পবিত্র রমাদ্বান মাসের ফযীলত

সংখ্যা: ৮৮তম সংখ্যা | বিভাগ:

-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ শোয়াইব আহমদ

          আরবী নবম মাসের নাম রমাদ্বান। আল্লাহ্ পাক এই রমাদ্বানুল মোবারক মাসেই তাঁর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি কুরআন মজীদ নাযিল করেন।

          এ সম্পর্কে তিনি এরশাদ করেন,

شهر رمضان الذى انزل فيه القران هدى للناس.

অর্থঃ- “রমাদ্বান মাস এমন একটি মাস যে মাসে মানুষের হিদায়েতের জন্য কুরআন শরীফ নাযিল করা হয়েছে।” (সূরা বাক্বারা/ ১৮৫)

                   উল্লেখ্য, বারটি মাসের মধ্যে একমাত্র রমাদ্বান মাসের নাম আল্লাহ্ পাক তাঁর কালাম পাকে সরাসরি বর্ণনা করেছেন। আর হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীস শরীফে এরশাদ করেন, “রমাদ্বান মাস হচ্ছে- সকল মাসের সর্দার।”

          ‘‘রমাদ্বান’’ শব্দটি এসেছে “রমদ্ব” থেকে। এর অর্থ হচ্ছে- জ্বালিয়ে-পুঁড়িয়ে দেয়া। মাসটির নাম এ জন্য রমাদ্বান রাখা হয়েছে, যেহেতু মানুষ এ মাসে রোজা রেখে নিজের কু-প্রবৃত্তিকে জ্বালিয়ে-পুঁড়িয়ে দেয়।

          রমাদ্বান মাসটি উম্মতে মুহম্মদীর প্রতি আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ হতে এক খাছ নিয়ামত। এ মাসটিতে দিনে রোজা রাখা আল্লাহ্ পাক ফরয করেছেন এবং রাতে তারাবীহ্র নামাযকে সুন্নত করেছেন।

          হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, “তাক্বওয়া হচ্ছে সমস্ত আমলের মূল।” এই তাক্বওয়া অর্জনের মাসই হচ্ছে রমাদ্বান মাস। এ মাসটিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ভাগ হচ্ছে- “রহমত”, দ্বিতীয় ভাগ “মাগফিরাত” এবং তৃতীয় ভাগ “নাযাত” লাভের কারণ। মূলতঃ এ মাসের প্রতিটি দিন ও রাত্রিই বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার অধিকারী। এতে প্রার্থনাকারীর কমপক্ষে একটি দোয়া বা প্রার্থনা নিশ্চিত কবুল হয়ে থাকে। এ মাসের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাত্রিতে “লাইলাতুল ক্বদর” বা “শব-ই ক্বদর” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই একটি মাত্র রাত্রির (ইবাদত-বন্দেগীর) মর্যাদা হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। যা পূর্বেকার কোন নবী-রসূল আলাইহিস্ সালাম ও তাঁর উম্মতকে দেয়া হয়নি। আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হাবীবুল্লাহ্, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মান ও ফযীলতের কারণেই তাঁর উম্মতরা এ মোবারক রাত্রিটি লাভ করেছেন। (সুবহানাল্লাহ্) এ মোবারক রাত্রিটি সহজে পাওয়ার জন্য শেষ দশ দিন ই’তিকাফ করা সুন্নত ও অশেষ ফযীলত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

          হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হাবীবুল্লাহ্, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের নিয়তে রমাদ্বানের রোজা রাখবে তাঁর পূর্বের গুণাহ্সমূহ মাফ করা হবে এবং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের নিয়তে রমাদ্বানের রাত্রি ইবাদতে কাটাবে তার পূর্বের গুণাহ্সমূহ মাফ করা হবে এবং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের নিয়তে ক্বদরের রাত্রি ইবাদতে কাটাবে তার পূর্বকৃত গুণাহ্সমূহ মাফ করা হবে।” (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

          তিনি আরো বর্ণনা করেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, “মানব সন্তানের প্রতিটি নেক আমল দশগুণ হতে সাত শতগুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়ে থাকে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, “রোজা ব্যতীত।”কেননা রোজা আমারই জন্য এবং আমিই তার প্রতিফল দান করব (যত ইচ্ছা তত)। কেননা সে আমার জন্যই আপন প্রবৃত্তি ও খানা-পিনার জিনিস ত্যাগ করেছে।” রোজাদারের জন্য দু’টি আনন্দ রয়েছে। একটি “ইফতারের সময়” এবং অপরটি “বেহেশ্তে আপন পরওয়ারদিগার-এর দীদার লাভের সময়। আর নিশ্চয়ই রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ্ পাক-এর নিকট মেশ্কের খুশবু অপেক্ষাও অধিক সুগন্ধময়। রোজা মানুষের জন্য (দোযখের আগুন হতে রক্ষার) ঢাল স্বরূপ। সুতরাং যখন তোমাদের কারো রোজার দিন আসে সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং অযথা শোরগোল না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে মারামারি করে সে যেন বলে, আমি একজন রোজাদার।” (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

হযরত আব্দুল্লাহ্ বিন আমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, খাতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, “রোজা এবং কুরআন শরীফ (কিয়ামতে) আল্লাহ পাক-এর নিকট বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, ‘আয় পরওয়ারদিগার! আমি তাকে দিনের বেলায় খাবার গ্রহণ ও প্রবৃত্তি বা ইচ্ছা পূরণ থেকে বিরত রেখেছি। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন’ এবং কুরআন শরীফ বলবে, ‘আমি তাকে রাত্রিতে নিদ্রা হতে বিরত রেখেছি। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। অতএব, উভয়ের সুপারিশই কবুল করা হবে।” (বায়হাক্বী শরীফ) এ মোবারক মাসে আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একটি নফল আমল অন্যান্য মাসে একটি ফরয আমলের নেকীর সমান এবং একটি ফরয আমল অন্যান্য মাসের সত্তরটি ফরয আমলের নেকীর সমান। কিন্তু একটি পাপের ক্ষেত্রে একটি পাপেই লিখা হয়ে থাকে। (সুবহানাল্লাহ্) এ মাসটি পরস্পর সহানুভূতির মাস। এতে মু’মিনের রিযিক বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। এ মাসে যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে শুধু এক চুমুক দুধ অথবা একটি খেজুর অথবা এক ঢোক পানি দ্বারা ইফতার করাবে এটা তার গুণাহসমূহ ক্ষমা ও দোযখের আগুন হতে মুক্তির কারণ স্বরূপ হবে এবং তার ছওয়াব হবে উক্ত রোজাদারের সমান। (সুবহানাল্লাহ্) আর যে ব্যক্তি এ মাসে কোন রোজাদারকে তৃপ্তিসহকারে পানাহার করাবে আল্লাহ্ পাক তাকে হাউযে কাওছার হতে পানীয় পান করাবেন, জান্নাতে প্রবেশ করা পর্যন্ত সে কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। (সুবহানাল্লাহ্)

আর যে ব্যক্তি এ মাসে আপন দাস-দাসীদের (অধীনস্থ কর্মচারী) কার্যভার হালকা করে দিবে আল্লাহ্ তায়ালা তাকে মাফ করে দিবেন এবং তাকে দোযখ থেকে মুক্তি দান করবেন। (সুবহানাল্লাহ) মূলতঃ মাসটির ফযীলত বর্ণনার অপেক্ষাই রাখে না। প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জরুরত আন্দাজ এর ফযীলত-বুযুর্গী সম্পর্কে জেনে তার হক আদায় করে আল্লাহ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সন্তুষ্টি হাছিল করা দায়িত্ব ও কর্তব্য।

পবিত্র শাওয়াল মাসের ফযীলত

পবিত্র যিলক্বদ মাসের ফযীলত

পবিত্র যিলহজ্ব মাসের ফযীলত

মুহররম মাস ও তার আলোচনা

ছফর মাস ও তার আলোচনা