ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪০)

সংখ্যা: ৯২তম সংখ্যা | বিভাগ:

-হযরত মাওলানা মুফ্তী মুহম্মদ আব্দুল হালীম

          আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মারিফাত-মুহব্বত, সন্তুষ্টি-রেজামন্দি হাছিলের বুনিয়াদ বা ভিত্তি হচ্ছে- “স্বীয় পীর ছাহেবের সন্তুষ্টি-রেজামন্দি।” আর ইহা সুবিদিত যে, যার ভিত্তি যত মজবুত ও শক্তিশালী তা তত মজবুত, শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। সেক্ষেত্রে আল্লাহ্ পাক-এর মারিফাত ও মুহব্বত হাছিলের লক্ষ্যে তার বুনিয়াদকে শক্তিশালী করার জন্য পূর্ববর্তী আউলিয়া-ই-কিরামগণ রীতিমত কঠোর রিয়াজত-মুশাক্কাতে মশগুল হতেন।

          অতীতের আউলিয়া-ই-কিরাম, যারা ইমাম-মুজতাহিদের পদ অলংকৃত করেছেন, তাঁরা এ বুনিয়াদ তথা স্বীয় পীর ছাহেবের সন্তুষ্টি-রেজামন্দির জন্যই জান-মাল, নিজেদের সম্মান-মর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তিকে পীর ছাহেবের কদম মুবারকে নিবেদিত করেছিলেন। শুধু তাই নয়, বরং রীতিমত তাঁর চেহারা মুবারকের ধ্যানও করতেন। আল্লাহ্ পাক-এর বিখ্যাত ওলী, ছদরুল উলামা ওয়াল মাশায়িখ, কুতুবুল ইরশাদ, আল্লামা হযরত আবু ইসহাক শামী চিশ্তী রহমতুল্লাহি আলাইহি, তাজুল উলামা ওয়াল মাশায়িখ, ইমামুল আইম্মা, হাফিজুল হাদীস, হযরত আবু বকর শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মত জগদ্বিখ্যাত আলিম, যিনি চল্লিশ হাজার হাদীস শরীফ হিফ্জ করেন, চারশত উস্তাদের নিকট হতে ইল্মের সনদপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তাঁরা স্ব স্ব মুরীদকে তাছাউফের তর্জ-তরীক্বা অনুযায়ী পরীক্ষা করার নিমিত্তে স্বীয় নামে কলেমা শরীফের তালক্বীন দিলেন। আর মুরীদ পীর ছাহেবকে সন্তুষ্ট করার জন্যই বিনা দ্বিধায় সে কলেমা শরীফ পাঠে স্বীকৃত হয়। মাহবুবে ইলাহী, রঈসুল মুহাদ্দিসীন, ফক্বীহুল উম্মত হযরত খাজা নিযামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাইহি আলাইহি যথারীতি প্রতিদিন ১৫ বার করে স্বীয় পীর ছাহেবের নামে ওযীফাই পাঠ করতেন। (তাযকিরাতুল আউলিয়া)

          আরো অসংখ্য আউলিয়া-ই-কিরাম গত হয়েছেন যারা স্বীয় পীর সাহেবের সন্তুষ্টি-রেজামন্দি হাছিলের জন্য তাঁর নামে ওযীফা পাঠ করতেন। এতো ত্যাগ-তিতিক্ষা, কঠোর রিয়াজত-মুশাক্কাতের ফসল যদি কোন সময় হাত ছাড়া হয়ে যায় তথা পীর ছাহেব অসন্তুষ্ট হন কিংবা এ কাঙ্খিত পথে কোন প্রতিবন্ধকতা আসে তবে ছালিক বা মুরীদ কিরূপ অবস্থার সম্মুখীন হয় তা নিম্নলিখিত ঘটনার দ্বারা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

          সুলতানুল আউলিয়া, মাহবুবে ইলাহী, রঈসুল মুহাদ্দিসীন, ফকীহুল উম্মত, খাজা নিযামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি ইল্মে ফিক্বাহ্ শিক্ষা সমাপ্ত করে ইল্মে তাছাউফ হাছিল করার জন্য শাইখুল ইসলাম, আমিরুল মুজাহিদীন, সুলতানুল আরিফীন, হাবীবুল্লাহ্ বাবা হযরত ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর খিদমতে নিজেকে নিবেদিত করলেন। আল্লাহ্ পাক-এর অশেষ রহমতে শাইখুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহিও তা’লীম-তরবিয়ত দ্বারা তাঁকে প্রতিপালন করতে লাগলেন।

          একদা শাইখুল ইসলাম, বাবা ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি “আওয়ারিফুল মায়ারিফ” কিতাবটি পড়তে শুরু করলেন। কয়েক সবক পড়ার পরই তিনি কোন কোন জায়গায় ঠেকে যেতে লাগলেন। শাইখুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর হাতে যেই নুস্খাটি ছিল তার লেখা ভাল ছিলনা, লেখা খুব সূক্ষ্ম ছিল। আর বয়স বেশী হওয়ার কারণে দৃষ্টি শক্তিও কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল। যার কারণে শাইখুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর পড়তে কষ্ট হচ্ছিল অথবা পড়তেছিলেন; কিন্তু থেমে থেমে তার তাৎপর্য উপলব্ধির জন্য চিন্তা করতেছিলেন। এমন সময় বাহরুল উলূম, রঈসুল মুহাদ্দিসীন, মাহবুবে ইলাহী হযরত নিযামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি বলে উঠলেন, “আমি মুন্তাজাবুদ্দীন মুতাওয়াক্কেল এর নিকট আওয়ারিফুল মায়ারিফের একটি ভাল নুস্খা দেখেছি।” সাথে সাথে শাইখুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি গম্ভীর স্বরে আওয়াজ করলেন, “অশুদ্ধ কপি সংশোধনের ক্ষমতা দরবেশের নেই?” একথাটি এক বার নয় বরং পর পর কয়েকবার বললেন। “আমি প্রথমে বুঝতে পারলাম না যে, ইহা কাকে বললেন।” কিন্তু শাইখুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন কয়েকবার একই উক্তি করলেন তখন আমার সহপাঠী মাওলানা বদরুদ্দীন ইসহাক বললেন, “তোমাকে লক্ষ্য করেই বলছেন।” একথা শুনে আমার জ্ঞান লোপ পেতে লাগল। আমি মাথার পাগড়ী খুলে ফেলে শাইখুল ইসলাম রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কদম মুবারকে লুটিয়ে পড়লাম। কেননা আমার ধারণা হল, আমার উক্তি হযরত শায়খের মর্যাদায় আঘাত  হেনেছে। কাজেই আমি ক্ষমা চেয়ে বলতে লাগলাম, “আমি শুধু হযরতকে জানালাম যে, অমুকের কাছে বিশুদ্ধ নুস্কা রয়েছে। এতে আমার জ্ঞানের প্রশস্ততা প্রকাশ কিংবা হযরতের জ্ঞানের সংকীর্ণতার প্রতি ইঙ্গিত করা আমার আদৌ উদ্দেশ্য ছিলনা।” কিন্তু আমি বললে কি হবে! আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য তা না হলেও আমার উক্তির দ্বারা সেই ভাব ফুটে উঠেছে। কাজেই যতই ক্ষমা প্রার্থনা করলাম আপাতভাবে ক্ষমা পেলামনা।

          হায়! সবকিছুই বিসর্জন দিয়ে পীর ছাহেবের দরবার শরীফে এলাম কিন্তু ‘অমুকের নিকট একটি বিশুদ্ধ কপি দেখেছি’ এ উক্তি আমাকে আজ এই অবস্থায় পৌঁছে দিল। আমার সবকিছুই ধুলিসাৎ হয়ে গেল। আমি অবশ্য বলতে পারতাম, “হযরত এখানে আমার এমন জঘন্য অপরাধ কি হয়েছে যে, তা ক্ষমার অযোগ্য?” আমি তো শুধু এতটুকুই প্রকাশ করেছি যে, “অমুকের নিকট একটি বিশুদ্ধ কপি আছে, তা দেখেছি মাত্র।” কিন্তু আমি তা বলতে পারলাম না। কারণ “আমি নিজের আভ্যন্তরীণ রোগের চিকিৎসা করতে এসেছি। হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলার দুর্বলতার চিকিৎসা করার জন্য অজুধনে আসিনি। আমি তো পূর্বেই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, শাইখুল ইসলাম, কুতুবুল মাশায়িখ, আমিরুল মুজাহিদীন বাবা ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি একজন বিচক্ষণ চিকিৎসক। অতএব, তাঁর খুঁত বের করার অধিকার কোথায়?”

          হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা-এর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধের কোন পরিবর্তন না দেখে নিরাশ হয়ে দরবার শরীফ হতে উঠে পড়লাম। দুঃখ ও চিন্তায় আমার মন এত ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ল যে, আমার চক্ষু হতে অশ্রুর বন্যা বয়ে যাচ্ছিল। চিকিৎসক আমার চিকিৎসা করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করেছেন। আমার রোগের উপশম হবে কিভাবে? আর এই রোগাক্রান্ত জীবন রেখে কি লাভ হবে? কাজেই আত্মহত্যা করার উদ্দেশ্যে একটি কুপের নিকট গিয়ে পৌঁছলাম; কিন্তু আবার ভাবলাম, লোকে মনে করবে আমাকে কেউ ধাক্কা মেরে কূপের ভিতর ফেলে দিয়েছে। আর এই অপরাধে বহু লোককে গ্রেফতার করা হবে। এতদ্ব্যতীত দুঃখ ও চিন্তার ফলে জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পাবার উপক্রম হতে থাকলেও মনের ভিতর এই চিন্তাও জেগেছিল যে, আত্মহত্যা করা কবীরা গুণাহ্। অতঃপর আত্মহত্যার সংকল্প পরিত্যাগ করলাম। অবশেষে তথা হতে ফিরে এসে অজুধনের মাঠে ও জঙ্গলে বিলাপ করতে করতে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। এইরূপে মাসাধিক কাল অতিবাহিত হয়ে গেল।

          শায়খ শিহাবুদ্দীন নামে শাইখুল ইসলাম হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা-এর একজন পুত্র ছিলেন। তাঁর সাথে আমার বেশ ভাব ছিল। তিনি আমাকে এই দূরবস্থায় দেখে সদয় হয়ে হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলাকে আমার দূরবস্থার কথা অবহিত করলেন। হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা বললেন, “হ্যাঁ, আমার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। তাঁকে আসতে বল।” অনুমতি পেয়ে আমি উর্ধ্বশ্বাসে দৌঁড়ে গিয়ে হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা-এর কদম মুবারকের উপর লুটে পড়লাম। হযরত পীর ছাহেব ক্বিবলা দয়া পরবশ হয়ে আমার অপরাধ ক্ষমা করলেন এবং পরের দিন আমাকে দরবার শরীফে উপস্থিত থাকতে বললেন। আমি যথাসময়ে দরবার শরীফে উপস্থিত হলে তিনি বললেন, “রহস্যের পর্দা উম্মোচন হয়েছে, বাবা নিযাম! তোমার অবস্থার পূর্ণতা সাধনের নিমিত্তই তোমার সাথে এইরূপ কঠোর ব্যবহার করতে হয়েছে। মুরীদের সমস্ত বিশৃঙ্খলাকে সুবিন্যস্ত করা এবং সমস্ত অপরিস্কার-অপরিচ্ছন্নতাকে ঘষে-মেজে পরিস্কার করে দেয়াই পীর ছাহেবের কাজ।” এই বলেই তিনি তাঁকে খাছ পোশাক পরিয়ে অতি উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছিয়ে দিলেন।” (সুবহানাল্লাহ্) (তায্কিরাতুল আউলিয়া)

          স্মর্তব্য যে, পীর ছাহেব হচ্ছেন আত্মার অভিজ্ঞ চিকিৎসক যেমন ডাক্তার কোন কোন রোগে কাউকে অত্যন্ত তিক্ত ঔষধ সেবন করান তদ্রুপ পীর ছাহেবও মুরীদকে তিক্ত ঔষধ সেবন করান অর্থাৎ পীর ছাহেবের অসন্তুষ্টি মাঝেও আভ্যন্তরীন রোগের চিকিৎসা নিহীত।

          সুতরাং স্বীয় পীর ছাহেবের সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি উভয় অবস্থাকে খায়ের বরকত মনে করা আবশ্যক। আল্লাহ্ পাক আমাদের সবাইকে এই গুঢ় তত্ত্ব উপলদ্ধি করার তাওফিক দান করুন। (আমীন)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪১)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪২)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৩)

হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২৬২)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৪)