সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সংখ্যা: ৯২তম সংখ্যা | বিভাগ:

মুহম্মদ আবুল ফয়েজ

পপুলার, লন্ডন

সুওয়াল ঃ উলামা-ই-কিরাম যে হাদীস শরীফ দ্বারা বলেন, “নবীজি (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উম্মতের দরূদ শরীফ শুনতে পান।” উদাহরণসহ (কিতাবের নাম ও ইবারত) জানতে চাই। তাছাড়া এই হাদীস শরীফের তরজমা ও তাশরীহ্ জানতে চাই যে, উম্মতের দরূদ শরীফ মদীনা শরীফ হাজির হয়ে পড়লে শুনতে পান, না বিশ্বের যে কোন স্থান থেকে পড়লে শুনতে পান?

জাওয়াব ঃ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মতের দরূদ ও সালাম সরাসরি শুনতে পান। চাই তা রওজা শরীফের কাছ থেকে হোক বা দূর থেকে হোক অথবা যমীনের যে কোন প্রান্ত থেকে হোক।

          তবে যারা খাছ মুহব্বত, তাযীম-তাকরীমের সাথে দরূদ ও সালাম পাঠ করেন তাদের প্রেরিত দরূদ ও সালাম সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সরাসরিই শুনতে পান বলে হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে।

          আর যারা আম ভাবে দরূদ ও সালাম পাঠ করে থাকেন তা ফেরেশ্তাদের মাধ্যমে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে পৌঁছানো হয় বলে হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে।

          যেমন, এ প্রসঙ্গে “দালায়েলুল খায়রাত” নামক গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ আছে,

وقيل لرسول الله أرعيت صلوة المصلين عليك ممن غاب عنك ومن ياتى بعدك ماحالهما عندك فقال اسمع صلوة اهل محبتى واعرفهم وتعرض على صلوة غيرهم عرضا.

অর্থঃ- “হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনার থেকে দূরে অবস্থানকারী ও পরবর্তীকালে ধরাধামে আগমনকারীদের দরূদ শরীফ পাঠ আপনার দৃষ্টিতে কি রকম হবে? তিনি ইরশাদ করেন, আন্তরিক, অকৃত্রিম ভালবাসা সহকারে দরূদ শরীফ পাঠকারীদের দরূদ আমি নিজেই শুনি এবং তাদেরকেও চিনি। আর যাদের অন্তরে আমার প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা নেই, তাদের দরূদ আমার কাছে পেশ করা হয়।”

          আল্লামা ইবনে কাইয়ূম রচিত “জিলাউল ইফহাম” গ্রন্থের ৭৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত ১০৮নং হাদীস শরীফে আছে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

ليس من عبد يصلى على الا بلغنى صوته حيث كان قلنا بعد وفاتك قال وبعد وفاتى.

অর্থঃ- “যে কোন ব্যক্তি আমার প্রতি দরূদ শরীফ পাঠ করলে পাঠকের আওয়াজ আমার কাছে পৌঁছে। এমনকি আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, “ইহা আপনার ওফাতের পরও? উত্তরে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, হ্যাঁ, এ নিয়ম আমার ওফাতের পরেও বলবৎ থাকবে।”

          “জিলাউল্ ইফহাম” গ্রন্থের ৭৩ পৃষ্ঠায় হযরতুল আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি রচিত “আনিসুল জলীস” গ্রন্থের ২২৭ পৃষ্ঠার বরাতে উল্লেখ আছে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

اصحابى اخوانى صلوا على فى كل يوم الاثنين والجمعة بعد وفاتى فانى اسمع صلوتكم بلا واسطة.

অর্থঃ- “হে আমার ছাহাবা-ই-কিরাম (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম) গণ প্রতি সোমবার ও শুক্রবার আমার ওফাতের পর বেশী করে দরূদ শরীফ পাঠ করবেন। আপনাদের দরূদ শরীফ আমি সরাসরি শুনি।”

          অন্য হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

ان لله ملئكة سياحين فى الارض يبلغون نى من امتى السلام.

অর্থঃ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক-এর নিকট সারা পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কতিপয় ফেরেশ্তা রয়েছেন যারা আমার উম্মতগণের সালাম আমার নিকট পৌঁছিয়ে থাকেন।” (দারেমী শরীফ)

          মূলতঃ শুধু দরূদ ও সালামই নয় বরং উম্মতের সমস্ত আমলই হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবার শরীফে পেশ করা হয়।

যেমন, অন্য হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে,

عرضت على اعمال امتى حسنها وسيئها فوجدت فى محاسن اعمالها الاذى يماط عن الطريق و وجدت فى مساوى اعمالها النخاعة تكون فى المسجد لاتدفن.

অর্থঃ- “আমার উম্মতের ভাল ও মন্দ সকল আমলই আমার নিকট পেশ করা (দেখানো, শোনানো) হয়। তন্মেধ্যে সর্বোত্তম আমল হিসেবে আমি দেখি রাস্তা হতে কষ্ট দায়ক বস্তু সরিয়ে রাখা। আর সর্ব নিকৃষ্ট আমল হিসেবে দেখি মসজিদের মধ্যে থুথু, কফ ও নাকের শ্লেষ্মা ফেলা যা মাটিতে পুতে ফেলা হয়না।” (মুসলিম, মিশকাত)

          উপরোক্ত হাদীস শরীফসমূহের ব্যাখ্যায় হযরতুল আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমতুল্লাহি আলাইহি “এনতেবাহুল আয্কিয়া ফি হায়াতিল আওলিয়া” নামক গ্রন্থের ৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন,

النظر فى اعمال امته والاستغفار لهم من السيئات والدعاء بكشف البلاء عنهم والتردد فى اقطار الارض والبركة فيها وحضور جنازة من صالحى امته فان هذه الامور من اشغاله كما وردت بذلك الحديث والاثار.

অর্থঃ- “উম্মতের বিবিধ কর্ম-কান্ডের প্রতি দৃষ্টি রাখা, তাদের পাপরাশি ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাদেরকে বালা-মুছিবত থেকে রক্ষা করার জন্য দু’আ করা, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত আনাগোনা করা ও বরকত দান করা এবং নিজ উম্মতের কোন নেক বান্দার ওফাত হলে তাঁর জানাযাতে অংশগ্রহণকরা এগুলোই হচ্ছে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শখের কাজ। অসংখ্য হাদীস শরীফ থেকেও এসব কথার সমর্থন পাওয়া যায়।”

          সুপ্রসিদ্ধ “মাজমাউল বরকাত” গ্রন্থে শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন,

وى عليه السلام بر احوال واعمال امت مطلع است بر مقربان وخاصان دركاه خود مفيض وحاضر وناظر است.

অর্থঃ- “হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ উম্মতের যাবতীয় অবস্থা ও আমল সম্পর্কে অবগত এবং তাঁর মহান দরবারে উপস্থিত সকলকেই ফয়েজ প্রদানকারী ও ‘হাজির-নাজির।”

          শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি “সুলূকু আকরাবুছ্ ছুবুল বিত্ তাওয়াজ্জ্ুেহ ইলা সাইয়্যিদির রুসূল” গ্রন্থে বলেন,

উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “উলামা-ই-কিরাম উম্মতের মধ্যে বিভিন্ন মতাদর্শ ও বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্য থাকা সত্বেও এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকৃত জীবনেই (কোন রূপ রূপক ও ব্যবহারিক অর্থে যে জীবন তা নয়) স্থায়ীভাবে বিরাজমান ও বহাল তবীয়তে আছেন। তিনি উম্মতের বিশিষ্ট কর্মকান্ড সম্পর্কে জ্ঞাত ও সেগুলোর প্রত্যক্ষদর্শীরূপে বিদ্যমান তথা ‘হাজির-নাজির।’ তিনি হাক্বীক্বত অন্বেষণকারী ও মহান দরবারে নবুওওয়াতের শরাণাপন্নদের ফয়েজদাতা ও মুরুব্বীরুপে বিদ্যমান আছেন।”

          আল্লামা মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি “শরহে শিফা” গ্রন্থে বলেছেন,

لان روح النبى صلى الله عليه وسلم حاضر فى بيوت اهل الاسلام.

অর্থঃ- “কেননা, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র রূহ মুসলমানদের ঘরে ঘরে বিদ্যমান আছেন।”

          শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর স্বরচিত “মাদারেজুন নবুওওয়াত” গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন,

উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্মরণ করুন, তাঁর প্রতি দরূদ পেশ করুন তাঁর যিকির করার সময় এমনভাবে অবস্থান করুন যেন তিনি আপনার সামনে জীবিতাবস্থায় উপস্থিত আছেন আর আপনি তাঁকে দেখছেন। আদব, মর্যাদা ও শ্রদ্ধা অক্ষুন্ন রেখে ভীত ও লজ্জিত থাকুন এবং এ ধারণা পোষণ করবেন যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে দেখছেন, আপনার কথাবার্তা শুনছেন। কেননা তিনি আল্লাহ্ পাক-এর গুণাবলীতে গুণান্বিত। আল্লাহ্ পাক-এর একটি গুণ হচ্ছে, আমি (আল্লাহ্ পাক) আমার স্মরণকারীর সঙ্গে সহাবস্থান করি।”

          হযরত ইমাম ইবনুল হাজ্জ রহমতুল্লাহি আলাইহি “মাদখাল” গ্রন্থে ও হযরত ইমাম কুসতুলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি “মাওয়াহেব” গ্রন্থের ২য় খন্ডের ৩৮৭ পৃষ্ঠায় ২য় পরিচ্ছদে “জিয়ারতু কবরিহিশ্ শরীফ” শীর্ষক বর্ণনায় লিখেছেন,

وقد قال علمائنا لا فرق بين موته وحيوته عليه السلام فى مشاهدته لامته ومعرفته باحوالهم ونياتهم وعزائمهم وخواطرهم وذلك جلى عنده لاخفاء به.

অর্থঃ- “আমাদের সুবিখ্যাত উলামা-ই-কিরাম বলেন যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হায়াত ও ওফাত মোবারকের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তিনি নিজ উম্মতকে দেখেন, তাদের অবস্থা, নিয়ত, ইচ্ছা ও মনের কথা জানেন। এগুলো তাঁর কাছে সম্পূর্ণরূপে সুস্পষ্ট, কোনরূপ অস্পষ্টতা বা পুশিদা থাকেনা।”

          হযরত কাজী আয়ায রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রণিত শিফা শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ “নসীমুর রিয়ায”-এর ৩য় খন্ডের  শেষে উল্লিখিত আছে,

الانبياء عليهم السلام من جهة الاجسام والظواهز مع البشر وبوااطنهم وقواهم الروحانية ملكية ولذا ترى مشارق الارض ومغاربها تسمع اطيط السماء وتشم رائحة جبرائيل اذا اراد النزول اليهم.

অর্থঃ- “হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস্ সালাম শারীরিক ও বাহ্যিক দিক থেকে মানবীয় বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। তবে আভ্যান্তরীণ ও রূহানী শক্তির দিক থেকে ফেরেশ্তাদের বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। এ কারণেই তাঁরা পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তসমূহ দেখতে পান, আসমানের চিড়চিড় আওয়াজ শোনেন এবং হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম তাঁদের নিকট অবতরণের ইচ্ছা পোষণ করতেই তাঁরা তাঁর সুঘ্রাণ পেয়ে যান।

          মূলকথা হলো- রওজা শরীফের পাশে দাঁড়িয়ে পাঠ করুক অথবা পৃথিবীর যে কোন স্থানেই পাঠ করুক। আর মহব্বত ও শ্রোদ্ধার সাথে পাঠ করুক অথবা সাধারণ ভাবে, উল্লিখিত সকল অবস্থাতেই “ছলাত” পাঠ কারীর “ছলাত” আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সরাসরি শুনতে পান।

          প্রকৃতপক্ষে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকলের দরূদ ও সালামই শুনতে পান যা হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত। তবে এ হাদীস শরীফে “শুনতে পান” ও “পৌঁছানো হয়” বলে উল্লেখ করে মুহব্বতের ফযীলত ও মর্যাদা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সকলেই যেন মুহব্বতের সাথে দরূদ ও সালাম পাঠ করে।

          প্রসঙ্গতঃ কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে, সত্যিই যদি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সরাসরি শুনতেই পেতেন তাহলে আবার ফেরেশ্তাদের মাধ্যমে পৌঁছানো হয় কেন? আর যদি ফেরেশ্তাদের মাধ্যমেই পাঠানো হয় তবে সরাসরি গ্রহণ কেন?

          এর জবাবে বলতে হয় যে, আল্লাহ্ পাক কি সবকিছু দেখননা বা শোনেননা? কিন্তু তারপরেও বান্দার আমলসমূহ আল্লাহ্ পাক তাঁর নিজের কাছে পৌঁছানোর জন্য ফেরেশ্তাদের নিয়োগ করেছেন কেন?

          মূলতঃ এটা আল্লাহ্ পাক-এর শান। সবকিছু দেখা-শোনার পরও তিনি ফেরেশ্তাদের মাধ্যমে পৌঁছানোর তরতীব রেখেছেন। তদ্রুপ আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্ পাক-এর কুদরতে সবকিছু দেখা-শোনা ও জানার পরও তাঁর তাযীমার্থে তরতীব রক্ষার্থে ফেরেশ্তারা দরূদ শরীফ পাঠকারীর দরূদ ও সালাম তাঁর দরবার শরীফে পৌঁছিয়ে থাকেন।

          তবে যারা একান্ত মুহব্বত, জওক-শওক, তাযীম-তাকরীমের সাথে দরূদ ও সালাম পাঠ করে তাদের মুহব্বতের মর্যাদার স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি সরাসরিই তা গ্রহণ করে থাকেন।

          {দলীলসমূহঃ (১) মুসলিম, (২) মিশকাত, (৩) দারেমী, (৪) দালায়েলুল খায়রাত, (৫) মাদারেজুন্ নবুওয়াত, (৬) মিরকাত, (৭) আশয়াতুল লুমুয়াত, (৮) লুময়াত, (৯) তালিকুছ্ ছবিহ্, (১০) ত্বীবী, (১১) মুযাহেরে হক্ব, (১২) মাওয়াহেব, (১৩) জিলাউল ইফহাম, (১৪) আনিসুল জলীস, (১৫) এনতেবাহুল আযইকয়া ফি হায়াতিল আওলিয়া, (১৬) মাজমাউল বারকাত, (১৭) সুলূকু আকরাবুছ ছুবুল বিত্ তাওয়াজ্জুহ্ েইলা সাইয়্যিদুর রসূল, (১৮) শরহে শিফা, (১৯) মাদখাল, (২০) নসীমুর রিয়ায ইত্যাদি।}

সাইয়্যিদ মুহম্মদ মোক্তাদুল ইসলাম (মিলন)

সুবহানী ঘাট, সিলেট।

সুওয়ালঃ রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্র ডিসেম্বর/২০০০ঈঃ সংখ্যায় তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুনিয়াতুত তালেবীন, রেযভীয়া কিতাবের বরাত দিয়ে বলেছে, “সহীহ্ মুসলিম শরীফসহ” অনেক নির্ভরযোগ্য কিতাবে নফল নামায বিশেষতঃ ক্বদর ও বরাতের নফল নামায জামাত সহকারে আদায় করা বৈধ ……..।”

জাওয়াবঃ রেযাখানী মুখপত্রের উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল, জিহালতপূর্ণ ও প্রতারণামূলক যা শরীয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। তারা তাফসীরে রুহুল বয়ান, বুখারী, গুণিয়াতুত্ তালেবীন ইত্যাদি কিতাবের নাম দিয়ে যে বক্তব্য প্রদান করেছে আসলে উক্ত কিতাবসমূহের বক্তব্য সে রকম নয়। বরং তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

          তারা তাফসীরে রুহুল বয়ান-এর ইবারত উল্লেখ করে ইবারত এবং অর্থে যে জালিয়াতী ও প্রতারণা করেছে তা আমরা গত সংখ্যায় বিস্তারিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছি যে, তাদের বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল, জিহালতপূর্ণ, জালিয়াতী ও প্রতারণা মূলক।

(ধারাবাহিক)

বর্তমান সংখ্যায় তাফসীরে রুহুল বয়ানের বক্তব্য আরো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হলো

          শুরুতেই একটা বিষয় জেনে রাখা জরুরী, তাহলো- সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য সমস্ত নামাযই দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। (১) ফরয নামায (২) নফল নামায। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য আলাদাভাবে কোন ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ্, সুন্নতে যায়েদাহ্, মুস্তাহাব নামায ছিলনা। পরবর্তীকালে ইমাম-মুজতাহিদগণ ইজতিহাদ করে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নফল নামাযগুলো তাকীদ অনুযায়ী আমাদের জন্য কোনটা ওয়াজিব যেমন- বিত্র ও দু’ঈদের নামায, কোনটা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ্ যেমন- তারাবীহ্, ফজরের পূর্বের, যুহ্রের পূর্বের ও পরের, মাগরিবের ও ইশার পরের সুন্নত নামাযসমূহ, কোনটা সুন্নতে যায়েদাহ্ যেমন- আছরের পূর্বের এবং ইশার পূর্বের চার রাকায়াত সুন্নত নামায, কোনটা মুস্তাহাব, নফল যেমন- ইশরাক, যাওয়াল, আওয়াবীন, চাশ্ত, শবে বরাত, শবে ক্বদর ইত্যাদি ভাগে ভাগ করেছেন। তাই একমাত্র ফরয নামায ব্যতীত সকল নামাযগুলোই মূলতঃ নফল নামাযের অন্তর্ভূক্ত। কিন্তু আহকামের দিক দিয়ে কোনটা ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ্, সুন্নতে যায়েদাহ্, নফল ও মুস্তাহাবের অন্তর্ভূক্ত।

          অতএব, “তাফসীরে রুহুল বয়ানে” আযান ইক্বামত ছাড়া (صلاة التطوع) নফল নামায  জামায়াতের সহিত আদায় করা যে জায়েয বলা হয়েছে, তা বিশেষ করে তারাবীহ্, ছলাতুল কুছূফ এবং ছলাতুল ইস্তিস্কার নামাযকে বুঝানো হয়েছে। কেননা তারাবীহ্র নামাযকেও التطوع নফল বলা হয়।

          যেমন, হাদীস শরীফে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

جعل الله صيامه فريضة وقيام ليله تطوعا.

অর্থঃ- “তোমাদের জন্য আল্লাহ্ পাক রমাদ্বান মাসের রোযাকে ফরয করেছেন এবং ক্বিয়ামুল লাইলকে (তারাবীহ্ নামাযকে) নফল (সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ্) করেছেন।” (বায়হাক্বী, মিশকাত)

          কাজেই প্রমাণিত হলো যে, আযান ইক্বামত ছাড়া নফল নামায জামায়াতের সহিত আদায় করা যে জায়েয বলা হয়েছে, তা মূলতঃ তারাবীহ্র নামায।

অনুরূপ ছলাতুল কুছূফ বা সূর্যগ্রহণের নামায এবং ছলাতুল ইস্তেস্কা বা বৃষ্টির নামায আযান ইক্বামত ছাড়া জামায়াতের সহিত আদায় করা জায়েয ও সুন্নত।

          যেমন, “শরহুন নিক্বায়া” কিতাবের ১ম খন্ডের ২৪৩-২৪৪পৃষ্ঠার হাশিয়ায় উল্লেখ আছে,

عند الكسوف ……… يصلى امام الجمعة بالناس ركعتين متنفلا بلا اذان واقامة.

অর্থঃ- “সূর্যগ্রহণের সময় জুমুয়ার ইমাম ছাহেব মানুষদেরকে (মুক্তাদীদেরকে) নিয়ে আযান ইক্বামত ব্যতীত (জামায়াতের সহিত) দুই রাকায়াত নফল নামায আদায় করবেন।”

          ছলাতুল ইস্তিস্কা বা বৃষ্টির নামায সম্পর্কে “শরহুন নিক্বায়া” কিতাবের ১ম খন্ডের ২৪৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

 خرج رسول الله صلى الله عليه وسلم يوما يستسقى فصلى بنا ركعتين بلا اذان ولا اقامة.

অর্থঃ- “একদা আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইস্তিস্কার নামাযের জন্য বের হলেন অতঃপর আমাদেরকে নিয়ে আযান ইক্বামত ছাড়া দুই রাকায়াত নামায আদায় করলেন।”

          আর আমাদের হানাফী মাযহাবের ফতওয়া হলো, “রমাদ্বান মাসে তারাবীহ্র নামায জামায়াতে পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া, বিত্র নামায রমাদ্বান মাসে জামায়াতে পড়া মুস্তাহাব, রমাদ্বানের বাইরে জামায়াতে পড়া মাকরূহ্ এবং ছলাতুল কুসূফ (সূর্যগ্রহণ) ও ছলাতুল ইস্তেস্কা (বৃষ্টির) নামায রমাদ্বান মাসে হোক অথবা গায়রে রমাদ্বানে হোক জামায়াতে আদায় করা সুন্নতে যায়েদাহ্।

          এছাড়া তাহাজ্জুদ, চাশ্ত, আওয়াবীন, শবে ক্বদর, শবে বরাত ইত্যাদি নফল নামাযসমূহ ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ্ তাহ্রীমী ও বিদয়াতে সাইয়্যিয়াহ্।

          উপরোক্ত দলীল ভিত্তিক আলোচনা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, “তাফসীরে রুহুল বয়ানে” আযান ইক্বামত ছাড়া নফল নামায জামায়াতের সহিত আদায় করা যে জায়েয বলা হয়েছে তা দ্বারা মূলতঃ তারাবীহ্, ছলাতুল কুছূফ এবং ছলাতুল ইস্তিস্কার নামাযকেই বুঝানো হয়েছে। আর শরহুন নিক্বায়া-এর মুছান্নিফ বা লিখক এবং অন্যান্য আলিমগণ বলেছেন যে, উলামা-ই-কিরামগণের অনেকেই এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

          উল্লেখ্য, “তাফসীরে রুহুল বয়ানে” “মুহিত” কিতাবের বরাত দিয়ে (مطلقا) সাধারণভাবে নফল নামাযসমূহে ইমামের সহিত ইক্তিদা করা যে মাকরূহ হবেনা বলা হয়েছে, তা দ্বারা মূলতঃ এটাই বুঝানো হয়েছে যে, مطلقا বা সাধারণভাবে একজন অথবা দুইজন মুক্তাদী যদি নফল নামাযে ইমামের সহিত ইক্তিদা করে তাহলে সেটা মাকরূহ হবে না। অনুরূপভাবেই শবে বরাত, শবে ক্বদর, লাইলার্তু রাগায়িব ইত্যাদি নফল নামাযে একজন অথবা দু’জন  মুক্তাদী যদি ইমামের সহিত ইক্তিদা করে তাহলে সেটাও মাকরূহ হবে না। আর এটাই বিশ্বখ্যাত, নির্ভরযোগ্য ফিক্বাহ্ ও ফতওয়ার কিতাবসমূহে যেমন, “বাহরুর রায়েক, ফতওয়ায়ে আলমগীরী, খুলাছাতুল ফতওয়া, আদদুররুল মুখতার, গায়াতুল আউত্বার, রদ্দুল মুহতার, শামী, আল কুহেস্তানী, শরহুল মুনিয়া, শরহুন নিক্বায়া, শরহে ইলিয়াস, মিনহাতুল খলিক্ব, ফতওয়ায়ে তাতারখানিয়া, হাশিয়ায়ে তাহতাবী আলা মারাকিউল ফালাহ্, আইনী শরহে হিদায়া, হাশিয়ায়ে শরহে বেকায়া লি চলপী, ফতওয়ায়ে মা’দিয়াহ, ইলমুল ফিক্বাহ” ইত্যাদি কিতাবে বলা হয়েছে যে,  নফল নামাযে একজন অথবা দুইজন মুক্তাদী যদি ইমামের সহিত ইক্তিদা করে তাহলে মাকরূহ হবে না। আর যদি তিনজন মুক্তাদী ইমামের সহিত ইক্তিদা করে তাহলে মাকরূহ হওয়ার ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে অর্থাৎ কেউ কেউ বলেছেন মাকরূহ হবেনা। আর কেউ কেউ বলেছেন মাকরূহ হবে। তবে যদি চারজন মুক্তাদী ইমামের সহিত ইক্তিদা করে নফল নামায জামায়াতের সহিত পড়ে তাহলে সকল ইমাম ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম মাকরূহ তাহরীমী বলেছেন।    যেমন “ফতওয়ায়ে তাতারখানিয়া” কিতাবের  ১ম খন্ডের ৬৩৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

ان التطوع بالجماعة انما يكره اذا كان على سبيل التداعى اما لو اقتدى واحد بواحد او اثنان بواحد لايكره واذا اقتدى ثلاثة بواحد اختلف فيه وان اقتدى اربعة بواحد كره اتفاقا.

অর্থঃ- “নিশ্চয় নফল নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ্ তাহ্রীমী, যখন ঘোষণা দিয়ে পড়া হবে। সুতরাং যদি (বিনা ঘোষণায়) ইমামের সাথে একজন অথবা দু’জন মুক্তাদী ইক্তিদা করে, তবে মাকরূহ্ হবেনা, আর তিনজন মুক্তাদী ইক্তিদা করার মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে, অর্থাৎ কেউ কেউ বলেছেন মাকরূহ হবে না। আর কেউ কেউ বলেছেন মাকরূহ হবে।  তবে যদি চারজন মুক্তাদী ইমামের সহিত ইক্তিদা করে নফল নামায জামায়াতের সহিত পড়ে তাহলে সকল ইমাম মুজতাহিদ ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম-এর সর্বসম্মত মতে মাকরূহ্ তাহ্রীমী।

          অথচ রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্ররা কিতাবের সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েই এ ধরণের ভুল সিদ্ধান্ত প্রদান করেছে। মূলকথা হলো, একজন অথবা দু’জন মুক্তাদী যদি নফল নামাযে ইমামের সহিত ইক্তিদা করে তাহলে মাকরূহ্ হবেনা। আর চারজন মুক্তাদী ইক্তিদা করলে সকলের ঐক্যমতে মাকরূহ তাহরীমী হবে।

          “তাফসীরে রুহুল বয়ান”-এর ইবারতে এটাও বলা হয়েছে যে,

ماراه المؤمنون حسنا فهو عند الله حسن.

অর্থঃ- মুমিনগণ যা উত্তম মনে করেন তা আল্লাহ্ পাক-এর নিকটও উত্তম। আর এখানে মুমিনগণ দ্বারা হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকেই বুঝানো হয়েছে। সুতরাং মু’মিনগণ তথা হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ যা উত্তম মনে করেন তা আল্লাহ্ পাক-এর নিকট উত্তম।

          যদি তাই হয়, তাহলে রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্ররা একখানা হাদীস শরীফ হলেও প্রমাণ পেশ করুক যে, মু’মিনগণ তথা হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ শবে বরাত, শবে ক্বদরের নামায ইমামের সহিত জামায়াতে আদায় করেছেন কস্মিনকালেও তারা তা পারবেনা।

          আরো উল্লেখ্য, তারাবীহ, ছলাতুল কুছুফ, ছলাতুল ইস্তিস্কা এই তিন প্রকার নামায ব্যতীত অন্যান্য নফল নামায যেমন- শবে বরাত, শবে ক্বদর, তাহাজ্জুদ, চাশ্ত, আওয়াবীন ইত্যাদি নফল নামাযসমূহ ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদীসহ জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহরীমী। সকল মু’মিন-মুসলমানগণ তথা সকল ইমাম-মুজতাহিদ ও ফক্বীহ্গণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদী সহ নফল নামায জামায়াতে আদায় করা মাকরূহ তাহরীমী।

যেমন, এ প্রসঙ্গে “বাহরুর রায়েক” কিতাবে উল্লেখ আছে যে, وان اقتدى اربعة بواحد كره اتفاقا

অর্থঃ- “যদি ইমামের সহিত চারজন মুক্তাদী ইক্তিদা করে নফল নামায জামায়াতে পড়ে তাহলে সকল ইমাম ও ফুক্বাহা-ই-কিরাম-এর সর্বসম্মত মত হলো, নফল নামায জামায়াতে পড়া মাকরূহ তাহরীমী।

          অতএব রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্ররা “তাফসীরে রুহুল বয়ানের” ইবারতের অর্থে “শরহে নেকায়া ও মুহিত” কিতাবের বরাত দিয়ে আযান ইক্বামত ছাড়া নফল নামায বিশেষত শবে বরাত, শবে ক্বদরের নফল নামায জামায়াত সহকারে আদায় করা যে বৈধ বলেছে তা ভুল। কারণ তারা কিতাবের ইবারত এবং তার সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েই এ ধরণের ভুল সিদ্ধান্ত পেশ করেছে।    (চলবে)

মুহম্মদ মশীউজ্জামান

পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম

সুওয়ালঃ “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” ৮৫তম সংখ্যায় “সুওয়াল-জাওয়াব” বিভাগে এক জাওয়াবের পরিপ্রেক্ষিতে রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্র সেপ্টেম্বর/২০০০ ঈঃ সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে নামাজে দু’সিজদার মধ্যে দোয়া পাঠ করা সম্পর্কে যে বক্তব্য প্রদান করেছে তা কতটুকু সত্য? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ রেযাখানী মাযহাবের মুখপত্রের উক্ত উত্তরটি সম্পূর্ণ অশুদ্ধ, মিথ্যা, প্রতারণামূলক, জালিয়াতি, ধোকাপূর্ণ, ইবারতচুরি, অনুবাদে ভুল এবং এ ধরণের “প্রায় ৩৫টি ত্রুটিতে ত্রুটিপূর্ণ থাকায় মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

          উক্ত বিবিধ ত্রুটিপূর্ণ উত্তরটি নির্ভরযোগ্য দলীলের ভিত্তিতে খন্ডন করে তার সহীহ জাওয়াব ধারাবাহিকভাবে পেশ করা হচ্ছে।

(ধারাবাহিক)

পরিশিষ্ট

তারা দলীল হিসেবে ৭টি কিতাবের নাম উল্লেখ করেছে।

অথচ উক্ত ৭টি কিতাবের বাইনাস সুতূরে, হাশিয়ায় এবং শরাহ্ গুলোতেই সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে,

وهو محمول على التطوع عندنا.

 এই সম্পূর্ণ দোয়াটি পড়া সম্পর্কিত হাদীস শরীফ খানা আমাদের হানাফী মাযহাবে নফল নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝখানে পড়া যাবে না।

          তাছাড়া বিশ্বখ্যাত সর্বজনমান্য ও নির্ভরযোগ্য ফতওয়ার কিতাবগুলোতে উল্লেখ আছে যে,

دون المكتوبة، التطوع، النفل، التهجد-

          উক্ত সম্পূর্ণ দোয়াটি ফরয নামায ব্যতীত নফল, তাহাজ্জুদ নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর আমরা এরই প্রেক্ষিতে, বিশ্ববিখ্যাত, নির্ভরযোগ্য, সহীহ হাদীস শরীফ ও তার শরাহ্ এবং ফিক্বাহ্র কিতাবের পৃষ্ঠাসহ ২২টি আরবী ইবারত উল্লেখ করে প্রায় ৩১টি কিতাবের দলীল পেশ করে সংক্ষিপ্তভাবে খন্ডন করে বলেছি যে, “উক্ত সম্পূর্ণ দোয়াটি আমাদের হানাফী মাযহাব মোতাবিক ফরয নামাযে পড়া যাবেনা। বরং উক্ত সম্পূর্ণ দোয়াটি শুধুমাত্র নফল নামাযের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।” ফরয নামাযে উক্ত সম্পূর্ণ দোয়াটি পড়া নিষেধ হওয়ার কারণ হচ্ছে, যদি দু’সিজদার মাঝে উক্ত সম্পূর্ণ দোয়াটি পাঠ করা হয় তাহলে নামাযের রোকন আদায়ে তা’খীর বা বিলম্ব হবে এবং সাহু সিজদা ওয়াজিব হবে।

          যেমন, এ প্রসঙ্গে “রদ্দুল মুহ্তার” কিতাবের ১ম খন্ডের ৫০৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

لو اطال هذه الجلسة او قومة الركوع اكثر من تسبيحة بقدر تسبيحة ساهيا يلزمه سجود السهو.

অর্থাৎ “যদি দুই সিজদার মাঝে এবং রুকু থেকে দাঁড়ানোর পর ভুলবশতঃ এক তাসবীহ পরিমাণের চেয়ে বেশী বিলম্ব করে তাহলে ওয়াজিব তরক হবে এবং সাহু সিজদা আবশ্যক হবে।

          আরো উল্লেখ্য, “ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করা হলে তা তো নামাযই ভঙ্গের কারণ।”

          এরপরও আমাদের কাছে আরো অসংখ্য দলীল মওজুদ রয়েছে।

          প্রকৃতপক্ষে রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্ররা উক্ত দোয়াটি ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝখানে বৈধ করার অপপ্রয়াস চালিয়ে চরম জিহালতির নজির স্থাপন করলো।

          পরিশেষে “মাসিক আল বাইয়্যিনাত”-এর পক্ষ থেকে রেযাখানী মাযহাবের মুখপাত্রদেরকে তাদের ওস্তাদ হিসেবে আজীবনের জন্য কিতাবের পরবর্তী ছবক আবারো স্মরণ করিয়ে দেয়া হলো যে,

উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থাৎ “ফরয নামাযের দুই সিজদার মাঝখানে সংক্ষিপ্ত অর্থাৎ শুধুমাত্র اللهم اغفرلى আর নফল নামাযে ইচ্ছাধীন অর্থাৎ ইচ্ছা করলে শুধুমাত্র اللهم اغفرلى অথবা ইচ্ছা করলে নফল নামাযে  হাদীস শরীফে বর্ণিত সম্পূর্ণ দোয়াগুলোও পড়তে পারবে।”

 বিঃ দ্রঃ- দুই সিজদার মাঝখানে দোয়া পড়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে, আমাদের “মাসিক আল বাইয়্যিনাত” ৮৫তম সংখ্যার “সুওয়াল-জাওয়াব” বিভাগ পড়ুন।”

হাফিজ মুহম্মদ কবীর হুসাইন

সভাপতি- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত, নরসিংদী

সুওয়ালঃ মাসিক মদীনা জানুয়ারী-২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় প্রশ্নোত্তর বিভাগে ৯৭ নং প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, “পায়ে হাত দিয়ে ছালাম বা কদমবুছি করা …….. মুশরেকদের ‘ষষ্ঠাংগে প্রণাম …… শেরেকীপূর্ণ আমল ‘তাজীমের ছেজদার’ কিছুটা নিকটবর্তী, ……….. এমনকি অনেকে নাজায়েয ও বলে থাকেন।”

          আবার ৩নং প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে “এটা বিজাতীয় রীতি। ইসলাম পরিপন্থী ও খেলাপে সুন্নত। তাই এটা বর্জন করা অপরিহার্য কর্তব্য।”

          আবার মদীনা ফেব্রুয়ারী’ ২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় ৪৫নং প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, “পদচুম্বন সেজদা সাদৃশ্য…..।”

          আর হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে মৌলভী আহমদ শফীর সম্পাদনায় প্রকাশিত অখ্যাত পত্রিকার ফেব্রুয়ারী- ২০০১ ঈসায়ী সংখ্যায় জিজ্ঞাসা সমাধান বিভাগে ৩২১৪ নং জিজ্ঞাসার-সমাধানে বলা হয়েছে, “কদমবুচির রীতি মনগড়াভাবে উদ্ভাবিত ….। তাই সম্মান প্রদর্শণার্থে প্রচলিত কদমবুচির প্রথা সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ … করতে হবে।”

          এখন আমার সুওয়াল হলো- পদচুম্বন বা কদমবুছী সম্পর্কে উক্ত পত্রিকাদ্বয়ের বক্তব্য কতটুকু সঠিক হয়েছে দলীলসহ জানিয়ে বাধিত করবেন।

জাওয়াবঃ   কদমবুছী বা পদচুম্বন করা সম্পর্কে মদীনার সম্পাদক মাহিউদ্দীন ও হাটহাজারীর মৌলভী আহ্মক শফীর উক্ত বক্তব্য মোটেও সঠিক হয়নি। বরং মিথ্যা, দলীলবিহীন ও কুফরীমূলক হয়েছে।

          কারণ কদমবুছী বা পদচুম্বন করা সুন্নত। অথচ সুন্নত আমলকে  মাহিউদ্দীন ও মৌলভী আহ্মক শফী বিনা দলীলে পদচুম্বন বা কদমবুছীকে পরিত্যাগ করতে ও কদমবুছী সম্পর্কে শরীয়ত বিরোধী কথা বলে কুফরী করেছে।

           নিম্নে দলীলসহ সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো। কদমবুছী করা শরীয়ত সম্মত তথা সুন্নতে ছাহাবা এর অন্তর্ভূক্ত। তা খোদ সিহাহ্ সিত্তাহ্ শরীফের মধ্যেই উল্লেখ আছে। যেমন, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদি¦য়াল্লাহু তা’য়ালা আনহুমগণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কদমবুছী করেছেন।

          এ প্রসঙ্গে সহীহ্ “আবু দাউদ শরীফের” ২জিঃ ৭০৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

عن الوازع بن زارع عن جدها وكان فى وفد عبد القيس قال لما قدمنا المدينة فجعلنا نتبادر من رواحلنا فنقبل يد رسول الله صلى الله عليه وسلم ورجله.

অর্থঃ- “হযরত ওযায়ে ইবনে যারে, তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন- তিনি বলেন, আমরা আব্দুল কায়েস গোত্রে থাকা অবস্থায় যখন মদীনা শরীফে আসতাম, তখন আমরা ছাওয়ারী হতে তাড়াতাড়ি অবতরণ করে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাত ও পা মুবারকে বুছা (চুম্বন) দিতাম।” অনুরূপ বযলুল মাজহুদ জিঃ৬ পৃঃ৩২৮, ফতহুল বারী জিঃ১১ পৃঃ৫৭, মিশকাত শরীফ, মিরকাত জিঃ৭ পৃঃ৮০, আশয়াতুল লুময়াত, মোযাহেরে হক্ব, এলাউস সুনান জিঃ১৭, ৪২৬ পৃষ্ঠা ইত্যাদি কিতাব সমূহেও উল্লেখ আছে।

          শুধু তাই নয় বরং হাদীস শরীফে কদমবুছী করার নির্দেশ করা হয়েছে আর বিশেষ করে মাকে কদমবুছী করার ফযীলতও বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, এ প্রসঙ্গে ফিক্বাহ্রে বিখ্যাত কিতাব “মাব্সূত লিস্ সারাখসী” ১ম জিঃ ১৪৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে,

وقال صلى الله عليه وسلم من قبل رجل امه فكانما قبل عتبة الجنة.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক-এর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি তার মায়ের কদমবুছী করল (অর্থাৎ পা চুম্বন করল) প্রকৃতপক্ষে সে ব্যক্তি যেন বেহেশ্তের চৌকাঠের উপর চুম্বন করলো।”

 তাছাড়া এক ছাহাবী অপর ছাহাবীকেও কদমবুছী করেছেন। যেমন, এ প্রসঙ্গে কিতাবে উল্লেখ আছে,

عن زيد بن ثابت ………….. ان عليا قبل يد العباس ورجله.

অর্থঃ- “হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন যে………., নিশ্চয়ই “হযরত আলী ইবনে আবী তালিব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হযরত আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর হাত ও পা মুবারকে বুছা (চুম্বন) দিয়েছেন।” (ফতহুল বারী জিঃ১১ পৃঃ৫৭, তোহ্ফাতুল আহ্ওয়াযী শরহে তিরমিযী জিঃ৭ পৃঃ৫২৮)

          উল্লেখ্য, মাহিউদ্দীন বলেছে, কদমবুছী করা মুশরিকদের ষষ্ঠাংগে প্রণাম, শেরেকীপূর্ণ আমল, এটা বিজাতীয় রীতি, ইসলাম পরিপন্থী ও খেলাফে সুন্নত। আর আহমক শফী বলেছে, “কদমবুছী মনগড়াভাবে উদ্ভাবিত।”

          অথচ উপরোক্ত হাদীস শরীফ দ্বারাই প্রমাণিত হলো যে, কদমবুছী মনগড়াভাবে উদ্ভাবিত নয়। বরং আখিরী রসূল হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ থেকেই এ কদমবুছী শুরু হয়েছে। সুতরাং কদমবুছী পরিত্যাগ করা যাবেনা বরং সম্মান প্রদর্শনার্থে বা তা’যীমার্থে পীর ছাহেব, বুযুর্গ, পরহেযগার আলিম, ওস্তাদ, মুরুব্বী ও পিতা-মাতাকে কদমবুছী করতে হবে।

          দ্বিতীয়তঃ আমহক ছাহেব বলেছে, “রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরাত সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.)কে যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন ঠিক সেভাবেই আমাদেরকেও করতে হবে। এর ব্যতিক্রম করলে গুণাহ্গার হতে হবে।”

          আহমক ছাহেবের উক্ত বক্তব্য দ্বারা এটাও প্রমাণিত হলো যে, আমাদেরকে অবশ্যই সম্মান প্রদর্শনার্থে বা তা’যীমার্থে পীর ছাহেব, বুযুর্গ, পরহেযগার আলিম, ওস্তাদ, মুরুব্বী ও পিতা-মাতাকে কদমবুছী করতে হবে। অন্যথায় গুণাহ্গার হতে হবে। কারণ আখিরী রসূল হাবীবুল্লাহ্ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমকে কদমবুছী বা পদচুম্বন করতে বলেছেন, শিক্ষা দিয়েছেন।

          আরো উল্লেখ্য যে, জাহিল মাহিউদ্দীন ও মৌলভী আহ্মক শফী কদমবুছী সম্পর্কে ফতওয়ায়ে মাহমুদিয়া, ফতওয়ায়ে শামী কিতাবের বরাত দিয়েছে। অথচ ফতওয়ায়ে মাহমুদিয়া ও ফতওয়ায়ে শামী কিতাবেই কদমবুছী বা পদচুম্বন করা জায়েয বলা হয়েছে।

          এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাতের ১২ তম সংখ্যা পাঠ করুন। সেখানে ১১৭ টি দলীলের দ্বারা প্রমাণ করা হয়েছে যে, সম্মান ও  তা’যীমার্থে পীর ছাহেব, বুযুর্গ, ওস্তাদ, পরহেযগার আলিম ও পিতা-মাতাকে কদমবুছী করা সুন্নতে সাহাবা, তাবেঈন ও আউলিয়া-ই-কিরাম।

উপরোক্ত দলীলভিত্তিক আলোচনা থেকে এটাই প্রমাণিত হলো যে, পদচুম্বন বা কদমবুছী করা সুন্নত।

          কাজেই আল্লাহ্ পাক-এর রসূল, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কোন আমল তথা সুন্নতকে এহানত করা, অবজ্ঞা করা, সুন্নত সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা সম্পূর্ণ কুফরী।

          এ ধরণের কুফরী কথা বলা হতে সকলকে বিরত থাকতে হবে এবং এ ধরণের কুফরী ফতওয়া প্রদানকারী পত্রিকা পড়া থেকে সকলকে বিরত থাকতে হবে ও বিরত থাকার জন্য কোশেশও করতে হবে। আর এ ধরণের কথা যে বলবে এবং লিখবে তাকে খালিছ ইস্তিগ্ফার ও তওবা করতে হবে। অন্যথায় তার ঈমান-আমল নষ্ট হয়ে কুফরী অবস্থায় মারা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

          শরীয়তের মাসয়ালা হচ্ছে- “যদি কেউ শরীয়তের কোন আইনকে অবজ্ঞা করলো, এনকার বা অপছন্দ করলো, তবে সে কুফরী  করলো। যে কুফরী করে, সে মুরতাদ হয়ে যায়। আর মুরতাদের ফায়সালা হচ্ছে- তার স্ত্রী তালাক হবে (যদি বিয়ে করে থাকে) এবং এক্ষেত্রে পুনরায় তওবা না করে, বিয়ে না দোহরানো ব্যতীত তার স্ত্রীর সাথে বসবাস করা বৈধ হবেনা। আর এই অবৈধ অবস্থায় সন্তান হলে সেই সন্তানও অবৈধ হবে। হজ্ব বাতিল হয়ে যাবে (যদি হজ্ব করে থাকে), সমস্ত নেক আমল বরবাদ হয়ে যাবে, তার ওয়ারিশ সত্ব বাতিল হবে। তাকে তিন দিন সময় দেয়া হবে তওবা করার জন্য এবং যদি তওবা করে, তবে ক্ষমা করা হবে। অন্যথায় একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড। কেননা হাদীস শরীফে রয়েছে, তিন কারণে মৃত্যুদন্ড দেয়া জায়েয। যথা- (ক) ঈমান আনার পর কুফরী করলে অর্থাৎ মুরতাদ হলে। (খ) ঐ জিনাকার বা জিনাকারিনী, যারা বিবাহিত বা বিবাহিতা। (গ) যে অন্যায়ভাবে কাউকে ক্বতল করে, তাকে। (তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাযাহ্, মসনদে শাফেয়ী, মসনদে বাজ্জার, মুস্তাদরেকে হাকেম)

          আর মুরতাদ মারা যাবার পর যারা জানাযার নামায পড়ে বা পড়ায় বা জানাযার নামাযে সাহায্য-সহযোগীতা করে, তাদের সকলের উপরই মুরতাদের হুকুম বর্তাবে এবং এ সকল মুরতাদ মরলে বা নিহত হলে তাকে মুসলমানগণের কবরস্থানে দাফন করা যাবেনা। এমনকি মুসলমানের ন্যায়ও দাফন করা যাবেনা। বরং তাকে কুকুরের ন্যায় একটি গর্তের মধ্যে পুঁতে রাখতে হবে।

          কুরআন শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই যারা কাফির এবং কুফরী অবস্থায় মারা গিয়েছে, তারা যদি পৃথিবী পরিমান স্বর্ণ তার ফিদিয়া বা (কুফরীর পরিবর্তে) কাফ্ফারা বাবদ দেয় (আমার থেকে বাঁচার জন্য), তা কখনো গ্রহণ করা হবেনা। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি বা আযাব এবং তাদের জন্য কস্মিনকালেও সাহায্যকারী নেই।” (সূরা আলে ইমরান/৯১)

          {দলীলসমূহঃ (১) আল্ ফিকহুল আক্বার, (২) শরহে আকাঈদে নছফি, (৩) আকাঈদে হাক্কা, (৪) তাক্মিলুল ঈমান, (৫) তাফসীরে মাযহারী, (৬) রুহুল বয়ান, (৭) রুহুল মায়ানী, (৮) খাযেন, (৯) বাগবী, (১০) ইবনে কাছীর, (১১) তাবারী, (১২) বুখারী, (১৩) মসনদে আহমদ, (১৪) মসনদে আশেয়া, (১৫) আবূ দাউদ, (১৬) দারেমী, (১৭) ইবনে মাযাহ্, (১৮) মিশকাত, (১৯) মিরকাত, (২০) আশয়াতুল লুমুয়াত, (২১) লুময়াত,  (২২) ত্বীবী, (২৩) তালীক্ব, (২৪) মোযাহেরে হক্ব, (২৫)  ফতহুল বারী, (২৬) উমদাতুল কারী, (২৭) বযলুল মাযহুদ (২৮) ইরশাদুস্ সারি, (২৯) ফতহুর রব্বানী, (৩০) আউনুল মা’বুদ, (৩১) আরবাঈন ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি (৩২) আল মুর্শিদুল আমীন, (৩৩) দুররুল মুখতার, (৩৪) খানিয়া, (৩৫) ফতওয়ায়ে কাজীখান, (৩৬) বাহরুর রায়েক, (৩৭) ফতওয়ায়ে আলমগীরী, (৩৮) ফতওয়ায়ে আল বারুরিয়া, (৩৯) জামিউল ফুছুলিন, (৪০) আল্ বায্যাজিয়া  ইত্যাদি।}

মুহম্মদ সাইফুল হাবীব

সভাপতি- আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত, বগুড়া

সুওয়ালঃ মৌলভী আজিজুল হক্বের অখ্যাত পত্রিকার ফেব্রুয়ারী ২০০১ ঈয়াসী সংখ্যায় জিজ্ঞাসার জবাব বিভাগে ৭৬০নং জিজ্ঞাসার জবাবে বলা হয়েছে, “কোন মানুষ ইন্তেকাল করার পর যে কোন দিনে তাঁর সাওয়াব রিসানীর উদ্দেশ্যে কুরআন শরীফ পড়ে টাকা নেয়া বা বিনিময় গ্রহণ করা না জায়িয। …… কাজেই এ ধরনের তিলাওয়াত দ্বারা মৃত ব্যক্তির উপকার হবে বলে কোন আশা করা যায় না।”

          এখন আমার সুওয়াল হলো- মৃত ব্যক্তির জন্য ছওয়াব রেসানীর উদ্দেশ্যে কুরআন শরীফ পড়ে বিনিময় গ্রহণ করা সম্পর্কে অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়েছে কি?

জাওয়াবঃ মৃত ব্যক্তির জন্য ছওয়াব রেসানী বা ঈছালে ছওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরআন শরীফ পড়ে টাকা বা বিনিময় গ্রহণ করা সম্পর্কে মৌলভী আজিজুল হকের অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য অশুদ্ধ ও জিহালতপূর্ণ। কেননা যেখানে ফতওয়াগ্রাহ্য মতে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করে উজরত বা বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয, সেখানে উজরত বা বিনিময় গ্রহণ করতঃ ইছালে ছওয়াব করা নাজায়েয হওয়ার প্রশ্নই উঠতে পারেনা। বরং সহীহ্ ও গ্রহণযোগ্য মত এই যে, মৃত ব্যক্তির জন্য ছওয়াব রেসানী বা ইছালে ছওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করতঃ ইছালে ছওয়াব করে উজরত গ্রহণ করা জায়েয। শুধু তাই নয়, উক্ত ছওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট অবশ্যই পৌঁছে থাকে এবং মৃত ব্যক্তির উপকারও হবে।

          এ প্রসঙ্গে ফতওয়ার বিখ্যাত কিতাব “বাহ্জাতুল ফতওয়াতে” উল্লেখ আছে যে,

 উর্দূ কম্পোজ করতে হবে

অর্থঃ- “যায়েদ মসজিদের ইমাম ছাহেবকে এই হেতু এক গোরশ প্রদান করলো যে, সে (অর্থাৎ ইমাম সাহেব) এশার নামাযের পর সূরায়ে মুল্ক পাঠ করে যায়েদের মৃত আত্মীয়-স্বজনের রূহের উপর ছওয়াব পৌঁছিয়ে দিবে, এটা জায়েয হবে কিনা? জবাবঃ- জায়েয হবে।”

          ফিক্বাহ্-এর মশহুর কিতাব “হাদীক্বায়ে নদিয়াহ্তে” আরো উল্লেখ আছে যে,

من تلا القران او ذكر الله تعالى لوجه الله واخذ شيأ من الدنيا وجعل عبادته هذه للمعطى جاز- و وجهه ان اخذ الدراهم صدقة من المعطى واخذ الصدقة لايمنع الثواب.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ তিলাওয়াত, যিকির ইত্যাদি আল্লাহ্র ওয়াস্তে করে এবং কিছু টাকা-পয়সার বিনিময়ে কাউকে উক্ত ইবাদতগুলো প্রদান করে, তবে এটা জায়েয হবে। তার কারণ এই যে, টাকা-পয়সা দাতার পক্ষ হতে দান, দান গ্রহণ করাতে ছওয়াবের ক্ষতি হয়না।”

          উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা অকাট্যভাবেই প্রমাণিত হয়েছে যে, মৃত ব্যক্তির জন্য ছওয়াব রেসানী বা ইছালে ছওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করে উজরত বা বিনিময় গ্রহণ করা সম্পর্কে মৌলভী আজিজুল হকের অখ্যাত পত্রিকার উক্ত বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল ও মনগড়া।

          মূলতঃ যারা গোমরাহীতে দৃঢ়, সর্বদা হারাম কাজে লিপ্ত ও হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল বানাতে অভ্যস্ত তাদের পক্ষেই সম্ভব, অকাট্য দলীল-প্রমাণাদি পেশ করার পরও হালালকে হারাম বলে ফতওয়া প্রদান করা। আর এদের প্রসঙ্গেই আল্লাহ্ পাক  তাঁর কালামে পাকে ইরশাদ করেন,

يايها الذين امنوا لاتحرموا طيبت ما احل الله لكم ولا تعتدوا ان الله لا يحب المعتدين.

অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্ পাক তোমাদের জন্যে পবিত্র বস্তু হতে যা হালাল করেছেন, তোমরা তা হারাম করোনা আর (এ ব্যাপারে) সীমালঙ্ঘন করোনা। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পাক সীমালঙ্ঘনকারীকে ভালবাসেন না।” (সূরা মায়িদা/৮৭)

          উপরোক্ত দলীল ভিত্তিক আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, মৃত ব্যক্তির জন্য ছওয়াব রেসানী বা ইছালে ছওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করেও উজরত বা বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয এবং উক্ত কুরআন শরীফ তিলাওয়াতের ছওয়াব অবশ্যই মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে থাকে এবং মৃত ব্যক্তির উপকারও হবে।

          {দলীলসমূহঃ- (১) তাফসীরে ইকলীল, (২) বাহরুর রায়েক, (৩) তাহতাবী, (৪) কাশফুল গুম্মাহু, (৫) ফতওয়ায়ে আলী আফেন্দী, (৬) ফতওয়ায়ে ফয়জী, (৭) ফতওয়ায়ে আবূ সাউদ ইমাদী, (৮) ফতওয়ায়ে আব্দুর রহীম আফেন্দী, (৯) মজমূয়ায়ে ফতওয়ায়ে আব্দুল হাই, (১০) মাদারেজুন নবুওয়াত, (১১) রোবউল ইফাদাহ, (১২) হাশিয়ায়ে মিসকীন, (১৩) জামিউর রুমূজ (১৪) শেফাউল আলীল, (১৫) ইয়াতীমাতুদ্দাহর লিল ইমাম আলাউদ্দীন হানাফী।

          (বিঃ দ্রঃ- এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত-এর ২৩ ও ২৪তম ফতওয়া বিভাগ এবং বিশেষ করে ৫৯, ৬০, ৬১, ৬২, ৬৩, ৬৪, ৬৫, ৬৬, ৬৭, ৬৮, ৬৯তম সংখ্যার মতামত বিভাগের উজরত সম্পর্কে “ভন্ডামী ফাঁস” মতামতটি পাঠ করুন।

মুহম্মদ আসাদ বিন ওয়ারিছ

আলেক জান্ডার এ্যাভি সুষ্ট, ইউ, কে

সুওয়ালঃ কুরুণে ছালাছা-এর হাদীস শরীফের তরজমা ও পূর্ণ তাশরীহ্ উল্লেখ করতঃ জানতে চাই যে, উক্ত তিন যুগ কত হিজরীতে আরম্ভ হয় এবং কত হিজরীতে শেষ হয়?

জাওয়াবঃ কুরুনে ছালাছাহ অর্থাৎ উত্তম তিন যুগ সম্পর্কিত হাদীস শরীফ ইবারতের তারতম্য অনুসারে একাধিক রাবী যেমন, হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হযরত উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু প্রমূখ ছাহাবী থেকে বর্ণিত আছে।

          আমরা এখানে মূল হাদীস শরীফটি উল্লেখ করে তার সঠিক তরজমা ও তাশরীহ্ (ব্যাখ্যা) তুলে ধরলাম। হাদীস শরীফটি হচ্ছে,

عن عمران حصين رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم خير امتى قرنى ثم الذين يلونهم ثم الذين يلونهم.

তরজমাঃ “হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম (যুগ) হলো আমার (ছাহাবীগণের) যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবেঈনগণের) যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী তাবে’ তাবেঈনগণের) যুগ।” (সহীহুল বুখারী ১ম জিঃ, ৩৬২, ৫১৫ পৃষ্ঠা, ২য় জিঃ  ৯৫১ পৃষ্ঠা, সহীহ্ মুসলিম ২য় জিঃ, ৩০৯ পৃষ্ঠা, আবূ দাউদ ২য় জিঃ ২৯২ পৃষ্ঠা, জামিউত্ তিরমিযী ২য় জিঃ ৪৫,৫৪ ও ২২৬ পৃষ্ঠা, ইবনে মাযাহ্ ১৭২ পৃষ্ঠা, মুসনাদু আহমদ ইবনে হাম্বল, মিশকাতুল মাছাবীহ্ ৫৫৩, ৫৫৪ পৃষ্ঠা)

          অপর একটি রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে,

خير القرون قرنى ثم الذين يلوهم ثم الذين يلونهم ثم يفشو الكذب.

অর্থঃ- “উত্তম যুগ হলো আমার (ছাহাবীগণের) যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবেঈগণের) যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবে’ তাবেঈগণের) যুগ। এরপর মিথ্যার প্রচলন শুরু হবে।” (নাসাঈ শরীফ, সায়েকাতুল মুসলিমীন, মাযহাব ও তাকলীদ)

তাশরীহ্ বা ব্যাখ্যাঃ প্রথমেই জেনে রাখা দরকার যে, উপরোক্ত হাদীস শরীফ দ্বারা সর্বোত্তম তিন যুগ তথা ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের, তাবেঈনগণের এবং তাবে’ তাবেঈনগণের যুগকে বুঝানো হয়েছে।

          যেমন, বুখারী শরীফের বিশ্ব বিখ্যাত শরাহ “ফতহুল বারী” ৭ম জিঃ ৫ ও ৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

(خير امتى قرنى) اى اهل قرنى …….. والمراد بقرن النبى صلى الله عليه وسلم وهذا الحديث الصحابة (ثم الذين يلونهم) اى القرن الذى بعدهم وهم التابعون (ثم الذين يلونهم) وهم اتباع التابعين واقتضى هذا الحديث ان تكون الصحابة افضل من التابعين والتابعون افضل من اتباع التابعين.

অর্থঃ- خير امتى قرنى. “আমার যুগের উম্মত সর্বোত্তম” অর্থাৎ আমার যুগের (ঈমানদার) অধিবাসী। অত্র হাদীস শরীফে বর্ণিত নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর র্ক্বণ বা যুগ বলতে হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের যুগকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। ثم الذين يلونهم “অতপর তাঁদের পরবর্তী যুগ” অর্থাৎ হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের পরবর্তী র্ক্বণ তথা তাবেঈনগণের ক্বরণ বা যুগ। ثم الذين يلونهم “অতঃপর তাঁদের পরবর্তী যুগ” আর তা হচ্ছে, তাবে’ তাবেঈনগণের যুগ। অত্র হাদীস শরীফ দ্বারা স্পষ্টভাবে বুঝানো হয়েছে যে, ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ তাবেঈনগণের উপর, এবং তাবেঈনগণ তাবে’ তাবেঈনগণের উপর মর্যাদা সম্পন্ন।”

          অনুরূপভাবে নিম্নোক্ত কিতাবগুলোতেও উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন-উমদাতুল ক্বারী ১৬তম জিঃ ১৭০ পৃষ্ঠা, ইরশাদুস্ সারী ৬ষ্ঠ জিঃ ৮০ পৃষ্ঠা, মুসলিম শরীফের বিশ্ব সমাদৃত শরাহ মুসলিম বি শরহিন নববী ৮ম জিঃ ৮৫ পৃষ্ঠা, মিশকাত শরীফের বিশ্ব খ্যাত শরাহ মিরকাত শরীফ ১১তম জিঃ ২৭৬ পৃষ্ঠা, শরহুত ত্বীবী ১১তম জিঃ ২১৪ পৃষ্ঠা এবং আত্তা’লীকুছ ছবীহ্ ৭ম জিঃ ২৯১ পৃষ্ঠা।

কুরুণে ছালাছাহ এর সময়সীমাঃ কুরুণে ছালাছাহ অর্থাৎ সর্বোত্তম তিন যুগ এর মধ্যে প্রথম ও প্রধানতম যুগ হচ্ছে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তথা ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের যুগ। হাদীস শরীফে বর্ণিত قرنى (ক্বরণী) অর্থাৎ আমার যুগ। হাদীসের ব্যাখ্যা গ্রন্থসমূহে এই প্রথম যুগ সম্পর্কে দু’টি পদ্ধতিতে গণনা পরিলক্ষিত হয়।

          প্রথমতঃ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আবির্ভাবের পর হতে ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের ইন্তিকাল পর্যন্ত একশত বিশ বছর প্রথম ক্বরণ বা যুগ। যেমন, আবু দাউদ শরীফের শরাহ “বযলুল মাজহুদ’-এর ৬ষ্ঠ জিঃ ২০৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

قال فى قتح الودود قيل قرنه صلى الله عليه وسلم من اول بعثته صلى الله عليه وسلم الى اخر من مات من الصحابة وكان مدته عشرين ومائة سنة.

অর্থঃ- “ফতহুল ওয়াদুদ” কিতাবে উল্লেখ রয়েছে যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আবির্ভাব (আনুষ্ঠানিকভাবে নুবুওওয়াত লাভ)-এর পর হতে ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের ইন্তিকাল পর্যন্ত হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগ। আর এর সময়সীমা হল একশত বিশ বছর পর্যন্ত।

          দ্বিতীয়তঃ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিদায়ের পর হতে ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের ইন্তিকাল পর্যন্ত একশত বৎসর প্রথম ক্বরণ বা যুগ।

          যেমন, বুখারী শরীফের বিখ্যাত শরাহ “ফতহুল বারী” এর ৭ম জিঃ ৬ পৃষ্ঠা, মিশকাত শরীফের শরাহ “আত্ তা’লীকুছ ছবীহ”-এর ৭ম জিঃ ২৯১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

وفى رواية بريدة عند احمد (خير هذه الامة القرن الذين بعثت فيهم) وقد ظهران الذى بين البعثة واخر من مات من الصحابة مائة سنة وعشرون سنة او دونها او فوقها بقليل على الاختلاف فى وفاة ابى الطفيل- وان اعتبر ذلك من بعد وفاته صلى الله عليه وسلم فيكون مائة سنة او تسعين اوسبعا وتسعين.

অর্থঃ- “মুসনাদে আহমদে হযরত বুরাইদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর রেওয়ায়েতে রয়েছে, (আমার উম্মতের এই যুগ উত্তম, যাতে আমি প্রেরিত হয়েছি), এখানে স্পষ্ট যে, আবির্ভাব থেকে শুরু করে ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের ইন্তিকাল পর্যন্ত একশত বছর এবং বিশ বছর অর্থাৎ একশত বিশ বছর অথবা তার কিছু কম বা বেশী এক র্ক্বণ বা যুগ। তবে হযরত আবু তুফাইল রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর ইন্তিকাল অনুযায়ী কম সংখ্যার উপর ইখতিলাফ (মত বিরোধ) রয়েছে। আর যদি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ইন্তিকালের পর থেকে গণনা শুরু করা হয় তবে একশত অথবা নব্বই নতুবা সাতানব্বই বছর হয়।

          উল্লেখ্য যে, হাদীস শরীফে বর্ণিত ক্বরণ বা যুগ এর ব্যাখ্যায় “ফতহুল বারী” ৭ম জিঃ ৫পৃষ্ঠা, “আত্ তা’লীকুছ ছবীহ” ৭ম জিঃ ২৯০ পৃষ্ঠায় একশত বছরকে মাশহুর তথা প্রসিদ্ধ মত বলা হয়েছে। যেমন বর্ণিত হয়েছে,

وقد وقع فى حديث عبد الله بن بسر عند مسلم ما يدل على ان القرن مائة وهو المشهور.

অর্থঃ- “ইমাম মুসলিমের নিকট আব্দুল্লাহ ইবনে বিসর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর হাদীস স্থান পেয়েছে। যা প্রমাণ করে যে, নিশ্চয়ই ক্বরণ বা যুগ একশত বছরে হয়। আর এটাই প্রসিদ্ধ মত।

          তাই উপরের আলোচনা থেকে আমরা সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগ। অর্থাৎ হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের যুগ যা তাঁদের ইন্তিকাল পর্যন্ত একশত বছর। অর্থাৎ একশত হিজরী পর্যন্ত তাঁদের যুগ যা প্রথম ক্বরণ বা যুগ হিসেবে মশহুর।

          এখানে উল্লেখ্য যে, সর্বশেষ ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ইন্তিকাল করেছেন ৯৮ হিজরীতে। কারো মতে ১০২ হিজরীতে। সুতরাং ছহীহ্ সমাধান মতে ১০০ হিজরী পর্যন্তই হচ্ছে প্রথম র্ক্বম বা যুগ।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক্বরণ বা যুগের সময়সীমা

          দ্বিতীয় ক্বরণ তথা তাবেঈনগণের যুগ শুরু একশত হিজরী থেকে, শেষ একশত সত্তর হিজরীতে। আর তৃতীয় ক্বরণ তথা তাবে’ তাবেঈনগণের যুগ শুরু এক শত সত্তর হিজরী থেকে, শেষ দু’শত বিশ হিজরীতে।

যেমন, এ প্রসঙ্গে মিশকাত শরীফের শরাহ “মিরকাত শরীফের” ১১তম জিঃ ২৭৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,

وقرن التابعين من مائة سنة الى نحو سبعين وقرن اتباع التابعين من ثم الى نحو العشرين ومائتين-

অর্থঃ- “তাবেঈনগণের যুগ একশত হিজরী থেকে একশত সত্তর হিজরী পর্যন্ত। আর তাবে’তাবেঈনগণের যুগ একশত সত্তর হিজরী থেকে দু’শত বিশ হিজরী পর্যন্ত।” অনুরূপভাবে বযলুল মাজহুদ শরহে আবী দাউদ ৬ষ্ঠ জিঃ ২০৩ পৃষ্ঠা, বুখারী শরীফ ১ম জিঃ ৩৬২ পৃষ্ঠা ১নং হাশিয়া এবং আবু দাউদ শরীফ ২য় জিঃ ২৯২ পৃষ্ঠা ৬নং হাশিয়ায় উল্লেখ আছে।

          অতএব, খাইরুল কুরুণ বা উত্তম যুগ বলতে কুরুণে ছালাছাহ্ তথা তিন যুগকে বুঝানো হয়েছে। যা পর্যায়ক্রমে হলো- প্রথম যুগঃ ছাহাবীগণের যুগ।  দ্বিতীয় যুগঃ তাবেঈনগণের যুগ। তৃতীয় যুগঃ তাবে’ তাবেঈনগণের যুগ। আর হিজরী সন হিসেবে মশহুর সময়কাল হচ্ছে, প্রথম যুগঃ শুরু থেকে ১০০ (একশত) হিজরী পর্যন্ত। দ্বিতীয় যুগঃ ১০০ (একশত) হিজরী থেকে ১৭০ (একশত সত্তর) হিজরী পর্যন্ত। তৃতীয় যুগঃ ১৭০ (একশত সত্তর) হিজরী থেকে ২২০ (দু’শত বিশ) হিজরী পর্যন্ত।

{দলীলসমূহঃ- (১) বুখারী শরীফ, (২) নাসাঈ শরীফ, (৩) ফতহুল বারী, (৪) ওমদাতুল কারী, (৫) ইরশাদুস্ সারী, (৬) শরহে কিরমানী, (৭) তাইসীরুল বারী, (৮) মুসলিম শরীফ, (৯) মুসলিম বি শরহিন্ নববী, (১০) শরহুল উবাই ওয়াস্ সিনূসী, (১১) আবু দাউদ শরীফ, (১২) বযলুল মাজহুদ, (১৩) আউনুল মা’বুদ, (১৪) শরহে আবী দাউদ লি বদরিদ্দীন আইনী, (১৫) তিরমিযী শরীফ, (১৬) তুহফাতুল আহওয়াযী, (১৭) আরিদাতুল আহওয়াযী, (১৮) মায়ারিফুস্ সুনান, (১৯) ইবনে মাজাহ, (২০) মিশকাত শরীফ, (২১) মিরকাত শরীফ, (২২) শরহুত্ ত্বীবী, (২৩) আত্ তা’লীকুছ ছবীহ, (২৪) লুময়াত, (২৫) আশয়াতুল্ লুময়াত, (২৬) মুযাহিরে হক্ব, (২৭) মিরয়াতুল্ মানাজীহ, (২৮) ফতহুল ওয়াদূদ, (২৯) মুসনাদু আহমদ ইবনে হাম্বল, (৩০) সায়েকাতুল মুসলিমীন, (৩১) মাযহাব ও তাকলীদ  ইত্যাদি।}

মুছাম্মত শাহানা শারমিন (স্নিগ্ধা)

সেনপাড়া, রংপুর

সুওয়ালঃ বর্তমান সময়ে বিভিন্ন দেশে নববর্ষ উপলক্ষে পহেলা তারিখে যেমন- পহেলা বৈশাখ, পহেলা জানুয়ারী ইত্যাদি তারিখে ভাল ভাল খাওয়ার জন্য উৎসাহ দেয়া হয়, এটা কতটুকু শরীয়তসম্মত? আর শরীয়তে কোন নির্দিষ্ট দিনে ভাল খাওয়ার জন্য উৎসাহ দেয়া হয়েছে কি?

জাওয়াবঃ শরীয়তের দৃষ্টিতে পহেলা বৈশাখ, পহেলা জানুয়ারীতে ভাল খাওয়ার জন্য আলাদাভাবে কোন তাগিদ করা হয়নি। বরং দশই মুর্হরমে প্রত্যেক পরিবারের প্রধান ব্যক্তিকে তার পরিবারের সদস্যদেরকে ভাল খানা খাওয়ানোর জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

          সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

من وسع على عياله فى النفقة يوم عاشوراء وسع الله عليه سائر سنته.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি তার পরিবারবর্গকে আশুরার দিন অর্থাৎ দশই মুর্হরমে ভাল খাদ্য খাওয়াবে, আল্লাহ্ পাক তাকে এক বৎসরের জন্য স্বচ্ছলতা দান করবেন।”

          এ সম্পর্কে কিতাবে একটি ওয়াকেয়া বর্ণিত রয়েছে- “এক ব্যক্তি ছিল গরীব, দিনমজুর। একবার অসুস্থতার কারণে তিনি তিন দিন যাবত কাজ করতে পারলেন না। চতুর্থ দিন ছিল আশুরার দিন। তিনি আশুরার দিনে ভাল খাওয়ার ফজিলত সম্পর্কে জানতেন। তখন ছিল কাজীদের(বিচারক) যুগ। কাজী সাহেব ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তার কাছে আশুরার ফজিলতের কথা বলে এবং নিজের অসুস্থতা ও পরিবারের তিনদিন যাবত অভুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করে ১০ সের আটা, ১০ সের গোশ্ত ও দুই দিরহাম চাইলেন। কাজী ছাহেব তাকে যোহরের সময় আসতে বললেন। যোহরের সময় কাজী ছাহেব বললেন, আছরে আসতে। কিন্তু এরপরে আসরের সময় মাগরিব এবং মাগরিবের সময় সরাসরি না করে দিলেন। দুঃখে অধীর হয়ে লোকটি তখন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ীর দিকে রওয়ানা হল। পথে ছিল এক খৃষ্টানের বাড়ী। লোকটিকে কাঁদতে দেখে উক্ত খৃষ্টান তাঁকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করল। কিন্তু বিধর্মী বিধায় খৃষ্টানকে প্রথমে কিছু বলতে চাইলেন না। অতঃপর খৃষ্টানের অধীর আগ্রহের কারণে তিনি আশুরার ফযীলত ও তার বর্তমান দূরবস্থার কথা ব্যক্ত করলেন। খৃষ্টান ব্যক্তি তখন উৎসাহী হয়ে তাকে আশুরার সম্মানার্থে ১০সের আটা, ১০সের গোস্ত, ২ দিরহাম এবং অতিরিক্ত আরও ২০ দিরহাম দিল এবং বললো যে, “তোমাকে আমি আশুরার সম্মানার্থে প্রতিমাসে এ পরিমাণ হাদিয়া দিব।”

          ঐ ব্যক্তি তখন তা নিয়ে বাড়ীতে গেল এবং খাবার তৈরী করে ছেলে-মেয়েসহ আহার করল। অতঃপর দোয়া করলো, “আয় আল্লাহ্ পাক! যে ব্যক্তি আমাকে সন্তুষ্ট করলো, আমার ছেলে-মেয়েদের মুখে হাসি ফুটালো, আল্লাহ্ পাক! আপনি তার দিল খুশী করে দিন, তাকে সন্তুষ্ট করে দিন।”

          ঐ রাত্রে কাজী ছাহেবকে স্বপে¦ দেখানো হলো যে, কাজী ছাহেবকে বলা হচ্ছে, “হে কাজী! তুমি মাথা উত্তোলন করো।” মাথা তুলে কাজী দেখতে পেলেন যে, তার সামনে দুটি বেহেশ্তের বালাখানা। একটি স্বর্ণের, আরেকটি রৌপ্যের। কাজী ছাহেব বললেন, “আয় আল্লাহ্ পাক! এটা কি?” গায়েবী আওয়াজ হলো, “এ বালাখানা দু’টি তোমার ছিল। কিন্তু এখন আর তোমার নেই। কারণ তোমার কাছে যে গরীব লোকটা এসেছিল, তাকে তুমি সাহায্য করার ওয়াদা করে ওয়াদা ভঙ্গ করেছ। এজন্য এ বালাখানা দু’টি এখন একজন খৃষ্টান লোকের।” কাজী ছাহেব বললেন, “আল্লাহ্ পাক! কোন সে খৃষ্টান?” কাজী ছাহেবকে বলা হলো যে, “অমুক খৃষ্টান।” অর্থাৎ স্বপে¦র মধ্যেই খৃষ্টানের পরিচয় ও ঠিকানা কাজী ছাহেবকে জানানো হলো।

          অতঃপর ঘুম থেকে উঠে ওজু ও নামায আদায় করে কাজী ছাহেব সেই ঠিকানা মোতাবিক খৃষ্টানের বাড়ীতে গেলেন। খৃষ্টান কাজী ছাহেবকে দেখে বিস্ময়াভিভূত হলো। কাজী ছাহেবকে খৃষ্টান বললো, “আপনি এত সকালে কি জন্য এলেন?” কাজী ছাহেব বললেন, “হে খৃষ্টান ব্যক্তি! তুমি গতরাত্রে কি কোন নেক কাজ করেছ?” খৃষ্টান ব্যক্তি বলতে নারাজ। তিনি বললেন, “কি ব্যাপার হয়েছে, আগে বলেন তারপর বলবো।” তখন কাজী ছাহেব  নিজের স্বপে¦র কথা খুলে বললেন যে, “এই ঘটনা ঘটেছে এবং তুমি নিশ্চয়ই গরীব লোকটাকে সাহায্য করেছ।” তখন খৃষ্টান ব্যক্তি তা স্বীকার করল। কাজী ছাহেব বললেন যে, “তুমি তো খৃষ্টান, তুমি মারা গেলে জাহান্নামে যাবে। তুমি তো এই বালাখানা পাবেনা। তোমার এটা নিয়ে কি ফায়দা হবে? তুমি তোমার এই নেক কাজ এক লক্ষ দিরহামের বিনিময়ে আমার নিকট বিক্রি করে দাও এবং তুমি তার কাছে প্রত্যেক মাসে যে ওয়াদা করেছ আমি তাকে তা দিয়ে দিব।” খৃষ্টান ব্যক্তি বললো, “এটা কখনও সম্ভব নয়। হে কাজী ছাহেব! আপনি সাক্ষী থাকেন, আমি কলেমা শরীফ পড়ে মুসলমান হয়ে গেলাম।” (সুবহানাল্লাহ্)

অতএব এটা ফিকির করার কথা যে, আশুরাকে সম্মান করার কারণে আল্লাহ্ পাক উক্ত খৃষ্টানকে ঈমান দিয়ে দিলেন এমনকি জান্নাত নসীব করলেন।

          {দলীলসমূহঃ- (১) জামিউল ফাওয়ায়েদ, (২) তিবরানী, (৩) বায়হাক্বী, (৪) ইবনে হাব্বান, (৫) মসনদে ফেরদৌস লিদ্ দায়লামী, (৬) মাসাবাতা বিস্ সুন্নাহ্ ইত্যাদি। }

মুছাম্মত আয়েশা ছিদ্দীকা

ডাংরারহাট সিনিয়র মাদ্রাসা, রাজারহাট, কুড়িগ্রাম

সুওয়াল ঃ আশুরা উপলক্ষে কয়টি রোজা রাখা সুন্নত? জানতে বাসনা রাখি।

জাওয়াবঃ হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

صوموا يوم عشوراء وخالفوا فى اليهود. صوموا قبله او بعده يوما.

অর্থ ঃ- “তোমরা আশুরার রোজা রাখ এবং (এ ব্যাপারে) ইহুদীদের বিপরীত কর। তোমরা আশুরার আগের দিনে অথবা পরের দিনেও রোজা রাখো।”

          এ হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আশুরার উদ্দেশ্যে দু’টি রোজা রাখা সুন্নত। মুর্হরমের ৯ ও ১০ তারিখ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ। তবে উত্তম হলো ৯ ও ১০ তারিখ রোজা রাখা। শুধু ১০ই মুর্হরম আশুরার উদ্দেশ্যে ১টি রোজা রাখা মাকরূহ্। কারণ ইহুদীরা সেদিনটিতে রোজা রেখে থাকে।

          {দলীলসমূহঃ (১) বুখারী, (২) মুসলিম, (৩) মিশকাত, (৪) তিরমিযী, (৫) মুয়াত্তা মালেক, (৬) জামিউল ফাওয়ায়িদ, (৭) মসনদে ফেরদৌস দায়লামী, (৮) মাসাবাতা বিস্ সুন্নাহ্, (৯) মুসনদে আহমদ ইত্যাদি)

সাইয়্যিদ মুহম্মদ ইউসুফ

মধ্য বাসাবো, ঢাকা

সুওয়াল ঃ হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর শাহাদতকে কেন্দ্র করে অনেকে জলীলুল ক্বদর ছাহাবী হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে দোষারোপ করে থাকে। এটা কতটুকু শরীয়তসম্মত? দয়া করে জানাবেন।

জাওয়াবঃ কোন নবী-রসূল আলাইহিস্ সালামকে যেমন কোন ব্যাপারে দোষারোপ করা জায়েয নেই তদ্রুপ কোন ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকেও কোন ব্যাপারে দোষারোপ করা জায়েয নেই।

আর আল্লাহ্ পাক তাঁর কালাম পাকে ইরশাদ করেন,

ولا تزر وازرة وزر اخرى.

অর্থঃ- “একজনের পাপের বোঝা অপরজন বহন করবেনা।” (সূরা আনয়াম/১৬৪)

          এ আয়াত শরীফের তাফসীরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সন্তানের অপরাধের জন্য পিতাকে এবং পিতার অপরাধের জন্য সন্তানকে দায়ী করা বৈধ নয়। যেমন, কাবিলের অপরাধের জন্য হযরত আদম আলাইহিস্ সালামকে, কেনানের অপরাধের জন্য হযরত নূহ আলাইহিস্ সালামকে দায়ী করা বৈধ নয়, তেমনি ইয়াযীদের অপরাধের জন্য হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে দায়ী করাও বৈধ নয়। বরং সম্পূর্ণ নাজায়েয, হারাম ও কুফরীর অন্তর্ভূক্ত।

আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন, ليغيظبهم الكفار.

অর্থঃ- “কাফিররাই তাঁদের (হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের) প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে থাকে।” (সূরা ফাতাহ্/২৯)

          আর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

من غاظه اصحاب محمد صلى الله عليه وسلم فهو كافر.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি হযরত মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, সে কাফির।”

          এখানে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার যে, আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদরের দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর মর্মান্তিক শাহাদতে মুসলিম উম্মাহ্র অন্তর ব্যাথাতুর হবে তা চরম সত্য কথা এবং এটি ঈমান মজবুতীর আলামতও বটে। কিন্তু এজন্য হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যিনি আল্লাহ্ পাক-এর রসূল হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জলীলুল ক্বদর ছাহাবী তাঁকে দোষারোপ করা কস্মিনকালেও শরীয়ত সম্মত হতে পারে না।

সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

لا تسبوا اصحابى فلو ان احدكم انفق مثل احد ذهبا مابلغ مد احدهم ولا نصيفه.

অর্থঃ- “তোমরা আমার ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে গালী দিওনা। কেননা যদি তোমাদের কেউ উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ আল্লাহ্ পাক-এর রাস্তায় দান কর, তবুও ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের এক মূদ্ বা অর্ধ মূদ্ গম দান করার ফযীলতের সমপরিমাণ ফযীলত অর্জন করতে পারবে না।” (বুখারী শরীফ)

হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে যে,

فمن سبهم فعليه لعنة الله والملئكة والناس اجمعين ولا يقبل الله منهم صرفا ولاعدلا.

অর্থঃ- “যে ব্যক্তি হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে গালী দেয়, তাদের প্রতি ফেরেশ্তা, মানুষ ও সকল মাখলুকাতের লা’নত এবং তাদের কোন ফরয ও নফল ইবাদত আল্লাহ্ পাক কবুল করবেন না।” (মুযাহেরে হক্ব)

          যারা হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে দোষারোপ করে মূলতঃ তারা তাঁর মহান মর্যাদা সম্পর্কে নেহায়েতই জাহিল, অজ্ঞ।

          স্মরণযোগ্য যে, হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছাহাবীগণের মধ্যে একজন বিশেষ শ্রেণীর ছাহাবী যাকে উলুল আযম বা জলীলুল ক্বদর ছাহাবী বলা হয়। তিনি ছিলেন আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন, কাতিবীনে ওহীর সদস্য, হাদীস শরীফের রাবী, ফক্বীহ্ ইত্যাদি মর্যাদার অধিকারী। তাঁর ইল্মের পূর্ণতা, হিদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা, তাঁর দ্বারা লোকদের হিদায়েত লাভ, কিতাব শিক্ষাদান এবং জাহান্নাম থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্ তায়ালার নিকট দোয়া করেছেন।

সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো ইরশাদ করেন,

اول جيش يغزون البحر قد اوجبوا.

অর্থঃ- “আমার উম্মতের প্রথম যে দল সমুদ্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে তাদের জন্য জান্নাত ওয়াজিব।” (বুখারী শরীফ)

          হযরত ইমাম তাবারী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ২৮ হিজরীতে সর্বপ্রথম সমুদ্র যুদ্ধের মাধ্যমে কাবরাসের উপর আক্রমণ করেন এবং কাবরাস তিনিই বিজয় করেন।”

          হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর মর্যাদা-মর্তবার মধ্যে অন্যতম মর্যাদা হলো- তিনি ছিলেন একজন আদিল বা ইন্সাফগার খলীফা। তাঁর ন্যায় বিচার ও ইন্সাফ সম্পর্কে কিতাবে উল্লেখ করা হয় যে, জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত ছাহাবী হযরত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, “আমার দৃষ্টিতে হযরত ওসমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, এরপর হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর চেয়ে অধিক ন্যায় বিচারক কেউ নেই।”

          এক ব্যক্তি মুয়াফা ইবনে ইমরানকে বললো, ন্যায় বিচারের দিক দিয়ে হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আযীয রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ? একথা শুনে তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, “হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের প্রতি কোন প্রকার কিয়াস করা যাবেনা। হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তো হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছাহাবী, কাতেবে ওহী ও আল্লাহ্ পাক-এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ‘আমীন’ (আমানতদার)।”

আমীরুল মু’মিনীন ফিল হাদীস হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুবারক রহমতুল্লাহি আলাইহিকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, “হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু শ্রেষ্ঠ, না হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আযীয রহমতুল্লাহি আলাইহি শ্রেষ্ঠ? তিনি বলেন, আল্লাহ্ পাক-এর কছম! হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে ঘোড়ায় চড়ে জিহাদে যেতেন, তখন ঘোড়ার নাকে যে ধুলোবালিগুলো প্রবেশ করতো, সে ধুলোবালিগুলোও হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আযীয রহমতুল্লাহি আলাইহি হতে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ।”

          সুতরাং এত সব মর্যাদা ও মর্তবার পরও যারা হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, তাঁকে নাকেছ বলে গালী দেয়, তাদের জন্যে হযরত ইমাম শিহাবুদ্দীন খাফ্ফাযী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কথাই অধিক প্রযোজ্য। তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে গালী দেয়, নাকেছ বলে, সমালোচনা করে, সে হাবিয়া দোযখের কুকুরসমূহের মধ্য হতে একটি কুকুর।”

উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হলো যে, হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু শুধু ছাহাবীই ছিলেন না, বরং উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, জলীলুল ক্বদর ছাহাবী ও খলীফা ছিলেন। সুতরাং হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু আনহুসহ সকল ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম সম্পর্কে সাবধানে কথা বলতে হবে। মূলত তাঁদের সকলের প্রতিই সুধারণা পোষণ করতে হবে, মুহব্বত করতে হবে এবং তাঁদেরকে অনুসরণ-অনুকরণও করতে হবে।

          কেননা তাঁরা হলেন দ্বীনের ইমাম এবং হাবীবে খোদা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শের বাস্তব প্রতিফলন। এইজন্য তাঁরা যেভাবে ঈমানের স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং আমলে যেভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন, ঠিক সেভাবেই ঈমানের স্বীকৃতি দেয়া এবং আমলে নিয়োজিত হওয়া পরবর্তী উম্মতের দায়িত্ব-কর্তব্য।      এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, امنوا كما امن الناس.

অর্থঃ- “তোমরা ঈমান আন যেভাবে অন্যান্য লোক অর্থাৎ ছাহাবা-ই-কিরাম ঈমান এনেছেন।” (সূরা বাক্বারা)

          আল্লাহ্ পাক হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম সম্পর্কে ইরশাদ করেন,

رضى الله عنهم ورضوا عنه.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ পাক তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তাঁরাও আল্লাহ্ পাক-এর প্রতি সন্তুষ্ট।”

তিনি আরো ইরশাদ করেন,

والذين اتبعوهم باحسان رضى الله عنهم.

অর্থঃ- “আল্লাহ্ ঐ সকল বান্দাগণের প্রতিও সন্তুষ্ট  যারা হযরত ছাহাবা-ই-কিরামকে উত্তম রূপে অনুসরণ করেন।” (সূরা তওবা/১০০)

          আর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

اصحابى كالنجوم بايهم اقتديتم اهتديتم.

অর্থঃ- “আমার ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ তারকা সাদৃশ্য, তাঁদের যে কাউকে তোমরা অনুসরণ করবে, তোমরা হিদায়েত প্রাপ্ত হবে।” (মিশকাত শরীফ)

          অতএব, আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি লাভ করতে চাইলে অবশ্যই ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে অনুসরণ-অনুকরণ করতে হবে এবং তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা, সমালোচনা করা ও নাকেস বলা হতে বিরত থাকতে হবে।

          {দলীলসমূহঃ- (১) বুখারী, (২) তিরমীযি, (৩) মিশকাত, (৪) ফতহুল বারী, (৫) উমদাতুল ক্বারী, (৬) ইরশাদুস্ সারী, (৭) তাইসীরুল ক্বারী, (৮) মিরকাত, (৯) আশয়াতুল লুমুয়াত, (১০) লুমুয়াত, (১১) শরহুত্ ত্বীবী,  (১২) মুযাহেরে হক্ব, (১৩) মাসাবাতা বিস্ সুন্নাহ্,  (১৪) মাজমাউয্ যাওয়ায়িদ, (১৫) তারীখুল ইসলাম লি হাফিয ইবনে যাহাবী, (১৬) বেদায়া, (১৭) নাসীমুর রিয়ায, (১৮) ফতওয়ায়ে হাদীছিয়াহ্, (১৯) তাবারী, (২০) মুসামেরা, (২১) তাফহীমাতে ইলাহিয়া ইত্যাদি}

          {বিঃ দ্রঃ বিস্তারিত জানতে হলে মাসিক আল বাইয়্যিনাত ২৪তম সংখ্যা পাঠ করুন।}

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ

সুওয়াল-জাওয়াব বিভাগ