-হযরত মাওলানা মুফতী সাইয়্যিদ শোয়াইব আহমদ
আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্, নূরে মুজাস্সাম, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিলাদত শরীফ উপলক্ষ্যে তাঁর ছানা-ছীফত করার ফযীলত বর্ণনার ও জীবনী মুবারক আলোচনার খাছ মাস “রবিউল আউয়াল।” আর “রবিউস্ সানী” আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ্, নূরে মুজাস্সাম, হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যাঁরা নায়েব বা ওয়ারিছ তাঁদের মাঝে যিনি অন্যতম, বে-মেছাল ওলী হযরত বড় পীর ছাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ওফাত ও ফাতিহা শরীফ উপলক্ষ্যে তাঁর ছানা-ছীফত, ফযীলত ও জীবনী মুবারক আলোচনার খাছ মাস।
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,
ان ذكر الصالحين تنزل الرحمة.
“নিশ্চয়ই ছলেহীন বা ওলীগণের আলোচনা করলে রহমত নাযিল হয়।”
মূলতঃ ওলীগণের আলোচনা করলে তাঁদের তরফ হতে ফয়েয এসে থাকে। এর উছীলায় রহমত, বরকত, সাকীনা হাছিল হয় এবং এ উছীলায় তাঁদের শাফায়াত-শুপারিশও নছীব হয়ে থাকে।
বড়পীর, গাউসুল আ’যম, মাহবুবে সুবহানী কুতুবে রব্বানী, হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল ক্বাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর মর্যাদা-মর্তবা এত বেশী যে, তিনি পিতার দিক থেকে হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং মাতার দিক থেকে হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর বংশধর। তাঁর বুযুর্গ পিতা এবং মাতা ছাহেবানের আমল আখলাক ও জীবন সম্পর্কে পর্যালোচনা করলে দেখতে পাবো যে, সত্যিই তাঁরা গাউসুল আ’যম, হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল ক্বাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর মাতা-পিতা হবার উপযোগী। তাঁর পিতার পবিত্র নাম সাইয়্যিদ আবু ছলেহ্ মূসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি। (যেহেতু তিনি যুদ্ধ প্রিয় ছিলেন সেহেতু তাঁকে জঙ্গী দোস্ত বলা হয়) এবং তার মাতার পবিত্র নাম উম্মুল খায়ের আমাতুল জাব্বার ফাতিমা রহমতুল্লাহি আলাইহা । হযরত আবূ ছলেহ্ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি যুবক থাকা কালীন তিনদিনের অনাহারী অবস্থায় দজলা নদীর তীর দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন দজলা নদীর মধ্যে একটি ছেব ফল ভাসমান অবস্থায় দেখে ক্ষুধার তাড়নায় খেয়ে ফেললেন। তিনি রাত্রে বিছানায় শুয়ে চিন্তা করতে লাগলেন ছেব ফল খাওয়া কতটুকু জায়েয হল। (যদিও শরীয়তের মাসয়ালা হল কোন ব্যক্তি যদি ৩ দিন না খেয়ে থাকে তার জন্য জরুরত আন্দাজ হারাম খাওয়া জায়েয)
অতঃপর হযরত আবু ছলেহ্ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি পরদিন সকালে দজলা নদীর তীর দিয়ে হাটতে লাগলেন, যেদিক থেকে ছেব ফলটি ভেসে এসেছিল সেদিকে। কিছুদূর যাবার পর তিনি দেখলেন, নদীর কিনারায় একটি ছেব ফলের বাগান। বাগানের একটি গাছের ডালা ফলসহ নদীর উপর ঝুলন্ত অবস্থায় এবং তার কিছ ুফল পানিতে ভেসে আছে। তখন তিনি নিশ্চিত হলেন যে, নিশ্চয়ই আমি এই গাছেরই ফল খেয়েছি। অতঃপর তিনি বাগানের মালিক হযরত আব্দুল্লাহ্ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, “হুজুর! আমি না বলে আপনার বাগানের একটি ছেব ফল ক্ষুধার তাড়নায় নদীতে ভাসমান অবস্থায় পেয়ে খেয়ে ফেলেছি। এখন আমি তার মূল্য পরিশোধ করতে এসেছি।” একথা শুনার পর হযরত আব্দুল্লাহ্ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি আশ্চর্য হলেন এবং মনে মনে ভাবলেন, কত লোকইতো আমার বাগানের কত ফল খেয়েছে কিন্তু কেউই এ পর্যন্ত দাম দিতে আসেনি। নিশ্চয়ই এ যুবক একজন আল্লাহ্র ওলী হবেন। অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনার নিকট কত দিরহাম আছে? উত্তরে হযরত আবু ছলেহ্ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, দিরহাম থাকলেতো আপনার ফলই খেতাম না। পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে কি দিয়ে মূল্য পরিশোধ করবেন?” হযরত আবু ছলেহ্ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “আপনার বাগানে কাজ করে ফলের মূল্য পরিশোধ করতে চাই।” বাগানের মালিক হযরত আব্দুল্লাহ্ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “বেশ কাজ করতে থাকুন।” কয়েক বছর কাজ করার পর হযরত আবু ছলেহ্ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত আব্দুল্লাহ্ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহিকে বললেন, “হুজুর! আমার ফলের মূল্য কি এখনও পরিশোধ হয়নি?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ হয়েছে। তবে আর একটি শর্তে আপনাকে মুক্তি দিতে পারি।” হযরত আবু ছলেহ্ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “কি আপনার শর্ত?”
হযরত আব্দুল্লাহ্ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “আমার একটি মেয়ে আছে তাকে বিয়ে করতে হবে। মেয়েটি অন্ধ, বোবা, বধির, খঞ্জ, লুলা, কালো ও কুৎসিত।”
এ কথা শুনে হযরত আবু ছলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ভাবলেন, এ ধরনের একটি মেয়েকে বিয়ে করবো! যার কাছ থেকে খিদমত পাওয়ার পরিবর্তে উল্টো তাকেই খিদমত করতে হবে। কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তা করলেন, দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, কাজেই এখন যদি তিনি ক্ষমা না করেন (বিবাহ করা ব্যতীত) তবে মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে কি জবাব দিব ইত্যাদি চিন্তা করে রাজী হয়ে গেলেন। বিয়ে হয়ে গেল। হযরত আবু ছলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বাসর ঘরে প্রবেশ করেই তিনি তাড়াহুড়া করে ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন। ঘর থেকে বের হয়েই দেখলেন, সম্মুখের রাস্তায় হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে। হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত আবূ ছলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার! আপনি ঘর থেকে বেড়িয়ে আসলেন কেন? তিনি বললেন, “হুযূর! আপনি যা বলেছিলেন এখন দেখি তার বিপরীত।” হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, “বাবা তিনিই আপনার স্ত্রী। রাত কাটান। সকালে আপনার প্রশ্নের জবাব দিব।”
পরদিন হযরত আব্দুল্লাহ সাওমাই রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হযরত আবূ ছলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে বললেন, বাবা! আমার মেয়েকে আমি অন্ধ বলেছি এজন্যে, আমার মেয়ে কখনও কোন পর পুরুষকে দেখনি। বোবা বলেছি এজন্যে, সে কখনও কোন পাপের কথা মুখে আনেনি। বধির বলেছি এজন্যে, সে কখনও পাপের কথা কানে শুনেনি। খঞ্জ ও লুলা বলেছি এজন্যে, সে কখনও কোন পাপের পথে পা বাড়ায়নি এবং কোন পাপ কাজ স্পর্শ করেনি। কালো ও কুৎসিত এজন্যে বলেছি, তাকে কখনও কোন পর পুরুষ দেখেনি। এ কথা শুনে হযরত আবূ ছলেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার শুকরগুজার করলেন। এখানে ফিকিরের বিষয়, কেমন নেককার ও পরহেযগার মুত্তাকী পিতা ও মাতার ঘরে ওলীয়ে মাদারজাদ গাউসুল আ’যম হযরত শায়খ সাইয়্যিদ মুহিউদ্দীন আব্দুল ক্বাদির জিলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন। উনারই ওফাতের মাস হচ্ছে রবিউস সানী মাস। অর্থাৎ এ মাসেরই ১১ তারিখে তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। যা সারাবিশ্বে “ফাতেহা-ই- ইয়াযদাহম” নামে মশহুর। সুতরাং এ মাসের ফযীলত বর্ণনা করার অপেক্ষাই রাখেনা।
মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ-সম্মানিত রবীউছ ছানী শরীফ মাস এবং উনাদের প্রাসঙ্গিক আলোচনা
জুমাদাল উলা মাস ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা