মুহম্মদ মিজানুর রহমান খান
লুটন, ইউ, কে।
সুওয়ালঃ “নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নুবুওওয়াতের পূর্বের জীবন অনুসরণীয় নয়। কারণ তিনি ছিলেন পথহারা।”
জনৈক লিখকের এ বক্তব্য কতটুকু শুদ্ধ? কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ উপরোক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণ অশুদ্ধ ও কুফরীমূলক। এ আক্বীদা যে পোষণ করবে সে কাট্টা কাফির হয়ে চির জাহান্নামী হবে।
কেননা, আখিরী রসূল হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবী ও রসূল হিসেবে পয়দা হয়েছেন। আর যিনি নবী ও রসূল হিসেবে পয়দা হয়েছেন তিনি কিভাবে পথ হারা হন। কাজেই তিনি কখনোই পথহারা ছিলেন না।
কারণ ‘পথহারা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘গোমরাহ্।’ বরং তিনি পথহারাদের পথ প্রদর্শক ছিলেন।
এ সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক বলেন,
ما ضل صاحبكم وما غوى.
অর্থঃ- “তোমাদের সঙ্গী হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম না গোমরাহ্ ছিলেন আর না বিপথগামী ছিলেন।” (সূরা নজম/২)
উল্লেখ্য, কুরআন শরীফের আয়াত শরীফসমূহ সাধারণতঃ বিশেষ উপলক্ষ্যে নাযিল হয়েছে কিন্তু তার হুকুম হচ্ছে আম। এ আয়াত শরীফের হুকুমও হচ্ছে আম যদিও নুযূল খাছ। অর্থাৎ আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্বে বা পরে কখনোই পথহারা বা বিপথগামী ছিলেননা।
এর ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,
عن ابى هريرة رضى الله تعالى عنه قال قالوا يا رسول الله صلى الله عليه وسلم متى وجبت لك النبوة قال وادم بين الروح والجسد.
অর্থঃ- “হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। ছাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি কখন থেকে নবী?” তিনি বললেন, “হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম যখন রূহ ও শরীরে ছিলেন আমি তখন থেকে নবী।” (তিরমিযী, মিশকাত, কানযুল উম্মাল)
অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবী হিসেবেই পয়দা হয়েছেন।
আর তিনি শুধু আমাদেরই নবী ও রসূল নন বরং তিনি সমস্ত নবীদের নবী ও রসূলদের রসূল তথা সমস্ত মাখলুকাতের নবী ও রসূল।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ পাক পবিত্র কালাম পাকে ইরশাদ করেন,
واذ اخذ الله ميثاق النبين لما اتيتكم من كتب وحكمة ثم جاءكم رسول مصدق لما معكم لتؤمنن به ولتنصرنه قال ءاقررتم واخذتم على ذلكم اصرى قالوا اقررنا قال فاشهدوا وانا معكم من الشهدين.
অর্থঃ- “আর যখন মহান আল্লাহ্ পাক নবীগণের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন, আমি তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত দান করবো, অতঃপর যখন সেই রসূল আগমণ করে তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তা সত্যে প্রতিপাদন করবেন। (তোমরা তাঁকে পেলে) অবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে। তিনি (আল্লাহ্ পাক তাদেরকে) বললেন, তোমরা কি (হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রিসালতকে) স্বীকার করে নিলে? এবং তোমাদের প্রতি আমার এ অঙ্গীকার গ্রহণ করলে? তাঁরা (নবীগণ) বললেন, আমরা স্বীকার করে নিলাম। তিনি (আলাহ্ পাক) বললেন, তোমরা স্বাক্ষী থাক এবং আমিও তোমাদের সাথে স্বাক্ষী রইলাম।” (সূরা আলে ইমরান/৮১)
অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রসূল হিসেবেই পয়দা হয়েছেন, রসূল হিসেবেই ছিলেন, রসূল হিসেবেই যমীনে এসেছেন, বর্তমানেও রসূল হিসেবেই আছেন এবং অনন্তকাল ধরে রসূল হিসেবেই থাকবেন।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক এক কথায় বলেছেন,
وما محمد الا رسول.
অর্থঃ- “মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রসূল ব্যতীত অন্য কিছু নন।” (সূরা আলে ইমরান/১৪৪)
এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফের বিশুদ্ধ কিতাব মুস্তাদরেকে হাকেমে বর্ণিত হয়েছে, “হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম যখন যমীনে আসলেন, মুখতালিফ রেওয়ায়েত তিনি যমীনে এসে দু’শ থেকে তিনশ বছর পর্যন্ত আল্লাহ্ পাক-এর নিকট কান্নাকাটি, দোয়া, ইস্তিগফার করলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি এই বলে দোয়া করলেন যে,
اغفرلى بحق محمد صلى الله عليه وسلم قال الله تعالى كيف عرفت محمدا صلى الله عليه وسلم قال ادم عليه السلام لما خلقتنى بيدك ونفخت فى عنى روحك رفعت رأسى فرأيت على قوام العرش مكتوبا لا اله الا الله محمد رسول الله فعلمت انك لم تضف الى اسمك احب الخلق اليك قال الله صدقت يا ادم لولاه ما خلقتك وفى رواية اخرى ماخلقت سماء ولا ارضا ولاجنا ولا انسا. الخ
অর্থঃ- “আয় আল্লাহ্ পাক! সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উসীলায় আমার দোয়া কবুল করুন।” আল্লাহ্ পাক বললেন, “হে আদম আলাইহিস্ সালাম! আপনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কিভাবে চিনলেন?” হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম বললেন, “আয় আল্লাহ্ পাক! যখন আপনি আপনার কুদরতী হাতে আমাকে সৃষ্টি করলেন এবং আমার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিলেন, তখন আমি আমার মাথা উপরের দিকে উাত্তালন করি এবং আরশের স্তম্ভের মধ্যে লেখা দেখি, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্’ তখন আমি বুঝলাম যে, যাঁর নাম মুবারক আপনার নামের সাথে সংযুক্ত করেছেন তিনি আপনার খুব প্রিয়।” আল্লাহ্ পাক বললেন, “আপনি সত্য কথাই বলেছেন। কারণ তিনি যদি না হতেন অর্থাৎ আমি যদি তাঁকে সৃষ্টি না করতাম তবে আপনাকেও সৃষ্টি করতাম না।”
অন্য বর্ণনায় এসেছে, “আসমান-যমীন, জ্বিন-ইনসান ইত্যাদি কিছুই সৃষ্টি করতামনা।”
কাজেই উপরোক্ত কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের আলোচনার দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যমীনে আগমণের পর চল্লিশ বছর বয়স মুবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে নুবুওওয়াত ঘোষণা করার পূর্বেও নবী ও রসূল ছিলেন। কাজেই যিনি নবী ও রসূল হিসেবে পয়দা হয়েছেন তিনি কিভাবে পথহারা থাকেন। কারণ নবী-রসূলগণতো পথাহারাদের পথপ্রদর্শক। সুতরাং তিনি পথহারা ছিলেননা। বরং প্রথপ্রদর্শক ছিলেন।
যারা আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুষ্ঠানিক নুবুওওয়াত ঘোষণার পূর্বে পথহারা বলে উল্লেখ করে থাকে, তারা “সূরা দু’হার” ৭নং আয়াত শরীফের ব্যাখ্যা না বুঝার কারণেই বলে থাকে।
সেখানে আল্লাহ্ পাক বলেন,
ووجدك ضالا فهدى.
এর অর্থ তারা করে থাকে, “তিনি (আল্লাহ্ পাক) আপনাকে পথহারা পেয়েছেন অতঃপর পথ দেখিয়েছেন।”
মুলতঃ এ অর্থ সম্পূর্ণই গোমরাহী ও কুফরীমূলক। এ অর্থ যদি কেউ বিশ্বাস করে তাহলে সে কাট্টা কাফির হয়ে চির জাহান্নামী হবে।
এ আয়াত শরীফের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, “তিনি (আল্লাহ্ পাক) আপনাকে কিতাবহীন পেয়েছেন অতপর কিতাব দান করেছেন।”
প্রকাশ থাকে যে, কুরআন শরীফ এবং হাদীস শরীফের বর্ণনাগুলো খুবই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়। এর জাহির ও বাতিন দু’টা দিক রয়েছে। যে কারণে সাধারণভাবে এর অর্থ ও ব্যাখ্যা উপলব্ধি করতে অনেকেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এবং দিয়ে থাকে।
আবার বর্ণনা গুলোর শাব্দিক ও ব্যবহারিক অর্থের সাথে আকাঈদী ও আ’মালী বিষয়টি ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। এক্ষেত্রে কেবল শাব্দিক কিংবা ব্যবহারিক অর্থ ও ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে দেখা যাবে, তা আদৌ ছহীহ্ হয়নি তাই তা গ্রহণযোগ্যও নয়। উক্ত অশুদ্ধ অর্থ ও ব্যাখ্যা কুফরী পর্যন্ত পৌঁছে থাকে।
কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা সম্পর্কে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ফতওয়া হলো, “শুধু আরবী ভাষা জানলেই কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা যাবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা ভিত্তিক অর্থ ও ব্যাখ্যা সে না শিখবে।”
মেছাল স্বরূপ বলা যেতে পারে-
(১) যেমন “مكر” শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ধোকাবাজী বা প্রতারণা’। এ শব্দটি যখন কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে কাফিরদের সম্পর্কে আসবে তখন এর অর্থ হবে ধোকাবাজী বা প্রতারণা।
আর এ শব্দটি যখন আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে আসবে তখন এর অর্থ হবে হিকমত বা কৌশল।
যেমন, আল্লাহ্ পাক “সূরা আলে ইমরানের ৫৪ নং” আয়াত শরীফে ইরশাদ করেন,
ومكروا ومكر الله والله خير الماكرين.
এ আয়াত শরীফের শাব্দিক অর্থ হলো, “তারা(কাফিররা) ধোকাবাজী করল, আল্লাহ্ পাকও ধোকাবাজী করলেন। আর আল্লাহ্ পাক হলেন উত্তম ধোকাবাজ।” (নাউযুবিল্লাহ্)।
কেউ যদি এ আয়াত শরীফের শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করে তাহলে সে কাট্টা কাফির হয়ে চির জাহান্নামী হয়ে যাবে।
এর ছহীহ অর্থ হলো, “তারা অর্থাৎ কাফিররা ধোকাবাজী করলো, আর আল্লাহ্ পাক হিকমত করলেন। আল্লাহ্ পাক হলেন উত্তম হিকমতওয়ালা।”
(২) যেমন “يقين” শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বিশ্বাস। এ শব্দটি কুরআন শরীফে ৮ বার এসেছে। এর মধ্যে ৬ বার বিভিন্ন অর্থে এসেছে। যেমন- নিঃসন্দেহে, নিশ্চিত, সত্য, অবশ্যই সত্য, বিশ্বাসযোগ্য ইত্যাদি। আর ২ বার এসেছে মৃত্যু অর্থে।
যেমন, সূরা হিজরের ৯৯ নং আয়াত শরীফে ইরশাদ হয়েছে, واعبد ربك حتى يأتيك اليقين.
অর্থঃ- “এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, “তোমার রব আল্লাহ্ পাক-এর ইবাদত-বন্দেগী কর বিশ্বাস আসা পর্যন্ত।”
যদি কেউ এ অর্থ করে তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। কারণ তাতে বুঝা যায় বিশ্বাস আসার পর আর ইবাদত-বন্দেগী করার দরকার নেই। যা কুফরী আক্বীদা। স্বয়ং আখিরী নবী হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় নেয়া পর্যন্ত ইবাদত-বন্দেগী করেছেন। বরং শেষ যিন্দেগী মুবারকে আরো বেশী বেশী করেছেন।
এখানে يقين শব্দের অর্থ হচ্ছে মৃত্যু। আয়াত শরীফের ছহীহ অর্থ হলো “তোমার রবের ইবাদত-বন্দেগী কর মৃত্যু আসা পর্যন্ত।”
অনুরূপ ضالا শব্দ যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে গোমরাহী। এ শব্দটি যখন কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে কাফিরদের সম্পর্কে আসবে তখন এর অর্থ হবে গোমরাহী। যেমন, আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
ومن يعص الله ورسوله فقد ضل ضللا مبينا.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নাফরমানী করবে সে অবশ্যই প্রকাশ্য গোমরাহীতে নিপতিত হবে।” (সূরা আহ্যাব/৩৬)
আর এ ضالا শব্দ যখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে আসবে তখন এর অর্থ যদি কেউ “গোমরাহ” করে তাহলে সে কাট্টা কাফির হয়ে চির জাহান্নামী হয়ে যাবে।
কারণ আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন, ما ضل صاحبكم وماغوى.
অর্থঃ- “তোমাদের সঙ্গী হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম না গোমরাহ্ ছিলেন, না বিপথগামী ছিলেন।” (সূরা নজম/২) আল্লাহ্ পাক আরো ইরশাদ করেন,
ليس بى ضللة ولكنى رسول من رب العلمين.
অর্থঃ- “হে আমার ক্বওম! আমার নিকট গোমরাহী বলতে কিছুই নেই বরং আমি মহান রব্বুল আলামীনের প্রেরিত রসূল।” (সূরা আ’রাফ/৬১)
অর্থাৎ যাঁর শানে স্বয়ং আল্লাহ্ পাক নিজেই স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন যে, “তিনি কস্মিনকালেও গোমরাহ্ বা পথহারা ছিলেন না। শুধু এতটুকুই নয় বরং তাঁর মধ্যে গোমরাহী বলতে কিছুই নেই। কারণ তিনি আল্লাহ্ পাক-এর খাছ নবী ও রসূল।”
তাহলে এ অর্থ কি করে ছহীহ্ হতে পারে যে, তিনি (হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট ছিলেন? মূলতঃ এরূপ অর্থ করা হচ্ছে সম্পূর্ণ কুফরী যা ঈমান ও আমল উভয়টি বিনষ্ট হয়ে জাহান্নামী হওয়ার কারণ।
এ আয়াত শরীফের ছহীহ্ অর্থ হলো “তিনি (আল্লাহ্ পাক) আপনাকে কিতাবহীন পেয়েছেন অতঃপর কিতাব দান করেছেন।”
উল্লেখ্য, আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পছন্দনীয় ভাষা হচ্ছে আরবী। জান্নাতের ভাষাও আরবী। এ আরবী ভাষাকে আল্লাহ্ পাক এমন সমৃদ্ধ ও পরিপূরক করেছেন যে, ক্ষেত্র বিশেষে এর একটি শব্দ একাধিক ও ভিন্ন অর্থ প্রদান করে থাকে। অনুরূপ একাধিক শব্দ একই অর্থের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
সুতরাং কেউ যদি কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের ছহীহ্ অর্থ প্রয়োগ ও ব্যবহারের ক্ষেত্র বুঝতে অক্ষম হয় এবং এই অক্ষমতা নিয়েই ব্যাখ্যা করে তাহলে তার অবস্থা সেরূপ হবে যেরূপ অবস্থা হয়েছে মীর্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর।
কাদিয়ানী خاتم النبين. আয়াতাংশে خاتم -এর ছহীহ্ অর্থ “শেষ” এর পরিবর্তে ভুল অর্থ “মহর” করার কারণে কাট্টা কাফির ও চির জাহান্নামী হয়েছে।
এমনিভাবে কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের ভুল অর্থ, ভুল ব্যাখ্যা, ভুল ফতওয়া, ভুল আমল ও আক্বীদার কারণে কলেমা, নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি সবকিছু স্বীকার করা ও আমল করার পরও অনেকে বিভ্রান্ত বা গোমরাহ হয়ে গেছে। এর উদাহরণ হচ্ছে মু’তাজিলা, শিয়া, খারেজী, মরজিয়া, নাজ্জাজিয়া, জাবারিয়া, মুশাব্বিহা ইত্যাদি ৭২টি বাতিল ও জাহান্নামী ফিরক্বা।
কাজেই কুরআন শরীফ কিংবা হাদীস শরীফের বরাত দিয়ে কোন কথা বললেই যে তা ছহীহ্ ও গ্রহণযোগ্য হবে তা নয়। বরং দেখতে হবে, উক্ত কথা আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা ও আমলের খেলাফ কিনা, উক্ত কথা আল্লাহ্ পাক ও তাঁর প্রিয় বান্দা নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের শান ও মর্যাদার খেলাফ কিনা? বিশেষ করে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হাবীবুল্লাহ, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শান ও ফযীলতের খেলাফ কিনা? অতঃপর ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম, অতঃপর আউলিয়া-ই-কিরামগণের খেলাফ কিনা?
স্মরণীয় যে, আমাদেরকে একদিন অবশ্যই আল্লাহ্ পাক এবং তাঁর প্রিয় হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে হাযির হতে হবে। এবং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শাফায়াত-শুপারিশ সবার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়বে। কাজেই এমন কথা কস্মিনকালেও বলা শুদ্ধ হবে না যা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শান ও মর্যাদার বিন্দুতম খেলাফ হয়।
আর অনুসরণ সম্পর্কে তারা যে বলেছে, “নুবুওওয়াতের পূর্বের জীবন অনুসরনীয় নয়।”
তাদের এ কথাও সম্পূর্ণ গোমরাহী ও কুফরী মূলক। কারণ আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নুবুওওয়াতি যিন্দেগী মুবারকের পূর্বে কোন যিন্দেগীই নেই। কারণ তিনি তো নবী হিসেবেই পয়দা হয়েছেন।
হ্যাঁ, তারা বলতে পারে, আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চল্লিশ বছর বয়স মুবারকে নুবুওওয়াতের আনুষ্ঠানিকতা ঘোষণার পূর্ববর্তী যিন্দেগী অনুসরণীয় কি-না?
এর জবাবে বলতে হয় যে, আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যমীনে অবস্থানকাল অর্থাৎ তেষট্টি বছর বয়স মুবারকের সম্পূর্ণটাই অনুসরণীয়। তবে এখানে প্রশ্ন আসতে পারে, আমরা সবটাই কি আমল করবো?
এর জবাব হচ্ছে, নুবুওওয়াত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার পর যে তেইশ বছর যিন্দেগী মুবারক তার সম্পূর্ণটাই অনুসরণীয় হওয়ার পরও তা আমল করা জায়েয নেই।
যেমন, “বুখারী শরীফে” বর্ণিত রয়েছে, “নামায ফরয হওয়ার পর প্রথমদিকে নামাযে আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথা বলেছেন, পরবর্তীতে তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন, অর্থাৎ বর্তমানে কেউ যদি নামাযরত অবস্থায় কথা বলে, তার নামায বাতিল হয়ে যাবে। প্রত্যেকটি আমলই অনুরূপ। অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেকটি আমল সম্পর্কে শেষ যে হুকুম দিয়েছেন সে অনুযায়ী আমল করতে হবে। পূর্বেরটি হচ্ছে মনসুখ (ব্যাখ্যাকৃত) আর পরবর্তীটি হচ্ছে নাসিখ (ব্যাখ্যাকারী)।
অতএব, মনসুখ ও নাসিখ প্রত্যেকটিই অনুসরণীয় তবে নাসিখ অনুযায়ী আমল করতে হবে।
যারা বলে, আখিরী রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুষ্ঠানিক নুবুওওয়াত প্রাপ্তির পূর্বের যিন্দেগী অনুসরণীয় নয়; তাদেরকে প্রশ্ন করতে হয়, বর্তমানে যদি কেউ আখিরী নবী হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুষ্ঠানিকভাবে নুবুওওয়াত ঘোষণার পূর্বের যিন্দেগী মুবারকের অনুসরণে “হিলফুল ফুযুল” করে তাহলে তা কি জায়েয হবে? অথবা নাজায়েয হবে? তারা এর জবাবে বলবে, অবশ্যই জায়েয হবে। কারণ এটা নাজায়েয হওয়ার পক্ষে কোন আদেশ বা নির্দেশ নাযিল করা হয়নি। অতএব, অন্যান্য বিষয়গুলোও অনুরূপ।
সুতরাং তারা এ কথা সম্পূর্ণই মনগড়াভাবে বলে থাকে। কারণ তাদের এ বক্তব্যের পক্ষে কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফ থেকে একটা দলীলও তারা পেশ করতে পারবেনা।
অতএব, আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি-এর গোটা যিন্দেগী মুবারকই অনুসরণীয়।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
لقد كان لكم فى رسول الله اسوة حسنة.
অর্থঃ- “তোমাদের জন্য, তোমাদের রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সূরা আহযাব/২১) আল্লাহ্ পাক আরো বলেন, وان تطيعوه تهتدوا.
অর্থঃ- “তোমরা তাঁকে অনুসরণ করলে হিদায়েত লাভ করবে।” (সূরা নূর/৫৬) আল্লাহ্ পাক আরো বলেন,
ما اتكم الرسول فخذوه وما نهكم عنه فانتهوا.
অর্থঃ- “রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের জন্য যা এনেছেন তা আঁকড়ে ধর এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাক।” (সূরা হাশর/৭)
আখিরী রসূল হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বকালে সবার জন্য অনুসরণীয়। অর্থাৎ তিনি যা এনেছেন তা আঁকড়ে ধরতে হবে এবং যা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন তা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ তিনি নিজ থেকে কোন কথা বলেননি এবং কাজও করেননি।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
وما ينطق عن الهوى ان هو الا وحى يوحى.
অর্থঃ- “তিনি (হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওহী ছাড়া নিজের থেকে কোন কথা বলেন না।” (সূরা নজম/৩, ৪)
এ আয়াত শরীফ যদিও নাযিল হয়েছে, নুবুওওয়াত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার পর কিন্তু এটা আল্লাহ্ পাক-এর কালাম যা লওহে মাহফুজে সংরক্ষিত রয়েছে। এ আয়াত শরীফের মেছদাক হচ্ছেন আখিরী রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। অর্থাৎ নুবুওওয়াত ঘোষণার পর তেইশ বছর এবং তার পূর্বে চল্লিশ বছর এ তেষট্টি বছর বয়স মুবারকই এ আয়াত শরীফের মেছদাক। অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তেষট্টি বছর যিন্দেগী মুবারকে কোন কাজ, কোন কথা, কোন আদেশ-নিষেধ আল্লাহ্ পাক-এর নির্দেশ ব্যতীত করেননি। প্রত্যেকটিই আল্লাহ্ পাক-এর নির্দেশেই করেছেন। তবে চল্লিশ বছর বয়স মুবারকের পরে যা করেছেন, বলেছেন তা নুবুওওয়াত ঘোষণার কারণে ওহীর অর্ন্তভূক্ত হয়েছে। আর পূর্ববর্তী যিন্দেগী মুবারকে যা করেছেন, বলেছেন তা নুবুওওয়াতের আনুষ্ঠানিকতা ঘোষণা না হওয়ার কারণে ওহী বলে উল্লেখ করা হয়নি। তবে তাও আল্লাহ্ পাক-এর নির্দেশেই করেছেন।
আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনুষ্ঠানিকভাবে নুবুওওয়াত ঘোষণা করার পূর্বে কোন কাজ আল্লাহ্ পাক-এর হুকুমের খেলাফ করেছেন এমন কোন দলীল কেউ পেশ করতে পারবে কি? কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। আকাঈদের কিতাবে বর্ণিত হয়েছে,
فى عصمة النبى صلى الله عليه وسلم عن سائر الذنوب قبل الوحى وبعد الوحى.
অর্থঃ- “হযরত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহী নাযিল হওয়ার পূর্বে ও পরে সকল প্রকার গুণাহ্ থেকে মাছুম বা নিস্পাপ ছিলেন।”
আর আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা করেছেন, বলেছেন, পরিধান করেছেন, খেয়েছেন, পান করেছেন ইত্যাদি সবকিছুই উত্তম থেকে উত্তমতর ছিল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক নাযিল করেন, انا اعطينك الكوثر.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাওছার দান করেছি।” (সূরা কাওছার/১)
“কাওছার”-এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়- প্রথমতঃ কাওছার বলা হয়েছে, হাউজে কাওছারকে। যা খাছ করে আল্লাহ্ পাক তাঁর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দান করেছেন। যা পান করলে জান্নাতে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পানির পিপাসা লাগবে না।
দ্বিতীয়তঃ কাওছার বলা হয়েছে খাইরে কাছীর। অর্থ যা অতি উত্তম, অনেক ভাল। অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক তাঁর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যা সর্বকালের জন্য সবদিক থেকে উত্তম তাই দান করেছেন। তা খাদ্য পানীয় হোক অথবা আদেশ-নিষেধ হোক।
যেমন, তিনি যা ব্যবহার করেছেন বা যা তাঁর ব্যবহারে এসেছে। তিনি যা খেয়েছেন, পান করেছেন, যেখানে অবস্থান করেছেন, তিনি যা আদেশ-নিষেধ করেছেন ইত্যাদি সমস্ত কিছুই সমস্ত কায়েনাতের মধ্যে সর্বকালের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ। সেটা আনুষ্ঠানিকভাবে নুবুওওয়াত ঘোষণার পূর্বে হোক অথবা পরে হোক। কারণ আয়াত শরীফ যদিও পরবর্তীতে নাযিল হয়েছে কিন্তু তা আল্লাহ্ পাক-এর কালামের অন্তর্ভূক্ত যা অনাদি অনন্তকালের জন্য একই হুকুম রাখে।
যার কারণে আক্বাঈদের কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে,
الانبياء كلهم منزحون عن الصغائر والكبائر والكفر والقبائح.
অর্থঃ- “হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস্ সাামগণ প্রত্যেকেই ছগীরা, কবীরা ও কুফরী গুণাহ্ থেকে পবিত্র। এমনকি অপছন্দনীয় কাজ থেকেও পবিত্র।”
অতএব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনুষ্ঠানিকভাবে নুবুওওয়াত ঘোষণার পূর্বে ও পরে উভয় যিন্দেগী মুবারকেই তিনি নবী ও রসূল এবং অনুসরণীয়ও।
{দলীলসমূহঃ (১) আহকামুল কুরআন, (২) রুহুল বয়ান, (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) খাযেন, (৫) বাগবী, (৬) ইবনে কাছীর, (৭) তাবারী, (৮) কুরতুবী, (৯) কবীর, (১০) তাফসীরে মাযহারী, (১১) বুখারী, (১২) তিরমিযী, (১৩) মিশকাত, (১৪) কানযুল উম্মাল, (১৫) মুস্তাদরেকে হাকেম, (১৬) ফতহুল বারী, (১৭) উমদাতুল ক্বারী, (১৮) শরহে কিরমানী, (১৯) ইরশাদুস্ সারী, (২০) তুহফাতুল আহ্ওয়াযী, (২১) উরফুস্ সাজী, (২২) মায়ারিফুস্ সুনান, (২৩) মিরকাত, (২৪) আশয়াতুল লুময়াত, (২৫) লুময়াত, (২৬) কাজীখান, (২৭) আলমগীরী, (২৮) শামী, (২৯) ফতহুল ক্বাদীর, (৩০) গায়াতুল আওতার, (৩১) বাহরুর রায়েক, (৩২) রদ্দুল মুহতার, (৩৩) দুররুল মুখতার, (৩৪) আইনুল হেদায়া (৩৫) শরহে আকাঈদে নছফী, (৩৬) আকাঈদে হাক্কা, (৩৭) তাক্বমীনুল ঈমান, (৩৮) আল ফিক্বহুল আক্ববার, (৩৯) ইহ্ইয়াউ উলুমিদ্দীন, (৪০) কিমিয়ায়ে সা’য়াদাত ইত্যাদি।}
মাওলানা মুহম্মদ আফজালুল হক, নাজিমখান, কুড়িগ্রাম
মুহম্মদ শহিদুল ইসলাম, দিলালপুর, পাবনা
মুহম্মদ তাজুল ইসলাম, কাউনিয়া, রংপুর
সুওয়ালঃ দেওবন্দী, খারিজী, ওহাবী, জামাতী ও অতি সুন্নীদের মাসিক মুখপত্রে এবং তাদের সমমনা ও সমগোত্রীয়দের কোন কোন দৈনিক মুখপত্রে ভোটকে ইসলামের নামে আমানত, সাক্ষী, সুপারিশ, উকিল নিয়োগের মাধ্যম ও ওয়াজিব বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দলীল হিসেবে কেউ কেউ পাকিস্তানের মুফতী শফী এবং বাংলাদেশের মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী ছাহেবের বক্তব্য তুলে ধরেছে।
বর্তমানে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের একমাত্র দলীলভিত্তিক মুখপত্র “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” কর্তৃপক্ষের নিকট আমাদের বিনীত সুওয়াল এই যে, উল্লিখিত পত্র-পত্রিকায় প্রদত্ত্ব বক্তব্য এবং তার অনুকূলে মুফতী শফী ও মাওলানা শামসুল হক ছাহেবের বক্তব্য কতটুকু কুরআন-সুন্নাহ্সম্মত? দলীলসহ জানিয়ে দেশের সরলমনা মুসলমানদের ঈমান, আক্বীদা ও আমল হিফাযতে সাহায্য করবেন।
জাওয়াবঃ উল্লিখিত মাসিক ও দৈনিক পত্র-পত্রিকার বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে কুরআন-সুন্নাহ্র খিলাফ এবং উক্ত বক্তব্যের অনুকূলে মুফতী শফী ছাহেব ও মাওলানা শামসুল হক ছাহেব দু’জনের বক্তব্য ও লিখনী তাফসীর বির রায় বা মনগড়া তাফসীর হেতু তা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য।
তাফসীর বির রায় সম্পর্কে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
من فسر القران برأيه فقدكفر.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি কুরআন শরীফের মনগড়া তাফসীর করলো সে কুফরী করলো।”
আরো ইরশাদ হয়েছে,
من قال فى القران برأيه فليتبوأ مقعده من النار وفى رواية من قال فى القران بغير علم فليتبوأ مقعده من النار.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি কুরআন শরীফের মনগড়া ব্যাখ্যা করে সে যেন তার স্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করে নেয়।”
অপর রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে, “যে ব্যক্তি ইল্ম ব্যতীত, না জেনে কুরআন শরীফের ব্যাখ্যা করে সেও যেন তার স্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করে নেয়।” (তিরমিযী, মিশকাত, মিরকাত, মায়ারিফুস্ সুনান ইত্যাদি)
উল্লেখ্য, কেবল সাধারণ মুফতী ও মাওলানা তো দূরের কথা যারা ইমামা-মুজতাহিদ তাঁদেরও সকলের সমস্ত ব্যাখ্যা ও বক্তব্য যে সঠিক হবে তা নয়। বরং কোন কোন মুজতাহিদের কোন কোন ইজতিহাদ ভুলও হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে “বুখারী শরীফে” ইরশাদ হয়েছে,
اذا حكم الحاكم فاجتهد فاصاب فله اجران واذا حكم فاجتهد فاخطأ فله اجر.
অর্থঃ- “যখন মুজতাহিদ কোন বিষয়ে সঠিক ইজতিহাদ করেন তখন তাঁর জন্য রয়েছে দ্বিগুণ ছওয়াব পাবেন। আর যখন তিনি ভুল ইজতিহাদ করেন তখন তাঁর জন্য রয়েছে একগুণ ছওয়াব।”
অর্থাৎ মুজতাহিদ ইজতিহাদ করার জন্য একগুণ এবং ইজতিহাদ সঠিক হওয়ার জন্য একগুণ মোট দ্বিগুণ ছওয়াব। আর মুজতাহিদের ইজতিহাদ ভুল হলে শুধু ইজতিহাদ করার কারণে একগুণ ছওয়াব পাবেন। ভুলের জন্য কোন ছওয়াব পাবেননা। তবে এ কথা সর্বজন স্বীকৃত যে, মুজতাহিদের ভুল ইজতিহাদ গ্রহণযোগ্য নয়, সম্পূর্ণরূপে তা পরিত্যাজ্য। আর যারা ইমাম-মুজতাহিদ নয়, সাধারণ মুফতী, মাওলানা, মৌলভী তাদের ভুল ফতওয়া, ব্যাখা সম্পর্কে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
من افتى بغير علم كان اثمه على من افتاه.
অর্থঃ- “যাকে ইল্ম ব্যতীত ফতওয়া দেয়া হলো তার সমূদয় গুণাহ্ ফতওয়া দানকারীর উপর বর্তাবে।” (আবূ দাউদ, মিশকাত, বযলুল মাযহুদ, মিরকাত)
অতএব, শরীয়তে মনগড়া, ভুল ফতওয়া, ব্যাখা, বক্তব্য, লিখনী ইত্যাদি প্রদান করা এবং তা গ্রহণ করা উভয়ই সম্পূর্ণরূপে নাজায়েয ও হারাম।
মাসিক আল বাইয়্যিনাত কর্তৃক কুরআন ও সুন্নাহ্র দৃষ্টিতে ছহীহ্ ফতওয়া নিম্নরূপ-
ইসলাম কাকে বলে?
আল্লাহ্ পাক “সূরা আলে ইমরানের ১৯ নং” আয়াত শরীফে বলেন, ان الدين عند الله الاسلام.
অর্থ :- “নিশ্চয়ই ইসলামই আল্লাহ্ পাক-এর কাছে একমাত্র দ্বীন।”
আর দ্বীন ইসলাম ব্যতীত অন্য সমস্ত ধর্ম যা পূর্বে ছিল বর্তমানে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে হবে সেগুলিকে তিনি বাতিল ঘোষণা করেছেন।
এ প্রসঙ্গে কালামে পাকে ইরশাদ হয়েছে,
هو الذى ارسل رسوله بالهدى ودين الحق ليظهره على الدين كله وكفى بالله شهيدا محمد رسول الله.
অর্থঃ- “তিনি (আল্লাহ্ পাক) তাঁর রসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে হিদায়েত এবং সত্য দ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন সকল দ্বীনের উপর প্রাধান্য দিয়ে (সমস্ত দ্বীনকে বাতিল ঘোষণা করে) এবং আল্লাহ্ পাক-এর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। (যার সাক্ষী আল্লাহ্ পাক) আর রসূল হচ্ছেন, মুহম্মদুর রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।” (সূরা ফাত্হ/২৮,২৯)
উপরোক্ত আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,
وعن جابر عن النبى صلى الله عليه وسلم حين اتاه عمر فقال انا نسمع احديث من يهود تعجبنا افترى ان نكتب بعضها فقال امتهوكون انتم كما تهوكت اليهود والنصارى لقد جئتكم بها بيضاء نقية ولو كان موسى حيا ماوسعه الا اتباعى.
অর্থঃ- “হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, একদিন হযরত ওমর ইবনে খত্তাব রদি¦য়াল্লাহু তায়ালা আনহু হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ্ (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমরা ইহুদীদের থেকে তাদের কিছু ধর্মীয় কথা শুনে থাকি, যাতে আমরা আশ্চর্যবোধ করি, এর কিছু আমরা লিখে রাখবো কি? হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরাও কি দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছো? যে রকম ইহুদী-নাছারারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে? অবশ্যই আমি তোমাদের নিকট পরিপূর্ণ, উজ্জ্বল ও পরিস্কার দ্বীন নিয়ে এসেছি। হযরত মুসা আলাইহিস্ সালামও যদি দুনিয়ায় থাকতেন, তাহলে তাঁকেও আমার অনুসরণ করতে হতো।” (মুসনাদে আহ্মদ, বাইহাক্বী, মিশকাত, মিরকাত, আশয়াতুল লুময়াত, লুময়াত, শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ ছবীহ্ ইত্যাদি)
মূলতঃ ইসলাম হচ্ছে আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে আল্লাহ্র রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ওহীর মাধ্যমে নাযিলকৃত দ্বীন, যা বাড়ানো-কমানো বা ইফরাত-তাফরীত যেমন কুফরী তেমনি তার মনগড়া তাফসীর বা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম মুবারকে মিথ্যারোপ করাও কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।
তার মেছাল বা উদাহরণ হচ্ছে- কাদিয়ানী সম্প্রদায়। কাদিয়ানীরা ইসলাম মানে এবং তা স্বীকারও করে থাকে। এমনকি কাদিয়ানীরা خاتم النبيين (খাতামুন্নাবিয়্যীন) এ রহ্মতপূর্ণ ও বরকতপূর্ণ বাক্যাংশটিও তারা শব্দগতভাবে অস্বীকার করে না কিন্তু মনগড়া অর্থ করে, তিনি নবীদের মোহর। (নাউযুবিল্লাহ্) অর্থাৎ কাদিয়ানী সম্প্রদায় শুধুমাত্র “খতম” শব্দের অর্থ শেষ না করে মোহর করার কারণে কাট্টা কাফির ও চির জাহান্নামী হয়েছে।
গণতন্ত্র কাকে বলে?
গণতন্ত্র হচ্ছে- মানব রচিত শাসন ব্যবস্থা, যার আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি, তর্জ তরীক্বা মানুষের দ্বারা রচিত। যা ইহুদী-খৃষ্টানদের দ্বারা প্রবর্তিত ও সংস্কারকৃত শাসন পদ্ধতি। যা আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে ওহীর দ্বারা নাযিলকৃত নয়। যা খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে গ্রীসে উৎপত্তি লাভ করেছে এবং বর্তমান বিশ্বে ব্যাপক প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
“রাষ্ট্র বিজ্ঞান” বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গণতন্ত্র শব্দের অর্থ হচ্ছে- ‘গণ’ অর্থ জনগণ, আর ‘তন্ত্র’ অর্থ নিয়ম-নীতি বা পদ্ধতি। এক্ষেত্রে গণতন্ত্রের প্রবক্তা আব্রাহাম লিঙ্কনের উক্তি উল্লেখ্য। তার ভাষায়- “উবসড়পৎধপু রং ধ এড়াবৎহসবহঃ ড়ভ :যব ঢ়বড়ঢ়ষব, নু :যব ঢ়বড়ঢ়ষব ধহফ ভড়ৎ :যব ঢ়বড়ঢ়ষব” যার অর্থ হলো- গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের, জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য।
সার্বভৌম ক্ষমতা বা সমস্ত ক্ষমতার মালিক হওয়ার কারণেই গণতন্ত্রে জনপ্রতিনিধিরা একমাত্র আইন প্রণেতা।
উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ্ পাক দ্বীন ইসলামকে মনোনীত ও পরিপূর্ণ করে নাযিল করেছেন। তার সাথে গণতন্ত্রের কোনই সম্পর্ক নেই। কারণ ইসলামের আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি ও তর্জ-তরীক্বা, আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে নাযিল করা হয়েছে। যা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ইত্যাদি প্রতিক্ষেত্রেই পালনীয় তা ক্বিয়ামত পর্যন্ত একইভাবে বলবৎ থাকবে। আর গণতন্ত্রের যে আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি ও তর্জ-তরীক্বা, তা মানুষের দ্বারা তৈরী। যার সাথে আল্লাহ্ পাক-এর কোন সম্পর্ক নেই।
নির্বাচনের ইতিহাস : প্রাচীন ইতিহাস : প্রাচীন গ্রীসে খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম এবং ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্বাচন প্রথা চালু ছিল। এছাড়া রোমান সিনেটেও এ পদ্ধতি চালু ছিল। ইলেকশন বা নির্বাচন শব্দটি উৎসরিত হয়েছে বা উৎপত্তি লাভ করেছে গ্রীক শব্দ ঊষড়মব হতে যার অর্থ ছিল পছন্দ। নির্বাচনের ধারণা প্রাচীন খ্রীষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের ব্যাখ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত।
এ ব্যাখ্যাটি এরূপ যে, তাদের এড়ফ নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিবর্গ অথবা জাতিকে বিশেষভাবে পছন্দ করতেন তার রাজত্বে বিশেষ কিছু ভূমিকা পালনের জন্য, যাকে বলা হত নির্বাচন।
আধুনিক কালের ইতিহাস : তবে আধুনিক ভোটদান ব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটে ইংল্যান্ডে ১৬৮৮ সালে। ইংল্যান্ডে ১৯২৮ সালে সকল নারীদের ভোটাধিকার দেয়া হয়। পরবর্তীতে অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে এ সকল পদ্ধতির সমাপ্তি ঘটিয়ে একুশ বছর বা তদুর্ধ বয়সের সকল সম্প্রদায়ের জন্য সার্বজনীন ভোটাধিকার দেয়া হয়।
অপরদিকে আমেরিকায় ১৯২০ সালে মহিলা ভোটাধিকার স্বীকৃত হয়। ১৯৭১ সালে ভোটারদের বয়স সীমা কমিয়ে ১৮ বছরে আনা হয়।
ব্যালট : ব্যালট হচ্ছে একটি কাগজের শীট, যার দ্বারা গোপন ভোট প্রদান করা হয়। প্রাচীনকালে এর দ্বারা ভোট গ্রহণ করা হতো এবং গ্রীসে এই পদ্ধতির প্রচলন ছিল। উল্লেখ্য, ১৯৫০ সালের মধ্যে এই ব্যালট প্রথা প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচন ও ভোট : প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। কেননা নির্বাচনের মাধ্যমেই গণতন্ত্র বাস্তবায়িত হয়। আর নির্বাচনের প্রয়োজন তখনই হয় যখন কোন পদে একাধিক ব্যক্তি প্রার্থী হয়। একাধিক প্রার্থীর মধ্যে উক্ত পদ একজনকে দেয়ার লক্ষ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর উক্ত নির্বাচন ভোট প্রয়োগের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়।
উল্লেখ্য, বর্তমান গণতান্ত্রিক নির্বাচন, তার পদপ্রার্থী হওয়া ও পদপ্রার্থীকে ভোট দেয়া ইত্যাদি কাজগুলিকে ইসলামের নামে ফরয-ওয়াজিব হিসেবে উল্লেখ করা নাজায়েয ও হারাম।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এরূপ ভোট শরীয়তসম্মত কিনা? যদি শরীয়তসম্মত না হয়, তাহলে কেন বা কি কারণে শরীয়তসম্মত নয়?
ভোট আমানত নয় : গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোট প্রদান হচ্ছে কথিত সুনাগরিকের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে ভোটকে আমানত হিসেবে উল্লেখ করা হয় না। কারণ ভোটদাতাকে যদি আমানতদার বলা হয় তবে প্রশ্ন উঠে, তাকে এ আমানত দিল কে?
যারা ভোটকে আমানত বলে উল্লেখ করে থাকে তারা নিম্নের আয়াত শরীফকে দলীল হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। অথচ নিম্নের আয়াত শরীফের সাথে ভোটের কোনই সম্পর্ক নেই।
আমানত সংক্রান্ত আয়াত শরীফ, তার অর্থ,
শানে নুযূল ও ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হলো-
ان الله يامركم ان تؤدوا الامنت الى اهلها واذا حكمتم بين الناس ان تحكموا بالعدل ان الله نعما يعظكم به ان الله كان سميعا بصيرا.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক তোমাদেরকে আদেশ করেন যে, তোমরা আদায় করে দাও আমানত সমূহকে তার হকদারদেরকে এবং যখন তোমরা মানুষের মধ্যে ফায়সালা বা বিচার করবে, তখন ন্যায়ের সাথে বিচার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক তোমাদেরকে উত্তম উপদেশ দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা নিসা/৫৮)
শানে নুযুলঃ হিজরতের পূর্বে জাহিলিয়াতের যুগে, সপ্তাহে দু’দিন সোমবার ও বৃহস্পতিবার কা’বা শরীফের দরজা খোলা হতো। যাতে যারা কা’বা শরীফে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক তাঁরা যেন প্রবেশ করতে পারে। এবং উক্ত ঘরের চাবীর জিম্মাদার ছিলেন উসমান বিন তাল্হা।
একদা কা’বা শরীফের দরজা খোলার পর আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছু সংখ্যক হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে নিয়ে প্রবেশ করতে আসলে, তখন সে বাঁধা প্রদান করে এবং কিছু কটু কথা বলে। এ সকল অশালীন ও অশোভনীয় আচরণ লক্ষ্য করে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “হে উসমান! এমন একদিন আসবে, যেদিন তুমি এ কা’বা ঘরের চাবি আমার হাতে দেখতে পাবে এবং এ চাবি যাকে ইচ্ছা তাকে দেয়ার অধিকারও আমার থাকবে।” ইত্যাদি আরো কিছু কথা বলে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যিয়ারত করে চলে গেলেন। পরবর্তীতে যখন মক্কা শরীফ বিজয় হলো, তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা শরীফে কা’বা ঘরের চাবি উসমান বিন তালহার কাছ থেকে নিয়ে কা’বা শরীফ খুলে তার মধ্যে প্রবেশ করে দু’রাকায়াত নামায পড়লেন। অতঃপর যখন বের হলেন, তখন হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমরা তো পানি পান করানোর জিম্মাদারীতে আছি, সুতরাং আমাদেরকে কা’বা ঘরের চাবিরও জিম্মাদারী করে দিন।
এখন কাকে চাবি দেয়া হবে, তা উক্ত আয়াত শরীফ নাযিল করে তার মাধ্যমে আল্লাহ্ পাক জানিয়ে দিলেন, তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসমান বিন তালহাকে ডেকে বললেন, “তোমার কি সেই কথা স্মরণ আছে যে, আমি বলেছিলাম কাবা ঘরের চাবি আমার হাতে আসবে এবং যাকে ইচ্ছা তাকে দেয়ার অধিকার আমার থাকবে।” অতঃপর তার নিকট চাবি অর্পণ করলেন এবং বললেন, এ চাবি ক্বিয়ামত পর্যন্ত তোমার বংশধরগণের নিকট থাকবে, যে এটি নিবে সে জালিমের অন্তর্ভূক্ত হবে।
আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উক্ত ভবিষ্যৎবাণী সত্যে বাস্তবায়িত হওয়া দেখে তাঁর ইসলাম গ্রহণের পূর্ব সূক্ষ্ম আকাংখা প্রবল হয়ে উঠল এবং সে ইসলাম গ্রহণ করলো।
ব্যাখ্যাঃ উপরোক্ত আয়াত শরীফে আল্লাহ্ পাক আমানত সমূহের হকদার কে, তার প্রতিই তার(প্রাপ্ত আমানত আদায় করার জন্য) আদেশ করেছেন।
উল্লেখ্য, কুরআন শরীফের কোথাও ভোটকে আমানত বলে উল্লেখ করা হয়নি। শুধু তাই নয়, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াসের কোথাও আমানত বলে উল্লেখ করা হয়নি। কারণ ভোট প্রথা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ ইসলামের নামে করা সম্পূর্ণই হারাম। যা ইসলামের নামে করা জায়েয নেই এবং সম্পূর্ণই হারাম তা কি করে ঈমানদারদের জন্য আমানত বলে সাব্যস্ত হতে পারে?
ভোটকে ইসলামের দৃষ্টিতে ও ইসলামের নামে আমানত বলা সম্পূর্ণ কুফরী।
ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট সাক্ষ্য নয় : সাক্ষী প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে উল্লেখ করেন,
يايها الذين امنوا كونوا قوامين بالقسط شهداء لله ولو على انفسكم اوالوالدين والاقربين ان يكن غنيا او فقيرا فالله اولى بهما فلا تتبعوا الهوى ان تعدلوا وان تلوا او تعرضوا فان الله كان بما تعملون خبيرا.
অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইনছাফের উপর কায়েম থাক, আল্লাহ্ পাক-এর জন্য সাক্ষ্য দেয়ার ব্যাপারে। যদি তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতার ও নিকট আত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়। হোক চাই সে ধনী বা দরিদ্র। অতঃপর আল্লাহ্ পাকই তাদের প্রতি অধিক কল্যাণকামী। তোমরা ইনছাফ করতে গিয়ে নফ্সের অনুসরণ করোনা। আর যদি তোমার বর্ণনায় বক্রতা অবলম্বন কর অথবা সঠিক সাক্ষ্য দেয়া হতে বিরত থাক, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তায়ালা তোমাদের কাজ সম্পর্কে সমধিক জ্ঞাত।” (সূরা নিসা/১৩৫)
يايها الذين امنوا كونوا قوامين لله شهداء بالقسط ولايجرمنكم شنان قوم على الا تعدلوا اعدلوا هو اقرب للتقوى واتقوا الله ان الله خبير بما تعملون.
অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ পাক-এর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেয়ার ব্যাপারে ইন্ছাফের উপর কায়েম থাক এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে ন্যায় বিচার করা হতে বিরত না রাখে, তোমরা ন্যায় বিচার কর। এটি তাক্বওয়া বা আল্লাহ্ ভীতির অধিক নিকটবর্তী এবং তোমরা আল্লাহ্ পাককে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক তোমাদের কাজ সম্পর্কে সমধিক অবহিত।” (সূরা মায়েদা/৮)
শানে নুযুলঃ একদা একজন ধনী ও একজন গরীব লোক আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে পরস্পর পরস্পরকে অপরাধের জন্য দোষারোপ করতে লাগলো। অতঃপর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গরীবকে হক্বের উপর দেখে তার পক্ষে রায় দিলেন। তখন আল্লাহ্ পাক উপরোক্ত আয়াত শরীফ নাযিল করলেন।
কারো মতে ত্ব’মা ইবনে আবরাক্ব নামক এক ব্যক্তির পক্ষে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা তার বিরুদ্ধবাদীদের বিপক্ষে মিথ্যা ও বাতিল সাক্ষী দিয়েছিল। তাদের সম্পর্কে উপরোক্ত আয়াত শরীফ নাযিল হয়।
ব্যাখ্যাঃ উপরোক্ত আয়াত শরীফে আল্লাহ্ পাক প্রতিক্ষেত্রে, সর্বাবস্থায়, সকলের জন্যই, চাই সে আত্মীয় বা অনাত্মীয়, শত্রু বা মিত্র, নিকটবর্তী বা দূরবর্তী যে কেউ হোক না কেন, এমন কি নিজের বিরূদ্ধে হলেও ইন্ছাফের সাথে সাক্ষ্য প্রদান করার জন্য আদেশ করেছেন। অনুরূপ “সূরা মায়েদার” ৮নং আয়াত শরীফেও সঠিক বা ইন্ছাফের সাথে সাক্ষ্য প্রদান করার জন্য আল্লাহ্ পাক নির্দেশ করেছেন।
যার সাথে ভোট প্রথার মিল নেই। ভোটকে স্বাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করলে কুরআন শরীফকে অস্বীকার করা হয়। আল্লাহ্ পাক “সূরা বাক্বারার” ২৮২ নং আয়াত শরীফে বলেন,
واستشهدوا شهيدين من رجالكم فى لم يكونا رجلين فرجل وامراتن.
অর্থঃ- “তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী দাঁড় করাও। যদি দু’জন পুরুষ না পাওয়া যায় তাহলে একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলার সাক্ষ্য গ্রহণ কর।” অর্থাৎ ইসলামে দু’জন মহিলার সাক্ষ্য একজন পুরুষের সমান।
আর ভোট প্রথায় একজন মহিলা একজন পুরুষের সমান যা কুরআন শরীফের আয়াতের খেলাফ। তাহলে ভোট প্রথা কি করে ইসলামের দৃষ্টিতে সাক্ষ্য বলে গণ্য হতে পারে?
ভোট প্রথাকে সাক্ষ্য হিসেবে হুকুম দেয়া বা বলা সম্পূর্ণ নাজায়েয, হারাম ও কুফরী।
ভোট সুপারিশ নয় : সুপারিশ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন-
من يشفع شفاعة حسنة يكن له نصيب منها ومن يشفع شفاعة سيئة يكن له كفل منها وكان الله على كل شئ مقيتا.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি সুপারিশ করবে কোন নেক কাজের জন্য, সে এর দরুণ (সওয়াবের) একটা অংশ পাবে। আর যে ব্যক্তি সুপারিশ করবে কোন পাপ কাজের জন্য, সে এর দরুণ (গুণাহ্র) একটা অংশ পাবে এবং আল্লাহ্ তায়ালা সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।” (সূরা নিসা/৮৫)
শানে নুযুলঃ উল্লিখিত আয়াত শরীফ পরস্পর পরস্পরের মাঝে সুুপারিশ করার প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে। আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেউ যদি শরীয়তসম্মত কোন নেক কাজের সুপারিশ করে, সে নেক কাজ সংঘটিত হোক বা না হোক সে নেকী লাভ করবে। তদ্রুপ কেউ যদি কোন পাপ কাজের সুপারিশ করে, তাহলে এর জন্য যা গুণাহ্ হবে, তার একটা অংশ তার উপর বর্তাবে।
অতএব, ভোট প্রথাই যেখানে ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয় সেখানে ইসলামের দৃষ্টিতে তার জন্য সুপারিশ কি করে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? মূলতঃ ইসলামের নামে এরূপ সুপারিশ করা বা ভোট দেয়া জায়েয নেই।
ভোট উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগ নয় : উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগ করা প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন-
ارءيت من اتخذ الهه هوه افانت تكون عليه وكيلا.
অর্থঃ- “আপনি কি লক্ষ্য করেননি? যে ব্যক্তি তার নফ্স বা প্রবৃত্তিকে ইলাহ্ (উপাস্য) হিসেবে গ্রহণ করে, এরপরও কি আপনি তার উকিল হবেন?” (সূরা ফুরক্বান/৪৩)
শানে নুযূলঃ নজর বিন হারেস ও তার সঙ্গী-সাথীরা নফ্সের চাহিদা মুতাবেক কোন বড় ও সুন্দর ধরণের পাথর বা অন্য কিছু দেখতো, তখন সেটিকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করে নিত। আবার পরবর্তীতে তার চাইতে আরো বড় ও সুন্দর ইত্যাদি আকৃতির কোন কিছু দেখলে প্রথমটি বাদ দিয়ে পরবর্তীটিকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করতো।
ব্যাখ্যাঃ যারা নফ্স বা প্রবৃত্তিকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করে তথা কুরআন-সুন্নাহ্র খেলাফ কাজ করে বা তাতে অংশ গ্রহণ করে, শরীয়তের দৃষ্টিতে তাদের উকিল হওয়া সম্পূর্ণভাবে নাজায়েয ও হারাম। কেননা নফ্সের অনুসরণকারী ব্যক্তি আল্লাহ্ পাক-এর নাফরমানীতে লিপ্ত। ইরশাদ হয়েছে,
ولئن اتبعت اهوائهم بعد الذى جائك من العلم مالك من الله من ولى ولا نصير.
অর্থঃ- “আপনার নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণাদি আসার পর আপনি যদি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করেন তাহলে আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ হতে আপনার জন্য কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী থাকবে না।”
উল্লেখ্য, উকিল বা প্রতিনিধি নির্ধারণ করতে হলে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। আর ইসলামের নামে নির্বাচন যেহেতু হারাম। কাজেই সে হারাম কাজের জন্য উকিল মনোনীত হতে চাওয়া অথবা মনোনীত করা কোনটিই জায়েয নেই।
নির্বাচন যে ইসলামের দৃষ্টিতে ও ইসলামের নামে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয় সে প্রসঙ্গে স্বয়ং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
والله لانولى على هذا العمل احدا ساله ولا احدا حرص عليه.
অর্থঃ- “এই কাজে (শাসক পদে) যারা পদপ্রার্থী হয় বা পদের আকাঙ্খা করে আমরা তাদের পদ দেই না।” (বুখারী, মুসলিম)
যেখানে স্বয়ং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্বাচন পদ্ধতি শুধু অপছন্দই করেননি সাথে সাথে নিষেধও করেছেন। তাহলে ইসলামের নামে নির্বাচন জায়েয কি করে বলা যেতে পারে? তাই ইসলামের নামে নির্বাচন জায়েয বলা কুফরী। যা সমগ্র কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষভাবে সূরা ফাতিহাতেও বলা হয়েছে।
অতএব, উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হলো যে, ইসলামের নামে ভোট দেয়া ওয়াজিব বলা কুফরীর অন্তর্ভূক্ত। আরো সাব্যস্ত হলো, ভোটকে ইসলামের নামে আমানত, সাক্ষ্য, সুপারিশ এবং উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যম বলাও সম্পূর্ণ কুফরীর অন্তর্ভূক্ত। তাই যারাই ইসলামের নামে উপরোক্ত আক্বীদা ও আমলে লিপ্ত তাদের উচিৎ খালিছ তওবা করে ছহীহ্ আক্বীদা ও আমলে ফিরে আসা।
(দলীলসমূহঃ ১১০টি।)
{বিঃ দ্রঃ এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ২৬, ৩০, ৮৪ ও ৯০তম সংখ্যা পাঠ করুন।}
১। মাওলানা মুহম্মদ মাহ্মুদ বিন হাসান, ছাতক, সুনামগঞ্জ, ২। মাওলানা মুহম্মদ জাকিউদ্দীন, দিরাই, সুনামগঞ্জ,
৩। মাওলানা মুহম্মদ আযীযুল হক (জামী) জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ। ৪। মুহম্মদ সোহেল রানা, গাজীনগর, সুনামগঞ্জ।
৫। মুহম্মদ ফারুক আহমদ, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ। ৬। মুহম্মদ শামছুল ইসলাম (রিপন), দিরাই, সুনামগঞ্জ। ৭। মুহম্মদ হাবিবুর রহমান মুন্সী, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ। ৮। মুহম্মদ আব্দুল মালিক (মানিক মিয়া) জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ, ৯। মুহম্মদ শাহানুর আলম, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ, ১০। মুহম্মদ আল মামুন, শ্রীহাইল শাল্লা, সুনামগঞ্জ,
১১। মুহম্মদ শাহাদত হুসাইন, বন্দর, চট্টগ্রাম।
১২। মুহম্মদ নূরুল গণী, খুলসী, চট্টগ্রাম।
১৩। মুহম্মদ মশিউজ্জামান, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম।
১৪। মুহম্মদ ছিদ্দীকুল ইসলাম, ঝাউতলা, চট্টগ্রাম,
১৫। মুহম্মদ ওহীদুল হক্ব, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম।
সুওয়ালঃ ওহাবী, খারিজী, অতি সুন্নী, বিদ্য়াতীরা নিম্নের আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় বলে,
ولاتلمزوا انفسكم ولاتنابزوا بالالقاب بئس الاسم الفسوق بعد الايمان ومن لم يتب فاولئك هم الظلمون.
অর্থঃ- “তোমরা কাউকে দোষারোপ করোনা এবং পরস্পর পরস্পরকে অশোভনীয় লক্বব বা উপাধী দ্বারা সম্বোধন করোনা। কেননা, ঈমান আনার পর অশ্লীল নাম দ্বারা ডাকা গুণাহ্। আর যারা এটা হতে তওবা করলো না তারা জালিমের অন্তর্ভূক্ত।” (সূরা হুজরাত/১১)
আল্লাহ্ পাক বলেছেন, “মানুষের নাম বিকৃতি করে খোটা দিওনা।” অথচ মাসিক আল বাইয়্যিনাতে শাইখুল হাদীসকে হদস, মুহিউদ্দীনকে মাহিউদ্দীন, আহমদ শফীকে আহমক শফী, আমিনীকে কমিনী লিখা হয়। যা কুরআন শরীফের খেলাফ।
এখন আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে- মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর বক্তব্য সঠিক? না, তাদের বক্তব্য সঠিক? দলীল-আদিল্লাহ্র মাধ্যমে জানালে খুশী হবো।
জাওয়াবঃ হ্যাঁ, আল্লাহ্ পাক কালামুল্লাহ্ শরীফে কাউকে দোষারোপ করতে এবং কাউকে খারাপ নামে সম্বোধন করতে নিষেধ করেছেন সত্যি তবে শর্তও আরোপ করেছেন। শর্ত হচ্ছে, ঈমান আনার পর আমলদারগণ অর্থাৎ যারা মু’মিনে কামিল তাদেরকে দোষারোপ করা এবং তাদেরকে খারাপ নামে সম্বোধন করা শরীয়তে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে যারা ফাসিক ও উলামায়ে “ছূ” তাদেরকে দোষারোপ করতে ও খারাপ নামে সম্বোধন করতে নিষেধ করা হয়নি।
উল্লেখ্য, কুরআন শরীফের কেবল একটা আয়াত শরীফের উপর ভিত্তি করে ফতওয়া দিলে সে ফতওয়া গ্রহণযোগ্য হবেনা ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ পর্যন্ত সেই ফতওয়া সমষ্টিগত কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে গ্রহণযোগ্য না হবে।
যেমন, আল্লাহ্ পাক কালামুল্লাহ্ শরীফে নাযিল করেন,
يايها الذين امنوا لاتقربوا الصلوة وانتم سكارى حتى تعلموا ما تقولون.
অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্থ থাকাবস্থায় নামাযের নিকটবর্তী হয়োনা। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা না বুঝ যে, তোমরা মুখে কি বলছো।” (সূরা নিসা/৪৩)
পরবর্তীতে নাযিল করেন,
يايها الذين امنوا انما الخمر والميسر والانصاب والازلام رجس من عمل الشيطن فاجتنبوه لعلكم تفلحون.
অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই শরাব, জুয়া, বলি দেয়ার বেদি এবং ভাগ্য নির্ধারক তীর নাপাক, যা শয়তানের আমলের অন্তর্ভূক্ত। এগুলো থেকে তোমরা বিরত থাক। তাহলে অবশ্যই কামিয়াবী লাভ করবে।” (সূরা মায়িদা/৯০)
সুতরাং কেউ যদি “সূরা নিসার” ৪৩ নং আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় বলে, “শুধু নামাযের সময় নেশা করা যাবেনা, অন্য সময় করা যাবে তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে।” কারণ, পরবর্তীতে আল্লাহ্ পাক “সূরা মায়েদার” ৯০ নং আয়াত শরীফ নাযীল করে শরাব সব অবস্থায়ই পান করা হারাম ঘোষণা করেন। তা নামাযের পূর্বে হোক আর পরেই হোক।
অতএব, কোন বিষয়ে পূর্ণ তাহক্বীক ব্যতীত ফতওয়া দেয়া শরীয়ত সিদ্ধ নয়। পূর্ণ তাহক্বীক ব্যতীত ফতওয়া দিলে ঈমান নষ্ট হয়ে কাট্টা কাফির হতে হবে।
কাজেই “সূরা হুজরাতের” ১১ নম্বর আয়াত শরীফে যদিও বলা হয়েছে, “কাউকে দোষারোপ করা যাবেনা এবং খারাপ নামে সম্বোধন করা যাবেনা।”
তারপর আল্লাহ্ পাক যেমন শর্ত আরোপ করেছেন তেমন পরবর্তীতে অন্য আয়াত শরীফও নাযীল করেছেন,
ولا يغتب بعضكم بعضا ايحب احدكم ان ياكل لحم اخيه ميتا فكر هتموه.
অর্থঃ- “তোমরা একজন আরেকজনের গীবত করোনা। তোমরা কি কেউ তোমাদের মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খাওয়া পছন্দ করো? কখনও করোনা।” (সূরা হুজরাত/ ১২)
আর আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الغيبة اشد من الزنا.
অর্থঃ- “গীবত জিনার থেকেও খারাপ।” (ইত্তেহাফুস সাদাতিল মুত্তাক্বীন, আত্তারগীব ওয়াত তারহীব, জামউয যাওয়ায়িদ, তবারানী, মিশকাত, কাশফুল খিফা, ফিরদাউস, ইলালুল হাদীস)
এখন গীবত কাকে বলে? এবং কোনটা করলে গীবত হয়? কোনটা করলে গীবত হয় না?
এর ব্যাখ্যায় উল্লিখিত আয়াত শরীফের তাফসীরে হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “কিমিয়ায়ে সায়াদাত, ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন” ইত্যাদি কিতাবে উল্লেখ করেছেন, “কয়েক প্রকার লোক রয়েছে যাদের দোষক্রটি বর্ণনা করলে গীবত হয়না। এছাড়া অন্যান্য লোকের দোষক্রটি বর্ণনা করলে গীবত হবে।”
এক নম্বরে বলা হয়েছে, “কোন লোক যদি কাজী ছাহেবের কাছে বিচার প্রার্থী হয় আর বিচারের জন্য সত্য কথা বলতে গিয়ে যদি বিপরীত পক্ষের দোষত্রুটি বর্ণনা করে, তাহলে সেটা গীবত হবে না।”
দুই নম্বরে বলা হয়েছে, “কোন ব্যক্তি যদি কোন মুফতী ছাহেবের কাছে যায় ফতওয়ার জন্য, তখন সে ফতওয়ার জন্য যদি বিপরীত পক্ষের দোষ-ত্রুটি বলে, তাহলে সেটা গীবত হবে না।”
তিন নম্বরে বলা হয়েছে, “যদি রাজা-বাদশাহ, আমীর-ওমরাহ্দের ইছলাহ্ বা সংশোধন করার জন্য তাদের দোষত্রুটিগুলো বর্ণনা করা হয় বা ধরিয়ে দেয়া হয়, তাহলে সেটা গীবত হবে না।”
চার নম্বরে বলা হয়েছে, “যারা ফাসিক। ফাসিক কাদেরকে বলা হয়? যে ব্যক্তি ফরয, ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদা তরক করে তাকে ফাসিক বলা হয়। ফাসিকদের দোষত্রুটি বর্ণনা করলে, সেটা গীবত হয় না।”
পাঁচ নম্বরে বলা হয়ে থাকে, “যখন কোন লোক মশহুর হয় লুলা-ল্যাংড়া, বোবা-তোতলা ইত্যাদি নামে। তখন তাকে যদি সেই মশহুর নাম লুলা-ল্যাংড়া, বোবা-তোতলা ইত্যাদি বলে ডাকা হয়, তাহলে সেটা গীবত হবে না।”
ছয় নম্বরে বলা হয়ে থাকে, “যদি কোন ছেলের পক্ষ অথবা মেয়ের পক্ষ অর্থাৎ কোন পিতা তার ছেলেকে বিয়ে করাতে চায় অথবা মেয়েকে বিয়ে দিতে চায়, তখন বিপরীত পক্ষ ছেলে বা মেয়ের বাড়ীতে গিয়ে তাদের প্রতিবেশীদের কাছে যদি ঐ ছেলে বা মেয়ে সম্বন্ধে সংবাদ নেয়। আর প্রতিবেশী লোকেরা যদি সত্য কথা বলে অর্থাৎ সেই ছেলে বা মেয়ের দোষত্রুটিগুলো বলে দেয়, তাহলে সেটা গীবত হবেনা। কারণ এখানে একজনের জীবন নিয়ে প্রশ্ন।”
আর সপ্তম যেটা বলা হয়েছে, সেটা হলো “যারা উলামায়ে “ছূ” বা “দুনিয়াদার আলিম।” যারা দ্বীনকে বিক্রি করে দুনিয়া অর্জন করে, তাদের দোষত্রুটি বর্ণনা করলে, সেটা গীবত হবে না।”
সুতরাং যারা উলামায়ে “ছূ” বা “দুনিয়াদার আলিম” তাদের দোষত্রুটি বর্ণনা করলে ও তাদেরকে মন্দ নামে সম্বোধণ করলে গীবত ও গুণাহ্ কোনটাই হবেনা। বরং ছওয়াব হবে। এ প্রসঙ্গে হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন,
ايك زمانه بدنام علماء سوء + بهتراز شصت سال طاعت ….. ريا.
“এক যামানা বদনামে উলামায়ে ‘ছূ’
বেহতেরাজ শস্ত সালে তোয়াত বেরিয়া”
অর্থঃ- “কিছু সময় উলামায়ে “ছূ” বা দুনিয়াদার আলিমদের দোষত্রুটি বর্ণনা করা, ষাট বৎসর কবুল ইবাদত থেকে উত্তম।”
তার কারণ উলামায়ে “ছূ” বা গোমরাহ্ লোকের কাছে গিয়ে মানুষ গোমরাহ্ হয়ে যায়। যদি কেউ তার দোষত্রুটি বর্ণনা করে দেয় বা তার হাক্বীক্বত প্রকাশ করে দেয় তাহলে হাজার হাজার লোকের ঈমান হিফাযত হয়ে যাবে।
শাইখুল হাদীস আজিজুল হক্বকে
শাইখুল হদস বলা হয় কেন?
“শাইখুল হাদীস”-এর অর্থ হলো “হাদীসের ওস্তাদ।” অর্থাৎ যে হাদীসের দর্স দেয়। আর “শাইখুল হদস” শব্দের অর্থ হলো “নাপাকের ওস্তাদ।” “হদস” শব্দের অর্থ “নাপাক, অপবিত্র” ইত্যাদি। অর্থাৎ এক কথায় যে নাজায়েয, হারাম, অবৈধ, অপবিত্র কাজ করে সে হদস। আর এ সমস্ত কাজের যে পথ প্রদর্শক হয় সেই শাইখুল হদস।
মাসিক মদীনা পত্রিকার সম্পাদক মুহিউদ্দীন খানকে
মাহিউদ্দীন খান বলা হয় কেন?
“মুহিউদ্দীন” শব্দের অর্থ হলো “দ্বীন যিন্দাকারী।” অর্থাৎ যে দ্বীনকে যিন্দা করে সে “মুহিউদ্দীন।” আর “মাহিউদ্দীন” অর্থ “দ্বীন ধ্বংসকারী।” অর্থাৎ যে দ্বীন ধ্বংসের কাজে সাহায্য করে সেই মাহিউদ্দীন।
মুফতী আমিনীকে মুফতী কমিনী বলা হয় কেন?
“আমীন” শব্দের অর্থ হলো “বিশ্বাসী, সত্যবাদী।” অর্থাৎ যে বিশ্বস্ততার সহিত হক্ব কাজ করে থাকে সে “আমীন বা আমিনী।” আর “কমিন” শব্দের অর্থ হলো “নিকৃষ্ট, খারাপ, বদ্কার” ইত্যাদি। অর্থাৎ যে বদ্ ও নিকৃষ্ট কাজ করে সেই হলো কমিনী।
আহমদ শফীকে আহমক শফী বলা হয় কেন?
“আহমদ” শব্দের অর্থ হলো “চরম প্রশংসাকারী।” অর্থাৎ যে নেক্কার, পরহেযগার সে হচ্ছে আহমদ। আর “আহমক” শব্দের অর্থ হচ্ছে “চরম বোকা, বেওকুফ, নাদান” ইত্যাদি। অর্থাৎ যে চরম বোকা বা নাদান সেই আহমক।
উপরোক্ত ব্যক্তি চতুষ্ঠয়কে পর্যায়ক্রমে হদস, মাহিউদ্দীন, কমিনী, আহমক বলার কারণ নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
(১)
পর্দা করা ফরয হওয়া সত্ত্বেও তারা পর্দা করে না।
কুরআন শরীফে আল্লাহ্ পাক পর্দা করা ফরয বলে ঘোষণা করেছেন। “সূরা নিসা, সূরা নূর ও সূরা আহযাব” ইত্যাদি সূরাসমূহে যা কিত্য়ী ফরযের অর্ন্তভূক্ত।
আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
قل للمؤمنين يغضوا من ابصارهم ويحفظوا فروجهم ذلك ازكى لهم ان الله خبير بما يصنعون وقل للمؤمنت يغضضن من ابصارهن ويحفظن فروجهن ولايبدين زينتهن.
অর্থঃ- “(হে হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) আপনি মু’মিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানকে হিফাযত করে। এটা তাদের জন্য পবিত্রতার কারণ। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক তারা যা করে তার খবর রাখেন। আর আপনি মু’মিনাদেরকে বলুন, তারাও যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানকে হিফাযত করে ও তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।” (সূরা নূর/৩০,৩১)
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
لعن الله الناظر والمنظور اليه.
অর্থঃ- “যে দেখে এবং দেখায় উভয়ের প্রতি আল্লাহ্ পাক-এর লা’নত।” (বায়হাক্বী ফি শুয়াবিল ঈমান, মিশকাত, মিরকাত)
অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক তাঁর কালাম পাক এবং আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাদীস শরীফ দ্বারা সরাসরি পর্দাকে ফরয করে দিয়েছেন। শুধু তাই নয় বরং দৃষ্টিসহ সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে হিফাযত করে পর্দা করতে বলেছেন।
উল্লেখ্য, উপরোক্ত ব্যক্তি চতুষ্ঠয় বে-পর্দা হওয়ার সাথে অবৈধ যিনার কাজেও লিপ্ত।
কারণ হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
العينان زناهما النظر والاذنان زناهما الاستماع واللسان زناه الكلام واليد زناها البطش والرجل زناها الخطى والقلب يهوى ويمنى ويصدق ذلك الفرج او يكذبه.
অর্থঃ- “চোখের যিনা হলো দৃষ্টি করা, কানের যিনা হলো শ্রবণ করা, মুখের যিনা হলো কথা বলা, হাতের যিনা হলো স্পর্শ করা, পায়ের যিনা হলো ধাবিত হওয়া, অন্তর চায় ও আকাঙ্খা করে এবং লজ্জাস্থান সেটাকে সত্য অথবা মিথ্যায় প্রতিপন্ন করে।” (বুখারী শরীফ, কানযুল উম্মাল)
হাদীস শরীফে এজন্য ইরশাদ হয়েছে,
لاتتبع النظرة فان لك الاولى وليست لك الاخرة.
অর্থঃ- “তোমরা দৃষ্টিকে অনুসরণ করোনা। প্রথম দৃষ্টিকে ক্ষমা করা হবে (যদি তা ইচ্ছাকৃত না হয়) কিন্তু পরবর্তী দৃষ্টিকে ক্ষমা করা হবেনা। অর্থাৎ পরবর্তী প্রতি দৃষ্টিতে একটা করে কবীরা (যিনার) গুণাহ্ লিখা হবে।” (আহমদ, তিরমিযী, আবূ দাউদ, দারিমী, মিশকাত, মিরকাত)
অর্থাৎ যারা বে-পর্দা হয়ে থাকে হাদীস শরীফের বর্ণনা মুতাবিক তারা সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা অবৈধ কাজ তথা যিনাতে মশগুল বা লিপ্ত।
উপরোক্ত ব্যক্তি চতুষ্ঠয় পর্দার হুকুমকে অমান্য করে প্রকাশ্যে বে-পর্দা হয়ে বেগানা মহিলার সাথে উঠা-বসা, খাওয়া-দাওয়া, মিটিং-মিছিল ইত্যাদি করে থাকে। এমনকি বে-পর্দা হয়ে বেগানা মহিলার সাথে এক গাড়িতে চড়েও থাকে।যার দলীল বাংলাদেশের জনগণ ও বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের অনেক অনেক সংখ্যা।
উল্লেখ্য, পর্দা এমন এক ফরয যা অস্বীকার করলে মানুষ কাফির হয়ে চির জাহান্নামী হয়ে যাবে। আর পর্দা ফরয স্বীকার করা সত্ত্বেও শরয়ী পর্দা পালন না করলে চরম ফাসিক হিসেবে সাব্যস্ত হবে।
কাজেই তারা যদি ফরয পর্দা অস্বীকার করে বে-পর্দা হয়ে থাকে তবে তাদের ঈমানই চলে গেছে। আর যদি স্বীকার করা সত্ত্বেও বে-পর্দা হয়ে থাকে তাহলে তারা চরম ফাসিক। আলিম হয়ে যারা ফাসিকী কাজ করে তারা উলামায়ে “ছূ”র অন্তর্ভূক্ত। উলামায়ে “ছূ”দের দোষত্রুটি বর্ণনা করা ও তাদেরকে মন্দ নামে ডাকা শরীয়তে নিষিদ্ধ নয় বরং সিদ্ধ রয়েছে। যা নেকীর কারণও বটে।
(২)
ছবি তোলা হারাম হওয়া সত্ত্বেও তারা ছবি তোলে।
“বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ” ইত্যাদি সমস্ত বিশ্বস্ত হাদীস শরীফের কিতাবসমূহে “ছবি তোলা কাট্টা হারাম” বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
যেমন- হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
ان اشد الناس عذابا عند الله المصورون.
অর্থঃ- “নিশ্চয় মানুষের মধ্যে ঐ ব্যক্তিকে আল্লাহ্ পাক কঠিন শাস্তি দিবেন, যে ব্যক্তি প্রাণীর ছবি তোলে বা আঁকে।” (বুখারী শরীফ)
ان من اشد اهل النار يوم القيامة عذابا المصورون.
অর্থঃ- “নিশ্চয় ক্বিয়ামতের দিন দোযখবাসীদের মধ্যে ঐ ব্যক্তির কঠিন শাস্তি হবে, যে ব্যক্তি প্রাণীর ছবি আঁকে বা তোলে।” (মুসলিম শরীফ)
ان اشد الناس عذابا يوم القيامة الذين يشبهون بخلق الله.
অর্থঃ- “নিশ্চয় ক্বিয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তির কঠিন শাস্তি হবে, যে আল্লাহ্ পাক-এর সৃষ্টির সাদৃশ্য কোন প্রাণীর ছূরত তৈরী করে।” (নাসাঈ শরীফ)
من صور صورة عذبه الله حتى ينفخ فيها يعنى الروح وليس ينافخ فيها.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি কোন প্রাণীর ছবি তৈরী করবে, আল্লাহ্ পাক তাকে ঐ ছবির মধ্যে প্রাণ না দেয়া পর্যন্ত শাস্তি দিবেন। কিন্তু সে তার মধ্যে প্রাণ দিতে সক্ষম হবে না।” (তিরমিযী শরীফ)
উল্লেখ্য, ছবি তোলা হারাম। তা অস্বীকার করলে কাফির হয়ে চির জাহান্নামী হতে হবে। আর হারাম জেনে ছবি তুললেও সে চরম ফাসিক হিসেবে সাব্যস্ত হবে।
আর উপরোক্ত ব্যক্তি চতুষ্ঠয় প্রকাশ্যে ছবি তুলে থাকে, শুধু ছবি তুলেই তারা ক্ষ্যন্ত হয়না সে সমস্ত ছবিগুলো পেপার পত্রিকায়ও দিয়ে থাকে। এর দলীল বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকার অনেক অনেক সংখ্যা।
কাজেই তারা যদি “ছবি তোলা হারাম” অস্বীকার করে জায়েয মনে করে তুলে থাকে তাহলে তাদের ঈমান চলে গেছে। আর যদি “ছবি তোলা হারাম” স্বীকার করা সত্ত্বেও ছবি তুলে থাকে তাহলে তারা চরম ফাসিক। আলিম হয়ে যারা ফাসিকী কাজ করে তারাই উলামায়ে “ছূ”র অন্তর্ভূক্ত। আর যারা উলামায়ে “ছূ” তাদের দোষত্রুটি বর্ণনা করা এবং তাদেরকে মন্দ নামে ডাকা শরীয়তে নিষিদ্ধ নয়; বরং সিদ্ধ রয়েছে। যা নেকীর কারণও বটে।
তাদের মধ্যে কেউ কেউ জনগণকে ধোকা দেয়ার জন্য বলে থাকে, “আমরা ছবি তুলি না, সাংবাদিকরা ছবি তুলে ছাপিয়ে থাকে।”
এটা কাট্টা মিথ্যা কথা। কারণ সাংবাদিকতার আইনে উল্লেখ রয়েছে, “কোন সাংবাদিক যদি কারো অনুমতি ব্যতীত ছবি ছাপায় আর যার ছবি ছাপানো হয়েছে সে যদি আপত্তি জানায় তাহলে সাংবাদিককে উক্ত ব্যক্তির নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে তার অনুমতি ব্যতীত কোন ছবি ছাপাতে পারবে না। যদি কোন সাংবাদিক কারো অনুমতি ব্যতীত ছবি ছাপায় আর ছবির মালিক যদি ছাপানোর ব্যাপারে আপত্তি জানায় আর সাংবাদিকও ক্ষমা প্রার্থনা না করে তাহলে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যদি মামলা করে তাহলে সাংবাদিকের সাংবাদিকতার সনদ বাতিল হয়ে যাবে।” (আধুনিক ফটোগ্রাফী, বাংলাদেশের গণমাধ্যম আইন ও বিধিমালা, সংবাদ বিষয়ক আইন।)
কাজেই কারো বিনা অনুমতিতে তার ছবি ছাপানোর কোন সুযোগ নেই।
(৩)
রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আদর্শ হিসেবে তারা গ্রহণ করেনা ও অনুসরণ করেনা।
কুরআন শরীফে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,
لقد كان لكم فى رسول الله اسوة حسنة.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সূরা আহযাব/২১)
তিনি আরো বলেন,
اطيعون الله ورسوله ان كنتم مؤمنين.
অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইতায়াত (অনুসরণ-অনুকরণ) করো যদি তোমরা মু’মিন হয়ে থাক।” (সূরা আনফাল/১)
হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, عليكم بسنتى.
অর্থঃ- “তোমাদের প্রতি আমার আদর্শ গ্রহণ করা ওয়াজিব।” (আহমদ, আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাযাহ্, মিশকাত, মিরকাত)
অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক ও আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তিনিই তথা রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই হচ্ছেন আদর্শ এবং তাঁকেই সর্বাবস্থায় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে অনুসরণ-অনুকরণ করার জন্য।
অথচ তারা খৃষ্টান প্রোটেষ্ট্যান্টের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের অনুসরণে মৌলবাদী দাবী করে।
মৌলবাদ : “মৌলবাদ” শব্দটি মূলতঃ খৃষ্টান প্রোটেষ্ট্যান্ট সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো। যারা বাইবেলের প্রতিটি বিষয়ের যথার্থতায় এবং আক্ষরিক ব্যাখ্যায় যুক্তিবিহীনভাবে, যাচাই-বাছাই ব্যতিরেকে, ধর্মান্ধের ন্যায়, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, চরমপন্থীদের মত বিশ্বাসী ছিল।
ইতিহাসঃ মৌলবাদ আমেরিকার প্রোটেষ্ট্যান্টদের একটি ব্যাপক আন্দোলনের নাম। মৌলবাদ আন্দোলন স্বাধীন চিন্তাবিদদের বিরুদ্ধে খৃষ্টধর্মের মূল তত্ত্বসমূহকে সংরক্ষণের জন্য হয়েছিল।
১৯১২ সালের দিকে কিছু বেনামী লেখক ১২টি ছোট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভলিউমে “ঞযব ভঁহফধসবহঃধষং” নামে বই বের করে এবং এই বইয়ের নামকরণ থেকেই এই আন্দোলন ঋঁহফধসবহঃধষরংঃ সড়াবসবহঃ বা মৌলবাদী আন্দোলন নামে আখ্যায়িত হয়।
তাই মুসলমানদের মৌলবাদী বলা জায়েয নেই। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে ইরশাদ করেন,
يايها الذين امنوا لاتقولوا راعنا وقولوا انظرنا واسمعوا وللكفرين عذاب اليم.
অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা রঈনা বলনা উনযুরনা বলো এবং শ্রবণ করো। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।” (সূরা বাক্বারা/১০৪)
এ আয়াত শরীফের শানে নুযূলে বলা হয়, ইহুদীরা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেয়ার জন্য রঈনা শব্দ খারাপ অর্থে ব্যবহার করতো যার একাধিক অর্থ। একটি অর্থ হলো, “আমাদের দিকে লক্ষ্য করুন” যা ভাল অর্থে ব্যবহৃত হয়, আর খারাপ অর্থে, “হে মূর্খ, হে মেষ শাবক” এবং হিব্রু ভাষায় এটি একটি বদ্দোয়া।
হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের কেউ কেউ রঈনা শব্দের ভাল অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করলে, ইহুদীরা খারাপ অর্থ চিন্তা করে হাসাহাসি করত। এতে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কষ্ট পেতেন তবুও কিছু বলতেন না।
কেননা আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহী ছাড়া কোন কথা বলতেন না।
وما ينطق عن الهوى ان هو الا وحى يوحى.
অর্থঃ- “তিনি (হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওহী ব্যতীত নিজের থেকে কোন কথা বলেন না।” (সুরা নজম/৩,৪)
এর ফলশ্রুতিতে আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফের আয়াত নাযিল করে “রঈনা” শব্দের পরিবর্তে “উনযুরনা” শব্দ ব্যবহার করতে বললেন। কারণ “রঈনা” শব্দ ভাল খারাপ উভয় অর্থে ব্যবহৃত হলেও “উনযুরনা” শব্দ শুধুমাত্র ভাল অর্থেই ব্যবহৃত হত। তাই যে সকল শব্দ ভাল মন্দ উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়, সে সকল শব্দের পরিবর্তে উপরোক্ত আয়াত মুতাবিক তার সমার্থক অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করতে হবে, যা শুধুমাত্র ভাল অর্থেই ব্যবহৃত হয়।
উপরোক্ত আয়াত শরীফ অনুযায়ী ‘মৌলবাদ’ শব্দ মুসলমানদের জন্য ব্যবহার করা জায়েয নেই। কারণ ‘মৌলবাদ’ শব্দটি দুু’অর্থে ব্যবহৃত হয়- আভিধানিক ও ব্যবহারিক। আভিধানিক অর্থে মৌলবাদের অর্থ হলো “যে কোন ধর্মের মূল তত্ত্ব বা মৌলিক বিষয়সমূহ বা মৌলিক মতবাদসমূহ।” আর ইসলাম কোন মতবাদ নয়।
আর ব্যবহারিক অর্থে ধর্মান্ধ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, চরমপন্থী আমেরিকান খৃষ্টান প্রোটেষ্ট্যান্ট সম্প্রদায়ের বাইবেল সম্পর্কীয় মতবাদকে মৌলবাদ বলে এবং এ অর্থেই এটা মশহুর।
শরীয়তের দৃষ্টিতে ‘মৌলবাদ’ নাজায়েয ও হারাম।
‘মৌলবাদ’ শব্দটি আভিধানিক অর্থে মন্দ না হলেও শরীয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। আর ব্যবহারিক অর্থে তো খুবই খারাপ। কারণ খৃষ্টান প্রোটেষ্ট্যান্টদের প্রতি অবমাননামূলক উক্তি হিসেবে এর উৎপত্তি। আর খৃষ্টান প্রোটেষ্ট্যান্টদের সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কযুক্ত।
এছাড়া কুরআন-সুন্নাহ্র কোথাও মুসলমানকে মৌলবাদী বলে সম্বোধন করা হয়নি। বরং “মু’মিন, মুসলিম, মুত্তাকী” বলে সম্বোধন করা হয়েছে।
যেমন “সূরা আলে ইমরানের” ১৩৯ নং আয়াত শরীফে আল্লাহ্ পাক বলেন,
ولاتهنوا ولاتحزنوا وانتم الاعلون ان كنتم مؤمنين.
অর্থঃ- “তোমরা চিন্তিত হয়োনা, পেরেশান হয়োনা বরং তোমরাই কামিয়াবী লাভ করবে যদি তোমরা মু’মিন হতে পার।”
“সূরা আলে ইমরানের” ১০২ নং আয়াত শরীফের আল্লাহ্ পাক বলেন,
يايها الذين امنوا اتقوا الله حق تقته ولاتموتن الا وانتم مسلمون.
অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ পাককে ভয় করার মত ভয় করো। আর তোমরা মুসলমান না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করোনা।”
“সূরা হুজরাতের” ১৩ নং আয়াত শরীফে আল্লাহ্ পাক বলেন, ان اكرمكم عند الله اتقكم.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক-এর নিকট ঐ ব্যক্তি সবচাইতে সম্মানিত যিনি তোমাদের মধ্যে মুত্তাক্বী।”
উপরোক্ত আয়াত শরীফসমূহে আল্লাহ্ পাক তাঁর বান্দাদেরকে “মু’মিন, মুসলমান ও মুত্তাক্বী” হওয়ার জন্য বলেছেন।
মুসলমান মাত্রই কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস অনুযায়ী চলবে। আর মুসলমানরা কখনো ধর্মান্ধ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, চরমপন্থী ইত্যাদি হতে পারেনা। কাজেই সকল মুসলমানের জন্যই খৃষ্টান প্রোটেষ্ট্যান্টের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের অনুসরণে মৌলবাদী দাবী করা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম।
কুরআন-সুন্নাহ্র এত কঠোর নিষেধ থাকার পরও উক্ত ব্যক্তি চতুষ্ঠয় আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ অমান্য করে খৃষ্টান প্রোটেষ্ট্যান্টের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের অনুসরণে মৌলবাদী দাবী করে। তারা যদি কুরআন-সুন্নাহ্সম্মত মনে করে মৌলবাদী দাবী করে তাহলে তাদের ঈমান চলে গেছে। আর যদি কুরআন-সুন্নাহসম্মত মনে না করে মৌলবাদী দাবী করে তাহলে তারা চরম ফাসিক। আলিম হয়ে যারা ফাসিকী কাজ করে তারাই উলামায়ে “ছূ”র অন্তর্ভূক্ত। আর যারা উলামায়ে “ছূ” তাদের দোষত্রুটি বর্ণনা করা এবং তাদেরকে মন্দ নামে ডাকা শরীয়তে নিষিদ্ধ নয়; বরং সিদ্ধ রয়েছে। যা নেকীর কারণও বটে।
তারা কট্টর নাস্তিক মুসলমান নিধনকারী
মাওসেতুং-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে
তার অনুসরণে লংমার্চ করে
লংমার্চ : ১৯৩০-৩৪ সালের মধ্যবর্তী সময় তৎকালীন চীনের প্রেসিডেন্ট কমুনিস্টদের বিরূদ্ধে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি জার্মান সামরিক উপদেষ্টাদের সহযোগিতায় কিয়াংসি প্রদেশে অবস্থানরত কমুনিস্টদের অবস্থানের প্রায় চতুর্দিকেই শক্ত ঘাঁটি ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এর ফলে কমুনিস্টগণ পালাতে বাধ্য হয়। পালানোর কৌশল হিসেবে তারা চীনের দক্ষিণ-পূর্ব কিয়াংসি থেকে পশ্চিম দিক দিয়ে ঘুরে প্রায় (৬-৮) হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে চীনের উত্তর পশ্চিম সেনসি প্রদেশে পৌঁছে। পথে তাদের ১৮টি পাহাড়ের সারি ও ২৪টি নদী অতিক্রম করতে হয়। মাওসেতুং এর নেতৃত্বে কমুনিস্টদের এই দীর্ঘ বিপদসঙ্কুল পথ পলায়নের কাহিনীই ইতিহাসে লংমার্চ নামে অভিহিত বা মশহুর।
এ প্রসঙ্গে কমুনিষ্ট আন্দোলনের নেতা মাওসেতুং ২৭শে ডিসেম্বর ১৯৩৬ সালে লংমার্চের স্মৃতিচারণ করে যা লিখেছে তা তার ঝবষবপঃবফ ড়িৎশং ড়ভ সধড় ওংব :ঁহম াড়ষ, ১. ঢ়ধমব ১৬১-১৬২ সংকলিত হয়েছে। যার বর্ণনা নিম্নরূপ- “ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহে লংমার্চ এ ধরণের প্রথম ঘটনা। একটি ইস্তেহার, একটি প্রচার বাহিনী, একটি বীজ বপনকারী যন্ত্র। পানগু যখন স্বর্গ থেকে মর্ত আলাদা করে দেয় এবং তিন রাজা ও পাঁচ সম্রাট রাজত্ব করত সেই থেকে ইতিহাস কি কখনো আমাদের মত একটি লংমার্চ প্রত্যক্ষ করেছে? আমরা অবর্ণনীয় কষ্ট এবং বিপদের মুকাবেলা করেছি; তথাপি দু’পা ব্যবহার করে আমরা এগারটি প্রদেশের দৈর্ঘ্যে এবং প্রস্থে বিশ হাজার লী’র বেশী দূরত্ব অতিক্রম করেছি। জিজ্ঞেস করতে চাই ইতিহাসে কি কখনো এ ধরণের লংমার্চের ঘটনা ঘটেছে? না, কখনোই নয়। লংমার্চ একটি ইস্তেহার। লংমার্চ গোটা বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে লাল ফৌজ বীরদের বাহিনী, সাম্রাজ্যবাদীরা এবং তাদের পা চাটা কুকুর জিয়াং জিয়েশি (চিয়াং কাই-শেক) ও তার দোসররা নপুংসক, আমাদের ঘেরাও, অনুসরণ, প্রতিরোধ এবং গতিরোধে তাদের চরম ব্যর্থতার কথাও লংমার্চ জানিয়ে দিয়েছে। লংমার্চ একটি প্রচারণী শক্তিও। এগারোটি প্রদেশের প্রায় ২০ কোটি জনগণকে লংমার্চ দেখিয়েছে লাল ফৌজের পথই তাদের মুক্তির একমাত্র পথ। লংমার্চ ছাড়া ব্যাপক জনগণ স্বল্প সময়ে কিভাবে লাল ফৌজের বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে পারতেন? লংমার্চ বীজ বপনকারী যন্ত্রও। এগারোটি প্রদেশে লংমার্চ যে অসংখ্য বীজ বুনেছে, তা মুঞ্জরিত হবে, পাতা গজাবে, বিকশিত হবে, ফল ধারণ করবে এবং ভবিষ্যতেও ফসল দেবে। এক কথায় আমাদের জন্য বিজয় এবং শত্রুর জন্য পরাজয়ের মধ্য দিয়ে লংমার্চ শেষ হয়েছে। কারা লংমার্চকে বিজয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে? কমিউনিষ্ট পার্টি। কমিউনিষ্ট পার্টি ছাড়া এ ধরণের একটি লংমার্চ কল্পনাই করা যেতনা।
কাজেই লংমার্চ হলো নাস্তিকদের নাস্তিক্যবাদ রক্ষার জন্য পলায়নের মাধ্যমে তাদের প্রবর্তিত এক বিশেষ পদ্ধতির নাম। যা পূর্ববর্তী কোন আসমানী কিতাব এবং কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা এবং ক্বিয়াসের কোথাও উল্লেখ করা হয়নি।
অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,
افغير دين الله يبغون وله اسلم من فى السموت ولارض طوعا وكرها و اليه يرجعون.
অর্থঃ- “তোমরা কি আল্লাহ্ পাক-এর দ্বীন (ইসলাম) ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম তালাশ কর। অথচ তাঁরই প্রতি আসমান-যমীনের সবকিছু ইচ্ছা এবং অনিচ্ছায় সমর্পিত রয়েছে এবং সবকিছু তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তিত হবে।” (সূরা আলে ইমরান/৮৩)
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
من سن فى الاسلام سنة سيئة كان عليه وذرها ووزر من عمل بها.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি দ্বীন ইসলামের মধ্যে কোন বদ প্রথা প্রচলন করলো এর গুণাহ্ তার উপর বর্তাবে এবং যারা উক্ত বদ প্রথা আমল করবে তাদের গুণাহ্ও তার উপর বর্তাবে।” (মুসলিম, মিশকাত)
উপরোক্ত আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দ্বীন-ইসলামের নিয়ম-নীতি, তর্জ-তরীক্বা ব্যতীত অন্য কোন নিয়ম-নীতি, তর্জ-তরীক্বা গ্রহণ করা যাবেনা। যদি কেউ বিধর্মী বিজাতীয়দের অনুসরণে কোন বদ্ প্রথা প্রচলন করে তাহলে সেই বদ্ প্রথা অনুযায়ী যারা চলবে তাদের সকলেরই গুণাহ্ যে বদ্ প্রথা প্রচলন করেছে তার উপর বর্তাবে।
তাই মুসলমান মাত্রই কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস অনুযায়ী চলবে। কারণ মুসলমান কখনো নাস্তিক, বিধর্মী, বিজাতীয়দের অনুসরণ-অনুকরণ করতে পারেনা।
শরীয়তের দৃষ্টিতে লংমার্চ করা হারাম ও নাজায়েয।
কাজেই সকল মুসলমানের জন্যই কট্টর নাস্তিক, মুসলমান নিধনকারী মাওসেতুং-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে লংমার্চ করা সম্পূর্ণরূপে নাজায়েয ও হারাম।
কুরআন-সুন্নাহ্য় এত কঠোর নিষেধ থাকার পরও উক্ত ব্যক্তি চতুষ্ঠয় আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ অমান্য করে কট্টর নাস্তিক, মুসলমান নিধনকারী মাওসেতুং-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে লংমার্চ করে। এখানে উল্লেখ্য যে, তারা যদি কুরআন-সুন্নাহসম্মত মনে করে লংমার্চ করে তাহলে তাদের ঈমান চলে গেছে। আর যদি কুরআন-সুন্নাহ্সম্মত মনে না করে লংমার্চ করে তাহলে তারা চরম ফাসিক। আলিম হয়ে যারা ফাসিকী কাজ করে তারাই উলামায়ে “ছূ”র অন্তর্ভূক্ত। আর যারা উলামায়ে “ছূ” তাদের দোষত্রুটি বর্ণনা করা এবং তাদেরকে মন্দ নামে ডাকা শরীয়তে নিষিদ্ধ নয়; বরং সিদ্ধ রয়েছে। যা নেকীর কারণও বটে।
তারা জাতী হিন্দু মুসলমান বিদ্বেষী মহন দাস
করমচাঁদ গান্ধীর অনুসরণে হরতাল করে
হরতাল : “হরতাল” শব্দের অর্থ বিশৃঙ্খলা, অত্যাচার, স্বেচ্ছাচার, অবাধ্যতা, অরাজকতা, প্রতিবন্ধকতা, প্রতিরোধ ইত্যাদি।
হরতালের ব্যাখ্যায় বলা হয়, বিক্ষোভ প্রকাশের জন্য যানবাহন, হাট-বাজার, দোকানপাট, অফিস-আদালত ইত্যাদি জনজীবনের সব কাজ-কর্ম অযাচিতভাবে বন্ধ করা।
হরতাল গুজরাটি শব্দ। ‘হর’ অর্থ প্রত্যেক। ‘তাল’ অর্থ তালা। অর্থাৎ প্রতি দরজায় তালা।
হরতালের ইতিহাস
মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রাচীনকাল হতেই দাবী আদায়ের কৌশল হিসেবে নানা প্রকার পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। যেমন, আমেরিকার ফিলাডেলফিয়াতে ১৭৮৬ সালে ছাপাখানার কর্মচারীরা, জার্মানে ১৯২০ সালে রাজনৈতিক কারণে, বৃটেনে ১৯২৬ সালে কয়লা শ্রমিকরা, এছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকার নানা স্থানে বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের দাবী আদায় করার জন্য যে কৌশল অবলম্বন করেছিল, তার নাম দেয়া হয়েছে স্ট্রাইক।
আর ভারত উপমহাদেশে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, বৃটিশদের রাউলাট আইন বাতিল করার জন্য তার প্রতিবাদে যে পদ্ধতি অবলম্বন করে, তার নাম দেয়া হয় হরতাল। এ হরতাল পালিত হওয়ার কথা ছিল ১৯১৮ সালের ৩০শে মার্চ। পরে এ তারিখ পিছিয়ে ৬ই এপ্রিল করা হয়। ফলে কোন স্থানে ৩০শে মার্চ আবার কোন স্থানে ৬ই এপ্রিল সর্ব প্রথম হরতাল পালিত হয়।
বলাবাহুল্য, হরতাল গুজরাটি শব্দ। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী কট্টর মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দু, সে দাবী আদায়ের পদ্ধতির নামকরণ করে হরতাল।
মূলতঃ স্ট্রাইক শব্দের প্রবর্তক হলো, ইহুদী-নাছারা। আর হরতাল শব্দের প্রবর্তক হলো, মুশরিক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী।
আশ্চর্য হলেও সত্য যে, বর্তমান আলিম নামধারী উলামায়ে “ছূ”রা নিজের অস্তিত্ব তো বিলীন করে দিয়েছেই সাথে সাথে ইসলামকে বিসর্জন দিয়ে কট্টর জাতী হিন্দু মহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে অনুসরণ করে হরতাল করছে।
অথচ মুসলমান বিদ্বেষী মহনদাস করমচাঁদ গান্ধী নিজেকে জাতী হিন্দু দাবী করার কারণে সে ইহুদী-নাছারাদের অনুসরণ করে ষ্ট্রাইক করলোনা। বরং সে তার জাতীয়তা বজায় রাখার জন্য নাম পরিবর্তন করে “হরতাল” করলো।
শরীয়তের দৃষ্টিতে ‘হরতাল’ নাজায়েয ও হারাম।
অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,
ومن يبتغ غير الاسلام دينا فلن يقبل منه وهو فى الاخرة من الخسرين.
অর্থঃ- “যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন (নিয়ম-নীতি, অন্য ধর্ম) তালাশ করে, তা কখনোই তার থেকে গ্রহণ করা হবেনা এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হবে।” (সূরা আলে ইমরান/৮৫)
আর এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
وعن جابر عن النبى صلى الله عليه وسلم حين اتاه عمر فقال: انا نسمع احاديث من يهود تعجبنا افترى ان نكتب بعضها فقال امتهوكون انتم كما تهوكت الهود والنصارى لقد جئتكم بها بيضاء نقية، ولو كان موسى حيا ماوسعه الا اتباعى.
অর্থঃ- “হযরত জাবির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, একদিন হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, (ইয়া রসূলাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমরা ইহুদীদের থেকে তাদের কিছু ধর্মীয় কথা শুনে থাকি, যাতে আমরা আশ্চর্যবোধ করি, ওটার কিছু আমরা লিখে রাখবো কি? হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরাও কি দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছো? যে রকম ইহুদী নাছারারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে? অবশ্যই আমি তোমাদের নিকট পরিপূর্ণ, উজ্জ্বল ও পরিস্কার দ্বীন নিয়ে এসেছি। হযরত মুসা আলাইহিস্ সালামও যদি দুনিয়ায় থাকতেন, তাহলে তাঁকেও আমার অনুসরণ করতে হতো।” (মুসনদে আহমদ, বায়হাক্বী, মিশকাত)
সুতরাং উপরোক্ত আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফ হতে বুঝা গেল যে, মুসলমানের জন্য কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াস ছাড়া অন্য কোন বিজাতীয় পন্থার অনুসরণ-অনুকরণ ও আমল করা হারাম।
কাজেই সকল মুসলমানের জন্য মুসলমান বিদ্বেষী কট্টর জাতী হিন্দু মহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে হরতাল করা সম্পূর্ণরূপে নাজায়েয ও হারাম।
কুরআন-সুন্নাহ্র এত কঠোর নিষেধ থাকার পরও উক্ত ব্যক্তি চতুষ্ঠয় আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ অমান্য করে মুসলমান বিদ্বেষী কট্টর জাতী হিন্দু মহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে হরতাল করে।
এখানে উল্লেখ্য যে, তারা যদি শরীয়তসম্মত মনে করে হরতাল করে তাহলে তাদের ঈমান চলে গেছে। আর যদি শরীয়তের খিলাফ জেনে হরতাল করে তাহলে তারা চরম ফাসিক। আলিম হয়ে যারা ফাসিকী কাজ করে তারাই উলামায়ে “ছূ”র অন্তর্ভূক্ত। আর যারা উলামায়ে “ছূ” তাদের দোষত্রুটি বর্ণনা করা এবং তাদেরকে মন্দ নামে ডাকা শরীয়তে নিষিদ্ধ নয়; বরং সিদ্ধ রয়েছে। যা নেকীর কারণও বটে।
তারা ইহুদী ও নাছারাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত
হয়ে তাদের অনুসরণে ইসলামের নামে
গণতন্ত্র ও নির্বাচন করে
নির্বাচনঃ প্রাচীন গ্রীসে খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম এবং ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্বাচন প্রথা চালু ছিল। এছাড়া রোমান সিনেটেও এ পদ্ধতি চালু ছিল।
ঊষবপঃরড়হ সম্পর্কে ধর্ম, মিথলজি বিষয়ক ঊহপুপষড়ঢ়বফরধ ড়ভ গধহ, গুঃয’ং ্ গধমরপ এ বলা হয়েছে, “ইলেকশন বা নির্বাচন শব্দটি উৎপত্তি লাভ করেছে গ্রীক শব্দ ঊষড়মব হতে, যার অর্থ ছিল পছন্দ। নির্বাচনের ধারণা প্রাচীন খ্রীষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের ব্যাখ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত।”
এ ব্যাখ্যাটি এরূপ যে, তাদের এড়ফ নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিবর্গ অথবা জাতিকে বিশেষভাবে পছন্দ করতেন তার রাজত্বে বিশেষ কিছু ভূমিকা পালনের জন্য, যাকে বলা হত নির্বাচন।
উল্লেখ্য, খ্রীষ্টান ধর্মতত্ত্বে নির্বাচনের ধারণাটি অদৃষ্টবাদ থেকে এসেছে। এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, খ্রীষ্টানদের আরো ধারণা যে, তাদের খোদার পছন্দনীয় বা বষবপঃবফ অবশ্যই স্বল্প হবে।” (গধঃযব-ি২২-২৪)
ঊহপুপষড়ঢ়বফরধ ড়ভ গধহ, গুঃয’ং ্ গধমরপ এ আরো বলা হয়েছে যে, “মূলকথা হচ্ছে নির্বাচন খ্রীষ্টীয় ধর্মতত্ত্বের সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত একটি বিষয়।”
আধুনিক গণতন্ত্র ও নির্বাচনের প্রবর্তক হচ্ছে ইহুদী ও নাছারা সম্প্রদায়। কিন্তু প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
وعد الله الذين امنوا منكم وعملوا الصلحت ليستخلفنهم فى الارض كما استخلف الذين من قبلهم وليمكنن لهم دينهم الذى ارتضى لهم وليبدلنهم من بعد خوفهم امنا يعبدوننى لايشركون بى شيأ ومن كفر بعد ذلك فاولئك هم الفسقون واقيموا الصلوة واتوا الزكوة واطيعوا الرسول لعلكم ترحمون لاتحسبن الذين كفروا معجزين فى الارض وماوهم النار ولبئس المصير.
অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক ওয়াদা দিয়েছেন যে, তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছেন এবং আমলে ছলেহ করেছেন, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে খিলাফত (শাসন কর্তৃত্ব) দান করবেন। যেমন তিনি তাদের পূর্ববর্তীদেরকে খিলাফত দিয়েছিলেন এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের জন্য তাদের দ্বীনকে, যে দ্বীন তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং নিশ্চয়ই তিনি তাদের ভয়ভীতির পরিবর্তে আসান (নিরাপত্তা) দান করবেন এ শর্তে যে, তারা আমার ইবাদত-বন্দেগী করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর এর পর যারা অস্বীকার করবে, তারাই ফাসিক। তোমরা নামায কায়েম কর এবং যাকাত আদায় কর এবং রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্যতা প্রকাশ কর। তাহলে অবশ্যই তোমরা (পূর্ণ) রহ্মত প্রাপ্ত হবে। তোমরা কাফিরদের সম্পর্কে এটা ধারণা করোনা যে, তারা যমীনে পরাক্রমশীল, তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম, আর নিশ্চয়ই তাদের প্রত্যাবর্তন স্থল অত্যন্ত নিকৃষ্ট।” (সূরা নূর/ ৫৫-৫৭)
উপরোক্ত আয়াত শরীফে আল্লাহ্ পাক ওয়াদা দিয়েছেন, যারা খালিছভাবে ঈমান আনবে এবং খালিছ আমলে ছলেহ্ করবে, তাদেরকে খিলাফত দান করবেন। যেমন পূর্ববর্তীগণকে দান করেছেন। আর শুধু তাই নয়, সাথে সাথে দ্বীনী মজবুতী দান করবেন, ভয়ভীতি দূর করে নিরাপত্তা দান করবেন। আর এ খিলাফত কায়েম থাকবে আল্লাহ্ পাক-এর ইবাদত-বন্দেগীতে দায়েম-কায়েম থাকলে এবং কোন বিষয়ে আল্লাহ্ পাক-এর সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না। আর বিশেষ করে শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহ্ পাক-এর প্রদত্ত আইনের সাথে অন্য কারো প্রণীত আইন-কানুন, নিয়ম-নীতি যেমন, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, মাওবাদ, লেলিনবাদ, মার্কসবাদ, ইহুদী, নাছারা, হিন্দু, বৌদ্ধ, মুশরিক ও মজূসী ইত্যাদি মতবাদ মিশ্রিত করে শরীক করা যাবে না। করলে সে গোমরাহ্ হয়ে যাবে।
কাজেই প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত নামায কায়েম, যাকাত আদায় এবং আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের ইত্তেবার দ্বারা খিলাফত কায়েমের কোশেশের মাধ্যমে রহ্মত হাছিল করা।
আর এটা যেন কোন মুসলমানই কখনো ঘুণাক্ষরেও চিন্তা না করে যে, কাফির, ফাসিক, জালিমরা পৃথিবীতে প্রতাপশালী, ক্ষমতাশালী, আধিপত্য বিস্তারকারী হয়ে গেছে, তাই তাদের নিয়ম-নীতি, তর্জ-তরীকা ব্যতীত খিলাফত কায়েম করা সম্ভব নয়- অবশ্যই সম্ভব। কারণ তারা আল্লাহ্ পাক-এর নিকট মনোনীত, পছন্দনীয়, প্রিয় নয়। তাই তাদের অবস্থানস্থল করা হয়েছে জাহান্নাম।
এ আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
عن عبد الله بن عمر رضى اله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من تشبه بقوم فهو منهم.
অর্থঃ- “হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের দলভুক্ত এবং তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে।” (মুসনদে আহমদ, সুনানে আবূ দাউদ)
বনী ইসরাঈল আমলের একটি ওয়াকেয়া তাফসীরে উল্লেখ করা হয়। আল্লাহ্ পাক হযরত ইউশা বিন নুন আলাইহিস সালাম-এর উপর ওহী নাযিল করলেন, “হে আমার নবী! আপনার উম্মতের মধ্যে ১ লক্ষ লোককে ধ্বংস করে দেয়া হবে, যার মধ্যে ৬০ হাজার লোক সরাসরি গুণাহে লিপ্ত (গোমরাহ)। তখন হযরত ইউশা বিন নুন আলাইহিস্ সালাম বললেন, “আয় আল্লাহ্ পাক! ৬০ হাজার লোক সরাসরি গুণাহে লিপ্ত তাই তাদের ধ্বংস করে দেয়া হবে কিন্তু বাকী ৪০ হাজার লোককে ধ্বংস করা হবে কেন?” তখন আল্লাহ্ পাক বললেন, “যেহেতু তারা তাদের সাথে মিলা-মিশা ও ওঠা-বসা করে এবং সম্পর্ক রাখে আর গুণাহের কাজে বাধা দেয় না, তাই তাদেরকেসহ ধ্বংস করে দেয়া হবে।”
উপরোক্ত আয়াত শরীফ, হাদীস শরীফ এবং তার ব্যাখ্যার দ্বারা এটাই ছাবেত হলো যে, বিজাতীয় বিধর্মীদের কোন নিয়ম-নীতি, আমল-আখলাক ও সীরত-ছূরত কোনটাই অনুসরণ-অনুকরণ ও আমল করা যাবেনা। যদি কেউ করে তাহলে সে ইহ্কালে ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং পরকালেও তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে, যাদেরকে সে অনুসরণ করবে।
কাজেই সকল মুসলমানের জন্য ইহুদী ও নাছারাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের অনুসরণে তাদের প্রবর্তিত গণতন্ত্র ও নির্বাচন ইসলামের নামে করা সম্পূর্ণরূপে নাজায়েয ও হারাম।
আর যদি কেউ বিশ্বাস করে যে, কাফির, মুশরিক, বেদ্বীনদের তর্জ-তরীকা, নিয়ম-নীতি অনুযায়ী কোশেশ করেই খিলাফত কায়েম করতে হবে অন্যথায় কায়েম করা সম্ভব নয়; তাহলে সে কাট্টা কাফির হবে।
কুরআন-সুন্নাহ্র এত কঠোর নিষেধ থাকার পরও উক্ত ব্যক্তি চতুষ্ঠয় আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ অমান্য করে ইসলামের নামে ইহুদী ও নাছারাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের অনুসরণে তাদের প্রবর্তিত গণতন্ত্র ও নির্বাচন করে। তারা যদি কুরআন-সুন্নাহসম্মত মনে করে গণতন্ত্র ও নির্বাচন করে তাহলে তাদের ঈমান চলে গেছে। আর যদি কুরআন-সুন্নাহ্র খিলাফ জেনে গণতন্ত্র ও নির্বাচন করে তাহলে তারা চরম ফাসিক। আলিম হয়ে যারা ফাসিকী কাজ করে তারাই উলামায়ে “ছূ”র অন্তর্ভূক্ত। আর যারা উলামায়ে “ছূ” তাদের দোষত্রুটি বর্ণনা করা এবং তাদেরকে মন্দ নামে ডাকা শরীয়তে নিষিদ্ধ নয়; বরং সিদ্ধ রয়েছে। যা নেকীর কারণও বটে।
তারা কুরআন-সুন্নাহ্র আইন বাদ দিয়ে ইহুদী, নাছারাদের প্রবর্তিত ব্লাসফেমী আইন চেয়ে থাকে
ব্লাসফেমীঃ ব্লাসফেমী শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে গ্রীক বা খধঃরহ ইষধংঢ়যবসরধ হতে। ব্লাসফেমী শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো- অশালীন ভাষায় ইশ্বর নিন্দা, ধর্ম নিন্দা বা কোন পবিত্র জিনিসের নিন্দা, কোন অশুভ কথা, নিন্দাবাচক শব্দ, অধর্মীয় বক্তব্য ইত্যাদি। প্রচলিত অর্থে ব্লাসফেমী আইনটি খৃষ্টানদের ধর্মীয় বিধির সাথে যুক্ত।
ব্লাসফেমী বলতে বুঝায়- খৃষ্ট ধর্ম, বাইবেল ও ইশ্বর-এর প্রতি দোষারোপ করা। ব্লাসফেমী হিসেবে ইহুদীদেরও ধর্ম রক্ষার আইনের প্রচলন ছিল। এ আইনে ধর্মদ্রোহীতার বা ধর্মবিরোধীতার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিভিন্ন প্রকার শাস্তিসহ, এমনকি মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত দেয়া হতো। তবে খ্রীষ্ট সমাজেই এর অধিক ব্যবহার, চর্চা ও প্রয়োগ দেখা যায়। আবার ঐতিহাসিকদের মতে- অনেক খ্রীষ্টান শাসক তাদের ব্যক্তি তথা রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যও, এ আইনকে ব্যবহার করতো। সম্রাট ফেডারিক (২য়) সহ অনেকের ক্ষেত্রে এর দৃষ্টান্ত রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, খ্রীষ্টান ও ইহুদী উভয় সম্প্রদায়ই ব্লাসফেমী প্রয়োগে একমত হলেও, এর ব্যবহারবিধি সম্পর্কে তাদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়।
ঐতিহাসিক বিবরণ মতে এ আইনের প্রথম ব্যবহার দেখা যায়- ইহুদী সম্প্রদায়ের মাঝে। খৃষ্ট মতে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম-এর আবির্ভাব ঘটে ৫০০০ বছর পূর্বে এবং তাঁর পরবর্তীতে এ আইনের প্রচলন হয়। তবে রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে এ আইন সর্বপ্রথম রোমে স্বীকৃত হয় এবং তার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ডও কার্যকর করা হয়।
ব্লাসফেমী আইন চাওয়া শরীয়তে
নাজায়েয ও হারাম :
আল্লাহ্ পাক বলেন,
افحكم الجاهلية يبغون ومن احسن من الله حكما لقوم يوقنون.
অর্থঃ- “তারা কি জাহিলিয়াতের নিয়ম-কানুন তালাশ করে বা চায়। অথচ আল্লাহ্ পাক থেকে কে উত্তম হুকুম দাতা ঈমানদারদের জন্য।” (সূরা মায়িদা/৫০)
আর আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
تركت فيكم امرين لن تضلوا ما تمسكتم بهما كتاب الله وسنتى.
অর্থঃ- “আমি তোমাদের মাঝে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি। তোমরা সে দু’টিকে আঁকড়ে থাকলে কখনোই গোমরাহ্ হবেনা। একটি হচ্ছে আল্লাহ্ পাক-এর কিতাব, দ্বিতীয়টি হচ্ছে আমার সুন্নত।” (বুখারী শরীফ)
উপরোক্ত আয়াত শরীফে আল্লাহ্ পাক নিজে বলেছেন যে, “তোমরা জাহিলিয়াতের আইন-কানুন গ্রহণ করোনা। কেননা, আল্লাহ্ পাক নিজেই উত্তম আইনদাতা।”
আর আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমরা কখনো কুরআন-সুন্নাহ্ ছেড়ে বেদ্বীনি, বদ্ দ্বীনি আইন-কানুন গ্রহণ করোনা। করলে নিশ্চিত গোমরাহ্ হয়ে যাবে। কাজেই মু’মিনদের উচিত হবে তারা যেন আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তরফ থেকে দেয়া আইনই গ্রহণ করে এবং তা বাস্তবায়ন করে।
ব্লাসফেমী আইনকে শরীয়তসম্মত মনে করে গ্রহণ করলে কাট্টা কাফির হয়ে চির জাহান্নামী হবে। আর যদি ব্লাসফেমী আইনকে হারাম মনে করেও গ্রহণ করে তাহলে চরম ফাসিকের অন্তর্ভূক্ত হবে।
উক্ত ব্যক্তি চতুষ্ঠয় ও তাদের সমগোত্রীয়রা আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত্ব আইনকে অমান্য করে তা গ্রহণ না করে খৃষ্টান-ইহুদীদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের অনুসরণে তাদের দ্বারা তৈরী ব্লাসফেমী আইনকে বাস্তবায়িত করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।
কুরআন-সুন্নাহ্র এত কঠোর নিষেধ থাকার পরও উক্ত ব্যক্তি চতুষ্ঠয় আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ অমান্য করে ইহুদী ও নাছারাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের প্রবর্তিত ব্লাসফেমী আইন চেয়ে থাকে। তারা যদি ব্লাসফেমী আইনকে শরীয়তসম্মত মনে করে চেয়ে থাকে তাহলে তাদের ঈমান চলে গেছে। আর যদি শরীয়তের খিলাফ মনে করে চেয়ে থাকে তাহলে তারা চরম ফাসিক। আলিম হয়ে যারা ফাসিকী কাজ করে তারাই উলামায়ে “ছূ”র অন্তর্ভূক্ত। আর যারা উলামায়ে “ছূ” তাদের দোষত্রুটি বর্ণনা করা এবং তাদেরকে মন্দ নামে ডাকা শরীয়তে নিষিদ্ধ নয়; বরং সিদ্ধ রয়েছে। যা নেকীর কারণও বটে।
তারা হিন্দু ও খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের অনুসরণে কুশপুত্তলিকা দাহ্ করে :
কুশপুত্তলিকা : কুশপুত্তলিকা একটি সর্বজনস্বীকৃত হিন্দু ঐতিহ্য যা অন্যান্য দেশে প্রচলন লাভ করে। বিশেষ করে প্রাচীনকালে হিন্দুরা মনে করত যে, তাদের মৃত ব্যক্তির শবদেহ দাহ না করলে শ্রাদ্ধাদি কার্য হতে পারে না। নিখোঁজ মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে তারা যখন শবদেহ পেত না তখন তারা কুশের বা অন্য কিছুর দ্বারা মানবমূর্তি নির্মাণ করত- যাকে কুশপুত্তলিকা বলা হয়। আর এ কুশপুত্তলিকা নির্মাণ করে দাহ করা হলে তাকে কুশপুত্তলিকা দাহ বলা হয়। ঐতিহাসিকগণ বলেছেন যে, প্রায় ৩০০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে হিন্দুদের মধ্যে এ কুশপুত্তলিকার প্রচলন চালু হয়।
১৫৩৯ সালে ফ্রান্সের জনগণ ভারতীয় হিন্দু কুশপুত্তলিকা সংস্কৃতির বিপরীত ভাবার্থে ঘৃণা ও তিক্ততা প্রকাশের কৌশল হিসেবে কুশপুত্তলিকা সংস্কৃতির প্রচলন করে।
ফ্রান্সের জনগণ কোন ব্যক্তিকে তার প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ বা অসন্তোষ প্রকাশের জন্য তার অবিকল প্রতীক বা প্রতিমূর্তি পোড়ানো বা ফাঁসীতে ঝুলানো হতো। তারা একথা বিশ্বাস করতো যে, একটি প্রতিমূর্তির উপর শাস্তিমূলক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তা প্রকৃত ব্যক্তির উপর যাদুক্রিয়া করবে। তারা যখন প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে পেত না তখন তারা প্রতিমূর্তিকে ফাঁসী দেবার ব্যবস্থা করত। কুশপুত্তলিকাও নির্মাণ করা এবং দাহ করা উভয়ই বিধর্মী ও বিজাতীয়দের প্রবর্তিত পদ্ধতি। আর কুশপুত্তলিকা তৈরী করা প্রকৃতপক্ষে মূর্তি নির্মাণ করারই নামান্তর।
কুশপুত্তলিকা দাহ্ করা শরীয়তে নাজায়েয ও হারামঃ
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
فاجتنبوا الرجس من الاوثان.
অর্থঃ- “তোমরা মূর্তির অপবিত্রতা হতে বিরত থাক।” (সূরা হজ্ব/৩০)
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, স্বয়ং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
بعثت لكسر المزامير والاصنام.
অর্থঃ- “বাদ্যযন্ত্র ও মূর্তি ধ্বংস করার জন্য আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে।”
অন্য হাদীস শরীফে তিনি ইরশাদ করেন,
ان الله بعثنى رحمة للعلمين وهدى للعلمين وامرنى ربى عزوجل بمحق المعازف والمزامير والاوثان والصليب وامر الجاهلية.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক আমাকে প্রেরণ করেছেন সমস্ত জাহানের জন্য রহমতস্বরূপ এবং হিদায়েতস্বরূপ। আর আদেশ করেছেন বাদ্যযন্ত্র, মূর্তি, ত্রুশ ও জাহিলী কাজসমূহ ধ্বংস করার জন্য।” (আবু দাউদ, আহ্মদ)
আল্লাহ্ পাক স্বয়ং মূর্তি পুজা ও মূর্তি তৈরী করতে নিষেধ করেছেন। আর আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি নিজেই বলেছেন, আল্লাহ্ পাক তাঁকে মূর্তি ধ্বংস করার জন্য পাঠিয়েছেন। অর্থাৎ ঈমানদারগণ যেন মূর্তি তৈরী করা ও মূর্তি পুজা করা থেকে দৃঢ়তার সহিত বিরত থাকে।
উক্ত ব্যক্তি চতুষ্ঠয় ও তাদের সমগোষ্ঠীরা আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিষেধ থাকার পরও হিন্দু ও খৃষ্টান সম্প্রদায়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের অনুসরণে কুশপুত্তলিকা তৈরী করে দাহ্ করেছে। যদি কোন মুসলমান কুশপুত্তলিকা জায়েয মনে করে তাহলে সে কাট্টা কাফির হয়ে চির জাহান্নামী হবে। আর যদি কেউ হারাম জেনে করে তাহলে সে চরম ফাসিক হিসেবে সাব্যস্ত হবে। আলিম হয়ে যারা ফাসিকী কাজ করে তারাই উলামায়ে “ছূ”র অন্তর্ভূক্ত। আর যারা উলামায়ে “ছূ” তাদের দোষত্রুটি বর্ণনা করা এবং তাদেরকে মন্দ নামে ডাকা শরীয়তে নিষিদ্ধ নয়; বরং সিদ্ধ রয়েছে। যা নেকীর কারণও বটে।
পরিশিষ্ট : উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতিভাত হলো যে, উপরোল্লিখিত প্রত্যেকটি বিষয় ইহুদী-নাছারা, হিন্দু-মুশরিক ও নাস্তিকদের দ্বারা উদ্ভাবিত ও প্রবর্তিত। যা অনুসরণ, অনুকরণ ও আমল করা আল্লাহ্ পাক এবং তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পূর্ণভাবে হারাম করেছেন। যা সমগ্র কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষভাবে সূরা ফাতিহাতে বলা হয়েছে, “তোমরা দোয়া কর।” যা আমরা দোয়া করে থাকি নামাযের প্রত্যেক রাকয়াতে রাকয়াতে-
اهدنا الصراط المستقيم.
অর্থঃ- “(আল্লাহ্ পাক) আমাদের সরলপথ প্রদর্শন করুন।”
কোন সরল পথ? বলা হয়েছে-
صراط الذين انعمت عليهم.
অর্থঃ- “যাদেরকে নিয়ামত দেয়া হয়েছে তাঁদের পথ।”
কাদেরকে নিয়ামত দেয়া হয়েছে? এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক অন্যত্র বলেন,
انعم الله عليهم من النبين والصديقين والشهداء والصلحين وحسن اولئك رفيقا.
অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক নিয়ামত দিয়েছেন যাঁরা নবী, ছিদ্দীক, শহীদ ও ছলেহ্ তাঁদেরকে এবং তাঁরাই উত্তম বন্ধু বা সঙ্গী।” (সূরা নিসা/৬৯)
অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক বান্দাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন তারা যেন নবী, ছিদ্দীক, শহীদ ও ছলেহ্গণের পথ তলব করে এবং তাঁরাই সকলের জন্য উত্তম সঙ্গী বা বন্ধু।
এরপর আল্লাহ্ পাক বলেন, তোমরা বলো-
غير المغضوب عليهم ولا الضالين.
অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক আমাদের তাদের পথ দিবেন না, যারা গযবপ্রাপ্ত ও পথহারা, (ইহুদী-নাছারা) অর্থাৎ বিশেষভাবে ইহুদী-নাছারা আর সাধারণভাবে হিন্দু, বৌদ্ধ, মজুসী (অগ্নি উপাসক), মুশরিক, বেদ্বীন, বদ্ দ্বীন, বিদ্য়াতী, বেশরা, গোমরাহ্ ইত্যাদি সর্বপ্রকার পথহারা গযবপ্রাপ্ত লোকদের পথ আমাদের দান করবেন না।
উল্লেখ্য, উপরোক্ত আয়াত শরীফে আল্লাহ্ পাক শুধু মাত্র নবী, ছিদ্দীক, শহীদ, ছলেহ্গণের পথই তলব করতে বলেছেন এবং তাঁদেরকেই অনুসরণ-অনুকরণ করে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে বলেছেন। আর যারা ইহুদী, নাছারা, হিন্দু, বৌদ্ধ, মজুসী, মুশরিক ইত্যাদি পথহারা ও গযবপ্রাপ্ত তাদের পথ থেকে পানাহ্ তলব করতে বলেছেন। এবং তাদের সঙ্গী না হওয়ার জন্য আদেশ করেছেন।
কুরআন-সুন্নাহ্র এত কঠোর নিষেধ থাকার পরও যদি কেউ আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ অমান্য করে নবী, ছিদ্দীক, শহীদ ও ছলেহ্ গণের আদর্শের খিলাফ ইহুদী, নাছারা, হিন্দু, বৌদ্ধ, মজুসী, কাফির, মুশরিক ইত্যাদি বিভ্রান্ত ও গযবপ্রাপ্তদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাদেরকে অনুসরণ-অনুকরণ করে হরতাল, লংমার্চ, গণতন্ত্র, নির্বাচন, কুশপুত্তলিকা দাহ্ করে এবং মৌলবাদ ও ব্লাসফেমী আইন দাবী করা জায়েয মনে করে তাহলে তার উপর শরীয়তের মাসয়ালা হচ্ছে এই যে, যদি সে এগুলো শরীয়তেরসম্মত মনে করে করে থাকে তাহলে তার ঈমান-আক্বীদা নষ্ট হয়ে যাবে। তার জীবনের সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যাবে। সে কাট্টা কাফির হিসেবে সাব্যস্ত হবে এবং সে চির জাহান্নামী হয়ে যাবে।
আর কোন মুসলমান যদি কুফরী করে তার উপর মুরতাদের হুকুম বর্তায়। মুরতাদের ফায়সালা হচ্ছে- তার স্ত্রী তালাক হবে (যদি বিয়ে করে থাকে) এবং এক্ষেত্রে পুনরায় তওবা না করে, বিয়ে না দোহরানো ব্যতীত তার স্ত্রীর সাথে বসবাস করা বৈধ হবেনা। আর এই অবৈধ অবস্থায় সন্তান হলে সেই সন্তানও অবৈধ হবে। হজ্ব বাতিল হয়ে যাবে (যদি হজ্ব করে থাকে), সমস্ত নেক আমল বরবাদ হয়ে যাবে, তার ওয়ারিশ সত্ব বাতিল হবে। তাকে তিন দিন সময় দেয়া হবে তওবা করার জন্য এবং যদি তওবা করে, তবে ক্ষমা করা হবে। অন্যথায় তার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড। কেননা হাদীস শরীফে রয়েছে, তিন কারণে মৃত্যুদন্ড দেয়া জায়েয। যথা- (ক) ঈমান আনার পর কুফরী করলে অর্থাৎ মুরতাদ হলে। (খ) ঐ যিনাকার বা যিনাকারিনী, যারা বিবাহিত বা বিবাহিতা। (গ) যে অন্যায়ভাবে কাউকে ক্বতল করে, তাকে। (তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাযাহ্, মুসনদে শাফেয়ী, মুসনদে বাজ্জার, মুস্তাদরেকে হাকেম)
আর মুরতাদ মারা যাবার পর যারা জানাযার নামায পড়ে বা পড়ায় বা জানাযার নামাযে সাহায্য-সহযোগীতা করে, তাদের সকলের উপর মুরতাদের হুকুম বর্তাবে এবং এ সকল মুরতাদ মরলে বা নিহত হলে তাদেরকে মুসলমানগণের কবরস্থানে দাফন করা যাবেনা। এমনকি মুসলমানের ন্যায়ও দাফন করা যাবেনা। বরং তাদেরকে কুকুরের ন্যায় একটি গর্তের মধ্যে পুঁতে রাখতে হবে।
কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
ان الذين كفروا وماتوا وهم كفار فلن يقبل من احدهم ملء الارض ذهبا ولو افتدى به اولئك لهم عذاب اليم وما لهم من نصرين.
অর্থঃ- “নিশ্চয়ই যারা কাফির এবং কুফরী অবস্থায় মারা গেছে, তারা যদি যমীন পরিপূর্ণ স্বর্ণ (কুফরীর পরিবর্তে) কাফ্ফারা বাবদ দেয় (আমার থেকে বাঁচার জন্য), তাদের থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবেনা। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি বা আযাব এবং তাদের জন্য কোন সাহায্যকারীও থাকবে না।” (সূরা আলে ইমরান/৯১)
আর যদি কেউ এগুলো কুরআন-সুন্নাহ্র খিলাফ অর্থাৎ হারাম জেনে করে তাহলে সে চরম ফাসিক হবে। আলিম হয়ে যারা ফাসিকী কাজ করে তারাই উলামায়ে “ছূ”র অন্তর্ভূক্ত। আর যারা উলামায়ে “ছূ” তাদের দোষত্রুটি বর্ণনা করা এবং তাদেরকে মন্দ নামে ডাকা শরীয়তে নিষিদ্ধ নয়; বরং সিদ্ধ রয়েছে। যা নেকীর কারণও বটে।
অতএব, শাইখুল হাদীসকে শাইখুল হদস, মুহিউদ্দীনকে মাহিউদ্দীন, আহমদ শফীকে আহমক শফী এবং মুফতী আমিনীকে মুফতী কমিনী ইত্যাদি বলার ব্যাপারে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর বক্তব্যই সঠিক ও দলীলভিত্তিক। আর এর বিপরীত যারা বক্তব্য পেশ করে থাকে তাদের বক্তব্য দলীলবিহীন ও মিথ্যা।
{দলীলসমূহঃ (১) তাফসীরে মাযহারী, (২) রুহুল বয়ান, (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) খাযেন, (৫) বাগবী, (৬) ইবনে কাছীর, (৭) তাবারী, (৮) কুরতুবী, (৯) কবীর, (১০) আহকামুল কুরআন, (১১) যাদুল মাসীর, (১২) ক্বাদিরী, (১৩) আদ্ দুররুল মনছুর, (১৪) আবী সাউদ, (১৫) মাওয়ারিদী, (১৬) আহমদী, (১৭) বায়যাভী, (১৮) শায়েখযাদাহ, (১৯) হাশিয়াতুশ্ শিহাব, (২০) মাওয়াহিবুর রহমান, (২১) হক্কানী, (২২) মাজেদী, (২৩) কাশফুর রহমান, (২৪) ওছমানী, (২৫) খাযায়িনুল ইরফান, (২৬) জিয়াউল কুরআন, (২৭) ক্বাসেমী, (২৮) কামালাইন, (২৯) কাশ্শাফ, (৩০) বুখারী, (৩১) মুসলিম, (৩২) নাসাঈ, (৩৩) তিরমিযী, (৩৪) আবূ দাউদ, (৩৫) দারেমী, (৩৬) ইবনে মাযাহ্, (৩৭) মুসনদে বাজ্জার, (৩৮) মুসনদে শাফেয়ী, (৩৯) মুস্তাদরেকে হাকেম, (৪০) বায়হাক্বী, (৪১) কানযুল উম্মাল, (৪২) মুসনদে আহমদ, (৪৩) মিশকাত, (৪৪) বযলুল মাজহুদ, (৪৫) আউনুল মা’বুদ, (৪৬) ফয়জুল বারী, (৪৭) ইরশাদুস্ সারী, (৪৮) তাইসিরুল বারী, (৪৯) শরহে কিরমানী, (৫০) শরহে নববী, (৫১) ফতহুল মুলহিম, (৫২) আত্ তারগীব ওয়াত তারহীব, (৫৩) জামউয যাওয়ায়েদ, (৫৪) তবারানী, (৫৫) ফেরদাউস, (৫৬) ইলালুল হাদীস, (৫৭) কাশফুল খিফা, (৫৮) উরফুশ শাজী, (৫৯) ফতহুল বারী, (৬০) উমদাতুল ক্বারী, (৬১) মিরকাত, (৬২) আশয়াতুল লুময়াত, (৬৩) লুময়াত, (৬৪) ত্বীবী, (৬৫) তালীক্ব, (৬৬) মুযাহিরে হক্ব, (৬৭) দুররুল মুখতার, (৬৮) খানিয়া, (৬৯) ফতওয়ায়ে কাজীখান, (৭০) বাহরুর রায়েক, (৭১) ফতওয়ায়ে আলমগীরী, (৭২) ফতওয়ায়ে আল বারুরিয়া, (৭৩) জামিউল ফুছুলিন, (৭৪) আল্ বায্যাজিয়া, (৭৫) শামী, (৭৬) মাবসূত, (৭৭) ফতহুল ক্বাদীর, (৭৮) হেদায়া, (৭৯) এনায়া, (৮০) গায়াতুল আওতার, (৮১) কানযুদ দাক্বায়েক্ব, (৮২) শরহে বেকায়া, (৮৩) নেহায়া, (৮৪) আইনুল হেদায়া, (৮৫) আইনী, (৮৬) ফতওয়ায়ে আমীনিয়া, (৮৭) শরহে আকাঈদে নছফী, (৮৮) আকাঈদে হাক্কা, (৮৯) তাক্মীলুল ঈমান, (৯০) আল্ ফিক্বহুল আক্বার, (৯১) ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, (৯২) কিমিয়ায়ে সা’য়াদাত, (৯৩) ঊহপুপষড়ঢ়বধফরধ ইৎরঃধহহরপধ, (৯৪) ঊহপুপষড়ঢ়বধফরধ অসবৎরপধহধ. (৯৫) ড়িৎষফ নড়ড়শ, (৯৬) খবীরপড়হ ঊহপুপষড়ঢ়বধফরধ, (৯৭) গধপসরষষধহ ঊহপুপষড়ঢ়বধফরধ, (৯৮) ঘবি নড়ড়শ ড়ভ শহড়ঃিবফমব, (৯৯) এৎড়ষষরৎ ঊহপুপষড়ঢ়বধফরধ, (১০০) ঋঁহশ ধহফ ডধমহধষষং ঊহপুপষড়ঢ়বধফরধ, (১০১) ডড়ৎফংড়িৎঃয ঊহপুপষড়ঢ়বধফরধ, ইত্যাদি।}
উল্লেখ্য যে, এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ৫, ৬, ৭,৯, ১০, ১২, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯, ২৬, ৩০, ৬২, ৬৩, ৮২, ৮৪, ৯০, ৯৪তম সংখ্যাগুলো পাঠ করুন।}
সাইয়্যিদ মুহম্মদ মোক্তাদুল ইসলাম (মিলন)
রঈসুল মজিলশ- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত
সুবহানী ঘাট, সিলেট।
সুওয়ালঃ রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্র ডিসেম্বর/২০০০ঈঃ সংখ্যায় “তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুনিয়াতুত তালেবীন, রেজভীয়া” কিতাবের বরাত দিয়ে বলেছে, “সহীহ্ মুসলিম শরীফসহ” অনেক নির্ভরযোগ্য কিতাবে নফল নামায বিশেষতঃ ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামাত সহকারে আদায় করা বৈধ….।”
আর আপনারা “মাসিক আল বাইয়্যিনাতে” লিখেছেন, “তারাবীহ, ছলাতুল কুছুফ (সূর্য গ্রহণের নামায), ছলাতুল ইস্তেস্কা (বৃষ্টির নামায) এই তিন প্রকার নামায ব্যতীত যেমন লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতুল বরাত, তাহাজ্জুদ, চাশ্ত, আওয়াবীন ইত্যাদি নফল নামায সমূহ ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্।” কোনটি সঠিক?
আর “বুখারী, মুসলিম শরীফে” কি “ক্বদর ও বরাতের নফল নামায” জামায়াতের সাথে আদায় করার কথা উল্লেখ আছে? দয়া করে জানাবেন।
জাওয়াবঃ রেযাখানী মুখপত্রে তারা “তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, গুনিয়াতুত্ তালেবীন এবং রেজভীয়া” কিতাবের নাম দিয়ে যে বক্তব্য প্রদান করেছে আসলে উক্ত কিতাবসমূহের বক্তব্য সে রকম নয়। বরং তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
উল্লেখ্য, নফল নামায বিশেষতঃ “শবে বরাত, শবে ক্বদরের” নফল নামায আযান ইক্বামত ছাড়া জামায়াত সহকারে আদায় করা যে বৈধ বলেছে, তা আমরা আমাদের “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” এর বিগত সংখ্যাগুলোতে বিস্তারিত ভাবে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে প্রমাণ করেছি যে, তাদের বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল, জিহালতপূর্ণ, জালিয়াতী ও প্রতারণামূলক।
কারণ তারা কিতাবের ইবারত, সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে ইবারত কারচুপি করেছে।
(ধারাবাহিক)
বর্তমান সংখ্যায় রেযাখানীদের দলীলবিহীন
ও মনগড়া বক্তব্য খন্ডন করা হলো-
আমরা নির্ভরযোগ্য বিশ্বখ্যাত, ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে অর্থাৎ দলীলের মাধ্যমে রেযাখানীদের বক্তব্য খন্ডন করে দিয়েছি। কিন্তু আমাদের উক্ত খন্ডনের জবাবে তারা কিছুই লিখতে পারেনি। অপারগ হয়ে রেযাখানীরা পরিশেষে বলেছে, “অবশ্য ফক্বীহগণের মধ্যে যারা এসব গুরুত্বপূর্ণ রাতে (অর্থাৎ শবে বরাত, শবে ক্বদর রাতে) আযানা ও ইক্বামত ছাড়া নফল নামায (অর্থাৎ বিশেষতঃ শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায) জামায়াত সহকারে আদায় করাকে মাকরূহ বলেছেন তা দ্বারা মাকরূহে তাহরীমী ও বিদআতে সাইয়্যিআহ বুঝায় না।”
এর জবাবে বলতে হয় যে, রেযাখানীদের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণই দলীল বিহীন ও মনগড়া। কারণ বিশ্বখ্যাত ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাব সমূহে উল্লেখ আছে, “শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল” নামায জামায়াতের সহিত আদায় করা মাকরূহ।”
আর মাকরূহ বলতে মাকরূহ তাহরীমী। কেননা ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাব সমূহে শুধুমাত্র مكروه (মাকরূহ) শব্দ উল্লেখ থাকলে তা দ্বারা মূলত (مكروه تحريم) মাকরূহ তাহ্রীমীকে বুঝায়।
যেমন, শরহুন নিক্বায়া কিতাবের ২য় খন্ডের ২১৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, كل مكروه تحريما.
অর্থাৎ- “প্রত্যেকটি মাকরূহ হলো মাকরূহ তাহরীমী।”
এ প্রসঙ্গে উছূলের কিতাবে একটি উছূল উল্লেখ আছে যে, المطلق يطلق على الفرد الكامل.
অর্থাৎ কোন বিষয়ের মূলটা বললে তার পূর্ণটা বুঝায়। যেমন ফরয বলতে ফরযে আইন, সুন্নত বলতে সুন্নতে মুয়াক্বাদাহ্, মাকরূহ বলতে মাকরূহ তাহরীমী এবং বিদয়াত বলতে বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহ্কেই বুঝায়।
উপরোক্ত বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাব সমূহে শুধুমাত্র (مكروه) মাকরূহ শব্দ উল্লেখ থাকলে তা দ্বারা মাকরূহ তাহরীমীকে বুঝায়। অনুরূপ ভাবে ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাব সমূহে শুধুমাত্র بدعة (বিদয়াত) শব্দ উল্লেখ থাকলে তাদ্বারা মূলত (بدعة سيئة) বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহকে বুঝায়।
সুতরাং ফিক্বাহ ও ফতওয়ার কিতাব সমূহের ভাষ্য মতে শবে বরাত ও শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াতের সহিত আদায় করা মাকরূহ তাহরীমী ও বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহ।
যেমন, “আশবাহ্ ওয়ান্ নাজায়ের” কিতাবের ১ম খন্ডের ২১৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
واعلم ان النفل بالجماعة على سبيل التداعى مكروه ماعدا التراويح وصلوة الكسوف والا ستسقاء فعلم ان كلا من الرغائب ليلة اول جمعة من رجب وصلوة البرأة وصلاة القدر ليلة السبع والشرين من رمضان بالجماعة بدعة مكروهة.
অর্থঃ- “জেনে রাখ! নিশ্চয় নফল নামায ঘোষণা দিয়ে জামায়াতে পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী। তবে তারাবীহ্, ছলাতুল কুসূফ (সূর্যগ্রহণ) ও ইস্তেস্কার (বৃষ্টির) নামায ব্যতীত। সুতরাং ছলাতুর রাগায়িব (অর্থাৎ রজব মাসের প্রথম জুময়ার রাত্রির নামায), শবে বরাতের রাত্রির নফল নামায এবং শবে ক্বদরের রাত্রির নফল নামায জামায়াতে পড়াও মাকরূহ্ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্।
মৌলভী আমজাদ আলী তার “বাহারে শরীয়ত” কিতাবে শবে বরাত, শবে ক্বদরের নামাযকে নাজায়েয বলে উল্লেখ করেছেন,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থঃ- “রাগায়িবের নামায যা রজবের প্রথম জুমুয়ার রাত্রি ও শা’বানের ১৫ই রাত্রি অর্থাৎ শবে বরাত এবং শবে ক্বদরে জামায়াতের সাথে কিছু লোক নফল নামায আদায় করে থাকে। ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উক্ত নফল নামাযগুলো জামায়াতের সাথে আদায় করাকে নাজায়েয, মাকরূহ তাহরীমী এবং বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্ বলেছেন।
শুধু তাই নয়, শবে বরাত, শবে ক্বদরের নামাযে ইক্তিদা করাও মাকরূহ তাহরীমী। যেমন, “ফতওয়ায়ে বাযযাযিয়াহ” কিতাবে উল্লেখ আছে,
كره الاقتداء فى صلاة الرغائب وصلاة البراءة وليلة القدر.
অর্থাৎ- “লাইলাতুল ক্বদর নামাযে, বরাতের নামাযে এবং রাগায়িবের নামাযে ইক্তিদা করা মাকরূহ তাহরীমী।”
আদদুররুল মুখতার কিতাবে উল্লেখ আছে,
يكره الاقتداء فى صلاة رغائب وبراءة وقدر.
অর্থাৎ- “ক্বদরের নামাযে বরাতের নামাযে এবং রাগায়িবের নামাযে ইক্তিদা করা মাকরূহ তাহরীমী।”
“গায়াতুল আওতার” কিতাবের ১ম খন্ডের ৩২৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
مكروه هى اقتداء كرنا صلوة رغائب مين اور صلوة براءت اور صلوة قدر مين.
অর্থাৎ- “শবে ক্বদরের নামাযে, শবে বরাতের নামাযে এবং রাগায়িবের নামাযে ইক্তিদা করা মাকরূহ তাহরীমী।”
এমনকি রেযাখানীদের “ফতওয়ায়ে রেজভীয়াতেও” উল্লেখ আছে,
উর্দূ কম্পোজ করতে হবে
অর্থাৎ- “তারাবীহ, কুসূফ, (সূর্যগ্রহণের নামায) ইস্তিস্কার (বৃষ্টির) নামায ব্যতীত অন্যান্য নফল নামায সমূহ … ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা সকল ইমাম মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের সর্বসম্মত মতে মাকরূহ তাহরীমী।”
সুতরাং যেখানে শবে বরাত, শবে ক্বদরের নামাযের ইক্তিদা করাই মাকরূহ তাহরীমী সেখানে “শবে বরাত, শবে ক্বদরের নামায” জামায়াতের সহিত আদায় করার প্রশ্নই আসে না।
তাছাড়া “বাহরুর রায়েক, ফতওয়ায়ে আলমগীরী, খুলাছাতুল ফতওয়া, আদদুররুল মুখতার, গায়াতুল আওতার, রদ্দুল মুহতার, শামী, আল কুহেস্তানী, শরহুল মুনিয়া, শরহুন নিক্বায়া, শরহে ইলিয়াস, মিনহাতুল খলিক্ব, ফতওয়ায়ে তাতারখানিয়া, হাশিয়ায়ে তাহতাবী আলা মারাকিউল ফালাহ্, আইনী শরহে হিদায়া, হাশিয়ায়ে শরহে বেকায়া লি চলপী, ফতওয়ায়ে মা’দিয়াহ, ইলমুল ফিক্বাহ,ইত্যাদি কিতাবের ভাষ্য হলো, তারাবীহ, ছলাতুল কুসূফ (সূর্য গ্রহণের নামায) ছলাতুল ইস্তেস্কা (বৃষ্টির নামায) এই তিন প্রকার নামায ব্যতীত অন্য যে কোন নফল নামায হোকনা কেন ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা সকল ইমাম, মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের ঐক্যমতে মাকরূহ তাহরীমী। যেমন,
وان اقتدى اربعة بواحد كره اتفاقا.
অর্থাৎ যদি ইমামের সাথে চারজন মুক্তাদী ইক্তিদা করে নফল নামায জামায়াতের সাথে পড়ে তাহলে সকল ইমাম, মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের সর্বসম্মত মতে মাকরূহ তাহরীমী।
উপরোক্ত দলীল ভিত্তিক আলোচনা থেকে এটাই প্রমাণিত হলো যে, শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহরীমী, বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহ ও নাজায়েয এবং একই সঙ্গে এটাও প্রমাণিত হলো যে, শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামাযে ইক্তিদা করাও মাকরূহ তাহরীমী।
সুতরাং রেযাখানীদের উক্ত বক্তব্য দলীল বিহীন ও মনগড়া বলেই প্রমাণিত হলো। (চলবে)
মুহম্মদ হাসানুল ইসলাম ভূইয়া
সভাপতি- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত
শাহজাহানপুর শাখা, ঢাকা।
সুওয়ালঃ মাসিক মদীনা মে/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যার প্রশ্নোত্তর বিভাগে নিম্নোক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপা হয়-
প্রশ্নঃ জনৈক ব্যক্তি এক আলোচনায় বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার একটি সুন্নতকে মজবুতভাবে ধারণ করবে, তার আমলনামায় একশত শহীদের সাওয়াব প্রদান করা হবে। জানতে চাই যে, এ জাতীয় কথা কি সহীহ হাদীসে আছে?
উত্তরঃ এ বিষয়ে সহীহ হাদীসটি হলো, যখন আমার উম্মতের মধ্যে ফাসাদ সৃষ্টি হবে, (অর্থাৎ বেদআতের প্রচলন ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে এবং মূর্খতা ও অজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়বে) তখন যে ব্যক্তি আমার সুন্নতকে মযবুতভাবে ধারণ করবে। (অর্থাৎ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সকল কাজে আমার আনিত শরীয়তের অনুসরণ করবে) তার জন্য “একশত শহীদের সমপরিমাণ সাওয়াব রয়েছে।” স্মর্তব্য যে, একটি সুন্নতের কথাটি হাদীসের এবারত নয়।
আর হাট হাজারী মাদ্রাসা থেকে মৌলভী আহমদ শফীর সম্পাদনায় প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকার সেপ্টেম্বর/২০০০ ঈসায়ী সংখ্যার জিজ্ঞাসা সমাধান বিভাগে নিম্নোক্ত জিজ্ঞাসা-সমাধান ছাপা হয়-
জিজ্ঞাসাঃ “হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি ফিত্নার যুগে আমার সুন্নাতের উপর আমল করবে তার আমলনামায় একশত শহীদের সাওয়াব দেওয়া হবে। উক্ত হাদীসটি উল্লেখ করে প্রাসঙ্গিকভাবে জনৈক ইমাম সাহেব বলেন, মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় পাঁচটি সুন্নাত এবং প্রবেশ করার সময় পাঁচটি সুন্নত। এই দশটি সুন্নাত যদি কেউ আমল করে, আল্লাহ্ তাকে এক হাজার শহীদের সাওয়াব দান করবেন। প্রশ্ন হচ্ছে, উক্ত হাদীস দ্বারা আলাদা আলাদাভাবে প্রত্যেকটি সুন্নাতকে বোঝানো হয়েছে, নাকি সুন্নাত তরীকাকে বোঝানো হয়েছে?
সমাধানঃ উক্ত হাদীসে সুন্নাতের অর্থ হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরীকা। অর্থ যে ব্যক্তি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরীকার উপর আমল করবে, তাকে একশত শহীদের সাওয়াব দান করা হবে। এটাই উক্ত হাদীসের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা।
এখন আমার সুওয়াল হলো- উক্ত পত্রিকাদ্বয় হাদীস শরীফে উল্লিখিত “সুন্নাতী” শব্দের যে অর্থ করেছে তা সঠিক হয়েছে কি? দয়া করে সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।
জাওয়াবঃ হাদীস শরীফে উল্লিখিত “সুন্নাতী” শব্দের অর্থ সম্পর্কে উক্ত পত্রিকাদ্বয়ের বক্তব্য সঠিক হয়নি বরং ভুল হয়েছে যা সম্পূর্ণই মনগড়া ও দলীলবিহীন। কারণ উক্ত হাদীস শরীফে “সুন্নাতী” বলতে শুধুমাত্র একটি সুন্নতকেই বুঝানো হয়েছে।
আলোচ্য হাদীস শরীফখানা হচ্ছে,
وعن ابى هريرة رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من ثمسك بسنتى عند فساد امتى فله اجر مأة شهيد.
অর্থঃ- “হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার উম্মতের ফিৎনা-ফাসাদের যামানায় যে ব্যক্তি আমার একটি সুন্নতকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরে থাকবে। বিনিময়ে সে একশত শহীদের ছওয়াব পাবে।” (মিশকাত শরীফ)
উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় মাহবুবে সুবহানী, গাউসে সামদানী, ইমামে রব্বানী, ক্বাইয়্যূমে আউয়াল, আফজালুল আউলিয়া, হযরত শায়খ আহমদ ফারুকী সিরহিন্দী মুজাদ্দিদে আল্ফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “মাকতুবাত শরীফে” বলেছেন, “যে ব্যক্তি আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরিত্যাজ্য (লুপ্তপ্রায়) কোন একটি সুন্নতকে মৃত্যু পর্যন্ত আকঁড়ে ধরবে অর্থাৎ আমল করবে বিনিময়ে সে একশত শহীদের সওয়াব পাবে।”
সুতরাং سنتى (সুন্নতী) দ্বারা শুধুমাত্র একটি মাত্র সুন্নতকেই বুঝানো হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, যদি সুন্নত বলতে আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সকল সুন্নতকে ধরে নেয়া হয় তাহলে প্রশ্ন এসে যায় যে, আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসলীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সকল সুন্নত পালন করা কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব হবে কি?
এর জবাব হলো, সকল সুন্নত পালন করা কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাহলে সকল সুন্নত পালন করার বিনিময়ে একশত শহীদের সওয়াব পাওয়া কি করে সম্ভব হতে পারে?
উল্লেখ্য, একটি সুন্নত পালনের বিনিময়ে একশত শহীদের ছওয়াব তখনই পাবে যখন ফিৎনা-ফাসাদের জামানায় সুন্নতটি পালন করা হবে। আর ফিৎনা-ফাসাদের জামানা বলতে আখিরী জামানাকে বুঝানো হয়েছে।
আর আখিরী জামানা সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে সানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “মাকতুবাত শরীফে” বলেছেন যে, “এক হাজার হিজরীর পর হচ্ছে- আখেরী জামানা।” আখেরী জামানায় ফিৎনা-ফাসাদ, ফিস্ক-ফুজুরী, মূর্খতা-অজ্ঞতা, বিদ্য়াত-বেশরা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এমনকি হক্ব-না হক্বের সংমিশ্রণে মানুষের পক্ষে প্রকৃত সুন্নত কোনটি তা জেনে আমল করাই কেবল দুঃসাধ্য হবে তা নয় বরং ফরয পালন করার ক্ষেত্রেও অনেক বাধার সম্মূখীন হবে যা বলার অপেক্ষা রাখেনা। যেমন, উলামায়ে “ছূ”দের আমল যা ফরয-ওয়াজিব, হালাল-হারাম সব একাকার করে দিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে আওয়ামুন্ নাছ ফরয-ওয়াজিব, হালাল-হারাম সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়েছে।
মেছালস্বরূপ বলা যায়, বর্তমান জামানায় উলামায়ে “ছূ”দের বে-পর্দা, বেহায়াপনা ও বেগানা মেয়ে লোকের সাথে বেপরওয়াভাবে প্রকাশ্যে বে-পর্দা হয়ে উঠা-বসা, খাওয়া-দাওয়া, চলা-ফেরা ইত্যাদি করার কারণে আওয়ামুন্ নাছ পর্দা সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়েছে।
অথচ পর্দা করা কুরআন শরীফের আয়াতের দ্বারা ফরয বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
দ্বিতীয়তঃ উলামায়ে “ছূ” বেপরওয়াভাবে প্রকাশ্যে ছবি তোলা, ভি.ডি.ও করা, ছবি দেখা, টেলিভিশন, ভি.সি.আর দেখা ইত্যাদি কারণে আওয়ামুন্ নাছ সন্দিহান হয়ে পড়েছে যে, এটা হালাল অথবা হারাম।
অথচ শত-সহস্র বিশুদ্ধ হাদীস শরীফের দ্বারা প্রমাণিত ছবি তোলা, আকাঁ, রাখা, দেখা ইত্যাদি প্রত্যেকটিই হারাম ও শক্ত কবীরাহ্ গুণাহ্র কারণ।
অনরূপ উলামায়ে “ছূ”দের অন্যান্য আমল যেমন, ইসলামের নামে গণতন্ত্র ও নির্বাচন করা, লংমার্চ করা, হরতাল করা, ব্লাসফেমী আইন তলব করা, কুশপুত্তলিকা দাহ্ করা, মৌলবাদী দাবী করা ইত্যাদি হারাম কাজগুলোকে দায়েমীভাবে বেপরওয়া হয়ে করার কারণে আওয়ামুন্ নাছ ফরয-ওয়াজিব, হারাম-হালালের মধ্যে সন্দিহান হয়ে পড়েছে।
সুতরাং এমন ফিৎনা-ফাসাদের যুগে ফরয পালনই যদি এত কঠিন হয় তাহলে সুন্নত পালন করা কত কঠিন হবে? তাও আবার সমস্ত সুন্নত! তবে কি উক্ত হাদীস শরীফে বর্ণিত সুন্নত পালনের ফযীলত থেকে উম্মত কি মাহরূম থাকবে? না, সুন্নত পালনের ফযীলত থেকে মাহরূম থাকবেনা বরং সুন্নত পালনের ফযীলত অবশ্যই লাভ করবে। তবে ঐ ব্যক্তি লাভ করবে যে, একটিমাত্র সুন্নতকে মৃত্যু পর্যন্ত দায়িমীভাবে আকঁড়িয়ে থাকবে। অর্থাৎ পালন করবে।
উপরোক্ত হাদীস শরীফের এটাই বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা।
অতএব, সুন্নত দ্বারা সকল সুন্নতকে বুঝানো হয়নি বরং আলাদাভাবে প্রত্যেকটি সুন্নতকেই বুঝানো হয়েছে।
সুতরাং মাসিক মদীনার সম্পাদক মাহিউদ্দীন ও হাটহাজারীর আহমক শফী সুন্নাতী শব্দের যে অর্থ করেছে তা সম্পূর্ণই ভুল বলেই প্রমাণিত হলো।
{দলীলসমূহঃ- (১) বায়হাক্বী শরীফ, (২) মিশকাত শরীফ, (৩) আবূ দাউদ শরীফ, (৪) তিরমিযী শরীফ, (৫) আহমদ, (৬) মিরকাত, (৭) আশরাফুত তাওজীহ্, (৮) শরহুত্ ত্বীবী, (৯) আশয়াতুল লুময়াত, (১০) তানজীমুল আশতাত, (১১) তালিকুছ্ ছবীহ্, (১২) মিরআতুল মানাজীহ্, (১৩) মুযাহেরে হক্ব, (১৪) মকতুবাত শরীফ ইত্যাদি}