আছমা বিনতে মারওয়ান ছিলো এক অভিশপ্ত, কুখ্যাত, ঔদ্ধত্যপরায়ণা ও বিদ্বেষপরায়ণা কাফির মহিলা। মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছেন,
وَكَانَتْ تَعِـيْبُ الاِسْلَامَ وَتُـؤْذِىْ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
‘এই অভিশপ্ত মহিলা মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র দ্বীন ইসলাম উনাকে কটাক্ষ করত এবং নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে কষ্ট দিত, উনার মানহানী করতো।’ না‘ঊযুবিল্লাহ!
অন্য বর্ণনা এসেছেন,
وَكَانَتْ تَعِيْبُ الْاِسْلَامَ وَتُـؤْذِىْ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَتُـحَرِّضُ عَلَيْهِ وَتَعِـيْبُ الْاِسْلَامَ وَتَـقُوْلُ الشِّعْرَ وَكَانَتْ تَطْرَحُ الْمَحَايِضَ فِـىْ مَسْجِدِ بَـنِـىْ خَطْمَةَ
‘সে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র দ্বীন ইসলাম উনাকে কটাক্ষ করত, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে কষ্ট দিত, উনার মানহানী করত এবং উনার বিরুদ্ধে লোকদেরকে উসকানি দিত। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিরুদ্ধে এবং মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র দ্বীন ইসলাম উনাকে কটাক্ষ করে সে অবমাননাকর কবিতা রচনা করতো। এমনকি তার ধৃষ্টতা এতটাই চরমে পেঁৗছেছিল যে, সে ঋতুস্রাবযুক্ত নাপাক বস্তু বনূ খ্বাতমাহ্ গোত্রের মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র মসজিদ মুবারক-এ নিক্ষেপ করত। না‘উযুবিল্লাহ! না‘উযুবিল্লাহ! না‘উযুবিল্লাহ!’
فَاَهْدَرَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَمَهَا
‘ফলে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এই অভিশপ্ত মহিলার রক্ত হালাল ঘোষণা করেন। অর্থাৎ তার একমাত্র শরঈ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা মুবারক করেন।’ সুবহানাল্লাহ!
তখন দৃষ্টি শক্তি অস্তমিত ছাহাবী হযরত উমায়ের ইবনে আদি রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি ওয়াদা মুবারক করেন,
لَئِنْ رَجَعَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ بَـدْرٍ اِلَـى الْمَدِيْـنَةِ لَاَقْـتُـلَـنَّـهَا
‘নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সম্মানিত বদর জিহাদ মুবারক থেকে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র মদিনা শরীফ ফিরার পর অবশ্যই অবশ্যই আমি তাকে হত্যা করবো, তাকে শরঈ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিব।’ সুবহানাল্লাহ!
তারপর যখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সম্মানিত বদর জিহাদ মুবারক থেকে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র মদীনা শরীফ ফিরে আসেন, তখন এক রাতে হযরত উমাইর রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি ওয়াদা মুবারক পূরণের জন্য বের হয়ে যান। তিনি চোখে দেখতে না পারা সত্ত্বেও রাতে গোপনে তার ঘরে প্রবেশ করেন। ঘরে তার চারপাশে তার সন্তানরা ঘুমিয়ে ছিলো; এমনকি একজন তখন দুধ পান করছিলো। তিনি যেহেতু চোখে দেখতেন না, তাই হাতে স্পর্শ করে তাকে চিনে নেন।
فَـنَحَّى الصَّبِـىَّ عَنْـهَا وَوَضَعَ سَيْـفَهٗ عَلـٰى صَدْرِهَا حَـتّٰـى اَنْـفَذَهٗ مِن ظَهْرِهَا
‘তারপর তিনি শিশুটিকে সরিয়ে দিয়ে সেই অভিশপ্ত মহিলার বুকের উপর তলোয়ার রেখে এমন জোরে চালালেন যে, তা পৃষ্ঠদেশ ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে গেল।’ সুবহানাল্লাহ!
এরপর তিনি ফিরে এসে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে ছলাতুল ফজর জামাআতে আদায় করেন। ছলাত মুবারক শেষে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত উমাইর ইবনে আদি আল খ্বাতমী রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু উনার দিকে সন্তুষ্টিপূর্ণ মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র নূরুস সা‘আদাত মুবারক (মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র নযর মুবারক) দিয়ে ইরশাদ মুবারক করেন,
اَقَـتَـلْتَ اِبْـنَةَ مَرْوَانَ
‘আপনি কি মারওয়ানের মেয়েকে হত্যা করেছেন? তাকে শরঈ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন?’
জবাবে তিনি বলেন,
نَـعَمْ يَا رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
‘ইয়া রসূলাল্লাহ! ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! জী; আমি তাকে হত্যা করেছি।’ সুবহানাল্লাহ!
তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার প্রতি অত্যন্তু সন্তুষ্টি মুবারক প্রকাশ করে ইরশাদ মুবারক করেন,
نَصَرْتَ اللهَ وَرَسُوْلَهٗ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَا حَضْرَتْ عُمَيْـرُ رَضِىَ اللهُ تَـعَالـٰى عَنْهُ
‘হে হযরত উমাইর রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু! আপনি মহান আল্লাহ পাক উনাকে এবং উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে অর্থাৎ উনাদেরকে সাহায্য করেছেন অর্থাৎ উনাদের মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র খিদমত মুবারক, গোলামী মুবারক উনার আনজাম মুবারক দিয়ে আখাছ্ছুল খাছ রেযামন্দি-সন্তুষ্টি মুবারক লাভ করেছেন।’ সুবহানাল্লাহ!
অতঃপর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহুম উনাদের উদ্দেশ্যে ইরশাদ মুবারক করেন,
اِذَا اَحْـبَـبْـتُمْ اَنْ تَـنْظُـرُوْا اِلـٰى رَجُلٍ نَصَرَ اللهَ وَرَسُوْلَهٗ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْغَـيْبِ فَانْظُـرُوْا اِلـٰى حَضْرَتْ عُمَيْـرِ بْنِ عَدِىٍّ رَضِىَ اللهُ تَـعَالـٰى عَنْهُ
‘যদি আপনারা এমন একজন ব্যক্তিত্ব মুবারক উনাকে দেখতে চান, যিনি মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র রসূল, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অর্থাৎ উনাদের মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র খিদমত মুবারক, গোলামী মুবারক উনার আনজাম মুবারক দিয়ে আখাছ্ছুল খাছ রেযামন্দি-সন্তুষ্টি মুবারক হাছিল করেছেন, তাহলে আপনারা হযরত উমায়র ইবনে আদি রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু উনার দিকে তাকান।’ সুবহানাল্লাহ!
তখন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি বলেন,
اُنْظُرُوْا اِلـٰى هٰذَا الْاَعْمَى الَّذِىْ تَشَرّٰى فِـىْ طَاعَةِ اللهِ
‘আপনারা সবাই চোখে দেখতে না পাওয়া এই সম্মানিত ব্যক্তিত্ব উনার দিকে তাকান, যিনি মহান আল্লাহ পাক উনার আনুগত্যে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছেন।’
তখন নূরে মুজাসসাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন,
لَا تَـقُلِ الْاَعْمٰى وَلٰكِنِ الْبَصِيْـرُ
“আপনি উনাকে ‘চোখে দেখতে না পাওয়া ব্যক্তিত্ব’ বলবেন না; বরং তিনিই হচ্ছেন ‘বাছীর বা প্রকৃত দৃষ্টিসম্পন্ন’।” সুবহানাল্লাহ!
তারপর যখন হযরত উমাইর রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি উনার গোত্রে ফিরে এলেন, তখন তিনি দেখলেন- (তার গোত্রের) লোকজন ঐ অভিশপ্ত মহিলার দাফনে অংশগ্রহণ করছে। উনাকে দেখে তারা বললো,
يَا حَضْرَتْ عُمَيْـرُ رَضِىَ اللهُ تَـعَالـٰى عَنْهُ اَنْتَ قَـتَـلْـتَـهَا
‘হে হযরত উমাইর রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু! আপনি কি তাকে হত্যা করেছেন?’
তিনি বললেন,
نَـعَمْ فَكِـيْدُوْنِــىْ جَـمِيْـعًا ثُـمَّ لَا تُـنْظِرُوْنِ فَـوَالَّذِىْ نَـفْسِىْ بِيَدِهٖ لَوْ قُـلْتُمْ جَـمِيْـعًا مَا قَالَتْ لَضَرَبْــتُـكُمْ بِسَيْـفِـىْ هٰذَا حَـتّٰـى اَمُوْتَ اَوْ اَقْـتُـلَكُمْ
‘হঁ্যা; আমি তাকে হত্যা করেছি, তার একমাত্র শরঈ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছি। তোমরা সবাই একত্র হয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করো। তারপর তোমরা আমাকে বিলম্ব করিও না। সেই খ্বালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার ক্বসম, যাঁর কুদরতী হাত মুবারকে আমার প্রাণ! যদি তোমরা সবাই তার মতো কথা বলতে, তাহলে আমি আমার এই তরবারি দিয়ে একে একে তোমাদের সবাইকে হত্যা করতাম, তোমাদের সবাইকে শরঈ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিতাম, যতক্ষণ না আমি শহীদ হই কিংবা তোমাদেরকে হত্যা করি।’ সুবহানাল্লাহ! (আল মাওয়াহিব ১/২৩০, শারহুয যারক্বানী ২/৩৪৩, সুবুলুল হুদা ওয়ার রশাদ ৬/২১, ইমতাউল আসমা’ ১/১২০, ‘উয়ূনুল আছার ১/৩৪০, ইবনে সা’দ ২/২৮ ইত্যাদি)
কাজেই, এই ঘটনা মুবারক দ্বারা দিবালোকের ন্যায় অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহুম উনারা ‘হুব্বে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ উনার বেমেছাল অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত মুবারক স্থাপন করেছেন। সুবহানাল্লাহ! পরবর্তী উম্মত যদি ইহকাল ও পরকালে হাক্বীক্বী কামিয়াবী হাছিল করতে চায়, তাহলে তাদের জন্য আবশ্যক হচ্ছে উনাদেরকে সার্বিকভাবে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অনুসরণ-অনুকরণ করা।
মহান আল্লাহ পাক তিনি ছাহিবু সাইয়্যিদি সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ, ছাহিবে নেয়ামত, রহমতুল্লিল আলামীন মামদূহ মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার সম্মানার্থে আমাদের সবাইকে সেই তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!
-মুহাদ্দিছ মুহম্মদ আমীন।