সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সংখ্যা: ৯৪তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ আলমগীর কবীর

জহুরী মহল্লা, মুহম্মদপুর, ঢাকা।

সুওয়ালঃ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে কোন সময় অথবা যে কোন স্থানে হাযির ও নাযির হতে পারেন কি-না? দয়া করে দলীল-আদিল্লাহ্সহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা হলো, আল্লাহ্ পাক ইল্ম ও কুদরতের দ্বারা হাযির ও নাযির। জাত হিসেবে নন।

          আর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত ক্ষমতায় ছিফত হিসেবে হাযির ও নাযির এবং জাত হিসেবে যে কোন সময়, যে কোন স্থানে স্ব-শরীর বা মেছালী শরীরে হাযির ও নাযির হতে পারেন ও হয়ে থাকেন।

          আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাস্সাম হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাযির ও নাযির  সম্পর্কে বুঝতে হলে, প্রথমেই বুঝতে হবে, আল্লাহ্ পাক-এর হাযির- নাযির হওয়া সম্পর্কে।

আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন, انه بكل شئ محيط.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ্ পাক) সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।” (সূরা হা-মীম সিজদা/৫৪)

          আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,

ان الله على كل شئ قدير.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক সর্ব বিষয়ে সমস্ত কিছুর উপর ক্ষমতাবান।” (সূরা বাক্বারা/২০)

তিনি আরো ইরশাদ করেন, ان الله عليم بذات الصدور.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক অন্তরের অন্তঃস্থলের খবরও জানেন।” (সূরা আলে ইমরান/১১৯)

          আল্লাহ্ পাক জাত হিসেবে হাযির ও নাযির নন। আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন, ليس كمثله شئ.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক-এর মেছাল বা অনুরূপ কোন কিছুই নেই। (সূরা শুরা/১১)

আল্লাহ্ পাককে জাত হিসেবে হাযির ও নাযির জানা কুফরী।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন, الله الصمد.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক সমস্তকিছু থেকে বেনিয়াজ (অমুখাপেক্ষী)” (সূরা ইখলাছ/২)

          আকাঈদের কিতাবে উল্লেখ আছে, “আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ফতওয়া হলো, আল্লাহ্ পাক ইল্ম ও কুদরতের দ্বারা হাযির ও নাযির।”

          এ প্রসঙ্গে তাজুল মুফাস্সিরীন, শাইখুল ওলামা আল্লামা ইবনুল আরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ “আহকামুল কুরআন লিল আরাবী”-এর ১ম জিঃ ৩৫ পৃষ্ঠায় লিখেন,

انه فى كل مكان بعلمه وقدرته.

অর্থাঃ- “নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ্ পাক) তাঁর ইল্ম ও কুদরতের দ্বারা সমস্ত স্থানে রয়েছেন।”

          “তাফসীরে মাওয়াহেবুলর রহমান” -এর ৮ম জিঃ ৩১৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

উর্দু কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “মহান আল্লাহ্ পাককে হাযির-নাযির জানার এটাই অর্থ যে, মহান আল্লাহ্ পাক তাঁর সৃষ্টি জগতের প্রত্যেক সৃষ্টির কার্যসমূহ পূর্ণরূপেই দেখেন এবং তাঁর ইল্ম সর্বত্র বিরাজমান।

আর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাযির ও নাযির হওয়া সম্পর্কে আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ফতওয়া হলো, “তিনি আল্লাহ্ পাক-এর প্রদত্ত্ব ক্ষমতায় ছিফত হিসেবে হাযির-নাযির।”

আল্লাহ্ পাক বলেন, وما ارسلنك الا رحمة للعلمين.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সমস্ত আলমের জন্য রহমত স্বরূপ পাঠিয়েছি। (সূরা আম্বিয়া/১০৭)

তিনি আরো বলেন, ورحمتى وسعت كل شئ.

অর্থঃ- “আর আমার রহমত সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে।” (সূরা আ’রাফ/১৫৬)

          অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত ক্ষমতায় রহমত হিসেবে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাস্সাম হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবকিছুতে বিরাজমান।

হাদীস শরীফে আছে,

اول ما خلق الله نورى وكل شئ من نورى.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আমার নূর থেকেই সমস্ত কায়েনাত সৃষ্টি করেছেন।” অর্থাৎ নূর হিসেবে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বত্র ব্যাপৃত।” (দায়লামী শরীফ)

কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

وكذلك جعلنكم امة وسطا لتكونوا شهداء على الناس ويكون الرسول عليكم شهيدا.

অর্থঃ- “এরূপেই আমি তোমাদেরকে উম্মতে ওয়াসাত (শ্রেষ্ঠ উম্মত) করেছি। যেন তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও, সমস্ত মানুষের জন্য এবং যাতে রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণ সাক্ষ্যদাতা হন, তোমাদের জন্য।” (সূরা বাক্বারা/১৪৩)

          এ আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়, হাশরের ময়দানে যখন সমস্ত নবী আলাইহিমুস্ সালামগণের গুণাহ্গার উম্মতদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, “তোমরা কেন নেক কাজ করনি?” তখন তারা বলবে, দুনিয়াতে আমাদের কাছে কোন আসমানী কিতাবও আসেনি এবং কোন নবী আলাইহিমুস্ সালামও আগমণ করেননি। তখন আল্লাহ্ পাক নবী আলাইহিমুস্ সালামগণকে জিজ্ঞেস করবেন, “আপনারা কি তাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছাননি?” তাঁরা বলবেন, “হ্যাঁ, পৌঁছিয়েছি।” তখন অন্য নবী আলাইহিমুস্ সালাম-এর উম্মতগণ তা অস্বীকার করবে। তখন আল্লাহ্ পাক বলবেন, “হে নবী আলাইহিমুস্ সালাম! আপনাদের সাক্ষী কোথায়?” তখন তাঁরা বলবেন, “উম্মতে মুহম্মদীগণই আমাদের সাক্ষী।” তখন উম্মতে মুহম্মদীগণকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হলে তাঁরা বলবেন, “হ্যাঁ, সমস্ত নবী আলাইহিমুস্ সালামগণই তাঁদের দাওয়াত পৌঁছিয়েছেন এবং দায়িত্ব পালন করেছেন।” একথা শুনে অন্যান্য নবী আলাইহিমুস্ সালামগণের উম্মতগণ বলবে, উম্মতে মুহম্মদী তো আমাদের থেকে অনেক পরে এসেছেন, তাঁরা কিভাবে আমাদের সাক্ষী হয়? তখন আল্লাহ্ পাক উম্মতে মুহম্মদীকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তাঁরা বলবেন, “হ্যাঁ, আমরা তাদের থেকে অনেক পরে এসেছি, তবে আমাদের নিকট এসেছিলেন- সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তিনি আমাদেরকে এ বিষয়ে জানিয়েছেন। আমরা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছি এবং তাঁকে সত্য বলে জেনেছি, তাই আমাদের সাক্ষ্য সত্য।” অতঃপর আল্লাহ্ পাক হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করবেন এবং  তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, উম্মতে মুহম্মদীকে সমর্থন করে সাক্ষী দেবেন, “হ্যাঁ, তারা যা বলেছে, সবই সত্য এবং আমিই তাদেরকে এ তথ্য জানিয়েছি, যা আমি আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে জেনেছি।” (ছিহাহ সিত্তাহ্ ও সমূহ তাফসীর)

          হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে,

انما انا قاسم والله يعطى.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক দান করেন। নিশ্চয়ই আমি বন্টনকারী।” (মিশকাত শরীফ)

“মুসলিম শরীফে” বর্ণিত রয়েছে, اعطيت بجوامع الكلم.

অর্থঃ- “আমাকে সৃষ্টির শুরু হতে শেষ পর্যন্ত ইল্ম দান করা হয়েছে।”

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

 كان رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا دخل المسجد صلى على محمد وسلم وقال رب اغفرلى ذنوبى وافتح لى ابواب رحمتك واذا خرج صلى على محمد وسلم وقال رب اغفرلى ذنوبى وافتح لى ابواب فضلك.

অর্থঃ- “রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মসজিদে প্রবেশ করতেন তখন নিজের উপর নিজে ছলাত-সালাম পাঠ করতেন এবং বলতেন, হে আমার রব! আমার উম্মতের গুণাহ্সমূহ ক্ষমা করুন এবং আমার উম্মতের জন্য রহমতের দরজা খুলে দিন। আর যখন মসজিদ হতে বের হতেন তখন নিজের উপর ছলাত-সালাম পাঠ করে বলতেন, হে আমার রব! আমার উম্মতের গুণাহ্সমূহ ক্ষমা করুন এবং আপনার ফযল-করমের দরজা খুলে দিন।” (তিরমীযী শরীফ)

          হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে,

كان رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا دخل المسجد قال بسم الله والسلم على رسول الله اللهم اغفرلى ذنوبى وافتح لى ابواب رحمتك واذا خرج قال بسم الله والسلام على رسول الله اللهم اغفرلى ذنوبى وافتح لى ابواب فضلك.

অর্থঃ- “রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মসজিদে প্রবেশ করতেন তখন বলতেন,

بسم الله والسلام على رسول الله.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ তায়ালার নামে প্রবেশ করছি এবং সালাম(শান্তি) বর্ষিত হোক আল্লাহ্ পাক-এর রসূলের উপর। হে আমার রব! আমার উম্মতের গুণাহ্সমূহ ক্ষমা করুন এবং আমার উম্মতের জন্য রহমতের দরজা খুলে দিন। আর যখন মসজিদ হতে বের হতেন তখন বলতেন আল্লাহ্ তায়ালার নামে বের হচ্ছি এবং সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহ্ পাক-এর রসূলের উপর।” হে আমার রব! আমার উম্মতের গুণাহ্সমূহ ক্ষমা করুন এবং আপনার ফযল-করমের দরজা খুলে দিন।” (ইবনে মাযাহ্) আরো ইরশাদ হয়েছে,

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا دخل احدكم المسجد فليسلم على النبى صلى الله عليه وسلم ثم ليقل اللهم افتح لى ابواب رحمتك فاذا خرج فليقل اللهم انى اسئلك من فضلك.

অর্থঃ- “রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করবে তখন সে যেন নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর সালাম পেশ করে। অতঃপর সে যেন বলে, আয় আল্লাহ্ পাক আমার জন্য আপনার রহমতের দরজা খুলে দিন, আর যখন মসজিদ হতে বের হবে তখন বলবে, আয় আল্লাহ্ পাক! আমি আপনার ফযল-করম কামনা করছি।” (আবূ দাউদ)

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

عن علقمة قال اذا دخلت المسجد اقول السلام عليك ايها النبى ورحمة الله وبركاته.

অর্থঃ- “হযরত আলক্বামা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, যখন আমি মসজিদে প্রবেশ করি তখন আমি বলি, ‘আস্সালামু আলাইকা আইয়্যূহান্                                               নাবিয়্যু ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্। অর্থাৎ হে রসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) আপনার প্রতি সালাম এবং আল্লাহ্ পাক-এর রহমত ও বরকত নাযিল হোক।” (শেফা- ক্বাযী আয়ায)

মিশকাত শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ “মিরকাত শরীফে” আল্লামা হযরত ইমাম মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,

وقال الغزالى سلم عليه اذا دخلت فى المسجد فانه عليه لسلام يحضر فى المسجد.

অর্থঃ- “হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, আপনি যখন মসজিদে প্রবেশ করবেন তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লামকে সশ্রদ্ধ সালাম দিবেন। কারণ তিনি মসজিদসমূহে হাযির আছেন।”

          “আশয়াতুল লুমুয়াত” গ্রন্থের কিতাবুস্ সালাত-এর তাশাহুদ অধ্যায়ে ও ‘মাদারেজুন্ নুবুওওয়াত” গ্রন্থের ১ম খন্ডের ১৩৫ পৃষ্ঠায় হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফাযায়েলের বর্ণনা প্রসঙ্গে হযরত শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন,

 উর্দু কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “কোন কোন আরিফ ব্যক্তি বলেছেন, তাশাহুদে ‘আস্সালামু আলাইকা আইয়্যূহান্ নাবিয়্যূ বলে হুজুর ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করার রীতির এ জন্যই প্রচলন করা হয়েছে যে, ‘হাক্বীক্বতে মুহম্মদীয়া ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মূল সত্ত্বা সৃষ্টিকুলের অনুপরমাণূতে এমনকি সম্ভবপর প্রত্যেক কিছুতেই ব্যাপৃত। সুতরাং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযীগণের সত্ত্বার মধ্যে বিদ্যমান ও হাযির আছেন।  নামাযীর এ বিষয়ে সচেতন হওয়া বা এ বিষয়ের প্রতি অমনোযোগী না হওয়াই বাঞ্ছনীয়, যাতে নামাযী নৈকট্যের নূর লাভে ও মারিফাতের গুপ্ত রহস্যাবলী উন্মোচনে সফলকাম হতে পারে।

আল্লামা শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,

وخوطب عليه السلام كانها اشارة الى انه تعالى يكشف له عن المصلين من امته حتى يكون كالحاضر يشهد لهم بالعقل اعمالهم وليكون تذكر حضوره سببا لمزيد الخشوع والخضوع.

অর্থঃ- “নামাযে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে। এটা যেন এক কথারই ইঙ্গিতবহ যে, আল্লাহ্ পাক তাঁর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মতদের মধ্যে নামাযীদের অবস্থা তাঁর কাছে এমনভাবে উদ্ভাসিত করেছেন যেন তিনি তাদের মধ্যে হাযির বা উপস্থিত থেকেই সবকিছু দেখতে পাচ্ছেন, তাদের আমলসমূহ অনুধাবন করছেন। এ সম্বোধনের আরও একটি কারণ হচ্ছে তাঁর এ হাযির হওয়ার (উপস্থিতির) ধারণা অন্তরে অতিমাত্রায় বিনয় ও নম্রতার সৃষ্টি করে।”

“ফতহুল কবীর” ১ম খন্ডের, ৩৪০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

 ان الله قد رفع لى الدنيا فانا انظر اليها والى ما هو كائن فيها الى يوم القيامة كانما انظر الى كفى هذه الحديث.

অর্থঃ- “হযরত তিবরানী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও হযরত নঈম ইবনে ওমর রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বর্ণিত। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ্ পাক এই পৃথিবীকে আমার চোখের সামনে এরূপভাবে রেখেছেন যে, আমি এ সমগ্র পৃথিবীকে এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত তার মধ্যে যা কিছু সৃজিত হবে তদসমূহকে এমনভাবে দেখি যেন তা সবই আমার হাতের মধ্যে।”

সুপ্রসিদ্ধ “মাজমাউল বরকাত” গ্রন্থে শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন,

وى عليه السلام بر احوال واعمال امت مطلع است بر مقربان وخاصان دركاه خود مفيض وحاضر وناظر است.

অর্থঃ- “হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ উম্মতের যাবতীয় অবস্থা ও আমল সম্পর্কে অবগত এবং তাঁর মহান দরবারে উপস্থিত সকলকেই ফয়েজ প্রদানকারী ও ‘হাযির ও নাযির।”

          হযরত শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর স্বরচিত “মাদারেজুন নবুওওয়াত” গ্রন্থে লিখেছেন,

 উর্দু কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্মরণ করুন, তাঁর প্রতি দরূদ পেশ করুন, তাঁর যিকির করার সময় এমনভাবে অবস্থান করুন যেন তিনি আপনার সামনে জীবিতাবস্থায় উপস্থিত আছেন, আর আপনি তাঁকে দেখছেন। আদব, মর্যাদা ও শ্রদ্ধা অক্ষুন্ন রেখে ভীত ও লজ্জিত থাকুন এবং এ ধারণা পোষণ করবেন যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে দেখছেন, আপনার কথাবার্তা শুনছেন। কেননা তিনি আল্লাহ্ পাক-এর গুণাবলীতে গুণান্বিত। আল্লাহ্ পাক-এর একটি গুণ হচ্ছে, আমি (আল্লাহ্ পাক) আমার স্মরণকারীর সঙ্গে অবস্থান করি।”

          আল্লামা হযরত ইমাম মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি “শরহে শিফা” গ্রন্থে বলেছেন,

لان روح النبى صلى الله عليه وسلم حاضر فى بيوت اهل الاسلام.

অর্থঃ- “কেননা, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র রূহ মুসলমানদের ঘরে ঘরে হাযির আছেন।”

          “সুলূকু আকরাবুছ্ ছুবুল বিত্ তাওয়াজ্জুহে ইলা সাইয়্যিদির রুসূল” গ্রন্থে বর্ণিত রয়েছে,

 উর্দু কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “উলামা-ই-কিরাম উম্মতের মধ্যে বিভিন্ন মতাদর্শ ও বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্য থাকা সত্বেও এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকৃত জীবনেই (কোন রূপ রূপক ও ব্যবহারিক অর্থে যে জীবন তা নয়) স্থায়ীভাবে বিরাজমান ও বহাল তবীয়তে আছেন। তিনি উম্মতের বিশিষ্ট কর্মকান্ড সম্পর্কে জ্ঞাত ও সেগুলোর প্রত্যক্ষদর্শীরূপে বিদ্যমান তথা ‘হাযির-নাযির।’ তিনি হাক্বীক্বত অন্বেষণকারী ও মহান দরবারে নবুওওয়াতের শরাণাপন্নদের ফয়েজদাতা ও মুরুব্বীরূপে বিদ্যমান আছেন।”

          হযরত ইমাম ইবনুল হাজ্জ রহমতুল্লাহি আলাইহি “মাদখাল” গ্রন্থে ও হযরত ইমাম কুসতুলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি “মাওয়াহেব” গ্রন্থের ২য় খন্ডের ৩৮৭ পৃষ্ঠায় ২য় পরিচ্ছদে “জিয়ারতু কবরিহিশ্ শরীফ” শীর্ষক বর্ণনায় লিখেছেন,

وقد قال علمائنا لا فرق بين موته وحيوته عليه السلام فى مشاهة لامته ومعرفته باحوالهم ونياتهم وعزانمهم وخواطرهم وذلك جلى عنده لاخفاء به.

অর্থঃ- “আমাদের সুবিখ্যাত উলামা-ই-কিরাম বলেন যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হায়াত ও ওফাত মুবারকের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তিনি নিজ উম্মতকে দেখেন, তাদের অবস্থা, নিয়ত, ইচ্ছা ও মনের কথা জানেন। এগুলো তাঁর কাছে সম্পূর্ণরূপে সুস্পষ্ট, কোনরূপ অস্পষ্টতা বা পুশিদা থাকেনা।”

হযরত আবূ সাঈদ খাররাজ রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,

فلا يغيب عنه شيئ ولا يخف عليه شيئ.

অর্থঃ- “তাঁর নিকট কোন কিছু অদৃশ ও লুকায়িত থাকনো।” (তাবাকাত)

          উপরোক্ত আয়াত শরীফ, হাদীস শরীফ ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি দ্বারা এটাই ছাবেত হয় যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিফত হিসেবে আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত্ব ক্ষমতায় হাযির ও নাযির।

আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাত হিসেবে আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত্ব  ক্ষমতায় যে কোন সময় এবং যে কোন স্থানে স্ব-শরীরে বা মেছালী শরীরে হাযির-নাযির হয়ে থাকেন।

হযরতুল আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি “এনতেবাহুল আয্কিয়া ফি হায়াতিল আওলিয়া” নামক গ্রন্থের ৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন,

النظر فى اعمال امته والاستغفار لهم من السيئات والدعاء بكشف البلاء عنهم والتردد فى اقطار الارض والبركة فيها وحضور جنازة من صالحى امته فان هذه الامور من اشغاله كما وردت بذلك الحديث والاثار.

অর্থঃ- “উম্মতের বিবিধ কর্ম-কান্ডের প্রতি দৃষ্টি রাখা, তাদের পাপরাশি ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাদেরকে বালা-মুছিবত থেকে রক্ষা করার জন্য দু’আ করা, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে আনাগোনা করা ও বরকত দান করা এবং নিজ উম্মতের কোন নেক বান্দার ওফাত হলে তাঁর জানাযাতে অংশগ্রহণ করা এগুলো হচ্ছে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যস্ততার কাজ। অসংখ্য হাদীস শরীফ থেকেও এসব কথার সমর্থন পাওয়া যায়।”

শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর স্বরচিত “মাদারেজুন নবুওওয়াত” গ্রন্থের ২য় খন্ডের ৪৫০ পৃষ্ঠায় হায়াতে আম্বিয়া শীর্ষক পরিচ্ছদে উল্লেখ করেন,

উর্দু কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “এরপর যদি বলা হয় যে, আল্লাহ্ পাক হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র শরীর মুবারকে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করেছেন ও এমন এক শক্তি দান করেছেন যে, তিনি যেখানে ইচ্ছা করেন সেখানে স্ব-শরীরে বা অনুরূপ কোন শরীর ধারণ করে অনায়াসে গমণ করতে পারেন। কবরের মধ্যে হোক বা আসমানের উপর হোক এ ধরণের কথা সঠিক ও বাস্তবসম্মত। তবে, সর্বাবস্থায় কবরের সাথে বিশেষ সম্পর্ক বজায় থাকে।”

          “তাফসীরে রুহুল বয়ান” কিতাবে সূরা মুলকের শেষে বর্র্ণিত আছে,

قال الامام الغزالى والرسول عليه السلام له الخيار فى طواف العالم مع ارواح الصحابة لقد راه كثير من الاولياء.

অর্থঃ- “হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম-এর রূহসমেত হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জগতে পরিভ্রমণের ইখতিয়ার আছে বিধায় আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম তাকে দেখছেন।”

হযরত আল্লামা সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,

ان اعتقد الناس ان روحه ومثاله فى وقت قرأة المولود وختم رمضا نوقرداءة القصائد يحضرجاز.

অর্থঃ- “যদি কেউ বিশ্বাস পোষণ করে যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র রূহ ও তাঁর “জিস্মে মিছালী” মীলাদ পাঠের সময়, রমজানে খতমে কুরআনের সময় এবং নাতে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠ করার সময় উপস্থিত হন তবে এ বিশ্বাস পোষণ করা অবশ্যই জায়েয।”

হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন,

 ارباب قلوب مشاهده مى كنند دربيدارى انبياء و ملائكة راو همكلام مى شوند بايشان.

অর্থঃ-“খোদায়ী নূরে আলোকিত অন্তর বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ জাগ্রত অবস্থায় হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ফেরেশ্তাগণকে দেখতে পান, তাঁদের সাথে কথাবার্তাও বলেন।”

          হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি “কাসিদায়ে নু’মান” নামক প্রশংসামূলক কাব্যগ্রন্থে বলেছেন,

واذا سمعت فعنك تولاطيا واذا نظرت ولاارى الاك.

অর্থঃ- “হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলছেন, “হে নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! যখনই আমি কিছু শুনি শুধু আপনার প্রশংসাই শুনি আর যখন কোন দিকে তাকাই তখন আপনি ছাড়া আর কিছুই আমার দৃষ্টিগোচর হয়না।”

          হযরত ইমাম আযম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি কুফা নগরে অবস্থানকালীন সময় চতুর্দিকে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখতে পেতেন।

“তাবাকাত” কিতাবের ২য় খন্ডের, ১৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

لى اربعون سنة ماحجبت عن رسول الله صلى الله عليه وسلم لو حجبت طرفة عين ما اعددت نفسى من جملة المسلمين.

অর্থঃ- “হযরত আবুল আব্বাস মারাসী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেছেন, আজ চল্লিশ বৎসরব্যাপী আমি রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর (দর্শন) হতে বঞ্চিত হইনি। যদি এক নিমেষও তাঁর দর্শন হতে বঞ্চিত হতাম তাহলে আমি নিজেকে মুসলমান বলে পরিগণিত করতাম না।”

          মাওলানা আব্দুল হাই রহমতুল্লাহি আলাইহি “তরবিহুল জানান তাশরীহি হুকমি শরবিদ্ দুখান” নামক রিসালায় লিখেছেন, “জনৈক ব্যক্তি নাতে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠ করতো এবং হুক্কাও পান করতো। সে একদিন স্বপ্নে দেখল যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন, “যখন তুমি মীলাদ শরীফ পাঠ কর তখন আমি মাহ্ফিলে উপস্থিত হই। কিন্তু যখনই হুক্কা আনা হয় তখন আমি কালবিলম্ব না করে মাহ্ফিল থেকে ফিরে যাই।”

 উর্দু কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মীলাদ শরীফের মাহ্ফিলে হাযির জানা শর্ত নয় তবে আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত ক্ষমতায় হাযির জানা র্শিক নয়। অন্যথায় র্শিক হবে।” (ফতওয়ায়ে রশীদিয়া/ ১০৩)

          অর্থাৎ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত ক্ষমতায় হাযির জানা জায়েয রয়েছে।

আল্লাহ্ পাক স্বীয় বান্দাদেরকে আল্লাহ্ পাক-এর রঙ-এ রঙীন হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সেজন্য স্বয়ং আল্লাহ্ পাকই তাঁর খাছ খাছ বান্দাদেরকে তাঁর কিছু খাছ বৈশিষ্ট দান করেছেন। যেমন, বান্দা رحيم (দয়ালু), غفور (ক্ষমাশীল), ستار (দোষ গোপনকারী) ইত্যাদি গুণের অধিকারী হয়। অনুরূপ আল্লাহ্ পাক-এর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- আল্লাহ্ পাক হাদীসে কুদসীতে বলেন, انا معه اذا ذكرنى.

অর্থঃ- “বান্দা যখন আমাকে স্মরণ করে আমি তার সাথেই থাকি।”

          আল্লাহ্ পাক তাঁর হাবীব, আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও উক্ত খাছ বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। অর্থাৎ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও সেই ক্ষমতা দান করেছেন যে, তিনি তাঁর ছানা-ছিফত বর্ণনাকারীদের ও ছলাত-সালাম পাঠকারী মজলিসে উপস্থিত হতে পারেন।

          উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হলো যে, দুনিয়াস্থিতঃ অনু-পরমানুর প্রতিও হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সার্বক্ষণিক দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে। আর নামায, তিলাওয়াতে কুরআন শরীফ, ছলাত-সালাম, মাহ্ফিলে মীলাদ শরীফ পাঠ, নাতে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠের মাহ্ফিলে বিশেষ করে নেককারদের নামাযে জানাযায়  এক কথায় যে কোন সময়, সে কোন অবস্থায়, যে কোন স্থানে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ব-শরীরে  বা মেছালী শরীরে তাশরীফ আনয়ন করতে পারেন এবং করেও থাকেন। তবে একথা সর্বসিদ্ধ যে, এটা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এখতিয়ারের মধ্যে। তিনি কারো অধীন নন। তিনি একমাত্র আল্লাহ্ পাক-এর অধীন।

          আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা হলো, আল্লাহ্ পাক ইল্ম ও কুদরতের দ্বারা হাযির ও নাযির। জাত হিসেবে নয়।

          আর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত ক্ষমতায় ছিফত হিসেবে হাযির ও নাযির এবং জাত হিসেবে যে কোন সময়, যে কোন স্থানে স্ব-শরীর বা মেছালী শরীরে হাযির ও নাযির হতে পারেন ও হয়ে থাকেন।

          {দলীলসমূহঃ- (১) আহকামুল কুরআন লিল আরাবী, (২) মাওয়াহিবুর রহমান, (৩) তাফসীরে আযীযী, (৪) রুহুল বয়ান, (৫) কবীর, (৬) খাযেন, (৭) কুস্তালানী শরহে বুখারী, (৮) তিবরানী, (৯) আবূ নঈম, (১০ বায়হাক্বী, (১১) হাকেম, (১২) মিরকাত, (১৩) আশয়াতুল লুময়াত, (১৪) মাদারেজুন নবুওওয়াত, (১৫) শরহে শিফা, (১৬) ফতহুল কবীর,  (১৭) মাওয়াহিব, (১৮) ইহ্ইয়াউ উলুমিদ্দীন, (১৯) মাজমাউল বারাকাত, (২০) এনতেবাহুল আয্কিয়া ফি হায়াতিল আউলিয়া, (২১) সুলূকু আকরাবুছ্ ছুবুল বিত্ তাওয়াজ্জ্ুেহ ইলা সাইয়্যিদির রুসূল,(২২) নাসীমুর রিয়াদ, (২৩) আওয়ারিফুল মা’আরিফ, (২৪) মাদখাল, (২৫) শরহে ফতহুল গায়ব, (২৬) তরবিহুল জানান তাশরীহি হুকমি শরবিদ্ দুখান, (২৭) কাসিদায়ে নু’মান, (২৮) তাবাকাত, (২৯) শামী, (৩০) দুররুল মুখতার, (৩১) হাদিকায়ে নাদিয়া, (৩২) ইনসানে কামিল, (৩৩) মাসালিকুল হুনাফা, (৩৪) শরহে এনায়া, (৩৫) শরহে ফিক্হে আকবর, (৩৬) ইওয়াকীত, (৩৭) শরহে ফুসুসুল হিকাম আফেন্দী, (৩৮) শরহে ছুদূর, (৩৯) তা’রীফু আহ্লিল ইসলাম ওয়াল ঈমান, (৪০) তানবীর, (৪১) শরহে ফুসুস, (৪১) তাওহীদ, (৪৩) জাওয়াহির, (৪৪) মায়ারিফে মুহম্মদী, (৪৫) আত্তাম্বিহাত ফি হাক্বীক্বাতে সাইয়্যেদুস্ সায়াদাত, (৪৬) আন্ নি’মাতুল কুবরা, (৪৭) জাওয়াহিরুল মায়ানী, (৪৮) মাওয়াক্বিফ, (৪৯) হকিকতে মোহাম্মাদী ও মীলাদে আহমদী, (৫০)এমদাদুল মুস্তাক, (৫১) ফতওয়ায়ে রশীদিয়া, (৫২) এমদাদুস্ সুলূক ইত্যাদি।}

মুহম্মদ শরিফুল ইসলাম

রামপুরা, ঢাকা।

সুওয়ালঃ- যারা বলে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাটির তৈরী, তারা দলীল হিসেবে এ হাদীস শরীফ খানা পেশ করে থাকে, হাদীস শরীফ খানা হলো-“হযরত আবু বকর ছিদ্দীক রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং আমি একই মাটি থেকে সৃষ্টি।” আর সে জন্যই তাঁরা তিন জন একই স্থানে দাফন হয়েছেন।

          এখন আমার সুওয়াল হলো- সত্যিই কি উক্ত হাদীস শরীফ দ্বারা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাটির তৈরী প্রমাণিত হয়? এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে আমাদের ঈমান হিফাযতে সহায়তা করবেন।

জাওয়াবঃ- না, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘মাটির তৈরি’ নন। তিনি ‘নূরের তৈরী।’ তাই বলা হয়,  তিনি ‘নূরে মুজাস্সাম।’

          তবে যারা এই হাদীস শরীফের উপর ভিত্তি করে বলে থাকে যে, “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘মাটির তৈরী।” তাদের এ বক্তব্য মোটেও শুদ্ধ নয়। তারা এ হাদীস শরীফের সঠিক ব্যাখ্যা না জানা ও না বুঝার কারণেই এরূপ বক্তব্য পেশ করে থাকে। এই হাদীস শরীফের ছহীহ্ ও আসল ব্যাখ্যা বুঝতে হলে কয়েকটি বিষয় প্রথমে বুঝতে হবে। (ক) সর্বপ্রথম কিসের সৃষ্টি হয়? (খ) হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নূরের তৈরী, (গ) মাটির তৈরী বলতে কি বুঝায়?

সর্ব প্রথম কিসের সৃষ্টি হয়?

এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

اول ما خلق الله نورى ومن نورى خلق كل شيئى.

অর্থঃ- “মহান আল্লাহ্ পাক সর্বপ্রথম আমার নূর মুবারক সৃষ্টি করেন এবং আমার নূর মুবারক থেকেই সবকিছু সৃষ্টি করেন” (মাতালেউল মাসাররাত)

তিনি আরো বলেন,

اول ما خلق الله نورى وكل شئ من نورى.

অর্থঃ- “মহান আল্লাহ্ পাক সর্ব প্রথম আমার ‘নূর’ সৃষ্টি করেন এবং আমার ‘নূর’ থেকেই(মাটিসহ) সব সৃষ্টি করেন।”

          এই হাদীস শরীফকে হযরত আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “মাদারেজুন্ নুবুওয়াত” কিতাবে বিশুদ্ধ বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ মহান আল্লাহ্ পাক সর্বপ্রথম নূরে মুহম্মদী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সৃষ্টি করেন। অতঃপর তা থেকে মাটিসহ সমস্ত কায়েনাত সৃষ্টি করেন।

হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি

 ওয়া সাল্লাম নূরের তৈরী

“মহান আল্লাহ্ পাক-এর সর্বপ্রথম সৃষ্টি হচ্ছেন- সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।”

যেমন, এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-

 عن جابر قال قلت يا رسول الله صلى الله عليه وسلم بابى انت وامى اخبرنى عن اول شيئ خلق الله تعالى قبل الاشياء قال يا جابر ان الله تعالى قد خلق قبل الاشياء نور نبيك من نوره فجعل ذلك النور يدور بالقدرة حيث شاء الله تعالى ولم يكن فى ذلك الوقت لوح ولا قلم ولاجنة ولا نار ولا ملك ولاسماء ولا ارض ولاشمس ولا قمر ولاجنى ولا انسى.

অর্থঃ- “হযরত জাবের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, ইয়া রসুলাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবানী হয়ে যাক, আপনি আমাকে জানিয়ে দিন যে, আল্লাহ্ পাক সর্বপ্রথম কোন জিনিস সৃষ্টি করেছেন তিনি বললেন, ‘হে জাবের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক সব কিছুর পূর্বে তোমার নবীর সম্মানিত ‘নূর মুবারককে’ সৃষ্টি করেছেন তাঁর নূর থেকে। অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর প্রথম সৃষ্টিই হচ্ছে নূরে মুহম্মদী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। অতঃপর সেই ‘নূর মুবারক’ আল্লাহ্ পাক-এর ইচ্ছানুযায়ী কুদরতীভাবে ঘুুরছিল। আর সে সময় লওহো-ক্বলম, বেহেশ্ত-দোযখ, ফেরেশ্তা, আসমান-যমীন, চন্দ্র-সূর্য, মানুষ ও জিন কিছুই ছিলনা।” (মসনদে আব্দুর রাজ্জাক, দালায়েলুন নুবুওওয়াত, আফজালুল ক্বোরা, মুতালেউল মাসাররাত, তারীখুল খামীছ, মাওয়াহেব, শরহে যুরকানী, মাদারেজুন নুবুওওয়া, নূরে মুহম্মদী, ফাতওয়ায়ে হাদীসিয়্যাহ, নশরুততীব)

          এখানে উল্লেখ্য যে হযরত জাবের রদ্বিয়াল্লাহ আনহু হতে বর্ণিত এ হাদীস শরীফের অর্থ উপলদ্ধিতে অনেকেই বিভ্রান্তির স্বীকার হন। বিশেষ করে বর্ণিত হাদীস শরীফে من نوره শব্দাংশের সঠিক মর্ম উদ্ধারে তারা ব্যর্থতার পরিচয় দেন। এ প্রসঙ্গে হযরত জাবের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত মুহাদ্দিস, আশেকে রসূল, আল্লামা যুরকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত ও মশহুর কিতাব “শরহে মাওয়াহেবুল লাদুন্নিয়া”-এর ১ম জিঃ ৪৬ পৃষ্ঠায় লিখেন,

… من نوره اضافة تشريف واشعار بانه خلق عجيب وان له شانا له مناسبة ما الى الحضرة الربوبية على حد قوله تعالى ونفخ فيه من روحه او هى بيانية اى من نور هو ذاته لا بمعنى انها مادة خلق نوره منها بل بمعنى تعلق الارادة به بلا واسطة شئ فى وجوده وهذا اولى من الاحتمال ان المرادمن نور مخلوق له تعالى قبل خلق نور المصطفى لما يلزم عليه من سبق مخلوق على نور المصطفى وهو خلاف المنصوص والمراد ومن تجويز انه معنى عبر عنه بالنور مشابهة اى خلق نور المصطفى من معنى بشبه النور موجودا ازلا لما فيه من اثبات تعدد القدما.

অর্থঃ- “من نوره” -এর তা’বীলী অর্থ বা ব্যাখ্যা হলো- উক্ত শব্দে যে “ইযাফত” (সম্বন্ধ) রয়েছে তা “ইযাফতে তাশরীফী” অর্থাৎ সম্মান বা মর্যাদা প্রকাশার্থেই সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর “নূর মুবারককে” “আল্লাহ্ পাক-এর নূর” বলা হয়েছে এবং এটাই বুঝানো হয়েছে যে, উক্ত “নূর” অর্থাৎ নূরে মুহম্মদী মহান আল্লাহ্ পাক-এর অতি আশ্চর্যজনক এক সৃষ্টি এবং আল্লাহ্ পাক-এর সাথে তাঁর বিশেষ ও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

          যেমন, মহান আল্লাহ্ পাক বলেন, “আল্লাহ্ পাক হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম-এর মধ্যে নিজ রূহ ফুঁকে দিলেন।” এ আয়াত শরীফে সম্মান বা মর্যাদা প্রকাশার্থেই হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম-এর রূহকে আল্লাহ্ পাক-এর রূহ বলা হয়েছে। অথবা উক্ত “ইযাফত” হচ্ছে- “ইযাফতে বয়ানিয়া।” অর্থাৎ “نوره” অর্থ- “আল্লাহ্ পাক-এর জাত” কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ্ পাক-এর জাত রসূলের নূর সৃষ্টির উপাদান বা ধাতু। বরং এ কথার অর্থ হলো¬- “মহান আল্লাহ্ পাক-এর জাত কর্তৃক রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূর তথা “নূরে মুহম্মদী” সৃষ্টি হয়েছে।” অর্থাৎ স্বয়ং আল্লাহ্ পাক নিজেই কোন প্রকার মাধ্যম ছাড়াই নিজ ইরাদা (ইচ্ছা) দ্বারা বিনা উপাদানে সেই ‘নূর’ সৃষ্টি করেন।

          এক্ষেত্রে আরো দু’টি অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে। (১) “নূর” আরেকটি বস্তু যা নূরে মুহম্মদীর পূর্বে আল্লাহ্ পাক সৃষ্টি করেন, আর উক্ত বস্তু হতেই নূরে মুহম্মদীকে সৃষ্টি করা হয়। অথচ এ অর্থ এ হাদীস শরীফ ও অন্যান্য হাদীস শরীফের সম্পূর্ণই বিপরীত। কেননা সকল হাদীস শরীফে স্পষ্টই উল্লেখ আছে যে, “নূরে মুহম্মদীর” পূর্বে অন্য কোন মাখলুক ছিল না। (২) অথবা “নূর” অর্থ নূর সাদৃশ্য এমন একটি গুণ যা আল্লাহ্ পাক-এর ছিফাতে ক্বাদীমার মত অনাদিকাল থেকে বিদ্যমান আর তা দ্বারাই রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর “নূর মুবারক” সৃষ্টি করা হয়েছে। অথচ এ অর্থ গ্রহণ করলে একাধিক ক্বাদীম সাব্যস্ত হয়ে যায়দ্দ যা তাওহীদের সম্পূর্ণই বিপরীত অর্থাৎ র্শিক। তাই শেষোক্ত দু’টি অর্থ গ্রহণ করা কিছুতেই শুদ্ধ নয়।”

          এ প্রসঙ্গে মাওলানা আব্দুল হাই লাখনবী ছাহেব তাঁর “মাজমুয়ায়ে ফতওয়া”-এর ২য় জিঃ ২৬০ পৃষ্ঠায় লিখেন,

السوال: ماقولكم اليها العلماء السادات فى ذات الله عز وجل فهل يكون اصلا وماذة لدات نبينا صلى الله عليه وسلم من نور الله وايضا ذاته صلى الله عليه وسلم هل هو حادث ام قديم بينوا.

الجواب: ان ذات الله قديم وذات نبينا حادث لايكون اصلا ومادة للحادث لان القديم فرد واحد لايتجزى ولا يتبعض فلا ينفصل منه شئ فالذى لايتجزى ولا ينفصل منه شئ لايكون اصلا لشئ كما يفهم من كتب العقائد وقال الزرقانى قى شرح المواهب الدنية فى شرح من نوره اى من نور هو ذاته لابمعنى انها مادة خلق نوره منها بل بمعنى تعلق الارادة به بلا واسطة شئ فى وجوده …… وهذا هو معتقد. جميع اهل الاسلام ومن اعتقد خلافه فهو اما مانف مجاهر او ملحد وزنديق عند اهل الاسلام.

অর্থঃ- “সুওয়াল হলো, ওলামা-ই-কিরামগণের নিকট প্রশ্ন এই যে, মহান আল্লাহ্ পাক-এর জাত সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জাত সৃষ্টির মূল বা উপাদান হতে পারে কিনা? সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম “আল্লাহ্ পাক-এর নূর হতে সৃষ্টি” এ কথার অর্থ কি? আর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জাত মুবারক হাদেছ না ক্বাদীম? বিস্তারিত জবাব দানে বাধিত করবেন।

          জাওয়াব হলো, মহান আল্লাহ্ পাক-এর জাত ক্বাদীম। আর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জাত হচ্ছে হাদেছ। আর ক্বাদীম কখনো হাদেছ সৃষ্টির মূল বা উপাদান হতে পারেনা। কেননা জাতে ক্বাদীম এক ও একক। তিনি খন্ডিত ও বন্টিত হননা। বিভক্ত ও বিভাজ্য হননা। তাঁর জাত হতে কোন কিছু বিচ্ছিন্ন হতে পারেনা। তাই আল্লাহ্ পাক-এর জাত কস্মিনকালেও অন্য কোন বস্তুর উপাদান বা ধাতু হতে পারেনা। এ বিষয়টি আক্বীদার কিতাবসমূহে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে।”

          হযরত জাবের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত হাদীস শরীফের এ অংশ “من نوره” এর ব্যাখ্যায় আল্লামা যুরকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি “শরহে মাওয়াহেবে” লিখেন যে, “من نوره” “মিন  নূরিহী” এ কথার অর্থ হচ্ছে “من ذاته” “মিন জাতিহী” অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর নূর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্ পাক-এর জাত। এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ্ পাক-এর জাত সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূর সৃষ্টির উপাদান বা ধাতু।

          বরং এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ্ পাক-এর জাত কর্তৃক রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নূর সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ মহান আল্লাহ্ পাক স্বয়ং নিজেই কোন প্রকার মাধ্যম ও উপাদান ছাড়াই নিজ ইরাদা দ্বারা “নূরে মুহম্মদী” সৃষ্টি করেন। …. এটাই আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের তথা সকল মুসলমানের আক্বীদা। এর বিপরীত আক্বীদা পোষণকারী সকল মুসলমানের ঐক্যমতে প্রকাশ্য কাফির অথবা মুলহিদ ও যিন্দিক।”

          “মহান আল্লাহ্ পাক-এর জাতে পাক “নূর বা আলো” নয়, বরং মহান আল্লাহ্ পাক “নূর বা আলোর” স্রষ্টা। আর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান আল্লাহ্ পাক-এর জাতের অংশ নন। তাঁকে মহান আল্লাহ্ পাক-এর জাতের অংশ বলে বিশ্বাস করা স্পষ্ট র্শিক ও কূফরী।

যারা মহান আল্লাহ্ পাককে “নূর বা আলো” বলে বিশ্বাস করে, তারা ৭২টি বাতিল ও জাহান্নামী ফিরক্বার অন্যতম “মুশাব্বিহা বা মুনাব্বিরাহ্” ফিরক্বার অন্তর্ভূক্ত।

          অতএব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-মহান আল্লাহ্ পাক-এর “নূর বা জাতের” অংশ একথা যেরূপ ছহীহ্ ও গ্রহণযোগ্য নয় তদ্রুপ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম “নূরের তৈরী নন” বরং মাটির তৈরী এ কথাও ছহীহ্ ও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ ছহীহ্ হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত যে, তাঁর সৃষ্টিই হয়েছে “নূর” হিসেবে।

          অথচ কিছু লোক কুরআন শরীফের কতিপয় আয়াত শরীফ ও দুই একটি হাদীস শরীফের সঠিক ব্যাখ্যা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে বলে বা লিখে থাকে যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম “মাটির তৈরী”, “নূরের তৈরী নন।”

          এক্ষেত্রে তারা যে, “যুক্তি-প্রমাণ” পেশ করে থাকে তা এতই দুর্বল যে, তা দলীল হিসেবে মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম “নূর” এ কথার স্বপক্ষে যে সকল দলীল-প্রমাণাদি রয়েছে তার তুলনায় উক্ত দলীলগুলো নেহায়েতই নগন্য ও পরিত্যাজ্য।

          “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপাদমস্তক “নূর বা নূরে মুজাস্সাম।” এর স্বপক্ষে কুরআন শরীফের আয়াত শরীফ, ছহীহ্ হাদীস শরীফ ও ইমাম-মুজতাহিদগণের ক্বওল দলীল হিসেবে মওজুদ রয়েছেদ্দ যা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নূরে মুজাস্সাম। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রায় সকল বিখ্যাত ও অনুসরণীয় হক্কানী ওলামা-ই-কিরামগণ যেমন- রঈসুল মুহাদ্দিসীন আল্লামা হযরত জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমামুল মুফাস্সিরীন আল্লামা হাফেয ইবনে জাওযী রহমতুল্লাহি আলাইহি, বাহরুল উলূম আল্লামা ইবনে সাবা রহমতুল্লাহি আলাইহি, শায়খুল ওলামা আল্লামা শায়খ ইব্রাহীম বেজোরী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমামুল মুহাদ্দিসীন, আল্লামা মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হাফিজুল হাদীস আওলাদুর রসূল আল্লামা সাইয়্যিদ যুরকানী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ওলীয়ে কামিল আল্লামা হুসাইন ইবনে মুহম্মদ দিয়ারে বিকরী রহমতুল্লাহি আলাইহি, আশেকে রসূল আল্লামা সুলায়মান জামাল রহমতুল্লাহি আলাইহি, ফক্বীহুল উম্মত শায়খ মুহম্মদ তাহের রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমামুল জলীল আল্লামা কাজী আয়ায রহমতুল্লাহি আলাইহি, আলিমুল ফাযিল আল্লামা মুহম্মদ বিন ছিবান রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমামুল আইম্মা আল্লামা আহমদ বিন মুহম্মদ কুস্তলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি, বিখ্যাত বুযুর্গ ইমাম ইবনে হাজার মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি, তাজুল মুফাস্সিরীন আল্লামা মাহমূদ নাসাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি, কাইয়্যূমুয্ যামান হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি, শাইখুল মুহাদ্দিসীন শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ফক্বীহুল আছর আল্লামা শাহ্ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং বিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা শিহাবুদ্দীন খাফফাজী রহমতুল্লাহি আলাইহিসহ আরো অনেকে তাঁদের নিজ নিজ কিতাবসমূহে উল্লেখ করেন যে, “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘নূর’ তথা নূরে মুজাস্সাম।

“মাটির তৈরী বলতে কি বুঝায়?”

          কুরআন শরীফে মাটির তৈরী বলতে একমাত্র হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে বুঝানো হয়েছে। কুরআন শরীফে কোথাও হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মাটির তৈরী বলে উল্লেখ করা হয়নি।

          হযরত জাবের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত হাদীস শরীফেও তাঁর প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

فلما اراد الله تعالى ان يخلق الخلق قسم ذالك النور اربعة اجزاء فخلق من الجزء الاول القلم ومن الثانى اللوح ومن الثالث العرش ثم قسم الرابع اربعة اجزاء دخلق من الاول حملة العرش ومن الثانى الكرسى ومن الثالث باقى الملئكة ثم قسم الرابع اربعة اجزاء مخلق من الاول السموت ومن الثانى الارضين.

অর্থঃ- “….. অতঃপর যখন মহান আল্লাহ্ পাক ‘মাখলুকাত’ সৃষ্টি করার ইচ্ছা পোষণ করলেন তখন সেই ‘নূর’ মুবারক (অর্থাৎ “নূরে মুহম্মদী থেকে একটি অংশ নিয়ে তাঁকে) চার ভাগ করলেন। প্রথম ভাগ দ্বারা ‘কলম’ দ্বিতীয় ভাগ দ্বারা ‘লওহে মাহ্ফুজ’ তৃতীয় ভাগ দ্বারা ‘আরশে মুয়াল্লা’ সৃষ্টি করলেন। চতুর্থ ভাগকে আবার চার ভাগ করেন। প্রথম ভাগ দ্বারা ‘আরশ বহনকারী ফেরেশ্তা, দ্বিতীয় ভাগ দ্বারা ‘কুরসী’ আর তৃতীয় ভাগ দ্বারা অন্যান্য সব ফেরেশ্তাদেরকে সৃষ্টি করেন। অতঃপর এ চতুর্থ ভাগকে আবার চার ভাগ করেন। প্রথম ভাগ দ্বারা ‘আসমান’ আর দ্বিতীয় ভাগ যমীন অর্থাৎ মাটি সৃষ্টি করেন ….।”

          উপরোক্ত ছহীহ্ হাদীস শরীফের বর্ণনা দ্বারা সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হলো যে, মাটি মূলতঃ সমস্ত কায়েনাত অর্থাৎ মাটিসহ সমস্ত কিছু তাঁর নূর থেকে সৃষ্টি। এতে বুঝা যাচ্ছে মাটিও নূরের একটা অংশ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পানির তিনটি ছূরত। (১) পানির সাধারন অবস্থা তরল, (২) পানিকে তাপ দিলে তা বাতাস বা বায়বীয় পদার্থ হয়ে যায়, (৩) পানিকে ঠান্ডা করলে তা বরফ বা শক্ত পদার্থে পরিণত হয়ে যায়।

          এখন যদি উক্ত বায়বীয় পদার্থকে ঠান্ডা করা হয় তাহলে তা পূর্বের মত তরল পদার্থ বা পানিতে পরিণত হবে। একইভাবে যদি বরফকে তাপ দেয়া হয় তাহলে উক্ত বরফ বা শক্ত পদার্থটিও তরল পদার্থে বা পানিতে পরিণত হয়ে যাবে।

          উল্লেখ্য, যেই পানি নূর থেকে সৃষ্টি সেই পানির যদি তিন তিনটি ছূরত হতে পারে তাহলে নূরে মুহম্মদী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা থেকে সবকিছু সৃষ্টি তাঁর কত ছূরত হতে পারে সেটা চিন্তা-ফিকিরের বিষয়। অর্থাৎ মাটি নূরের একটা ছূরত ও তার অংশ।

          প্রসঙ্গত কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে, হ্যাঁ,  হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে,

عن عبد الله بن مسعود رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ما من مولود الا وفى سرته من تربته التى خلق منها حتى يدفن فيها وانا وابو بكر وعمر خلقنا من تربة واحدة وفيها ندفن.

অর্থঃ- “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, প্রত্যেক সন্তানের নাভীতে মাটির একটি অংশ রাখা হয়, যেখানকার মাটি তার নাভীতে রাখা হয়েছিল মৃত্যুর পর সে ঐ স্থানেই সমাধিস্থ হবে। আমি, হযরত আবূ বকর ও হযরত উমর একই মাটি থেকে সৃষ্টি হয়েছি এবং একই স্থানে সমাধিস্থ হবো। (মাযহারী, আল মুত্তাফিক ওয়াল মুফতারিক) এই হাদীস শরীফে মাটি থেকে সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। সুতরাং তার জবাব হবে কি?

          এর ব্যাখ্যায় বলা হয়, মাতৃগর্ভে সন্তানের বয়স যখন চার মাস হয়, তখন নিয়োজিত ফেরেশ্তা উক্ত সন্তানের হায়াত-মউত ও মৃত্যুস্থান সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ পাক-এর নিকট জিজ্ঞাসা করেন, তখন আল্লাহ্ পাক লওহে মাহফুজ দেখে নিতে বলেন। নিয়োজিত ফেরেশ্তা লওহে মাহফুজ দেখে যেখানে তার কবর হবে সেখান থেকে সামান্য মাটি এনে সন্তানের নাভীতে দিয়ে দেন। এটা মূলতঃ প্রতিটি মানুষের “কবরের স্থান” নির্ধারণের জন্যে দেয়া হয়। দেহ সৃষ্টির জন্য নয়।

  নিম্নে এর কতিপয় প্রমাণ পেশ করা হলো।

          যেমন, আল্লামা জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি “শরহুছ্ ছুদুর” নামক কিতাবে উল্লেখ করেন, হাদীস শরীফে রয়েছে,

 اخرج ابو نعيم عن ابى هريرة رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ما من مولود الا وقد ذر عليه من تراب حفرته.

অর্থঃ- “হযরত ইমাম আবূ নঈম রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘এমন কোন সন্তান নেই যার উপর তার কবরের মাটি ছিটিয়ে দেয়া হয়না।”

          আল্লামা শা’রানী রহমতুল্লাহি আলাইহি “তায্কেরায়ে কুরতুবী” কিতাবে উল্লেখ করেন,

روى الديلمى مرفوعا كل مولود ينشر على سرته من تراب حفرته فاذا مات رد الى تربته.

অর্থঃ- “ইমাম দায়লামী হতে মরফু’ হিসেবে বর্ণিত। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, প্রতিটি সন্তানের নাভীর উপর (মাতৃগর্ভে) তার কবরের মাটি ছিটিয়ে দেয়া হয় এবং মৃত্যুর পর তাকে উক্ত মাটিতেই ফিরিয়ে নেয়া হয়।”

হযরত আবূ আব্দুল্লাহ্ মুহম্মদ ইবনে আহ্মদ আল আনছারী আল কুরতুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “তাফসীরে কুরতুবী-এর ৩য় জিঃ, ৩৮৭ পৃষ্ঠায় লিখেন,

عن ابن مسعود ان الملك الموكل بالرحم يأخذ النطفة فيضعها على كفه ثم يقول يارب مخلقة او غير مخلقة؟ فان قال مخلقة قال يارب ما الرزق ما الاثر ما الاجل؟ فيقول انظر فى ام الكتاب فينظر فى اللوح المحفوظ فيجد فيه رزقه وأثره واجله وعمله ويأخذ التراب الذى يدفن فى بقعته ويعجن به نطفته.

অর্থঃ- “হযরত আবূ নঈম হাফিজ মুররা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, নিশ্চয়ই রেহেম অর্থাৎ গর্ভের জন্য নির্ধারিত ফেরেশ্তা (মাতৃগর্ভে) নুত্ফা বা মনিকে নিজ হাতের তালুতে রাখেন। অতঃপর বলেন, হে প্রতিপালক! এই মনি দ্বারা সন্তান সৃষ্টি হবে কি হবেনা?’ যখন আল্লাহ্ পাক বলেন, ‘ইহা দ্বারা সন্তান সৃষ্টি হবে। তখন ফেরেশ্তা বলেন- তার রিযিকের ব্যবস্থা, মৃত্যুর আলামত কি ও মৃত্যু কোথায় হবে? প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ্ পাক বলেন, লওহে মাহ্ফুজে দেখে নাও। ফেরেশ্তা লাওহে মাহ্ফুজ দেখে সেখানে তার রিযিক, মৃত্যুর আলামত, মৃত্যুর স্থান ও আমল সম্পর্কে জেনে নেন। অতঃপর যেখানে তাকে দাফন করা হবে সেখান থেকে একটু মাটি নিয়ে তা নুত্ফা বা মনির সঙ্গে মিশিয়ে দেন।”

          এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় তা হলো, এক হাদীস  শরীফে যদিও বলা হয়েছে যে, কবরের মাটি নাভীমূলে রেখে দেয়া হয়, কিন্তু অন্য হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, নুতফার সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। অর্থাৎ সন্তানের বয়স যখন মাতৃগর্ভে চার মাস হয় তথা সন্তানের দেহ বা আকার-আকৃতি যখন সৃষ্টি হয়ে যায়, তখন রূহ ফুঁকে দেয়ার সময় ফেরেশ্তা তার কবরস্থান থেকে মাটি এনে নাভীমূলে রেখে দেন। এতে বুঝা গেল যে, উক্ত মাটি মূলতঃ দেহ সৃষ্টির জন্যে নয় বরং কবরস্থান নির্ধারণের জন্যে। যদি দেহ সৃষ্টির জন্যই হতো তবে দেহ সৃষ্টির পরে উক্ত মাটি নাভীতে রাখা হলো কেন? উক্ত মাটি রাখার পূর্বেই তো দেহ সৃষ্টি হয়ে গেছে তাই এখন রূহ ফুঁকে দেয়া হবে।     সুতরাং বলার আর অপেক্ষাই রাখেনা যে, কবরের মাটি নাভীমূলে রেখে দেয়া হোক বা নুতফার সাথে মিশিয়ে দেয়া হোক তা দেহ সৃষ্টির জন্য নয় বরং কবরের স্থান নির্ধারণের জন্য।

          এর ব্যাখ্যায় বলা হয়, নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের রওজা শরীফ চিহ্নিত করার জন্য নির্দিষ্ট স্থান থেকে মাটি যা তার হাক্বীক্বী ছূরতে এনে নূর বানিয়ে নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের (নুত্ফার সঙ্গে মিশ্রিত করা হয়না বরং তা) নাভী মুবারকের উপর রাখা হয়। এর মেছালস্বরূপ বলা হয়, হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম এবং হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালাম যারা বিনা নুত্ফাতে কুদরতীভাবে সৃষ্টি হয়েছেন। এছাড়াও হযরত হাওয়া আলাইহাস্ সালামও বিনা নুত্ফায় কুদরতীভাবে সৃষ্টি হয়েছেন।

আর আখিরী রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সৃষ্টি মুবারক তাঁদের চাইতেও অনেক বেশী রহস্যময় ও কুদরতের অন্তর্ভূক্ত।

          এছাড়াও আল্লাহ্ পাক-এর কিছু খাছ বান্দা বা বান্দী রয়েছেন যাদের কবরস্থান চিহ্নিত করার জন্য তাঁদেরও নাভীমূলে মাটি রাখা হয়েছে।

          আর আওয়ামুন্ নাস বা সাধারণ লোকদের কবরস্থান চিহ্নিত করার জন্য তাদের নির্দিষ্ট স্থান থেকে মাটি এনে নুত্ফার সাথে মিশ্রিত করা হয়।

          কাজেই “হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত ওমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং আমি (হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একই স্থানের মাটি দ্বারা সৃষ্টি” এ কথার অর্থ হলো “তাঁদের তিনজনের নাভী মুবারকে একই স্থানের মাটি রাখা হয়েছে, তাই তারা একই স্থানে শায়িত রয়েছেন।”

          শুধু তাই নয়, হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালামও সেই একই স্থানে শায়িত হবেন। তাই রওজা শরীফের পাশে হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালামের জন্যে জায়গা খালি রাখা হয়েছে। আর “মাকতুবাত শরীফে” হযরত মুজাদ্দিদে আলফেছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন,“আমিও রওজা শরীফের মাটি দ্বারা সৃষ্ট। অর্থাৎ আমার নাভী মূলেও রওজা শরীফের মাটি রাখা হয়েছে। তবে তাঁর মাযার শরীফ সেরহিন্দ শরীফে হওয়ার কারণ হলো হযরত নূহ আলাইহিস্ সালাম-এর বন্যার সময় রওজা শরীফের কিছু মাটি সেরহিন্দ শরীফে আসে। তাই তাঁর মাযার শরীফ সেরহিন্দ শরীফেই হয়েছে।

উল্লেখ্য, প্রতিটি সন্তানের কবরের স্থান নির্ধারণের জন্যে যেরূপ তাদের কবরের স্থান থেকে মাটি এনে নাভীতে দিয়ে দেয়া হয় ঠিক; তদ্রুপ আখেরী রসূল, সাইয়্যিদূল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাস্সাম হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর “রওজা শরীফ” নির্ধারণের জন্যেও তাঁর নাভী মুবারকে রওজা শরীফের যে নূরানী ও পবিত্র মাটি মুবারক রাখা হয়েছে প্রকৃতপক্ষে তা বেহেশ্তের পানি দ্বারা ধৌত করে এবং তার হাক্বীক্বী ছূরত অর্থাৎ নূরে পরিণত করে রাখা হয়েছে। তাই হাদীস শরীফেও রওজা শরীফের উক্ত মাটি মুবারককে “নূর” বলা হয়েছে।

যেমন এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

 عن كعب الاحبار قال لما اراد الله تعالى ان يخلق محمدا صلى الله عليه وسلم امر جبريل ان ياتيه بالطينة التى هى قلب الارض وبهائها ونورها قال فهبط جبريل فى ملائكة الفردوس وملائكة الرفيع الاعلى فقبض قبضة رسول الله صلى الله عليه وسلم من موضع فبره الشريف وهى بيضاء منيرة فعجنت بماء التسنيم فى معين انهار الجنة حتى صارت كالدرة البيضاء …..

অর্থঃ- “হযরত কা’ব আহবার রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যখন মহান আল্লাহ্ পাক আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সৃষ্টি করার ইচ্ছা করলেন, তখন হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালামকে (তাঁর নাভী মুবারকে রাখার জন্য) এমন খামীর নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন যা মূলতঃ যমীনের আত্মা, ঔজ্জ্বল্য ও ‘নূর’। এ নির্দেশ পেয়ে হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালাম জান্নাতুল ফিরদাউস ও সর্বোচ্চ আসমানের ফেরেশ্তাদেরকে নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। অতঃপর রওজা শরীফের স্থান থেকে এক মুষ্ঠি স্বচ্ছ নূরানী মাটি নেন। উক্ত মাটিকে বেহেশতের প্রবাহিত ঝরণা সমূহের মধ্যে ‘তাসনীম’ নামক ঝরণার পানি দ্বারা ধৌত করার পর তা একখানা শুভ্র মুক্তার আকার ধারণ করে। অর্থাৎ নূরে পরিণত হয়ে যায়। …”

          অতএব, প্রমাণিত হলো যে, আখেরী রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাভী মুবারকে যে মাটি রাখা হয়েছে তা মাটির ছূরতে রাখা হয়নি।  কারণ তাঁর নূরে মুজাস্সাম শরীর মুবারকে মাটিকে মাটির ছূরতে রাখা সম্ভব নয় বা রাখার কোন অবকাশ নেই। তাই তা পূনরায় তার পূর্বের হাক্বীক্বী ছূরতে পরিবর্তন করে অর্থাৎ মাটিকে নূর বানিয়ে সেই নূরকে নাভী মুবারকে রাখা হয়। সত্যিকার অর্থে তা হলো নূরে মুহম্মদী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরই একটা অংশ যা প্রকৃতপক্ষে “নূর।”

          শুধু তাই নয়, বরং আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জিস্ম বা শরীর মুবারকের সব কিছুই যেমন রক্ত মুবারক, ইস্তিঞ্জা মুবারক, কেশ মুবারক ইত্যাদি সবই ‘নূর’। যার কারণে ফতওয়া দেয়া হয়েছে “দুররুল মুখতার” কিতাবে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সমস্ত কিছু পাক বা পবিত্র। শুধু পাক বা পবিত্রই নয় বরং তা পান করলে বা খেলে যে পান করবে বা খাবে সে জান্নাতী হবে বা তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হবে।

          তাই কবি বলেছেন, “আমরা যা খাই তা মল-মূত্র হয়ে বের হয়ে যায়। আর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা খান তা ‘নূর’ হয়ে যায়।”

          সুতরাং সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাটির তৈরী হওয়ার প্রশ্নই আসেনা। কারণ তাঁর সৃষ্টি, আগমণ ও অবস্থান প্রত্যেকটিই ‘নূর’ হিসেবে। আর মাটিসহ সব কিছুই তাঁর সৃষ্টির পর তাঁরই ‘নূর মুবারক’ থেকে সৃষ্টি হয়েছে।

          অতএব, “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাস্সাম, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত আবু বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একই স্থানের মাটি দ্বারা সৃষ্টি” এর সরাসরি অর্থ গ্রহণ করলে আখিরী রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শান ও মানের খিলাফ হবে যা কুফরীর অন্তর্ভূক্ত। তাই এর ছহীহ্ ও গ্রহণযোগ্য তা’বীল বা ব্যাখ্যা হলো, “রওজা শরীফ-এর স্থান নির্ধারণের জন্যে নাভী মুবারকে যা রাখা হয়েছে। তাই তা পূনরায় তার পূর্বের হাক্বীক্বী ছূরতে পরিবর্তন করে অর্থাৎ মাটিকে নূর বানিয়ে সেই নূরকে নাভী মুবারকে রাখা হয়। সত্যিকার অর্থে তা হলো নূরে মুহম্মদী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরই একটা অংশ যা প্রকৃতপক্ষে “নূর।”

  কারণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মাটির তৈরি বলা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার শামীল। আর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মাটির তৈরি বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা কুফরী। আর যে এ কুফরী করে সে কাট্টা কাফির ও লা’নতের উপযুক্ত।

          যেমন- ইবলিস লা’নতের উপযুক্ত হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে কালামুল্লাহ্ শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

قال ما منعك الا تسجد اذا امرتك قال انا خير منه خلقتنى من نار وخلقته من طين.

অর্থঃ-“আল্লাহ্ পাক বললেন, (হে ইবলিস আমি যখন তোকে হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে সিজদা করতে আদেশ করলাম তখন) কোন জিনিষ তোকে সিজদা করতে নিষেধ করলো। ইবলিস বললো, আমি হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম থেকে উত্তম। কারণ আপনি আমাকে তৈরি করেছেন আগুন থেকে আর হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে তৈরি করেছেন মাটি থেকে।” (সূরা আ’রাফ/১২)

তখন আল্লাহ্ পাক ইবলিসকে বললেন,

فاهبط منها فما يكون لك ان تتكبر فيها فاخرج انك من الصغرين.

অর্থঃ-“তুই এখান থেকে নেমে যা লা’নতের সহিত এখানে তোর অহংকার করার কোন অধিকার নেই। অতএব তুই বের হয়ে যা। নিশ্চয়ই তুই লাঞ্ছিত, অপমানিত ও হীনতমদের অন্তর্ভূক্ত।” (সূরা আ’রাফ/১৩)

          উল্লেখ্য, ইবলিস হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে মাটির তৈরি বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে সিজদা না করায় অর্থাৎ হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে যথাযথ সম্মান না করার কারণে সে আল্লাহ্ পাক-এর রহ্মত থেকে বিতাড়িত হয়ে মালউনের অন্তর্ভূক্ত হয়ে শয়তানে রাজীম হয়েছে।

          অতএব, কেউ যদি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মাটির তৈরি বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে যথাযথ সম্মান না করে তাহলে সেও ইবলিসের মত আল্লাহ্ পাক-এর রহ্মত থেকে বঞ্চিত হয়ে মালউনের অন্তর্ভূক্ত হয়ে শয়তানের কায়েম-মোকাম হবে।

          মূলকথা হলো, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সৃষ্টি, আগমণ, অবস্থান, বিদায় ও বর্তমান অবস্থান সর্বাবস্থায়ই তিনি নূর বা নূরে মুজাস্সাম। এটাই আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা আর এই আক্বীদাই পোষণ করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরয।

          {দলীলসমূহঃ (১) আহ্কামুল কুরআন লি ইবনিল আরাবী, (২) কুরতুবী, (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) মাযহারী, (৫) তাবারী, (৬) কবীর, (৭) বায়যাবী, (৮) শায়খ যাদাহ্, (৯) আবী সাউদ, (১০) মায়ানিউত তানযীল, (১১) মাদারিকুত্ তানযীল, (১২) জালালাইন, (১৩) মুয়ালিমুত্ তান্যীল, (১৪) যাদুল মাসীর,  (১৫) নিশাপুরী, (১৬) রুহুল বয়ান, (১৭) ক্বাদেরী, (১৮) মাওয়ারেদী, (১৯) নাযমুদ্দুরার, (২০) মুদ্বীহুল কুরআন, (২১) দুররুল মানছুর, (২২) দুররুল মাছূন, (২৩) আল জাওয়াহির, (২৪) আত্ তাসহীল, (২৫) ফাতহুল ক্বাদীর, (২৬) হাশিয়াতুশ্ শিহাব, (২৭) মাওয়াহেবুর রহমান, (২৮) হাক্কানী, (২৯) মাজেদী, (৩০) কাশফুর রহমান, (৩১) ওছমানী, (৩২) খাযায়েনুল ইরফান, (৩৩) জিয়াউল কুরআন, (৩৪) ক্বাসেমী,  (৩৫) আলী হাসান, (৩৬) তাহেরী, (৩৭) নূরুল কুরআন, (৩৮) কামালাইন, (৩৯) হাশিয়ায়ে জুমাল, (৪০) মুছান্নেফে আব্দুর রাজ্জাক, (৪১) দালায়েলুন নবুওওয়াত, (৪২) ফেরদাউস্ লি দায়লামী, (৪৩) আবু নাঈম, (৪৪) মুসনদে আহ্মদ, (৪৫) হাকেম, (৪৬) শরহুস্ সুন্নাহ্, (৪৭) মিশকাত, (৪৮) মিরকাত, (৪৯) আশয়াতুল লুময়াত, (৫০) মুযাহেরে হক্ব, (৫১) ফয়জুল ক্বাদীর, (৫২) মাওজুআতুল কবীর,  (৫৩) খাছায়েছুল কুবরা, (৫৪) মাওয়াহেবুল লাদুন্নিয়া, (৫৫) শরহে মাওয়াহেব, (৫৬) সীরতে হালবীয়া, (৫৭) নি’মাতুল কুবরা, (৫৮) বুলুগুল আমানী, (৫৯) ইবলুল আসাকির, (৬০) জাওয়াহিরুল বিহার, (৬১) তাহ্ক্বীকুল মাকাম, (৬২) শরফুল আলম, (৬৩) তাওয়ারিখে মুহম্মদী, (৬৪) উমদাতুন নুকূল, (৬৫) বেদায়া ওয়ান নেহায়া, (৬৬) আনওয়ারে মাহমুদীয়া, (৬৭) নুযহাতুল মাযালিশ, (৬৮) মাদারেজুন নবুওওয়াত, (৬৯) হাদিয়াতুল মাহ্দী, (৭০) আল আনওয়ার ফী মাওলিদিন্ নাবিয়্যীল মুহম্মদ, (৭১) নূরে মুহম্মদী, (৭২) মকতুবাত শরীফ, (৭৩) হাদিকায়ে নাদিয়া শরহে তরীকায়ে মুহম্মদীয়া, (৭৪) মায়ারিফে মুহম্মদী, (৭৫) ইওয়াকীত, ইত্যাদি।}

মুহম্মদ মঈনুদ্দীন মাষ্টার

বাউনিয়া আব্দুল জলিল হাইস্কুল

উত্তরা, ঢাকা।

সুওয়াল ঃ কেউ কেউ বলে থাকে যে, সমস্ত মানুষ মায়ের রেহেম শরীফ হতে যেভাবে জন্মগ্রহণ করে থাকে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সেভাবে আগমণ করেছেন। তারা দলীল হিসেবে নিম্নোক্ত হাদীস শরীফদ্বয় উল্লেখ করে থাকে।

 اخرج ابو نعيم وكذا ابن سعد عن بريدة عن مرضعته صلى الله عليه وسلم فى بنى سعد ان أمنة قالت رأيت كانه خرج من فرجى شهاب اضائت له الارض حتى رأيت قصور الشام.

وعن همام بن يحيى عن اسحاق بن عبد الله ان ام رسول الله صلى الله عليه وسلم قالت لما ولدته خرج من فرجى نور اضاء له قصور الشام فولدته نظيفا مابه قذر.

অর্থঃ- “আবূ নঈম এবং অনুরূপ ইবনে সা’দ বুরাইদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন। তিনি বণী সা’দ গোত্রীয় হজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুধ মা (হযরত হালিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা) থেকে বর্ণনা করেন যে, নিশ্চয়ই হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বলেন, আমি দেখেছি যে, আমার র্ফজ থেকে একটি আলোক বর্তিকা বের হলো। তার দ্বারা সমস্ত যমীন আলোকিত হলো। এমনকি আমি সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ দেখতে পেলাম।

          “হুমাম ইবনে ইহাহইয়া তিনি ইসহাক ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন যে, নিশ্চয়ই হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আম্মা বলেন, যখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যমীনে আগমণ করলেন তখন আমার র্ফজ থেকে একটি নূর বের হলো। যার দ্বারা সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত হলো। তিনি আগমণ করেছেন পাক-সাফ অবস্থায়। তাঁর মধ্যে কোন নাপাকী ও ময়লা ছিলনা।”

          তাদের উক্ত কথা কতটুকু সঠিক? দলীল-আদিল্লাহ দ্বারা জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ প্রকাশ থাকে যে, কুরআন শরীফ এবং হাদীস শরীফের বর্ণনাগুলো খুবই সূক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বিষয়। এর জাহির ও বাতিন দু’টা দিক রয়েছে। যে কারণে সাধারণভাবে এর অর্থ ও ব্যাখ্যা উপলব্ধি করতে অনেকেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এবং দিয়ে থাকে।

          আবার বর্ণনা গুলোর শাব্দিক ও ব্যবহারিক অর্থের সাথে আকাঈদী ও আ’মালী বিষয়টি ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। এক্ষেত্রে কেবল শাব্দিক কিংবা ব্যবহারিক অর্থ ও ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে দেখা যাবে, তা আদৌ ছহীহ্ হয়নি তাই তা গ্রহণযোগ্যও নয়। উপরোক্ত উক্ত অশুদ্ধ অর্থ ও ব্যাখ্যা কুফরী পর্যন্ত পৌঁছে থাকে।

           কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা সম্পর্কে আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ফতওয়া হলো, “শুধু আরবী ভাষা জানলেই কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের অর্থ ও ব্যাখ্যা করা যাবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা ভিত্তিক অর্থ ও ব্যাখ্যা সে না শিখবে।”

          মেছাল স্বরূপ বলা যেতে পারে-

(১) যেমন “ضالا” শব্দ যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে গোমরাহী। এ শব্দটি যখন কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে কাফিরদের সম্পর্কে আসবে তখন এর অর্থ হবে গোমরাহী। যেমন আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,

 ومن يعص الله ورسوله فقد ضل ضللا مبينا.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নাফরমানী করবে সে অবশ্যই প্রকাশ্য গোমরাহীতে নিপতিত হবে।” (সূরা আহ্যাব/৩৬)

          আর এ ضالا শব্দ যখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে আসবে তখন এর অর্থ যদি কেউ “গোমরাহ” করে তাহলে সে কাট্টা কাফির হয়ে চির জাহান্নামী হয়ে যাবে।

 যেমন ‘সূরা ‘দুহা’-এর ৭নং আয়াত শরীফে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন, و وجدك ضالا فهدى.

এ আয়াতে কারীমার শাব্দিক অর্থ করলে অর্থ দাড়ায় “আর তিনি (আল্লাহ্ পাক) আপনাকে অর্থাৎ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পথভ্রষ্ট বা গোমরাহ্ পেয়ে হিদায়েত দান করলেন।” (নাউযুবিল্লাহ)

          এ অর্থ মূলত কুফরী। কারণ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন সময়ই গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট ছিলেন না।

          কারণ আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,

ما ضل صاحبكم وماغوى.

অর্থঃ- “তোমাদের সঙ্গি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম না কখনো গোমরাহ্ হয়েছেন না বিপথগামী হয়েছেন।” (সূরা নজম/২)

আরো ইরশাদ করেন,

ليس بى ضللة ولكنى رسول من رب العلمين.

অর্থঃ- “হে আমার ক্বওম! আমার নিকট গোমরাহী বলতে কিছুই নেই বরং আমি মহান রব্বুল আলামীনের প্রেরিত রসূল।” (সূরা আ’রাফ/৬১)

তিনি তো সৃষ্টিই হয়েছেন নবী হিসেবে। হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, كنت نبيا وادم بين الماء والطين.

অর্থঃ- “আমি তখনো নবী ছিলাম যখন হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম মাটি ও পানিতে অবস্থান করতেন।”

হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে,

عن ابى هريرة رضى الله تعالى عنه قال قالوا يا رسول الله صلى الله عليه وسلم متى وجبت لك النبوة قال وادم بين الروح والجسد.

অর্থঃ- “হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ছাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনাকে কখন নবুওওয়ত দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ আপনি কখন থেকে নবী? তিনি বললেন, আমি তখনো নবী ছিলাম যখন হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম রূহে এবং শরীরে অবস্থান করছিলেন। অর্থাৎ হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম সৃষ্টির পূর্ব থেকেই আমি নবী।” (তিরমীযী, মিশকাত)

          অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে সৃষ্টি করার পূর্বেই নবী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন।

          তাহলে এ অর্থ কি করে ছহীহ্ হতে পারে যে, তিনি (হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট ছিলেন? মুলতঃ এরূপ অর্থ করা হচ্ছে সম্পূর্ণ কুফরী যা ঈমান ও আমল উভয়টি বিনষ্ট হওয়ার কারণ।

          এ আয়াত শরীফের ছহীহ্ অর্থ হলো “তিনি (আল্লাহ্ পাক) আপনাকে কিতাবহীন পেয়েছেন অতঃপর কিতাব দান করেছেন।”

          (২) যেমন “مكر” শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ধোকাবাজী বা প্রতারণা’। এ শব্দটি যখন কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে কাফিরদের সম্পর্কে আসবে তখন এর অর্থ হবে ধোকাবাজী বা প্রতারণা।

          আর এ শব্দটি যখন আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে আসবে তখন এর অর্থ হবে হিকমত বা কৌশল। যেমন আল্লাহ্ পাক সূরা আলে ইমরান ৫৪ নং আয়াত শরীফে ইরশাদ করেন,

ومكروا ومكر الله والله خير المكرين.

          এ আয়াত শরীফের শাব্দিক অর্থ হলো, “তারা(কাফিররা) ধোকাবাজী করল, আল্লাহ্ পাকও ধোকাবাজী করলেন। আর আল্লাহ্ পাক হলেন উত্তম ধোকাবাজ।” (নাউযুবিল্লাহ্)।

          কেউ যদি এ আয়াত শরীফের শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করে তাহলে সে কাট্টা কাফির হয়ে চির জাহান্নামী হয়ে যাবে।

          এর ছহীহ অর্থ হলো, “তারা অর্থাৎ কাফিররা ধোকাবাজী করলো, আর আল্লাহ্ পাক হিকমত করলেন। আল্লাহ্ পাক হলেন উত্তম হিকমতওয়ালা।”

          (৩) যেমন “يقين” শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বিশ্বাস। এ শব্দটি কুরআন শরীফে ৮ বার এসেছে। এর মধ্যে ৬ বার বিভিন্ন অর্থে এসেছে। যেমন- নিঃসন্দেহে, নিশ্চিত, সত্য, অবশ্যই সত্য, বিশ্বাসযোগ্য ইত্যাদি। আর ২ বার এসেছে মৃত্যু অর্থে। যেমন- সূরা হিজরের ৯৯ নং আয়াত শরীফে ইরশাদ হয়েছে, واعبد ربك حتى يأتيك اليقين.

অর্থঃ- “এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, “তোমার রব আল্লাহ্ পাক-এর ইবাদত-বন্দেগী কর বিশ্বাস আসা পর্যন্ত।”

          যদি কেউ এ অর্থ করে তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। কারণ তাতে বুঝা যায় বিশ্বাস আসার পর আর  ইবাদত-বন্দেগী করার দরকার নেই। যা কুফরী আক্বীদা। স্বয়ং আখিরী নবী হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় নেয়া পর্যন্ত ইবাদত-বন্দেগী করেছেন। বরং শেষ যিন্দেগী মুবারকে আরো বেশী বেশী করেছেন।

          এখানে يقين শব্দের অর্থ হচ্ছে মৃত্যু। আয়াত শরীফের ছহীহ অর্থ হলো “তোমার রবের ইবাদত-বন্দেগী কর মৃত্যু আসা পর্যন্ত।”

          উল্লেখ্য, আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পছন্দনীয় ভাষা হচ্ছে আরবী। জান্নাতের ভাষাও আরবী। এ আরবী ভাষাকে আল্লাহ্ পাক এমন সমৃদ্ধ ও পরিপূরক করেছেন যে, ক্ষেত্র বিশেষে এর একটি শব্দ একাধিক ও ভিন্ন অর্থ প্রদান করে থাকে। অনুরূপ একাধিক শব্দ একই অর্থের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

          সুতরাং কেউ যদি কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের ছহীহ্ অর্থ প্রয়োগ ও ব্যবহারের ক্ষেত্র বুঝতে অক্ষম হয় এবং এই অক্ষমতা নিয়েই ব্যাখ্যা করে তাহলে তার অবস্থা অনুরূপই হবে যেরূপ অবস্থা হয়েছে মীর্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর।

          কাদিয়ানী خاتم النبين. আয়াতাংশে خاتم -এর ছহীহ্ অর্থ “শেষ” এর পরিবর্তে “মহর” ভুল অর্থ করার কারণে কাট্টা কাফির ও চির জাহান্নামী হয়েছে।

          এমনিভাবে কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের ভুল অর্থ, ভুল ব্যাখ্যা, ভুল ফতওয়া, ভুল আমল ও আক্বীদার কারণে কলেমা, নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি সবকিছু স্বীকার করা ও আমল করার পরও অনেকে বিভ্রান্ত বা গোমরাহ হয়ে গেছে। এর উদাহরণ হচ্ছে মু’তাজিলা, শিয়া, খারেজী, মরজিয়া, নাজ্জারিয়া, জাবারিয়া, মুশাব্বিহা ইত্যাদি ৭২টি বাতিল ও জাহান্নামী ফিরক্বা।

          কাজেই কুরআন শরীফ কিংবা হাদীস শরীফের বরাত দিয়ে কোন কথা বললেই যে তা ছহীহ্ ও গ্রহণযোগ্য হবে তা নয়। বরং দেখতে হবে, উক্ত কথা আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা ও আমলের খেলাফ কিনা, উক্ত কথা আল্লাহ্ পাক ও তাঁর প্রিয় বান্দা নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের শান ও মর্যাদার খেলাফ কিনা? বিশেষ করে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হাবীবুল্লাহ, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শান ও ফযীলতের খেলাফ কিনা? অতঃপর ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম, অতঃপর আউলিয়া-ই-কিরামগণের খেলাফ কিনা?

          স্মরণীয় যে, আমাদেরকে একদিন অবশ্যই আল্লাহ্ পাক এবং তাঁর প্রিয় হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে হাযির হতে হবে। এবং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শাফায়াত-শুপারিশ সবার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়বে। কাজেই এমন কথা কস্মিনকালেও বলা শুদ্ধ হবে না যা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শান ও মর্যাদার বিন্দুতম খেলাফ হয়।

          সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামসহ পূর্ববর্তী আম্বিয়া আলাইহিমুস্ সালামগণ সকলেই সাধারণ মানুষের মত ভূমিষ্ট হননি, যেহেতু নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণ মহান আল্লাহ্ পাক-এর খাছ ও বিশেষভাবে মনোনীত বান্দা।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,

الله يجتبى اليه من يشاء.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক তাঁর দিকে মনোনীত করেন যাকে ইচ্ছা তাকেই।” (সূরা শুরা/১৩)

          আর তাই আল্লাহ্ পাক নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণকে তাঁদের শান হেতু স্বীয় কুদরতে আলাদাভাবে সৃষ্টি করেছেন।

          আর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হাবীবুল্লাহ্, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সৃষ্টি অন্যান্য সকল নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালাম এবং সকল মানুষের সৃষ্টি থেকে এক ভিন্ন প্রক্রিয়ায় হয়েছে।

          মানবীয় আকৃতি মুবারকে তিনি যমীনে তাশরীফ এনেছেন সত্যি কিন্তু  তার সৃষ্টির উৎস, উপাদান, মায়ের রেহেম শরীফে তাশরীফ আনয়ণ এবং রেহেম শরীফ হতে যমীনে আগমণ প্রত্যেকটি ছিল আল্লাহ্ পাক-এর খাছ কুদরতের অন্তর্ভূক্ত। অর্থাৎ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শরীর মুবারক যে নূর মুবারক হতে সৃষ্টি হয়েছে সে নূর মুবারক কুদরতীভাবে তাঁর আম্মার রেহেম শরীফে প্রবেশ করেছে এবং কুদরতীভাবেই তিনি তাঁর আম্মার বাম পাঁজরের নিচ থেকে ভূমিষ্ট হয়েছেন। এটাই ছহীহ্ এবং আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা।

          যারা বলে, “সমস্ত মানুষ মায়ের রেহেম শরীফ হতে যেভাবে জন্মগ্রহণ করে থাকে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সেভাবে আগমণ করেছেন।” তাদের একথা সম্পূর্ণ ভুল। তাদের বক্তব্য ভুল হওয়ার সবচাইতে বড় কারণ হলো তারা হাদীস শরীফে বর্ণিত “فرج” শব্দের একাধিক শাব্দিক অর্থ থেকে একটি অর্থের উপর ভিত্তি করেই বক্তব্য পেশ করেছে। অর্থটি হচ্ছে  “শরমগাহ”।

          অথচ  এ অর্থ ব্যতীত আরো যে অর্থের বর্ণনা পাওয়া যায় বিভিন্ন লুগাত বা অভিধানে তাহলো ছিদ্র, ফাঁক, ফাটল, প্রবেশ পথ, সুড়ঙ্গ, দু’হাত কিংবা দু’পায়ের মধ্যেবর্তী স্থান, দু’জিনিসের মাঝে ব্যবধান সৃষ্টিকারী বস্তু, পুরুষ-মহিলা, যুবক প্রত্যেকের শরমগাহ্ এবং তার চতুর্দিকের স্থান ও সন্তান মায়ের রেহেম শরীফ হতে যে স্থান দিয়ে ভুমিষ্ঠ হয় ইত্যাদি।  অর্থাৎ এক কথায় فرج শব্দের অর্থ হলো ঐ রাস্তা যে রাস্তা দিয়ে সন্তান ভুমিষ্ঠ হয়।

 فرجশব্দটি সকলের ক্ষেত্রে এক অর্থ প্রদান করবেনা। যেমন সাধারণ মানুষের শানে যখন فرج শব্দটি ব্যবহার হবে তখন এর অর্থ হবে সাধারণ ও স্বাভাবিক স্থান।

আর অন্যান্য নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগণের শানে যখন এ শব্দ ব্যবহার হবে তখন এর অর্থ হবে নাভী ও শরমগাহের মধ্যবর্তী স্থান।

 আর যখন আখিরী রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে এ শব্দ ব্যবহার হবে তখন এর অর্থ হবে ডান পাঁজরের নীচের স্থান।

সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভুমিষ্ঠ হওয়া সম্পর্কে কিতাবে চারটি মত বর্ণিত হয়েছে। যেমন- এ প্রসঙ্গে কিতাবে বর্ণিত হয়েছে,

اعلم ان فى موضع ولادة النبى صلى الله عليه وسلم اربعة اقوال الاول انه ولد من الخاصرة اليسرى والثانى انه ولد من نقبة بين الفرج والسرة والثالث انه ولد من فم امه – والرابع انه ولد من ولهذا افتى المالكية بقتل من قال ان النبى صلى الله عليه وسلم ولد من مجرى البول.

অর্থঃ-“জেনে রাখ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভুমিষ্ঠ হওয়ার স্থান সম্পর্কে চারটি ক্বওল রয়েছে।”

(১) হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (স্বীয় মাতার) বাম পার্শ্বের পাঁজরের নীচ থেকে ভুমিষ্ঠ হয়েছেন।

(২) শরমগাহ্ ও নাভীর মধ্যবর্তী স্থান হতে।

(৩) তাঁর মাতা হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা-এর মুখ থেকে।

(৪) স্বাভাবিকভাবে।

          হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভুমিষ্ঠ হওয়া সম্পর্কে আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের সকল ইমাম-মুজ্তাহিদ ও আওলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের অভিমত হলো,

كل مولود غير الانبياء يولد من الفرج وكل الانبياء غير نبينا مولودون من فوق الفرج وتحت السرة واما نبينا صلى الله عليه وسلم فمولود من الخاصرة اليسرى تحت الضلوع.

অর্থঃ- “আম্বিয়া আলাইহিমুস্ সালামগণ ব্যতীত সমস্ত মানুষই (স্বীয় মায়ের) শরমগাহ্ থেকে জন্ম গ্রহণ করে। আর সমস্ত আম্বিয়া আলাইহিমুস্ সালামগণ শরমগাহ্রে উপর ও নাভীর নীচ থেকে ভুমিষ্ঠ হয়েছেন। আর আমাদের নবী সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর বাম পার্শ্বের পাঁজরের নীচ থেকে ভুমিষ্ঠ হয়েছেন।” (উমদাতুন্নুকুল ফি কাইফিয়াতে বিলাদাতির রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)

          উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সমস্ত নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণ সাধারণ মানুষের মতো ভুমিষ্ঠ হননি। বরং আল্লাহ্ পাক তাঁদেরকে খাছ কুদরতীভাবে শরমগাহ্ ব্যতীত অন্যস্থান দিয়ে ভুমিষ্ঠ করিয়েছেন। এ সম্পর্কে আরো বর্ণিত আছে যে,

ولم يصح نقل ان نبيا من الانبياء ولد من الفرج ولهذا افتى المالكية بقتل من قال ان النبى صلى الله عليه وسلم ولد من مجرى البول.

অর্থঃ- “আম্বিয়া আলাইহিমুস্ সালামগণ স্বীয় মাতার শরমগাহ্ থেকে জন্মগ্রহণ করেছেন একথা সম্পূর্ণরূপেই অশুদ্ধ। আর এজন্যই মালিকী মায্হাবের ইমামগণ ঐ ব্যক্তিকে ক্বতল করার ফতওয়া দিয়েছেন যে ব্যক্তি বলবে যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (তাঁর মাতার) শরমগাহ্ দিয়ে ভুমিষ্ঠ হয়েছেন।” (ওমদাতুন্নুকুল ফি কাইফিয়াতি বিলাদাতির রসূল)

          উল্লেখ্য, বর্তমানে আমরা দেখতে পাই যে, সন্তান যখন স্বাভাবিক রীতি অনুযায়ী ভুমিষ্ট হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে তখন সে সন্তানকে অপারেশন করে মায়ের রেহেম শরীফ থেকে বের করে আনতে হয়। এ অবস্থায় নাভীর নীচে ও শরমগাহের উপর অপারেশন করতে হয়। অর্থাৎ এ অবস্থায়ও সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক পথে ভুমিষ্ট হয় না।

          অতএব, এ বিষয়ে সকলকেই আহ্লে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা মোতাবেক আক্বীদা পোষণ করতে হবে। আর তাহলো “আম্বিয়া আলাইহিমুস্ সালামগণ ব্যতীত সমস্ত মানুষই (স্বীয় মায়ের) শরমগাহ্ থেকে জন্ম গ্রহণ করে। আর সমস্ত আম্বিয়া আলাইহিমুস্ সালামগণ শরমগাহ্রে উপর ও নাভীর নীচ থেকে ভুমিষ্ঠ হয়েছেন। আর আমাদের নবী সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর আম্মা (হযরত আমিনা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা)-এর বাম পার্শ্বের পাঁজরের নীচ থেকে ভুমিষ্ঠ হয়েছেন।”

          সুতরাং এর খেলাফ আক্বীদা পোষণ করার অর্থ হলো আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ইহানত করা যা কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

          {দলীলসমূহঃ (১) আহ্কামুল কুরআন জাস্সাস, (২) কুরতুবী, (৩) মাযহারী, (৪) রুহুয় মায়ানী, (৫) রুহুল বয়ান, (৬) খাযেন, (৭) বাগবী, (৮) গারায়িবুল কুরআন, (৯) হাশিয়াতুছ ছাবী, (১০) ক্বাদিরী, (১১) মুদ্বীহুল কুরআন, (১২) মাজেদী, (১৩) ইবনে কাছীর, (১৪) তাবারী, (১৫) কবীর, (১৬) যাদুল মাছীর, (১৭) তাফসীরে ওয়াহেদী, (১৮) উমদাতুন্ নুকুল ফি কাইফিয়াতে বিলাদাতির রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, (১৯) তালখীছ, (২০) আত্ তাহ্সীল ওয়াল বয়ান,(২১) জামিউল ফুছুলীন, (২২) হাশিয়াতু আলাশ্ শিফা, (২৩) খোলাছা, (২৪) হাশিয়ায়ে জামিউল ফুছুলীন, (২৫) ইক্বদুছ ছামীন,  (২৬) নেহায়াতুল আমল, (২৭) ইবনে সা’দ, (২৮) খামীছ, (২৯) আন্ নি’মাতুল কুবরা, (৩০) আন্ নি’মাতুল কুবরা, (৩১) ফতওয়ায়ে মাহমুদিয়া, (৩২) মিশকাত, (৩৩) মিরকাত, (৩৪) আশয়াতুল লুময়াত, (৩৫) লুময়াত, (৩৬) কামূছ আল মুহীত, (৩৭) ওয়াসীত, (৩৮) জাদীদ, (৩৯) লিসানুল আরব, (৪০) মুনজিদ আরবী, (৪১) মুনজিদ উর্দূ, (৪২) মিছবাহুল লুগাত, (৪৩) লুগাতে হীরা, (৪৪) গিয়াছুল লুগাত, (৪৫) লুগাতে সাঈদী, (৪৬) বয়ানুল লিসান, (৪৭) আল কামূসুদ্ দরসী, (৪৮) মিছবাহুল  মুনীর, (৪৯) নেহায়া, (৫০) আল মু’জামুল ওয়াজীয, (৫১) মু’জামু মাক্বায়ীসুল লুগাত, (৫২) মাগরিব, (৫৩) আল মু’জামুল বুলদান, (৫৪) আল মুহীত ফিল লুগাত, (৫৫) আল মানার, (৫৬) লুগাতে কিশওয়ারী, (৫৭) তাজুল আরুস, (৫৮) ইফরাতুল মাওয়ারীদ, (৫৯) ফরহঙ্গ-ই রব্বানী, (৬০) করীমুল লুগাত,(৬১) আরবী ও বাংলা অভিধান, (৬২) আর রইদ, (৬৩) ক্বামুসুল কুরআন, (৬৪) ফিরুজুল লুগাত, (৬৫) ফরহঙ্গে আমেরা, (৬৬) আল ক্বামুসুল জাদীদ, (৬৭) করীমুল লুগাত, (৬৮) ফতর্হু রহমান, (৬৯) আল ক্বামুসুল ইছত্বলাহিল জাদীদ, (৭০) মু’জামু লুগাতিল ফুক্বাহা, (৭১) লুগাতুল হাদীস, (৭২) আল মুরাদাত, (৭৩) ****  ইত্যাদি।

মুহম্মদ আরিফুল খবীর

সভাপতি- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত

ঈদগাঁহ্ আবাসিক এলাকা, দিনাজপুর।

সুওয়ালঃ আমরা জানি যে, রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহু আলী, একজন হক্ব ও খালিছ ওলী আল্লাহ্। কারণ আমি তাঁর ওয়াজ-নছীহত শুনেছি এবং তাঁর প্রকাশিত মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকাও পাঠ করেছি। কিন্তু বেশ কিছুদিন পূর্বে আমার এক পরিচিত লোকের কাছে একটি হ্যান্ডবিল দেখলাম। তাতে রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী সম্পর্কে নানা ধরণের বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে যা আমার কাছে অসত্য ও মিথ্যা মনে হয়েছে। তাই প্রকৃত সত্য জানালে আমার মত অনেক সাধারণ মানুষের সংশয় নিরসন হত।

জাওয়াবঃ হ্যাঁ, রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী সম্পর্কে প্রচারিত হ্যান্ডবিল ও লিফলেটে যে মন্তব্য বা কটুক্তি করা হয়েছে তা সম্পূর্ণরূপে অসত্য ও চরম মিথ্যার শামীল। সাথে সাথে তা শরীয়ত তথা কুরআন-সুন্নাহ্র খেলাফও বটে।

          কারণ কারো সম্পর্কে কোন কথা বলতে হলে এবং তা বিশ্বাস করতে হলে তা পূর্ণ তাহক্বীক করে, যাচাই-বাছাই করে বলতে হবে ও বিশ্বাস করতে হবে। অন্যথায় মনগড়া ও মিথ্যাভাবে বানিয়ে কারো নামে কোন কথা বললে ও তা বিশ্বাস করলে কঠিন গুণাহে গুণাহ্গার হতে হবে।

          এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফের ছহীহ্ কিতাব “আবূ দাউদ শরীফে” বর্ণিত হয়েছে,

عن ابى الدرداء رضى الله عنه قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول ان العبد اذا لعن شيئا صعدت اللعنة الى السماء فتغلق ابواب السماء دونها ثم تهبط الى الارض فتغلق ابوابها دونها ثم تأخذ يمينا وشمالا فاذا لم تجد مساغا رجعت الى الذى لعن فان كان لذلك اهلا والا رجعت الى قائلها.

অর্থঃ- “হযরত আবূ দারদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা  আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, নূরে মুজাস্সাম, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যখন বান্দা কোন কিছুকে বা কাউকে অভিসম্পাত করে, তখন সে অভিসম্পাত আকাশের দিকে উঠতে থাকে তখন আকাশের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। অতঃপর ঐ অভিসম্পাত যমীনের দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তখন যমীনের দরজাও বন্ধ করে দেয়া হয়। অতঃপর তা ডান দিক ও বাম দিকে যায় এবং সেখানেও যখন কোন রাস্তা না পায় শেষ পর্যন্ত সেই ব্যক্তি বা বস্তুর দিকে প্রত্যাবর্তন করে যার প্রতি অভিসম্পাত করা হয়েছে (যদি সে অভিসম্পাতের উপযুক্ত হয়) তার উপরে আপতিত হবে। অন্যথায় (যদি সেই ব্যক্তি বা বস্তু অভিসম্পাতের উপযুক্ত না হয় তাহলে) অভিসম্পাতকারীর দিকেই ফিরে আসে।”

          এ হাদীস শরীফ দ্বারা বুঝা গেল, কারো প্রতি কোনরূপ মিথা দোষারোপ করা হলে তিনি যদি তার উপযুক্ত না হন তাহলে যে বা যারা দোষারোপ করবে সে ব্যক্তিই উক্ত দোষারোপের ভাগীদার হবে। সুতরাং কারো সম্পর্কে কোন মন্তব্য করতে হলে তা খুব চিন্তা-ফিকির, যাচাই-বাছাই করে সাবধানে করতে হবে। আন্দাজ বা অনুমান করে, একে অপরের দেখা-দেখি, বিনা তাহক্বীক্বে বিন্দুমাত্র মন্তব্য পেশ করা ও তা বিশ্বাস করা এবং প্রচার করা শরীয়তসম্মত নয়।

এ প্রসঙ্গে  আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

ان بعض الظن اثم.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই অনেক ধারণাই গুণাহ্র কারণ।” (সূরা হুজরাত/১২)

হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে,

كفى بالمرء كذبا ان يحدث بكل ماسمع.

অর্থঃ- “কোন ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য ইহাই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তাই বলে বেড়ায়।” (মুসলিম শরীফ)

          অতএব, কারো কাছে কোন কথা শুনে বা কোন লেখা দেখেই শরয়ী দলীল-প্রমাণ ছাড়া তা বিশ্বাস করা, রটনা করা ও প্রচার করা মিথ্যাবাদী হওয়া তথা কবীরা গুণাহ্ েগুণাহ্গার হওয়ার শামীল।

          আমাদেরকে এ কথা বুঝতে হবে যে, আল্লাহ্ পাক মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত করেছেন, বিবেক-বুদ্ধি, আক্বল-সমঝ দান করেছেন। বিশেষ করে মুসলমানী জিন্দেগী পরিচালনার জন্য পূর্ণাঙ্গ শরীয়ত দান করেছেন। তাই মুসলমানদেরকে শরীয়ত তথা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের ভিত্তিতে ইল্ম অর্জন ও যাচাই-বাছাই করে আমল করতে হবে। কোন বিষয়ে শরীয়তের খেলাফ, মনগড়া ও মিথ্যার আশ্রয় নেয়া জায়েয হবে না।

          প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন, হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু একদা তাঁর সভাসদকে বললেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কি অমুক ব্যক্তিকে চেন? একজন বললেন, জী হুজুর! আমি তাকে চিনি। তখন হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তুমি কিভাবে তাকে চেন? তুমি কি তার প্রতিবেশী? সে ব্যক্তি বললো, না। অতঃপর তিনি বললেন, তুমি কি তার সাথে কখনো সফর করেছ? সে ব্যক্তি বললো, না, আমি তার সাথে কোন দিন সফর করিনি। পুনরায় তিনি বললেন, তাহলে তুমি কি তার সাথে কখনো লেন-দেন করেছ? এবারও সে ব্যক্তি বললো, না আমি তার সাথে কোন দিন লেন-দেনও করিনি। তখন হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু  বললেন, তাহলে তুমি তাকে চেন না বা জান না।”

          তাই কাউকে চিনতে হলে বা জানতে হলে প্রথমতঃ হয় তার প্রতিবেশী হতে হবে অথবা তার সাথে সফর করতে হবে অথবা তার সাথে লেন-দেন করতে হবে। তবেই তার প্রকৃত পরিচয় জানা যাবে, অন্যথায় নয়।

          কাজেই রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী সম্পর্কে কেউ মিথ্যা রটনা করলে বা অপপ্রচার করলে তা কোন মতেই মেনে নেয়া যাবেনা বরং তার সত্যতা যাচাই করতে হবে, ব্যাখ্যা, অর্থ, ক্ষেত্র বুঝতে হবে এবং প্রয়োজনে রাজারবাগ শরীফ থেকে সঠিক তত্ত্ব ও তথ্য জেনে নিতে হবে।

মূলতঃ এ বিরোধীতা আজকে নতুন করে নয়।

          উল্লেখ্য, দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরা স্বয়ং আল্লাহ পাক-এর নামে অপবাদ রটনা করেছে।

          এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

انظر كيف يفترون على الله الكذب وكفى به اثما مبينا. اولئك الذين لعنهم الله ومن يلعن الله فلن تجدله نصيرا ………..

অর্থঃ- “লক্ষ্য করুন, কেমন করে তারা আল্লাহ পাক-এর প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে, অথচ এই প্রকাশ্য পাপই যথেষ্ট। …. এরা হল সেসমস্ত লোক যাদের উপর স্বয়ং আল্লাহ পাক লা’নত করেছেন  বস্তুতঃ আল্লাহ পাক যার উপর লা’নত করেন আপনি তার কোন সাহায্যকারী খুঁজে পাবেননা।”

(সূরা নিসা/ ৫০, ৫২)

আল্লাহ্ পাক আরো ইরশাদ করেন,

 ومن الظلم ممن افترى على الله كذبا او كذب بالحق لما جاءه اليس فى جهنم مثوى للكفرين.

অর্থঃ- “ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক জালিম আর কে আছে? যে আল্লাহ পাক সম্পর্কে মিথ্যা রটনা করে অথবা তার কাছে সত্য আসার পর তাকে অস্বীকার করে তার কি স্মরণ রাখা উচিত নয় যে, জাহান্নামই সেসব কাফিরদের আশ্রয়স্থল হবে।” (সূরা আনকাবুত/৬৮)

 এরপর প্রথম নবী, রসূল হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম থেকে শুরু করে আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাস্সাম, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত সকলেরই বিরোধীতা করা হয়েছে। এমনকি বণী ইসরাঈলের সত্তর হাজার নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণকে শহীদ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, যিনি সৃষ্টির মূল, সেই আমাদের প্রাণের আকাঁ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, নূরে মুজাস্সাম হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দানদান মুবারক শহীদ করা হয়েছে এবং তাঁকে বিষ পান করানো হয়েছে এবং অব্যক্ত অত্যাচার-জুলুম করা হয়েছে।

পবিত্র কালামুল্লাহ্ শরীফে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ ফরমান,

ولقد استهزئ برسل من قبلك فحاق بالذين سخروا منهم ماكانوا به يستهزئون.

অর্থঃ- “আপনার পূর্বেও অনেক রসূল আলাইহিমুস্ সালামকেই ঠাট্টা বিদ্রুপ করা হয়েছিল। পরিণামে তারা যা’ নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করত, তা বিদ্রুপকারীদেরকে পরিবেষ্টন করেছিল।” (সূরা আম্বিয়া/৪১)

আল্লাহ্ পাক আরো ইরশাদ করেন,

وكذلك جعلنا لكل نبى عدوا شيطين الانس والجن يوحى بعضهم الى بعض زخرف القول غرورا ولوشاء ربك مافعلوه فذرهم ومابفترون ولتصغى اليه افئدة الذين لا يؤمنون بالاخرة وليرضوه وليقترفوا ماهم مقترفون.

অর্থঃ- “এমনিভাবে আমি প্রত্যেক নবীর জন্য শত্রু করেছি শয়তান, মানব ও জিনদের। তারা ধোকা দেয়ার জন্য একে অপরকে কারুকার্যখচিত কথা-বার্তা শিক্ষা দেয়। যদি আপনার পালনকর্তা চাইতেন, তবে তারা এ কাজ করতনা। অতএব, আপনি তাদেরকে এবং তাদের মিথ্যা অপবাদকে ছেড়ে দিন যাতে কারুকার্যখচিত বাক্যের প্রতি তাদের মন আকৃষ্ট হয়, যারা পরকাল বিশ্বাস করেনা এবং তারা একেও পছন্দ করে নেয় এবং যাতে ঐসব কাজ করে যা তারা করেছে।” (সূরা আন্য়াম/১১২, ১১৩)

আল্লাহ্ পাক ইরশাদ ফরমান,

 ثم بعثنا من بعده رسلا الى قومهم فجائوهم بالبينات فما كانوا ليؤمنوا بما كذبوابه من قبل كذلك نطبع على قلوب المعتدين.

অর্থঃ- “এরপর আমি হযরত নূহ আলাইহিস্ সালাম-এর পর অনেক নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামকে পাঠিয়েছি তাঁদের সম্প্রদায়ের প্রতি। তারপর তাদের কাছে তাঁরা প্রকাশ্য দলীল প্রমাণ পেশ করেছেন। কিন্তু তাদের দ্বারা এমনটি হয়নি যে, তারা ঈমান আনবে সে ব্যাপারে যাকে তারা ইতিপূর্বে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল। এভাবে আমি মহর মেরে দেই সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তরসমূহের মধ্যে।” (সূরা ইউনূস/৭৪)

আল্লাহ্ পাক আরো ইরশাদ করেন,

 من كان عدوا لله وملئكته ورسله وجبريل وميكل فان الله عدو للكفرين.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাক-এর, তাঁর ফেরেশ্তা ও রসূলগণ এবং জিবরাঈল আলাইহিস্ সালাম ও মীকাঈল আলাইহিস্ সালাম-এর শত্রু হয় নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক সেসব কাফিরদের শত্রু।” (সূরা বাক্বারা/৯৮)

          পাঠক! উপরোক্ত আয়াত শরীফের আলোকে বোঝা যায়  খালিক, মালিক, রহ্মানুর রহীম আল্লাহ্ পাক-এর শত্রুতাও মানুষ করে।

          নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ, নির্মল চরিত্রের নবী আলাইহিমুস্ সালামগণের শত্রুতাও মানুষ করে।

          মানবীয় বৈশিষ্ট্যের উর্ধ্বে সম্মানিত  ফেরেশ্তা জিবরাঈল আলাইহিস্ সালাম, মীকাঈল আলাইহিস্ সালাম-এর শত্রুতাও মানুষ করে। অর্থাৎ তাদেরও শত্রু আছে।

          একই ধারাবাহিকতায় হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম-এর প্রতিও দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরা বিরোধীতা করেছে, অপবাদ রটনা করেছে, বিবিধ কষ্ট দিয়েছে, শহীদ করেছে। বেহেশ্তের যুবকদের সর্দার, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর কলিজার টুকরা হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু আনহুকেও মানুষ শহীদ করেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে শত্রুতায় লিপ্ত হয়েছে।

          একই ধারাবাহিকতায় যারা সত্যিকার নায়েবে রসূল, যামানার মুজাদ্দিদ, ওলী হিসেবে যমীনে এসেছেন তাঁদের সকলেরই বিরোধীতা করা হয়েছে, মিথ্যা অপপ্রচার, কুৎসা রটনা করা হয়েছে, তাঁদেরকে নানা ধরণের গাল-মন্দ তো করা হয়েছেই শেষ পর্যন্ত কাফির বলতেও কুক্তাবোধ করেনি স্ব-স্ব যামানার ওলামায়ে “ছূ”রা। এজন্য বলা হয়েছে, “প্রত্যেক মুসা আলাইহিস্ সালাম-এর জন্য আল্লাহ্ পাক একজন করে  ফিরআউন নির্দিষ্ট করে দেন, যে তাকে কষ্ট দিয়ে থাকে।” অর্থাৎ প্রত্যেক আল্লাহ্ ওয়ালার জন্যই আল্লাহ্ পাক শত্রু নির্দিষ্ট করে দেন। যারা তার নামে অপবাদ রটনা করে তার নামে মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছড়ায়।

          হযরত নিযামুদ্দীন আওলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর একটি ঘটনা বর্ণিত আছে। অতি উচুঁ স্তরের ওলী আল্লাহ্ হওয়া সত্ত্বেও এক লোক তাঁকে কিছুতেই ওলী আল্লাহ্ মানতে চাইতোনা। কারণ হিসেবে সে পেশ করত যে,তাঁর কোন শত্রু নেই।

          এ প্রেক্ষিতে একদিন তাকে বলা হল- হযরত নিযামুদ্দীন আওলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বাসস্থান হতে স্বল্প দূরে অবস্থানকারী এক বুড়ির বাড়ি থেকে অন্ধকার রাতে আলো নিয়ে আসার জন্য। সে মোতাবিক তিনি উক্ত বুড়ির বাড়িতে গিয়ে আলো চাইলেন। বুড়ি তাকে আলো দিল। কিন্তু ফিরতি পথে কিছুদূর চলে আসার পর বুড়ি তাকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কার জন্য আলো নিয়ে যাচ্ছ? জবাবে তিনি হযরত নিযামুদ্দীন আওলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নাম বললেন। বুড়ি সাথে সাথে ক্রোধে  অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল। সে হযরত নিযামুদ্দীন আওলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহিকে ভন্ড, প্রতারক, ঠগ ইত্যাদি বলেই ক্ষান্ত হলো  না, প্রতিহিংসা বশতঃ সে তার দেয়া আলোটুকু ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল।

          এ ঘটনার পর তখন উক্ত ব্যক্তি স্বীকার করে নিল যে সত্যিই হযরত নিযামুদ্দীন আওলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি বিরাট ওলী আল্লাহ্। কারণ তাঁকে ভন্ড, প্রতারক, ইত্যাদি বলার মত লোকও রয়ে গেছে। তাঁর শত্রুও পৃথিবীতে আছে।

          মূলতঃ এ ধরণের শত্রু থাকা আল্লাহ্ পাক-এর সুন্নত। আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নত, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম এবং হযরত আওলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের সুন্নত। ইমামুল আইম্মা, কুতুবুল আলম, মুজাদ্দিদুয্ যামান, আওলার্দু রসূল রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর দ্বারা আল্লাহ্ পাক সেই সুন্নত পালন করাচ্ছেন সর্বোতভাবে। তাঁর শত্রুরা তাঁর নামে নানা অপবাদ রটনা করছে, মিথ্যা অপপ্রচারণা চালাচ্ছে, চোগলখুরী করছে।

উল্লেখ্য যে, কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

ولا تشتروا بايتى ثمنا قليلا.

অর্থঃ- “তোমরা অল্প বিনিময়ে আমার আয়াতকে বিক্রী করোনা।” (সূরা মায়িদা/৪৪)

 হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে যে,

 ان خير الخير خيار العلماء وان شر الشر شرار العلماء.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই সৃষ্টির সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট হল আলিম। সৃষ্টির সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট হল আলিম নামধারী।” (মিশকাত শরীফ)

          অতি সংক্ষেপে এই আয়াত শরীফ আর হাদীস শরীফ এর আলোকেই বুঝা যায় যে, যমীনে আলিমের ছদ্মাবরণে একদল লোক থাকবে তারা মূলতঃ আলিম নামধারী, কিন্তু তাদের মাঝে আমল থাকবেনা। তারা দুনিয়াবী স্বার্থের জন্য ইসলামকে ব্যবহার করবে, ইসলামের দোহাই দিয়ে তারা এমন সব আমলের প্রচলন করবে যা স্পষ্টতঃ বিদয়াত। যে  সম্পর্কে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

 يكون فى اخر الزمان دجالون كذابون ياتونكم من الاحاديث بما لم تسمعوا انتم ولا ابائكم فاياهم لايضلونكم ولا بفتنونكم.

অর্থঃ- “আখিরী যামানায় কিছু দাজ্জালের চেলা বের হবে। তারা এমন সব কথা বলবে যা তোমরা শোননি, তোমাদের বাপ-দাদা চৌদ্দপুরুষ শোনেনি। তোমরা তাদের থেকে দূরে থাক এবং তাদেরকে তোমাদের থেকে দূরে রাখ। তাহলে তারা তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে পারবেনা এবং ফিৎনায় ফেলতে পারবেনা।” (মিশকাত শরীফ)

          পক্ষান্তরে হাদীস শরীফের ঘোষণা অনুযায়ী আগত যামানার মুজাদ্দিদগণ তাদের সেসব বিদয়াতী কাজের মূলোৎপাটন করে, বিদয়াতকে কুরআন-সুন্নাহর দলীল দ্বারা বিদয়াত বলে সাব্যস্ত করে, বিদয়াত ও বিদয়াতীদের সম্পর্কে আওয়ামুন্নাসকে সচেতন করে তাদেরকে সুন্নত পালনে অভ্যস্ত করে তোলেন।

          সুতরাং স্বার্থান্বেষী কারণেই তখন ওলামায়ে “ছূ” বা নামধারী আলিম তথা বিদয়াতীগণ মুজাদ্দিদে যামানের বিরোধীতায় ও অপপ্রচারে লিপ্ত হয়।

          এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, যিনি দ্বিতীয় হিজরী সহস্রাব্দের মুজাদ্দিদ, আফযালুল আওলিয়া, কাইয়্যূমে আউয়াল, হযরত শায়খ আহমদ ফারুকী সিরহিন্দী মুজাদ্দিদে আল্ফেছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি যাঁর আগমণ ও পরিচিতি সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভবিষ্যৎবাণী রয়েছে। যার তাজদীদে বাদশাহ্ আকবরের কুফরী মতবাদ “দ্বীনে ইলাহীর” অবসান ঘটেছে এবং সঠিক “দ্বীন ইসলাম” সম্পর্কে বুঝতে সক্ষম হয় মানুষ। মুসলমানদের বিপর্যস্ত আক্বীদা ও আমল শুদ্ধ হয়। সেই মহান মুজাদ্দিদে আল্ফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর চরম বিরোধীতা করে, এমনকি তাঁকে কাফির পর্যন্ত বলতে বাদ রাখেনি আকবর মদদপুষ্ট ওলামায়ে “ছূ”র দল। তাদের মধ্যে মশহুর হচ্ছে- (১) আবুল ফজল, (২) ফৈজী ও (৩) মোল্লা মোবারক নাগরী। যারা বাদশাহ্ আকবরের কাছ থেকে ইনয়াম বা উপঢৌকন নিয়ে সমর্থন যুগিয়েছিল দ্বীনে ইলাহীর পক্ষে। তারা বাদশাহ্ আকবরকে এতটুকু সন্তুষ্ট করেছিল যে, তারা তাকে নবী পর্যন্ত বানিয়েছিল এবং কিতাব লিখে তা তার প্রতি নাযিল হয়েছে বলে প্রচার করেছিল (নাউযুবিল্লাহ্)। তারা বাদশাহ্ আকবরের সেই দ্বীনে ইলাহীর মধ্যে এমন সব নিয়ম-নীতি ও আমলের প্রবর্তন করে যা দ্বীন ইসলামের সম্পূর্ণ খেলাফ, কুফরী, হারাম ও নাজায়েয আমলের অন্তর্ভূক্ত। যেমন, (১) গরু যবেহ্ বন্ধ করা, (২) যে সকল প্রাণীর গোশ্ত খাওয়া হারাম তা হালাল ঘোষণা করা, (৩) সূর্য পুজা করা এবং (৪) যে সকল মেয়েকে বিয়ে করা জায়েয যেমন, চাচাতো, খালাতো, মামাতো ও ফুফাতো বোন তাদেরকে বিয়ে করা নাজায়েয ও হারাম ঘোষণা ইত্যাদি।

          এক কথায় বাদশাহ্ আকবর তার দ্বীনে ইলাহীতে ঐ সমস্ত বিষয়কে হারাম করেছে যা কুরআন-সুন্নাহ্তে হালাল করা হয়েছে। আর সে ঐ সমস্ত বিষয়গুলোকে হালাল ও জায়েয করেছে যা কুরআন-সুন্নাহ্তে হারাম ও নাজায়েয করা হয়েছে। তার দ্বীনে ইলাহীর অনুসারীদেরকে সে এক নতুন নাম “চেলা” বলে আখ্যায়িত করে।

          ঠিক একই কায়দায় আজকের যারা ওলামায়ে “ছূ” তারাও বাদশাহ্ আকবরের ফায়দাভোগী ওলামায়ে “ছূ”দের ন্যায় এমন সব নাজায়েয, হারাম ও কুফরী কাজের প্রবর্তন করেছে ও করছে যা দ্বীন ইসলাম তথা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের সম্পূর্ণ খেলাফ।

           যেমন, মুসলমানদের কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফের ভাষায় ‘মু’মিন,’ ‘মুসলিম’ ও ‘মুত্তাক্বী’ নামে পরিচিত না করে ‘মৌলবাদী’ নামে পরিচিত করার জন্য কোশেশ করছে। আল্লাহ্ পাক-এর খিলাফত ব্যবস্থাকে বর্জন করে ইসলামের নামে গণতন্ত্র করছে। হরতাল, লংমার্চ ও ব্লাসফেমী আইনকে শরীয়তের বিধান বলে প্রচার করছে। বিধর্মীদের উদ্ভাবিত ভোট পদ্ধতিকে আমানত তথা ফরয-ওয়াজিব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে লোকদেরকে সেদিকে উদ্বুদ্ধ করছে।

          প্রকাশ্য ছবি তুলে হারামকে হালালে পরিণত করছে। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নতসমূহকে আধুনিকতার দোহাই দিয়ে মুলোৎপাটন করে তদস্থলে বিদ্য়াত ও হারামের প্রতিষ্ঠা করে মানুষের ঈমান-আক্বীদা নষ্ট করছে।

কুরআন শরীফের অপব্যাখ্যা করে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করে সমাজে ফিৎনার সৃষ্টি করছে।

          ওলামায়ে “ছু”দের দ্বারা এতসব হারাম, নাজায়েয, বিদ্য়াত ও কুফরী কাজের প্রবর্তনের ফলে সাধারণ মুসলমান যখন  সঠিক দ্বীনি আক্বীদা, আমল, ইল্ম ও ইখলাছ থেকে বঞ্চিত। ঠিক এমনি মূহুর্তে আল্লাহ্ পাক স্বীয় ওয়াদা ও ইহ্সান অনুযায়ী যামানার মুজাদ্দিদ হিসেবে রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলীকে পাঠিয়ে যামানার সংস্কারের কাজে নিয়োজিত করলেন।

          এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফের ছহীহ্ কিতাব “আবূ দাউদ শরীফে” বর্ণিত রয়েছে,

ان الله يبعث لهذه الامة على رأس كل مأة سنة من يجدد لها دينها.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক এ উম্মতের হিদায়েতের জন্য প্রতি হিজরী শতকের মাথায় একজন দ্বীনের সংস্কারক বা মুজাদ্দিদ পাঠিয়ে থাকেন।”

          এ হাদীস শরীফের বর্ণনা মোতাবিক হুজুর পাক ছল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অবর্তমানে তাঁর নায়েব বা উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে প্রধান হলেন যামানার মুজাদ্দিদ। তাই তাঁর ইল্ম, আমল ও ইখলাছ ইত্যাদি সবকিছুই বেমেছাল।

          আরো উল্লেখ্য যে, জামানার মুজাদ্দিদগণকে আল্লাহ্পাক বেমেছাল ইলম, রূহানী কুওয়াত ও অব্যক্ত যোগ্যতা দিয়ে পাঠান। সে তুলনায় নামধারী জাহেরী আলিমগণ চরমভাবে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে এটাও তাদের বিরোধীতা ও অপপ্রচারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন, وفوق كل ذى علم عليم.

অর্থঃ- “প্রত্যেক জ্ঞানীর উপরও জ্ঞানী রয়েছে।”

(সূরা ইউসুফ/৭৬)

          হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে,

من يرد الله به خيرا يفقهه فى الدين.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক যার ভালাই চান তাকে দ্বীনের সহীহ্ সমঝ দান করেন।” (মিশকাত)

উপরোক্ত আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফের পরিপূর্ণ মেছদাক হলেন আল্লাহ্ পাক-এর ওলীগণ। যেমন আমাদের হানাফী মাযহাবের ইমাম, ইমামে আ’যম, হযরত আবূ হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ইল্ম ও সমঝের প্রশংসা করে শাফেয়ী মাযহাবের ইমাম, হযরত ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,

الفقهاء كل عيال ابى حنيفة.

অর্থঃ- “সমস্ত আলিমগণ ইল্মের দিক থেকে ইমামে আ’যম হযরত আবূ হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কাছে সন্তানতুল্য।”

          আরো বর্ণিত রয়েছে যে, “তাঁর যামানায় মানুষ মনে করত যে, হযরত ইমাম আ’যম আবূ হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি সমস্ত কিছুই জানেন।” (সুবহানাল্লাহ্)

          শুধু ইল্মই নয় আমল-আখলাক, সীরত-ছূরত, সবদিক থেকে তিনি ছিলেন বেমেছাল। তাঁর এতসব গুণাবলী ও মর্যাদা বিশেষ করে ইল্ম ও সমঝের অপরিসীম মর্যাদা তাঁকেও মানুষের কাছে শত্রু করে তুলেছে।

          এ প্রসঙ্গে কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একদা তিনি হজ্ব পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফ গেলেন। সেখানে বাইতুল্লাহ্ শরীফ তাওয়াফ কালে এক লোক তাঁকে ইশারা করে আওলার্দু রসূল হযরত ইমাম বাকের রহমতুল্লাহি আলাইহিকে দেখিয়ে কি যেন ফিস ফিস করে বললেন। ইহা দেখে হযরত ইমামে আ’যম আবূ হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর তীক্ষ্ম মেধার কারণে সহজেই বুঝতে পারলেন যে, নিশ্চয়ই এ লোকটা আওলার্দু রসূল হযরত ইমাম বাকের রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কাছে তাঁর বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ করেছে। তাই তিনি হজ্বের কার্যাদি সম্পন্ন করে আওলার্দু রসূল হযরত ইমাম বাকের রহমতুল্লাহি আলাইহি (যিনি ছিলেন তাঁর প্রথম পীর ছাহেব) তাঁর সাক্ষাতে গিয়ে একে একে তিনবার সালাম পেশ করলেন। কিন্তু প্রতিবারেই আওলার্দু রসূল হযরত ইমাম বাকের রহমতুল্লাহি আলাইহি স্বীয় মুখ মুবারক ঘুরিয়ে নিলেন। অতঃপর তিনি চতুর্থবার সালাম পেশ করে বললেন, হে আওলাদুর রসূল! আমার বেয়াদবী মাফ করুন, আমার সালাম গ্রহণ করুন। তখন তিনি তাঁর সালামের জবাব দিয়ে বললেন, তুমি নাকি আমার নানাজী সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্ নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস শরীফের বিরুদ্ধে ফতওয়া দিয়ে থাক? ইমামে আ’যম আবূ হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি অবাক হয়ে বললেন, “তাতো আমি কোন দিন করিনি হে আওলার্দু রসূল! যদি আমি আপনার নানা (হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদীস শরীফের বিরুদ্ধে ফতওয়া দিতাম তাহলে আমি ফতওয়া দিতাম যে, (১) রমজান শরীফে মেয়েরা অসুস্থ অবস্থায় নামায-রোযা উভয়ই ভঙ্গ করে থাকে। পরবর্তীতে তারা শুধু রোযাগুলি আদায় করে কিন্তু নামায আদায় করে না।

          এখন আমি যদি হাদীস শরীফের বিরুদ্ধে ফতওয়া দিতাম তাহলে আমি এই ফতওয়া দিতাম যে, মেয়েদেরকে নামাযের ক্বাযা আদায় করতে হবে, রোযার ক্বাযা আদায় করতে হবে না। কারণ রোযার চেয়ে নামাযের গুরুত্ব বেশী।  অথবা এই ফতওয়া দিতাম যে, নামায-রোযা উভয়ের ক্বাযা আদায় করতে হবে। কিন্তু তাতো আমি করিনি।

          (২) ছেলে-মেয়ে একই পিতা-মাতার সন্তান। পিতা কিংবা মাতা মারা গেলে মীরাছ থেকে মেয়ে ছেলের অর্ধেক অংশ পেয়ে থাকে। এখানে আমি যদি হাদীস শরীফের বিরুদ্ধে ফতওয়া দিতাম তাহলে এই ফতওয়া দিতাম যে, ছেলে-মেয়ে উভয়ে সমান সমান অংশ পাবে অথবা ছেলের চাইতে মেয়ে বেশী পাবে। কারণ ছেলেরা কামাই-রোজগার করতে পারে, তারা সবল। আর মেয়েরা দুর্বলা, তারা কামাই-রোজগার করতে পারে না।

          (৩) আমি আবূ হানিফা লটারী খেলাকে হারাম ফতওয়া দিয়ে থাকি। তবে আমার ফতওয়াতে ঐ লটারীকে জায়েয ও সুন্নত রেখেছি , যে লটারী আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সফরে যাওয়ার পূর্বে উম্মুল মু’মিনীন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুন্নাগণ-এর মাঝে করতেন। অর্থাৎ লটারীতে যাঁর নাম মুবারক উঠতো তাঁকে সফরে সঙ্গীনি হিসেবে নিয়ে যেতেন।”

          এহেন তত্ত্বমুলক আলোচনা শুনে  আওলার্দু রসূল হযরত ইমাম বাকির রহমতুল্লাহি আলাইহি ইমামে আ’যম আবূ হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর প্রতি ভাল করে দৃষ্টি করলেন এবং কপাল মুবারকে চুমু খেয়ে বললেন যে, “তোমার ইল্ম ও সূক্ষ্ম সমঝই তোমাকে জাহিরী আলিমদের কাছে শত্রু করে তুলেছে।” এ কারণেই সাইয়্যিদুত্বায়েফা, হযরত আবুল কাশেম জুনায়েদ রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন,

 لايبلغ الرجل عندنا مبلغ الرجال حتى يشهد فيه الف مديق من علماء الرسوم بانه زنيق وذالك لان احوالهم من وراء النقل والعقل.

অর্থঃ- “আমাদের মত কোন ব্যক্তি কামালিয়াতের দ্বারে পৌঁছতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না হাজার জাহিরী আলিম তাঁকে “কাফির” বলে সাক্ষ্য দান করে। যেহেতু আউলিয়া-ই-কিরাম-এর অবস্থা জাহিরী আলিমদের ইল্ম-আক্বল ও সমঝের বাইরে।” (আনওয়ারে কুদছিয়া/ ১২২)

          অনুরূপভাবে পূর্ববর্তী অসংখ্য আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিকে জাহিরী আলিমরা নানানভাবে জুলুম-নির্যাতন করেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার করেছে। তাদের মধ্যে গাউছুল আযম, সাইয়্যিদুল আউলিয়া হযরত বড় পীর সাইয়্যিদ আব্দুল কাদির জিলানী রহমুতল্লাহি আলাইহি, সুলতানুল আরিফীন হযরত বায়জীদ বুস্তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি, আফজালুল আউলিয়া, কাইউমে আউয়াল হযরত মুজাদ্দিদে আলফেছাসী রহমতুল্লাহি আলাইহি, মুজাদ্দিদে মিল্লাত, শাহ ওয়ালীউল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি, আমিরুল মু’মিনীন, মুজাহিদে আযম, মুজাদ্দিদে যামান, আওলাদুর রসূল, হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রমুখ।

           উল্লেখ্য, এহেন বিরোধীতা ও অপপ্রচারের একই কারণ রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে।

রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর বেমেছাল ইল্ম ও আমল, সুন্নতের সূক্ষ্মতিসূক্ষ্ম, পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ  এবং কুরআন-সুন্নাহ্র দলীল-আদিল্লাহ্র ভিত্তিতে অকাট্য, নির্ভরযোগ্য ও ছহীহ্ ফতওয়া দানের প্রেক্ষিতে তাবত দুনিয়াদার, ধর্ম ব্যবসায়ী ওলামায়ে “ছু”দের নিজেদের গোস্বায় মরে যাবার উপক্রম হয়েছে।

আল্লাহ পাক বলেন, موتوا بغيظكم.

“তোমাদের গোস্বায় তোমরা মরে যাও।” (সূরা আলে ইমরান/১১৯)

          মানুষের কাছে তাদের ইল্মী জিহালত এবং শরীয়তের খিলাফ, মনগড়া আমল প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় মরণ কামড় হিসেবে চরম বিরোধীতা শুরু করেছে। অথচ তাঁর বিরোধীতা করার ক্ষেত্রে শরয়ী কোন কারণ নেই। বরং তারা সাধারণ মানুষের কম ইল্ম, কম বুঝের সুযোগ নিয়ে এমন কিছু বিষয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এমন অপবাদ রটনা করে যা মূলতঃ সাধারণের অনেকের জানা না থাকলেও আসলে তা সুন্নত। যেমন তারা  রাজারবাগ  শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দাজিল্লুহুল আলী-এর লক্বব নিয়ে অপপ্রচার করে থাকে। অথচ লক্বব ব্যবহার করা সুন্নতুল্লাহ, সুন্নতে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

লক্বব ব্যবহারের এই মহান সুন্নত আদায়ের লক্ষ্যেই অতীতের সকল ইমাম-মুজতাহিদ, ওলী আল্লাহ্গণও স্বীয় নাম মুবারকের সাথে লক্বব ব্যবহার করেছেন

যেমন-

(১) হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ৪৮টি।

(২) হযরত ইমাম শাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ৩৭টি।

(৩) হযরত ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ৪১টি।

(৪) হযরত ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ২৮টি।

(৫) হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ৫১টি।

(৬) হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চীশ্তী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ৮২টি।

(৭) হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ২৪টি।

(৮) হযরত হাসান বছরী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ২৪টি।

(৯) হযরত ইমাম বায়হাক্বী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ৪৫টি। (১০) গত ১৪০০ হিজরীর মুজাদ্দিদ আল্লামা আবূ বকর ছিদ্দীকী ফুরফুরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ৪১টি।

(১১) হাফেযে হাদীস আল্লামা রুহুল আমীন রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ২৮টি।

(১২) হাজী এমদাদুল্লাহ্ মুহাজেরে মক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ৩৩টি।

(১৩) আল্লামা নেছারুদ্দীন রহমতুল্লাহি আলাইহি (ছারছীনা)-এর ৩০টি।

(১৪) আল্লামা আমীমুল ইহ্সান রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ২৯টি।

          অনুরূপ সর্বজনমান্য, বিশ্ববিখ্যাত সকল ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ স্বীয় নাম মুবারকের সাথে অসংখ্য লক্বব মুবারক ব্যবহার করেছেন।  আরো উল্লেখ্য যে, বর্তমানে যারা লক্ববের বিরোধীতা করছে, সেসব দেওবন্দী অথবা অতিসুন্নী তাদেরই মুরুব্বী অথবা আকাবিররাই অনেক লক্বব ব্যবহার করেছে। যেমন

(১৫) আহমদ রেজা খাঁ বেরেলভী-এর ৩১টি।

(১৬) ইবনে তাইমিয়া-এর ৩৮টি।

(১৭) রশীদ আহমদ গাঙ্গুহীর ৩২টি।

(১৮) আশ্রাফ আলী থানভীর ৬১টি।

(১৯) হুসাইন আহমদ মাদানীর ২৭টি।

(২০) খলীল আহমদ শাহরানপূরীর ৪২টি লক্বব।

          অনুরূপ ওলামায়ে দেওবন্দের আকাবিররা সবাই অসংখ্য লক্বব ব্যবহার করেছে।

(দলীলঃ মুকাদ্দামায়ে এলাউস্সুনান, মানাকেবে আবূ হানীফা, তাহাবী শরীফ, আত্তারগীব, মায়ারেফুস্ সুনান, আহকামুল কুরআন শাফী, মুয়াত্তা মালেক আওজাজুল মাসালিক, কিতাবুল হুজ্জাহ্, শরহে যুরকানী, বুখারী, উমদাতুল ক্বারী, শরহে কেরমানী, তানযীম, আশয়াতুল লুময়াত,  হাফতে মাসায়েল, আখবারুল আখইয়ার, মুঈনুল হিন্দ, আনীসুল আরওয়াহ্, দলীলুল আরেফীন, রাহাতিল মুহিব্বীন, মাকতুবাত শরীফ, সিরাতে মুজাদ্দিদে আল্ফে ছানী, তাফসীরে হাসান বছরী, দালায়েলুন্ নুবুওয়াহ্, তরীক্বত দর্পন, তাহক্বীকুল মাসায়েল, সুন্নত ওয়াল জামায়াত, নামাজ শিক্ষা, ফতওয়ায়ে আমীনিয়া, ফতওয়ায়ে ছিদ্দীক্বিয়া , হাক্বীক্বাতুল মারিফাতির রব্বানিয়া, ইত্তেহাফু আশরাফ, কাওয়ায়েদুল ফিক্বাহ্, আদাবুল মুফতী, তরীকায়ে হজ্ব, ফতওয়ায়ে রেজভিয়া, আহকামে শরীয়ত, ফতওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া, জিয়াউল কুলূব, দেওয়ানে আযীয, ইমদাদুচ্ছুলুম, ফতহুল মুলহিম, বযলুল মাযহুদ, এমদাদুল ফতওয়া, ফতওয়ায়ে দেওবন্দ, তাবলীগে দ্বীন, তামবীহুত্ ত্ববারী)

          উপরোক্ত দলীলভিত্তিক বর্ণনায় এটাই প্রমাণিত হয় যে, অতীতের সর্বজনমান্য সকল ইমাম-মুজতাহিদগণই লক্বব ব্যবহার করেছেন।

          এতদসত্ত্বেও বর্তমানে সকল দুনিয়াদার আলিমরা রাজারবাগ শরীফ-এর হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর লক্বব মুবারকের বিরোধীতা করে থাকে এবং সে অন্যায় বিরোধীতা করতে গিয়ে তারা তাঁর লক্বব মুবাকের মনগড়াভাবে শাব্দিক অর্থ  গ্রহণ করে অপব্যাখ্যা করে থাকে।

লক্ববের শাব্দিক অর্থ  গ্রহণ কি জায়েয?

স্মর্তব্য, লক্ববের ক্ষেত্রে সব লক্ববেরই শাব্দিক অর্থ  গ্রহণযোগ্য নয়। মূলতঃ কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসে এরূপ শত-সহস্র শব্দ রয়েছে যার সরাসরি শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করলে কুফরী হয়।

যেমন, (مكر)   শব্দের অর্থ- ধোকা। আল্লাহ্ পাক বলেছেন,

مكروا ومكر الله والله خير الماكرين.

অর্থঃ- “তারা ধোকা দিল আল্লাহ্ পাক মকর করলেন, আল্লাহ্ পাক উত্তম মকরকারী।” (সূরা আলে ইমরান/৫৪)

এখানে আল্লাহ্ পাক-এর শানে (مكر) শব্দের শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করলে আল্লাহ্ পাককে উত্তম ধোকাবাজ বলতে হয় অথচ ইহা সুস্পষ্ট কুফরী।

এখানে আল্লাহ্ পাক-এর শানে (مكر) শব্দের অর্থ হলো হিকমত। অনুরূপ مولانا (মাওলানা) মহান আল্লাহ্ পাক-এর একটি পবিত্র নাম মুবারক। যেমন, কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে, انت مولنا فانصرنا.

অর্থঃ- “আপনি আমাদের মাওলা বা রব। আমাদেরকে সাহায্য করুন।” (সূরা বাক্বারা/২৮৬)

          এখানে মাওলানা দ্বারা মহান আল্লাহ্ পাককে বুঝানো হয়েছে। অথচ ইহা সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ ব্যবহার করছে। তাহলে কি যারা ‘মাওলানা’ শব্দ ব্যবহার করে তারা আল্লাহ্ দাবী করে? প্রকৃতপক্ষে এসব ক্ষেত্রে শাব্দিক অর্থ গ্রহণযোগ্য নয়।

কাজেই একথা আল্লাহ পাক-এর রহমতে নির্বিবাদে সঙ্গত ও সত্য যে, রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী হারাম কাজ তো দূরের কথা বরং শরীয়তের খিলাফ একটা আদনা কাজ তথা কোন মাকরূহ কাজও তিনি করেন না। বরং তিনি সব সময় আল্লাহ পাক-এর রহমতে সার্বিক সুন্নত পালন ও যিন্দাকরণের দ্বারা সুশোভিত।

          মূলতঃ রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর লিখনি, বক্তব্যে বহুবার বলা হয়েছে ও হচ্ছে যে, “আমার কোন কথা, কোন আমল শরীয়তের খেলাফ প্রমাণ করতে পারলে তা আমি তৎক্ষনাত ছেড়ে দিব এবং যা শরীয়তসম্মত তা আমল করব। কারণ আমরা আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টি চাই এবং আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি চাই।”

আল্লাহ্ পাক বলেন, ورضوان من الله اكبر.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টিই হচ্ছে সবচেয়ে বড়।” (সূরা তওবা/৭২)

তিনি আরো বলেন,

والله ورسوله احق ان يرضوه ان كانوا مؤمنين.

অর্থঃ- “যদি তারা মু’মিন হয়ে থাকে তাহলে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো, আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সন্তুষ্ট করা। তাঁরাই সন্তুষ্টি পাওয়ার সমধিক উপযুক্ত।” (সূরা তাওবা/৬২)

অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর মতে মত এবং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পথে পথ হয়ে সন্তুষ্টি-রেজামন্দি অর্জন করাই মু’মিন-মুসলমানের একমাত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য।

          উক্ত আয়াত শরীফের পরিপূর্ণ মেছদাক হওয়ার জন্য রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী প্রতিনিয়ত দোয়া করেন, চলার কোশেশ করেন এবং কোশেশের জন্য তা’লীম ও তালক্বীন দিয়ে থাকেন।

          তিনি চান মানুষ সকলেই আল্লাহ্ ওয়ালা হোক। আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি হাছিল করুক। তাই তিনি দেশব্যাপী শত শত মাহ্ফিলে ওয়াজের ভূমিকাতেই বলে থাকেন, كونوا ربانين.

অর্থঃ- “তোমরা সকলেই আল্লাহ্ওয়ালা হয়ে যাও।” (সূরা আলে ইমরান/৭৯)

অথচ মানুষ না বুঝে, না জেনে মিথ্যা ও মনগড়াভাবে দলীল-প্রমাণ ছাড়াই তাঁর বিরোধীতা করে যদিও তাদের সে বিরোধীতা স্বল্পকালের জন্য এবং তার পরিণাম খুবই ভয়াবহ ও নিকৃষ্ট।

আল্লাহ্ পাক বলেন, ان الباطل كان زهوقا

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই বাতিল পরাভূত হবেই হবে।” (সূরা বণী ইসরাঈল/৮১)

          শুধু তাই নয়, তিনি দ্বীনের ছহীহ্ ইল্ম, আমল ও আক্বীদা যমীনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিশ্বব্যাপী প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করেছেন যাতে মানুষ হক্ব গ্রহণ করে না হক্ব ছেড়ে দেয়। অদ্যাবধি সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সাহস কারো হয়নি এবং হবেও না ইনশাআল্লাহ্।

          কাজেই কেউ যদি এমন অপপ্রচারের স্বীকার হন তার উচিৎ হবে সে অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে প্রকৃত বিষয় জানা, প্রয়োজনে রাজারবাগ শরীফে এসে প্রকৃত সত্য জানা ও ছহীহ্ সমঝ অর্জন করা।

মুহম্মদ আলী হায়দার

সাধারণ সম্পাদক- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত, চট্টগ্রাম।

সুওয়ালঃ আপনাদের “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর বিগত সংখ্যার সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগে একটি সংক্ষিপ্ত জাওয়াবে জানতে পারলাম “পীর ছাহেবের নিকট বাইয়াত হওয়া ফরয” অথচ ওহাবীদের মুখপত্র গুলো যেমন “মাসিক মদীনা আগষ্ট/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে লিখেছে “বায়আত গ্রহণ করা মোস্তাহাব।” ….

          মৌলভী আজিজুল হক্বের অখ্যাত পত্রিকা মাসিক রাহমানী পয়গাম আগষ্ট/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-জবাব বিভাগে বলা হয়েছে “কামেল পীর বুজুর্গের ……. হাত ধরে মুরীদ হওয়া ….. মুস্তাহাব।”

          হাট হাজারী মাদ্রাসার মৌলভী আহ্মদ শফীর অখ্যাত পত্রিকা মাসিক মুঈনুল ইসলাম মার্চ/৯৮ ঈঃ সংখ্যার জিজ্ঞাসা-সমাধান বিভাগে বলা হয়েছে, “পীর ছাহেবের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করা মুস্তাহাব।

          মাসিক আত্ তাওহীদ মার্চ /৯৮ ঈঃ সংখ্যায় সমস্যার সমাধান বিভাগে বলা হয়েছে “পীর ছাহেবের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করা মুস্তাহাব।”

তথাকথিত সুন্নীদের মুখপত্র মাসিক তরজুমান ডিসেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে লিখেছে “পীর-মুর্শিদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করাটা সুন্নত।”

          এখন আমার সুওয়াল হলো পীর ছাহেবের নিকট বাইয়াত হওয়া সম্পর্কে ওহাবী ও তথাকথিত সুন্নীদের মুখপত্র উক্ত অখ্যাত পত্রিকাগুলোর বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? দয়া করে দলীল আদিল্লাহ সহ বিস্তারিত ভাবে জানিয়ে আমাদের আক্বীদা বিশুদ্ধ করবেন।

জাওয়াবঃ  না, উক্ত পত্রিকাগুলোর বক্তব্য শুদ্ধ হয়নি। কারণ বাইয়াত হওয়া ফরয। বাইয়াত গ্রহণ এবং তার তর্জ-তরীক্বা নতুন কোন বিষয় নয়। কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে এ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা বর্ণিত রয়েছে। স্বয়ং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরুষ-মহিলা সকলকে বাইয়াত করিয়েছেন।

          উল্লেখ্য, বাইয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে ঈমানের যাবতীয় বিষয় অর্থাৎ আক্বীদা ও আমল শুদ্ধ করতঃ খালিছ বান্দা ও উম্মত হওয়া।

          আরো উল্লেখ্য, নবীর যামানায় ছাহাবীগণ বাইয়াত হয়েছেন নবীর কাছে কিন্তু নবীর অবর্তমানে পরবর্তী যামানায় লোকজন কার কাছে বাইয়াত হবে? যিনি নবীর ওয়ারিছ বা প্রতিনিধি হবেন তার কাছে বাইয়াত হতে হবে। এজন্য আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,

اطيعوا الله واطيعوا الرسول واولى الامر منكم.

অর্থঃ- “তোমরা ইতয়াত বা অনুসরণ কর আল্লাহ্ পাক-এর এবং রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এবং তোমাদের মধ্যে যারা উলিল আমর তথা নবীর ওয়ারিছ তাঁদের।” (সূরা নিসা/৫৯)

          হাদী বা পথ প্রদর্শকের জন্য যেই যোগ্যতা, কামালিয়াত, রূহানিয়াত ইত্যাদির প্রয়োজন নবীর ওয়ারিছ বা ওলীগণ তা ওয়ারিছ সূত্রে লাভ করেছেন। তাঁর সীনা ব সীনা এবং ছোহ্বতের মাধ্যমে এই ইল্ম সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তরফ হতে ছাহাবী, তাবেঈ, তাবে তাবেয়ী এভাবে পর্যায়ক্রমে ওলীগণের মাঝে চলে আসছে। এজন্য খালিছ খিলাফতপ্রাপ্ত ওলী যিনি কোন খালিছ ওলীর ছোহ্বতে যিক্র-ফিকির, রিয়াযত-মুশাক্কাত করে জাহির-বাতিন, ইসলাহ্ (শুদ্ধতা) লাভ করেছেন। ঈমানী, আকাঈদী, ইল্মী, আমলী সবকিছুর ক্ষেত্রে শুদ্ধতা ও পূর্ণতা হাছিল করেছেন। তাঁর নিকট বাইয়াত হওয়া ব্যতীত মুরীদের কোন রূহানী তরক্কী হবেনা। অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে নিছবত  ও তায়াল্লুক পয়দা হবেনা।

হাদীস শরীফে এর উদাহরণ রয়েছে। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, নূরে মুজাস্সাম, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

والذى نفسى بيده لا يؤمن احدكم حتى اكون احب اليه من والده وولده والناس اجمعين وفى رواية فى نفسه.

অর্থঃ- “যেই মহান আল্লাহ্ পাক-এর কুদরতী হাতে আমার প্রাণ তাঁর কছম! তোমাদের কেউই (হাক্বীক্বী) ঈমানদার হতে পারবেনা, যতক্ষণ পর্যন্ত তার নিকট আমি তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং অন্যান্য সকল মানুষ থেকে তথা সবকিছু থেকে বেশী প্রিয় না হবো।”

          অন্য বর্ণনায় এসেছে, “তার প্রাণের চেয়ে বেশী প্রিয় না হবো।” (বুখারী শরীফ-১/৭, মুসলিম শরীফ, ফতহুল বারী- ১/৪৯, মিশকাত শরীফ, মিরকাত শরীফ/১/৭৩, তানযীম-১/৪২)

          উপরোক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যখন হযরত উমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উক্ত হাদীস শরীফ শ্রবণ করলেন তখন তিনি বললেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি আপনাকে আমার সবকিছুর চেয়ে বেশী মুহব্বত করি কিন্তু এখন পর্যন্ত আমার নিজের জান বা প্রাণের চেয়ে আপনাকে অধিক মুহব্বত করতে পারিনি।”

          তা শুনে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “হে উমর! তুমি এখনও মু’মিনে কামিল হতে পারনি। হযরত ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এ জবাব শুনে কাঁদতে লাগলেন ও বলতে লাগলেন “ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! সমস্ত কিছু ত্যাগ করেছি। যেমন, পূর্বের ধর্ম, ঘর-বাড়ী ইত্যাদি। তারপরও যদি মু’মিনে কামিল না হতে পারি তাহলে কিভাবে হবো?

          তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাত মুবারক হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর ছিনা মুবারকে রেখে ফয়েজে ইত্তেহাদী দিলেন। যার ফলে হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর মধ্যে কিছুক্ষণ পূর্বে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি যে মুহব্বত ছিল ফয়েজে ইত্তেহাদীর কারণে এখন তা বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তখনই হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এখন আমার প্রাণের চেয়েও আপনাকে অনেক বেশী মুহব্বত করি; এমনকি আমার মত শত-সহস্র উমর (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু) কেও আপনার জন্য কুরবান করতে প্রস্তুত রয়েছি।”

          উল্লিখিত ঘটনায় স্বয়ং আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর ছিনা মুবারকে হাত রেখে ‘ফয়েজে ইত্তেহাদী’ প্রদান করেছেন। যার কারণে তিনি সবকিছুর চেয়েও আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মুহব্বত করে কামিল ঈমানদার হয়েছেন। অন্য কোন আমলের দ্বারা মু’মিনে কামিল হতে পারেননি।

একই ধারাবাহিকতায় হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরে যাঁরা নায়েবে নবী ওয়ারাছাতুল আম্বিয়া, হক্কানী-রব্বানী ওলী আল্লাহ্ তাঁদের মাধ্যমেই উক্ত ফয়েজে ইত্তেহাদী হাছিল করতে হয়। আর কোন মানুষই হাক্বীক্বী ঈমানদার হতে পারবেনা যতক্ষণ না সে উক্ত ফয়েজে ইত্তেহাদী হাছিল করবে।

সেজন্যেই হক্কানী ওলী আল্লাহ্গণের ছোহ্বতে যাওয়া ও তাঁদের কাছে বাইয়াত হয়ে তাঁদের ক্বালবের বরকতময় নূর দ্বারা নিজ ক্বালবকে নূরানী করা এবং তাঁদের মাধ্যমে ফয়েজে ইত্তেহাদী হাছিল করে আল্লাহ্ পাক ও হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি হাছিল করা ফরযে আইন।

          সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেরূপ হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে ফয়েজ দান করেছেন, তাঁর অনুসরণে নায়েবে নবী ওয়ারাছাতুল আম্বিয়া তথা হক্কানী ওলী আল্লাহ্গণও স্বীয় মুরীদদের অন্তরকে ফয়েজের দ্বারা নূরানী করে থাকেন, এটা সম্পূর্ণরূপেই কুরআন-সুন্নাহ্সম্মত যা নিম্নোক্ত দলীল ভিত্তিক বর্ণনা দ্বারা প্রতিয়মান হয়।

          যেমন, “মিশকাত শরীফের” ৬৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “আমি আল্লাহ্ পাককে উৎকৃষ্ট গুণসম্পন্ন দেখেছিলাম। অতঃপর আল্লাহ্ পাক বললেন, ‘হে মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! ফেরেশ্তাগণ কি বিষয়ে আলোচনা করেন?’ আমি বললাম, আপনি শ্রেষ্ঠতম অভিজ্ঞ অন্তর্যামী। তৎপরে আল্লাহ্ পাক-এর রহমতের জ্যোতি আমার অন্তরে নিক্ষেপ করলেন, এতে আমি এর শীতলতা আপন হৃদয়ে অনুভব করতে লাগলাম এবং আমি আকাশ ও ভূতলস্থিত যাবতীয় বিষয় অবগত হলাম।

          অন্য হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, “হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্তরে আল্লাহ্ পাক-এর রহমতের জ্যোতি অর্পিত হয়েছিলো, এটাকেই ফয়েয বলে। যা তাওয়াজ্জুহ্-এর মাধ্যমে দেয়া হয়েছে ।

          “ছহীহ্ বুখারী শরীফের” ১ম খন্ডের ৩য় পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হেরা গুহায় তাশরীফ এনেছিলেন এমতাবস্থায় হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম তাঁর নিকট আগমণ করে বললেন, “আপনি পড়ণ্ডন।” হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আমি  পাঠক নই।” তৎপরে তিনি আমাকে এরূপভাবে জড়িয়ে ধরলেন যে, আমার নিশ্বাস রূদ্ধ হতে লাগলো। তৎপরে তিনি আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, “আপনি পড়ুন।” আমি বললাম, “আমি পাঠক নই।” তৎপরে তিনি আমাকে দ্বিতীয়বার জড়িয়ে ধরলেন এবং আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হচ্ছিল তারপরে তিনি আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, “আপনি পড়ুন।” আমি বললাম, “আমি পাঠক নই।” তৎপরে তিনি তৃতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হচ্ছিল, তৎপরে তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে “ইক্বরা” সূরার পাঁচখানা আয়াত শরীফ পড়লেন।” তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত আয়াত শরীফসমূহ পাঠ করলেন ও সে আয়াত শরীফসহ প্রত্যাবর্তন করলেন, তখন তাঁর হৃদয় স্পন্দিত হচ্ছিল।

          হযরতুল আল্লামা শাহ্ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি আমপারার তাফসীরের ৩০৭/৩০৮ পৃষ্ঠায় “সূরা আ’লাকের” ব্যাখ্যায় লিখেছেন, “উপরোক্ত ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম আল্লাহ্ পাক-এর নির্দেশে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জড়িয়ে ধরে আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ থেকে তাঁর পাক আত্মার (পাক রূহের) মধ্যে অতি মাত্রায় জ্যোতি বা ফয়েজ (আছর) নিক্ষেপ করেছিলেন।

          উপরোক্ত বর্ণনায় আখিরী নবী, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ থেকে যে নিয়ামতপ্রাপ্ত হয়েছেন ইল্মে তাছাউফের পরিভাষায় তাকেই ফয়েজ বলে যা তাওয়াজ্জুহ্-এর মাধ্যমে দেয়া হয়। যা তিনি হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকেও দান করেছিলেন।

আল্লামা মাওলানা শাহ্ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি “তোহ্ফা এছনা আশারিয়া” কিতাবের ২১ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,  আল্লাহ্ পাক আমার হৃদয়ে যা কিছু নিক্ষেপ করেছেন আমি তৎসমূদয় হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর হৃদয়ে নিক্ষেপ করেছি।”

এ স্থলেও হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর চির সহচর হযরত আবূ বকর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর হৃদয়ে ফয়েজ দান করেছিলেন।

          “তাফসীরে দুররে মানছুর” কিতাবে বর্ণিত আছে, “হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে খোলা তরবারীসহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শহীদ করার জন্যে তাঁর নিকট পৌঁছলে হযরত নবী করিম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দু’হাত ধরেছিলেন। এতে  তাঁর সমস্ত শরীর প্রকম্পিত হলো ও তাঁর হাত হতে তরবারী মাটিতে পড়ে গেল। তিনি তৎক্ষনাৎ কলেমা শরীফ পাঠ করে মুসলমান হয়ে গেলেন।”

          এ হাদীস শরীফের দ্বারাও প্রমাণ হলো যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে ফয়েজ প্রদান করেছেন।

          যেমন, “বুখারী শরীফের” ২২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, আমি বলেছিলাম, ‘ইয়া রসূলাল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্, ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি আপনার নিকট অনেক হাদীস শরীফ শুনে থাকি কিন্তু তা ভুলে যাই।” হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তোমার চাদরটি বিছিয়ে ধর, আমি বিছিয়ে ধরলাম।” হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই হাত মুবারক দ্বারা এর দিকে ইশারা করে বললেন, “তুমি উঠিয়ে নাও।” আমি এটা উঠিয়ে নিলাম। তৎপরে আমি আর কিছু ভুলিনি।”

          উক্ত হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর অন্তরে তাওয়াজ্জুহ্-এর মাধ্যমে ফয়েজ প্রদান করেছিলেন। এর প্রভাবে তাঁর হৃদয় এমন প্রভাবসম্পন্ন হয়েছিল যে, তিনি আর কখনও কোন হাদীস শরীফ ভুলে যাননি।

          “শেফা কাজী আয়ায” কিতাবের ১/১৩২/২৩৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, “হযরত হামজাহ্ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হযরত শায়বা ইবনে ওছমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর পিতা ও চাচার (পিতৃব্যের) প্রাণ বধ করেছিলেন। সেই হযরত শায়বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হুনাইন যুদ্ধের দিনে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একা পেয়ে বলতে লাগলেন, অদ্য আমি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট হতে এর প্রতিশোধ নিব। এ কথা বলে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পশ্চাৎদিক হতে তাঁর উপর আঘাত করার উদ্দেশ্যে তরবারী উঠালো। হযরত শায়বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেছেন, যে সময় আমি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অতি নিকটবর্তী হলাম সে সময় বিদুৎ অপেক্ষা অধিকতর দ্রুতগতিতে একটি অগ্নিশিখা আমার নিকট ধাবিত হলো এতে আমি পলায়ন করতে লাগলাম। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার এ অবস্থা দেখে আমাকে ডাকলেন। আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হলে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার বক্ষের উপর নিজ হাত মুবারক রাখলেন। অথচ তিনি আমার নিকট সর্বাপেক্ষা অধিক অপ্রিয় ও অপছন্দনীয় ছিলেন। তৎপরে তিনি যখন হাত মুবারক উঠিয়ে নিলেন তখন তিনি আমার নিকট সর্বাপেক্ষা অধিক প্রীতিভাজন হয়ে গেলেন। এমতাবস্থায় হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, তুমি নিকটে গিয়ে যুদ্ধ কর। আমি তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে কাফিরদের উপর তরবারীর আঘাত করতে লাগলাম এবং তাঁর রক্ষণাবেক্ষণ করতে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতে উদ্যত হলাম। যদি সে সময় হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আমার পিতাকে দেখতাম তবে আমি তার উপরও তরবারীর আঘাত করতাম।”

          এ স্থলে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তাওয়াজ্জুহ্-এর মাধ্যমে ফয়েজ প্রদান করায় হযরত শায়বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কুফরী ও শত্রুতা ত্যাগ করে খাছ খাদিম ও ঈমানদার হয়েছিলেন।

          হযরত ফজলা ইবনে আমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা শরীফ বিজয় লাভ হওয়ার বছর কা’বা শরীফ তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করছিলেন। এমতাবস্থায় আমি তাঁর প্রাণ বধ করতে ইচ্ছা করলাম। যখন আমি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকটবর্তী হলাম তখন তিনি বললেন, “হে ফজলা!” আমি হুজুর বলে উত্তর দিলাম। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তুমি মনে মনে কি চিন্তা করতেছ?” আমি বললাম, কিছু না। এতে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্মিত হেসে আমার জন্য আল্লাহ্ পাক-এর নিকট ক্ষমা চাইলেন এবং নিজের হাত মুবারক আমার বক্ষের উপর রাখলেন। তখন আমার মন শান্তিপ্রাপ্ত হলো। আল্লাহ্ পাক-এর কছম! হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাত মুবারক  উঠাতে না উঠাতেই আমার নিকট এরূপ মনে হলো, যেন আল্লাহ্ পাক হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপেক্ষা আমার সমধিক প্রিয়পাত্র আর কাউকে সৃষ্টি করেননি।”

          এ স্থলেও হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাওয়াজ্জুহ-এর মাধ্যমে ফয়েজ প্রদানের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।

          কামিল পীর ছাহেবগণ মানুষের হৃদয়ে এ ধরণেরই ফয়েজ, আছর বা আধ্যাত্মিক জ্যোতি অর্পণ করেন আর একেই তরিক্বতপন্থীগণ ফয়েজ নামে অভিহিত করেন।

ফয়েজের প্রকারভেদ

          ফয়েজ চার প্রকার- প্রথম “ফয়েজে ইন্য়েকাছী।” যেমন, কোন ব্যক্তি আতর শরীরে মর্দন করে কোন মজলিশে উপস্থিত হলে তার সুঘ্রাণে মজলিশের সমস্ত লোক মোহিত হয়। এটা সাধারণ ও প্রাথমিক পর্যায়ের ফয়েজ। কেননা, সেই ব্যক্তি তথা হতে প্রস্থান করলে আর উক্ত সৌরভ বা সুঘ্রাণ স্থায়ী থাকেনা। এরূপ কোন ওলী আল্লাহ্ একস্থানে উপস্থিত হলে তাঁর রূহানী ফয়েজ বা আন্তরিক জ্যোতির প্রভাবে সাধারণ লোক বিমোহিত হতে থাকে। আর এর কারণেই উক্ত এলাকার মৃত ব্যক্তিরাও ফায়দা হাছিল করে থাকে।

          দ্বিতীয় “ফয়েজে ইল্ক্বায়ী।” যেমন, কোন ব্যক্তি তার প্রদীপকে অন্য ব্যক্তির প্রদীপের আগুন দ্বারা প্রজ্জ্বলিত করে নেয়। এই প্রকার ফয়েজ প্রথম প্রকার ফয়েজ অপেক্ষা অধিক প্রভাবযুক্ত হয়ে থাকে। কেননা, কিছুকাল এর প্রভাব স্থায়ী থাকে কিন্তু প্রবল বাতাস প্রবাহিত হলে এটা নির্বাপিত হয়ে যায়। এতে নফ্ছ ও লতিফাসমূহ সম্পূর্ণরূপে পরিমার্জিত হয়না।

          তৃতীয় “ফয়েজে ইছলাহী।” যেমন, কোন ড্রেন বা নালা দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। উক্ত ড্রেন বা নালাতে যদি কোন ময়লা, তৃণ, ঘাস বা দুব্বা ইত্যাদি পড়ে তৎক্ষনাৎ তা দূরীভূত হয়ে উক্ত ড্রেন বা নালা পরিস্কার হয়ে যায়। তবে যদি কোন বড় আকারের পাথর বা মাটির টুকরা উক্ত ড্রেন বা নালায় পড়ে তবে তা বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রকার ফয়েজের প্রভাব অনেককাল স্থায়ী হয়ে থাকে। এতে স্থুল ও সূক্ষ্ম লতিফা সকল পরিমার্জিত হয়ে থাকে। এ প্রকার ফয়েজকে ফয়েজে ইছলাহী বলে।

          চতুর্থ “ফয়েজে ইত্তেহাদী।” পীর ছাহেব নিজ নিজ আত্মাকে (কামিল রূহকে) দৃঢ়তার সাথে মুরীদের আত্মার সাথে সংযোগ করেন। এতে পীর ছাহেবের আত্মার প্রভাব মুরীদের আত্মায় প্রবেশ করে, এটা সর্বাপেক্ষা প্রবল ফয়েজ। কারণ, উভয় আত্মার সংযোগে পীর ছাহেবের সমস্ত কামালত (আত্মিক ক্রিয়া) মুরীদের আত্মায় প্রভাব বিস্তার করে।

          হযরত খাজা বাকী বিল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বর্ণিত আছে যে, এক সময় তাঁর বাড়িতে কয়েকজন মেহমান আগমণ করেন। কিন্তু তাঁদের খাবারের উপযুক্ত কোন খাদ্য-সামগ্রী তাঁর বাড়ীতে ছিলনা। এই হেতু তিনি খাদ্য সংগ্রহ করতে নিকটবর্তী নান ভাইয়ের হোটেলে গেলেন এবং নান ভাইকে বললেন, “আমাকে আপাততঃ বাকীতে কিছু খাবার দাও মেহমানদারী করার জন্য। পরে আমি শোধ করে দিব। তুমি যা চাইবে তাই দিব। অর্থাৎ যত টাকা চাইবে তত টাকাই দিব। নান ভাই বললো, “বেশ আপনার যতটুকু খাদ্য দরকার নিয়ে যান পরে ফয়সালা হবে। হযরত বাকী বিল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি নান ভাই-এর দোকান থেকে রুটি ও অন্যান্য খাদ্য নিয়ে মেহ্মানদারী করে মেহ্মানদেরকে বিদায় করলেন। অতঃপর কোন এক সময় নান ভাইকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি তোমার খাদ্যের মূল্য কত বা কি চাও?” তখন নান ভাই বললেন, “আমি যা চাই আপনি কি সত্যিই তাই দিবেন?” তখন হযরত বাকী বিল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “হ্যাঁ, তুমি যা চাও আমি তা দিব।” তখন নান ভাই বললো, “আমি চাই আপনি আমাকে আপনার মত করে দিবেন।” এটা শুনে হযরত বাকী বিল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “তুমি বল কি? আমি তো একথা বলিনি। বরং আমি বলেছি তুমি যত টাকা চাও আমি তত টাকাই দিব।” কিন্তু নান ভাই সে তার কথার উপর দৃঢ় রইলো যে, তাকে হযরত বাকী বিল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মত করে দিতে হবে। নান ভাইকে এ কথার উপর দৃঢ় দেখে হযরত বাকী বিল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “তুমি তো তাহলে বাঁচবে না।” এটা শুনে নান ভাই বললো, আপনার মত হয়ে আমার ইন্তিকাল করলেও কামিয়াবী।” তখন হযরত বাকী বিল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “তাহলে তুমি তোমার স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন থেকে বিদায় নিয়ে আস।” তখন সত্যিই নান ভাই স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজন থেকে বিদায় নিয়ে হযরত বাকী বিল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর খিদমতে উপস্থিত হলেন। অতঃপর হযরত বাকী বিল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি নান ভাইকে নিয়ে সকাল বেলা তাঁর হুজরা শরীফে প্রবেশ করলেন। যোহ্রের কিছুক্ষণ পূর্বে হযরত বাকী বিল্লাহ্ রমহতুল্লাহি আলাইহি নান ভাইকে নিয়ে বের হলেন এমন অবস্থায় যে, বাহ্যিক আকার-আকৃতি দেখে কে হযরত বাকী বিল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি আর কে নান ভাই তা চেনা সম্ভব ছিলনা। হযরত বাকী বিল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি নান ভাইকে এমন ফয়েজে ইত্তেহাদী দিয়েছিলেন যে, তার সমস্ত কিছু পরিবর্তিত হয়ে হুবহু হযরত বাকী বিল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর অনুরূপ হয়েছিলেন। তবে এতটুকু পার্থক্য ছিল যে, হযরত বাকী বিল্লাহ্ রহমতুল্লাহি আলাইহি সম্পূর্ণ সুস্থ আর নান ভাই ফয়েজের কারণে এমন অসুস্থ হয়েছিলেন যে, স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও পারছিলেন না। অবশেষে ফয়েজ সহ্য করতে না পেরে নান ভাই তিন দিন পর ইন্তিকাল করেন।

          আল্লামা, মাওলানা শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “কাওলুল জামিল” গ্রন্থে লিখেছেন, “পীর ছাহেব নিজের লতিফা কিংবা সর্বাঙ্গে জিকির জারী করে কিংবা নিজে মোরাকাবার নূরে আলোকিত হয়ে সজোরে উক্ত জিকির কিংবা নূর মুরীদের লতিফা  বা সর্বাঙ্গে নিক্ষেপ করেন এতে উক্ত লতিফা বা সর্বাঙ্গে  জিকির জারী হয়ে যায় বা নূরে আলোকিত হয়ে যায়, একেই তাওয়াজ্জুহ্ বলে। যার মাধ্যমে ফয়েজ পৌঁছানো হয়। এরূপ তাওয়াজ্জুহ্ দানের বহু দলীল কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে।

          এরূপ ফয়েজ হাছিল করেই হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ পরিপূর্ণ ঈমানদার হয়ে আল্লাহ্ পাক ও হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি হাছিল করেছেন। সুতরাং প্রতিটি মুসলমান নর ও নারীর জন্যও আল্লাহ্ পাক ও হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি হাছিল করা ফরযে আইন।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ পাক পবিত্র কালামে পাকে ইরশাদ করেন,

يايها الذين امنوا اتقوا الله وكونوا مع الصدقين.

অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ পাককে ভয় কর এবং ছদেক্বীন বা সত্যবাদীগণের সঙ্গী হও।” (সূরা তওবা/১১৯)

          উপরোক্ত আয়াত শরীফে ছদেক্বীন দ্বারা তাঁদেরকেই বুঝানো হয়েছে, যাঁরা জাহির-বাতিন, ভিতর-বাহির আমল-আখলাক, সীরত-ছূরত, ক্বওল-ফে’ল সর্বাবস্থায় সত্যের উপর কায়েম রয়েছেন। অর্থাৎ যাঁরা ইল্মে ফিক্বাহ্ ও ইল্মে তাসাউফে তাক্মীলে (পূর্ণতায়) পৌঁছেছেন। এক কথায় যাঁরা আল্লাহ্ পাক-এর মতে মত এবং আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পথে পথ হয়েছেন এবং সর্বদা আল্লাহ্ পাক-এর যিকিরে মশগুল অর্থাৎ যাঁরা কামিল পীর বা মুর্শিদ, তাঁদেরকে বুঝানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক আরো বলেন,

واصبر نفسك مع الذين يدعون ربهم بالغدوة والعشى يريدون وجهه.

অর্থঃ- “আপনি নিজেকে তাঁদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন, যাঁরা সকাল-সন্ধায় তাঁদের রবকে ডাকে তাঁর সন্তুষ্টি হাছিলের জন্য।” (সূরা কাহ্ফ/২৮)

          অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টি হাছিলের জন্য ক্বাল্বী যিকির করেন, তাঁর অনুসরণ ও ছোহ্বত এখতিয়ার করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আল্লাহ্ পাক এ প্রসঙ্গে আরো বলেন,

واتبع سبيل من اناب الى.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি আমার দিকে রুজু হয়েছেন, তাঁর পথকে অনুসরণ কর।” (সূরা লুক্বমান/১৫)

          কামিল মুর্শিদের গুরুত্ব সম্পর্কে কালামুল্লাহ্ শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে,

من يهد الله فهو المهتد ومن يضلل فلن تجد له وليا مرشدا.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক যাঁকে হিদায়েত দান করেন, সেই হিদায়েত পায়। আর যে ব্যক্তি গোমরাহীর মধ্যে দৃঢ় থাকে, তার জন্যে কোন ওলীয়ে মুর্শিদ (কামিল পীর) পাবেনা।” (সূরা কাহ্ফ/১৭)

          অর্থাৎ যারা কামিল মুর্শিদের নিকট বাইয়াত হয়না তারা পথভ্রষ্ট। কারণ তখন তাদের পথ প্রদর্শক হয় শয়তান। তাই সুলতানুল আরিফীন, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী রহমতুল্লাহি আলাইহি, সাইয়্যিদুত্ ত্বয়েফা, হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হুজ্জাতুল ইসলাম, ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহিসহ আরো অনেকেই বলেন যে,

من ليس له شيخ فشيخه شيطان.

অর্থঃ- “যার কোন পীর বা মুর্শিদ নেই তার মুর্শিদ বা পথ প্রদর্শক হলো শয়তান।” (ক্বওলুল জামীল, নূরুন আলা নূর, তাছাউফ তত্ত্ব)

আর শায়খ বা পীর ছাহেবের গুরুত্ব সম্পর্কে হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, الشيخ لقومه كالنبى فى امته.

অর্থঃ- “শায়খ (পীর ছাহেব) তাঁর ক্বওমের মধ্যে তদ্রুপ, যেরূপ নবী আলাইহিস্ সালাম তাঁর উম্মতের মধ্যে।” (দায়লামী, মকতুবাত শরীফ)

          অর্থাৎ নবী আলাইহিস্ সালাম-এর দ্বারা যেরূপ উম্মতের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন সবক্ষেত্রে ইছলাহ্ লাভ হয়, সেরূপ শায়খ বা পীর ছাহেবের দ্বারাও মুরীদের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন সবক্ষেত্রে ইছলাহ্ লাভ হয়।

          অতএব, নবী আলাইহিস্ সালাম-এর উম্মত না হয়ে যেরূপ হিদায়েত লাভ করা যায়না, তদ্রুপ কামিল মুর্শিদ বা পীর ছাহেবের নিকট বাইয়াত না হয়েও ইছলাহ্ বা পরিশুদ্ধতা লাভ করা যায়না। বরং শয়তানী প্রবঞ্চনায় পড়ে গোমরাহীতে নিপতিত হওয়াই স্বাভাবিক।

          আর এ কারণেই জগত বিখ্যাত আলিম, আলিমকুল শিরমনি, শ্রেষ্ঠতম মায্হাব হানাফী মায্হাবের প্রতিষ্ঠাতা, ইমামুল আইম্মা, ইমামুল আকবর, হযরত ইমাম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, لولا سنتان لهلك ابو نعمان.

অর্থঃ- “(আমার জীবনে) যদি দুটি বৎসর না হতো, তবে আবু নোমান (আবু হানীফা) ধ্বংস হয়ে যেত।” (সাইফুল মুকাল্লেদীন, ফতওয়ায়ে ছিদ্দীকিয়া) অর্থাৎ আমি আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি যদি আমার শায়খ বা পীর ছাহেব ইমাম বাকের ও ইমাম জা’ফর ছাদিক রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট বাইয়াত না হতাম, (ফয়েজ লাভ না করতাম) তবে (শয়তানী প্রবঞ্চনায়) ধ্বংস বা বিভ্রান্ত হয়ে যেতাম।

          সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, যে ব্যক্তি কোন কামিল মুর্শিদের নিকট বাইয়াত না হবে এবং ফয়েজ লাভ না করবে তার পক্ষে শয়তানী প্রবঞ্চনা ও বিভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকা আদৌ সম্ভব নয়। কেননা পীর ছাহেবের নিকট বাইয়াত হওয়া ও ফয়েজ লাভ ব্যতীত ক্বাল্বে যিক্র জারি করা অসম্ভব। আর ক্বাল্বে যিক্র জারি করা ব্যতীত শয়তানী ওয়াস্ওয়াসা থেকে বেঁচে থাকাও সম্ভব নয়। তাই পরিশুদ্ধতা লাভ করার জন্য বা ক্বাল্বে যিকির জারি করার জন্য অবশ্যই একজন কামিল মুর্শিদের নিকট বাইয়াত হতে হবে এবং তাঁর নিকট হতে ফয়েজ লাভ করতে হবে।

          আর তাই এ যাবত পৃথিবীতে যত ইমাম-মুজতাহিদ ও আওলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম আগমণ করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকেই কোন না কোন একজন পীর ছাহেবের নিকট বাইয়াত হয়েছেন, ফয়েজ হাছিল করেছেন এবং তাঁদের অনেকেই তাঁদের স্ব-স্ব কিতাবে পীর ছাহেবের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করাকে ফরয বলেছেন।

          যেমন- গাউসুল আ’যম, মাহ্বুবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, ইমামুল আইম্মা, হযরত বড় পীর আব্দুল কাদির জ্বিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী কিতাব “সিররুল আসরারে” লিখেন,

ولذالك طلب اهل التلقين لحياة القوب فرض.

অর্থঃ-“ক্বাল্ব জিন্দা করার জন্য অর্থাৎ অন্তর পরিশুদ্ধ করার জন্য “আহলে তালক্বীন” তালাশ করা বা কামিল মুর্শিদের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করা ফরয। অনুরূপ ‘ফাতহুর রব্বানীতে’ও উল্লেখ আছে।”

          তদ্রুপ হুজ্জাতুল ইসলাম, ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিশ্ব সমাদৃত কিতাব “ক্বিমিয়ায়ে সায়াদাতে”, কাইউমুয্যামান হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে সানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “মাকতুবাত শরীফে”, আওলাদে রসূল, আশেক্বে নবী, হযরত আহ্মদ কবীর রেফাঈ রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর “আল বুনিয়ানুল মুশাইয়্যাদ” কিতাবে উল্লেখ করেন যে, অন্তর পরিশুদ্ধ করার জন্য বা ইল্মে তাছাউফ অর্জন করার জন্য একজন কামিল মুর্শিদের নিকট বাইয়াত হওয়া ফরয। অনুরূপ “তাফসীরে রুহুল বয়ান, রুহুল মায়ানী ও কবীরে” উল্লেখ আছে।

          মূলতঃ কামিল মুর্শিদ বা পীর ছাহেব হলেন, অন্তর পরিশুদ্ধ করতঃ বেলায়েত হাছিল করে মহান আল্লাহ্ পাক-এর খাছ নৈকট্য লাভ করার এক বিশেষ উছীলা বা মাধ্যম। আর তাই মহান আল্লাহ্ পাক পবিত্র কালামে পাকে ইরশাদ করেন,

يايها الذين امنوا وابتغوا اليه الوسيلة.

অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ পাক-এর নৈকট্য লাভ করার জন্য উছীলা তালাশ (গ্রহণ) কর।” (সূরা মায়িদা/৩৫)

          এ আয়াত শরীফের তাফসীরে বা ব্যাখ্যায় “তাফ্সীরে রুহুল বয়ানে” উল্লেখ আছে যে,

الوصول لايحصل الا بالوسيلة وهى العلماء الحقيقة ومشائخ الطريقة.

অর্থঃ- “উছীলা ব্যতীত আল্লাহ্ পাক-এর নৈকট্য লাভ করা যায়না। আর উক্ত উছীলা হচ্ছেন, হাক্বীক্বত ও তরীক্বতপন্থী আলিম বা মাশায়িখগণ অর্থাৎ কামিল মুর্শিদগণ।”

          উপরোক্ত দলীলভিত্তিক বিস্তারিত আলোচনা দ্বারা সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হলো যে, সন্তুষ্টি অর্জন বা কামিল মু’মিন হতে হলে কোন মু’মিন নর ও নারীর পক্ষে শুধুমাত্র আমলের দ্বারা হওয়া সম্ভব নয়। যেমন, সম্ভব হয়নি হযরত ওমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর পক্ষে। এই সন্তুষ্টি অর্জন বা কামিল মু’মিন হতে হলে রূহানী ফয়েজ অর্জন করা ফরয। যেমন, ফরয হয়েছিল হযরত ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর। আর রূহানী ফয়েজ অর্জন করতে হলে পীরানে তরীক্বত বা মাশায়েখে এজাম বা হক্কানী-রব্বানী ওলী আল্লাহ্র নিকট বাইয়াত হওয়া ফরয।

          {দলীলসমূহঃ (১) রুহুল মায়ানী, (২) মাযহারী, (৩) কবীর, (৪) রুহুল বয়ান, (৫) দুররে মুনছুর, (৬) বুখারী, (৭) মুসলিম , (৮) দায়লামী,  (৯) মিশকাত, (১০) ফতহুল বারী, (১১) ওমদাতুল ক্বারী, (১২) মিরকাত, (১৩) তানযীম,  (১৪) মিনহাযুল আবেদীন, (১৫) ইহ্ইয়াউ উলুমিদ্দীন, (১৬) সিররুল আসরার, (১৭) মকতুবাতে মাছূমিয়া, (১৮) ফতহুল গায়ব, (১৯) আল বুনিয়ানুল মুশাইয়্যাদ, (২০) রিসালায়ে কুশাইরিয়া, (২১) মছনবী শরীফ, (২২) ফতুহাতে মক্কিয়া, (২৩) ফাতহুর রব্বানী,  (২৪) মাবদা মা’য়াদ, (২৫) মায়ারিফে লাদুন্নিয়া, (২৬) সিরাজুস্ সালেকীন, (২৭) ইমদাদুস্ সুলূক, (২৮) আল বুরহানুল মু’ইয়াদ, (২৯) তাছাউফ তত্ত্ব, (৩০) শেফা- কাজী আয়ায, (৩১) ইরশাদুত্ ত্বলেবীন, (৩২) কাওলুল জামিল, (৩৩) তুহ্ফা ইছনা আশারিয়া, (৩৪) মাকতুবাত শরীফ, (৩৫) নূরুন আলা নূর, (৩৬) সাইফুল মুকাল্লেদীন, (৩৭) তা’লীমে মারিফত, (৩৮) ফতওয়ায়ে ছিদ্দীক্বিয়া, (৩৯) ইরশাদে খালেক্বীন, (৪০) মুকাশিফাতে আইনিয়া, (৪১) ক্বিমিয়ায়ে সায়াদাত, (৪২) আওয়ারিফুল মায়ারিফ, (৪৩) আলমুনকিযু মিনাদ্দালাল, (৪৪) তাবলীগে দ্বীন, (৪৫) লুময়াত, (৪৬) শরহে ফতহুল গায়ব, (৪৭) শেফাউল আলীল, (৪৮) শরহে ইহ্ইয়াউ উলূমিদ্দীন, (৪৯) দেওয়ানে হাফিয ইত্যাদি}

সাইয়্যিদ মুহম্মদ মোক্তাদুল ইসলাম (মিলন)

সভাপতি- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত

সুবহানী ঘাট, সিলেট।

সুওয়ালঃ রেযাখানী মাযহাবের মূখপত্র ডিসেম্বর/২০০০ঈঃ সংখ্যায় তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুনিয়াতুত তালিবীন, রেজভীয়া কিতাবের বরাত দিয়ে বলেছে, “সহীহ্ মুসলিম শরীফ সহ অনেক নির্ভর যোগ্য কিতাবে নফল নামায বিশেষতঃ ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামাত সহকারে আদায় করা বৈধ…….।”

          আর আপনারা মাসিক আল বাইয়্যিনাতে লিখেছেন তারাবীহ, ছলাতুল কুছুফ, (সূর্য গ্রহণের নামায) ছলাতুল ইস্তেস্কা, (বৃষ্টির নামায) এইতিন প্রকার নামায ব্যতীত যেমন লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতুল বরাত, তাহাজ্জুদ, চাশ্ত, আওয়াবীন ইত্যাদি নফল নামায সমূহ ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহ্রীমী ও বিদ্য়াতে সাইয়্যিয়াহ্। কোনটি সঠিক? আর বুখারী, মুসলিম শরীফে কি ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করার কথা উল্লেখ আছে? দয়া করে জানাবেন।

জাওয়াবঃ রেযাখানী মুখপত্রের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল, জিহালতপূর্ণ ও প্রতারণামূলক যা শরীয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা “তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুনিয়াতুত্ তালেবীন” ইত্যাদি কিতাবের নাম দিয়ে যে বক্তব্য প্রদান করেছে আসলে উক্ত কিতাবসমূহের বক্তব্য সে রকম নয়। বরং তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

তারা “তাফসীরে রুহুল বয়ান-এর ইবারতের অর্থে “শরহে নেকায়া ও মুহিত” কিতাবের এবং “বুখারী শরীফের” বরাত দিয়ে নফল নামায বিশেষতঃ “শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায আযান ইক্বামত ছাড়া জামায়াত সহকারে আদায় করা যে বৈধ বলেছে তা আমরা আমাদের “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” এর গত সংখ্যাগুলোতে বিস্তারিত ভাবে বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেছি যে, তাদের বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল, জিহালতপূর্ণ, জালিয়াতী ও প্রতারণামূলক।

          কারণ তারা কিতাবের ইবারত, সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েই ইবারত কারচুপি করে “বুখারী শরীফের” বরাত দিয়ে কিতাবের নাম ব্যবহার করে যেটা বলতে চেয়েছে আসলে “বুখারী শরীফের” বক্তব্য সে রকম নয়। কেননা রেযাখানীরা “বুখারী শরীফের” ১ম খন্ডের ১৫৮ পৃষ্ঠার বরাত দিয়ে যে হাদীস শরীফটি উল্লেখ করেছে উক্ত হাদীস শরীফে “শবে বরাত ও শবে ক্বদরের” নামায জামায়াত সহকারে আদায় করার কোন বর্ণনাই নেই। সুতরাং রেযাখানীরা কিতাবের নাম ব্যবহার করে যে প্রতারণা করেছে “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর গত সংখ্যাগুলোর আলোচনা দ্বারাই তা প্রমাণিত হয়েছে। এর পরেও যদি প্রয়োজন হয় তাহলে পরবর্তীতে আরো বিস্তারিত ভাবে দলীল আদিল্লাহ্সহ বুখারী শরীফের বক্তব্য ধারাবাহিক ভাবে পর্যালোচনা করা হবে ইন্শাআল্লাহ্।

(ধারাবাহিক)

বর্তমান সংখ্যায় “মুসলিম শরীফের” বক্তব্য

বিস্তারিত ভাবে পর্যালোচনা করা হলো-

          উল্লেখ্য, রেযাখানীরা আযান-ইক্বামত ছাড়া নফল নামায বিশেষতঃ “শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াত সহকারে আদায় করা বৈধ বলে “মুসলিম শরীফের” ১ম খন্ডের বরাত দিয়ে যে হাদীস শরীফ উল্লেখ করেছে উক্ত হাদীস শরীফে “শবে বরাত ও শবে ক্বদরের” নামায জামায়াত সহকারে আদায় করার কোন বর্ণনাই নেই। সুতরাং প্রমাণিত হলো, “শবে বরাত শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াতের সহিত আদায় করা যাবে না।”

          দ্বিতীয়তঃ তারা “মুসলিম শরীফের” ১ম খন্ডের বরাত দিয়ে হাদীস শরীফের যে অর্থ উল্লেখ করেছে তা হাদীস শরীফের হুবহু অর্থ নয়।

          তৃতীয়তঃ তারা “মুসলিম শরীফের” হাদীস শরীফ খানার অনুবাদের শুরুতে বলেছে “হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর দাদী হযরত মুলায়কাহ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা……।”

          রেযাখানীদের এ বক্তব্য ভুল হয়েছে। কারণ হযরত মুলাইকা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা, হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর দাদী নন। বরং হযরত মুলাইকা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা হলেন হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর মা।

          আর হাদীস শরীফে এ কথা বলা হয়নি যে, হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর দাদী হযরত মুলাইকা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা। বরং হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে, (ان جدته مليكة) তাঁর দাদী মুলাইকা। এখন আসুন পর্যালোচনা করে দেখি (ان جدته مليكة) তাঁর দাদী মুলাইকা বলতে কার দাদীকে বুঝানো হয়েছে?

          এর জবাবে “মুসলিম শরীফ” ১ম খন্ড ২৩৪ পৃষ্ঠায় উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে,

 (ان جدته مليكة) الصحيح انها جدة اسحق فتكون ام انس لان اسحق ابن اخى انس لامه.

অর্থঃ- তার দাদী মুলাইকা বলতে “ছহীহ্ বা বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে, নিশ্চয়ই তিনি অর্থাৎ হযরত মুলাইকা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা হলেন হযরত ইসহাক রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর দাদী। সুতরাং হযরত মুলাইকা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা হলেন হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর মা। কেননা ইসহাক রহমতুল্লাহি আলাইহি হলেন হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর বৈপিতৃয় ভাইয়ের ছেলে।

          আফসুস! এই সমস্ত রেযাখানী মৌলভীদের জন্য যে, তারা উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় বিশুদ্ধ ও ছহীহ্ মতটি গ্রহণ করেনি। অথচ কিতাবে উক্ত হাদীস “শরীফের ব্যাখ্যায়” ছহীহ্ বর্ণনা মতে বলা হয়েছে যে, হযরত মুলাইকা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা হলেন হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর মা এবং হযরত ইসহাক রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর দাদী। (আরো বিস্তারিত দলীলের জন্য অপেক্ষায় থাকুন)

চতৃর্থতঃ তারা মুসলিম শরীফের হাদীস শরীফের ইবারতে আবারো صلى الله عليه وسلم এভাবে (ص)   সংক্ষেপে লিখেছে। অথচ হাদীস শরীফে সংক্ষেপে লেখা নেই। বরং হাদীস শরীফে এভাবে صلى الله عليه وسلم লিখা আর صلى الله عليه وسلم সংক্ষেপে লিখা  মাকরূহ।

          পঞ্চমতঃ তারা “মুসলিম শরীফের” হাদীস শরীফের অর্থ ভুল করেছে। যেমন তারা অর্থ করেছে “বৃদ্ধা (নারীরা) আমাদের পিছনে ছিল।” আর বৃদ্ধা নারীরা বলতে কয়েকজন বৃদ্ধা মহিলাকে বুঝায়।

          অথচ মুসলিম শরীফে উক্ত হাদীস শরীফ বর্ণনার পর তার ব্যাখ্যায় والعجوز বা বৃদ্ধা বলতে হযরত মুলাইকা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা নামে একজন বৃদ্ধা মহিলাকে বুঝানো হয়েছে যিনি হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর মা।

যেমন “মুসলিম শরীফের” ১ম খন্ডের ২৩৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

والعجوز هى ام انس অর্থাৎ “বৃদ্ধা মহিলা হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর মা” যার নাম হলো মুলাইকা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা।

          আর বুখারী শরীফের বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ “উমদাতুল ক্বারী” কিতাবে উল্লেখ আছে, والعجوز هى مليكة অর্থাৎ বৃদ্ধা হলেন হযরত মুলাইকা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা।

          আফসুস! এই সমস্ত রেযাখানী মৌলভীদের জন্য যে, তারা সাধারণ মানুষকে ধোকা দেয়ার উদ্দেশ্যে জামায়াতে মুক্তাদীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্য والعجوز শব্দের অর্থ  করেছে বৃদ্ধা নারীরা।

          অথচ উপরোক্ত দলীল ভিত্তিক আলোচনা থেকে স্পষ্টরূপে প্রমাণিত হলো যে, والعجوز বলতে বৃদ্ধা নারীরা নয়। বরং والعجوز বলতে মুলাইকা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা নামে একজন বৃদ্ধাকেই বুঝানো হয়েছে যিনি হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর মা এবং যিনি নিজেই হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খানা খাওয়ার জন্য দাওয়াত দিয়েছিলেন।

          ষষ্ঠতঃ রেযাখানীরা “মুসলিম শরীফের” ১ম খন্ডের বরাত দিয়ে যে হাদীস শরীফ উল্লেখ করেছে উক্ত হাদীস শরীফ সম্পর্কে মুহাদ্দিসীন-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ ইখতিলাফ বা মতবিরোধ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর ওয়ালাদের জন্য বরকত স্বরূপ নামায পড়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন যে, ইহা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য বিশেষ ব্যবস্থার আওতাভুক্ত। কেউ কেউ বলেছেন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাময়িক কারণ বশতঃ এই নামায আদায় করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে নামাযের কার্যসমূহ শিক্ষা দেয়ার জন্য নামায পড়িয়েছেন।

যেমন- উক্ত হাদীস শরীফের ব্যাখ্যায় “মুসলিম শরীফের” ১ম খন্ডের ২৩৪ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে,

ولعل النبى صلى الله عليه وسلم اراد تعليمهم افعال الصلوة.

অর্থাৎ “নিশ্চয়ই নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে নামাযের কার্যসমূহ শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যেই নফল নামায জামায়াতে পড়েছেন।”

          উপরোক্ত হাদীস শরীফ দ্বারা এটাই প্রমাণিত হলো যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মুলাইকা রদ্বিয়াল্লাহু আনহার বাড়ীতে বরকত স্বরূপ এবং তাদেরকে নামাযের কার্যসমূহ শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে তাদের জন্য দু’রাকায়াত নামায পড়েছেন।

          সর্বোপরি কথা হলো। ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি “মুসলিম শরীফের” উক্ত হাদীস শরীফের ভিত্তিতে নফল নামায জামায়াতে জায়েয সম্পর্কে যে অধ্যায় বেঁধেছেন উক্ত হাদীস শরীফে জামায়াতে মুক্তাদী ছিলেন তিনজন। একজন হলেন হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু, দ্বিতীয়জন হলেন একজন ইয়াতীম। আর তৃতীয়জন হলেন হযরত মুলাইকা রদ্বিয়াল্লাহু আনহা। অর্থাৎ উক্ত হাদীস শরীফে ইমাম ব্যতীত মুক্তাদী ছিল তিনজন।

          অতএব, রেযাখানীরা “মুসলিম শরীফের” বরাত দিয়ে শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াত, সহকারে আদায় করা যে বৈধ বলেছে তা ভুল ও মিথ্যা। কারণ “মুসলিম শরীফের” বরাত দিয়ে রেযাখানীদের মুখপত্রে উল্লিখিত হাদীস শরীফে শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াতের সহিত আদায় করার কোন উল্লেখ নেই। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, জামায়াতের সহিত আদায় করা তো দূরের কথা রেযাখানী মুখপত্রের উল্লিখিত হাদীস শরীফ খানাতে শবে বরাত, শবে ক্বদরের নামাযের কথাই উল্লেখ নেই, সেখানে জামায়াতের সহিত আদায় করার প্রশ্ন আসে কি করে। আর “মুসলিম শরীফে” নফল নামায জামায়াতের সহিত আদায় করার ব্যাপারে যে হাদীস শরীফখানা বর্ণিত আছে উক্ত হাদীস শরীফে ইমামের সহিত মুক্তাদী ছিল তিনজন। আর হাদীস শরীফখানা সম্পর্কে ইখতিলাফ থাকায় আমরাও প্রমাণ করে দিয়েছি যে,

اما لو اقتدى ثلثة بواحد اختلف فيه.

অর্থঃ- “আর যদি ইমামের সহিত তিনজন মুক্তাদী ইক্তিদা করে তাহলে মাকরূহ হওয়ার মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অর্থাৎ ইমাম ব্যতীত তিনজন মুক্তাদী ইক্তিদা করলে কেউ কেউ বলেছেন মাকরূহ হবে। আর কেউ কেউ বলেছেন মাকরূহ হবেনা। আর চারজন মুক্তাদী ইক্তিদা করলে সকল ইমাম মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের ঐক্যমতে মাকরূহ তাহরীমী হবে।” যেমন-

واذا اقتدى اربعة بواحد كره اتفاتا.

অর্থঃ- “যদি ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদী ইক্তিদা করে তাহলে সকল ইমাম মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের ঐক্যমতে মাকরূহ তাহরীমী হবে।”

যেমন, “খোলাছাতুল ফতওয়ার” ১ম খন্ডের ১৫৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ان التطوع بالجماعة انما يكره اذا كان على سبيل التداعى اما لو اقتدى واحد او اثنان بواحد لايكره واذا اقتدى ثلثة بواحد اختلف فيه وان اقتدى اربعة بواحد كره اتفاقا.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই নফল নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী, যখন ঘোষণা দিয়ে পড়া হবে। সুতরাং যদি (বিনা ঘোষণায়) ইমামের সাথে একজন অথবা দু’জন মুক্তাদী ইক্তিদা করে, তবে মাকরূহ্ হবেনা, আর তিনজন মুক্তাদী ইক্তিদা করার মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। অর্থাৎ কেউ কেউ বলেছেন, মাকরূহ হবে না। আর কেউ কেউ বলেছেন, মাকরূহ হবে। তবে যদি চারজন মুক্তাদী ইমামের সহিত ইক্তিদা করে নফল নামায জামায়াতের সহিত পড়ে তাহলে সকল ইমাম মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম-এর সর্বসম্মত মতে মাকরূহ্ তাহ্রীমী।” (চলবে)

মুহম্মদ রাশেদুল ইসলাম, রাশেদ

সভাপতি- ছাত্র আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত, রংপুর।

সুওয়ালঃ আমরা দেখে থাকি যে, কেবল হক্কানী ওলীগণই ক্বাল্বী যিক্র করার ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তাই আমাদের জানার বিষয় হলো, কুরআন-সুন্নাহ্র দৃষ্টিতে ক্বল্বী যিক্রের গুরুত্ব ও সমাধান কতটুকু ও কি? ছহীহ্ জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ হক্কানী ওলী বা পীর ছাহেবগণ যে ক্বাল্বী  যিক্রের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন তা মূলতঃ মনগড়া ও বিনা দলীলে দেননা। বরং কুরআন-সুন্নাহ্র দলীল-আদীল্লাহ্র ভিত্তিতেই দিয়ে থাকেন।

          উল্লেখ্য, কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে যিক্র করার ব্যাপারে যে অসংখ্য আদেশ-নির্দেশ করা হয়েছে তা মূলতঃ ক্বাল্বী যিক্র প্রসঙ্গেই করা হয়েছে। কারণ ক্বাল্বী যিক্র হচ্ছে এমন এক যিক্র যার মাধ্যমে বান্দা স্বীয় রব আল্লাহ্ পাককে সর্বদা স্মরণ করে থাকে এবং বান্দার শরীরে যে বিশেষ এক টুকরা গোশ্ত আছে যার নাম হচ্ছে, “ক্বাল্ব” তা পরিস্কার, পরিশুদ্ধ হয়ে থাকে।

          উল্লেখ আছে যে, নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণ যমীনে আগমণ করার বিভিন্ন কারণের মধ্যে একটি বিশেষ কারণ হচ্ছে, “তাঁরা উম্মতগণকে তাযকিয়া বা পরিশুদ্ধ করে থাকেন।”

যে প্রসঙ্গে কালামুল্লাহ্ শরীফের একাধিক স্থানে ويزكيهم

“তিনি তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন।” অর্থাৎ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতগণকে পরিশুদ্ধ করবেন।”

          আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় সমস্ত তাফসীরেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাযকিয়ায়ে বাতিন বা তাযকিয়ায়ে ক্বাল্ব অর্থাৎ ক্বাল্ব (অন্তর) পরিশুদ্ধ করা ফরয। আর অন্তর পরিশুদ্ধ করা ও ইখলাছ অর্জন করার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে ক্বাল্বী যিক্র। অর্থাৎ তাছাউফ তথা মুহ্লিকাত ও মুন্জিয়াত সম্পর্কিত ইল্ম অর্জন করার সাথে সাথে ক্বাল্বী যিক্র  করা। তবেই অন্তর পরিশুদ্ধ হবে এবং হুজুরী ক্বাল্ব অর্জিত হবে এবং নামাযসহ সকল ইবাদত শুদ্ধভাবে বা ইখলাছের সহিত আদায় করা সম্ভব হবে। যার ফলে সকলেই ক্বাল্বী যিক্র করাকে ফরয বলেছেন।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ পাক কালামুল্লাহ্ শরীফে ইরশাদ করেন,

الا بذكر الله تطمئن القلوب.

অর্থঃ- “সাবধান! আল্লাহ্ পাক-এর যিক্রের দ্বারাই ক্বাল্ব (অন্তর) এত্মিনান বা পরিশুদ্ধ হয়।” (সূরা রা’দ/২৮)

উক্ত আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

لكل شيئ صقالة وصقالة القلوب ذكر الله.

অর্থঃ- “প্রত্যেক জিনিস পরিস্কার করার যন্ত্র রয়েছে, আর ক্বাল্ব বা অন্তর পরিস্কার (পরিশুদ্ধ) করার যন্ত্র (মাধ্যম) হচ্ছে- আল্লাহ্ পাক-এর যিক্র (ক্বাল্বী যিক্র)।” (বুখারী, বায়হাক্বী, মিশকাত, মিরকাত, লুময়াত, আশয়াতুল লুময়াত, শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ্ ছবীহ্, মুযাহেরে হক্ব)

          লেসানী যিক্র হচ্ছে, বিভিন্ন প্রকার তাস্বীহ্-তাহ্লীল, দোয়া-দরূদ, কুরআন তিলাওয়াত, ওয়াজ-নছীহত ইত্যাদি। মূলতঃ লেসানী যিক্রের দ্বারা সার্বক্ষণিকভাবে অর্থাৎ দায়েমীভাবে আল্লাহ্ পাক-এর যিক্রে মশগুল থাকা সম্ভব নয়। কারণ উল্লিখিত যিক্রসমূহ সময় ও স্থান বিশেষে করা সম্পূর্ণই অসম্ভব। যেমন- ওযু-ইস্তিঞ্জা, খাওয়া-দাওয়া, কথা-বার্তা ও ঘুম ইত্যাদি।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ পাক পবিত্র কালাম পাকে ইরশাদ করেন,

 ومن يعش عن ذكر الرحمن نقيض له شيطنا فهو له قرين وانهم ليصدونهم عن السبيل ويحسبون انهم مهتدون.

অর্থঃ- “যে বা যারা আল্লাহ্ পাক-এর যিক্র  থেকে বিরত (গাফিল) থাকে, আমি (আল্লাহ্ পাক) তার জন্য একটি শয়তান নিযুক্ত করে দেই। অর্থাৎ তার জন্য একটা শয়তান নিযুক্ত হয়ে যায়। অতঃপর সেই শয়তান তার সঙ্গী হয় এবং তাকে সৎপথ থেকে ফিরিয়ে রাখে, অর্থাৎ পাপ কাজে লিপ্ত করে দেয়। অথচ তারা মনে করে, তারা সৎপথেই রয়েছে।” (সূরা যুখরূফ/৩৬, ৩৭)

          উক্ত আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

الشيطان جاثم على قلب ابن ادم فاذا ذكر الله خنس واذا غفل وسوس.

“শয়তান আদম সন্তানের ক্বাল্বের উপর বসে, যখন সে আল্লাহ্ পাক-এর যিক্র  করে, তখন শয়তান পালিয়ে যায়। আর যখন সে যিক্র  থেকে গাফিল বা অমনোযোগী হয়, তখন শয়তান তাকে ওয়াসওয়াসা দেয়।” (বুখারী, মিশকাত, ফতহুল বারী, ওমদাতুল ক্বারী, ইরশাদুস সারী, তাইসীরুল ক্বারী, মিরকাত, লুময়াত, আশয়াতুল লুময়াত, শরহুত্ ত্বীবী, তা’লীকুছ্ ছবীহ্, মুযাহেরে হক্ব, মিরআতুল মানাজীহ্)

          উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হলো যে,  লেসানী বা মৌখিক যিক্রের দ্বারা অন্তর পরিশুদ্ধ করা ও শয়তানী ওয়াসওয়াসা থেকে বেঁচে থাকা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়।

          পক্ষান্তরে অন্তর পরিশুদ্ধ করতে হলে বা শয়তানী ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে হলে “ক্বাল্বী যিক্র করতে হবে। কারণ ক্বাল্বী যিক্রেই সার্বক্ষনিক বা দায়িমী যিকরের একমাত্র মাধ্যম।

যেমন দায়িমী বা ক্বাল্বী যিক্র সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ পাক পবিত্র কালামে পাকে ইরশাদ করেন,

 واذكر ربك فى نفسك تضرعا وخيفة ودون الجهر من القول بالغدو والاصال ولا تكن من الغفلين.

অর্থঃ- “সকাল-সন্ধা স্বীয় অন্তরে সবিনয়ে, সভয়ে, অনুচ্চ আওয়াজে তোমার রবের যিক্র (স্মরণ) কর। আর (এ ব্যাপারে) তুমি গাফিলদের অন্তর্ভূক্ত হয়োনা।” (সূরা আ’রাফ/২০৫)

          কুরআন শরীফের উক্ত আয়াত শরীফের তাফসীরে বা ব্যাখ্যায় বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ “তাফসীরে খোলাছায়” উল্লেখ আছে যে, (উক্ত আয়াত শরীফে) যিক্র দ্বারা ক্বাল্বী যিক্র ও সার্বক্ষণিক পাছ-আনফাছ বা শ্বাস-প্রশ্বাস যিক্রকে বুঝানো হয়েছে।” এছাড়া তাফসীরে কবীর, খোলাছা, রুহুল বয়ানেও একই কথা বর্ণিত রয়েছে।

          উক্ত আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত মুফাস্সির, ইমামুল মুফাস্সিরীন, ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর জগদ্বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ “তাফসীরে কবীর” কিতাবে উল্লেখ করেন,

 من الناس من قال ذكر هذين الوقتين والمراد مداومة الذكر والمواظبة عليه بقدر الامكان.

অর্থঃ- “কেউ কেউ বলে, শুধুমাত্র সকাল-সন্ধা যিক্র  করার কথা  উক্ত আয়াত শরীফে বলা হয়েছে। মূলতঃ উক্ত আয়াত শরীফের সকাল-সন্ধা যিক্র  করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- দায়িমী বা সার্বক্ষণিক যিক্র এবং সাধ্যানুযায়ী যিকিরে মশগুল থাকা।” অনুরূপ “তাফসীরে রুহুল বয়ানে”ও উল্লেখ আছে।

          সুতরাং পবিত্র কুরআন শরীফের উল্লিখিত আয়াত শরীফসমূহ ও তার তাফসীর বা ব্যাখ্যার ভিত্তিতে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হলো যে, ইখলাছ তথা দায়েমী হুজুরী অর্জন করতে হলে অবশ্যই ক্বাল্বী যিক্র করতে হবে। কারণ ক্বাল্বী যিক্র ব্যতীত যেরূপ ইখলাছ লাভ করা সম্ভব নয়, তদ্রুপ দায়িমী বা সার্বক্ষণিক হুজুরীও হাছিল করা অসম্ভব।

তাই “তাফসীরে মাযহারীতে” উল্লেখ করা হয়েছে,

 دوام الحضور بالقلب اذ لايتصور دوام الذكر باللسان.

অর্থঃ- “দায়িমী হুজুরী বা যিক্র কেবলমাত্র ক্বাল্বের দ্বারাই সম্ভব। কেননা লেসান বা মুখ দ্বারা দায়িমী বা সার্বক্ষণিকভাবে যিক্র  করা অসম্ভব।”

          তাই সকলেই তাছাউফের কিতাবসমূহে “ক্বাল্বী যিক্র” করাকে ফরয বলেছেন। উল্লেখ্য যে, যাদের ক্বাল্বে যিক্র  জারী নেই বা যাদের ক্বাল্ব বা অন্তর মহান আল্লাহ্ পাক-এর যিক্র  থেকে গাফিল, তারা মহান আল্লাহ্ পাক-এর রহ্মত থেকে সম্পূর্ণই বঞ্চিত। আর রহ্মত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণেই তারা হয় গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ পাক কালামুল্লাহ্ শরীফে ইরশাদ করেন,

 ولا تطع من اغفلنا قلبه عن ذكرنا واتبع هوه وكان امره فرطا.

অর্থঃ- “সেই ব্যক্তিকে অনুসরণ করোনা, যার ক্বাল্বকে আমার যিক্র থেকে গাফিল করেছি অর্থাৎ যার ক্বাল্বে আমার যিক্র নেই। সে নফ্স (শয়তান)কে অনুসরণ করে। তাই তার কাজগুলো (আমলগুলো) শরীয়তের খেলাফ।” (সূরা ক্বাহ্ফ/২৮)

          অতএব, বুঝা গেল যে, ক্বাল্বী যিক্র  ব্যতীত পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা ও শয়তানী ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচা আদৌ সম্ভব নয়। কাজেই আল্লাহ্ পাক-এর রহ্মত প্রাপ্তি, হক্ব মত-পথে ক্বায়েম থাকা ও আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টি বা নৈকট্য লাভ করার একমাত্র মাধ্যম ক্বাল্বী যিক্র।

          এ প্রসঙ্গে “জামিউল উছূল” নামক কিতাবে উল্লেখ আছে যে, “জেনে রাখ, মহান আল্লাহ্ পাক-এর নৈকট্য অর্জনের ক্ষেত্রে (ক্বাল্বী) যিক্র ই হচ্ছে একমাত্র পদ্ধতি বা মাধ্যম। দায়িমী বা ক্বাল্বী যিক্র  ব্যতীত মহান আল্লাহ্ পাক-এর নৈকট্য বা সন্তুষ্টি অর্জন করা মোটেও সম্ভব নয়। আর দায়িমী বা ক্বাল্বী যিক্র  করা আল্লাহ্ পাক-এরই নির্দেশ, যা অসংখ্য, অগণিত দলীল দ্বারা প্রমাণিত।”

          তাই কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজ্মা ও ক্বিয়াসের ছহীহ্ বর্ণনা সাপেক্ষে সকল ইমাম, মুজ্তাহিদ, আওলিয়া-ই-কিরাম ও মাশায়েখে ইজাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ ক্বালবী যিক্র  জারী করতঃ অন্ততঃপক্ষে বেলায়েতে আম হাছিল করাকে ফরয/ওয়াজিব বলেছেন। তাঁদের মতে অন্তর পরিশুদ্ধ করে ইখলাছ অর্জন করার এটাই একমাত্র উপায় বা পদ্ধতি। নচেৎ শুধুমাত্র কিতাবাদী পাঠ করলে বা করালে আর তাছাউফী বিষয়সমূহের তথা মুহ্লিকাত ও মুনজিয়াতের তা’রীফ, সবব, আলামত ও এলাজ ইত্যাদি মুখস্ত করলে অথবা সারা জীবন চিল্লা দিলে বা তাস্বীহ্-তাহ্লীল পাঠ করলেও অন্তর পরিশুদ্ধ হবেনা।

          অতএব, সকলের জন্যই ক্বাল্বী যিক্র করা ফরযে আইন।

          {দলীলসমূহঃ- (১) তাফসীরে খাযেন, (২) বাগবী, (৩) কুরতুবী, (৪) আহ্কামুল কুরআন লিল জাস্সাস, (৫) আবী সউদ, (৬) ফতহুল ক্বাদীর, (৭) ইবনে কাছীর, (৮) তাবারী, (৯) দুররে মানছূর, (১০) রুহুল বয়ান, (১১) রুহুল মায়ানী, (১২) তাফসীরে কবীর, (১৩) মাযহারী, (১৪) মায়ারিফুল কুরআন, (১৫) বুখারী, (১৬) মুসলিম, (১৭)  তিরমিযী, (১৮) আবূ দাউদ, (১৯) ইবনে মাযাহ্ (২০) বায়হাক্বী, (২১) দারেমী, (২২) দায়লামী, (২৩) তারগীব ওয়াত তারহীব, (২৪) তারীখ, (২৫) আব্দুল বার, (২৬) মিশকাত, (২৭) বজলুল মাযহুদ, (২৮) শরহে নববী, (২৯) মায়ারিফুস্ সুনান, (৩০) উরফুশ্ শাজী, (৩১) ফতহুল বারী, (৩২) ওমদাতুল ক্বারী, (৩৩) ইরশাদুস্ সারী, (৩৪) তাইসীরুল ক্বারী, (৩৫) মিরকাত, (৩৬) লুময়াত, (৩৭) আশয়াতুল লুময়াত, (৩৮) শরহুত্ ত্বীবী, (৩৯) তা’লীকুছ্ ছবীহ্, (৪০) মুযাহেরে হক্ব, (৪১) মিরআতুল মানাজীহ্, (৪২) কিমিয়ায়ে সায়াদাত, (৪৩) ইহ্ইয়াউ উলুমিদ্দীন, (৪৪) আল মুনকিযু মিনাদ্ দালাল (৪৫) ফাতহুর রব্বানী, (৪৬) আল বুনিয়ানুল মুশাইয়্যাদ, (৪৭) সাইফুল মুকাল্লেদীন, (৪৮) দুররুল মুখতার, (৪৯) ফতওয়ায়ে আমীনিয়া, (৫০)  ফতওয়ায়ে ছিদ্দীক্বিয়া, (৫১) শরহে আক্বায়েদে নসফী, (৫২) ফিক্বহুল আকবার ইত্যাদি।}

মুছাম্মৎ মমতাজ আলী বেগম

সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম।

সুওয়ালঃ পীরানে তরীক্বতগণ বলেন যে, “ইখলাছ অর্জন করা ফরয এবং ইখলাছ ব্যতীত কোন আমল বা ইবাদত-বন্দেগী কবুল হয়না।” এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বহুল পঠিত মাসিক আল বাইয়্যিনাত কর্তৃপক্ষের নিকট আমার আরয এই যে, “ইখলাছ কি? তা অর্জন করা কি?” ইখলাছের গুরুত্ব কতটুকু? কিভাবে ইখলাছ অর্জন করা যায়?” কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ ইখলাছ-এর আভিধানিক অর্থ হলো- একাগ্রতা, একনিষ্ঠতা, আন্তরিকতা, নিবিষ্টতা, ঘনিষ্টতা ইত্যাদি। পরিভাষায় “ইখলাছ” শব্দের অর্থ হলো- ইবাদত-বন্দেগী, দান-ছদকা ইত্যাদি যাবতীয় নেক আমল আন্তরিকতার সহিত অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহ্ তায়ালার রেজামন্দী ও কুরবত(সন্তুষ্টি ও নৈকট্য) লাভের জন্য করা।

ইখলাছ অর্জন করা ফরয

আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন,

وما امروا الا ليعبدوا الله مخلصين له الدين.

অর্থঃ- “খালিছভাবে একমাত্র আল্লাহ্ তায়ালার ইবাদত করার জন্যই তাদেরকে আদেশ করা হয়েছে।” (সূরা বাইয়্যিনাহ্/৫)

          হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

يا معاذ اخلص دينك يكفيك العمل القليل.

অর্থঃ- “হে মুয়ায বিন জাবাল! ইখলাছের সহিত ইবাদত কর। অল্প আমলই তোমার (নাযাতের) জন্য যথেষ্ট হবে।” (তারগীব)

          হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো ইরশাদ করেন,

ان الله لايقبل من العمل الا ما كان خالصا وابتغى به وجهه.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তায়ালা ঐ আমল কবুল করেননা যে আমল খালিছভাবে তাঁর সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে করা না হয়।” (নাসাঈ শরীফ)

          “ইখলাছ” মূলতঃ ঈমান, ইল্ম ও আমলের সাথে এমনভাবে জড়িত যে, ইখলাছ ছাড়া যতই ঈমান গ্রহণ, ইল্ম অর্জন ও আমল করা হোক না কেন তা কস্মিনকালেও আল্লাহ্ পাক-এর দরবারে কবুল হবেনা। উপরোক্ত ইখলাছবিহীন ঈমান, ইল্ম ও আমলের কারণে ব্যক্তি জাহান্নামী হয়ে যাবে। কুরআন শরীফ এবং ছহীহ্ হাদীস শরীফে যার প্রমাণ পেশ করা হয়েছে।

ইখলাছের গুরুত্ব

          কুরআন শরীফ ও হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে, “আব্দুল্লাহ্ বিন উবাই আল্লাহ্ পাক-এর জন্য ঈমান আনেনি তাই সে ছূরতান অনেক নেক কাজ করা সত্ত্বেও মুনাফিক হিসেবে চির জাহান্নামী হয়েছে।”

মহান আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,

ان الله لايغفر ان يشرك به ويغفر مادون ذلك لمن يشاء ومن يشرك بالله فقد ضل ضللا بعيدا.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক তাকে ক্ষমা করেননা, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে। এছাড়া এর নিম্নপর্যায়ের পাপ যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করেন। যে আল্লাহ্ পাক-এর সাথে শরীক করে সে সুদূর বিভ্রান্তিতে পতিত হয়।” (সূরা নিসা/১১৬)

তিনি আরো ইরশাদ করেন,

من يشرك بالله فقد حرم الله عليه الجنة وماوه النار.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাক-এর শরীক করে, আল্লাহ্ পাক তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম।” (সূরা মায়িদা/৭২)

হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

لا تشرك بالله وان قتلت وان حرقت.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক-এর সাথে শরীক করনা। যদিও তোমাকে হত্যা করা হয় অথবা আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয়।” (আহমদ)

তিনি আরো ইরশাদ করেন,

ان حق الله على العباد ان يعبدوه ولايشركوبه شيئا.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই বান্দাগণের উপর আল্লাহ্ পাক-এর হক্ব হলো যে, তারা তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না।” (বুখারী শরীফ)

          একইভাবে আমল তা যত বড়ই হোক না কেন যদি তা খালিছ আল্লাহ্ পাক-এর জন্য না করে গায়রুল্লাহ্র উদ্দেশ্যে করা হয় তাহলেও জাহান্নামে যেতে হবে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক তাঁর কালামে পাকে ইরশাদ করেন,

فويل للمصلين الذين هم عن صلاتهم ساهون الذين هم يرانون.

অর্থঃ- “ঐ সকল নামাযীদের জন্য হালাক্বী-যারা গাফলতির সহিত নামায আদায় করে এবং ঐ সকল নামাযীদের জন্যও হালাক্বী যারা মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে নামায আদায় করে (ইখলাছের সহিত আমল করেনা)।” (সূরা মাউন ৪-৬)

          আর হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

عن ابى هريرة قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان اول الناس يقضى عليه يوم القيامة رجل استشهد الخ.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই ক্বিয়ামতের দিন তিনজন লোককে প্রথমে বিচারের জন্য আনা হবে। প্রথম যে ব্যক্তিকে আনা হবে, সে হলো একজন শহীদ। তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, “হে ব্যক্তি! তোমাকে আমি এত শক্তি-সামর্থ দিলাম, তা দিয়ে তুমি কি করেছ?” সে বলবে, “আল্লাহ্ পাক! আমি জ্বিহাদ করতে করতে আপনার জন্য শহীদ হয়েছি।” আল্লাহ্ পাক বলবেন, “মিথ্যা কথা, তুমি আমার জন্য জিহাদ করনি। মানুষ তোমাকে বড় পালোয়ান বা শক্তিশালী বলবে, সেজন্য তুমি জ্বিহাদ করেছ, যুদ্ধ করেছ। মানুষ তোমাকে শহীদ বলেছে। (তোমার বদলা তুমি পেয়েছ)।” তখন ফেরেশ্তাদের বলবেন, “হে ফেরেশ্তারা! এ লোকটাকে চুলে ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর।” তাই করা হবে।

          দ্বিতীয় আরেকজন লোককে আনা হবে, যাকে ইল্ম দান করা হয়েছে এবং সে তা অন্যকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন শরীফ ছহীহ্-শুদ্ধভাবে পড়তে শিখেছে। আল্লাহ্ পাক তাকে বলবেন, “হে আলিম বা ক্বারী ছাহেব! তোমাকে এত ইল্ম দেয়া হয়েছিল, শুদ্ধ করে কুরআন শরীফ পাঠ করতে শিক্ষা দেয়া হয়েছিল, তুমি কি করলে?” সে ব্যক্তি বলবে, “আল্লাহ্ পাক! আমি আপনার জন্য ইল্ম শিক্ষা করেছি এবং তা অন্যকে শিক্ষা দিয়েছি, আর আপনার জন্যই আমি কুরআন শরীফ শুদ্ধ করে পাঠ করেছি।” আল্লাহ্ পাক বলবেন, “মিথ্যা কথা। বরং মানুষ তোমাকে বড় আলিম বা বড় ক্বারী ছাহেব বলবে, সে জন্যেই তুমি ইল্ম অর্জন করেছ, কুরআন শরীফ শুদ্ধ করে তিলাওয়াত করতে শিখেছ। কাজেই মানুষ তোমাকে বড় আলিম, বড় ক্বারী ছাহেব বলেছে (তোমার বদলা তুমি পেয়েছ)।” তখন আল্লাহ্ পাক ফেরেশ্তাদেরকে বলবেন, “হে ফেরেশ্তারা! তোমরা এ লোকটাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর।” তখন তার চুলে ধরে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

          এরপর তৃতীয় আরেক জনকে আনা হবে, যাকে অনেক সম্পদ দান করা হয়েছে। তাকে আল্লাহ্ পাক বলবেন, “হে ব্যক্তি! তোমাকে আমি দুনিয়াতে অনেক সম্পদের মালিক করেছিলাম, তার বিনিময়ে তুমি কি আমল করলে?” সে ব্যক্তি বলবে, “আয় আল্লাহ্ পাক! আমি আপনার পছন্দনীয় এমন কোন পথ নেই, যে পথে দান-খয়রাত করিনি। অর্থাৎ আপনি যতগুলো রাস্তা পছন্দ করতেন- মস্জিদ-মাদ্রাসা, লঙ্গরখানা-এতিমখানা, গরীব-মিস্কিন, রাস্তা-ঘাট, পুল ইত্যাদি সমস্ত ক্ষেত্রেই আমি কম-বেশী দান করেছি। কোন প্রার্থীকে আমি খালি হাতে ফিরিয়ে দেইনি। সবাইকে কম-বেশী দান করেছি, একমাত্র আপনার সন্তুষ্টির জন্য।” আল্লাহ্ পাক বলবেন, “মিথ্যা কথা। তুমি এ জন্য করেছ যে, লোকে তোমাকে দানশীল বলবে, তোমাকে তা বলা  হয়েছে।” আল্লাহ্ পাক তখন বলবেন, “হে ফেরেশ্তারা! এ দানশীল ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে দাও।” তখন ফেরেশ্তারা তাকে চুলে ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।”(মুসলিম শরীফ)

          ইখলাছ সম্পর্কে আরো একটি দীর্ঘ হাদীস শরীফের বর্ণনা নিম্নরূপ-

          আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন, “সাত আসমান তৈরী করার পূর্বে আল্লাহ্ পাক প্রথম সাতজন ফেরেশ্তা তৈরী করলেন, যাদেরকে হাফাজা নাম দেয়া হয়েছে। যখন আল্লাহ্ পাক সাত আসমান তৈরী করলেন, তখন সেই সাতজন ফেরেশ্তাকে সাত আসমানের দায়িত্বে দিয়ে দিলেন। আল্লাহ্ পাক বললেন, “হে ফেরেশ্তারা! তোমাদের জিম্মাদারী হলো, তোমাদের সামনে দিয়ে বান্দাদের আমলগুলি যাবে, তোমরা আমলগুলি পরীক্ষা করবে।”

          যে ফেরেশ্তা প্রথম আকাশে থাকেন তার জিম্মাদারী হলো, “গীবতের।” যারা গীবত করে, তাদের আমলনামা প্রথম আকাশ উত্তীর্ণ হবেনা।

          হযরত মু’য়ায ইবনে জাবাল রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, “যখন তার আমলনামাগুলি ফেরেশ্তারা নিয়ে প্রথম আকাশে পৌঁছে, তখন সেই হাফাজা ফেরেশ্তা বলেন, “আমলনামাগুলি রাখ, আমাকে যাচাই-বাচাই করতে দাও।” তখন আমলবাহী ফেরেশ্তারা বলেন, “আপনি কি যাচাই-বাছাই করবেন?” সেই হাফাযা বা পরীক্ষক ফেরেশ্তা বলেন, “আমি যাচাই-বাছাই করবো, সে গীবত করেছে কিনা? সে গীবতকারী ব্যক্তি কিনা? যদি কোন গীবতকারী ব্যক্তির আমলনামা এখানে এসে থাকে, তাহলে সেটা আমার এ দরজা দিয়ে উত্তীর্ণ হবেনা।”

          কাজেই যারা গীবতকারী তাদের আমলনামা প্রথম আকাশ থেকে উত্তীর্ণ হবে না।

          এরপর দ্বিতীয় আকাশে গিয়ে যখন পৌঁছবে, তখন দ্বিতীয় আকাশের ফেরেশ্তা বলবেন, “রাখ আমলনামাগুলি, আমাকে যাচাই-বাছাই করতে দাও। আমাকে পরীক্ষা করতে দাও।” তখন আমলবাহী ফেরেশ্তা বলবেন, “হে ভাই ফেরেশ্তা! আপনি কি যাচাই-বাছাই করবেন?”

পরীক্ষক ফেরেশ্তা বলবেন, “যারা হুব্বেজাহ্ অর্থাৎ মান-সম্মানের জন্য আমল করেছে। মূলতঃ তাদের আমল আমি এই রাস্তা দিয়ে উত্তীর্ণ হতে দিব না।”

          কাজেই যারা হুব্বেজাহ্ অর্থাৎ মান-সম্মানের জন্য, ইবাদত-বন্দেগী করবে, তাদের আমলনামা দ্বিতীয় আকাশ দিয়ে যাবে না।

          এরপর যখন বাকী আমলনামাগুলি নিয়ে তৃতীয় আকাশে পৌঁছানো হবে, তখন তৃতীয় আকাশের হাফাজা ফেরেশ্তা বলবেন, “রাখ আমলনামাগুলি, আমাকে যাচাই-বাছাই করতে দাও। আমাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দাও।” তখন সেই তৃতীয় আকাশের ফেরেশ্তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, “হে ভাই ফেরেশ্তা! আপনি কি যাচাই-বাছাই করবেন?” তখন সেই ফেরেশ্তা বলবেন, “দেখ আমি হলাম অহংকারের ফেরেশ্তা। যারা অহংকারী, তাদের আমলনামা তৃতীয় আকাশ উত্তীর্ণ হবে না।

          এরপর বাকী আমলনামাগুলি নিয়ে ফেরেশ্তারা চতুর্থ আকাশে গিয়ে পৌঁছবেন, তখন ঐ চতুর্থ আকাশের হাফাজা ফেরেশ্তা বলবেন, “ব্যক্তিগত কোন আমলের উপর যদি কেউ ফখর করে, তাহলে সে আমলটা চতুর্থ আকাশ দিয়ে উত্তীর্ণ হবে না।”

          কাজেই যারা ফখর করবে ঐ ব্যক্তির আমলনামা চতুর্থ আকাশ অতিক্রম করবে না কখনও।

          এরপর বাকী আমলনামাগুলো নিয়ে ফেরেশ্তারা পঞ্চম আকাশের দিকে রওয়ানা হবেন। যখন পঞ্চম আকাশে গিয়ে পৌঁছবেন, তখন সেই হাফাজা ফেরেশ্তা বলবেন, “রাখ আমলনামাগুলি, আমাকে যাচাই-বাছাই করতে দাও, আমাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দাও।” তখন আমলবাহী ফেরেশ্তারা বলবেন, “হে ভাই পঞ্চম আকাশের ফেরেশ্তা! আপনি কি যাচাই-বাছাই করবেন? কি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন?” পরীক্ষক ফেরেশ্তা বলবেন, “আমি হলাম হিংসার ফেরেশ্তা। যারা হিংসুক, হাসাদকারী তাদের আমলনামা আমার এই পঞ্চম আকাশ দিয়ে উত্তীর্ণ হবে না। ”

          কাজেই যারা হিংসা করে, তাদের আমলনামা পঞ্চম আকাশ দিয়ে উত্তীর্ণ হবে না।

          এরপর ষষ্ঠ আকাশে গিয়ে যখন ফেরেশ্তারা পৌঁছবেন, কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে- তখন আমলগুলি গুণগুণ করতে থাকে, খুব জ্বলজ্বল করতে থাকে, আলোক বিকিরণ করতে থাকে। তখন ষষ্ঠ আকাশের ফেরেশ্তা বলেন, “হে আমলবাহী ফেরেশ্তারা! তোমরা আমলনামাগুলি রাখ, আমাকে যাচাই-বাছাই করতে দাও, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দাও।” আমলবাহী ফেরেশ্তারা বলবেন, “আপনি কি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন? তখন পরীক্ষক ফেরেশ্তারা বলেন, আমি হলাম রহ্মতের ফেরেশ্তা।”

          যারা নির্দয়, তাদের আমলনামাগুলি ষষ্ঠ আকাশ দিয়ে উত্তীর্ণ হবে না।

          পরীক্ষক ফেরেশ্তা ঐ আমলনামাগুলি যাচাই-বাছাই করে আবার ছেড়ে দেবেন। বলবেন, “তোমরা বাকী আমলনামাগুলি নিয়ে যাও।” আমলবাহী ফেরেশ্তারা সপ্তম আকাশের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।

          যখন সপ্তম আকাশে গিয়ে পৌঁছবেন, তখন সেই পরীক্ষক ফেরেশ্তা বলবেন, “দাঁড়াও, আমলনামাগুলো আমাকে পরীক্ষা করতে দাও”। তখন ফেরেশ্তারা বলবেন, “আপনি কি পরীক্ষা করবেন?” তখন সেই হাফাজা ফেরেশ্তা বলবেন,  আমি  রিয়ার  ফেরেশ্তা। মূলতঃ লোক প্রদর্শনের জন্য যারা আমল করে, তাদের আমল সপ্তম আকাশ উত্তীর্ণ হবে না।”

যখন সপ্তম আকাশ উত্তীর্ণ হয়ে গিয়ে আল্লাহ্ পাক-এর কাছে যাবে, বলা হয়- তখন ঐ আমলগুলো গুণগুণ করতে থাকবে। তখন আল্লাহ্ পাক বলবেন, “হে ফেরেশ্তারা! আমাকে যাচাই-বাছাই করতে দাও।”

          আলাহ্ পাক বলবেন, “আমি যাচাই-বাছাই করবো, বান্দা ইখলাছের সহিত আমল করেছে কিনা?” কেননা আল্লাহ্ পাক বান্দাকে শুধুমাত্র খালিছভাবে তাঁর ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন।”

          অতএব, যে ইবাদতগুলো ইখলাছের সহিত অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর জন্য করা হবে, সেটাই আল্লাহ্ পাক কবুল করবেন। আর যে ইবাদত গায়রুল্লাহ্র জন্য করা হবে, তা কবুল করবেন না। বরং তা আমলকারীর চেহারার উপর নিক্ষেপ করবেন।

          “সূরা মাউনে” বর্ণিত উপরোক্ত আয়াত শরীফ এবং ছহীহ্ মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীস শরীফ ও অন্যান্য হাদীস শরীফ দ্বারা একথা সুস্পষ্টভাবে জানা গেল যে, একমাত্র ইখলাছ না থাকার কারণে নামাযী, শহীদ, আলিম, ক্বারী, দানশীল সবাই জাহান্নামে চলে যাবে। সুতরাং ঈমান, ইল্ম ও আমলের ক্ষেত্রে ইখলাছের গুরুত্ব কতবেশী তা সহজেই বুঝা গেল।

          উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এটাই সাব্যস্ত হলো যে, ইখলাছ ব্যতীত পাহাড়সম আমল ও ইল্ম কোন উপকারে আসবেনা। তাই ইখলাছ অর্জন করা ফরয।

          এ প্রসঙ্গে হানাফী মাযহাবের বিখ্যাত ফতওয়ার কিতাব “ফতওয়া শামীতে” বর্ণিত হয়েছে,

علم الاخلاص فرض لان صحة العمل موقوفة عليه.

অর্থঃ- “ইখলাছ সম্পর্কিত ইল্ম অর্জন করা ফরয। কারণ আমল কবুল হওয়া ইখলাছের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ ইখলাছ ব্যতীত আমল কবুল হয়না।”

ইখলাছ কিভাবে অর্জন করা যায়

স্মরণীয় যে, ইখলাছ বাহ্যিক ও দৃশ্যমান বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়। ইখলাছের সম্পর্ক হচ্ছে অন্তরের সাথে। ইখলাছের বিপরীত বস্তুর নাম হচ্ছে গায়রুল্লাহ্। একমাত্র আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য হাছিলের উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে অন্য যে কোন উদ্দেশ্যে আমল করার নাম হচ্ছে গায়রুল্লাহ্। আর এর মধ্যে রিয়া, অহংকার, হিংসা, গীবত ইত্যাদি অন্তরের যত বদ্ খাছলত রয়েছে তার মধ্যে রিয়া নামক অন্তরের বদ্ খাছলতটি সর্বাপেক্ষা মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

الرياء شرك خفى.

অর্থঃ- “রিয়া হলো গুপ্ত শিরক।” (ইহ্ইয়াউ উলুমিদ্দীন)

উল্লেখ্য, রিয়া নামক বদ্ খাছলতটি যতক্ষণ পর্যন্ত কোন মানুষের অন্তরে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার অন্তরে ইখলাছ নামক নেক্ খাছলতটি আসবে না।

          সুতরাং অন্তরে “ইখলাছ” পয়দা করতে হলে অন্তর থেকে রিয়াসহ যাবতীয় বদ্ খাছলত দূর করতে হবে। আর বদ্ খাছলত দূর করতঃ অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার একমাত্র পদ্ধতি হচ্ছে ক্বলবী যিক্র।

কালামুল্লাহ্ শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

الا بذكر الله تطمئن القلوب.

অর্থঃ- “সাবধান! আল্লাহ্ তায়ালার যিক্রের দ্বারা ক্বলব বা অন্তরসমূহ প্রশান্তি ও পরিশুদ্ধতা লাভ করে।” (সূরা রা’দ/২৮)

আর হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

لكل شيئ صقالة وصقالة القلوب ذكر الله.

অর্থঃ- “প্রতিটি বস্তু পরিস্কার করার অস্ত্র আছে। আর ক্বলব বা অন্তর পরিস্কার করার অস্ত্র তথা মাধ্যম হচ্ছে আল্লাহ্ তায়ালার যিক্র।” (বুখারী শরীফ)

          উপরোক্ত যিক্রের আয়াত শরীফ ও হাদীস শরীফ দ্বারা ক্বল্বী যিক্র উদ্দেশ্য এবং ক্ব্ল্বী যিক্র-আযকারের দ্বারাই কেবল ক্বল্ব পরিশুদ্ধ হয়ে থাকে।

          এইজন্য ক্বলবী যিক্রের ব্যাপারে কালামুল্লাহ্ শরীফে সরাসরি আদেশ এসেছে,

ولا تطع من اغفلنا قلبه عن ذكرنا واتبع هوه وكان امره فرطا.

অর্থঃ- “ঐ সকল ব্যক্তির অনুসরণ করনা যার ক্বলব আল্লাহ্ পাক-এর যিক্র থেকে গাফিল রয়েছে। (ক্বলবী যিক্র না করার কারণে) সে নফ্সের অনুসরণ করে এবং তার কাজগুলো হয়ে থাকে শরীয়তের খেলাফ।” (সূরা কাহ্ফ/২৮)

ক্বলবী যিক্র প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে,

الشيطان جاثم على قلب ابن ادم فاذا ذكر الله خنس واذا غفل وسوس.

অর্থঃ- “শয়তান আদম সন্তানের ক্বলবের উপর বসে। যখন সে যিক্র করে তখন শয়তান পালিয়ে যায়। আর যখন সে যিক্র থেকে গাফিল থাকে তখন শয়তান তাকে ওয়াস্ওয়াসা দেয়।” (বুখারী শরীফ)

          অর্থাৎ ক্বলবী যিক্র করলে শয়তান তার সর্বপ্রকার শয়তানী খাছলতসহ বান্দার থেকে দূরে সরে যায়। আর যখন বান্দা যিক্র থেকে গাফিল হয় তখন শয়তান সর্ব প্রকার শয়তানী খাছলতসহ বান্দার ক্বল্বের উপর বাসা বাঁধে।”

          আর এই ক্বল্বী যিক্রই হচ্ছে ইল্মে তরীক্বত বা তাছাউফের বিষয়। যার দ্বারা রিয়াসহ অন্তরের যাবতীয় বদ্ খাছলত দূর হয়ে ইখলাছসহ যাবতীয় নেক্ খাছলত পয়দা হয়। আর তখনই বান্দার পক্ষে প্রতিটি আমল একমাত্র আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টির জন্য করা সম্ভব। অন্যথায় হাজার চেষ্টা ও পদ্ধতি অবলম্বন করলেও ইখলাছের সহিত ইবাদত-বন্দেগী করা সম্ভব নয়।

          আর এটা সর্বজন স্বীকৃত যে, একমাত্র হক্কানী ওলী আল্লাহ্গণই ইল্মে তাছাউফের শিক্ষাদানের মাধ্যমে মানুষের অন্তরে ইখলাছ পয়দা করে থাকেন।

          সুতরাং পুরুষ-মহিলা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য হক্কানী ওলী আল্লাহ্-এর নিকট বাইয়াত হয়ে ইল্মে তাছাউফ চর্চা করে ক্বালবী যিক্র-আযকারের মাধ্যমে ইখলাছ অর্জন করা ফরয।

          [বিঃ দ্রঃ- এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকার ৪৩ ও ৪৪তম সংখ্যা পাঠ করুন। ]

          {দলীলসমূহঃ- (১) খাযেন, (২) বাগবী, (৩) কুরতুবী, (৪) আহ্কামুল কুরআন লিল জাস্সাস, (৫) আবী সউদ, (৬) ফতহুল ক্বাদীর, (৭) ইবনে কাছীর, (৮) তাবারী, (৯) দুররে মানছূর, (১০) রুহুল বয়ান, (১১) রুহুল মায়ানী, (১২) তাফসীরে কবীর, (১৩) মাযহারী, (১৪) মায়ারিফুল কুরআন, (১৫) বুখারী, (১৬) মুসলিম, (১৭) তিরমিযী, (১৮) আবূ দাউদ, (১৯) ইবনে মাযাহ্ (২০) বায়হাক্বী, (২১) দারেমী, (২২) দায়লামী, (২৩) তারগীব ওয়াত তারহীব, (২৪) তারীখ, (২৫) আব্দুল বার, (২৬) মিশকাত, (২৭) বজলুল মাযহুদ, (২৮) শরহে নববী, (২৯) মায়ারিফুস্ সুনান, (৩০) উরফুশ্ শাজী, (৩১) ফতহুল বারী, (৩২) ওমদাতুল ক্বারী, (৩৩) ইরশাদুস্ সারী, (৩৪) তাইসীরুল ক্বারী, (৩৫) মিরকাত, (৩৬) লুময়াত, (৩৭) আশয়াতুল লুময়াত, (৩৮) শরহুত্ ত্বীবী, (৩৯) তা’লীকুছ্ ছবীহ্, (৪০) মুযাহেরে হক্ব, (৪১) মিরআতুল মানাজীহ্, (৪২) কিমিয়ায়ে সায়াদাত, (৪৩) ইহ্ইয়াউ উলুমিদ্দীন, (৪৪) আল মুনকিযু মিনাদ্ দালাল (৪৫) ফাতহুর রব্বানী, (৪৬) আল বুনিয়ানুল মুশাইয়্যাদ, (৪৭) সাইফুল মুকাল্লেদীন, (৪৮) দুররুল মুখতার, (৪৯) ফতওয়ায়ে আমীনিয়া, (৫০)  ফতওয়ায়ে ছিদ্দীক্বিয়া, (৫১) শরহে আক্বায়েদে নসফী, (৫২) ফিক্বহুল আকবার ইত্যাদি।}

মুহম্মদ আজীজুল হক বেলাল

সাধারণ সম্পাদক- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত

চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

সুওয়াল ঃ সাম্প্রতিক কালে কতিপয় ইসলামী দলের নেতারা ও তাদের সমর্থিত লোকেরা বিভিন্ন ইস্যূ দিয়ে প্রায়ই ইসলামের দোহাই দিয়ে লংমার্চ করে থাকে। তারা লংমার্চকে হিজরত ও তাবুকের যুদ্ধের সাথে তুলনা করে থাকে। আবার কেউ কেউ তায়েফ গমণকেও লংমার্চের সাথে তুলনা করে। আর বলে থাকে, লংমার্চ করা অবশ্যই জায়েয যদিও এটা মাও সেতুং কর্তৃক প্রবর্তিত। কারণ বিধর্মীদের আবিষ্কৃত সমরাস্ত্র যদি আমরা জিহাদে ব্যবহার করতে পারি তাহলে তাদের নিয়মনীতি আমরা ব্যবহার করতে পারব না কেন? কেননা দুশমনদের কাবু করার জন্য যেকোন পদ্ধতি অনুসরণ করা জায়েয যদিও তা বিধর্মী ও বিজাতীয়দের প্রবর্তিত পদ্ধতি হয়।

           এখন এই লংমার্চ করা জায়েয কিনা? লংমার্চ শব্দ ব্যবহার করা জায়েয কিনা? এটাকে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হিজরত ও তাবুকের যুদ্ধের সাথে তুলনা করা জায়েয কিনা? বিধর্মীদের আবিষ্কৃত সমরাস্ত্র যদি আমরা ব্যবহার করতে পারি তাহলে তাদের নিয়মনীতি আমরা ব্যবহার করতে পারব না কেন? এর শরীয়তসম্মত ফয়সালা জানতে বাসনা রাখি।

জাওয়াবঃ মুসলমান মাত্রই প্রত্যেককে যেকোন কাজ করতে হলে কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা এবং কিয়াসের ভিত্তিতে করতে হবে। তাই লংমার্চ করা শরীয়তসম্মত কিনা আর লংমার্চ শব্দ ব্যবহার করা জায়েয কিনা তার সমাধান করতে হলে প্রথমে এর উৎপত্তি, ইতিহাস সম্বন্ধে জানতে হবে এবং তারপর কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের সাথে মিলাতে হবে, যদি মিলে তাহলে তা জায়েয আর যদি না মিলে তাহলে তা নাজায়েয।

          এখন যেহেতু প্রথমে আমাদের ইতিহাস উৎপত্তি সম্বন্ধে জানতে হবে তাই লংমার্চের ইতিহাস নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

লংমার্চের প্রাক ইতিহাস

 ১৯২৭ সালটা চীনা কমিউনিষ্ট পার্টির জন্যে এক দুর্যোগপূর্ণ সময় বলে ধরা হয়। পার্টির নির্দেশে মাওসেতুং তার কর্মক্ষেত্র হুনান প্রদেশে শরৎকালীন ফসল তোলার পূর্বে এক কৃষক বিদ্রোহ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। হুনানের পার্শ্ববর্তী প্রদেশ কিয়াংসির প্রধান শহর নানচাঙ-এ আরেক কমিউনিষ্ট নেতা আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মোটামুটি সফল হয়। এ বাহিনী সদম্ভে ক্যান্টেনের দিকে অভিযান চালাতে গিয়ে চীনের তৎকালীন কমিউনিষ্ট বিরোধী প্রেসিডেন্ট চিয়াঙ কাইশেকের বাহিনীর নিকট পরাজয় বরণ করে। নানচাঙ কয়েক দিনের জন্যে কমিউনিষ্ট পার্টির ফৌজের অধীনে থাকলেও ক্যান্টেনের অভিযানে পরাজিত হয়ে একেকজন একেক দিকে পালিয়ে যায়। হোলাঙ সাংহাইতে, চৌ-এন লাই হংকং-এ, মাওসেতুং তার অবশিষ্ট সৈন্য বাহিনী নিয়ে হুনান আর কিয়াংশি প্রদেশের সীমান্তবর্তী পার্বত্য অরণাঞ্চল চিঙ্খানশান এ পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। কিছুদিন পর চু-তে এখানে এসে মিলিত হয় মাওসেতুং এর সাথে।

          এদিকে এ বৎসরটি শেষ হওয়ার পূর্বেই কমিন্টার্ণ চীনের এখানে ওখানে কয়েকটি সোভিয়েত প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

          সোভিয়েত বলতে কমিউনিষ্টদের ভাষায় একটি ভুখন্ড, যেখানে কমিউনিষ্টরা তাদের কথিত সাম্যবাদের নীতিতে দেশটাকে শাসন করে অর্থাৎ সেখানে উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থা হবে জমিদার বা কারখানা মালিক ও কৃষক-মজদুরের তথাকথিত যৌথ স্বার্থে। জমিদার বা কারখানা মালিকরা এ ব্যবস্থা মেনে না নিলে পুলিশ ও মিলিটারী দিয়ে তাদের বাধ্য করা হবে। কারণে কমিউনিষ্টরা সোভিয়েত প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নিজস্ব ফৌজ বা গণফৌজ তৈরী করতে সচেষ্ট হয়।

          প্রথম সোভিয়েত প্রতিষ্ঠা হয়েছিল কোয়াংতুং প্রদেশের হাই-লু-ফেং সোভিয়েত। এর নেতা ছিল পেং পাই। প্রায় সাত-আট লক্ষ কৃষকদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল এ সোভিয়েত কিন্তু এক বছর না যেতেই ১৯২৮ সালের মার্চে তাকে নির্মূল করে ফেলা হয়।

          সেক্রেটারী জেনারেলের পদ- ত্যাগ করে চু-চিউ পাই মস্কো চলে যায়। দলের নেতৃত্বভার গ্রহণ করে লি-লি সান। তার প্রধান সহকারী নিযুক্ত হয় চৌ এন লাই। তিন বছর এর মধ্যেই ব্যাপক আকারের বিপ্লব কর্মসূচী হাতে নেয় লিলি সান। তার আশা ছিল এ বিপ্লব শুধু চীনেই নয় বরং তা হবে সমগ্র বিশ্বে এবং এটাই হবে চুড়ান্ত বিপ্লব এবং বিশ্বের শেষ এবং চুড়ান্ত শ্রেণী সংগ্রাম। ১৯৩০ সালের জুনে লি- মাওসেতুং আর চু-তের অধীনস্ত গণফৌজ নিয়ে পার্শ্ববর্তী কারখানা আছে এমন শহরগুলো বিশেষ করে উহান আর হুনান প্রদেশের রাজধানী চাংশা দখল করে নেয়ার জন্যে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে হুকুমনামা জারী করে।

কিন্তু গণফৌজ সে যুদ্ধে পরাজিত হয়। পেং তে হুয়ির পঞ্চম বাহিনী চাংশা দখল করেও স্থায়িত্ব পায়নি। ফলে পরাজিত বাহিনীর অবশিষ্ট ফৌজ নিয়ে মাওসেতুং এবং চুতে পুনরায় পর্বত কন্দরে পালিয়ে যায়।

          ১৯৩১ সালের গোড়ার দিকে লিলিসানকে সরে দাঁড়াতে হল নেতৃৃত্বের পদ থেকে। পার্টির নতুন নেতৃত্ব গ্রহণ করে মস্কো ফেরৎ ছাত্রদল, যারা ‘অষ্টবিংশতিবলশেভিক’ নামে পরিচিত। এ দলের তিন  জন ছিল চীনা বিপ্লবী। এদের ছদ্ম নাম যথাক্রমে- ওয়াং মিং, পে-কু এবং লো ফু। দলের নেতা ছিল ওয়াং ফু। কিন্তু তার নীতিতে কার্যকর হলনা কিছুই। পার্টির ভিতর হতাশা নেমে এল। শহরাঞ্চলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে হতাশা নেমে এলেও চিঙ্খানশান পার্বত্য ভূখন্ডের গভীরে তিন বন্ধু মাওসেতুং, চুতে আর পেনতে হুয়ি অন্যভাবে কাজ করে যাচ্ছিল।

চিঙ্খানশানের কিয়াংশি সোভিয়েতঃ

          হুনান আর কিয়াংশি প্রদেশের সীমান্তে চিঙ্খানশান একটা অরণ্য পর্বত পরিধিতে প্রায় দেড়শ মাইল বিস্তৃত। পাইন আর বাঁশ ঝাড়ের জঙ্গল, নেকড়ে, বুনো শুয়োর আর চিতা বাঘের আড্ডা। চম্বল অরণ্যের মতো এখানেও যুগে যুগে আশ্রয় নিয়েছে ডাকাতের দল। ১৯২৭ সালের শেষদিকে পরাজিত ভগ্নহৃদয় সৈন্যদলের ভগ্নাংশ নিয়ে মাওসেতুং ঐ জঙ্গলে এসে আশ্রয় নেয়। তখন তার সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার। হুনান এর কৃষক বিদ্রোহের ব্যর্থতা, নানচাঙ এর পতন, ক্যান্টেনের চুড়ান্ত পরাজয় আর পার্টি থেকে মাওসেতুং এর বহিস্কার ইত্যাদি সব মিলিয়ে মাও এর অবস্থা শোচনীয়। তবুও হতাশ না হয়ে অদম্য স্পৃহা আর মনোবল নিয়ে ডাকাত দলের সাথে সমঝোতা করে ঐ অরণ্যেই একটা সোভিয়েত গড়ে তুলবার চিন্তায় বিভোর হল মাও। কেন্দ্রীয় কমিটির ভৎসনাকে উপেক্ষা করেই মাও ভাব জমিয়ে তুলল ছয়’শ জন সদস্য বিশিষ্ট ডাকাত দলের সর্দারের সাথে। ছয় মাস পরে ১৯২৮ এর বসন্তকালে মাও এর সাথে  নয় শত সৈন্য আর চেনয়ি ও লিন পিয়াও নামের দু’জন সহকারী সহ হাজির হয় চুতে। একই বছরে হুনান এর কৃষক নেতা পেনতেহুয়ি হাজারখানিক নিজস্ব সৈন্য নিয়ে এসে মিলিত হয় তাদের সাথে। তিন বন্ধুর মিলিত  বাহিনীর সাথে ডাকাত দল আর স্থানীয় কৃষকদের সমন্বয়ে মোটামুটি একটা সৈন্যদল গঠিত হল। সেই সাথে মাও তার নয়া যুদ্ধনীতি প্রবর্তন করে। কিয়াংশি জঙ্গলে যখন এসব ঘটনা ঘটছে, বহিঃচীন তখন জাপানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত। জাপান চীনের মাঞ্চুরিয়া দখল করে নেয়ায় চীনের জনগণ জাপান বিরোধী মনোভাব ব্যক্ত করলে চিয়াঙ জাপানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বরং উল্টোভাবে জাপান বিরোধী আন্দোলন  দমনে সক্রিয় হয়ে উঠে।

          চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট চিয়াঙ কাইশেক এরপর ঐ কিয়াংশি সোভিয়েতকে নিশ্চিহ্ন করার জন্যে পর পর কয়েকটি অভিযান চালিয়ে ব্যর্থ হয়। অভিযান পরিচালিত হয় ১৯৩০ সালের ডিসেম্বরে, দ্বিতীয়বার ১৯৩১ এর বসন্তকালে। এ অভিযানকালে গণফৌজ চিয়াঙ-এর বিশ হাজার সৈন্যকে বন্দী করে তাদের সব আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নেয়। জেনারালেসিমো চিয়াঙ কাইশেক তৃতীয় অভিযান পরিচালনা করতে নিজেই এসে আস্তানা গাড়ে, গণফৌজের দশগুণ সৈন্য সমাবেশ করে এবারও ব্যর্থ হয়। মাও এবং চু-র গেরিলা যুদ্ধনীতিতে চিয়াঙ এর দুটি বিগ্রেড আত্মসমর্পন করে। বন্দী হয় বিশ হাজার সৈন্য। সেই সাথে তাদের বিশ হাজার রাইফেল এবং কয়েকশ মেশিনগান। গণফৌজের সৈন্য সংখ্যা তখন দুই লক্ষ। তাদের আছে প্রায় দেড় লাখ রাইফেল। জাপানের সাথে যুদ্ধ বাঁধার ফলে ১৯৩২ সালে চিয়াঙ চতুর্থবার অভিযান পরিচালনা করেও মাও বাহিনীকে পর্যদুস্ত করতে ব্যর্থ হয়। এরই মধ্যে ১৯৩২ সালে ওয়াং মিং অবসর নিয়ে ফিরে যায় রাশিয়ায়। সেক্রেটারী জেনারেল পো-কু তার সহকারী চৌ-এন লাই এবং একজন জার্মান অটোব্রন, যার ছদ্মনাম লি তে, চিয়াঙ এর চতুর্থ বারের ব্যর্থতায় সাহস বেড়ে গেল ওদের। এক লক্ষ গণফৌজ নিয়ে আশ-পাশের শহরাঞ্চলগুলো দখলের হুকুম জারী করল। মাওসেতুং এ নীতির ঘোর বিরোধী থাকার ফলে তার দলের অনেক অনুচরকেই তখন বহিস্কার করা হয়। কিন্তু পো কু আর লি তের আশা সফল হলনা। ঘটনা প্রবাহিত হল ভিন্ন দিকে। চিয়াঙ জাপানের সঙ্গে আতাত করবে না কমিউনিষ্টের সঙ্গে আতাত করে বহিঃশত্রু জাপানকে তাড়াবে তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিল। অবশেষে জাপানের সাথে মামুলী ধরণের একটা সন্ধি করে গৃহশত্রুকে সবংশে নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে পঞ্চম এবং শেষ অভিযান পরিচালনা করতে গণফৌজকে নির্মূলীকরণে পশ্চিমা শক্তির দেয়া পাঁচ কোটি ডলার মূল্যের গম, আগ্নেয়াস্ত্র এবং চারশ বিমান আর দশ লক্ষ সৈন্যের বিরাট বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হয় কিয়াংশি সোভিয়েতের বহিঃদ্বারে। রণনীতি বদলে চিয়াঙ এবার চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলল লাল এলাকা।

          চিয়াঙ সম্মুখ যুদ্ধ না করে সমস্ত এলাকা ঘিরে রাতারাতি পাকা সড়ক নির্মাণ করে রাস্তার উপর সাজোয়া গাড়ী সাজিয়ে মেশিনগান দিয়ে সৈন্যদের বসিয়ে রাখে। ছেলে-মেয়ে, বাচ্চা-বুড়ো যে কেউ ঐ জঙ্গল ছেড়ে বের হওয়ার চেষ্টা করলে দেখা মাত্রই গুলি করার নির্দেশ জারী হলো। অতঃপর পরিখা খনন করে কাঁটা তারের বেড়া দিল চার পাশে। যাতে কেউ জঙ্গল ছেড়ে এপারে আসতে না পারে। ঐ ম্যালেরিয়া অধ্যুষিত পার্বত্য অরণ্যে এক গ্রেন কুইনিন প্রবেশের ক্ষেত্রেও কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

          অবস্থা পর্যবেক্ষণ পূর্বক এ বিপদ থেকে বাঁচার জন্যে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বুহ্য ভেদ করে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে মাও এবং চু পরামর্শ দিয়েছিল সেনাপতিকে। কিন্তু জার্মান সেনাপতি লি তে-তা অগ্রাহ্য      ১৯৩৪ সালের এপ্রিলে লি তে মাও এর যুদ্ধনীতি অগ্রাহ্য করে ফুকিয়েন-কিয়াংশি সীমান্তে কোয়াংচাঙ এর রণক্ষেত্রে সম্মূখ যুদ্ধে মর্মান্তিকভাবে পরাজিত হয়। এতে গণফৌজের চার হাজার সৈন্য নিহত এবং বিশ হাজার সৈন্য আহত হয়। অবশেষে বাধ্য হয়ে তাদের ফিরে আসতে হল অবরুদ্ধ জঙ্গলে।

এতদিনে পলিটব্যুরো মাওয়ের মত মেনে নিলো। সোভিয়েত ছেড়ে সদলবলে পালানোর জন্যে প্রস্তুত হলো। আর মাওসেতুং এর কথানুযায়ী কমিউনিষ্ট তথা লাল ফৌজ বা গণ ফৌজ বাহিনীর এই পলায়ণের কাহিনীই ইতিহাসে লংমার্চ নামে অভিহিত। ১৬ইঅক্টোবর ১৯৩৪ সালে শুরু হলো এই কথিত মহাযাত্রা লংমার্চ। পালানোর কৌশল হিসেবে তারা চীনের দক্ষিণ-পূর্ব কিয়াংশি থেকে পশ্চিম দিক দিয়ে ঘুরে প্রায় (৬-৮) হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে চীনের উত্তর পশ্চিম সেনসি প্রদেশে পৌঁছে। পথে তাদের ১৮টি পাহাড়ের সারি ও ২৪টি নদী অতিক্রম করতে হয়। মাওসেতুং এর নেতৃত্বে কমিউনিস্টদের এই দীর্ঘ বিপদসঙ্কুল পথ পলায়নের কাহিনীই ইতিহাসে লংমার্চ নামে অভিহিত বা মশহুর।

১৯৩৪ সালের ১৫ই অক্টোবর প্রায় ১লাখ ৩৫জন লোক নিয়ে মাওসেতুং এই পলায়ন অভিযান আরম্ভ করে। এদের মধ্যে ৮৫ হাজার ছিল কমুনিস্ট সৈন্য, ১৫ হাজার বেসামরিক ব্যক্তি ও ৩৫ জন মেয়েলোক। পলায়নের সময় একদিকে নতুন সৈন্য অন্তর্ভূক্তির ব্যর্থতা অপরদিকে সমরাস্ত্র, খাদ্য, চিকিৎসা ইত্যাদির অভাবে তাদের অবস্থা খুবই নাজুক হয়ে পড়ে। যার ফলে তারা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং প্রায় ৮ হাজার লোক জীবিত অবস্থায় ১৯৩৫ সালের অক্টোবরে সেনসি প্রদেশে পৌঁছে।

          উল্লেখ্য এর মধ্যে অবশ্য অনেককে ইচ্ছে করেই বিভিন্ন গ্রামে রেখে আসা হয়, সে অঞ্চলে বিপ্লবের বীজ বপন করতে।

          অবশেষে তৎকালীন চীনের প্রেসিডেন্ট চিয়াং কাইশেকের কাছেও খবরটা পৌঁছল। মাওসেতুং-এর নেতৃত্বে কমিউনিষ্টরা উত্তর-পশ্চিম চীনের সেনসিতে মিলিত হয়েছে।  ১৯৩৬ সালের অক্টোবরে চিয়াং কাইশেক স্বয়ং এল সেনসিতে। সব সেনাপতিকে ডেকে কমিউনিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযানের  কথা বললো চিয়াং কাইশেক। কিন্তু এদিকে তখন চীনের বহিঃশক্র জাপানের আক্রমণ তুঙ্গে। তাই মার্শাল চ্যান্ড সহ কতিপয় সেনাপতি কমিউনিষ্টদের সাথে সন্ধি করে বহিঃশত্রু জাপানের বিরুদ্ধে একযোগে আক্রমণের পরামর্শ দেয়। কিন্তু চিয়াং কাইশেক তাতে রাজী না হলেও ছাত্র জনতার চাপ এমনকি মার্শাল চ্যান্ড এর মত কতিপয় সেনাপতির কৌশলে চিয়াং কাইশেক এক পর্যায়ে বন্দী হয়ে অবশেষে মাওসেতুং এর কমিউনিষ্ট পার্টির বিরুদ্ধে আক্রমণ বাদ দিয়ে বরং তার সাথে মিলিত হয়ে জাপানের বিরুদ্ধে লড়তে সম্মত হয়।

          আর এদিকে চিয়াং কাইশেকের সাথে মিলিত হওয়ার পেছনে মাও-এর দর্শন ছিল যে, জাপানীদের থেকে রাজনৈতিক ভাবে স্বাধীনতা লাভের জন্য তখন চিয়াং কাইশেকের সাথে মিলিত হয়ে যুক্তফ্রন্ট করা দরকার। কিন্তু মাওসেতুং বিশ্বাস করত যে এ যুক্তফ্রন্ট বেশী দিন চলবেনা। কিন্তু ঐভাবে মাওসেতুং চিয়াং কাইশেকের সৈন্যদলের ভিতর ঢুকে পড়তে চেয়েছিলো। তার সে চেষ্টা সফল হয়েছিল। আর এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৯ সালে আরেক বিরোধে মাওসেতুং জয় লাভ করে, চিয়াং কাইশেক পদত্যাগ করে এবং ১৯৫০ সালে চিয়াং কাইশেক সপরিবারে ফরমোসায় পলায়ন করলে পুরো চীনে মাওসেতুং এর কমিউনিষ্ট পার্টি  কমিউনিষ্ট শাসন জারী করে।

          কারণ মাওসেতুং এর কথানুযায়ী তার লংমার্চ যদি না করা হত তাহলে কিয়াংশি প্রদেশেই সমস্ত কমুনিষ্টদের চিয়াং কাইশেকের সেনাবাহিনীর হাতে মৃত্যুবরণ করতে হত।

          কিন্তু মাওসেতুং-এর লংমার্চের কারণেই তারা প্রাণে বেচেঁছে এবং পরিণামে কমিউনিষ্ট মতবাদও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আর মাওসেতুং নিজেও জানে যে কমিউনিষ্ট মতবাদ প্রতিষ্ঠার পেছনে এই লংমার্চের নেপথ্যে ছিল তার একক কৃতিত্ব। (কমিউনিষ্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাওসেতুং  সেনসিতে পৌঁছার দুই মাস পরে ২৭ শে ডিসেম্বর ১৯৩৬ সালে লংমার্চের স্মৃতিচারণ করে যা লিখে তা তার

***

১৬১-১৬২ এ সংকলিত হয়েছে। যার বর্ণনা নিম্নরূপঃ

চেয়ারম্যান মাও জেডোঙের

(মাও সেতুং) উদ্ধৃতি

          “ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহে লংমার্চ এ ধরণের প্রথম ঘটনা। একটি ইস্তেহার, একটি প্রচার বাহিনী, একটি বীজ বপনকারী যন্ত্র। পানগু যখন স্বর্গ থেকে মর্ত আলাদা করে দেয় এবং তিন রাজা ও পাঁচ সম্রাট রাজত্ব করত সেই থেকে ইতিহাস কি কখনো আমাদের মত একটি লংমার্চ প্রত্যক্ষ করেছে? দীর্ঘ বারো মাস বেশ কিছু বিমান আকাশ থেকে আমাদের ওপর নজর রেখেছে এবং বোমা ফেলেছে। মাটিতে কয়েক শত-সহস্র মানুষের এক বিশাল বাহিনী আমাদের ঘেরাও, অনুসরণ, গতিরোধ করেছে এবং প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে, পথে আমরা অবর্ণনীয় কষ্ট এবং বিপদের মোকাবেলা করেছি; তথাপি দু’পা ব্যবহার করে আমরা এগারটি প্রদেশের দৈর্ঘ্যে এবং প্রস্থে বিশ হাজার লী’র বেশী দূরত্ব অতিক্রম করেছি। জিজ্ঞেস করতে চাই ইতিহাসে কি কখনো এ ধরণের লংমার্চের ঘটনা ঘটেছে? না, কখনোই নয়। লংমার্চ একটি ইস্তেহার। লংমার্চ গোটা বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে লাল ফৌজ বীরদের বাহিনী, সাম্রাজ্যবাদীরা এবং তাদের পা চাটা কুকুর জিয়াং জিয়েশি (চিয়াং কাই-শেক) ও তার দোসররা নপুংসক, আমাদের ঘেরাও, অনুসরণ, প্রতিরোধ এবং গতিরোধে তাদের চরম ব্যর্থতার কথাও লংমার্চ জানিয়ে দিয়েছে। লংমার্চ একটি প্রচারণী শক্তিও। এগারোটি  প্রদেশের প্রায় ২০ কোটি জনগণকে লংমার্চ দেখিয়েছে লাল ফৌজের পথই তাদের মুক্তির একমাত্র পথ। লংমার্চ ছাড়া ব্যাপক জনগণ স্বল্প সময়ে কিভাবে লাল ফৌজের বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে পারতেন? লংমার্চ বীজ বপনকারী যন্ত্রও। এগারোটি প্রদেশে লংমার্চ যে অসংখ্য বীজ বুনেছে, তা মুঞ্জরিত হবে, পাতা গজাবে, বিকশিত হবে, ফল ধারণ করবে এবং ভবিষ্যতেও ফসল দেবে। এক কথায় আমাদের জন্য বিজয় এবং শত্রুর জন্য পরাজয়ের মধ্য দিয়ে লংমার্চ শেষ হয়েছে। কারা লংমার্চকে বিজয়ের লক্ষ্যে পৌছে দিয়েছে? কমিউনিষ্ট পার্টি। কমিউনিষ্ট পার্টি ছাড়া এ ধরণের একটি লংমার্চ কল্পনাই করা যেতনা। চীনের কমিউনিষ্ট পার্টি, এর নেতৃত্ব, ক্যাডার এবং সদস্যরা কোন প্রতিকূলতা অথবা কষ্টকে ভয় পায়না। বিপ্লবী যুদ্ধ পরিচালনায় আমাদের দক্ষতা সম্পর্কে কেউ প্রশ্ন তুললে সুবিধাবাদের আবর্তে নিক্ষিপ্ত হবে। লংমার্চ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে এক নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। যিলুওযেনের যুদ্ধে কেন্দ্রীয় লাল ফৌজ এবং উত্তর পশ্চিমের লাল ফৌজ মৈত্রীবদ্ধ হয়ে লড়াই করে সেনসী-গানসু সীমান্ত এলাকার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতক জিয়াং জিয়েশি-এর “ঘেরাও এবং দমন” নীতিকে চূর্ণ করে দিয়েছে এবং পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির কর্মসূচীর অর্থাৎ উত্তর পশ্চিম চীনে বিপ্লবের জাতীয় হেডকোয়ার্টারের ভিত্তি স্থাপন করেছে।” কমিউনিষ্ট মতবাদ প্রতিষ্ঠার মূলে এই লংমার্চের একক কৃতিত্বের দাবীদার মাওসেতুং ও তার লংমার্চ সম্পর্কে বিশ্বকোষ গুলোতেও বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে Encyclopaedia Britannica তে লেখা হয়েছেঃ LONG MARCH: (1934-35), the 6,000- mile (10,-000-kilometre) historic trek of the Chinese Communists, Which resulted in the relocation of the Communist revolutionary base from Southeast China to Northwest China and in the emergence of Mao Zedong as the undisputed party leader. Fighting National-ist forces under Chiang Kai-shek throughout their journey. the Communist troops crossed 18 mountain ranges and 24 rivers to reach the northwestern province of Shensi. The heroism Attributed to the Long March inspired many young Chinese to join the Chinese Communist Party during the late 1930s and early 1940s. warfare Between 1930 and 1934 Chiang Kai-shek launched a series of five military encirclement campaigns against the Chinese Communists in an attempt to annihilate their base area (the Kiangsi Soviet) on the kiangsi Fukien border in Southeastern China. The Communists Successfully fought off the first four campaigns using tactics of mobile infiltration and guerrilla developed by Mao. In the fifth campaign Chiang mustered about 700,000 troops and established a series of cement blockhouses around the Communist positions. The Chinese Communist Central Committee, which had removed Mao from the leadership early in 1934, Abandoned his guerrilla warfare strategy and used regular positional warfare tactics against the better-armed and more numerous Nationalist forces. As a result the Communist forces suffered heavy losses and were nearly crushed. On Oct. 15. 1934, the remaining 85,000 troops, 15,000 administrative personnel, and 35 women broke through the Nationalist lines at their weakest points and fled westward. Mao, at the time of the Communists, departure, was not in control of events; Zhu De was the commander of the army, and Zhou Enlai was the political commissar of the party. The first three months of the march were disastrous for the Communists: subjected to constant bombardment form Chiang’s air force and repeated attacks from his ground troops, they lost more than half of their army. Morale was low when they arrived in Tsun-i, in the southwestern province of Kweichow, but at a conference in Tsun-i in January 1935 Mao was able to gather enough support to establish his dominance of the party. The march then headed toward Northwest China, near the safety of the Soviet border and close to the territory occupied by the Japanese in northeastern china. In June 1935 a force under Chang Kuo-t’ao, a longtime communist leader, joined the main army, and at Maoerh-kai in western szechwan a power struggle ensued between Mao and Chang. Chang’s group. accompanied by Zhu De, headed to ward the extreme southwestern part of china. The main body under Mao proceeded to ward northern shensi, where the Communist leaders Gao Gang and Liu Zhidan had built up another Soviet area. Mao arrived at this destination is October 1935 along with only about 8,000 survivors. Along the route some Communists had left the march to mobilize the peasantry; but most of the missing had been eliminated by fighting, disease, and starvation. Among the missing were Mao’s two small children and his younger brother, Mao Zetan. Mao’s troops joined the local Red Army contingent of 7,000 men, and other units (including that of Zhu De) swelled their total strength by late 1936 to about 30,000 troops. In December 1936 the Communists moved to the nearby district of Yen-an in Shensi, where they remained throughout the war with the Japanese. The Long March decisively established Mao’s leadership of the Chinese communist Party, and it enabled the embattled Communists to reach a base area beyond the direct control of the Nationalists. From their base at Yen-an the Communists grew in strength and eventually defeated the Nationalists in the struggle to control mainland china. অনুরূপ Encyclopedia Amaricana, World Book, Lexicon universal Encyclopedia, Macmilan Encyclopedia, সহ  আরো অনেক বিশ্বকোষ এবং লংমার্চের ইতিহাস সম্বলিত পুস্তকে এই কাহিনী বর্ণিত রয়েছে।

          ইসলামের আলোকে লংমার্চের উপরোক্ত ইতিহাস আলোচনা করলে বিষয়টি দুভাবে মূল্যায়িত হতে পারেঃ

(ক) প্রথম দিক হচ্ছে-

(১) লংমার্চ করার অর্থ মাওসেতুংকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা। অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,

لقد كان لكم فى رسول الله اسوة حسنة.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।” (সূরা আহ্যাব/২১)

 (২) লংমার্চ কমিউনিষ্ট নেতা মাওসেতুং-এর একক আবিস্কার। সুতরাং লংমার্চ করা তাকেই অনুসরণ করা।

অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,

اطيعوا الله ورسوله ان كنتم مؤمنين.

অর্থঃ- “যদি তোমরা মু’মিন হয়ে থাক তাহলে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ করো।” (সূরা আনফাল/১)

          (৩) লংমার্চ করার অর্থ কমিউনিজমকে সমর্থন করা ও বাতিল মতবাদের সাহায্য নেয়া।

অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,

ولاتعاونوا على الاثم والعدوان.

অর্থঃ- “তোমরা পাপ ও শত্রুতার মধ্যে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করনা।” (সূরা মায়িদা/২)

(৪) লংমার্চ করার অর্থ কমিউনিষ্ট আইন-কানুনকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা উদ্যোগ নেয়া বা চাওয়া।

অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,

افحكم الجاهلية يبغون ومن احسن من الله حكما لقوم يوقنون.

অর্থঃ- “তোমরা কি জাহিলিয়াতের হুকুম-আহকাম, নিয়ম-কানুন চাও? অথচ আল্লাহ্ পাক থেকে উত্তম হুকুম দাতা ও আইন-কানুন প্রণেতা কে রয়েছেন বিশ্বাসীদের জন্য।” (সূরা মায়িদা/৫০)

(৫) ইসলামকে অপূর্ণ মনে করা।

 অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,

اليوم اكملت لكم دينكم واتممت عليكم نعمتى ورضيت لكم الاسلام دينا.

অর্থঃ- “আজ আমি তোমাদের জন্য দ্বীনকে কামিল বা পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং নিয়ামতকে তোমাদের উপর পূর্ণ করে দিলাম এবং দ্বীন ইসলামকে তোমাদের জন্য মনোনীত করে দিলাম।” (সূরা মায়িদা/৩)

 (৬) হক্ব ও নাহক্বকে মিশ্রিত করা। অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন, ولا تلبسوا الحق بالباطل.

অর্থঃ- “তোমরা হক্বকে নাহক্বের সাথে মিশ্রিত করোনা।” (সূরা বাক্বারা/৪২)

 (৭) ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্ম তালাশ করা। অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,

من يبتغ غير الاسلام دينا فلن يقبل منه وهو فى الاخرة من الخسرين.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে তার থেকে তা কখনই গ্রহণ করা হবেনা এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হবে।” (সূরা আলে ইমরান/৮৫)

(৮) লংমার্চ করলে গণফৌজ, লালফৌজ, চীনা কমিউনিষ্ট তথা মাওসেতুং বর্ণিত লংমার্চের মধ্যে বিশ্ব মুক্তির বীজ লুকিয়ে আছে এ কথা স্বীকার ও প্রমাণ করা।

অথচ আল্লাহ্ পাক বলেন,

افغير دين الله يبغون وله اسلم من فى السموت والارض طوعا وكرها واليه يرجعون.

অর্থঃ- “তোমরা কি আল্লাহ্ পাক-এর দ্বীন (ইসলাম) ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম তালাশ কর। অথচ তাঁর জন্য আসমান-যমীনের সবকিছু ইচ্ছা এবং অনিচ্ছায় সমর্পিত রয়েছে এবং সবকিছু তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তিত হবে।” (সূরা আলে ইমরান/৮৩)

 (খ) আর দ্বিতীয় দিক হচ্ছে-

(১) লংমার্চ না হলে চীনা কমিউনিষ্টরা সিয়েনসি প্রদেশ থেকে বের হতে পারতো না। সুতরাং কমিউনিষ্ট মতবাদও প্রতিষ্ঠা পেতনা।

          অথচ হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

من سن فى الاسلام سنة سيئة كان عليه وزرها ووزر من عمل بها.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি দ্বীন ইসলামের মধ্যে কোন বদ প্রথা প্রচলন করলো এর গুণাহ্ তার উপর বর্তাবে এবং যারা উক্ত বদ প্রথা আমল করবে তার গুণাহ্ও  তার উপর বর্তাবে।” (মুসলিম, মিশকাত)

(২) লংমার্চ সম্মুখ জয়ের কাহিনী নয় বরং পিছন দিকে পলায়নের কাহিনী বা প্ররিক্রমা।

অথচ হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

من وقر صاحب بدعة فقد اعان على هدم الاسلام.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি কোন বিদ্য়াতী বা গোমরাহ্কে সম্মান করল সে যেন ইসলাম ধ্বংসের কাজে সাহায্য করল।” (মিশকাত শরীফ)

(৩) লংমার্চ মাওসেতুং, গণফৌজ, লালফৌজ তথা কমিউনিষ্টদের কৃতিত্ব ও বীরত্বগাঁথাকে প্রচার ও প্রকাশ করা।

অথচ হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

اذا مدح الفاسق اهتز له العرش.

অর্থঃ- “যখন কোন ফাসিক-ফুজ্জার বা কাফিরের প্রশংসা করা হয় তখন তার কারণে আল্লাহ্ পাক-এর আরশ কাঁপে।” (মিশকাত শরীফ)

লংমার্চ শব্দ ব্যবহার করা জায়েয নেই

          উপরোক্ত পর্যালোচনার পর আমরা লংমার্চ শব্দ ব্যবহার করা জায়েয কিনা তা তাহকীক্ব করব। লংমার্চ শব্দ ব্যবহার করা জায়েয নেই। আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে ইরশাদ করেন,

 يايها الذين امنوا لاتقولوا راعنا وقولوا انظرنا واسمعوا وللكفرين عذاب اليم.

অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ তোমরা রঈনা বলোনা উনজুরনা বল এবং শ্রবণ কর (বা শুনতে থাক) আর কাফিরদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।” (সূরা বাক্বারা/১০৪)

          এ আয়াতের শানে নুযুলে বলা হয়, ইহুদীরা হুজুরে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেবার জন্য রঈনা শব্দ ব্যবহার করত যার একাধিক অর্থ। একটি অর্থ হলো- ‘আমাদের দিকে লক্ষ্য করুন’ যা ভাল অর্থে ব্যবহৃত হয় আর খারাপ অর্থে ‘হে মূর্খ’, ‘হে মেষ শাবক’ এবং হিব্রু ভাষার একটি বদ্দোয়া। ইহুদীরা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রঈনা বলে সম্বোধন করত। যাতে প্রকৃতপক্ষে তাদের উদ্দেশ্য ছিল খারাপ অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করা। অন্যান্য ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ রঈনা শব্দের ভাল অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করে হুজুর পাক ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করলে তখন ইহুদীরা খারাপ অর্থ চিন্তা করে হাসাহাসি করত। এতে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কষ্ট পেতেন তবুও কিছু বলতেন না। কেননা, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহী ছাড়া কোন কথা বলতেন না। যেমন, কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

وما ينطق عن الهوى ان هو الاوحى يوحى.

অর্থঃ- “তিনি (হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওহী ব্যতীত নিজের থেকে মনগড়া কোন কথা বলেন না।” (সুরা নজম/৩,৪)

          এর ফলশ্রুতিতে আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফের আয়াত নাযীল করে রঈনা শব্দের বদলে উনজুরনা শব্দ ব্যবহার করতে বললেন। কারণ রঈনা শব্দ ভাল খারাপ উভয় অর্থে ব্যবহৃত হলেও উনজুরনা শব্দ শুধুমাত্র ভাল অর্থেই ব্যবহৃত হত। তাই যে সকল শব্দ ভাল মন্দ উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়, সে সকল শব্দের পরিবর্তে উপরোক্ত আয়াত মোতাবিক ওটার সমার্থক অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করতে হবে, যা শুধুমাত্র ভাল অর্থেই ব্যবহৃত হয়। তাই লংমার্চ শব্দের দু’টি অর্থ- আভিধানিক ও ব্যবহারিক থাকলেও, আর আভিধানিক অর্থে লংমার্চের অর্থ লম্বা সফর হলেও এ অর্থে লংমার্চ কখনও ব্যবহৃত হয়নি বরং তার ব্যবহারিক অর্থে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ব্যবহারিক অর্থে নাস্তিকদের পলায়নের ও নাস্তিক্যবাদের প্রতিষ্ঠার এক বিশেষ পদ্ধতিকে বুঝায় এবং এই অর্থেই এটা মশহুর। তাই লংমার্চ যেহেতু ভাল ও মন্দ উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হতে পারে। তাই কুরআন শরীফের উপরোক্ত আয়াত শরীফ অনুযায়ী এই শব্দ ব্যবহার করা যাবেনা। কারণ লংমার্চ সর্ব প্রথম বিধর্মী নাস্তিক্যবাদের ধারক ও বাহক মাওসেতুং কর্তৃক উদ্ভাবিত হয়।

লংমার্চ করা জায়েয নেই

আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে ইরশাদ করেন,

ان الدين عند الله السلام.

অর্থঃ-“নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাকের নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন হলো ইসলাম।” (সুরা আলে ইমরান/১৯)

          আর এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ্ পাক অন্য আয়াত শরীফে ইরশাদ করেছেন,

ومن يبتغ غير الاسلام دينا فلن يقبل منه وهو فى الاخرة من الخسرين.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন (নিয়ম-নীতি, অন্য ধর্ম) তালাশ করে, তা কখনই তার থেকে গ্রহণ করা হবেনা এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হবে।” (সূরা আলে ইমরান/৮৫)

আর এ আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে,

وعن جابر عن النبى صلى الله عليه وسلم حين اتاه عمر فقال: انا نسمع احاديث من يهود تعجبنا افترى ان نكتب بعضها فقال امتهوكون انتم كما تهوكت اليهود والنصارى؟ لقد جئتكم بها بيضاء نقية ولو كان موسى حيا ماوسعه الا اتباعى.

অর্থঃ- হযরত জাবের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, একদিন হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, আমরা ইহুদীদের অনেক ধর্মীয় কাহিনী, কথা-বার্তা, নিয়ম-কানুন ইত্যাদি শ্রবণ করে থাকি যা আমাদের নিকট ভাল লাগে। আমরা এর থেকে কিছু লিখে রাখতে পারবো কি? তখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তোমরাও কি তোমাদের দ্বীন সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্থ বা বিভ্রান্ত রয়েছ? যেভাবে ইহুদী-নাসারাগণ বিভ্রান্ত রয়েছে? আল্লাহ্ পাক-এর কসম! আমি তোমাদের নিকট সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও পরিপূর্ণ দ্বীন এনেছি। হযরত মুসা আলাইহিস্ সালাম যদি এখন থাকতেন, তাহলে তাঁকেও আমার অনুসরণ করতে হতো।” (আহমদ, বায়হাক্বী, শোয়াবুল ঈমান, মিশকাত)

          তাই আমরা দেখতে পাই ইহুদী-খ্রীষ্টান তথা বিধর্মীরা যে সকল আমল করত হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে সকল জিনিস স্বয়ং নিজেও অনুসরণ করতেন না এবং আমাদেরকেও কঠোরভাবে অনুসরণ না করার জন্য তাগিদ দিতেন। যেমন, ইহুদী-নাসারারা আশুরার একদিন রোযা রাখত, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতে মুহম্মদীকে দুইদিন রোযা রাখতে বললেন। ইহুদী-নাসারারা দেরী করে ইফতার করত। এর পরিপ্রেক্ষিতে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমগণকে তাড়াতাড়ি ইফতার করতে বলেন। আবার ইহুদীরা শুধুমাত্র পাগড়ী ব্যবহার করত। এর পরিপ্রেক্ষিতে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম টুপি ছাড়া পাগড়ী পরতে নিষেধ করেছেন এবং টুপীসহ পাগড়ী ব্যবহার করতে বলেছেন। দাড়ি ও মোঁচের ব্যাপারে মজুছী (অগ্নি উপাসক) ও মুশরিকদের বিরোধিতা করতে বলেছেন। যেমন, তারা দাড়ি কাটতো ও মোঁচ বড় করত। তাই হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা দাড়ী বড় কর ও মোঁচ ছোট কর। ইত্যাদি প্রত্যেক বিষয়ে আল্লাহ্ পাকের রসুল  হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের আস্তিক, নাস্তিক, ইহুদী-নাসারা, মজুছি-মুশরিক তথা বিজাতীয় বিধর্মীদের অনুসরণ না করে বরং খিলাফ করতে বলেছেন। কারণ, আল্লাহ্ পাক বলেন,

هو الذى ارسل رسوله بالهدى ودين الحق ليظهره على الدين كله وكفى بالله شهيدا.

অর্থঃ- তিনিই (আল্লাহ্ পাক) তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীনসহ (পূর্বের) সমস্ত দ্বীনের উপর প্রাধান্য দিয়ে পাঠিয়েছেন। এক্ষেত্রে সাক্ষী হিসেবে আল্লাহ্ পাকই যথেষ্ট।” (সূরা ফাত্হ/ ২৮)

আল্লাহ্ পাক আরো বলেন,

قل ان هدى الله هو الهدى ولئن اتبعت اهواءهم بعد الذى جاء ك من العلم مالك من الله من ولى ولا نصير.

অর্থঃ- “বলে দিন, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক-এর হিদায়েতই প্রকৃত হিদায়েত। আপনার কাছে সত্য ইল্ম (অর্থাৎ ইসলাম ধর্ম) আসার পরও যদি আপনি তাদের নফসের বা মনগড়া নিয়ম-নীতির অনুসরণ করেন তবে আপনার জন্য আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী নাই বা পাবেননা।” (সুরা বাক্বারা/১২০)

          উপরোক্ত আয়াত শরীফ অনুযায়ী আমাদের কোন আমল করতে হলে বিধর্মী, বিজাতীয় বা নফসের কোন অনুসরণ করা যাবে না। বা তাদের থেকে কোন নিয়ম-নীতি গ্রহণ করা যাবে না কারণ তা আল্লাহ্ পাক বাতিল ঘোষণা করেছেন। শুধুমাত্র কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও কিয়াস অনুযায়ী আমল করতে হবে সেটাই নির্দেশ দিয়েছেন। বেদ্বীন ও বদ্দ্বীনদের অনুসরণ ও অনুকরণ সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

ليس منا من تشبه بغيرنا.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি আমাদের ভিন্ন অন্য জাতির অনুসরণ করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” (তিরমিযী, মিশকাত)

তিনি আরো বলেন,

من تشبه بقوم فهو منهم.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের অন্তর্ভূক্ত এবং তার হাশর-নশর তাদের সাথে হবে।” (আবূ দাউদ, মুসনদে আহমদ)

          এই হাদীস শরীফ প্রসঙ্গে নিম্নলিখিত ঘটনা উল্লেখ করা যায়, হিন্দুস্থানে একজন জবরদস্ত আল্লাহ্ পাক-এর ওলী ছিলেন। যিনি ইন্তিকালের পর অন্য একজন বুযুর্গ ব্যক্তি স্বপে¦ তাকে দেখে জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহ্ পাক-এর ওলী, আপনি কেমন আছেন?” তখন সেই আল্লাহ্ পাক-এর ওলী জাওয়াবে বলেন, “আপাতত আমি ভালই আছি কিন্তু আমার উপর দিয়ে এক কঠিন সময় অতিবাহিত হয়েছে। যা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আমার ইন্তিকালের পর আমাকে ফেরেশ্তারা সরাসরি আল্লাহ্ পাক-এর সম্মুখে পেশ করেন। আল্লাহ্ পাক ফেরেশতাদের বলেন, “হে ফেরেশ্তাগণ! তোমরা কেন তাঁকে এখানে নিয়ে এসেছ”? ফেরেশ্তাগণ বলেন, “আয় আল্লাহ্ পাক! আমরা তাকে খাছ বান্দা হিসেবে আপনার সাথে সাক্ষাত করার জন্য নিয়ে এসেছি।” এটা শ্রবণ করে আল্লাহ্ পাক বললেন, “তাকে এখান থেকে নিয়ে যাও, তার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হবে। কেননা সে পূঁজা করেছে। এটা শুনে আমি ভয় পেয়ে গেলাম এবং আমার সমস্ত শরীর ভয়ে কাঁপতে লাগল। তখন আমি আল্লাহ্ পাক-এর নিকট আরজু পেশ করলাম, “আয় আল্লাহ্ পাক! আমার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হবে কেন? আমি তো সব সময় আপনার এবং হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফরমাবরদার ছিলাম। কখনও ইচ্ছাকৃত নাফরমানি করিনি এবং কখনো পুঁজা করিনি আর মন্দিরেও যাইনি।” তখন আল্লাহ্ পাক বললেন, “তুমি সেইদিনের কথা স্মরণ কর, যেদিন হিন্দুস্থানে হোলি পূঁজা হচ্ছিল। তোমার সামনে-পিছনে, ডানে-বামে, উপরে-নীচে সমস্ত গাছ-পালা, তরু-লতা, পশু-পাখী, কীট-পতঙ্গ সবকিছুকে রঙ দেয়া হয়েছিল। এমতাবস্থায় তোমার সামনে দিয়ে একটি গর্দভ যাচ্ছিল যাকে রঙ দেয়া হয়নি। তখন তুমি পান চিবাচ্ছিলে, তুমি সেই গর্দভের গায়ে এক চিপটি পানের রঙীন রস নিক্ষেপ করে বলেছিলে, “হে গর্দভ তোমাকে তো কেউ রঙ দেয়নি, এই হোলি পূঁজার দিনে আমি তোমাকে রঙ দিয়ে দিলাম।” এটা কি তোমার পূঁজা করা হয়নি? তুমি কি জান না,

من تشبه بقوم فهو منهم.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের অন্তর্ভূক্ত এবং তার হাশর-নশর তাদের সাথে হবে।”          সুতরাং তোমার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হবে।” যখন আল্লাহ্ পাক এই কথা বললেন, তখন আমি লা-জওয়াব হয়ে গেলাম এবং ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে বললাম, “আয় আল্লাহ্ পাক! আমি এটা বুঝতে পারিনি।” কিছুক্ষণ পর আল্লাহ্ পাক বললেন, “হ্যাঁ তোমাকে অন্যান্য আমলের কারণে ক্ষমা করা হয়েছে।”

          বনী ইসরাঈল আমলের অনুরূপ আরও একটি ওয়াকেয়া তফসীরে উল্লেখ করা হয়। আল্লাহ্ পাক হযরত ইউশা বিন নুন আলাইহিস্ সালাম-এর উপর ওহী নাযিল করলেন, হে আমার নবী! আপনার উম্মতের মধ্যে ১ লক্ষ লোককে ধ্বংস করে দেয়া হবে, যার মধ্যে ৬০ হাজার লোক সরাসরি গুণাহে লিপ্ত (গোমরাহ)। তখন হযরত ইউশা বিন নুন আলাইহিস্ সালাম বললেন, “আয় আল্লাহ্ পাক! ৬০ হাজার লোক সরাসরি গুণাহে লিপ্ত তাই তাদের ধ্বংস করে দেয়া হবে কিন্তু বাকী ৪০ হাজার লোককে ধ্বংস করা হবে কেন?” তখন আল্লাহ্ পাক বললেন, “যেহেতু তারা তাদের সাথে মিলা-মিশা ও ওঠা-বসা করে এবং সম্পর্ক রাখে আর গুণাহের কাজে বাধা দেয় না, তাই তাদেরকেসহ ধ্বংস করে দেয়া হবে।”

          উপরোক্ত আয়াত শরীফ, হাদীস শরীফ এবং তার ব্যাখ্যার দ্বারা এটাই সাবেত হলো যে, বিজাতীয় বিধর্মীদের কোন নিয়ম-নীতি, আমল-আখলাক ও সীরত-সূরত কোনটাই অনুসরণ-অনুকরণ করা যাবেনা। যদি কেউ করে তবে তার থেকে সেটা আল্লাহ্ পাক গ্রহণ করবেন না বা কোন সওয়াবও দেবেন না এবং আল্লাহ্ পাকের তরফ থেকে কোন মদদ পাবেনা। যার ফলে সে ইহকালে ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং পরকালেও তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে যাদেরকে সে অনুসরণ করতো।  কাজেই লংমার্চ কোন মতেই জায়েয নেই।

বিধর্মীদের তৈরী দ্রব্য-সামগ্রী

ব্যবহার করা জায়েয রয়েছে

সমরাস্ত্র ঃ বিধর্মীদের আকিষ্কৃত সমরাস্ত্র মুসলমানদের জন্য ব্যবহার করা জায়েয। কেননা কাফিররা হলো মুসলমানদের খাদিম, শুধু তাই নয় সমগ্র মখলুকাতকেই সৃষ্টি করা হয়েছে মুসলমানদের ফায়দার জন্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে ইরশাদ করেছেন,

هو الذى خلق لكم ما فى الارض جميعا.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক যিনি তোমাদের (ফায়দার) জন্য দুনিয়ার সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা বাক্বারা/২৯)

হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে,

ان الدنيا خلقت لكم وانكم خلقتم للاخرة.

অর্থঃ-“নিশ্চয়ই দুনিয়া তোমাদের (খিদমতের) জন্য তৈরী করা হয়েছে আর তোমরা সৃষ্টি হয়েছ পরকাল (আল্লাহ্ পাক)-এর জন্য।”

          কাজেই কাফিররা মুসলমানদের খাদিম। তারা অনেক কিছু আবিষ্কার করেছে এবং করবে। যেমন (গাড়ী, মাইক, ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশন) ইত্যাদি। মুসলমানগণ যখন দেখেন কাফিরদের খিদমত শরীয়তের খেলাফ নয়, তখন তারা ইচ্ছা করলে তা গ্রহণ করতে পারেন। আর শরীয়তের খেলাফ হলে অবশ্যই তা বর্জন করতে হবে। অবশ্য কোন মুসলমানও যদি শরীয়তের খেলাফ কিছু আবিষ্কার করে তবে সেটাও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আল্লাহ্ পাক বলেন,

تعاونوا على البر والتقوى ولا تعاونوا على الاثم والعدوان.

অর্থঃ- “তোমরা নেকী এবং পরহেযগারীর মধ্যে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য কর। পাপ এবং শত্রুতার মধ্যে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করোনা।” (সূরা মায়িদা/২)

          শুধু তাই নয়, বরং কোন প্রকার সাহায্য সহযোগীতা বা সমর্থনও করা যাবে না। তাই আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

اذا عملت الخطيئة فى الارض من شهدها فكرهها كان كمن غاب عنها ومن غاب فرضيها كان كمن شهدها.

অর্থঃ- “পৃথিবীতে যখন কোন অন্যায় বা পাপ সংঘটিত হয়, তখন যে ব্যক্তি ঐ স্থানে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও ওটাকে ঘৃণা করে, সে যেন সেস্থানে উপস্থিত ছিলনা। আর যে ব্যক্তি অনুপস্থিত থেকেও পাপের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, সে যেন তথায় উপস্থিত ছিল।”

সুতরাং সমগ্র কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও কিয়াসে কোথাও বিধর্মীদের জিনিসপত্র ব্যবহার করা নাজায়েয ঘোষণা করা হয়নি।

আল্লাহ্ পাক বলেন,

يايها الذين امنوا لاتحرموا طيبت ما احل الله لكم ولا تعتدوا ان الله لا يحب المعتدين.

অর্থঃ- “হে মু’মিনগণ! তোমরা ঐসব পবিত্র বস্তু হারাম করনা, যেগুলো আল্লাহ্ পাক তোমাদের জন্য হালাল করেছেন এবং সীমা অতিক্রম করনা। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক সীমা অতিক্রমকারীকে পছন্দ করেননা।” (সূরা মায়িদা/৮৭)

          কাজেই সমরাস্ত্র ব্যবহার করা জায়েয, যেহেতু প্রথমত তারা আমাদের খাদিম এবং এগুলি ব্যবহার করলে তাদের অনুসরণ-অনুকরণ করা হয়না এবং আমলও গ্রহণ করা হয় না। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিধর্মীদের বহু জিনিসপত্র ব্যবহার করেছেন কিন্তু তাদের নিয়ম-নীতি কখনও অনুসরণ-অনুকরণ করেননি। যেমন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুমী জুব্বা, মিশরীয় সূতী, ইয়ামানী চাদর, যুদ্ধাস্ত্র, শিরস্ত্রাণ ইত্যাদি বিধর্মীদের নানা প্রকার জিনিস ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তাদের নিয়ম-নীতি আমল-আখলাক কখনও অনুসরণ করেননি। তাই বিধর্মীদের জিনিসপত্র যেমন সমরাস্ত্র মুসলমানদের জন্য ব্যবহার করা জায়েয পক্ষান্তরে লংমার্চ, হরতাল যা তাদের বিশেষ আমল, করলে তাদের নিয়ম-নীতি অনুসরণ-অনুকরণ করা হয় এবং তাদের আমলকে গ্রহণ করা হয়। যা স্পষ্টতঃই শরীয়তে নিষিদ্ধ ও হারাম।

হিজরত ও জিহাদ-এর সাথে

তুলনা করা কুফরী

          তায়েফ গমণ, হিজরত ও তাবুকের জিহাদ। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্ পাক-এর নির্দেশে দ্বীন ইসলাম প্রচারের জন্য তায়েফ গমণ করেছিলেন। এই প্রকার দ্বীনি সফর পূর্বেকার সমস্ত নবী আলাইহিমুস্ সালামগণ হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম এবং  আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ কম-বেশী করেছিলেন। সুতরাং এটাকে যদি লংমার্চ বলা হয়, তাহলে বলতে হয় পূর্বেকার সমস্ত নবী আলাইহিমুস্ সালাম, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ এবং আউলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ লংমার্চ করেছিলেন। (নাউযুবিল্লাহ্) আর প্রথম লংমার্চ করেছিলেন হযরত আদম আলাইস্ িসালাম। (নাউযুবিল্লাহ্) যিনি সিংহল থেকে মক্কা শরীফ গিয়েছিলেন। এটা হবে নবী আলাইহিমুস্ সালামগণের শানে মহা অপবাদ।

আল্লাহ্ পাক বলেন, سبحنك هذا بهتان عظيم.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক পবিত্র,মহান। এটাতো এক গুরুতর অপরাধ।” (সূরা নূর/১৬)

কারণ, নবী আলাইহিমুস্ সালামগণের শানে আকাঈদের কিতাবে উল্লেখ করা হয়,

الانبياء عليهم السلام كلهم منزهون عن الصغائر والكبائر والكفر والقبائح.

অর্থঃ- “সমস্ত নবী আলাইহিমুস্ সালামগণ কবীরা ও সগীরা গুণাহ হতে পবিত্র এমনকি সমস্ত অপছন্দনীয় কাজ হতেও পবিত্র।”

          কাজেই নবী আলাইহিমুস্ সালামগণদের শানে লংমার্চ ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অবৈধ। কারণ, লংমার্চ হলো নাস্তিকদের নাস্তিক্যবাদ রক্ষার জন্য পলায়নের মাধ্যমে তাদের প্রবর্তিত এক বিশেষ পদ্ধতির নাম। যা পূর্ববর্তী কোন আসমানী কিতাব এবং কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা এবং ক্বিয়াসের কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। আর হিজরতের আভিধানিক অর্থ হলো ত্যাগ করা পৃথক হওয়া আর শরীয়তে হিজরতের অর্থ হলো- ঈমান ও ইসলাম হিফাজতের জন্য ঘরবাড়ী, বিষয়-সম্পত্তি ইত্যাদি সবকিছু ত্যাগ করে অন্যস্থানে প্রস্থান করা। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্ পাক-এর নির্দেশে মক্কা শরীফ থেকে মদীনা শরীফ হিজরত করেছিলেন। আর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্ পাক-এর নির্দেশে তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য দ্বীন ইসলাম কায়েমের উদ্দেশ্যে বিধর্মীদের সাথে যে যুদ্ধ করেছিলেন তাকেই দ্বীনি যুদ্ধ বা জিহাদ বলা হয়। যেমন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাবুকে গিয়েছিলেন জিহাদ করার জন্য এবং গাজী হয়ে এসেছিলেন। কাজেই হিজরত এবং জেহাদ এ দু’টি হলো পবিত্র শব্দ। যা দ্বীন ইসলামের সাথে  সম্পর্কিত। আর লংমার্চ হলো- নাস্তিকদের নাস্তিক্যবাদ রক্ষার জন্য পলায়নের মাধ্যমে তাদের প্রবর্তিত এক বিশেষ পদ্ধতির নাম। কাজেই তাদের দাবী অনুযায়ী লংমার্চকে যদি হিজরত এবং তাবুকের জিহাদের সাথে তুলনা করা হয়, তাহলে বলতে হয়। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “যারা জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করবে বা পালিয়ে আসবে, তাদের তওবা কবুল হবেনা। আর আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি শরীয়তে হিজরতের অর্থ হলো ঈমান ও ইসলাম হিফাযতের জন্য ঘর-বাড়ী, বিষয়-সম্পত্তি ইত্যাদি সবকিছু ত্যাগ করে অন্যস্থানে প্রস্থান করা। আর হিজরতের ক্ষেত্রেও শরঈ যে কারণে কেউ হিজরত করবে সে বিষয় ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত পুনরায় সে সেখানে ফেরত আসতে পারবে না।

আল্লাহ্ পাক হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানে বলেন, وتعز روه وتوقروه.

অর্থঃ- “তোমরা আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্য কর ও সম্মান কর।” (সূরা ফাত্হ/৯)

আর হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে,

متخذت خليلا وحبيا.

অর্থঃ- “(আল্লাহ্ পাক বলেন) আমি আপনাকে খলীল ও হাবীব হিসাবে গ্রহণ করেছি।”

          উপরোল্লিখিত আয়াত শরীফ এবং হাদীস শরীফের মধ্যে এবং এই প্রকার আরও আয়াত শরীফ এবং হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্ পাক-এর খাছ হাবীব এবং তাঁর প্রতি তাজীম-তাকরীম করা আমাদের উপর ফরয। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি যেমন তাজীম-তাকরীম করা ফরয তেমনি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ফরয। যেমন, আকাঈদের কিতাবে উল্লেখ করা হয় কদু খাওয়া সুন্নত এবং এই সুন্নতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ফরয। কেউ যদি এই কদু খাওয়াকে অবজ্ঞা, অবহেলা, এহানত করে তবে তা হবে কুফরী। তদ্রুপ তাবুকের জিহাদ ও হিজরত যেহেতু হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সংশ্লিষ্ট তাই এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ফরজ এবং কেউ যদি এটাকে অবজ্ঞা, অবহেলা করে তবে তা হবে কুফরী। কাজেই লংমার্চ যেহেতু বিধর্মী, বিজাতীয়দের প্রবর্তিত পদ্ধতি বা আমল তাই ওটাকে হিজরত এবং তাবুকের জিহাদের সাথে তুলনা করা, হিজরত এবং তাবুকের জিহাদকে অবজ্ঞা, অবহেলা বা এহানত করারই নামান্তর, যা কুফরীর সমতুল্য। আর আল্লাহ্ পাক বলেন, ولا تلبسوا الحق بالباطل.

অর্থঃ- “তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করোনা বা হক্বকে নাহক্বের সাথে মিশ্রিত করোনা।” (সূরা বাক্বারা/৪২)

কারণ আল্লাহ্ পাক কাফিরদের সম্বন্ধে বলেন,

ان شر الدواب عند الله الذين كفروا فهم لا يؤمنون.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক-এর নিকট নিকৃষ্ট প্রাণী হলো কাফের, যারা ঈমান আনবে না।” (সূরা আনফাল/৫৫)

আরও আয়াত শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,

ان الذين كفروا وماتوا وهم كفار فلن يقبل من احدهم ملء الارض ذهبا ولو افتدى به اولئك لهم عذاب اليم وما لهم من نصرين.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই যারা কাফির এবং কুফরী অবস্থায় মারা গেছে, তারা যদি পৃথিবী পরিপূর্ণ স্বর্ণ তাদের কুফরীর কাফফারা বাবদ (বা মুক্তির বিনিময়ে) দান করে তবে তা কখনও গ্রহণ করা হবে না। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক কঠিন শাস্তি এবং তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী নাই।” (সূরা আলে ইমরান /৯১)

আবার আল্লাহ্ পাক বলেন, انما المشركون نجس.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই মুশরিকরা (আল্লাহ্ পাক-এর নিকট) নাপাক।”(সূরা তাওবা/২৮)

          উপরোক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা এটাই ছাবেত হলো যে, কাফির মুশরিকরা আল্লাহ্ পাক-এর নিকট নিকৃষ্ট প্রাণী। তাদের কোন আমল কবুল করা হবে না, এমনকি তারা মারা গেলেও তাদের রেহাই নেই তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক কঠিন শাস্তি আর মৃত্যুর পরও তারা যদি তাদের কুফরীর বিনিময়ে কোন কাফফারা দেয় তবে সেটাও তাদের থেকে গ্রহণ করা হবে না। কাজেই লংমার্চ যেহেতু কাফিরদের আমল তাই এটাও কাফিরদের মতই আল্লাহ্ পাক-এর নিকট চরম অপছন্দনীয় ও পরিত্যাজ্য এবং কোন মতেই তা গ্রহণযোগ্য নয়।

          আর যারা আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্বন্ধে মিথ্যা কথা বলে তিনি যা করেন নাই তা তাঁর নামের সাথে সংযোজন করে, যা করেছেন তা তাঁর নামের থেকে বাদ দেয় উভয়ই মিথ্যার শামীল। আর যে আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্বন্ধে মিথ্যা কথা বলে তাদের সম্পর্কে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

من كذب على متعمدا فليتبوأ مقعده من النار.

অর্থঃ- “যে আমার নামে স্বেচ্ছায় মিথ্যা কথা বলে সে যেন দুনিয়ায় থাকতে তার স্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করে দেয়।” (বুখারী শরীফ)

          হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনে কখনও লংমার্চ করেননি আর কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের কোথাও লংমার্চ সম্বন্ধে উল্লেখ করা হয়নি। সুতরাং কেউ যদি বলে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লংমার্চ করেছেন, তাহলে তার উপরে উপরোল্লিখিত হাদীসের হুকুম বর্তাবে। অর্থাৎ কুফরী হবে।

          যেহেতু লংমার্চ-ই নাজায়েয এবং এটা বিজাতীয় বিধর্মীদের প্রবর্তিত পদ্ধতি, তাই এটাতে যারা যাবে তাদের শহীদ হবার কোন প্রশ্নই ওঠে না। একমাত্র দ্বীনি যুদ্ধ বা জিহাদে যারা মারা যায় তাদেরকেই শহীদ বলা হয়। আর অন্যান্য দুর্ঘটনায় যেমন পানিতে পড়ে, ছাদ ধ্বসে, বা সন্তান হবার সময় ইত্যাদি প্রকারে যারা মারা যায় তারা শহীদী দরজা পায়।

          কাজেই না-জায়েয লংমার্চ করে যারা মারা যাবে তারা শহীদ তো হবেই না বরং তারা ফাসাদকারী হবে কেননা এটা দ্বারা ফিৎনা-ফাসাদের সৃষ্টি হয়, যার কারণে লোক আহত এবং নিহত হয়। আর আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে ফিৎনা-ফাসাদ করতে মানা করেছেন। যেমন, আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন,

الفتنة اشد من القتل.

অর্থঃ- “ফিৎনা কতলের চেয়েও ভয়াবহ ফিৎনা কতলের চেয়েও ভয়ঙ্কর।” (সূরা বাক্বারা/১৯১)

তিনি আরো ইরশাদ করেন, الفتنة اكبر من القتل.

অর্থঃ- “ফিৎনা কতলের চেয়েও বড় অপরাধ।” (সূরা বাক্বারা/২১৭)

          আর যে ফিৎনা-ফাসাদ কতলের চেয়েও ভয়াবহ বা ভয়ঙ্কর তা দ্বারা কখনও শান্তি স্থাপন করা যাবেনা। তদ্রুপ যারা লংমার্চ এবং এই ধরণের শরীয়ত বিরোধী কাজ দ্বারা যমীনে ফিৎনা-ফাসাদ পয়দা করার পরও মনে করে যে, তারা শান্তি স্থাপনকারী। মূলতঃ এটা তাদের জিহালত তারা লংমার্চের ইতিহাস, তথা ইসলামের গৌরব ও আদর্শ সম্পর্কে অজ্ঞ বলেই, কমিউনিষ্ট মতবাদের প্রক্রিয়া ও তাদের গৌরবগাঁথা লংমার্চকে গ্রহণ করে তাদের নেতা মাওসেতুংকে অনুসরণ করে এবং তার কীর্তি ঘোষণা করে। এজন্যই কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফের জ্ঞানের সাথে সম-সাময়িক বিষয়ের জ্ঞান হাছিল করাও হক্ব মতে-পথে থাকার জন্য আবশ্যকীয় কর্তব্য। এই জ্ঞানের অভাবেই জাহিলরা ইসলামের নামে লংমার্চের মত হারাম আমল করে। তাই সে সম্পর্কে “দুররুল মুখতার” ১ম খন্ডের ৯৯ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে,

من لم يكن عالما باهل زمانه فهو جاهل.

অর্থঃ- “যে নিজ জামানার আনুসঙ্গিক অবস্থার সাথে পরিচিত নয় সে জাহিল।”

          সুতরাং যারা ইসলামের নামে হারাম লংমার্চ করে তারা শান্তি স্থাপনকারীর পরিবর্তে ফাসাদকারী হবে। যা আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফের নিম্নলিখিত আয়াত শরীফে উল্লেখ করেছেন,

واذا قيل لهم لا تفسدوا فى الارض قالوا انما نحن مصلحون.

অর্থঃ- “আর যখন তাদেরকে বলা হয় তোমরা যমীনে ফিৎনা সৃষ্টি করোনা, তখন তারা বলে আমরা শান্তি স্থাপনকারী। প্রকৃতপক্ষে তারাই ফিৎনা-ফাসাদকারী।” (সূরা বাক্বারা/১১)

          তবে যদি কেউ সত্যবাদী হয় তার আমলের উপর তবে তার জানা উচিত সে প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে ইরশাদ করেছেন,

قل هاتوا برهانكم ان كنتم صدقين.

অর্থঃ- “যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক, তবে দলীল পেশ কর।” (সূরা বাক্বারা/১১১)

{দলীলসমূহ- (১) আহকামুল কুরআন লিল জাস্সাস, (২) কুরতুবী, (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) রুহুল বয়ান, (৫) মাযহারী, (৬) কবীর, (৭) খাযেন, (৮) বাগবী, (৯) আহমদী, (১০) ইবনে কাছীর, (১১) তাবারী, (১২) যাদুল মাছীর, (১৩) বুখারী, (১৪) মুসলিম, (১৫) আবু দাউদ, (১৬) তিরমীযী, (১৭) বায়হাক্বী, (১৮) মুসনদে আহমদ, (১৯) মিশকাত, (২০) শুয়াবুল ঈমান, (২১) ফতহুল বারী, (২২) ওমদাতুল ক্বারী, (২৩) শরহে নববী, (২৪) আওনুল মা’বূদ, (২৫) ফতহুর রব্বানী, (২৬) তুহ্ফাতুল আহ্ওয়াযী, (২৭) মিরকাত, (২৮) আশয়াতুল্ লুময়াত, (২৯) লুময়াত, (৩০) ত্বীবী, (৩১) তালীক্ব, (৩২) মুযাহেরে হক্ব, (৩৩) ফিকহুল আকবর, (৩৪) শরহে আকাঈদে নছফী, (৩৫) আকাঈদে হাক্কা, (৩৬) তাকমীলুল ঈমান, (৩৭) আহওয়াযী, (২৭) মিরকাত, (২৮) আশয়াতুল্ লুময়াত, (২৯) লুময়াত, (৩০) ত্বীবী, (৩১) তালীকু, (৩২) মুযাহেরে হকু, (৩৩) ফিকহুল আকবর, (৩৪) শরহে আকাঈদে নছফী, (৩৫) আকাঈদে হাক্কা, (৩৬) তাকমীলুল ঈমান, (৩৭) Encyclopaedia Britannica, (৩৮) Encyclopedia Americana. (৩৯) World book, (80) Lexicon Encyclopedia, (৪১) Macmilian Encyclopedia, (৪২) Groilir Encyclopedia, (৪৩) Wordsworth Encyclopedia, (88) Funk & Wagnalls new Encyclopedia, (৪৫) The Great Road by Smedly Agnes. (৪৬) The Long March, by Dick Wilson, (৪৭) A Documentary History of Chinese Communism, (৪৮) Chinese Communism and the Rise of Mao by B. schwartz, (৪৯) Attack on Nanchang by Mao, translated into English by Jerome Chen, (৫০) Stories ot the Long March by Chen Chang fen, (৫১) On the Long March with chairman Mao, (৫২) The Red Army Man’s cap by Wang Teh-ching, (৫৩) Problems ot the Chinese Revolution’, by L. “Trotsky. (৫৪) The Chinese Qly, (৫৫) China peadings Voll-11, (৫৬) Soviet Russia In china Chiang Kai-shek, (৫৭) News Published in hsinking Min Pao (sianfu) Dec 17, 1936, (৫৮) Red star over Chiha, Snow, p 438, (৫৯) Selected Works of Mao Tse-tung, (৬০) Mao and the Chinese Revolution, chen Jerome. (৬১), লংমার্চের স্মৃতি-বিদেশী ভাষা প্রকাশনালয়, বেইজিং চীন, (৬২) চীন-ভারত লংমার্চ; নারায়ণ সান্যাল ইত্যাদি।

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ