ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর সাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৪)

সংখ্যা: ৮৬তম সংখ্যা | বিভাগ:

          -হযরত মাওলানা মুফ্তী মুহম্মদ আব্দুল হালীম

২৫। নামায-রোজা, ইবাদত-বন্দেগী, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি ছোট-বড় সকল বিষয়ে স্বীয় পীর ছাহেবের অনুসরণ-অনুকরণ করবে। তাঁর কাজ দেখে “ফিক্বাহ্”-এর মাসয়ালা শিক্ষা করবে।” (মাকতুবাতে ইমামে রব্বানী)

          কামিল পীর ছাহেবের পরিপূর্ণ অনুসরণ-অনুকরণ করার অর্থই হচ্ছে, আল্লাহ্ পাক ও তাঁর প্রিয় হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাক্বীক্বী অনুসরণ-অনুকরণ করা। সুতরাং যে সালিক বা মুরীদ স্বীয় পীর ছাহেবের যে পরিমাণ অনুসরণ-অনুকরণ করবে, সে সালিক সে পরিমাণ আল্লাহ্  পাক ও তাঁর হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুহব্বত-মা’রিফাত, সন্তুষ্টি-রেজামন্দি হাছিল করতে সক্ষম হবে।

          মা’রিফাত-মুহব্বত হাছিলের ক্ষেত্রে হক্কানী-রব্বানী আলিম তথা কামিল পীর ছাহেবের অনুসরণ-অনুকরণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা স্বীয় পীর ছাহেবের পরিপূর্ণ অনুসরণ-অনুকরণ করলে, তাঁর নির্দেশ মোতাবিক নিজেকে পরিচালনা করতে পারলে শরীয়তের নির্দেশিত পথে চলা সহজসাধ্য হয়ে যায়। খাহেশাতে নফ্সানীর পরিসমাপ্তি ঘটে। প্রবৃত্তির ওয়াস্ওয়াসা বা ধোকা হতে নিরাপত্তা লাভ করে। অসৎ গুণাবলীর অবসান হয়ে সৎ স্বভাব বা সৎ গুণাবলীর সমাবেশ ঘটে। ফলে সালিকের অন্তর আল্লাহ্ পাক-এর মা’রিফাত ও মুহব্বতের নূরে উদ্ভাসিত হয়। অর্জিত হয় পরম প্রত্যাশিত মা’রিফাত-মুহব্বতের খাজিনাহ্। সর্বোপরি উলীল-আমর বা কামিল পীর ছাহেবগণের পরিপূর্ণ অনুসরণ-অনুকরণ করা, আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরই নির্দেশ।

আল্লাহ্ পাক বলেন,

يايها الذين امنوا اطيعوا الله واطيعوا الرسول واولى الامر منكم.

অর্থঃ- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ পাক-এর অনুগত হও, অনুগত হও রসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এবং তোমাদের মধ্যে যারা “উলীল আমর” রয়েছেন তাদের অনুগত হও (অনুসরণ-অনুকরণ কর)।” (সূরা নিসা/৫৯)

আল্লাহ্ পাক আরো বলেন,

واتبع سبيل من اناب الى.

অর্থঃ- “যিনি আমার দিকে রুজু হয়েছেন (মনোনিবেশ করেছেন) তাঁরই অনুসরণ-অনুকরণ কর।” (সূরা লুকমান/১৫)

          স্মর্তব্য যে, মানুষ অনুসরণ-অনুকরণ প্রিয়। অনুসরণ-অনুকরণ তাদের স্বভাব। অন্যকে দেখে তার কথা শুনে সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে অভ্যস্ত। সে ক্ষেত্রে  অনুসরণীয়-অনুকরণীয় ব্যক্তি যদি আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রসূল সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মত ও পথের উপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত থাকেন, অনুগত হন তাহলে অনুসরণকারী ব্যক্তিও আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মত ও পথের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারেন, মা’রিফাত-মুহব্বত, সন্তুষ্টি-রেজামন্দি হাছিল করতে পারেন।

          কামিল পীর ছাহেবের অনুসরণ-অনুকরণ এবং নফ্সের দাসত্ব পরস্পর বিপরীতমূখী দু’টি বিষয়। যেখানে কামিল পীর ছাহেবের অনুসরণ-অনুকরণ বিরাজমান সেখানে নফ্স নিস্ক্রিয়, প্রবৃত্তি কোনঠাসা। পক্ষান্তরে তার বিপরীতে নফ্স সক্রিয়। যদিও উখরুবী বিষয় তথা নামায, রোজা, হজ্ব, যাকাত, যিকির-ফিকির ইত্যাদি যা হউক না কেন। অর্থাৎ শরীয়তের আহ্কাম ব্যতীত যেমন দ্বীন ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা যায় না তেমনি স্বীয় পীর ছাহেবের হাক্বীক্বী অনুসরণ-অনুকরণ করা ব্যতীত কিংবা তার ইচ্ছা বহির্ভূত আমল দ্বারা মা’রিফাত-মুহব্বত হাছিল করার আশা করাও কল্পনা বৈ কিছুই নয়। স্বীয় পীর ছাহেবের হাক্বীক্বী অনুসরণ-অনুকরণ ব্যতীত সালিক যে আমল বা কাজই করুক না কেন তা সবই স্বীয় নফ্স বা প্রবৃত্তির খোরাকে পর্যবসিত হয়। নফ্সের খোরাক জোগান দিয়ে নফ্সের শক্তিকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করা যায়। তা দিয়ে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর হাবীব সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাক্বীক্বী মা’রিফাত-মুহব্বত হাছিল করা যায় না। কামিয়াবী লাভ হয় না। পরাজয়ের গ্লানী নিয়ে ব্যর্থ জীবন-যাপন করতে বাধ্য হতে হয়। এজন্যই পূর্ববর্তী আওলিয়া-ই-কিরামগণ কঠোর রিয়াজত, মুজাহাদা, মুশাহাদা, সাধনা করে স্বীয় নফ্সকে পূর্ণ রূপে কামিল পীর সাহেবের অনুসরণ-অনুকরণমূখী করতেন। এ পথে তাদের অনেক ত্যাগ, কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে। কেননা নফ্সের ধোকা এমনি সূক্ষè যে, অনেক সময় তা কুফরী ও শেরেকীর কর্ম কান্ডে লিপ্ত করে গোমরাহ্ বা পথ ভ্রষ্ট করে দেয়ার সম্ভাবনা থাকে।

          এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,

افرأيت من اتخذ الهه هوه والضله الله على علم وختم على سمعه وقلبه وجعل على بصره غشوة فمن يهديه من بعد الله افلا تذكرون.

অর্থঃ- “হে রসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আপনি তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন, যে তার নফ্স বা প্রবৃত্তিকে স্বীয় মাবুদ বা উপাস্য সাব্যস্ত করেছে? আর আল্লাহ্ পাক (সত্য উপলব্ধির) ইল্ম থাকা সত্বেও তাকে পথভ্রষ্ট করে দিয়েছেন। কান ও অন্তরের উপর মোহর মেরে দিয়েছেন। আর চোখের উপর এঁটে দিয়েছেন পর্দা। সুতরাং আল্লাহ্ পাক ব্যতীত এরূপ ব্যক্তিকে কে হিদায়েত দান করবেন, তোমরা কি তাও বুঝ না?” (সূরা জাসিয়া/২৩)

          নফ্স বা প্রবৃত্তির দাসত্বের শিকল থেকে মুক্ত হয়ে শরীয়তের যাবতীয় হুকুম-আহকামকে পূর্ণরূপে পালন করা, আল্লাহ্ পাক-এর হাক্বীক্বী গোলামে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে ১ লক্ষ ২৪ হাজার মতান্তরে ২ লক্ষ ২৪ হাজার নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণকে আল্লাহ্ পাক এ যমীনে পাঠিয়েছেন। কেননা শুধুমাত্র আসমানী কিতাব তথা কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ বা অন্য কোন দ্বীনি কিতাবাদী পাঠ করেই আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টি-রেজামন্দি পাওয়া যায় না। তাঁর হুকুম মত জীবনযাপন করা কঠিন। সর্বোপরি নফ্স বা প্রবৃত্তির দাসত্ব হতে মুক্ত হওয়া যায় না,

নফ্সের দাসত্ব হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য আল্লাহ্ পাক-এর মনোনীত বান্দা তথা নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালাম এবং তাদের অবর্তমানে তাঁদের নায়েব হযরত আওলিয়া-ই-কিরামগণের সোহ্বত ও তাঁদের পূর্ণরূপে অনুসরণ-অনুকরণ করা আবশ্যক।

          মূলতঃ এলক্ষ্যেই আল্লাহ্ পাক মানব জাতির হিদায়েতের জন্য আসমানী কিতাব অবতীর্ণের সাথে সাথে নবী-রসূল আলাইহিস্ সালামগণকে পাঠিয়েছেন। সুতরাং যারা তাঁদের হাক্বীক্বী অনুসরণ-অনুকরণ    করেছেন তারা আল্লাহ্ পাক-এর সন্তুষ্টি-রেজামন্দি পেয়েছেন। আরো পেয়েছেন তাঁর নিয়ামত ভান্ডার।

          এক্ষেত্রে হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণের নাম মোবারক বিশেষভাবে উল্লেখ্য। নবী-রসূল আলাইহিস্ সালামগণের পর শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হচ্ছেন, হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণ যা সর্বজনমান্য ও সর্বস্বীকৃত। তাঁদের এ শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম কারণ হচ্ছে, আখেরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরিপূর্ণ অনুসরণ-অনুকরণ, ইত্য়াত বা আনুগত্য। হযরত ছাহাবা-ই-কিরাম রদিয়াল্লাহু আনহুমগণ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যেরূপ অনুসরণ-অনুকরণ করেছেন তা নজীরবিহীন।

          মেছালস্বরূপ বলা যায়, বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর ফারুক রদিয়াল্লাহু আনহুমা। তিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণ-অনুকরণের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

          একদা তিনি তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র ইমাম নাফে রহমতুল্লাহি আলাইহি সহ কতিপয় ছাত্র নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথ চলতে চলতে এক স্থানে গিয়ে তাঁর মাথা নীচু করলেন একটু পরে আবার মাথা উঠিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলতে লাগলেন। তাঁর এরূপ আচরণ দেখে ছাত্ররা বললেন, হুজুর! বেয়াদবী মাফ করবেন, আপনি এখানে কেন এরূপভাবে আপনার মাথা মোবারক নীচু করলেন? তখন হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর ফারুক রদিয়াল্লাহু আনহুমা বললেন, আমরা যখন সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে এ রাস্তা দিয়ে সফর করতাম। এখানে একটি গাছ ছিল। সে গাছের একটি ডাল এ রাস্তার উপর বিস্তৃত ছিল। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এখানে আসতেন তখন মাথা মোবারক নীচু করে এ স্থানটুকু অতিক্রম করতেন আবার স্বাভাবিক ভাবেই চলতেন। আজকে যদিও সে গাছটি নেই, ডালটিও নেই কিন্তু সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন্নাবিয়্যীন, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সেদিনের অনুসরণ-অনুকরণের উদ্দেশ্যেই আমি আমার মাথা নীচু করতঃ সে স্থান অতিক্রম করলাম। (সুবহানাল্লাহ্)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৫)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৬)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৭)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৮)

ফিক্বহুল হাদীস ওয়াল আছার পীর ছাহেব ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৩৯)