(ধারাবাহিক)
অতঃপর সে বললো, তারপর আমি অযুধন (বর্তমান পাক পাট্টাতন শরীফ, পশ্চিম পাঞ্জাব) গেলাম। সেখানে আমি তরীক্বতের এক বাদশাহ্কে দেখলাম, যিনি এত ভাল এবং এত উত্তম যে (অর্থাৎ তরীক্বতের বাদশাহ্ বলতে এখানে গজল গায়ক, হযরত বাবা ফরীদুদ্দীন মাসউদ গন্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর কথা বুঝিয়েছেন) একথা বলতেই হযরত নিযামুদ্দীন আওলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর দিলের মধ্যে হযরত বাবা ফরিদুদ্দীন মাসউদ গন্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মুহব্বত বা ইশ্ক পয়দা শুরু হলো এবং ঐ সময় থেকে দিন দিন তাঁর সাক্ষাত ও দর্শন লাভের জন্য দিলের বেকারারী অবস্থা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে লাগলো। অতপর উঠা-বসা, খাওয়া-পরা প্রত্যেক অবস্থায় তার দিলের মধ্যে ভেসে উঠতে লাগলো হযরত বাবা ফরিদুদ্দীন মাসউদ গন্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর মোলাকাত ও তাঁর ছূরত মোবারকের প্রতিচ্ছবি। অতঃপর তিনি বাদায়ুন থেকে ইল্ম হাছিলের জন্য দিল্লী তাশরীফ আনেন এবং ছদরে বিলায়েত শামছুল মূলক রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ছাত্র ও সাথীদের সাথে যোগ দিলেন এবং “মাকামাতে হারিরী” পর্যন্ত পড়েন। এভাবে তিনি তাঁর থেকে ইল্মে হাদীসেরও দরস নেন। (হযরত মাহবুবে ইলাহী রহমতুল্লাহি আলাইহি একজন বিখ্যাত মানতেকী আলিমও ছিলেন- এজন্য অন্যান্য তালিবে আলিমগণ তাঁকে হযরত নিযামুদ্দীন মানতেকী রহমতুল্লাহি আলাইহিও বলতেন।) এইখানে অর্থাৎ দিল্লী থেকে ইল্ম শিক্ষা সমাপনের পর তিনি পাক পাট্টান শরীফে চলে গেলেন হযরত বাবা ফরিদুদ্দীন মাসউদ গন্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর দরবারে। তাঁর বয়স মোবারক তখন বিশ বৎসর ছিল। পাক পাট্টান শরীফে তিনি হযরত বাবা ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট পবিত্র কুরআন শরীফের ছয় পারা তাজবীদ সহকারে পড়েন এবং আওয়ারিফুল মা’আরিফ কিতাবের ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ পর্যন্ত তালিম নেন। “তামহীদে আবু শুকুর সালমী” এবং অন্যান্য কিতাবও তিনি তাঁর নিকট থেকে পড়েন।
হযরত নিযামুদ্দীন আওলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “যেদিন আমার হযরত বাবা ফরিদুদ্দীন গন্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর (পবিত্র) কদমবুছি করার সৌভাগ্য হাছিল হলো সেদিনই প্রথম মোলাকাতেই এই (আমাকে দেখে) শের পড়েছিলেন-
“আয় আতেশে ফারাকাত দিলহা কাবাব কারদা,
সায়লাবে ইশ্তিয়াকাত জানহা খারাব কারদা।
অর্থঃ- “ওহে, তোমার বিচ্ছেদের আগুন দিলকে কাবাব করে দিয়েছে, তোমার মুহব্বতের বন্যা প্রাণকে বিরান করে দিয়েছে।”
অতঃপর আমি চেয়েছিলাম যে, তাঁর খিদমত ও ছোহ্বত লাভের জন্য আমার যে উৎসাহ-উদ্দিপনা (দিলের মধ্যে লুকিয়ে ছিল) তা প্রকাশ করে দেই, কিন্তু বাবা ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর রোব আমার মধ্যে এমন (গভীর) ভাবে প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছিল যে, আমি শুধু এতটুকুই বললাম যে, “আপনার সাক্ষাতের আকাংখা আমার দিলের মধ্যে সীমাহীন প্রবল ছিল।” ঐদিন আমি তাঁর নিকট বাইয়াত হই এবং (আদবের সাথে) সুওয়াল করি, “(এখন) আপনার নির্দেশ কি? যদি বলেন, ইল্ম শিক্ষা ছেড়ে দিয়ে ওজিফা, দরূদ এগুলোর মধ্যে মশগুল হয়ে যাই।”
এর জবাবে তিনি বললেন, “আমি ইল্ম শিক্ষা করতে কখনো কাউকে নিষেধ করিনা। তুমি দুটোই করতে থাকো। তারপর দেখো কোন জিনিস তোমার মধ্যে অধিক প্রভাব বিস্তার করে। কেননা ফকির-দরবেশীর জন্য কিছু ইল্ম থাকাও জরুরী।” অতঃপর হযরত নিযামুদ্দীন আওলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি খিলাফতের নিয়ামত হাছিল করে দিল্লী চলে গেলেন। তিনি তাঁর দিল্লীর হায়াতে যিন্দেগীর মধ্যে তাঁর পীর ও মুর্শীদের নিকট পাক পাট্টাতন তিনবার গিয়েছিলেন। হযরত বাবা ফরিদুদ্দীন মাসউদ গন্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ইন্তিকালের সময় হযরত নিযামুদ্দীন আওলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর নিকট উপস্থিত ছিলেননা। যেমন উপস্থিত ছিলেন না হযরত বাবা ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহিও তাঁর পীর মুর্শিদ হযরত কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাক্বী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ইন্তিকালের সময়। এভাবে হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশ্তী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ওফাতের সময়ও হযরত খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাক্বী রহমতুল্লাহি আলাইহি উপস্থিত ছিলেন না। ঐ ঘটনার পর (অর্থাৎ বাবা ছাহেবের ওফাতের পর) অদৃশ্য ইঙ্গিত পেয়ে তিনি দিল্লী ছেড়ে (যমুনার তীরবর্তী) নিকটেই-গিয়াসপুর বস্তিতে গিয়ে উঠেন। (অসমাপ্ত)
বিশ্ব সমাদৃত, হযরত আওলিয়া-ই-কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিমগণের অনুপম মুবারক চরিত গ্রন্থ আখবারুল আখইয়ার