-হযরত মাওলানা মুফ্তী মুহম্মদ আব্দুল হালীম
৩৩। স্বীয় পীর ছাহেবের নিকট কখনো কারামত দেখতে চাইবেনা। যেহেতু কোন মু’মিন কোন নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের নিকট হতে মু’যিযা দেখতে চাননি। (মাকতুবাতে ইমামে রব্বানী ২য় খন্ড/৩০৬ পৃষ্ঠা)
যারা হাক্বীক্বী মুরীদ তারা কখনো স্বীয় পীর ছাহেবের নিকট হতে কারামত দেখতে চাননা এবং কারামত প্রকাশিত হওয়ার প্রয়োজনও অনুভব করেননা। কারণ তাদের উদ্দেশ্য কারামত বা অলৌকিক ঘটনা নয় বরং তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হচ্ছে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মা’রিফাত-মুহব্বত, রেযামন্দী হাছিল করা।
উল্লেখ্য যে, কাফির-মুশরিক ও মুনাফিকরাই সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট ঈমান গ্রহণ তথা নুবুওওয়াতের সত্যতা প্রমাণের জন্য মু’যিযাকে শর্তারোপ করতো। সেক্ষেত্রে অসংখ্য-অগণিত মু’যিযাও প্রকাশিত হয়েছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা ঈমান গ্রহণ করেনি। বরং তাঁর প্রতি শত্রুতার মাত্রা আরো বহু গুণে বৃদ্ধি করে দিয়েছিলো।
সেটাই আল্লাহ্ পাক বলেছেন,
ولواننا نزلنا اليهم الملئكة وكلمهم الموتى وحشرنا عليهم كل شىء قبلا ماكانوا ليؤمنوا الا ان يشاء الله ولكن اكثرهم يجهلون.
অর্থঃ- “আমি যদি তাদের নিকট ফেরেশ্তাগণকে প্রেরণ করতাম এবং তাদের সাথে মৃত্যুব্যক্তিরা কথা-বার্তা বলতো কিংবা সব বস্তুকে তাদের সামনে জীবিত করে দিতাম তথাপি আল্লাহ্ পাক যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত তারা কখনও বিশ্বাস স্থাপন করবেনা; আর তাদের অধিকাংশই মূর্খ।” (সূরা আন্য়াম/১১১)
বিশ্বাস স্থাপন তথা নুবুওওয়াতের সত্যতা প্রমাণের জন্য নবী-রসূলগণের নিকট মু’যিযা প্রার্থনা করা যেমন মূর্খতা তেমনি আল্লাহ্ পাক-এর মা’রিফাত-মুহব্বত হাছিলের পথযাত্রীগণের জন্য স্বীয় পীর ছাহেবের কারামত তালাশ করাও জিহালতি বা মূর্খতারই নামান্তর। কেননা ওলী হওয়ার জন্য কারামত শর্ত নয় এবং অলৌকিকতা জাহির হওয়ার জন্য ওলী হওয়া শর্ত নয়। কারণ আউলিয়া-ই-কিরাম ব্যতীত যাদের দ্বারা অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয় তাকে কারামত বলা হয়না। বরং তাকে বলা হয় এস্তেদ্রাজ।
তবে আউলিয়া-ই-কিরামগণের জীবনে কারামত প্রকাশিত হবেনা তা নয়। প্রত্যেক আউলিয়া-ই-কিরামগণের জীবনে কম-বেশী অনেক কারামতই ঘটে থাকে যা তাদের মর্যাদা-মর্তবা, বুযুর্গী-সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। তবে আউলিয়া-ই-কিরামগণ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেন না। বরং সর্বদা গোপন রাখাই সমীচিন মনে করেন। অধিকন্ত একে গাইরুল্লাহ্র অন্তর্ভূক্ত বলে অভিহিত করে থাকেন। ইমামুল আইম্মা, মুহ্ইস্ সুন্নাহ্, কুতুবুল আলম, মুজাদ্দিদুয্ যামান, সাইয়্যিদুল মুজতাহিদীন, গাউসুল আজম, ইমামুশ্ শরীয়ত ওয়াত্ তরীক্বত, আওলাদুর রসূল, রাজারবাগ শরীফের হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী এ ব্যাপারে একদা জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন, “রিয়াজত-মুশাক্কাত করে করে অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ যারা কাশ্ফ, কারামত হাছিলের দিকে নজর দিয়েছে তারা সফলতা লাভ করতে পারেনি।”
পূর্ববর্তী আউলিয়া-ই-কিরামগণ এরূপ শিক্ষাই দিয়েছেন। কাশ্ফ কারামত ইত্যাদির প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে শরীয়ত তথা সুন্নতের প্রতি গভীর মনোযোগী হওয়াই আবশ্যক।
তাজুল উলামা ওয়াল মাশায়িখ, আল্লামা আবূ বকর শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহি, যিনি চল্লিশ হাজার হাদীস শরীফ মুখস্ত করেছিলেন। চারশত উস্তাদের নিকট হতে ইল্মের সনদপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তিনি ইল্মে ফিক্বাহ্ শিক্ষা সমাপনান্তে পূর্ণতা হাছিলের জন্য তদানিন্তন সময়ে আল্লাহ্ পাক-এর মূল লক্ষ্যস্থল সাইয়্যিদুত্ ত্বয়েফা, সুলতানুল মাশায়িখ, বুরহানুল আশিকীন, ইমামুশ্ শরীয়ত ওয়াত্ ত্বরীকত আল্লামা হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর দরবার শরীফে গমন করেন। দীর্ঘ দশ দিন তথায় অবস্থানের পর একদা তাঁর সামানা (আসবাবপত্র) নিয়ে যখন আসতে উদ্যত হলেন তখন সাইয়্যিদুত্ ত্বয়েফা হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মুবারক দৃষ্টি তার প্রতি নিবদ্ধ হলো। স্নেহপূর্ণ মধুর কক্তে জিজ্ঞেস করলেন, “কি হে! আবু বকর শিবলী! কোথায় যাচ্ছ?” জাওয়াবে তাজুল উলামা উয়াল মাশায়িখ হযরত আবূ বকর শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “হুজুর! বেয়াদবীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি! ইল্মে তাছাউফ হাছিলের জন্য আপনার দরবার শরীফে এসেছিলাম। সে লক্ষ্যে দশ দিন অতিবাহিত হলো; কিন্তু এ দশদিনে আপনার একটি কারামতও দৃষ্টিগোচর হলোনা। তাই ফিরে যাওয়াই সমীচিন মনে করলাম।”
সাইয়্যিদুত্ ত্বয়েফা রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “হে আবূ বকর শিবলী! তুমি এ যুগের প্রসিদ্ধ আলিমে দ্বীন, তাই না? লোকে তোমাকে শ্রেষ্ঠ আলিম মনে করে? বলতো এ দশ দিনে আমাকে সুন্নতের খেলাফ কোন আমল করতে দেখেছ কি?” তাজুল উলামা ওয়াল মাশায়িখ রহমতুল্লাহি আলাইহি কিছুক্ষণ নিরব রইলেন অতঃপর বললেন, “জ্বি-না, সত্যি আপনাকে দশদিনে সুন্নতের খেলাফ কোন আমল করতে দেখিনি।” তখন তিনি বললেন, “ইহাই হচ্ছে আমার কারামত।” (সুবহানাল্লাহ্)
সাইয়্যিদুত্ ত্বয়েফা, সুলতানুল মাশায়িখ রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর খাছ ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহ্ পতিত হলো, ইমামুল আইম্মা, আল্লামা হযরত আবূ বকর শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর উপর। অন্তরের যবনিকাগুলো অপসারিত হলো। নতুন দিগন্তের সূচনা হলো। তাঁর অন্তর চক্ষু খুলে গেল। নিজেকে সপে দিলেন সাইয়্যিদুত্ ত্বয়েফা রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট। অতঃপর তওবা পড়ে বাইয়াত গ্রহণ করে সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভূক্ত হলেন। (তাযকেরাতুল আউলিয়া)
সুতরাং কারামত-কাশ্ফ ইত্যাদি দুনিয়াবী বিষয়গুলোর দিকে লক্ষ্য রাখা কিংবা কার কত কাশ্ফ-কারামত হাছিল হলো বা হলোনা অথবা ওলী হলে কারামত নেই কেন? এসব প্রশ্ন উত্থাপন করা উচিত নয়।
ইমামে রব্বানী, গাউসে সামদানী, আফজালুল আউলিয়া, হাবীবুল্লাহ্, কাইয়্যূমে আউয়াল, বদ্রুদ্দীন শায়খ আহমদ ফারুকী সেরহিন্দী, মুজাদিদ্দে আল্ফে ছানী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর সমীপে তার এক মুরীদ মুহম্মদ সাদীক কাশ্মীরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তৎকালীন আউলিয়া-ই-কিরামগণের “কারামতের” বিষয়টি সম্পর্কে নিবেদন করেছিলেন। তার জাওয়াবে ইমামে রব্বানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “তোমার এই প্রশ্নের উদ্দেশ্য যদি এ হয় যে, কারামত অল্প প্রকাশ হয় বলে এ জামানার বুযুর্গগণ বুযুর্গ নয়, যেরূপ তোমার ভাষায় প্রকাশ হয়েছে, তাহলে এরূপ শয়তানি প্রবঞ্চনা হতে আমি আল্লাহ্ পাক-এর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।” “ওলী” হওয়া জন্য কোন কারামত প্রকাশ হওয়ার শর্ত নয়। তবে নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের মু’যিযা তার বিপরীত। যেহেতু ইহা নুবুওওয়াতের মাকামের শর্ত। অবশ্য আউলিয়া-ই-কিরামগণ হতে বহু অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ হয়ে থাকে। কিন্তু অধিক কারামত প্রকাশ হওয়া শ্রেষ্ঠত্বের নির্দ্দেশক নয়। আল্লাহ্ পাক-এর নৈকট্যের আধিক্যই শ্রেষ্ঠত্বের কারণ। হয়তো অধিক নৈকট্যপ্রাপ্ত আউলিয়া-ই-কিরামগণের কারামত অল্প এবং তা হতে দূরবর্তী আউলিয়া-ই-কিরামগণের কারামত অধিক। এই উম্মতের অনেক আউলিয়া-ই-কিরাম হতে এত অধিক কারামত প্রকাশ হয়েছে যে, তার শত ভাগের এক ভাগও হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম হতে প্রকাশ হয়নি। অথচ ছাহাবীয়াতের মাকাম বেলায়েতের মাকামের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু মাকাম।
নুবুওওয়াত এবং বেলায়েতের ফয়েজের নূরাদি ঐ ব্যক্তিই অধিক প্রাপ্ত হবে যার মধ্যে অনুসরণ করার যোগ্যতা প্রবল আছে। ছিদ্দীকে আকবর হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক রদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর অনুসরণ যোগ্যতা প্রবল থাকা হেতু সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিশ্বাস করতে কোন “কারণের” মুখাপেক্ষী হননি পক্ষান্তরে অভিশপ্ত আবূ জাহিল উক্ত যোগ্যতার ন্যূততা বশতঃ এত অধিক মু’যিযা ও প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহ দেখেও নুবুওওয়াতে বিশ্বাসী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করতে পারেনি। আল্লাহ্ পাক হতভাগাদের সম্পর্কে বলেছেন, “এরা সর্বপ্রকারের নিদর্শন দেখলেও তাঁকে বিশ্বাস করবে না। এমনকি যে তারা আপনার নিকট এসে বিবাদ করতে থাকবে এবং উক্ত অবিশ্বাসীগণ বলবে যে, এটা পূর্ববর্তী মিথ্যা কাহিনী ব্যতীত আর কিছুই নয়।” (সূরা আনয়াম/২৫)
অধিকন্ত বলতে চাই যে, পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ হতে তাঁদের আজীবন কালে মাত্র পাঁচ কিংবা ছয় কারামতের অধিক কেউই বর্ণনা করেন নাই। সাইয়্যিদুত্ ত্বয়েফা হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমতুল্লাহি আলাইহি যিনি ছূফীগণের শীর্ষস্থানীয়, জানিনা যে, তাঁর থেকে দশটি অলৌকিক ঘটনা বর্ণিত আছে কিনা। আল্লাহ্ পাক স্বীয় কালামে পাকে হযরত মুসা আলাইহিস্ সালাম সম্পর্কে বর্ণনা করেন এভাবে, “নিশ্চয়ই আমি মূছা আলাইহিস্ সালামকে নয়টি প্রকাশ্য নিদর্শন প্রদান করেছি।” (সূরা বণি ইস্রাঈল/১০১)
আপনি কোথা হতে জানলেন, যে এ জামানার বুযুর্গগণের এরূপ কারামত প্রকাশ হয়না। বরং ওলী আল্লাহ্গণ পূর্ববর্তী হউক বা পরবর্তী হোক তাঁদের সকলের নিকট হতে প্রতি মুহুর্তেই কারামত প্রকাশ হচ্ছে। বিপক্ষগণ তা জানুক বা না জানুক।” (মাকতুবাত শরীফ/১-২৪০)
অর্থাৎ কারামত হচ্ছে হযরত আউলিয়া-ই-কিরামগণের সৌন্দর্যবর্ধক পোশাক। যা প্রত্যেকেই দয়াময় আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ হতে প্রাপ্ত হন। যার কিছু অংশ সাধারণ লোকের অনুধাবনে আসে আবার কিছু সর্ব সাধারণের অনুধাবন ক্ষমতা বহিঃর্ভূত। সুতরাং মুরীদের জন্য এটাই আদব বা শিষ্টতা যে, স্বীয় পীর ছাহেবের কারামত সম্পর্কে জানতে না চাওয়া। কেননা, কারামতের প্রয়োজন হলে তা প্রদর্শনের জন্য তিনিই অধিক অবগত।
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪২)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৩)
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২৬২)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৪)
ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৫)