ক্বারী খন্দকার মুহম্মদ মঈনুদ্দীন
انا اعطينك الكوثر.
অর্থঃ- “(হে হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাওছার দান করেছি।” (সূরা কাওছার/১)
আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ায় আগমণ করেন ১২ই রবিউল আউয়াল। তাঁর আবির্ভাবের এই মাসের প্রথম বার দিনের ঘটনা ঐতিহাসিক ওয়াকিদী বর্ণনা করেন।
* “ওয়াকিদী বর্ণনা করেন, রবিউল আউয়াল মাসের প্রথম রাত যখন সমাগত হল তখন নবীজীর আম্মাজানের অন্তরে সুখ ও আনন্দানুভূতি সৃষ্টি হল।”
* “রবিউল আউয়ালের দ্বিতীয় রাতে তাঁকে বাসনা বাস্তবায়নের সুসংবাদ প্রদান করা হল।”
* “রবিউল আউয়াল মাসের তৃতীয় রাতে হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাকে কেউ একজন জানালেন, “হে আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা! সময় নিকটবর্তী হয়েছে তাঁর আগমণের, যিনি সকলের প্রশংসায় ও কৃতজ্ঞতায় চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবেন।”
* “রবিউল আউয়ালের চতুর্থ রাতে হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা উচ্চ কণ্ঠে ফেরেশতাদের তাসবীহ-তাহলীল শুনতে পেলেন।”
* “পঞ্চম রাতে হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা স্বপ্নে দেখলেন, হযরত ইব্রাহীম খলীল আলাইহিস্ সালামকে। তিনি বলছেন, “আমি আপনাকে সুসংবাদ প্রদর্শন করছি। সেই মহিমান্বিত নবীর আগমণের যিনি নূরের অধিকারী। যিনি উজ্জ্বল প্রভা, কল্যাণ, সম্মান ও প্রশংসার অধিকারী।”
* “ষষ্ঠ রাতে চরম প্রশংসার অধিকারী তাঁর জন্য বিভিন্ন স্থান হতে নূর সমূহ প্রকাশ পেল।”
* “সপ্তম রাতে ফেরেশ্তাগণ হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর গৃহে একত্রিত হতে লাগলেন। এতে তাঁর অন্তরে আনন্দের ধারা বইতে লাগল।”
* “অষ্টম রাতে এক আনন্দবার্তা ঘোষিত হতে লাগল। তাঁর আগমণের সময় ঘনিয়ে এল।”
* “নবম রাতে এক মমতাময়ী কক্তস্বর করুণা ও মমতার আওয়াজ দিল। এতে তাঁর (আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা) সকল দুশ্চিন্তা ও কষ্টক্লেশ দূর হয়ে গেল।”
* “দশম রাতে খাইফ ও মিনা আনন্দিত হল।”
* “একাদশ রাতে আসমান ও যমীনবাসী তাঁর আগমণ বার্তার কথা একে অপরের সাথে আলোচনা করতে লাগল।”
* “আর বারই রবিউল আউয়াল রাতের অবস্থা বর্ণনায় হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বলেন, এটা ছিল চন্দ্রের আলোয় আলোকিত রাত্র। কোন প্রকার অন্ধকার ছিলনা চার পাশে। সে সময়ে আব্দুল মুত্তালিব তাঁর সন্তানাদিদের নিয়ে হারাম শরীফের দিকে গমন করেন। তিনি বাইতুল্লাহ শরীফের ভাঙ্গা দেয়াল মেরামত করতে যান। সে সময় আমার নিকট কোন নারী বা পুরুষ কেহই ছিলনা। আমার নিঃসঙ্গতার জন্য আমি কাঁদছিলাম। হায়! কোন মহিলাই আমার সহযোগীতায় নেই। আমার জন্য কোন একান্ত সাথীও নেই যিনি আমাকে সান্তনা দিবেন। কোন দাসীও নেই যে আমার মনোবল অটুট রাখবে। অতঃপর হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বলেন, আমি তাকালাম বসত বাড়ীর এক কোনায়। সহসাই উহা উম্মোচিত হল এবং চারজন মহিলা বের হয়ে এলেন।”
“উক্ত চারজন মহীষী সুউচ্চ ছিলেন যেন তাঁরা চন্দ্র। তাঁদের চারদিকে আলো আর আলো। আবদে মানাফ বংশের সহিত সাদৃশ্য রাখেন তাঁরা। অতঃপর তাঁদের প্রথম জন এগিয়ে এলেন এবং তিনি বললেন, হে আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা! আপনার মত কে আছে? আপনি যে সাইয়্যিদ, রবিয়া ও মুদার গোত্রের সাইয়্যিদকে গর্ভধারণ করেছেন। অতঃপর তিনি তাঁর ডানদিকে বসলেন। তখন আমি (আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা) তাকে প্রশ্ন করলাম, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি হাওয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা, মানব জাতির মাতা। অতঃপর দ্বিতীয়জন এগিয়ে এলেন। তিনি বললেন, আপনার মত কে আছে? হে আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা! আপনিতোগর্ভে ধারণ করেছেন পুত-পবিত্র জ্ঞান ভান্ডারের রহস্যকে, রতœরাজির সাগরকে, নূরের ঝলককে, সুস্পষ্ট তত্ত্বজ্ঞানীকে। অতঃপর তিনি বামদিকে উপবেশন করলেন। তখন আমি তাকে বললাম, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি সারাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা, হযরত ইব্রাহীম খলীল আলাইহিস সালাম-এর স্ত্রী।”
“অতঃপর তৃতীয়জন এগিয়ে এলেন এবং বললেন, ইয়া আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা! আপনারতো কোন মেছালই হয়না। আপনি যে চির প্রত্যাশার হাবীবে খোদাকে গর্ভধারণ করেছেন যিনি প্রশংসা ও গুণগানের লক্ষ্যস্থল। অতঃপর তিনি আমার পিঠের দিকে বসলেন। আমি বললাম, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি আছিয়া বিনতে মুযাহিম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা (ফিরআউনের স্ত্রী)
এরপর চতুর্থজন এগিয়ে এলেন। তিনি অন্যদের তুলনায় বেশী ভীতি উজ্জ্বলতার অধিকারী ছিলেন। তিনি বললেন, হে আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা! আপনার কোন তুলনা হয়না। আপনি গর্ভে ধারণ করেছেন অকাট্য দলীলের অধিকারী ব্যক্তিত্বকে, যিনি মু’জিযা আয়াত ও দালায়েলের অধিকারী, যিনি যমীন ও আসমান বাসীদের সর্দার। তাঁর উপর আল্লাহ পাকের সর্বোত্তম ছলাত এবং পরিপূর্ণ সালাম। তারপর তিনি আমার নিকটে বসলেন। আর আমাকে বললেন, হে আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা! আপনি আমার উপর হেলান দিন। আমার উপর পূর্ণ আস্থা রাখুন। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম। আপনি কে? তিন বললেন, আমি মরিয়ম বিনতে ইমরান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা। আমরা আপনার ধাত্রী এবং (মুহম্মদ) মুস্তফা ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গ্রহণকারী।”
“হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বলেন, তাঁদের উপস্থিতিতে আমার শংকাভাব দূর হল। আর আমি দেখতে লাগলাম, দীর্ঘ বাহুবিশিষ্ট জনেরা আমার নিকট দলে দলে আসছেন। আমি আমার গৃহের দিকে তাকালাম, এখানে নানান ভাষায় বৈচিত্রপূর্ণ দূর্বোধ্য কথা আমি শুনতে পেলাম। এসব কথা বার্তায় সুরলী ভাষায় কথাগুলো বেশী মনে হচ্ছিল। হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বলেন, আমি সেসময় লক্ষ্য করলাম, দলে দলে ফেরেশ্তাগণ আমার ডানে-বামে উড়ছেন। তখন আল্লাহ পাক হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালামকে আদেশ করলেন, হে জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম! রুহ সমুহকে পবিত্র শরাবের পাত্রের নিকট শ্রেণীবদ্ধ কর। হে রিদওয়ান! জান্নাতের নবোদভিন্না যুবতীগনকে নতুন সাজে সজ্জিত কর আর পবিত্র মেশকের সুগন্ধি ছড়িয়ে দাও। সারা মাখলুকাতের যিনি মহান ব্যক্তিত্ব সেই মুহম্মদুর রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবির্ভাব উপলক্ষ্যে।”
হে জিব্রাইল আলাইহিস্ সালাম! বিছিয়ে দাও নৈকট্য ও মিলনের জায়নামায সেই মহান ব্যক্তিত্বের জন্য যিনি অধিকারী নূরের, উচ্চ মর্যাদার এবং মহা মিলনের। হে জিব্রাইল আলাইহিস সালাম! দোযখের খবরদার ফিরিশতা মালিক আলাইহিস্ সালামকে আদেশ কর যেন সে দোযখের দরজাসমূহ বন্ধ করে। হে জিব্রাইল আলাইহিস সালাম! জান্নাতের তত্ত্বাবধায়ক ফিরিশতা রিদওয়ান আলাইহিস্ সালামকে বল যেন সে জান্নাতের দরওয়াজা সমূহ উম্মুক্ত করে। হে জিব্রাইল আলাইহিস সালাম! রিদওয়ানের পোশাক (অনুরূপ পোশাক) পরিধান কর। হে জিব্রাইল আলাইহিস সালাম! যমিনের বুকে গমন কর সুসজ্জিত, কাছের ও দুরের সকল ফিরিশতা সহকারে। হে জিব্রাইল আলাইহিস সালাম! আসমান-যমীনের চার পাশে ঘোষণা দাও সময় ঘনিয়ে এসেছে। মুহিব ও মাহবুবের মিলনের, তালিব ও মাতলুবের সাক্ষাতের অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর সহিত তাঁর হাবীবে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যে মি’রাজ হবে তার সময় নিকট হল তাঁর আবির্ভাবের মাধ্যমে।”
“অতঃপর হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম হুকুম বর্ণনা করলেন যেমনটি আল্লাহ্ জাল্লাজালালাহু আদেশ করলেন। এক জামাত ফিরিশ্তাকে মক্কার পাহাড়ে দায়িত্ব দিলেন। তাঁরা হারাম শরীফের দিকে নজর রাখলেন। তাদের পাখা সমুহ যেন সুগন্ধিযুক্ত সাদা মেঘের টুকরা। তখন পাখীসমূহ তাসবীহ্ করতে লাগল এবং উম্মুক্ত প্রান্তরে বনের পশুগুলো সহানূভুতির ডাক আশার ডাক দিতে লাগল। এসব কিছুই সেই মহান মালিক জলীল জাব্বার আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আদেশ মোতাবিক হল।”
হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বলেন, অতঃপর আল্লাহ পাক আমার চোখের পর্দা অপসারিত করলেন। আমি দেখতে পেলাম শাম দেশের বসরা নগরীর প্রাসাদ সমূহ। আর আমি দেখলাম তিনটি পতাকা। একটি পতাকা পূর্ব প্রান্তে, আরেকটি পতাকা পশ্চিম প্রান্তে এবং তৃতীয়টি কা’বা শরীফের ছাদে।
“হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বলেন, আমি যখন এ অবস্থায় উপনীত তখন আমি দেখলাম, আমি পাখিদের একটি দলে যে পাখিদের চক্ষুগুলো স্বর্ণাভ, ডানাগুলো বৈচিত্রময় রঙবেরঙের ফুলের মত। সেগুলো আমার কক্ষে প্রবেশ করল। মনিমুক্তার মত। এরপর উক্ত পাখীগুলো আল্লাহ্ পাক এর ছানা-ছিফত করতে লাগল আমার চার পাশে। আমি উত্থিলিত রইলাম এ অবস্থায় ঘন্টার পর ঘন্টা। আর ফিরিশতাগন আমার নিকট দলে দলে আসতে লাগলেন। আর তাদের হাতে ছিল আগরদান-স্বর্ণাভ ও রৌপ্য নির্মিত। আর তারা সুগন্ধি ধুম্র ছড়াচ্ছিল। সেই সাথে তারা উচ্চ কক্তে সম্মানিত রসূলের প্রতি মর্যাদাবান হাবীবের প্রতি ছলাত ও সালাম পাঠ করছিল। তাদের কক্তে সৌজন্যতার ও মহানুভবতার ভাব স্পষ্ট ছিল।”
হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বলেন, চন্দ্র আমার মাথার উপর চলে এল তাবু মাথার উপর থাকার মত। আর তারকারাজি আমার মাথার উপর সুদৃশ্য মোমবাতির ন্যায়। সে অবস্থায় আমার নিকট ছিল দুধের ন্যায় শুভ্র সুগন্ধিময় পাণীয়। যা ছিল চিনি ও মধুর চেয়ে মিষ্ট এবং বরফের চেয়ে বেশি ঠান্ডা। তখন আমার খুব পিপাসা লেগেছিল। আমি উহা গ্রহণ করলাম ও পান করলাম। ইহার চেয়ে অধিক কোন সুপেয় আগে পান করিনি। ইহা থেকে আমাতে প্রকাশ পেল মহিমান্বিত নূরের ছটা। আমি লক্ষ্য করলাম এক সাদা পাখি আমার কক্ষে প্রবেশ করেছে। উহা আপন ডানা মেলে আমার কক্ষ অতিক্রম করে চলে গেল। (আন্ নি’য়মাতুল কুবরা আলাল আলাম)