পরম দয়ালু, প্রবল পরাক্রমশালী পালনকর্তার জন্যই সব প্রশংসা। যাঁর নিকট থেকে অবতীর্ণ হয়েছে কুরআন শরীফ। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি অফুরন্ত দরূদ ও সালাম। যাঁর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে, সন্দেহাতীত কুরআন শরীফ, পবিত্র রমাদ্বান শরীফ উনার মধ্যে।
কুরআন শরীফ উনার ব্যাখ্যা হাদীছ শরীফ। হাদীছ শরীফ উনার ছহীহ ব্যাখ্যা কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ মুতাবিক ইসলামী লিখা।
এতদ্বপেক্ষিতে ইসলামী লিখা স্বভাবতইঃ সাধারণ লিখা, সাংবাদিকতা ইত্যাদির চেয়ে অনেক বেশি ও আলাদা ধরণের গুরুত্ব ও তাৎপর্যের দাবী রাখে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ বিষয়টির প্রতি অন্য কেউ আদৌ নজর দেয়নি। একমাত্র মাসিক আল বাইয়্যিনাত উনার ব্যতিক্রম।
মহান আল্লাহ পাক উনার অপার করুণায় মাসিক আল বাইয়্যিনাত উনার শততম সংখ্যা পূর্ণতার প্রক্রিয়ায় ছহীহ দিক নির্দেশনায়, সুন্নতের পুনঃপ্রচলন, বিদয়াত নির্মূলীকরণ তথা উলামায়ে ‘সূ’দের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণে, একথা আজ প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হয়েছে যে, মাসিক আল বাইয়্যিনাত বর্তমান যামানার তাজদীদী মুখপত্র। উম্মাহর প্রতি মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর অবদান অগণিত। মাসিক আল বাইয়্যিনাত একদিকে ছহীহ ইসলামী শিক্ষা সবার জন্য সার্বজনীন করেছে অপরদিকে ধর্ম ব্যবসায়ীদের মুখোশ উম্মোচন করেছে অবারিতভাবে। মাসিক আল বাইয়্যিনাত সাধারণ মানুষকে আলিমে দ্বীনে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া শিক্ষা দিয়েছে। তাদেরকে দালীলীক চেতনার সাথে সম্পৃক্ত করেছে। দলীল চাবার ও পাবার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছে। সাথে সাথে যে কোন বিষয়ে অনেক অনেক দলীল পাবার সুযোগ করে দিয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে একশত সংখ্যার অবকাশে মাসিক আল বাইয়্যিনাতে ফতওয়া দেয়া হয়েছে বিশটি এবং তাতে দলীল দেয়া হয়েছে প্রায় সত হাজার, সুওয়াল দেয়া হয়েছে প্রায় পনের’শর মত, আর তাতে দলীল দেয়া হয়েছে প্রায় সাড়ে বার হাজার। অর্থাৎ দলীলীক উপস্থাপনার ব্যাপারে মাসিক আল বাইয়্যিনাত যুগান্তকারী ইতিহাস তৈরি করেছে। উল্লেখ্য, এটিই হক্ব ও সত্য হওয়ার প্রমাণ। মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক ফরমান, “তোমরা যদি সত্যবাদী হয়ে থাক তবে দলীল সমূহ পেশ কর।”
মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এ ফেরাসাত বা দূরদর্শীতা। যুগের প্রবাহে, হুজুগে মেতে অথবা বিজাতীয় আদর্শ অনুসরণ করে নয়, পরিপূর্ণ সুন্নতের উপর দৃঢ় থেকে প্রজ্ঞা সম্পন্ন ফায়সালা দেয়াই মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এখানে উল্লেখ্য যে কিতাবী বা জাহিরী ইলমের বদৌলতে এটি সম্ভব নয়, বরং এর জন্য দরকার রুহানী শক্তি ও খাছ ইলমে লাদুন্নী। আর মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক, ইমামুল আইম্মা, কুতুবুল আলম, মুহইস সুন্নাহ, মুজাদ্দিদুয যামান, আওলাদুর রসূল ঢাকা রাজারবাগ শরীফ উনার হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার অতুলনীয়, অকল্পনীয়, ইলমে লাদুন্নী সমৃদ্ধ হওয়ায়, মহান আল্লাহ পাক ও উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথ বেমেছাল তায়াল্লুক যুক্ত হওয়ায়, উনাদের তরফ থেকে নির্দেশিত হয়ে পরিচালিত হওয়ার সুবাদেই উনার পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর দর্শন, মন্তব্য ও ফায়সালা এত অকাট্য, এত সমৃদ্ধ। সাম্প্রতিক কালের আফগান প্রসঙ্গে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর বিদগ্ধ মন্তব্য এ ধারারই একটি নিদর্শন।
বলাবাহুল্য, আফগানে আমেরিকার আক্রমণ প্রসঙ্গে আলোচনার অবকাশ এখনও শেষ হয়নি। আফগান প্রসঙ্গটি তিনটি দিক থেকে আলোচনার দাবী রাখে। প্রথমতঃ এ আক্রমণের পেছনে আমেরিকান তথা ইংল্যান্ডের খ্রিস্টানদের দৃষ্টিভঙ্গি। বিশেষতঃ জর্জ বুশ এ আক্রমণকে ক্রুসেড উল্লেখ করে আশঙ্কাজনিত কারণে তা পরিবর্তন করলেও, অভিজ্ঞমহল মনে করেন ক্রুসেডের চেতনা মূলতঃ খ্রিস্টান মানসিকতায় বহাল তবিয়ত বিদ্যমান।
ক্রুসেডের ইতিহাস অনেক পেছনের। পোপ দ্বিতীয় আরবন এর আবেদনক্রমে ইউরোপের খ্রিস্টান রাজ্যসমূহ জোটবদ্ধ হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাজ্যসমূহের বিরুদ্ধে একাদিক্রমে দুশত বৎসর ৪৮৯/১০৯৬ সাল হতে ৬৯১/১২৯২ সাল পর্যন্ত যে সকল ধর্মীয় বুদ্ধ ও অভিযান পরিচালনা করে একটি মতানুযায়ী সাধারণভাবে একে ক্রুসেড হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী খ্রিস্টানগণ যেহেতু নামে একতাবদ্ধ হয়েছিল এবং এ ক্রুসকেই যুদ্ধের পতাকা হিসেবে ব্যবহার করত সে কারণেই এর নামকরণ হয় ক্রুসেড যুদ্ধ বা হারবুস সালিবিয়্যা। তবে খ্রিস্টানরা এর পরিভাষাটিকে আরো ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করে। তারা মুসলিম জাতির সাথে খ্রিস্টানদের প্রতিটি সংঘর্ষকেই ক্রুসেড বলে মনে করে।
কাজেই দৃশ্যতঃ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার যতই আফগান আক্রমণকে খ্রিস্টান-মুসলমানের ধর্মীয় সংঘাতের বাইরে বলে প্রচার করুক কিন্তু অভিজ্ঞ মহল মনে করেন, তেল, গ্যাস আহরণ, অস্ত্রবাজার চাঙ্গা আর তৃতীয় বিশ্বের পারমানবিক চুল্লী ধ্বংস করার পাশাপাশি মূলতঃ খ্রিস্টানদের ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাব ও মুসলিম নিধন প্রবনতা বিশেষভাবে জোরদার বটে। দ্বিতীয় আলোচনাটি মুসলিম বিষয় সম্পর্কিত। এর তিনটি দিক রয়েছে-
এক: সাধারণ মুসলমান ইসলামকে এখনও প্রচন্ড ভালবাসে। ইসলামের নামে প্রচারিত শক্তিকে রক্ষার জন্য, অথবা বিজয়ের জন্য তারা এখনও যে কোন সময়ে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে প্রস্তুত। তথাকথিত তারেবান জিহাদে ব্রিটিশ মুসলিম, চীনা মুসলিম, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া তথা বাংলাদেশ থেকে স্বেচ্ছায় তালেবান যোগ দিতে যাওয়া আগ্রহী শত শত যুবকের উন্মাদনা তার প্রমাণ।
দুই: জিহাদ ডাক মাত্রই যে তা জিহাদের পর্যায়ে পড়েনা, জিহাদের আহবানকারী যে শয়তানের নকীবও হতে পারে ইতিহাসের বহু নজীর থেকেও সে শিক্ষা না নেয়া।
মাসিক আল বাইয়্যিনাতে ইতোমধ্যে যথেষ্ট লিখালিখি হয়েছে যে, লাদেন মূলতঃ সি.আই-এর এজেন্ট। তালেবান সি.আই-এ. রই সৃষ্টি। আফগানিস্তানের সীমান্ত এলাকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় হেরোইন উৎপাদনকারী এলাকা। এই হেরোইন থেকে তালেবানের বার্ষিক আয় ছিলো দশ হাজার কোটি থেকে বিশ হাজার কোটি ডলার। এই অর্থ ব্যয়িত হত তালেবানদের অস্ত্র সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণে। ঢাকার আফগান রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, স্ব-ঘোষিত আমীরুল মু’মিনীন মোল্লা ওমরের আমলে নিষিদ্ধ মাদক আফিমের উৎপাদন চার হাজার ছয়শ টনে পৌঁছেছে যা গোটা বিশ্বে উৎপাদিত আফিমের সত্তর ভাগ।
উল্লেখ্য, ইসলাম ধর্মে মাদকদ্রব্য সেবন অতি ঘৃণিত কাজ। কাট্টা হারাম। যাদের তওবা শবে বরাতেও কবুল হওয়ার কথা নয়, একান্ত খালিছভাবে তওবা না করলে। সেক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য ব্যবসাকারী যে কতদূর ঘৃণিত বা কত বড় হারাম কাজের হোতা হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। সে প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “যে একটি হারাম কাজের সূচনা করলো যতজন লোক তাতে জড়িত থাকলো তাদের সমূদয় গুণাহ যে পথ দেখিয়েছে তার উপর বর্তাবে।”
স্মর্তব্য, ইসলাম তার খিদমতের জন্য কখনও কোন হারাম কাজের অনুমতি দেয়না। ইসলামের নামে যারা হারাম কাজ করে তারা মূলতঃ ইসলামের দুশমন। বলাবাহুল্য, আফগানের তালেবান এই শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত।
তিন: ওসামা বিন লাদেন আর মোল্লা ওমরের মত অযোগ্য ব্যক্তিকে মুসলিম হিরো বানানোর প্রয়াসের প্রেক্ষিতে এটাই প্রতিভাত হয় যে, সারা মুসলিম বিশ্বে মূলতঃ নেতৃত্বের সঙ্কট চলছে। কোন কোন মহলের এ মন্তব্যের প্রেক্ষিতে বলতে হয় যে, এক্ষেত্রে সাধারণ মুসলমানের অসচেতনতা আর প্রকৃত নেতৃত্বের প্রতি ধাবমান হওয়ার অনাগ্রহ ও অজ্ঞতাই বেশি দায়ী।
এখানে উল্লেখ্য যে, ইসলাম কোন ব্রাহ্মন্যবাদী ধর্ম নয় যে, ধর্ম সম্পর্কিত জ্ঞান হাছিলের দায়িত্ব শুধু একটি শ্রেণীর। বরং ইসলামী বিধান মুতাবিক সকল মুসলিম নর-নারীর জন্যই জ্ঞান অর্জন করা ফরয। হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, “যে যামানার ইমামকে (মুজাদ্দিদকে) চিনলো না সে যেন জাহিলীয়াতের মধ্যে মারা গেল।”
এতদ্বপ্রেক্ষিতে আমরা মনে করি কপট ওসামা তথা নামধারী আলিম নেতৃত্বের বিপরীতে যামানার মুজাদ্দিদকে চেনা ফরয-ওয়াজিবের অন্তর্ভুক্ত।
আফগানে তালেবান পতনে বাংলাদেশের তালেবানপন্থীদের সম্পর্কে সঙ্গত কারণেই বিশেষ হুশিয়ার হওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। “আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান”- এই শ্লোগানধারীরা এখনও বাংলার বহু মাদরাসা, মক্তবে ওসামার চর হয়ে আছে। মূলতঃ সি.আই.এ চেয়েছে ওসামার এই তালেবান বাহিনী তৈরির নামে বাংলাদেশের মাদরাসা, মক্তবগুলো ধ্বংস করে দিতে। কারণ মাদরাসাগুলোতে যদি এভাবে তারেবানের নামে সন্ত্রাসী বাহিনী তৈরি হয় আর তারা যদি বর্তমান পদ্ধতিতে ইসলামী রাজনীতির নামে সন্ত্রাস চালায় তাহলে সরকার ও জনগণ কেউই তাদের বরদাশত করবেনা। বলাবাহুল্য, এ প্রক্রিয়ায় মাদরাসার ছাত্র-ওস্তাদ তথা আলিমদের প্রতি সাধারণ মমত্ববোধ ও শ্রদ্ধাবোধ ইতোমধ্যে অনেক কমে গেছে। আর তার অনিবার্য পরিণতি স্বরূপ অতি শীঘ্রই মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি সর্বত্রই প্রবল বিরূপ প্রতিক্রিয়া উঠবে এবং এক পর্যায়ে মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ হওয়ারও উপক্রম হবে। এ প্রসঙ্গে স্মর্তব্য যে, ব্রিটিশরা এদেশের আশি হাজার মাদরাসাকে বন্ধ করে দিয়েছিল।
বলাবাহুল্য, সি.আই.এ ওসামার দ্বারা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ কাজটিই করাতে চাইছে অতি সু-কৌশলে। অপরদিকে তালেবানের পক্ষ নিয়ে যারা ইসলামী আন্দোলন তৈরিতে ব্যস্ত তারা আমেরিকার বিরোধীতা প্রদর্শন করলেও কার্যতঃ সেই আমেরিকার কৃষ্টি অনুসরণেই মত্ত। তারা কুশপুত্তলিকা দাহ, মানববন্ধন, ছবি বহন ইত্যাদি খ্রিস্টীয় রীতি গ্রহণ করে মূলতঃ তাদেরই জয়গান ঘোষণা করছে।
বলাবাহুল্য, এ মহলটিই লংমার্চ, ব্লাসফেমী, মৌলবাদ ইসলামের নামে নির্বাচন ইত্যাদি বিধর্মী প্রক্রিয়ার সাথেও যুক্ত। অথচ বিধর্মী, বিজাতীয় আদর্শ ত্যাগ করার মধ্যেই তাক্বওয়া। আর শুধু রোযাই নয় মূলতঃ সমগ্র ইবাদত-বন্দেগীরও মূল কথা তাকওয়া হাছিল করা।
স্মর্তব্য, তাক্বওয়া আর তাছাউফ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। যা কেবল মাত্র হক্কানী-রব্বানী ওলীআল্লাহ উনার ছোহবতের মাধ্যমেই সম্ভব। মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদের সকলকে তা নসীব করুন। (আমীন)