সুওয়াল-জাওয়াব

সংখ্যা: ৯৯তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ মিজানুর রহমান খান, লুটন, ইউ. কে

১নং সুওয়াল

সুওয়াল : “মীলাদুন নবী বা মীলাদ মাহফিল” নবী, ছাহাবী, তাবেয়ী, তাবে’ তাবেয়ী ও আইম্মা-ই-মুজতাহিদীন উনাদের যামানায় হয়নি।

জনৈক ব্যক্তির এ বক্তব্য সঠিক কি-না? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব : উল্লিখিত বক্তব্য সঠিক নয়। তা মিথ্যা, মনগড়া ও কল্পনা প্রসূত। সঠিক বক্তব্য বা জাওয়াব হচ্ছে এই যে, “মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা মীলাদ শরীফ মাহফিল” অর্থা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উনার বিলাদত শরীফ এবং উনার সমগ্র জীবন মুবারক সম্পর্কে আলোচনা, উনার প্রতি ছলাত-সালাম পাঠ এক কথায় উনার ছানা-ছীফত করা সকল নবী, ছাহাবী, তাবেয়ী, তাবে’ তাবেয়ী, ইমাম-মুজতাহিদ, আউলিয়ায়ে কিরাম উনারা সকলের যামানায়ই ছিল এবং হয়েছে।

বদ বখত, বদ নছীবদের তা দৃষ্টিগোচর না হলেও সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যারা আশেকীন ও মুহিব্বীন উনারা বরাবরই তা করে তা জেনে আসছেন।

যেমন, “আওয়াহিবুল লাদুননিয়া” কিতাবে বর্ণিত রয়েছে, “ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যেদিন যমীনে তাশরীফ আনেন সেই রাত্রিতে অগণিত ফেরেশতা অবতরণ করেন এবং হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম উনার হুজরা শরীফ উনার দরজায় দাঁড়িয়ে আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করেন।”

“মিশকাত শরীফ উনার মধ্যে” বর্ণিত রয়েছে, হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু আলাইহি আনহু বর্ণনা করেন, একদা আমি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সমীপে উপস্থিত ছিলাম। ইতোপূর্বে কোন কোন লোক আমাদের বংশ পরিচয় সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছিল এবং সম্ভবত এ সংবাদ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কর্ণগোচর হয়েছিল। এ সময় উনার দরবার শরীফ উনার মধ্যে আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

তিনি মিম্বর শরীফ উনার মধ্যে আরোহণ করতঃ উপস্থিত লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি কে?” সকলে সমস্বরে উত্তর দিলেন, “আপনি মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল।” অতঃপর তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন, “আমি মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত আব্দুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার পুত্র, আব্দুল মুত্তালিব আলাইহিস সালাম উনার পৌত্র। মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি আমাকে কুল-মাখলুকাতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম মাখলুক অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ বাশার ও রসূলরূপে পাঠিয়েছেন। শ্রেষ্ঠ গোত্র কুরাইশ খান্দানে এবং কুরাঈশ গোত্রের বিভিন্ন শাখার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হাশেমী শাখায় আমাকে পয়দা করেছেন।”

আরো বর্ণিত রয়েছে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “আমি হলাম হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উনার দোয়া, হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম উনার সু-সংবাদ এবং আমার মাতা হযরত আমিনা আলাইহাস সালাম উনার দেখা সু-স্বপ্ন ও অলৌকিক ঘটনার বাস্তব প্রতিফলন। আমার মাতা আমার বেলাদতকালে দেখেছিলেন যে, এক “নূর” যমীনে তাশরীফ নিলেন এবং উনার আলোকে শাম দেশের বালাখানাসমূহ উনার দৃষ্টিগোচর হলো। (মিশকাত)

এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, হযরত আতা ইবনে ইয়াছার রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, “একদা আমি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আছ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সমীপে গেলাম এবং আরজ করলাম, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার যে না’ত “তাওরাত” কিতাবে আছে তা আমাকে আবৃত্তি করে শুনান। তিনি তখন আমাকে তা পড়ে শুনালেন।” (মিশকাত)

হযরত আবূ দারদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত আছে যে, “তিনি একদিন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে হযরত আবূ আমের আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার ঘরে গেলেন। তিনি সেখানে দেখতে পেলেন যে, হযরত আবূ আমের আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি উনার নিজ সন্তানাদি ও আত্মীয়-স্বজন উনাদের একত্রিত করে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মীলাদ শরীফ (জন্ম বৃত্তান্ত) আলোচনা করছেন। এটা দেখে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি অত্যন্ত খুশি হলেন এবং বললেন, “হে আমের! নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক আপনার জন্য উনার রহমতের দ্বারা উন্মুক্ত করেছেন এবং সকল ফেরেশতাগণ আপনাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। আর যারা আপনার ন্যায় এরূপ আমল করবে, তারাও আপনার ন্যায় নাযাত পাবে।” (কিতাবুত তানবীর ফী মাওলুদিল বাশীর ওয়ান নাযীর, সুবুলুল হুদা ফী মাওলুদিল মুস্তফা)

আরো বর্ণিত আছে যে, “একদিন হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি সেখানকার সকল লোকদেরকে উনার নিজ ঘরে একত্রিত করে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মীলাদ শরীফ বা জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা করেন, যা শুনে উপস্থিত সকলেই আনন্দচিত্তে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপর ছলাত-সালাম পাঠ করেন। এমন সময় সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সেখানে উপস্থিত হলেন এবং তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, حلت لكم شفاعتى. অর্থাৎ “তোমাদের জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে গেল।” (মাওলুদুল কবীর, দুররুল মুনাজ্জাম, সুবুলুল হুদা ফী মাওলুদিল মুস্তফা)

মূলতঃ মহান আল্লাহ পাক, ফেরেশতাগণ, পূর্ববর্তী নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগণ, খোদ নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ এবং পরবর্তীকালে ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উনারা সকলের আমল হতেই মীলাদ শরীফ উনার প্রমাণ পাওয়া যায়।

{দলীলসমূহ : (১) মাযহারী (২) কুরতুবী (৩) খাযেন (৪) বাগবী (৫) দুররে মানছূর (৬) রুহুল মায়ানী (৭) রুহুল বয়ান (৮) কবীর (৯) মিশকাত (১০) মিরকাত (১১) আশয়াতুল লুময়াত (১২) লুময়াত (১৩) শরহুত ত্বীবী (১৪) আত তালিকুছ ছবীহ (১৫) মুযাহিরে হক্ব (১৬) মাওয়াহিবুল লাদুননিয়া (১৭) মাওলুদুল কবীর (১৮) দুররুল মুনাজ্জাম (১৯) সুবুলুল হুদা ফী মাওলিদিল মুস্তফা (২০) কিতাবুততানবীর ফী মাওলিদিল বাশীর ওয়ান নাযীর ইত্যাদি}

২নং সুওয়াল

সুওয়াল : কুরুণে ছালাছার মধ্যে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বর্ণনা পাওয়া যায়না। তাই তা বর্জনীয়।

জনৈক ব্যক্তির এ বক্তব্য সঠিক কি-না?

জাওয়াব : জনৈক ব্যক্তির উক্ত বক্তব্য সঠিক নয়। তার উক্ত বক্তব্যই প্রমাণ করে যে, সে চরম জাহিল। শরীয়ত সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞানও তার নেই। কারণ কুরুণে ছালাছাই হচ্ছে পর্যায়ক্রমে ছাহাবী, তাবিয়ী ও তাবে’ তাবিয়ীগণ উনাদের তিন যুগ। আর কুরুণে ছালাছার প্রথম ক্বরণ বা যুগই হচ্ছে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনার যুগ। আর সে যুগেই মীলাদ মাহফিল হয়েছে।

সুতরাং “কুরুণে ছালাছার মধ্যে এটা পাওয়া যায়না” এ কথা মিথ্যা প্রতিপন্ন হলো ও তার জিহালতী পরিষ্ফুটিত হলো।

আর কোন আমল কুরুণে ছালাছার মধ্যে না থাকলে যে তা বর্জনীয় একথা সম্পূর্ণ অশুদ্ধ ও কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ উনার খিলাফ। বরং কোন আমল গ্রহণীয় কিংবা বর্জনীয় হওয়ার জন্য কুরুণে ছালাছা শর্ত নয়। শর্ত হচ্ছে, সে আমল কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ সম্মত কি না? যদি কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ সম্মত হয় তাহলে তা গ্রহণীয়। আর যদি কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ সম্মত না হয় তবে তা বর্জণীয় বা পরিত্যাজ্য। যেমন, এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

من سن فى الاسلام سنة حسنة فله اجرها واجر من عمل بها.

অর্থ: “যে ব্যক্তি দ্বীন ইসলামে কোন উত্তম বিষয় বা আমলের প্রচলন করলো তবে তার জন্য প্রতিদান (নেকী) রয়েছে এবং যারা সে আমল করবে তারাও ছাওয়াবের অধিকারী হবে।” (মুসলিম শরীফ, মিশকাত শরীফ)

হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

ماراه المسلمون حسنا فهو عند الله حسن.

অর্থ: “মুসলমানগণ যে কাজ ভাল মনে করেন তা মহান আল্লাহ পাক উনার নিকটও ভাল বলে বিবেচিত হয়।” (মিশকাতুল আনোয়ার)

অতএব, “কুরণে ছালাছার মধ্যে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বর্ণনা পাওয়া যায় না।” জনৈক ব্যক্তির এ বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল ও কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ উনার খিলাফ বলে প্রমাণিত হলো।

{দলীলসমূহ : (১) মুসলিম শরীফ (২) মিশকাত শরীফ (৩) ফতহুল মুলহিম শরীফ (৪) শরহে নব্বী শরীফ (৫) মুফহিম শরীফ, মিরকাত শরীফ (৬) আশয়াতুল লুময়াত শরীফ (৭) লুময়াত শরীফ (৮) মুযাহিরে হক্ব শরীফ (৯) শরহুত ত্বীবী শরীফ (১০) আত তালীকুছ ছবীহ শরীফ (১১) মিরয়াতুল মানাযীহ শরীফ (১২) মিশকাতুল আনোয়ার শরীফ ইত্যাদি}

৩নং সুওয়াল

সুওয়াল : খুলাফায়ে রাশিদীনগণ উনারা ছিলেন সকল ছাহাবী উনাদের মধ্যে অধিক নবী প্রেমিক। তাই মুহব্বতের আমল অর্থাৎ মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনারা পালন করলেন না কেন?

জনৈক ব্যক্তির এ বক্তব্য সঠিক কি-না?

জাওয়াব : জনৈক ব্যক্তির উক্ত বক্তব্য সঠিক নয়। তার এ কথা চরম মূর্খতাসূচক। কারণ শরীয়তে কোন আমল গ্রহণীয় হওয়ার ক্ষেত্রে শরীয়তের কোথাও এ শর্ত আরোপ করা হয়নি যে, হযরত খুলাফায়ে রাশিদীন ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাদের আমল থাকতে হবে। বরং এ শর্ত আরোপ করা হলে অন্যান্য ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাদেরকে ইহানত করা হবে, যা কাট্টা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। তাই শরীয়ত কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস এ চারটিকে দলীল হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। তাই এ চারটি দলীলের কোন একটি দলীলের দ্বারা কোন আমল ছাবেত বা প্রমাণিত হলেই তা গ্রহণীয়। এটাই আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ফতওয়া। এ ফতওয়ার বিপরীত বক্তব্য পেশ করা গোমরাহী ও কুফরী বৈ কিছু নয়।

উল্লেখ্য, ঈদে মীলাদুন নবী জায়েয বা শরীয়ত সম্মত হওয়ার জন্য যদি খুলাফায়ে রাশিদীনগণ করতে হবে বা বলতে হবে এ শর্ত আরোপ করা হয় তাহলে প্রশ্ন উঠে যে, হযরত খুলাফায়ে রাশিদীনগণ উনাদের থেকে বর্ণিত হাদীছ শরীফ রয়েছে কিনা? আরো প্রশ্ন উঠে যে, খুলাফায়ে রাশিদীনগণ উনাদের থেকে কত সংখ্যক হাদীছ শরীফ বর্ণিত রয়েছে? আমরা দেখতে পাই খুলাফায়ে রাশিদীনগণ উনাদের বর্ণিত হাদীছ শরীফ উনার সংখ্যা যথাক্রমে- ১৪২, ৫৩৯, ১৪৬, ৫৮৬ মোট ১,৪১৩টি। এর মধ্যে বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ উনার মধ্যে মাত্র ১২২টি হাদীছ শরীফ বর্ণিত রয়েছে।

যদি খুলাফায়ে রাশিদীনগণ উনাদের হাদীছ শরীফই কেবল গ্রহণ করা হয় তাহলে অন্যান্য ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাদের বর্ণিত হাদীছ শরীফগুলো কি গ্রহণ করা যাবেনা? যদি তাই হয় তাহলে দ্বীনের অনেক জরুরী বিষয়ের আমলই ছেড়ে দিতে হবে। যা শরীয়তের গ্রহণযোগ্য তো নয়ই বরং তা কাট্টা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।

অতএব, কোন আমল শরীয়ত সম্মত হওয়া বা না হওয়ার বিষয়টি কেবল খুলাফায়ে রাশিদীনগণ উনাদের উপর নির্ভরশীল বলে শর্তারোপ করার অর্থই হলো যে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাকে ইহানত করা, যা কাট্টা কুফরী।

আরো উল্লেখ্য, স্বয়ং সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপস্থিতিতে যখন হযরত হাসসান বিন সাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মসজিদে নব্বী শরীফ উনার মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার শানে না’ত, কাছীদা, কবিতা আবৃত্তি করে শুনাতেন তখন খুলাফায়ে রাশিদীনগণ উনারা কোথায় থাকতেন? নিঃসন্দেহে উনারাও সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে মসজিদে নব্বীতে উপস্থিত থেকে হযরত হাসসান বিন সাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার স্বরচিত ও আবৃত্তি করা কাছিদাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতেন।

আর খুলাফায়ে রাশিদীনগণ উনারা মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছানা-ছীফত, উনার প্রতি ছালাত-সালাম পাঠ করেননি তা কোন কিতাবে আছে কি? কোন কিতাবেই নেই। বরং মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সার্বিক ছানা-ছীফত, ফযীলত-মর্যাদা বর্ণনার ক্ষেত্রে উনারাই ছিলেন অগ্রগামী।

এ প্রসঙ্গে বিশ্ব সমাদৃত ও সুপ্রসিদ্ধ “আন নি’য়ামাতুল কুবরা আলাল আলাম” কিতাবে বর্ণিত রয়েছে,

قال ابو بكر الصديق رضى الله عنه من أنفق درهما على قراءة مولد النبى صلى الله عليه وسلم كان رفيقى فى الجنة.

অর্থ: “হযরত আবু বরক ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মীলাদ শরীফ পাঠ (মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপলক্ষ্যে এক দিরহাম ব্যয় করবে সে জান্নাতে আমার বন্ধু হয়ে থাকবে।” (সুবহানাল্লাহ)

وقال عمر رضى الله عنه من عظم مولد النبى صلى الله عليه وسلم فقد احيا الاسلام.

অর্থ: “হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, যে ব্যক্তি মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে (বেলাদত দিবসকে) বিশেষ মর্যাদা দিল সে মূলতঃ ইসলামকেই পূনরুজ্জীবিত করলো।” (সুবহানাল্লাহ)

وقال عثمان رضى الله عنه من أنفق درهما على قراءة مولد النبى صلى الله عليه وسلم فكانما شهد غزوة بدر وحنين.

অর্থ: “হযরত উছমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, যে ব্যক্তি মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষ্যে এক দিরহাম খরচ করলে সে যেন বদর ও হুনাইন যুদ্ধে শরীক থাকলো।” (সুবহানাল্লাহ)

وقال على رضى الله عنه وكرم الله وجهه من عظم مولد النبى صلى الله عليه وسلم وكان سببا لقرائته لايخرج من الدنيا إلا بالايمان ويدخل الجنة بغير حساب.

অর্থ: “হযরত আলী কারমাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম তিনি বলেন, যে ব্যক্তি মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি বিশেষ মর্যাদা প্রদান করলো সে ব্যক্তি অবশ্যই ঈমান নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিবে এবং বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সুবহানাল্লাহ)

وقال حسن البصرى رضى الله عنه وددت لو كان لى مثل جبل أحد ذهبا فانفقته على قرائة مولد النبى صلى الله عليه وسلم.

অর্থ: “(বিশিষ্ট তাবেয়ী) হযরত হাসান বছরী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, আমার একান্ত ইচ্ছা হয় যে, আমার যদি ওহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকত তাহলে তা মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষ্যে ব্যয় করতাম।” (সুবহানাল্লাহ)

وقال الامام الشافعى رحمة الله من جمع لمولد النبى صلى الله عليه وسلم إخوانا وهيأ طعاما واخلى مكانا وعمل إحسانا وصار سببا لقرائته بعثه الله يوم القيامة مع الصديقين والشهداء والصالحين ويكون فى جنات النعيم.

অর্থ: “হযরত ইমাম শাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, যে ব্যক্তি মীলাদ শরীফ পাঠ বা মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন উপলক্ষ্যে লোকজন একত্রিত করলো এবং খাদ্য তৈরি করলো ও জায়গা নির্দিষ্ট করলো এবং মীলাদ শরীফ পাঠের জন্য উত্তম ভাবে (তথা সুন্নাহ শরীফ ভিত্তিক) আমল করলো তাহলে উক্ত ব্যক্তিকে মহান আল্লাহ পাক তিনি হাশরের দিন ছিদ্দীক, শহীদ, ছালেহীনগণ উনাদের সাথে উঠাবেন এবং উনার ঠিকানা হবে জান্নাতে নাঈমে।” (সুবহানাল্লাহ)

وقال جنيد البغدادى قدس الله سره من حضر مولد النبى صلى الله عليه وسلم وعظم قدره فقد فاز بالإيمان.

অর্থ: “হযরত জুনাইদ বাগদাদী ক্বাদ্দাসাল্লাহু সিররাহু রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, যে ব্যক্তি মীলাদন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আয়োজনে উপস্থিত হলো এবং উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করলো সে তার ঈমানের দ্বারা সাফল্য লাভ করবে অর্থাৎ সে বেহেশতী হবে।” (সুবহানাল্লাহ)

وقال سلطان العارفين الامام جلال الدين السيوطى قدس الله سره ونور ضريحه فى كتابه المسمى بالوسائل فى شرح الشمائل ما من بيت أو مسجد أومحلة قرئ فيه مولد النبى صلى الله عليه وسلم إلا حفت الملائكة ذلك البيت أوالمسجد أو المحلة وصلت الملائكة على أهل ذلك المكان وعمهم الله تعالى بالرحمة والرضوان وأما المطوقون بالنور يعنى جبرائيل وميكائيل وإسرافيل وعزرائيل عليهم السلام فإنهم يصلون على من كان سببا لقرائة مولد النبى صلى الله عليه وسلم.

অর্থ: “সুলতানুল আরিফীন হযরত ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “ওসায়িল ফী শরহি শামায়িল” নামক কিতাবে বলেন, যে কোন ঘরে অথবা মসজিদে অথবা মহল্লায় মীলাদ শরীফ পাঠ করা হয় বা মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন করা হয় সেখানে অবশ্যই মহান আল্লাহ পাক উনার ফেরেশতাগণ বেষ্টন করে নেন। আর উনারা সে স্থানের অধিবাসীগণ উনাদের উপর ছলাত-সালাম পাঠ করতে থাকেন। আর মহান আল্লাহ পাক তিনি তাদেরকে স্বীয় রহমত ও সন্তুষ্টির আওতাভুক্ত করে নেন। আর নূর দ্বারা সজ্জিত প্রধান চার ফেরেশতা, অর্থাৎ হযরত জিব্রাঈল, মীকাঈল, ইসরাফিল, ও আজরাইল আলাইহিমুস সালাম উনারা মীলাদ শরীফ পাঠকারীর উপর বা মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপনকারীর উপর ছলাত-সালাম পাঠ করেন। (সুবহানাল্লাহ)

অতএব তার উল্লিখিত বক্তব্য মিথ্যা বলে প্রমাণিত হলো।

{দলীলসমূহ : (১) কুরতুবী (২) রুহুল বয়ান (৩) রুহুল মায়ানী, (৪) খাযেন (৫) বাগবী (৬) মাযহারী (৭) বুখারী (৮) মুসলিম (৯) আহমদ (১০) বায়হাক্বী (১১) হাবীউল ফতওয়া (১২) মাওলুদুল কবীর (১৩) ইশবাউল কালাম (১৪) মাওয়াহিবুল লাদুননিয়া (১৫) নিয়ামাতুল কুবরা (১৬) ওসায়িল ফী শরহিশ শামায়িল (১৭) রিসালায়ে মওদুদ (১৮) মাসাবাতা বিস সুন্নাহ (১৯) মকতুবাত শরীফ (২০) মজমুয়ায়ে ফতওয়া ইত্যাদি।}

মুহম্মদ মুছাদ্দিক হুসাইন (নিপু)

সভাপতি- ছাত্র আনজুমানে আল বাইয়্যিনাত, দিনাজপুর।

সুওয়াল : (১) শবে বরাত কি? (২) এ সম্পর্কে কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে কোন বর্ণনা আছে কি? (৩) অনেকে শ’বে বরাত উদযাপনকে বিদয়াত ও নাজায়েয বলে থাকে। তারা কারণ স্বরূপ বলে থাকে যে, কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ উনাদের কোথাও শ’বে বরাতের উল্লেখ নেই। আসলে কি তাই? সঠিক জাওয়াব দানে বাধিত করবেন।

জাওয়াব : (১) শবে বরাত হচ্ছে- ইসলামের বিশেষ রাত্রিসমূহের মধ্যে একটি রাত্র। যা শা’বানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত্রিতে হয়ে থাকে। “শবে বরাত” এর অর্থ হচ্ছে, “মুক্তির রাত্র” বা “নাযাতের রাত্র”।

(২) ‘শব’ ফার্সী শব্দ। যার অর্থ হচ্ছে, “রাত্র”। আর “বরাত” আরবী শব্দ যা উর্দূ, ফার্সী ইত্যাদি সব ভাষাতেই ব্যবহার হয়ে থাকে। যার অর্থ “মুক্তি ও না’যাত” ইত্যাদি। কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ উনাদের ভাষা যেহেতু আরবী তাই ফার্সী ‘শব’ শব্দটি কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে না থাকাটাই স্বাভাবিক।

স্মর্তব্য যে, কুরআন শরীফ উনার ভাষায় “শ’বে বরাতকে” “লাইলাতুম মুবারাকা বা বরকতময় রজনী” এবং হাদীছ শরীফ উনার ভাষায় শ’বে বরাতকে “লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান” বা শা’বানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত্রি” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন যে,

انا انزلنه فى ليلة مبركة انا كنا منذرين فيها يفرق كل امر حكيم امرا من عندنا انا كنا مرسلين.

অর্থ: “নিশ্চয়ই আমি বরকতময় রজনীতে (শবে বরাতে) কুরআন শরীফ নাযিল করেছি। আর আমিই ভয় প্রদর্শনকারী, উক্ত রাত্রিতে আমার পক্ষ থেকে সমস্ত প্রজ্ঞাময় কাজ গুলো ফায়সালা করা হয়। আর নিশ্চয়ই আমিই প্রেরণকারী।” (সূরা দুখান/৩-৫)

আর হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

عن عائشة رضى الله عنها قالت فقدت رسول الله صلى الله عليه وسلم ليلة فاذا هو بالبقيع فقال اكنت تخافين ان يخيف الله عليه ورسوله قلت يا رسول الله انى ظننت انك اتيت بعض نسائك فقال ان الله تعالى ينزل ليلة النصف من شعبان الى السماء الدنيا فيغفر لاكثر من عدد شعر غنم كلب.

অর্থ: “হযরত আয়িশা ছিদ্দীকা আলাইহাস সালাম উনার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে কোন এক রাত্রিতে রাত্রিযাপন করছিলাম। এক সময় উনাকে বিছানায় না পেয়ে আমি মনে করলাম যে, তিনি হয়ত অন্য কোন স্ত্রীর হুজরা শরীফ উনার মধ্যে গেছেন। অতঃপর আমি তালাশ করে উনাকে জান্নাতুল বাক্বীতে পেলাম। সেখানে তিনি উম্মতের জন্য মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। এ অবস্থা দেখে আমি স্বীয় হুজরা শরীফ উনার মধ্যে ফিরে আসলে তিনিও ফিরে এসে আমাকে বললেন, তুমি কি মনে করেছ, মহান আল্লাহ পাক ও উনার রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তোমার সাথে আমানতের খিলাফ করেছেন! আমি বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি ধারণা করেছিলাম যে, আপনি হয়তো আপনার অপর কোন স্ত্রীর নিকটে গেছেন। অতঃপর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি শা’বানের ১৫ তারিখ রাত্রিতে পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন, অতঃপর তিনি বণী ক্বালবের মেষের গায়ে যত পশম রয়েছে তার চেয়ে অধিক সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করে থাকেন।” (তিরমিযী শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ, রযীন শরীফ, মিশকাত শরীফ)

অতএব, প্রমাণিত হলো যে, কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ উনাদেরই শ’বে বরাতের কথা উল্লেখ আছে। তবে কুরআন শরীফ উনার মধ্যে বরাতের রাত্রকে “লাইলতুম মুবারকাহ” আর হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে “লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান বলা হয়েছে।

অনেকে বলে থাকে যে, “সূরা দুখানের” উক্ত আয়াত শরীফ দ্বারা “শবে ক্বদরকে” বুঝানো হয়েছে। কেননা উক্ত আয়াত শরীফ উনার মধ্যে সুস্পষ্টই উল্লেখ আছে যে, “আমি কুরআন শরীফ নাযিল করেছি ….. “আর কুরআন শরীফ যে ক্বদরের রাত্রিতে নাযিল হয়েছে তা “সূরায়ে ক্বদরেও” উল্লেখ আছে।”

মূলতঃ যারা উপরোক্ত মন্তব্য করে থাকে তারা “সূরা দুখানের” উক্ত আয়াত শরীফ উনার সঠিক ব্যাখ্যা না জানার কারণেই করে থাকে। মহান আল্লাহ পাক তিনি যে “সূরা দুখানে” বলেছেন, “আমি বরকতময় রজনীতে কুরআন শরীফ নাযিল করেছি।” এর ব্যাখ্যামূলক অর্থ হলো- “আমি বরকতময় রজনীতে কুরআন শরীফ নাযিলের ফায়সালা করেছি।”

আর “সূরা ক্বদরে” যে বলেছেন, “আমি ক্বদরের রাত্রিতে কুরআন শরীফ নাযিল করেছি।”

এর ব্যাখ্যামূরক অর্থ হলো, “আমি ক্বদরের রাত্রিতে কুরআন শরীফ নাযিল শুরু করি।”

অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক তিনি “লাইলাতুম মুবারকাহ বা শ’বে বরাতে” কুরআন শরীফ নাযিলের সিদ্ধান্ত নেন আর শ’বে ক্বদরে তা নাযিল করা শুরু করেন।

এজন্য মুফাসসিরীনয়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ উনারা শবে বরাতকে “ليلة التجويز” অর্থাৎ “ফায়সালার রাত্র”। আর শবে ক্বদরকে “ليلة التنفيذ” অর্থাৎ “জারী করার রাত্র” বলে উল্লেখ করেছেন। কেননা শবে বরাতে যে সকল বিষয়ের ফায়সালা করা হয় তা “সূরা দুখানের” উক্ত আয়াত শরীফ উনার মধ্যেই উল্লেখ আছে। যেমন, ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

فيها يفرق كل امر حكيم.

অর্থাৎ “উক্ত রজনীতে সকল প্রজ্ঞাময় কাজ গুলো ফায়সালা করা হয়।”

হাদীছ শরীফ উনার মধ্যেও উক্ত আয়াতাংশের সমর্থন পাওয়া যায়। যেমন ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

فيها ان يكتب كل مولود من بنى ادم فى هذه السنة وفيها ان يكتب كل هالك من بنى ادم فى هذه السنة وفيها ترفع اعمالهم وفيها تنزل ارزاقهم.

অর্থাৎ “বরাতের রাত্রিতে ফায়সালা করা হয় কতজন সন্তান এ বৎসর জন্ম গ্রহণ করবে এবং কতজন সন্তান মৃত্যু বরণ করবে। এ রাত্রিতে বান্দাদের আমলগুলো উপরে উঠানো হয় এবং এ রাত্রিতে বান্দাদের রিযিকের ফায়সালা করা হয়।” (বায়হাক্বী শরীফ, মিশকাত শরীফ)

কাজেই মহান আল্লাহ পাক তিনি যেহেতু বলেছেন যে, বরকতময় রজনীতে সকল কাজের ফায়সালা করা হয়। আর উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিও যেহেতু বলেছেন যে, বরাতের রাত্রিতেই সকল বিষয় যেমন, হায়াত, মউত, রিযিক, আমল ইত্যাদি যা কিছু মানুষের প্রয়োজন হয়ে থাকে তার ফায়সালা করা হয় সেহেতু বলার অপেক্ষাই রাখেনা যে, “সূরা দুখানের” উক্ত আয়াত শরীফ দ্বারা শবে বরাতকেই বুঝানো হয়েছে।

(৩) বরাতের রাত উদযাপন বা উক্ত রাত্রিতে খালিছভাবে ইবাদত-বন্দেগী, দোয়া-ইস্তেগফার ও দিনে রোযা রাখা ইত্যাদির নির্দেশ কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ উনাদের রয়েছে। যেমন, হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

عن على رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا كانت ليلة النصف من شعبان فقوموا ليلها وصوموا يومها فان الله تعالى ينزل فيها لغروب الشمس الى السماء الدنيا فيقول الا من مستغفر فاغفرله الا مسترزق فارزقه الا مبتلى فاعافيه الا كذا الا كذا حتى يطلع الفجر.

অর্থ: “হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু উনার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যখন শা’বানের ১৫ তারিখ রাত্রি অর্থাৎ বরাতের রাত্রি উপস্থিত হবে তখন তোমরা উক্ত রাত্রিতে নামায আদায় করবে এবং দিনে রোযা রাখবে। কেননা নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি উক্ত রাত্রিতে সূর্যাস্তের সময় পৃথিবীর আকাশে আসেন; অতঃপর ঘোষণা করেন, “কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দিব।” “কোন রিযিক প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে রিযিক দান করব।” “কোন মুছিবতগ্রস্থ ব্যক্তি আছে কি? আমি তার মুছিবত দূর করে দিব।” এভাবে ফযর পর্যন্ত ঘোষণা করতে থাকেন।” (ইবনে মাজাহ শরীফ, মিশকাত শরীফ)

কাজেই শ’বে বরাত উদযাপন করা বা উক্ত রাত্রিতে ইবাদত-বন্দেগী করা কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ উনাদেরই নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত। এটা মোটেও বিদয়াত ও নাজায়েয নয় বরং সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।

{দলীলসমূহ : (১) সুলা দুখান ৬নং আয়াত শরীফ (২) তাফসীরে দুররে মনছুর শরীফ (৩) কুরতুবী শরীফ (৪) মাযহারী শরীফ (৫) তিরমিযী শরীফ (৬) ইবনে মাজাহ শরীফ (৭) বায়হাক্বী শরীফ (৮) মিশকাত শরীফ (৯) মিরকাত শরীফ (১০) আশয়াতুল লুময়াত শরীফ (১১) লুময়াত শরীফ (১২) ত্বীবী শরীফ (১৩) তালীক্ব শরীফ (১৪) মুযাহিরে হক্ব ইত্যাদি।}

মুহম্মদ রাশেদুল ইসলাম (রাশেদ)

সভাপতি- ছাত্র আনজুমানে আল বাইয়্যিনাত, রংপুর।

সুওয়াল : শ’বে বরাতকে কেন্দ্র করে সমাজের এক শ্রেণীর মানুষেরা আতশবাজি ও আলোকসজ্জা করে থাকে। শরীয়তের দৃষ্টিতে এটা জায়েয আছে কি-না?

জাওয়াব : শ’বে বরাতে আলোকসজ্জা ও আতশবাজি করা শরীয়ত সম্মত নয়। ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আলোক সজ্জা হচ্ছে- গ্রীক ধর্মের একটি ধর্মীয় প্রথা। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে হিন্দু ধর্মের ধর্মীয় প্রথা হিসেবে রূপ লাভ করে যা শেষ পর্যন্ত দেয়ালী পূজা নামে মশহুর হয়। আলোকসজ্জা সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করে যা প্রকৃত দ্বীন ইসলামের শেয়ার বা তর্জ-ত্বরীকার অন্তর্ভুক্ত নয়। আর আতশবাজিও দ্বীন ইসলামের কোন শেয়ারের অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রকৃতপক্ষে আতশবাজিও হিন্দু ধর্মের একটি ধর্মীয় প্রথার অন্তর্ভুক্ত।

আর এ প্রসঙ্গে হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

عن عبد الله بن عمر رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من تشبه بقوم فهو منهم.

অর্থ: “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল বা সাদৃশ্য রাখবে তার হাশর-নশর তাদের সাথেই হবে।” (আহমদ শরীফ, আবূ দাউদ শরীফ)

এ প্রসঙ্গে একটি ওয়াকেয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তা হলো- হিন্দুস্থানে একজন জবরদস্ত মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী ছিলেন। যিনি ইন্তিকালের পর অন্য একজন বুযুর্গ ব্যক্তি উনাকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করেন, “হে মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী, আপনি কেমন আছেন?” তখন সেই মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী জাওয়াবে বলেন, “আপাতত আমি ভালই আছি, কিন্তু আমার উপর দিয়ে এক কঠিন সময় অতিবাহিত হয়েছে। যা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আমার ইন্তিকালের পর আমাকে ফেরেশতারা সরাসরি মহান আল্লাহ পাক উনার সম্মুখে পেশ করেন। মহান আল্লাহ পাক তিনি ফেরেশতাদের বলেন, “হে ফেরেশতাগণ! তোমরা কেন উনাকে এখানে নিয়ে এসেছ?” ফেরেশতাগণ বলেন, “আয় মহান আল্লাহ পাক! আমরা উনাকে খাছ বান্দা হিসেবে আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য নিয়ে এসেছি।” এটা শ্রবণ করে মহান আল্লাহ পাক তিনি বললেন, “উনাকে এখান থেকে নিয়ে যাও, উনার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হবে। কেননা সে পূঁজা করেছে। এটা শুনে আমি ভয়ে পেয়ে গেলাম এবং আমার সমস্ত শরীর ভয়ে কাঁপতে লাগল। তখন আমি মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট আরজু পেশ করলাম, “আয় মহান আল্লাহ পাক! আমার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হবে কেন? আমি তো সব সময় আপনার এবং সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ফরমাবরদার ছিলাম। কখনও ইচ্ছাকৃত নাফরমানি করিনি এবং কখনো পূজা করিনি আর মন্দিরেও যাইনি।” তখন মহান আল্লাহ পাক তিনি বললেন, “তুমি সেইদিনের কথা স্মরণ কর, যেদিন হিন্দুস্থানে হোলি পূজা হচ্ছিল।

তোমার সামনে-পিছনে, ডানে-বায়ে, উপরে-নীপে সমস্ত গাছ-পালা, তরু-লতা, পশু-পাখী, কীট-পতঙ্গ সবকিছুকে রঙ্গ দেয়া হয়েছিল। এমতাবস্থায় তোমার সামনে দিয়ে একটি গর্দভ যাচ্ছিল যাকে রঙ দেয়া হয়নি। তখন তুমি পান চিবাচ্ছিলে, তুমি সেই গর্দভের গায়ে এক চিপটি পানের রঙ্গীন রস নিক্ষেপ করে বলেছিলে, “হে গর্দভ তোমাকে তো কেউ রং দেয়নি, এই হোলি পূঁজার দিনে আমি তোমাকে রং দিয়ে দিলাম।” “এটা কি তোমার পূজা করা হয়নি? তুমি জি জান না”,

من تشبه بقوم فهو منهم.

অর্থ: “যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে মিল রাখে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত এবং তার হাশর-নশর তাদের সাথে হবে।”

সুতরাং “তোমার হাশর-নশর হিন্দুদের সাথে হবে।” যখন মহান আল্লাহ পাক তিনি এ কথা বললেন, তখন আমি লা-জাওয়াব হয়ে গেলাম এবং ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে বললাম, “আয় মহান আল্লাহ পাক! আমি এটা বুঝতে পারিনি।” কিছুক্ষণ পর মহান আল্লাহ পাক তিনি বললেন, “হ্যাঁ তোমাকে অন্যান্য আমলের কারণে ক্ষমা করা হয়েছে।”

কাজেই মুসলমানদের জন্য শুধু শ’বে বরাতকেই কেন্দ্র করে নয় বরং কোন অবস্থাতেই আতশবাজি ও আলোকসজ্জা ইত্যাদি করা শরীয়ত সম্মত নয়।

{দলীলসমূহ : (১) আহমদ শরীফ (২) আবূ দাউদ শরীফ (৩) বযলুল মাজহুদ শরীফ (৪) আউনুল মা’বূদ শরীফ (৫) মাছাবাতা বিস সুন্নাহ শরীফ (৬) গ্রীক জাতির ইতিহাস (৭) হিন্দু ধর্মের ইতিহাস ইত্যাদি।}

মুহম্মদ আলী হায়দার, ঝাউতলা, চট্টগ্রাম।

সুওয়াল : শ’বে বরাতকে মহান আল্লাহ পাক তিনি ও উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ফযীলত বা মর্যাদা দিয়েছেন। যার কারণে এ রাত্রিটি ইবাদতের রাত্রি হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। তাই এ রাত্রে দেখা যায় কেউ নামায পড়ে, কেউ যিকির-আযকার করে, কেউ কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করে, কেউ মাযার শরীফ জিয়ারত করে, কেউ হালুয়া-রুটি পাকিয়ে থাকে, কেউ আতশবাজি ও আলোকসজ্জা করে থাকে।

এখন আমার সুওয়াল হচ্ছে- শ’বে বরাতে কোন আমল করা শরীয়ত সম্মত? দয়া করে তা জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব : শ’বে বরাত হচ্ছে মুক্তি বা ভাগ্য অথবা নাযাতের রাত্র। অর্থাৎ বরাতের রাত্রিতে ইবাদত-বন্দেগী করে ও পরবর্তী দিনে রোযা রেখে মহান আল্লাহ পাক ও উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সন্তুষ্টি অর্জন করাই মূল উদ্দেশ্য।

শ’বে বরাতে কোন কোন ইবাদত-বন্দেগী করতে হবে তা কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ উনাতে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। তবে ইবাদত বন্দেগী করার জন্য নির্দেশ করা হয়েছে।

যেমন, হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে,

عن على رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا كانت ليلة النصف من شعبان فقوموا ليلها وصوموا يومها فان الله تعالى ينزل فيها لغروب الشمس الى السماء الدنيا فيقول الا من مستغفر فاغفرله الا مسترزق فارزقه الا مبتلى فاعافيه الا كذا الا كذا حتى يطلع الفجر.

অর্থ: “হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু উনার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যখন শা’বানের ১৫ তারিখ রাত্রি উপস্থিত হবে তখন তোমরা উক্ত রাত্রিতে নামায আদায় করবে এবং দিনে রোযা রাখবে। কেননা নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি উক্ত রাত্রিতে সূর্যাস্তের সময় পৃথিবীর আকাশে আসেন, অতঃপর ঘোষণা করেন, “কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছ কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দিব।” “কোন রিযিক প্রার্থনাকারী আছ কি? আমি তাকে রিযিক দান করব।” “কোন মুছিবতগ্রস্থ ব্যক্তি আছ কি? আমি তার মুছিবত দূর করে দিব।” এভাবে ফযর পর্যন্ত ঘোষণা করতে থাকেন।” (ইবনে মাজাহ শরীফ, মিশকাত শরীফ)

হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

عن حضرت عائشة عليها السلام. قالت فقدت رسول الله صلى الله عليه وسلم ليلة فاذا هو بالبقيع فقال اكنت تخافين ان يخيف الله عليك ورسوله قلت يا رسول الله انى ظننت انك اتيت بعض نسائك فقال ان الله تعالى ينزل ليلة النصف من شعبان الى السماء الدنيا فيغفر لاكثر من عدد شعر غنم كلب.

অর্থ: “হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে কোন এক রাত্রিতে রাত্রিযাপন করছিলাম। এক সময় উনার বিছানায় না পেয়ে আমি মনে করলাম যে, তিনি হয়ত অন্য কোন স্ত্রীর হুজরা শরীফ উনার মধ্যে গেছেন। অতঃপর আমি তালাশ করে উনাকে জান্নাতুল বাক্বীতে পেলাম। সেখানে তিনি উম্মতের জন্য মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। এ অবস্থা দেখে আমি স্বীয় হুজরা শরীফ উনার মধ্যে ফিরে আসলে তিনিও ফিরে এসে আমাকে বললেন, তুমি কি মনে করেছ, মহান আল্লাহ পাক ও উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমার সাথে আমানতের খিলাফ করেছেন! আমি বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহু ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি ধারণা করেছিলাম যে, আপনি হয়তো আপনার অপর কোন স্ত্রীর নিকটে গেছেন। অতঃপর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি শা’বানের ১৫ তারিখ রাত্রিতে পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন, অতঃপর তিনি বণী ক্বালবের মেষের গাযে পশম রয়েছে তার চেয়ে অধিক সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করে থাকেন।” (তিরমিযী শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ, রযীন শরীফ, মিশকাত শরীফ)

হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো বর্ণিত আছে,

عن ابى موسى الاشعرى عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال ان الله تعالى ليطلع فى ليلة النص من شعبان فيغفر لجميع خلقه الا لمشرك او مشاحن وفى روايته الا اثنين مشاحن وقاتل النفس.

অর্থ: “হযরত আবু মুসা আশয়ারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা তিনি আনহু মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হতে বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি শা’বানের ১৫ তারিখ রাত্রিতে ঘোষণা করেন যে, উনার সমস্ত মাখলুকাতকে তিনি ক্ষমা করে দিবেন। শুধু মুশরিক ও হিংসা-বিদ্বেষকারী ব্যতীত। অপর এক রিওয়ায়েতে বর্ণিত রয়েছে, হিংসা-বিদ্বেষকারী ও হত্যাকারী ব্যতীত।” (ইবনে মাজাহ শরীফ, আহমদ শরীফ, মিশকাত শরীফ)

উপরোক্ত হাদীছ শরীফ সমূহের সংক্ষিপ্ত বিষয় বস্তু হলো, রাত্রিতে ইবাদত-বন্দেগী করতে হবে এবং দিনে রোযা রাখতে হবে। যার মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক তিনি বান্দাকে ক্ষমা করে স্বীয় সন্তুষ্টি দান করবেন।

বরাতের রাত্রিতে যে ইবাদত করতে হবে তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হলো-

বরাতের নামায পড়বে

কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ উনাতে শবে বরাত উপলক্ষ্যে নির্দিষ্ট কোন নামায বা ইবাদতের কথা উল্লেখ নেই। তবে শবে বরাতে ৪, ৬, ৮, ১০, ১২ রাকায়াত নফল নামায পড়া যেতে পারে।

ছলাতুত তাসবীহ নামায পড়বে

অতঃপর ছলাতুত তাসবীহ-এর নামায পড়বে, যার দ্বারা মানুষের সমস্ত গুণাহ-খতা ক্ষমা হয়।

তাহাজ্জুদ নামায পড়বে

অতঃপর তাহাজ্জুদের নামায পড়বে, যা দ্বারা মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্য হাছিল হয়।

কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করবে

কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করবে, যার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তায়ালা উনার সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। কেননা নফল ইবাদতের মধ্যে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত হচ্ছে আফজাল।

মীলাদ শরীফ ও দরূদ শরীফ পাঠ করবে

মীলাদ ও দরূদ শরীফ পাঠ করবে, যার দ্বারা মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।

যিকির-আযকার করবে

যিকির-আযকার করবে, যার দ্বারা দিল ইছলাহ হয়।

কবর জিয়ারত করবে

কবরস্থান জিয়ারত করবে, যার দ্বারা সুন্নত আদায় হয়। তবে কবর বা মাযার শরীফ যিয়ারত করতে গিয়ে সারা রাত্র ব্যয় করে দেয়া জায়েয হবেনা। সুন্নত আদায়ের লক্ষ্যে নিকটবর্তী কোন কবরস্থান করে চলে আসবে।

দান ছদকা করবে

গরীব-মিসকীনকে দান-ছদকা করবে ও লোকজনদের খাদ্য খাওয়াবে, যার দ্বারা হাবীবুল্লাহ হওয়া যায়।

হালুয়া রুটি তৈরি করা জায়েয

উল্লেখ্য, শবে বরাতে হালুয়া- অথবা অন্য কোন বিশেষ খাবার তৈরি করা শরীয়তে নাজায়েয নয়। শ’বে বরাত উপলক্ষ্যে বিশেষ করে আমাদের দেশ ও তার আশ-পাশের দেশসমূহে যে রুটি হালুয়ার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে তার পিছনে ইতিহাস রয়েছে।

ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে, পূর্ববর্তী যামানায় যখন বর্তমানের মতো বাজার, বন্দর, হোটেল-রেস্তরা ইত্যাদি সর্বত্র ছিলনা। তখন মানুষ সাধারণতঃ সরাইখানা, লঙ্গরখানা, মুছাফিরখানা ইত্যাদিওত ছফর অবস্থায় প্রয়োজনে রাত্রিযাপন করতেন। অর্থাৎ মুছাফিরগণ তাদের ছফর অবস্থায় চলার পথে আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিত জনের ঘর-বাড়ি না পেলে সাধারণঃ সরাইখানা, মুছাফিরখানা ও লঙ্গরখানায় রাত্রিযাপন করতেন। আর এ সমস্ত মুছাফিরখানা, লঙ্গরখানা ও সরাইখানার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত থাকতেন তারাই মুছাফিরদের খাবারের ব্যবস্থা করতেন।

বিশেষ করে মুছাফিরগণ শ’বে বরাতে যখন উল্লিখিত স্থানসমূহে রাত্রি যাপন করতেন তাদের মধ্যে অনেকেই রাত্রিতে ইবাদত-বন্দেগী করতেন ও দিনে রোযা রাখতেন। যার কারণে উল্লিখিত স্থানসমূহের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিগণ খাবারের ব্যবস্থা করতেন যাতে মুছাফিরদের রাত্রে ইবাদত-বন্দেগী করতে ও দিনে রোযা রাখতে অসুবিধা না হয়।

আর যেহেতু হালুয়া-রুটি ও গোশত-রুটি খাওয়া সুন্নত সেহেতু তারা হালুয়া-রুটি বা গোশত-রুটির ব্যবস্থা করতেন।

এছাড়াও আরবীয় এলাকার লোকদের প্রধান খাদ্য রুটি-হালুয়া বা রুটি-গোশত। তারা ভাত, মাছ, ইত্যাদি খেতে অভ্যস্ত নয়। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে শ’বে বরাত উপলক্ষ্যে হালুয়া রুটির প্রচলন আমাদের দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

উল্লেখ্য, প্রত্যেক আমলের ক্ষেত্রেই বদ রছম বা বদ প্রথার অনুসরণ করা জায়েয নেই।

এখন মাসয়ালা হচ্ছে- কেউ যদি শ’বে বরাত উপলক্ষ্যে রছম রেওয়াজ না করে বা নিজের ইবাদত-বন্দেগীর ব্যাঘাত না ঘটিয়ে উক্ত হালুয়া-রুটির ব্যবস্থা করে তাহলে তা অবশ্যই জায়েয।

শুধু তাই নয় বরং যদি কেউ তার নিজের ইবাদত-বন্দেগী ঠিক রেখে অন্যান্যদের জন্য যারা রাত্রিতে ইবাদত-বন্দেগী করবে ও দিনে রোযা রাখবে তাদের ইবাদত-বন্দেগী ও রোযা পালনের সুবিধার্থে হালুয়া-রুটি বা গোশত-রুটি অথবা আমাদের দেশে প্রচলিত খাদ্যসমূহের কোন প্রকারের খাদ্যের ব্যবস্থা করে তা অবশ্যই নেকীর কারণ হবে।

হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

عن عبد الله بن سلام قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم يا ايها الناس افشوا السلام واطعموا الطعام وصلوا الارحام وصلوا بالليال والنيام تدخلوا الجنة بسلام.

অর্থ: “হযরত আব্দুল্লাহ বিন সালাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, হে লোক সকল! তোমরা সালামের প্রচলন কর, মানুষকে খাদ্য খাওয়াও, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা কর এবং মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন নামায পড় তাহলে শান্তির সাথে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।” (তিরমিযী, ইবনে মাযাহ, দারিমী)

তবে সতর্ক থাকতে হবে যে এই কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে যাতে এমন পরিশ্রম তথা এমন সময় ব্যয় না হয় যাতে করে কারো শবে বরাতের ইবাদতে ঘাটতি হয়। আরো উল্লেখ্য যে, খাদ্য বিতরণ যেন আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে বরং এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন অভাবগ্রস্তদের প্রাধান্য দেয়া হয়।

দোয়া-ইস্তিগফার করবে

মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট দোয়া করবে, যার কারণে মহান আল্লাহ পাক তিনি খুশি হবেন ও উনার নিয়ামত লাভ হবে। আর সর্বশেষ খালিছ ইস্তিগফার ও তওবা করবে, যার মাধ্যমে বান্দাহর সমস্ত গুণাহ-খতা মাফ হয়ে মহান আল্লাহ পাক উনার খালিছ সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। অর্থাৎ শ’বে বরাতের বারাকাত, ফুয়ুজাত, নিয়ামত, রহমত, মাগফিরাত ও নাযাত ইত্যাদি হাছিল করা যায়।

স্মর্তব্য যে, অনেক স্থানে দেখা যায় যে, তারা ছুবহে সাদিকের পর আখিরী মুনাজাত করে থাকে। মূলতঃ মুনাজাত যে কোন সময়েই করা যায়। তবে বরাতের রাত্রে দোয়া কবুল করার যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা ছুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্তই। এরপর বরাতের রাত্র অবশিষ্ট থাকেনা। কেননা, হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে স্পষ্টই বলা হয়েছে যে, حتى يطلع الفجر.

অর্থ: “ফজর বা ছুবহে ছাদিক পর্যন্ত মহান আল্লাহ পাক দোয়া কবুল করেন।”

অতএব, সকলের উচিৎ মূল বা আখিরী মুনাজাত ছুবহে সাদিকের পূর্বেই করা।

{দলীলসমূহ : (১) তাফসীরে কুরতুবী (২) মাযহাবী (৩) রুহুল বয়ান (৪) রুহুল মায়ানী (৫) খাযেন (৬) বাগবী (৭) তিরমিযী (৮) ইবনে মাজাহ (৯) আহমদ (১০) রযীন (১১) মিশকাত (১২) মিরকাত (১৩) আশয়াতুল লুময়াত (১৪) লুময়াত (১৫) ত্বীবী (১৬) ত্বালীক (১৭) মুযাহিরে হক্ব ইত্যাদি।}

মুহম্মদ আবু ইয়াকুব ইসহাক

সভাপতি- ছাত্র আনজুমানে আল বাইয়্যিনাত, শেরপুর।

সুওয়াল : “ছলাতুত তাছবীহ” নামাযের ফযীলত ও নিয়ম জানতে বাসনা রাখি।

জাওয়াব : “ছলাতুত তাছবীহ” নামাযের বহু ফযীলত হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে। যেমন, হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

عن ابن عباس ان النبى صلى الله عليه وسلم قال للعباس بن عبد المطلب يا عباس يا عماه الا اعطيك الا امنحك الا اخبرك الا افعل بك عشر خصال اذا انت فعلت ذلك غفر الله لك ذنبك اوله واخره قديمه وحديثه خطأه وعمده صغيره وكبيره سره وعلانيته ان تصلى اربع ركعات …….. ان استطعت ان تصليها فى كل يوم مرة فافعل فان لم تفعل ففى كل جمعة مرة فان لم تفعل ففى كل سنة مرة فان لم تفعل ففى عمرك مرة.

অর্থ: “হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত। একদা রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি (আমার পিতা) হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে বলেন, “হে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! হে আমার চাচা! আমি কি আপনাকে দিবনা, আমি কি আপনাকে দান করবোনা, আমি কি আপনাকে বলবোনা, আমি কি আপনার সাথে করবোনা দশটি কাজ? (অর্থাৎ শিক্ষা দিবনা দশটি তাসবীহ) যখন আপনি তা আমল করবেন, মহান আল্লাহ পাক আপনার প্রথম গুণাহ, শেষ গুণাহ, পুরাতন গুণাহ, নতুন গুণাহ, অনিচ্ছাকৃত গুণাহ, ইচ্ছাকৃত গুণাহ, ছোট গুণাহ, বড় গুণাহ, গোপন গুণাহ, প্রকাশ্য গুণাহ ইত্যাদি সকল গুণাহ-খতা ক্ষমা করে দিবেন। আপনি (ছলাতুত তাছবীহ-এর) চার রাকায়াত নামায পড়বেন। …. যদি সম্ভব হয় তবে প্রতিদিন একবার এ নামায আপনি পড়বেন। যদি সম্ভব না হয় তবে সপ্তাহে একবার তাও যদি সম্ভব না হয় তবে বৎসরে একবার, তাও যদি সম্ভব না হয় তবে জীবনে অন্তত একবার এ নামায আপনি পড়বেন।” (আবূ দাউদ শরীফ, ইবনে মাযাহ শরীফ, বায়হাকী ফী দাওয়াতিল কবীর শরীফ, তিরমিযী শরীফ, মিশকাত শরীফ)

আর ‘ছলাতুত তাছবীহ’ নামাযের নিয়ম সম্পর্কে কিতাবে দু’টি মত উল্লেখ আছে। একটি হানাফী মাযহাব অনুযায়ী অপরটি শাফিয়ী মাযহাব অনুযায়ী।

এখানে আমাদের হানাফী নিয়মটিই উল্লেখ করা হলো-

প্রথমতঃ এই বলে নিয়ত করবে যে, “আমি ছলাতুত তাছবীহ-এর চার রাকায়াত সুন্নত নামায ক্বিবলামুখী হয়ে আদায় করছি।”

অতঃপর তাকবীরে তাহরীমা বেঁধে ছানা পাঠ করবে, ছানা পাঠ করে সূরা ক্বিরয়াত পাঠ করার পূর্বেই ১৫ বার নি¤েœাক্ত তাছবীহ পাঠ করবে।

سبحان الله والحمد لله ولا اله الا الله والله اكبر.

উচ্চারণ : “সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।”

অতঃপর সূরা ক্বিরয়াত পাঠ করে রুকুতে যাওয়ার পূর্বে ১০ বার উক্ত তাছবীহ পাঠ করবে। রুকুতে গিয়ে রুকুর তাছবীহ পাঠ করার পর ১০ বার উক্ত তাছবীহ পাঠ করবে। রুকু থেকে উঠে সিজদায় যাওয়ার পূর্বে দাঁড়িয়ে ১০ বার উক্ত তাছবীহ পাঠ করবে। অতঃপর সিজদায় গিয়ে সিজদায় তাছবীহ পাঠ করে ১০ বার উক্ত তাছবীহ পাঠ করবে। সিজদার থেকে উঠে দ্বিতীয় সিজদায় যাওয়ার পূর্বে বসে ১০ বার উক্ত তাছবীহ পাঠ করবে। অতঃপর দ্বিতীয় সিজদায় গিয়ে সিজদা তাছবীহ পাঠ করে ১০ বার উক্ত তাছবীহ পাঠ করবে। অর্থাৎ এরূপভাবে প্রতি রাকায়াত ৭৫ বার উক্ত তাছবীহ পাঠ করবে।

অতঃপর পরবর্তী রাকায়াতের জন্য দাঁড়াবে। দাঁড়িয়ে প্রথমেই ১৫ বার উক্ত তাছবীহ পাঠ করবে। তারপর প্রথম রাকায়াতের মতই উক্ত তাছবীহ গুলো আদায় করবে। অর্থাৎ চার রাকায়াত নামাযে মোট ৩০০ বার উক্ত তাছবীহ পাঠ করবে।

জরুরী মাসয়ালা

“ছলাতুত তাছবীহ” নামায আদায়কালীন হাতে তাছবীহ নিয়ে ছলাতুত তাছবীহ-এর নামাযের তাছবীহগুলো গণনা করা মাকরূহ। অঙ্গুলী টিপে টিপে তাছবীহগুলো গণনা করতে হবে।

কোন স্থানে তাছবীহ পড়তে ভুলে গেলে পরবর্তী তাছবীহ পাঠের সময় তা আদায় করে নিতে হবে। তবে শর্ত হচ্ছে ক্বওমা ও জলসায় উক্ত তাছবীহ আদায় করা যাবেনা। যেমন, সূরা ক্বিরয়াত পাঠের পূর্বে তাছবীহ ভুলে গেলে তা ক্বিরয়াতের পর আদায় করতে হবে। ক্বিরয়াতের পর তাছবীহ ভুলে গেলে রুকুতে আদায় করতে হবে। রুকুতে তাছবীহ ভুলে গেলে উক্ত তাছবীহ ক্বওমায় আদায় না করে প্রথম সিজদাতে গিয়ে আদায় করতে হবে। ক্বওমায় তাছবীহ ভুলে গেলে তাও প্রথম সিজদাতে গিয়ে আদায় করতে হবে। প্রথম সিজদাতে তাছবীহ ভুলে গেলে তা জলসায় আদায় না করে দ্বিতীয় সিজদাতে গিয়ে আদায় করতে হবে। জলসায় তাছবীহ ভুলে গেলে তাও দ্বিতীয় সিজদায় আদায় করতে হবে। আর দ্বিতীয় সিজদাতে তাছবীহ ভুলে গেলে সূরা-ক্বিরয়াত পাঠ করার পূর্বে আদায় করে নিতে হবে। আর ভুলে যাওয়া তাছবীহ প্রত্যেক স্থানে ছলাতুত তাছবীহ-এর নির্ধারিত তাছবীহ পাঠ করার পর পাঠ করতে হবে।

{দলীলসমূহ : (১) আবু দাউদ শরীফ (২) ইবনে মাজাহ শরীফ (৩) বায়হাক্বী শরীফ (৪) তিরমিযী শরীফ (৫) মিশকাত শরীফ (৬) বযলুল মাজহুদ শরীফ (৭) আওনুল মা’বুদ শরীফ (৮) তুহফাতুল আহওয়াযী শরীফ (৯) মা’য়ারিফুস সুনান শরীফ (১০) মিরকাত শরীফ (১১) লুময়াত শরীফ (১২) আশয়াতুল লুময়াত শরীফ (১৩) শরহুত ত্বীবী শরীফ (১৪) তা’লীকুছ ছবীহ শরীফ (১৫) মুজাহিরে হক্ব শরীফ (১৬) ফতহুল ক্বাদীর শরীফ (১৭) বাহরুর রায়েক শরীফ (১৮) মারাকিউল ফালাহ শরীফ (১৯) আলমগীরী শরীফ (২০) শরহে বিক্বায়া শরীফ (২১) হিদায়া শরীফ (২২) আইনুল হিদায়া শরীফ ইত্যাদি।}

আলহাজ্জ মুহম্মদ ইসহাক ওয়াইজঘাট, ঢাকা।

সুওয়াল : শবে বরাতে ইবাদতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে সারা রাত্র ওয়াজ মাহফিল করা শরীয়ত সম্মত কিনা?

কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে জাওয়াব দিয়ে ফিৎনা নিরসনে সাহায্য করবেন বলে আমরা আশাবাদী।

জাওয়াব : শবে বরাত হচ্ছে- ইসলামের বিশেষ রাত্রিসমূহের মধ্যে একটি রাত্র। যা শা’বানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত্রিতে হয়ে থাকে। “শ’বে বরাত” এর অর্থ হচ্ছে, “মুক্তির রাত্র” বা “না’যাতের রাত্র।”

এ রাতে ওয়াজ নছীহত করার আদেশও নেই। আবার নিষেধও করা হয়নি। তবে এ রাতে দোয়া কবুল করার ও ইবাদত বন্দেগী করার কথাই হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ব্যক্ত হয়েছে। যেমন আখিরী নবী, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন,

ان الدعاء يستجاب فى خمس ليال اول ليلة من رجب وليلة النصف من شعبان وليلة القدر المباركة وليلتى العيدين.

অর্থ: “নিশ্চয়ই পাঁচ রাত্রিতে দোয়া নিশ্চিতভাবে কবুল হয়ে থাকে। (১) রজব মাসের প্রথম রাতে (২) শবে বরাতের রাতে (৩) ক্বদরের রাতে (৪) ঈদুল ফিতরের রাতে (৫) ঈদুল আযহার রাতে।” (মাসাবাতা বিস সুন্নাহ, আমালুল ইয়াত্তমি ওয়াল লাইলা)

তাই হাদীছ শরীফ উনার মধ্যেও উক্ত রাতে ইবাদত বন্দেগী দোয়া ও তাওবা-ইস্তিগফার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে,

عن على رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا كانت ليلة النصف من شعبان فقوموا ليلها وصوموا يومها فان الله تعالى ينزل فيها لغروب الشمس الى السماء الدنيا فيقول الا من مستغفر فاغفرله الا مسترزق فارزقه الا مبتلى فاعافيه الا كذا الا كذا حتى يطلع الفجر.

অর্থ: “হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু উনার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যখন শা’বানের ১৫ তারিখ রাত্রি উপস্থিত হবে তখন তোমরা উক্ত রাত্রিতে নামায আদায় করবে এবং দিনে রোযা রাখবে। কেননা নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি উক্ত রাত্রিতে সর্যাস্তের সময় পৃথিবীর আকাশে আসেন, অতঃপর ঘোষণা করেন, “কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছ কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দিব।” “কোন রিযিক প্রার্থনাকারী আছ কি? আমি তাকে রিযিক দান করব।” “কোন মুছিবতগ্রস্থ ব্যক্তি আছ কি? আমি তার মুছিবত দূর করে দিব।” এভাবে ফযর বা ছুবহে সাদীক পর্যন্ত ঘোষণা করতে থাকেন।” (ইবনে মাজাহ শরীফ, মিশকাত শরীফ)

উক্ত হাদীছ শরীফ উনার ব্যাখ্যায় ইমাম-মুজতাহিদগণ উনারা বলেন যে,

ليلة العفو والكرم-ليلة التوبة والندم- ليلة الذكر والصلوة-ليلة الصدقات والخيرات- ليلة الدعاء والزيارة-ليلة الصلاة على النبى صلى الله عليه وسلم وليلة التلاواة القران.

অর্থ: “বরাতের রাত্র হলো ক্ষমা ও দয়ার রাত্র, তওবা ও লজ্জিত হওয়ার রাত্র, যিকির ও নামাযের রাত্র, ছদক্বা ও খয়রাতরে রাত্র, দোয়া ও যিয়ারতের রাত্র, দরূদ শরীফ তথা ছলাত-সালাম পাঠ করার রাত্র এবং কুরআন শরীফ তিলাওয়াতের রাত্র।”

কাজেই বরাতের রাতে যেহেতু ওয়াজ নছীহতের আদেশও করা হয়নি এবং নিষেধও করা হয়নি, তাই মুছল্লীদেরকে বরাতের ফযীলত ও ইবাদত বন্দেগীর নিয়ম-নীতি, তর্জ-তরীক্বা বাতিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত ওয়াজ-নছীহত করা জায়েয বটে। তা বলে, সারা রাত্র ওয়াজ করে মুছল্লীদেরকে নামায, তিলাওয়াত, যিকির-আযকার ইত্যাদি ইবাদত বন্দেগী হতে মাহরূম করা কখনোই শরীয়ত সম্মত নয়। বরং হাদীছ শরীফ উনার খিলাফ। শুধু তাই নয় এতে হক্কুল ইবাদ নষ্ট করা হয়। আর হক্কুল ইবাদ নষ্ট করা কবীরা গুণাহর অন্তর্ভুক্ত।

কারণ ওয়াজ বৎসরের যে কোন দিনেই করা যায়। কিন্তু বরাতের রাত্র বৎসরে মাত্র একবারই পাওয়া যায়। যদি কেউ পরবর্তী বৎসর হায়াতে থাকে তবেই সে বরাতের রাত্র পাবে। কাজেই এই মহামূল্যবান রাত্রকে শুধুমাত্র ওয়াজ করে ও শুনে খতম করে দেয়া সুন্নতের খিলাফ।

আর সুন্নতের খিলাফ কাজ করে মহান আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার রেজামন্দী বা সন্তুষ্টি কস্মিনকালেও হাছিল করা সম্ভব নয়।

মূলকথা হলো, বরাতের রাত্র মূলতঃ ইবাদত-বন্দেগীর রাত্র, সারা রাত্র ওয়াজ করে ইবাদত বন্দেগীতে বিঘœ ঘটানো এবং মানুষদেরকে ইবাদত থেকে মাহরূম করা সর্ম্পূণই শরীয়তের খিলাফ। এ ধরণের কাজ থেকে বেঁচে থাকা সকলের জন্যেই দায়িত্ব ও কর্তব্য।

{দলীলসমূহ : (১) আহকামুল কুরআন জাসসাস শরীফ (২) কুরতুবী শরীফ (৩) রুহুল মা’য়ানী শরীফ (৪) রুহুল বয়ান শরীফ (৫) ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন শরীফ (৬) কিমিয়ায়ে সা’য়াদাত শরীফ (৭) ইবনে মাজাহ শরীফ (৮) মিশকাত শরীফ (৯) মাসাবাতা বিস সুন্নাহ শরীফ (১০) মিরকাত শরীফ (১১) আশয়াতুল লুময়াত শরীফ (১২) লুময়াত শরীফ (১৩) শরহুত ত্বীবী শরীফ (১৪) তালিকুছ ছবীহ (১৫) মুযাহিরে হক্ব (১৬) মাসাবাত বিস সুন্নাহ শরীফ (১৭) আমালুল ইয়াউমি ওয়াল লাইলা ইত্যাদি।}

মুহম্মদ তাজুল ইসলাম, কাউনিয়া ডিগ্রী কলেজ, রংপুর।

সুওয়াল : রমযান মাস আসলেই কেউ কেউ পেপার-পত্রিকায় ও প্রচার মাধ্যমে প্রচার করে থাকে যে, “রোযা অবস্থায় ইনজেকশন এমনকি স্যালাইন ইনজেকশন নিলেও রোযা ভঙ্গ হয়না।”

এখন আমার সুওয়াল হলো- তাদের উক্ত বক্তব্যের স্বপক্ষে নির্ভরযোগ্য কোন দলীল আছে কি?

জাওয়াব যারা বলে থাকে যে, “রোযা অবস্থায় ইনজেকশন বা স্যালাইন ইনজেকশন নিলেও রোযা ভঙ্গ হয়না” তাদের এ বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল ও জিহালতপূর্ণ। কেননা, তারা তাদের উক্ত বক্তব্যের স্বপক্ষে নির্ভরযোগ্য একটি দলীলও পেশ করতে পারবেনা। পক্ষান্তরে রোযা অবস্থায় যে কোন ইনজেকশন নিলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে এ ফতওয়াটিই ছহীহ ও গ্রহণযোগ্য। কারণ এর স্বপক্ষে ফিক্বাহ ও ফতওয়ার নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের অসংখ্য দলীল বিদ্যমান রয়েছে।

যেমন, “হেদায়া মা’য়াদ দেরায়া” কিতাবের ১ম খণ্ডের ২২০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ومن احتقن …. افطر لقوله صلى الله عليه وسلم الفطر مما دخل.

অর্থ: “এবং যদি কোন ব্যক্তি ইনজেকশন নেয় …. তাহলে রোযা ভঙ্গ হবে। কারণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেন, “কিছু ভিতরে প্রবেশ করলে রোযা ভঙ্গ হবে।”

“বাহরুর রায়েক” কিতাবের ২য় খণ্ডের ২৭৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

واذا احتقن …. افطر لقوله عليه السلام الفطر مما دخل وليس مما خرج.

অর্থ: “যদি কোন ব্যক্তি ইনজেকশন নেয় …. তাহলে রোযা ভঙ্গ হবে। কারণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেন, কিছু ভিতরে প্রবেশ করলে রোযা ভঙ্গ হবে এবং বের হলে রোযা ভঙ্গ হবেনা।”

“ফতওয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবের ১ম খণ্ডের ২০৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, ومن احتقن … افطر.

অর্থ: “এবং যদি কোন ব্যক্তি ইনজেকশন নেয় ….. তাহলে রোযা ভঙ্গ হবে।” অনুরূপ “ফতওয়ায়ে শামীতে” ও উল্লেখ আছে।

অতএব, উপরোক্ত দলীলভিত্তিক আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, ইনজেকশন নিলে রোযা ভঙ্গ হবে।

{বিঃ দ্রঃ এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে, মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ২১, ২২, ৪৬ ও ৪৭তম সংখ্যা পাঠ করুন।}

{দলীলসমূহ : (১) বুখারী শরীফ (২) মুসলিম শরীফ (৩) মিশকাত শরীফ (৪) ফতহুল বারী শরীফ (৫) উমদাতুল ক্বারী শরীফ (৬) ইরশাদাহ ছারী শরীফ (৭) শরহে নব্বী শরীফ (৮) ফতহুল মুলহিম শরীফ (৯) মুফহিম শরীফ (১০) মিরকাত শরীফ (১১) আশয়াতুল লুময়াত শরীফ (১২) লুময়াত শরীফ (১৩) শরহুত ত্বীবী শরীফ (১৪) তালিকুছ ছবীহ শরীফ (১৫) মুযাহিরে হক্ব শরীফ (১৬) মি… (১৭) মাবছুত লি সারাখসী শরীফ (১৮) ফতহুল ক্বাদীর শরীফ (১৯) আলমগীরী শরীফ (২০) বাহরুর রায়েক্ব শরীফ (২১) ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া শরীফ (২২) হেদায়া মায়াদ দেরায়া শরীফ (২৩) শামী শরীফ (২৪) বাদায়েউছ ছানায়ে শরীফ (২৫) খুলাছাতুল ফতওয়া শরীফ (২৬) Biopharmaceuties & Semisolids Chapter from the theory and practice of Industrial Pharmacy by leon Lachman/Herbert. A. Lieberman/Joseph L. Kanig. (২৭) Guyton’s medical physiology. (২৮) Remington’s pharmaceutical. (২৯) Goodman Gilman pharmacology. (৩০ Cunningham’s manuals of practical anatomy (৩১) Martindate Extra Pharmacopoeia. ইত্যাদি।

মাওলানা মুহম্মদ আবুল হাসান, মাদারটেক, ঢাকা।

সুওয়াল : আমরা ওলামায়ে দেওবন্দের অনেক কিতাবেই দেখতে পাই যে, তারা ফতওয়ার দিয়েছে- “তারাবীহর নামাযে বা অন্যান্য সময়ে কুরআন শরীফ খতম করে উজরত বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা হারাম।”

এখন আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে যে, উলামায়ে দেওবন্দের উপরোক্ত ফতওয়া কতটুকু গ্রহণযোগ্য, দয়া করে বিস্তারিত জানাবেন।

জাওয়াব : কুরআন শরীফ খতম বা তিলাওয়াত করে উজরত গ্রহণ করা সম্পর্কিত উলামায়ে দেওবন্দের উক্ত ফতওয়া অসম্পূর্ণ ও অশুদ্ধ। কারণ উজরত গ্রহণ করা শর্ত সাপেক্ষে জায়েয, আবার শর্ত সাপেক্ষে নাজায়েয। অর্থাৎ সময় অথবা স্থান নির্ধারণ করে দেয়া হলে, কুরআন শরীফ খতম বা তিলাওয়াত করে উজরত গ্রহণ করা জায়েয। আর সময় অথবা স্থান নির্ধারণ করা না হলে, উজরত গ্রহণ করা জায়েয নেই। এর উপরই উলামায়ে মুতাআখখেরীনগণ উনাদের ফতওয়া এবং এটাই গ্রহণযোগ্য ও ফতওয়াগ্রাহ্য মত। যেমন, ফিক্বাহর বিখ্যাত কিতাব “বাহরুর রায়েকে” উল্লেখ আছে,

ان الفتى به جواز الاخذ على القرائة.

অর্থ: “নিশ্চয়ই কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করে উজরত গ্রহণ করা জায়েয হওয়া ফতওয়াগ্রাহ্য মত।”

বিঃ দ্রঃ এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে, মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ২৩ ও ২৪তম সংখ্যা পাঠ করুন। সেখানে ৫১টি নির্ভর যোগ্য কিতাবের দলীল পেশ করা হয়েছে।

{দলীলসমূহ : (১) বাহরুর রায়েক শরীফ (২) আলমগীরী শরীফ (৩) তাতারখানিয়া শরীফ (৪) ফতওয়ায়ে আযীযী শরীফ (৫) দুররুল মখতার শরীফ (৬) আশবাহু ওয়ান নাজায়ের শরীফ (৭) ফতওয়ায়ে আলী আফেন্দী শরীফ (৮) জাওহারাতুন নাইয়্যারাহ শরীফ (৯) কাশফুল গুম্মাহ শরীফ (১০) ফতওয়ায়ে ফয়জী শরীফ (১১) তাফসীরে আযীযী শরীফ (১২) তাফসীরে ইকলীল ইত্যাদি।}

সাইয়্যিদ মুহম্মদ মোক্তাদুল ইসলাম (মিলন)

রঈসুল মজলিশ- ছাত্র আনজুমানে আল বাইয়্যিনাত

সুবহানী ঘাট, সিলেট।

সুওয়াল রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্র ডিসেম্বর/২০০০ ঈসায়ী সংখ্যায় “তাফসীরে রুহুল বয়ান শরীফ, বুখারী শরীফ, গুনিয়াতুত তালেবীন, রেজভীয়া” কিতাবের বরাত দিয়ে বলেছে, “সহীহ মুসলিম শরীফসহ” অনেক নির্ভরযোগ্য কিতাবে নফল নামায বিশেষতঃ ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামাত সহকারে আদায় করা বৈধ ….।”

আর আপনারা “মাসিক আল বাইয়্যিনাতে” লিখেছেন, “তারাবীহ, ছলাতুল কুছুফ (সূর্য গ্রহণের নামায), ছলাতুল ইস্তেফা (বৃষ্টির নামায) এই তিন প্রকার নামায ব্যতীত যেমন লাইলাতুল ক্বদর, লাইলাতুল বরাত, তাহাজ্জুদ, চাশত, আওয়াবীন ইত্যাদি নফল নামায সমূহ ইমামের সাথে চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহরীমী ও বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহ।” কোনটি সঠিক?

আর “বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ” কি “ক্বদর” ও বরাতের” নফল নামায জামায়াতের সাথে আদায় করার কথা উল্লেখ আছে? দয়া করে জানাবেন।

জাওয়াব : রেযাখানীরা তাদের মুখপত্রে “তাফসীরে রুহুল বয়ান শরীফ, বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, গুনিয়াতুত তালেবীন এবং রেজভীয়া” কিতাবের বরাত দিয়ে নফল নামায বিশেষতঃ “শবে বরাত”, “শবে ক্বদরের” নফল নামায আযান-ইক্বামত ছাড়া জামায়াত সহকারে আদায় করা যে বৈধ বলেছে, তা “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর বিগত সংখ্যাগুলোতে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে প্রমাণ করা হয়েছে যে, “তাদের বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল, জিহালতপূর্ণ, জালিয়াতী ও প্রতারণামূলক।”

কেননা, রেযাখানীরা কিতাবের নাম দিয়ে যে বক্তব্য প্রদান করেছে, আসলে উক্ত কিতাবসমূহের বক্তব্য সে রকম নয়। বরং তার সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ, তারা কিতাবের ইবারত, সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে মনগড়া বক্তব্য প্রদান করেছে এবং ক্ষেত্র বিশেষ নিজের ভ্রান্ত মতকে টিকিয়ে রাখতে কিতাবের ইবারত কারচুপি করেছে।

(ধারাবাহিক)

বর্তমান সংখ্যায় রেযাখার ইবারত কারচুপির বিষয় পর্যালোচনা করা হলো-

উল্লেখ্য, রেযাখানীরা “শবে বরাত, শবে ক্বদেরর রাতের আযান ও ইক্বামত ছাড়া নফল নামায বিশেষতঃ শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াত সহকারে আদায় করা মাকরূহ তানযীহী বলে, রেযাখার লিখিত “রেজভীয়া” কিতাবের বরাত দিয়েছে।”

অথচ “ফতওয়ায়ে রেজভীয়ার” উক্ত বক্তব্য এক্ষেত্রে মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ রেযা খা তার ভ্রান্ত মতকে ছাবেত করার উদ্দেশ্যে “রদ্দুল মুহতারে” বর্ণিত বিতর নামাযের বর্ণনাকে শবে বরাত, শবে ক্বদর, তাহাজ্জুদ ইত্যাদি নামাযের ক্ষেত্রে দলীল হিসেবে বর্ণনা করে চরম প্রতারণা করেছে। শুধু তাই নয় বরং ক্ষেত্র বিশেষে সে “রদ্দুল মুহতারের” মূল ইবারতও কাট-ছাট করেছে।

যেমন, রেযা খা “রদ্দুল মুহতারের” বর্ণিত বিতর নামায জামায়াতে আদায় করা সম্পর্কিত ইবারত গুলো কারচুপি করে তার লিখিত “রেজভীয়া” কিতাবে এভাবে উল্লেখ করেছে,

উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অথচ হিলইয়া কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে মূল “রদ্দুল মুহতার” কিতাবে যে ইবারতগুলো উল্লেখ আছে তাতে বলা হয়েছে যে, “হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি রমযান মাস ব্যতীত অন্য সময় অর্থাৎ হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনার দাফনের রাত্রিতে বিতর নামায জামায়াতের সাথে পড়েছেন।”

অথচ রেযা খা হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার বিতর নামায জামায়াতে আদায় করা সম্পর্কিত ইবারতগুলো কারচুপি করে তার লিখিত “রেজভীয়া” কিতাবে উল্লেখ করেনি।

মূল “রদ্দুল মুহতার” কিতাবের ২য় খণ্ডের ৪৮ পৃষ্ঠার যে ইবারতগুলো রেযা খা কারচুপি করেছে তাহলো-

فى الحلية بما اخرجه الطحاوى عن المسور بن مخرمة قال دفنا ابا بكر رضى الله تعالى عنه ليلا فقال عمر رضى الله تعالى منه انى لم أوتر فقال وصفنا وراءه فصلى بنا ثلاث ركعات لم يسلم الا فى اخرهن ثم قال وبمكن ان يقال الظاهر ان الجماعة فيه غير مستحبة ……..

অর্থাৎ- “হিলইয়া কিতাবে উল্লেখ আছে, যেটা ইমাম ত্বহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মিসওয়ার ইবনে মাখরামা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন- আমরা হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনাকে রাত্রে দাফন করলাম। অতঃপর হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বললেন, আমি (এখনও) বিতর নামায পড়িনি। অতঃপর তিনি (অর্থাৎ হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বিতর নামায পড়ার জন্য) দাঁড়ালেন এবং আমরাও উনার পিছনে কাতার করে দাঁড়ালাম। এরপর তিনি আমাদেরকে নিয়ে তিন রাকায়াত বিতর নামায পড়ে শেষে সালাম ফিরালেন। প্রকাশ থাকে যে, নিশ্চয়ই বিতর নামায জামায়াতে পড়া মুস্তাহাব নয়।”

উপরোক্ত বর্ণনা থেকে সুস্পষ্টভাবে এটাই প্রমাণিত হলো যে, “আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন, হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু রমযান মাস ব্যতীত অন্য সময় অর্থাৎ আফযালুন নাস বা’দাল আম্বিয়া, নবীদের পরে শ্রেষ্ঠ মানুষ, হযরত আবু বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনার দাফনের রাত্রিতে বিতর নামায জামায়াতের সাথে আদায় করেছেন।”

আর এরই উপর ভিত্তি করে বলা হয়েছে যে, “রমযান মাস ব্যতীত অন্য সময় কোন ঘটনাক্রমে বা অনিচ্ছাসত্ত্বেও হঠাৎ করে যদি বিতর নামায জামায়াতে আদায় করা হয় যেমন, আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন, হযরত উমর বিন খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি করেছিলেন, তাহলে সেটা মুবাহ হবে। মাকরূহ তাহরীমী হবে না। তবে মাকরূহ তানযীহী।”

অথচ রেযা খা মাকরূহ তানযীহী বলে উপরোল্লিখিত বিতর নামায সম্পর্কিত ইবারত গুলো কারচুপি করে, তার “রেজভীয়া” কিতাবে উল্লেখ না করে বিতর নামাযকে অন্যান্য নফলের সাথে মিলিয়ে দিয়েছে। আর রেযা খার অন্ধ অনুসারীরা মূল “রদ্দুল মুহতার” কিতাবের ইবারত না দেখে, রেযা খার প্রতি অন্ধবিশ্বাস রেখে “মাকরূহ তাহরীমী হবেনা” বলে বিতর নামাযকে শবে বরাত, শবে ক্বদরের নামাযের সাথে মিলিয়ে দিয়ে রেযা খার যোগ্য শাগরিদের পরিচয় দিয়েছে। (চলবে)

মাওলানা মুহম্মদ আখলাখুর রহমান

রাজারহাট, কুড়িগ্রাম।

সুওয়াল : হাটহাজারী মাদরাসা থেকে প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকার সেপ্টেম্বর/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসা-সমাধান বিভাগে নি¤েœাক্ত জিজ্ঞাসা-সমাধান ছাপা হয়।

জিজ্ঞাসা : আযানে “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ” ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলার সময় আঙ্গুলে চুমু খেয়ে চোখ মুছন করা কি?

সমাধান : …… নির্ভরযোগ্য কোন হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত নয়। ……. এজন্য ইবাদত মনে করে যদি এটা করা হয়, তাহলে বিদআত হিসেবে গণ্য হবে। “….. তাফসীরে জালালাইন শরীফ উনার টীকায় বর্ণিত হাদীছ শরীফটি বিশুদ্ধ নয়, বরং এটি মাওজু তথা জাল ও বানোয়াট ….. যা শরীয়তের দৃষ্টিতে আমলযোগ্য নয়।”

আর মাসিক মদীনা আগস্ট/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যার প্রশ্নোত্তর বিভাগে নি¤েœাক্ত প্রশ্নোত্তর ছাপা হয়।

প্রশ্ন : আযানের সময় “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহা” বলার পর জবাবে সকলেই দুরূদ শরীফ (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পড়ে থাকি। অনেকেই আবার দু’হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলী একত্রিত করে প্রথমে নখের উপর চুমু খায় এবং পরে এই দুই বৃদ্ধাঙ্গুলীর নখ দ্বারা চক্ষুদ্বয় মোচন করে নেয়। শরীয়ত অনুযায়ী কোনটি সহীহ?

উত্তর : আযানে ……. সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র নাম শোনার পর দরূদ শরীফ পড়া জরুরী। দুই হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলী একত্রিত করে আঙ্গুলের অগ্রভাগে চুমো খাওয়া এবং চোখে লাগানো কোন সহীহ বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত নয়। এক শ্রেণীর লোক এই আমলকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু যেহেতু এ আমল বেদাআতপন্থীদের আমলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাই এরূপ না করা উত্তম।

এখন আমার সুওয়াল হলো- হাটহাজারী মুখপত্র ও মাসিক মদীনার উপরোক্ত বক্তব্যদ্বয় সঠিক হয়েছে কি? দয়া করে নির্ভরযোগ্য দলীল-আদিল্লাহসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব : হাটহাজারীর মুখপত্র ও মাসিক মদীনার উক্ত বক্তব্যদ্বয় সঠিক হয়নি। বরং তা সম্পূর্ণই ভুল, মনগড়া, জিহালপূর্ণ ও দলীলবিহীন হয়েছে।

উল্লেখ, কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে এ প্রকার অজ্ঞ লোকদের নিকট সূক্ষ্মা ও জ্ঞানমূলক মাসয়ালা জিজ্ঞেস করা নিষেধ। আর এদেরকে এ প্রকার মাসয়ালা জিজ্ঞেস করাও জ্ঞানী লোকদের লক্ষণ নয়।

কাজেই মূর্খ লোককে কোন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তার জবাব যেমন হওয়া দরকার এখানেও ঠিক তাই হয়েছে।

যেমন, হাটহাজারীর মূখপত্র ও মাসিক মদীনায় লিখেছে, “আযানে …… চুমু খেয়ে চোখে লাগানো নির্ভরযোগ্য কোন হাদীছ দ্বারা বা সহীহ বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত নয়।”

এর জবাবে বলতে হয় যে, তাদের বক্তব্যই প্রমাণ করে যে, তারা হাদীছ শরীফ ও তার উছূল সম্পর্কে নেহায়েতই অজ্ঞ।

কেননা, আযানে আঙ্গুলে চুমু খেয়ে চোখে লাগানো সম্পর্কিত হাদীছ শরীফখানা ছহীহ, মারফু, মাওকুফ, জঈফ সব ধরণের সনদে বর্ণিত রয়েছে। অথচ তারা অন্যান্য বর্ণনাগুলো এড়িয়ে হীন উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে শুধুমাত্র নির্ভরযোগ্য বা ছহীহ নয় বলে উল্লেখ করেছে।

যেমন, ফিক্বাহর বিখ্যাত ও মাশহুর কিতাব “মারাকিউল ফালাহ” কিতাবের ১৩৭ পৃষ্ঠায় হাদীছ শরীফ উনার কিতাব “দায়লামী” শরীফ উনার বরাত দিয়ে উক্ত হাদীছ শরীফখানা মারফু হিসেবে উল্লেখ আছে,

وذكر الديلمى فى الفردوس من حديث ابى بكر رضى الله عنه مرفوعا من مسح العين بباطن انملة السبابتين بعد تقبيلهما عند قول المؤذن اشهد ان محمدا رسول الله وقال اشهد ان محمدا عبده ورسوله ……. حلت له شفاعتى.

অর্থ: “ইমাম দায়লামী রহমতুল্লাহি আলাইহি (উনার বিখ্যাত ও মাশহুর হাদীছ শরীফ উনার কিতাব) “ফিরদাউস লিদ দায়লামীতে” হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনার মারফূ হাদীছ উল্লেখ করেন যে, “যে ব্যক্তি মুয়াজ্জিনের আযানের সময় ‘মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ’ শুনে শাহাদাত অঙ্গুলি দু’টির ভিতরের দিকে চুম্বন করে চোখে বুছা দিবে, তার জন্য আমার সুপারিশ ওয়াজিব।”

এছাড়াও হযরত ইমাম ছাখাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “মাকাসিদুল হাসানা” কিতাবে, হযরত মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “মাওযুআতুল কবীর” কিতাবে এবং হযরত মুহম্মদ ফাত্তানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “মাজমাউল বিহার” কিতাবে “আযানের সময় অঙ্গুলী চুম্বন করা সম্পর্কিত হাদীছ শরীফ উনাকে মারফু হিসেবে ছঞীহ বলে উল্লেখ করেছেন।”

মুফতিয়্যুল আ’যম হযরত আমীমুল ইহসান মুজাদ্দিদী আল বরকতী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “ফতওয়ায়ে বরকতিয়া” কিতাবে এ হাদীছ শরীফ উনাকে “মাওকুফ” হিসেবে ছহীহ বলে উল্লেখ করেন।

অতএব, উপরোক্ত বর্ণনা ছাড়াও যদি হাদীছ শরীফখানাকে জঈফ হিসেবেও ধরে নেয়া হয়, তবুও এরা দ্বারা উক্ত আমল বিদয়াত প্রমাণিত হয়না। কারণ শরীয়তের কোথাও এ কথা উল্লেখ নেই যে, কোন বিষয়ে ছহীহ হাদীছ শরীফ উনার প্রমাণ না থাকলেই তা বিদয়াত। বরং শরীয়তের বিধান হলো, যে সকল বিষয় ছহীহ হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমানিত নয় বরং জঈফ হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমানিত, সে সকল বিষয়ও ফযীলত লাভের উদ্দেশ্যে আমল করা বিদয়াত নয় বরং জায়েয ও মুস্তাহাব।

এ প্রসঙ্গে ফিক্বাহের বিশ্ব বিখ্যাত বিতাব “ফতহুল ক্বাদীর” কিতাবে উল্লেখ আছে,

الاستحباب يثبت بالضعيف.

অর্থ: “জঈফ হাদীছ শরীফ দ্বারা মুস্তাহাব প্রমাণিত হয়।” কাজেই যেখানে আযানের সময় বৃদ্ধাঙ্গুলিদ্বয় চুম্বন করা আফজালুন্নাছ বা’দাল আম্বিয়া, (নবী উনাদের নবী পরে শ্রেষ্ঠ মানুষ) হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম উনার সুন্নত বলে প্রমানিত। শুধু তাই নয় বরং হাদীছ শরীফখানাও ছহীহ।

অতএব, প্রমানিত হলো যে, “আযানের সময় চোখে বুছা দেয়া সুন্নতে ছাহাবা যা মুস্তাহাব; জায়েয তো বটেই।”

দ্বিতীয়ত : হাটহাজারীর মুখপত্রে লিখেছে, “ইবাদত মনে করে যদি এটা করা হয় তাহলে বিদয়াত হিসেবে গণ্য হবে।”

আর মাসিক মদীনা লিখেছে “যেহেতু এ আমল বেদআতপন্থীদের আমলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ তাই এরূপ না করা উত্তম।”

আশ্চর্যের বিষয়! যে আমল বিশুদ্ধ হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত ও সুন্নাতে ছাহাবা সে আমল কি করে বিদয়াত হতে পারে। আর তা কিভাবে বিদয়াতী পন্থিদের আমলের অনুরূপ হতে পারে? সুন্নাতে ছাহাবা সম্পর্কে এ ধরণের বক্তব্য কুফরীর শামীল।

তৃতীয়ত : হাটহাজারীর মুখপত্রে লিখেছে, “এতদ্বসংক্রান্ত তাফসীরে জালালাইন শরীফ উনার টীকায় বর্ণিত হাদীছটি বিশুদ্ধ নয়, বরং এটি মওজু তথা জাল ও বানোয়াট বলে প্রমাণিত যা শরীয়তের দৃষ্টিতে আমলযোগ্য নয়।”

এর জবাবে বলতে হয় যে, তাদের উক্ত বক্তব্যও ডাহা মিথ্যা ও দলীলবিহীন। কারণ আযানে আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলার সময় আঙ্গুলে চুমু খেয়ে চোখে লাগানো সম্পর্কিত হাদীছ শরীফ উনাকে “তাফসীরে জালালাইন শরীফ উনার” হাশিয়ায় (টীকায়) মাওজু তথা জাল ও বানোয়াট বলা হয়নি এবং “তাফসীরে জালালাইন শরীফ উনার” হাশিয়ায় মাওজু তথা জাল ও বানোয়াট বলে কোন শব্দই উল্লেখ নেই। বরং “তাফসীরে জালালাইন শরীফ উনার” হাশিয়ায় আযানে আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলার সময় অঙ্গুলী চুম্বন করে চোখে লাগানো মুস্তাহাব বলা হয়েছে।

যেমন, “তাফসীরে জালালাইন শরীফ উনার” ৩৫৭ পৃষ্ঠার ১৩ নং হাশিয়ায় উল্লেক আছে,

اعلم انه يستحب ان يقال عند سماع الولى من الشهادة الثانية صلى الله عليك يا رسول الله وعند سماع الثانية قرة عينى بك يا رسول الله ثم يقال اللهم متعنى بالسمع والبصر بعد وضع ظفر الابهامين على العينين فانه صلى الله عليه وسلم قأئدله الى الجنة.

অর্থ: “জেনে রাখ! আযানের সময় শাহাদাতে ছানিয়া অর্থাৎ আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ প্রথমবার শুনে “ছল্লাল্লাহু আলাইকা ইয়া রসূলাল্লাহ” বলা এবং উক্ত শাহাদাতের বাক্য দ্বিতীয়বার শুনে “কুররাতু আইনী বিকা ইয়া রসূলাল্লাহ” বলঅ মুস্তাহাব।

অতঃপর বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখ চুম্বর করে চোখের উপর রেখে “আল্লাহুমা মাত্তি’নী বিসসাময়ী ওয়াল বাছার” বলা মুস্তাহাব। এরূপ আমলকারীকে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিজে বেহেশতে নিযে যাবেন।” সুবহানাল্লাহ!

উল্লেখ্য যে, “তাফসীরে জালালাইন শরীফ উনার মধ্যে” এটাও উল্লেখ আছে যে, “আমলের ক্ষেত্রে জঈফ হাদীছ শরীফ দলীল হিসেবে গ্রহণ করা জায়েয।” এমতটিকেই অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ ছহীহ বা বিশুদ্ধ বলেছেন।

যেমন, “তাফসীরে জালালাইন শরীফ উনার” উক্ত পৃষ্ঠার হাশিয়ায় উল্লেখ আছে,

قد صح من العلماء تجويز الاخذ بالحديث الضعيف فى العمليات.

অর্থাৎ “আমলের ক্ষেত্রে জঈফ হাদীছ শরীফ উনাকে গ্রহণ করা জায়েয। এ মতটিকে অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণ ছহীহ বা বিশুদ্ধ বলেছেন। কিন্তু এরপরেও কিছু কিছু লোক তাদের কিল্লতে ইলমের কারণে, স্বল্পজ্ঞানের কারণে, বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।”

যেমন, “তাফসীরে জালালাইন শরীফ উনার” ৩৫৭ পৃষ্ঠার ১৩ নং হাশিয়ার পরিশেষে বলা হয়েছে, لان بعض الناس ينازع فيه لقلة علمه.

অর্থাৎ “কিছু কিছু লোক তাদের ক্বিল্লতে ইলমের কারণে এ ব্যাপারে অর্থাৎ আযানে অঙ্গুলী চুম্বন করে চোখে লাগানোর ব্যাপারে বিতর্কের সৃষ্টি করে।”

পরিশেষে হাটহাজারীর মুখপত্রে লিখেছে, “যা শরীয়তের দৃষ্টিতে আমলযোগ্য নয়।”

তাদের এ বক্তব্যও কুফরীমূলক। কারণ যে আমল বিশুদ্ধ হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমানিত ও সুন্নাতে ছাহাবা সে আমল সম্পর্কে কি করে বলঅ যেতে পারে যে, তা শরীয়তের দৃষ্টিতে আমলযোগ্য নয়। শরীয়ত বলতে কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসকে বুঝায়। আর আযানে অঙ্গুলী চুম্বন করার বর্ণনাটি যদিও কুরআন শরীফ উনার মধ্যে প্রত্যক্ষভাবে উল্লেখ নেই কিন্তু পরোক্ষভাবে তা উল্লেখ আছে।

যেমন, মহান আল্লাহ পাক তিনি কুরআন শরীফ উনার “পবিত্র সূরা আহযাবের ৫৬নং” আয়াত শরীফ উনার মধ্যে বলেন,

ان الله ومكئكته يصلون على النبى يايها الذين امنوا صلوا عليه وسلموا تسليما.

অর্থ: “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক ও উনার ফেরেশতাগণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি ছলালত পাঠ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও উনার প্রতি ছলাত-সালাম পাঠ কর।”

এ আয়াত শরীফ উনার তাফসীরে, “তাফসীরে রুহুল বয়ানের” ৭ম খণ্ডের ২২৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থ: “মুহীত কিতাবে উল্লেখ আছে যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মসজিদে তাশরীফ এনে একটি স্তম্ভের নিকট বসেছিলেন, উনার পাশে হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম তিনিও বসেছিলেন। এর মধ্যে হযরত বিলাল রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি আযান মুরু করেছিলেন, যখন

اشهد ان محمدا رسول الله.

(আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ)

উচ্চারণ করলেন তখন হযরত আবূ বরক ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম তিনি আপন বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ের নখ চুম্বন করে আপন দু’চোখের উপর রেখে বললেন, قرة عينى بك يا رسول الله. (কুররাতু আইনী বিকা ইয়া রসূলাল্লাহ)

অর্থ: “হে রসূল রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি আমার চোখের মণি।”

হযরত বিলাল রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার আযান শেষ হওয়ার পর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, “হে আবূ বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম! আপনি যা করেছেন, যে ব্যক্তি তদ্রুপ করবে, মহান আল্লাহ পাক তিনি তার সমূদয় গুণাহ মাফ করে দিবেন।” সুবহানাল্লাহ!

এছাড়াও অনুসরণীয় ও বিশ্বখ্যাত বহু ইমাম-মুজতাহিদ ও আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের স্ব-স্ব কিতাবে “আযানের মধ্যে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নাম মুবারক শুনে বৃদ্ধাঙ্গুলী চুম্বন করে চোখে বুছা দেয়ার আমলকে মুস্তাহাব বলে ফতওয়া দিয়েছেন।”

আর আযানে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র নাম মুবারক শুনে বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয় চুম্বন করে চোখে লাগানোর ফযীলত সম্পর্কে বর্ণিত হাদীছ শরীফখানা নি¤েœ পেশ করা হলো-

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من سمع اسمى فى الاذان و وضع ابهاميه على عينيه فانا طالبه فى صفوف القيامة وقائده الى الجنة.

অর্থ: সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি আযানের সময় আমার নাম গুনলো এবং তার উভয় অঙ্গুলী দু’চোখের উপর রাখল, আমি তাকে ক্বিয়ামতের দিন কাতারের মধ্যে তালাশ করবো এবং তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাবো।” (সুবহানাল্লাহ) (ছালাতে নখশী)

সুতরাং উপরোক্ত দলীলভিত্তিক আলোচনা থেকে এটাই প্রমাণিত হলো যে, আযানে আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তথা আখিরী রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র নাম মুবারক শুনে বৃদ্ধাঙ্গুলী চুম্বন করে চোখে লাগানো শরীয়তের দৃষ্টিতেই সুন্নতে ছাহাবা যা আমলযোগ্য, জায়েয, মুস্তাহাব ও ফযীলত, বুযুর্গী এবং মর্যাদা লাভের কারণ।

আর সেই সাথে এটাও প্রমাণিত হলো যে, হাটহাজারীর মুখপত্র ও মাসিক মদীনার বক্তব্য ভুল, অশুদ্ধ, বিভ্রান্তিকর ও দলীলবিহীন।

(বিঃদ্রঃ বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত পত্রিকার ১ম বর্ষ ৩য় সংখ্যার “অঙ্গুলী চুম্বনের বিধান ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে ফতওয়া” পাঠ করুন।)

{দলীলসমূহ : (১) তাফসীরে জালালাইন (২) তাফসীরে রুহুল বয়ান (৩) শরহে নেকায়া (৪) মাজমাউল বিহার (৫) ফতওয়ায়ে শামী (৬) মাযমুয়ায়ে ফতওয়া (৭) ফতওয়ায়ে খাজানাতুর রেওয়ায়েত (৮) ফতওয়ায়ে সিরাজুম মুনীর (৯) ফতওয়ায়ে মিফতাহুল যিনান (১০) ফতওয়ায়ে ছিদ্দীকিয়া (১১) ফতওয়ায়ে বরকতিয়া (১২) মাকাসিদুল হাসানা (১৩) এয়ানাতুত তালেবীন আলা হল্লে আলফায়ে ফাতহিল মুবীন (১৪) কেফায়াতুত তালেবীর রব্বানী লি রিসালতে আবি যায়িদিল কায়রুয়ানী (১৫) মুনিরুল আইন ফী তাকবীলুল ইবহামাইন (১৬) নাহজুসসালামাহ ফী তাকবীলিল ইবহামাইনে ফিল ইক্বামা (১৭) ছালাতে নকশী (১৮) হুজ্জাতুল্লাহি আলাল আলামীন (১৯) কুওয়াতুল কুলুব (২০) কিতাবুন নিয়ামুল ইনতিবাহ (২১) তরীকুল ইসলাম (২২) জা’আল হক্ব (২৩) জামিউল রুমুজ, কানযুল ইবাদ (২৪) শরহে কবীর (২৫) শরহে ইলিয়াছ ইত্যাদি।}

মুহম্মদ শাহিনুর রহমান, রামপুরা, ঢাকা।

সুওয়াল : ঢাকা মুহম্মদপুর জামিয়া রাহমানিয়া থেকে প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকা অক্টোবর/২০০১ ঈসায়ী সংখ্যার জিজ্ঞাসার-জবাব বিভাগে এক জিজ্ঞাসার জবাবে বলা হয়েছে “যদি নিষিদ্ধ ছবি পায়ের তলে অথবা নামাযীর পিছনের দিকে থাকে তাহলে নামায আদায়ে কোন মাকরূহ হবেনা।”

এখন আমার সুওয়াল হলো- ছবি সম্পর্কে অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি? আর সত্যিই কি নামাযির পিছনে ছবি থাকলে নামায মাকরূহ হবে না? দলীল-আদিল্লাহসহ সঠিক জাওয়াব জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াব : নামাযীর পিছনে ছবি থাকা সম্পর্কে অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়নি; বর ভুল ও অশুদ্ধ হয়েছে। কারণ নামাযীর পিছনে ছবি থাকলে নামায মাকরূহ তাহরীমী হবে।

যেমন, “হিদায়া” কিতাবের ১ম খণ্ডের ১৪২/১৪৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ويكره أن يكون فوق رأسه فى السقف او بين يديه او بحذائه تصاوير اوصورة معلقة ….. واشدها كراهة أن تكون امام المصلى ثم من فوق رأسه ثم على يمينه ثم على شماله ثم خلفه.

অর্থ: “নামায মাকরূহ তাহরীমী হবে যদি নামাযীর মাথার উপর, ছাদের মধ্যে অথবা সামনে অথবা জুতার মধ্যে অথবা ঝুলন্ত অবস্থায় প্রাণীর ছবি থাকে। … এবং নামায শক্ত মাকরূহ হবে যদি প্রাণীর ছবি নামাযীর সামনে বা মাথার উপরে বা ডানে বা বাঁয়ে বা নামাযীর পিছনে থাকে।”

“বাহরুর রায়েক” কিতাবের ২য় খণ্ডের ২৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

واشدها كراهة ……… مايكون خلفه.

অর্থ: “এবং নামায শক্ত মাকরূহ তাহরীমী হবে যদি প্রাণীর ছবি … নামাযীর পিছনে থাকে।”

“ফতওয়ায়ে আলমগীরী” কিতাবের ১ম খণ্ডের ১০৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

وأشدها كراهة أن تكون أمام المصلى ثم فوق رأسه ثم يمينه ثم يساره ثم خلفه.

অর্থ: “এবং নামায শক্ত মাকরূহ তাহরীমী হবে যদি প্রাণীর ছবি নামাযীর সামনে বা মাথার উপরে বা ডানে বা বাঁয়ে বা নামাযীর পিছনে থাকে।”

“কিতাবুল ফিক্বহে আলাল মাযাহিবিল আরবায়া” কিতাবের ১ম খণ্ডের ১৭৮ পৃষ্ঠায় উল্লেক আছে,

واشدها كراهة ما كانت امامه ثم فوقه ثم يمينه ثم يساره ثم خلفه.

অর্থ: “এবং নামায শক্ত মাকরূহ তাহরীমী হবে প্রাণীর ছবি নামাযীর সামনে বা উপরে বা ডানে বা বায়ে বা নামাযীর পিছনে থাকলে।”

কিতাবে আরো উল্লেখ আছে,

উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থ: “প্রাণীর ছবিযুক্ত কাপড় পরিধান করে নামায পড়া মাকরূহ তাহরীমী। নামাযের বাইরেও উক্ত কাপড় পরিধান করা নাজায়েয। এবং প্রাণীর ছবি নামাযীর মাথার উপর ছাদের মধ্যে অথবা ঝুলন্ত অবস্থায় অথবা সিজদার স্থানে থাকলে নামায মাকরূহ তাহরীমী হবে। এবং নামাযীর সামনে, ডানে, বাঁয়ে এবং পিছনে প্রাণীর ছবি থাকলেও নামায মাকরূহ তাহরীমী হবে।” (ফতওয়ায়ে আব্দুল হাই, নুরুল হিদায়া, সুন্নী বেহেস্তী জেওর, আহসানুল মাসায়েল, রোকনুদ্দীন, আইনুল হিদায়া, ইলমুল ফিক্বাহ, বাহারে শরীয়ত, ফতওয়ায়ে দারুল উলূম দেওবন্দ, আশ্রাফী বেহেস্তী জেওর, ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া, তরীকুল ইসলাম, নুরুল ইজাহ, গায়াতুল আওতার ইত্যাদি।)

উপরোক্ত বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হলো, নামাযীর পিছনে ছবি থাকলে নামায মাকরূহ তাহরীমী হবে। শুধু তাই নয় ছবিযুক্তস্থানে নামায পড়লে নামায মাকরূহ তাহরীমী হবে এবং উক্ত নামায দোহরানো ওয়াজিব।

যেমন, “আহসানুল ফতওয়ার” ৩য় খণ্ডের ৪২৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থ: “প্রাণীর ছবিযুক্ত স্থানে নামায পড়া মাকরূহ তাহরীমী এবং উক্ত নামায দোহরানো ওয়াজিব। কেননা আলমগীরী, ফতহুল কাদীর কিতাবে মাকরূর বয়ানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নামাযের মধ্যে মাকরূহ তাহরীমী হলে নামায দোহরানো ওয়াজিব, আর মাকরূহ তানজীহ হলে নামায দোহরানো মুস্তাহাব।”

অতএব, উপরোক্ত দলীলভিত্তিক আলোচনা দ্বারা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্টভাবে এটাই প্রমাণিত হলো- নামাযীর পিছনে ছবি থাকলে নামায মাকরূহ তাহরীমী হবে এবং উক্ত নামায দোহরিয়ে পড়া ওয়াজিব হবে।

সুতরাং কোন নামাযীর নামায আদায় কালে পিছনের দিকে ছবি থাকলে নামায মাকরূহ হবে না এ বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে ভুল, বিভ্রান্তিকর শরীয়তের খিলাফ বলে প্রমানিত হলো।

{দলীলসমূহ : (১) হেদায়া, (২) বাহরুর রায়েক্ব (৩) আলমগীরী (৪) কাফী (৫) মাবছূত লিস সুরুখসী (৬) ফতহুল ক্বাদীর (৭) কিতাবুল ফিক্বাহ আলাল মাযাহিবিল আরবায়া (৮) আইনী শরহে হিদায়া (৯) শরহে বিকায়া (১০) শরহুন নিকায়া (১১) মারাক্বিউল ফালাহ (১২) আল জামিউছ ছগীর (১৩) নূরুল হিদায়া (১৪) ফতওয়ায়ে হিন্দিয়া, (১৫) গায়াতুল আওতার (১৬) হাশিয়ায়ে তাহতাবী (১৭) নুরুল ইজাহ (১৮) মালাবুদ্দা মিনহু (১৯) ফতওয়ায়ে আব্দুল হাই (২০) সুন্নী বেহেশতী জেওর (২১) আইনুল হিদায়া (২২) ইলমুল ফিক্বাহ (২৩) বাহরে শরীয়ত (২৪) আহসানুল মাসায়িল (২৫) রুকনুদ্দীন (২৬) তরীকুল ইসলাম (২৭) ফতওয়ায়ে দারুল উলূম দেওবন্দ (২৮) আশ্রাফী বেহেশতী জেওর (২৯) আহসানুল ফতওয়া ইত্যাদি।}

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ