।
হাদীস শরীফে আছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈদুল ফিত্র ও ঈদুল আয্হার রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদতে মশগুল থাকবে, যেদিন অন্য সমস্ত দিল মরবে, সেদিন তার দিল মরবে না।” এর অর্থ হলো- ক্বিয়ামতের দিন অন্যান্য দিল পেরেশানীতে থাকলেও দু’ঈদের রাতে জাগরণকারী ব্যক্তির দিল শান্তিতে থাকবে। (তিবরাণী শরীফ)
মুহম্মদ বদরুজ্জামান
পুলেরঘাট বাজার, বাইয়েরকাদি, কিশোরগঞ্জ।
সুওয়ালঃ ঈদের দিনের সুন্নতসমূহ কি? জানালে কৃতার্থ হবো।
জাওয়াবঃ ঈদের দিনের সুন্নত হলো- (১) খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠা, (২) গোসল করা, (৩) মিস্ওয়াক করা, (৪) সামর্থ অনুযায়ী নতুন ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা, (৫) আতর ব্যবহার করা, (৬) নামাযের পূর্বে সদকাতুল ফিৎর আদায় করা, (৭) ঈদুল ফিত্র নামাযের পূর্বে কিছু মিষ্টান্ন খাওয়া (৮) তিন, পাঁচ বা বেজোড় সংখ্যক খেজুর বা খুরমা খাওয়া, (৯) মহল্লার (এলাকার) মসজিদে গিয়ে ফজরের নামায পড়া, (১০) ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া, (১১) এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা, (১২) সকাল সকাল ঈদের নামায পড়ার জন্য যাওয়া, (১৩) ঈদের নামায, ঈদগাহে গিয়ে পড়া। সম্ভব না হলে মহল্লার (এলাকার) মসজিদে গিয়ে ঈদের নামায পড়া, (১৪) আস্তে আস্তে নিম্নলিখিত দোয়া পড়তে পড়তে ঈদগাহে যাওয়া
الله اكبر الله اكبر
لا اله الا الله والله اكبر
الله اكبر والله الحمد.
(১৫) শরীয়তের সীমার মধ্যে থেকে খুশী প্রকাশ করা ইত্যাদি ঈদের সুন্নত। (আলমগীরী, নূরুল ইজা ও অন্যান্য ফিক্বাহ্রে কিতাব)
মুহম্মদ আব্দুল্লাহ্
লাখাই, হবিগঞ্জ।
সুওয়ালঃ ঈদের নামাযের পূর্বে কোন নফল ইবাদত বা কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা যাবে কি?
জাওয়াবঃ ঈদের নামাযের পূর্বে পুরুষ, মহিলা প্রত্যেকের জন্য নফল নামায আদায়, কুরআন শরীফ তিলাওয়াত ইত্যাদি মাকরূহ্। (মারাকিউল ফালাহ্, তাহ্তাবী, তাতারখানিয়া)
মুহম্মদ শাহিনুর ইসলাম
ওয়াল্লেছ কলোনী, লালমনিরহাট।
সুওয়ালঃ ঈদের নামায পড়া ফরয না ওয়াজিব? ঈদের নামায কখন পড়া সুন্নত? আজকাল অনেক জায়গায় দেখা যায় কেউ কেউ সকাল সকাল ঈদের নামায পড়েন আবার কেউ কেউ দেরী করে ঈদের নামায পড়েন। যেমন সকাল ১১টায়, ১২টায় পড়েন, কোন্ সময় নামায আদায় করলে সুন্নত হবে জানতে বাসনা রাখি।
জাওয়াবঃ আমাদের হানাফী মাযহাব মুতাবিক ঈদের নামায পড়া ওয়াজিব। সকালে সূর্য পূর্ণভাবে উদিত হবার পর থেকে (অর্থাৎ মাকরূহ্ ওয়াক্ত শেষ হবার পর থেকে অথবা সূর্য উদয়ের শুরু থেকে ঘড়ির মিনিট অনুযায়ী ২৩মিঃ পর) ঈদের নামাযের ওয়াক্ত শুরু হয়। আর যাহওয়াতুল কোবরা বা যাওয়াল অথবা শরয়ী অর্ধদিন বা দ্বিপ্রহর অর্থাৎ সূর্যের এস্তাওয়া আরম্ভ হবার পূর্ব পর্যন্ত ঈদের নামাযের ওয়াক্ত থাকে।
ফজরের ওয়াক্ত শেষ হবার পর, ২৩মিঃ পর্যন্ত মাকরূহ্ ওয়াক্ত এবং এরপর ঈদের নামাযের ওয়াক্ত শুরু হয়। আর যোহরের ওয়াক্ত শুরু হবার ১ ঘন্টা পূর্ব পর্যন্ত ঈদের নামাযের ওয়াক্ত থাকে। অর্থাৎ মাকরূহ্ ওয়াক্ত শুরু হবার আগ পর্যন্ত।
সূর্য পূর্ণভাবে উদিত হবার পর থেকে অর্থাৎ মাকরূহ্ ওয়াক্ত যা ঘড়ির হিসাব অনুযায়ী ২৩মিঃ অতিক্রম হবার পূর্বে ঈদের নামায আদায় করলে নামায হবে না এবং যোহরের নামাযের ওয়াক্ত হবার পূর্বের ১ ঘন্টা যা মাকরূহ্ ওয়াক্ত নামে পরিচিত অর্থাৎ যাহওয়াতুল কোবরা বা সূর্যের এস্তাওয়া আরম্ভ হবার পর ঈদের নামায আদায় করলে তা আদায় হবে না।
অর্ধদিন বা নিসফুন্নাহার দু’ভাবে বর্ণিত। একটি হলো শরয়ী অর্ধদিন আরেকটি ওরফী (প্রচলিত) অর্ধদিন। সূর্য উদয় হতে সূর্য অস্ত পর্যন্ত সময়কে দু’ভাগে ভাগ করলে প্রথম ভাগকে শরয়ী অর্ধদিন বলা হয়। প্রথম ভাগের শেষ অংশকে বলা হয় শরয়ী দ্বিপ্রহর বা যাহওয়াতুল কোবরা। যাহওয়াতুল কোবরা হতে সূর্য ঢলা পর্যন্ত সময়কে এস্তাওয়ায়ে শাম্স বলা হয়। ওটার মধ্যবর্তী সময় নামায পড়া মাকরূহ্। আর প্রচলিত অর্ধদিন বলতে বেলা ১২টা বুঝানো হয়। ঈদের নামাযের ওয়াক্ত শরয়ী অর্ধদিনের পূর্ব পর্যন্ত থাকে।
মেসালস্বরূপ সকাল ৬টায় যদি সূর্য উদিত হয়, তাহলে ৬টা ২৩মিঃ হতে ঈদের নামাজের ওয়াক্ত শুরু হয় এবং ১২টায় যদি যোহরের ওয়াক্ত শুরু হয়, তাহলে তার পূর্বে ১ঘন্টা বাদ দিয়ে অর্থাৎ ১১টা পর্যন্ত ঈদের নামাজের ওয়াক্ত থাকে।
আর নিম্নবর্ণিত হাদীস শরীফের মাধ্যমে আমরা ঈদের নামায কোন সময় আদায় করলে তা সুন্নত হবে, তা জানতে পারবো।
হযরত আবুল হোয়ারেস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আমর ইবনে হাযম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে (তিনি নাজরানের গভর্ণর থাকা অবস্থায়) চিঠি দিয়ে আদেশ করেছেন, ঈদুল আযহার নামায খুব সকাল সকাল পড়বে এবং ঈদুল ফিত্রের নামায ঈদুল আযহার চেয়ে অল্প একটু দেরীতে পড়বে এবং নামাযের পরে মানুষকে নসীহত করবে।
ঈদের দিন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফজরের নামায পড়ে হুজরা শরীফে গিয়ে সকাল সকাল গোসল করতেন এবং ঈদুল ফিত্র হলে বেজোড় সংখ্যক (৩,৫,৭) খোরমা, খেজুর খেয়ে ঈদগাহে যেতেন। আর ঈদুল আযহার সময় কিছু না খেয়ে সরাসরি ঈদগাহে যেতেন এবং ঈদের নামাযের ওয়াক্ত হবার সাথে সাথে ঈদের নামায আদায় করতেন এবং তারপর খুৎবা দিতেন ও নসীহত করতেন। সে জন্য ঈদের নামায সকাল সকাল পড়া সুন্নত। ঈদের নামাযের সম্মানার্থে এবং ঈদের নামায যাতে আদায়ে দেরী না হয়, সেজন্য ঈদের দিন ইশরাকসহ অন্যান্য নফল নামায পড়া নিষিদ্ধ ।
মুহম্মদ আব্দুল মালেক
কাউখালী, পিরোজপুর।
সুওয়ালঃ ঈদের নামাযের খুৎবার পরে মুসাফাহা করা কি?
জাওয়াবঃ ঈদের নামাযের খুৎবার পর মুছাফাহা করা জায়েয। (মুছাওওয়া/শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ফতওয়ায়ে আমিনিয়া)
আখিরী রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দরবার শরীফ উনার খাছ মেছদাক আওলাদুর রসূল রাজারবাগ শরীফ উনার হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার দরবার শরীফ
-মুহম্মদ নূরুল আমীন সরকার
لقد كان لكم فى رسول الله اسوة حسنة.
অর্থ: “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মাঝে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (পবিত্র সূরা আহযাব/২১)
প্রসঙ্গতঃ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক দরবার শরীফ বা মজলিশ সমূহও উম্মতের জন্য বে-মেছাল আদর্শ। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মজলিশ ছিল খুবই সাদাসিদে ও স্বাভাবিক।
মজলিশে নববীতে আগমণকারীদের জন্য কোন বাধা-ছিলনা। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার চরিত্র, মহত্ব সকল মজলিশে সমুন্নত ও অচিন্তনীয় ভাব ধারণ করত। এ মজলিশে সরলতা, পবিত্রতা, ন¤্রতা এবং আদব ও শিষ্টাচারপূর্ণ অবস্থা বিরাজমান ছিল। মজলিশে নববী সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নূরে নুবুওওয়তের জ্যোতিতে সমূদ্ভাসিত থাকত।
ইমামুল আইম্মা, মুহইস সুন্নাহ, কুতুবুল আলম, মুজাদ্দিদুয যামান, আওলাদুর রসূল রাজারবাগ শরীফ উনার হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার দরবার শরীফ বা মজলিশ সমূহও সবার জন্য উন্মুক্ত। হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার দরবার শরীফও খুবই সাদাসিদে ও স্বাভাবিক।
হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মজলিশে যখন লোকজন বসে থাকত, তখন মনে হত যেন উনাদের মাথা মুবারক উনার উপর পাখি বসে রয়েছে।” অর্থাৎ সকলেই উনার উপস্থিতিতে নিথর নিশ্চুপ থাকতেন। কথা-বার্তা বলার অনুমতির ক্ষেত্রেও উনারা তরতীবের প্রতি নজর রাখতেন।
রাজারবাগ শরীফ উনার হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি যখন দরবার বা মজলিশে উপস্থিত থাকেন তখন লোকজন উনার উপস্থিতিতে নিথর নিশ্চুপ থাকে এবং কথা বলার অনুমতির ক্ষেত্রেও তরতীবের প্রতি নজর রাখে।
আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মজলিশে দুনিয়াবী ধন-দৌলত, মান-সম্মান, প্রভাব প্রতিপত্তি ইত্যাদি কারণে কাউকে প্রাধান্য দেয়া হতনা বরং তাক্বওয়ার আলোকে প্রাধান্য দেয়া হত।
ইমামুল আইম্মা, কুতুবুল আলম, আওলাদুর রসূল, রাজারবাগ শরীফ উনার হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার দরবার বা মজলিশেও দুনিয়াবী ধন-দৌলত, মান-সম্মান, প্রভাব প্রতিপত্তি ইত্যাদি কারণে কাউকে প্রাধান্য দেয়া হয়না বরং তাক্বওয়ার আলোকে প্রাধান্য দেয়া হয়।
মজলিশে যে বিষয়ে আলোচনা হত সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সে বিষয়েই আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন। মার্জিত হাস্য-খুশিতেও তিনি অংশগ্রহণ করতেন। কখনো নিজেও আনন্দ দায়ক কথা-বার্তা বলে মজলিশের লোকদেরকে আনন্দ দিতেন।
রাজারবাগ শরীফ উনার হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার দরবার বা মজলিশে যে বিষয়ে আলোচনা শুরু হয় তিনিও সে বিষয়েই আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। মার্জিত হাস্য-খুশিতেও তিনি অংশগ্রহণ করেন। কখনো নিজেও আনন্দদায়ক কথা-বার্তা বলে মজলিশের লোকদের আনন্দ দেন।
সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মজলিশে কোন সম্মানিত ব্যক্তি এলে তার যথাযথ সম্মান প্রদান করতেন। শারীরিক সুস্থতার কথা জিজ্ঞেস করে কারো কোন কথা প্রয়োজনে বা অভিযোগ আছে কিনা তা জিজ্ঞেস করতেন।
রাজারবাগ শরীফ উনার হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার দরবার বা মজলিশে কোন সম্মানিত ব্যক্তি এলে তার যথাযথ সম্মান প্রদান করেন। কারো কোন কথা, প্রয়োজন বা অভিযোগ আছে কিনা তা জিজ্ঞেস করেন।
সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দরবার বা মজলিশে কোন কিছু বিতরণ কালে ডানদিকে হতে শুরু করা হত।
রাজারবাগ শরীফ উনার হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার দরবার বা মজলিশে কোন কিছু বিতরণকালে ডানদিক হতে শুরু করা হয়।
সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দরবারে নববীতে প্রত্যেকেই বসার স্থান লাভ করতেন। আসন গ্রহণের ব্যাপারে কারো এরূপ ধারণা হতনা যে, অপরকে উনার অপেক্ষা অধিক মর্যাদাপূর্ণ আসন দেয়া হয়েছে। উত্তম বিষয়ে কোন আলোচনা হলে তিনি তার প্রশংসা করতেন। আর কেউ কোন অসংলগ্ন কথা বললে তিনি উনাকে বারণ করতেন।
রাজারবাগ শরীফ উনার হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার দরবার শরীফ উনার মধ্যে প্রত্যেকেই বসার স্থান লাভ করে। আসন গ্রহণের ব্যাপারে কারো এরূপ ধারণা হয়না যে, অপরকে তার অপেক্ষা অধিক মর্যাদাপূর্ণ আসন দেয়া হয়েছে। কেউ কোন উত্তম বিষয়ে আলোচনা করলে তিনি তার প্রশংসা করেন। আর কেউ অসংলগ্ন কথা বললে তিনি তাকে বারণ করেন।
সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রকাশ্য মজলিশের ফয়েজ ও বরকত সাধারণঃ পুরুষদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। এতে মহিলাগণ পরিপূর্ণ ফায়দা হাসিলের সুযোগ কম পেতেন। এ কারণে মহিলাগণ তাদের জন্য একটি দিন নির্দিষ্ট করার আরজী পেশ করলে তা কবুল করা হয়।
রাজারবাগ শরীফ উনার হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার মজলিশেরও ফয়েজ ও বরকত সাধারণভাবে পুরুষদের মাঝেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু মহিলাগণ উনাদের ফয়েজ ও বরকত পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেমন, মহিলারা প্রতি মাসে আলাদাভাবে এক দিন এবং প্রতি সোমবার, শুক্রবার ওয়াজ, নসীহত শুনতে পারেন ও ফয়েজ বরকত লাভ করেন।
মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদের সকলকে বর্তমান যামানার মুজাদ্দিদ, ইমামুল আইম্মা, মুহইস সুন্নাহ, কুতুবুল আলম, আওলাদুর রসূল, ঢাকা রাজারবাগ শরীফ উনার হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার মুবারক হাতে বাইয়াত হয়ে উনার ছোহবত ইখতিয়ার করে মহান আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সন্তুষ্টি অর্জন করার তাওফিক দান করুন। (আমীন)