ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য

সংখ্যা: বিবিধ | বিভাগ:

(ধারাবাহিক)

যেটা আল্লাহ্ পাক বলে দিয়েছেন কুরআন শরীফে,

يايها الذين امنوا لاتلهكم اموالكم ولا اولادكم عن ذكر الله ومن يفعل ذلك فاولئك هم الخسرون.

আল্লাহ্ পাক বলেন, “হে ঈমানদারগণ!

 لاتلهكم اموالكم ولا اولاذكم عن ذكر الله.

তোমাদের সন্তান, তোমাদের সম্পদ যেন আমার যিকির থেকে গাফিল করে না দেয়।

ومن يفعل ذلك فاولئك هم الخسرون.

যে সন্তানের জন্য বা সম্পদের জন্য আমার যিকির থেকে গাফিল হয়ে যাবে সে ক্ষতিগ্রস্থের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাবে।” (সূরা মুনাফিকূন/৯)

          সন্তানদের হক্ব যথাযথ আদায় করতে হবে। সন্তানের জন্য আল্লাহ্ পাক থেকে গাফিল হওয়া যাবেনা। আবার এমন সন্তান যার জন্য আল্লাহ্ পাক থেকে পিতা-মাতা গাফিল হয়ে যায়, তাহলে সেই সন্তানকেও সতর্ক করে দিতে হবে যেন, সন্তানের জন্য পিতা-মাতা আল্লাহ্ পাক থেকে গাফিল না হয়ে যায়।

          কাজেই সন্তানের দায়িত্ব হচ্ছে, পিতা-মাতাকে আল্লাহ্ পাক-এর ধ্যানে-খেয়ালে মশগুল থাকার জন্য ব্যবস্থা করা। আবার পিতারও দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে, সন্তানের জন্য পিতা নিজেও যেন গাফিল না হয়ে যায় এবং সন্তানও যেন আল্লাহ্ পাক থেকে গাফিল না হয়।

          এ প্রসঙ্গে বলা হয় যে, খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন, হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর খিলাফত কালে এক পিতা আসলেন। এসে একটা মামলা দায়ের করলেন। পিতা এসে কি মামলা দায়ের করলেন? মামলা হলো- পিতা বললো যে, “হে খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! আল্লাহ্ পাক কুরআন শরীফে, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হাদীস শরীফে সন্তানদেরকে আদেশ দিয়েছেন পিতার হক্ব আদায় করার জন্য। কিন্তু আমার সন্তান আমার কোন হক্ব আদায় করেনা। আমার সন্তান আমার কোনই হক্ব আদায় করেনা। কাজেই আমি তার বিরুদ্ধে আপনার কাছে মামলা দায়ের করলাম। আপনি এটার ব্যবস্থা করবেন।”

          পিতা মামলা দায়ের করা মাত্রই খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সে সন্তানকে ডেকে পাঠালেন। যখন সন্তানকে ডেকে পাঠানো হলো, সন্তান হাযির হলো। হাযির হওয়ার পরে হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, “হে সন্তান! তুমি তোমার পিতার হক্ব আদায় করনা কেন যথাযথভাবে? আল্লাহ্ পাক যে নির্দেশ দিয়েছেন, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল যে নির্দেশ দিয়েছেন সে অনুযায়ী তুমি কেন হক্ব আদায় করনা?” সন্তান বললো, “হে খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! আমার কিছু কথা আছে। অবশ্যই আমার অপরাধ হলে আমি শাস্তি গ্রহণ করবো, কোন অসুবিধা নেই। তবে আমারও কিছু কথা আছে।” হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, “কি কথা তোমার রয়েছে, বল!” তখন সে সন্তান বললো, “হে খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! প্রথম আমার জানার বিষয় হচ্ছে, সন্তানের প্রতি পিতার কি হক্ব রয়েছে? সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার কি হক্ব রয়েছে?” যখন এই প্রশ্ন করা হলো, তখন খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন হযরত উমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, “আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে দিয়েছেন যে, সন্তানের কতটুকু হক্ব। “পিতার প্রতি সন্তানের তিনটা হক্ব রয়েছে। কি হক্ব রয়েছে?

এক নাম্বার হচ্ছে, যে কোন পুরুষ, সে এমন মেয়ে বিয়ে করবে, যে মেয়েটা হচ্ছে পরহেযগার, দ্বীনদার, আল্লাহ্ওয়ালী।

          দুই নাম্বার হচ্ছে, সন্তান যখন জন্মগ্রহণ করবে তখন সে পিতা সন্তানের একটা শরীয়তসম্মত সুন্দর অর্থবোধক নাম রাখবেন।

          তৃতীয় নাম্বার হচ্ছে, সন্তান যখন বড় হবে তখন তাকে দ্বীনি ইল্ম তা’লিম দিবেন। এই তিনটা সন্তানের প্রাপ্য হক্ব পিতার কাছে।”

          যখন এটা বলা হলো, তখন সে সন্তান বললো যে, “আপনি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করুন, উনি আমার হক্ব আদায় করেছেন অথবা করেননি।” যখন হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সে পিতাকে ডেকে আনলেন যে, “তুমি তোমার ছেলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছ, এখন তোমার ছেলে তোমার বিরুদ্ধে বলেছে, তুমি তোমার সন্তানের হক্ব আদায় করেছ কিনা?” পিতা চুপ করে রইলো। তখন সন্তান বললো যে, “হে খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, মূলতঃ আমার পিতা আমার একটা হক্বও আদায় করেননি।

এক নাম্বার হচ্ছে, যিনি আমার মাতা উনি কৃতদাসী। শরীয়তের সাথে উনার কোন সম্পর্ক নেই। ইল্ম-কালাম, আমল-আখলাক বলতে উনার কিছুই নেই।

           দুই নাম্বার হচ্ছে, আমার এমন নাম রাখা হয়েছে যা মানুষ শুনলে হাসে।” “নাম কি রাখা হয়েছে?” “নাম রাখা হয়েছে ‘জুল।” ‘জুল’ অর্থ হচ্ছে, ‘গোবরের পোকা।’

          তিন নাম্বার হচ্ছে, আমাকে দ্বীনি ইল্ম বলতে কিছুই শিক্ষা দেয়া হয়নি। আমি শরীয়ত সম্পর্কে কিছুই জানিনা। যার জন্য আমার ইচ্ছা থাকা সত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই পিতা-মাতার হক্ব আদায় করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়না ইত্যাদি। এলোমেলো অনেক কাজই আমার দ্বারা হয়ে থাকে যেহেতু আমার সে বিষয়ে কিছুই জানা নেই। পিতাকে বলা হয়েছিল, আমাকে দ্বীনি ইল্ম দেয়ার জন্য কিন্তু পিতা সে ব্যবস্থা করেননি, যার জন্য আমার পক্ষে হক্ব আদায় করা সম্ভব হয়নি।” যখন এ কথা বলা হলো, তখন হযরত ওমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মামলা খারিজ করে দিলেন। “এই মামলা এখানে চলবেনা। কারণ তুমি সন্তানের হক্ব আদায় করনি অতএব সন্তানও তোমার হক্ব আদায় করবেনা।”

          কাজেই পিতার দায়িত্ব হচ্ছে, সন্তানের হক্ব আদায় করে দেয়া। তারপর সন্তানও হক্ব আদায় করবে। যে হক্ব আদায় করবেনা সে সেজন্য জবাবদিহী করবে। কাজেই ব্যাপারটা একদিক থেকে যেমন খুবই সহজ আবার অপরদিক থেকে তেমন খুবই কঠিন।

যেমন, সন্তানের হক্ব আদায় করা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, হাদীস শরীফে রয়েছে,

ما نحل والد ولده من نحل افضل من ادب حسن.

“যে কোন সন্তানকে পিতা যা দিয়ে থাকে, দান-খয়রাত করে থাকে সবচাইতে উত্তম দান হচ্ছে, ‘আদব শিক্ষা’ দেয়া, দ্বীনি ইল্ম শিক্ষা দেয়া, এর চেয়ে উত্তম দান সন্তানের প্রতি পিতার আর কিছুই নেই।”

প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে, সন্তানকে আদব শিক্ষা দেয়া, দ্বীনি ইল্ম (জরুরত আন্দাজ) শিক্ষা দিয়ে দেয়া। এটা পিতার জন্য ফরয-ওয়াজিবের অন্তর্ভূক্ত।

যেমন, অন্য হাদীস শরীফে বলা হয়েছে,

حق الولد على الوالد

“সন্তানের হক্ব পিতার উপর কি?”

ان يحسن اسمه ويحسن ادبه-

“সন্তানের হক্ব পিতার প্রতি কতটুকু? সেটা হচ্ছে, পিতা সন্তানকে আদব-কায়দা, নিয়ম-কানুন, দ্বীনি ইল্ম জরুরত আন্দাজ শিক্ষা দিবে এবং সুন্দর একটা নাম রাখবে। অর্থাৎ অর্থবোধক সুন্দর একটা নাম রাখবে যেটা শরীয়তসম্মত।

          এ প্রসঙ্গে অন্য হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

 انكم تدعون يوم القيامة باسمائكم واسماء ابائكم فاحسنوا اسمائكم.

“নিশ্চয়ই তোমরা ক্বিয়ামতের দিন তোমাদের নামে ও তোমাদের পিতা-মাতার নামে সম্বোধিত হবে। কাজেই তোমরা তোমাদের নাম সুন্দর দেখে রেখ। সুন্দর দেখে অর্থবোধক শরীয়তসম্মত নাম রেখ। আল্লাহ্ পাক-এর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এটাই নির্দেশ।”

          কাজেই সন্তানের জন্য যেমন নাম সুন্দর রাখতে হবে। ঠিক তদ্রুপ তাকে দ্বীনি আদব-কায়দা, তর্জ-তরীক্বা, নিয়ম-কানুন, ইল্ম শিক্ষা দিতে হবে। সেটা শিক্ষা দেয়ার পর সন্তান যদি হক্ব আদায় না করে সে জন্য সে জবাবদিহী করবে। কিন্তু সন্তানকে পিতা যদি দ্বীনি শিক্ষা না দেয় তাহলে অবশ্যই সন্তান থেকে পিতা তার হক্ব আশা করতে পারেনা। (অসমাপ্ত)

ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য

সম্পাদকীয়

ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য

ওয়াজ শরীফ কুরআন শরীফ ও সুন্নাহ্ শরীফের আলোকে- পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য

খলীফাতুল্লাহ, খলীফাতু রসূলিল্লাহ, ছাহিবু সাইয়্যিদি সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ, ছাহিবে নেয়ামত, আল মালিক, আল মাখদূম, কুতুবুল আলম, গাউছুল আ’যম, মুজাদ্দিদে আ’যম, মুহইউস সুন্নাহ, মাহিউল বিদয়াত, আযীযুয যামান, ক্বইউমুয যামান, ইমামুল আইম্মাহ, আস সাফফাহ, আল জাব্বারিউল আউওয়াল, আল ক্বউইউল আউওয়াল, হাবীবুল্লাহ, মুত্বহ্হার, মুত্বহ্হির, আহলু বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ক্বায়িম মাক্বামে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, মাওলানা মামদূহ মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র ওয়াজ শরীফ মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র কুরআন শরীফ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের আলোকে- মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র হজ্জ, মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র উমরা উনাদের ফাযায়িল-ফযীলত, হুকুম-আহকাম সম্পর্কে (৩৩)