ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪২)

সংখ্যা: ৯৪তম সংখ্যা | বিভাগ:

-হযরত মাওলানা মুফতী মুহম্মদ আব্দুল হালীম

৩৪। পীর ছাহেবের কোন কথা কাজ কিংবা অন্য কোন বিষয়ের আমানত নষ্ট করবেনা।

          আমানত সংরক্ষণ করা স্বীয় পীর ছাহেবের খালিছ সন্তুষ্টি-রেজামন্দী ও নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। পীর ছাহেবের আমানত সংরক্ষণ দ্বারা ছালেক বা মুরীদ- আল্লাহ্ পাক ও তদ্বীয় রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাস্সাম হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আমানত সংরক্ষণের শিক্ষা ও শক্তি অর্জন করে থাকে। মারিফাত ও মুহব্বতের খাজিনা হাছিলের যোগ্যতা পয়দা হয়। বাতিনী নিয়ামতপ্রাপ্তির উপযুক্ত হয়ে উঠে।

          উল্লেখ্য যে, আমানতের বিষয়টি এমনি গুরুত্বপূর্ণ যে, তার মাধ্যমে যেমন স্বীয় পীর ছাহেবের খালিছ সন্তুষ্টি ও নৈকট্য পাওয়া যায় তেমনি তা সংরক্ষিত না হলে তাঁর অসন্তুষ্টির রোষাণলে পড়তে হয়। আর পীর ছাহেবের অসন্তুষ্টির কারণে মহান আল্লাহ্ পাক রব্বুল আলামীন ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে অসন্তুষ্ট হন তা বলা নিস্প্রয়োজন।

আল্লাহ্ পাক কালামে পাকে ইরশাদ করেন,

يايها الذين امنوا لاتخونوا الله والرسول وتخونوا امنتكم ومنتكم وانتم تعلمون.

অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ পাক ও রসূল পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আমানতের খিয়ানত করনা এবং তোমাদের পরস্পরের মাঝে আমানতের খিয়ানত বা বিশ্বাস ঘাতকতা করনা।” (সূরা আনফাল/২৭)

          আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাস্সাম হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “মুনাফিকের আলামত বা চিহ্ন হচ্ছে চারটি। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আমানতের খিয়ানত করা।”

          উল্লেখ্য যে, আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরেই হচ্ছে পীর ছাহেবের হক্ব। মুরীদ সে হক্ব সংরক্ষণের পূর্ণ প্রতিশ্রুতি জ্ঞাপন করেই ছোহবত লাভের সুযোগ পায়। কাজেই হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমগণ যেমনিভাবে আখিরী রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আমানত সংরক্ষণ করেছেন। তেমনিভাবে মুরীদের জন্যও স্বীয় পীর ছাহেবের কথা-কাজ ইত্যাদি বিষয়ের পূর্ণ আমানত রক্ষা করা আবশ্যক। হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ আমানত সংরক্ষণের প্রতি এমন যতœবান ছিলেন যে, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের প্রতি বিশেষ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে,

لكل نبى صاحب السر صاحب سرى معوية ابن ابى سفيان.

অর্থঃ- “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাস্সাম হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “প্রত্যেক নবীর গুপ্ত রহস্যভেদ অবগত ছাহাবী ছিলেন। আমার গুপ্ত ভেদ অবহিত ছাহাবী হচ্ছেন হযরত মুয়াবিয়া ইবনে আবূ সুফিয়ান রদ্বিয়াল্লাহু আনহু।

          হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আবূ আমীরা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাস্সাম হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর জন্য এভাবে দোয়া করেছেন যে, اللهم اجعله هاديا مهديا واهدبه.

অর্থঃ- “আয় আল্লাহ্ পাক! আপনি তাঁকে (মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে) সঠিক পথ প্রদর্শনকারী, সত্য পথের অনুসারী এবং তাঁর দ্বারা মানুষের হিদায়েত নছীব করুন।” (তিরমিযী শরীফ)

এমনিভাবে “মিশকাত শরীফের” ৫৭৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, حذيفة صاحب السر.

অর্থঃ- “হযরত হুযাইফা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হচ্ছেন গুপ্ত ভেদ অবহিত ছাহাবী।” সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, “হযরত হুযাইফা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তোমাদেরকে যা বলে তা সত্য বলে মনে করো।” (মিশকাত শরীফ)

          প্রকাশ থাকে যে, তিনি তাঁর নিকট মুনাফিকদের নামের তালিকা দিয়েছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে আমিরুল মু’মিনীন, খলিফাতুল মুসলিমীন, ফারুকে আযম, হযরত উমর ইবনুল খত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সে ব্যক্তির জানাযার নামাযে শরীক হতেন যার জানাযার নামাযে ছহেবুস্ সির হযরত হুযাইফা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু শরীক থাকতেন।

          ফক্বীহুল উম্মত হযরত আব্দুল্লাহু ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন ছহেবুস্ সিরগণের অন্যতম। তিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এমন নৈকট্য লাভ করেছিলেন যে, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ তাঁকে আহলে বাইতগণের অন্তর্ভূক্ত বলে মনে করতেন। (মিশকাত শরীফ)

          খাদিমু রসূলিল্লাহ হযরত আনাস ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে তো সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওসীয়তই করেছেন, “হে ছেলে! তুমি আমার গোপন কথা গোপন রাখবে। তবেই তুমি ঈমানদার হবে।” হযরত আনাছ ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, “আমার মা এবং অন্যকেউ আমার কাছে রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গোপন কথা জিজ্ঞেস করলে, আমি তা বলিনি। আমি তাঁর কোন গোপন কথা কারও কাছে প্রকাশ করিনি।”

           এক দিনের ঘটনা, তিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রসূলুল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রয়োজনীয় কাজ সেরে দুপুরে বাড়ীর দিকে চলছেন। পথে দেখলেন, তাঁরই সমবয়সী ছেলেরা খেলছে। তাঁর কাছে খেলাটি ভালো লাগলো। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন, তাদের খেলা দেখতে। কিছুক্ষণ পর দেখলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের দিকে আসছেন। তিনি এসে প্রথমে ছেলেদের সালাম দিলেন, তারপর হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর হাতটি ধরে তাঁকে কোন কাজে পাঠালেন। আর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর অপেক্ষায় একটি দেয়ালের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকলেন। হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু কাজ সেরে ফিরে এলে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাড়ীর দিকে ফিরলেন। আর তিনিও চললেন বাড়ীর দিকে। ফিরতে বিলম্ব হওয়ায় তাঁর মা জিজ্ঞেস করলেন, এত দেরী হলো কেন? তিনি বললেন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি গোপন কাজে গিয়েছিলাম এজন্য ফিরতে দেরী হয়েছে। মা মনে করলেন, ছেলে হয়তো সত্য গোপন করছে, এই জন্য জানতে চাইলেনঃ কী কাজ? হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু জবাব দিলেন একটি গোপন কথা, কাউকে বলা যাবেনা। মা বললেন, তাহলে গোপনই রাখ, কারও কাছে প্রকাশ করোনা। আনাস রদ্বিয়াল্লাহু আনহু আজীবন এ সত্য গোপন রেখেছেন। একবার তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র সাবিত রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন সেই কথাটি জানতে চাইলেন তখন তিনি বললেন, কথাটি কাউকে জানালে তোমাকেই জানাতাম। কিন্তু আমি তা কাউকে বলবো না। (আল ফাতর্হু রাব্বানী মা’য়া বুলুগুল আমানী/২০৪ পৃষ্ঠা, হায়াতুছ্ ছাহাবা ১/৩৪৩ পৃষ্ঠা, ২/৫০৩ পৃষ্ঠা)

          হযরত আবূ লুবাবা ইবনে আব্দুল মুনযির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যিনি ছিলেন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিশিষ্ট ছাহাবী। তাঁর জীবনে একটি ব্যতিক্রম ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। যা মুসলিম উম্মাহ্র জন্য বিশেষ ইবরত ও নছীহ্ত স্বরূপ। বর্ণিত আছে যে, মদীনা শরীফে ইহুদীদের কয়েকটি বড় বড় সম্প্রদায় বাস করতো। তন্মধ্যে বনু কুরাইযা ছিল অন্যতম। মদীনা শরীফে হিজরতের পর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  তাদের সাথে সন্ধি চুুক্তি করলেন যে, “আমরা পরস্পর মিলেমিশে বসবাস করবো এবং পরস্পর শত্রুতা পোষণ করবো না। অনুরূপ ভাবে কেউ কারো শত্রুর সাথেও হাত  মিলাতে পারবে না।” কিন্তু হিজরী ৫ম সালে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে যখন দশ হাজার কুরাঈশ মদীনা শরীফ আক্রমণের জন্য অগ্রসর হলো, তখন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমগণকে নিয়ে মদীনা শরীফের অদূরে (সলিলা) পর্বতের নিকটবর্তী স্থানে খন্দক খনন করে শত্রুর মোকাবিলার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আর সে সময় ইহুদী সম্প্রদায় বনু কুরাইযা সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করে কুরাঈশদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছিল। যুদ্ধ শেষে বিশ্বাসঘাতক বনু কুরাইযাকে মদীনা শরীফ হতে বহিস্কার করার জন্য আল্লাহ্ পাক-এর পক্ষ হতে নির্দেশ আসলো। ফলে মুসলমানগণ তাদেরকে অবরোধ করল। তারা আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে অনুরোধ জানালো যে, হযরত আবু লুবাবা ইবনে আব্দুল মুনযির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে আমাদের কাছে পাঠিয়ে  দিন। আমরা তাঁর সাথে পরামর্শ করবো। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত আবু লুবাবা ইবনে মুনযির রদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে তাদের কাছে পাঠালেন। তাঁকে দেখা মাত্র পুরুষগণ তাঁকে অভিবাদন জানাতে ছুটে আসল, আর নারী ও শিশুরা তাঁর সামনে গিয়ে কেঁদে কেঁদে ফরিয়াদ জানালো। তাদের সে বুক ফাটা কান্না দেখে তাঁর অন্তর বিগলিত হলো। তারা বলল, “হে আবু লুবাবা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু! আপনি কি বলেন,  আমরা কি মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশমত দুর্গ হতে নেমে আসবো?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ” সেই সাথে গলদেশের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “তোমাদেরকে জবাই করা হবে।” পরবর্তীতে হযরত আবূ লুবাবা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহ্ পাক-এর কসম! সে স্থান হতে আমি এক কদমও উঠাইনি, এর মধ্যেই আমার উপলব্ধি হলো যে, আমি আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছি। কাজেই তিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাত না করেই সোজাসুজি মসজিদে নববীতে চলে গেলেন এবং মসজিদের খুঁটির সাথে নিজেকে শক্ত করে বাঁধলেন। বললেন, যতক্ষণ আল্লাহ্ পাক আমাকে ক্ষমা না করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত এ স্থান ত্যাগ করবো না। তিনি আরো প্রতিজ্ঞা করলেন যে, জীবনে কোন দিন বনু কুরাইযার মাটি মাড়াবো না এবং যে মাটিতে আল্লাহ্ পাক ও তদ্বীয় রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছি, সেখানে কখনও নিজের মুখ দেখাবো না। এভাবে  ছয় দিন অতিবাহিত হওয়ার পর আল্লাহ্ পাক তাঁর তওবা কবুল করতঃ খোশ খবরী দিয়ে আয়াত শরীফ নাযিল করেন,

 واخرون اعترفوا بذنوبهم خلطوا عملا صالحا واخر سيأ عسى الله ان يتوب عليهم ان الله غفور رحيم.

অর্থঃ- “আর কোন কোন লোক এমন রয়েছে, যারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে, তারা একটি সৎ কর্মের সাথে অপর একটি অসৎ কর্ম মিশ্রিত করেছে। আল্লাহ্ পাক হয়ত তাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ্ পাক ক্ষমাশীল ও অত্যন্ত করুণাময়।” (সূরা তওবা /১০২)

          পরে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, নিজ হস্ত মুবারকে তাঁর বাঁধন খুলে তাঁকে মুক্ত করে দেন। (তাফসীরে জালালাইন, সীরাতে ইবনে হিশাম)

          স্মর্তব্য যে, নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের ইন্তিকালের পর দ্বীনের যাবতীয় কাজের সুষ্ঠ আঞ্জাম দেন হযরত আউলিয়া-ই-কিরামগণ। সুতরাং তাদের এ মহান দায়িত্ব পালনের পথে আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত অনেক গোপন নিয়ামত প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। যা গোপন রাখাই জরুরী। সেক্ষেত্রে তাঁদের একান্ত লোক তথা মুরীদগণের কিছু অবগত হওয়া বিচিত্র নয়। কাজেই তাদের একান্ত দায়িত্ব বা আদব হচ্ছে স্বীয় পীর ছাহেবের দুনিয়াবী ও উখরুবী সকল কাজ-কর্ম, কথা-বার্তা কিংবা অন্যান্য সকল বিষয়ের আমানত সংরক্ষণ করা।

৩৫। কাছরাতুস্ সুওয়াল বা অধিক জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকবে। আর কোন বিষয়ে নিতান্ত জরুরী হলে পীর ছাহেবের অনুমতি নিয়ে জিজ্ঞাসা করবে।

          উল্লেখ্য যে, সাধারণতঃ কোন বিষয়ে জানার প্রয়োজন হলে একাগ্রতার সাথে স্বীয় পীর ছাহেবের সম্মুখে বসলে তা সমাধান হয়ে যায়। তবুও জিজ্ঞাসার একান্ত দরকার হলে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তবে অপ্রয়োজনীয় কিংবা অধিক জিজ্ঞাসাবাদ হতে বিরত থাকবে।

কেননা, হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে,

فانما هلك من كان قبلكم بكثرة سوالهم واختلافهم على انبيائهم.

অর্থঃ- “সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাস্সাম, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “তোমাদের পূর্ববর্তীগণ এমনিভাবে অধিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণের সাথে মত-বিরোধের কারণে ধ্বংস হয়েছে।” (তাফসীরে রুহুল বয়ান/২-৪৪৯)

          একদা এক ব্যক্তি আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, রহমতুল্লিল আলামীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে “লুকতা” তথা হারানো বস্তু সম্পর্কে প্রশ্ন করলো। তিনি উত্তরে বললেন, “তুমি তার গিলাফ বা বাঁধন এবং পাত্র চিনে রাখবে। অর্থাৎ এগুলো তার মালিককে দিয়ে দিবে।”

          লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “ইয়া রসূলল্লাহ্, ইয়া হাবীবাল্লাহ্ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! “হারানো উটের কি হুকুম?” এবারে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, নূরে মুজাস্সাম হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেহারা মুবারক লাল হয়ে গেলো। জলদ গম্ভীর স্বরে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তা দ্বারা তুমি কি করবে? সে উটের সাথে তার মশক ও ক্ষুর আছে। সে পানির ঘাটে গিয়ে পানি পান করে আর গাছের পাতা খায়।” (বুখারী শরীফ) অর্থাৎ এটা অনর্থক প্রশ্ন ব্যতীত আর কিছুই নয়।

          কতক লোক এমন আছে যে, যারা আল্লাহ্ পাক-এর হুকুম-আহ্কাম সম্পর্কে অনাবশ্যক চুঁ-চেরা, ঘাঁটা-ঘাঁটি করতে আগ্রহী এবং যেসব বিষয়ে বিধান দেয়া হয়নি সেগুলো নিয়ে বিনা প্রয়োজনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন তুলতে থাকে। হযরত মূসা আলাইহিস্ সালাম-এর মায়ের নাম কি ছিল? ইত্যকার নানা রকমের প্রশ্ন বানিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দেয়। অথচ এসব প্রশ্ন মানুষের দ্বীনি কর্ম-কান্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। আর এরূপ প্রশ্নকারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় মাসয়ালা-মাসায়েল সম্পর্কে যে অজ্ঞ থাকে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। সুতরাং এ জাতীয় জিজ্ঞাসাবাদ করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। আল্লাহ্ পাক এরূপ আচরণ হতে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন যে, “তারা যেন এরূপ প্রশ্ন না করে। যার ফলশ্রুতিতে তারা কষ্টে পতিত হবে কিংবা গোপন রহস্য ফাঁস হওয়ার কারণে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবে।” আল্লাহ্ পাক বলেন,

يايها الذين امنوا لاتسئلوا عن اشياء ان تبدلكم تسؤكم.

অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা এমন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করনা, যা প্রকাশ হলে তোমাদের খারাপ লাগবে।” (সূরা মায়িদা/১০১)

          হাদীস শরীফে আরো বর্ণিত আছে,

عن ابن عباس رضى الله عنهما انه عليه السلام كان يخطب ذات يوم غضبان من كثرة ما يسألون عنه مما لايعنيهم فقال لا اسأل عن شىء الا اجبت فقال رجل اين ابى فقال فى النار وقال اخر من ابى فقال حذافة.

অর্থঃ- “হযরত ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, একদা আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুৎবাহ্ দিচ্ছিলেন। তাঁদের (হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম) অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে অধিক জিজ্ঞাসাবাদের কারণে রাগান্বিত হয়ে বললেন, আমি এমন কোন বিষয়ে যেন জিজ্ঞাসিত না হই যার জাওয়াব দিতে বাধ্য হবো। তারপরও এক ব্যক্তি বললেন, ‘আমার আব্বা কোথায়?’ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তোমার পিতা জাহান্নামে।’ অপর এক ব্যক্তি বললেন, ‘আমার পিতা কে।’ হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তোমার পিতা হুজাফাহ্।” (তাফসীরে রুহুল বয়ান/২-৪৪৯)

          অধিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নের দ্বারা বহুমূখী সমস্যার উদ্ভব হয়। তার দ্বারা কাঠিন্যতার সৃষ্টি হয়। ফলে আমল করা কষ্টসাধ্য হয়। এতে ইখ্তিলাফ বা মত-বিরোধ দেখা দেয়। তাই ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ে। সাথে সাথে অনর্থক কাজে অযথা সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

          আর ইল্মে তাছাউফের মৌলিক শিক্ষাই হচ্ছে, অপছন্দনীয়, নিন্দনীয় এবং অনর্থক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা। হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে,

من حسن اسلام المرء تركه مالايعنيه.

অর্থঃ- “ইসলামের সৌন্দর্য হচ্ছে- মুসলমান ব্যক্তি অনর্থক বিষয়াদি পরিত্যাগ করে।” (মিশকাত শরীফ/৪১৩)

আর বাহ্যিক সৌন্দর্য্যরে প্রভাব যে আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য্যরে সহায়ক তা জ্ঞানী মাত্রই অবগত।

          সুলতানুল  মুফাস্সিরীন, ইমামুল মুহাক্কিকীন, সরফুল মিল্লাত্ ওয়াদ্ দ্বীন, ইমামুল কাবির, হুজ্জাতুল্লাহ্ আলাল মুসলিমীন, রঈসুল মুহাদ্দিসীন, হুসাইন ইবনে মুহম্মদ ত্বীবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিশ্ববিখ্যাত কিতাব “শরহুত্ ত্বীবী আল মিশকাতিল মাসাবিহ্”-এর ১ম খন্ডের ৯৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন,

حسن الادب فى الظاهر عنوان حسن الادب فى الباطن.

অর্থঃ- “বাহ্যিক উত্তম শিষ্টাচার, আভ্যন্তরীণ উত্তম শিষ্টাচারের শিরোনাম স্বরূপ।”

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৩)

হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (২৬২)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৪)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৫)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৬)