পবিত্র যিলহজ্ব মাসের ফযীলত

সংখ্যা: ৯১তম সংখ্যা | বিভাগ:

হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ শোয়াইব আহমদ

          মহান আল্লাহ্ তায়ালার গণনা হিসেবে ১২টি মাসের সর্বশেষ মাস এবং তাঁর ঘোষণাকৃত ৪টি হারাম বা সম্মানিত মাসের দ্বিতীয় মাসটিই হচ্ছে পবিত্র “যিলহজ্ব।”

          যে পাঁচটি স্তম্ভের উপর দ্বীন ইসলামের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পবিত্র হজ্ব আদায়ের ফরযটি আল্লাহ্ পাক এ মাসেই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। অর্থাৎ এ সম্মানিত মাসে পবিত্র হজ্ব পালিত হয় বলেই এ মাসের নাম যিলহজ্ব বা হজ্বের মাস। আল্লাহ্ পাক তাঁর কালাম পাকে ইরশাদ করেন,

لله على الناس حج البيت من استطاع اليه سبيلا.

অর্থ: “যে ব্যক্তির হজ্ব করার সামর্থ আছে তার প্রতি আল্লাহ্ পাক-এর জন্য হজ্ব করা ফরয।” (সূরা আলে ইমরান/৯৭) প্রত্যেক স্বাধীন, বালেগ, সুস্থ, দৃষ্টি শক্তি সম্পন্ন মুসলমানের যদি সাংসারিক প্রয়োজনীয় ব্যয়ের এবং হজ্বে যাওয়া ও ফিরে আসা পর্যন্ত পরিবার বর্গের ভরণ-পোষণের অতিরিক্ত সম্বল ও পাথেয়, যানবাহনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা থাকে এবং যাতায়াতের রাস্তাও নিরাপদ হয়, তবে তার প্রতি জীবনে একবার হজ্ব করা ফরয। তারপর সামর্থ থাকলে একাধিকবার হজ্ব করা সুন্নত।

          এ মাসের ফযীলত সম্পর্কে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

سيد الشهور شهر رمضان واعظمها كرمة ذى الحجة.

অর্থ: “মাস সমূহের সর্দার রমাদ্বান মাস, আর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব ও বুযুর্গী সম্পন্ন মাস যিলহজ্ব।”

          অর্থাৎ রমাদ্বান মাস যদিও সর্দারের মর্তবা লাভ করেছে তবে যিলহজ্ব মাস সম্মানের দিক দিয়ে প্রথম স্থান দখল করে আছে।

          এ মর্যাদাপূর্ণ পবিত্র মাসে তিনটি বিশেষ মর্তবাপূর্ণ দিন রয়েছে- (১) ইয়াওমে তারবিয়াহ অর্থাৎ যে দিন হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম স্বপ্ন যোগে হযরত ইসমাঈল আলাইহিস্ সালামকে কুরবানী করার নির্দেশ লাভ করেছিলেন। (২) ইয়াওমে নহ্র অর্থাৎ কুরবানীর দিন, (৩) ইয়াওমে আরাফাহ্ অর্থাৎ হজ্ব আদায়ের দিন। এছাড়াও হজ্ব আদায়ের পরবর্তী তিন দিন, যাকে আইয়ামে তাশরীক বলা হয়, তাও অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ।

          আল্লাহ্ পাক বছরের কোন কোন দিনকে আলাদাভাবে ফযীলতপূর্ণ করেছেন সত্যিই। কিন্তু যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশ দিনকে একই সাথে যে খাছ মর্যাদা-মর্তবা দানে ভরপুর করেছেন, তা “সূরা ফজর” পাঠে অনুধাবন করা যায়। আল্লাহ্ পাক এ সূরার প্রারম্ভে উক্ত দশ দিনের কছম খেয়ে আয়াত শরীফ নাযীল করেন। এ সূরা পাঠ করা সম্পর্কে “রাহাতিল কুলূব” কিতাবে বর্ণিত হয়েছে, শায়খুল ইসলাম হযরত খাজা ফরিদুদ্দীন মাসউদ গন্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি ইরশাদ করেন, গরীবে নেওয়াজ হাবীবুল্লাহ্ হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চীশ্তি রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর বেছাল শরীফের পর তাঁকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞাসা করা হলো, “হযরত! এ মহান সৌভাগ্য কিভাবে লাভ করলেন?” উত্তরে তিনি বললেন, “হক্ব তায়ালা স্বীয় রহমতের উছীলায় আমার সকল মুশকিল আসান করেছেন। যখন আমাকে আরশের নীচে নিয়ে যাওয়া হলো, আমি মাথা অবনত করলাম। আওয়াজ হলো, মাথা উপরে তুলুন। এতো ভয় কি জন্য পাচ্ছেন? আমি আরয করলাম, “ইয়া বারে ইলাহী! আমি আপনার জব্বারী শান হতে ভয় পাচ্ছি।” পুনরায় আওয়াজ হলো, হে মুঈনুদ্দীন! যে ব্যক্তি আমার জন্য কাজ করে, আমি তার জন্য কাজ করি। জেনে রাখ, যে ব্যক্তি যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশদিন “সূরা ফজর” তিলাওয়াত করে, তার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যাও আমি তোমাকে পুরস্কৃত করলাম এবং দীদারকারীর মর্যাদা দান করলাম।”

          উক্ত কিতাবে আরো বর্ণিত হয়েছে যে, রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি ঐ (যিলহজ্বের) দশ দিন নিম্নোক্ত নিয়মে ছয় রাকায়াত নামায পড়বে, সে এত অধিক ছওয়াবের অধিকারী হবে যে, সমস্ত মখলুক যদি একত্রিত হয়ে তার পরিমাণ নির্ধারণ করতে চায়, তথাপিও তা সম্ভব হবেনা।”

নামায পড়ার নিয়মঃ ১ম, ২য়, ৩য়, ৪র্থ রাকায়াতে “সূরা ফাতিহার পর যথাক্রমে সূরা আছর, কুরাঈশ, কাফিরূন, নছর ১বার এবং ৫ম, ৬ষ্ঠ রাকায়াতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাছ ৩বার পাঠ করতে হবে।

হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে,

افضل ايام الدنيا ايام عشرة ذى احجة.

অর্থ: “পৃথিবীর দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশী ফযীলতপূর্ণ দিন হচ্ছে যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশ দিন। এর প্রত্যেক দিনের রোযা এক বছরের রোযার সমান এবং প্রত্যেক রাত্রির ইবাদত শবে ক্বদরের ইবাদতের সমতুল্য।”

          হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হয়েছে, “আল্লাহ্ পাক-এর দরবারে যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশ দিনের ইবাদত-বন্দেগীর চেয়ে বেশী প্রিয় আর কোন দিনের ইবাদত-বন্দেগী নেই।”

          উম্মূুল মু’মিনীন হযরত হাফসা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বর্ণনা করেন, উম্মূুল মু’মিনীন হযরত হাফসা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বর্ণনা করেন, “চারটি জিনিষ আল্লাহ্ পাক -এর হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো ছাড়েননি। (১) যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশ দিন রোযা রাখা, (২) আশুরার দিনের রোযা রাখা, (৩) আইয়ামে বীয তথা প্রত্যেক মাসে তিন দিন রোযা রাখা, (৪) ফজরের ফরয নামাযের পূর্বে দু’রাকায়াত সুন্নত নামায আদায় করা।

          এছাড়া আরো অনেক ফযীলতের কথা হাদীস শরীফ ও অন্যান্য কিতাবাদিতে বর্ণিত হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ্।

          অতএব, যাদের প্রতি হজ্ব ফরয, তারা যথারীতি হজ্ব আদায় করে আর যাদের প্রতি হজ্ব ফরয হয়নি, তারা উক্ত দিনসমূহে যথারীতি ইবাদত-বন্দেগী করে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি তলব করা উচিৎ। আল্লাহ্ পাক আমাদের সকলকে তাওফিক দান করুন। (আমীন)

পবিত্র যিলক্বদ মাসের ফযীলত

মুহররম মাস ও তার আলোচনা

ছফর মাস ও তার আলোচনা

রবিউল আউয়াল মাস ও তার  আলোচনা

রবিউস্ সানী মাস ও তার আলোচনা