-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ শোয়াইব আহমদ
বছরের খুব ছোট দিনে সূর্যোদয় হতে সূর্য গড়িয়ে যাওয়া পর্যন্ত পথ চললে যে পরিমাণ পথ অতিক্রম করা যায় এরূপ তিন দিবসের দূরত্ব পথ মধ্যম গতিতে পায়ে হেঁটে অথবা উটে চড়ে অথবা নৌকাযোগে অতিক্রম করে গেলে শরীয়তের পরিভাষায় তাকে মুছাফির বলা হয়। ফক্বীহ্গণ এই দূরত¦কে তিন মঞ্জিল তথা ৪৮ মাইল নির্ণয় করেছেন। কিলোমিটার হিসেবে প্রায় ৭৯ কিলোমিটার।
অতএব, যে ব্যক্তি ৪৮ মাইল পথ অতিক্রম করার নিয়ত করে ঘর থেকে বের হয়ে পল্লী কিংবা শহর ও তৎসংলগ্ন শহরতলী অতিক্রম করে সে মুছাফির হবে।
যদি কোন স্থান এত পরিমাণ দূরবর্তী হয় যা, ৪৮ মাইল বা স্বাভাবিকভাবে পায়ে হেঁটে বা নৌকাযোগে গেলে তিনদিন লাগে, কিন্তু কোন দ্রুতগামী যানবাহন যেমন- ঘোড়া, ঘোড়ার গাড়ী, ষ্টীমার, রেলগাড়ী, বাস, মোটর, উড়োজাহাজ ইত্যাদিতে তদপেক্ষা কম সময় লাগে এরূপ অবস্থায়ও শরীয়ত অনুযায়ী মুছাফিরই হবে।
যদি কেউ কমপক্ষে তিন মঞ্জিল বা ৪৮ মাইল যাওয়ার নিয়ত না করে, আর সারা দুনিয়াও ঘুরে আসে, তবুও সে মুছাফির হবে না।
কোন স্থানে যাওয়ার যদি দুটো রাস্তা থাকে, একটির দূরত্ব ৪৮ মাইল হয়, অন্যটির দূরত্ব তত পরিমাণ হয় না, তবে যে রাস্তা দিয়ে যাবে সেই রাস্তারই হিসাব ধরা হবে, অন্য রাস্তার হিসাব ধরা হবে না।
সুতরাং কোন ব্যক্তি ৪৮ মাইল বা তা হতে বেশী দূরবর্তী স্থানে গেলে সে মুছাফির বলে গণ্য হবে এবং মুছাফির অবস্থায় যতদিন থাকবে ততদিন তাকে যোহর, আছর ও ইশার ফরয নামাযগুলো চার রাকায়াতের স্থলে দু’রাকায়াত পড়তে হবে। একে “কছর” বলে। এই কছর আদায় করা মুছাফিরের জন্য ফরজ-ওয়াজিব।
কছর না করে মুছাফির যদি চার রাকায়াতই আদায় করে, আর সে যদি দু’রাকায়াত পর বৈঠক করে থাকে, তবে তার নামায আদায় হয়ে যাবে। দু’রাকায়াত ফরয এবং দু’রাকায়াত নফল হবে। তবে ফরযকে নফলের সাথে মিশানোর কারণে গুণাহ্গার হতে হবে। ভুলক্রমে যদি এরূপ করে থাকে, তবে সালামকে বিলম্ব করার কারণে ছোহ্-সিজদা আদায় করতে হবে। ইচ্ছা করে এরূপ পড়লে আল্লাহ্ পাক-এর দেয়া সুযোগের প্রতি অবহেলা করার কারণে নামায বাতিল হয়ে যাবে। দু’রাকায়াত পর যদি বৈঠক না করে থাকে, তবে ফরয বাতিল হয়ে যাবে, চার রাকায়াতই নফল হয়ে যাবে এবং ছোহ্-সিজদা আদায় করতে ও ফরয পুনরায় আদায় করতে হবে।
উল্লেখ্য, তিন রাকায়াতের কছর হয়না। তদ্রুপ সুন্নত নামাযেরও কছর নেই। কাজেই মাগরিবের ফরয, বিত্র এবং সকল ওয়াক্তের সুন্নত ও নফল নামায সমূহের কছর পড়া জায়েয নেই।
সুন্নত ও নফল নামায আদায় করা মুছাফিরের এখতিয়ারাধীন। ইচ্ছে করলে আদায় করতে পারে অথবা নাও করতে পারে। তবে মাঝে মধ্যে আদায় করা এবং মাঝে মধ্যে ছেড়ে দেয়া উভয়টিই সুন্নত।
যদি কোন মুছাফির এক শহর বা পল্লীতে ১৫ দিন থাকার নিয়ত করে, তবে চার রাকায়াত ফরয নামাযের ক্ষেত্রে চার রাকায়াত পড়তে হবে। যদি সমুদ্রে কিংবা জনশুন্য দ্বীপে কিংবা উভয় স্থানে ১৫ দিন থাকার নিয়ত করে, তবে ইক্বামতের বা মুকীম হওয়ার নিয়ত সহীহ্ হবেনা। তাকে দুই রাকায়াত ফরয পড়তে হবে।
তিন মঞ্জিলের নিয়ত করে বাড়ী হতে বের হওয়ার পর পথিমধ্যে কোন স্থানে যদি কয়েকদিন থাকার ইচ্ছা হয়, তবে যতক্ষণ পর্যন্ত ১৫ দিন বা তদুর্ধকাল থাকার নিয়ত না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত মুছাফিরের ন্যায় কছর পড়তে হবে। অবশ্য যদি ১৫ দিন বা তদুর্ধকাল থাকার নিয়ত করে, তবে যখন এরূপ নিয়ত করবে, তখন থেকেই পুরো নামায পড়া শুরু করতে হবে। তারপর যদি নিয়ত বদলে যায় এবং ১৫ দিনের আগেই চলে যাওয়ার ইচ্ছা করে, তবে পুরো নামাযই পড়তে হবে, কছর পড়া জায়েয হবে না। এরূপ ১৫ দিন থাকার নিয়ত করে মুকীম হয়ে যাওয়ার পর যখন ঐ স্থান হতে অন্য স্থানে রওয়ানা হবে, তখন দেখতে হবে যে, যে স্থানে যাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছে সে স্থানের দূরত্ব কত? যদি সে স্থানের দূরত্ব ঐ অবস্থানের স্থান হতে তিন মঞ্জিল অর্থাৎ ৪৮ মাইল হয় তবে আবার কছর পড়তে হবে। আর যদি তার দূরত্ব ৪৮ মাইল না হয়, তবে কছর পড়তে পারবেনা, পুরো নামাযই পড়তে হবে। (এরূপ পনের দিনের অবস্থানের স্থানকে ওত্নে ইক্বামত বলে)।
এক ব্যক্তি যে স্থান হতে চলেছে সে স্থান হতে গন্তব্য স্থান তিন মঞ্জিল বটে, কিন্তু পথিমধ্যে তার নিজের গ্রামে এলো, তবে সে মুছাফির হবেনা, সারা রাস্তায় তাকে পুরো নামায পড়তে হবে। কারণ যদিও বাড়ীতে অবস্থান না করে বা বাড়ীতে প্রবেশও না করে, তবুও নিজ গ্রামের সীমানায় পা রাখা মাত্রই তার সফর বাতিল হয়ে যাবে।
ফিক্বহুস্ সুনান মুছাফির ব্যক্তির নামাযের বয়ান
ফিক্বহুস্ সুনান অসুস্থ ব্যক্তির নামাযের বয়ান
ফিক্বহুস্ সুনান অসুস্থ ব্যক্তির নামাযের বয়ান